Tuesday, 27 April 2021

মোরগ ফুল (Cockscomb flower)

 


মোরগ ফুল ।

এশিয়ার নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চল (দক্ষিণ, পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) এবং ক্রান্তীয় বা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আফ্রিকায় এর আদি নিবাস । ওয়েস্ট ইন্ডিজ, উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকাতেও পাওয়া যায় । এ ফুলগাছটি স্থানীয় পর্যায়ে প্রাকৃতিকভাবেই বন্যফুল হিসেবে জন্মে । এছাড়া এটিকে পুষ্টিকর সবুজ শাকসব্জী হিসেবে চাষ করা হয় । মোরগ ফুলগাছ মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলিতে ঐতিহ্যবাহী খাদ্য (বা শস্য) হিসেবে গ্রহণ করে এবং নাইজেরিয়ার অন্যতম প্রধান পাতাযুক্ত সবুজ শাকসব্জি, যেখানে এটি ‘Soko yokoto’ নামে পরিচিত, যার অর্থ “স্বামীদের স্বাস্থ্যবান এবং সুখী করুন” । এটি পালং শাকের মতো এমন স্বাদ নয় । আর্দ্র অঞ্চলে ভালো কাজ করে ৷ স্পেনে এটি “Rooster comb” নামে পরিচিত ৷ ভারত, বেনিন, কঙ্গো এবং ইন্দোনেশিয়ায় আহার্য সামগ্রী হিসেবে পরিচিত ও ব্যবহৃত হয় । সম্ভবত এটি মূলত ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করেছিল ৷ প্রাচীনকাল থেকেই যেখানে ভারতীয়, বার্মিজ এবং চীনা উদ্যানরক্ষক বা মালী এ গাছটিকে মন্দিরগুলির নিকটে রোপণ বা চাষ করেছিলেন, যা দ্বারা বিভিন্ন ধরণের ধর্মীয় তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় যুক্ত ছিল এবং এটি রোপণ বা চাষের ফলে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল । দারুণ আকর্ষণীয়, মনোমুগ্ধকর এবং মখমলের মতো মোলায়েম এ রক্তবর্ণ ফুলের জনপ্রিয়তা বাংলাদেশেও রয়েছে ।
এর ইরেজি নাম: Cock’s comb flower, Red Fox, Feather Cockscomb, Red Spinach, Plumed Cockscomb, Feathery Amaranth, Woolflower, Cockscomb ‘Century Rose’, Wild Cockscomb, বাংলা নাম: মোরগ ফুল / লালমুর্গা / মোরগঝুঁটি, হিন্দি নাম: Lalmurga, মনিপুরী নাম: Haolei, তামিল নাম: Kozhi poo ।
বৈজ্ঞানিক নাম: Celosia argentea var. cristata ।
এটি বিভিন্ন Celosia argentea প্রজাতির Cristate বা Crested প্রজাতি । Celosia genus এর মধ্যে প্রায় ৫০ টিরও বেশি প্রজাতি রয়েছে । এর মধ্যে C. argentea var. argentea বা Lagos spinach (A.K.A. quail grass, Soko, Celosia, Feather cockscomb, Silver cockscomb), Celosia argentea var. cristata, C. argentea var. plumosa Voss (Feathery amaranth, Plume Cockscomb, Plumed Celosia) ইত্যাদি নানা বৈচিত্র্যের প্রজাতি । পূর্ব আফ্রিকার উচ্চভূমিতে এ উদ্ভিদগুলি Swahili নামে সুপরিচিত । এছাড়া Celosia spicata, যেটি গম সেলোসিয়া (Wheat celosia) নামেও পরিচিত । এ প্রজাতিটির ফুলের মাথাগুলি গমের মাথা বা বোতল ব্রাশের (Bottle brush) সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ । তবে Celosia plumosa প্রজাতিটি Prince of Wales feather হিসেবে পরিচিত এবং ভারত ও জাপানে আগাছা হিসেবে বিবেচিত হয় । গাছটি প্রায়শই হরিণ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হয় ।
Amaranthaceae পরিবারভুক্ত একটি উদ্ভিদ ।
গণ: Celosia (Celosia নামটি এসেছে প্রাচীন গ্রীক শব্দ κήλεος (কেলিয়স) বা Kelos থেকে, যার অর্থ হচ্ছে ‘জ্বলন্ত’ বা ‘Burned’)
প্রজাতি: C. argentea ।
কান্ডের ঠিক অগ্রভাগে মোরগের মাথা’র লাল ঝুঁটির মতো আকৃতির কারণেই এর নাম মোরগ ফুল । তবে বাংলাদেশে অঞ্চল ভেদে মোরগঝুঁটি ও লালমুর্গা নামেও পরিচিতি রয়েছে । প্রায় সর্বত্রই এটির দেখা মেলে । মোরগ ফুল বর্ষজীবি গুল্ম জাতীয় ভেষজ উদ্ভিদ । এ গাছটি উষ্ণতা প্রিয় এবং কিছুটা খরা সহনশীল, তাই শুকনো পরিস্থিতিতে সর্বোত্তম উপায়ে বৃদ্ধি পায় । ঠান্ডার প্রতি খুব সংবেদনশীল হওয়ার কারণে হিমশীতল আবহাওয়ায় বাঁচতে পারে না । এ বর্ণময়-রঙিন-প্রাণবন্ত মোরগফুল গ্রীষ্ম, হেমন্ত, শীত ঋতুর ফুল । চাষ করার দুই-তিন মাসের মধ্যেই গাছে মোহনীয় ফুল ধরে এবং গাছটি কয়েক মাসের মধ্যে প্রকৃতির নিয়মেই মৃত্যু ঘটে । ফুলগুলি প্রায় ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে । পরিপক্ক ফুলের মাঝে ডাঁটা বীজের মতো বীজ হয় । প্রতিটি ফুল থেকে একটি উচ্চ সংখ্যক বীজ উৎপাদিত হতে পারে, প্রতি গ্রামে ১৫০০ বা প্রতি আউন্সে ৪৩০০০ পর্যন্ত মসৃণ-চকচকে বীজ থাকে । বিভিন্ন ধরণের আকর্ষণীয় সুন্দর ফুলগুলি হচ্ছে Gypsy Queen, Red Velvet, Fan Dance Scarlet, King Coral, Crested Armor, Forest Fire, Flamingo Series (Flamingo Feathers), Arrabona Red, Fresh Look Red, Fresh Look’ Mix, Plumed Castle ইত্যাদি । এটি একটি শোভাময় পল্লবগুচ্ছ ও ফুল, সর্বোপরি সৌন্দর্যবর্ধক গাছ । গাছের কান্ড পুরু ও নরম, দেখতে লালচে বা সাদা । শাখা-প্রশাখা বের হয় । এর গায়ে অসংখ্য গিঁঠ থাকে । পাতা লম্বা, এর শিরা-মধ্য শিরা সুস্পষ্ট এবং পাতার অগ্রভাগ বর্শার ফলা আকৃতির । চটকদার, স্বতন্ত্র এবং সূক্ষ্মতাপূর্ণ বিভিন্ন দুর্দান্ত রঙের ফুলগুলি পালকগুচ্ছ মোমবাতির শিখা, প্রবাল ও মস্তিষ্কের অনুরূপ কিছু মনে হয় । অপরূপ সুন্দর উজ্জ্বল রঙের মোলায়েম পালকের মতো ফুলগুলি অনেকগুলি ছোট ছোট ফুলের সমন্বয়ে গঠিত । বলতে গেলে, ছোট ছোট ফুলে ঠাসা মঞ্জরি । পুষ্পমঞ্জরির ধরণ হচ্ছে Spike । মোরগ ফুল ফোটে থোকায় থোকায়, উজ্জ্বল রঙের কারণে পোকামাকড় ও মানুষকে আকৃষ্ট করে তীব্রভাবে । বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের রঙ ভিন্ন হয় । লাল, কমলা, ক্রিমযুক্ত হলুদ, হালকা বেগুনি থেকে গোলাপী, সাদা, রূপালি, সোনালী, Magenta, Apricot, Grey এবং কিছু ক্ষেত্রে দোআঁশলা বা সংকর বা মিশ্ররঙেও (Hybrid) প্রস্ফুটিত হয় । বিবাহের জন্য অপূর্ব ফুলের তোড়া, টেবিল বিন্যাস এবং বহিরঙ্গনে তাজা এবং শুকনো উভয় ফুল দুর্দান্তভাবে প্রদর্শন করে তোলে । মোরগ ফুল তিন ভাগে বিভক্ত হতে পারে; তাদের Spikes, Plumes এবং Crestsগুলি একে অপরের থেকে পৃথক হলেও বৈশিষ্ট্যে অভিন্নতা রয়েছে । ডাঁটা গাছের মতো দেখতে মোরগ ফুল গাছের এ সুন্দর রেশমী ফুলটি গন্ধহীন এবং এ ফুল শুকিয়ে গেলেও দীর্ঘদিন যাবৎ এর উজ্জ্বলতা নষ্ট হয় না । ফুলগুলি উভলিঙ্গ (Hermaphrodite) এবং উদ্ভিদটি Dodecaploidy প্রদর্শন করে । আদর্শ বীজতলায় বা এ ফুলের বীজ বপন করে মোরগ ফুলগাছের বংশ বিস্তার করা যায় । পরবর্তী মৌসুমে চাষ করার জন্য এ ফুলের বীজকে সংরক্ষণ করা যায় । এ গাছে ফুলের পাপড়ি হয় না, তবে কিছু প্রজাতিতে Capsule আকৃতির বা ফাটিয়া যায় এমন শুকনো ফল দেখা যায় । মোরগ ফুলগাছ পর্যাপ্ত পরিমাণ ভেষজ গুণ সমৃদ্ধ । এ গাছের উপাদানগুলির মধ্যে রয়েছে Water, Vitamin C, Minerals, Carotenoids, Protein, Nitrate এবং Oxalate । বিশেষ করে শিকড় এবং বীজের মধ্যে Triterpene saponins সনাক্ত হয়েছে । এছাড়া শিকড়ের মধ্যে Sugar এবং পাতা ও কান্ডে Flavonoid রয়েছে । চুলকানি, মুখের ঘা, অতিরিক্ত প্রস্রাব, চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং রক্ত আমাশয় চিকিৎসায় এ ফুলগাছ ব্যবহৃত হয় । কোরিয়ায় প্রথাগতভাবে মিষ্টান্ন, চালের পিঠা এবং মদ্যপযুক্ত পানীয় হিসেবে ফুলগুলিকে চারিত ও সুশোভিত করে ব্যবহৃত হয় । প্রায় সকল প্রকার সমৃদ্ধ মাটিতেই মোরগ ফুলগাছ জন্মে ৷ বিশেষত সূর্য আলোকিত উর্বর দো-আঁশ মাটিতে বেশ ভালো হয় । গাছটি ৬.০ থেকে ৭.০ এর pH মাত্রায় মাটি পছন্দ করে । প্রায় ৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (60 °F) বা ১৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড (16 °C) মাটির তাপমাত্রা গাছটি বৃদ্ধির জন্য আদর্শ । এ উদ্ভিদ বা গাছের জন্য ক্ষতিকর কয়েকটি ছত্রাকজনিত রোগ (Powdery mildew, Edema, Fungal leaf spot) এবং পোকামাকড় বা কীটপতঙ্গ রয়েছে । যদিও কিছু Aphids, Spider mites, White filies গাছটিকে খেয়ে ফেলার জন্য বেশ পরিচিত । এ গাছটি প্রায়শই উচ্চতা ৩০ সেন্টিমিটার (০১ ফুট) পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় । এছাড়া এ জাতীয় কিছু কিছু বামন ধরণের উদ্ভিদ যেমন Jewel Box Mixture, Toreador কেবলমাত্র ০৬ থেকে ০৮ ইঞ্চি (লম্বা) পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় । গাছটিকে জোরে আঘাত করা এবং শামুক থেকে রক্ষা করাও জরুরি । বর্তমানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এ ফুলের চাষ করা হয় । 

https://muhammadashrafulalam.wordpress.com/2021/04/27/%e0%a6%ae%e0%a7%8b%e0%a6%b0%e0%a6%97-%e0%a6%ab%e0%a7%81%e0%a6%b2-cockscomb-flower/

Monday, 19 April 2021

Lake Natron

 🌿 ———————————————————————————————————————------------ 


🌿আফ্রিকা মহাদেশের পূর্ব আফ্রিকার দেশ তাঞ্জানিয়ার উত্তর প্রান্তে ২৯৬০ মিটার উচ্চতার ঈশ্বরের পর্বত নামে পরিচিত ওল ডোইনিও লেংগাই (Ol Doinyo Lengai) আগ্নেয় পর্বত অবস্থিত । পর্বতটি মূলত তাঞ্জানিয়ার বিগত কয়েক হাজার বছরের সর্বাধিক সক্রিয় একটি আগ্নেয়গিরি । এটি পৃথিবীর আগ্নেয়গিরিগুলোর মধ্যে অনন্য এবং ভয়ানক । এই আগ্নেয়গিরির অনেক পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে । অদ্ভুত আগ্নেয়গিরিটি নাইট্রোকার্বোনেট এবং পটাশিয়াম লাভার উদগীরণ ঘটায় । এটিই হচ্ছে বিশ্বের একমাত্র সক্রিয় কার্বোনেটাইট আগ্নেয়গিরি যার আয়তন প্রায় ১০৪০ বর্গকিলোমিটার । এই আগ্নেয় পর্বতের পাদদেশেই ৩.৬৬ মিলিয়ন বছর পূর্বেকার মানব পদচিহ্নগুলো (The hominid footprints) আবিষ্কৃত হয়েছে । ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে তাঞ্জানিয়ার আরুশা অঞ্চলের এনগোরোঙ্গোরো জেলার পিনয়িনি ওয়ার্ডে অবস্থিত প্রাক-ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান পেনিঞ্জে Australopithecus boisei মানবজাতির ১.৭৫ মিলিয়ন বছরের পুরোনো জীবাশ্মযুক্ত চোয়াল ও দাঁতের সন্ধান পাওয়া যায় । এই ওল ডোইনিও লেংগাই আগ্নেয়গিরির ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে প্রত্যন্ত অঞ্চলে দিগন্ত বিস্তৃত এক সুবিশাল লবণাক্ত, সাবান বা সোডা এবং ক্ষারীয় পানির ন্যাট্রন হ্রদ (Lake Natron) অবস্থিত । আর ভয়ঙ্কর আগ্নেয়গিরি থেকেই সোডিয়াম কার্বোনেট এবং ক্যালসিয়াম কার্বোনেট লবণের গলিত মিশ্রণ ন্যাট্রন হ্রদের জলে মিশে । ফলে, এই হ্রদে উচ্চ লবণ, ম্যাগনেসাইট, ক্লোরিন এবং ঘন সোডিয়াম কার্বোনেট (ধৌতকরণ সাবান বা সোডা, সাবান ছাই, সাবান স্ফটিক নামেও পরিচিত) জমা হয় । কেনিয়া সীমান্তের কাছে ও সমুদ্রতল থেকে প্রায় ৬১০ মিটার উচ্চতায় অগভীর প্রশান্ত জলাধার এই ন্যাট্রন হ্রদের দৈর্ঘ্য ৫৭ কিঃ মিঃ (৩৫ মাইল), প্রশস্ত ২২ কিঃ মিঃ (১৪ মাইল) এবং জলের গভীরতা ৩ মিটার (৯.৮ ফুট) এরও কম । নয়নাভিরাম হ্রদটি আফ্রিকার মহাফাটল উপত্যকার (The Great Rift Valley) গ্রেগরি ফাটলে (Gregory Rift) অবস্থিত, যা পূর্ব আফ্রিকার ফাটল (East African Rift) উপত্যকার একটি অংশ । বিচিত্র এই হ্রদটি এনগোরোঙ্গোরো অগ্নিমুখের উত্তরে সেরেঙ্গেটি জাতীয় উদ্যান এবং এনগোরোঙ্গোরো সংরক্ষিত অঞ্চলের নিকটে । ন্যাট্রন হ্রদের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে বিলুপ্তপ্রায় অতি উচ্চ গেলাই আগ্নেয়গিরি (উচ্চতা: ৯৬৫২ ফুট বা ২৯৪২ মিটার) অবস্থিত । হ্রদের নিকটে অগভীর অংশে অসংখ্য কঠিন সাদা লবণাক্ত ভেলা (White salt-crust rafts) রয়েছে । এই হ্রদের পানির সাধারণ তাপমাত্রা হচ্ছে ৪০ °C (১০৪ °F) । তবে, প্রায়শই এখানে ৬০ °C (১৪০ °F) নরকীয় তাপমাত্রায় পৌঁছে । আর এই উচ্চ তাপমাত্রার কারণেই হ্রদের অধিকাংশ পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার ফলে পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যায় । তাই, বেশিরভাগ প্রাণীর জন্যই হ্রদটি আশ্রয়যোগ্য নয় । ন্যাট্রন হ্রদের এই বিস্ময়কর উচ্চমাত্রার বাষ্পীভবনের পেছনে রয়েছে এক জটিল Natron (Sodium carbonate decahydrate, Na2CO3·10H2O) এবং Trona (Trisodium hydrogendicarbonate dihydrate বা Sodium sesquicarbonate dihydrate, Na2CO3·NaHCO3·2H2O) । এই হ্রদের জলীয় দ্রবণের অম্লতা বা ক্ষারত্ব ১২ থেকেও বেশি pH মাত্রায় পৌঁছতে পারে (এই ক্ষারত্ব নাইট্রোজেন ও হাইড্রোজেনের সমন্বয়ে গঠিত দুর্গন্ধযুক্ত বর্ণহীন গ্যাস অ্যামোনিয়ার মতোই প্রায় মৌলিক) । ফলে এটি কোনো প্রাণীর ত্বক এবং চোখ পুড়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে, যা পশু-পাখির পক্ষে অসহনীয় । মূলত, হ্রদের জলের ক্ষারধর্ম বা ক্ষারীয় প্রকৃতির কারণেই এমন ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে থাকে ।

তাঞ্জানিয়ার অতি লোনা (Hypersaline) হ্রদটিতে খুব কম সংখ্যক প্রাণীই বেঁচে থাকার সাফল্য অর্জন করতে পারে কারণ, এটি অত্যাধিক পরিমাণ লবণ ধারণকারী । কিন্ত, আগুনে পাখি ফ্ল্যামিঙ্গোর (Flamingo) ক্ষেত্রে সম্পূর্ণই ব্যতিক্রম । তাই ন্যাট্রন হ্রদের উষ্ণ জল, সংলগ্ন এলাকা ও বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলোই হচ্ছে বিলুপ্তপ্রায় Lesser Flamingo (Phoeniconaias minor) দের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং নিরাপদ একটি আদর্শ প্রজনন ক্ষেত্র ৷ পূর্ব আফ্রিকায় প্রায় ১.৫ - ২.৫ মিলিয়ন লেসার ফ্ল্যামিঙ্গো রয়েছে, যা বিশ্বের জনসংখ্যার তিন-চতুর্থাংশই প্রতিনিধিত্ব করে । তাদের বেশিরভাগই প্রকৃতির এই নির্ভেজাল স্বর্গ ন্যাট্রন হ্রদে নিরাপদ বসবাস এবং বংশবৃদ্ধি করার জন্য এক বৃহৎ পাল নিয়ে দল বেঁধে নেমে পড়ে । এছাড়া, পৃথিবীর অনান্য জায়গায় বিপন্ন হয়ে পড়া লেসার ফ্ল্যামিঙ্গোরা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এই হ্রদকে বেছে নিয়েছে । কারণ, এখানে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে লাল-নীল-সবুজ বর্ণের Arthrospira fusiformis বা Spirulina নামক শেওলা জাতীয় খাদ্য (যার মধ্যে আছে ক্যারোটিনয়েড বা সালোকসংশ্লেষক রঙ্গক পদার্থ), পর্যাপ্ত বাসা বাঁধার স্থান এবং সর্বোপরি বিচ্ছিন্ন-নির্বিঘ্নিত-অব্যবহৃত এই হ্রদটি । ফ্ল্যামিঙ্গোরা সাধারণত এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে এবং অন্য পা শরীরের নিচে থাকে । তাদের এই অদ্ভুত আচরণটি অজানা । হতে পারে, শরীরের তাপ সংরক্ষণ ও ভারসাম্য বজায় রাখে । এরা খুবই সামাজিক এবং কোলাহলপূর্ণ পাখি । ব্রাইন চিংড়ি, শৈবাল, পোকা-মাকড়, ছোট পোকা-মাকড়ের লার্ভা, মলাস্ক ও ক্রাস্টেসিয়ানকে পরিস্রুত করার মাধ্যমে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি বজায় রাখতে তাদের চঞ্চুর মধ্য দিয়ে জলশোধন ব্যবস্থা করতে পারে । সর্বভুক ফ্ল্যামিঙ্গোরা প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি বা মার্চের কাছাকাছি সময়ে লবন হ্রদে একত্রিত হয় । গোলাপী পাখায় ঢেউ তোলে আসার সাথে সাথে কখনো হঠাৎ তারা অদৃশ্য হয়ে যায় । আবার নিরিবিলি ফিরে আসে । বিশেষত জুলাই থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে প্রায় ২ মিলিয়ন লেসার ফ্ল্যামিঙ্গো প্রজনন ও বাসা বাঁধার জন্য হ্রদের তীর বা সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছে যায় ৷ গ্রেটার ফ্ল্যামিঙ্গোরা কাদামাটির সমতল ভূমি ও ছাই রঙের মাটির ঢিবিতে বাসা বাঁধে এবং বংশবৃদ্ধি করে । বিটা-ক্যারোটিনের কারণে ফ্ল্যামিঙ্গো পাখি গোলাপী থেকে উজ্জ্বল লাল রঙের হয় । স্বাস্থ্যকর খাদ্য বা পুষ্টির কারণেই এরা প্রাণবন্ত রঙের অধিকারী । গোলাপী দেহ এবং শুভ্রতার মাঝে রক্তবর্ণ পাখার বিশাল ফ্ল্যামিঙ্গো গোষ্ঠী যখন হ্রদের চারদিকে ঘুরে বেড়ায় কিংবা অসীম নীলাকাশে উড়ে যায় প্রকৃতির এই এক অপার সৌন্দর্য ৷ মনোমুগ্ধকর অনুপম দৃশ্য ৷ স্বর্গীয় সুখের হাতছানি । এক দারুণ অনুভূতি । কখনো মনে হয়, এটি যেন ”গোলাপী কুচকাওয়াজ” ।
এখানে অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও লবণাক্ততা ভয়াবহ রূপ নিলেও বেশিরভাগ উদ্ভিদ এবং প্রাণীজ প্রাণীদের জন্য এই হ্রদকে অতিথিপরায়ণ করে তোলে । ন্যাট্রন হ্রদ হচ্ছে লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র অমেরুদণ্ডী প্রাণী ক্রাস্টেসিয়ানদের বাসস্থান । এখানে যথেষ্ট অভিযোজিত বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্র বা আণুবীক্ষণিক জলজ জীব প্লাঙ্কটন (ব্যাকটেরিয়া, আর্কিয়া, ডায়াটমস ও সবুজ শৈবাল ইত্যাদি) জৈবিকভাবে অত্যন্ত উৎপাদনশীল । এই হ্রদটি আরো প্রায় ১০০০০০ অন্যান্য জলচর পাখিদের (ফিশার'স লাভবার্ড, মাছরাঙা, ভন ডার ডেকেন'স হর্নবিল, লাল ও হলুদ বারবেট, কর্ডনব্লু, লিলাক রোলার ব্রেস্ট, প্যারাডাইস হোয়াইডাহ, হিলডেব্রান্ট'স স্টারলিং, আর্নড'স বারবেট, রুপেল'স গ্রিফন) জন্য আশ্রয় ও সহায়তা প্রদান করে থাকে, যার মধ্যে অনেকগুলোই হচ্ছে প্যালিআর্কটিক অভিবাসী । উল্লেখ্য যে, প্যালিআর্কটিক হচ্ছে পৃথিবীর একটি জৈব-ভৌগলিক অঞ্চল, যা হিমালয় এবং উত্তর আফ্রিকার উত্তরে ইউরেশিয়া জুড়ে রয়েছে । পৃথিবীর ৮টি জৈব-ভৌগলিক অঞ্চলের মধ্যে এটিই বৃহত্তম এবং প্রায় সম্পূর্ণরূপে পূর্ব গোলার্ধে অবস্থিত । এই হ্রদ অঞ্চলে ব্রাজিলিয়ান সালমন গোলাপী পাখি মাটির ঢিবিতে বাসা বাঁধে ও বংশবৃদ্ধি করে । ন্যাট্রন লবণ হ্রদের আশেপাশের উপকূল অঞ্চল খবুই নির্জন । এখানে শুষ্ক মৌসুমে চন্দ্রের এক অনাবিল সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পরিণত হয়, যেখানে মরুভূমির শুষ্কতার বিপরীতে উজ্জ্বল গোলাপী ক্যাকটাস ফুল ফোটে । ধুলাবালিময় পাথরসহ কদাচিৎ শীতের মরুভূমিতে তুষারপাত ঘটে । ডিসেম্বর মাস থেকে মে মাসের মধ্যে প্রতিবছর মোট ৮০০ মিলিমিটার (৩১ ইঞ্চি) অনিয়মিত মৌসুমী বৃষ্টিপাত হয় । তবে, তৃণভূমিতে কিছু পশুপালন ও মৌসুমী চাষ হয় ৷ ন্যাট্রন হ্রদ থেকে নিকটতম শহরগুলো হচ্ছে তাঞ্জানিয়ার আরুশা এবং কেনিয়ার মাগাদি । এই হ্রদের চারপাশে ও কাছাকাছি খাড়া-উঁচু পাহাড় বরাবর দ্রুতগামী স্রোত, বিপুল সংখ্যক আগ্নেয়গিরির হিংস্র জ্বালামুখ, গিরিখাত, রুপেল'স গ্রিফন শকুনের বাসা বাঁধার নিরাপদ জায়গা এবং উচ্ছ্বল জলপ্রপাতগুলো এক চমৎকার দুঃসাহসিক হয়ে ওঠে ৷ এছাড়া হ্রদ থেকে দূরে অরণ্যময় প্রাকৃতিক দৃশ্য, সু-দূর প্রান্ত, শুকনো আগ্নেয়গিরির শিলা, মরুভূমির গোলাপ, অ্যাডেনিয়াম, ওবেসাম, রসালো উদ্ভিদ, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সরস খেজুর এবং মাসাই সম্প্রদায়ের সাথে খানিকটা সময় কাটানো এক অনন্য মিশ্রণ । হ্রদের অ-দূরে তাবু খাটানো বা শিবির করার জন্য অসংখ্য সুন্দর স্থান রয়েছে, যেগুলো ওল ডোইনিও লেংগাই পর্বত আরোহণেরও ঘাঁটি হিসেবে পরিণত হয় । এছাড়া, আরো কিছু ছোট ছোট শিবির এলাকা রয়েছে যেমন: মাসাই জিরাফ ইকো ক্যাম্প এবং ওয়ার্ল্ড ভিউ ইত‍্যাদি । পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করে এই হ্রদে পর্যটনের ক্ষেত্রে এক আকর্ষণীয় সম্ভাবনা রয়েছে, যা ইকোট্যুরিজম বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । তাঞ্জানিয়ার লেক ন্যাট্রন বেসিন ২০০১ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা জুলাই হ্রদটির অনন্য জীববৈচিত্র্যের কারণে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমির রামসার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে । এই হ্রদটি আন্তর্জাতিক বন্যজীবন তহবিলের পূর্ব আফ্রিকার 'হ্যালোফাইটিক্স ইকোরিজিয়ন’ । তবে, এই প্রজনন ভূমিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সুরক্ষা বা সংরক্ষণ করা না হলে এটি পর্যায়ক্রমে হুমকির সম্মুখীন হতে পারে । এই অঞ্চলের আশেপাশে মাউ ফরেস্ট, তারাঙ্গীরে ন্যাশনাল পার্ক এবং মানিয়ারা লেক ন্যাশনাল পার্কের মত এখানেও একটি সুন্দর বন্যজীবন রয়েছে- যেখানে বসবাসকারী প্রাণী হচ্ছে: জেব্রা, উটপাখি, ওরিক্স, গেজেল, গেরেনুক, জিরাফ, ওয়াইল্ডেবিস্ট, মহিষ, উট, বেবুন, হাতি, সিংহ, লেসার কুডু, সোনালি শেয়াল, হায়েনা, চিতাবাঘ, বুশবাক, ওয়াটারবাক ও বানর ইত্যাদি । ন্যাট্রন হ্রদের অত্যন্ত শুষ্ক, গরম, কঠোর ও বৈচিত্র্যময় পরিবেশে কতিপয় স্থানীয় শৈবাল, অমেরুদণ্ডী প্রাণী, পাখি এবং এর প্রান্তের চারপাশে অতি কম নোনতা জলে কিছু মাছ বাঁচতে পারে । স্থানীয় দুইটি মৎস্য প্রজাতি হচ্ছে: অ্যালকালিন তেলাপিয়াস অ্যালকোলাপিয়া লাটিলাব্রিস এবং অ্যালকোলাপিয়া এনডালালানি । এই মাছগুলো গরম বসন্তে বৃহৎ জলাশয় থেকে নির্গত জলধারায় কিংবা পাথর খাঁজের কিনারাতে বেঁচে থাকার সাফল্য অর্জন করেছে, অর্থাৎ এরা এই হ্রদে অভিযোজিত হয়েছে । এছাড়া, বিপন্ন প্রজাতির অ্যালকোলাপিয়া অ্যালকালিকা মাছের উপস্থিতি রয়েছে এই হ্রদে, যদিও এটি এ স্থানীয় প্রজাতি নয় । হ্রদের উত্তর প্রান্তের অঞ্চলটি প্রস্তাবিত উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মিঠা জল ধারণের জন্য একটি বাঁধ বা পরিখা নির্মাণের কথা রয়েছে । এছাড়া ন্যাট্রন হ্রদের জন্য একটি নতুন হুমকি হচ্ছে যে, হ্রদের তীরে কয়লা চালিত শক্তি কেন্দ্র 'সোডা অ্যাশ প্লান্ট’ নির্মাণ করা, যেখানে প্রকল্পটি দমকলের সাহায্যে হ্রদের জল থেকে সোডিয়াম কার্বোনেট আহরণ করে নিষ্কাশনের মাধ্যমে রূপান্তর ঘটিয়ে ওয়াশিং পাউডার রপ্তানি করবে । সম্ভাবনা রয়েছে যে, উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান উক্ত প্রকল্পের নিষ্কাশন দক্ষতা বা ক্ষমতা বাড়াতে একটি হাইব্রিড ব্রাইন শ্রিম্প প্রবর্তন করতে পারে । যদিও সচেতন নাগরিক, পরিবেশবাদী ও পরিবেশ রক্ষাকারী বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবাদের মুখে তানজানিয়ার ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন এবং টাটা কেমিক্যালস লিঃ এই প্রকল্প থেকে সরে আসে । এছাড়া, মধ্য কেনিয়া থেকে বয়ে আসা ইওয়াসো এনগিরো নদীর জল তাঞ্জানিয়ার ন্যাট্রন হ্রদে এসে মিশে থাকে । কিন্তু, এই নদীতে প্রস্তাবিত একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হলে হ্রদের স্বকীয়তা এবং এর উপর নির্ভরশীল বিশাল ফ্ল্যামিঙ্গো প্রজাতি ও অন্যান্য প্রাণী অনিবার্যভাবে হুমকির সম্মুখীন হবে । প্রত্যক্ষভাবে লেসার ফ্ল্যামিঙ্গোদেরকে বিলুপ্তির দিকে ধাবিত করবে । এদিকে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি মনুষ্য সৃষ্ট নানাবিধ কর্মকাণ্ড দ্বারা ফ্ল্যামিঙ্গো পাখিসহ এই অঞ্চলের জীব-বৈচিত্র্যকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে । ফলে, এই গ্রহের এক সুন্দর এবং নোনতা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আশ্চর্য সম্পদটি হারিয়ে যেতে পারে । সুতরাং যে-ই হোক না কেন, এই কাজ থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে ৷ তা না হলে, হ্রদের পরিবেশের ভারসাম্য এবং শান্তিভঙ্গের জন্য এমন নির্মম ব্যবস্থার মুখে লেসার ফ্ল্যামিঙ্গোদের বংশবৃদ্ধি অব্যাহত করার সম্ভাবনা খুবই নগন্য হবে । যার পরিণতিতে হ্রদের প্রজনন স্থানটি সম্ভাব্যভাবে ধ্বংস হয়ে এদের জীবন-জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে ভয়ঙ্কর ক্ষতি করবে । বিশ্বের ৭৫ শতাংশ লেসার ফ্ল্যামিঙ্গো পাখি এই হ্রদে জন্মগ্রহণ করে । তাই, এই ধরণের অদূরদর্শী ও পরিবেশ প্রতিবন্ধক উন্নয়নের ফলস্বরূপ পূর্ব আফ্রিকায় লেসার ফ্ল্যামিঙ্গোরা বিলুপ্তির মুখোমুখি হবে । এই কারণেই 'আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা' প্রজাতিটিকে “হুমকির কাছাকাছি” ঘোষণা করেছে । অতএব, হুমকির মুখে পড়া এই অভিবাসী প্রজাতিটির খাদ্য নিরাপত্তা, নিরাপদ আবাস, বংশবৃদ্ধি এবং সংরক্ষণ অতিজরুরি । পাশাপাশি “Think Pink" এর মাধ্যমে আফ্রিকার ফ্লেমিঙ্গোকে বাঁচাতে হবে এবং এদের রক্ষার জন্য প্রচার ও সচেতনা বৃদ্ধি করতে হবে www.birdlife.org । ন্যাট্রন হ্রদ এবং এর বাস্তুতন্ত্র স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য জীবন-জীবিকার একটি উৎস নির্বাহ করে ৷ মাসাই উপজাতি সদস্যরা এই হ্রদের 'রামসার জলাভূমি স্থানে' বিস্তৃত অর্ধ-যাযাবর যাজকবাদের (Semi-nomadic pastoralism) অনুশীলন করে থাকেন । হ্রদটির জলের সংস্পর্শে আসা বিপজ্জনক বিধায় এখানে সাঁতার কাঁটা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ । বিভিন্ন উৎস থেকে পানি এই হ্রদের ভিতরে প্রবেশ করতে পারে, কিন্তু কোনো নদী বা সমুদ্রের দিকে এখানকার পানি প্রবাহিত হয় না । ফলে, প্রকৃতিগতভাবেই নানা খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ হয়েছে ঐশ্বর্যময় এই হ্রদটি । হ্রদের চারপাশে শিলা বিছানার ভিত দিয়ে গঠিত । প্রচুর পরিমাণ সোডিয়াম এবং উচ্চ মাত্রার কার্বোনেটের আধিপত্যের কারণে ট্র্যাকাইট লাভা দ্বারা প্রায় ২৬ লক্ষ বছর আগে (Pleistocene period) ন্যাট্রন হ্রদের তলদেশ তৈরি হয়েছিল । যদিও উক্ত লাভায় ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের মাত্রা ছিল খুবই কম । হ্রদটি এক দগ্ধকারক ক্ষারীয় নোনা জলের ঘনত্বের স্পষ্টতা দিয়েছে । যার ফলে হ্রদের জলে ক্ষারের পরিমাণ অস্বাভাবিক মাত্রায় থাকে ৷ মূলত সোডিয়াম কার্বোনেট এবং অন্যান্য খনিজ পদার্থ থেকে এই হ্রদে একটি শক্ত ক্ষারযুক্ত পদার্থ উৎপন্ন হয়- যা আসে হ্রদটির চারদিকে ঘেরাও করা পাহাড়-পর্বত, আগ্নেয়গিরির ছাই, নদী, উষ্ণ প্রস্রবণ, হ্রদের পৃষ্ঠের উপর সরাসরি বৃষ্টিপাত এবং প্রচুর সংখ্যক হাইড্রোথার্মাল ঝরনা থেকে । হ্রদে নেমে আসা জল অতিরিক্ত গরম ও তাপদগ্ধ জলবায়ুর কারণে দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে উচ্চ ঘনত্বের লবণ, অন্যান্য খনিজ পদার্থ, রাসায়নিক যৌগ ন্যাট্রন, দ্রবণীয় খনিজ ট্রোনা (ট্রোনা কাঁচ উৎপাদন, বস্ত্র রঞ্জন ও কাগজ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয়) এবং জলের মত তরল লাভা হ্রদের তলায় জমা হয়ে থাকে । ইংরেজি এবং জার্মান শব্দ 'ন্যাট্রন’ হচ্ছে ফরাসি সগোত্রীয় শব্দের ব্যুৎপত্তিগতভাবে প্রাপ্ত যা ল্যাটিন শব্দ ন্যাট্রিয়াম ও গ্রিক শব্দ নাইট্রন থেকে স্প্যানিশ ন্যাট্রনের মাধ্যমে উদ্ভূত হয়েছে এবং এটি প্রাচীন মিশরীয় শব্দ nṯrj থেকে এসেছে । ন্যাট্রন হচ্ছে একটি খনিজ লবণ এবং পানিতে দ্রবীভূত হয় । প্রাচীন মিশরীয়রা মমিকরণ প্রক্রিয়ায় ন্যাট্রন ব্যবহার করতেন । এছাড়া, ন্যাট্রনের অনেক ব্যবহারিক প্রয়োগ রয়েছে । এই রাসায়নিক পদার্থ ন্যাট্রন থেকেই হ্রদটির নামকরণ করা হয়েছে । জমাকৃত ন্যাট্রন কখনো কখনো লবণাক্ত হ্রদের বিছানায় পাওয়া যায় যেটি শুষ্ক পরিবেশে উদ্ভূত হয় ।
তাছাড়া, এই হ্রদের ভূপৃষ্ঠ থেকে নির্গত হয় শক্তিশালী বিষাক্ত গ্যাস হাইড্রোজেন সালফাইড । হ্রদের জলে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষারের পরিমাণ থাকার কারণে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় খাদ্য অর্জনকারী ও লবণগ্রাহী সায়ানোব্যাকটেরিয়া ও হ্যালোফিলিক অণুজীব এখানে জন্ম নেয় । এমন লবণাক্ত জলের পরিবেশে রাসায়ণিক বিক্রিয়ায় জন্ম নেয়া অণুজীবের পুষ্টির প্রধান উৎসই হচ্ছে লবণ । এই সকল সায়ানোব্যাকটেরিয়ার শরীরে থাকে এক প্রকার লাল রঞ্জক পদার্থ । ফলে, দূর থেকে হ্রদের জল রঙিন মনে হয় । তবে, হ্রদের কিনারায় জল হালকা গোলাপি ও পোড়া কমলা রঙ ধারণ করে । হ্রদের এই লাল রঙই তীব্রভাবে আকৃষ্ট করে পশুপাখিদেরকে এবং তারা মুগ্ধ হয়ে অবচেতন মনে নেমে পড়ে হ্রদের জলে । কিন্তু জলের অতিরিক্ত ক্ষারীয় বৈশিষ্ট্যই এদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায় । রহস্যে ঘেরা বিপজ্জনক এই হ্রদটি রূপকথার গল্পের মতই সুন্দর আর ভয়ঙ্কর । যেখানে ওৎ পেতে আছে নীরব মৃত্যুফাঁদ! কথিত আছে, এই হ্রদের উপর দিয়ে কোনো পাখি বা প্রাণী উড়ে গেলে সে আর বেঁচে ফিরে আসে না । অনাকাঙ্খিতভাবে অধিকাংশ প্রাণীরই তৎক্ষণাৎ করুণ মৃত্যু হয় কিংবা জীবন্ত প্রাণীকে পাথরের মত মূর্তিতে পরিণত করে ।
কিন্তু, কিভাবে?
বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে, সূর্য রশ্মি হ্রদের গাঢ় জলে পতিত হয়ে তা আয়নার মত প্রতিফলিত হয় । হ্রদের তলদেশ যেহেতু লাভা দ্বারা গঠিত, তাই সূর্যরশ্মি অধিক পরিমাণে প্রতিফলিত হয় । হ্রদ থেকে প্রতিফলিত হওয়া সূর্যরশ্মি হ্রদের উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া পাখির চোখে পড়ার কারণে তীক্ষ্ণ আলোর ঝলকানিতে চোখ ধাঁধিয়ে বা বিভ্রান্ত হয়ে পাখিটি হ্রদের জলে আছড়ে পড়ে । ফলে, হ্রদের জলে থাকা ঘন সোডা ও খনিজ লবণ পাখি বা প্রাণীটির দেহে লেগে গিয়ে (পানির অতিরিক্ত তাপমাত্রা, উচ্চমাত্রার ক্ষার ও ক্যালসিয়ামের রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে) অধিকাংশ পাখিই দুর্ভাগ্যবশত, অসহায় ও মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করে । ২০১১ খ্রিস্টাব্দে Nick Brandt নামে একজন ইংরেজ বন্যপ্রাণী চিত্রগ্রাহক এই হ্রদ সম্পর্কে তার ‘Across the Ravaged Land’ বইয়ে বিস্তারিত লিখেছেন । যাই হোক, ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক! কদাচিৎ কোনো পাখি বা বাদুড় জীবন সংগ্রাম করে মৃত্যুহ্রদের জল থেকে কোনোভাবে তীরে এসে পড়লেও ভিজে যাওয়া শরীর বাতাসে শুকানোর সাথে সাথে সোডা ও লবণ তাদের শরীরকে কামড়ে ধরে জীবন্ত অবস্থাতেই একসময় মূর্তি বানিয়ে ফেলে [প্রাণীর দেহে ক্যালসিয়াম জমা হয়ে কোষগুলোকে জমাটকরণ বা প্রস্তরীভবনের মাধ্যমে (Calcification)] । হ্রদের পাশে পড়ে থাকা অসংখ্য বাদুড়, মাছরাঙা, রাজহাঁস, মেছো ঈগল, দুর্লভ ভাবে ফ্ল্যামিঙ্গো, স্টার্লিং, ধনেশ, চড়ুই এবং ঘুঘু ইত্যাদি প্রাণীকে প্রকৃতি তার বিস্ময়কর কর্মশালায় এমন নির্মম ও নান্দনিকভাবে মূর্তি বা ভাস্কর্য তৈরি করে যে- মনে হয়, কোনো ভাস্করের নিখুঁত ভাস্কর্য । কখনো মনে হয়, যেন জীবন্ত জীবাশ্ম । তবে অনেকেই দ্বি-মত করেন যে, এটি অবশ্যই সত্য নয় । কারণ, হ্রদে একটি সমৃদ্ধ বাস্তুসংস্থান রয়েছে । যদিও চিত্রগ্রাহক নিক ব্র্যান্ডট সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে, প্রাণীগুলো কিভাবে মারা গেল সেই সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিল না ।
কিন্তু, লেসার ফ্ল্যামিঙ্গোরা ন্যাট্রন হ্রদের এমন খুনি চরিত্র এবং চরম আবহাওয়া সম্পর্কে দারুণভাবে ওয়াকিবহাল । নইলে, কিভাবে এরা লম্বা লম্বা পা ফেলে হ্রদের অগভীর জলে নির্বিঘ্নে-নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায়?
তবে কি, লম্বা পায়ের কারণেই হ্রদের জল থেকে এদের দেহ অনেক উপরে থাকে বলেই জল স্পর্শ করতে পারে না । অবশ্য, এরাতো নিজেদের বাঁচার তাগিদেই লম্বা গলা, মাথা এবং শাণিত ঠোঁটকে হ্রদের জলে ডুবিয়ে খাদ্য খুঁজে বেড়ায়, স্নান করে ও জলকেলিতে কতই না মত্ত থাকে ।
না কি, ফ্ল্যামিঙ্গোদের পায়ের ত্বক খুব শক্ত হওয়ার কারণে হ্রদের লবণাক্ততাকে সহ্য করার ক্ষমতা রাখে ।
পরম সৃষ্টিকর্তাই জানেন- ন্যাট্রন হ্রদের এমন রহস্যময়, চরম বৈরী পরিবেশ এবং আফ্রিকা মহাদেশের বেশিরভাগ প্রাণীকুলের জন্য সর্বাধিক অস্বাস্থ্যকর বা দূষিত স্থানে এক সংগ্রামী জীবন ও বংশবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে রক্তাভ পাখার ফ্ল্যামিঙ্গোরা কিভাবে নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে নিয়েছে?
কিভাবেই তারা বেঁচে থাকে এই মৃত্যু উপত্যকায়?
সত্যিই, বিস্ময়কর! 

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, আন্তর্জাল । 

Satellite image: Lake Natron (Tanzania) 

Source: https://commons.wikimedia.org/wiki/File:Lake_Natron_(Tanzania)_%E2%80%93_2017-03-06_(very_early_in_rainy_season)_%E2%80%93_satellite_image_(cropped).jpg 


Satellite map of Lake Natron in Google Maps:   https://www.expertafrica.com/tanzania/lake-natron/google-map

Lake Natron : https://www.brilliant-africa.com/tanzania/lake-natron 

Satellite map of Lake Natron in Google Maps  




























































































































প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...