Wednesday, 23 December 2020

দুধকোশী নদী (Dhudh Koshi River / Milk-Koshi River)


এশিয়ার ছয় দেশ আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, চীন, নেপাল এবং ভূটানে বিস্তৃত হিমালয় পর্বতমালা (হিম+আলয় = বরফের ঘর) পর্বতমালা অবস্থিত, যা তিব্বতীয় মালভুমি থেকে ভারতীয় উপমহাদেশকে পৃথক করেছে । উঁচু এ পর্বতমালায় উল্লেখযোগ্য পর্বত শৃঙ্গ হচ্ছে: মাউন্ট এভারেস্ট, কে-টু (K2), কাঞ্চনজঙ্ঘা, লোৎসে, মাকালু, চো ওইয়ু, ধবলগিরি, মানাসলু, নাংগা, অন্নপূর্ণা, গাশারব্রুম-১, ব্রড পিক, গাশারব্রুম-২, শিশাপাংমা, নন্দা দেবী । এটি ক্রমাগত একে অন্যের প্রায় সমান্তরাল ধারায় উল্লম্বভাবে দূরত্ব স্থাপন করেছে । কোথাও দুটি ধারা একত্রিত হয়ে মিশে গিয়ে সৃষ্টি করেছে অসংখ্য উপত্যকা, অধিত্যকা এবং বালিয়াড়ি । পর্বত পাদদেশীয় ঘনজঙ্গল, জলাভূমি এবং সমভূমি থেকে সারিবদ্ধ অনুচ্চ পাহাড়ের ভিত ধরে উচ্চ থেকে আরও উচ্চে উঠে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে হিমালয় শ্রেণীর তুষার আবৃত শিখর । হিমালয়ের গগনস্পর্শী সুউচ্চ চূড়াগুলো বিস্তীর্ণভাবে জমাট হিমশীতল বরফে ঢাকা থাকে, যেখান থেকে নেমে আসে অসংখ্য ছোট-বড় হিমেল রসনা (Tongues of Ice) যেগুলো হিমবাহ (Glacier) নামে পরিচিত । তুষার আর কঠিন বরফে হিমায়িত এ পর্বতমালা থেকে আন্তর্জাতিক প্রধান নদী সিন্ধুগঙ্গা,  ব্রহ্মপুত্র, কালি, তিস্তা এবং শতদ্রু ইত্যাদি প্রধান নদী ও উপ-নদী উৎপন্ন হয়েছে । মেসোজোয়িক যুগে (The Mesozoic Era) ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় সঞ্চার (Drift), ক্রিটেসিয়াস-প্রাক-তৃতীয় যুগে (The Cretaceous-pre-Tertiary Era) সিন্ধু-সাংপো (Tsangpo) সন্ধিবলয় এবং সেনোজোয়িক যুগে (The Cenozoic Era) ভারতীয় ­প্লেট ও এশিয়ান প্লেট এর মধ্যে এক সংঘর্ষের কারণে সৃষ্ট সংকোচন ও বিকৃতি হিমালয় পর্বত সৃষ্টি করেছে । ট্রেকারদের (Trekker) স্বর্গ হচ্ছে হিমালয় পর্বত । সর্বাধিক জনপ্রিয় হিমালয়ের ট্রেক (Himalayan trek) হচ্ছে Everest Basecamp Trek, যেগুলো মাউন্ট এভারেস্ট এর বিপরীত দিক থেকে অবস্থিত । দক্ষিণ Base camp নেপালে, যা ৫,৩৬৪ মিটার (১৭,৫৯৮ ফুট) (২৮°০′২৬″ উত্তর ৮৬°৫১′৩৪″ পূর্ব) উচ্চতায় অবস্থিত এবং উত্তর Base camp তিব্বতে, যা ৫,৩৬৪ মিটার (১৭,৫৯৮ ফুট) (২৮°৮′২৯″ উত্তর ৮৬°৫১′৫″ পূর্ব) উচ্চতায় অবস্থিত । এ ঘাঁটিগুলো মাউন্ট এভারেস্টের উপর প্রাথমিক Resort camp, যা পর্বত আরোহণ এবং নামার সময় পর্বতারোহীরা ব্যবহার করে থাকেন ৷ সারা বিশ্বে ট্রেকাররা সংক্ষেপে একে Everest Base Camp (E B C) বলে থাকেন । অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এ পর্বতমালায় তথাপি চীন এবং নেপাল সীমান্তে অবস্থিত বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট (Mount Everest) / সগরমাথা / সাগরমাতা (সাগরের মাতা) / চোমোলংমা বা কোমোলংমা (মহাবিশ্বের মাতা) । এ শৃঙ্গটি হিমালয়ের মহালঙ্গুর হিমাল পর্বতমালায় অবস্থিত । আদিম কাল থেকেই মানুষ বিস্ময়কর অজানা রহস্যকে জানবার ইচ্ছায় দুঃসাহসিক অভিযাত্রায় অংশ নিয়ে কখনো সীমাহীন মহাকাশে, মহাসমুদ্রে, পর্বতশৃঙ্গে, দুর্গম মরুভূমিতে, জলপ্রপাতে, হিমবাহে, গভীর জঙ্গলে, পর্বতগুহায়, গিরিখাদে, তটভূমিতে এবং উপত্যকায় কঠিন প্রকৃতির সাথে তীব্র লড়াই করে নতুন নতুন আবিষ্কার ও নানাবিদ বিষয়াদি উদঘাটন করে চলেছেন ৷ শিক্ষা, চিন্তা-চেতনা, জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে আজও মানুষ দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে অসাধ্যকে সাধ্য করে এ গ্রহকে নিজ হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে বদ্ধপরিকর । 

দুর্গম পাহাড় ঘেরা গ্রাম । সমতল থেকে উচ্চতা প্রায় ১৪ হাজার ফুট এরও বেশি । সবুজ অরণ্যের মাঝে অপূর্ব সুন্দর সে গ্রাম । পাহাড়ের বুক চিড়ে দুর্বার গতিতে বয়ে চলেছে পাহাড়ি নদী দুধকোশী । এঁকেবেঁকে হারিয়ে গেছে পাহাড়ি জঙ্গলের মধ্য দিয়ে । জমাট বরফে ঢাকা পাহাড় চূড়ায় সূর্যের আলো পতিত হয়ে মেঘ ও কুয়াশার ফাঁকে অতি বেগুণি- নীলাভ আলোর বিচ্ছুরণ, প্রকৃতির এ এক বিস্ময়কর অনন্য সৌন্দর্য! পাহাড়ের ঢালে অথবা নানা বাঁকে বাঁকে টুপরি ঘর, কোথাও ছোটো ছোটো গ্রাম । যেখানে চা, গম, যব, জুম, আনারস, আলু, কলা, ভূট্টা ইত্যাদি চাষ হয় । দুধকোশী নদীর তীরবর্তী সবুজ এক অঞ্চল সলুখুম্বু উপত্যকা, এখানেই এক ছোট্ট গ্রাম সা-চু । নেপালি ভাষায় যার অর্থ হচ্ছে ‘গরম জলের উৎস’ । ঐতিহ্যবাহী এ গ্রামেই শেরপাদের বসবাস । শেরপারা নেপালি পর্যটন ইতিহাস এবং পর্বত আরোহী হিসেবে বিখ্যাত । এরা চাষাবাদের পাশাপাশি কেউ ব্যবসা করছে, আবার কেউ পর্বতারোহীদের মালামাল বহন করে থাকে । নামগিয়াল ওয়ান্দি ওরফে তেনজিং নোরগে নেপালের এক শেরপা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং একজন নেপালি শেরপা পর্বতারোহী ছিলেন । নেপালি ভাষায় তেনজিং অর্থ ধর্মবিশ্বাসী এবং নোরগে অর্থ ভাগ্যবান । তেনজিং নোরগের বাবা বলতেন, ”ঐ দিকে যাওয়া যায় না, চোমোলোংমা (Mount Everest) পাহাড়কে পাখিও অতিক্রম করতে পারে না” । কিন্তু সাহসী তেনজিং নোরগের মন এ কথা মানত না, সামনের উঁচু পাহাড়টা পেড়িয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন । অনেকেই এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন দেখেন, হয়তো এমন স্বপ্নই তাকে তাড়া করে বেড়াতো । তেনজিং নোরগে এভারেস্ট চূড়ায় পদার্পণের স্বপ্ন নিয়েই বড় হয়েছেন । এ পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পাহাড় এটি- তাই তার অদম্য ইচ্ছা একে জয় করবেনই । এরিক শিপটনের নেতৃত্বে ১৯৩৫ ব্রিটিশ এভারেস্ট পর্বত অভিযানতেনজিংয়ের জীবনে প্রথম পর্বতারোহণ অভিযানের (মালবাহক হিসেবে) সুবর্ণ সুযোগ আসে এবং পরবর্তীতে আরও কিছু অভিযানে অংশ নেন । ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২৯শে মে যৌথভাবে এভারেস্ট জয়ের স্বপ্নের অভিযানে অংশ নিয়ে নিউজিল্যান্ড অধিবাসী স্যার এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগে নেপালের দিক থেকে দক্ষিণ-পূর্ব শৈলশিরা ধরে সর্বপ্রথম পৃথিবীর সর্বোচ্চ গিরিশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টে আরোহণ করে এ শৃঙ্গ জয় করেন । 

আর এ সর্ব্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট চূড়ায় সৃষ্টি হয়েছে অপরূপ সৌন্দর্যের রাণী দুধকোশী নদী । মনোরম পরিবেশে এ নদীর উৎপত্তি হয়েছে খুম্বু হিমবাহ (Khumbu Glacier) থেকে । সমুদ্রতল থেকে পৃথিবীর সর্ব্বোচ্চ ২৯,০২৯ ফুট (৮৮৪৮ মিটার) উচ্চতায় বহমান এ নদীটি পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গ এভারেস্টের বিশাল পর্বতপ্রাচীর থেকে নির্গত হয় । সাদা ধবধবে দুধের মতো কুয়াশাচ্ছন্ন দুধকোশী নদী উদ্দাম বেগে বয়ে চলে । পর্বতশৃঙ্গের তুষার এবং হিমবাহ গলিত পানিই এর উৎস, যা নদীর জলপ্রবাহে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখে । পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দুর্দান্তভাবে বয়ে চলা এ নদীটি অসাধারণ সৌন্দর্য ধারণ করে আছে । সাধারণত পাহাড়ি নদীগুলো এক নৈসর্গিক আর ভয়ঙ্কর সৌন্দর্যের অধিকারী হয়ে থাকে । দুধকোশী নদীর শীতল বাঁকে প্রবাহিত স্বচ্ছ জল প্রশান্তি এনে দেয় । কোথাও টলমলে জল, আবার কোনো অংশ প্রচন্ড ঠান্ডায় বরফে জমাট বেঁধে থাকে দুধকোশী নদী । কখনও নদীর প্রাণচাঞ্চল্যতা, আবার কখনও স্থবির বা নিস্তেজতা, কখনও আকাশজুড়ে তুষারমৌলি কিংবা হিমালয়ের পাদদেশে বরফাবৃত সফেদ নৈঃশব্দময় প্রকৃতির অবিশ্বাস্য এ সৌন্দর্য সত্যিই রোমাঞ্চকর! এ নদীটি কোশী বা সপ্তকোশী নামে পরিচিত । পূর্ব নেপালে সাতটি নদী (সানকোশী নদী, ইন্দ্রাবতী নদী, ভোতেকোশী নদী, দুধকোশী নদী, অরুণ নদী, বরুণ নদী এবং তামুর নদী) মিলে এ নদী সৃষ্টি হয় । শুষ্ক ঋতুতে পাহাড় থেকে নির্গত হয়ে নদীটি ছত্র গিরিসঙ্কট এর মধ্যে দিয়ে দক্ষিণ দিকে বইতে থাকে । গোকিও লেকসমূহের পূর্ব থেকে শুরু হয়ে দক্ষিণে শেরপাদের পীঠস্থান বা রাজধানী বা এভারেস্টের প্রবেশ দ্বার নামচে বাজার অভিমুখে যায় এবং সাগরমাথা জাতীয় উদ্যান হয়ে পশ্চিমে লুকলা অতিক্রম করে । সুরক এর দক্ষিণ-পশ্চিমে লামডিং খোলা দুধকোশী নদীতে মিলিত হয়ে দক্ষিণে বয়ে চলে এবং হরকপুর গিয়ে সানকোশী নদীর সঙ্গে মিলিত হয় । এ নদীর চরম সাদা জল এবং প্রচণ্ড বিপজ্জনক খরস্রোত বৈশিষ্ট্যের কারণে সাধারণত জল ক্রীড়া (Water sports) ক্ষেত্রে এ নদী ব্যবহার হয় না । তবে কখনও কখনও অভিযাত্রীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ নদীতে Kayaking করে থাকেন । ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবার ব্রিটিশ অধিবাসী মাইক জোন্স Mike Jones (canoeist) (QGM- Queen’s Gallantry Medal) এর নেতৃত্বে একটি ব্রিটিশ অভিযান পরিচালিত হয় । একটি চলচ্চিত্র ‘দুধ কোসি- এভারেস্টের নিরলস নদী’ (Dudh Kosi – Relentless River of Everest) । এ অভিযানটি The Observer Colour Magazine অনুসরণ করে এবং HTV Cardiff এ প্রদর্শিত হয়েছিল । অভিযানটি রেকর্ড করে এবং এটি ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে ১২টি আন্তর্জাতিক পুরষ্কার জিতে নেয় ।  

* তথ্যসূত্র: অন্তর্জাল (The Internet)

ছবি: Razib Rahman 


Tuesday, 21 July 2020

সেঁজুতি সাহা (Senjuti Saha)

(বাবার সাথে) ছবি: https://www.sangbadpratidin.in/


বাংলাদেশের উজ্জ্বল নক্ষত্র, তরুণ প্রতিভাময়ী অণুজীব বিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহা (Senjuti Saha) https://www.sgs.utoronto.ca/profile/senjuti-saha/ https://www.linkedin.com/in/senjutisaha/ https://web.facebook.com/senjuti.saha.98 https://en.wikipedia.org/wiki/Senjuti_Saha https://twitter.com/senjutisaha ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র (WHO) একজন পরামর্শক নিযুক্ত হয়েছেন । তিনিই প্রথম বাংলাদেশি বিজ্ঞানী হিসেবে সংস্থাটির বিশ্বব্যাপী পোলিও (Polio) https://www.who.int/news-room/fact-sheets/detail/poliomyelitis https://en.wikipedia.org/wiki/Polio http://polioeradication.org/polio-today/history-of-polio/ নির্মূল কর্মোদ্যোগ সম্পর্কিত The Polio Transition Independent Monitoring Board (TIMB) এ নিয়োগ পেয়েছেন । সেঁজুতি সাহা মূলত Microbiology, Epidemiology এবং Global Health নিয়ে গবেষণা করেন । বৈশ্বিকভাবে করোনা ভাইরাস ((Covid-19) ছড়িয়ে পড়ার পর গত মে মাসে সে তার বাবার সাথে যৌথভাবে বাংলাদেশে বেসরকারি শিশুস্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান Child Health Research Foundation (CHRF) https://www.linkedin.com/company/child-health-research-foundation/ http://chrfbd.org/ এর গবেষণাগারে প্রথমবারের মতো নভেল করোনাভাইরাসের Genome sequencing (জিন-নকশা) https://en.wikipedia.org/wiki/Whole_genome_sequencing http://chrfbd.org/whole-genome-sequencing-of-novel-coronavirus-sars-cov-2-in-bangladesh/ https://unb.com.bd/category/special/dr-samir-for-genome-sequencing-of-more-coronavirus-samples/51872 এর কাজে গবেষকদের একটি দলকে নেতৃত্ব দিয়ে সফলভাবে শেষ করেছেন । CHRF এর এ প্রকল্পটিকে স্বাস্থ্য পরিষেবা মহাপরিদপ্তর (Directorate General of Health Services), রোগবিস্তার বা মহামারী-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান (Institute of Epidemiology), রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা (Disease Control and Research), বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন (Bill and Melinda Gates Foundation) এবং চ্যান জাকারবার্গ বায়ো হাব (Chan Zuckerberg Biohub) থেকে সহায়তা করে । সেঁজুতি সাহার বাবা অধ্যাপক ডাঃ সমীর কুমার সাহা https://en.wikipedia.org/wiki/Samir_Kumar_Saha https://web.facebook.com/Dr.Samirsaha?_rdc=1&_rdr একজন অণুজীব বিজ্ঞানী ৷ তিনি বাংলাদেশের শিশুরোগ চিকিৎসা সংক্রান্ত বৃহত্তম হাসপাতাল Dhaka Shishu Hospital এর অনুজীববিজ্ঞান/জীবার্ণুবিজ্ঞান (Microbiology) বিভাগের প্রধান এবং CHRF এর নির্বাহী পরিচালক । উল্লেখ্য যে, মেনিনজাইটিস (Meningitis) হচ্ছে মস্তিষ্কে এক ধরণের সংক্রমণ বা প্রদাহ https://www.cdc.gov/meningitis/index.html https://www.healthline.com/health/meningitis#symptoms https://www.nhs.uk/conditions/meningitis/ এবং নিউমোনিয়া (Pneumonia) হচ্ছে ব্যাকটিরিয়া, ভাইরাস ও ছত্রাক দ্বারা মানবদেহের অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ফুসফুসকে সংক্রমণ করে ৷ ফলে ফুসফুসের বায়ু থলিতে (Alveoli) প্রদাহ সৃষ্টি করে এক প্রকার তরল বা পুঁজের সৃষ্টি হয় ৷ এতে করে আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাসে তীব্র কষ্ট এবং ব্যথা অনুভূত হয়, এমনকি মৃত্যুও ঘটে ৷ নিউমোনিয়া https://www.nhs.uk/conditions/pneumonia/ https://en.wikipedia.org/wiki/Pneumonia এবং মেনিনজাইটিস এ দু’টি মরণব্যাধি শিশুমৃত্যুর বড় কারণ । ডাঃ সমীর কুমার সাহা শিশুদের জন্য সরকারের গৃহীত টিকাদান কর্মসূচী, স্বাস্থ্যসেবায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগীতার পাশাপাশি CHRF কর্তৃক এ সকল রোগের টিকা ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিশুমৃত্যু হার কমিয়ে আনতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন । অধ্যাপক ডাঃ সমীর কুমার সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনুজীব বিজ্ঞান বিভাগে MSc এবং ভারতের Banaras Hindu University এর Institute of Medical Science থেকে PhD করেন । বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলিতে সংক্রামক রোগ থেকে শিশুমৃত্যু হার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ডাঃ সমীর কুমার সাহা কল্যাণকর ও স্বনামধন্য CHRF প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন নিজ মেধা, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং পরম মমতায় । বর্তমানে এখানে ০৫ বৎসরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে RSV সংক্রমণ এবং নিউমোনিয়া রোগ সম্পর্কে নানাবিদ গবেষণা চলছে । সেঁজুতি সাহা বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে একজন Microbiologist (অণুজীব বিজ্ঞানী) হিসেবে কাজ করছেন । ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে ডাঃ সমীর কুমার সাহা প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে মাইক্রোবায়োলজিতে ‘Unesco Carlos J Finlay Prize’ পুরস্কার পেয়েছেন এবং Clinical Microbiology তে অসামান্য গবেষণার জন্য American Society of Microbiology তাকে বিশেষভাবে সম্মানিত করেছেন । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র https://en.wikipedia.org/wiki/World_Health_Organization https://www.who.int/ Global Polio Eradication Initiative (GPEI) সম্পর্কিত বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে বিশ্বের খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে The Independent Monitoring Board (IMB) গঠিত হয়। এ বৎসর তিন জনকে IMB তে নতুন করে নিয়োগ দেয়া হয় ৷ এটি মূলত বিশ্বব্যাপী পোলিও রোগ বিস্তার সম্পর্কে তথ্য, পোলিওভাইরাস সনাক্তকরণ, রোগ প্রতিরোধ বা নির্মূলকরণ, স্বাধীন পর্যবেক্ষণ, অভীষ্ট লক্ষ্যপূরণ, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং পোলিও মুক্ত বিশ্ব অর্জনের জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে থাকে ৷ এছাড়া বৈশ্বিকভাবে পোলিও মহামারীর উপর ভিত্তি করে এর রোধকল্পে মূল মাইলফলকের দিকে অগ্রগতির মূল্যায়ন করে ৷ মাইলফলক যদি At risk, Off track বা Missed হয়েছে বলে দেখা যায় তবে সংক্রামিত স্থানকে কেন্দ্র করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বাস্তবায়নকারী অংশীদার অথবা দাতা সংস্থাগুলিকে দিক নির্দেশনাসহ প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক কর্ম পরিকল্পনা (আর্থিক দিকও হতে পারে) এবং পথ প্রদর্শনের মাধ্যমে এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকে । অন্যান্য কার্যক্রমের উপর তথ্যের ভিত্তিতে গৃহীত বা সম্পাদিত কার্যের গুণমান মূল্যায়ন করে সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে । ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদে (World Health Assembly) পোলিও সম্পর্কিত বিল অনুমোদনের পর থেকে ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’ পোলিও সংক্রমণ পরিস্থিতি এবং বিশ্বের দেশগুলির জনস্বাস্থ্যের অবকাঠামো ব্যবস্থা সুরক্ষিত করা বা এটি টিকিয়ে রাখতে বিশেষ করে অপরিহার্য টিকাদান, বৃহত্তর সংক্রামক রোগের নজরদারি, পর্যবেক্ষণ, সতর্কতা এবং জরুরি প্রতিক্রিয়ার বিষয়গুলি নিয়ে কাজ করছে । পোলিও নির্মূল কর্মসূচির জন্য ‘স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের’ (IMB) সম্মানিত সভাপতি হচ্ছেন ব্রিটেনের প্রাক্তন প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রোগীর সুরক্ষার জন্য বিশেষ দূত Professor Sir Liam Joseph Donaldson https://en.wikipedia.org/wiki/Liam_Donaldson https://twitter.com/DonaldsonLiam https://www.ms.w3ki.com/wiki/Liam_Donaldson । তিনি একইসঙ্গে যুক্তরাজ্যের Bloomsbury, Camden এ অবস্থিত সর্বসাধারণ গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় London School of Hygiene & Tropical Medicine এর জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক । Professor Sir Liam Joseph Donaldson বর্তমানে Imperial College London এর স্বাস্থ্য নীতিমালার চেয়ারম্যান এবং Newcastle University এর আচার্য (Chancellor) । ‘স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ বোর্ডে’ (IMB) সেঁজুতি সাহার সহকর্মী অন্য দুই জন নব নিযুক্ত সদস্যের মধ্যে প্রথম জন হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের University of North Carolina এর Gillings School of Global Public Health এর গবেষণা অধ্যাপক, CBE, Hon FRCP, Sheila Leatherman https://sph.unc.edu/adv_profile/sheila-leatherman-msw/ https://en.wikipedia.org/wiki/Sheila_Leatherman https://www.linkedin.com/in/sheila-leatherman-01933711/ । দ্বিতীয় জন হচ্ছেন নাইজেরিয়ার Community চিকিৎসক, মহামারী বিশেষজ্ঞ (Epidemiologist), সামাজিক বিকাশ বা উন্নয়ন পরামর্শক এবং স্বাস্থ্য বিজ্ঞান প্রশিক্ষণ- গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রের (CHESTAD) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা Dr. Boluwatife Oluwafunmilola (Olajoyegbe) Lola-Dare https://thinklab.com/dare_lola https://connectnigeria.com/articles/2018/06/women-know-dr-lola-dare/ https://www.linkedin.com/in/boluwatife-oluwafunmilola-lola-dare-65a21b30/?originalSubdomain=uk । সেঁজুতি সাহা মনিটরিং বোর্ডের অন্যান্য সদস্যদের সাথে তিনি ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’কে পোলিও নির্মূল প্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে মহাপরিচালক পর্যায়ে পরামর্শ দেবেন । গত বৎসর নিউইয়র্কে তৃতীয় বার্ষিক Gates Goalkeepers Event এ সেঁজুতি সাহা বক্তব্য রাখেন https://www.youtube.com/watch?v=3r-4v-NXsXQ , যেখানে ৪০০টি নীতিমালা গৃহীত হয় ৷ উক্ত অনুষ্ঠানে সরকারী প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ, সক্রিয় অংশগ্রহণকারী কর্মী, সংবাদ মাধ্যম, ব্যবসায়ী এবং এ গ্রহের সবচেয়ে ধনী ও সর্বাধিক দানশীল ব্যক্তিদের একজন বিল গেটস (Bill Gates) https://www.gatesfoundation.org/Who-We-Are/General-Information/Leadership/Executive-Leadership-Team/Bill-Gates https://web.facebook.com/BillGates/?_rdc=1&_rdr https://web.facebook.com/BillGates https://www.gatesnotes.com/ https://en.wikipedia.org/wiki/Bill_Gates সহ বিভিন্ন গণ্যমান্য নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করেন । সেঁজুতি বিশ্বাস করেন “Science by and for the many, not the few”। তার দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বজুড়ে প্রত্যেকেরই বিজ্ঞানের অনুশীলন এবং এর সুবিধাগুলিতে সমান প্রবেশাধিকার পাওয়া উচিৎ । তিনি মনে করেন স্বাস্থ্য এবং গবেষণায় সাম্যভাব সৃষ্টি করাই তার কাজ এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মূল ভিত্তি ।

সেঁজুতি সাহা Bangladesh International Tutorial থেকে তার বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে প্রথমে BSc ডিগ্রি, John Hopkins Bloomberg School এ জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানী (Public Health Scientist), কানাডায় প্রাণরসায়নে (Biochemistry) স্নাতক ডিগ্রি এবং পরবর্তীতে University of Toronto https://www.utoronto.ca/ থেকে আণবিক জীনতত্ত্ব বিষয়ে (Molecular Genetics) PhD ডিগ্রি নেন । তিনি Visiting Post Doctoral Scholar এ পড়াশোনার আগে Stanford School Of Medicine Associate Faculty তে পড়াশোনা করেন । ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে নবজাতক ও শিশুদের মধ্যে Meningitis (মস্তিষ্কের সংক্রমণ) রোগ বেড়ে গেলে সেঁজুতি সাহা শিশুদের জিনগত উপাদানগুলি বিশ্লেষণ করে এর রহস্য উন্মোচন করতে সক্ষম হন । তিনি আবিষ্কার করেন যে, মেনিনজাইটিসের প্রকোপ বৃদ্ধি পায় মশা এর দ্বারা ছড়িয়ে পড়া চিকুনগুনিয়া জ্বরের (Chikungunya fever) https://www.who.int/news-room/fact-sheets/detail/chikungunya https://en.wikipedia.org/wiki/Chikungunya https://www.cdc.gov/chikungunya/index.html প্রাদুর্ভাবের কারণে । ভবিষ্যতে মেনিনজাইটিস এবং অন্যান্য মারাত্মক রোগের প্রাদুর্ভাব দ্রুত সমাধানে দেশকে সহায়তা করতে তিনি তখন থেকেই বাংলাদেশে একটি স্বল্প ব্যয়ে রোগ নির্ণয় সংক্রান্ত বিশেষ যন্ত্রপাতি CHRF এ স্থাপন করেন ৷ মেনিনজাইটিস এর কারণে যে সমস্ত শিশুদের দীর্ঘকালীন অক্ষমতা নিয়ে বাঁচতে হয়- তাদের জন্য সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তিনি একজন সামাজিক কর্মী এবং Microbiologist হিসেবে ‘মেনিনজাইটিস’ নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন । সেজুঁতি সাহা ২৩শে এপ্রিল ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন । তার মা ডাঃ সেতারুন্নাহার সেতারা যিনিও একজন অণুজীব বিজ্ঞানী এবং Institute of Public Health, Bangladesh থেকে অবসর নিয়েছেন । অন্যদিকে University of Toronto বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ছোট ভাই সুদীপ্ত কুমার সাহা Microbiology and Global Health বিষয়ে পড়াশোনা করছেন । বলতে গেলে একটি বিজ্ঞানী পরিবার ৷ ব্যক্তিগত জীবনে সেজুঁতি সাহা বিবাহিত এবং তার স্বামী Yogesh Hooda https://web.facebook.com/yogihooda88 https://www.linkedin.com/in/yogihooda/?originalSubdomain=uk https://twitter.com/yogihooda88?lang=en একজন ভারতীয় নাগরিক । যিনি Medical Research Council Laboratory of Molecular Biology (MRC LMB) তে এবং যুক্তরাজ্যে একজন Biochemist হিসেবে কাজ করছেন । ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে তারা বিয়ে করেন । সেজুঁতি সাহা ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে ‘Bil And Melinda Gates Award’ পুরস্কারে ভূষিত হন । সারাবিশ্বে যারা নিজেদের সৃষ্টিশীল প্রতিভার মাধ্যমে সমাজকে বদলে দিয়ে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে অবদান রেখে চলেছেন- তাদের নিয়ে মাইক্রোসফটের https://en.wikipedia.org/wiki/Microsoft https://www.linkedin.com/company/microsoft/ https://account.microsoft.com/account?lang=en-us http://news.microsoft.com/ প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস ‘Heroes in the field’ শিরোনাম করে Blog লিখে থাকেন । সম্প্রতি বিল গেটস বাংলাদেশের অণুজীব বিজ্ঞানী অধ্যাপক ডাঃ সমীর কুমার সাহা এবং তার মেয়ে সেঁজুতি সাহার ভূয়সী প্রশংসা করে লিখেন যে: https://www.gatesnotes.com/Health/The-Sahas-are-battling-global-health-inequity ”বাংলাদেশি এ বাবা-মেয়ে বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্যের গতিশীল এক জুটি । এক্ষেত্রে তারা সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তথ্য-উপাত্ত, রোগ নির্ণয়ের সর্বাধুনিক পদ্ধতি এবং সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে টিকাদান কর্মসূচীকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের নিম্ন আয়ের দেশগুলির সাথে সম্পদশালী দেশগুলির স্বাস্থ্যসেবার যে পার্থক্য রয়েছে, যেখানে শিশু মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি এবং এ ধরণের পার্থক্য কমিয়ে আনতে তারা সেখানে স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহের ফাঁকগুলি বন্ধ করতে কাজ করছেন । Child Health Research Foundation (CHRF) এর কাজের বদৌলতে এবং শিশুদের জন্য বর্তমান সরকারের গৃহীত টিকাদান কর্মসূচীর পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে পাঁচ বৎসর বয়সের নিচে শিশুমৃত্যু হার কমেছে । ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশ এখন প্রায় ৯৮ শতাংশ টিকাদান কর্মসূচীর আওতায় এসেছে । তাদের কাজের জন্য ধন্যবাদ ৷ বাংলাদেশ যদি রোগ প্রতিরোধে আরও বেশি কিছু করতে পারে তাহলে বাংলাদেশ এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে, যেখানে সংক্রামক ব্যাধি খুব কম থাকবে এবং হাসপাতালের বিছানাগুলি এক সময় ফাঁকা থাকবে ৷ CHRF বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে শিশুমৃত্যু হার হ্রাস করার ক্ষেত্রে সাহায্যকারী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান । তাদের এ মহৎ কর্মকাণ্ড এবং গবেষণা শুধুমাত্র বাংলাদেশেই নয় বরং একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন দক্ষিণ এশিয়া তথাপি সারাবিশ্বে এর সুফল বয়ে নিয়ে আসবে” ।

শিক্ষা, মেধা, মনন, নিষ্ঠা এবং অধ্যবসায়ের কারণে সেজুঁতি সাহা এ যোগ্যতা অর্জন করেছেন- যা আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করেছে । প্রিয়, সেজুঁতি সাহা আপনাকে অভিনন্দন! আপনি বাংলাদেশের জন্য এক বিরল সম্মান বয়ে এনেছেন । আমরা গর্বিত । ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র IMB তে আপনার নিয়োগে বাংলাদেশ তথাপি সারাবিশ্বে নানা সংক্রামক ব্যাধি রোধকল্পে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য এক তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফল বয়ে নিয়ে আসবে, যা এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে । প্রত্যাশা করি আপনার সুখ, শান্তি, উন্নতি এবং এক সুন্দর স্বাস্থ্যময় জীবন ৷ ভালো থাকুন । 

* তথ্যসূত্র: অন্তর্জাল (The Internet)






Thursday, 16 July 2020

নীলাকুরিঞ্জি (Neelakurinji)

                                                        
                                                    ছবি:  https://www.ekeralatourism.net/ 

🧚🏽‍♀️ Cenozoic যুগের কঠিন শিলা ব্যাসাল্ট, ল্যাটেরাইট ও চুনাপাথর দ্বারা গঠিত ভারত উপমহাদেশের সর্বপ্রাচীন ঐতিহাসিক অঞ্চল এবং ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান সহ্যাদ্রি পর্বতমালা বা পশ্চিমঘাট পর্বতমালা হচ্ছে ভারতের পশ্চিমভাগে প্রসারিত একটি পর্বতমালা । প্রকৃতপক্ষে, এটি একটি পার্বত্য উপত্যকা । এ পর্বতমালা দাক্ষিণাত্য মালভূমির পশ্চিমসীমা বরাবর উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রসারিত হয়ে ভারতের পশ্চিমে আরব সাগরের তীরবর্তী সংকীর্ণ উপকূলীয় সমভূমি অঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করেছে । গুজরাটের পশ্চিম তীর (কঙ্কন উপকূল) এবং মহারাষ্ট্রের সীমান্তভাগে তাপ্তি নদীর দক্ষিণে এ পর্বতমালার উৎপত্তিস্থল । মহারাষ্ট্র, গুজরাট, গোয়া, কর্ণাটক, পশ্চিম তামিলনাড়ু এবং কেরল বা কেরালা রাজ্যের মধ্য দিয়ে দৈর্ঘ্যে প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার ও প্রস্থে প্রায় ১০০ কিলোমিটার বিস্তৃত এ পর্বতমালা ভারতের মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণতম বিন্দু তামিলনাড়ু রাজ্যের কন্যাকুমারী বা কুমারী আম্মান (Cape Comorin / Kanyakumari) শহরের কাছে এসে মিলিত হয়েছে । অন্যদিকে উড়িষ্যার গজপতি জেলার উত্তর-পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত ১৫০০ মিটার উচ্চতার মহেন্দ্রগিরি পর্বত বা পূর্বঘাট পর্বতমালা হচ্ছে ভারতের পূর্ব উপকূলের একটি বিচ্ছিন্ন বা ক্ষয়জাত বা অবশিষ্ট (Relict বা Erosional বা Residual mountain) পর্বতশ্রেণী । শেভারয় পাহাড়, জাভাদি পাহাড়, আনাইমালাই পাহাড় (হাতি পাহাড়) প্রভৃতি কয়েকটি বিচ্ছিন্ন পর্বতের সমষ্টিই হচ্ছে পূর্বঘাট পর্বতমালা । পূর্বঘাট পর্বতমালা ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক এবং কেরালা রাজ্য হয়ে তেলেঙ্গানা পর্যন্ত বিস্তৃত । বঙ্গোপসাগরের সমান্তরালে প্রসারিত হয়ে দাক্ষিণাত্য মালভূমির পশ্চিমে এবং পূর্ব-পশ্চিমঘাটের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত । কৃষ্ণা নদী, কাবেরী নদী, মহানদী, গোদাবরী নদী ও পেন্নার নদী দ্বারা পূর্বঘাট পর্বতমালা ক্ষয়িত এবং বিচ্ছিন্ন হয়েছে । চর্নাকোট, গ্রানাইট গিনিস, খুন্ডালাইট, মেটামোরফিক গিনিস এবং কোয়ার্টজাইট শিলার সংযোজনে গঠিত হয়েছে এ পূর্বঘাট পর্বতমালা । সহ্যাদ্রি বা পশ্চিমঘাট পর্বতমালার তুলনায় এ মহেন্দ্রগিরি বা পূর্বঘাট পর্বতমালা অধিক প্রাচীন । অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের সর্বোচ্চ শিখর জিন্দাগাদা এর উচ্চতা হচ্ছে ১৬৯০ মিটার বা ৫৫৪৫ ফুট । 
সহ্যাদ্রি বা পশ্চিমঘাট পর্বতমালার ভৌগোলিক অবস্থান হচ্ছে ১০°১০′ উত্তর ৭৭°০৪′ পূর্ব এবং এর আয়তন প্রায় ১৬০০০০ বর্গকিলোমিটার । এটি বিশ্বের ৮টি প্রধান জীব-বৈচিত্র্যের উষ্ণবিন্দু স্থান (Biodiversity hotspot) এবং বাস্তুতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য পশ্চিমঘাট পর্বতমালা হচ্ছে ভারতের অন্যতম সমৃদ্ধ জৈবিক অঞ্চল (Biotic region) যেটি জৈব-ভৌগলিকভাবে অনন্য । পশ্চিমঘাট সুউচ্চ পর্বতমালা দক্ষিণ ভারতের জলবিদ্যুৎ এবং নদী ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ জলবিভাজিকার কার্য সম্পাদন করে থাকে । মহাদীর্ঘকাল পেরিয়ে যাওয়া প্রাচীন এ পর্বতমালার ঘন, আর্দ্র ও অন্ধকারাচ্ছন্ন গভীর অরণ্য হচ্ছে অনেক দুষ্প্রাপ্য প্রাণী, কীট-পতঙ্গ, পাখী, ফুল, ফল এবং উদ্ভিদের প্রাণকেন্দ্র । এটি তৃণভূমি, গুল্মভূমি ও বনভূমির এক নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং প্রাণ বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এক জনপদ । চির সবুজ অরণ্যের বিশাল প্রাণ-প্রাচুর্য এবং বনজ সম্পদকে কেন্দ্র করে টোডা, কোটা, আলুকুরুম্বা, বাদাগা, ইরুলা, কাণিকরন ও মুথুভান আদিম নৃ-গোষ্ঠী প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই এখানে বসতি স্থাপন করেছে । পাহাড়ের ঢালে এবং গহীন অরণ্যে তারা নিজস্ব সামাজিক রীতি, নীতি ও লোকাচারকে অনুসরণ করে সমাজ-সংস্কৃতি গড়ে তোলে জীবন যাপন করছেন । হাজার হাজার বছর ধরে তারা পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করা পথকে লক্ষ্য স্থির করে তাদের ঐতিহ্যকে বহন করে চলছেন । এখানকার নদী, সমুদ্রের শাখা, সাগর, উপত্যকা, কুয়াশা, উন্মুক্ত চারণভূমি, জলপ্রবাহ, সবুজ চা বাগিচা, পাহাড়, হ্রদ, গিরিপথ, জলপ্রপাত এবং ঘন সবুজ বনের সাথে রয়েছে এ অধিবাসীদের আত্মার সম্পর্ক । এক নিবিড় অনুভূতি । আরব সাগর থেকে আগত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে এখানে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয় । বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ৩০০ - ৪০০ সেন্টিমিটার ও গড় উষ্ণতা প্রায় ১৫০ সেন্টিমিটার এবং বাতাসে আর্দ্রতা অত্যন্ত বেশি । বনভূমির উঁচু উঁচু গাছগুলোর মাথায় শামিয়ানা বা চাঁদোয়ার মতো লতা এবং পরজীবী উদ্ভিদের আচ্ছাদনের কারণেই সূর্যের আলো বনভূমিতে সহজে প্রবেশ করতে পারে না । মায়াবী এ চির হরিৎ ঘন অরণ্য পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন উৎপন্ন করে ভারতের সমগ্র দাক্ষিণাত্যের শহরগুলোকে দূষণমুক্ত করতে ফুসফুসের মতো মুখ্য ভূমিকা পালন করছে । 
ভারতীয় উপ-দ্বীপের সর্বদক্ষিণে পাহাড়-সমুদ্রে ঘেরা রাজ্য তামিলনাড়ুর পশ্চিম সীমায় পশ্চিমঘাট পর্বতমালা (Western Ghat) এবং উত্তর সীমায় পূর্বঘাট পর্বতমালা (Eastern Ghat) অবস্থিত । সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গড়ে প্রায় ৯০০ - ১৫০০ মিটার উচ্চতায় সহ্যাদ্রি বা পশ্চিমঘাট পর্বতমালার দক্ষিণাংশটি কেরালা, কর্ণাটক এবং তামিলনাড়ু রাজ্যের অন্তর্গত । মূলত তামিলনাড়ু ও কেরালা রাজ্যেই "নীলগিরি পর্বতমালা" (Nilgiri Mountains / Blue Mountains / Nilagiri / The Nilgiris / Nila Mountain) এর অবস্থান । তামিলনাড়ু্ রাজ্যের একেবারে পশ্চিম সীমান্তে নীলগিরি পর্বত । এ নীলগিরি পর্বতই হচ্ছে পশ্চিমঘাট পর্বতমালা এবং পূর্বঘাট পর্বতমালার মধ্যে পরস্পরের মিলনস্থল । পশ্চিমঘাট এবং পূর্বঘাট দুই এলাকা বিভক্ত হয়ে জীববৈচিত্র্যের পাশাপাশি নীলগিরির প্রাকৃতিক পার্বত্য চিরহরিৎ তৃণভূমি, গুল্মভূমি এবং বনভূমি অঞ্চলই গঠন করেছে শোলা বাস্তুতন্ত্র (Shola Ecosystem) । Shola নামটি সম্ভবত Chola শব্দ থেকে এসেছে, যার দুইটি অর্থ হচ্ছে: ছায়া এবং বসন্ত । সহ্যাদ্রি বা পশ্চিমঘাট পর্বতমালার সর্বোচ্চ আনামুদি পর্বতটির উচ্চতা প্রায় ২৬৯৫ মিটার বা ৮৮৪২ ফুট যেটি কেরালা রাজ্যে অবস্থিত ইরাভিকুলাম জাতীয় উদ্যানের মাথার মুকুট হিসেবে পরিচিত এবং এ পর্বতটি হিমালয় পর্বতমালার দক্ষিণে সর্বোচ্চ উঁচুতে অবস্থান করছে । 
হোয়সালা সাম্রাজ্য হচ্ছে একটি 'কন্নাদিগা শক্তি' যা ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে উৎপত্তি হয়েছিল ১০ম থেকে ১৪তম শতাব্দীতে । নীলগিরি অঞ্চল এ সাম্রাজ্যের রাজাদের অধীনে ছিল । পরবর্তীতে এ অঞ্চল ব্রিটিশ ভারতের মহীশূর রাজ্যের শাসনকর্তা (মহীশূরের বাঘ), সাহসী বীর যোদ্ধা ও ভারতের স্বাধীনতাকামী বীরপুত্র টিপু সুলতানের হাত হয়ে ইংরেজদের আমলে পাহাড়ী উটি অঞ্চলের একটি অংশ আদিবাসী টোডা জনগোষ্ঠী তামিলনাড়ু রাজ্যের কোয়েম্বাটুর শহরের গভর্নর সুলিভানের নিকট হস্তান্তর করার পর থেকে এখানে চা, কফি, সিনকোনা গাছ এবং টিক গাছ প্রভৃতি চাষাবাদ শুরু হয় । উল্লেখ্য যে, তামিলনাড়ু রাজ্যের নীলগিরি জেলায় সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২২৪০ মিটার উঁচুতে নীলগিরি পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের এক শৈল শহরের মহারাণী হচ্ছে উটি / Ooty / উধাগামান্দলাম / উওটোক্যমুন্দ / উটাকামান্দ । ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের মাণ্ড্য জেলার একটি শহর শ্রীরঙ্গপত্তনে টিপু সুলতান এবং লর্ড কর্ণওয়ালিসের সঙ্গে এক সন্ধির (শ্রীরঙ্গপত্তনমের সন্ধি) মাধ্যমে এ এলাকাটি স্থায়িভাবে The British East India Company এর হাতে চলে যায় । ১৮২০ খ্রিস্টাব্দের গোড়ার দিকে এ অঞ্চলের পাহাড়গুলো ব্রিটিশ রাজের অধীনে দ্রুত বিকাশ (রক্ষণাবেক্ষণ) লাভ করে । কারণ, বেশিরভাগ জমিই ইতিমধ্যে ব্রিটিশ নাগরিকদের ব্যক্তিগতভাবে মালিকানাধীন হয়েছিল । ব্রিটিশ সরকার দক্ষিণ ভারতের অধিকাংশ অঞ্চলকেই মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির অধীনে নিয়ে আসে এবং বাকী অঞ্চলগুলোর বেশিরভাগই ব্রিটিশ সরকারের নির্ভরশীল হয়ে বিভক্ত থাকে ৷ পরবর্তীতে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের পর এক এক অঞ্চলের স্থানীয় ভাষার উপর নির্ভর করে দক্ষিণ ভারত বিভিন্ন রাজ্যে বিভক্ত হয় । 
মুন্নার (Munnar) হচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতের কেরালা রাজ্যের ইদুক্কি জেলায় অবস্থিত প্রস্তরময় গিরিচূড়ায় একটি সুন্দর শহর ও পার্বত্য কেন্দ্র । 'Moonu' অর্থ 'তিন' এবং 'Aru' অর্থ 'নদী' । মুন্নার শহরটি পশ্চিমাঞ্চল ঘাট পর্বতমালায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬০০ মিটার (৫২০০ ফুট) উচ্চতায় যেটি মাদুপেট্টি ও পেরিয়াভারু নদীর তীরে অবস্থিত । মুন্নার শহরকে দক্ষিণ ভারতের 'কাশ্মীর' বলা হয় । পর্যটক বা ভ্রমণকারীদের জন্য শহরটি মধুচন্দ্রিমা বা মধুযামিনীর (Honeymoon) উদ্দেশ্যে এক মনোমুগ্ধকর অন্যতম গন্তব্যস্থল এবং প্রশান্তির আশ্রয়স্থল । সবুজ অরণ্যেঘেরা মুন্নার শহরই পশ্চিমঘাট পর্বতমালার মুদ্রাপুজহা, নল্লাথান্নি ও কুন্ডালা পার্বত্য নদীর সঙ্গমস্থল । আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যময় এ শহরটি একসময় ব্রিটিশ সরকারের গ্রীষ্মকালীন অধিষ্ঠান বা প্রায়ই যাত্তয়া হয় এমন স্থান (Resort) ছিল এটি । নীলগিরি পর্বতমালার সর্বোচ্চ শৃঙ্গের নাম দোদ্দাবেত্তা বা রাঙ্গস্বামী শিখর যার উচ্চতা প্রায় ২৬৩৭ মিটার বা ৮৬৫২ ফুট । নীলগিরিকে নীলাকাশের মতোই নীল মনে হয়, যেখানে সাদা মেঘগুলো নীলিমায় মিলিয়ে যায় । কিংবা অবারিত নীলের রাজ্য । আসলে, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়ার কারণেই যে কোনো পাহাড়কে দেখতে নীলাভ মনে হয় । নীলগিরি পর্বতের ঢালে বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে তৃণভূমি ও বনাঞ্চল যেখানে জন্ম নেয় এক দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির অসাধারণ সুন্দর সপুষ্পক উদ্ভিদ নীলাকুরিঞ্জি বা কুরিঞ্জি বা নীলকুরিঞ্জি (Neelakurinji / Kurinji / Kurunji / Neel Kurinji) https://www.keralatourism.org/neelakurinji/ । উল্লেখ্য যে, মুন্নার শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে সংরক্ষিত এলাকা কুরিঞ্জিমালা অভয়ারণ্য বা ইরাভিকুলাম জাতীয় উদ্যান হচ্ছে এমন একটি জায়গা যেখানে দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের তিরুপপুর জেলার সীমান্তবর্তী কেরালা রাজ্যের দেবীকুলম তালুকের ইদুক্কি জেলার কোট্টাকাম্বুর এবং ভাট্টাভাডা গ্রামে বিপন্ন বা বিপদগ্রস্ত প্রজাতি নীলাকুরিঞ্জি উদ্ভিদের জন্য ৩২ হেক্টর জমিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রস্থল বা মূল আবাস হিসেবে সুরক্ষিত করা হয়েছে । ভারতের পশ্চিমঘাট ব্যতীত পৃথিবীর অন্য কোথাও নীলাকুরিঞ্জি ফুল এখন আর দেখা যায় না । নীলগিরি পাহাড়ের গায়ে নীল রঙের অগণিত নীলাকুরিঞ্জি ফুল ফোটে বলেই এ অঞ্চলের নামকরণ হয়েছে 'নীলগিরি' । সর্বাধিক প্রশংসিত এবং বিশেষ মর্যাদার এ দৃষ্টিনন্দন নীলাকুরিঞ্জি ফুলের প্রধান আবাসস্থল হচ্ছে মুন্নার শহর থেকে পার্শ্ববর্তী নির্জন পাহাড়ি এলাকা পশ্চিমঘাটের শোলা বনে ও তৃণভূমিতে । সারাদেশের মধ্যে মুন্নার শহর হচ্ছে নীলাকুরিঞ্জি উদ্ভিদের সর্বাধিক ঘনত্বের উৎসবিন্দু, যা প্রায় ৩০০০ হেক্টর ঘূর্ণায়মান পাহাড়ের মধ্যে বিস্তৃতভাবে ফুলগুলো প্রস্ফুটিত হয়ে শহরটিকে নীল রঙে রাঙিয়ে তোলে । রূপবতী নীলাকুরিঞ্জি ফুল কুয়াশাচ্ছন্ন নীলগিরি পাহাড়ের পুরো তৃণভূমিকে নীল সমুদ্রে পরিণত করে । বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এ এক শিহরণ জাগানিয়া ঐন্দ্রজালিক দৃশ্য । অনাবিল সৌন্দর্যের অধিকারী নীলাকুরিঞ্জি ফুল পশ্চিমঘাটের জৈব-বৈচিত্র্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে । এ স্থানীয় প্রজাতিটি বাস্তুতন্ত্র স্বাস্থ্যেরও একটি সূচক । দক্ষিণী ভাষায় (তামিল বা মালয়ালাম) এ ফুলকে নীলাকুরিঞ্জি বা নীল ফুল বলে । নীলাকুরিঞ্জি ফুল কয়েকটি শাখা বিশিষ্ট অতি সাধারণ একটি গুল্ম বা ঝোপঝাড় । এর নীলচে বেগুনি রঙের ছোট ছোট ফুলগুলো থোকায় থোকায় দলবদ্ধভাবে ফোটে । নীলাকুরিঞ্জি ফুল দেখতে অনেকটা কলস বা ঘণ্টার মতো । বৈচিত্র্যময় ফুলের আকর্ষণীয় উজ্জ্বল রঙ, মিষ্টি ঘ্রাণ ও অমৃতের লোভে মৌমাছি, ভ্রমর, কীট-পতঙ্গ এবং প্রজাপতি প্রচণ্ডভাবে আকৃষ্ট হয় । বেগুনি ফুলগুলো প্রচুর পরিমাণে অমৃত ধারণ করার ফলে পুবাল মৌমাছি Apis cerana কে বেশি আকর্ষণ করে । নীলাকুরিঞ্জি ফুল থেকে সংগৃহীত মধু স্বাদযুক্ত, স্বাস্থ্যকর এবং সর্বোচ্চ পুষ্টি মানের হয় । এ মধু'র বিশেষত্ব হচ্ছে যে, এটি প্রায় ১৫ বছর পর্যন্ত বিনষ্ট হয় না এবং ঔষধিগুণ সম্পন্ন । নীলাকুরিঞ্জি উদ্ভিদের উচ্চতা প্রায় ৩০ - ৬০ সেন্টিমিটার এবং সর্বোত্তম অবস্থায় ১৮০ সেন্টিমিটার অবধি বৃদ্ধি পায় । নীলাকুরিঞ্জি ফুলের মন মাতানো সুগন্ধ বা তীব্র ঘ্রাণ তেমন নেই । তবুও কেন, এর এতো কদর? কারণ, নীলাকুরিঞ্জি অতি দুর্লভ । তাই, সে অনিন্দ্য সুন্দর এবং মনোহারিণী । এ ফুল প্রতি ১২ বছরে একবার পার্বত্য ভূমিকে এক অপরূপ রূপে সাজিয়ে তোলে । ঐশ্বরিকভাবেই ফুলের রঙ বদলে গিয়ে নীল থেকে নীলচে-বেগুনি এবং পরবর্তীতে ফিকে বেগুনি রঙ ধারণ করে । ফুল ফোটার পর গাছ মরে যায় এবং মৃত গাছের বীজ থেকে পুনরায় গাছের জন্ম হলেও ফুলের দেখা মেলে না । কারণ, ফুল দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘ ১২ বছর । তাই, প্রতি ১২ বছরে একবার এ ফুল ফোটে বলেই একে 'Super bloom' বলা হয় । যে সকল উদ্ভিদ দীর্ঘ বিরতিতে এরূপভাবে প্রস্ফুটিত হয় তাকে Plietesial বলে এবং উদ্ভিদবিদ্যায় এটিকে উদ্ভিদের ''বেঁচে থাকার ব্যবস্থা'' হিসেবে উল্লেখ করা হয় । এছাড়া, Strobilanthes cuspidatus প্রজাতির উদ্ভিদে প্রতি ৭ বছরে একবার ফুল ফোটে থাকে । নীলাকুরিঞ্জি উদ্ভিদ পর্বতাঞ্চলে নিজের মতো করেই বেড়ে উঠে এবং প্রকৃতির নিয়মে এভাবেই তার জীবন-মৃত্যু চক্র ঘটে থাকে । সাধারণত জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এ ফুল ফোটে । তবে, সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর মাস হচ্ছে ফুল ফোটার আদর্শ সময় । যখন নীলাকুরিঞ্জি ফুল ফুটতে শুরু করে তখন সমগ্র পার্বত্য অঞ্চল জুড়ে এক অদ্ভুত সুন্দর বেগুনি রঙে ছেয়ে যায় এবং এর আভা ছড়িয়ে দেয় । মনে হয়, এ যেনো পৃথিবীর স্বর্গ । এক সময় মনোরম ফুলগুলো নিজের অতি মহিমান্বিত রঙ পাল্টে নীলরঙা রাজকীয় শাড়ির আঁচলে ঢেকে দেয় গোটা পর্বতকে । ভোরের সূর্যের উজ্জ্বল আলোয় পাহাড়ের বুকে জন্ম নেয়া ফুলগুলোর নীলাভ বর্ণচ্ছটায় এক নৈসর্গিক রূপ আবির্ভূত হয় । চমৎকার সুন্দর নীলাকুরিঞ্জি ফুল প্রকৃতির এক রহস্যময় এবং বিস্ময়কর সৌন্দর্য । এ ফুলের সংস্পর্শে মন ছুঁয়ে যায় । সত্যিই মনোমুগ্ধকর, পরিশুদ্ধ এবং এক স্বর্গীয় অনুভূতি । পাহাড়ী অঞ্চলের অসিতবর্ণ আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়ানো, দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ চা বাগান, নীলগিরির শিখরে দাঁড়িয়ে মেঘের স্পর্শ অনুভব, প্রাণের উচ্ছ্বাসে বৃষ্টিস্নাত গঙ্গাফড়িংয়ের প্রান্তরে উড়ে যাওয়া, গহীন অরণ্য থেকে মৃদু শীতল বাতাসে ভেসে আসা বনজ মসলার মন মাতানো সুবাসিত ঘ্রাণ, অদূর উপত্যকার জাদুকরী সৌন্দর্য, রোদের আলোয় শুভ্র বরফাচ্ছন্ন পর্বতমালার সর্বোচ্চ শিখরে ভেসে থাকা মেঘ ও কুয়াশার ফাঁকে এক অপরূপ নীলাভ আলোর বিচ্ছুরণ, অশান্ত জলপ্রপাতের স্বচ্ছ জলধারা এবং নিস্তব্ধতার মাঝে নীলগিরির আকাশ ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলিয়ে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির আলতো স্পর্শনে এক প্রশান্তি এনে দেয় । সবুজে ঘেরা পাহাড়ের কিনারা গড়িয়ে সূর্যাস্ত,  জ্যোৎস্নাভরা মায়াবী-শান্ত রাতের আকাশ এবং কুয়াশাপূর্ণ শীতের সকাল এ আরেক অনন্য রূপ । সারাবিশ্বে প্রায় ২৫০ এর অধিক নীলাকুরিঞ্জি উদ্ভিদের (Strobilanthes) প্রজাতি রয়েছে । ৪৬টি প্রজাতির এ উদ্ভিদের মধ্যে বেশিরভাগ প্রজাতিই ভারতীয় উপদ্বীপ এলাকায় বা নীলগিরির বিভিন্ন উপত্যকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এবং স্থানভেদে ফুল ফোটার ভিন্নতাও রয়েছে । নীলাকুরিঞ্জি ফুলের স্ট্রোবিলান্থেস কুন্থিয়ানাস প্রজাতিটি কুন্থি নদী থেকে উদ্ভূত হয়েছে । অপূর্ব সুন্দর নীলাকুরিঞ্জির বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে Strobilanthes kunthianus (Acanthaceae) । এটি একটি Semelparous প্রজাতি । উদ্ভিদবিদরা ১৮৩৮ খ্রিস্টিব্দের প্রথম দিকে শনাক্ত করেছিলেন যে, নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর এ গাছের ফুল ফোটে (Periodic flowering) । ১৯ শতকে Christian Gottfried Daniel Nees von Esenbeck বৈজ্ঞানিকভাবে প্রথম বর্ণনা করেন যে নীলাকুরিঞ্জি উদ্ভিদ Strobilanthes গোত্রের অন্তর্গত । এটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উদ্ভিদ প্রজাতি, যা এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া যায় । নীলাকুরিঞ্জির সর্বশেষ প্রজাতির নামকরণ করা হয়েছে 'Kannan' নামে (যেটির বৈজ্ঞানিক নাম: Strobilanthes kannani) । এ পর্বতমালায় বা বনে বসবাসকারী মাদুরাই রাজবংশের অনুগত প্রাচীন মুথুভান নৃ-গোষ্ঠীর অধিবাসীরা বিশ্বাস করেন যে, নীলাকুরিঞ্জি হচ্ছে ভালোবাসার ফুল এবং শুভ বার্তার প্রতীক । দক্ষিণ ভারতের (তামিলনাড়ু, কেরালা) পলিয়ান বা পালাইয়ার বা পাঝাইয়ারারে আদিবাসীরা তাদের বয়স নির্নয় করেন নীলাকুরিঞ্জি ফুল ফোটার সময়কালের উপর নির্ভর করে । তামিলনাড়ু রাজ্যের পাহাড়ী শহর কোদাইকানালে অবস্থিত হিন্দু দেবতা কার্তিক ও গণেশের পবিত্র 'Kurinji Andavar Temple' কে নীলগিরির দুর্লভ ফুল নীলাকুরিঞ্জির নাম থেকেই 'কুরিঞ্জি মন্দির' নামকরণ করা হয়েছে । এ মন্দিরের দেবতাদের উদ্দেশ্যে নীলাকুরিঞ্জি ফুল উৎসর্গ করা হয় । সর্বোৎকৃষ্ট তামিল সাহিত্যে নীলাকুরিঞ্জিকে 'শতবর্ষীয় ফুল' কিংবা 'কুরাঙ্গল কুরিঞ্জি' হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এটি নিয়ে বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে "Red earth and pouring rain" । এ ফুলকে কেন্দ্র করে জনপ্রিয় সাহিত্যিক Clare Flynn বিখ্যাত প্রেমের উপন্যাস 'Kurinji flowers' রচনা করেছেন । এছাড়া, আরেক লেখক Roy Mathew লিখেছেন 'Kurinji the flower of the blue mountains' । অনন্য বৈশিষ্ট্য এবং অনুপম সৌন্দর্যের কারণেই নীলাকুরিঞ্জিকে পশ্চিমঘাটের রাণী বলা হয় । অপার সৌন্দর্য, বৈচিত্র্যময়তা এবং নীলাকুরিঞ্জি ফুলের জন্য এ পর্বতমালাকে নীলাকুরিঞ্জি ফুলের রাজ্যও বলা যেতে পারে । নীলাকুরিঞ্জি উদ্ভিদ আগুন প্রতিরোধ করার ক্ষমতা রাখে । এ উদ্ভিদ বনের আগুন থেকে তৃণভূমির প্রাকৃতিক সুরক্ষক হিসেবে কাজ করে এবং মাটির ক্ষয়সাধনে বাধা দেয় । নীলাকুরিঞ্জি উদ্ভিদ দক্ষিণ ভারতের পশ্চিমঘাট পর্বতমালা (নীলগিরি, আন্নামালাই পাহাড়, এলাচ পাহাড়, পালানি পাহাড়, আগালি পাহাড়, সান্দুরু পাহাড়, বাবাবুডাঙ্গিরি পাহাড় বা দত্ত পিটা পাহাড়) জুড়ে, পূর্বঘাট পর্বতমালার শেভরয়সহ অন্যান্য পাহাড়গুলোতে, কেরালা রাজ্যের ইরাভিকুলাম জাতীয় উদ্যানে, টপ স্টেশন, সাইলেন্ট ভ্যালি এবং ভিথিরি ইত্যাদি জায়গায় দেখা যায় । এছাড়া এটি মুন্নার শহড়ের নিকটবর্তী অঞ্চল রাজামালা, কোভিলুর, কান্থাল্লুর, ভাট্টাভাডা, কোট্টাকাম্বুর ও কাডাভারি প্রভৃতি গ্রামে এবং তামিলনাড়ু রাজ্যের কোদাইকানাল, পালানি পর্বতগুলোতেও নীলাকুরিঞ্জির অনুকূল জলবায়ু রয়েছে । 
যদিও ভারতে এ উদ্ভিদের আবাসস্থল ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে বা পাচ্ছে । পশ্চিমঘাট পর্বতশ্রেণীতে ৫০০০ - ৮৫০০ ফুট পর্যন্ত উঁচুতে দক্ষিণ-পশ্চিম জৈব বৈচিত্র্যের উষ্ণ বিন্দুতে (Hotspot) প্রচুর পরিমাণে নীলাকুরিঞ্জি জন্মে থাকে । সময়ের পরিবর্তনে নীলাকুরিঞ্জি উদ্ভিদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউক্যালিপটাস গাছ, বাবলা গাছ, কৃষিকাজ (চা, এলাচ, কফি ও মসলা ইত্যাদি), পাখি এবং ঘাস খায় এমন স্তন্যপায়ী প্রাণী দ্বারা ।  অতি সম্প্রতি পর্যটন, দখল, অবৈধভাবে জমি গ্রহণ, খামার ও আবাসিক উন্নয়ন ইত্যাদি কাজের প্রত্যক্ষ প্রভাবে এবং জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে যেখানে নীলাকুরিঞ্জি উদ্ভিদ জন্মে থাকে এমন তৃণভূমিকে ছিনিয়ে নিয়েছে বা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বা করছে । এছাড়া, নীলাকুরিঞ্জি উদ্ভিদের আদিম আবাসস্থলের বেশিরভাগ এলাকা বিস্ময়করভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে এবং পাহাড়ী আবাসে নীলাকুরিঞ্জির বিবর্তন ও বেঁচে থাকা জটিলভাবে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে । তাই, এভাবে চলতে থাকলে একেবারেই চূড়ান্তভাবে এটি ধ্বংসের সম্মুখীন হবে । কয়েক বছর পূর্বে পশ্চিমঘাট অঞ্চলের এক অংশে উপগ্রহ চিত্র থেকে দেখা গেছে যে, গত ৪০ বছর থেকে প্রায় ৬৬ শতাংশ তৃণভূমি সঙ্কুচিত হয়েছে এবং একই সাথে ১২ গুণ কাঠ বাগান বৃদ্ধি পেয়েছে । আসলেই, এ বৃহত্তম পরিবর্তনটি আশঙ্কাজনক! সড়ক প্রশস্তকরণ, ক্রমবর্ধমান নির্মাণ কাজ, এক শ্রেণীর পর্যটকের ফুল বা গাছের অংশ ছিঁড়ে ছবি তোলা, অগোচরে ফুল বাড়িতে নিয়ে সাজিয়ে রাখার প্রবণতা এবং ফুলসহ গাছ উপড়ে ফেলা ইত্যাদি কারণে নীলাকুরিঞ্জির স্বাভাবিক জীবন প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করে এটিকে হ্রাস বা ধ্বংস করছে । এ ধরণের দায়িত্বজ্ঞানশূন্য আচরণের জন্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নীলাকুরিঞ্জি উদ্ভিদ । এছাড়া, বনমোরগ এবং অন্যান্য ক্ষুদে স্তন্যপায়ী প্রাণীরা (Predator saturation বা খাদক-আধিক্য) এ ফুলের সুস্বাদু বীজ খেয়ে এটিকে নিঃশেষ করে ফেলছে । নীলাকুরিঞ্জি উদ্ভিদ বিপন্ন প্রজাতি এবং এর ক্ষতিসাধনের ফলে পরিবেশগত বিপর্যয় বা ভারসাম্যকে ব্যাহত করতে পারে । নীলাকুরিঞ্জি উদ্ভিদ এবং এর আবাসস্থল সম্পর্কে ক্ষতিকারক দিকগুলো নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, এ অঞ্চলে নীলাকুরিঞ্জি উদ্ভিদের জন্য যা মারাত্মক ক্ষতিকর সেই সকল বাণিজ্যিক ক্রিয়াকলাপ বন্ধ করার পদক্ষেপ নেয়া, অধিক পরিমাণে জাতীয় উদ্যান সৃষ্টি ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং এ উদ্ভিদের ক্ষতিগ্রস্ত আবাসকে পুনরায় জীবন্ত রূপ দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে । তবেই, প্রকৃতি আরো স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রাণ ফিরে পাবে, সজীবতায় ভরে উঠবে এবং নীলাকুরিঞ্জির আবাসস্থল পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে । 
নীলাকুরিঞ্জি ফুল ভালোবাসার তীব্র আকাঙ্ক্ষার প্রতীক । সুখ, আনন্দ এবং অনুপ্রেরণার উৎস । এ ফুল একটি মেয়ের আত্মজাগরণের প্রতিনিধিত্ব করে । উল্লেখ্য যে, তামিল ঐতিহ্য অনুসারে কন্যা সন্তানের ১২ বছর বয়সে যৌন পরিপক্কতা অর্জন হিসেবে এ ফুলকে বিবেচনা করা হয় এবং নারীত্বের মধ্যে পুষ্পিত ফুলের সাথে এক নিবিড় সম্পর্ক হিসেবে গন্য করা হয় । গত ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে পাহাড়গুলোতে নীলাকুরিঞ্জি ফুল প্রস্ফুটিত হয়েছিল । এবার ফুল ফোটার পরবর্তী মৌসুম শুরু হবে ২০৩০ খ্রিস্টাব্দে যা এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা । সুতরাং, আপনি হয়তো বিরল নীলাকুরিঞ্জির অপূর্ব নীল সৌন্দর্যের রোমাঞ্চকর এক দুর্দান্ত অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হতে পারেন । 
ছবি: https://www.ekeralatourism.net/  
* তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, আন্তর্জাল (The Internet) ।

Saturday, 4 July 2020

করোনাভাইরাস (Covid-19) এর টীকা আবিষ্কারের পথে বাংলাদেশ ।

এ এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ!
বাংলাদেশের অন্যতম ওষুধ প্রস্তুতকারী Globe Pharmaceuticals Group of Companies Ltd এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান Globe Biotech Limited, Bangladesh http://globe-biotech.com/?fbclid=IwAR1qydLig41MKxdoCsk7wdHYJcQ3ckX27VL3d20u8Q-IJpDmSdrWWcW6WTA বাংলাদেশের প্রথম সংস্থা হিসেবে Covid-19 https://www.who.int/bangladesh/emergencies/coronavirus-disease-(covid-19)-update করোনা ভাইরাস (Coronavirus) রোগের বিরুদ্ধে একটি টীকা (Vaccine) আবিষ্কারের দ্বারপ্রান্তে । Covid-19 এর টীকা'র জন্য প্রারম্ভিকভাবে প্রাণীর উপর পরীক্ষায় (Preliminary animal modelling trial) সাফল্য দাবি করা হয়েছে (যেখানে Covid-19 spike protein এর বিপরীতে প্রাণীর মডেলগুলিতে উচ্চ অনুরক্তিতে Antibody তৈরি করছে) ।
গতকাল ০৩/০৬/২০২০ খ্রিস্টাব্দ এক সংবাদ সম্মেলনে Globe Biotech Limited, Bangladesh এর সহকারী ব্যবস্থাপক এবং গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের প্রধান ডঃ আসিফ মাহমুদ (Dr Asif Mahmud) বলেছেন, বাংলাদেশে প্রথম Covid-19 ঘটনা ধরা পড়লে ৮ই মার্চ ২০২০খ্রিঃ থেকে তারা Testing kit, Vaccine এবং Medicine এর উন্নতিসাধন/সংস্কার করতে শুরু করেছেন । এ রোগ প্রতিরোধের জন্য বৈশ্বিক দৌড়ে যোগ দিয়েছেন, যা প্রতিদিনের জীবনকে বিশ্বজুড়ে উলট-পালট করে দিয়েছে । গত ১০ই জুন থেকে ২৮শে জুন ২০২০খ্রিঃ পর্যন্ত ০৩টি খরগোশের উপর প্রাথমিক পরীক্ষার পর তারা এ ফলাফল পেয়েছেন । তবে, পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরে টীকা বাজারজাত করতে আরও প্রায় ছয় মাস সময় প্রয়োজন । যদিও, সংস্থাটি এখনো Patent (বিশেষ অধিকার) এর জন্য আবেদন করতে পারেনি এবং Patent নিশ্চিত হওয়ার আগে এটি পরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত তথ্য প্রকাশ করবে না । নিয়মানুযায়ী তারা ইতিমধ্যে মূলনীতি ও প্রাণী পরীক্ষা নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে এবং এ পরীক্ষা চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে শেষ করে পরবর্তীতে সংস্থাটি Bangladesh Medical Research Council (BMRC) এর নিকট নৈতিক অনুমোদন চাইবে এবং উক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে (যদি/যখন) অনুমোদন অর্জনের মধ্য দিয়ে সংস্থাটি ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (DGDA) তত্ত্বাবধানে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ওষুধের কার্যকারিতা নির্ধারণের জন্য মানুষের উপর পরীক্ষায় এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে (এ টিকা'র 7.0 million vials তৈরির সক্ষমতা রয়েছে) । আশা করা যায়, ভবিষ্যতে মানবদেহে প্রয়োগে সফলভাবে এ টীকা কাজ করবে ।
Globe Biotech Limited, Bangladesh এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাকন নাগ (Kakon Nag) এবং প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা নাজনীন সুলতানা (Naznin Sultana) এর নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি বৈজ্ঞানিক দল গত ১৮ই মার্চ ২০২০খ্রিঃ SPR পৃষ্ঠতল প্লাজমনের অনুরণন পদ্ধতিতে (Surface plasmon resonance method) গবেষণাটি শুরু করেন এবং দু'জনেই কানাডা থেকে দলটিকে তদারকি করেছিলেন । পৃষ্ঠতল প্লাজমনের অনুরণন পদ্ধতি একটি অপটিক্যাল কৌশল (প্রযুক্তি ব্যবহার) যা আণবিক মিথস্ক্রিয়া সনাক্তকরণের জন্য ব্যবহৃত হয় ।
জিনোম (Genome) একটি জীবের জিনগত উপাদান । এটিতে DNA (বা RNA, আরএনএ ভাইরাসগুলির মধ্যে) থাকে । জিনোমে জিনগুলি (Gene) (কোডিং অঞ্চলগুলি) এবং ননকোডিং (Noncoding) DNA, পাশাপাশি Mitochondrial DNA এবং Chloroplast DNA উভয়ই রয়েছে । ৭৬ Genome sequence https://en.wikipedia.org/wiki/Whole_genome_sequencing নিয়ে সেখানে দেখেন যে, একটি বিন্যাসক্রমে (Sequence) একটি পরিব্যক্তি বিন্দু রয়েছে, যা তারা অ্যামিনো অ্যাসিড বন্ধনের (Amino acid bonding) জন্য ব্যবহার করেছেন । খরগোশগুলিকে বিচ্ছিন্ন এবং তারা (খরগোশ) তাদের দেহে ইতিমধ্যে Antibody (জীবদেহে কোনো বিশেষ ক্ষতিকর পদার্থ প্রবেশের প্রতিক্রিয়ায় জাত বিশেষ প্রোটিনজাতীয় পদার্থ যা ঐ ক্ষতিকর পদার্থকে ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করে) তৈরি করেছে কি-না, রক্তরস (Serum) সংগ্রহের মাধ্যমে তা বিশ্লেষণ করে ০৩টি খরগোশকেই প্রথমবারের জন্য আবিষ্কারকৃত ওষুধের মাত্রা (Dose) দেওয়া হয় । এরপর খরগোশগুলোকে পর্যায়ক্রমে দু'টি মাত্রা (Dose) দেওয়ার পর রক্তের Serum সংগ্রহের মাধ্যমে Antigen ও Antibody বন্ধন কার্যকরভাবে তৈরি করছে কি-না (যথেষ্ট উন্নত মাত্রায় অনুরণন করে) পরীক্ষা করা হয় এবং পুরো প্রক্রিয়াটিই চলে WHO এর নির্দেশিকা অনুসরণ করে । বাংলাদেশি উদ্ভাবকরা প্রাণী পরীক্ষায় করোনাভাইরাস টীকা প্রয়োগ করে প্রাথমিকভাবে সফলতা অর্জন করেন ।
Globe Biotech Limited, Bangladesh তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ কোডিং (The complete coding of the target) (অনুক্রমটি) জমা দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বায়ো টেকনোলজি তথ্য সংস্থার (NCBI) কাছে এবং তারা ইতিমধ্যে বিষয়টি অনুমোদিত ও সংস্থার সাময়িকীতে (Journal)  প্রকাশ করেছে । NCBI virus database অনুসারে, গত ৩০শে জুন, ২০২০ খ্রিঃ অবধি বিশ্বজুড়ে একটি ভাইরাসের একটি টীকা আবিষ্কার, সুরক্ষা, কার্যকারিতা, উন্নতিসাধন বা সংস্কারে ৫,৭৪৩টি জিনোম সিকোয়েন্স (Genome sequences) জমা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ৭৬টি জমা পড়েছে এবং সর্বশেষ সংস্কার ১১৭তম এ দেশ । সত্যিই একটি সুখবর, প্রশংসিত ও আশাপ্রদ কাজ ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Moderna এবং Pfizer, যুক্তরাজ্যের Oxford University, চীনের Synovac Biotech, ভারতের Bharat Biotech Limited/Bharat Biotech International Limited (BBIL) এর মতো সারাবিশ্বে কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত সংস্থা টীকা তৈরি ও উন্নয়নের উপর এ বিষয়ে কাজ করছে । আবার কেউ কেউ তাদের আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছেন । এদের মধ্যে কয়েকটি সংস্থাই এ বছরের মধ্যে প্রথম ধাপের বিচারে যেতে সক্ষম হয়েছে । ২০০টি কোম্পানির মধ্যে প্রায় ১১টি প্রকল্প প্রথম পর্যায়ে রয়েছে, ০৪টি সংস্থা দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছে এবং ০৩টি সংস্থা বিশ্বের ৩য় পর্যায়ে রয়েছে ।
আমরা পিছিয়ে থাকবো কেন?
এ মহামারিতে ক্ষণে ক্ষণে বেড়ে চলছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা । বিশ্বব্যাপী এ পর্যন্ত মরণঘাতী করোনো ভাইরাসে প্রায় ৫২০,০০০ অধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে । বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বিজ্ঞানীরা Covid-19 এর কার্যকর প্রতিষেধক বা টীকা আবিষ্কারের জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা ও উন্নতিসাধন করে চলেছেন । বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ০৭ বিলিয়ন টীকা'র চাহিদা রয়েছে যার মধ্যে কেবলমাত্র ১.২ বিলিয়ন পূরণ করা যেতে পারে । এ পরিস্থিতিতে আমাদের নিজস্ব একটি টীকা তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি সম্ভবপর ।
২০১৫খ্রিঃ Globe Biotech Limited https://web.facebook.com/globebiotechlimited/?_rdc=1&_rdr প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অনুমতি সাপেক্ষে এ জাতীয় গবেষণা চালানোর অনুমতি রয়েছে । প্রথমত এ টিকা আবিষ্কার মানবজাতির জন্যই কল্যাণকর, বিদেশ থেকে করোনা ভাইরাসের টীকা আমদানি করা অবশ্যই ব্যয়বহুল, সাশ্রয়ী মূল্যে এটি উত্পাদন করে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানি দিকও বিবেচনা করা যেতে পারে এবং এর সাথে উৎপাদনকারী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান সংস্থা ও দেশের সুনাম জড়িয়ে আছে । Globe Biotech Limited গবেষণা বা উদ্ভাবনী কাজ করে যে সাহসী উদ্যোগ নিয়েছে সত্যিই প্রশংসনীয় । আমাদের নিজস্ব প্রয়োজনেই এর সহায়তা, সমর্থন, উন্নয়ন, সংরক্ষণ, নিরাপত্তা এবং সরকারের পূর্ণ সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা অতীব জরুরী । সত্যিকারভাবেই Globe Biotech Limited, Bangladesh বায়োইনফরম্যাটিক্স সরঞ্জামের (The Bioinformatics tools) মাধ্যমে টেকসই এ কার্যক্রম পরীক্ষা করে তাদের টীকা উৎপাদনের লক্ষ্যকে নিশ্চিত করেছে- যা শুধু এ ভৌগলিক অঞ্চলেই নয় সারাবিশ্বে এটি যৌক্তিকভাবে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে । জনহিতকর এ কার্যক্রমের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আমি আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানাই এবং এ কর্মসূচীর উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি । জয় হোক মানবতার ।
#COVID19 #Vaccine #Invention #Bangladesh #GlobeBiotechLimited #GBL #Corona #CoronaVirus

https://web.facebook.com/watch/live/?v=757645861643290&ref=watch_permalink

https://web.facebook.com/globebiotechlimited/posts/2690812854491988

Sunday, 31 May 2020

প্রকৃতির শাশ্বত সৌন্দর্য


সুন্দর, শান্ত এবং মনোরম প্রকৃতি ।  
ঐন্দ্রজালিক সংস্পর্শে তার মাঝে কি যেনো খুঁজে পাই । 
এক অজানা আকর্ষণে হারিয়ে যাই দূর- বহুদূর । 
এ বিশুদ্ধ সবুজ প্রকৃতি আশীর্বাদ স্বরূপ । 
তবে, কখনো হয় অভিশপ্ত ।  
কারণ, প্রকৃতির কাছে মানুষ বিষম অসহায় । 
তাই, প্রায়শই এটি নিষ্ঠুর এবং বেদনাদায়ক হয়! 
তবুও, প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য প্রশান্তি এনে দেয় । 
মানব আত্মাকে শান্ত রাখে । 
সেই অপরূপ প্রকৃতির গহীনে রয়েছে বৈচিত্র্যময় কতো কি... 
বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত জলরাশির হিমশীতল তলদেশে চকচকে রূপালি ইলিশের পদচারণা । 
পরিযায়ী পাখিদের সুদীর্ঘ পথ পেরিয়ে এ নৈসর্গিক ভূমিতে ক্ষণস্থায়ী আগমন । 
সাদা তুলা মেঘগুলো সুনীল আকাশের নীলিমায় মিশে যায় ৷ 
বাবুই পাখি সুনিপুণ কারুকার্যে নির্মাণ করে শান্তির নীড় ।  
প্রবাহিণীর তীরে বেড়ে উঠা কলমি ফুল আগন্তুককে সাদর সম্ভাষণ করে । 
কেটে আসা পরিচয়হীন ঘুড়ি দুর্বার গতিতে হারিয়ে যায় অজানা গন্তব্যে । 
কদম, হিজল, বনতুলসী ও মধুমাধবী লতার মাতাল ঘ্রাণে দিশেহারা ভ্রমর ।
ডুমুর গাছে আড়ালে থাকা ধুরন্ধর মাছরাঙার আচকা শিকার ।
পলাশ, শিমুল, সোনালু এবং মহুয়ার অবারিত রঙের ঝলক ।
রঙিন প্রজাপতি প্রিয়তমার সাথে উড়ে যায় সংকীর্ণ গিরিখাতের উপর দিয়ে । 
তালগাছের ডগায় চিলের বাসার কাছেই আটকে থাকা ঘূর্ণায়মান ঘুড়ির ব্যাকুলতা ৷ 
দুর্গম ঢিবির তে-মাথায় ঘন বেত ঝোপঝাড়ে ঝুলে থাকা রসালো বেত্তুইন ফলের হাতছানি । 
কুণ্ডলী পাঁকানো মৌমাছির ঝাঁকে অশান্ত শিকারী ঈগলের হিংস্র থাবা । 
নীলমনি, রাধাচূড়া, নাগলিঙ্গম, অশোক এবং কিংশুকের দুর্নিবার প্রাণচাঞ্চল্যতা । 
কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম আভা ও নরম স্পর্শে মন ছুঁয়ে যায় ।
কোকিলের সু-মধুর কুহুতানে ভালোবাসার উচ্ছ্বাস ৷ 
বিলের শান্ত জলে মাছ শিকারে মগ্ন চৌকষ পানকৌড়ি ৷ 
বৃদ্ধ গাব গাছের মগডালে ঘুঘু পাখির গোপন অভিসার ৷ 
স্রোতস্বিনী নদীতে অজোপাড়া গাঁয়ের দামাল ছেলেদের দুরন্তপনা ৷  
পাহাড়ী অরণ্য থেকে দারুচিনির সুমিষ্ট গন্ধ ভেসে আসে নির্জন সৈকতে । 
পূবালী বাতাস মনমাতানো ঢেউ খেলে শুভ্র কাশফুল বনে ৷ 
দেবদারু গাছে বাঁধা কানি বকের বাসায় বিষধর শঙ্খিনী সাপের আচমকা হানা ৷ 
ধূর্ত খেঁকশিয়ালের ভয়ে আতঙ্কিত ডাহুক যুগল আত্মগোপন করে নলখাগড়ার বনে ৷ 
সাঁওতাল নারীরা টিলার বন্ধুর পথ ধরে হেঁটে যায় ছোট ছোট মাটির তৈরি ঘর অভিমুখে । 
উচ্চাকাশে ঘুরপাক খাওয়া ক্ষুধার্ত শকুন তীক্ষ্ণ চোখে তন্ন তন্ন করে খোঁজে মৃত জীবদেহ ।
ভূতুরে ছাতিম গাছ তলার আঁকাবাঁকা মেঠো পথে শৈশবের পদাঙ্ক । 
বাদুড় থেকে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের ভয় খেজুরের অমৃত রস পানের ইচ্ছাকে নিবৃত্ত করে । 
সর্ষে ক্ষেতে কাকতাড়ুয়ার মাথায় বসা ফিঙের শাণিত দৃষ্টি ।
সোনালী ফসলী জমির কাঙ্খিত ফলন দেখে উচ্ছ্বসিত রূপসী বধূ । 
শিশির ভেজা ঠোঁটে এক চিলতে সুখের হাসি । 
অপার সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্যময় বাংলার অনাবিল সবুজ প্রান্তর ।
অপলক চেয়ে থাকি দিগন্ত জুড়ে । 
পড়ন্ত বিকেল । 
রক্তাভ সূর্যাস্ত ।
এক মায়াবী মুহূর্ত । 
বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় । 

https://www.facebook.com/ashrafulalam715/posts/1346085348838132

Friday, 22 May 2020

বিক্রমপুর (Bikrampur)


আজ থেকে প্রায় নয় হাজার বছর পূর্বে নব্যপ্রস্তর যুগে ধাদার, বেলুচিস্তান, পাকিস্তান অঞ্চলে সৃষ্টি হয় বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতা 'মেহেরগড় সভ্যতা' এবং এটি ৭০০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ৩২০০ খ্রিষ্টপূর্বে আবিস্কৃত হয় । মহাদীর্ঘকালের ধারাবাহিকতায় এবং বিভিন্ন পট- পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পরবর্তীকালে সিন্ধু সভ্যতার (বা হড়প্পা সভ্যতা) সূচনা, বিকাশ, বিস্তৃতি, ধ্বংস বা বিলুপ্তি ঘটে । আর্য সভ্যতা, ঋক্‌বৈদিক কিংবা পরবর্তী-বৈদিক সভ্যতার (Vedic Civilization) গোড়াপত্তনের সময়কালীন প্রাচীন ভারতে এক ঐতিহাসিক যুগের সূচনা হয় । শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় জীবন ও সাহিত্যে উৎকর্ষতার সুদৃঢ় ভিত সৃষ্টি করে এখানে এক অতি উন্নত মানের সভ্যতা এবং সংস্কৃতি গড়ে উঠে । যেখান থেকে পূর্ব- পুরুষদের অনুপ্রেরণা নিয়ে উত্তরাধিকার সূত্রে আজ অবধি আমরা আমাদের অস্তিত্ব, সে ইতিহাস এবং ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছি । 
 রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী জেলা মুন্সীগঞ্জের অন্তর্গত 'বিক্রমপুর' । বাংলার একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল । ধারণা করা হয়, বৈদিক যুগ (ছয় হাজার বছরেরও বেশি পূর্বেকার বেদবর্ণিত সময়কাল) থেকে ভাওয়াল এবং সোনারগাঁও (সুবর্ণ গ্রাম) রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পূর্বে এটিই ছিল বাংলার প্রাচীনতম রাজধানী । উল্লেখ্য যে, ভাওয়াল জমিদার বংশের পূর্বপুরুষগণ মুন্সীগঞ্জের অন্তর্গত বজ্রযোগিনী গ্রামের বিখ্যাত পুশিলাল শোত্রীয় ব্রাহ্মণগোত্রের বাসিন্দা ছিলেন । বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর তীর থেকে ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকা পার হয়ে সুসং পাহাড় পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ভূ-ভাগের মধ্যে জয়ানশাহি গহীন অরণ্য অঞ্চলের উত্তরাংশকে মধুুপুর অরণ্য অঞ্চল এবং দক্ষিণাংশকে ভাওয়াল অরণ্য অঞ্চল বলা হয় । প্রাচীন ভাওয়াল পরগনা তথা বর্তমান বাংলাদেশের গাজীপুর জেলা যেটি সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে (২৭৩-২৩২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) মৌর্য সম্রাজ্যের অধিকারে ছিল । প্রাচীন কাল থেকেই বৌদ্ধ জ্ঞান চর্চা এবং পরবর্তীতে সাংস্কৃতিক প্রভাবের জন্য বিক্রমপুর বেশ সুপরিচিত । বিক্রমপুর ছিল প্রাচীন বঙ্গের (বঙ্গ জনপদের) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র । বিক্রমপুর নামের ‘বিক্রম’ অর্থ সাহস বা বীরত্ব এবং ‘পুর’ অর্থ নগর বা এলাকা । বিক্রমপুর নামটির উৎপত্তি বিক্রমাদিত্য থেকে । প্রাচীন ভারতীয় সাম্রাজ্য ছিল গুপ্ত সাম্রাজ্য (Gupta Empire)। মহারাজ চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য [যিনি গ্রিকদের নিকট সান্দ্রোকোত্তোস বা আন্দ্রাকোত্তাস নামে পরিচিত (৩৪০ খ্রিস্টপূর্ব- ২৯৮ খ্রিষ্টপূর্ব)] মৌর্য্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা । ভারতবর্ষের ইতিহাসে শ্রীগুপ্ত ছিলেন প্রথম সম্রাট যিনি ভারত উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ অংশকে এক শাসনের অধীনে নিয়ে এসে শাসনকার্য পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন । পরবর্তীকালে তারই বংশধরগণ ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্রাজ্য স্থাপন ও বিস্তার প্রসারিত করেন । জ্ঞান- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, আবিষ্কার, বাস্তুবিদ্যা, শিল্প, ন্যায়শাস্ত্র, সাহিত্য, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, ধর্ম ও দর্শন শাস্ত্রে উৎকর্ষতার ফলে গুপ্তযুগকে বলা হয় ভারতের স্বর্ণযুগ । বর্তমান হিন্দু সংস্কৃতি মূলত গুপ্তযুগেরই প্রতিনিধিত্ব করছে । মহারাজ চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের উত্তরসূরী দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বা চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্য (রাজত্বকাল: ৩৭৫ খ্রিষ্টাব্দ- ৪১৫ খ্রিষ্টাব্দ) একজন রাজা ছিলেন যা হিন্দু পুরানে বর্ণিত আছে । বিক্রমপুর ছিল রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজধানী । বিক্রমাদিত্য এর অর্থ হলো সূর্যের প্রতাপ । বিক্রমাদিত্য প্রাচীন উত্তর ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজা ও শক্তিশালী শাসক ছিলেন । হিন্দু পঞ্জিকা ‘বিক্রম সম্বৎ’ এর রচয়িতা তিনি । প্রাচীন ভারতবর্ষের সম্রাটদের কাছে 'বিক্রমাদিত্য' অত্যন্ত গর্ব, বীরত্ব, আভিজাত্য ও জনপ্রিয় উপাধি । শৌর্য- বীর্যের এ উপাধির ধারক ছিলেন প্রাচীন গুপ্ত, চালুক্য, চোল, একাধিক হিন্দু সাম্রাজ্যের সম্রাটগণ ও কাশ্মীরি রাজারা । মধ্যযুগ এবং তারও পরবর্তীকালীন সময়ে অনেক শাসকগণ এ উপাধি বা পদবি গ্রহণ করেছিলেন । চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্য 'বিক্রম' ও 'মহাকালদেব' নামে ভারতের প্রাচীন রাজাদের মধ্যে একজন আদর্শবান, সৎ, ন্যায়পরায়ণ, বুদ্ধিমান এবং সাহসী শাসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন । মহারাজ শ্রীগুপ্তের পৌত্র, মৌর্য সাম্রাজ্যের তৃতীয়, ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্রাট অশোক (৩০৪ খ্রিস্টপূর্ব- ২৩২ খ্রিস্টপূর্ব) দাক্ষিণাত্যের কিছু অংশ বাদ দিয়ে ভারতবর্ষের অধিকাংশ অঞ্চল শাসন করেন । সম্রাট অশোকের জন্ম হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৩০৪ সালে । ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য ছিল অশোকের । গৌতম বুদ্ধের অনুসারি হিসেবে তিনি তার সাম্রাজ্য জুড়ে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার করেছিলেন, যার মধ্যে তার সাম্রাজ্যের পূর্বে অবস্থিত এ বিক্রমপুরও ছিল । পরবর্তীকালে পাল, সেন, বর্মণ, চন্দ্র, দেব, বারোভুঁইয়া এবং মুঘল'রা বিক্রমপুরে এসে এ অঞ্চল শাসন করেন । 
প্রাচীন বঙ্গদেশের প্রথম সার্বভৌম বাঙালি নৃপতি (রাজত্বকাল: ৫৯০ থেকে ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ) ও শৈব ধর্মের উপাসক শ্রী মহাসামন্ত শশাঙ্ক (Shashanka) এর রাজ্য পতনের পর বাংলা অঞ্চলে নৈরাজ্য দেখা দিলে পাল রাজা গোপাল ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে গৌড়ের সম্রাট পদে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পাল শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন (রাজত্বকাল: ৭৫০ থেকে ৭৮১ কিংবা ৭৯৫ খ্রিস্টাব্দ) এবং পাল সাম্রাজ্য (Pala Empire) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেন । পাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা রাজা গোপালের পিতৃভূমি (জনকভূ) বরেন্দ্র (উত্তরবঙ্গ) অঞ্চলে । (প্রাচীন) প্রাকৃত ভাষায় 'পাল' শব্দের অর্থ ‘রক্ষাকর্তা’ । পাল সাম্রাজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিল বাংলা ও বিহার ভূখণ্ড এবং প্রধান শহরগুলো ছিল পাটলীপুত্র, বিক্রমপুর, রামাবতী (বরেন্দ্র), মুঙ্গের, তাম্রলিপ্ত এবং জগদ্দল । পাল সম্রাটরা প্রাজ্ঞ কূটনৈতিক, যুদ্ধজয়ী এবং বৌদ্ধধর্মের মহাযান ও তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের অনুগামী ছিলেন । তারা সাহিত্য, চিত্রকলা, ধ্রুপদি ভারতীয় দর্শন এবং ভাস্কর্যশিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন । তাদের শাসনামলে প্রোটো- বাংলা ভাষা, গাণিতিক, জ্যোতির্বিজ্ঞান, শিল্পকলা ও স্থাপত্য শিল্পের বিকাশ এবং বাংলা অঞ্চলে প্রথম ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ঘটে । বাংলা ভাষার ভিত রচনা ও বাংলায় প্রথম সাহিত্যকীর্তি 'চর্যাপদ' পাল শাসনামলেই রচিত হয়েছিল । রাজ্য প্রতিষ্ঠা, প্রভাব- প্রতিপত্তি, পাল বংশের গৌরব ধরে রাখা ইত্যাদির মাধ্যমে প্রায় চার শত বৎসর ছিল পাল রাজ বংশের রাজত্বকাল । পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম রাজবংশই এতটা সময় ধরে একচ্ছত্রাধিপত্যের মাধ্যমে রাজত্ব ধরে রাখতে পেরেছিল । রাজা গোপাল রাজ্য প্রতিষ্ঠার সূচনা করলেও পাল সাম্রাজ্যকে আরও সুসংহত করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন তার পুত্র ধর্মপাল । তবে, পঞ্চদশ পাল সম্রাট রামপাল ছিলেন অতি শক্তিশালী পাল সম্রাট । ১১৬১ খ্রিস্টাব্দে সর্বশেষ পাল রাজা মদনপালের রাজত্বকালের সময়ে দীর্ঘকাল যাবৎ পালদের তিলে তিলে গড়ে তোলা সাম্রাজ্যর চূড়ান্ত পতন ঘটে । সে সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বশেষ প্রধান বৌদ্ধ সাম্রাজ্যের অবসান হয় । বাংলার ইতিহাসে পাল যুগকে অন্যতম 'সুবর্ণযুগ' মনে করা হয় । বাংলার ইতিহাসে সৃষ্ট রাজনৈতিক পালা বদলে শক্তিশালী রাজবংশ হিসেবে পাল রাজবংশের পরই উল্লেখ করা যায় সেন রাজবংশের কথা । প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে একাদশ শতাব্দীর অন্তিম লগ্নে পাল সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে হিন্দু সেন রাজবংশের (Sena dynasty) উত্থান এবং সেন রাজবংশ পরাক্রমশালীভাবে বাংলা শাসন করতে শুরু করে । বাংলায় সেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা সামন্ত সেন এবং তার আদি নিবাস বর্ধমান অঞ্চলে । বসতি স্থাপন করেন রাঢ় অঞ্চলে গঙ্গা নদীর তীরে । সেন বংশের রাজারা সমগ্র বাংলার উপর তাদের নিরঙ্কুশ শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন । ভারতবর্ষে বাংলার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে সেন বংশীয় রাজাদের মধ্যে বিজয় সেন, বল্লাল সেন এবং লক্ষ্মণ সেন বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন । সেন রাজারা প্রায় একশ বছরেরও অধিক সময়কাল ধরে (রাজত্বকাল: ১০৯৭- ১২২৫ খ্রিঃ) বাংলা অঞ্চলকে শাসন করেন । সেনদের আদিনিবাস ছিল দাক্ষিণাত্যের কর্ণাট অঞ্চলে (বর্তমান ভারতের মহীশূর, কর্ণাটক এবং অন্ধ্র প্রদেশের কানাড়ী ভাষাভাষি অঞ্চল) । চন্দ্রবংশীয় বীরসেন এবং অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ কর্ণাট অঞ্চলে শাসন করতেন । চন্দ্র বংশোদ্ভূত সামন্ত সেনের বংশধরগণই বাংলা শাসন করেন । সেন বংশের লোকেরা কর্ণাট থেকে বাংলায় আসেন এবং পাল বংশীয় রাজাদের অধীনে উচ্চ রাজকার্যে নিয়োজিত হন । কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস! পাল বংশ দুর্বল হয়ে পড়লে সেন'রা বাংলার শাসন ক্ষমতা করায়ত্ত করেন । দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বিজয়সেন (রাজত্বকাল: ১০৯৫- ১১৫৮ খ্রিস্টাব্দ) পাল ও বর্মনদের পরাভূত করে সমগ্র বাংলায় নিজ বংশের শাসন প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন । সেন রাজারা ছিলেন গোঁড়া হিন্দু এবং চন্দ্রবংশীয় ‘ব্রহ্মক্ষত্রিয়’ । তারা ব্রাহ্মণ্য আচার, রাজ্যশাসন, শাস্ত্র বিদ্যা ও অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন । বিক্রমপুরের রামপাল নগরে ১০৬০ খ্রিস্টাব্দে বিজয় সেনের ঘরে জন্ম নেয় বল্লাল সেন । বিজয়সেন গৌড়াধিপতি চন্দ্রসেনের কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন । শৈব বরে বল্লাল সেনের জন্ম হওয়ায় বিজয়সেন পুত্রের নাম রাখেন 'বরলাল', পরবর্তীতে 'বল্লাল' শব্দটি তারই অপভ্রংশ হয়ে দাঁড়ায় । বিজয় সেনের পুত্র এবং উত্তরসূরি বল্লাল সেন চৌদ্দ বছর বয়সেই অস্ত্রবিদ্যায় ও শাস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠেন । তিনি দক্ষিণ ভারতের পশ্চিম চালুক্য সাম্রাজ্যের চালুক্যরাজ ২য় জগদেবমল্লের কন্যা রামদেবীকে বিয়ে করেন । বল্লাল সেন ছিলেন বঙ্গের সেন রাজবংশের দ্বিতীয় রাজা । ১১৬০ থেকে ১১৭৯ খ্রিঃ পর্যন্ত তিনি সেন বংশের রাজত্ব করেন । রামপালে (ঢাকায় বিক্রমপুর) তিনি তার নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । রামপালে একটি দীঘি আছে, যা বল্লাল সেনের নির্দেশে খনন করা হয় । বর্তমানে দীঘিটির অস্তিত্ব বিলীনপ্রায়, গ্রীস্মকালে পানি শুকিয়ে দীঘির কিছু অংশ ছাড়া প্রায় সবটাই ফসলের চাষ হয়ে থাকে । তবে বর্ষার পানিতে সে দীঘি কিছুটা প্রাণ ফিরে পায় । ঢাকায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্দির ঢাকেশ্বরী মন্দির তার আদেশে নির্মাণ করা হয় । বিক্রমপুর কৃষ্ণনগরের মায়াপুরে বল্লাল ঢিবি নামে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অস্তিত্ব ছিল ব্রিটিশ শাসনামলেও । পিতার মতো তিনিও শিবের উপাসক ছিলেন । শাসক হিসেবে অন্যান্য রাজকীয় উপাধির সঙ্গে তিনি 'অরিরাজ নিঃশঙ্ক শঙ্কর' ও 'গৌড়েশ্বর' উপাধি গ্রহণ করেছিলেন । সেন রাজাদের শাসন শেষ হলে বাংলায় তুর্কি শাসন শুরু হয় । একপর্যায় বর্মণদের রাজত্বকাল । বর্মণ বংশ দক্ষিণ- পূর্ব বাংলা শাসনকারী রাজবংশ । কামরূপ রাজ্যের প্রথম রাজা পুষ্যবর্মণ ঐতিহাসিক বর্মণ রাজবংশের (Varman dynasty) প্রতিষ্ঠাতা (৩৫০- ৩৭৪ খ্রিস্টাব্দ) । এ রাজবংশের শাসকরা গুপ্ত সাম্রাজ্যের সামন্ত ছিলেন । বর্মণ রাজারা ছিলেন বৈষ্ণব, কিন্তু তারা বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেন । ০৭ শতকের মধ্যভাগে শালস্তম্ভ নামক এক আদিবাসী নেতা বর্মণ রাজবংশের রাজা অবন্তীবর্মণকে (৬৫০- ৬৫৫ খ্রিস্টাব্দ) সিংহাসনচ্যুত করে ম্লেচ্ছদের অধিকার (মুসলমানদের ম্লেচ্ছ বলা হতো, যে মুসলমানদের অস্পৃশ্য- অভিশপ্ত- পাপী বলতো হিন্দুরা) প্রতিষ্ঠিত হয় । কিছুকাল অতিবাহিত হওয়ার পর পুনরায় বাংলার শাসন ক্ষমতায় রদ-বদল । পাল রাজশক্তি দুর্বল হয়ে পড়লে একাদশ শতাব্দীর শেষ এবং দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বর্মণরাজগণ বাংলার শাসনভার গ্রহণ করেন । বর্মদের রাজধানী ছিল বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুর । বর্ম্ম রাজন্যে এবং তাম্র শাসনে (একমাত্র প্রাথমিক সূত্র হিসেবে তামার পাতে প্রাচীনতম লিখিত দলিল বা তাম্রপত্র) বিক্রমপুর রাজধানীর কথা উল্লেখ আছে । শ্রীচন্দ্রের তাম্র শাসন থেকে রাজধানী হিসেবে যে বিক্রমপুর পাওয়া যায় সে বিক্রমপুর নামটি আজও পর্যন্ত চলমান রয়েছে । দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার সবচেয়ে শক্তিশালী স্বাধীন রাজবংশ ছিল চন্দ্র বংশ (Lunar dynasty) । চন্দ্রবংশের প্রথম নৃপতি পূর্ণচন্দ্র ও তার পুত্র সুবর্ণচন্দ্র রোহিতগিরির ভূ- স্বামী ছিলেন । সুবর্ণচন্দ্রের পুত্র ত্রৈলোক্যচন্দ্র হরিকেল, চন্দ্রদ্বীপ (বরিশাল ও পার্শ্ববর্তী এলাকা), বঙ্গ এবং সমতট (সমগ্র পূর্ব ও দক্ষিণ- পূর্ব বাংলায়) নিজ বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন (৯০০- ৯৩০ খ্রিঃ) । লালমাই পাহাড় ছিল চন্দ্র বংশীয় রাজাদের মূল কেন্দ্র এবং প্রাচীনকালে এ পাহাড় 'রোহিতগিরি' নামে পরিচিত ছিল । ত্রৈলোক্যচন্দ্রের পুত্র শ্রীচন্দ্র চন্দ্র রাজবংশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজা ও সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক (চন্দ্র শাসনের দ্বিতীয় শাসক, ৯৩০- ৯৭৫ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন এবং ‘পরমেশ্বর পরম ভট্টারক মহারাজাধিরাজ’ উপাধি ধারণ করেছিলেন । তার রাজ্য দক্ষিণ- পূর্ব বাংলা ছাড়াও উত্তর- পূর্ব কামরূপ ও উত্তরে গৌড় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল । বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে তিনি তার রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন । শ্রীচন্দ্রের পুত্র কল্যাণচন্দ্র (৯৭৫- ১০০০ খ্রিঃ) এবং পৌত্র লডহ চন্দ্র (১০০০- ১০২০ খ্রিঃ) চন্দ্র বংশের মান- মর্যাদা, গৌরব বংশানুক্রমে অক্ষুণ্ণ রাখেন । লডহ চন্দ্রের পুত্র গোবিন্দচন্দ্র ছিলেন সর্বশেষ চন্দ্র রাজা । দশম শতাব্দীর শুরু থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত প্রায় দেড়শত বৎসর এ বংশের রাজারা শাসন করেন । খড়গ বংশের শাসনের পর এ অঞ্চলে দেব বংশের (Deva dynasty ) উত্থান ঘটে । খ্রিস্টীয় ৮ম- ৯ম শতাব্দীতে সমতট অঞ্চলে রাজত্বকারী হিন্দু 'দেব রাজবংশ' এর রাজধানী ছিল দেবপর্বত এবং মধ্যযুগে (খ্রিস্টীয় ১২শ- ১৩শ শতাব্দীতে) বঙ্গে হিন্দু 'দেব রাজবংশ' (হিন্দু- বৈষ্ণব দেব রাজবংশ) এর রাজধানী ছিল বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুর । সেন, বর্মণ, চন্দ্র রাজাদের (খ্রিস্টীয় ১০০০- ১৩০০ প্রথম পর্যন্ত) এবং বারোভুঁইয়াদের অন্যতম কেদার রায় ও তার ভাই চাঁদ রায়ের রাজধানী ছিল তৎকালীন ঢাকার শ্রীপুর বা বিক্রমপুর । মুঘল বা মোগল আমলে বিক্রমপুর সোনার গাঁয়ের অন্তর্গত একটি পরগনা ছিল (ব্রিটিশ East India Company এর পঞ্চম রিপোর্টে বিক্রমপুর পরগনার বিষয় উল্লেখ আছে) । মুঘল সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট, ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক, জালালুদ্দিন মুহাম্মদ আকবর (মহামতি আকবর) এর সময়ে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বারো জন শাসনকারী জমিদার বা ভূস্বামী ও শাসক ছিলেন তাদেরকে 'বারো ভূঁইয়া' বলে (কিংবা অনুমিত হয় যে, অতি প্রাচীনকালে বাংলায় বারো জন শক্তিশালী সামন্তরাজা হয়তো ছিলেন যে কারণে ‘বারোভুঁইয়া’ শব্দটি জনশ্রুতিতে পরিণত হয়) । ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট আকবর বাংলা দখল করার পর এ সকল জমিদার ঐক্যবদ্ধ হয়ে মোগল সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন । এদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ভূঁইয়া কেদার রায় শক্তিশালী বীর ও চরিত্রবান । তিনি ছিলেন বিক্রমপুরের জমিদার । শাসন ও বীরত্বে তার খ্যাতি ছিল । কেদার রায় ও তার ভাই চাঁদ রায় এর রাজধানী ছিল তৎকালীন ঢাকার শ্রীপুর বা বিক্রমপুর । বর্তমানে দক্ষিণ বিক্রমপুর তথা শরীয়তপুর জেলা (যা ছিল কালীগঙ্গা নদীর তীরবর্তী অঞ্চল যেটি মুন্সিগঞ্জ টঙ্গিবাড়ী উপজেলার দীঘিরপাড় ইউনিয়নের দক্ষিণে নদীতে বিলীন) । পদ্মার দুইপারের বিস্তীর্ণ জনপদ এ ভ্রাতৃদ্বয় শাসন করতেন । বিক্রমপুর, ইদ্রাকপুর, ইদিলপুর, কেদারপুর, চাঁদপুরের বৃহৎ অংশ জুড়ে ছিল তাদের রাজত্ব । কালের পরিক্রমায় বিক্রমপুরের অনেক পরিবর্তন ঘটে । ঢাকায় মুঘল শাসন দৃঢ় হলে মুন্সীগঞ্জে ফৌজদারী আদালত সৃষ্টি হয় । মুঘলদের সময়ে এ স্থানে মুন্সী হায়াদার হোসেন নামে একজন ফৌজদার থাকতেন, তারই নামানুসারে মুন্সীগঞ্জ নামকরণ হয় । বৌদ্ধ, হিন্দু, পাঠান আর মুঘল শাসনামলের সমাপ্তি টেনে বিক্রমপুর অবশেষে ব্রিটিশ দুঃশাসনের কবলে চলে যায় । ১৮৪৫ খ্রিষ্টাব্দে বিক্রমপুর 'মুন্সীগঞ্জ মহকুমায়' স্থাপিত হয় । তখন জন ফ্রেঞ্চ (John French) নামের একজন ইংরেজ ব্যক্তি মহকুমার সর্বপ্রথম বিচারক নিযুক্ত হন । হিন্দু ও মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় দর্শন, সামাজিক আচার আচরণ, মূল্যবোধ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সভ্যতার মতাদর্শ ও ধ্যানধারণার ভিন্নতার কারণে ভারতীয় মুসলমান এবং হিন্দু দুটি স্বতন্ত্র জাতীয়তার উপর নির্ভর করে (দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে বা ধর্মীয় ভিত্তিতে) ভারতীয় উপমহাদেশ তথাপি ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্যকে দুটি স্বাধীন অধিরাজ্য ভারত ও পাকিস্তানে (ভারত বিভাজন বা দেশভাগ) বিভক্ত করা হয় ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে প্রায় দুইশত বছরের ইতি টেনে । এর ফলে ভারতে ব্রিটিশ রাজ বা Crown শাসনের অবসান ঘটে । দু'টি স্ব-শাসিত দেশ পাকিস্তান এবং ভারত আইনত ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই ও ১৫ই আগস্ট অস্তিত্ব লাভ করে । ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানাধীন 'মুন্সীগঞ্জ' মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত হয় এবং মুন্সীগঞ্জের প্রথম মহকুমা প্রশাসক ছিলেন গঙ্গাচরণ চট্টোপাধ্যায় । পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ২৪ বছরের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগণ বাংলা ভাষার অধিকার হরণ, আঞ্চলিক বৈষম্য ও শোষণের কারণে পূর্ব বাংলার জনগণ মহান স্বাধীনতার জন্যে বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র লড়াই করে দুই লক্ষ ষাট হাজার মা- বোনের সম্ভ্রমহানি আর ত্রিশ লক্ষ শহীদের মহা আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বর মহান বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সৃষ্টি করেন । বর্তমানে মুন্সীগঞ্জের ছয়টি উপজেলা । ঢাকা জেলার অধিকাংশ, ফরিদপুর জেলার কিছু অংশ বিক্রমপুরের অংশ ছিল । পূর্বে বিক্রমপুরের আয়তন ছিল প্রায় ৯০০ বর্গমাইল । ঐতিহাসিক বিক্রমপুরের পশ্চিমে পদ্মানদী, উত্তর ও পূর্বে ধলেশ্বরী নদী, দক্ষিণে আড়িয়াল খাঁ ও মেঘনা নদীর সংযোগস্থল এবং এর মধ্যখানে প্রবাহিত কালিগঙ্গা নদী বিক্রমপুরকে উত্তর- দক্ষিণে দু'ভাগ করেছে । মুন্সীগঞ্জ তথাপি বিক্রমপুর এক অতি প্রাচীনতম জনপদ । নবদ্বীপ, গৌড়, সোনার গাঁ, সপ্তগ্রাম, ঢাকা প্রভৃতি স্থানসমূহ পরিচিত ও খ্যাতি লাভ করার অনেক আগে থেকেই বিক্রমপুর শিক্ষা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, ধর্ম, শিল্প, বাণিজ্য, সংস্কৃতি, সভ্যতা, ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এক ঐতিহাসিক প্রত্নতত্ত্ব নগরী । এক সুদীর্ঘ ইতিহাসের কারণে এর রয়েছে ব্যাপক পরিচিতি ও সুনাম । মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান প্রভৃতি স্থানসমূহ বিক্রমপুরের অনেক পরে খ্যাতি অর্জন করে । প্রাচীনকাল থেকেই কালের পরিক্রমায় বিভিন্ন শাসকগণ শাসন করেছেন এ জনপদ বা অঞ্চলকে । যার পিছনে রয়েছে হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ আর হৃদয় বিদারক এক মর্মান্তিক রক্তপাতের ইতিহাস! নানা ধর্মের মানুষের বসতি এবং অনেক কীর্তিমান ও সু-মহান গুণীজনের নাড়ির শিকড় এ মুন্সীগঞ্জে । বৌদ্ধ বাঙালি পন্ডিত ও বৌদ্ধধর্মপ্রচারক মহাতান্ত্রিক জ্ঞানতাপস শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর, উদ্ভিদের প্রাণ আছে ও রেডিওর আবিষ্কারক জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, প্রগতিশীল লেখক ও শিল্পীদের সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী'র প্রতিষ্ঠাতা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি বিপ্লবী-সাহিত্যিক ও শ্রমিক সংগঠক সত্যেন সেন, বাঙালি আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিযুগের শহীদ বিপ্লবী সন্তোষচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়, প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি ঔপন্যাসিক সমরেশ বসু, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সক্রিয় যোদ্ধা-বিশিষ্ট বাগ্মী-Indo Anglian যশস্বী কবি-The Nightingale of India সরোজিনী নাইড়ু, ইংলিশ চ্যানেল সাঁতরিয়ে অতিক্রমের গৌরবের অধিকারী দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম সাঁতারু ব্রজেন দাস, ব্রিটিশ বিরোধী বাঙালি বিপ্লবী বিনয় কৃষ্ণ বসু, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধান্ত শংকর রায়, ভারতীয় বাঙালি ঔপন্যাসিক-ছোটোগল্পকার ও প্রাবন্ধিক প্রতিভা বসু, মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার গণকপাড়া গ্রামের শীলভদ্র সহ আরও অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব এ মাটিতে জন্ম নিয়েছেন । যারা শিক্ষা- জ্ঞান- গুণ- মেধা- শ্রমে সমস্ত পৃথিবীর মানুষের কল্যাণকর কাজের মধ্য দিয়ে মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়েছেন । মুন্সীগঞ্জের অনেক প্রাচীন অমূল্য সম্পদ ও অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহাসিক নিদর্শনসমূহ বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘর এবং বরেন্দ্র জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে । যা আমাদের জাতীয় সম্পদ, বাংলাদেশ তথাপি সারাবিশ্বের মানুষ এ নিয়ে গর্ব করতে পারে । এছাড়া, টঙ্গিবাড়ী উপজেলার চুরাইন থেকে প্রাপ্ত একটি রূপা'র বিষ্ণুমূর্তি বর্তমানে ভারতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে । প্রাচীন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ শাসকগণ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি শাসনকার্য, রাজ্যবিস্তার, শিল্প-সাহিত্য ও হিন্দু ধর্মসহ বিভিন্ন ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন । মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে তৎকালীন শাসকদের স্মৃতিচিহ্ন এবং অনেক ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থাপনা বা নিদর্শন আজও বহন করে চলছে সে মহাকালের ইতিহাসকে । যদিও ক্রমাগত নদী ভাঙ্গনের ফলে প্রাচীন বিক্রমপুর শহর এবং এর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ প্রায় পুরোটাই কালের আবর্তে বিলীন হয়ে গেছে! এ অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংস সাধন করার পাশাপাশি অমূল্য এবং মহৎ পুরাকীর্তিগুলিকে গ্রাস করে কীর্তিনাশা পদ্মা নদী । ঐতিহাসিক প্রাচীন নিদর্শনসমূহ, লোককাহিনী এবং প্রাচীন বিক্রমপুরের অতীতের গৌরবের কথা আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় । বর্তমান মুন্সীগঞ্জের সদর উপজেলাধীন রামপালের বল্লাল বাড়িতে তৎকালীন সেন রাজবংশের রাজপ্রাসাদ অনুসন্ধান করার জন্য বাংলাদেশ ও চীনের প্রত্নতাত্ত্বিকদের যৌথ উদ্যোগে গত সোমবার ২১/০১/২০১৯ খ্রিস্টাব্দে খনন কাজ শুরু হয় । তবে কালের বিবর্তনে এটি ইতিহাসে অংশ নিলেও রাজা বল্লাল সেনের প্রাসাদ বা দুর্গ হাড়িয়ে গিয়েছিল বহুকাল আগেই । এখন এ প্রত্ন খননে সেখান থেকে বেরিয়ে আসছে হাজার বছরের পুরনো ঐতিহাসিক রাজা বল্লাল সেনের দুর্গের প্রাচীর বা দেওয়ালসহ প্রাচীন ইট, ইটের টুকরো, মৃৎ পাথরের টুকরো ও কাঠকয়লা ইত্যাদি । ধারণা করা হচ্ছে, মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার রামপালের বল্লাল বাড়িখ্যাত এ এলাকাটিই ছিল সেন বংশের রাজা বল্লাল সেনের রাজপ্রাসাদ । রামপালের বল্লাল বাড়ি এলাকার স্থানীয় নুরুল ইসলাম শেখের কাঠবাগানে চলছে এ খনন কাজ । 
সত্যিই মহাবিস্ময়কর ঘটনা! এক নতুন দিগন্তের সূচনা হবে, অনেক অজানা রহস্য উন্মোচিত হবে । আরেক নতুন ইতিহাসের সম্মুখীন হবো আমরা । প্রাগৈতিহাসিক অনেক অজানা প্রশ্ন হাতছানি দিবে আমাদের । অনুপ্রাণিত হবে পরবর্তী প্রজন্ম । উল্লেখ্য, বাংলাদেশের ঐতিহ্য অন্বেষণের নির্বাহী পরিচালক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান ও চীনের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. চাই হুয়ান বো এর নেতৃত্বে এবং অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে পরীক্ষামূলকভাবে বড় একটি অনুসন্ধানী দল এ খনন কাজে অংশ নিয়েছেন । 
সত্যিই আমি আশ্চর্য, আনন্দিত এবং কালের প্রত্যক্ষ সাক্ষী পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নের একজন অধিবাসী হিসেবে । তবে উদ্বিগ্ন যে, এ অমূল্য সম্পদের পরিবেশগত দিক, তত্ত্বাবধান ও যথোপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারবে কি না? এ কর্মসূচীকে সফল করতে সরকারের পাশাপাশি সকলের সর্বাত্মক সাহায্য- সহযোগীতা একান্ত প্রয়োজন । এর যাবতীয় তথ্য, উৎস, উপাত্ত, নথিপত্র এবং পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস বিজ্ঞানসম্মত সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যাতে বিলুপ্ত বা ধ্বংসপ্রাপ্ত না হয় । আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য এগুলি অবশ্যই রক্ষা করতে হবে । এর গবেষণা, জরিপ, অনুসন্ধান, পরিবেশগত তথ্যের মনোস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, প্রত্নস্থান চিহ্নিতকরণ, উৎখনন, সংগ্রহ, নথিভুক্তকরণ, বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যালোচনা করে তা জনসাধারণ্যে উপস্থাপন ও বিকাশ করতে হবে । আমি এ কর্মসূচীর সাফল্য কামনা করছি ।

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...