বিজ্ঞান বিষয়ক মার্কিন সাময়িকী Science News এ সারাবিশ্বের বর্তমান সময়ের সেরা ১০ জন তরুণ বিজ্ঞানীদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি তরুণী তনিমা তাসনিম অনন্যা তালিকার শীর্ষস্থানে রয়েছেন । চোখ কপালে উঠার মতোই বিষয় । কৃষ্ণগহ্বর বা কৃষ্ণ বিবর {Black hole (Cygnus X-1)} নিয়ে গবেষণার জন্য তিনি এ স্বীকৃতি পেয়েছেন । কৃষ্ণগহ্বরের যে ছবি প্রশংসা কুড়িয়েছে বৈজ্ঞানিক সমাজে তথাপি বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষের কাছে । তনিমা তাসনিম তার ইচ্ছাশক্তি এবং মেধাকে কাজে লাগিয়ে জটিল এ গবেষণাকে বলিষ্ঠভাবে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যা সত্যিই প্রশংসনীয় এবং গর্বের বিষয় । তার এ সাফল্য বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে । Science News এর ওয়েবসাইটে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দে 'এ বছরের SN ১০ বিজ্ঞানীর বিজ্ঞানের কয়েকটি বৃহত্তম চ্যালেঞ্জ সমাধানের লক্ষ্য' সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে । তনিমা তাসনিম সবচেয়ে ভারী বা অতি বৃহদায়তন কৃষ্ণগহ্বরের নিখুঁত ছবি তৈরি করার ফলে Science News একে ‘অসাধারণ গবেষণা’ বলে অভিহিত করেছে । ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত Science News সাময়িকী বা সংবাদ মাধ্যম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি স্বতন্ত্র ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিজ্ঞান, চিকিৎসা এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বা এ সংক্রান্ত উদ্ভাবনী চিন্তাসহ নানা বিষয়াদি নিয়ে হালনাগাদ তথ্য সরবরাহ করার পাশাপাশি তরুণ বিজ্ঞানীদের একটি শীর্ষ তালিকা তৈরি করে থাকে । যত দূর জানা যায়- Science News এর বিজয়ী বিজ্ঞানী ও The American Astrophysical Society এর সদস্য বা এর আগে যারা এ তালিকায় ছিলেন সাধারনত তারাই (বিজ্ঞানীদের) নাম মনোনয়ন দিয়ে থাকেন । ৪০ বৎসর বা তারও কম বয়সী বিজ্ঞানীরা তাদের মেধা, কর্ম ও যোগ্যতার মধ্য দিয়ে এ তালিকায় নিজেকে স্থান করে নেন ।
তনিমা তাসনিম অনন্যা একজন বাংলাদেশি তরুণী, তার শৈশব কেটেছে রাজধানী ঢাকায় । Manarat Dhaka International School & College থেকে ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ফল পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে ‘O’ এবং পরবর্তীতে ‘A’ স্তরে উত্তীর্ণ হন । ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন করে বিদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য International General Certificate of Secondary Education Course সম্পন্ন করেন । বাংলাদেশের নরসিংদী জেলার বেলাবো উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের হোসেন নগর গ্রামে তার জন্ম । বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক কমিশনার ও ভারপ্রাপ্ত মেয়র এম এ কাইয়ুম হোসেনের প্রথম সন্তান তনিমা তাসনিমকে ছোটবেলায় তার গৃহিণী মা খবরের কাগজ পড়ে জানাতেন যে, পাথফাইন্ডার (Pathfinder spacecraft) নামের এক রোবটিক মহাকাশযান পৃথিবী থেকে যাত্রা শুরু করে মঙ্গল গ্রহে অবতরণ করেছে এবং মঙ্গলের মাটি নিয়ে গবেষণা করছে । তনিমা তাসনিম তখন মাকে জিজ্ঞেস করে গ্রহ কী? তার মা তাকে বিস্তারিত বুঝিয়ে বলেন যে, পৃথিবীর বাইরে আরো একটি বিশাল মহাজগৎ রয়েছে এবং সেখানে আছে পৃথিবীর মতোই আরও অনেক গ্রহ । তেমনি মঙ্গল হচ্ছে পৃথিবীর মতোই একটি গ্রহ, যেখানে সবকিছু লাল… আস্তে আস্তে মায়ের কাছ থেকে বিস্ময়ভরে বুঝে নেয় অজানা রহস্যেঘেরা তার মন । তনিমা তাসনিমের মা শামিম আরা বেগম তেমন শিক্ষিত না হলেও কিছুটা ছিলেন বিজ্ঞানমনষ্ক এবং এ বিষয়ে কৌতূহলী ৷ মেয়েকে অনুপ্রেরণা, মেয়ের সৃজনশীল প্রতিভা ও কৌতূহলকে উৎসাহিত করেছিলেন । তখন থেকেই তনিমা তাসনিমের মনের মধ্যে অপার মহাকাশ জগতের এক স্বপ্ন বুনে দেন তার মা । ফলে মহাকাশ বিজ্ঞানের প্রতি ক্রমেই তার আগ্রহ বাড়তে থাকে এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার স্বপ্ন দেখেন । পদার্থবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, কম্পিউটার কোডিং (প্রোগ্রামিং সংকেত লেখা) ইত্যাদি বিষয় ভালো লাগা এবং জটিল নানা সমস্যা সমাধানের প্রতি ছিল তার প্রবল ইচ্ছা । ৩১ বৎসর বয়সী তনিমা তাসনিম অনন্যা একজন জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী (Astrophysicist) । ‘A’ স্তর শেষ করে ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে Physics and Astronomyতে উচ্চতর পড়াশোনার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের Pennsylvania প্রদেশের Bryn Mawr College এ ভর্তি হন । তিনি লক্ষ্য করেন যে- সেখানকার মহিলারা তীব্রভাবে নারীবাদী, বক্তব্যপ্রবণ, মতামতী, স্বতন্ত্র এবং ব্যক্তিত্বপূর্ণ ছিলেন যা তাকে অনুপ্রাণিত করে জ্ঞানের প্রসার বা মানসিক বৃদ্ধি ঘটিয়ে নিজেকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সাহায্য করে । এ বিদ্যাপীঠে দুই বছর পড়ালেখার পর NASA (The National Aeronautics and Space Administration) এর Space Telescope Science Institute এ অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক Internship এর জন্য নির্বাচিত হন । NASA তে কাজ করার সময় তিনি প্রথম বাংলাদেশি তরুণী হিসেবে ২০১১ খ্রিস্টাব্দে Hubble Telescope এর সাহায্যে ‘Orion Nebula’ নামে একটি তারকা গুচ্ছের মানচিত্রাবলী তৈরি করেন । জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা, গবেষণা এবং নানাবিদ কাজ করতে গিয়ে তাকে নতুন নতুন বিভিন্ন বিষয় শিখতে হয়েছে । এমনকি Computer coding সম্পর্কে । এ সময় তিনি Python programming language এর মাধ্যমে দূরবীক্ষণ (Telescope) যন্ত্র থেকে প্রাপ্ত সংকেতগুলোকে নিজে শিখে নিয়ে জ্ঞানের পরিধিকে সমৃদ্ধ করেন ৷ NASA তে Internship শেষ করে University of Cambridgeএ এক বছরের Bachelor ডিগ্রির শেষ বর্ষের পাঠ্যগুলো সম্পন্ন করার পর থেকেই তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় । Cambridge শেষ করে তিনি প্রথম বাঙালি হিসেবে ইউরোপের পারমাণবিক গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু CERN (The European Organization for Nuclear Research) এ একজন গ্রীষ্মকালীন ছাত্র হিসেবে পাঠ গ্রহণ করেন । এছাড়া সুইজারল্যান্ডের জেনেভার কাছে ইউরোপীয় কণা পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষাগারে (European particle physics laboratory) তিনি কাজ করার সুযোগ পান । ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Bryn Mawr College থেকে বৃত্তিসহ পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক শেষ করেন । D. Alan Brumley Graduate Fellowship নিয়ে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের Yale University তে ভর্তি হন ।
মহাকাশ নিয়ে গবেষণা এবং কৃষ্ণগহ্বর অন্যতম আগ্রহের বিষয় হওয়ার কারণে তনিমা তাসনিম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিকে (Artificial intelligence technology) ব্যবহার করে কৃষ্ণগহ্বরের সম্পূর্ণ চিত্র এঁকে দেখিয়েছেন- মহাবিশ্ব জুড়ে তারা কোথায়, সময়ের সাথে কিভাবে বেড়ে উঠে, কিভাবে শক্তি সঞ্চয় করে, কিভাবে বেঁচে থাকে, কিভাবেই তারা মহাকাশের পরিবেশকে প্রভাবিত করে । তার এ সৃষ্টিশীল কাজটি The Astrophysical Journal এ প্রকাশিত হয়েছে । কৃষ্ণগহ্বরের মতো জটিল বিষয়টি Dartmouth College এ গবেষণা করেন এবং তার উদ্ভাবিত এ নকশা (Model) দ্বারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আদিকাল থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত সমস্ত কৃষ্ণগহ্বরের তথ্য পাওয়া যাবে । কঠোর পরিশ্রমী তনিমা তাসনিম ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে Yale University থেকে মাস্টার্স এবং পরবর্তীতে অধ্যাপক Meg Urry এর তত্ত্বাবধানে কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে গবেষণা করে পদার্থবিজ্ঞানে Ph.D সম্পন্ন করেন । তার গবেষণার মূল বিষয় ছিল X-rays দ্বারা বিগত সাড়ে ১২ বিলিয়ন বছরে এ ধরনের অতি ভারী কৃষ্ণগহ্বরের একটি গণনা (Census) তৈরি করা । এ গণনা তৈরি করতে তিনি একটি স্নায়বিক নেটওয়ার্ক সংকেতপদ্ধতি (Code) গঠন করেন । তিনি চারটি X-ray telescope থেকে সমীক্ষা সংগ্রহ করেছিলেন, যা পূর্ববর্তী যে কোনও গবেষণার চেয়ে বেশি Dataset ছিল । তার লক্ষ্য ছিল যে, কিভাবে কৃষ্ণগহ্বরগুলো বৃদ্ধি পায় এবং মহাজাগতিক ইতিহাস জুড়ে পরিবর্তন ঘটে- তার একটি পূর্ণাঙ্গ নকশা তৈরি করা । তনিমা তাসনিম অনন্যা বলেন, “এটি একটি সংক্ষিপ্ত কাগজ হওয়ার কথা ছিল । তবে এমন নকশা যা এক বা কয়েকটি Dataset ব্যাখ্যা করেছিল, পুরো নমুনার জন্য কাজ করে না । গবেষণার সময় এটি আমাদের কিছু সময়ের জন্য থামিয়ে দিয়েছিল । কেননা মাঝে মধ্যেই দূরবীক্ষণ থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলোর মাঝে মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না । যদিও এটি কৃষ্ণগহ্বরের প্রকৃত চিত্র নয় । কিন্তু অনেকগুলো কৃষ্ণগহ্বরের উপাত্ত থেকে পাওয়া একটি পরিসংখ্যানগত চিত্র ।”
তনিমা তাসনিমের Yale University এর Ph.D উপদেষ্টা ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী Meg Urry বলেছেন- “তিনি সবেমাত্র চলে গিয়েছিলেন এবং নিজেকে Machine learning শিখিয়েছিলেন, ‘সে বলে না, ওহ! আমি এটি করতে পারি না’। সে যতো সমস্যায় পড়ুক না কেন কখনোই তাকে হতাশ হতে দেখিনি । সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে বের করে এবং কাজ করে যায় ।”
তিনি এটি শিখতে এবং এটি করার একটি উপায় খুঁজে বের করেছেন । গরাদ বা লোহার ঝাঁঝরি (Gridlock) ভাঙতে তিনি একটি স্নায়বিক নেটওয়ার্ক বিকাশ করেছেন, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা সন্ধান করে কৃষ্ণগহ্বরের জনসংখ্যার একটি বিবরণ তৈরি করা যায় । Model এর প্রথম দিকের ফলাফল থেকে বোঝা গেছে যে, পূর্বের উপলব্ধির চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় কৃষ্ণগহ্বর রয়েছে । ছায়াপথগুলো তাদের কৃষ্ণগহ্বর দ্বারা বেঁচে থাকে এবং মরে যায় । যখন কোনো কৃষ্ণগহ্বর ছায়াপথে শক্তি জোগায় তখন এটি নক্ষত্র গঠনের কারণ হতে পারে । কিংবা এটি গ্যাসকে (Gas) দূরে সরিয়ে দিয়ে নক্ষত্রের গঠন বন্ধ করে দেয় এবং ছায়াপথের বৃদ্ধিও বন্ধ করে দিতে পারে । সুতরাং বোঝা যায় কৃষ্ণগহ্বরগুলো কিভাবে মহাজাগতিক কাঠামো, ছায়াপথ গুচ্ছ (Galaxy cluster) থেকে শুরু করে গ্রহ পর্যন্ত সমস্ত কিছুই এবং সম্ভবত এমনকি জীবন এখান থেকে এসেছিল- তা বোঝার মূল চাবিকাঠি । তনিমা তাসনিমের অসাধারণ কিছু চিত্র তৈরি করা Modelটি বিভিন্ন মহাজাগতিক দূরত্বের কৃষ্ণগহ্বরগুলোকে বর্ণনা করে এমন Data তৈরি হয়েছে, যা মহাকাশ বিজ্ঞানের জগতে একেবারে নতুন এক ধারণার সংযোজন করেছে । নকশাটি (Model) দেখায় যে, কিভাবে কৃষ্ণগহ্বরগুলো বৃদ্ধি পায় এবং সময়ের সাথে সাথে বিস্ময়করভাবে পরিবর্তিত হয় । কৃষ্ণগহ্বরগুলো কিভাবে দক্ষতার সাথে খায় বা গিলে ফেলে বা গ্রাস করে- তা নির্ধারণ করতেও এটি সহায়তা করতে পারে । প্রাথমিক ইঙ্গিতগুলো পরামর্শ দেয় যে- কৃষ্ণগহ্বরগুলো তাত্ত্বিকভাবে যত দ্রুত সম্ভব গ্যাসকে (Gas) গোগ্রাসে গিলে ফেলতে পারে, তাই যা কিছু এত দ্রুত এত বড় হয়ে ঘটেছে তা ব্যাখ্যা করতেও সহায়তা করতে পারে ।
যতদূর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলতে পারেন- নক্ষত্রের জীবনচক্রের একটি ধাপ হচ্ছে কৃষ্ণগহ্বর, যা বিজ্ঞানের জগতে এক অনন্য রহস্য । মহাবিশ্বের অনেক রহস্যময় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার প্রভাবক হিসেবে কাজ করে কৃষ্ণগহ্বর । সীমাহীন এ মহাকাশে আমাদের ছায়াপথ কিংবা দূরবর্তী কোনো ছায়াপথ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে প্রয়োজন কৃষ্ণগহ্বর সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা থাকা ৷ কৃষ্ণগহ্বর মহাবিশ্বের এমন একটি বস্তু যা এত ঘন সন্নিবিষ্ট বা অতি ক্ষুদ্র আয়তনে এর ভর এত বেশি যে কৃষ্ণগহ্বরের মহাকর্ষীয় শক্তি কোন কিছুকেই তার ভিতর থেকে বের হতে দেয় না, এমনকি তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণকেও- যেমন আলোক বিন্দু বা আলোক তরঙ্গ পর্যন্ত বের হয়ে আসতে পারে না । প্রকৃতপক্ষে এ স্থানে সাধারণ মহাকর্ষীয় বলের মান এত বেশি হয়ে যায় যে এটি মহাবিশ্বের অন্য সকল বলকে অতিক্রম করে । কৃষ্ণগহ্বর তার নিজের দিকে আসা সকল আলোক রশ্মিকে শুষে নেয় বলে একে কৃষ্ণগহ্বর বা কালো গর্ত (Black hole) বলে । কৃষ্ণগহ্বরের আশেপাশে বিশিষ্ট ধরণের কয়েক প্রকার দিগন্ত যেমন: ঘটনা দিগন্ত (Event horizon), পরম দিগন্ত (Absolute horizon), আপাত দিগন্ত (Apparent horizon), কোশি দিগন্ত (Cauchy horizon), খুনে দিগন্ত (Murderous horizon), বিচ্ছিন্ন দিগন্ত (Isolated horizon), গতিশীল দিগন্ত (Dynamic horizon), কণা দিগন্ত (Particle horizon), মহাজাগতিক দিগন্ত (Cosmic horizon), ফোটন পরিমন্ডল (Photon atmosphere) এবং আর্গন বায়ুমণ্ডল (Argon atmosphere) ইত্যাদি দেখা যায় । ঘটনা দিগন্ত (প্রত্যাবর্তনের শেষ বিন্দু) বিষয়টি মূলত কৃষ্ণগহ্বর এর সাথে সংযুক্ত । প্রায় প্রতিটি ছায়াপথ তার কেন্দ্রে একটি বৃহৎ কৃষ্ণগহ্বর জমা করে বা রেখে দেয় । এ কৃষ্ণগহ্বরের ভর সূর্যের ভর থেকে কয়েক মিলিয়ন বা বিলিয়ন গুণ বেশি । ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে, অতিমাত্রার ভর বিশিষ্ট একটি কৃষ্ণগহ্বর যার ভর সূর্য থেকে ৪ মিলিয়ন গুণ বেশি এবং আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে আমরা যে ছায়াপথে থাকি সে আকাশগঙ্গার (Milky Way) মাঝখানেই এ কৃষ্ণগহ্বর অবস্থিত । যদিও এ বিশালাকার কৃষ্ণগহ্বরগুলো আশেপাশের উপাদানগুলোকে উত্তপ্ত করতে পারে যতক্ষণ না এটি ছায়াপথের সমস্ত নক্ষত্রের চেয়ে একত্রে উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত করে । তবে কৃষ্ণগহ্বরের টানে গ্যাস এবং ধূলিকণা দ্বারা আলো লুকিয়ে রাখে । উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রঞ্জনরশ্মির (High-energy X-rays) মাধ্যমে সে ধূলিকণার আবরণ কাটে । যখন এ কৃষ্ণগহ্বর সক্রিয় থাকে তখন এটি থেকে প্রচুর পরিমাণে রশ্মিবিচছুরণ বা বিকিরণ (Radiation) হয় । সূর্য একটি নক্ষত্র ৷ এখানে অপরিমেয় হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাস রয়েছে ৷ এ গ্যাসের সংঘর্ষ বা ক্রিয়া-বিক্রিয়ায় তাপ ও আলো উৎপন্ন হয় এবং পৃথিবীকে এ তাপ-আলো দিয়ে সমস্ত প্রাণী জগৎ টিকিয়ে রেখেছে ৷ পৃখিবী থেকে সূর্য প্রায় ১৫ কোটি ১৪ লক্ষ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ৷ সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে প্রায় ৮.৩২ মিনিট সময় লাগে । অর্থাৎ সূর্যে যদি কিছু একটি ঘটে, সেটি আমরা প্রায় ৮.৩২ মিনিট পর জানতে পারব । সূর্য থেকে আরও দূরে বহুদূরে থাকা এমন অনেক অজানা বস্তু রয়েছে, যেখান থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে আরও বেশি সময়ের প্রয়োজন হয় । দূরবীক্ষণ (Telescope) যন্ত্র দিয়ে অসীম মহাকাশে তাকালে শুধু অনেক দূরের বস্তু বা বিষয়ই নয়, অনেক অতীতের বিষয়ও জানা যায় । অত্যাধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির কল্যাণে বারো শত কোটি বছর পূর্বের কিছু সক্রিয় কৃষ্ণগহ্বরও দেখা মিলে । কৃষ্ণগহ্বরের তিনটি মৌলিক উপাদান হচ্ছে; চার্জ, ভর এবং ঘূর্ণন । সাধারণত বেশীরভাগ ছায়াপথেই তার মধ্যস্থ কৃষ্ণগহ্বরকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান । অতএব, এটি দ্রুত ঘুরছে । স্বাভাবিকভাবে কোনো একটি নক্ষত্র চুপসে গেলে কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয় । তবে নক্ষত্রগুলোর ভর হয় অনেক । আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র সূর্য এর বিস্তৃতি প্রায় 1.3×10^9 km এবং সূর্যের ভর প্রায় 2×10^30 kg এর কাছাকাছি । নক্ষত্রগুলোর অস্বাভাবিক ভরের কারণে এদের মধ্যাকর্ষণ শক্তিও অনেক বেশি ।
প্রতিভাধর এ বিজ্ঞানী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের Dartmouth College এর সঙ্গে যুক্ত আছেন এবং অধ্যাপক Ryan Hickox এর গ্রুপে তিনি একজন পোস্টডক্টোরাল গবেষণা সহযোগী (Postdoctoral Research Associate) । তিনি একটি কৃষ্ণগহ্বরের ভর সংক্রান্ত নির্দিষ্ট কর্ম (Mass function) এবং বৃহদাকার কৃষ্ণগহ্বরের রশ্মিবিকিরণকর দক্ষতা বাধায় কাজ করে যাচ্ছেন (Active Galactic Nuclei (AGN) X-ray parameters) । ইতিপূর্বে NASA এবং CERN এর বেশ কিছু প্রকল্পের সাথে তিনি সংযুক্ত ছিলেন । বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী মেয়ে এবং যুব মহিলাদের জন্য একটি পরামর্শদাতা নেটওয়ার্ক Wi-STEM (সুস্পষ্ট ‘জ্ঞান’) এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন তনিমা তাসনিম । গবেষণার পাশাপাশি তিনি এবং অন্য চারজন বাংলাদেশী বিজ্ঞানী যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেছেন এমন একদল পরামর্শক যারা বাংলাদেশের উচ্চ বিদ্যালয় এবং কলেজ পড়ুয়া ২০ জন ছাত্রীকে তাদের বিজ্ঞানশিক্ষা অন্বেষণ বা অনুসরণের পথ খুঁজে পেতে সহায়তা ও পথপ্রদর্শন করছেন । শিক্ষার্থীদের স্বপ্নগুলোর দিকে একটু যত্ন, বিজ্ঞানচর্চায় আগ্রহ এবং বিজ্ঞান বিষয়ে পৃষ্ঠপোষকতা সৃষ্টি করার জন্য তাদের এ মহৎ উদ্যোগ যথার্থ তাৎপর্যপূর্ণ, যা প্রশংসার দাবী রাখে ৷ তিনি সম্মানজনক Lee Page Award এবং The Alan J. Bramley Fellowship Award লাভ করেন । তনিমা তাসনিম অনন্যার এ সৃষ্টিশীল কর্মকান্ড মানবজাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে এবং এ গ্রহের মানুষকে অনুপ্রেরণা যোগাবে ।
ছবি: https://www.prothomalo.com/
