Thursday, 28 May 2026

মঙ্গলে হিমায়িত বরফের ঘূর্ণি


🔴❄️ মঙ্গল হচ্ছে মরুভূমির মত একটি পাথুরে গ্রহ । সূর্য থেকে এই চতুর্থ গ্রহটি কমলা-লাল রঙের জন্য "লাল গ্রহ" নামেও পরিচিত । মঙ্গলের ঘূর্ণন অক্ষ (Axial tilt, মঙ্গলের জন্য ২৫.১৯°, পৃথিবীর জন্য ২৩.৪৫°) আমাদের পৃথিবীর কাছাকাছি কোণে হেলে থাকার কারণে এখানে পৃথিবীর মতই চমৎকার ঋতু পরিবর্তন হয় । এই লাল গ্রহের মাটি ও বায়ুমণ্ডলের পাতলা স্তরে কিছু জলীয় বাষ্প রয়েছে যা কুয়াশা, সিরাস মেঘ, তুষার, পারমাফ্রস্ট এবং বরফ টুপিসহ বৃহত্তর মেরু অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে । কিন্তু গ্রহপৃষ্ঠে কোনো তরল জলের আধার নেই । মঙ্গল গ্রহের একটি পাতলা বায়ুমণ্ডল রয়েছে, যেটি প্রধানত কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস (CO₂) দ্বারা গঠিত । প্রতি বছর শীতকালে উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে এই কার্বন ডাই অক্সাইড বরফ হয়ে জমে থাকার কারণে গ্রহটির মহাকর্ষ পরিবর্তিত হয় । এক গবেষণায় দেখা যায়, দক্ষিণ মেরুর কাছে হিমায়িত কার্বন ডাই অক্সাইডের একটি বিশাল ভান্ডার রয়েছে । গ্রহটির হেলে থাকার কোণ বেড়ে যাওয়ায় এই ভান্ডারের বেশিরভাগই সম্ভবত মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেছিল । আর যখন এমনটা ঘটে, তখন বায়ুমণ্ডল ঘন হয়ে ওঠে, বায়ুপ্রবাহ আরো শক্তিশালী হয় এবং ভূপৃষ্ঠের আরো বৃহত্তর এলাকা জুড়ে তরল জল ধরে রাখা সম্ভব হয় । প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, যদি এই ভান্ডার সম্পূর্ণরূপে গ্যাসে রূপান্তরিত হয় তাহলে মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডলীয় চাপ দ্বিগুণ হয়ে যাবে । প্রতিবছর শীতকালে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন থেকে ৪ ট্রিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল থেকে মেরু বরফ টুপিতে জমে যায় । এটি সমগ্র মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডলের ভরের ১২ থেকে ১৬ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে । একটি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডলে জলের বিভিন্ন আইসোটোপিক রূপের মানচিত্র তৈরি করার পর, উত্তর মেরু অঞ্চলের বরফে HDO (Semi-heavy water) এবং পানির অনুপাত পরিমাপ করে প্রমাণ পেয়েছে যে, মঙ্গল গ্রহে একসময় অন্তত ১৩৭ মিটার গভীর একটি মহাসাগর তৈরি করার মত যথেষ্ট জল ছিল । মেরু অঞ্চলের বরফ পৃথিবীর মহাসাগরের জলের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি ডিউটেরিয়াম সমৃদ্ধ । এর অর্থ হচ্ছে, মঙ্গল গ্রহ আজকের মেরু অঞ্চলে সঞ্চিত জলের চেয়ে ৬.৫ গুণ বেশি পরিমাণ জল হারিয়েছে । এই জল কিছু সময়ের জন্য নিম্নভূমি Vastitas Borealis এবং সংলগ্ন নিম্নভূমিতে (Acidalia, Arcadia এবং Utopia planitiae) মহাসাগর তৈরি করে থাকতে পারে । আর যদি সেই সমস্ত জল কখনো তরল আকারে ভূপৃষ্ঠে উঠে আসে, তবে তা পৃথিবী পৃষ্ঠের ২০ শতাংশ ঢেকে ফেলবে এবং কিছু কিছু জায়গায় এর গভীরতা প্রায় এক মাইল হবে । উল্লেখ্য যে, প্রোটিয়ামের তুলনায় ভারী পরমাণু ডিউটেরিয়াম হচ্ছে হাইড্রোজেনের একটি স্থিতিশীল আইসোটোপ ।
মঙ্গল গ্রহের দুই মেরু অঞ্চলে স্থায়ী বরফ টুপি রয়েছে, যা মূলত জমাট বাঁধা জলীয় বরফ এবং হিমায়িত কার্বন ডাই অক্সাইডের (শুষ্ক বরফ) আস্তরণ দ্বারা গঠিত । এটি একটি স্থায়ী বরফের চাদর । উভয় মেরু টুপিতেই স্তরযুক্ত বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, যাকে মেরু-স্তরযুক্ত সঞ্চয় (Polar Layer Deposit) বলে, যেটি মঙ্গল গ্রহের ধূলিঝড় থেকে আসা ধূলিকণার সাথে বরফের ঋতুভিত্তিক ক্ষয় এবং সঞ্চয়ের ফলে তৈরি হয়েছে । উভয় মেরু টুপিতেই খাঁজকাটা বৈশিষ্ট্যও দেখা যায়, যা সম্ভবত বায়ুপ্রবাহের ধরণ দ্বারা সৃষ্ট । এই খাঁজগুলো ধূলিকণার পরিমাণ দ্বারাও প্রভাবিত হয় । ধূলিকণা যত বেশি, পৃষ্ঠতল তত গাঢ় হয় । পৃষ্ঠতল যত গাঢ় হয়, গলনও তত বেশি হয় । গাঢ় পৃষ্ঠতল বেশি আলোক শক্তি শোষণ করে । মঙ্গল গ্রহের দক্ষিণ মেরুর বরফের স্তর বা টুপিটি (South Polar Cap) উত্তর মেরুর বরফের স্তর বা টুপির (North Polar Cap) তুলনায় অনেক ছোট । দক্ষিণ মেরু অঞ্চলটি উত্তর মেরুর চেয়ে অধিক উচ্চতায় অবস্থিত এবং চরম শীতল, গভীর ও দুর্গম অঞ্চল- যেটি মঙ্গল গ্রহের দক্ষিণ গোলার্ধের Planum Australe নামক এক বিশাল মেরু মালভূমিতে অবস্থিত । দক্ষিণ মেরুর বরফের চাদর বা আচ্ছাদনের ব্যাস প্রায় ৪০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার এবং এর পুরুত্ব প্রায় ৩ কিলোমিটার (৩০০০ মিটার বা ২ মাইল) পর্যন্ত হতে পারে । এই বরফের চাদরে ধূলিকণা এবং বরফের পর্যায়ক্রমিক স্তর রয়েছে, যা গ্রহটির প্রাচীন জলবায়ু ও ঋতু পরিবর্তনের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে । ধারণা করা হয়, দক্ষিণ মেরুর বরফস্তর এবং সংলগ্ন স্তরযুক্ত জমাট বরফের মোট আয়তন প্রায় ১.৬ মিলিয়ন ঘন কিলোমিটার । মঙ্গলীয় শীতকালে দক্ষিণ মেরুতে তাপমাত্রা নাটকীয়ভাবে -১৩০° (ডিগ্রি) সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায় । ফলে, প্রচণ্ড ঠান্ডায় বায়ুমণ্ডলীয় কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস জমে বরফে পরিণত হয় এবং মূল বরফ টুপির উপরে তুষারের মত ঝরে পড়ে আরো একটি শুষ্ক বরফের পাতলা স্তর তৈরি করে, যা আকারে বৃদ্ধি পায় । বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে এই বরফ গলে বায়ুমণ্ডলে বাষ্পীভূত হয়ে যায় এবং এর আয়তন সংকুচিত করে । বরফ টুপির উপরিভাগে শক্তিশালী বাতাসের কারণে এর পৃষ্ঠে গভীর খাদ এবং সর্পিল নকশা সৃষ্টি করে । দক্ষিণের বরফ টুপির নিকটবর্তী কিছু এলাকায় ঋতুগতভাবে বরফ জমার ফলে ভূপৃষ্ঠের উপরে ১ মিটার পুরু স্বচ্ছ ও শুষ্ক বরফের চাঁই তৈরি হয় । বসন্তের আগমনে সূর্যের আলো ভূগর্ভস্থ স্তরকে উষ্ণ করে এবং ঊর্ধ্বপাতিত কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে সৃষ্ট চাপ বরফের চাঁইয়ের নিচে তৈরি হয়, যা এটিকে উপরে তুলে আনে এবং অবশেষে ফাটিয়ে দেয় । যার ফলে, কালো ব্যাসল্টিক বালি (Basaltic sand) বা ধূলিকণার সাথে মিশ্রিত কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসের উষ্ণপ্রস্রবণের মত অগ্ন্যুৎপাত ঘটে । এই প্রক্রিয়াটি দ্রুত- যা কয়েক দিন, সপ্তাহ ও মাসের মধ্যে ঘটতে দেখা যায় । ভূতত্ত্বে, বিশেষ করে মঙ্গল গ্রহের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের হার বেশ অস্বাভাবিক । বরফের চাঁইয়ের নিচে উষ্ণপ্রস্রবণের স্থানে ছুটে আসা গ্যাস মাকড়সার জালের মত বৃত্তাকার প্রণালী তৈরি করে । ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে European Space Agency (ESA) এর Mars Express Orbiter থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ইতালীয় বিজ্ঞানীরা জানান যে, এই মেরু অঞ্চলের বরফের স্তরীভূত সঞ্চয়ের পৃষ্ঠ থেকে ১.৫ কিঃমিঃ বা ০.৯৩ মাইল গভীরে (দৃশ্যমান স্থায়ী বরফের টুপির নিচে নয়) অবস্থিত বরফ ও ধূলিকণার স্তরের নিচে চাপা পড়া তরল লবণাক্ত পানির হ্রদ বা জলাধার বা জটিল জলজ ব্যবস্থার অস্তিত্ব থাকতে পারে । হ্রদটি প্রায় ২০ কিলোমিটার বা ১২ মাইল প্রশস্ত । যদি এটি নিশ্চিত হয়, তাহলে এটি হবে গ্রহটিতে প্রথম পরিচিত স্থিতিশীল জলাশয় । তবে, তরল জলের পরিবর্তে কঠিন খনিজ বা লবণাক্ত বরফও থাকতে পারে । Chasms Australe হচ্ছে একটি প্রধান উপত্যকা, যা দক্ষিণ মেরু টুপির স্তরীভূত সঞ্চয়ের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত । এটি প্রায় ১০০ কিলোমিটার চওড়া এবং ২ কিলোমিটার পর্যন্ত গভীর, যা পৃথিবীর গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের চেয়েও গভীর । ৯° পূর্ব দিকে এই সঞ্চয়গুলো Prometheus নামক একটি প্রধান অববাহিকার উপর অবস্থিত । দক্ষিণ মেরুর কিছু স্তরে আয়তক্ষেত্রের আকৃতির বহুভুজীয় ফাটলও দেখা যায় । মনে করা হয় যে, ভূপৃষ্ঠের নিচে জলীয় বরফের প্রসারণ এবং সংকোচনের কারণে এই ফাটলগুলো তৈরি হয়েছে । দক্ষিণ মেরুর চারপাশে হিমবাহের বরফ গলে গিয়ে তৈরি হওয়া Dorsa Argentea Formation নামে এক বিশাল দীর্ঘ ও আঁকাবাঁকা শৈলশিরা (Esker) বিদ্যমান । এটি একটি দানব মেরু বরফ চাদরের অবশেষ বলে ধারণা করা হয়, যেটি প্রায় ১.৫ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল । এই এলাকাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস রাজ্যের আয়তনের দ্বিগুণ ।
দক্ষিণের বরফ টুপি স্থানচ্যুত । অর্থাৎ, এটি দক্ষিণ মেরুতে কেন্দ্র করে নেই । দক্ষিণের ঋতুগত টুপি ভৌগোলিক মেরুর কাছাকাছি কেন্দ্র করে থাকে । গবেষণায় দেখা গেছে যে, একপাশের তুলনায় অন্যপাশে বেশি তুষারপাত হওয়ার কারণে কেন্দ্রচ্যুত টুপিটি গঠিত হয় । দক্ষিণ মেরুর প্রভাবশালী হেলাস বেসিন অববাহিকার (Hellas Basin বা Hellas Planitia) কারণে বায়ুপ্রবাহ পরিবর্তিত হওয়ায় একটি নিম্নচাপ ব্যবস্থা তৈরি হয় । বিস্ময়কর এই ব্যবস্থা অনেক বেশি তুষারপাত ঘটায় । অন্যদিকে, কম তুষারপাত এবং বেশি হিম থাকে । গ্রীষ্মকালে তুষার বেশি সূর্যালোক প্রতিফলিত করে, তাই খুব বেশি গলে না বা ঊর্ধ্বপাতিত হয় না (মঙ্গল গ্রহের জলবায়ু তুষারকে সরাসরি কঠিন থেকে গ্যাসে পরিণত করে) । অন্যদিকে, হিমের পৃষ্ঠ আরো অমসৃণ এবং বেশি সূর্যালোক আটকে রাখে, যার ফলে বেশি ঊর্ধ্বপাতন ঘটে । যে অঞ্চলে বেশি অমসৃণ হিম থাকে, সেই অঞ্চলগুলো উষ্ণতর হয় । মঙ্গলের মহাজাগতিক বিকিরণ উচ্চমাত্রায় ।
যাই হোক, এই ছবিতে মঙ্গল গ্রহের হিমায়িত দক্ষিণ মেরু দেখতে প্রায় অবাস্তব মনে হলেও বরফাবৃত সর্পিল আকৃতিটি একেবারেই বাস্তব । হয়তো, এই স্তরগুলোর নিচে লুকিয়ে আছে মঙ্গল গ্রহের প্রাচীন জলবায়ুর সূত্র এবং সম্ভবত ভূগর্ভস্থ জলও । মানুষ কি কোনোদিন এখানে গবেষণা কেন্দ্র তৈরি করবে? 🚀

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, গুগল
ছবি: Beyond Space । 

Saturday, 16 May 2026

অ্যান্টার্কটিকার সমুদ্রে জেগে উঠেছে নতুন দ্বীপ




সম্প্রতি, বিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক দল অ্যান্টার্কটিকার হিমশীতল ওয়েডেল সাগরে ঝুঁকিপূর্ণ একটি এলাকায় গবেষণা করার সময় নতুন একটি দ্বীপ আবিষ্কার করেছে, যা এর আগে বিশ্বের কোনো মানচিত্রেই এটি চিহ্নিত ছিল না । বিস্ময়কর প্রকৃতি কখনো কখনো বরফাবৃত অ্যান্টার্কটিকায় এমন সব রহস্য উন্মোচন করে যে বিজ্ঞানীরাও অবাক হয়ে যান । তাদের এই আবিষ্কারটি এখন বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে । আলফ্রেড ভেগেনার ইনস্টিটিউটের জার্মান গবেষণা বা বরফভাঙা জাহাজ পোলারস্টার্নে থাকা ৯৩ জন সদস্যের আন্তর্জাতিক দলটি গত ৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে অ্যান্টার্কটিকার উত্তর-পশ্চিম ওয়েডেল সাগর এলাকায় সমুদ্রের স্রোত, বরফ গলে যাওয়া এবং জলরাশির মানচিত্র তৈরি করছিল । হঠাৎ খারাপ আবহাওয়ার কারণে গবেষণা কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ করে তারা জয়েনভেল্লি আইল্যান্ডে আশ্রয় নেয়ার সময় একটি দ্বীপ দেখতে পান এবং এই অংশটি নৌ-মানচিত্রে আগে কেবল একটি "রহস্যময় ও বিপজ্জনক এলাকা" হিসেবে চিহ্নিত করা ছিল । প্রথমে এটিকে ময়লা জমে থাকা একটি হিমশৈল (Iceberg) মনে হচ্ছিল । পরে যখন বরফ ও হিমবাহ গলতে শুরু করে তখন জানা যায় যে, এটি আসলে একটি ভূখণ্ড বা পাথুরে দ্বীপ । অ্যান্টার্কটিকায় দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রের বরফ স্থিতিশীল ছিল । কিন্তু গত ১০ বছরে এর অনেক পরিবর্তন ঘটেছে । জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অ্যান্টার্কটিকায় বাতাসের ধরণ বা গতিপথ বদলে যাচ্ছে । ফলে, ঠান্ডা পানি ও বরফ সরে যায় এবং গভীর সমুদ্রতলের উষ্ণ জল উপর দিকে উঠে এসে বরফ গলিয়ে দিতে সাহায্য করে । ঠিক যেন চুলার মত কাজ করে । বিজ্ঞানীরা দ্বীপটির আকার ও অবস্থান মানচিত্রায়নের জন্য একটি ড্রোন এবং একটি ইকো সাউন্ডার ব্যবহার করেছেন । ইকো সাউন্ডার হচ্ছে এমন একটি যন্ত্র যা পানির নিচে দূরত্ব মাপার জন্য শব্দ তরঙ্গ নির্গত করে । বিজ্ঞানীদের হতবাক করে তাদের অনুসন্ধানে দেখা যায় যে, দ্বীপটি আশ্চর্যজনকভাবে বড়— এর দৈর্ঘ্য গিজার মহা পিরামিডের (The Great Pyramid of Giza) প্রায় সমান বলে অনুমান করা হয় । গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, দ্বীপটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬ মিটার উঁচু, প্রস্থ ৪০ মিটার এবং দৈর্ঘ্যে ১৩০ মিটার । এই প্রথমবারের মত ভূখণ্ডটির জরিপ এবং নথিভুক্ত করা হলো । তবে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত নন যে, কেন দ্বীপটিকে নৌ-মানচিত্রে বিপদসীমার মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছিল ।  অথচ অন্যান্য ডেটা সেটে এটিকে উপকূলরেখা হিসেবে দেখানো হয়নি । আরো বিস্ময়ের বিষয় যে, মানচিত্রে নতুন আবিষ্কৃত দ্বীপটির অবস্থান প্রকৃত অবস্থান থেকে প্রায় এক মাইল দূরে দেখানো ছিল । স্যাটেলাইট চিত্রগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, বরফে ঢাকা থাকার কারণে দ্বীপটিকে তার আশেপাশের ভাসমান অসংখ্য হিমশৈল থেকে আলাদা করে চেনা প্রায় অসম্ভব ছিল । নতুন আবিষ্কৃত এই দ্বীপটির এখনো কোনো নাম দেয়া হয়নি । গবেষক দল জানিয়েছে, দ্বীপটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করার পর ভবিষ্যতে এর নামকরণ করা হবে । এদিকে অনেক সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা এর নাম রাখার পরামর্শ দিয়েছেন যেমন: (ক) আইসবার্গ (খ) লুমারল্যান্ড (গ) পাখিদের মিলন দ্বীপ । ভেনিস উপকূলের কাছে আরেকটি গোপন ক্ষুদ্র দ্বীপের আবির্ভাবের পর এই নতুন দ্বীপ আবিষ্কার হলো । তবে, আবিষ্কৃত এই দ্বীপ ঘিরে অনেক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং এর মালিকানা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে । সবচেয়ে কৌতুহলোদ্দীপক প্রশ্ন হচ্ছে: যে বিজ্ঞানীরা এই দ্বীপ খুঁজে পেয়েছেন, তারা বা তাদের দেশ কি এই দ্বীপটির মালিকানা দাবি করতে পারবেন? আন্তর্জাতিক আঞ্চলিক জলসীমা ও সার্বভৌমত্ব বা সমুদ্র আইন (UNCLOS) অনুযায়ী, এর উত্তর হচ্ছে না । আইনে বলা আছে, একটি উপকূলীয় দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে সর্বোচ্চ ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত অঞ্চলকে ‘একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল’ (Exclusive Economic Zone বা EEZ) বলা হয় । যদি এই সীমার মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে কোনো দ্বীপ সৃষ্টি হয়, তাহলে ঐ নতুন দ্বীপের উপর কেবলমাত্র সেই নিকটবর্তী দেশেরই সার্বভৌম অধিকার থাকবে । ২০০ নটিক্যাল মাইলের পর বাইরের সমুদ্র এলাকাকে আন্তর্জাতিক জলসীমা বা উচ্চ সাগর (High Seas) বলা হয় । এটি Common Heritage of Mankind বা সমগ্র মানবজাতির সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয় । ফলে, এই জলসীমায় কোনো দেশ বা ব্যক্তি এককভাবে এর মালিকানা বা সার্বভৌমত্ব দাবি করতে পারে না । তাই, এখানে সৃষ্ট কোনো নতুন দ্বীপে কোনো ব্যক্তি নিজেকে সেই দ্বীপের রাজা ঘোষণা করতে পারেন না । আন্তর্জাতিক জলসীমায় যদি কোনো ব্যক্তি কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করে নিজেকে রাজা ঘোষণা করে, তবে UNCLOS এর আইন অনুসারে সেই দ্বীপের নিজস্ব কোনো জলসীমা বা সার্বভৌমত্বের মর্যাদা থাকে না । বিশ্বের কোনো দেশই সেই তথাকথিত দ্বীপ বা রাজ্য বা ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না । বিজ্ঞানীদের মতে তিনটি কারণে যেমন: (ক) সমুদ্রের গভীরে থাকা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে বের হওয়া লাভা ধীরে ধীরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরে উঠে এসে জলের সংস্পর্শে ঠান্ডায় জমে গিয়ে সেটি দ্বীপ সৃষ্টি করে (খ) পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্লেটগুলোর সংঘর্ষ বা সরে যাওয়ার ফলে বিশেষ করে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণে সমুদ্রের তলদেশের ভূমি উপরে উঠে দ্বীপ তৈরি করে (গ) সমুদ্রের স্রোতের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে বালি ও মাটি জমে ছোট ছোট দ্বীপ বা চরের সৃষ্টি করে । 

তথ্যসূত্র: www.dw.com, www.thesun.ie 

ছবি: www.thesun.ie [Image credit: (Alfred Wegener Institute / Simon Dreutter), Christian Haas] ।

Friday, 15 May 2026

সোনারং মন্দির



মুন্সিগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ী উপজেলার সোনারং ইউনিয়নের সোনারং গ্রামে অবস্থিত এই জোড়া মন্দিরটি অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রাচীন বাংলার এক অপূর্ব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন । মুন্সীগঞ্জ তথাপি প্রাচীন বিক্রমপুরের এই মন্দির ১৮৯ বছরের ঐতিহ্যের জৌলুস হারিয়ে এখনো মাথা উঁচু করে কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । পাশাপাশি অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন মন্দিরটি স্থানীয়ভাবে 'জোড়া মঠ' নামে পরিচিত । সোনারং গ্রামে এক সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল । মন্দিরের একটি প্রস্তরলিপি থেকে জানা যায় যে, স্থানীয় জমিদার রূপচন্দ্র সেন ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে কালী মন্দির এবং ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে আরেকটি শিব মন্দির নির্মাণ করেন । এটি জোড়া মন্দির হলেও দুইটি মন্দিরের উচ্চতা এবং স্থাপত্য গঠনে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে । অষ্টভুজ আকৃতির বিশিষ্ট মন্দিরটি দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ২১ ফুট এবং এর দেয়াল বেশ পুরু । মন্দির দুইটির অভ্যন্তরীণ ছাদ নিচু এবং গোলাকার গম্বুজ আকৃতির । ৫.৩৫ মিটার বর্গাকার স্থানে নির্মিত পশ্চিমের কালী মন্দিরটি বৃহৎ, এর উচ্চতা প্রায় ১৫ মিটার (প্রায় ৫০ ফুট) এবং পূবের শিব মন্দিরটি ছোট । কালী মন্দিরের প্রধান উপাসনালয় কক্ষের সাথে ১.৯৪ মিটার এবং শিব মন্দিরের প্রধান উপাসনালয় কক্ষের সাথে ১.৫ মিটার প্রশস্তের বারান্দা আছে । মন্দিরের বাহির ও ভেতরে অসাধারণ কারুকাজে সজ্জিত । মূলত ইট, চুন এবং সুরকি দ্বারা নির্মিত এই মন্দিরটি প্রাচীন খিলান, সূক্ষ্ম কারুকাজ, কুণ্ডলিত চূড়া এবং এর নকশা তৎকালীন স্থাপত্যশৈলীর অনন্য চিহ্ন বহন করছে । কথিত আছে যে, শ্রী রূপচন্দ্র সেনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এখানেই সম্পন্ন হয়েছিল । এছাড়া, মন্দিরের সম্মুখভাগে রয়েছে একটি বিশাল বড় পুকুর । কালী মন্দিরটি তৈরি করার সময় এই পুকুর খনন করা হয় । কালী মন্দিরের সুউচ্চ শিখরে দন্ডায়মান ত্রিশূলটি কিছুটা বাঁকা হয়ে আছে । ধারণা করা হয়, তীব্র বাতাস বা বজ্রপাতের প্রভাবে এটি এমন হয়েছে । বিস্ময়কর এই মন্দিরের চূড়ার ছোট ছোট গর্তগুলো নীলকণ্ঠ, ঘুঘু, মাছরাঙা, শালিক, টিয়া এবং পায়রাসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাসস্থল, যেখানে তারা উচ্চস্বরে কোলাহল করে । চোর বা দুর্বৃত্তরা এই মন্দিরের পাথর, শিবলিঙ্গ, কষ্টিপাথরের কলস এবং বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যায় । দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন এবং অবহেলায় পড়ে থাকার পর, বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগে কিছুদিন আগে সংস্কারের পর অত্যন্ত সুন্দর এই মন্দিরটি এখন এক নতুন রূপ ধারণ করেছে । কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া মন্দিরের সেই অতীত চেহারা পুনরায় আবির্ভূত হওয়ায় মানুষের সাথে এর নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়েছে । জানি না, এর মধ্যে কি এক দুর্নিবার আকর্ষণ লুকিয়ে আছে । নিপুণ কারুকার্যে অনবদ্যভাবে নির্মিত মন্দিরের নান্দনিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি পরম প্রশান্তি এনে দেয় । পবিত্র এই মন্দিরটি দীর্ঘকালের অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং অজানা রহস্যকে ধারণ করে আছে, যা প্রাচীন বিক্রমপুরের এক দুর্লভ ও সমৃদ্ধ ইতিহাসের অংশ । আমি মনে করি, সোনারং মন্দিরের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং পর্যটন ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হলে এটি হবে মুন্সীগঞ্জ জেলার অন্যতম ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান । উল্লেখ্য যে: কালজয়ী বাঙালি, প্রগতি লেখক ও শিল্পী সমিতি 'উদীচী সাংস্কৃতিক সংগঠন' এর প্রতিষ্ঠাতা, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি বিপ্লবী, সাহিত্যিক এবং শ্রমিক সংগঠক সত্যেন সেন এই সোনারং গ্রামেই হিন্দু সেন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ।  

তথ্যসূত্র: আন্তর্জাল (গুগল, উইকিপিডিয়া) । 

ছবি: নিজ ।

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...