Thursday, 28 May 2026

মঙ্গলে হিমায়িত বরফের ঘূর্ণি


🔴❄️ মঙ্গল হচ্ছে মরুভূমির মত একটি পাথুরে গ্রহ । সূর্য থেকে এই চতুর্থ গ্রহটি কমলা-লাল রঙের জন্য "লাল গ্রহ" নামেও পরিচিত । মঙ্গলের ঘূর্ণন অক্ষ (Axial tilt, মঙ্গলের জন্য ২৫.১৯°, পৃথিবীর জন্য ২৩.৪৫°) আমাদের পৃথিবীর কাছাকাছি কোণে হেলে থাকার কারণে এখানে পৃথিবীর মতই চমৎকার ঋতু পরিবর্তন হয় । এই লাল গ্রহের মাটি ও বায়ুমণ্ডলের পাতলা স্তরে কিছু জলীয় বাষ্প রয়েছে যা কুয়াশা, সিরাস মেঘ, তুষার, পারমাফ্রস্ট এবং বরফ টুপিসহ বৃহত্তর মেরু অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে । কিন্তু গ্রহপৃষ্ঠে কোনো তরল জলের আধার নেই । মঙ্গল গ্রহের একটি পাতলা বায়ুমণ্ডল রয়েছে, যেটি প্রধানত কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস (CO₂) দ্বারা গঠিত । প্রতি বছর শীতকালে উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে এই কার্বন ডাই অক্সাইড বরফ হয়ে জমে থাকার কারণে গ্রহটির মহাকর্ষ পরিবর্তিত হয় । এক গবেষণায় দেখা যায়, দক্ষিণ মেরুর কাছে হিমায়িত কার্বন ডাই অক্সাইডের একটি বিশাল ভান্ডার রয়েছে । গ্রহটির হেলে থাকার কোণ বেড়ে যাওয়ায় এই ভান্ডারের বেশিরভাগই সম্ভবত মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেছিল । আর যখন এমনটা ঘটে, তখন বায়ুমণ্ডল ঘন হয়ে ওঠে, বায়ুপ্রবাহ আরো শক্তিশালী হয় এবং ভূপৃষ্ঠের আরো বৃহত্তর এলাকা জুড়ে তরল জল ধরে রাখা সম্ভব হয় । প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, যদি এই ভান্ডার সম্পূর্ণরূপে গ্যাসে রূপান্তরিত হয় তাহলে মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডলীয় চাপ দ্বিগুণ হয়ে যাবে । প্রতিবছর শীতকালে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন থেকে ৪ ট্রিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল থেকে মেরু বরফ টুপিতে জমে যায় । এটি সমগ্র মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডলের ভরের ১২ থেকে ১৬ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে । একটি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডলে জলের বিভিন্ন আইসোটোপিক রূপের মানচিত্র তৈরি করার পর, উত্তর মেরু অঞ্চলের বরফে HDO (Semi-heavy water) এবং পানির অনুপাত পরিমাপ করে প্রমাণ পেয়েছে যে, মঙ্গল গ্রহে একসময় অন্তত ১৩৭ মিটার গভীর একটি মহাসাগর তৈরি করার মত যথেষ্ট জল ছিল । মেরু অঞ্চলের বরফ পৃথিবীর মহাসাগরের জলের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি ডিউটেরিয়াম সমৃদ্ধ । এর অর্থ হচ্ছে, মঙ্গল গ্রহ আজকের মেরু অঞ্চলে সঞ্চিত জলের চেয়ে ৬.৫ গুণ বেশি পরিমাণ জল হারিয়েছে । এই জল কিছু সময়ের জন্য নিম্নভূমি Vastitas Borealis এবং সংলগ্ন নিম্নভূমিতে (Acidalia, Arcadia এবং Utopia planitiae) মহাসাগর তৈরি করে থাকতে পারে । আর যদি সেই সমস্ত জল কখনো তরল আকারে ভূপৃষ্ঠে উঠে আসে, তবে তা পৃথিবী পৃষ্ঠের ২০ শতাংশ ঢেকে ফেলবে এবং কিছু কিছু জায়গায় এর গভীরতা প্রায় এক মাইল হবে । উল্লেখ্য যে, প্রোটিয়ামের তুলনায় ভারী পরমাণু ডিউটেরিয়াম হচ্ছে হাইড্রোজেনের একটি স্থিতিশীল আইসোটোপ ।
মঙ্গল গ্রহের দুই মেরু অঞ্চলে স্থায়ী বরফ টুপি রয়েছে, যা মূলত জমাট বাঁধা জলীয় বরফ এবং হিমায়িত কার্বন ডাই অক্সাইডের (শুষ্ক বরফ) আস্তরণ দ্বারা গঠিত । এটি একটি স্থায়ী বরফের চাদর । উভয় মেরু টুপিতেই স্তরযুক্ত বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, যাকে মেরু-স্তরযুক্ত সঞ্চয় (Polar Layer Deposit) বলে, যেটি মঙ্গল গ্রহের ধূলিঝড় থেকে আসা ধূলিকণার সাথে বরফের ঋতুভিত্তিক ক্ষয় এবং সঞ্চয়ের ফলে তৈরি হয়েছে । উভয় মেরু টুপিতেই খাঁজকাটা বৈশিষ্ট্যও দেখা যায়, যা সম্ভবত বায়ুপ্রবাহের ধরণ দ্বারা সৃষ্ট । এই খাঁজগুলো ধূলিকণার পরিমাণ দ্বারাও প্রভাবিত হয় । ধূলিকণা যত বেশি, পৃষ্ঠতল তত গাঢ় হয় । পৃষ্ঠতল যত গাঢ় হয়, গলনও তত বেশি হয় । গাঢ় পৃষ্ঠতল বেশি আলোক শক্তি শোষণ করে । মঙ্গল গ্রহের দক্ষিণ মেরুর বরফের স্তর বা টুপিটি (South Polar Cap) উত্তর মেরুর বরফের স্তর বা টুপির (North Polar Cap) তুলনায় অনেক ছোট । দক্ষিণ মেরু অঞ্চলটি উত্তর মেরুর চেয়ে অধিক উচ্চতায় অবস্থিত এবং চরম শীতল, গভীর ও দুর্গম অঞ্চল- যেটি মঙ্গল গ্রহের দক্ষিণ গোলার্ধের Planum Australe নামক এক বিশাল মেরু মালভূমিতে অবস্থিত । দক্ষিণ মেরুর বরফের চাদর বা আচ্ছাদনের ব্যাস প্রায় ৪০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার এবং এর পুরুত্ব প্রায় ৩ কিলোমিটার (৩০০০ মিটার বা ২ মাইল) পর্যন্ত হতে পারে । এই বরফের চাদরে ধূলিকণা এবং বরফের পর্যায়ক্রমিক স্তর রয়েছে, যা গ্রহটির প্রাচীন জলবায়ু ও ঋতু পরিবর্তনের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে । ধারণা করা হয়, দক্ষিণ মেরুর বরফস্তর এবং সংলগ্ন স্তরযুক্ত জমাট বরফের মোট আয়তন প্রায় ১.৬ মিলিয়ন ঘন কিলোমিটার । মঙ্গলীয় শীতকালে দক্ষিণ মেরুতে তাপমাত্রা নাটকীয়ভাবে -১৩০° (ডিগ্রি) সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায় । ফলে, প্রচণ্ড ঠান্ডায় বায়ুমণ্ডলীয় কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস জমে বরফে পরিণত হয় এবং মূল বরফ টুপির উপরে তুষারের মত ঝরে পড়ে আরো একটি শুষ্ক বরফের পাতলা স্তর তৈরি করে, যা আকারে বৃদ্ধি পায় । বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে এই বরফ গলে বায়ুমণ্ডলে বাষ্পীভূত হয়ে যায় এবং এর আয়তন সংকুচিত করে । বরফ টুপির উপরিভাগে শক্তিশালী বাতাসের কারণে এর পৃষ্ঠে গভীর খাদ এবং সর্পিল নকশা সৃষ্টি করে । দক্ষিণের বরফ টুপির নিকটবর্তী কিছু এলাকায় ঋতুগতভাবে বরফ জমার ফলে ভূপৃষ্ঠের উপরে ১ মিটার পুরু স্বচ্ছ ও শুষ্ক বরফের চাঁই তৈরি হয় । বসন্তের আগমনে সূর্যের আলো ভূগর্ভস্থ স্তরকে উষ্ণ করে এবং ঊর্ধ্বপাতিত কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে সৃষ্ট চাপ বরফের চাঁইয়ের নিচে তৈরি হয়, যা এটিকে উপরে তুলে আনে এবং অবশেষে ফাটিয়ে দেয় । যার ফলে, কালো ব্যাসল্টিক বালি (Basaltic sand) বা ধূলিকণার সাথে মিশ্রিত কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসের উষ্ণপ্রস্রবণের মত অগ্ন্যুৎপাত ঘটে । এই প্রক্রিয়াটি দ্রুত- যা কয়েক দিন, সপ্তাহ ও মাসের মধ্যে ঘটতে দেখা যায় । ভূতত্ত্বে, বিশেষ করে মঙ্গল গ্রহের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের হার বেশ অস্বাভাবিক । বরফের চাঁইয়ের নিচে উষ্ণপ্রস্রবণের স্থানে ছুটে আসা গ্যাস মাকড়সার জালের মত বৃত্তাকার প্রণালী তৈরি করে । ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে European Space Agency (ESA) এর Mars Express Orbiter থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ইতালীয় বিজ্ঞানীরা জানান যে, এই মেরু অঞ্চলের বরফের স্তরীভূত সঞ্চয়ের পৃষ্ঠ থেকে ১.৫ কিঃমিঃ বা ০.৯৩ মাইল গভীরে (দৃশ্যমান স্থায়ী বরফের টুপির নিচে নয়) অবস্থিত বরফ ও ধূলিকণার স্তরের নিচে চাপা পড়া তরল লবণাক্ত পানির হ্রদ বা জলাধার বা জটিল জলজ ব্যবস্থার অস্তিত্ব থাকতে পারে । হ্রদটি প্রায় ২০ কিলোমিটার বা ১২ মাইল প্রশস্ত । যদি এটি নিশ্চিত হয়, তাহলে এটি হবে গ্রহটিতে প্রথম পরিচিত স্থিতিশীল জলাশয় । তবে, তরল জলের পরিবর্তে কঠিন খনিজ বা লবণাক্ত বরফও থাকতে পারে । Chasms Australe হচ্ছে একটি প্রধান উপত্যকা, যা দক্ষিণ মেরু টুপির স্তরীভূত সঞ্চয়ের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত । এটি প্রায় ১০০ কিলোমিটার চওড়া এবং ২ কিলোমিটার পর্যন্ত গভীর, যা পৃথিবীর গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের চেয়েও গভীর । ৯° পূর্ব দিকে এই সঞ্চয়গুলো Prometheus নামক একটি প্রধান অববাহিকার উপর অবস্থিত । দক্ষিণ মেরুর কিছু স্তরে আয়তক্ষেত্রের আকৃতির বহুভুজীয় ফাটলও দেখা যায় । মনে করা হয় যে, ভূপৃষ্ঠের নিচে জলীয় বরফের প্রসারণ এবং সংকোচনের কারণে এই ফাটলগুলো তৈরি হয়েছে । দক্ষিণ মেরুর চারপাশে হিমবাহের বরফ গলে গিয়ে তৈরি হওয়া Dorsa Argentea Formation নামে এক বিশাল দীর্ঘ ও আঁকাবাঁকা শৈলশিরা (Esker) বিদ্যমান । এটি একটি দানব মেরু বরফ চাদরের অবশেষ বলে ধারণা করা হয়, যেটি প্রায় ১.৫ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল । এই এলাকাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস রাজ্যের আয়তনের দ্বিগুণ ।
দক্ষিণের বরফ টুপি স্থানচ্যুত । অর্থাৎ, এটি দক্ষিণ মেরুতে কেন্দ্র করে নেই । দক্ষিণের ঋতুগত টুপি ভৌগোলিক মেরুর কাছাকাছি কেন্দ্র করে থাকে । গবেষণায় দেখা গেছে যে, একপাশের তুলনায় অন্যপাশে বেশি তুষারপাত হওয়ার কারণে কেন্দ্রচ্যুত টুপিটি গঠিত হয় । দক্ষিণ মেরুর প্রভাবশালী হেলাস বেসিন অববাহিকার (Hellas Basin বা Hellas Planitia) কারণে বায়ুপ্রবাহ পরিবর্তিত হওয়ায় একটি নিম্নচাপ ব্যবস্থা তৈরি হয় । বিস্ময়কর এই ব্যবস্থা অনেক বেশি তুষারপাত ঘটায় । অন্যদিকে, কম তুষারপাত এবং বেশি হিম থাকে । গ্রীষ্মকালে তুষার বেশি সূর্যালোক প্রতিফলিত করে, তাই খুব বেশি গলে না বা ঊর্ধ্বপাতিত হয় না (মঙ্গল গ্রহের জলবায়ু তুষারকে সরাসরি কঠিন থেকে গ্যাসে পরিণত করে) । অন্যদিকে, হিমের পৃষ্ঠ আরো অমসৃণ এবং বেশি সূর্যালোক আটকে রাখে, যার ফলে বেশি ঊর্ধ্বপাতন ঘটে । যে অঞ্চলে বেশি অমসৃণ হিম থাকে, সেই অঞ্চলগুলো উষ্ণতর হয় । মঙ্গলের মহাজাগতিক বিকিরণ উচ্চমাত্রায় ।
যাই হোক, এই ছবিতে মঙ্গল গ্রহের হিমায়িত দক্ষিণ মেরু দেখতে প্রায় অবাস্তব মনে হলেও বরফাবৃত সর্পিল আকৃতিটি একেবারেই বাস্তব । হয়তো, এই স্তরগুলোর নিচে লুকিয়ে আছে মঙ্গল গ্রহের প্রাচীন জলবায়ুর সূত্র এবং সম্ভবত ভূগর্ভস্থ জলও । মানুষ কি কোনোদিন এখানে গবেষণা কেন্দ্র তৈরি করবে? 🚀

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, গুগল
ছবি: Beyond Space । 

No comments:

Post a Comment

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...