Monday, 11 December 2023

উজ্জ্বল নক্ষত্র HD 110067 কে ছয়টি গ্রহ অনুরণনে প্রদক্ষিণ করছে



জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি আকাশগঙ্গা ছায়াপথে (The Milky Way Galaxy) নতুন একটি সৌরজগতের সন্ধান পেয়েছেন । তারা বিশ্বাস করেন যে, এ সৌরজগতটি কোটি কোটি বছর আগে তার জন্মের পর থেকে অস্পর্শ ছিল । বিশাল মহাবিশ্বে জন্ম নেয়া আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৭০০০ আলোকবর্ষ দূরে ছায়াপথের এক অতি ক্ষুদ্র অংশে কালপুরুষ বাহুতে একাধিক গ্রহ নিয়ে গড়ে উঠেছে আমাদের সৌরজগৎ (Solar System), যার কেন্দ্রে রয়েছে জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্য । সেই সৌরজগতের একটি ছোট সবুজ গ্রহ পৃথিবী হচ্ছে আমাদের বাসস্থান । অসংখ্য নক্ষত্র, নাক্ষত্রিক অবশেষ, গ্রহাণু, উল্কা, ধূমকেতু, আন্তঃগ্রহীয় ধূলি মেঘ, আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাস, ধূলিকণা, অদৃশ্য পদার্থ, নীহারিকা, সৌরজগৎ এবং মহাজাগতিক বস্তুর সমন্বয়ে গঠিত হয় এক একটি ছায়াপথ । অর্থাৎ আমরা থাকি আকাশগঙ্গা ছায়াপথে । আকাশগঙ্গা ছায়াপথের সবচেয়ে নিকটবর্তী বামন ছায়াপথ হচ্ছে Canis Major Dwarf Galaxy (Canis Major Overdensity) যা আকাশগঙ্গা ছায়াপথের Galactic Core কে কেন্দ্র করে মহাকর্ষ শক্তি দ্বারা আকাশগঙ্গা ছায়াপথের সাথে আবদ্ধ আছে । অ্যানড্রোমিডা (Andromeda) ছায়াপথ হচ্ছে স্থানীয় ছায়াপথ সমুহের মধ্যে সবচেয়ে বিশালাকার ছায়াপথ যার প্রতিবেশী হিসেবে আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথ ও ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথসহ আরো প্রায় ৪৪টি ছোট ছায়াপথ রয়েছে । আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্রে বেতার তরঙ্গের প্রবল উৎস এবং ধনু এ তারা (Sagittarius A*) নামক অতিভার বিশিষ্ট একটি কৃষ্ণগহ্বর রয়েছে । আর এ আকাশগঙ্গা ছায়াপথেই আবিষ্কৃত হয়েছে আরো একটি নতুন সৌরজগৎ ৷ দারুণ ও বিস্ময়কর ঘটনা! ঐ সৌরজগতে সবচেয়ে উজ্জ্বল একটি বামন নক্ষত্র HD 110067 কে কেন্দ্র করে নিখুঁত সুরে ঘুরছে ০৬টি গ্রহ । যে নক্ষত্রটির উজ্জ্বলতা আলোকীয় তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বিখ্যাত লাল বামন TRAPPIST-1 নক্ষত্রকে প্রায় ১০০০০ গুণ ছাড়িয়ে গেছে । গ্রহগুলো একটি নির্দিষ্ট ছন্দে বা অনুরণিত শৃঙ্খলে অনেকটা গাণিতিকভাবে কেন্দ্রীয় নক্ষত্র HD 110067 কে কেন্দ্র করে কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করছে । জ্যামিতিক ছন্দে নক্ষত্রের চারপাশে গ্রহগুলোর আবর্তনের এ ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা ‘কাক্ষিক অনুরণন’ (Orbital Resonance) নামে আখ্যায়িত করেছেন । জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে এটি এমন একটি আপেক্ষিক অবস্থান বা বহিরবয়ব বা রূপরেখা (Configuration), যা প্রকৃতিতে পর্যবেক্ষণ করা একটি বিরল ঘটনা । সত্যিই, অনন্য আবিষ্কার । উত্তর গোলার্ধ থেকে HD 110067 নক্ষত্রটি দেখা যায় । এটি আমাদের সূর্যের মতোই একটি নক্ষত্র এবং যার আকার ও ভর প্রায় ৮০ শতাংশ । নক্ষত্র এবং সংশ্লিষ্ট গ্রহমণ্ডলটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১০০ আলোকবর্ষ (৫.৮ ট্রিলিয়ন মাইল) দূরে Coma Berenices নক্ষত্রমণ্ডলে (উত্তর) অবস্থিত । এ নক্ষত্রের আপাত মাত্রা ৮.৪ এবং বক্রতার ব্যাসার্ধ ১.৯৪আর⊕ থেকে ২.৮৫আর⊕ । গত ২৯শে নভেম্বর ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ববিখ্যাত Nature সাময়িকীতে নতুন এ সৌরজগত নিয়ে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে । সৌরজগতের গ্রহগুলো নিজ বা কেন্দ্রীয় বা মূল নক্ষত্রের (Host Star) খুব কাছাকাছি থেকে আবর্তন করে । সবগুলো গ্রহই পৃথিবীর ব্যাসের দুই থেকে তিনগুণ । তবে এ গ্রহতন্ত্রের কোনো গ্রহকেই জীবনধারণের জন্য বাসযোগ্য অঞ্চলে (Habitable Zone) পাওয়া যায়নি ৷ জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ধারণা, গ্রহগুলো গ্যাসীয় হলেও সকলেরই পাথুরে ও বরফের অন্তস্তল বা কেন্দ্রভাগ (Core) এবং হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের বর্ধিত বায়ুমণ্ডল রয়েছে । গ্রহগুলোর বায়ুমণ্ডলের গঠন, তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং সেখানে জল আছে কি-না ভবিষ্যতে আরো বিস্তারিত জানা যাবে ।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ২০২০ খ্রিস্টাব্দে NASA এর মহাকাশ টেলিস্কোপ Transiting Exoplanet Survey Satellite (TESS) দ্বারা একটি উজ্জ্বল K0 জাতের নক্ষত্র HD 110067 কে প্রদক্ষিণকারী দুটি বহিঃসৌর অভ্যন্তরীণ গ্রহকে প্রথম আবিষ্কারের মাধ্যমে এ সৌরজগতের সন্ধান পান ৷ পরবর্তীতে ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ESRA এর CHEOPS বা Characterizing Exoplanet Satellite (CES) মহাকাশ টেলিস্কোপ ব্যবহার করে এ বছর বাকী চারটি বহিঃসৌর গ্রহ আবিষ্কার করেন ৷ অবিশ্বাস্য এ আবিষ্কারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ সৌরজগৎ কিভাবে গঠিত ও বিবর্তিত হয়েছে এবং গ্রহ গঠনের প্রাথমিক পর্যায় ও পরবর্তী বিবর্তন সম্পর্কে মূল্যবান অনেক কিছুই জানা যাবে । বিজ্ঞানীদের ধারণা, এ সৌরজগতে এমন আরো গ্রহ থাকতে পারে । এখন পর্যন্ত ০৬টি পরিচিত b, c, d, e, f, g গ্রহের সন্ধান পাওয়া গেছে । গ্রহগুলোর আকৃতি প্রায় নেপচুনের মতো । তাই এদেরকে উপ-নেপচুন বহিঃসৌর গ্রহ (Sub-Neptune Exoplanet) বলা হয় । উল্লেখ্য যে, পৃথিবীর চেয়ে বড় ও ভারী এবং নেপচুন বা ইউরেনাসের চেয়ে ছোট ও হালকা গ্রহগুলোকে অতি-পৃথিবী (Super-Earth) বলে । অতি-পৃথিবী গ্রহগুলো বরফ সমৃদ্ধ, জলীয়, এমনকি গলিত লাভায় আচ্ছাদিত, গ্যাসীয়, পাথুরে কিংবা এদের মিশ্রণে তৈরি হতে পারে । সাধারণত পৃথিবীর চেয়ে অতি-পৃথিবী গ্রহগুলোর মাধ্যাকর্ষণ বেশি, বৃহদাকার এবং অত্যাধিক ভর থাকে ৷ আমাদের সৌরজগতে এ ধরনের কোনো গ্রহ নেই ৷ তবে মহাবিশ্বে অন্যান্য নক্ষত্রদের পর্যবেক্ষণ বা জরিপ করার সময় বহিঃসৌর অতি-পৃথিবী গ্রহগুলোকে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় ৷ আমাদের সৌরজগতের বাইরে অপার মহাবিশ্বে খুঁজে পাওয়া অন্য কোনো নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে এমন গ্রহগুলোকেই বহিঃসৌর গ্রহ (Exoplanet) বলে । এ পর্যন্ত ৫৫০০ টি বহিঃসৌর গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে । যাই হোক, মাতৃনক্ষত্র বা কেন্দ্রীয় নক্ষত্র HD 110067 কে কেন্দ্র করে পরিক্রমণ করা বহিঃসৌর গ্রহগুলোর ঘনত্ব অনেক বেশি যা আমাদের সৌরজগতের সর্ববৃহৎ গ্যাস দানব গ্রহ বৃহস্পতির প্রায় কাছাকাছি । বৃহস্পতি গ্রহ পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ৩১৮ গুণ বড় এবং এর রয়েছে বিশাল মাধ্যাকর্ষণ শক্তি । আবিষ্কৃত এ বহিঃসৌর গ্রহগুলো নির্দিষ্ট জ্যামিতিক ছন্দ মেনেই কেন্দ্রীয় নক্ষত্রের চারপাশে ০৯ থেকে ৫৪ দিনের মধ্যে একবার ঘুরে এসে বছর পূর্ণ করে । প্রতিটি গ্রহ যেমন: অভ্যন্তরীণ গ্রহ b প্রতি ৯.১১৪ দিনে, পরবর্তী গ্রহ c প্রতি ১৩.৬৭৩ দিনে এবং গ্রহ d প্রতি ২০.৫১৯ দিনে কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে । এ সময়কালগুলো প্রতিটি পরেরটির প্রায় ১.৫ গুণ, মানে গ্রহগুলো বহিরবয়ব বা আপেক্ষিক অবস্থানে থেকে একটি অনুরণন শৃঙ্খল গঠন করেছে যাকে বলা হয় ৩:২ । অর্থাৎ গতির অনুরণন (Speed Resonance) । এ ক্ষেত্রে নক্ষত্রের সবচেয়ে কাছের (অভ্যন্তরীণ বা প্রথম গ্রহটি) গ্রহ b তিনবার ও পরবর্তী গ্রহ c দুইবার কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে । তারপর গ্রহ c তিনবার ও শেষে গ্রহ d দুইবার কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে । এছাড়া ‘অনুরণিত শৃঙ্খলে’ (Resonant Chain) গ্রহ e প্রতি ৩০.৭৯৩ দিনে, গ্রহ f প্রতি ৪১.০৫৯ দিনে এবং গ্রহ g প্রতি ৫৪.৭৭০ দিনে কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে । পুরো তন্ত্রটি বুধ গ্রহের কক্ষপথের ভিতরে খাপ খাত্তয়া বা মানানসই হতে পারে । নক্ষত্রটির সবচেয়ে ভিতরের চারটি গ্রহ একটি সুনির্দিষ্ট ৩:২ অনুরণনের শৃঙ্খলে নিরবচ্ছিন্নভাবে এক স্বর্গীয় নৃত্য করে চলছে । পাশাপাশি বাইরের দুটি গ্রহ f ও গ্রহ g ৪:৩ অনুরণনে রয়েছে এবং এর অভ্যন্তরীণ গ্রহ প্রতি চারবার ও পরবর্তী গ্রহটি তিনবার কক্ষপথে পূর্ণ আবর্তন করে । সামগ্রিকভাবে, অভ্যন্তরীণ গ্রহ b ছয়বার কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে এবং সবচেয়ে বাইরের গ্রহ g একটি পূর্ণ বিপ্লব ঘটায় । এভাবেই নক্ষত্রটির গ্রহগুলোর মধ্যে ছন্দাকারে পর্যায়ক্রমে আকর্ষণীয় প্রক্রিয়াটি চলতে থাকে । সুতরাং HD 110067 নক্ষত্র এবং সংশ্লিষ্ট গ্রহব্যবস্থায় বহিঃসৌর গ্রহ ছয়টি একে অপরের উপর মাধ্যাকর্ষণীয় প্রভাবের কারণে এতো সুন্দর সামঞ্জস্যের মধ্যে রয়েছে । তবে অন্য কোনো সৌরজগতে এ গ্রহগুলোর মতো এমন বিস্ময়কর ছন্দময় পরিক্রমণ খুব বেশি দেখা যায়নি ৷ গ্রহগুলো তাদের কেন্দ্রীয় নক্ষত্র HD 110067 থেকে এমনই দূরত্বে রয়েছে যা আমাদের সূর্য থেকে শুক্র গ্রহের দূরত্বের চেয়েও কম । তাই এ গ্রহগুলোর তাপমাত্রা প্রচণ্ড পরিমাণ এবং সেখানে প্রাণ থাকার সম্ভাবনা খুবই কম ।

আদিম বা আদিগ্রহীয় চাকতি (Protoplanetary Disk) হচ্ছে নক্ষত্রের চারপাশে ঘূর্ণায়মান ধূলিকণার মেঘ, যে মেঘের উপাদানগুলো একত্রিত হয়ে পরবর্তীকালে গ্রহ তৈরি করে । আবিষ্কৃত সৌরজগতে কিভাবে গ্রহগুলোর একটি ব্যবস্থা বা তন্ত্র বা পদ্ধতি (System) নিখুঁত গাণিতিক অনুপাতের মধ্যে প্রদক্ষিণ করে ? এ বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান লেখক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী Rafael Luque বলেন: ”গ্রহগুলোর গঠনকারী আদিগ্রহীয় চাকতি শেষ পর্যন্ত অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার প্রাথমিক অবস্থার প্রতিফলন । এ ধরনের অনুরণিত শৃঙ্খলগুলো প্রকৃতিতে অত্যন্ত সাধারণ হওয়া উচিৎ, কিন্তু তারা তা নয় । কারণ সৌরজগতের জন্মের পর মহাবিশ্বে ‘ঘনঘন বিশৃঙ্খল ঘটনা’ যেমন ক্ষণস্থায়ী নক্ষত্র, দৈত্যাকার উল্কাপিণ্ডের প্রভাব এবং মহাকাশে বিচরণকারী দানব গ্রহগুলো যে কোনো অনুরণনকে কর্দমাক্ত করে যতক্ষণ না তারা চলে যায়” । উদাহরণস্বরূপ, সৌরজগতের কিছু গ্রহ অতীতে স্থানান্তরিত হয়েছে বলে মনে করা হয় । কিন্তু কমপক্ষে চার বিলিয়ন বছর আগে গ্রহগুলো গঠিত হওয়ার পর থেকে HD 110067 নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে এদের অনুরণন শৃঙ্খল ব্যবস্থাটি নিরবচ্ছিন্নভাবে এখনো টিকে আছে, যা ‘এ ব্যবস্থার বিবর্তন খুব শান্ত, খুব মৃদু হয়েছে’ নির্দেশ করে । সম্ভবত এ ভাবেই গ্রহব্যবস্থা শুরু হয় । আকাশগঙ্গা ছায়াপথে এটি একটি ব্যতিক্রমী লুকানো রত্ন । তবে, সমস্ত গ্রহ ব্যবস্থার প্রায় এক শতাংশ এখনো অনুরণনে প্রদক্ষিণ করছে । হয়তো অপার মহাবিশ্বে এমন কিছু সৌরজগৎ রয়েছে যেগুলোর সন্ধান পেলে সৌরজগৎ ও গ্রহব্যবস্থার সূচনাকালের অবস্থা সম্পর্কে আরো বিশদভাবে জানা যাবে । কারণ, শুধু এ সৌরজগতগুলোই এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে । যদিও প্রায় ৪৫৭ কোটি বছর আগে এক বিশাল আন্তঃনাক্ষত্রিক আণবিক মেঘ এর একটি ক্ষুদ্র অংশের মহাকর্ষীয় পতন থেকে সৌরজগৎ গঠিত হয় ও বিবর্তন ঘটে ৷ ফলে সূর্য এবং বৃহৎ গ্যাসীয় দানব বৃহস্পতি ও শনির মতো অন্যান্য গ্রহগুলোর জন্ম হয় । এভাবেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে প্রায় সকল সৌরজগতের সূচনা হয়েছিল । কিন্তু পরবর্তীতে সময়ের পথ পরিক্রমায় এটি আর সেভাবে থাকেনি ৷ ধীরে ধীরে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের এ অবস্থায় পৌঁছেছে । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আশা করছেন যে, নতুন গ্রহব্যবস্থাটি আমাদের সৌরজগতের ইতিহাস এবং কিভাবে এটি তার ছন্দ হারিয়েছে তা বুঝতে সাহায্য করবে । এছাড়া গ্রহগুলোর আকার, ভর, তাপমাত্রা এবং তাদের কেন্দ্রীয় নক্ষত্র থেকে দূরত্বের সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো অন্য কোনো কারণের অনুপস্থিতিতে এদের বিবর্তনকে কিভাবে প্রভাবিত করতে পারে তা অধ্যয়নের জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এ গ্রহগুলোকে একে অপরের সাথে তুলনা করতে পারেন ।

সূত্র: https://www.astronomy.com/ (By Alison Klesman), আন্তর্জাল (The Internet), ছবি: https://nccr-planets.ch/ ।

Friday, 1 December 2023

এক বিকেলের অনুভূতি

মায়াবী পড়ন্ত বেলা ৷

শান্ত ও নৈঃশব্দময় পরিবেশ ৷

স্রোতস্বিনী নদী বয়ে চলে অজানা গন্তব্যে ৷

শির উঁচু করা পাহাড়গুলো আকাশ স্পর্শ করতে চায় ৷

তীরে বাঁধা নৌকাটি আপন করে নিয়েছে নিঃসঙ্গতাকে ৷

সাদা তুলা মেঘ নীলিমায় মিলিয়ে যায় ৷

দক্ষিণা বাতাসে ভেসে আসে দারুচিনির সুমিষ্ট ঘ্রাণ ৷

কলসী কাঁখে অষ্টাদশীর প্রাণোচ্ছলতা ৷

শিকারী গাংচিলের তীক্ষ্ণ চোখ হন্য হয়ে শিকার খোঁজে ৷

প্রিয়তমার সাথে ডানা মেলে উড়ে যায় রঙিন প্রজাপতি ৷

সৈকতে লাল কাঁকড়াগুলোর উদ্দাম দৌড় প্রতিযোগিতা ৷

গোধূলি বেলায় আগুন লেগেছে পশ্চিমাকাশে ৷

মন্থর গতিতে শামুকের আঁকাবাঁকা পথচলা ৷

সন্ধ্যাকে আলিঙ্গনের অপেক্ষায় দূর দিগন্ত ৷

ক্লান্ত বলাকা বাড়ি ফেরার পথে ৷

জোনাকির মিটমিটি আলোয় সাঁজ প্রদীপ জ্বলে ৷ 

ডিঙি নৌকায় লণ্ঠন জ্বেলে নদী অভিমুখে জেলেরা ৷

অস্তগামী সূর্যের দিকে অপলক চেয়ে থাকি ৷

ঐশ্বর্যময় প্রকৃতির এক অনুপম সৌন্দর্য ৷

আবহমান বাংলার শাশ্বত প্রতিচ্ছবি ৷

Saturday, 4 November 2023

দৃষ্টিপাত

চোখ কখনো মিথ্যা বলে না ৷

হৃদয়েশ্বরী এতো প্রেমে পড়েছে—

আমি তার উল্লাস দেখেছি ৷

ঐ মেঠোপথে দুরন্তপনা ৷

অব্যক্ত কথাগুলোর জন্য তীব্র আকুতি ৷

কখনো দুঃসাহসিকতা ।

অপলক চাহনির গহীনে সহস্রাব্দের নীরবতা ।

কি যেনো শত জিজ্ঞাসা?

বালুকাময় সমুদ্র সৈকতে অনুরাগ দেখেছি ৷

কখনো তার অপরূপ সৌন্দর্যের মহিমা ৷

জ্যোৎস্না রাতে পূর্ণিমা চাঁদের সাথে গোপন অভিসার ৷

বিরহের নৃশংস দাবানলে দগ্ধ হৃদয়ের হাহাকার ।

সভ্যতা নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা দেখেছি ৷

আবার কখনো স্পর্ধিত অহংকার ।

কিংবা পরাজয়ের গ্লানিকর মুখচ্ছবি ।

তবুও, তার অদম্য পথচলা ।

দূরে, বহুদূরে…

এক অজানা নৈঃশব্দের জগতে ।

তবে কি, সে অপরাজিতা?

প্রেয়সী’র নম্র স্পর্শে উষ্ণ রক্তে উত্তাল ঢেউ ওঠে ।

তার প্রাণস্পন্দন আমার সত্তাকে নাড়া দেয় ।

এক স্বর্গীয় অনুভূতি ।

শাশ্বত ভালোবাসা ৷


Monday, 9 October 2023

রসায়ন, সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার ২০২৩

নোবেল পুরস্কার (The Nobel Prize) হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার । ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে সুইডিশ শিল্পপতি এবং উদ্ভাবক আলফ্রেড নোবেল (Alfred Nobel) নিজের মোট উপার্জনের শতকরা ৯৪ ভাগ ( প্রায় ৩ কোটি সুইডিশ ক্রোনার) অর্থ দিয়ে অছিয়তনামা বা ইচ্ছাপত্রের (Will) মাধ্যমে ছয়টি ক্ষেত্রে যেমন: রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, সাহিত্য, শান্তি, চিকিৎসাবিদ্যা এবং অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে (The Sveriges Riksbank Prize) নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন করেন । আলফ্রেড নোবেল স্মরণে বিভিন্ন গবেষণা, উদ্ভাবন এবং মানবকল্যানমূলক কর্মকান্ডে অসামান্য অবদানের জন্য ব্যক্তি, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয় । আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছা অনুসারে নোবেল পুরস্কারটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নোবেল ফাউন্ডেশন দ্বারা পরিচালিত হয় । ১৯০১ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রবর্তিত হওয়া আন্তর্জাতিক এ পুরস্কারটি প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সুইডিশ একাডেমি, স্টকহোম, সুইডেন (Swedish Academy, Stockholm, Sweden) প্রদান করে থাকে । একমাত্র শান্তিতে নোবেল পুরস্কার নরওয়েজিয়ান জাতীয় সংসদ (Stortinget) দ্বারা নির্বাচিত একটি কমিটির মাধ্যমে নরওয়ের রাজধানী অসলো (Oslo) থেকে প্রদান করা হয় ৷ নোবেল Laureate গণ প্রত্যেকে একটি স্বর্নপদক, সনদ ও নোবেল ফাউন্ডেশন কর্তৃক কিছু পরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকেন ৷ অত্যন্ত গৌরবজনক এ পুরস্কারের আর্থিকমূল্য ১১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার বা প্রায় এক মিলিয়ন মার্কিন ডলার । নোবেল পুরস্কার বিজয়ীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এবং শৃঙ্খলার প্রতিনিধিত্ব করে । কিন্তু তারা সকলেই মানবজাতির কল্যাণে তাদের অসাধারণ অবদানের জন্য একত্রিত । তাদের কাজগুলো আমাদের চারপাশের বিশ্ব সম্পর্কে বোঝার উপর এবং সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধান করার ক্ষমতার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে ।

দীর্ঘদিন যাবৎ বিজ্ঞানীরা ন্যানো জগৎ নিয়ে কাজ করছেন । ন্যানো জগতের উদ্ভট ঘটনাগুলো বোঝার ক্ষেত্রে তাদের বিশাল ভূমিকা রয়েছে । এতে করে তাদের সৃষ্টিশীল উদ্ভাবনের সুফল পাচ্ছেন এ গ্রহের কোটি কোটি মানুষ । মৌলিক ন্যানোপ্রযুক্তি (Fundamental nanotechnology) উদ্ভাবনের জন্য ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে রসায়নে তিনজন গবেষক: মুঙ্গি জি. বাওয়েন্ডি (Moungi G. Bawendi), লুইস ই. ব্রুস (Louis E. Brus) এবং আলেক্সি আই. একিমভ (Alexei I. Ekimov) নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন । তারা ন্যানো প্রযুক্তির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বীজ রোপণ করেছেন রসায়নে । তারা কলয়েডাল অর্ধপরিবাহী ন্যানোস্ফটিকের {Colloidal semi-conductor nanocrystals (CS-NCs) or Quantum dots} কোয়ান্টাম আচরণ ব্যবহার করেছেন । কল্পনা করুন, একটি ন্যানোস্ফটিক এতোটাই ক্ষুদ্র যে এটি একটি পরমাণুর মতো আচরণ করে । গবেষকরা কোয়ান্টাম (খুদ্রাংশিক) বিন্দু (Quantum dot) নামে পরিচিত এ ধরনের মিনিট বিস্ময়কর বস্তুর (Minute marvel) একটি বিভাগ আবিষ্কার এবং তাদের সংশ্লেষণের একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি বিকাশ করেছেন । মানুষের তৈরি ন্যানোকণা (Nanoparticle) এতোই ছোট যে তাদের আকর্ষণীয় এবং অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যগুলো কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান (Quantum mechanics) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় । এ বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে আলোর নির্গমন: তারা নির্গত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য শুধুমাত্র কণার আকারের উপর নির্ভর করে । বড় কণার ইলেকট্রনের শক্তি কম এবং লাল আলো নির্গত করে । যেখানে ছোট কণার ইলেকট্রনের শক্তি বেশি থাকে এবং নীল আলো নির্গত করে । গবেষকগণ সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারেন যে, কোয়ান্টাম বিন্দুগুলো থেকে আলোর কোন রঙ বের হবে কেবল তাদের আকার নিয়ন্ত্রণ করে । এটি অন্যান্য ধরণের প্রতিপ্রভ অণু (Fluorescent molecule) ব্যবহারের উপর একটি বিশাল সুবিধা প্রদান করে, যার জন্য প্রতিটি স্বতন্ত্র রঙের জন্য একটি নতুন ধরণের অণু প্রয়োজন । নিয়ন্ত্রণযোগ্যতার এ সুবিধাটি কোয়ান্টাম বিন্দুর রঙের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় । ন্যানো কণাগুলোর আকার সামঞ্জস্য করে গবেষকরা বৈদ্যুতিক, অপটিক্যাল এবং চৌম্বকীয় প্রভাবগুলোর পাশাপাশি তাদের গলনাঙ্কের মতো ভৌত বৈশিষ্ট্যগুলো বা কিভাবে তারা রাসায়নিক বিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে সেটিও সামঞ্জস্য করতে পারেন । বর্তমানে কোয়ান্টাম বিন্দু পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে । এ কণার আকৃতি পরিবর্তন করে রঙ বদলে দেয়া যায় । বিশেষ করে কোয়ান্টাম বিন্দু ইলেকট্রনিক্স (Electronics) এবং বায়োমেডিকেল ইমেজিং ও আলোতে (Biomedical imaging and lighting) যেমন: ঔষধ সরবরাহ (Drug delivery), ইমেজিং (Imaging), চিকিৎসা নির্ণয় (Medical diagnoses) ইত্যাদিতে গুরুত্বপূর্ণভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে । এছাড়া ন্যানো কণাগুলো এলইডি প্রদর্শন (LED display), জৈব রসায়ন (Biochemistry), চিকিৎসাবিদ্যায় ইমেজিং এবং মানবদেহে আব কোষ পর্যবেক্ষণ (Observation of tumor tissue in human body) ইত্যাদি ব্যবহারসহ ভবিষ্যতে এটির আরো আশাব্যঞ্জক বা প্রতিশ্রুতিশীল আবেদন রয়েছে । গবেষকরা এখনো কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও যোগাযোগ (Quantum computing and communications), নমনীয় ইলেকট্রনিক্স (Flexible electronics), সেন্সর (Sensor), দক্ষ সৌর কোষ (Efficient solar cell) এবং সৌর জ্বালানির জন্য অনুঘটক (Catalysis for solar fuel) হিসেবে ন্যানোকণাগুলোর অতিরিক্ত আবেদনগুলো অন্বেষণ করছেন । তাদের অর্জনগুলো ন্যানোপ্রযুক্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করে । কোয়ান্টাম বিন্দুকে কখনো কখনো কৃত্রিম পরমাণু বলা হয় । সিলিকন এবং অন্যান্য অর্ধপরিবাহী পদার্থ দিয়ে তৈরি সুনির্দিষ্ট ন্যানোস্ফটিক যা মাত্র কয়েক ন্যানোমিটার চওড়া । যদিও তারা আকারে একশ থেকে কয়েক হাজার পরমাণু হলেও স্বতন্ত্র বা পৃথক পরমাণুর মতো কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্যগুলো প্রদর্শন করার জন্য যথেষ্ট ছোট । যেহেতু ইলেকট্রনগুলো তাদের মধ্যে নির্দিষ্ট শক্তি স্তরে আটকে থাকতে পারে, তাই ন্যানোস্ফটিকগুলো শুধুমাত্র নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো নির্গত করতে পারে । কণার আকার নিয়ন্ত্রণ করে, উদ্দীপিত হলে কোয়ান্টাম বিন্দুগুলো কি রঙে প্রদীপ্ত হবে বা আকস্মিক ঝাপটা (Flash) দিবে তা গবেষকরা সঠিকভাবে কার্যক্রম করতে পারেন । রসায়নে নোবেল কমিটির সদস্য এবং ন্যানোপদার্থবিদ্যার (Nanophysics) অধ্যাপক হেইনার লিংক (Heiner Linke) ব্যাখ্যা করেন: কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান ভবিষ্যদ্বাণী করে যে, আপনি যদি একটি ইলেকট্রন গ্রহণ করেন এবং এটিকে একটি ছোট জায়গায় চেপে ধরেন তবে ইলেকট্রনের তরঙ্গের নির্দিষ্ট কর্ম (Function) সংকুচিত হয়ে যায় । আপনি স্থান যতো ছোট করবেন, ইলেক্ট্রনের শক্তি ততো বেশি হবে । যার অর্থ এটি একটি মৌলকণা ফোটনকে আরো শক্তি দিতে পারে । সারমর্মে, একটি কোয়ান্টাম বিন্দুর আকার নির্ধারণ করে যে এটি কোন রঙে জ্বলছে । ক্ষুদ্রতম কণাগুলো নীল চকচক করে, যখন বড়গুলো হলুদ এবং লাল চকচক করে । এ পর্যন্ত গবেষকরা কণাগুলোর আকার এবং গুণমানকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সংগ্রাম করে গেছেন । বিজ্ঞানীদের নানা আবিষ্কার কোয়ান্টাম বিন্দুকে বিভিন্ন ধরনের আবেদনে ব্যাপকভাবে উপযোগী করে তুলেছে । যাক সে কথা, আমেরিকান-তিউনিসিয়ান-ফরাসি রসায়নবিদ মুঙ্গি গ্যাব্রিয়েল বাওয়েন্দি ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন । বর্তমানে Massachusetts Institute of Technology (MIT), Cambridge, MA, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Lester Wolfe এর অধ্যাপক । পিএইচডি করেন ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, আইএল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে । মুঙ্গি গ্যাব্রিয়েল বাওয়েন্দি উচ্চ-মানের কোয়ান্টাম বিন্দুর রাসায়নিক উৎপাদনে বিপ্লব ঘটিয়েছেন, যার ফলে প্রায় নিখুঁত কণা হয় । লুইস ইউজিন ব্রুস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Columbia University, New York, NY রসায়ন বিভাগের S. L. Mitchell অধ্যাপক । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Columbia University, New York, NY থেকে ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে পিএইচডি করেন । তিনি কোয়ান্টাম বিন্দু নামে পরিচিত কলয়েডাল অর্ধপরিবাহী ন্যানোস্ফটিকগুলোর সহ-আবিষ্কারক । তিনিই বিশ্বের প্রথম বিজ্ঞানী যিনি তরলে অবাধে ভাসমান কণার আকার-নির্ভর কোয়ান্টাম প্রভাব প্রমাণ করেছেন । লুইস ব্রুস ১০ আগস্ট ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে ক্লিভল্যান্ড, ওহাইও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেন । অ্যালেক্সি ইভানোভিচ একিমভ Ioffe Physical-Technical Institute, Saint Petersburg, Russia থেকে ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে পিএইচডি করেন । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Nanocrystals Technology Inc., New York, NY এর প্রাক্তন প্রধান বিজ্ঞানী । রাশিয়ার Leningrad State University এর পদার্থবিদ্যা অনুষদ থেকে স্নাতক করেন ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে । তিনি ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ায় (সাবেক USSR) জন্মগ্রহণ করেন । Vavilov State Optical Institute এ কাজ করার সময় কোয়ান্টাম বিন্দু নামে পরিচিত কলয়েডাল অর্ধপরিবাহী ন্যানোস্ফটিক আবিষ্কার করেন । আলেক্সি একিমভ রঙিন কাঁচে আকার-নির্ভর কোয়ান্টাম প্রভাব তৈরি করতে সফল হন । রঙটি তামা ক্লোরাইডের ন্যানো কণা থেকে এসেছে এবং দেখিয়েছেন যে কণার আকার কোয়ান্টাম প্রভাবের মাধ্যমে কাচের রঙকে প্রভাবিত করে ।

এদিকে নরওয়েজিয়ান লেখক এবং নাট্যকার জন ওলাভ ফস (Jon Olav Fosse) তার উদ্ভাবনী নাটক এবং গদ্যের জন্য ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, যা অব্যক্তকে কণ্ঠ দিয়েছে । নরওয়েজিয়ান নাইনর্স্ক (Nynorsk) ভাষায় রচিত এবং বিভিন্ন ধারায় বা শৈলীতে বিস্তৃত তার বিশাল রচনার মধ্যে রয়েছে প্রচুর নাটক, উপন্যাস, কবিতার সংকলন, প্রবন্ধ, শিশুদের বই এবং অনুবাদের ভাণ্ডার । তার প্রথম গদ্য বা উপন্যাস Raudt, Svart (Red, Black), প্রথম নাটক Og aldri skal vi skiljast (And We’ll Never Be Parted) এবং প্রথম কবিতা Engel med vatn i augene । তার সৃষ্টিকর্মগুলো চল্লিশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে । তিনি সঙ্গীত তথাপি বাঁশি বাজাতেন । যদিও তিনি আজ বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় নাট্যকারদের একজন, তিনি তার গদ্যের জন্যও ক্রমশ স্বীকৃত হচ্ছেন । জন ওলাভ ফস ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে নরওয়ের হাউজসুন্ডে (Haugesund) জন্মগ্রহণ করেন এবং স্ট্র্যান্ডেবার্মে (Strandebarm) বেড়ে উঠেন । তার ব্যাপক সাংস্কৃতিক আগ্রহ ছিল । প্রারম্ভিক যৌবনে তিনি লেখনী দ্বারা নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন । তার গ্রন্থাগার বিভিন্ন ভাষায় সাহিত্যের একটি সমৃদ্ধ এবং বিস্তৃত নির্বাচন নিয়ে গঠিত । জীবনের শেষ বছরগুলোতে তিনি একজন লেখক হিসেবে তার হাতের চেষ্টা করেছেন এবং কল্পকাহিনী লিখতে শুরু করেন । আধুনিক নাটকের জনক, নরওয়ের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ লেখক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাট্যকার হেনরিক ইবসেনের (Henrik Ibsen) পর তিনিই সবচেয়ে বেশি নাট্যকর্ম সম্পাদিত করা নরওয়েজিয়ান নাট্যকার ।

এছাড়া বর্তমানে ইরানে কারাবন্দি মানবাধিকার কর্মী, সমাজ সংস্কারক, পেশাদার প্রকৌশলী এবং বিজ্ঞানী নারগেস মোহাম্মদীকে ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার (Nobel Peace Prize) প্রদান করা হয় । ইরানে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে এবং সকলের জন্য মানবাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য আপোষহীন সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে সম্মানজনক এ পুরস্কারে ভূষিত করা হয় । তিনি ২১ এপ্রিল ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে ইরানের জাঞ্জান (Zanjan) প্রদেশের কেন্দ্রীয় জেলার একটি শহরে জন্মগ্রহণ করেন । তিনি সহকর্মী নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী শিরিন এবাদির নেতৃত্বে অলাভজনক সংস্থা Defenders of Human Rights Center (DHRC) এর উপ-প্রধান । নারগেস মোহাম্মদী দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার নিয়ে লড়াই করে চলেছেন । মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষায় সাহসী লড়াইয়ের ফলে ইরানের এ নারীকে ব্যক্তিগতভাবে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে । ইরানের কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন অভিযোগে বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যান এবং এখনো কারাবন্দি আছেন । তেহরানে একটি মানবাধিকার আন্দোলন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করার জন্য ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে তাকে ১৬ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়, যেটি নারীর অধিকার এবং মৃত্যুদণ্ড বাতিলের জন্য প্রচারণা চালায় । সব মিলিয়ে তাকে প্রায় ৩১ বছরের কারাদণ্ড এবং ১৫৪টি বেত্রাঘাতের শাস্তি দেয়া হয় ।

তথ্যসূত্র: https://www.quantamagazine.org/ (Staff Writer: Yasemin Saplakoglu), Wikipedia, https://www.nobelprize.org/ ।


Wednesday, 4 October 2023

নোবেল পুরস্কার ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ

গত ০২ অক্টোবর ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের তালিকা এবং সময়সূচী প্রকাশিত হয়েছে । তালিকানুযায়ী আগামী ০৯ অক্টোবর পর্যন্ত নোবেল পুরষ্কারের অঘোষিত অন্যান্য বিভাগের বাকী বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে ৷ সমস্ত ঘোষণা https://www.nobelprize.org/ থেকে সরাসরি প্রকাশ করছে । এ বছর পুরস্কার প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ঘোষণা অনুযায়ী- ফিজিওলজি বা মেডিসিন: সোমবার, ০২ অক্টোবর, 11:30 CEST (মধ্য ইউরোপীয় গ্রীষ্মকালীন সময়), স্থান Karolinska Institutet, Solna, বিজয়ী: Katalin Karikó এবং Drew Weissman । পদার্থবিদ্যা: মঙ্গলবার, ০৩ অক্টোবর, 11:45 CEST, স্থান Royal Swedish Academy of Sciences, Stockholm, বিজয়ী: Pierre Agostini, Ferenc Krausz এবং Anne L’Huillier । The Royal Swedish Academy of Sciences, Stockholm দ্বারা রসায়ন: বুধবার, ০৪ অক্টোবর, 11:45 CEST, স্থান Royal Swedish Academy of Sciences, Stockholm । The Swedish Academy (Svenska Akademien), Börssalen, Källargränd দ্বারা সাহিত্য: বৃহস্পতিবার, ০৫ অক্টোবর, 13:00 CEST, স্থান The Swedish Academy, Stockholm । The Norwegian Nobel Committee, The Norwegian Nobel Institute (Norska Nobelinstitutet) দ্বারা শান্তি: শুক্রবার, ০৬ অক্টোবর, 11:00 CEST, স্থান Norwegian Nobel Institute, Oslo । The Royal Swedish Academy of Sciences দ্বারা আলফ্রেড নোবেলের স্মৃতিতে অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে The Sveriges Riksbank Prize পুরস্কার: সোমবার, ০৯ অক্টোবর, 11:45 CEST, স্থান Royal Swedish Academy of Sciences, Stockholm । নোবেল পুরস্কার (The Nobel Prize) হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার যেটি পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, চিকিৎসা, সাহিত্য, শান্তি এবং অর্থনীতিতে অসামান্য সাফল্যের জন্য ব্যক্তি ও সংস্থাকে সম্মানিত করে থাকে । সুইডিশ শিল্পপতি এবং উদ্ভাবক আলফ্রেড নোবেলের (Alfred Nobel) ইচ্ছার ভিত্তিতে নোবেল ফাউন্ডেশন বার্ষিক পুরস্কারগুলো প্রদান করে । নোবেল পুরস্কার বিজয়ীরা বিভিন্ন ক্ষেত্র এবং শৃঙ্খলার প্রতিনিধিত্ব করে কিন্তু তারা সকলেই মানবজাতির জন্য তাদের অসাধারণ অবদানের জন্য একত্রিত । তাদের কাজ আমাদের চারপাশের বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের বোঝার উপর এবং আমাদের সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধান করার ক্ষমতার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে । গত ০২ অক্টোবর ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে এমআরএনএ mRNA Vaccine নিয়ে অগ্রগামী কাজের জন্য ক্যাটালিন কারিকো (Katalin Karikó) এবং ড্রু ওয়েইসম্যানকে (Drew Weissman) ফিজিওলজি বা মেডিসিনে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়, যা কোভিড-১৯ (COVID-19) এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে । তাদের এ আবিষ্কার আমাদের সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা পদ্ধতিতে বিপ্লব ঘটাতে পারে । ২০২০ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে শুরু হওয়া মহামারী চলাকালীন সময়ে কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে কার্যকর mRNA Vaccine তৈরির জন্য এ দুইজন নোবেল বিজয়ীর আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ ছিল । তাদের যুগান্তকারী অনুসন্ধানের মাধ্যমে যেগুলো আমাদের রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থাপনার (Immune system) সাথে mRNA কিভাবে মিথস্ক্রিয়া করে সে সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করেছে । বিজয়ীরা আধুনিক সময়ে মানব স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকির মধ্যে টিকা এর বিকাশে অভূতপূর্ব হারে অবদান রেখেছেন । এছাড়া পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরষ্কার ২০২৩ বিজয়ীরা হচ্ছেন Pierre Agostini, Ferenc Krausz এবং Anne L'Huillier । তারা পরীক্ষামূলক পদ্ধতির জন্য যা পদার্থের ইলেক্ট্রন গতিবিদ্যা অধ্যয়নের জন্য আলোর অ্যাটোসেকেন্ড স্পন্দন তৈরি করেন (Attosecond pulses of light) । পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ীরা তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য স্বীকৃত হয়েছেন, পরমাণু এবং অণুর ভিতরে ইলেকট্রনের জগৎ অন্বেষণের জন্য যা মনুষ্যজাতিকে নতুন সরঞ্জাম বা হাতিয়ার দিয়েছে । পিয়েরে অ্যাগোস্টিনি, ফেরেঙ্ক ক্রাউস এবং অ্যান ল'হুইলিয়ার আলোর অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত স্পন্দন তৈরি করার একটি উপায় প্রদর্শন করেছেন যা দ্রুত প্রক্রিয়াগুলো পরিমাপ করতে ব্যবহার করা যেতে পারে যেখানে ইলেক্ট্রনগুলো চলে যায় বা শক্তি পরিবর্তন করে । দ্রুত গতিশীল ঘটনা একে অপরের মধ্যে প্রবাহিত হয় যখন মানুষের দ্বারা অনুভূত হয়, ঠিক একটি চলচ্চিত্রের মতো যা স্থির চিত্রগুলোকে ক্রমাগত আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করা হয় । আমরা যদি সত্যিই সংক্ষিপ্ত ঘটনা তদন্ত করতে চাই, আমাদের বিশেষ প্রযুক্তি প্রয়োজন । ইলেকট্রনের জগতে একটি অ্যাটোসেকেন্ডের কয়েক দশমাংশে পরিবর্তন ঘটে, একটি অ্যাটোসেকেন্ড এতোই ছোট যে মহাবিশ্বের জন্মের সময়ে যতো সেকেন্ড হয়েছে তার প্রতি সেকেন্ডের লক্ষ লক্ষ কোটি ভাগের এক ভাগ । নোবেল বিজয়ীদের পরীক্ষাগুলো এতোই সংক্ষিপ্ত আলোর স্পন্দন তৈরি করেছে যে সেগুলো অ্যাটোসেকেন্ডে পরিমাপ করা হয় । এভাবে প্রমাণ করে যে, এ স্পন্দনগুলো পরমাণু এবং অণুর ভিতরে প্রক্রিয়াগুলোর চিত্র সরবরাহ করতে ব্যবহার করা যেতে পারে ।

তথ্যসূত্র: https://currentaffairs.adda247.com/ 

নিচের লিঙ্কে নিবন্ধ:

https://www.quantamagazine.org/covid-19-mrna-vaccines-win-nobel-prize-for-medicine-2023-20231002/   

https://www.quantamagazine.org/physicists-who-explored-tiny-glimpses-of-time-win-nobel-prize-20231003/?fbclid=IwAR3ObJjK12tlM3513upxXcdhwDr3zSZ2BYL9YRa_IPn4wUpcD4pdSv9iGdM 

 https://www.nobelprize.org/  

Tuesday, 26 September 2023

জ্যৈষ্ঠের তাপদাহ

প্রায় দুপুর ।

রৌদ্রের দুর্দান্ত প্রতাপ ।

উষ্ণতার কাছে অনিবার্য বশ্যতা স্বীকার । 

জ্যৈষ্ঠের তাপদাহে তৃষ্ণার্ত হৃদয় ।

মাঝে মধ্যে বিরক্তিকর বিদ্যুৎ বিভ্রাট ।

যেনো মরার উপর খাঁড়ার ঘা ।

সাময়িকভাবে বিপর্যস্ত জনজীবন ।

তবুও, যে যার মতোই কর্মব্যস্ত ।

লবণাক্ত ঘাম ঝরে শরীরের সূক্ষ্ম রোম কূপ থেকে ।

কেউ তৃপ্ত হয় লেবু শরবত, ডাব, তরমুজ, লিচু, পেঁপে, আম, আনারস, কমলা ও তালের শ্বাঁসে ।

অথবা ঠাণ্ডা কোমল পানীয় বা হিমায়িত আইসক্রিমে ।

আবার কেউ পরিতুষ্ট হয় নলকূপ, দিঘি, নদী, খাল, বিল, হাওর, জলাধার, স্নান কক্ষ ও সাঁতার-পুকুরে ।

কিংবা বৈদ্যুতিক পাখা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং উন্মুক্ত আকাশের নিচে ।

কারো সম্বল তালপাতার হাতপাখা ৷

কেউবা স্বাদ মেটায় আমলকি, রোয়াইল, আমড়া, কামরাঙ্গা, জাম্বুরা, করমচা, চালতা, কৎ বেল, জামরুল, জলপাই, বিলাতী বেগুন, বরই ও কাঁচা আম ভর্তায় ।

যদিও কমতি নেই তাপদাহের চোখ রাঙানি ।

বৃষ্টি প্রত্যাশিত চাতক পাখির আকাশ পানে দৃষ্টিপাত ।

অবিরাম ডুব-সাঁতারে ব্যস্ত বুনো রাজহাঁস দম্পতি ।

সূর্যের প্রখর তাপে গলায়মান পিচ ঢালা পথে মানব পদচিহ্ন ।

গাড়ী চালক গন্তব্যের সময়টুকুকে মুষ্টিবদ্ধ করে ছুটে যায় তীব্র গতিতে ।

দূরবর্তী তপ্ত পথে দৃশ্যমান ঝাপসা-ধোঁয়াশা ।

বেওয়ারিশ কুকুরটির ঘন ঘন শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে বের হওয়া অর্ধ-জিহ্বা থেকে লালা নির্গত হয় । 

হঠাৎ সাইরেন বাজিয়ে ধেয়ে আসা অ্যাম্বুলেন্স দেখে আঁতকে উঠে প্লীহা ।

অস্বস্তিকর উষ্ণতায় অপেক্ষমাণ ক্লান্ত পথিকের বাড়ি ফেরার তাড়া ।

মনে হয়, নিষ্প্রাণ দেহে সটান দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি সবুজ গাছগুলো ।

আচমকা দক্ষিণা দমকা হাওয়া ।

পরিতৃপ্ত করে মন এবং সতেজতায় প্রাণ ফিরে পায় প্রকৃতি ।

এ এক পরম প্রশান্তি । 


Friday, 15 September 2023

এসরাত জাহান 'ARCASIA Thesis of the Year 2023' এ ব্রোঞ্জ পুরস্কার অর্জন করেছেন



এসরাত জাহান মর্যাদাকর “ARCASIA Thesis of the Year 2023” এ ব্রোঞ্জ পুরস্কার অর্জন করায় তাকে আন্তরিক অভিনন্দন! এসরাত জাহান (ESRAT JAHAN, B.Arch in BUET) World University of Bangladesh এর স্থাপত্য বিভাগের প্রভাষক যিনি ফিলিপাইনের বোরাকে দ্বীপে (Boracay Island) ২০তম “Asian Congress of Architects (ACA)” এর আসরে নির্বাচিত হয়েছেন । তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েট (Bangladesh University of Engineering and Technology বা BUET) এবং Institute of Architects Bangladesh (IAB) এর প্রতিনিধিত্ব করেন । আন্তর্জাতিক “Asian Congress of Architects (ACA)” এর আসরে পুরস্কারপ্রাপ্ত হিসেবে এটি তার ব্যতিক্রমী স্নাতক শেষ বছরের Thesis বা গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকল্পের একটি ইচ্ছাপত্র বা প্রমাণ (Testament) । এতে করে তার জ্ঞানের ভাণ্ডার, অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত অভিজ্ঞতাকে ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ করবে । তার এ সাফল্যের যাত্রা উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্থপতিদের জন্য একটি অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ সৃষ্টির পাশাপাশি তাদেরকে সৃজনশীলতা ও শ্রেষ্ঠত্বের সীমানা ঠেলে দিতে অনুপ্রাণিত করবে । এছাড়া তিনি পরবর্তী প্রজন্মের স্থপতিদের লালন-পালন, দক্ষতা বৃদ্ধি, স্থাপত্য ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা এবং বৈশ্বিক মঞ্চে তার কর্মস্থল তথাপি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর খ্যাতি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন । ZONE A অঞ্চলে বাংলাদেশের গবেষণামূলক নির্বাচিত প্রবন্ধ: THESIS OF THE YEAR FINALIST NO. 2 of 4, ”Echos of Replenishment- Breathing New Life into the Padma Bridge Construction”, IAB (Institute of Architects Bangladesh) এবং THESIS OF THE YEAR FINALIST NO. 4 of 4, ”Transfiguring Social Architecture through Computational Carpentry”, IAB (Institute of Architects Bangladesh) । এসরাত জাহানের থিসিস প্রকল্প “কম্পিউটেশনাল ছুতার কাজের মাধ্যমে সামাজিক স্থাপত্যকে স্থানান্তর করা” ARCASIA Thesis of the Year 2023 ফাইনাল রাউন্ডের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল । এটি শীর্ষ ০৪ ফাইনালিস্টে জায়গা করে নেয় । এসরাত জাহান নিশি (ESRAT JAHAN NISHI) বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মিরপুরে বসবাস করেন । ঢাকায় অবস্থিত Bangladesh Navy School & College এবং Adamjee Cantonment College এ পড়াশোনা করেছেন । পরবর্তীতে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্থাপত্যে স্নাতকোত্তর করেন । উল্লেখ্য যে: আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন Architects Regional Council Asia (ARCASIA) পরিষদ এশিয়ার National Institutes of Architects এর সভাপতিদের নিয়ে গঠিত । সংস্থাটি নিজেই প্রতিটি সদস্য প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক কার্যক্রম এবং সম্পর্কের সম্প্রসারণ হিসেবে কাজ করে । এশীয় অঞ্চলে স্থাপত্য পেশাকে প্রভাবিত করে এমন বিষয়গুলোর উপর আলোচনা, সম্মিলিত দিকনির্দেশনা এবং প্রতিনিধিত্ব করার জন্য বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হয় । ARCASIA এর ২০তম Asian Congress of Architects (ACA20) কর্তৃক United Architects of the Philippines (UAP) এর আয়োজনে এ বছর ফিলিপাইনের বোরাকে দ্বীপে ১৭-২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা (Event) বা অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে । যদিও গত ১৮ই সেপ্টেম্বর পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান হয় । এটি জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচী (United Nations Development Programme বা UNDP) দ্বারা প্রবর্তিত রূপান্তরমূলক পরিবর্তনের জন্য এশীয় প্রতিক্রিয়াকে কেন্দ্রীভূত করবে, যার লক্ষ্য ”একটি নতুন সংস্কৃতি গড়ে তোলা: যেটি জটিলতাকে আলিঙ্গন করে, সক্রিয়ভাবে ঝুঁকি পরিচালনা করে, ক্রমাগতভাবে মানিয়ে নেয় এবং ফলাফল প্রদানের পাশাপাশি শেখার চেষ্টা করে” কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যে । কংগ্রেসের মূলভাব বা রচনার বিষয়বস্তু (Theme) হচ্ছে: একটি ভবিষ্যত-প্রস্তুত পরিবেশ বুনন (Weaving a Future-Ready Environment) । উপ-থিমগুলোর মধ্যে: স্মার্ট ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তি, সম্প্রদায় ও সামাজিক স্থিতিস্থাপকতা, স্থাপত্য শিক্ষা ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, স্থিতিস্থাপক ও অভিযোজিত পরিবেশ এবং স্থায়িত্ব ও আমাদের ভবিষ্যত । Thesis of the Year (TOY ARCASIA) এর উদ্দেশ্য হচ্ছে যে, এর সদস্য দেশগুলোতে স্থাপত্য স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি ক্ষেত্র তৈরি করা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্নাতক ছাত্রদের উচ্চতর শিক্ষা ও তাদের নতুন ধারণাগুলোকে ARCASIA দ্বারা আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে প্রদর্শন করার মাধ্যমে এশিয়ায় স্থাপত্য শিক্ষাকে উন্নত করা । TOY ARCASIA প্রতিটি সদস্য দেশের চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থীদের থেকে Thesis বা গবেষণামূলক প্রবন্ধে নতুন ধারণার জন্য নিবেদিত এবং স্থাপত্য শিক্ষার জ্ঞান বিনিময়ের পথ খুলে দেয় । এখানে অংশগ্রহণকারীর কাজ বা গবেষণামূলক প্রবন্ধটি ARCASIA সদস্য প্রতিষ্ঠান দ্বারা জমা দিতে হয় । প্রতিটি ইনস্টিটিউটকে অবশ্যই জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ীদের নির্বাচন করার জন্য একটি পদ্ধতি সংস্থাপন বা প্রতিষ্ঠিত (Set up) করতে হয় এবং চূড়ান্ত বিচারের জন্য ০৩ জন জাতীয় বিজয়ীর নাম বা গবেষণামূলক প্রবন্ধটি TOY ARCASIA বিচার কমিটিতে জমা দিতে হয় । গবেষণামূলক প্রবন্ধটি অবশ্যই একটি স্নাতক পেশাদার ডিগ্রি প্রোগ্রামে পঞ্চম বা চূড়ান্ত বছরের শিক্ষার্থীর একটি সম্পূর্ণ গবেষণামূলক প্রবন্ধ হতে হবে । শিক্ষার্থীরা তাদের কাজ বা গবেষণামূলক প্রবন্ধটি সরাসরি TOY ARCASIA বিচার কমিটিতে জমা দিতে পারবে না । নানা দেশের বিভিন্ন স্থানের সকল জাতীয় প্রতিষ্ঠান থেকে পাঠানো নির্বাচিত গবেষণামূলক প্রবন্ধ বা আবেদনগুলো TOY ARCASIA এর বিচারকগণ বিস্তৃত মূল্যায়ন (নির্দেশিকা অনুসারে) বা বিচার করেন । জুরি প্যানেলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ও সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের জন্য তা বাধ্যতামূলক এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আপিল করা যায় না । বিচারকদের মন্তব্য বা রেকর্ড বা রায়ের উপর কোনো অনুরোধ বা অধিগম্যতার অধিকার অংশগ্রহণকারীদের নেই । স্থাপত্যের জন্য ARCASIA পুরস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাকর ৷ ARCASIA Thesis of the Year 2023 এর জন্য পুরষ্কার কমিটি থেকে ARCASIA Award Jury Board এর রায় অনুযায়ী বিভিন্ন বিভাগে যেমন: আবাসিক প্রকল্প, জনসাধারণের সুবিধা ভবন, শিল্প ভবন, সংরক্ষণ প্রকল্প, সমন্বিত উন্নয়ন এবং বিশেষ পুরস্কার বিভাগে স্থাপত্যের জন্য ARCASIA Award দেয়া হয় । সমস্ত বিচারকের দ্বারা সর্বোচ্চ যোগ্যতা অর্জনকারীকে একটি স্বর্ণপদক, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ যোগ্যতা অর্জনকারীকে একটি রৌপ্য এবং তৃতীয় সর্বোচ্চ যোগ্যতা অর্জনকারীকে একটি ব্রোঞ্জ পুরস্কার প্রদান করা হয় । যাক সে কথা, সাধারণভাবে এশিয়া জুড়ে বিশেষ করে ARCASIA এর সদস্য দেশগুলোতে পরিবেশের মান বাড়ানোর প্রচেষ্টায় এশিয়ায় কর্মরত স্থপতিদের দ্বারা তৈরি করা অনুকরণীয় কাজগুলোকে উৎসাহিত করতে এবং স্বীকৃতি দেয়ার উদ্দেশে ARCASIA স্থাপত্যের জন্য ARCASIA AWARDS FOR ARCHITECTURE (AAA) প্রতিষ্ঠা করেছে । ARCASIA পরিষদ কর্তৃক মনোনীত জুরি সদস্যদের একটি স্বাধীন প্যানেল, এশিয়ার নেতৃস্থানীয় স্থপতি ও অ-স্থপতির সমন্বয়ে গঠিত এবং এটি বিজয়ীদের মূল্যায়ন ও নির্ধারণ করে এবং পরিষদ পুরস্কার ঘোষণা করে । AAA এর উদ্দেশ্য হচ্ছে অনুকরণীয় স্থাপত্যের কাজকে স্বীকৃতি দেয়া ও এটি করার মাধ্যমে এশীয় চেতনা উদযাপন করা এবং এশিয়ার নির্মিত স্থাপত্যশিল্প ও পরিবেশের উন্নয়নকে উৎসাহিত করা । পাশাপাশি এশীয় দেশগুলোর আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে স্থপতিদের ভূমিকা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা । ARCASIA Award এর লক্ষ্য হচ্ছে, ভালো স্থাপত্য মানব-পরিবেশের উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং এশিয়ার সফল ভৌত বিকাশের জন্য এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, জাতীয় পরিচয় ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে অসঙ্গতি বা অনৈক্যের প্রয়োজন নেই ।

Wednesday, 9 August 2023

RoboSub 2023 প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিতীয়


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরের পাশে অবস্থিত সান দিয়েগো শহরতলিতে Naval Information Warfare Center (NIWC) Pacific এর Transducer Evaluation Center (TRANSDEC) এ পাঁচটি দেশ যথা: কানাডা, ভারত, সিঙ্গাপুর, বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী ৩৫টি দল ২৬ তম আন্তর্জাতিক RoboSub 2023 (July 31 – August 06) প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে । দলগুলো থেকে উচ্চ বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক, স্নাতক কর্মসূচী এবং অলাভজনক সংস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিযোগীরা অংশ নেন । নৌ গবেষণা কার্যালয় এবং NIWC প্যাসিফিকের তত্ত্বাবধানে একটি অলাভজনক সংস্থা RoboNation এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে । প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো TRANDEC কেন্দ্রে পৌঁছানোর আগে প্রাক-ইভেন্ট প্রযুক্তিগত নকশা ও দলিল রচনা ইত্যাদি জমা দেয় । প্রতিযোগিতা চলাকালীন স্বেচ্ছাসেবক বিচারকরা পানির নিচে স্বায়ত্তশাসন সংপ্রশ্ন কাজ, দল উপস্থাপনা এবং পদ্ধতিসহ দলের সম্পাদিত কার্যের মূল্যায়ন করেন । বিচারকরা নকশা, কারুশিল্প, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং চাক্ষুষ প্রভাবের জন্য যানবাহন পরিদর্শন করেন । নৌ গবেষণা কার্যালয় এবং NIWC প্যাসিফিক কেন্দ্রটি গবেষণা, বিকাশ ও সমন্বিত ক্ষমতাকে বহর বা নৌবহর বা নৌশক্তিতে সরবরাহ করে এবং নিয়মিতভাবে STEM Outreach কর্মসূচীগুলোতে অবদান রাখে যা ভবিষ্যতের জন্য প্রতিভা ও অংশীদারিত্ব বিকাশে সহায়তা করে । RoboSub একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা । যেটি সারা বিশ্বজুড়ে ছাত্র ও অংশগ্রহণকারীদেরকে পানির নিচের সামুদ্রিক শিল্পের মুখোমুখি হওয়া সংপ্রশ্ন বা চ্যালেঞ্জগুলোর সরলীকৃত সংস্করণগুলো মোকাবেলা করার পাশাপাশি রোবোটিক ডুবো জাহাজ (Robotic submarine) তৈরি করা সম্পর্কে ধারণা দেয়াসহ নানা বিষয়ের উপর আমন্ত্রণ জানায় । এ চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে মহাসাগরীয় অনুসন্ধান, সমুদ্রতলের মানচিত্র তৈরি, পানির নিচে বস্তুর শনাক্ত ও প্রভাবিত করা, পাইপলাইন সনাক্তকরণ, Tracking এবং Sonar স্থানীয়করণ ইত্যাদি । প্রতিযোগিতায় পরীক্ষামূলক স্বায়ত্তশাসিত ডুবো যানবাহন (Autonomous Underwater Vehicle বা AUV) ব্যবহার করে দলগুলো বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ এবং জটিল কাজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে থাকে । প্রকৌশল চ্যালেঞ্জগুলো সমাধানের জন্য স্বায়ত্তশাসিত ডুবো যানবাহনের নকশা এবং প্রয়োগের উপর কেন্দ্রবিন্দু নির্ভর করে । RoboSub প্রতিযোগিতার মৌলিক লক্ষ্য হচ্ছে একটি স্বায়ত্তশাসিত ডুবো যানবাহন প্রতি বছর একটি নতুন থিম (Theme) বা মূলভাব বা কেন্দ্রীয় ধারণাসহ পানির নিচের কাজগুলো সম্পন্ন করার মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসন প্রদর্শন করা । এখানে পদ্ধতিগত প্রকৌশলের মাধ্যমে দুঃসাহসিক কাজের ফলে স্বায়ত্তশাসিত ডুবো যানবাহনের নকশা, নির্মাণ এবং পরীক্ষা করার সুযোগ পাওয়া যায় । এতে করে বৈশ্বিকভাবে ছাত্র এবং অংশগ্রহণকারীরা রোবোটিক ডুবো জাহাজ তৈরি করছে । বাংলাদেশের ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের (BRAC University) একটি দল ব্র্যাকইউ ডুবুরি (BRACU Duburi) নামে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় । ব্র্যাকইউ ডুবুরি বাংলাদেশে পানির নিচের যন্ত্রমানব নির্মাণ বিদ্যা (Robotics) সম্পর্কিত গবেষণার পথপ্রদর্শক এবং সেই থেকে বাংলাদেশে পানির নিচে গবেষণার পথ তৈরি ও প্রশস্ত করে চলছে । এছাড়া ব্র্যাকইউ ডুবুরি দল একটি টেকসই এবং উদ্ভাবনী বাস্তুতন্ত্র তৈরি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে যেটি বাংলাদেশে এবং তার বাইরেও পানির নিচে শিল্পের বৃদ্ধি ও বিকাশকে চালিত করবে । এ বছর ব্র্যাকইউ সংস্করণ ৪.০ প্রকাশ এবং এর কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করেছে । কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাযুক্ত অত্যাধুনিক রোবটিক ব্র্যাকইউ ডুবুরি বা স্বায়ত্তশাসিত ডুবো যানটি পানির নিচে নেভিগেশনের পাশাপাশি যন্ত্র শিক্ষা দ্বারা চালিত তথ্য সংগ্রহে সক্ষম । স্বয়ংক্রিয় এ ডুবোযানটি উদ্ধার অভিযান পরিচালনার জন্য সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ, গভীর সমুদ্রে কোরাল গবেষণা, জল দূষণ হ্রাস এবং সমুদ্রের অঞ্চলগুলোতে স্বায়ত্তশাসিত পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার সমাধানগুলো টেকসই বিকাশ করতে পারে, যেখানে মনুষ্যবাহী মিশন (Manned-mission) একেবারেই অসম্ভব । ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন শিক্ষক ও তাদের মধ্য থেকে একজন কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খলিলুর রহমানের তত্ত্বাবধানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটারবিজ্ঞান এবং তড়িৎ ও বৈদ্যুতিক প্রকৌশল বিভাগের একদল শিক্ষার্থী ব্র্যাকইউ ডুবুরি উদ্ভাবন করেন । RoboSub প্রতিযোগিতায় ব্র্যাকইউ ডুবুরি এর দলনেতা হচ্ছেন এ.টি.এম. মাসুম বিল্লাহ মিশু এবং উপ-দলনেতা মোঃ মাহফুজুল হক । এছাড়া এ প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সদস্যগণ হচ্ছেন এস এম মিনুর করিম, উমামা তাসনুভা আজিজ, নাজমুল হক অমি, শাওনক মোঃ ইবনে শাহরিয়ার তালুকদার, পার্থ প্রতিম সরকার জয়, সামিয়া আবদুল্লাহ, মাহদী উদ্দিন আহমেদ, সৌমিক হাসান শ্রান্ত, মোঃ মুসফিক বিল্লাহ এবং মোঃ সাজ্জাদ হোসেন চৌধুরী । প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান ($6500): National University of Singapore, দ্বিতীয় স্থান ($3500): BRAC University, তৃতীয় স্থান ($2000): University of Alberta, চতুর্থ স্থান ($1500): Si Se Puede Foundation এবং পঞ্চম স্থান ($1000): Amador Valley High School স্বায়ত্তশাসন চ্যালেঞ্জ পুরস্কার (Autonomy Challenge Award) অর্জন করে । বাংলাদেশের ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান দ্বিতীয় । এছাড়া ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়টি উদ্ভাবনী দক্ষতায় সেরা বুদ্ধিমত্তা বিশেষ পুরস্কার (Ingenuity Special Award) পেয়েছে । যন্ত্রমানব নির্মাণ বিদ্যার (Robotics) ক্ষেত্রে বাংলাদেশী প্রতিযোগীদের সৃষ্টিশীল প্রতিভা, উদ্ভাবন এবং উজ্জ্বলতা প্রদর্শনের কারণে বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাস রচিত হয়েছে । দুর্দান্ত এ প্রতিযোগিতায় অন্যান্য আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দলগুলো ডিজাইন ডকুমেন্টেশন, পরামর্শদাতা, দক্ষতা, তথ্য ভাগ করে নেয়া এবং সহযোগিতার জন্য বিশেষ পুরষ্কার পেয়েছে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর Vice Chief of Naval Operations Adm. Lisa Franchetti বলেন ”নৌবাহিনী প্রতিটি কার্যক্ষেত্র বা শাসনক্ষেত্রে (Domain) মানবহীন পদ্ধতি নিয়োগ করে — বাতাসে, সমুদ্রে এবং সমুদ্রের নিচে । আমরা কর্মসূচীগুলোর মাধ্যমে যে উদ্ভাবন এবং সৃজনশীলতা দেখি RoboSub এর মতো মনুষ্যবিহীন প্ল্যাটফর্মে যা সম্ভব তার কল্পনাকে ধাক্কা দেয় । এ প্রতিযোগীরা ভবিষ্যতের নেতাদের প্রতিনিধিত্ব করে যারা বহর বা নৌবহর এবং শিল্পে আমাদের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধান নিয়ে আসবে । নৌবাহিনী STEM শিক্ষার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে । বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়া, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা আমাদের যেখানে যেতে হবে সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য । আমাদের নাবিক এবং বেসামরিক ব্যক্তিরা প্রতিদিন সেখানে যুদ্ধের সবচেয়ে জটিল বাস্তুতন্ত্রের বিকাশ, পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করছে; চালনা, শক্তি, অস্ত্র, যুদ্ধ এবং তথ্য ব্যবস্থাকে একীভূত করা আমাদের বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ নৌবাহিনীর প্রয়োজন ।” এছাড়া নিউ ইয়র্কের স্থানীয় বাসিন্দা, নৌ গবেষণা এবং নৌ বিজ্ঞানের প্রধান Rear Adm. Kurt Rothenhaus এর দৃষ্টিকোণ থেকে ”প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত (STEM) নির্বাহী হচ্ছে RoboSub বৃহত্তর নৌ-উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার জন্য সত্যিই একটি মূল্যবান এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা (Event) । আমরা কেবলমাত্র পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিভাবান বিজ্ঞানী এবং প্রকৌশলীদের সাথে দেখা করতে পারি না, তবে আমরা তাদের আমাদের নাবিক এবং মেরিনদের মুখোমুখি হওয়া সবচেয়ে চাপের চ্যালেঞ্জগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেই । এটি স্বায়ত্তশাসিত পদ্ধতি এবং ক্ষমতা হিসেবে বিশেষভাবে প্রচলিত কারণ বর্তমান এবং ভবিষ্যত যুদ্ধক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।”

তথ্যসূত্র: https://robosub.org/https://robonation.org/https://www.cpf.navy.mil/ , https://bracu-duburi.com/ , আন্তর্জাল (The Internet) ।

ছবি: https://web.facebook.com/bracuduburi

Wednesday, 2 August 2023

বৃষ্টি ও বর্ষার অনুভূতি

আষাঢ়ে দুপুর ৷
পূবাকাশের কপালে কালো মেঘের তিলক ৷
মুষলধারে বৃষ্টি ৷
হিংস্র বজ্রপাতের হুঙ্কারে চমকে উঠে প্লীহা ৷
জল বিন্দুগুলোর দুর্দান্ত প্রতাপ ৷
তীব্রভাবে বর্ষিত হয় ৷
রৌদ্রদগ্ধ ভূ-পৃষ্ঠের তৃষ্ণা মেটায় ৷
জলপাই সবুজ কচু পাতার উপর নৃত্য করে ৷
মানুষের হৃদয়কে রাঙিয়ে তোলে ৷
কখনো কারো চোখের জলে মহাপ্লাবন সৃষ্টি করে ৷
কিংবা প্রকৃতিকে জীবনীশক্তি দেয় ৷
এরা প্রবলবেগে প্রবাহিত হয়ে নদীর বুকে ঠাঁই নেয় ৷
বৃষ্টিভেজা ডেউয়া পাতাগুলোর নির্মল হাসি ৷
হয়তো, শ্রাবণের আগমনী বার্তা ৷
চারদিকে শারদীয় উৎসবের আমেজ ৷
কদম ফুলের মাতাল গন্ধে দিশেহারা প্রজাপতি ৷
শুভ্র কাশ বনে ডাহুক যুগলের গোপন অভিসার ৷
নববধূকে নিয়ে নৌকায় চড়ে বরযাত্রীদের বাড়ি ফেরা ৷
শ্রাবণের মেঘগুলো মিলিয়ে যায় নীল আসমানের নীলিমায় ৷
অষ্টাদশীর খোঁপায় পরা অনুপম সৌন্দর্যের প্রতীক শাপলা ৷
চাতক পাখি প্রেয়সীর প্রতীক্ষায় ৷
জ্যোৎস্না রাতে পূর্ণিমার চাঁদ নেমে আসে বর্ষার অথৈ জলে ।

Sunday, 9 July 2023

শনির দৈত্যাকার ষড়ভুজ ঝড়


https://solarsystem.nasa.gov/ 


NASA, ESA, JPL, SSI, Cassini Imaging Team 

বৃহস্পতি গ্রহের পরই সৌরজগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রহ হচ্ছে শনি । শনি গ্রহের নাম হয়েছে হিন্দু গ্রহদেবতা শনির নামানুসারে । রোমান ধনসম্পদ ও কৃষিদেবতা স্যাটার্ন এর নাম থেকে ইংরেজি Saturn শব্দটি এসেছে । সূর্য থেকে ষষ্ঠ গ্রহটিকে নিয়ে এখনো অনেক রহস্য ধারণ করে । বরফ বলয়গুলোর চকচকে তন্ত্রের সাথে গ্রহটি প্রাচীনকাল থেকেই মুগ্ধতার বিষয় হয়ে উঠেছে । সূর্য থেকে এর গড় দূরত্ব প্রায় ৮৮৬ মিলিয়ন মাইল (১.৪ বিলিয়ন কিলোমিটার) । শনি গ্রহ ২৯.৫ পৃথিবী বছরে একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে । ধারণা করা হয়, শনির বৈচিত্র্যময় ১৪৬টি চাঁদ বা উপগ্রহ রয়েছে কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তাদের মধ্য থেকে ৮৩টি চাঁদ আবিষ্কার করেছেন । শনি গ্রহের ব্যাস প্রায় ৭২৩৬৭ মাইল (১১৬৪৬০ কিলোমিটার), যা পৃথিবীর ব্যাসের প্রায় ৯.৫ গুণ । এটি পৃথিবীর তুলনায় ৯৫ গুণ বেশি ভারী । শনি গ্রহের কেন্দ্রস্থল লোহা, নিকেল ও পাথর (সিলিকন ও অক্সিজেন যৌগ) দ্বারা গঠিত। এ কেন্দ্রস্থলটিকে ঘিরে রয়েছে ধাতব ও তরল হাইড্রোজেন, তরল হিলিয়াম এবং গ্যাসীয় স্তর । ধাতব হাইড্রোজেনে প্রবহমান তড়িৎ প্রবাহটিকে শনি গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্রের উৎস মনে করা হয় । দূর থেকে শনিকে অত্যাশ্চর্য বলয়সহ একটি নির্মল গ্যাস দৈত্যের মতো দেখায়, যা তার কক্ষপথে সামান্য বা কোনো ঝামেলা ছাড়াই ঘুরছে । শনি গ্রহের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর আকর্ষণীয় বলয় ব্যবস্থা (Ring system)। মহাজাগতিক এক বিমূর্ত চিত্র । ইতালীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী, পদার্থবিদ, পলিম্যাথ এবং প্রকৌশলী গ্যালিলিও গ্যালিলি ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবারের মতো গ্রহের বলয়গুলো দেখেছিলেন । মূলত বরফ কণা দিয়ে গঠিত দৃষ্টিনন্দন এ বলয়গুলোতে অল্প পরিমাণে পাথুরে ভগ্নাবশেষ এবং ধূলিকণা রয়েছে । মেঘের চূড়া ছাড়িয়ে, গ্রহের নজরকাড়া বলয়ের বৃত্তপরিধির অংশগুলো (Arc) উজ্জ্বল নীল রঙের । দীর্ঘদিন চেষ্টার পর নাসা (NASA) এর বিজ্ঞানীরা সৌরজগতের বিশাল গ্রহ শনির চারপাশে ঘূর্ণায়মান বৃহদাকার নতুন একটি বলয়ের সন্ধান পেয়েছেন । শনির বায়ুমণ্ডলে শতকরা ৯৬ ভাগ হাইড্রোজেন, শতকরা ০৩ ভাগ হিলিয়াম এবং সামান্য পরিমাণ মিথেন, অ্যামোনিয়া, জলীয় বাষ্পসহ অন্যান্য উপাদান রয়েছে । বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে অ্যামোনিয়া কেলাসের উপস্থিতির কারণে গ্রহটির রং ফিকে হলুদ । গ্যাস দৈত্যের কোনো শক্ত পৃষ্ঠ নেই । যদিও শনি ঘোরে, এটি পৃথিবীর প্রায় ০১ শতাংশ সূর্যালোক গ্রহণ করে । তাই দিন ও রাতের মধ্যে শক্তি যোগানের পার্থক্য পৃথিবীর তুলনায় অনেক কম তীক্ষ্ণ । বৈচিত্র্যময় গঠনের কারণেই পৃথিবী থেকে এটি ভিন্ন । এর বায়ুমণ্ডলে ঝড়ের আবাসস্থল । শনির বায়ুমণ্ডলের অত্যাশ্চর্য বৈশিষ্ট্য ও সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে শনির উত্তর মেরুতে অবস্থিত ষড়ভুজ আকারের এক বিশাল ঘূর্ণিঝড় । তবে ঝড়টি সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে খুব কমই জানা যায়, কারণ গ্রহটি সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে এক দীর্ঘ সময় নেয় এবং সেই সময়ের জন্য উভয় মেরুকে অন্ধকারে রেখে যায় । এছাড়া শনির মেঘের আড়ালে কিছু দেখতে পাওয়াও খুব কঠিন ব্যাপার কারণ সেখানে সূর্যের আলো খুব বেশি প্রবেশ করে না । শনির কক্ষপথ, ঋতু এবং পৃথিবীর দিকে এর কাত হওয়ার কারণে ছবি তোলা সবসময় সম্ভব নয় । এটির দূরত্ব সরাসরি পর্যবেক্ষণকে কঠিন করে তোলে । যদিও শনি গ্রহটিকে দেখা সম্ভব হতে পারে কারণ এটি আকাশে উজ্জ্বলভাবে জ্বলছে । কখনো কখনো গ্রহটি যখন অন্ধকারের সময় দিগন্তের উপরে থাকে, সৌর অয়নবৃত্ত বা গ্রহণ (Ecliptic) বা তার কাছাকাছি গ্যাস দৈত্য গ্রহটিকে দেখা যায় । যদি শনির উত্তর গোলার্ধটি আমাদের দিকে ঝুঁকে থাকে (এটি প্রতি ১৪ থেকে ১৫ বছরে একবার হয়) এবং ব্যতিক্রমী অন্ধকার আকাশ থাকে তাহলে খুব শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে উত্তর মেরুতে বিশাল ষড়ভুজ ঝড়টি দেখা যাবে । ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে শনি গ্রহে ভয়েজার ১ মহাকাশযান উড়ানের (Voyager 1 spacecraft flyby) সময় প্রথম আবিষ্কৃত হয় যে, একটি অশান্ত ষড়ভুজ আকৃতির ঝড় কমপক্ষে চার দশক ধরে শনির উত্তর মেরুর কাছে আছড়ে পড়ছে । সৌরজগতের অন্য কোথাও কেউ এর মতো কিছু দেখেনি । শনির মেরু ষড়ভুজ ঝড়টি ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে ডেভিড গডফ্রে (David Godfrey) আবিষ্কার করেন । 

শনির ষড়ভুজ ঝড় হচ্ছে শনি গ্রহের উত্তর মেরুতে প্রায় ৭৮ ° (ডিগ্রি) উত্তর অক্ষাংশে অবস্থিত একটি অবিরাম প্রায় ষড়ভুজ মেঘের নমুনা বা কারুকার্যের নকশা (Pattern) । মেঘের গভীরে বিখ্যাত ষড়ভুজের উষ্ণতা, উচ্চ-উচ্চতার ঘূর্ণি সত্যিই বিস্ময়কর । প্রতি ঘন্টায় প্রায় ৩০০ মাইল (৫০০ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা) বেগে পূর্ব দিকে চলাচলকারী বায়ুমণ্ডলীয় গ্যাস দ্বারা তৈরি একটি ফিনকি জলপ্রবাহ বা স্রোত (Jet stream) যেটি ষড়ভুজ তৈরি করে তা একটি প্রতিবন্ধক বা আত্মরক্ষামূলক বেড়ার (Barrier) মতো কাজ করে বলে মনে হয়, যার ফলে অ্যান্টার্কটিকের " ওজোন গর্ত " (Ozone hole) এর মতো কিছু হয় । উত্তর মেরু ঘূর্ণিঝড়টি (NPV) প্রায় সমান দৈর্ঘ্যের ছয়টি সুনির্দিষ্ট দিক বা বাহু বা পার্শ্ব যুক্ত আকারে ভাঁজ করে কারণ ষড়ভুজ হচ্ছে একটি স্থির তরঙ্গ যা ফিনকি জলপ্রবাহ বা স্রোতে গ্যাসের পথ নির্দেশ করে । ষড়ভুজ ঝড়ের বাহুগুলো প্রায় ১৪৫০০ কিঃমিঃ (৯০০০ মাইল) দীর্ঘ, যা পৃথিবীর ব্যাসের চেয়ে প্রায় ২০০০ কিঃমিঃ (১২০০ মাইল) বেশি । ষড়ভুজটি প্রায় ৩০০০০ কিঃমিঃ (২০০০০ মাইল) জুড়ে বিস্তৃত এবং ৩০০ কিঃমিঃ (১৯০ মাইল) উচ্চ । এটি ১০ ঘন্টা ৩৯ মিনিট ২৪ সেকেন্ড সময়ে একবার আবর্তিত হয়, যা শনির অভ্যন্তর থেকে বেতার নির্গমনের (Radio emission) একই সময়কাল । ষড়ভুজটি প্রথম শ্রেণীর বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘূর্ণি কাঠামো (Classic vortex structure) । এটির ফিনকি জলপ্রবাহ বা স্রোত শুধুমাত্র উত্তরে, দক্ষিণে নয় । ষড়ভুজের ভিতরে চারটি পৃথিবী মানানসই হতে পারে । দৃশ্যমান বায়ুমণ্ডলে অন্যান্য মেঘের মতো ষড়ভুজ ঝড় দ্রাঘিমাংশ বরাবর পরিবর্তিত হয় না । রাক্ষস ষড়ভুজ ঝড়ের বিশাল কাঠামোর কেন্দ্রে একটি মন্থন ঝড় রয়েছে । বিজ্ঞানীরা এ ষড়ভুজ ঝড়ের মধ্যে থাকা বিভিন্ন ধরণের মেঘের কাঠামোর গতি দেখতে পান । উত্তর মেরুতে শক্তভাবে কেন্দ্রীভূত এ বিশাল প্রবল বাত্যাটি (Hurricane) পৃথিবীর গড় প্রবল বাত্যা চোখের চেয়ে প্রায় ৫০ গুণ বড় একটি চোখ । অসংখ্য ছোট ঘূর্ণিও উপস্থিত রয়েছে, যা লালচে ডিম্বাকৃতি । এর মধ্যে কিছু ঘূর্ণি ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরে যখন ষড়ভুজীয় প্রবল বাত্যা (Hexagonand hurricane) ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘোরে । এ ছোট বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে কয়েকটি ষড়ভুজের ফিনকি জলপ্রবাহ বা স্রোত প্রবাহিত হয়, যেন একটি ঘোড়দৌড়ের মাঠের উপর । এ ঘূর্ণিগুলোর মধ্যে ষড়ভুজের নিচে ডানদিকের কোণে সবচেয়ে দানবাকৃতি সাদা প্রচণ্ড ঝড়টি দ্য গ্রেট হোয়াইট স্পট (The Great White Spot) প্রায় ২২০০ মাইল (৩৫০০ কিলোমিটার) বিস্তৃত, যা পৃথিবীর বৃহত্তম প্রবল বাত্যার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ । এটি বায়ুর ভয়ঙ্কর ঘূর্ণন তাপমাত্রাকে স্বাভাবিকের চেয়ে ৮৩ কেলভিন বাড়িয়ে তোলে, যা আগে কখনোই কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডলে দেখা যায়নি । ষড়ভুজ ঝড়ের বিন্দুগুলো তার কেন্দ্রের চারপাশে প্রায় ঠিক একই হারে ঘোরে, যা শনি তার অক্ষের উপর ঘোরে । কয়েক শতক ধরে এ ঝড় শনি গ্রহে তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে । 

একদিকে এটি গ্যাস দৈত্য শনি গ্রহের বায়ুমণ্ডলে অগভীর, পর্যায়ক্রমে গ্যাস ফিনকি থেকে শত শত কিলোমিটার গভীরে গঠিত হতে পারে যেখানে প্রায় ১০ বার (Bar) বা তার চেয়ে বেশি চাপ থাকে এবং যেখানে গ্যাস বেশি উত্তাল । অন্যদিকে হাজার হাজার কিলোমিটার নিচে প্রসারিত গভীর বলয়িত ফিনকি (Deep zonal jet) থেকে এসে এটি আরো গভীরভাবে প্রোথিত হতে পারে, যেখানে চাপ কয়েক হাজার গুণ বেশি এবং গ্রহের ঘূর্ণন ও ভূ-সংস্থান একটি উন্মাদনা তৈরি করতে পারে । কারণ এর মেজাজ অনেক বেশি অস্থির । এর অর্থ হচ্ছে গ্রহের ঘূর্ণন এবং সম্ভবত এর অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলো এমন একটি জায়গায় ঝড়ের উদ্রেক করছে যেখানে শনির গভীর বলয়িত ফিনকিগুলো উচ্চতায় তাদের শক্তি ধরে রাখে এবং চাপ উপরের স্তরের তুলনায় আশ্চর্যজনক ১০০০০০ বার (Bar) বা তার চেয়েও বেশি । এ অদ্ভুত ষড়ভুজ ঘূর্ণিগুলো গভীর এবং আরো স্থিতিশীল । শনির ষড়ভুজ তৈরি হয়েছে গভীর তাপীয় পরিচলনের কারণে । যখন শনির গভীরে গ্যাস উত্তপ্ত হয় এবং তারপর আরো বাইরে চলে যায়, তখন এটি তার সাথে সমস্ত তাপ শক্তি নিয়ে যায় । উপরের গ্যাসের স্তরগুলোকে প্রসারিত করতে, ঘনত্ব হারাতে এবং বৃদ্ধি পেতে বাধ্য করে । এটিই পরিচলন । পরিচলন একই শক্তি যা পৃথিবীতে ঘূর্ণিবাত বা ঘূর্ণিঝড় (Tornado) এবং প্রবল বাত্যা (Hurricane) সৃষ্টি করে । এটি ঘটে যখন তাপ গ্রহের মধ্যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করে, ফিনকি জলপ্রবাহ বা স্রোতগুলোকে জাগরিত করে ছেড়ে যায় । এ ফিনকি জলপ্রবাহ বা স্রোতগুলো সংখ্যায় অনেক এবং যখন তারা শনির বায়ুমণ্ডলের শীর্ষে মিশে যায়, তখন তারা বিভিন্ন আকার তৈরি করে । এটি একটি পূর্বমুখী বলয়িত ফিনকির সাথে যুক্ত এবং শনির মতো একই সময়ে ঘোরে । গঠনটি শনির বায়ুমণ্ডলের প্রায় ২০০ মাইল গভীরে । যদিও গবেষকরা পুরোপুরি নিশ্চিত নন যে, ফিনকি জলপ্রবাহ বা স্রোতগুলো ঠিক কিভাবে ষড়ভুজ আকার তৈরি করে । হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ষড়ভুজের উৎপত্তি সম্পর্কে মনে করেন যে, একটি ঘূর্ণায়মান গোলাকার খোলকে গভীর অশান্ত পরিচলনের ক্ষেত্রে কি ঘটে তা অনুসরণ করা । কেন শনির বিশাল রহস্যময় ষড়ভুজ বিদ্যমান এখন মনে হয় তাদের কাছে এর একটি যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা আছে । ত্রিমাত্রিক নমুনায় (3D model) দেখা যায় যে, গ্রহে যখন পরিচলন ঘটে তখন হিংস্রভাবে অশান্ত সংকোচনযোগ্য গ্যাস শনি গ্রহের বাইরের স্তরে গভীর তাপীয় পরিচলন স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিশাল মেরু ঘূর্ণিঝড়ের জন্ম দিতে পারে এবং পর্যায়ক্রমে ভয়াবহ বলায়কার প্রবাহ একটি পূর্বমুখী ফিনকির নমুনা ( Jet pattern) সৃষ্টি করতে পারে । এ বলয়কিত ফিনকিগুলো গুণগত এবং পরিমাণগতভাবে শনি গ্রহে যা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে ঠিক তার মতোই । ভান বা আদিখেত্যা (Simulation) বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় যে প্রাকৃতিক চেহারার ঘূর্ণিঝড়টি ঘটে যখন শনির গভীরে বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহ অনেক বড় এবং ছোট ঘূর্ণিঝড় তৈরি করে, যা গ্রহের উত্তর মেরুর কাছে পূর্ব দিকে প্রবাহিত একটি বৃহত্তর অনুভূমিক ফিনকি প্রবাহকে ঘিরে থাকে যার মধ্যে অনেক ঝড়ও রয়েছে । এর মধ্যে ছোট ঝড়গুলো বৃহত্তর তন্ত্রের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে ও দৈত্যাকার ঘূর্ণি আকারে স্ব-সংগঠিত হয়ে আলোড়নপূর্ণ বা অশান্ত পূর্বমুখী ফিনকিকে চিমটি দেয় এবং এটিকে গ্রহের শীর্ষে সীমাবদ্ধ করে । এ চিমটি প্রক্রিয়াই প্রবাহকে একটি ভয়ঙ্কর ষড়ভুজ ঝড়ের সূত্রপাত করে । কিংবা বহুভুজ কাঠামো তৈরি করে যা শনি গ্রহে দেখা যায় । গবেষকরা যুক্তি দিয়েছেন যে, শনির ষড়ভুজ প্রবাহের ধরণকে উত্তেজনাপূর্ণ করার জন্য অনুরূপ প্রক্রিয়া দায়ী । তাদের নমুনাটি শনির বায়ুমণ্ডলের প্রতিটি দিককে বন্দি বা নিয়ন্ত্রণে আনে না, এটি শুধুমাত্র গ্রহের ব্যাসার্ধের বাইরের দশমাংশকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং তাদের মেরু ফিনকিগুলো ষড়ভুজের পরিবর্তে ত্রিভুজ গঠন করতে থাকে । তারা আত্মবিশ্বাসী যে, এ সরলীকৃত পরিস্থিতি শনি গ্রহে দেখা কিছু বৈশিষ্ট্য খুঁজে বের করতে সাহায্য করবে । উত্তর মেরুকে কেন্দ্র করে একটি বৃহৎ ঘূর্ণিঝড় উঠেছিল, যখন বেশ কয়েকটি ছোট ঘূর্ণিঝড় বিষুব রেখা বা নিরক্ষরেখার সামান্য উত্তরে একটি শক্তিশালী পূর্বমুখী ফিনকিতে যোগ দেয় । যদিও এ কেন্দ্রীয় ঘূর্ণিঝড়টি ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি গ্যাসের অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল । আশেপাশের ঘূর্ণিগুলো অগভীর স্তরে এ সমস্ত অস্থিরতার দ্বারা মুখোশিত বা মুখোশযুক্ত ছিল, যা তাদের ঘূর্ণিবাতের চেয়ে বহুভুজ ফিনকির মতো দেখায় । গবেষকরা লিখেছেন, শনি গ্রহের জন্য অনুরূপ দৃশ্য কল্পনা করা যেতে পারে যেখানে ফিনকির ষড়ভুজ আকারটি সংলগ্ন ছয়টি বড় ঘূর্ণি দ্বারা টিকে থাকে, যা অগভীর স্তরগুলোতে আরো বিশৃঙ্খল পরিচলন দ্বারা লুকিয়ে থাকে । এ কারণেই কিছু অন্যান্য নমুনা হতে পারে এবং পর্যবেক্ষণগুলো শনির ষড়ভুজের কিছু এলাকায় একটি অগভীর ফিনকির উপস্থিতি নির্দেশ করে, যখন প্রকৃতপক্ষে সত্য মিথ্যা অনেক নিচে । কিন্তু এটি ধারণার একটি প্রমাণ মাত্র এবং এ নমুনাটির বাস্তবতাকে আরো ভালোভাবে প্রতিফলিত করতে আমাদের শনি গ্রহ থেকে আরো অনেক বেশি বায়ুমণ্ডলীয় তথ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে । তবুও, মনে হচ্ছে আমরা হয়তো সঠিক পথেই আছি । পৃথিবীতে নিয়মিত ঝড় দেখি এবং সেগুলো সর্বদা সর্পিল হয়, কখনো কখনো বৃত্তাকার । তবে কখনোই ষড়ভুজ রেখাংশ বা প্রান্তসহ বহুভুজ হয় না । এটি সত্যিই আকর্ষণীয় এবং সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত । কিন্তু শনি গ্রহ নিয়ে প্রশ্ন হচ্ছে কিভাবে এতো বড় তন্ত্র (System) তৈরি হয়েছে এবং কিভাবে এতো বড় তন্ত্র এ বৃহৎ গ্রহে অপরিবর্তিত থাকতে পারে? পৃথিবীতে একটি প্রবল বাত্যার স্থায়িত্বকাল হতে পারে প্রায় এক সপ্তাহ বা আরো কয়েক দিন । কিন্তু এ ঝড় কয়েক দশক এমনকি শতক ধরে এখানে বিদ্যমান রয়েছে তা কেউই বলতে পারে না । ষড়ভুজ ঝড়টির মতো প্রবল বাত্যা আর কোনো জগতে বা চাঁদে কখনো দেখা যায়নি । 

NASA এর Pioneer 11 robotic space probe শনি গ্রহে উড়ে যাওয়া প্রথম মহাকাশযান । ভয়েজার ১ এবং ২ মহাকাশযানসহ বেশ কয়েকটি মহাকাশযান শনিকে অন্বেষণ করে । নাসা (NASA) এর ক্যাসিনি মহাকাশযানটি (The Cassini orbiter) ২০০৪ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে যখন প্রথম শনি গ্রহে পৌঁছেছিল তখন উত্তর মেরুতে শীতকাল ও অন্ধকার এবং দক্ষিণ গোলার্ধ গ্রীষ্মকাল ছিল । এটি গ্রহ এবং এর বলয়গুলোর প্রথম কাছাকাছি চিত্রগুলো সরবরাহ করে । আলোর দৃশ্যমান তরঙ্গদৈর্ঘ্যে ষড়ভুজ দেখতে বিজ্ঞানীদের আরো কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল কারণ শনির ঋতু পৃথিবীর তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী হয় । এছাড়া যখন শনির উত্তর মেরুতে সূর্য উঠে তখনো মেঘগুলো এতো ঘন যে আলো গ্রহের গভীরে প্রবেশ করে না । তাই সূর্য সত্যিই শুধুমাত্র ষড়ভুজের সমগ্র অভ্যন্তর আলোকিত করতে শুরু করে যখন উত্তরে বসন্তের শুরু হয় ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে যখন শনি গ্রহে মার্কিন-ইউরোপীয় ক্যাসিনি-হুইজেনস মিশন (Cassini-Huygens mission) দ্বারা পুনরায় পর্যবেক্ষণ শুরু করে । ক্যাসিনি মহাকাশযান Visual and Infrared Mapping Spectrometer (VIMS) যন্ত্র ব্যবহার করে ষড়ভুজ পর্যবেক্ষণ করে । ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে সূর্যের আলোতে প্রবেশ না করা পর্যন্ত এবং আগস্টে উত্তরে বসন্তের সূচনাকালে ক্যাসিনি মহাকাশযান Imaging Science Subystem (ISS) যন্ত্র দিয়ে ষড়ভুজের চিত্রগুলো ধারণ করতে সক্ষম হয় । ২০১২ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে শনি গ্রহের সুদূর উত্তর মেরুতে প্রথম সূর্যালোক দৃশ্যগুলো Composite Infrared Spectrometer (CIRS) ধারণ করে যখন ক্যাসিনি মহাকাশযানটি গ্রহের সবচেয়ে কাছে ছিল । ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে ষড়ভুজের পুরো অভ্যন্তরটি নীল দেখায় । শনির ঋতু পরিবর্তন এবং ক্যাসিনি মহাকাশযানের কক্ষপথ পরিবর্তনের কারণে সম্প্রতি ষড়ভুজ ঝড়টির তরঙ্গদৈর্ঘ্য, অতিবেগুনী ও অবলোহিত উচ্চ-নির্ণয়কর (High resolution) চিত্র ধারণ করা সম্ভব হয়েছে । ক্যাসিনি মহাকাশযানের প্রশস্ত-ত্রিকোণী ক্যামেরা দিয়ে বলয়যুক্ত শনি গ্রহের উত্তর মেরুতে ষড়ভুজের অনন্য ছয় বাহুযুক্ত ফিনকি জলপ্রবাহ বা স্রোতের উচ্চ-নির্ণয়কর মেকী-রঙের অত্যাশ্চর্য চিত্র নথিভুক্ত করেছে । কাছাকাছি অবলোহিত যৌগিক চিত্রের তথ্যে নিচু মেঘের জন্য লাল এবং উঁচু মেঘের জন্য সবুজ রঙ দেখা যায়, যা শনীয় মেঘ দৃশ্যকে (Saturnian cloudscape) একটি প্রাণবন্ত চেহারা দেয় । পরবর্তীতে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ষড়ভুজ অভ্যন্তরের বেশিরভাগ অংশই হলুদাভ কুয়াশায় ঢেকে গিয়েছিল । নীল রঙ থেকে সোনালি রঙে পরিবর্তিত হয়েছিল । শুধুমাত্র মেরু ঘূর্ণির কেন্দ্র নীল রঙ ধরে রেখেছিল । এর জন্য একটি তত্ত্ব হচ্ছে যে, ঋতু পরিবর্তনের কারণে মেরুটি সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মির সংস্পর্শে আসায় সূর্যের আলো কুয়াশার সৃষ্টি করেছে । মেরু অঞ্চলের সাধারণ হলুদ হওয়াটি মেরু অঞ্চলে সৌর বিকিরণ বৃদ্ধির ফলে উৎপন্ন ধোঁয়াশা কণার কারণে ঘটেছে বলে মনে করা হয় । এ পরিবর্তনগুলো ক্যাসিনি মহাকাশযান দ্বারা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল । লাল, সবুজ এবং নীল বর্ণালী ছাঁকনি ব্যবহার করে চিত্রগুলোকে এ প্রাকৃতিক রঙের দৃশ্য তৈরি করতে একত্রিত করা হয়েছিল, আমরা শনি গ্রহে থাকলে মানুষের চোখ যা দেখতে পাবে । এ চিত্র সংস্করণে অতিবেগুনী থেকে অবলোহিত পর্যন্ত দৃশ্যমান আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের রঙ নির্ধারণ করা হয়েছে । ষড়ভুজের ভিতরে এবং বাইরে বায়ুমণ্ডলীয় কণার প্রকারের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র বৈসাদৃশ্য দেখা যায় । ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই সেপ্টেম্বর শনির গায়ে আছড়ে পড়ে ক্যাসিনি মহাকাশযান ধ্বংস হয় । হাবল দূরবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারা পর্যবেক্ষণ করে জানা যায় শনির দক্ষিণ মেরুতে কোনো ষড়ভুজ নেই, তবে এখানে একটি ঘূর্ণি রয়েছে এবং উত্তর মেরুতে ষড়ভুজের ভিতরেও একটি ঘূর্ণি রয়েছে । 
Cassini-Huygens mission হচ্ছে নাসা (NASA) এর European Space Agency এবং Italian Space Agency এর একটি সহযোগিতামূলক প্রকল্প । নাসা এর Jet Propulsion Laboratory হচ্ছে প্যাসাডেনা শহরে অবস্থিত California Institute of Technology এর একটি বিভাগ । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির নাসা এর Science Mission Directorate মিশন পরিচালনা করে । 
তথ্যসূত্র:  https://solarsystem.nasa.gov/ ,  https://www.sciencealert.com/  ,  https://www.sciencedaily.com/ , আন্তর্জাল (The Internet) ।




Monday, 26 June 2023

বিশ্বের গভীরতম গিরিখাতে এশিয়ার সবচেয়ে লম্বা গাছের আবাসস্থল

এ পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চিত্রটি উপর থেকে নিচ পর্যন্ত বিশাল একটি সাইপ্রেস গাছ (চিত্র : পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়) ।



চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে সাইপ্রেস গাছের একটি ত্রিমাত্রিক (3D) চিত্র, (চিত্র: পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়) ।


সম্প্রতি চীনা বিজ্ঞানীরা বিশ্বের গভীরতম গিরিখাতে এশিয়ার সবচেয়ে লম্বা গাছের আবাসস্থল খুঁজে পেয়েছেন ৷ ৩৩৫ ফুট (১০২ মিটার) উচ্চতার নতুন আবিষ্কৃত এক বিশাল সাইপ্রেস গাছ (Cypress tree) চীনের তিব্বত অঞ্চলের একটি জঙ্গলে পাওয়া গিয়েছে, যেটি স্ট্যাচু অফ লিবার্টি (Statue of Liberty) থেকেও উচ্চ হয়ে উঠেছে । এটি একটি সরলবর্গীয় চিরহরিৎ বৃক্ষ । চীনে আবিষ্কৃত সাইপ্রেস গাছটি এশিয়ার সবচেয়ে লম্বা গাছ । এ আশ্চর্যজনক গাছটি বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গাছ বলেও বিশ্বাস করা হয় । বিস্ময়কর যে, এ উচ্চতায় গাছটি স্ট্যাচু অফ লিবার্টির (৩০৫ ফুট বা ৯৩ মিটার) চেয়েও উঁচু । চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক বিবৃতি অনুসারে জানা যায় যে, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষক বা অনুসন্ধানিক দল গত মে মাসে অতিকায় সাইপ্রেস গাছটি হিমালয়ের উত্তর দিকে সুউচ্চ ‘পৃথিবীর ছাদ’ খ্যাত তিব্বত মালভূমিতে অবস্থিত চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের নিইংচি শহরের (Nyingchi City) বোমে বিভাগ বা জেলার (Bome County) ইয়ারলুং জাংবো গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন জাতীয় প্রকৃতি সংরক্ষিত (Yarlung Zangbo Grand Canyon National Nature Reserve) ভূমিতে আবিষ্কার করে । এ স্থানটি বিশ্বের গভীরতম স্থলজ গিরিখাত বলে মনে করা হয় । কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে ইয়ারলুং জাংবো নদী দ্বারা এটি গঠিত হয়েছে । যেখানে প্রকৃতি সংরক্ষণের গড় গভীরতা ১৬০০০ ফুট এবং সর্বোচ্চ গভীরতা ১৯৭১৪ ফুট । এ ঘন বনাঞ্চল থেকে গাছের উচ্চতা অনুমান করা সহজ ছিল না এবং উপত্যকায় অবস্থানের কারণে এ গাছের উচ্চতা এক নজরে বোঝা খুব কঠিন । জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তিব্বতের বনভূমি সবচেয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে একটি । এ কারণেই গবেষকরা এখন এ অঞ্চলে উদ্ভিদ জীববৈচিত্র্যের একটি বিশদ গবেষণা পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন । এ সমস্ত লম্বা গাছ একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ভাগ করে । এগুলো সবই নিইংচি শহরের মধ্যে বিশেষত মেডগ কাউন্টি (Medog County), জায়ু কাউন্টি (Zayu County) এবং বোমে কাউন্টিতে (Bome County) আবিষ্কৃত হয়েছে । দেশের এ অঞ্চলে প্রচুর সংখ্যক বিশালাকার গাছ রয়েছে । সাইপ্রেস গাছটি কোন প্রজাতির অন্তর্গত তা স্পষ্ট নয়, যদিও চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত যে এটি হয় হিমালয়ান সাইপ্রেস (Himalayan cypress, বৈজ্ঞানিক নাম: Cupressus torulosa) কিংবা একটি তিব্বতি সাইপ্রেস (Tibetan cypress, বৈজ্ঞানিক নাম: Cupressus gigantea) প্রজাতি ৷ হিমালয় এবং তিব্বতীয় সাইপ্রেস প্রজাতিগুলো বন্য অঞ্চলে বিরল প্রজাতি এবং মাত্র কয়েকটি ইয়ারলুং জাংবো গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন জাতীয় প্রকৃতি সংরক্ষিত ভূমিতে পাওয়া যায় । এ গাছগুলো চীনের প্রথম শ্রেণীর সংরক্ষিত উদ্ভিদ প্রজাতির অন্তর্গত । রাষ্ট্র পরিচালিত চীনা প্রকাশনা পিপলস ডেইলি অনলাইন অনুসারে গাছটির ব্যাস হচ্ছে ৯.৬ ফুট (২.৯ মিটার) । এটি আবিষ্কারের আগে এশিয়ার সবচেয়ে লম্বা গাছটি ছিল ৩৩১ ফুট লম্বা (১০০.৮ মিটার) হলুদ মেরান্টি (Yellow Meranti, বৈজ্ঞানিক নাম: Shorea faguetiana), যেটি মালয়েশিয়ার সাবাহ (Sabah) এর ড্যানুম উপত্যকা সংরক্ষিত এলাকায় (Danum Valley Conservation Area) অবস্থিত । তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের একটি অনন্য বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem) রয়েছে যা ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে । উল্লেখ্য যে: বাস্তুতন্ত্র হচ্ছে জৈব, অজৈব পদার্থ ও বিভিন্ন জীবসমন্বিত এমন প্রাকৃতিক একক যেখানে বিভিন্ন জীবসমষ্টি পরস্পরের সাথে এবং তাদের পারিপার্শ্বিক জৈব ও অজৈব উপাদানের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে একটি জীবনধারা গড়ে তোলে । যাইহোক, এলাকাটি বিশেষ করে নিইংচি শহর সম্প্রতি উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতকে রক্ষা করার জন্য সংরক্ষণ প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে । বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এলাকার পরিবেশগত বৈচিত্র্যকে আরো ভালোভাবে বুঝতে এবং পরিবেশগত সুরক্ষা প্রচেষ্টায় সাহায্য করার জন্য এ অঞ্চলে লম্বা গাছের নথিভুক্ত করেছেন । গত বছরের মে মাসে গবেষক দলটি দক্ষিণ-পশ্চিম চীনে ২৭২ ফুট লম্বা (৮৩ মিটার) প্রাচীনতম একটি ফার গাছ (Fir tree) খুঁজে পেয়েছিল, যেটিকে তারা প্রাথমিকভাবে বিশ্বাস করেছিলেন যে এটিই চীনের বৃহত্তম গাছ । এছাড়াও দলটি এক মাস আগে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের আবহাওয়া প্রতিকূল ও বিপদসঙ্কুল মেডগ বিভাগ বা জেলাতে (Medog County) ২৫২ ফুট (৭৭ মিটার) উচ্চতার আরেকটি গাছ উদ্ঘাটিত বা উন্মোচন করেছিল । এ বছর গবেষকরা তাদের জরিপ অব্যাহত রেখে ড্রোন, লেজার এবং রাডার সরঞ্জাম ব্যবহার করে এলাকার গাছের মানচিত্র তৈরি করেন এবং মাটি থেকে তাদের উচ্চতা চিহ্নিত করেছেন । কয়েকদিনের মাঠ জরিপের পর দৈত্যাকার সাইপ্রেস গাছটি পাওয়া গেছে ৷ তারা ড্রোন (Drone) ব্যবহার করে একটি থ্রিডি লেজার স্ক্যানার (3D laser scanner) এবং লিডার প্রযুক্তি (Lidar technology) দ্বারা যা দূরত্ব পরিমাপ প্রদান করতে হালকা মরীচি বা রশ্মি (Beam) ব্যবহার করেন । গবেষক দলটি সঠিক মাত্রা প্রদান করে এ বিশাল গাছের একটি থ্রিডি মডেল তৈরি করেছে । এটি ব্যবহার করে তারা নিশ্চিত করেছেন যে, এটিই এশিয়ার সবচেয়ে লম্বা গাছ । ক্রিমানা ফর্মটিও (Krimana form) প্রকৃত গাছের সঠিক মাত্রা অনুসরণ করে প্রস্তুত করা হয় । গবেষকরা আশা করছেন যে, এ ত্রিমাত্রিক মডেল তাদের একই প্রজাতির অন্যান্য গাছ সম্পর্কে আরো বুঝতে সাহায্য করবে । পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের রিমোট সেন্সিং ইনস্টিটিউটের (Institute of Remote Sensing) অধ্যাপক গুও কিংহুয়া (Guo Qinghua) রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমসকে বলেছেন যে, এ গাছের বিশেষত্ব হচ্ছে এর সহায়ক শিকড় সম্পূর্ণরূপে মাটির নিচে থাকে না । অনেক বিরল উদ্ভিদ প্রজাতিও ছড়িয়ে থাকা শিকড়ের নিচে বাস করে । গাছটির একটি জটিল শাখা ব্যবস্থাও রয়েছে যা “কিছু বিপন্ন উদ্ভিদ এবং প্রাণীদের জন্য আদর্শ স্বল্প জলবায়ু এবং স্বাভাবিক আবাসস্থল” প্রদান করে । বর্তমানে ৩৮১ ফুট (১১৬ মিটার) উচ্চতার বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা উপকূলীয় রেডউড (Coastal redwood, বৈজ্ঞানিক নাম: Sequoia sempervirens) গাছটির অবস্থান হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ার রেডউড ন্যাশনাল পার্কে । এ প্রাচীন গাছটি ৬০০ থেকে ৮০০ বছরের মধ্যে পুরোনো বলে মনে করা হয় এবং গ্রীক পৌরাণিক কাহিনীতে টাইটানদের একজনের নাম অনুসারে এর ডাকনাম হাইপেরিয়ন (Hyperion), এটি ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে আবিষ্কৃত হয়েছে । গত বছর ইউ. এস. পার্ক সার্ভিস (U.S. Park Service) হাইপারিয়নে জনসাধারণের প্রবেশাধিকার সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয় কারণ দর্শনার্থীদেরকে গাছে আরোহণ এবং এলাকায় বর্জ্য ফেলতে দেখা যায়, ফলে আশেপাশের নিচের পুষ্টি বা ক্রমবিকাশকে (Undergrowth) ক্ষতিগ্রস্ত করে । বিশ্বের তৃতীয় উচ্চতম গাছ হওয়ার রেকর্ড মালয়েশিয়ার ৩৩১ ফুট (১০০.৮ মিটার) হলুদ মেরান্টি গাছটি । চতুর্থ স্থান অস্ট্রেলিয়ার পর্বত ছাইকে (Mountain Ash) দেয়া হয়েছে যার পরিমাপ ৩২৯.৭ ফুট (১০০.৫ মিটার) । বিশ্বের পঞ্চম স্থানের অধিকারী গাছটি হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের প্রেইরি ক্রিক রেডউডস স্টেট পার্কের ৩২৯ ফুট (১০০.২ মিটার) Sitka spruce (Picea sitchensis) । এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের রাজ্য ওরেগন এর ব্রুমিট ক্রিক, কুস কাউন্টিতে ৩২৭ ফুট (৯৯.৭ মিটার) Coast Douglas-fir (Pseudotsuga menziesii var. menziesii) গাছটি বিশ্বের ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে । সাইপ্রেস বলতে ১২ প্রজাতির আলংকারিক এবং কাঠ চিরসবুজ শঙ্কুযুক্ত উদ্ভিদের যে কোনো একটিকে বোঝায়, যা Cupressus গণের অন্তর্গত । এগুলো এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা বিশেষত উষ্ণ নাতিশীতোষ্ণ এবং উপক্রান্তীয় অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃতি লাভ করেছে । সাইপ্রেস গাছগুলো তাদের অদ্ভুত এবং অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিচিত । এ গাছগুলো মানুষ এবং পরিবেশের জন্য বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করে । মাথাব্যথা, প্রদাহ এবং কাশি চিকিৎসার জন্য ঐতিহ্যগত ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয় । যেহেতু এগুলোতে একটি সক্রিয় উপাদান রয়েছে যা উইপোকা বিকর্ষণ করে, তাই এগুলো পোকামাকড় তাড়ানোর বৈশিষ্ট্যযুক্ত পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয় । সর্বোপরি সাইপ্রাস গাছগুলো নির্মাণ সামগ্রীর একটি ভালো উৎস হিসেবে বিবেচিত হয় । বিশেষ করে মেঝে, দরজা এবং স্থাপত্য কাঠের কাজ তৈরিতে । তারা ৫০ থেকে ১৫০ ফুট পর্যন্ত ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে এবং ১০০ থেকে ৬০০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় বাঁচতে পারে । দীর্ঘমেয়াদে গবেষকরা গিরিখাতের সাইপ্রাস গাছগুলোকে তাদের বৈশিষ্ট্য যেমন জনসংখ্যা, বন্টন ঘনত্ব এবং বয়স সম্পর্কে গবেষণা বা অধ্যয়ন করার জন্য নিরীক্ষণ করার পরিকল্পনা করেছেন । তারা ইয়ারলুং জাংবো গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের জীববৈচিত্র্য এবং অনাবিষ্কৃত গাছগুলো বিশ্লেষণ করতে আরো অনেকাংশে অন্বেষণ করার লক্ষ্য রাখে ।

তথ্যসূত্র: livescience.com (by science writer Lydia Smith),  https://www.sciencetimes.com/ , উইকিপিডিয়া ৷  ছবি: https://www.livescience.com/


Monday, 19 June 2023

জুনো মহাকাশযান বৃহস্পতির ঘূর্ণিঝড়ে বজ্রপাতের আভা ধারণ করেছে



NASA এর জুনো মহাকাশযান আমাদের অদ্ভুত সৌরজগতের একটি প্রাণবন্ত চিত্র ধারণ করেছে  ৷ এটি বৃহস্পতি গ্রহের ঝড়ের ভিতরে বজ্রপাতের গগনচারী সৌন্দর্যের অনুপম দৃশ্য ধারণ করে আরেকটি অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জন করেছে । যা বৃহস্পতি-প্রদক্ষিণ মিশনের একটি মাইল ফলক । বৃহস্পতির উত্তর মেরুর কাছে ঘূর্ণায়মান ঘূর্ণি ঝড় বা ঘূর্ণিবাত্যার মধ্যে বজ্রপাতের চমক বা আভা দেখাচ্ছে । এটি সম্ভবত বাদামী অ্যামোনিয়া-জল দ্রবণযুক্ত মেঘ থেকে উদ্ভূত হয়েছে, যা পৃথিবীতে ফুঁপানো জলীয় বাষ্পের মেঘের চেয়ে কিছুটা আলাদা । পৃথিবীর মতো এ মেঘগুলোর মধ্যে প্রায়শই বজ্রপাত হয় এবং বেশিরভাগ বজ্রপাত প্রধানত মেরুগুলোর কাছাকাছি দেখা যায় । পৃথিবীতে বজ্রপাতগুলো জলের মেঘ থেকে উদ্ভূত হয় এবং প্রায়শই বিষুবরেখার কাছাকাছি ঘটে । 

বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের লালিত বাসনা যে, সূর্য থেকে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন মাইল দূরে থাকা আমাদের সৌরজগতের সর্ববৃহৎ গ্রহ বৃহস্পতি সম্পর্কে এবং তার হীমশীতল চাঁদে নোনা জলের সমুদ্র, জীবন বা প্রাণের অস্তিত্ব ও বাসযোগ্যতার লক্ষণগুলো অন্বেষণ করা ৷ বেশ কিছুদিন যাবৎ বিজ্ঞানীদের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে চাঁদে প্রাণের অস্তিত্বের পাশাপাশি বাসযোগ্যতার বিষয়টি ৷ পৃথিবী একটি অপেক্ষাকৃত ছোট পাথুরে গ্রহ । কিন্তু বৃহস্পতি বিশাল গ্রহ, যার নাম হচ্ছে একজন প্রাচীন রোমান দেবতার নাম । এ গ্যাস দৈত্য এতোটাই বিশাল যে আমাদের সৌরজগতের অন্য সমস্ত গ্রহগুলো এর ভিতরে সুন্দরভাবে মানানসই করতে পারে —  ১৩০০ টিরও বেশি পৃথিবী সহ । গ্যাস দানব বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুন গ্রহ চারটিকে একত্রে 'জোভিয়ান গ্রহ' (Jovian planet ) বলে । বৃহস্পতি গ্রহকে প্রদক্ষিণকারী ৯৫টি উপগ্রহ বা চাঁদের মধ্যে চারটি হচ্ছে গ্যালিলীয় চাঁদ যেমন: ইউরোপা (Europa), ক্যালিস্টো (Callisto), আইও (Io) এবং গ্যানিমিড (Ganymede) –  যেগুলোর কোনোটি বরফ পৃষ্ঠের নিচে গভীর তরল জলের মহাসাগরকে আশ্রয় দেয়, যেখানে সামুদ্রিক প্রাণ বা জীবন থাকতে পারে । ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ এবং দার্শনিক গ্যালিলিও গ্যালিলি প্রথম এ চারটি উপগ্রহ বা চাঁদকে আবিষ্কার করেন বলে তার নামানুসারে চাঁদগুলোর নামকরণ হয় গ্যালিলীয় চাঁদ । বৃহস্পতি প্রধানত হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের সমন্বয়ে গঠিত এবং সামান্য পরিমাণ অন্যান্য গ্যাস । ফিতে (Stripes) এবং কয়েকটি ঘূর্ণিঝড় বৃহস্পতির রঙিন চেহারায় প্রাধান্য পায় । এটি সূর্য থেকে পঞ্চম গ্রহ, যার ব্যাস প্রায় ১৪৩০০০ কিলোমিটার । বৃহস্পতি গ্রহ বিখ্যাতভাবে প্রচণ্ড জটিকাপূর্ণ । এর মহা লাল বিন্দু (Great Red Spot) পৃথিবীর চেয়েও বিশাল বড় একটি ঘূর্ণি, যা শতাব্দী কাল ধরে ঘুরছে । হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম প্রধান বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে জল ও অ্যামোনিয়ার ঝড়ো মেঘগুলো ঘূর্ণায়মান হয় । যাই হোক, সেই বৃহস্পতি গ্রহেই জুনো মহাকাশযানটি আশ্চর্যজনক এক আবিষ্কার করেছে । মহাকাশযানটি ৫০ বার বৃহস্পতির চারপাশে ঘুরেছে । এখন এটি বৃহস্পতির ৫১তম মিশনে রয়েছে, যার ফলে আগামী জুলাই, অক্টোবর এবং ডিসেম্বরের শেষের দিকে বৃহস্পতির আইও (Io) চাঁদের সবচেয়ে কাছ দিয়ে অতিক্রম করবে এবং পরের বছরের ফেব্রুয়ারিতে আইও চাঁদের সাথে যমজ উড়ান (Twin flyby) মুখোমুখি হবে ৷ এ সমস্ত উড়ানগুলো পরম বিস্ময়কর আইও চাঁদের আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপের দর্শনীয় দৃশ্য প্রদান করছে বা করবে ৷ মহাকাশযানটি জোভিয়ান চাঁদ আইও এবং এর অগ্ন্যুৎপাত হওয়া আগ্নেয়গিরি থেকে মাত্র ৯৩০ মাইল দূরে চলে যাবে । 

বৃহস্পতির বজ্রপাত পৃথিবীর মতোই আশ্চর্যজনকভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ । একটি নতুন সমীক্ষায় দেখা গেছে যে বজ্রপাত জীবনকে চমকে দেয় এবং বৃহস্পতিতে একইভাবে বিবর্তিত হয় যেভাবে এটি পৃথিবীতে ঘটে । জোভিয়ান বজ্রপাত পৃথিবীর মতো একই "ধাপ-ভিত্তিক" (Step-wise) উপায়ে ঘটে । দুটি গ্রহ তাদের আকার ও গঠনে বিপরীত হওয়া সত্ত্বেও বৃহস্পতি এবং পৃথিবীতে বজ্রপাত প্রক্রিয়ায় গ্রহ দুটিতে বজ্রপাতের হার একই । যদিও বৃহস্পতিতে বজ্রপাতের বন্টন পৃথিবীর থেকে আলাদা । তবুও, উভয়ই একই ধরণের বৈদ্যুতিক ঝড়ের অতিথিসেবক বা স্বাগতিক । NASA এর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন যে, এ ঘূর্ণিঝড়ের মেঘে আরো বজ্রপাত দেখা যাবে । আসন্ন মাসগুলোতে জুনোর কক্ষপথগুলো বারবার এটিকে বৃহস্পতির কাছাকাছি নিয়ে যাবে কারণ মহাকাশযানটি দৈত্য গ্রহের রাতের পাশ দিয়ে চলে যাবে, যা জুনো মহাকাশযানের বিজ্ঞান যন্ত্রের অনুচরবৃন্দকে বজ্রপাত দৃশ্য ধারণের সাক্ষী হওয়ার জন্য আরো বেশি অতুলনীয় সুযোগ প্রদান করবে । বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলের রহস্যময় কার্যকারিতা সম্পর্কে অমূল্য অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করবে । বজ্রপাত পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাকৃতিকভাবে ঘটে যাওয়া বৈদ্যুতিক উৎস । চেক একাডেমি অফ সায়েন্সেস (Czech Academy of Sciences) এর গ্রহ বিজ্ঞানী ইভানা কোলমাসোভা (Ivana Kolmasova) বলেন, "বজ্রপাত হচ্ছে একটি বৈদ্যুতিক নিঃসরণ, যা বজ্রঝড়ের মধ্যে শুরু হয় । মেঘের অভ্যন্তরে থাকা বরফ এবং জলের কণা সংঘর্ষের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক বা তড়িৎ আধান (Charge) হয়ে যায় এবং একই মেরুত্বের আধানে কণার স্তর তৈরি করে । এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি বিশাল বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নির্গত করতে পারে । যদিও ব্যাখ্যাটি কিছুটা সরলীকৃত, কারণ বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নন যে, বজ্রপাতের ভিতরে ঠিক কি ঘটছে ।" ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে NASA এর ভয়েজার ০১ মহাকাশযান দ্বারা বৃহস্পতি গ্রহে বজ্রপাতের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছিল যা শ্রবণযোগ্য ফ্রিকোয়েন্সিতে টেলটালে রেডিও নির্গমনের (Telltale radio emissions) সময় রেকর্ড করা হয় যখন এটি সৌরজগতের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল । জুনো মহাকাশযানের তরঙ্গ যন্ত্রটি তার পূর্বসূরীদের তুলনায় দশ গুণ বেশি রেডিও নির্গমন সংগ্রহ করেছে । এটি এক মিলিসেকেন্ডের কাছাকাছি দ্বারা পৃথক করা বজ্রপাতের সংকেতগুলোকে তুলে ধরে । বিজ্ঞানী ইভানা কোলমাসোভা আরো বলেন, সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং এবং কাজের সবচেয়ে সময়সাপেক্ষ অংশ ছিল তরঙ্গ যন্ত্রের রেকর্ডে বজ্রপাতের সংকেত অনুসন্ধান করা । বৃহস্পতি গ্রহে বজ্রপাতের এমন একটি ধাপ কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার মিটার দীর্ঘ যে কোনো জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে পারে । যদিও বিদ্যমান জুনো মহাকাশযানের তথ্য দিয়ে নিশ্চিত করা কঠিন । যখন পৃথিবী এবং বৃহস্পতি গ্রহে একইভাবে বজ্রপাত হয়, যেখানে এ ঘটনাগুলো ঘটে উভয় জগতেই সম্পূর্ণ আলাদা । গ্যাস দৈত্যের উপর, বজ্রঝড়ের একটি বড় অংশ মধ্য অক্ষাংশ ও উচ্চতর এবং মেরু অঞ্চলে পাওয়া গেছে । তারা বিশাল গ্রহের বিষুবরেখায় অনুপস্থিত, যা ঘরে ফিরে বজ্রঝড়ের বিপরীত, যেখানে বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলগুলো সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতের বিবরণ করে ৷ পৃথিবীতে মেরুগুলোর কাছাকাছি আমাদের প্রায় কোনো বজ্রপাতের কার্যকলাপ নেই । এর মানে হচ্ছে যে, জোভিয়ান এবং স্থলজ বা পার্থিব বজ্র মেঘের গঠনের শর্তগুলো সম্ভবত খুব আলাদা । বৃহস্পতিতে বজ্রপাত একপাশে ছড়িয়ে পড়ে, উত্তর গোলার্ধে এর দক্ষিণ অর্ধেকের চেয়ে বেশি আঘাত হানে । এর কারণ অবশ্য এখনো স্পষ্ট নয় । আমরা এটিও জানি না, কেন আমরা এখনো পর্যন্ত মহা লাল বিন্দু (Great Red Spot) থেকে কোনো বজ্রপাত দেখতে পাইনি ।'' এ গবেষণাটি গত ২৩শে মে ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে নেচার কমিউনিকেশন (Nature Communication) সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বর্ণিত হয়েছে । সৌরজগতের অন্যান্য গ্যাস গ্রহ যেমন: শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুনেও বজ্রপাত দেখা যায় । পাথুরে গ্রহ শুক্রের মেঘেও বজ্রপাতের কিছু প্রমাণ রয়েছে, যদিও এটি এখনো বিতর্কের বিষয় । পৃথিবীতে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলগুলো সবচেয়ে সক্রিয় । বেশিরভাগ জোভিয়ান বজ্রপাত (Jovian lightning) মধ্য-অক্ষাংশে এবং মেরু অঞ্চলেও ঘটে । আমাদের পৃথিবীর মেরুগুলোর কাছাকাছি কোনো বজ্রপাতের কার্যকলাপ নেই । এর অর্থ হচ্ছে যে, গঠনের জন্য শর্তগুলো জোভিয়ান এবং স্থলজ বা পার্থিব বজ্রপাত সম্ভবত খুব আলাদা । অপটিক্যাল পরিমাপের উপর ভিত্তি করে বজ্রপাতের শক্তি তুলনা করার কিছু প্রচেষ্টা করা হয়েছিল এবং এর উপসংহারে পৌঁছেছিল যে, বৃহস্পতিতে বজ্রপাত সবচেয়ে শক্তিশালী স্থলজ বজ্রপাতের সাথে তুলনীয় হতে পারে । পৃথিবীতে বজ্রপাতের উৎপত্তি হয় উত্তাল মেঘের অভ্যন্তরে । যার ঊর্ধ্বমুখী বাতাস জলের ফোঁটা তুলে বরফে পরিণত করে । যখন নিম্নগামী বাতাস সেই হিমশীতল ব্লবগুলোকে (Blob) মেঘের নিচে ঠেলে দেয় । যেখানে পতিত বরফ ক্রমবর্ধমান জলের ফোঁটাগুলোর সাথে মিলিত হয়, ইলেকট্রনগুলো পূর্বের থেকে ছিনিয়ে নেয় । যার ফলে একটি মেঘ তৈরি হয়, যেটির ভিত্তি ঋণাত্মক বৈদ্যুতিক আধানযুক্ত ও শীর্ষটি ধনাত্মক এবং বায়ু নিরোধক দ্বারা পৃথক হয় । যখন এ বৈদ্যুতিক আধানগুলো তৈরি হয়, তখন সুপরিচিত বজ্রপাত চমক আঘাত করে একটি মেঘের মধ্যে বা কখনো কখনো মেঘের ভিত্তি থেকে মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে । যদিও পৃথিবীতে বজ্রপাতকে দূর থেকে লম্বা, মসৃণ আভার মতো দেখায় । গবেষকরা জানান যে, বিদ্যুতের প্রতিটি স্ফুলিঙ্গ প্রকৃতপক্ষে স্বতন্ত্র পদক্ষেপ দ্বারা তৈরি । প্রতিটি পদক্ষেপ বিচ্ছিন্ন রেডিও নির্গমনকে বের করে দেয়, যার সনাক্তকরণ প্রায়শই বজ্র মেঘের ভিতরে কি ঘটছে তা বোঝার একমাত্র উপায় । গ্রহ বিজ্ঞানী Ivana Kolmasova বলেন, "এটি স্পষ্ট ছিল না যে এ ধরনের পদক্ষেপের প্রক্রিয়া জোভিয়ান মেঘেও ঘটে কি না ।" 

জুনো মহাকাশযানটি ৩০শে ডিসেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দে বৃহস্পতির ৩১তম কাছাকাছি উড়ান (flyby) সফলভাবে সম্পন্ন করার সময় উত্তর মেরুর কাছে বজ্রপাত থেকে নির্গত আলোকিত আভার মন্ত্রমুগ্ধকর দৃশ্যটি ধারণ করেছিল । ২০২২ খ্রিস্টাব্দে নাগরিক বিজ্ঞানী কেভিন এম. গিল (Kevin M. Gill) মহাকাশযানে থাকা জুনোক্যাম (JunoCam) যন্ত্রের কাঁচা বা অশোধিত তথ্য (Raw data) থেকে ছবিটি প্রক্রিয়া করেছেন । কাঁচা চিত্রটি তোলার সময় জুনো মহাকাশযান বৃহস্পতির মেঘের শীর্ষ থেকে প্রায় ১৯৯০০ মাইল (৩২০০০ কিলোমিটার) উপরে ছিল, প্রায় ৭৮ ডিগ্রি অক্ষাংশে মহাকাশযানটি গ্রহের কাছে আসার সময় । এ চিত্তাকর্ষক আবিষ্কারটি আমাদের প্রতিবেশী গ্যাস দৈত্য গ্রহে ঘটতে থাকা স্বর্গীয় ঘটনার উপর নতুন আলোকপাত করে এবং বৃহস্পতি গ্রহের বিশাল বিস্তৃতির মধ্যে লুকানো রহস্য উদঘাটনের জন্য কৌতূহলী মনকে ইঙ্গিত করে । জুনোক্যাম দ্বারা ধারণ করা কাঁচা ছবিগুলোকে অসাধারণ ইমেজ পণ্যগুলোতে অন্বেষণ এবং প্রক্রিয়াকরণের জন্য জনসাধারণের কাছে সুগম বা সহজগম্য করা হয়েছে । তথ্য ভাগ করে নেয়ার এ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিটি উৎসাহী এবং বিশেষজ্ঞদের একইভাবে বৃহস্পতির রহস্যময় বায়ুমণ্ডলের জটিলতাগুলো অনুসন্ধান করার পাশাপাশি মহাজাগতিক এ প্রতিবেশীর চলমান বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে অবদান রাখতে সাহায্য করবে । জুনো মিশন (Juno Mission) দ্বারা বৃহস্পতির বজ্রপাতের ঝড় পর্যবেক্ষণ এবং নথিভুক্ত করার ক্ষমতা আমাদের সৌরজগতের বিস্ময়কর এবং গতিশীল প্রকৃতির একটি আভাস দেয় । মহাজাগতিক বৃহত্তম গ্রহের চারপাশের রহস্য উন্মোচন করে এবং অন্বেষণের জন্য নতুন দরজা খুলে দেয় । মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের বুঝতে (জ্ঞানের পরিধিকে) সমৃদ্ধ করে যাকে আমরা বাড়ি বলে থাকি । উল্লেখ্য যে: জুনো মিশন হচ্ছে NASA এর একটি মহাকাশ অনুসন্ধান, যা বৃহস্পতি গ্রহকে প্রদক্ষিণ করছে । এটির উদ্দেশ্য হচ্ছে বৃহস্পতি গ্রহের উৎপত্তি ও গঠন, এর চাঁদ সম্পর্কে, গ্রহে পাথুরে কেন্দ্রস্থল আছে কি-না, গ্রহের বায়ুমণ্ডলে জলের পরিমাণ, ভর বিতরণ, মহা লাল বিন্দু, গভীর বাতাস, মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র, চৌম্বক ক্ষেত্র এবং মেরু চুম্বকমণ্ডল ইত্যাদি পরিমাপ করা । জুনো মিশনটি NASA এর New Frontiers Program এর অংশ, যেটি ওয়াশিংটনে এজেন্সির বিজ্ঞান মিশন অধিদপ্তরের (Science Mission Directorate) জন্য আলাবামার হান্টসভিলে নাসা’র Marshall Space Flight Center এ পরিচালিত হয় ৷ যুক্তরাষ্ট্রের (ডেনভার) মহাকাশ, প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা বিষয়ক কোম্পানি লকহিড মার্টিন স্পেস (Lockheed Martin Space) মহাকাশযান তৈরি এবং পরিচালনা করে । 

তথ্যসূত্র:  https://www.nasa.gov/ ,  https://www.cbc.ca/   ,  https://www.space.com/  ,  আন্তর্জাল (The Internet) ।   ছবি: https://www.nasa.gov/

Tuesday, 13 June 2023

এশিয়ার শীর্ষ ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় বাংলাদেশের দু'জন নারী

                                                                          Senjuti Saha


                                                    Dr. Gawsia Wahidunnessa Chowdhury


গবেষণায় অনবদ্য অবদান রাখার জন্য সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি বিষয়ক 'Asian Scientist' সাময়িকীতে এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশের দু'জন নারী বিজ্ঞানী । Asia's Top 100 🌏 । জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহ চক্র, কাঠামোগত ভূতত্ত্ব অনুসন্ধান এবং মহাকাশ গবেষণা ইত্যাদির মতো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা মোকাবিলায় অবদান রাখা বিশ্বের নানা গবেষক এবং উদ্ভাবকদের বেছে নেয়া হয়েছে । গত ১১ই জুন ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে এ তালিকা প্রকাশ করা হয় । এদের মধ্যে একজন হচ্ছেন সেঁজুতি সাহা (Senjuti Saha) এবং অন্যজন অধ্যাপক ডঃ গাওসিয়া ওয়াহিদুন্নেছা চৌধুরী (Dr. Gawsia Wahidunnessa Chowdhury) । সেঁজুতি সাহা 'Life Science' এবং ডঃ গাওসিয়া ওয়াহিদুন্নেছা চৌধুরী টেকসই জলবায়ুর ‘Sustainability’ এর ক্ষেত্রে অবদানের জন্য মর্যাদাপূর্ণ এ তালিকায় স্থান পেয়েছেন । সত্যিই, বিশ্বের বুকে নারীদের অগ্রযাত্রার জয়গান । তারা দু'জনই তাদের কর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য এক বিরল সম্মান বয়ে এনেছেন । আমরা গর্বিত । তাদেরকে অভিনন্দন! তারা আমাদের অনুপ্রেরণা ।

বাংলাদেশের উজ্জ্বল নক্ষত্র, তরুণ প্রতিভাময়ী অণুজীব বিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহা ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র (WHO) একজন পরামর্শক । তিনিই প্রথম বাংলাদেশি বিজ্ঞানী হিসেবে সংস্থাটির বিশ্বব্যাপী পোলিও নির্মূল কর্মোদ্যোগ সম্পর্কিত The Polio Transition Independent Monitoring Board (TIMB) এর একজন সদস্য । উল্লেখ্য যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র বৈশ্বিক পোলিও নির্মূল উদ্যোগ (Global Polio Eradication Initiative / GPEI) সম্পর্কিত বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে সারা পৃথিবীর খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে The Independent Monitoring Board (IMB) গঠিত ৷ এটি মূলত বিশ্বব্যাপী পোলিও রোগ বিস্তার সম্পর্কে তথ্য, পোলিওভাইরাস সনাক্তকরণ, রোগ প্রতিরোধ বা নির্মূলকরণ, স্বাধীন পর্যবেক্ষণ, অভীষ্ট লক্ষ্যপূরণ, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং পোলিও মুক্ত বিশ্ব অর্জনের জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে থাকে ৷ এছাড়া বৈশ্বিকভাবে পোলিও মহামারীর উপর ভিত্তি করে এটি রোধকল্পে মূল মাইলফলকের দিকে অগ্রগতির মূল্যায়ন করে ৷ মাইলফলক যদি At risk, Off track বা Missed হয়েছে বলে দেখা যায় তবে সংক্রামিত স্থানকে কেন্দ্র করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বাস্তবায়নকারী অংশীদার অথবা দাতা সংস্থাগুলোকে দিক নির্দেশনাসহ প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক কর্ম পরিকল্পনা (আর্থিক দিকও হতে পারে) এবং পথ প্রদর্শনের মাধ্যমে এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকে । এছাড়া অন্যান্য কার্যক্রমের উপর তথ্যের ভিত্তিতে গৃহীত বা সম্পাদিত কার্যের গুণমান মূল্যায়ন করে সঠিক পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে । ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদে (World Health Assembly) পোলিও সম্পর্কিত বিল অনুমোদনের পর থেকে ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’ পোলিও সংক্রমণ পরিস্থিতি ও বিশ্বের দেশগুলোর জনস্বাস্থ্যের অবকাঠামো ব্যবস্থা সুরক্ষিত করা বা এটিকে টিকিয়ে রাখতে বিশেষ করে অপরিহার্য টিকাদান, বৃহত্তর সংক্রামক রোগের নজরদারি, পর্যবেক্ষণ, সতর্কতা এবং জরুরি প্রতিক্রিয়ার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে । আণবিক জিনতত্ত্বের গবেষক সেঁজুতি সাহা মনিটরিং বোর্ডের অন্যান্য সদস্যদের সাথে তিনি ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’কে পোলিও নির্মূল প্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে মহাপরিচালক পর্যায়ে পরামর্শ দিয়ে থাকেন । এতে করে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে নানা সংক্রামক ব্যাধি রোধকল্পে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য এক তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফল বয়ে নিয়ে আসছে, যা এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে । সেঁজুতি সাহা মূলত Microbiology, Epidemiology এবং Global Health নিয়ে গবেষণা করেন । ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে বৈশ্বিকভাবে শ্বাসযন্ত্রের সংক্রামক রোগ করোনা ভাইরাস (Covid-19) ছড়িয়ে পড়ার পর সেঁজুতি সাহা তার বাবার সাথে যৌথভাবে বাংলাদেশে বেসরকারি শিশু স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (Child Health Research Foundation / CHRF) গবেষণাগারে প্রথমবারের মতো তীব্র শ্বাসযন্ত্রীয় রোগলক্ষণসমষ্টি সৃষ্টিকারী নভেল করোনাভাইরাসের (SARS-CoV-2) জিন-নকশা বা বিন্যাসক্রমের (Genome sequencing) কাজে গবেষকদের একটি দলকে নেতৃত্ব দিয়ে সফলভাবে শেষ করেছেন । CHRF এর এ প্রকল্পটিকে স্বাস্থ্য পরিষেবা মহাপরিদপ্তর (Directorate General of Health Services), রোগবিস্তার বা মহামারী-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান (Institute of Epidemiology), রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা (Disease Control and Research), বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন (Bill and Melinda Gates Foundation) এবং চ্যান জাকারবার্গ বায়ো হাব (Chan Zuckerberg Biohub) থেকে সহায়তা করে । সেঁজুতি সাহার বাবা অধ্যাপক ডাঃ সমীর কুমার সাহা একজন অণুজীব বিজ্ঞানী ৷ তিনি বাংলাদেশের শিশুরোগ চিকিৎসা সংক্রান্ত বৃহত্তম হাসপাতাল ঢাকা শিশু হাসপাতালের অনুজীববিজ্ঞান বা জীবার্ণুবিজ্ঞান (Microbiology) বিভাগের প্রধান এবং CHRF এর নির্বাহী পরিচালক । ডাঃ সমীর কুমার সাহা শিশুদের জন্য সরকারের গৃহীত টিকাদান কর্মসূচী, স্বাস্থ্যসেবায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগীতার পাশাপাশি CHRF কর্তৃক এ সকল রোগের টিকা ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিশুমৃত্যু হার কমিয়ে আনতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন । বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংক্রামক রোগ থেকে শিশুমৃত্যু হার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ডাঃ সমীর কুমার সাহা CHRF গড়ে তুলেছেন নিজ মেধা, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং পরম মমতায় । এখানে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে RSV সংক্রমণ এবং নিউমোনিয়া (Pneumonia) রোগ সম্পর্কে নানাবিদ গবেষণা চলছে । সেঁজুতি সাহা বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে একজন অণুজীব বিজ্ঞানী (Microbiologist) হিসেবে কাজ করছেন । Meningitis (মস্তিষ্কের সংক্রমণ) হচ্ছে মস্তিষ্কে এক ধরণের সংক্রমণ বা প্রদাহ এবং Pneumonia হচ্ছে ব্যাকটিরিয়া, ভাইরাস ও ছত্রাক দ্বারা মানবদেহের অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ফুসফুসকে সংক্রমণ করে ৷ ফলে ফুসফুসের বায়ু থলিতে (Alveoli) প্রদাহ সৃষ্টি করে এক প্রকার তরল বা পুঁজের সৃষ্টি হয় ৷ এতে করে আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাসে তীব্র কষ্ট এবং ব্যথা অনুভূত হয়, এমনকি মৃত্যুও ঘটে ৷ নিউমোনিয়া এবং মেনিনজাইটিস এ দু’টি মরণব্যাধি হচ্ছে শিশুমৃত্যুর বড় কারণ । ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে নবজাতক ও শিশুদের মধ্যে মেনিনজাইটিস রোগ বেড়ে গেলে সেঁজুতি সাহা শিশুদের জিনগত উপাদানগুলো বিশ্লেষণ করে এর রহস্য উন্মোচন করতে সক্ষম হন । তিনি আবিষ্কার করেন যে, মেনিনজাইটিসের প্রকোপ বৃদ্ধি পায় মশা এর দ্বারা ছড়িয়ে পড়া চিকুনগুনিয়া জ্বরের (Chikungunya fever) প্রাদুর্ভাবের কারণে । তিনি বিশ্বে প্রথম দেখান যে, চিকুনগুনিয়া ভাইরাস শিশুদের মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে ও বাংলাদেশী শিশুদের মেনিনজাইটিস রোগ সৃষ্টি করে । ভবিষ্যতে মেনিনজাইটিস এবং অন্যান্য মারাত্মক রোগের প্রাদুর্ভাব দ্রুত সমাধানের জন্য দেশকে সহায়তা করতে তিনি তখন থেকেই বাংলাদেশে একটি স্বল্প ব্যয়ে রোগ নির্ণয় সংক্রান্ত বিশেষ যন্ত্রপাতি শিশুস্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান CHRF এ স্থাপন করেন ৷ মেনিনজাইটিসের কারণে যে সমস্ত শিশুদেরকে দীর্ঘকালীন অক্ষমতা নিয়ে বাঁচতে হয়, তাদের জন্য সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি একজন সামাজিক কর্মী এবং অণুজীব বিজ্ঞানী হিসেবে ‘মেনিনজাইটিস’ নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন । সেঁজুতি সাহা Bangladesh International Tutorial থেকে তার বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে প্রথমে BSc ডিগ্রি, John Hopkins Bloomberg School এ জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানী (Public Health Scientist), কানাডায় প্রাণরসায়নে (Biochemistry) স্নাতক ডিগ্রি এবং পরবর্তীতে University of Toronto https://www.utoronto.ca/ থেকে আণবিক জীনতত্ত্ব বিষয়ে (Molecular Genetics) PhD ডিগ্রি অর্জন করেন । তিনি Visiting Post Doctoral Scholar এ পড়াশোনার আগে Stanford School Of Medicine Associate Faculty তে পড়াশোনা করেন । সেজুঁতি সাহা ২৩শে এপ্রিল ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন । তার মা ডাঃ সেতারুন্নাহার সেতারা একজন অণুজীব বিজ্ঞানী । তার ছোট ভাই সুদীপ্ত কুমার সাহা University of Toronto বিশ্ববিদ্যালয়ে Microbiology and Global Health বিষয়ে পড়াশোনা করছেন । বলতে গেলে একটি বিজ্ঞানী পরিবার ৷ ব্যক্তিগত জীবনে সেজুঁতি সাহা বিবাহিত এবং তার স্বামী যোগেশ হুদা (Yogesh Hooda) একজন ভারতীয় নাগরিক । যিনি Medical Research Council Laboratory of Molecular Biology (MRC LMB) তে এবং যুক্তরাজ্যে একজন প্রাণরসায়নবিদ (Biochemist) হিসেবে কাজ করছেন । ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে তারা বিয়ে করেন । সেজুঁতি সাহা ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে 'Bil And Melinda Gates Award' পুরস্কারে ভূষিত হন । সারাবিশ্বে যারা নিজেদের সৃষ্টিশীল প্রতিভার মাধ্যমে সমাজকে বদলে দিয়ে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে অবদান রেখে চলেছেন, তাদেরকে নিয়ে মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস 'Heroes in the field' শিরোনাম করে Blog লিখে থাকেন । বিল গেটস (Bill Gates) বাংলাদেশের অণুজীব বিজ্ঞানী অধ্যাপক ডাঃ সমীর কুমার সাহা এবং তার মেয়ে সেঁজুতি সাহার ভূয়সী প্রশংসা করে লিখেন যে: https://www.gatesnotes.com/The-Sahas-are-battling-global-health-inequity?WT.mc_id=20200114193000_RLMForum_BG-FB&WT.tsrc=BGFB&linkId=80625611 '' বাংলাদেশি এ বাবা-মেয়ে বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্যের গতিশীল এক জুটি । এক্ষেত্রে তারা সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তথ্য-উপাত্ত, রোগ নির্ণয়ের সর্বাধুনিক পদ্ধতি এবং সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে টিকাদান কর্মসূচীকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের নিম্ন আয়ের দেশগুলোর সাথে সম্পদশালী দেশগুলোর স্বাস্থ্যসেবার যে পার্থক্য রয়েছে যেখানে শিশু মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি এবং এ ধরণের পার্থক্য কমিয়ে আনতে তারা সেখানে স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহের ফাঁকগুলো বন্ধ করতে কাজ করছেন । Child Health Research Foundation (CHRF) এর কাজের বদৌলতে এবং শিশুদের জন্য বর্তমান সরকারের গৃহীত টিকাদান কর্মসূচীর পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে পাঁচ বছর বয়সের নিচে শিশুমৃত্যু হার কমেছে । ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশ এখন প্রায় ৯৮ শতাংশ টিকাদান কর্মসূচীর আওতায় এসেছে । তাদের কাজের জন্য ধন্যবাদ ৷ বাংলাদেশ যদি রোগ প্রতিরোধে আরো বেশি কিছু করতে পারে তাহলে বাংলাদেশ এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে, যেখানে সংক্রামক ব্যাধি খুব কম থাকবে এবং হাসপাতালের বিছানাগুলো এক সময় ফাঁকা থাকবে ৷ CHRF বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশুমৃত্যু হার হ্রাস করার ক্ষেত্রে সাহায্যকারী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান । তাদের এ মহৎ কর্মকাণ্ড এবং গবেষণা শুধুমাত্র বাংলাদেশের জন্যই নয় বরং একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন দক্ষিণ এশিয়া তথাপি সারাবিশ্বে এর সুফল বয়ে নিয়ে আসবে ।'' ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ নিউইয়র্কে তৃতীয় বার্ষিক 'Gates Goalkeepers Event' এ সেঁজুতি সাহা বক্তব্য রাখেন, যেখানে ৪০০টি নীতিমালা গৃহীত হয় ৷ উক্ত অনুষ্ঠানে সরকারী প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ, সক্রিয় অংশগ্রহণকারী কর্মী, সংবাদ মাধ্যম, ব্যবসায়ী এবং এ গ্রহের সবচেয়ে ধনী ও সর্বাধিক দানশীল ব্যক্তিদের একজন বিল গেটস সহ বিভিন্ন গণ্যমান্য নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করেন । সেঁজুতি সাহা বিশ্বাস করেন “Science by and for the many, not the few” । তার দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বজুড়ে প্রত্যেকেরই বিজ্ঞানের অনুশীলন এবং এর সুবিধাগুলোতে সমান প্রবেশাধিকার পাওয়া উচিৎ । তিনি মনে করেন স্বাস্থ্য এবং গবেষণায় সাম্যভাব সৃষ্টি করাই তার কাজ এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মূল ভিত্তি । সেঁজুতি সাহা বাংলাদেশের একজন নেতৃস্থানীয় তরুণ বিজ্ঞানী যিনি বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য গবেষণায় সাম্যভাব বা সমদর্শিতার কারণ হিসেবে কাজ করছেন । জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চিকিৎসা বিজ্ঞান গবেষণায় অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি Junior Chamber International, Webby 2020 Award, Women of Inspiration 2021 Award এবং Chan Zuckerberg Initiative ইত্যাদি পুরষ্কার অর্জন করেন । শিক্ষা, মেধা, মনন, নিষ্ঠা এবং অধ্যবসায়ের কারণে সেজুঁতি সাহা এ যোগ্যতা অর্জন করেছেন, যা আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে ।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডঃ গাওসিয়া ওয়াহিদুন্নেছা চৌধুরী একজন শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং লেখক । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণীবিদ্যা (জলভূমি পরিবেশবিদ্যা) বিষয়ে Ph.D করেন । প্রাণী বৈচিত্র্য, জলাভূমি বাস্তুবিদ্যা এবং প্রাণিবিদ্যায় প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে তার ১৪ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে । তিনি বাংলাদেশের নৌপথে প্লাস্টিক দূষণের ঝুঁকির দিকে মনোনিবেশ করেন । প্লাস্টিক দূষণের ফলে পরিবেশ ও মানুষের উপর যে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে তা নিয়ে তিনি একাধিক গবেষণা করেছেন । বর্তমানে বাংলাদেশে বিপন্ন প্রজাতি এবং আবাসস্থল সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করছেন । বাংলাদেশে জলজ বাস্তুতন্ত্র এবং বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী সংরক্ষণে তার অবদানের জন্য ২০২২ খ্রিস্টাব্দে তাকে 'OWSD-Elsevier Foundation Award' দেয়া হয় । তিনি বাংলাদেশের প্রাণীবিদ্যাবিষয়ক সমিতির আজীবন সদস্য এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা Wild Team এর একজন বোর্ড সদস্য । এছাড়া আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সঙ্ঘের (IUCN) দক্ষিণ এশীয় 'Invertebrate Special Group' এর সহ-সভাপতি হিসেবেও নিযুক্ত হয়েছেন । অধ্যাপক ডঃ গাওসিয়া ওয়াহিদুন্নেছা চৌধুরী দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারীদের কর্মসংস্থান এবং ক্ষমতায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছেন । মাছ ধরার পরিত্যক্ত জালকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন করে কার্পেটের মতো প্রস্তুত করে (পদ্ধতি উদ্ভাবন) ব্যবহার উপযোগী পণ্যে পরিণত করার ফলে জলজ আবাসস্থল রক্ষার পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের জন্য আয়ের বিকল্প উৎস তৈরি করছেন । তিনি Commonwealth Academic Staff Scholarship এবং Wildlife Conservation Society Fellowship সহ অনেক পুরষ্কার এবং অনুদান পেয়েছেন । সরকারি, বেসরকারি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে কাজ করেন । এছাড়াও তিনি শিক্ষা ও যোগাযোগ কমিশন এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক মৈত্রীর Species Survival Commission সহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত গোষ্ঠীর সদস্য । অধ্যাপক ডঃ গাওসিয়া ওয়াহিদুন্নেছা চৌধুরী National Geographic Society এর সাগর থেকে উৎস গঙ্গা নদী অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন এবং বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন । সম্প্রতি তিনি Cambridge Prisms: প্লাস্টিক সম্পাদকীয় বোর্ড ( cambridge.org ) জার্নালের সম্পাদকীয় বোর্ডের সদস্য হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন ।

তথ্যসূত্র: https://www.asianscientist.com/ , https://du.ac.bd/ , আন্তর্জাল (Internet )। 

ছবি: Senjuti Saha

ছবি: Organization for Women in Science for the Developing World

https://www.asianscientist.com/as100/ 

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...