Sunday, 30 October 2022

দাম্পত্য জীবন

স্বামী-স্ত্রী’র সম্পর্ক পবিত্র । একে অপরের পরিপূরক । এক সুতোয় গাঁথা । দু’টি হৃদয়ের প্রতিশ্রুতি । দু’জনের দেহ দু’টি হলেও তাদের আত্মিক সম্পর্ক অভিন্ন । যদিও দু’জন জিনগতভাবে (Genetically) আলাদা ৷ বিপরীত দুই প্রান্তের । ভিন্ন সত্তা ৷ তবুও, দু’জনের মধ্যেই ভালোবাসার শাশ্বত দৃঢ় বন্ধন ৷ এক অদৃশ্য শক্তি ৷ এক ঐশ্বরিক সম্পর্ক ৷ এই বৈবাহিক সম্পর্কের মাঝেই বসবাস । নারী-পুরুষ দু’জনই এর অংশীদার । আস্থা, ভালোবাসা, বিনয়, সততা এবং কর্মের মাধ্যমে সুখী ও শান্তিময় মধুর সম্পর্কের দাম্পত্য জীবন গড়ে উঠে । একটি সুন্দর পরিবার গঠিত হয় । উত্তম আদর্শে জীবন রচিত হয় । মান-অভিমান, সুখ-দুঃখ এবং হাসি-কান্না নিয়েই পথচলা । বিবাহিত দম্পতিকে নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করেই চলতে হয় । রীতিনীতি, অধিকার ও বাধ্যবাধকতার নিয়ম মেনেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হয় । কখনও, দু’জনের মতের ভিন্নতা পারস্পরিক সম্পর্কে তিক্ততা সৃষ্টি করে । ধীরে ধীরে এর অবনতি ঘটে । বৈবাহিক সম্পর্কের স্থায়িত্ব হুমকির সম্মুখীন হয় । এক সময় দু’জনের মতানৈক্যের চূড়ান্ত পরিণতি বিবাহ বিচ্ছেদ! একক বা উভয়ের সিদ্ধান্তেই এটি হতে পারে । পক্ষ-বিপক্ষের মাঝে তৈরি হয় এক বিশাল মহাপ্রাচীর । অনাকাঙ্খিত, জটিল ও দুঃখজনক এই সমস্যার সমাধান করে মহামান্য আদালত । জয়-পরাজয় থেকে কোন এক পক্ষ সন্তুষ্ট হলেও প্রত্যক্ষভাবে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এমনকি রাষ্ট্রের উপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে । সুস্থ, সুন্দর, সুখী, পরিশীলিত, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ জীবনের জন্য অতিগুরুত্বপূর্ণ বৈবাহিক ব্যবস্থা বা কাঠামো দুর্বল হয়ে যায় । পরোক্ষভাবে উভয়েরই ক্ষতি হয় । সর্বোপরি ভালোবাসা পরাজিত হয় । রচিত হয় জীবনের এক ভিন্ন অধ্যায় । দু’জনের দুই দিক । একান্ত কাছের আপনজন অন্তড়ালে চলে যায় । দৃষ্টিসীমা থেকে দূর, বহুদূরে… । হয়তো, সে কখনও ফিরে আসবে না । বিরহের বীভৎস দাবানল হৃদয়কে দগ্ধ করে । না পাওয়ার এক তীব্র বেদনা মনের উপর একচ্ছত্রভাবে প্রভাব বিস্তার করে । নিদারুণ মর্মব্যথা! অন্তর গহীনে দীর্ঘকাল ধরে সুপ্ত স্মৃতিগুলি পুনর্জাগরিত হয় । তরতাজা বিচিত্র ভাবনাগুলি আলোর গতির চেয়েও দুর্দান্ত গতিতে বিচরণ করে এই অপার বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে । আত্মপোলব্ধিকে শাণিত করে । শুরু হয় হিসাব-নিকাশ । এতে করে মানুষ আবেগপ্রবণ, হতাশাগ্রস্ত, বিপর্যস্ত, দায়িত্বজ্ঞানহীন বা অপরিনামদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ, উদার মন কিংবা মহান ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয় । তবুও, সেই প্রিয়জনের দূরত্ব বা অপ্রাপ্তির মাঝে থাকে প্রগাঢ় আকর্ষণ । স্পর্শকাতর অনুভূতি । শাশ্বত ভালোবাসা । অন্তহীন প্রেরণার উৎস । তাই, তাকে কাছে পাওয়ার অদম্য বাসনা জাগে । আর সেই পাওয়ার মাঝেইতো রয়েছে আত্মতৃপ্তি, শান্তি এবং মাহাত্ম্য । এক স্বর্গীয় সুখ । কিন্তু, সেই অভিলাষ কখনও পূরণ হয় না । তবে কি- অপ্রাপ্তি বা ব্যর্থতার মাঝেও রয়েছে আলাদা এক পরম সুখ, কে জানে?

Saturday, 1 October 2022

অন্তর্যামী

অন্তর্যামী 

-----------------

রোদেলা মিষ্টি সকাল ।

প্রজাপতি রঙিন ডানা মেলে উড়ে যায় ।

দোয়েল পাখির সুললিত কলকাকলি ।

নীল অপরাজিতার অপলক চাহনি ।

বন্য শ্বেত চন্দনের মাতাল ঘ্রাণ ।

কাশফুলের আলতো স্পর্শে অষ্টাদশীর প্রাণের উচ্ছ্বাস ।

স্বচ্ছ জলের সরোবরে রাজহংস যুগলের নিবিড় আলাপন ।

জীবন্ত ঘৃতকুমারীর মোহনীয় সতেজতা ।

নীলিমায় মিশে যায় শুভ্র তুলা মেঘ ।

বেত্তুন ফলের রসালো শাঁসের অমিয় তৃপ্তি । 

শরতের রোমাঞ্চকর জ্যোৎস্না রাত ।

প্রকৃতির এক অনুপম সৌন্দর্যের মুগ্ধতা ।

কার না ভালো লাগে? 

তবে, কখনো প্রকৃতি হয় বেপরোয়া বা উদাসীন ।

ক্ষণিকেই ঝড়ের ঘনঘটা ।

এক অশনি সংকেত!

নিকষ কালো অন্ধকারে চারিদিক আচ্ছন্ন ।

ধূলিময়, ঝড়ো শীতল হাওয়া ।

কালবৈশাখী ঝড়ের নৃশংস তাণ্ডব ।

হিংস্র বজ্রপাতের দুর্দান্ত প্রতাপ ।

চমকে উঠে প্লীহা ।

মৃত্যু ভয় তাড়িত করে ।

জীবনের প্রতি অসীম মায়া ।

তবুও প্রকৃতির কাছে মানুষ অসহায় ।

বেঁচে থাকার তীব্র আকুতি ।

নত মস্তিষ্কে স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা ।

ক্ষমা কর, রক্ষা কর ।

হে মহান প্রভু— শান্তি দাও ।

একমাত্র তুমিই আমাদের রক্ষাকর্তা ।

এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিয়ন্ত্রক ।

শান্ত হয় প্রকৃতি ।

মহান সৃষ্টিকর্তার অপরিমেয় শক্তির এ এক শাশ্বত দৃষ্টান্ত ।

বহমান জীবনকালে মানুষ যে যার মতোই ব্যস্ত ।

কখন যে আকাশের রঙ বদলায়— কেউ জানে না ।

তেমনি, মানুষের মনে কখন যে পরিবর্তন ঘটে— সে নিজেও জানে না ।

Thursday, 22 September 2022

Ahinahina / Haleakalā silversword / Mauna Kea silversword



                               ছবি: Wonderful Flowers, Gardens and other beautiful things 

Ahinahina, Haleakalā silversword, তরবারি ফুল, Sandwicense এবং Mauna Kea silversword প্রজাতিটি হচ্ছে Hawaii দ্বীপপুঞ্জের (Big Island) স্থানীয় একটি অত্যন্ত বিপন্ন ফুলের উদ্ভিদ । ইংরেজি নাম Silversowrd ৷ এর বৈজ্ঞানিক নাম: Argyroxyphium sandwicense subsp. macrocephalum এবং Asteraceae পরিবারের সদস্য । এটিকে Mauna Kea পর্বতের ‘মুকুট মণি’ বা ‘মুকুট রত্ন’ (Crown jewel) বলে ৷ এ উদ্ভিদের হাওয়াইয়ান নাম হচ্ছে আহিনাহিনা (Ahinahina) ।
হাওয়াই দ্বীপের পূর্ব Maui এর বৃহৎ ঢালু আগ্নেয় পর্বতমালা বা পশ্চিম Maui পর্বতমালার শিখরে বা টিলার ঢালে অর্থাৎ Haleakalā আগ্নেয়গিরির শীর্ষ ঢালে প্রায় ৩০৫৫ মিটার উচ্চতায় তরবারি ফুল বা আহিনাহিনা উদ্ভিদটি জন্মে ৷ এক কঠিন পরিবেশে বেড়ে উঠে । বিশ্বের অন্য কোথাও এটি জন্মে না! উল্লেখ্য যে: Haleakalā বা East Maui Volcano হচ্ছে একটি বিশাল ঢাল আগ্নেয়গিরি, যেটি হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের Maui এর শতকরা ৭৫ ভাগেরও বেশি গঠন করে । Haleakalā (House of the sun) আগ্নেয়গিরির সর্বোচ্চ শিখর হচ্ছে Puʻu ʻUlaʻula (Red hill) {১০০২৩ ফুট (৩০৫৫ মিটার)} । এখানেই অবিশ্বাস্য সুন্দর এ বিরল প্রজাতিটি বাস করে । দ্বীপের পশ্চিম অংশের শতকরা ৭৫ ভাগ আরেকটি আগ্নেয়গিরি Mauna Kahalawai দ্বারা গঠিত, যাকে West Maui Mountainও বলা হয় । আহিনাহিনা ৩ থেকে ৯০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে নিজেকে গোলাপের আকৃতির ব্যাজ (Rosette) ধারণ করতে (কিছুটা দৈত্য, রৌপ্য, ভাজা পেঁয়াজের ফুলের মতো দেখতে) এক দীর্ঘ সময় ব্যয় করে থাকে ৷ তারপর এক গ্রীষ্মে মুকুলিত হয় এবং তার রুপালি ”তরবারি” উত্ক্রান্ত হয় । এর তরবারিগুলো প্রায় ছয় ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে । উদ্ভিদের দেহে শত শত বেগুনি তারাফুল আচ্ছাদিত করে, যা স্থানীয় হলুদমুখি মৌমাছি (Yellow-faced bees) দ্বারা পরাগায়ন ঘটে থাকে । এক সময় ফুলগুলো প্রস্ফুটিত হওয়ার পর বাতাসে এর শুকনো বীজগুলো বিকীর্ণ করে (Dispersing) বা ছড়িয়ে দিয়ে আহিনাহিনা মারা যায় ৷ আহিনাহিনার আরো একটি প্রজাতি হচ্ছে Mauna Kea silversword, যেটি হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে আগ্নেয় পর্বতমালা Mauna Kea এর ২৬০০ মিটার উচ্চতায় জন্মে ৷ Mauna Kea silversword প্রজাতি হচ্ছে Silversword জোটের সদস্য । তিনটি Genera প্রায় ৫০টি প্রজাতির একটি দল, যা সবগুলোই হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা । তাদের বৈচিত্র্যময় Morphologies অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সৃষ্টি-সম্বন্ধীয় আত্মীয়তাকে বিশ্বাস করে এবং একটি একক অগ্রদূত প্রজাতি থেকে অত্যন্ত দ্রুত বিবর্তনের পরামর্শ দেয় । Silversword এর জোটকে Hawaii এর উদ্ভিদের মধ্যে অভিযোজিত বিকিরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় । যা বিবর্তনের বৈশিষ্ট্যে বিচ্ছিন্নতা এবং স্বতন্ত্র পরিবেশগত অবস্থার ভূমিকাকে চিত্রিত করে । Mauna Kea silversword খাড়া, একক-কাণ্ডযুক্ত এবং Monocarpic বা কদাচিৎ শাখাযুক্ত । Polycarpic মূলত কাঠীয় ভেষজ, পুরু একটি গোলক আকৃতির গুচ্ছ তৈরি করে । সর্পিলভাবে সাজানো, তলোয়ার আকৃতির Silvery-green floccose-sericeous, রৈখিক Ligulate থেকে রৈখিক Lanceolate পাতা একটি Rosette এ বৃদ্ধি পায় । Epigeal বা প্রায় Epigeal rosette ০.৬ মিটার (২ ফুট) বা তার বেশি ব্যাস হতে পারে । যার পৃথক পাতা ০.৩ মিটার (১ ফুট) পর্যন্ত লম্বা এবং সাধারণত ১.৩ সেঃমিঃ (১⁄২ ইঞ্চি) চওড়া হয় । পাতাগুলো সম্পূর্ণরূপে দীর্ঘ রূপালি চুলের একটি ঘন স্তর দিয়ে আচ্ছাদিত । সমস্ত আহিনাহিনার পাতার অন্তঃকোষীয় স্থানগুলোতে জেল হিসেবে জল সঞ্চয় করার একটি অস্বাভাবিক এবং গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে যেখানে অন্যান্য গাছের পাতায় বাতাস থাকে । ফুলের ডালপালা, যা ফুল ফোটার কয়েক সপ্তাহ আগে প্রদর্শিত হয় । এটি সরু, তবে উচ্চতায় প্রায় ৩ মিটার (৯.৮ ফুট) পৌঁছতে পারে । এটি ২.৫ সেঃমিঃ (৩১⁄৩২ ইঞ্চি) ব্যাসের প্রায় ৬০০টি ফুলের মাথা পর্যন্ত খুব আঠালো অসংখ্য ডালপালা দিয়ে গঠিত । প্রতিটি মাথার চারপাশে প্রায় এক ডজন গোলাপী থেকে মেরুন পাপড়ির মত রশ্মি ফুল রয়েছে । ফলগুলো সূর্যমুখীর মত, তবে লম্বা ও সরু এবং সাধারণত মুকুটযুক্ত । উদ্ভিদটি ফুল না হওয়া পর্যন্ত বহু বছর বেঁচে থাকে । এর আয়ুষ্কাল আনুমানিক ৫ বছর থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত । জুনের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ফুল ফোটে । অস্বাভাবিক বা বিরল (Atypical) গাছপালা ফুলের শাখা ধারণ করে এবং মূল উদ্ভিদ থেকে স্বাধীনভাবে মারা যায় । তাই এ উদ্ভিদগুলো শুধুমাত্র শেষ শাখা ফুলের পরেই স্বতন্ত্র বা পৃথকভাবে মৃত্যুবরণ করে । আহিনাহিনা উদ্ভিদটি Haleakalā আগ্নেগিরি বা অগ্নিমুখের আশেপাশে পাওয়া যায় । এগুলো প্রাথমিকভাবে পুষ্পমঞ্জুরি আকারে পৃথক হয়— আহিনাহিনা উদ্ভিদের মধ্যে বিস্তৃত (প্রস্থের চেয়ে ৪ গুণেরও কম লম্বা) । Mauna Kea এর উপর আরো সংকীর্ণ (৪.৩-৮.৬ গুণ যতোটা লম্বা ততোটা চওড়া) । আহিনাহিনা'র উপ-প্রজাতিতেও সাধারণত রশ্মি ফুলের সংখ্যা বেশি থাকে । Mauna Kea এর জন্য ১১–৪২ বনাম ৫–২০ । আহিনাহিনা উদ্ভিদ একটি বিলুপ্ত প্রজাতি থেকে বিবর্তিত হয়েছে বলে মনে করা হয় । যেখান থেকে বর্তমান California tarweed (Raillardiopsis প্রজাতি) বিবর্তিত হয়েছিল প্রায় ৫ মিলিয়ন বা ৬ মিলিয়ন বছর আগে একটি সাধারণ মূল ভূখণ্ডের পূর্বপুরুষ থেকে । Molecular Deoxyribonucleic Acid (জীবদেহের গঠন ও ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণের জিনগত নির্দেশ দ্বারা) গবেষণা দৃঢ়ভাবে এ অনুমান সমর্থন করে । ধারণা করা হয় যে, উপনিবেশ স্থাপনকারী পৃথক একটি পাখির পালকে এটি Hawaii দ্বীপে পৌঁছেছিল । আন্তঃমহাদেশীয় বিশালতার চরম দূরত্বের বিসরণ বা বিচ্ছুরণকে (Dispersal) গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তা বাধ্য করে, কারণ প্রজাতিগুলোকে অন্তত ৩৯০০ কিঃমিঃ (২৪০০ মাইল) খোলা সমুদ্রের একটি বিচ্ছুরণ বাধা অতিক্রম করতে হয়েছিল, যা আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকাকে আলাদা করার চেয়ে শতকরা ৬০ ভাগ বেশি দূরত্ব । আহিনাহিনা অসাধারণভাবে কঠোর উপ-আল্পীয় (Subalpine) পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার জন্য বিবর্তিত হয়েছিল, যেখানে কার্যত অন্য কোনো গাছপালা জন্মাতে পারে না । যদিও এটি চারণকারী স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা রাখে না, যা হাওয়াইতে উদ্ভিদের অভিযোজনের লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বিদ্যমান ছিল না । একজন আমেরিকান উদ্ভিদবিদ এবং চিত্রগ্রাহক Sherwin John Carlquist FMLS (Sherwin Carlquist) যিনি হাওয়াইয়ান আহানিহিনার বিবর্তনীয় ইতিহাসে California tarweed এর পূর্বপুরুষের ভূমিকা প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন । তিনি অনুমান করেন যে, তাদের মূল ভূখণ্ডের পূর্বসূরি প্রজাতির তৃণভোজীদের জন্য অরুচিকর রজন বা শালীনীর্যাস (Resin) থাকতে পারে । আন্তঃকোষীয় জেল (Intracellular gel) হিসেবে জল সঞ্চয় করার অনন্য ক্ষমতা Tarweed এবং Silversword এর পক্ষে, যা প্রজাতির জন্য শুষ্ক পরিবেশে অভিযোজন করে এটিকে বসবাস করা সম্ভব করে তুলেছিল । ঐতিহাসিক নথি থেকে জানা যায় যে, আহিনাহিনা একসময় Mauna Kea এর উপর প্রভাবশালী ছিল । বিশেষ করে ২৬০০-৩৮০০ মিটার (৮৫০০-১২৫০০ ফুট) উচ্চতায় বায়ু-প্রবাহিত Alpine মরুভূমির সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল । এ অঞ্চলে আর্দ্রতা কার্যত শূন্য এবং বৃষ্টিপাত সাধারণত শীতকালীন তুষার আকারে হয় । প্রধানত শীতকালে গড়ে বার্ষিক বৃষ্টিপাত প্রতি বছর ৫১-১০২ সেঃমিঃ (২০-৪০ ইঞ্চি) এর চেয়ে কম । গ্রীষ্মকালে চরম খরা থাকে । গরম গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সূর্য থেকে কোনো ছায়া নেই বা রাতের তাপমাত্রা থেকে সুরক্ষা নেই, যা বছরের যে কোনো সময় হিমাঙ্কের নীচে নেমে যায় । মাটি সাধারণত পাতলা, পাথুরে এবং আগ্নেয়গিরিময় অঙ্গার বা ভস্ম । এ অতি উচ্চ বাসস্থান অঞ্চলে অন্য কোনো গাছপালা জন্মায় না । ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে আহিনাহিনা'র জনসংখ্যা পর্যায়ক্রমে হ্রাস পেয়েছে । জীবন্ত আহিনাহিনা শুধুমাত্র Puhakuloa, Waikahalulu এবং Waipahoehoe Gulche এর পাহাড়ে দেখা যেতো । তবে কিছুক্ষেত্রে দুর্লভভাবে বন্য এলাকার অতিথিপরায়ণ পরিবেশে এটি উন্নতি লাভ করেছিল ৷ কিন্তু সবচেয়ে রুক্ষ এবং দুর্গম জায়গা ছাড়া এখন এটি প্রায় বিলুপ্ত । এছাড়া ভেড়া-ছাগল-শূকর বিভিন্ন গবাদি পশু খোলা পরিসরে চরানোর ফলে স্থানীয় গাছপালা খেয়ে ফেলা, ভূমি ব্যবহার এবং বন্য কুকুর ইত্যাদির কারণে অবশিষ্ট আাহিনাহিনাসহ প্রতিরক্ষাহীনভাবে স্থানীয় উদ্ভিদকেও ধ্বংস করে দেয় ।
আহিনাহিনাকে ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে শুধুমাত্র ৪১টি প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভূত উদ্ভিদ বন্য অঞ্চলে বেঁচে ছিল । ১৯৭০ এর দশকে প্রজাতিটির বংশবিস্তার শুরু হয় । ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের গণনায় ১৩১টি উদ্ভিদ পাওয়া যায় । যার মধ্যে শুধুমাত্র ১৫টি বন্য বলে বিশ্বাস করা হয় এবং যা Nursery পরিবেশে Propagated করা হয়নি । ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রায় ১৫০০ আহিনাহিনা রোপণ করা হয় । উদ্ভিদগুলো ফুলের পরিপক্কতার জন্য উদ্ভূত হয়েছিল । কিন্তু শুধুমাত্র এক বা দুইটি স্ত্রী-জাতীয় উদ্ভিদ পিতামাতার সাথে শুরু করে একটি সংকীর্ণ জিনগত বৈচিত্র্য ঘটায় । শাখা উৎপাদনের জন্য বংশধরদের বিরল বা অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায় । এ প্রজাতির সাধারণ বৃদ্ধির ইতিহাস হচ্ছে একটি একক ফুলের ডালপালা উৎপন্ন করার পরে উদ্ভিদটির মৃত্যু হয় । অন্তঃপ্রজননের প্রভাব মোকাবেলা করার জন্য বিজ্ঞানীরা একটি নিয়ন্ত্রিত Crossing program শুরু করেছিলেন । বন্য এবং Nursery উভয় ক্ষেত্রেই হাতে পরাগায়নকারী ফুল আহিনাহিনা । যৌক্তিক সংপ্রশ্ন বা আপত্তি সত্ত্বেও, হাতের পরাগায়নকে নিষিক্তকরণ এবং Nursery ও বন্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এটির জন্ম সম্বন্ধীয় (Genetic) বিনিময় বৃদ্ধির সম্ভাব্য পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল । নিয়ন্ত্রিত বংশবৃদ্ধি চারা পুনঃপ্রবর্তনের জন্য ব্যবহার করা হয় । যেহেতু পূর্ববর্তী Outplantings শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি বেঁচে থাকে, কারণ বহু বছর পর শুধুমাত্র একবারই ফুল ফোটে । ফলে এতো কম বন্য উদ্ভিদের সাথে, প্রক্রিয়াটিকে একটি উপযুক্ত পরাগায়নকারীর সাথে সুযোগের মুখোমুখি হওয়ার জন্য ছেড়ে দেওয়াকেই বুদ্ধিমান হিসেবে বিবেচনা করা হয় । এছাড়াও আর্জেন্টিনা পিঁপড়ার মতো আক্রমণাত্মক প্রজাতির দ্বারা স্থানীয় পরাগায়নকারীরা ব্যাহত হয়েছে বলে মনে করা হয় । স্থানীয় নির্জন Hylaeus bee genus এ উপ-প্রজাতির পরাগায়নকারী । অ-স্থানীয় মধু মৌমাছি (Apis mellifera) ফুল পরিদর্শন করে । কিন্তু উদ্ভিদের মধ্যে স্থানান্তর করার পরিবর্তে পরাগ চুরি করতে দেখা যায় । অতএব, বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন যে, কোনো বীজ হয়তো বন্যের মধ্যে আর অবশিষ্ট থাকবে না । এক সময় আহিনাহিনা'র বন্য জনসংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে । প্রায় দুটি পৃথক বা বৈশিষ্ট্যমূলক প্রজাতি প্রতি বছর পুনরুৎপাদন করার আগেই হারিয়ে যায় । ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে Mauna Keaতে একাধিক সুরক্ষিত স্থানে ২৫০০টিরও বেশি অতিরিক্ত আহিনাহিনা রোপণ করা হয় এবং প্রতি বছর আরো নতুন করে প্রবর্তনের পরিকল্পনা নেয় । ২০০৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কোনো অতিরিক্ত বন্য ফুল ফোটেনি । ২০০৫ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে, একটি বন্য বৈশিষ্ট্যে হাতে পরাগায়িত Cross থেকে প্রায় এক লক্ষ বীজ সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং বেশ কয়েকটি স্বতন্ত্র বা বৈশিষ্ট্যমূলক Outplanted করা হয় । সফল পুনঃপ্রবর্তনের হার আশা জাগায় যে, হয়তো এ প্রজাতিটিকে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরিয়ে আনা যেতে পারে । The United States Fish and Wildlife Service একটি প্রতিবেদন করে যে, Mauna Keaতে এখন কিছু প্রজাতির স্বতন্ত্র বা বৈশিষ্ট্যমূলক উদ্ভিদ রোপণ করা হয়েছে । যদিও তারা এখনো শুধুমাত্র ০৬টি বন্য প্রতিষ্ঠাতা থেকে উদ্ভূত হয়েছিল । তরবারি ফুল বা আহিনাহিনা একটি হুমকিপ্রাপ্ত প্রজাতি । তাদের খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকলে জালের ন্যায় গঠিত সূক্ষ্ম শিকড়গুলো (Network) দৃঢ়ভাবে পদদলিত হতে পারে (Trample) । তাই নিশ্চিত হয়ে এদের এখানে একটি দীর্ঘ সময়ের জন্য নঙ্গর (Berth) ফেলা উচিৎ নয় । দূর থেকে আহিনাহিনা উদ্ভিদগুলোকে উপভোগ করাই শ্রেয় ।

তথ্যসূত্র: আন্তর্জাল (The Internet) ।
ছবি: Wonderful Flowers, Gardens and other beautiful things

Monday, 5 September 2022

বৃহস্পতি গ্রহ (Jupiter)

                                                                         ছবি: https://blogs.nasa.gov/

আমরা ছোট একটি পাথুরে গ্রহ পৃথিবীতে বাস করি, যেটি আকাশগঙ্গা ছায়াপথে যেখানে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে তার মধ্যে একটি নক্ষত্র সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে । এই বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে বিদ্যমান দুই ট্রিলিয়ন ছায়াপথের মধ্যে আমাদের ছায়াপথ একটি । প্রতিটি ছায়াপথে শত শত কোটি নক্ষত্র এবং অসংখ্য গ্রহ রয়েছে ট্রিলিয়ন কিলোমিটার দূরে । আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রের খুব কাছের নক্ষত্রটি হচ্ছে সূর্য ৷ এই সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে ০৮টি গ্রহ (আরও ০৫টি বামন গ্রহ: Pluto, Haumea, Eris, Makemake এবং Ceres), অগণিত গ্রহাণুপুঞ্জ, উল্কা এবং ধূমকেতু  ৷ সৌরজগতের বৃহত্তম এবং সূর্য থেকে পঞ্চম দূরত্বের গ্রহটি বৃহস্পতি (Jupiter) । বৃহস্পতি গ্রহদের রাজা । সূর্য থেকে ৭৭.৮৪ কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থিত । পৃথিবী থেকে বৃহস্পতির দূরত্ব প্রায় ৮০ কোটি কিলোমিটার । এই বৃহস্পতি একটি গ্যাস দৈত্য গ্রহ ৷ এটি কঠিন পদার্থের পরিবর্তে গ্যাস এবং তরল দ্বারা গঠিত । এর উপরিতল সম্পূর্ণ বরফে ঢাকা । তাই গ্যাসীয় পদার্থ জমাট বেঁধে এই বৃহৎ দৈত্যাকার গ্রহটি তৈরি হয়েছে । বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, ৪৬৫ কোটি বছর পূর্বে সূর্য জন্ম নেয়ার পরপরই গ্রহগুলি আবির্ভূত হয়েছিল । এদের মধ্যে সর্বপ্রথমে জন্ম নেয় বৃহস্পতি গ্রহ ৷ এর ভর সৌরজগতের অন্য সকল গ্রহগুলির ভরকে একত্রিত করলে তার থেকে আড়াই গুণ বেশি (ভর ১.৯০ * ১০২৭ কিঃগ্রাঃ) । এতই বিশাল যে সূর্যের সাথে এর বেরিকেন্দ্র (Barycentre) সূর্যের কেন্দ্র থেকে ১.০৬৮ সৌর ব্যাসার্ধে সূর্যের পৃষ্ঠের উপরে অবস্থিত । কিন্তু সূর্যের ভরের ১০৪৭ ভাগের এক ভাগ থেকে সামান্য কম । অর্থাৎ এর ভর আর একটু বেশি হলেই বৃহস্পতির আভ্যন্তরীণ মহাকর্ষ হাইড্রোজেন পরমাণুগুলিকে নিষ্ক্রিয় গ্যাস হিলিয়ামে পরিণত এবং Photon বা আলোক কণা উৎপাদন করত । মানে, বৃহস্পতি নক্ষত্রে পরিণত হত । বৃহস্পতি গ্রহটি পৃথিবীর চেয়ে অনেক বড় এবং যথেষ্ট কম ঘন । এটির আয়তন পৃথিবীর ১৩২১ গুণ কিন্তু ভর মাত্র ৩১৮ গুণ । বৃহত্তম এই গ্রহটির ব্যাস নিরক্ষরেখা বা বিষুবরেখা বরাবর ১৪২৯৮৪ কিঃ মিঃ (৮৮৮৪৬ মাইল) । বৃহস্পতির গড় ঘনত্ব ১.৩২৬ গ্রাম/সেঃমিঃ³, যা গ্যাসীয় দানব গ্রহগুলির মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ । গ্যাসীয় দানব নেপচুনের ঘনত্ব সর্বোচ্চ । বৃহস্পতি হচ্ছে চাঁদ এবং শুক্র গ্রহের পরে পৃথিবী থেকে রাতের আকাশে দৃশ্যমান মহাজাগতিক তৃতীয় উজ্জ্বল প্রাকৃতিক বস্তু ৷ যেহেতু বৃহস্পতির কক্ষপথ পৃথিবীর বাইরে, তাই পৃথিবী থেকে দেখা বৃহস্পতির পর্যায় কোণ সর্বদা ১১.৫° এর কম । সুতরাং, পৃথিবী ভিত্তিক দূরবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে দেখা হলে বৃহস্পতি সর্বদা প্রায় সম্পূর্ণরূপে আলোকিত দেখায় । বৃহস্পতি হচ্ছে একমাত্র গ্রহ যার বেরিকেন্দ্র সূর্যের আয়তনের বাইরে, যদিও সূর্যের ব্যাসার্ধের মাত্র শতকরা ০৭ ভাগ । বৃহস্পতি এবং সূর্যের মধ্যে গড় দূরত্ব ৭৭৮ মিলিয়ন কিঃমিঃ (৫.২ AU) । বৃহস্পতি পৃথিবীর সময় অনুসারে ৪৩৩৫ দিন বা ১১.৮৭ বছরে সূর্যের চারদিকে একটি কক্ষপথ সম্পন্ন করে । এটি শনির কক্ষপথের প্রায় দুই-পঞ্চমাংশ এবং কাছাকাছি কক্ষপথের অনুরণন তৈরি করে । বৃহস্পতির কক্ষপথ পৃথিবীর তুলনায় ১.৩০° কাৎ বা হেলে আছে । কারণ এর কক্ষপথের বিকেন্দ্রতা ০.০৪৯ । বৃহস্পতি অপসূর বিন্দুর চেয়ে অনুসূর বিন্দুতে সূর্যের কাছে ৭৫ মিলিয়ন কিলোমিটারেরও বেশি । বৃহস্পতির অক্ষীয় কাৎ অপেক্ষাকৃত ছোট, মাত্র ৩.১৩° ৷ তাই এর ঋতু পৃথিবী এবং মঙ্গল গ্রহের তুলনায় নগণ্য । বৃহস্পতির ঘূর্ণন সৌরজগতের সমস্ত গ্রহের মধ্যে দ্রুততম । দশ ঘণ্টারও কম সময়ে তার অক্ষের উপর একটি ঘূর্ণন সম্পন্ন করে । তাই পৃথিবীর হিসেবে বৃহস্পতির একটি দিন হয় মাত্র ৯.৮ ঘন্টায় । যেহেতু বৃহস্পতির দেহটি কঠিন নয়, তাই তার উপরের বায়ুমণ্ডলটি পার্থক্যমূলক বা জাতিগত বৈশিষ্ট্যমূলক ঘূর্ণনের মধ্য দিয়ে যায় । বৃহস্পতির মেরু বায়ুমণ্ডলের ঘূর্ণন বিষুবীয় বায়ুমণ্ডলের তুলনায় প্রায় ০৫ মিনিট বেশি । বৃহস্পতির বিষুবরেখা জুড়ে ব্যাস তার মেরুগুলির মধ্যে পরিমাপ করা ব্যাসের চেয়ে দীর্ঘ । মেরু ব্যাসের চেয়ে নিরক্ষীয় ব্যাস ৯২৭৬ কিঃমিঃ (৫৭৬৪ মাইল) বেশি । গ্রহটি খুবই দ্রুত ঘূর্ণনের কারণে এর আকৃতি একটি স্থূল গোলক ৷ বৃহস্পতির নিম্ন-অক্ষাংশের অঞ্চল পূর্ব-পশ্চিমের বাতাস তৈরি করে । বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলের উর্দ্ধাংশের গাঠনিক উপাদান পরমাণু সংখ্যার দিক দিয়ে হাইড্রোজেন শতকরা ৯৩ ভাগ এবং হিলিয়াম শতকরা ০৭ ভাগ । বৃহস্পতি গ্যাস অণুসমূহের ভগ্নাংশের দিক দিয়ে শতকরা ৮৬ ভাগ হাইড্রোজেন, শতকরা ১৩ ভাগ হিলিয়াম, শতকরা ০.১ ভাগ মিথেন, শতকরা ০.১ ভাগ জলীয় বাষ্প, শতকরা ০.০২ ভাগ অ্যামোনিয়া, শতকরা ০.০০০২ ভাগ ইথেন, শতকরা ০.০০০১ ভাগ ফসফিন এবং শতকরা <০.০০০১০ ভাগ হাইড্রোজেন সালফাইড দিয়ে গঠিত । সুতরাং বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলের গাঠনিক উপাদানের অনুপাতটি শতকরা ৭৫ ভাগ হাইড্রোজেন, শতকরা ২৪ ভাগ হিলিয়াম এবং শতকরা ০১ ভাগ অন্যান্য মৌল । বৃহস্পতির অভ্যন্তরে ঘন পদার্থ থাকার কারণে ভর অনুসারে এইখানের অংশে রয়েছে শতকরা ৭১ ভাগ হাইড্রোজেন, শতকরা ২৪ ভাগ হিলিয়াম এবং শতকরা ০৫ ভাগ অন্যান্য মৌল । বৃহস্পতির অভ্যন্তরে চলমান সংকোচনের ফলে সূর্য থেকে প্রাপ্ত উত্তাপের চেয়ে বেশি তাপ উৎপন্ন করে । পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ১১০ Kelvin (K) । বায়ুমণ্ডল গঠনকারী অন্যান্য যৌগের মধ্যে রয়েছে মিথেন, জলীয় বাষ্প, অ্যামোনিয়া এবং সিলিকন ইত্যাদি । এছাড়াও কার্বন, ইথেন, হাইড্রোজেন সালফাইড, নিয়ন, অক্সিজেন, ফসফাইন এবং সালফারের ভগ্নাংশ রয়েছে । বৃহস্পতির সম্মিলিত গ্যাসগুলিই এক অনাবিল সুন্দর রঙে একটি ভিন্ন মাত্রা দিয়ে তাকে চমৎকার রঙিন করে তুলেছে । বায়ুমণ্ডলের বাইরের স্তরে হিমায়িত অ্যামোনিয়ার স্ফটিক রয়েছে । অবলোহিত এবং অতিবেগুনী রশ্মি দ্বারা পরিমাপ করে বেনজিন এবং অন্যান্য হাইড্রোকার্বনের চিহ্ন পাওয়া যায় । বৃহস্পতি গ্রহটির গায়ে বাদামি, হলুদ, নীল, সাদা এবং গাঢ় লাল রঙের যে সকল রেখা দেখা যায় এগুলি হচ্ছে গাঢ় নীল মেঘ । এই মেঘ প্রায় ১০০ কিঃমিঃ পূরু এবং তাপমাত্রা -১২০° সেঃ এর চেয়েও কম । ধারণা করা হয়, এই মেঘ থেকে তরল হীরা-বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে । বৃহস্পতি চিরকাল অ্যামোনিয়া স্ফটিক (Ammonia crystal) মেঘে আবৃত থাকে, যেটিতে Ammonium hydrosulfideও থাকতে পারে । এছাড়া গ্যাসীয় এবং বিভিন্ন যৌগিক পদার্থের মিশ্রণ রয়েছে । এ্যামোনিয়া মেঘগুলি বায়ুমণ্ডলের Tropopause স্তরে অবস্থিত । বৃহস্পতির চতুর্দিকে বলয় রয়েছে । ধারণা করা হয় বৃহস্পতির চাঁদগুলির সাথে ধূমকেতু, গ্রহাণু এবং মহাজাগতিক বিভিন্ন বস্তুর সংঘর্ষের কারণে ছিটকে আসা কণা থেকে বলয়গুলির সৃষ্টি হয়েছে । বৃহস্পতির পৃষ্ঠতলটি বিষুবরেখার সাথে সমান্তরালভাবে বেশ কয়েকটি বন্ধনীতে বিভক্ত । বিভিন্ন অক্ষাংশে বেড়ী বা মণ্ডলী (Band) গঠন করে, যা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল হিসেবে পরিচিত । এগুলি হালকা-আভাযুক্ত ‘ক্ষেত্র বা অঞ্চল’ (Zones) এবং অন্ধকার বা গাঢ় বন্ধনী বা কটিবন্ধে (Belts) বিভক্ত । এই পরস্পরবিরোধী সঞ্চালন নিদর্শনগুলির মিথস্ক্রিয়ায় ঝড় এবং অশান্তি বা আলোড়নপূর্ণতা সৃষ্টি করে । সাধারণত প্রতি সেকেণ্ডে ১০০ মিটার (৩৬০ কিঃ মিঃ/ঘন্টা বা ২২০মাইল) বাতাসের গতিবেগ থাকে জোনাল জেট স্রোতে (Zonal jet stream) । অঞ্চলগুলির প্রস্থ, রঙ, পরিবেশ এবং তীব্রতা বছরের পর বছর পরিবর্তন হতে দেখা যায় । মেঘাছন্ন এবং কুয়াশায় ভরা থাকে বৃহস্পতি গ্রহের বায়ুমণ্ডল । মেঘের স্তরটি প্রায় ৫০ কিঃমিঃ (৩১ মাইল) গভীর । Ammonia মেঘ কমপক্ষে দু’টি পাটাতন বা তল নিয়ে গঠিত । একটি ঘন নিম্ন পাটাতন বা তলসহ উপরে এবং অপরটি পাতলা পরিষ্কার অঞ্চল । মেঘের নিচে জলের মেঘের একটি পাতলা স্তর থাকতে পারে, যেটি বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলে শনাক্ত হওয়া বিদ্যুতের ঝলকানি । এই বৈদ্যুতিক নিঃসরণগুলি পৃথিবীতে সংঘটিত বজ্রপাতের চেয়ে হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী হতে পারে । ধারণা করা হয়, জলের মেঘগুলি পার্থিব বা স্থলজ বজ্রঝড়ের মতই বজ্রঝড় সৃষ্টি করে এবং অভ্যন্তর থেকে ক্রমবর্ধমান উত্তাপ দ্বারা এটি পরিচালিত হয় । Juno spacecraft নভোযানের The juno mission এর মাধ্যমে ‘অগভীর বজ্রপাত’ (Shallow lightning) এর উপস্থিতি নজরে আসে, যা বায়ুমণ্ডলে তুলনামূলকভাবে উচ্চ Ammonia জল মেঘ থেকে উদ্ভূত হয় । অগ্নিবৃষ্টিগুলি বরফে ঢাকা জল-Ammonia ঝলক (Water-ammonia slushes) ‘Mushballs’ বহন করে, যা বায়ুমণ্ডলের গভীরে পড়ে । বৃহস্পতির উপরের বায়ুমণ্ডলে ‘উচ্চ-বায়ুমণ্ডলীয় বজ্রপাত’ দেখা যায় । আলোর উজ্জ্বল ঝলক যা প্রায় ১.৪ মিলিসেকেন্ড স্থায়ী হয় । এগুলি ‘Elves’ বা ‘Sprites’ নামে পরিচিত এবং হাইড্রোজেনের কারণে নীল বা গোলাপী দেখায় । বৃহস্পতি মেঘের কমলা এবং বাদামী রঙগুলি উত্থিত যৌগগুলির কারণে ঘটে । যা সূর্যের অতিবেগুনী আলোর সংস্পর্শে আসার সময় রঙ পরিবর্তন করে । তবে এর সঠিক গঠন-প্রণালী বা বিন্যাস এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে । কিন্তু পদার্থগুলি ফসফরাস, সালফার এবং হাইড্রোকার্বন দ্বারা গঠিত বলে মনে করা হয় । Chromophore নামে পরিচিত এই রঙিন যৌগগুলি নিচের পাটাতন বা তলের উষ্ণ মেঘের সাথে মিশে যায় । ক্রমবর্ধমান পরিচলন কোষগুলি যখন স্ফটিক Ammonia গঠন করে তখন হালকা রঙের বলয় বা মণ্ডল তৈরি হয়, যা Chromophoreকে দৃশ্য থেকে লুকিয়ে রাখে । বৃহস্পতির কম অক্ষীয় কাৎ মানে মেরুগুলি সর্বদা গ্রহের নিরক্ষীয় অঞ্চলের তুলনায় কম সৌর বিকিরণ গ্রহণ করে । গ্রহের অভ্যন্তরের মধ্যে পরিচলন মেরুতে শক্তি পরিবহন করে এবং মেঘের স্তরে তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় রাখে । 

Juno spacecraft mission এর তথ্যে দেখা যায় যে, বৃহস্পতির একটি খুব বিচ্ছুরিত কেন্দ্রস্থল রয়েছে যা এর আঙরাখায় (Mantle) মিশে যায় । এই মিশ্রণ প্রক্রিয়াটি গঠনের সময় উদ্ভূত হতে পারে, যখন গ্রহটি আশেপাশের নীহারিকা থেকে কঠিন পদার্থ এবং গ্যাসগুলিকে সংগ্রহ করে । বিকল্পভাবে, এটি বৃহস্পতির গঠনের কয়েক মিলিয়ন বছর পরে প্রায় দশটি পৃথিবীর ভরের একটি গ্রহের প্রভাবের কারণে ঘটতে পারে, যা মূলত একটি কঠিন জোভিয়ান কেন্দ্রস্থলকে (Jovian core) ব্যাহত করে । এটি অনুমান করা হয় যে, কেন্দ্রস্থলটি গ্রহের ব্যাসার্ধের শতকরা ৩০–৫০ ভাগ দখল করে এবং পৃথিবীর ০৭–২৫ গুণ সম্মিলিত ভরসহ ভারী উপাদান আছে । ধাতব হাইড্রোজেনের স্তরের বাইরে হাইড্রোজেনের একটি স্বচ্ছ অভ্যন্তরীণ বায়ুমণ্ডল রয়েছে । এই গভীরতায়, চাপ এবং তাপমাত্রা আণবিক হাইড্রোজেনের ১.৩ MPa এর গুরুতর চাপ এবং ৩৩ K (−২৪০.২ °C বা −৪০০.৩ °F) এর গুরুতর তাপমাত্রার উপরে । এই অবস্থায়, কোন স্বতন্ত্র তরল এবং গ্যাসের পর্যায় নেই— হাইড্রোজেনকে অতিজটিল তরল অবস্থা (Supercritical fluid state) বলা হয় । মেঘের স্তর থেকে নিচের দিকে প্রসারিত হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম গ্যাস ধীরে ধীরে গভীর স্তরে তরলে রূপান্তরিত হয় । সম্ভবত তরল হাইড্রোজেন সমুদ্রের অনুরূপ কিছু এবং অন্যান্য অতিজটিল তরল । শারীরিকভাবে, গ্যাস ধীরে ধীরে গরম হয়ে উঠে এবং গভীরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে আরও ঘন হয় । হিলিয়াম এবং নিয়নের বৃষ্টির মত ফোঁটাগুলি নিম্ন বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে নিচের দিকে বর্ষণ করে, উপরের বায়ুমণ্ডলে এই উপাদানের প্রাচুর্য হ্রাস করে । হিলিয়াম ফোঁটাগুলি ৬০০০০ কিঃমিঃ (৩৭০০০ মাইল) Cloudtops এর নিচের ব্যাসার্ধে ধাতব হাইড্রোজেন থেকে পৃথক হয়ে যায় এবং আবার একত্রিত করে ৫০০০০ কিঃমিঃ (৩১০০০ মাইল) {২২০০০ কিঃমিঃ (১৪০০০ মাইল) মেঘের নীচে} । হীরার বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেইসাথে শনি এবং বরফের দৈত্য ইউরেনাস ও নেপচুনেও । বৃহস্পতির অভ্যন্তরে তাপমাত্রা এবং চাপ ক্রমাগতভাবে ভিতরের দিকে বৃদ্ধি পায় কারণ গ্রহের গঠনের তাপ কেবল পরিচলনের মাধ্যমেই বেরিয়ে যেতে পারে । পৃষ্ঠের গভীরতায় যেখানে বায়ুমণ্ডলীয় চাপের মাত্রা ০১ Bar (০.১০ MPa) । তাপমাত্রা প্রায় ১৬৫ K (−১০৮ °C বা −১৬৩ °F) । অতিজটিল হাইড্রোজেনের অঞ্চলটি আণবিক তরল থেকে ধাতব তরলে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয় ৫০০০–৮৪০০ K (যথাক্রমে ৪৭৩০–৮১৩০ °C বা ৮৫৪০–১৪৬৬০ °F) তাপমাত্রায় ৫০–৪০০ GPa এর চাপের বিস্তৃত পরিসরে । অনুমান করা হয়, বৃহস্পতির মিশ্রিত বা জলবৎ তরল মিশ্র কেন্দ্রস্থলের তাপমাত্রা প্রায় ৪০০০ GPa চাপ সহ ২০০০০০ K (১৯৭০০ °C বা ৩৫৫০০ °F) । 

বৃহস্পতিকে সৌরজগতের প্রাচীনতম গ্রহ বলে মনে করা হয় । সৌরজগৎ গঠনের বর্তমান নকশা বা মডেলগুলি থেকে সুপারিশ করে যে, বৃহস্পতি তুষার রেখায় গঠিত বা তুষার রেখা ছাড়িয়ে । প্রথম দিকের সূর্য থেকে একটি দূরত্ব যেখানে পানি কঠিন পদার্থে ঘনীভূত হওয়ার জন্য তাপমাত্রা উদ্বায়ী’র (Volatile) জন্য যথেষ্ট ঠাণ্ডা ছিল । গ্রহটি একটি কঠিন কেন্দ্র হিসেবে শুরু হয়েছিল । যা পরবর্তীতে তার বায়বীয় বায়ুমণ্ডলে জমা হয় । ফলস্বরূপ, সৌর নীহারিকা সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছুরিত হওয়ার আগে গ্রহটি অবশ্যই তৈরি হয়েছিল । বৃহস্পতি গঠনের সময় এর ভর ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে যতক্ষণ না এটি পৃথিবীর ভরের ২০ গুণ (যার প্রায় অর্ধেক সিলিকেট, বরফ এবং অন্যান্য ভারী-উপাদান) ছিল । প্রদক্ষিণকারী ভর বৃদ্ধি পেয়ে ৫০টি পৃথিবীর ভরেরও বেশি ছাড়িয়ে গিয়ে এটি সৌর নীহারিকাতে একটি ফাঁক তৈরি করে । তারপরে ক্রমবর্ধমান গ্রহটি ৩-৪ মিলিয়ন বছরে তার চূড়ান্ত ভরে পৌঁছেছে । Grand tack hypothesis অনুসারে, বৃহস্পতি সূর্য থেকে প্রায় ৩.৫ AU (৫২০ মিলিয়ন কিঃমিঃ বা ৩৩০ মিলিয়ন মাইল) দূরত্বে তৈরি হতে শুরু করে । তরুণ গ্রহটির ভর বাড়ার সাথে সাথে সূর্যকে প্রদক্ষিণকারী গ্যাস চাকতির সাথে মিথস্ক্রিয়া এবং শনির সাথে কক্ষপথের অনুরণন (Resonance) এটিকে ভিতরের দিকে স্থানান্তরিত করে । এটি সূর্যের কাছাকাছি প্রদক্ষিণ করা বেশ কয়েকটি মহা-পৃথিবীর (Super-earth) কক্ষপথকে বিপর্যস্ত করে । যার ফলে তাদের ধ্বংসাত্মকভাবে সংঘর্ষ হয় । শনি গ্রহ পরবর্তীতে বৃহস্পতির চেয়ে অনেক দ্রুত ভিতরের দিকে স্থানান্তর করতে শুরু করে, যতক্ষণ না দু’টি গ্রহ সূর্য থেকে আনুমানিক ১.৫ AU (২২০ মিলিয়ন কিঃমিঃ বা ১৪০ মিলিয়ন মাইল) এ ৩:২ গড় গতি অনুরণনে আধৃত (Captured) হয় । এটি অভিপ্রয়াণ বা অভিবাসনের দিক পরিবর্তন করে, যার ফলে গ্রহগুলি সূর্য থেকে দূরে এবং অভ্যন্তরীণ তন্ত্র বা প্রণালীর (Inner system) বাইরে তাদের বর্তমান অবস্থানে চলে যায় । এই সবই ঘটেছিল ৩-৬ মিলিয়ন বছর ধরে । বৃহস্পতি গ্রহের চূড়ান্ত স্থানান্তর ঘটেছিল কয়েক লক্ষ বছর ধরে । অভ্যন্তরীণ সৌরজগৎ থেকে বৃহস্পতি গ্রহের প্রস্থান শেষপর্যন্ত ধ্বংসস্তূপ বা পাথরকুঁচি (Rubble) থেকে পৃথিবীসহ অভ্যন্তরীণ গ্রহগুলিকে তৈরি হতে দিয়েছে । যদিও Grand tack hypothesis নিয়ে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে । পার্থিব গ্রহগুলি গঠনের সময়কাল পরিমাপিত মৌলিক রচনার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয় । সম্ভবত বৃহস্পতি সৌর নীহারিকা দিয়ে স্থানান্তরিত হলে সূর্যের অনেক কাছাকাছি একটি কক্ষপথে বসতি স্থাপন করত । সৌরজগতৎ গঠনের কিছু প্রতিযোগী নকশায় কক্ষপথের বৈশিষ্ট্যসহ বৃহস্পতি গঠনের ভবিষ্যদ্বাণী করে যেগুলি বর্তমান সময়ের গ্রহের কাছাকাছি । অন্যান্য নকশাগুলি ভবিষ্যদ্বাণী করে যে, বৃহস্পতি অনেক দূরে ১৮ AU (২.৭ বিলিয়ন কিঃমিঃ বা ১.৭ বিলিয়ন মাইল) দূরত্বে গঠিত হয়েছে । বৃহস্পতির প্রাথমিক গঠন বা রচনার উপর ভিত্তি করে গবেষকরা আণবিক নাইট্রোজেন তুষাররেখার বাইরে একটি প্রাথমিক গঠনের জন্য Case বা তদন্ত তৈরি করেছেন যা সূর্য থেকে ২০-৩০ AU (৩.০–৪.৫ বিলিয়ন কিঃমিঃ বা ১.৯-২.৮ বিলিয়ন মাইল) দূরে অনুমান করা হয় । সম্ভবত এমনকি Argon তুষাররেখার বাইরেও, যা ৪০ AU (৬.০ বিলিয়ন কিঃমিঃ বা ৩.৭ বিলিয়ন মাইল) পর্যন্ত দূরে হতে পারে । এই চরম দূরত্বগুলির মধ্যে একটিতে গঠিত হওয়ার পরে বৃহস্পতি তার বর্তমান অবস্থানে ভিতরের দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে । এই অভ্যন্তরীণ স্থানান্তরটি প্রায় ৭০০০০০ বছর সময়কালের মধ্যে ঘটেছিল । গ্রহটি গঠন শুরু হওয়ার প্রায় ২-৩ মিলিয়ন বছর পরে একটি যুগে । এই নকশায় শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুন বৃহস্পতি গ্রহের চেয়ে আরও বাইরে তৈরি হত এবং শনিও ভিতরের দিকে স্থানান্তরিত হত । বৃহস্পতি গ্রহের বিষুবরেখার চারপাশে সামান্য স্ফীতি রয়েছে । বাইরের বায়ুমণ্ডল অক্ষাংশীয় মণ্ডলের বিভিন্ন বন্ধনীতে বিভক্ত এবং একটি বন্ধনীর সাথে অন্য আরেকটি বন্ধনীর সংযোগস্থলে ঝড়-ঝঞ্ঝাপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করে । এ ধরণের পরিবেশের একটি হচ্ছে ‘মহা লাল বিন্দু’ বা Great red spot (GRS) । বৃহস্পতি গ্রহের সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য মহা লাল বিন্দুটি হচ্ছে একটি ভয়ঙ্কর ঝড় । এটি এতোই বড় যে দুই-তিনটি পৃথিবীর সমতুল্য । ডিম্বাকৃতির এক জটিল দানবীয় ঝড় । ঝড়টির বর্তমান অবস্থান হচ্ছে দক্ষিণ নিরক্ষীয় বলয়ে । তবে, এটি সম্ভবত বৃহস্পতির স্থানান্তরিত চাঁদ (Transiting moon) ক্যালিস্টো এর ছায়ায় ছিল । ঝড়টি বৃহস্পতির দক্ষিণ গোলার্ধে নিরক্ষরেখা বা বিষুবরেখার ২২° দক্ষিণে অবস্থিত । ইটের মতো লাল থেকে গোলাপী এবং সাদাসহ রঙের ভিন্নতা রয়েছে । বিশাল এ ঝড়টি দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল এবং সক্রিয় অবস্থায় আছে । ধারণা করা হয়, অতি শক্তিশালী এ ঝড়টি সপ্তদশ শতাব্দী থেকে একটানা বয়ে চলছে । অসংখ্য ছোট ঝড়ের পাশাপাশি দৃশ্যমান আরো একটি বৃত্তাকার সাদা অংশ উজ্জ্বলভাবে অবস্থান করছে । কারণ, ঝড়গুলো প্রচুর সূর্যালোক প্রতিফলিত করে কিংবা একটি গভীর প্রধান মেঘ থেকে প্রতিফলিত আলো প্রদর্শন করে থাকে । এ মহা লাল বিন্দুর উচ্চ-ঊর্ধ্বতা বা গভীরতায় ধোঁয়াশা রয়েছে, যেমন নিরক্ষীয় অঞ্চলে আছে । অসংখ্য উজ্জ্বল সাদা এবং আঁকাবাঁকা দাগ বা পাতলা স্তর যেগুলো সম্ভবত ঘনীভূত সংবহনশীল ঝড়ের খুব উচ্চ-খাড়াইয়ের মেঘের চূড়া । বিপরীত দিকে, নিরক্ষীয় অঞ্চলের উত্তরে গাঢ় বন্ধনী বা ফিতাগুলোতে সামান্য মেঘের আচ্ছাদন রয়েছে । ঝড়টির অভ্যন্তরে বায়ু প্রবাহের গতি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২৭০ মাইল । 'মহা লাল বিন্দু' হচ্ছে বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলে একটি উচ্চ-চাপ অঞ্চল, যা অবিরাম একটি Anticyclonic ঝড় তৈরি করে । যেটি আমাদের সৌরজগতের বৃহত্তম ঝড় । এ দানব ঝড়টি ৪৩২ কিঃমিঃ/ঘন্টা (২৬৮ মাইল) পর্যন্ত বাতাসের গতিবেগ তৈরি করে । ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭১৩ খ্রিস্টাব্দের পর্যবেক্ষণগুলো থেকে ধারণা করা হয় যে, ভয়ানক শক্তিশালী এ ঝড়টি কমপক্ষে ৩৫৭ বছর ধরে বিদ্যমান রয়েছে । ১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে ইংরেজ Polymath, বিজ্ঞানী এবং স্থপতি Robert Hooke FRS মহা লাল বিন্দু ঝড়টি পর্যবেক্ষণ করেন । পরবর্তীতে ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইতালীয় গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ এবং প্রকৌশলী Giovanni Domenico Cassini (Jean-Dominique Cassini) বিস্ময়কর এ ঝড়টি পর্যবেক্ষণ করেন । জার্মানির একজন Pharmacist ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী Samuel Heinrich Schwabe ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে মহা লাল বিন্দুর প্রথম পরিচিত অঙ্কন তৈরি করেন । মহা লাল বিন্দুটি ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে বেশ সুস্পষ্ট হওয়ার আগে ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭০৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বেশ কয়েকটি পর্যবেক্ষণে এটি দৃষ্টি থেকে হারিয়ে গিয়েছিল । ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আবার ঝড়টি ম্লান বা অদৃশ্য হয়ে যায় । ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে মহা লাল বিন্দুর প্রান্তে ফলকায়িত (Flaking) শুরু করে ঝড়টি টুকরো হয়ে ভেঙ্গে যাওয়া কিংবা বিলুপ্ত হওয়ার অবস্থা ঘটেছিল । ঝড়টির সঙ্কুচিত হওয়া এবং Flaking এর কারণে এটি সম্পর্কে কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের উদ্বেগকে আরো উস্কে দিয়েছিল যে, মহা লাল বিন্দুটি আগামী ২০ বছরের মধ্যে বিলীন হয়ে যেতে পারে । যদিও কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে এ বিষয়ে দ্বি-মত ছিল । বৃহস্পতি গ্রহের মহা লাল বিন্দুটি ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘোরে, ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের হিসেব অনুযায়ী যার সময়কাল প্রায় ৪.৫ পৃথিবী দিন বা ১১ Jovian দিন । ৩রা এপ্রিল ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এ ঝড়টির প্রস্থ ১৬৩৫০ কিঃমিঃ (১০১৬০ মাইল) পরিমাপ করা হয় । মহা লাল বিন্দুর ব্যাস হচ্ছে পৃথিবীর ব্যাসের ১.৩ গুণ । এ ঝড়ের চূড়াগুলো (Cloud-tops) আশেপাশের মেঘ চূড়া থেকে প্রায় ৮ কিঃমিঃ (৫.০ মাইল) উপরে । মহা লাল বিন্দুটি বৃহস্পতি গ্রহের অন্যান্য মেঘের তুলনায় উচ্চ-ঊর্ধ্বতায় শীতল । তবে ঝড়ের উপরের বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা গ্রহের বাকি অংশের তুলনায় যথেষ্ট বেশি । নিচের ঝড়ের উত্তালতা থেকে ক্রমবর্ধমান শব্দ তরঙ্গগুলো এ অঞ্চলের উত্তাপের জন্য এটি একটি ব্যাখ্যা হিসেবে প্রস্তাব করা হয় । মহা লাল বিন্দুটি তার দক্ষিণে একটি পরিমিত পূর্বমুখী Jet স্রোত এবং উত্তরে একটি খুব শক্তিশালী পশ্চিমমুখী স্রোত দ্বারা সীমাবদ্ধ । যদিও ঝড়টির শিখর প্রান্তের চারপাশে বাতাস প্রায় ৪৩২ কিঃমিঃ/ঘন্টা (২৬৮ মাইল প্রতি ঘন্টা) বেগে প্রবাহিত হয় । মহা লাল বিন্দুর গভীরতা, অভ্যন্তরীণ কাঠামো এবং সামান্য আন্তঃ-বহিঃপ্রবাহসহ ঝড়টির ভিতরে স্রোত কয়েক দশক ধরে স্থবির রয়েছে বলে মনে হয় । তবে, এর ঘূর্ণন সময়ের সাথে সাথে হ্রাস পেয়েছে । মহা লাল বিন্দুর Anticyclonic সঞ্চালনের মধ্যে ফসফিন (PH₃), অ্যামোনিয়া (NH₃) এবং অ্যারোসলের (Para-H₂) সংমিশ্রণ রয়েছে । কিন্তু Jet স্রোতগুলো যে শক্তি সরবরাহ করে মহা লাল বিন্দুর ঘূর্ণিকে শক্তি দেয়, সেগুলো কাঠামোর ভিত্তির নিচে রয়েছে । মহা লাল বিন্দুর গঠন এবং এর লাল রঙের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি । তবে পরীক্ষাগারে নানা পরীক্ষা দ্বারা সমর্থিত অনুমান করা হয় যে: Ammonium hydrosulfide এবং জৈব যৌগ Acetylene এর সংস্পর্শে সূর্যের অতিবেগুনী বিকিরণ থেকে সৃষ্ট রাসায়নিক উপাদানগুলোর কারণে এমন রঙ হতে পারে, যা একটি লালচে উপাদান তৈরি করে । সম্ভবত এটি একটি জটিল জৈব যৌগ, যেটি Tholin নামে পরিচিত । যৌগগুলোর উচ্চ-ঊর্ধ্বতাও এ রঙে অবদান রাখতে পারে । Laboratory অধ্যয়নগুলোতে বৃহস্পতির মেঘের রাসায়নিক সংমিশ্রণে সূর্যের মহাজাগতিক অতিবেগুনী রশ্মির (Cosmic UV rays) প্রভাব পরীক্ষা করা হয় । বৃহস্পতি গ্রহের বাইরের বায়ুমণ্ডলে Ammonium hydrosulfide এবং জৈব যৌগ Acetylene এর সাথে সূর্যের অতিবেগুনী বিকিরণ থেকে সৃষ্ট রাসায়নিক উপাদানগুলোর বিক্রিয়া করে গভীর লাল রঙ তৈরি করে । মহা লাল বিন্দু বর্ণে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়, প্রায় ইট-লাল থেকে ফ্যাকাশে সালমন বা এমনকি সাদা । মহা লাল বিন্দুটি মাঝে মাঝে অদৃশ্য হয়ে যায় । শুধুমাত্র Red Spot Hollow এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠে, যা দক্ষিণ নিরক্ষীয় বলয় বা অঞ্চলে (South Equatorial Belt বা SEB) এটির অবস্থান । এর দৃশ্যমানতা দৃশ্যত দক্ষিণ নিরক্ষীয় বলয়ের সাথে মিলিত হয় যখন বলয়টি উজ্জ্বল সাদা হয় ও মহা লাল বিন্দুটি অন্ধকার হতে থাকে এবং যখন এটি অন্ধকার হয় মহা লাল বিন্দুটি সাধারণত হালকা হয় । ঐ গবেষণা থেকে পরামর্শ দেয়া হয় যে, ঝড়ের অশান্তি বা আলোড়নপূর্ণতার কারণে ঝড়টি চরম পরিমাণে শব্দ তরঙ্গ সৃষ্টি করে । শব্দ তরঙ্গগুলো ঝড়ের উপরে ৮০০ কিলোমিটার (৫০০ মাইল) উচ্চতায় উল্লম্বভাবে ভ্রমণ করে থাকে । যেখানে তারা উপরের বায়ুমণ্ডলে ভেঙে যায় এবং তরঙ্গ শক্তিকে তাপে রূপান্তর করে । এটি উপরের বায়ুমণ্ডলের একটি অঞ্চল তৈরি করে যা ১৬০০ Kelvin (১৩৩০°C বা ২৪২০°F)— এ উচ্চতায় গ্রহের বাকি অংশের তুলনায় কয়েক শত Kelvin বেশি উষ্ণ থাকে । এ প্রভাবটিকে "সৈকতে সমুদ্রের ঢেউ বিধ্বস্ত হওয়ার মতো" অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে । ঘর্ষণ প্রদানের জন্য কোনো গ্রহের পৃষ্ঠ (শুধুমাত্র হাইড্রোজেনের একটি আবরণ) না থাকার কারণে ঝড়টি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিদ্যমান বা অব্যাহত রয়েছে । সঞ্চালনকারী গ্যাস ঘূর্ণিগুলো (Eddies) বায়ুমণ্ডলে খুব দীর্ঘ সময় ধরে থাকে, কারণ তাদের কৌণিক গতিবেগ বা ভরবেগের বিরোধিতা করার মতো কিছুই নেই । মহা লাল বিন্দুর সংলগ্নে দুটি ‘লাল দাগ’ এবং ঝড়টিতে ১২ সেঃমিঃ বড় একটি ছ্যাঁদা দেখা যায় । এ ঝড়ের সর্বোচ্চ ঊর্ধ্বতা আশেপাশের মেঘ চূড়াগুলো (Cloud-tops) থেকে প্রায় ৮ কিঃমিঃ (৫ মাইল) উপরে । ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের প্রথমদিকে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, প্রায় ৪১০০০ কিঃমিঃ (২৫৫০০ মাইল) জুড়ে ঝড়টির অবস্থান ছিল । ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে Voyager নভোযানের উড়ান (Flyby) থেকে পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ঝড়টির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩৩০০ কিঃমিঃ (১৪৫০০ মাইল) এবং প্রস্থ প্রায় ১৩০০০ কিঃমিঃ (৮০০০মাইল) ছিল । ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে Hubble Space Telescope এর পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, ঝড়টি আকারে ২০৯৫০ কিঃমিঃ (১৩০২০ মাইল) কমেছে এবং পরবর্তীতে ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের পর্যবেক্ষণে ঝড়টির আকার দেখা যায় প্রায় ১৭৯১০ কিঃমিঃ (১১১৩০ মাইল) । ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের হিসেবে ঝড়টি প্রায় ১৬৫০০ কিঃমিঃ থেকে ১০৯৪০ কিঃমিঃ (১০২৫০ মাইল থেকে ৬৮০০ মাইল) পরিমাপ করা হয় এবং প্রতি বছর এটির প্রায় ৯৩০ কিঃমিঃ (৫৮০ মাইল) দৈর্ঘ্য কমেছিল । ২০২১ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে প্রেরিত Juno spacecraft মহাকাশযান দ্বারা মহা লাল বিন্দুর গভীরতা পরিমাপ করা হয় প্রায় ৩০০-৫০০ কিঃমিঃ (১৯০-৩১০ মাইল) । এছাড়া, বৃহস্পতির মেরুতে বেশ কয়েকটি মেরু ঘূর্ণিঝড়পুঞ্জ বা ঘূর্ণিঝড়মণ্ডলী রয়েছে । উত্তর ঘূর্ণিঝড়পুঞ্জে ৯টি ঘূর্ণিঝড় রয়েছে, যার কেন্দ্রে বড় ১টি এবং এটির চারপাশে রয়েছে ৮টি ঘূর্ণিঝড় । অন্যদিকে দক্ষিণ অংশটিও ১টি কেন্দ্রীয় ঘূর্ণি বা ঘূর্ণিবাত্যা নিয়ে গঠিত, যার ৫টি বড় এবং ১টি ছোট ঘূর্ণিঝড় দ্বারা বেষ্টিত । এ মেরু কাঠামোগুলো বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলের তীব্র অশান্তি বা আলোড়নপূর্ণতার কারণে ঘটে থাকে । যেটিকে শনি গ্রহের উত্তর মেরুর ষট্কোণ বা ষড়ভুজ ক্ষেত্রের (Hexagon) সাথে তুলনা করা যেতে পারে । ২০০০ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ গোলার্ধে একটি বায়ুমণ্ডলীয় বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছিল যেটি মহা লাল বিন্দুর মতোই, কিন্তু এটি ছিল ছোট । সাদা ডিম্বাকার আকৃতির ঝড়গুলো একত্রিত হয়ে একটি একক বৈশিষ্ট্য তৈরি করে । ১৯৩৯-১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে এ তিনটি ছোট সাদা ডিম্বাকার আকৃতির ঝড় একত্রিত হয়ে গঠিত হয়েছিল । এ একত্রিত বৈশিষ্ট্যটির নাম Oval BA । ওভাল ঝড়টি পরবর্তীতে সাদা থেকে লালচে রঙে পরিণত হয়ে তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এটিকে "ছোট লাল বিন্দু" বা Little red spot বা Red junior নামকরণ করেছেন । গত ৫ই জুন ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে Great red spot এবং Oval BA এক-কেন্দ্রাভিমুখতা বা অভিসারণের (Convergence) দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়েছিল । ঝড় দুটি প্রায় প্রতি দুই বছর পর পর একে অপরকে অতিক্রম করে । তবে ২০০২ খ্রিস্টাব্দে এবং ২০০৪ খ্রিস্টাব্দের এ অতিক্রমগুলো খুব কম তাৎপর্যপূর্ণ ছিল । NASA এর Goddard space flight center এর আমেরিকান গ্রহ বিজ্ঞানী Amy Simon-Miller ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, ঝড়গুলো তাদের সবচেয়ে কাছাকাছি চলে যাবে । কিন্তু 'ছোট লাল বিন্দুটি' স্বল্প মেয়াদে তার আকৃতি বা গঠন ও তীব্রতা পরিবর্তন করে এবং ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বায়ুমণ্ডলে তার সাধারণ অবস্থান বজায় রেখেছে । ধারণা করা হয়, 'ছোট লাল বিন্দু'টি এক সময় মহা লাল বিন্দুর মতোই একটি দৈত্যাকার ঘূর্ণি বা ঘূর্ণিবাত্যা বা ঘূর্ণিঝড়ে (Giant vortex) পরিণত হতে পারে । এটিকে পৃথিবীর তাপমণ্ডলের (Thermosphere) ঘূর্ণিগুলোর মতোই অর্ধ-স্থিতিশীল বলে মনে হয় । এ বৈশিষ্ট্যই সম্ভবত বৃহস্পতির আইও (Io) চাঁদ থেকে উৎপন্ন চার্জিত কণার মধ্যে মিথস্ক্রিয়া দ্বারা গঠিত হতে পারে । আইও চাঁদের আগ্নেয়গিরিগুলো প্রচুর পরিমাণে সালফার ডাই অক্সাইড নির্গত করে, যা চাঁদের কক্ষপথে একটি Gas torus তৈরি করেছে । উল্লেখ্য যে: 'The Great Red Spot' বা মহা লাল বিন্দুকে Great Dark Spot এর সাথে বিভ্রান্ত করা উচিত নয় । কারণ ২০০০ খ্রিস্টাব্দে বৃহস্পতির উত্তর মেরুর কাছে Cassini–Huygens মহাকাশযান দ্বারা Great Dark Spot এর মতো একটি বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করা হয়, যে বেশিষ্ট্য নেপচুনের বায়ুমণ্ডলে রয়েছে আর সেটিই হচ্ছে Great Dark Spot ।  বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলীয় প্রচণ্ড চাপে এর হাইড্রোজেন তরলে পরিণত হয়ে উপরিভাগে মহাসাগর সৃষ্টি করেছে । তরল হাইড্রোজেন সাগর তলদেশে দ্রুত ঘূর্ণনের কারণে বিদ্যুৎ তৈরি হয় । অনুমান করা হয় বৃহস্পতি গ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে ধাতব হাইড্রোজেন । যা এই গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে । বৃহস্পতির রয়েছে একটি শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র । পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ২০০০০ গুণ শক্তিশালী । যার ফলে তাপ প্রবাহের পুনর্বন্টন হয় । বৃহস্পতির কেন্দ্রের তাপমাত্রা ৩০০০০° (ডিগ্রী) সেলসিয়াস । তার মানে, সূর্যের পৃষ্টদেশের প্রায় ০৫ গুণ বেশি এই তাপমাত্রা । বৃহস্পতির চৌম্বকক্ষেত্রটি সৌরজগতের যে কোনও গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী । আয়তনের দিক থেকে Heliosphere এর পরে সৌরজগতের বৃহত্তম পরিচিত অবিচ্ছিন্ন কাঠামো । সাথে একটি ৪.১৭০ Gauss (০.৪১৭০ mT) এর Dipole মুহূর্ত রয়েছে, যা ঘূর্ণনের মেরুতে ১০.৩১° কোণে হেলে পড়ে বা কাৎ হয় । এই চৌম্বক ক্ষেত্রটি তরল ধাতব হাইড্রোজেনের কেন্দ্রস্থলের মধ্যে পরিবাহী পদার্থের ঘূর্ণায়মান নড়াচড়া বা গতিবিধির কারণে ঘূর্ণিস্রোত (Eddy current) দ্বারা উৎপন্ন হয়েছে বলে মনে করা হয় । বৃহস্পতির চুম্বকমণ্ডলে গ্যাস আয়নিত হয় । সালফার এবং অক্সিজেন আয়ন তৈরি করে । সেগুলি বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডল থেকে উদ্ভূত হাইড্রোজেন আয়নের সাথে একত্রে বৃহস্পতির নিরক্ষীয় সমতলে একটি প্রাণরস চাদর বা পাত (Plasma sheet) তৈরি করে, যা গ্রহের সাথে ঘুরতে থাকে । যার ফলে চৌম্বকীয় Dipole মুহূর্তে চৌম্বক ক্ষেত্রের বিকৃতি ঘটে Magnetodisk এ পরিণত হয় । ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলে বৃহস্পতির উত্তর মেরুতে একটি মহা শীতল বিন্দু বা Great cold spot আবিষ্কৃত হয় । শীতল দাগ ফেলা টুকরো অংশটি ২৪০০০ কিঃমিঃ (১৫০০০ মাইল) জুড়ে অবস্থিত এবং ১২০০০ কিঃমিঃ (৭৫০০ মাইল) প্রশস্ত । এটি গ্রহের উপরের বায়ুমণ্ডলে আশেপাশের এলাকার তুলনায় প্রায় ২০০° C (৩৬০° F) শীতল । যদিও এটি সময়ে সময়ে অদৃশ্য হয়ে যায় এবং পুনরুত্থিত হয় বলে মনে করা হয় । ধীরে ধীরে পরিবর্তিত মহা লাল বিন্দুর চেয়ে মহা শীতল বিন্দুটি অনেক বেশি উদ্বায়ী (Volatile) । মাত্র কয়েক দিন বা সপ্তাহে এর আকৃতি এবং আকারে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন হয় । যুক্তরাজ্যের University of Leicester এর একজন গ্রহসংক্রান্ত জ্যোতির্বিজ্ঞানী Tom Stallard বলেছেন যে, ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমাদের কাছে এর অনুসন্ধান করার জন্য তথ্য থাকা পর্যন্ত এটি পুনরায় আবির্ভূত হয়েছে । মহা শীতল বিন্দুটি সম্ভবত গ্রহের পরম বিস্ময়কর, দর্শনীয় ও অনাবিল সুন্দর মেরুপ্রভার একটি উপজাত হিসেবে গঠিত হয়েছে । গবেষকরা বলেছেন যে, যেভাবে মহা শীতল বিন্দুটি সর্বদা পুনরায় গঠন করে তাই এটি মেরুপ্রভাগুলির মতই পুরনো হতে পারে- বয়সে হাজার হাজার বছর পর্যন্ত । এই বিশাল গ্যাসীয় গ্রহটির বিস্ময়কর আবহাওয়া, এখানকার পরিবেশ, এমনকি শতাব্দী কাল ধরে কিভাবে দুর্দান্ত ঝড়গুলি বয়ে চলছে— সত্যিই ভাবনার বিষয় ।

বৃহস্পতির ৮০টি পরিচিত প্রাকৃতিক উপগ্রহ রয়েছে (সম্ভবত আরও অনেকগুলি রয়েছে) । এই উপগ্রহগুলি অনুগামী গতিতে বৃহস্পতিকে প্রদক্ষিণ করছে । তবে কয়েকটি উপগ্রহ বৃহস্পতির ঘূর্ণনের বিপরীত গতিতে ঘুরছে । উপগ্রহগুলির মধ্যে ৬০টি উপগ্রহ ১০ কিলোমিটার ব্যাস এর কম । ০৪টি বৃহৎ আকৃতির উপগ্রহ রয়েছে যেমন: Io, Europa, Ganymede এবং Callisto । এই উপগ্রহ বা চাঁদগুলিকে ০৭-১৩ই জানুয়ারি ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ ও দার্শনিক Galileo Galilei আবিষ্কার করেন । তিনি এদের নামকরণ করেন 'Medicean stars' । এইগুলি সৌরজগতের বৃহত্তম চাঁদ । Europa এবং Io চাঁদ প্রায় পৃথিবীর চাঁদের আকৃতির, Callisto চাঁদ প্রায় বুধ গ্রহের আকৃতির এবং Ganymede হচ্ছে সর্ববৃহৎ চাঁদ । বৃহৎ আকৃতির এই চারটি চাঁদকে গ্যালিলীয় চাঁদ (Galilean moon) বলে । বৃষ্টিহীন একটি পরিষ্কার রাতে এইগুলিকে দূরবীন দিয়ে পৃথিবী থেকে দেখা যায় । এছাড়া বৃহস্পতি গ্রহের দুটি ছোট চাঁদ হচ্ছে Amalthea এবং Adrastea । বৃহস্পতির চাঁদগুলি বর্তমানে বিভিন্ন দলে বিভক্ত, যদিও বেশ কয়েকটি চাঁদ রয়েছে যেগুলি কোন দলের অংশ নয় । বৃহস্পতির বিষুবরেখার সমতলের কাছে প্রায় বৃত্তাকার কক্ষপথ রয়েছে— এমন ০৮টি অভ্যন্তরীণ নিয়মিত চাঁদ বৃহস্পতির পাশাপাশি গঠিত হয়েছে বলে মনে করা হয় । বাকি চাঁদগুলি অনিয়মিত চাঁদ কিংবা আধৃত গ্রহাণু (Captured asteroids) বা আধৃত গ্রহাণুর টুকরো । প্রতিটি গোষ্ঠীর মধ্যে অনিয়মিত চাঁদগুলির একটি সাধারণ উৎস থাকতে পারে । সম্ভবত একটি বৃহত্তর চাঁদ বা আধৃত দেহ (Captured body) যা ভেঙে গেছে । বৃহস্পতির চাঁদ ঐতিহ্যগতভাবেই তাদের অনুরূপ কক্ষপথের উপাদানের উপর ভিত্তি করে ০৪টির ০৪টি দলে বিভক্ত ছিল । বৃহস্পতির চাঁদগুলিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয় যেমন (ক) নিয়মিত চাঁদ (Regular moon): অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী (Inner group), গ্যালিলিয়ান চাঁদ (Galilean moons) (খ) অনিয়মিত চাঁদ (Irregular moon): হিমালিয়া গোষ্ঠী (Himalia group), আনাঙ্কে গোষ্ঠী (Ananke group), কারমে গোষ্ঠী (Carme group), পাসিফাই গোষ্ঠী (Pasiphae group) । ০৩রা ডিসেম্বর ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে Space probe pioneer 10 ছিল প্রথম স্বয়ংক্রিয় মহাকাশযান যেটি বৃহস্পতি গ্রহ পরিদর্শন করে । পরবর্তীতে ০৪ঠা ডিসেম্বর ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে Space probe pioneer 11 মহাকাশযান বৃহস্পতি গ্রহটির সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় এবং এর বৈশিষ্ট্য ও ঘটনা সম্পর্কে তথ্য উদ্ঘাটন করে তা ফেরৎ পাঠায় । যেমন: মহা লাল বিন্দুর রঙ পরিবর্তন হয়ে কমলা থেকে গাঢ় বাদামী হয়েছে । Io চাঁদের কক্ষপথে আয়নিত পরমাণুর একটি Torus আবিষ্কার করে, যা চাঁদের পৃষ্ঠে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকে পাওয়া গেছে । Pioneer মহাকাশযানটি গ্রহের পিছনে চলে যাওয়ার সাথে সাথে এটি রাতে পাশের বায়ুমণ্ডলে বিদ্যুৎ চমক বা ঝলকানি লক্ষ্য করে । ০৫ই মার্চ ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে Voyager 1 এবং ০৯ই জুলাই ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে Voyager 2 মহাশূন্যযান বৃহস্পতির পাশ দিয়ে উড়ে গিয়ে বিশেষকার্যে অভিযান শুরু করে গ্যালিলিয়ান চাঁদগুলি (Galilean moons) সম্পর্কে ব্যাপক তথ্য সংগ্রহ এবং বৃহস্পতির বলয় আবিষ্কার করে । ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে একটি মনুষ্যবিহীন মহাকাশযান Galileo spacecraft বৃহস্পতির উদ্দেশে রওনা দেয়ার পর ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে বৃহস্পতিতে পৌঁছে সেখানকার নানা তথ্য দেয় ৷ ০৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দ এবং ০৪ই ফেব্রুয়ারি ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে Ulysses solar probe মহাকাশযান বৃহস্পতির মুখোমুখি হয়ে Mission সম্পন্ন করে । এটি সূর্যের চারপাশে একটি মেরু কক্ষপথ অর্জনের জন্য একটি Flyby কৌশল সম্পাদন করে । অতিক্রমের সময় মহাকাশযানটি বৃহস্পতির চুম্বকমণ্ডল (Magnetosphere) সম্পর্কে অধ্যয়ন করে, যদিও গ্রহটির ছবি তোলার জন্য এতে কোনও Camera ছিল না । পরবর্তীতে একাধিক Robotic মহাকাশযানের সাহায্যে বৃহস্পতিকে অন্বেষণ করা হয় । ৩০শে ডিসেম্বর ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে Cassini probe মহাকাশযানটি বৃহস্পতি হয়ে শনির পথে উড়েছিল এবং উচ্চ-নির্ণয়কর ছবি প্রদান করে । The new horizons probe মহাকাশযানটি ২৮শে ফেব্রুয়ারি ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে বামন গ্রহ Plutoতে যাওয়ার পথে বৃহস্পতি থেকে মাধ্যাকর্ষণ বা অভিকর্ষ (Gravity) ব্যবহার করে বা সহায়তা নিয়ে বিশেষকার্য সম্পাদন করতে উড়ে যায় । যদিও, এটি ছিল মূলত Pluto গ্রহের উদ্দেশে যাত্রা এবং এর পথে তার গতিপথ বাঁকিয়েছিল । New horizons probe মহাকাশযানের Camera দ্বারা Io চাঁদের আগ্নেয়গিরি থেকে প্রাণরস উৎপাদন বা উৎপাদিত দ্রব্যের পরিমাণ (Plasma output) পরিমাপ করে এবং মহাকাশযানটি চারটি গ্যালিলিয়ান চাঁদকে (Galilean moons) বিস্তারিতভাবে অধ্যয়ন করে । NASA এর মনুষ্যবিহীন Juno spacecraft নভোযান ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে এবং ০৪ই জুলাই ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে বৃহস্পতি গ্রহটি পরিদর্শন বা অনুসন্ধানের জন্য বৃহস্পতির চারপাশে কক্ষপথে প্রবেশ করে । সেই সময় ধারণা করা হয়েছিল যে Mission এর সময় মহাকাশযানটি বৃহস্পতির চুম্বকমণ্ডল থেকে উচ্চ মাত্রার বিকিরণের সংস্পর্শে আসবে, যা ভবিষ্যতে কিছু যন্ত্রের ব্যর্থতা বা বিকল হওয়ার কারণ হতে পারে । ২৭শে আগস্ট ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে মহাকাশযানটি বৃহস্পতির জন্য তার প্রথম উড়ান (Flyby) সম্পন্ন করে এবং বৃহস্পতির উত্তর মেরুর প্রথম ছবি ফেরৎ পাঠায় । বিজ্ঞানীদের বৃহস্পতি গ্রহের বৃহত্তর বরফ সমৃদ্ধ চাঁদগুলি সম্পর্কে অধ্যয়ন করে বিশেষকার্য (Mission) সম্পাদন করার প্রচুর আগ্রহ রয়েছে । যেগুলির পৃষ্ঠতলে বরফ-ঢাকা তরল মহাসাগর থাকতে পারে । বৃহস্পতির প্রণালী বা দৈহিক গঠনতন্ত্র (Jupiter system) অন্বেষণের জন্য ভবিষ্যত লক্ষ্যগুলির (Lunar flyby) মধ্যে রয়েছে Europa চাঁদের সম্ভাব্য বরফ-ঢাকা তরল মহাসাগর, Ganymede, Callisto এবং Io চাঁদ । কিন্তু তহবিল সংকটের কারণে এটির অগ্রগতি বিলম্বিত করেছে । যার ফলে ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে NASA এর JIMO (Jupiter Icy Moons Orbiter) প্রকল্প বাতিল হয়ে যায় । EJSM / Laplace নামে একটি যৌথ NASA / ESA মিশনের জন্য পরবর্তী প্রস্তাব তৈরি করা হয়, যার একটি অস্থায়ী উৎক্ষেপণের তারিখ ছিল ২০২০ খ্রিস্টাব্দের দিকে । সিদ্ধান্ত হয় যে, NASA এর নেতৃত্বাধীন Jupiter Europa Orbiter নিয়ে EJSM / Laplace গঠিত হবে এবং ESA (European Space Agency) এর নেতৃত্বাধীন Jupiter Ganymede Orbiter গঠিত হবে । কিন্তু ESA আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১১ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলে ঐ প্রকল্প থেকে নিজের অংশীদারিত্বের সমাপ্তি ঘটায় । NASA তেও বাজেট সমস্যা দেখা দেয়, যার কারণে মিশনের সময়সূচী পরিবর্তন হয় । পরবর্তীতে ESA তার L1 Cosmic Vision নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য শুধুমাত্র ইউরোপীয় বিশেষকার্য (European mission) নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে । এতে করে আগামী ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে ESA এর Jupiter Icy Moon Explorer (JUICE) হিসেবে এই পরিকল্পনাগুলি চালু করা বা উৎক্ষেপণের (Launch) জন্য এবং ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে NASA এর Europa Clipper mission চালু করা বা উৎক্ষেপণের (Launch) জন্য তারিখ নির্ধারিত আছে ৷ অন্যান্য প্রস্তাবিত মিশনের মধ্যে রয়েছে Chinese National Space Administration এর Gan De mission, যার লক্ষ্য হচ্ছে Jovian system এর মধ্যে একটি Orbiter চালু করা । সম্ভবত ২০৩৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে China National Space Administration (CNSA) এর Interstellar Express এবং NASA এর Interstellar Probe (প্রস্তাবিত) অভিযানের অংশ হিসেবে এগুলি বৃহস্পতির মাধ্যাকর্ষণ ব্যবহার করে তাদেরকে সূর্য দ্বারা আশেপাশের আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যমে গঠিত গহ্বর Heliosphere এর প্রান্তে পৌঁছতে সাহায্য করবে ।

বৃহস্পতিকে সৌরজগতের প্রাচীনতম গ্রহ বলে মনে করা হয় । হাইড্রোজেন এবং হিলিয়ামের বায়ুমণ্ডলীয় অনুপাত আদিম সৌর নীহারিকার তাত্ত্বিক গঠনের কাছাকাছি । সম্ভবত বৃহস্পতি গ্রহটি আদিম সৌর নীহারিকাটির সরাসরি সংশ্লেষ থেকে এসেছিল । বৃহস্পতির কেন্দ্রস্থলে রয়েছে কঠিন পদার্থ এবং পাশাপাশি সম্ভবত বর্ণহীন, গন্ধহীন এবং স্বাদহীন নিষ্ক্রিয় গ্যাস হিলিয়ামের কিছু অংশ ঘনীভূত অবস্থায় আছে । উপরের বায়ুমণ্ডলে নিয়ন ভর দ্বারা প্রতি মিলিয়নে ২0টি অংশ নিয়ে গঠিত, যা সূর্যের মত প্রচুর পরিমাণে প্রায় দশমাংশ । সূর্যের হিলিয়াম গঠনের হিলিয়ামও শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ কমে গেছে । এই হ্রাস বা অবক্ষয় হিলিয়ামসমৃদ্ধ ফোঁটা হিসেবে এই উপাদানগুলির অধঃক্ষেপণের ফলে (বৃষ্টিপাতের মতই), একটি প্রক্রিয়া যা গ্রহের অভ্যন্তরে গভীরভাবে ঘটে । The Kelvin–Helmholtz instability বা একটি তরল অস্থিরতা প্রক্রিয়ার কারণে বৃহস্পতি সৌর বিকিরণের মাধ্যমে যত বেশি তাপ গ্রহণ করে তার চেয়ে বেশি বিকিরণ করে । যখন এটি গঠিত হয়েছিল তখন বৃহস্পতি ছিল আরও বেশি উত্তপ্ত এবং তার বর্তমান ব্যাসের প্রায় দ্বি-গুণ ছিল । আলো এবং পদার্থের মিথস্ক্রিয়ার (Spectroscopy) উপর ভিত্তি করে শনি গ্রহকে বৃহস্পতির অনুরূপ বলে মনে করা হয় । তবে অন্যান্য দৈত্য গ্রহ যেমন ইউরেনাস এবং নেপচুনে তুলনামূলকভাবে কম হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, অক্সিজেন, কার্বন, নাইট্রোজেন ও সালফার রয়েছে । এই গ্রহগুলি বরফের দৈত্য হিসেবে পরিচিত । কারণ তাদের অধিকাংশ উদ্বায়ী যৌগগুলি কঠিন আকারে থাকে । বৃহস্পতিসহ শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুনকে গ্যাস দানব গ্রহ বলা হয় । এই চারটি গ্রহকে একত্রে জোভিয়ান গ্রহ (Jovian planet) বলে । Jovian শব্দটি Jupiter এর বিশেষণ রুপ । ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের জ্যোতির্বিজ্ঞানী Bernard Flood Burke এবং যুক্তরাষ্ট্রের জ্যোতির্বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ Kenneth Linn Franklin আবিষ্কার করেন যে বৃহস্পতি ২২.২ MHz frequencyতে রেডিও তরঙ্গের বিস্ফোরণ নির্গত করে । এই বিস্ফোরণের সময়কাল গ্রহের ঘূর্ণনের সাথে মিলে যায় । তারা বৃহস্পতির ঘূর্ণন হারের জন্য আরও সুনির্দিষ্ট মান নির্ধারণ করতে এই তথ্য ব্যবহার করেছিলেন । বৃহস্পতি থেকে উদ্ভূত রেডিও তরঙ্গ বিস্ফোরণ দু’টি আকারে পাওয়া যায়: দীর্ঘ বিস্ফোরণ ( L-bursts) কয়েক সেকেন্ড পর্যন্ত স্থায়ী হয় এবং সংক্ষিপ্ত বিস্ফোরণ (S-bursts) এক সেকেণ্ডের একশত ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম স্থায়ী হয় । বিজ্ঞানীরা বৃহস্পতি থেকে প্রেরিত রেডিও সংকেতের তিনটি রূপ আবিষ্কার করেছেন: (ক) ডেকামেট্রিক রেডিও বিস্ফোরণ (Decametric radio bursts) (দশ মিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্য সহ) বৃহস্পতির ঘূর্ণনের সাথে পরিবর্তিত হয় এবং বৃহস্পতির চৌম্বক ক্ষেত্রের সাথে Io চাঁদের মিথস্ক্রিয়া দ্বারা প্রভাবিত হয় (খ) ডেসিমেট্রিক রেডিও নির্গমন (Decimetric radio emission) (সেন্টিমিটারে পরিমাপ করা তরঙ্গদৈর্ঘ্য সহ) যেটি ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের জ্যোতির্বিজ্ঞানী, জ্যোতির্পদার্থবিদ Frank Donald Drake এবং নরওয়েজিয়ান প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী Hein Hvatum প্রথম পর্যবেক্ষণ করেন । এই সংকেতের উৎপত্তি হচ্ছে বৃহস্পতির বিষুবরেখার চারপাশে একটি টরাস আকৃতির বন্ধনী (Torus shaped belt), যা বৃহস্পতির চৌম্বক ক্ষেত্রে ত্বরান্বিত Electron থেকে সাইক্লোট্রন বিকিরণ (Cyclotron radiation) তৈরি করে (গ) বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলে তাপ দ্বারা তাপীয় বিকিরণ উৎপাদিত হয় । সৌরজগতের ০৮টি গ্রহের মধ্যে বৃহস্পতি সবচেয়ে বড় গ্রহ হিসেবে এর মহাকর্ষীয় প্রভাব সৌরজগৎ গঠনে সাহায্য করেছে । বুধ গ্রহ বাদে গ্রহগুলির কক্ষপথ সূর্যের নিরক্ষীয় সমতলের চেয়ে বৃহস্পতির কক্ষপথের কাছাকাছি অবস্থিত । গ্রহাণু বন্ধনীর কার্কউড ফাঁকগুলি (Kirkwood gap) বেশিরভাগই বৃহস্পতি দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে । অভ্যন্তরীণ সৌরজগতের ইতিহাসে বিলম্বিত বা দেরিতে ভারী গোলাবর্ষণের (Bombardment) জন্য এই গ্রহটি দায়ী হতে পারে । উল্লেখ্য যে, মহাবিস্ফোরণের (Big bang) পরই মহাবিশ্বের উৎপত্তি । আদি মহাবিশ্বের ইতিহাস খুবই হিংস্র । এক মহা দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় সৌরজগতের সৃষ্টি । কালের আবর্তে বিভিন্ন ধাপে প্রচণ্ড উত্তপ্ত থেকে পৃথিবী নামক গ্রহটি এক সময় ঠাণ্ডা, শান্ত ও জীবন ধারণের উপযোগী হলে এখানে প্রাণের উৎপত্তি ঘটে । এই অপার বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মহাজাগতিক অসংখ্য গ্রহাণু, ধূমকেতু ও বিভিন্ন উত্তপ্ত বস্তুকণা প্রচণ্ডগতিতে উড়ে বেড়ায় এবং একে অপরের সাথে তীব্রভাবে সংঘর্ষ বা ধাক্কা খায় । যখনই কোন গ্রহাণু বা ধূমকেতু সৌরজগতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তখন বৃহস্পতি তার বিশালতা বা দানবীয় আকৃতির কারণে ঐ সকল অপ্রত্যাশিত বস্তুকে মহাকর্ষীয় আকর্ষণে নিজের দিকে টেনে নেয় । ফলে নিজে এক ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার পরও মহাজাগতিক গ্রহাণু, ধূমকেতু ও অন্যান্য বস্তুর ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ বা বিধ্বংসী আঘাত এবং প্রভাব থেকে তার প্রতিবেশী বন্ধুপ্রতিম তারচেয়ে ছোট গ্রহগুলিকেও রক্ষা করে । হয়তো অন্যদের বাঁচানোর জন্য এটি তার বিশাল আত্মত্যাগ । আবার বিপরীত দিকে- সাম্প্রতিক এক গবেষণায় অনুমান করা হয় যে, এই সৌরজগতেই ছিল আরও অনেক ছোট ছোট গ্রহ । গ্যাসীয় পদার্থে তৈরি ঐ ছোট ছোট গ্রহগুলিকে যাদের কেন্দ্রের মধ্যে ছিল কঠিন পদার্থ সেগুলিকে এক সময় গিলে খেয়ে আজকে এত বৃহদাকার ধারণ করেছে এই গ্রহখাদক বৃহস্পতি । সত্যিই বিস্ময়কর! জানি-না, প্রকৃতির এই অপার রহস্য । যেহেতু সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহের তুলনায় বৃহস্পতির মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সবচেয়ে বেশি (পৃথিবীর তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি) । তাই বৃহস্পতির চাঁদগুলি ছাড়াও এর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র অনেকগুলি গ্রহাণুকে নিয়ন্ত্রণ করে । যেগুলি Lagrangian বিন্দুগুলির চারপাশে বসতি স্থাপন করেছে । সূর্যের চারপাশে তার কক্ষপথে গ্রহটিকে অনুসরণ করে । এগুলি ট্রোজান গ্রহাণু (Trojan asteroids) নামে পরিচিত । প্রাচীন গ্রীক মহাকাব্য Iliad কে সম্মান জানাতে গ্রীক এবং ট্রোজান ‘Camps’ এ বিভক্ত । জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী Maximilian Franz Joseph Cornelius Wolf ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে এদের মধ্যে প্রথমটি 588 Achilles গ্রহাণু আবিষ্কার করেন । তারপর থেকে দুই হাজারেরও বেশি আবিষ্কৃত হয়েছে । বৃহত্তমটি হচ্ছে বৃহস্পতি Trojan 624 Hektor গ্রহাণু । বৃহস্পতি পরিবারকে ধূমকেতু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, কারণ তার একটি আধা-প্রধান অক্ষ রয়েছে বৃহস্পতির চেয়ে ছোট । বেশিরভাগ স্বল্প-কালীন ধূমকেতু এই দলের অন্তর্গত । বৃহস্পতি পরিবারের সদস্যরা নেপচুনের কক্ষপথের বাইরে কুইপার বেল্টে (Kuiper belt) তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হয় । বৃহস্পতির সাথে ঘনিষ্ঠ মুখোমুখি হওয়ার সময় তারা একটি অল্প সময়ের সাথে কক্ষপথে বিচলিত বা বিভ্রান্ত (Perturbed) হয় । যেগুলি পরবর্তীতে সূর্য এবং বৃহস্পতির সাথে নিয়মিত মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়া দ্বারা পরিবর্তিত হয় । বৃহস্পতি বিশাল মাধ্যাকর্ষণ কূপ এবং অভ্যন্তরীণ সৌরজগতের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এটিকে সৌরজগতের Vacuum cleaner বলা হয় । সৌরজগতের অন্য কোন গ্রহের তুলনায় বৃহস্পতির উপর ধূমকেতুর বেশি প্রভাব রয়েছে । উদাহরণস্বরূপ, বৃহস্পতি পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ২০০ গুণ বেশি গ্রহাণু এবং ধূমকেতুর প্রভাব অনুভব করে । অতীতে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন যে, বৃহস্পতি আংশিকভাবে অভ্যন্তরীণ তন্ত্র বা প্রণালী বা দৈহিক গঠনতন্ত্রকে (Inner system) ধূমকেতুর গোলাবর্ষণ (Bombardment) থেকে রক্ষা করে । ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে Computer simulation গুলি পরামর্শ দেয় যে, বৃহস্পতি অভ্যন্তরীণ সৌরজগতের মধ্য দিয়ে যাওয়া ধূমকেতুর সংখ্যায় Net (পাকা বা বাদসাদ দিয়া যাহা থাকে) হ্রাস ঘটায় না । কারণ বৃহস্পতির মাধ্যাকর্ষণ ধূমকেতুগুলির কক্ষপথকে প্রায় ততবার অভ্যন্তরীণভাবে বিক্ষিপ্ত বা বিচলিত করে যতবার এটি তাদের আকর্ষণ বা একত্রিত করে কিংবা বের করে দেয় । তবে এই বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক রয়ে গেছে, কারণ কেউ কেউ মনে করেন যে এটি Kuiper belt থেকে ধূমকেতুকে পৃথিবীর দিকে টানে । আবার অন্যরা বিশ্বাস করেন যে, বৃহস্পতি গ্রহটি পৃথিবীকে উর্ট মেঘ (Oort cloud) থেকে রক্ষা করে । ২০শে জুলাই ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে Comet Shoemaker–Levy 9 ধূমকেতুটি বৃহস্পতির সাথে সংঘর্ষে পড়ে এবং ঐ ধূমকেতুর টুকরো অংশগুলি বৃহস্পতির দক্ষিণ গোলার্ধের উপর আছড়ে পড়ে ও তা ধ্বংস হয়ে যায় । এই ধ্বংসাত্মক প্রভাবগুলি Hubble Space Telescope এবং Galileo spacecraftসহ সারা বিশ্বের মানমন্দিরগুলি দ্বারা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল । এছাড়া তদন্তে জানা গেছে ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দে ইতালীয় গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং প্রকৌশলী Giovanni Domenico Cassini (Jean-Dominique Cassini) দ্বারা আবিষ্কৃত একটি অন্ধকার পৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্য (Dark surface feature) প্রকাশ করা হয়, যেটি একটি প্রভাবের দাগ (An impact scar) হতে পারে । 


ছবি: https://www.nasa.gov/    

বৃহস্পতি গ্রহটি অতিপ্রাচীনকাল থেকেই পরিচিত । ‘বৃহস্পতি’ একটি সংস্কৃত শব্দ । ভারতীয় একটি নাম । পৌরাণিক চরিত্রের নাম হচ্ছে বৃহস্পতি । প্রাচীন হিন্দু সাহিত্যে বর্ণিত যে বৈদিক যুগে একজন ঋষি ছিলেন বৃহস্পতি- যিনি বাগ্মিতার দেবতা, অগ্নি দেবতা, দেবতাদের পরামর্শদাতা এবং গুরু । সনাতন ধর্মের আদি উৎস ঋগ্বেদ (Rigveda) এর মধ্যে বলা হয়েছে পৃথিবীর প্রথম উজ্জ্বল এবং পবিত্র মহাআলোক থেকে হিন্দু দেবতা বৃহস্পতির জন্ম, যিনি সকল অন্ধকার দূর করেন । বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্রে হিন্দু জ্যোতিষীরা বৃহস্পতির নামানুসারে গ্রহের নামকরণ করেন । প্রায়শই একে ‘গুরু’ বলা হয় এবং যার অর্থ ‘শিক্ষক’ । জ্যোতিষশাস্ত্রে দেবগুরু বৃহস্পতিকে সম্মান, বিবাহ, ভাগ্য, আধ্যাত্মিকতা, শান্তি এবং সন্তানের কারক গ্রহ হিসেবে বিশেষ বিবেচনা করা হয় । এই রাশির সংখ্যা হচ্ছে ০৩। এছাড়া সপ্তাহের একটি দিন বা বার এর বাংলা নাম হচ্ছে বৃহস্পতি । মধ্যযুগের বিভিন্ন গ্রন্থে বৃহস্পতি শব্দটি বৃহস্পতি গ্রহকে চিহ্নিত করে । মেসোপটেমিয়ার (Mesopotamia) ইতিহাসের আদিকালে (প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০-৩২০০ অব্দের মধ্যবর্তী সময়ে) ব্যাবিলনীয় জ্যোতির্বিদ্যার সূচনা হয় । সুমেরীয়রা পৌরাণিক কাহিনীকে ঘিরে নিজেদের মতাদর্শ, দর্শন, যুক্তি এবং বিশ্বাস নিয়ে জ্যোতির্বিদ্যা বা জ্যোতিঃশাস্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেন । গ্রহ-সংক্রান্ত দেবতাগণেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল । ফলে ব্যাবিলনীয় সংস্কৃতির উপর যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে । বৃহস্পতি গ্রহের পর্যবেক্ষণ সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম কিংবা অষ্টম শতাব্দীতে ব্যাবিলনীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে পাওয়া যায় । ব্যাবিলনীয় জ্যোতির্বিদগণ গ্রহ-সংক্রান্ত নিজস্ব কার্যকর তত্ত্ব এবং রাশিচক্র প্রবর্তন করেন । প্রাচীন চীনারা বৃহস্পতি গ্রহকে ‘Sui star’ হিসেবে অভিহিত করেন । খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যে এটিই পার্থিব শাখার বিভিন্ন চক্র হিসেবে চীনা রাশিচক্রে বিকশিত হয় । ধর্মীয় বিশ্বাসগুলি কিছু তাওবাদী (Taoist) ধর্মীয় রীতিতে এবং পূর্ব এশীয় রাশিচক্রের ১২টি প্রাণীতে টিকে আছে । বিভিন্ন সংস্কৃতিতে নানা ধরণের পৌরাণিক কাহিনী এবং ধর্মীয় বিশ্বাস আবর্তিত হয়েছে এই বৃহস্পতি গ্রহকে কেন্দ্র করে । প্রাচীন গ্রীক এবং রোমান উভয় সভ্যতায় বৃহস্পতির নামকরণ করা হয়েছে ঐশ্বরিক Pantheon এর প্রধান দেবতাদের নামানুসারে যেমন: গ্রীকদের জন্য Zeus এবং রোমানদের জন্য Jupiter । বৃহস্পতির প্রাচীন নাম Jove । যিনি আলো, আকাশ এবং বজ্রের দেবতা । প্রাচীন রোমান ধর্ম এবং পুরাণে দেবতাদের রাজা । বৃহস্পতির নামকরণ করা হয়েছে রোমান দেবতাদের রাজা Jupiter এর নামে । Jupiter শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘আকাশের পিতা’ । রোমানরা মূলত বৃহস্পতিকে ‘বৃহস্পতির তারা’ (Star of jupiter) / (Iuppiter stella) বলে অবহিত করতেন । কারণ তারা এটিকে পবিত্র বলে বিশ্বাস করেছিলেন তার নামের ঈশ্বরের কাছে । এই নামটি Proto-Indo-European vocative compound থেকে এসেছে । যার অর্থ ‘Father sky-god’ বা ‘Father day-god’ । রোমান Pantheon এর সর্বোচ্চ দেবতা হিসেবে বৃহস্পতি হচ্ছে বজ্র, বজ্রপাত এবং ঝড়ের দেবতা । ১৪ শতকের কাছাকাছি বৃহস্পতি একটি কাব্যিক নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল । রোমানরা বৃহস্পতি গ্রহের নামানুসারে সপ্তাহের পঞ্চম দিনটি নামকরণ করেন Dies Jovis (Jove’s day) । Dies Jovis (লাতিন) এর মধ্যযুগীয় বানান হচ্ছে diēs Iovis । বৃহস্পতিকে প্রাচীন জার্মানির পৌরাণিক কাহিনী এবং Paganism এ বর্ণিত দেবতা Thor এর সমতুল্য করা হয় । যেখান থেকে রোমানদের জন্য Dies Jovis এর ইংরেজি নাম Thursday । ব্যাবিলনীয়দের কাছে এই গ্রহটি তাদের মেসোপটেমিয়া ধর্মের ও ব্যাবিলন শহরের প্রধান দেবতা Marduk (Bel বা Lord) এর প্রতিনিধিত্ব করত । মূলত, Marduk বজ্রপাতের দেবতা এবং তার নক্ষত্র ছিল বৃহস্পতি । ব্যাবিলনীয়রা তাদের রাশিচক্রে নক্ষত্রপুঞ্জ বা নক্ষত্রমণ্ডলকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য বৃহস্পতির প্রায় ১২ বছরের কক্ষপথকে ক্রান্তিবৃত্ত বা গ্রহণরেখার (Ecliptic) সাথে ব্যবহার করেছিলেন । এই গ্রহের পৌরাণিক গ্রীক নাম Zeus । Zeus হচ্ছে গ্রীকদের দেবরাজ । এটি Dias নামেও পরিচিত । বৃহস্পতি গ্রহের নাম আধুনিক গ্রীক সাহিত্যে উল্লেখ আছে । প্রাচীন গ্রীকরা বৃহস্পতি গ্রহটিকে Phaethon নামে জানতেন । উল্লেখ্য যে, গ্রীক পুরাণে বা পৌরাণিক কাহিনীতে Phaethon (Greek: ‘Shining’ বা ‘Radiant’) কে Oceanid Clymene, সূর্য দেবতা Helios এর পুত্র, সূর্যদেবতা, Prote, Rhode এবং একজন মহিলা বা জলপরী বা জলদেবী হিসেবে বিভিন্নভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে । যার অর্থ হচ্ছে ‘উজ্জ্বল এক’ (Shining one) বা ‘জ্বলন্ত তারা’ (Blazing star) । Homeric যুগের Zeus এর গ্রীক পৌরাণিক কাহিনীগুলি Semitic El, Baal, Sumerian Enlil এবং ব্যাবিলনীয় দেবতা Mardukসহ কিছু নিকট-প্রাচ্যের দেবতার সাথে বিশেষ মিল দেখা যায় । গ্রহ এবং গ্রীক দেবতা Zeus এর মধ্যে সংযোগটি নিকট প্রাচ্যের প্রভাব থেকে তৈরি বা আকৃষ্ট হয়েছিল । এটি সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে, যেমনটি গ্রীক দার্শনিক Plato এবং তার সমসাময়িকদের Epinomis এ নথিভুক্ত রয়েছে । মধ্য এশীয় তুর্কি পৌরাণিক কাহিনীতে বৃহস্পতিকে Eren এবং Yultuz থেকে Erendiz বা Erentüz বলা হয় । তুর্কিরা বৃহস্পতির কক্ষপথের সময়কাল ১১ বছর এবং ৩০০ দিন হিসেবে গণনা করেন । তারা বিশ্বাস করেন যে, কিছু সামাজিক এবং প্রাকৃতিক ঘটনা আকাশে Erentüz এর গতিবিধির সাথে যুক্ত । চীনা, ভিয়েতনামী, কোরিয়ান এবং জাপানিরা বৃহস্পতিকে চীনের ০৫টি উপাদানের উপর ভিত্তি করে ‘কাঠ তারকা’ (Wood star) বলে অভিহিত করেন । চীনে এটি ‘বছর-তারকা’ (Year-star) / (Sui-sing) নামে পরিচিত । কারণ চীনা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেছেন যে, এটি প্রতি বছর একটি রাশিচক্রের নক্ষত্রমণ্ডলকে লাফ দেয় । কিছু প্রাচীন চীনা লেখায় বছরগুলির নামকরণ করা হয়েছিল, অন্তত নীতিগতভাবে Jovian রাশিচক্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত । বৃহস্পতি গ্রহটি রাতের আকাশে খালি চোখে দেখা যায় । মাঝে মধ্যে দিনের বেলায় দেখা যায় যখন সূর্যের আলো কম থাকে । বৃহস্পতির জন্য গ্রহের প্রতীক ♃, গ্রীক Zeta থেকে এসেছে (Ƶ) । The International Astronomical Union (I A U) কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে এই গ্রহের বৃহস্পতি নামটি গৃহীত হয় ।

NASA এর James Webb Space Telescope এর মাধ্যমে ১৪ই জুলাই ২০২২ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবার ধারণকৃত ছায়াপথগুচ্ছ বা ছায়াপথ স্তবকের (Galaxy cluster) অসাধারণ সুন্দর, সুস্পষ্ট, পূর্ণাঙ্গ রঙিন, উচ্চ-নির্ণয়কর, তীক্ষ্ণতম, অবলোহিত বিকিরণ এবং অবলোহিত তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ঐতিহাসিক ছবিটি মানবজাতির ইতিহাসে এক বিস্ময়কর আবিষ্কার । কিন্তু এবার ২২শে আগস্ট ২০২২ খ্রিস্টাব্দে বৃহস্পতি গ্রহের এক চমৎকার ছবি তুলে মানুষকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে NASA এর JWST (Webb) দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি । বৃহস্পতির বলয়, দৈত্যাকার ঝড় Great red spot, শক্তিশালী বাতাস, চরম তাপমাত্রা, অত্যাধিক চাপের অবস্থা, মেরুপ্রভা বা মেরুজ্যোতি (Aurora) এবং বিভিন্ন প্রান্তের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি গ্রহটির এমন নিখুঁত ছবিটি দেখে অনেকের মত বিজ্ঞামনষ্ক মানুষসহ বিস্মিত জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাও । বিশ্বের সবচেয়ে নতুন এবং বৃহত্তম Webb এর NIRCam যন্ত্রের সাহায্যে বৃহস্পতি গ্রহের অভ্যন্তরীণ জীবনের এই নতুন যৌগিক চিত্রটি আসলেই বিস্ময়কর । Webb’s Early Release Science program এর জন্য একটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে Paris Observatory এর অধ্যাপক Thierry Fouchet এর সাথে গ্রহজনিত জ্যোতির্বিদ Imke De Pater, University of California এর অধ্যাপক Emerita বৃহস্পতি গ্রহের পর্যবেক্ষণের নেতৃত্ব দেন । বিশ্বের বৃহত্তম, ব্যয়বহুল, শক্তিশালী এবং সবচেয়ে জটিল প্রযুক্তির James Webb Space Telescope (JWST)  https://www.jwst.nasa.gov/index.html  https://web.facebook.com/NASAWebb/   https://webbtelescope.org/  হচ্ছে এ গ্রহের প্রধান মহাকাশ বিজ্ঞান মানমন্দির । এটিকে সংক্ষেপে Webb নামে ডাকা হয় । জ্যোতির্বিদ্যার বিভিন্ন শাখার জন্য যেটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ৷ পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে বর্তমানে এটি মহাকাশে প্রায় ১৫ লক্ষ কিলোমিটার (০১ মিলিয়ন মাইল বা ১.৬ মিলিয়ন কিলোমিটার) দূরে একটি শূন্য বিন্দুকে প্রদক্ষিণ করছে (সূর্য-পৃথিবীর Second Lagrange Point / L2 এর কাছাকাছি) । ঐ বিন্দুতে পৃথিবী এবং সূর্যের মাধ্যাকর্ষণের (Gravity) মান সমান । ফলে এর প্রভাব যে কোনও বস্তুর উপর একই থাকে এবং বস্তুটি স্থিতিশীল হয়ে যায় । এছাড়া যন্ত্রটির ক্ষেত্রে জ্বালানি খরচও কম । Webb বা মানমন্দিরটি (The observatory) পৃথিবী কক্ষের বাইরে অবস্থিত হলেও একই কৌণিক গতিতে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে । তাই পৃথিবী থেকে কম দূরত্বের কারণে খুব সহজে ও দ্রুতগতিতে বৈজ্ঞানিক তথ্য সরবরাহ করছে । Hubble Space Telescope এর চেয়েও এটি প্রায় তিনগুণ বড় এবং শতগুণ বেশি শক্তিশালী । Webb একটি আন্তর্জাতিক মিশন যার নেতৃত্বে NASA এবং এর অংশীদার ESA (European Space Agency) ও CSA (Canadian Space Agency) । NIRCam যন্ত্রে তিনটি বিশেষ অবলোহিত ছাঁকনি থাকার কারণে বৃহস্পতির যে চিত্রটি ধারণ করা হয়েছে তা থেকে গ্রহটির বিশদ বিবরণ প্রদর্শন করে । অবলোহিত আলো মানুষের চোখে অদৃশ্য । তাই আলোকে দৃশ্যমান বর্ণালীতে চিত্রাঙ্কিত বা বিশদভাবে বর্ণনা করা হয় । সাধারণত দীর্ঘতম তরঙ্গদৈর্ঘ্য লালচে এবং ক্ষুদ্রতম তরঙ্গদৈর্ঘ্য আরও নীল দেখায় ।

পৃথিবীর আকাশে এক চমৎকার প্রাকৃতিক আলোর প্রদর্শনী হচ্ছে মেরুপ্রভা বা আকাশে দৃষ্ট আলোকচ্ছটা বা মেরুজ্যোতি (Aurora) । এটি Northern light, Southern light এবং Aurora australis (আরোরা উষা) নামেও পরিচিত রয়েছে । প্রধানত উঁচু অক্ষাংশের এলাকাগুলিতে মেরুপ্রভা দেখা যায় । এছাড়া এটি বৃহস্পতির উত্তর এবং দক্ষিণ আলোর অভূতপূর্ব স্বতন্ত্র দৃশ্য । বৃহস্পতির উভয় মেরুর চারপাশে অবিরামভাবে উজ্জ্বল আলো প্রদর্শন করে । পৃথিবীর মেরুপ্রভা থেকে ভিন্ন, যেটি ক্ষণস্থায়ী । শুধুমাত্র উচ্চতর সৌর কার্যকলাপের সময়ে এটি ঘটে । বৃহস্পতির মেরুপ্রভা স্থায়ী । যদিও সেটির তীব্রতা দিনে দিনে পরিবর্তিত হয় । এগুলি তিনটি প্রধান উপাদান নিয়ে গঠিত (ক) প্রধান ডিম্বাকৃতি: যা উজ্জ্বল, সরু (প্রস্থে ১০০০ কিলোমিটারের কম) বৃত্তাকার বৈশিষ্ট্য যেগুলি চৌম্বক মেরু থেকে প্রায় ১৬° এ অবস্থিত । (খ) উপগ্রহের মেরুপ্রভীয় বিন্দু (Auroral spot): যা বৃহস্পতির আয়নমণ্ডলকে তার বৃহত্তম চাঁদগুলির সাথে সংযোগকারী চৌম্বক ক্ষেত্রের রেখাগুলির পদচিহ্নের সাথে মিলে যায় । (গ) ক্ষণস্থায়ী মেরু নির্গমন: প্রধান ডিম্বাকৃতির মধ্যে অবস্থিত । রেডিও তরঙ্গ থেকে রঞ্জন-রশ্মি পর্যন্ত (৩ keV পর্যন্ত) তড়িচ্চুম্বকীয় বর্ণালীর প্রায় সমস্ত অংশেই মেরুপ্রভীয় নির্গমন সনাক্ত করা হয়েছে । তারা প্রায়শই মধ্য-অবলোহিত (তরঙ্গদৈর্ঘ্য ৩-৪ μm এবং ৭-১৪ μm) এবং দূর অতিবেগুনী বর্ণালী অঞ্চলে (তরঙ্গদৈর্ঘ্য ১২০-১৮০ nm) পরিলক্ষিত হয় । প্রধান ডিম্বাকৃতি হচ্ছে Jovian aurorae এর প্রভাবশালী অংশ । তাদের মোটামুটি স্থিতিশীল আকৃতি এবং অবস্থান রয়েছে । কিন্তু তাদের তীব্রতা সৌর বায়ুর চাপ দ্বারা দৃঢ়ভাবে সংযোজিত হয় । সৌর বায়ু যত শক্তিশালী, মেরুপ্রভা তত দুর্বল । Magnetodisk plasma এবং Jovian আয়নমণ্ডলের মধ্যে বৈদ্যুতিক সম্ভাব্য ফোঁটা বা ঝরা দ্বারা ত্বরান্বিত ইলেকট্রনের শক্তিশালী প্রবাহ কর্তৃক প্রধান ডিম্বাকৃতিগুলি বজায় থাকে । এই ইলেকট্রন ক্ষেত্র সারিবদ্ধ স্রোত বহন করে, যা Magnetodiskএ প্রাণরসের সহ-ঘূর্ণন বজায় রাখে । উল্লেখ্য যে, আয়নিত গ্যাস এবং ইলেকট্রনের সমন্বয়ে গঠিত পদার্থের চতুর্থ অবস্থাকে (কঠিন, তরল ও বায়বীয় এর পরের অবস্থাই হচ্ছে চতুর্থ অবস্থা) প্লাজমা (Plasma) বলে । নিরক্ষীয় চাদরের (Sheet) বাইরের Sparse plasma এর অস্থিরতা ছাড়াই সম্ভাব্য ফোঁটা বা ঝরা বিকশিত হয় এবং এটি সম্ভাব্য ফোঁটা তৈরি না করে শুধুমাত্র সীমিত শক্তির স্রোত বহন করতে পারে । প্রক্ষেপণকারী বা বর্ষণকারী ইলেকট্রনগুলির শক্তি ১০-১০০ keV সীমার মধ্যে থাকে এবং বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলের গভীরে প্রবেশ করে । যেখানে তারা আয়নিত হয় এবং আণবিক হাইড্রোজেনকে উত্তেজিত করে যার ফলে অতিবেগুনী নির্গমন ঘটে । আয়নমণ্ডলে মোট শক্তি যোগান দেয় ১০-১০০ TW । এছাড়াও, আয়নমণ্ডলে প্রবাহিত স্রোতগুলি Joule heating নামে পরিচিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এটিকে উত্তপ্ত করে । এই উত্তাপ, যা ৩০০ TW পর্যন্ত শক্তি উৎপাদন করে । জোভিয়ান মেরুপ্রভা (Jovian aurorae) থেকে শক্তিশালী অবলোহিত বিকিরণ আংশিকভাবে বৃহস্পতির Thermosphereকে উত্তপ্ত করার জন্য দায়ী । উল্লেখ্য যে, সূর্য থেকে উদ্ভূত মহাজাগতিক সৌরঝড়ের কারণে চার্জিত কণাগুলি (Plasma) মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে । এই সকল চার্জিত কণা পৃথিবীতে প্রবেশের সময় বায়ুমণ্ডল এবং পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের সাথে এক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে । সূর্যের চার্জিত কণাগুলি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অণু-পরমাণুকে আঘাত করার ফলে অণু-পরমাণুগুলি আন্দোলিত হয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠে । মৌলিক কণা ইলেকট্রন, প্রোটন এবং নিউট্রন দ্বারা গঠিত হয় পরমাণু । এই পরমাণুর কেন্দ্রে থাকা নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় ইলেকট্রন । সূর্য থেকে আগত চার্জিত কণাগুলি যখন বায়ুমণ্ডলের পরমাণুকে আঘাত করে তখন ইলেকট্রনগুলি তীব্রভাবে উত্তেজিত হয়ে উচ্চ শক্তিতে নিউক্লিয়াস থেকে অপেক্ষাকৃত অনেক দূরে ঘুরতে শুরু করে । আবার যখন ইলেকট্রনগুলি নিম্ন শক্তিস্তরে চলে আসে তখন সেটি এক প্রকার Photon মৌলকণা বা আলোক কণাতে পরিণত হয় । অতি উচ্চ মানের আলো দিয়ে মেরুপ্রভা ঠিক এভাবে কাজ করে । মহা লাল বিন্দুর দাগ বা বিন্দুগুলিকে (The spot) গ্যালিলিয়ান চাঁদ Io, Europa এবং Ganymede চাঁদের বৈশিষ্ট্যের সাথে মিল পাওয়া যায় । কারণ প্রাণরস সহ-ঘূর্ণন চাঁদের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে তাদের আশেপাশে ধীরগতিতে তারা বিকশিত হয় । উজ্জ্বলতম স্থানটি Io চাঁদের অন্তর্গত, যা চুম্বকমণ্ডলে প্রাণরসের প্রধান উৎস । Ionian মেরুপ্রভীয় বিন্দুটি Jovian থেকে Ionian আয়নমণ্ডলে প্রবাহিত আলফভেন স্রোতের (Alfvén current) সাথে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয় । Europa চাঁদটিও একই রকম কিন্তু অনেক ম্লান । কারণ এটির বায়ুমণ্ডল আরও ক্ষীণ এবং এটি একটি দুর্বল প্রাণরস উৎস । Europa চাঁদের বায়ুমণ্ডল তার পৃষ্ঠতল থেকে জলের বরফের পরমানন্দ বা ঊর্ধ্বপাতন (Sublimation) দ্বারা উৎপাদিত হয় । বরং আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপগুলি Io চাঁদের বায়ুমণ্ডল তৈরি করে । Ganymede চাঁদের একটি অভ্যন্তরীণ চৌম্বক ক্ষেত্র রয়েছে এবং নিজস্ব একটি চুম্বকমণ্ডল (Magnetosphere) । এই চুম্বকমণ্ডল এবং বৃহস্পতির মধ্যে মিথস্ক্রিয়া চৌম্বকীয় পুনঃসংযোগের কারণে স্রোত উৎপন্ন করে । Callisto চাঁদের সাথে যুক্ত মেরুপ্রভীয় বিন্দু সম্ভবত Europa চাঁদের মতই । তবে ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের জুন পর্যন্ত এটি শুধুমাত্র একবার দেখা গেছে । সাধারণত Callisto চাঁদের সাথে যুক্ত চৌম্বক ক্ষেত্র রেখাগুলি বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলকে প্রধান মেরুপ্রভীয় ডিম্বাকৃতির (Auroral oval) খুব কাছাকাছি বা বরাবর স্পর্শ করে, যা Callisto চাঁদের মেরুপ্রভীয় বিন্দু সনাক্ত করা কঠিন করে তোলে । উজ্জ্বল Arcs এবং বিন্দুগুলি প্রধান ডিম্বাকৃতির মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে প্রদর্শিত হয় । এই ক্ষণস্থায়ী ঘটনাগুলি সৌর বায়ু বা বাইরের চুম্বকমণ্ডলের গতিশীলতার সাথে মিথস্ক্রিয়া (Interaction) সম্পর্কিত বলে মনে করা হয় । এই অঞ্চলের চৌম্বক ক্ষেত্র রেখাগুলি বা চৌম্বকক্ষেত্রীয়লেজটি (Magnetotail) সম্ভবত উন্মুক্ত । গৌণ বা মধ্যমপ্রকার ডিম্বাকৃতি মাঝে মধ্যে প্রধান ডিম্বাকৃতির ভিতরে পরিলক্ষিত হয় । সেগুলি উন্মুক্ত এবং বন্ধ চৌম্বকীয় ক্ষেত্র রেখা বা মেরু শিখরের মধ্যবর্তী সীমানার সাথে সম্পর্কিত হতে পারে । চৌম্বকশক্তিসম্পন্ন মেরুপ্রভীয় নির্গমন পৃথিবীর মেরুগুলির চারপাশে পর্যবেক্ষণ করা অনুরূপ হতে পারে । বৃহস্পতি গ্রহের সাথে সৌর চৌম্বক ক্ষেত্রের পুনঃসংযোগের সময় ইলেকট্রনগুলি সম্ভাব্য ফোঁটা দ্বারা গ্রহের দিকে ত্বরান্বিত হলে প্রদর্শিত হয় । প্রধান ডিম্বাকৃতির মধ্যে থাকা অঞ্চলগুলি বেশিরভাগ মেরুপ্রভীয় রঞ্জন-রশ্মি (Auroral X-rays) নির্গত করে । মেরুপ্রভীয় রঞ্জন-রশ্মির বর্ণালী উচ্চ আয়নিত অক্সিজেন এবং সালফারের বর্ণালী রেখা নিয়ে গঠিত । মেরুপ্রভীয় রঞ্জন-রশ্মি বিকিরণ বা রশ্মিবিচ্ছুরণের বর্ণালীতে উচ্চ আয়নযুক্ত অক্সিজেন এবং সালফারের বর্ণালী রেখা থাকে, যেগুলি সম্ভবত শক্তিমান (শত কিলোইলেক্ট্রনভোল্ট) S এবং O আয়নগুলি বৃহস্পতির মেরু বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলে দেখা যায় । X-ray মেরুপ্রভা মূলত উৎপন্ন হয় প্রকৃতির অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিরূপ ঘটনা যেমন কৃষ্ণ গহ্বর, নিউট্রন নক্ষত্র থেকে। কিন্তু বৃহস্পতি থেকে উৎপন্ন হওয়াটা আশ্চর্যের ঘটনা! জোতির্বিদগণ Juno spacecraft মহাকাশযান দ্বারা সনাক্ত করা প্রাণরসের তরঙ্গ এবং European Space Agency এর Space rocket ‘XMM-Newton’ দ্বারা নথিকৃত বৃহস্পতির উত্তর মেরুতে X-ray মেরুপ্রভা শিখার মধ্যে একটা মিল পেয়েছেন । কিন্তু এই অতিশয় ত্বরা (Precipitation) এর উৎস এখনও অজানা রয়ে গেছে । এছাড়া কেনই-বা এই চৌম্বক ক্ষেত্রের রেখাগুলিতে নিয়মিত কম্পন সৃষ্টি হয় তা এখনও অস্পষ্ট । ধারণা করা হয়, বৃহস্পতি গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্রের সাথে সৌরঝড়ের মিথস্ক্রিয়া কিংবা উচ্চ গতিতে প্রাণরস (Plasma) প্রবাহের কারণে কম্পন সৃষ্টি হতে পারে । বৃহস্পতির মেরুপ্রভা অনেক বেশি ধ্রুবক এবং তীব্র । মেরুপ্রভাটি গ্রহ ও উপগ্রহ বা চাঁদের পাশাপাশি সূর্য থেকে আসা কণা দ্বারা চালিত হয় । নতুন গবেষণা অনুসারে- মেরুপ্রভা বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলে শক্তি জমা করে এটিকে উত্তপ্ত করে । তাই বায়ুমণ্ডলের শীর্ষ এবং নিচে তাপের মধ্যে একটি বড় বৈষম্য থাকে । মেরুপ্রভা বায়ুমণ্ডলের উপর একটি ঘূর্ণি সচেতক করে বলে মনে হয় । এটি একটি Patch তৈরি করে যা আশেপাশের থেকে শীতল এবং মেরুপ্রভা থেকে প্রশাখা বা অঙ্কুর । পৃথিবীর মেরুপ্রভার কাছাকাছি একই রকম প্রভাব পাওয়া যেতে পারে । কিন্তু এটির একটি স্থায়ী দৃঢ় করা বা স্থিরীকরণ (Fixture) কম, কারণ পৃথিবীর মেরুপ্রভা অনেক বেশি পরিবর্তিত হয় এবং বৃহস্পতির ঘূর্ণন তার কিছু তাপকে আটকে রাখতে কাজ করে । বৃহস্পতি গ্রহের উত্তর এবং দক্ষিণ মেরুর উভয় প্রান্তের উচ্চতায় রহস্যময় রঙের মেরুপ্রভা বিস্তৃত । মেরুপ্রভা পরিস্রুত হয়ে উজ্বলিত বা জ্বলজ্বল করে লাল রঙে চিত্রিত হয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশকে এক অনুপম সৌন্দর্যময় করে তোলে । যেটি নিম্ন মেঘ এবং উপরের কুয়াশা থেকে প্রতিফলিত আলোকেও দৃষ্টিগোচর করে । পরবর্তীতে মেরুপ্রভা একটি আলাদা উপায়ে পরিস্রুত হয়ে হলুদ এবং অক্সিজেনের কারণে সবুজ রঙে চিত্রিত করে । উত্তর এবং দক্ষিণ মেরুগুলির চারপাশে রয়েছে ঘূর্ণায়মান মেরুকুয়াশা । অবশেষে মেরুপ্রভা নাইট্রোজেন গ্যাসের কারণে তৃতীয় ধাপে পরিস্রুত হয়ে নীল রঙে চিত্রিত হয় । অনেকসময় মেরুপ্রভায় বেগুনী ও গোলাপী রঙ দেখা যায় ।

উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্র-ফরাসি গবেষণা দলের মতে এই গ্রহের বৈশিষ্ট্যগুলিকে আলাদা করে তোলার জন্য NIRCam এর ধারণকৃত আসল অবলোহিত ছবিগুলির পাশাপাশি এই ছবিগুলিকে আধুনিক প্রযুক্তিতে কৃত্রিমভাবে সংস্কার করে নীল, সাদা, সবুজ, হলুদ এবং কমলা রঙে রঙ করা হয়েছে । 

তথ্যসূত্র: আন্তর্জাল (The Internet), উইকিপিডিয়া ।


Sunday, 21 August 2022

মহাপৃথিবী (Super Earth Ross 508b)

 

            (নতুন আবিষ্কৃত Ross 508 গ্রহ ব্যবস্থার পরিকল্পিত চিত্র)  ছবি: https://bigganbarta.org/ 


এ মহাবিশ্বে পৃথিবীই কি একমাত্র গ্রহ যেখানে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে? না-কি এ গ্রহের বাইরেও প্রাণের উৎস আছে? এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মানুষই কি একমাত্র সৃষ্টির সেরা জীব? না-কি ভিনগ্রহে কোনো অপরিচিত আগন্তুক বা সভ্যতায় অগ্রগামী বুদ্ধিমান প্রাণী পরকদের (Aliens) অস্তিত্ব রয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে সৌরজগৎ (Solar system) ছেড়ে অপার মহাবিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হন্য হয়ে এখনো খুঁজে চলেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা । হয়তো নির্দিষ্ট করে আজো মেলেনি এর সঠিক উত্তর ৷ কিন্তু থেমে থাকেননি বিজ্ঞানীরা ৷ সৃষ্টিশীল প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে অদম্য স্পৃহা, উৎসাহ, উদ্দীপনা এবং নানা কৌতূহল নিয়ে তারা দুর্বার গতিতে এ মহাবিশ্বের নানা অজানা রহস্যকে ভেদ করে মহৎ-কল্যাণকর অসংখ্য সৃষ্টি বা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে শাশ্বত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ৷ আরো নতুন কিছু আবিষ্কার বা উদ্ঘাটন করতে এখনো তারা বদ্ধপরিকর ৷ কখনো তারা অসম্ভকেও হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে চায় ৷ এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে লুকিয়ে থাকা অসংখ্য অজানা রহস্যকে নিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা চিন্তা-ভাবনার পাশাপাশি বিরামহীনভাবে তারা গবেষণা কার্যক্রম ও পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছেন । কেউ কেউ সৌরজগৎ ছাড়িয়ে অসীম মহাকাশে নতুন নতুন গ্রহের সন্ধান করছেন । কেউ অনন্ত মহাবিশ্বে তন্ন তন্ন করে প্রাণের উৎস খুঁজে চলেছেন ৷ কেউবা পরকদের অস্তিত্ব কিংবা এদের বৈচিত্র্যময় জীবনের নানা দিক পর্যবেক্ষণ করছেন । আবার কেউ কেউ পৃথিবীবাসী মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নিরাপদ ও শান্তিময় বসতি স্থাপনের জন্য ভিনগ্রহে একটি বিকল্প আবাসস্থলের সন্ধান করছেন । যাই হোক আশার সংবাদ যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বিমানচালনা ও মহাকাশ প্রশাসন (NASA) কর্তৃক হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের Mauna Kea তে অবস্থিত National Astronomical Observatory of Japan (NAOJ) এর Subaru Telescope (IRD-SSP) এর মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একটি লাল বামন নক্ষত্রের বসবাসযোগ্য অঞ্চলে এক বিরল বহিসৌর গ্রহের চমকপ্রদ খোঁজ পেয়েছেন । যদিও জাপানের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ২০২২ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে সর্বপ্রথম এ গ্রহটিকে দেখেছিলেন । গত ০৪ই আগস্ট ২০২২ খ্রিস্টাব্দে NASA এ গ্রহটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেছে । অজানা রহস্যেঘেরা এ গ্রহটি মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং পদার্থবিদ Frank Elmore Ross এর নামে নামকরণ করা হয়েছে । এটি আমাদের প্রাণবান্ধব পৃথিবীর মতোই আরেকটি গ্রহ । হয়তো সেখানে এক অভাবনীয় উত্তর অপেক্ষা করছে মানব জাতির জন্য । এ বহিসৌর পাথুরে গ্রহটি পৃথিবী থেকে মাত্র ৩৬.৬ আলোকবর্ষ (১১.২১৮৩ parsecs) দূরে Serpen নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত । সারা পৃথিবীর মানুষের মধ্যে গ্রহটিকে ঘিরে নানা কৌতূহল সৃষ্টি করেছে এবং শুরু হয়েছে বিশদ জল্পনা-কল্পনা ৷ গ্রহটির বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে: Ross 508b । এটি বসবাসযোগ্য অঞ্চলের (Star habitat zone) মধ্যে মূল নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে এবং বাতাসে ভাসছে । এ ধরনের গ্রহকে বলা হয় বহিসৌর গ্রহ বা Exoplanet । গ্রহটি পৃথিবী থেকে বড় হওয়ায় এটিকে 'Super Earth' হিসেবেও অভিহিত করা হয় । মহাকাশ বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন যে, হয়তো সেখানে জীবনের সম্ভাবনা থাকতে পারে এবং মানব অপেক্ষা উন্নত জীবের দেখাও মিলতে পারে । এছাড়া ধারণা করা হচ্ছে যে, লাল বামন কেন্দ্রীয় বা মূল নক্ষত্রটির বসবাসযোগ্য অঞ্চলের (Habitable zone) অভ্যন্তরীণ প্রান্তের কাছে এ বহিসৌর গ্রহটি প্রদক্ষিণ করার ফলে এখানকার অনুকূল তাপমাত্রায় গ্রহটির পৃষ্ঠে জল ধরে রাখার সক্ষমতা রয়েছে । এ অঞ্চলটি Goldilocks zone নামেও পরিচিত । কারণ এ স্থানের গ্রহগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত গরম বা ঠাণ্ডা থাকে না । সেজন্য এ স্থানকে সৌরজগতের (বাইরেও) বসবাসযোগ্য অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয় । তবে এটিও মনে রাখতে হবে যে, কোনো গ্রহ তার কেন্দ্রীয় বা মূল নক্ষত্রের (Host star) বসবাসযোগ্য অঞ্চলে থাকা মানেই এ নয় যে, ঐ গ্রহটিও প্রাণের বসবাসযোগ্য হবে । কারণ, মঙ্গল গ্রহও কিন্তু নিজের মূল নক্ষত্র (Host star) সূর্যের বসবাসযোগ্য অঞ্চলে (Habitable zone) অবস্থান করছে । তবে সেখানে এখনো পর্যন্ত প্রাণের অস্তিত্বের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি । আমাদের এ সবুজ পৃথিবীও সূর্যের Habitable zone এর মধ্যে অবস্থিত । কিন্তু আমরা এ সুন্দর পৃথিবীতে প্রাণ খুলে বসবাস করছি ৷ উল্লেখ্য যে, কোনো গ্রহ নিজের মূল নক্ষত্র থেকে যে দূরত্বে থাকে সেখানে প্রাণ বেড়ে উঠার জন্য যে উপযুক্ত তাপমাত্রা বিরাজ করে বা আদর্শ পরিবেশগত অবস্থা বজায় থাকে তাকে Habitable zone বা বসবাসযোগ্য অঞ্চল বলে । যদি সেখানে কোনো জলের অস্তিত্ব থাকে তাহলে গ্রহটি পৃথিবীর সহযোগী বা সমকক্ষ হতে পারে । এতে করে সেখানে বসবাসের জন্য প্রবল সম্ভাবনা থাকে । তবে, এখনো পর্যন্ত ঐ লাল গ্রহে প্রাণের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি । Ross 508b গ্রহটি মাত্র ০৫ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরত্বে তার কেন্দ্রীয় বা মূল নক্ষত্র (Host star) বা একটি লাল বামন নক্ষত্রকে (Red dwarf star) কেন্দ্র করে ঘনিষ্ঠভাবে চারপাশে প্রদক্ষিণ করছে । ঠিক যেমন আমাদের পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে । গ্রহটির কক্ষপথ ছোট হওয়ার কারণে প্রায় ১০.৮ দিনে বছর পূর্ণ করে । যেখানে পৃথিবীতে ৩৬৫ দিনে এক বছর হয় । লাল বামন কেন্দ্রীয় বা মূল নক্ষত্রটিকে ০৩টি গ্রহ যথাক্রমে (ক) Proxima Centauri B, ১১.২ দিনে (খ) Proxima Centauri C, ১৯০০ দিনে (গ) Proxima Centauri D, ০৫ দিনে প্রদক্ষিণ করে থাকে ৷ দূরত্বের দিক দিয়ে Ross 508b গ্রহটি পৃথিবীর দ্বিতীয় নিকটবর্তী গ্রহ । পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রটি হচ্ছে Proxima Centauri B (Alpha Centauri Cb) । যেটি সূর্যের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র । সূর্য থেকে Proxima Centauri B এর দূরত্ব ৪.২৩ আলোকবর্ষ এবং ভর খুব কম ৷ Scottish জ্যোতির্বিদ Robert Thorburn Ayton Innes ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে Proxima Centauri B আবিষ্কার করেন । এটি Centaurus নক্ষত্রমণ্ডলে পৃথিবী থেকে আনুমানিক ৪.২ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত । Proxima Centauri B নক্ষত্র থেকে প্রচুর পরিমাণে রঞ্জন-রশ্মি (X-rays) এবং অতিবেগুনী রশ্মি (Ultraviolet rays) নির্গত হয় । তীব্র ক্ষতিকর এ রশ্মির কারণে এর অধীনস্থ গ্রহগুলো বিরান এবং নিষ্প্রাণ হয়ে যাবে অনিবার্যভাবে । সুতরাং তুলনামূলকভাবে নতুন আবিষ্কৃত Ross 508b গ্রহটি নিয়ে যথেষ্ট আশাবাদী । Ross 508b বহিসৌর গ্রহটি সূর্য থেকে প্রায় ৬০ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত (আনুমানিক ০.০৫৩৬৬ AU বা Astronomical Units) । এ গ্রহটির তাপমাত্রা ৩০৭১ কেলভিন (K) । এটি রুক্ষ, পাথুরে এবং পুরোপুরি গ্যাসীয় নয় । আকার এবং ভর আমাদের পৃথিবীর চেয়ে প্রায় চারগুণেরও বেশি । নাক্ষত্রিক ভর (Msun): ০.২ । গ্রহটির উচ্চ বিকেন্দ্রতা (অতিকেন্দ্রিকতা ০.৩৩) রয়েছে । নাক্ষত্রিক ব্যাসার্ধ (Rsun): ০.২ । পৃথিবীর ব্যাসার্ধের প্রায় ১.৮৩ গুণ । সৌরজগতের কেন্দ্রের খুব কাছের নক্ষত্রটি হচ্ছে সূর্য । ১৩ তম মাত্রায় উজ্জ্বল লাল বামন মূল নক্ষত্রটি সূর্যের তুলনায় অনেক ছোট । এ লাল বামন মূল নক্ষত্রটি Gliese 585, LTT 14584, LHS 396, LSPM J1523+1727 নামেও পরিচিত । নক্ষত্রটি খুব বেশি ক্ষমতাশালী নয় । এটি M4.5-type নক্ষত্র, যেটি সূর্যের চেয়ে লাল, ঠাণ্ডা এবং দানবীয় । এর উত্তাপ সূর্যের তুলনায় অনেক কম । সবচেয়ে অস্পষ্ট এবং ক্ষুদ্রতম নক্ষত্র হিসেবে এটি বিবেচিত হয় । কারণ এটি এতোই ম্লান যে, খালি চোখে দেখা প্রায় অসম্ভব । নক্ষত্রটির ভর সূর্যের ভরের প্রায় ০.১৮ গুণ এবং ব্যাসার্ধ ০.২১ গুণ । কিন্তু লাল বামন নক্ষত্রটি সূর্যের চেয়ে ছোট হওয়ার কারণে এর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রগুলোও সূর্যের মতো বিস্তৃত নয় । এ লাল বামন তারকা বা নক্ষত্র, যা আকাশগঙ্গা ছায়াপথের (Milky way galaxy) তিন-চতুর্থাংশ নক্ষত্র গঠন করে এবং এ ধরনের তারকা আমাদের সৌরজগৎ বা সৌর প্রতিবেশে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে । অন্যান্য তারকাদের তুলনায় লাল বামন নক্ষত্রগুলো শীতল এবং কম আলো নির্গত করে যাতে তাদের কম দৃশ্যমান হয় । লাল বামন নক্ষত্রকে দৃশ্যমান আলোর মধ্যে নজরদারি বা পর্যবেক্ষণ করা খুবই কঠিন, স্পর্শকাতর এবং জটিল । কেননা লাল বামন নক্ষত্রের নিম্ন পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ০৪ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকে । যাই হোক, উচ্চ-নির্ভুলতার সাথে রশ্মীয় বা দূরপ্রসারী বেগ (Radial velocity) পদ্ধতি ব্যবহার করে লাল বামন মূল নক্ষত্রটি আবিষ্কৃত হয়েছে । তবে বিস্ময়ের ব্যাপার যে, এ গ্রহটি তার চেয়ে ছোট একটি লাল বামন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে সে ঘুরছে বা প্রদক্ষিণ করছে । গবেষকদের মতে, Ross 508b গ্রহটির সম্ভবত একটি উপ-বৃত্তাকার কক্ষপথ রয়েছে । ফলে গ্রহটি তার লাল বামন মূল নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণের সময় মাঝে মধ্যে নক্ষত্রটির কাছাকাছি থাকে না এবং নিজের বসবাসযোগ্য অঞ্চলের কখনো ভিতরে ও অনেক নিম্নদিকে ঝোঁকে কখনো বাইরে চলে যায় । তার মানে, গ্রহটি নিজের লাল বামন কেন্দ্রীয় বা মূল নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে কক্ষপথে পরিভ্রমণের সময় প্রায়ই নিজের অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে । এ বহিসৌর গ্রহ এবং এর লাল বামন কেন্দ্রীয় নক্ষত্রের মধ্যে স্বল্প দূরত্ব নিয়ে প্রশ্ন জাগিয়েছে যে, এটি আদৌ বসবাসের যোগ্য কিনা? যদিও বিজ্ঞানীরা এটিকে নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন । সুতরাং এ গ্রহটিতে সত্যিই প্রাণ রয়েছে কি-না সেটিই এখন দেখার বিষয় । হয়তো James Webb Space Telescope আমাদেরকে এ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক গবেষণা করে আরো গুরুত্বপূর্ণ নতুন কোনো তথ্য দিতে পারবে ।    

 * তথ্যসূত্র: আন্তর্জাল (The Internet) । 

Saturday, 6 August 2022

Cartwheel Galaxy

       Photo credits: NASA, ESA, CSA, STScI, Webb ERO Production Team   https://www.nasa.gov/

অজানা, অদেখা ও মানব চিন্তার বাইরে এক রহস্যেঘেরা অপার মহাকাশের অতিপ্রাচীন, অবিশ্বাস্য এবং মনোমুগ্ধকর মহাজাগতিক কয়েকটি চমৎকার ছবি নাসা'র জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র উচ্চনির্ণয়কর চিত্রধারণ করে এ গ্রহের মানুষের মাঝে হৈচৈ ফেলে দিয়েছে । ফলে, নানা কৌতূহলের পাশাপাশি বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষের ভাবনাকে আরো শাণিত করে সৃষ্টিশীল কর্মস্পৃহা সৃষ্টি করেছে ৷ মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি দীর্ঘ সময় ধরে অসীম মহাকাশের ধূলিকণা, গ্যাস ও নানা বাধা-বিপত্তিকে অতিক্রম করে খুব নিকট থেকে কার্টহুইল ছায়াপথটি (The Cartwheel Galaxy) আবিষ্কার করে । এটি ESO 350-40 অথবা PGC 2248 নামেও পরিচিত । জ্যোতির্বিদরা এ ছায়াপথের মধ্যে নাক্ষত্রিক বা নক্ষত্রমণ্ডলগত শরীরচর্চা প্রণালীর (Stellar Gymnastics) এক দুর্দান্ত যৌগিক চিত্র ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন । এটি মসূরাকার ছায়াপথ (Lenticular Galaxy) বা বলয় ছায়াপথ (Ring Galaxy) । এটির ডি২৫ আইসোফোটাল ব্যাস ৪৪.২৩ কিলো প্রতি সেকেন্ড (১৪৪৩০০ আলোকবর্ষ) । ছায়াপথটির ভর প্রায় ২.৯–৪.৮ × ১০৯ সৌর ভর এবং বাইরের বলয়ের বৃত্তাকার বেগ প্রতি সেকেন্ডে ২১৭ কিঃমিঃ । ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে সুইস জ্যোতির্বিজ্ঞানী Fritz Zwicky বিস্ময়কর ছায়াপথটি আবিষ্কার করেন । একটি বড় কার্টহুইল ছায়াপথ (যার আইসোফোটাল ব্যাস প্রায় ৬০.৯ আর্ক সেকেন্ড) হচ্ছে এ ছায়াপথ গোষ্ঠীর সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্য, যেটি শারীরিকভাবে যুক্ত চারটি সর্পিল ছায়াপথ নিয়ে গঠিত । এ ছায়াপথটির গঠন অত্যন্ত জটিল এবং প্রচণ্ডভাবে বিরক্তকর । ২০২১ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে কার্টহুইল ছায়াপথে SN 2021afdx নমুনা-২ অতিনবতারা (Supernova) আবিষ্কৃত হয়েছিল ।
নাসা'র জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি কার্টহুইল ছায়াপথের এক বিশৃঙ্খলার মধ্যে দৃষ্টিপাত করেছে । যন্ত্রটি বিশালাকার খণ্ডিত গ্যাসের মেঘে কিভাবে একটি দানব নক্ষত্রের জন্ম হয় এবং এ ছায়াপথের কেন্দ্রীয় কৃষ্ণগহ্বর সম্পর্কে নতুন বিবরণ প্রকাশ করেছে । এছাড়া, অতীতে এ ছায়াপথের কি ঘটেছিল এবং ভবিষ্যতে এটি কিভাবে বিবর্তিত হবে তার অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে । এ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি বিলিয়ন বছর ধরে কার্টহুইল ছায়াপথ কিভাবে পরিবর্তিত হয়েছে তার অত্যাশ্চর্য নতুন দৃশ্য সরবরাহ করেছে, যা সত্যিই একটি বিরল দৃশ্য । ছায়াপথটি একটি মালবাহী গাড়ীর চাকার মতো । ছায়াপথের উজ্জ্বল কেন্দ্রস্থলে প্রচুর পরিমাণে উষ্ণ ধূলিকণা রয়েছে এবং উজ্জ্বলতম অঞ্চলগুলো বিশাল রাক্ষুসে বা দানবীয় তরুণ তারকাগুচ্ছের আবাসস্থল । কার্টহুইল ছায়াপথ পৃথিবী থেকে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে Sculptor নক্ষত্রপুঞ্জে অবস্থিত । এটি একটি বৃহৎ গোলাপী ও দাগযুক্ত ছায়াপথ যার ভিতরে ডিম্বাকৃতি । ছায়াপথের ডানদিকের মাঝখানে ধূলিময় নীল এবং অন্যান্য অনেক ছায়াপথের সাথে বিশেষকরে পটভূমির বিপরীতে বাম দিকে প্রায় একই আকারের দুইটি ছোট সহচর সর্পিল ছায়াপথ রয়েছে । কার্টহুইল ছায়াপথের কেন্দ্রে সাদা রঙের বলয় রয়েছে । কোনো পুকুরে ঢিল ছুড়লে যেমন বলয় সৃষ্টি করে জল প্রসারিত হয়, ঠিক তেমনি । এ ছায়াপথটি দুইটি বলয় নিয়ে গঠিত । বাইরের বলয়টি প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে এটি ছায়াপথকে ঘিরে থাকা ধূলিকণা এবং গ্যাসকে বাইরের দিকে ঠেলে দিয়ে নক্ষত্র গঠনের সূত্রপাত করে । বাইরের বলয়, গ্যাস এবং ধুলো সংকোচনের কারণে বৃহদায়তন চলমান নক্ষত্র গঠনের স্থান এবং গ্যালাক্টিক কেন্দ্রকে অভ্যন্তরীণ নিউক্লিক বলয় (Nucleic ring) ঘিরে থাকে । গাঢ় শোষণকারী ধূলিকণার একটি বলয়ও নিউক্লিক বলয়ে উপস্থিত থাকে । ছায়াপথের বাইরের বলয়ে ষাঁড়ের চোখ আকৃতির নিউক্লিয়াসের মধ্যে বিভিন্ন রঙের রঙিন বেশ কিছু অপটিক্যাল বাহু (Spokes) বাইরের বলয়কে ভেতরের সাথে সংযুক্ত করে রাখে । বাইরের অংশের বলয়টি অনন্ত মহাবিশ্বে প্রায় ৪৪০ মিলিয়ন বছর যাবৎ প্রসারিত হওয়ার মধ্য দিয়ে গ্যাসে পরিণত হচ্ছে, যা নতুন নক্ষত্র তৈরিতে স্ফুলিঙ্গ (Spark) গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে । নক্ষত্রিক বিস্ফোরণ বা অতিনবতারা বিস্ফোরণ (সংকোচন তরঙ্গের কারণে নক্ষত্রের গঠন) দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এমনটি ঘটে থাকে । ফলে, বৃহৎ এবং অত্যন্ত উজ্জ্বল নক্ষত্রের সৃষ্টি হয় । যখন বিশাল নক্ষত্রগুলো অতিনবতারা বিস্ফোরণ হিসেবে বিস্ফোরিত হয়, তখন তারা নিউট্রন নক্ষত্রের সৃষ্টি করে এবং কৃষ্ণ গহ্বরকে পিছনে ফেলে । এ নিউট্রন নক্ষত্র এবং কৃষ্ণ গহ্বরের মধ্যে কিছু কাছাকাছি সহচর নক্ষত্র রয়েছে এবং রঞ্জন-রশ্মিগুলোর শক্তিশালী উৎস হয়ে উঠে । কারণ, তারা তাদের সঙ্গী বস্তু বা পদার্থকে সরিয়ে দেয় (Ultra এবং Hyperluminous X-ray উৎস হিসেবে পরিচিত) । উজ্জ্বলতম রঞ্জন-রশ্মিগুলোর উৎস সম্ভবত কৃষ্ণ গহ্বরের সহচর নক্ষত্রের সাথে, যা রঞ্জন-রশ্মির চক্রবেড় বরাবর অন্তর্ভুক্ত থাকে । কার্টহুইল ছায়াপথের ভিতরের এবং বাইরের বলয়ের মধ্যে উজ্জ্বল লাল রেখা দেখা যায় । এ উজ্জ্বল লাল রঙগুলো শুধুমাত্র কার্টহুইল ছায়াপথ জুড়েই নয়, উপরে বাম দিকে সহচর সর্পিল ছায়াপথেও রয়েছে । এটি আশেপাশের গ্যাসে ভূমিকর্ষণ বা লাঙ্গল চাষ দেয় এবং নক্ষত্র গঠনের সূত্রপাত করে । অনাবিল সৌন্দর্যের অধিকারী ও বিরল এ ছায়াপথটি সম্ভবত আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথের মতোই সর্পিল ছিল । কিন্তু পরবর্তীতে সময়ের চক্রে প্রায় ২০০ মিলিয়ন বছর (৭০০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ) পূর্বে তুলনামূলক ছোট একটি ছায়াপথ এ কার্টহুইল ছায়াপথকে ধাক্কা দেয় । যার ফলে এক শক্তিশালী মহাকর্ষীয় অভিঘাত তরঙ্গ বা ঢেউ (Shockwave) ছায়াপথের মধ্য দিয়ে উচ্চগতিতে প্রবাহিত হয় । প্রতি ঘন্টায় ২০০০০০ মাইল বেগে প্রসারিত এ মহাজাগতিক সুনামি'র প্রেক্ষিতে ছেড়ে যায় নতুন তারকা সৃষ্টির অগ্নিঝড় । নবজাত তারকার বিশাল গুচ্ছ, Immense loops এবং নক্ষত্র বিস্ফোরিত হয়ে আতশবাজির String এর মতো বুদবুদগুলো মহাকাশে উড়িয়ে দেয় । গ্যাস এবং ধূলিকণাকে সংকুচিত করে ছায়াপথের কেন্দ্রীয় অংশের চারপাশে একটি Starburst তৈরি করে, যা বাইরের দিকে প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে অক্ষত থেকে যায় । দু'টি ছায়াপথের মধ্যে একটি উচ্চ-গতির প্রবল সংঘর্ষের কারণে কার্টহুইল ছায়াপথটি এমন আকৃতি ধারণ করেছে । ছায়াপথটির পর্যবেক্ষণে Non-thermal radio এবং Optical spokes উভয়েরই উপস্থিতি দেখা যায় । কিন্তু দুইটিই জড়িয়ে পড়ে না এবং একে অপরের সাথে সম্পর্কহীন এবং এভাবে বিভিন্ন কাঠামো তৈরি হয় । এমন স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্যের কারণেই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কার্টহুইল ছায়াপথকে বলয় ছায়াপথ (Ring Galaxy) বলে থাকেন । কার্টহুইল ছায়াপথটি আকাশগঙ্গা ছায়াপথের মতো সর্পিল ছায়াপথের চেয়ে কম সাধারণ একটি কাঠামো । হাইড্রোকার্বন এবং অন্যান্য রাসায়নিক যৌগ সমৃদ্ধ ধূলিকণা দ্বারা সৃষ্টি হয় কার্টহুইল ছায়াপথ । যেমন: সিলিকেট ধুলো, যা পৃথিবীর অনেক ধুলোর মতোই । Spiraling spoke এর একটি শ্রেণী বা সারি, যা মূলত ছায়াপথের কঙ্কাল গঠন করে ।
বিশ্বের বৃহত্তম, ব্যয়বহুল, শক্তিশালী এবং সবচেয়ে জটিল প্রযুক্তির James Webb Space Telescope (JWST) https://www.jwst.nasa.gov/index.html https://web.facebook.com/NASAWebb/ https://webbtelescope.org/ হচ্ছে এ গ্রহের প্রধান মহাকাশ বিজ্ঞান মানমন্দির । এটিকে সংক্ষেপে Webb নামে ডাকা হয় । জ্যোতির্বিদ্যার বিভিন্ন শাখার জন্য যেটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ৷ পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে বর্তমানে এটি মহাকাশে প্রায় ১৫ লক্ষ কিলোমিটার (প্রায় ১ মিলিয়ন মাইল) দূরে একটি শূন্য বিন্দুকে প্রদক্ষিণ করছে (সূর্য-পৃথিবীর Second Lagrange Point / L2 এর কাছাকাছি) । ঐ বিন্দুতে পৃথিবী এবং সূর্যের মাধ্যাকর্ষণের (Gravity) মান সমান, ফলে এর প্রভাব যে কোনো বস্তুর উপর একই থাকে ও বস্তুটি স্থিতিশীল হয় । এছাড়া, যন্ত্রটির জ্বালানি খরচও কম । জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি পৃথিবী কক্ষের বাইরে অবস্থিত হলেও এটি একই কৌণিক গতিতে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে । তাই, পৃথিবী থেকে কম দূরত্বের কারণে যন্ত্রটি খুব সহজে ও দ্রুতগতিতে বৈজ্ঞানিক তথ্যাবলী সরবরাহ করছে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারী কর্মকর্তা এবং নাসাতে নিযুক্ত দ্বিতীয় প্রশাসক James Edwin Webb (James E. Webb) এর নামানুসারে এ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটির নামকরণ করা হয়েছে । যন্ত্রটির নকশা ও নির্মাণ করতে সময় লেগেছে প্রায় ৩০ বছর এবং ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ বিলিয়ন (১০০০ কোটি) মার্কিন ডলার । জ্ঞান-বিজ্ঞান, জ্যোর্তিবিজ্ঞান, মহাকাশ অভিযাত্রা এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষতার মাধ্যমে এ নভোদুরবীন মানবজাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে । জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটির মূল লক্ষ্য হচ্ছে প্রায় পৌণে চৌদ্দ শত কোটি বছর পূর্বেকার মহাবিশ্বে মহাবিস্ফোরণের ফলে জ্বলে উঠা আদি নক্ষত্রগুলোর ছবি তোলা, সৌরজগতের অজানা রহস্যের সমাধান করা, ছায়াপথ-নক্ষত্র-গ্রহসমূহের সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করা, নক্ষত্রের চারপাশে দূরবর্তী বিশাল মহাবিশ্বের বিরাজমান বস্তু ও সংঘটিত ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করা এবং মহাবিশ্বের রহস্যময় কাঠামো, উৎস ও দূর-দূরান্তে অবস্থিত গ্রহগুলো প্রাণ ধারণের উপযোগী কি-না তা পর্যবেক্ষণ বা অনুসন্ধান করা । জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র হচ্ছে একটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতামূলক কার্যক্রম, যার নেতৃত্বে NASA এবং এর অংশীদার ESA (European Space Agency) ও CSA (Canadian Space Agency) । এ বৃহৎ এবং শক্তিশালী Infrared-optimized করা মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটিকে ২৫শে ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দে মহাকাশে সফলভাবে স্থাপন করে চালু করা হয় । যন্ত্রটি অবলোহিত আলোকে সনাক্ত করার ক্ষমতা রাখে এবং তাপ, ধূলিকণা ও মেঘের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করে এর কার্যক্রম পরিচালনা করে । এটি Near-Infrared Camera (NIRCam) এবং Mid-Infrared Instrument (MIRI) দ্বারা ০.৬ থেকে ৫ মাইক্রনের কাছাকাছি অবলোহিত পরিসরে আলোর গুরুত্বপূর্ণ তরঙ্গদৈর্ঘ্য দেখতে পারে, যা দৃশ্যমান আলোতে পর্যবেক্ষণের চেয়ে আরো বেশি নক্ষত্রকে প্রকাশ বা আবিষ্কার করতে পারে । এটি ছায়াপথের বাইরের বলয়ে ঘন ধূলিকণার উপস্থিতিতে তৈরি হওয়া অস্পষ্ট তরুণ নক্ষত্রগুলোকে অবলোহিত আলোতে পর্যবেক্ষণ করতে পারে । এটির NIRCam অংশটি পুরনো নক্ষত্র জনসংখ্যার মসৃণ বিতরণ বা আকারের মধ্যে পার্থক্য ও কেন্দ্রস্থলের ঘন ধূলিকণাসহ আরো সূক্ষ্মভাবে বিশদ বিবরণ প্রকাশ করেছে । এ ছবিতে NIRCam এর ডেটা বা উপাত্তগুলো হচ্ছে নীল, কমলা এবং হলুদ রঙের । এ যৌগিক চিত্রটিতে MIRI এর তথ্য বা উপাত্তগুলো লাল রঙের । এ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের NIRCam ক্যামেরাটি University of Arizona এবং Lockheed Martin’s Advanced Technology Center এর একটি দল তৈরি করেছে । MIRI অংশটি তৈরিতে ESA এবং NASA এর অবদান রয়েছে । JPL এবং University of Arizona এর সাথে অংশীদারিত্বে জাতীয়ভাবে অর্থায়িত The MIRI European Consortium দ্বারা এর নকশা এবং নির্মাণ হয় । জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের চারটি প্রধান বৈজ্ঞানিক রচনার বিষয়বস্তু বা মূলভাব রয়েছে যেমন- অন্ধকার যুগের সমাপ্তি (The End of the Dark Ages): প্রথম আলো ও পুনঃআয়নকরণ (First Light and Reionization), ছায়াপথের সমাবেশ (The Assembly of Galaxies), নক্ষত্রের জন্ম ও আদি বা আদিম বা প্রাক-গ্রহজনিত পদ্ধতি (The Birth of Stars and Protoplanetary Systems) এবং জীবনের উৎস (The Origins of Life) । জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি প্রথমদিকের ছায়াপথগুলোকে খুঁজে বের করবে যেগুলো মহাবিস্ফোরণের সময় (Big Bang) প্রথম গঠিত হয়েছিল এবং আমাদের নিজস্ব আকাশগঙ্গা ছায়াপথের সাথে সংযুক্ত করেছে । এছাড়া, সৌরজগতের সাথে আকাশগঙ্গা ছায়াপথকে (Milky Way Galaxy) সংযুক্ত করে ধূলিময় মেঘের মধ্য দিয়ে গ্রহতন্ত্র গঠনকারী নক্ষত্রগুলোকে দেখতে পাবে । এ যন্ত্রটি অনন্যভাবে ছায়াপথের বর্তমান অবস্থার শুধু এক চমৎকার আলোকচিত্র গ্রহণের কাজই করে না, তবে এর অতীত এবং ভবিষ্যতের দিকেও উঁকি মারে ।
Photo credits: NASA, ESA, CSA, STScI, Webb ERO Production Team

* তথ্যসূত্র: https://www.nasa.gov/ , আন্তর্জাল (The Internet), উইকিপিডিয়া ।

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...