Thursday, 27 April 2023

অ্যান্টার্কটিকা


I don't know their destination
What their feelings
The words of their mind
I realize the eternal bond of their love
An invisible power
Heavenly relationship
I'm fascinated to their wend
But, they're on their way.

বন্য #antarctica থেকে এক রঙিন অনুপ্রেরণা নিয়ে এসেছে আপনার কাছে ৷ 
পৃথিবীর সর্বদক্ষিণে অবস্থিত মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকার অভ্যন্তরীণ জীবন অত্যন্ত বিরল এবং রূক্ষ ৷ কুমেরু বৃত্তের দক্ষিণে এটি দক্ষিণ মহাসাগর, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণ অতলান্ত মহাসাগর সংলগ্ন দক্ষিণ মেরুদেশীয় (Antarctic) সাগর এবং ভারত মহাসাগরের দক্ষিণভাগ দ্বারা পরিবেষ্টিত । এটিতে ভৌগলিক দক্ষিণ মেরু রয়েছে । মহাদেশটি পূর্ব অ্যান্টার্কটিকা যা মূলত পূর্ব-দক্ষিণ মেরুদেশীয় এক উচ্চ বরফে আচ্ছাদিত মহাসাগরীয় মালভূমি Kerguelen Plateau বা Antarctic Plateau বা ভৌগলিক দক্ষিণ মেরু দ্বারা গঠিত । যেখানে রয়েছে Coats Land, Queen Maud Land, Enderby Land, Mac. Robertson Land, Wilkes Land এবং Victoria Land ইত্যাদি । পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার Dome Argus নামে পরিচিত বরফের গম্বুজটি ৪০৯১ মিটার (১৩৪২২ ফুট), যা দক্ষিণ মেরুদেশীয় বরফের সর্বোচ্চ বৈশিষ্ট্য । পূর্ব অ্যান্টার্কটিকা বেশিরভাগ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত এবং পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার চেয়ে বড়, যা সম্পূর্ণ পশ্চিম দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত ও এর স্থানাঙ্ক ৮০° দক্ষিণ ৯০° পূর্ব । অন্যদিকে পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকা যেটি মূলত পাহাড়ী দ্বীপকে একটি বরফের চাদর দ্বারা আবৃত রাখে ।
ইংরেজী Antarctic শব্দটি মধ্য ফরাসি Antartique / Antarctique (আর্কটিকের বিপরীতে) এবং লাতিন শব্দ Antarcticus (উত্তরের বিপরীতে) থেকে উদ্ভূত হয়েছে । Antarctica নামটি প্রকৃতপক্ষে গ্রিক যৌগিক শব্দ ‘আন্তার্কতিকে’ এর রোমান রূপ । প্রাচীন কাল থেকে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী অ্যান্টার্কটিকা আবিষ্কার এবং অনুসন্ধানে জড়িত ছিলেন । আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০ অব্দে প্রাচীন গ্রীসে ধ্রুপদী যুগে বিশ্ববিখ্যাত গ্রীক বিজ্ঞানী, দার্শনিক, পলিম্যাথ, প্রাণিবিজ্ঞানের জনক Aristotle আবহাওয়াবিদ্যা সংক্রান্ত গ্রন্থ Meteorologica বা Meteora তে দক্ষিণ মেরুদেশীয় (Antarctic) অঞ্চলের কথা উল্লেখ করেন । গ্রীক ভূগোলবিদ, মানচিত্রকার, গণিতবিদ, গাণিতিক ভূগোলের প্রতিষ্ঠাতা Marinus of Tyre খ্রিস্টীয় ২য় শতাব্দীতে তার বিশ্ব মানচিত্রে অ্যান্টার্কটিক নামটি ব্যবহার করেন । লাতিন লেখক, পণ্ডিত Alexander Polyhistor এর ছাত্র, Caesar Augustus এর একজন মুক্ত ব্যক্তি Gaius Julius Hyginus এবং নুমিডিয়ান ল্যাটিন ভাষার গদ্য লেখক, প্লেটোনিস্ট দার্শনিক, অলংকারশাস্ত্রের শিক্ষক Apuleius (খ্রিস্টীয় প্রথম-দ্বিতীয় শতাব্দীতে) দক্ষিণ মেরু বা দক্ষিণ মেরুদেশীয় অর্থে রোমানীকৃত গ্রীক পোলাস আন্তার্কতিকাস (লাতিন: Polus antarcticus) নামটিকে গ্রহণ করেন । ইংরেজ কবি, লেখক এবং ইংরেজি সাহিত্য বা কবিতার জনক Geoffrey Chaucer এর লেখা একটি গ্রন্থে ১২৭০ খ্রিস্টাব্দে প্রত্যয়িত পুরাতন ফরাসি Pole antartike (আধুনিক Pôle antarctique) এবং সেখান থেকে মধ্য ইংরেজি Pol antartik নামটি প্রথম পাওয়া যায় ।

এ মহাদেশটি Terra Australis নামে পরিচিত । প্রায় ৬৫০ খ্রিস্টাব্দেরও অনেক আগে মধ্যযুগ এবং রেনেসাঁ বা নবজাগরণের সময়ে ইউরোপীয় ভূগোলবিদরা সুদূর দক্ষিণে একটি পৌরাণিক ভূমি Terra Australis Incognita (অজানা দক্ষিণাঞ্চলীয় ভূমি) সম্পর্কে অনুমান করেছিলেন । Rarotongan মাওরি ভাষার মৌখিক ঐতিহ্য Ui-te-Rangiora থেকে জানা যায়, একজন পলিনেশিয়ান অভিযাত্রী Tamarereti যিনি নিউজিল্যান্ডের উত্তর দ্বীপের Aotearoa এর দক্ষিণে যাত্রা করেছিলেন এক অতি ঠাণ্ডা বরফপূর্ণ বা হিমায়িত অঞ্চলে । ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা সম্ভবত ১৫২০ খ্রিস্টাব্দের দিকে প্রথম অ্যান্টার্কটিকার কাছে এসেছিলেন । ১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে স্পেনীয় অন্বেষণকারী ও সমুদ্র অভিযাত্রী Gabriel de Castilla অ্যান্টার্কটিকা পর্যবেক্ষণ করেন । পরবর্তীতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অভিযাত্রী, পর্যটক, গবেষক, ভূতত্ত্ববিদ, ভূ-পদার্থবিদ, হিমবিজ্ঞানী, জীববিজ্ঞানী এবং নানা পেশার মানুষ এখানে আসতে শুরু করেন । পর্যায়ক্রমে তারা অদম্য সাহস, শক্তিশালী প্রেরণা ও উদ্দীপনা নিয়ে বীরত্বপূর্ণ নানা প্রকার অভিযান, অন্বেষণ, আবিষ্কার, বাণিজ্য (বিশেষ করে শিকার), সমুদ্র গমনপথ সহজীকরণ, আন্তর-আকাশের (Stratosphere) ওজোন গ্যাস স্তর অধ্যয়ন, আবহাওয়া ও উচ্চ বায়ুমণ্ডলীয় তথ্য সংগ্রহ, বরফ পাত (Ice sheet) জুড়ে চিহ্নিতকরণ, চৌম্বকীয় রূপরেখা তৈরি, জৈবিক সম্ভাবনা (স্থানীয় প্রজাতিতে দরকারী রাসায়নিক যৌগ এবং জিনের অনুসন্ধান), মানচিত্রবৎ (Cartographic) এবং প্রযুক্তিগত উন্নতির পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে দুর্দান্ত অগ্রগতি সাধন করেন । তাদের বৈজ্ঞানিক প্রকল্প এবং গবেষণা প্রচেষ্টাগুলো হচ্ছে: International Antarctic Glaciological Project, Dry Valley Drilling Project, Biomass (Biological Investigations of Antarctic Systems and Stocks), IceCube (South Pole Neutrino Observatory), Southern Ocean Observing System (SOOS) ইত্যাদি । এ কার্যক্রমগুলোর অধীনে পরিচালিত গবেষণায় কার্যত সমস্ত ভৌত বিজ্ঞানের প্রতিনিধিত্ব করা হয় । উল্কাবিদ্যা ও গ্রহসংক্রান্ত ভূতত্ত্ব, মহাদেশীয় প্রবাহ, ভূপদার্থবিদ্যা, জ্যোতির্পদার্থবিদ্যা, আবহবিদ্যা ও জলবায়ু ইতিহাস, জীববিদ্যা এবং জনসংখ্যার অধ্যয়নের মতো ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রগুলোতে সরাসরি প্রভাব ফেলে । জৈবিক কার্যক্রমগুলিো দক্ষিণ মেরুদেশীয় বিষয়গুলোর অন্তর্নিহিত আগ্রহ, বাস্তুবিদ্যা এবং সংরক্ষণে বিশ্বের অন্যত্র প্রতিফলিত করে । দক্ষিণ মেরুদেশীয় তিমি শিকারের ইতিহাস বিজ্ঞানীদের কাছে জৈবিক জনসংখ্যা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্ট করে তুলেছে এবং ৬০° সেলসিয়াসের নিচের এলাকায় দীর্ঘকাল ধরে যেখানে বৃহত্তর বা ক্ষুদ্রতর পরিমাণে প্রকৃতির মজুদ ছিল । এছাড়া সম্ভবত অন্যান্য মহাদেশের মতো এখানেও খনিজ এবং পেট্রোলিয়ামের সম্ভাবনাকে গুরুত্বপূর্ণভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে ।

উত্তর মেরু বা সুমেরু হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরে অবস্থিত বিন্দু (৯০° অক্ষাংশ), যেটি দক্ষিণ মেরুদেশীয় মহাসাগরের (Arctic sea) মধ্যভাগে অবস্থিত । এই মহাসাগরের উত্তরাংশের জল বছরের অধিকাংশ সময়ই ধবধবে সাদা সামুদ্রিক বরফে জমাটবদ্ধ থাকে । উত্তর মেরুর সামুদ্রিক গভীরতা প্রায় ১৩৪১০ ফুট (৪০৮৭ মিটার) । গ্রীষ্ম ও শীত এখানে দুটি ঋতু । ১৮৭ দিন গ্রীষ্মকাল সময়টি সম্পূর্ণই দিন এবং ১৭৮ দিন শীতকাল সময়টি সম্পূর্ণই রাত থাকে । শীতকালে গড় তাপমাত্রা -৩৪° সেন্টিগ্রেড এবং গ্রীষ্মকালে গড় তাপমাত্রা ০° সেন্টিগ্রেড থাকে । উত্তর মেরুতে মাংসাশী হিংস্র প্রাণী শ্বেত মেরু ভাল্লুক (Polar bear) এবং ঠাণ্ডা বরফ জলে কয়েক প্রজাতির মাছ বসবাস করে । উত্তর অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপ এবং সাব-অ্যান্টার্কটিক দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলসমূহে Chinstrap, Gentoo, Rockhopper, Macaroni প্রজাতির অসংখ্য পাখির আবাসস্থল । উত্তর মেরুতে সুনির্দিষ্ট কোনো ঘড়ির সময় নেই এবং এ অঞ্চলটিতে পৃথিবীর অন্যান্য অংশের মতো কোনো সময় অঞ্চলও নেই । এখানে কোনো জনবসতি নেই । উত্তরের মেরু অঞ্চল থেকে ব্যতিক্রমভাবে বরফের নিচে শুষ্ক ভূমি রয়েছে । ধারণা করা হয়, ০৬ই এপ্রিল ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের নেভি'র কর্মকর্তা ও অনুসন্ধানকারী Robert Edwin Peary Sr সর্বপ্রথম উত্তর মেরুতে পদার্পণ করেন । অপরদিকে দক্ষিণ মেরু বা কুমেরু হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষিণে, যেটি অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের কেন্দ্রভাগে অবস্থিত । দক্ষিণ মেরুর চারপাশে প্রায় এককেন্দ্রীয়ভাবে পড়ে থাকা অ্যান্টার্কটিকার নামের অর্থ হচ্ছে ''আর্কটিকের বিপরীত'' (Opposite to the Arctic) ।

অ্যান্টার্কটিকা হচ্ছে বিশ্বের দক্ষিণতম এবং পঞ্চম বৃহত্তম মহাদেশ । ইউরোপের তুলনায় শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ বড় । এটির আয়তন অস্ট্রেলিয়ার দ্বিগুণ এবং প্রায় ১৪২০০০০০ বর্গকিলোমিটার (৫৫০০০০০ বর্গমাইল) । অ্যান্টার্কটিকার শতকরা ৯৮ ভাগ অঞ্চল যা প্রায় ৫৪ লক্ষ বর্গমাইলেরও বেশি জায়গা জুড়ে সম্পূর্ণরূপে শুভ্র বরফের এক বিশাল চাদর দ্বারা আবৃত থাকে । বরফের গড় পুরুত্ব ১.৯ কিলোমিটার (১.২ মাইল) । মহাদেশীয় বরফের পাতে প্রায় ৭ মিলিয়ন ঘন মাইল (প্রায় ২৯ মিলিয়ন কিউবিক কিলোমিটার) বরফ রয়েছে, যা বিশ্বের বরফের প্রায় ৯০ শতাংশ এবং এর ৮০ শতাংশ স্বাদু জলের প্রতিনিধিত্ব করে । বরফের গড় বেধ প্রায় ৫৯০০ ফুট (১৮০০ মিটার) । বরফের তাক বা সমুদ্রের উপর ভাসমান বরফের চাদর Ross Sea এবং Weddell Sea এর অনেক অংশ জুড়ে বিস্তৃত । এ তাকগুলো Ross Ice Shelf এবং Filchner-Ronne Ice Shelf একসাথে মহাদেশীয় কিনারার চারপাশে অন্যান্য তাকগুলোর সাথে— অ্যান্টার্কটিকার প্রায় ৪৫ শতাংশ । দক্ষিণ মেরুদেশীয় উপকূলের চারপাশে তাক, হিমবাহ এবং বরফের পাত ক্রমাগত ‘Calve’ বা ‘Discharge’, সমুদ্রের মধ্যে হিমশৈল । এখানে তরল পানির অভাব । কিন্তু এ মহাদেশেই পৃথিবীর শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ বিশুদ্ধ বা স্বাদু পানি হিমায়িত আকারে মজুত রয়েছে, যা গলে গেলে বৈশ্বিক সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৬০ মিটার (২০০ ফুট) বৃদ্ধি পাবে । যদিও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে এখানে বরফ গলতে শুরু করেছে । বরফের স্তর গলে যাওয়ার গতি ক্রমশই দ্রুততর হচ্ছে এবং প্রতিবছর এর উচ্চতা গড়ে ২ সেন্টিমিটার করে কমে যাচ্ছে । তাই পশ্চিম এন্টার্কটিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিজ্ঞানীরা বেশি উদ্বিগ্ন । কারণ এখানকার হিমশৈল বা হিমবাহগুলো কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে । প্রতিটি হিমবাহের উচ্চতা প্রতি বছর ৯ মিটার করে কমে যাচ্ছে । বিজ্ঞানীরা বলছেন যে, পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বায়ু-স্রোতের মাধ্যমে মহাসাগরগুলোর উষ্ণ পানি এ অঞ্চলে প্রবেশ করে হিমবাহগুলোর সংস্পর্শে এসে বরফ গলে যাচ্ছে । ফলে পৃথিবীর নিম্নাঞ্চলের দেশগুলো তলিয়ে যাচ্ছে । বায়ুমণ্ডলে Chlorofluorocarbon এবং Halon নির্গমনের কারণে কড়া গন্ধযুক্ত হালকা নীল রঙের বিষাক্ত গ্যাস ওজনকে অন্যান্য গ্যাসে ভেঙ্গে দেয় । অ্যান্টার্কটিকার চরম ঠাণ্ডা অবস্থা মেরু Stratospheric cloud তৈরি করতে সাহায্য করে । মেঘ রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য অনুঘটক হিসেবে কাজ করে, যা শেষ পর্যন্ত ওজন গ্যাসকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় । ওজন গ্যাস হ্রাসের ফলে আন্তর-আকাশে (Stratosphere) প্রায় ৬ °C (১১ °F) শীতল হতে পারে । শীতলকরণ মেরু ঘূর্ণিকে শক্তিশালী করে এবং তাই দক্ষিণ মেরুর কাছে ঠাণ্ডা বাতাসের বহিঃপ্রবাহকে বাধা দেয় । যার ফলস্বরূপ পূর্ব-দক্ষিণ মেরুদেশীয় বরফের পাত মহাদেশীয় ভর কে শীতল করে । অ্যান্টার্কটিকার প্রান্তস্থ বা সীমান্তবর্তী এলাকা বিশেষ করে দক্ষিণ মেরুদেশীয় উপদ্বীপ তখন উচ্চ তাপমাত্রার শিকার হয়, যা বরফ গলে যাওয়াকে ত্বরান্বিত করে । ওজন গ্যাস হ্রাস এবং উন্নত মেরু ঘূর্ণির প্রভাবও সমুদ্রের বরফের পরিমাণ বৃদ্ধির সময়কালের জন্য দায়ী হতে পারে । বরফের তাক Buttressing এর ক্ষতিকে পশ্চিম-দক্ষিণ মেরুদেশীয় বরফের পাতে ক্ষতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে । তবে পূর্ব-দক্ষিণ মেরুদেশীয় বরফের আশেপাশেও এটি পরিলক্ষিত হয় । উচ্চ উচ্চতার কারণে পূর্ব অ্যান্টার্কটিকা তার পশ্চিম অংশের তুলনায় শীতল । মহাদেশের প্রান্তে, মেরু মালভূমি থেকে শক্তিশালী Katabatic বাতাস প্রায়ই ঝড়ের শক্তিতে বয়ে যায় । গ্রীষ্মকালে নিরক্ষরেখার তুলনায় দক্ষিণ মেরুতে বেশি সৌর বিকিরণ পৌঁছায় কারণ সেখানে প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা সূর্যালোক পাওয়া যায় । অ্যান্টার্কটিকায় বৃষ্টিপাত তুষার আকারে ঘটে, যা মহাদেশটিকে বিশাল বরফের চাদর ঢেকে দেয় । মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে বরফ উপকূলের দিকে প্রবাহিত হয় । বরফ তখন সাগরে চলে যায় । প্রায়শই বিশাল ভাসমান বরফের তাক তৈরি করে । এ তাকগুলো গলে যেতে পারে বা বরফখণ্ড তৈরি করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সমুদ্রের উষ্ণ জলে পৌঁছানোর সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় । বরফের তাক উষ্ণ জলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, যার ফলে বরফের বড় তাকগুলো সমুদ্রে ভেঙে পড়ে । অ্যান্টার্কটিকাকে স্পন্দিত মহাদেশ বলা হয়, কারণ এর মাধ্যমিক বা গৌণ বরফ-সমন্বিত উপকূলরেখার বার্ষিক নির্মাণ এবং পশ্চাদপসরণ । গবেষকদের মতে প্রায় ৪৫ শতাংশ Ice shell, ৩৮ শতাংশ Ice wall, ১৩ শতাংশ Ice stream এবং ০৪ শতাংশ Rock দিয়ে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ গঠিত । মহাদেশটি একটি ঠাণ্ডা শুষ্ক মরুভূমি, যেখানে পানির প্রবেশাধিকার জীবন বা প্রাণের প্রাচুর্য নির্ধারণ করে । যদিও স্থলজ বাস্তুতন্ত্রে ১০০০ এরও বেশি পরিচিত প্রজাতির জীব রয়েছে, যার মধ্যে বেশিরভাগই অণুজীব । সামুদ্রিক অ্যান্টার্কটিকা, দ্বীপপুঞ্জ ও উপকূলগুলো অভ্যন্তরীণ অ্যান্টার্কটিকার চেয়ে বেশি জীবন বা প্রাণকে সমর্থন করে এবং আশেপাশের সমুদ্র জীবন সমৃদ্ধ, যেহেতু জমি অনুর্বর বা বন্ধ্যা ।

Ross Sea এবং Weddell Sea সাগরের মাঝে বিস্তীর্ণ ভূদৃশ্যময় Cape Adere থেকে Coats Land পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ২১০০ মাইল (প্রায় ৩৪০০ কিলোমিটার) এলাকা নিয়ে বিস্তৃত Transantarctic Mountains পর্বতশ্রেণী দ্বারা পূর্ব ও পশ্চিম দুটি অসমান অংশে মহাদেশটিকে বিভক্ত করেছে । অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের মূল ভূখণ্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হচ্ছে পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকা এবং বাকি দুই-তৃতীয়াংশ পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার অন্তর্ভুক্ত । এ ক্ষুদ্রতম পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকা সম্পূর্ণই বরফে আচ্ছাদিত । সাদা বরফে আবৃত সর্ববৃহৎ পর্বতশ্রেণী হচ্ছে Gamburtsev Mountain Range, যা প্রায় ৭০ মাইল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত । উচ্চতা প্রায় ০৯ হাজার ফুট । অ্যান্টার্কটিকার দু’টি সাগর হচ্ছে Ross Sea এবং Weddell Sea । এখানে রয়েছে অসংখ্য হ্রদ । প্রায় ৪০০টি পরিচিত উপ-হিমবাহ হ্রদের মধ্যে বৃহত্তম হ্রদটি হচ্ছে Lake Vostok । স্বাদু জলের এ হ্রদটি সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৪৮৮ মিটার (১১৪৪৪ ফুট) উপরে অবস্থিত । গ্রীষ্মকালে হ্রদের প্রান্তের বরফ গলে যেতে পারে এবং অস্থায়ীভাবে তরল খাই বা পরিখা তৈরি হয় । অ্যান্টার্কটিকায় লবণাক্ত এবং স্বাদুপানির উভয় ধরণের হ্রদ রয়েছে । প্রায় ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘতম নদী হচ্ছে Onyx River । অনেকগুলো পরিচিত দ্বীপ রয়েছে যেমন: Alexander Island, Berkner Island, Thurston Island, Kenny’s Island ইত্যাদি । প্রবল শৈত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে বেঁচে থাকতে সক্ষম এমন উদ্ভিদ ও প্রাণীরাই অ্যান্টার্কটিকায় টিকে থাকতে পারে । তুন্দ্রা অঞ্চলে স্থানীয় প্রজাতির মধ্যে রয়েছে Mite, Nematode, Crab, Emperor Penguin, Adélie Penguin, Seal, Tardigrade, Pelagic fish, শৈবাল, অন্যান্য ক্ষুদ্র অণুজীব এবং তুন্দ্রাঞ্চলীয় বিভিন্ন উদ্ভিদ ইত্যাদি । এ মেরু অঞ্চলের প্রতীক হচ্ছে পেঙ্গুইন । প্রায় ৩০০ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদের বসবাস এ শৈত্যময় পরিবেশে ।

মূল ভূখণ্ডে বিশেষ করে Mount Melbourne, Berlin Mountain, Mount Hampton, Muhlig-Hofman Mountain পর্বতে কয়েকটি সক্রিয় বা জলন্ত আগ্নেয়গিরি রয়েছে । বরফের খুঁতেল বা দাগযুক্ত সক্রিয় আগ্নেয়গিরিগুলো Dot Western Ellsworth Land, Marie Byrd Land, অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের উপকূলের অংশগুলোতে এবং Victoria Land এর উপকূলের কিছু অংশে অবস্থিত । কিন্তু Scotia Arc এর মধ্যে আগ্নেয়গিরির প্রধান কার্যকলাপ কেন্দ্রীভূত হয় । শুধুমাত্র একটি আগ্নেয়গিরি Gaussberg (৯০° E) পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার সমগ্র উপকূলে দেখা যায় । Mount Sidley হচ্ছে সর্ববৃহৎ সুপ্ত আগ্নেয়গিরি এবং এ আগ্নেয়গিরিটি Volcanic Seven Summit এর সদস্য । এর উচ্চতা ৪১৮১–৪২৮৫ মিটার । এটি একটি বিশাল— প্রধানত তুষার আচ্ছাদিত ঢাল আগ্নেয়গিরি, যা Marie Byrd Land এর Executive Committee Range এর অন্তর্ভুক্ত পাঁচটি আগ্নেয় পর্বতের মধ্যে সর্বোচ্চ । এছাড়া Ross Island দ্বীপে বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষিণের সক্রিয় আগ্নেয়গিরিটি হচ্ছে Mount Erebus । প্রতিদিন প্রায় ১০ বার বিস্ফোরিত হয় । অগ্ন্যুৎপাতের ছাই আগ্নেয়গিরির গর্ত থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার (১৯০ মাইল) দূরেও পাওয়া যায় । এ আগ্নেয়গিরিটি মহাদেশের ষষ্ঠ-সর্বোচ্চ আল্ট্রা পর্বত (Ultra mountain) । মহাদেশের অপর প্রান্তে Deception Island দ্বীপের আগ্নেয়গিরিকুণ্ডটি সবচেয়ে বেশি সক্রিয় রয়েছে । আগ্নেয়গিরি প্রায়শঃ লাভা'র পরিবর্তে বরফের স্ফটিক (Crystal) উদগীরণ করে । এছাড়া ধারণা করা হয় Buckle Island, Penguin Island, Paulet Island এবং Lindenberg Island দ্বীপগুলো ছাড়াও বরফের নীচে প্রচুর পরিমাণে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে, যেগুলোর কার্যকলাপের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে বরফ পাতের (Ice sheet) জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে । অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের উত্তর-পশ্চিমে একটি বড় পর্বতমালা Vinson Massif এর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ বা বিন্দুটি হচ্ছে ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ, ১৩ কিলোমিটার চওড়া এবং ১৬০৬৬ ফুট (৪৮৯৭ মিটার) উচ্চতা । এটি Ellsworth পর্বতমালার Sentinel Range এর মধ্যে অবস্থিত । সর্বনিম্ন বিন্দুটি The Bentley Subglacial Trench হচ্ছে পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার Marie Byrd Land এর একটি বিশাল স্থান বৃত্তান্ত ঘটিত খাদ, যেটি ৮০° S এবং ১১৫° W অবস্থিত । পরিখা বা খাদটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৫৫৫ মিটার (৮৩৮২ ফুট) নিচে । এটি (সংলগ্ন Byrd Subglacial Basin এর গভীরতম বিন্দুগুলোর সাথে) পৃথিবী পৃষ্ঠের সর্বনিম্ন বিন্দুগুলোর মধ্যে রয়েছে যা মহাসাগর দ্বারা আবৃত নয়, যদিও এটি বরফ দ্বারা আবৃত ।  

Neoproterozoic যুগের শেষ থেকে Cretaceous পর্যন্ত, অ্যান্টার্কটিকা ছিল সুপারমহাদেশ Gondwana এর অংশ । আধুনিক অ্যান্টার্কটিকা গঠিত হয়েছিল যখন Gondwana ১৮৩ Ma এর দিকে ধীরে ধীরে ভেঙে যায় । Phanerozoic যুগের একটি বড় অংশের জন্য অ্যান্টার্কটিকায় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বা নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু এবং এটি বনে আচ্ছাদিত ছিল । অ্যান্টার্কটিকা উদ্ভিদ জীবনের বিস্তৃত বৈচিত্র্য দেখেছে । অ্যান্টার্কটিকার বেশিরভাগ প্রজাতি লক্ষ লক্ষ বছর আগে সেখানে বসবাসকারী প্রজাতির বংশধর বলে মনে করা হয় । যেমন, তারা অবশ্যই একাধিক হিমবাহ চক্র থেকে বেঁচে আছে । প্রজাতিগুলো বিচ্ছিন্ন উষ্ণ অঞ্চলে অত্যন্ত ঠাণ্ডা জলবায়ুর সময়কাল থেকে বেঁচে ছিল । কুমেরু বৃত্তের বাইরে অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপ এবং এর আশেপাশের এলাকাগুলোতে তাপমাত্রা বেশি থাকায় এ পরিবেশে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা সহ্য করার ক্ষমতা আছে এমন Moss, Algae এবং বিভিন্ন ধরনের Lichen জাতীয় উদ্ভিদের বসবাস রয়েছে । যদিও এরা প্রচণ্ড শীত বা ঠাণ্ডায় সুপ্ত অবস্থায় থাকে এবং অনুকুল পরিবেশে আবার জীবন্ত হয়ে উঠে । অ্যান্টার্কটিকায় মোট প্রায় ৮০০ প্রজাতির গাছের মধ্যে প্রায় ৩৫০টি প্রজাতিই হচ্ছে ছত্রাক বা শ্যাওলা বা শৈবাল জাতীয় উদ্ভিদ (Lichen) । যদিও লাইকেন ধীর গতিতে বর্ধনশীল, বিশেষ করে অ্যান্টার্কটিকায় বেঁচে থাকার জন্য ভালোভাবে অভিযোজিত । তারা সুপ্ত অবস্থায় দীর্ঘ উচ্চ-চাপ সহ্য করতে পারে এবং অবস্থার উন্নতি হলে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সালোকসংশ্লেষী হয়ে উঠে । প্রায় ১০০ প্রজাতির Bryophytes (Moss এবং Liverwort) রয়েছে । উপকূলীয় এবং সামুদ্রিক অঞ্চলে এগুলো প্রাধান্য পায় । অসংখ্য প্রজাতির Mold, Yeast, Fungi, Diatom, Plankton, মিঠা পানির Algae এবং Bacteria ইত্যাদি দক্ষিণ মেরুদেশীয় উদ্ভিদ বা প্রাণী । যদিও মৃত্তিকা মূলত Humic ধরনের নয় । তবে সাধারণত জীবাণুমুক্ত হয় না । এতে ব্যাকটেরিয়া বা বিভিন্ন ধরণের নীল-সবুজ শৈবালের (Blue-green algae) মতো অণুজীব থাকতে পারে । নীল-সবুজ শৈবাল Nostoc স্থানীয়ভাবে মাটিতে ক্ষুদ্র জৈব যৌগ যোগান দেয় । দক্ষিণ মেরুদেশীয় অঞ্চলের হ্রদগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাক বাস করে । প্রায় ১১৫০ প্রজাতির ছত্রাক তালিকাভূক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৭৫০টি অ-লাইকেন (Non-lichen) গঠনকারী । কিছু প্রজাতি চরম পরিস্থিতিতে বিকশিত হয়ে ছিদ্রযুক্ত শিলাগুলোর মধ্যে কাঠামোগত গহ্বরে উপনিবেশ স্থাপন করেছে । McMurdo Dry Valley এবং পার্শ্ববর্তী পর্বত শৈলশিরাগুলোর শিলা গঠনে অবদান রেখেছে । এ ধরনের ছত্রাকের Simplified morphology তাদের অনুরূপ জৈবিক কাঠামোসহ বিপাক ব্যবস্থা খুব কম তাপমাত্রায় সক্রিয় থাকতে সক্ষম এবং জীবনচক্র হ্রাস করে ও তাদের এ ধরনের পরিবেশের জন্য উপযুক্ত করে তোলে । পুরু-প্রাচীরযুক্ত এবং দৃঢ়ভাবে Melanised কোষগুলো তাদের অতিবেগুনী বিকিরণ (UV) প্রতিরোধী করে তোলে । Algae এবং Cyanobacteria তে একই বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষ্য করা যায়, ধারণা করা হয় তারা অ্যান্টার্কটিকায় বিরাজমান অবস্থার সাথে অভিযোজিত । এর ফলে মঙ্গল গ্রহের প্রাণ বা জীবন হয়তো অ্যান্টার্কটিক ছত্রাকের মতোই ছিল, যেমন Cryomyces antarcticus এবং Cryomyces minteri । ছত্রাকের কিছু প্রজাতি রয়েছে যেগুলো অ্যান্টার্কটিকার স্থানীয় । পাখির গোবরে বাস করে এবং বিবর্তিত হয়েছে, তাই তারা অত্যন্ত ঠাণ্ডা গোবরের ভিতরে বৃদ্ধি পেতে পারে । তবে উষ্ণ রক্তের প্রাণীদের অন্ত্রের মধ্য দিয়েও যেতে পারে । আন্টার্কটিকার দ্বীপ বা উপ-দ্বীপগুলোতে বিভিন্ন জাতের লতা রয়েছে যেমন: Deschampia, Deschampia elegantula, Colobanthus crassifolius ইত্যাাদি এবং ঘাস জাতের মধ্যে যেমন: Poa annua পাওয়া যায় । বরফের নিচে ৮০০ মিটার (০.৫০ মাইল) গভীরে Bacteria পাওয়া গেছে । ধারণা করা হয় যে Lake Vostok হ্রদের ভূগর্ভস্থ জলাশয়ের মধ্যে একটি স্থানীয় Bacteria সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব রয়েছে । সেখানে প্রাণ বা জীবনের অস্তিত্ব বৃহস্পতি গ্রহের চাঁদ Europa তে প্রাণ বা জীবনের সম্ভাবনার পক্ষে যুক্তিকে শক্তিশালী করে বলে মনে করা হয়, যার জল-বরফের ভূত্বকের (Water-ice crust) নিচে পানিতে থাকতে পারে । Lake Untersee হ্রদের অত্যন্ত ক্ষারীয় জলে Extremophile bacteria এর একটি সম্প্রদায় বিদ্যমান আছে । এ ধরনের আতিথেয়তাহীন বা আতিথ্যবিমুখ এলাকায় অত্যন্ত স্থিতিস্থাপক বা স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তী বা প্রাণোচ্ছল প্রাণীর (Highly resilient creature) প্রসার আরো ঠাণ্ডা মিথেন সমৃদ্ধ পরিবেশে বহির্জাগতিক জীবনের পক্ষে যুক্তিকে আরো শক্তিশালী করতে পারে । প্রচণ্ড ঠাণ্ডা দক্ষিণ মেরুদেশীয় সমুদ্রে উদ্ভিদ-প্ল্যাংকটন (Phytoplankton) এবং প্রানী-প্ল্যাংকটনের (Zooplankton) প্রাচূর্যতা রয়েছে । ৭০০ প্রজাতির শৈবালের (Algae) মধ্যে প্রায় অর্ধেকই সামুদ্রিক Phytoplankton । বহু রঙের তুষার শৈবাল বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রচুর দেখা যায় । বিভিন্ন প্রজাতির Krill, Euphausia superba, Penguin, Seal, Squid, Whale ইত্যাদি প্রাণী এখানে বসবাস করে থাকে । নিকটবর্তী অঞ্চলের সমুদ্রের তলদেশের প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে Sessile hydrozoan, Coral, Sponge এবং Bryozoan, Pycnogonid, Isopod, Annelid worm polychaeta, Echinoid, Sea star (Starfish) এবং বিভিন্ন ধরণের Crustacean, Mollusk ইত্যাদি । দক্ষিণ সমুদ্রে মাছের দ্রুত বৃদ্ধির অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে । আধুনিক মাছ প্রায় ৩০০০০ প্রজাতির এবং এদের মধ্যে অ্যান্টার্কটিক অভিসরণের দক্ষিণে সমুদ্র থেকে প্রায় ১০০টিরও বেশি পরিচিত নয় । সমুদ্রের তলদেশের ৯০ প্রজাতির প্রায় তিন-চতুর্থাংশই Antarctic Perches Superfamily Notothenioidea এর অন্তর্গত । এ গহীন সমুদ্রে Zoarcidae বা Eel-pout, Liparidae, Macrouridae, Gadidae বা Cod, Barracuda, Lantern এবং বিরল প্রজাতির Nonbony ধরনের Hagfish ও Skate মাছ রয়েছে । অ্যান্টার্কটিক মাছগুলো ঠাণ্ডা জলের সাথে ভালোভাবেই অভিযোজিত হয়ে থাকে । সাগর তলদেশের মাছগুলো অত্যন্ত স্থানীয়, শতকরা ৯০ ভাগ প্রজাতি অন্য কোথাও পাওয়া যায় না । এটি অন্যান্য জৈবিক এবং ভূতাত্ত্বিক প্রমাণকে সমর্থন করে যে, অ্যান্টার্কটিকা খুব দীর্ঘ সময় ধরে বিচ্ছিন্ন ছিল । Ross sea এবং Weddell sea এর বরফ তাকের মধ্যে ঠান্ডায় জমে যাওয়া বড় বড় মাছ পাওয়া গেছে । কার্বনের তেজষ্ক্রীয় রূপভেদ নির্ণয় বা প্রত্নবস্তুর বয়স নির্ধারণকারী Radiocarbon dating (Carbon-14 dating) করে এ মাছগুলোর বয়স প্রায় ১০০০ বছরেরও বেশি বলে জানা যায় । উল্লেখ্য যে: Radiocarbon dating হচ্ছে কার্বনের একটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ, রেডিওকার্বনের বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে জৈব উপাদান ধারণকারী বস্তুর বয়স নির্ধারণের একটি পদ্ধতি । ধারণা করা হয়, মাছগুলো সমুদ্রের খুব গভীরে পৌঁছে এবং বরফের মধ্যে আটকা পড়েছিল । পরবর্তীতে বরফের তাকগুলো ক্ষয় হয়ে যাওয়ার কারণে মাছগুলো বরফের উপর উঠে আসে । পৃথিবীর বিরান ও হিমশীতল এ মহাদেশে সবুজের কোনো চিহ্ন নেই । মশা, পিঁপড়া ও সরীসৃপের কোনো অস্তিত্ব নেই বললেই চলে । এক প্রকার বিচিত্র Ice fish মাছ রয়েছে, যার রক্ত লাল নয় কিন্তু স্বচ্ছ জলের মতো । প্রচণ্ড ঠাণ্ডার কারণে কিছু মাছের শরীরে বিপাকক্রিয়া (Metabolism) বিলম্বে ঘটে । Dissotichus mawsani এবং Trematomus প্রজাতির মাছের মধ্যে এক অবিশ্বাস্য ক্ষমতা রয়েছে যে, প্রচণ্ড ঠান্ডায়ও এদের রক্ত জমাট বাঁধে না । এছাড়া এদের রক্তে এক ধরনের Antifreeze ক্ষমতাও রয়েছে । এখানে রয়েছে নানা ধরণের কীটপতঙ্গ বা পোকামাকড়, পরজীবী এবং এক প্রকার পাখাবিহীন মাছি । যেমন: স্থানীয় স্থলজ (Antarctic microfauna) সম্পূর্ণরূপে অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে Heliozoan, Rotifer, Tardigrade, Nematode, Ciliate protozoan ইত্যাদি । প্রধান Arthropod গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে Acarina (Mite), Mallophaga (Biting lice), Collembola (Springtail), Anoplura (Sucking lice), Diptera (Midge), Siphonaptera (Flea) ইত্যাদি । দুই প্রজাতির গুবরে পোকা রয়েছে এবং এরা সম্ভবত অস্থানিক, অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের কাছাকাছি দ্বীপ থেকে পরিচিত । আজকের অনুর্বর অ্যান্টার্কটিকের প্রাকৃতিক ভূচিত্রের সাথে প্রাচীন Paleozoic এবং Mesozoic যুগের প্রাকৃতিক ভূচিত্রের পার্থক্য অনেক । Antarctic glaciation সম্ভবত ৫০ মিলিয়ন বছর আগে শুরু হয়েছিল । সমস্ত সংবহনতান্ত্রিক (Vascular) উদ্ভিদ (Fern, Conifer এবং ফুলের গাছ) উত্তর দিকে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছিল । শুধুমাত্র অ-কাঠীয় (Nonwoody) প্রজাতি উপ-দক্ষিণ মেরুদেশীয় অঞ্চলে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং খুব কমই দক্ষিণ মেরুদেশীয় অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করেছে । অ্যান্টার্কটিকার বিপরীতে, দক্ষিণ মেরুদেশীয় অভিসরণের দক্ষিণে, উপ-দক্ষিণ মেরুদেশীয় উদ্ভিদসংক্রান্ত অঞ্চলের অভিসরণের উত্তরে অবস্থিত— South Georgia, Crozet, Kerguelen, Macquarie Island দ্বীপগুলোতে অনেক প্রজাতির সংবহনতান্ত্রিক উদ্ভিদের প্রাচুর্যতা রয়েছে । শুধুমাত্র দক্ষিণ জর্জিয়াতে অন্তত ৫০টি প্রজাতি চিহ্নিত করা হয়েছে । এখানে বীজগুটি (Spore) দ্বারা পুনরুৎপাদনকারী উদ্ভিদগুলো অ্যান্টার্কটিকার বৈশিষ্ট্য এবং বীজ উদ্ভিদগুলো প্রধানত উপ-দক্ষিণ মেরুদেশীয় অঞ্চলগুলোর বৈশিষ্ট্য । দক্ষিণ মেরুদেশীয় এবং উপ-দক্ষিণ মেরুদেশীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রকে মানুষ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে । তিমি শিকারের ঘাঁটি বা স্থানে সংবহনতান্ত্রিক উদ্ভিদের পরক বা অস্থানিক প্রজাতির প্রবর্তন করা হয়েছে এবং নিঃসন্দেহে সমস্ত দক্ষিণ মেরুদেশীয় ঘাঁটির কাছে অনেক অস্থানিক অণুজীব বিদ্যমান । স্থানীয় নয় এমন তৃণভোজী প্রাণী প্রধানত ভেড়া এবং খরগোশ অনেক উপ-দক্ষিণ মেরুদেশীয় দ্বীপের উদ্ভিদ সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছে । এছাড়া পর্যটকদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা অ্যান্টার্কটিকার ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রের উপর প্রভাব ফেলেছে বা ফেলবে । 

আন্টার্কটিকা ও কুমেরু বৃক্তের বাইরে দক্ষিণে মহাদেশের দ্বীপগুলোতে পরিচিত প্রায় ৪৫টি প্রজাতির পাখি বাস করে । এদের মধ্যে রয়েছে Snow petrel (Pagodroma nivea), Antarctic petrel (Thalassoica antarctica), বিপন্ন প্রজাতি ও হিংস্র শিকারী আন্টার্কটিকার বাজ বা ঈগল জাতীয় পাখি South polar skua (Stercorarius McMormic), Fulmer বা Giant Antarctic petrel (Macronectes giganteus), Cormorant (Phalacrocorax atriceps), Diving petrel, পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম আকাশ ভ্রমণকারী (১০ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ৩৪ গ্রাম ওজন) ক্ষুদ্রতম পাখি Storm petrel (Oceanites oceanicus), Pintail, Gull, Tern, Sheathbill এবং Pipit ইত্যাদি । পাখিগুলো সামুদ্রিক খাবারের উপর নির্ভরশীল । বেশিরভাগ পাখি প্রতি শরৎকালে মহাদেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে যায় এবং উত্তর দিকে বরফ গাঁটরি বা ফেটি (Ice pack) তৈরি হওয়ার সাথে সাথে অ্যান্টার্কটিকার “Secondary” উপকূলরেখা অনুসরণ করে । এক গবেষণায় দেখা যায় যে, কিছু অ্যান্টার্কটিক পাখি সারা বিশ্বে ভ্রমণ করে । মহাদেশীয় অভ্যন্তরে, এমনকি দক্ষিণ মেরু ছাড়িয়েও Skuas এবং Petrel পাখিগুলো মাঝে মাঝে মহাদেশ অতিক্রম করতে পারে । উড়ন্ত পেঙ্গুইনসহ অ্যান্টার্কটিক পাখিদের এক শক্তিশালী স্ব-গৃহে প্রত্যাবর্তনের সহজাত প্রবৃত্তি এবং চমৎকার নেভিগেশনাল ক্ষমতা রয়েছে । তাদের একটি উচ্চ বিকশিত বা বেশ উন্নত Sun-azimuth orientation system এবং জৈবিক ঘড়ি প্রক্রিয়া (Biological clock mechanism) রয়েছে যে, এটি ক্রমাগত উচ্চে থাকা সত্ত্বেও এমনকি সূর্যের সাথে কাজ করে । Adélie পেঙ্গুইনগুলো তাদের বাসা থেকে ১৯০০ মাইল পর্যন্ত পথ মুক্তভাবে উড়ে যায় এবং এক বছরের মধ্যে পুনরায় ফিরে আসে । অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের উত্তর প্রান্তে সেমুর দ্বীপ এবং আরো কয়েকটি স্থানে পাওয়া জীবাশ্ম পরীক্ষা করে প্রায় ৪০ মিলিয়ন বছর আগে Eocene যুগের এ উড়ন্ত পাখিদের বিবর্তন ইতিহাস পাওয়া গেছে । এ মহাদেশের শুকনো উপত্যকা অঞ্চল হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্কতম অঞ্চল । এখানে টকটকে লাল পানির রক্ত ঝর্না বা জলপ্রপাত রয়েছে । পানির সাথে প্রচুর পরিমাণে আয়রন অক্সাইড থাকার কারণে এ পানি লাল দেখায় । বিস্ময়কর যে, প্রচণ্ড শীতল ও তুষারমণ্ডিত এ অঞ্চলে কোনো ভাল্লুক নেই । আরেকটি মজার বিষয় হচ্ছে যে, পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের চেয়ে এখানে নক্ষত্র পতনের দৃশ্য সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ।

The International Council for Science (ICSU) ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে Special Committee on Antarctic Research (SCAR) সংক্রান্ত একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে এবং পরবর্তীতে 'অ্যান্টার্কটিক চুক্তি' সম্পন্ন হয় । অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের মালিকানা কারো দখলে নেই । তবে বেশ কয়েকটি দেশ এর বিভিন্ন অংশের উপর নিজেদের আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব বা মালিকানা দাবী করলে ০১লা ডিসেম্বর ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে ১২টি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ‘অ্যান্টার্কটিক চুক্তি’ স্বাক্ষর করার পর শাসিত হচ্ছে এ শীতল মহাদেশটি । ১২টি দেশ হচ্ছে: Argentina, Australia, Belgium, Chile, France, Japan, New Zealand, Norway, South Africa, Russia (The Soviet Union), The United Kingdom, The United States । অ্যান্টার্কটিক চুক্তি রাজনৈতিক কূটনীতিতে একটি অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্য ছিল যে: এটি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য সমগ্র মহাদেশকে সংরক্ষণ করে । এ চুক্তি দ্বারা মহাদেশটিকে বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক অস্ত্র-মুক্ত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং একটি উদ্ভাবনী পদ্ধতিতে আঞ্চলিক দাবির বিষয়টি নিয়ে কাজ করে । বর্তমানে ৪৮টি দেশ এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে । ফলে এখানে সামরিক কার্যকলাপ, খনিজ সম্পদ খনন, পারমানবিক বিস্ফোরণ এবং পারমানবিক বর্জ্য নিষ্পত্তি ইত্যাদি নিষিদ্ধ করা হয়েছে । আন্তর্জাতিক বিরোধের বিষয়বস্তুতে পরিণত না করা, মানবজাতির কল্যাণের জন্য শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে সহায়তা, অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ-সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষিত করা হয়েছে । অধিকন্তু দূরপাল্লার বিমান, রকেট, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং যুদ্ধের পরিবর্তিত প্রকৃতির ক্রমবর্ধমান সামর্থ্যের কারণে ২১ শতকে কৌশলগত সামরিক অবস্থান হিসেবে অ্যান্টার্কটিকার গুরুত্ব হ্রাস পেয়েছে । ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে অ্যান্টার্কটিকার জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য প্রথম আন্তর্জাতিক চুক্তি হয় । অতিরিক্ত Krill মাছ (ইহা একটি প্রাণী যেটি অ্যান্টার্কটিক বাস্তুতন্ত্রে এক বড় ভূমিকা পালন করে) ধরার ফলে এর উপর একটি প্রবিধান প্রণয়ন করে । মৎস্য চাষ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত বা বাস্তুসংস্থানগত সম্পর্ক রক্ষা করার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে The Convention for the Conservation of Antarctic Marine Living Resources (CCAMLR) আন্তর্জাতিক চুক্তিটি কার্যকর হয় । অ্যান্টার্কটিকের খনিজ সম্পদ নিয়ন্ত্রণের জন্যেও ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে একটি প্রবিধান গৃহীত হয়, যেটি ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে কার্যকর করে । এ মহাদেশটিকে একটি 'বিশ্ব উদ্যান' হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য Greenpeace ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত Ross Island দ্বীপে একটি ঘাঁটি স্থাপন এবং ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করে । ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিক তিমি কমিশন দ্বারা 'দক্ষিণ মহাসাগর তিমি অভয়ারণ্য' প্রতিষ্ঠিত হয় । এটি ৫০ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার (১৯ মিলিয়ন বর্গ মাইল) জুড়ে এবং সম্পূর্ণরূপে দক্ষিণ মেরুদেশীয় (Antarctic) মহাদেশকে ঘিরে রয়েছে । অঞ্চলটিতে সমস্ত বাণিজ্যিক তিমি শিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যদিও জাপান গবেষণার উদ্দেশ্যে এই এলাকায় তিমি শিকার অব্যাহত রেখেছে । এই সুরক্ষা সত্ত্বেও, অ্যান্টার্কটিকার জীববৈচিত্র্য এখনও মানুষের কার্যকলাপ থেকে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে । বিশেষভাবে সুরক্ষিত এলাকা শতকরা ২ ভাগ এর কম এলাকা প্রাবরণ করে এবং কম দৃশ্যমান প্রাণীর তুলনায় জনপ্রিয় আবেদনসহ প্রাণীদের জন্য ভাল সুরক্ষা প্রদান করে । সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকার চেয়ে বেশি ভূ-সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে । বাস্তুতন্ত্র স্থানীয় এবং বৈশ্বিক হুমকি দ্বারা প্রভাবিত হয় । বিশেষ করে দূষণ, অ-স্থানীয় প্রজাতির আক্রমণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন প্রভাবে ।

পৃথিবীর হিমঘর অ্যান্টার্কটিকা হচ্ছে একটি মনোরম স্থান । ১৯ শতকের শেষের দিকে এ অঞ্চলে পর্যটন লক্ষ্য করা যায় । বেশিরভাগ ভ্রমণ পরিচালনাকারীরা ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত International Association of Antarctica Tour Operators (IAATO) এর সদস্য । IAATO হচ্ছে একটি স্ব-নিয়ন্ত্রক শিল্প সংস্থা এবং অ্যান্টার্কটিক চুক্তি ব্যবস্থার সাথে যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু বা সম্পর্কযুক্ত । এখানে প্রায় ৮০টি স্থায়ী গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে । বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অসংখ্য বিজ্ঞানী-গবেষক নানা গবেষণা কাজে এখানে নিয়োজিত রয়েছেন । এখানে কোনো স্থায়ী অধিবাসী নেই । তবে গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে গ্রীষ্মকালে প্রায় ৫০০০ লোকের বসবাস রয়েছে, যা শীতকালে প্রায় ১০০০ লোকসংখ্যায় নেমে আসে । দূরবর্তীতা সত্ত্বেও মানুষের নানাবিদ কার্যকলাপের ফলে দূষণ, ওজোন হ্রাস বা নিঃশেষকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মাধ্যমে এ মহাদেশটিতে একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে । যদিও এখানে ভ্রমণ নিয়ন্ত্রিত, ব্যয়বহুল এবং অত্যন্ত কঠিন । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিখ্যাত হেভি মেটাল রক ব্যান্ড ‘Metallica’ এর জনপ্রিয় গান ”Freeze ‘Em All”এর চিত্রায়ন করা হয় এ সফেদ তুষার দেশে । ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে 'মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অ্যান্টার্কটিক গবেষণা কেন্দ্র' বা পরিবেশ বান্ধব পারমাণবিক চুল্লি ‘McMurdo Station’ এর কার্যক্রম শুরু হয় । এ শীতলতম মহাদেশে ০৭টি গির্জা, ০১টি ATM যেটি ১০১৩২৫ bar বা ১০১৩২৫ pascal এবং ০১টি পানশালা রয়েছে । এছাড়া এখানে রয়েছে British Base Camp বা সংগ্রহশালা যেটি সর্ব দক্ষিণের একটি ডাকঘর (Penguin post office) হিসেবে পরিচিত । ইন্টারনেট জগতে অ্যান্টার্কটিকার নিজস্ব ওয়েব ডোমেইন হচ্ছে .aq । নরওয়ের অধিবাসী Roald Amundsen হচ্ছেন প্রথম মানুষ যিনি ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই ডিসেম্বর অ্যান্টার্কটিকার দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছেন । এখানে শীত এবং গ্রীষ্ম দু’টি ঋতু । গ্রীষ্মকালে সূর্য কিরণ থাকলেও শীতকালে প্রায় চার থেকে ছয় মাস সূর্যের মুখ দেখা যায় না । অঞ্চলটির বৈশিষ্ট্য এমনই যে, ঝকঝকে দিনের আলোয় ক্ষণিকেই তুষার ঝড়ের তাণ্ডবে প্রকৃতি তার বৈচিত্র্যময় রূপের আত্মপ্রকাশ করে । শৈত্য প্রবাহ, তুষার ঝড়, আদ্র বাতাস, ঘূর্ণিঝড়, মেঘলা এবং কুয়াশাপূর্ণ আবহাওয়া বিদ্যমান । বৃষ্টি প্রায় অচেনা । মেরু মালভূমিতে প্রতি বছর প্রায় ২ ইঞ্চি (৫০ মিলি মিটার) গড় বৃষ্টিপাত হয় । যদিও উপকূলীয় অঞ্চলে ১০ গুণ বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে । এছাড়া মেরু ঘূর্ণি (Polar vortex) মেঘের সৃষ্টি হয় । এ গ্রহের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে এখানে সবচেয়ে বেশি বাতাস প্রবাহিত হয় । তীব্র ঝড়ো বাতাসের গতিবেগ প্রতি ঘন্টায় প্রায় ২০০ মাইল । অ্যান্টার্কটিকায় শীতকালীন তাপমাত্রা −১২৮.৬ °F (−৮৯.২ °C), যা বিশ্বের সর্বনিম্ন নথিভুক্ত তাপমাত্রা । সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি −৭৬ °F (−৬০ °C) । তবে তাপমাত্রা স্থানভেদে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয় । শীতলতম মাসের গড় তাপমাত্রা হচ্ছে উপকূলে −৪ °F থেকে −২২ °F (−২০ °C থেকে −৩০ °C) এবং অভ্যন্তরীণ অংশে −৪০ °F থেকে −৯৪ °F (−৪০ °C থেকে −৭০ °C) । অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপে গ্রীষ্মের মাঝামাঝি তাপমাত্রা ৫৯ °F (১৫ °C) পর্যন্ত পৌঁছতে পারে । পৃথিবীর সকল মহাদেশের মধ্যে অ্যান্টার্কটিকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭২০০ ফুট (২২০০ মিটার) গড় উচ্চতায় মহাদেশটি সামগ্রিকভাবে সবচেয়ে শীতল, শুষ্ক এবং সর্বাধিক ঝটিকাপূর্ণ । বেঁচে থাকার জন্য অ্যান্টার্কটিকা কঠিন জায়গা ৷

Snow petrel (Pagodroma nivea) #snowpetrels পাখি হচ্ছে Pagodroma গোত্রের একমাত্র সদস্য । এটি প্রায় একটি কবুতরের আকার, খাঁটি বা সম্পূর্ণ সাদা, কয়লা কালো চোখ, একটি ছোট ঠোঁট এবং নীলাভ ধূসর চরণযুগল রয়েছে । প্রাচীন গ্রীক শব্দ Pagos হচ্ছে এর বংশ নাম, যার অর্থ ‘তুষার’ বা ‘সমুদ্র-বরফ’ । Dromos শব্দের সাথে একত্রিত হয়ে যার অর্থ হচ্ছে ‘দৌড়বাজ’ (Racer বা Runner) । নির্দিষ্টভাবে বিশেষণটি লাতিন শব্দ Niveus থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘তুষার-সাদা’ । ‘Petrel’ শব্দটি Peter the Apostle এবং তার জলের উপর হাঁটার গল্প থেকে উদ্ভূত হয়েছে । Snow petrel পাখির দু’টি উপ-প্রজাতি রয়েছে যেমন: P. n. nivea (Forster, G, 1777) এবং P. n. major (Schlegel, 1863) । এ পাখিটি ঘন ঘন দিক পরিবর্তনের সাথে অস্থিরগতিতে উড়ে । প্রায় সম্পূর্ণরূপে ঠাণ্ডা অ্যান্টার্কটিক জলে সীমাবদ্ধ থাকে । ঝাঁকে ঝাঁকে— বিশেষভাবে হিমশৈলের উপর এদেরকে বসে থাকতে দেখা যায় । প্রধানত মাছ, কিছু Cephalopod, Mollusk, Krill, মৃত/মৃতজাত সীল, সীল এর গর্ভফুলের গলিত মাংস, তিমি'র মৃতদেহ এবং মৃত পেঙ্গুইন ছানা খেয়ে থাকে । শীতকালে পাখিগুলো বরফ রাশি, ভাসমান তুষারস্তর এবং খোলা সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে । অ্যান্টার্কটিক মহাদেশ এবং এর বিভিন্ন দ্বীপে বসতি বা উপনিবেশগুলোতে প্রজনন ঘটায় । বাসা বাঁধার মৌসুমে Snow petrel পাখিগুলো দূরবর্তী উঁচু Queen Maude Land পাহাড়ের উপরে বাসা বাঁধতে কয়েকশ মাইল পথ উড়ে যায় ৷ এদের অংশীদাররা (Partners) সারা জীবনের জন্য বিশ্বস্ত (প্রায় ২০ বছর) । খাদ্যের জন্য তাদেরকে কয়েক দিন পর পর সমুদ্রে কঠিন যাত্রা করতে হয় এবং এক সময় ছানাগুলোর জন্য খাদ্য নিয়ে ফিরে আসে ৷ যাই হোক, এ রকম ককর্শ বা কঠোর পরিস্থিতিতে জন্মগ্রহণ কেমন হবে তা কল্পনা করা খুবই কঠিন ৷ সহনশীলতা এখানে বেঁচে থাকার পূর্বশর্ত ৷

২০১২ খ্রিস্টাব্দে @natgeo এর জন্য আন্তর্জাতিক চিত্রগ্রাহক @ladzinski সুদূর অ্যান্টার্কটিকা থেকে Snow petrel পাখির এ চমৎকার ছবিটি ধারণ করেন এবং এখানে তার ৫০ দিনের আরোহণ ও অনুসন্ধান অ্যাসাইনমেন্টের সময় ৷ অ্যান্টার্কটিকা হচ্ছে পৃথিবীর বৃহত্তম মরুভূমি এবং বিশ্বের নথিবদ্ধ ইতিহাসে সর্বশেষ আবিষ্কৃত অঞ্চল ৷ এটি এমন একটি জায়গা যা আপনাকে সমস্ত কিছুর জন্য কাজ করতে তৈরি করে তোলে । এ Snow petrel পাখি’রা কিভাবে বংশ বৃদ্ধির মধ্যদিয়ে যায়— তা দেখে মুগ্ধ করার কোনো কমতি ছিল না ৷ এ রকম একটি রূঢ় ও দুর্গম জায়গায় তার (এবং সাথে অন্যরা) একমাত্র সঙ্গী ছিল এ পাখিগুলো এবং পৃথিবীর অচেনা অংশে এটি পেয়ে সে কৃতজ্ঞ ৷ আমিও মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকি ছবির পাখিগুলোর দিকে ৷ অনুভব করি তাদের জীবন, চলার পথ, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, খাদ্য অন্বেষণ, আবাস, বংশবৃদ্ধি, সহনশীলতা (অভিযোজন ক্ষমতা) এবং #Antarctica কে ৷ এটি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে । সত্যিকার অর্থেই, অজানা রহস্যেঘেরা প্রকৃতির এ এক অনুপম সৌন্দর্য ৷ পৃথিবীর ঐ অচেনা-অজানা অংশে যাওয়া আমার পক্ষে হয়তো কখনোই সম্ভব হবে না! তাই আমিও আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ চিত্রগ্রাহক @ladzinski এর কাছে । কারণ, তার মাধ্যমে অসাধারণ সুন্দর ছবিটি দেখতে পেয়েছি ৷ তা না হলে, এ ক্ষণস্থায়ী জীবনে বৈচিত্র্যময় পৃথিবীর অনেক অজানা-অদেখা’র মাঝে এটিও অপূর্ণ রয়ে যেতো ৷ 

তথ্যসূত্র: আন্তর্জাল (The Internet) ।

ছবি: Keith Ladzinski
https://www.instagram.com/p/B_PwFMkBx-h/?fbclid=IwAR0a9Zz_t-oqMMY75cjbnK4HYTfZ7vtOt2_P738heZ2G6ZpGHY0kEWFzoMg https://www.instagram.com/p/BZzuIXkAa1d/

Sunday, 16 April 2023

বৃহস্পতির দিকে ছুটে চলছে Juice probe মহাকাশযান

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা'র জুস প্রোব (The European Space Agency’s Juice probe) মহাকাশযান গত শুক্রবার ১৪ই এপ্রিল ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর-পূর্ব কাঁধে ফ্রেঞ্চ গায়ানার কৌরো (French Guiana, Kourou) এর উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে বৃহস্পতির চাঁদে এক যুগান্তকারী বিশেষকার্যের উদ্দেশে পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় । যদিও এর আগের দিন বৃহস্পতিবার বজ্রপাতের হুমকি বা আশংকার কারণে উৎক্ষেপণ প্রচেষ্টা ২৪ ঘন্টা বিলম্বিত হয়েছিল ৷ মহাকাশযানটি বৃহস্পতির মহা লাল বিন্দু (Great Red Spot), দৃষ্টিনন্দন রঙিন চকচকে বিশাল মেরুপ্রভা (Polar Aurora), গ্রহটিকে ঘিরে গ্রহীয় বলয় এবং কিভাবে বৃহস্পতির শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র এই গ্যাস দৈত্যটির নিকটবর্তী চাঁদে নানা পরিস্থিতির আকার ধারণ করে তার রহস্যময় ঘটনাও উদঘাটন করতে চায় । ১.৪ বিলিয়ন পাউন্ডের Jupiter Icy Moons Explorer টি যুক্তরাজ্যের সময় দুপুর ১.১৪ পি.এম আরিয়ান ০৫ রকেটে (Ariane 5 rocket) চড়ে আকাশ পাড়ি দেয় । এতে করে বিজ্ঞানী এবং প্রকৌশলীরা দৃশ্যত স্বস্তি পেয়েছেন কারণ অনুসন্ধানটি সৌরজগতে সবচেয়ে জটিল মিশনে যাত্রা শুরু করেছে । কোনো সমস্যা ছাড়াই পৃথিবী থেকে কয়েক মিলিয়ন মাইল দূরে বৃহস্পতির কাছাকাছি যেতে জুস মহাকাশযানটির সময় লাগবে প্রায় ০৮ বছর ৷ বৃহস্পতিতে এর পথ সরাসরি থেকে অনেক দূরে হবে । পৃথিবী এবং শুক্র গ্রহের চারপাশে একাধিক মাধ্যাকর্ষণ সহায়তার সাহায্যে এটিকে তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে । অর্থাৎ ২০৩১ খ্রিস্টাব্দে এটি বৃহস্পতির কাছাকাছি গন্তব্যে পৌঁছবে ৷ এর নাম জুস মিশন (Juice Mission) ৷ মহাকাশযানটি পৌঁছানোর পর ১০টি উন্নত যন্ত্র বা অনুচরবৃন্দ (Suite) সহ বৃহস্পতি এবং এর বরফের চাঁদগুলো পর্যবেক্ষণ বা জরিপ করবে । বিশেষ করে বৃহস্পতির মহা লাল বিন্দু (Great Red Spot) কেন সঙ্কুচিত হচ্ছে, বৃহস্পতির তৃতীয় বৃহত্তম চাঁদ আইও (Io) কেনইবা সৌরজগতে সবচেয়ে আগ্নেয়গিরিগতভাবে সক্রিয় দেহ এবং বৃহস্পতির মহাসাগর-বহনকারী চাঁদে জীবন আছে কি-না বা কখনো ছিল কি-না ইত্যাদি । জুস মহাকাশযান সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহ বৃহস্পতিকে প্রদক্ষিণ করার সময় ৩৫টি উড়ান (Flyby) সম্পন্ন করবে । চাঁদেরাই প্রধান আকর্ষণ । বৃহস্পতির ৯২টি উপগ্রহ বা চাঁদের মধ্য থেকে ০৪টি গ্যালিলীয় চাঁদের ০৩টি চাঁদকে বিশেষভাবে জুস মহাকাশযান পরিদর্শন করবে ৷ চাঁদে প্রাণের অস্তিত্বের পাশাপাশি বাসযোগ্যতা নিয়ে মহাকাশযানটি তথ্য সরবরাহ করবে যা বিজ্ঞানীদের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হবে ৷ সূর্য থেকে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন মাইল দূরে থাকা হিমশীতল পরিস্থিতি সত্ত্বেও জুস প্রোব বৃহস্পতির ০৩টি চাঁদ যেমন: ইউরোপা (Europa), ক্যালিস্টো (Callisto) এবং গ্যানিমিড (Ganymede) কে পরিদর্শন করবে যা তাদের বরফ পৃষ্ঠের নীচে গভীর তরল জলের মহাসাগরকে আশ্রয় দেয়, যেখানে সামুদ্রিক জীবন থাকতে পারে । বৃহস্পতির হীমশীতল চাঁদে উপ-পৃষ্ঠের নোনা জলের সমুদ্র আবিষ্কার, জীবন বা প্রাণ এবং বাসযোগ্যতার লক্ষণগুলো অন্বেষণ করার জন্য সৌরজগতের স্থানগুলো তালিকার উপরে ঠেলে দিয়েছে । যদি হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট (Hydrothermal vent) - সারা পৃথিবীতে সমুদ্রের তলায় পাওয়া যায় - জোভিয়ান চাঁদে বিদ্যমান থাকে, তবে তারা অন্ধকারের মধ্যে জীবনের উন্নতির জন্য যথেষ্ট উষ্ণতা সরবরাহ করতে পারে । UCL Mullard Space Science Laboratory এর অধ্যাপক অ্যান্ড্রু কোটস (Prof Andrew Coates) বলেন, ''অবশেষে জুস মহাকাশযানটিকে তার পথে দেখে আমি খুবই রোমাঞ্চিত । বৃহস্পতির চাঁদে বাসযোগ্যতা দেখার জন্য এটি একটি দুর্দান্ত মিশন ।" অধ্যাপক অ্যান্ড্রু কোটস জুস প্রোবের উপর পেপ (Pep) এবং জানুস (Janus) নামক ০২টি যন্ত্র তৈরি করতে সহায়তা করেছেন । University of Leicester’s Institute for Space এর পরিচালক এবং জুস প্রোবের J-Mag magnetometer এর সহ-তদন্তকারী অধ্যাপক এমা বান্স (Prof Emma Bunce) বলেন, "এটি বৃহস্পতির একটি দীর্ঘ যাত্রার শুরু মাত্র, তবে এটি অপেক্ষা করার মতো হবে ৷ একটি অবিশ্বাস্য আন্তর্জাতিক দলকে এই মাইলফলকে পৌঁছতে অনেক বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে ।" রোবোটিক জুস মহাকাশযানটি বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপাতে (Europa) ০২টি উড়ান সম্পাদন করবে ৷ ইউরোপা চাঁদটি তার মূল গ্রহ বৃহস্পতির এতো কাছাকাছি থাকার কারণে তীব্র বিকিরণ ক্ষেত্রের অংশে মহাকাশযানটির পরিদর্শন সীমিত হবে । ইউরোপার আরো পর্যবেক্ষণ, যা শিখা (Plume) এবং উষ্ণপ্রস্রবণের (Geyser) মাধ্যমে আগ্নেয়গিরি মুখের জলীয় বাষ্পকে মহাকাশে প্রেরণ বা প্রবাহিত করে বলে মনে হয় । এদিকে নাসা (NASA) কক্ষপথ সমন্বিত বিকাশের একটি আন্তঃগ্রহের মিশন ইউরোপা ক্লিপার প্রোব (Europa Clipper probe) যা আগামী বছর অক্টোবরে SpaceX এর সবচেয়ে শক্তিশালী রকেটে উৎক্ষেপণ করবে । কিন্তু আরো সরাসরি যাত্রাপথ নিয়ে ২০৩০ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলে জুস মহাকাশযানের আগে পৌঁছাবে । ধারণা করা হয়, শুধুমাত্র ইউরোপা চাঁদেই (Europa) জীবন আশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে । এটি মাত্র ২০০০ মাইল চওড়া এবং পৃথিবীর চাঁদের চেয়ে ছোট । তবে ১০০ মাইল পর্যন্ত গভীর মহাসাগরের সাথে, এটি পৃথিবীর সমস্ত মহাসাগরের চেয়ে দ্বিগুণ জল ধরে রাখতে পারে । ইউরোপা চাঁদটি বিশেষভাবে বাধ্যতামূলক লক্ষ্য কারণ এর মহাসাগর একটি পাথুরে সমুদ্রতলের উপর বসে বলে মনে করা হয়, যা জীবন্ত প্রাণীদের টিকিয়ে রাখতে পারে এমন থার্মাল ভেন্ট (Thermal vent) এবং পুষ্টির সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে । জুস মহাকাশযান ক্যালিস্টোতে (Callisto) ২১টি উড়ান সম্পাদন করবে ৷ এছাড়া বৃহস্পতির সর্ববৃহৎ ও একটি ভারী গর্তযুক্ত চাঁদ গ্যানিমিডে (Ganymede) ১২টি উড়ান সম্পাদন করবে ৷ গ্যানিমিড চাঁদ বুধের চেয়ে শতকরা ০৮ ভাগ বড় এবং সৌরজগতের বৃহত্তম ও একমাত্র চাঁদ যেটি নিজস্ব চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে । যখন জুস প্রোবটি ২০৩৪ খ্রিস্টাব্দে গ্যানিমিড চাঁদের চারপাশে কক্ষপথে ঘুরবে, তখন এটি আমাদের নিজস্ব চাঁদ ছাড়া অন্য কোনো একটি চাঁদকে প্রদক্ষিণ করবে । যখন জুস নিজেই জীবন সনাক্ত করতে সজ্জিত নয় -  ছয় টন জুস প্রোবটি জলের পকেট বা জেব, জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান এবং শক্তির উৎসগুলো অনুসন্ধান করবে । গ্যাস দানব বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুন গ্রহ ০৪টিকে জোভিয়ান গ্রহ (Jovian planet ) বলে । জুস প্রোবটি জোভিয়ান চাঁদগুলোকে অতিক্রম করার সময় এটি তাদের ভূতত্ত্ব, কার্যকলাপ এবং পরিবেশের তথ্য সংগ্রহ করবে । ব্রিটিশ মহাকাশ পদার্থবিদ এবং লিসেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Leicester) প্ল্যানেটারি প্লাজমা পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক এমা জে. বান্স (Emma J. Bunce) বলেন ''আমি আশা করি যে এই মিশনটি বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞানী এবং অনুসন্ধানকারীদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে, ঠিক যেমন আমরা অনেকেই আজ মহাকাশ শিল্পে কাজ করছি যারা আগের মহাকাশ মিশনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছি । বৃহস্পতি তন্ত্রে (Jupiter system) আমাদের সামনে একটি উত্তেজনাপূর্ণ ভবিষ্যত রয়েছে এবং আগামী বছরগুলোতে জুস মহাকাশযানের সমৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক তথ্য ফেরতের অপেক্ষায় আছি ।"

*তথ্যসূূত্র: https://www.theguardian.com/international

https://www.theguardian.com/science/2023/apr/14/juice-mission-blasts-off-to-jupiter-to-assess-lunar-habitability

Wednesday, 12 April 2023

Webb দূরবীক্ষণ যন্ত্র ইউরেনাস গ্রহের নতুন ছবি ধারণ করেছে


                                                          চিত্র:  https://www.nasa.gov/

২০২২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত নেপচুন গ্রহ চিত্রের পদাঙ্ক অনুসরণ করে NASA এর James Webb Space Telescope সৌরজগতের আরেকটি বরফ দৈত্য ইউরেনাস (Uranus) গ্রহের অত্যাশ্চর্য চিত্র ধারণ করেছে । নতুন চিত্রটিতে ইউরেনাসের নাটকীয় বলয়গুলোর পাশাপাশি এর বায়ুমণ্ডলের উজ্জ্বল আবছায়া বৈশিষ্ট্য রয়েছে । এর আগে NASA এর Hubble Space Telescope এবং হাওয়াই এর মাউনাকেয়ার উন্নত অভিযোজিত দৃষ্টিশক্তিসংক্রান্ত ডব্লিও.এম কেক পর্যবেক্ষণিকা ( W.M. Keck Observatory) দ্বারা গ্রহটিকে পর্যবেক্ষণ ছাড়াও ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে ভয়েজার ০২ (Voyager ০2) মহাকাশযান গ্রহটির পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছিল ৷ যদিও তারা গ্রহের বায়ুমণ্ডলীয় বলয়গুলোর অস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে । কিন্তু Webb গ্রহটির উজ্জ্বল বায়ুমণ্ডলীয় বৈশিষ্ট্য এবং সবচেয়ে কম ধূলিকণাময় বলয়গুলোর জন্য পর্যবেক্ষণিকার অভূতপূর্ব সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করে । ২০২৩ খ্রিস্টাব্দের ০৬ই ফেব্রুয়ারী Webb এর Near-Infrared Camera (NIRCam) থেকে ধারণ করা ইউরেনাসের এই জুম-ইন চিত্রটি গ্রহের বলয়ের অত্যাশ্চর্য দৃশ্য প্রকাশ করে । এই অবলোহিত চিত্রটি ১.৪ এবং ৩.০ মাইক্রনের দুটি পরিস্রুত বা ছাঁকনি (F140M, F300M) থেকে তথ্য একত্রিত করে, যা এখানে যথাক্রমে নীল এবং কমলা রঙে দেখানো হয়েছে । ফলস্বরূপ প্রতিনিধি-রঙিন চিত্রে গ্রহটি একটি নীল আভা প্রদর্শন করে । সূর্য থেকে সপ্তম গ্রহ ইউরেনাস ৷ এই গ্রহটি তার কক্ষপথের সমতল থেকে প্রায় ৯০ ডিগ্রী কোণে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে । ইউরেনাস সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে ৮৪ বছর সময় নেয় ৷ এটি এক চরম ঋতু সৃষ্টি করে কারণ গ্রহের মেরুগুলো ৪২ বছর ধরে স্থির বা অবিরাম সূর্যালোক অনুভব করে এবং তারপরে ৪২ বছর ধরে সম্পূর্ণ অন্ধকার থাকে ৷ পৃথিবীর ১৭ ঘন্টা ১৪ মিনিটের সমান ইউরেনাসের ০১টি দিন ৷ বর্তমানে ইউরেনাসের উত্তর মেরুতে বসন্তের শেষের দিকে, যা এখানে দৃশ্যমান । গ্রহটির উত্তরে গ্রীষ্মকাল হবে আগামী ২০২৮ খ্রিস্টাব্দে । বিপরীতে, ভয়েজার ০২ মহাকাশযান যখন ইউরেনাসকে পরিদর্শন করেছিল তখন দক্ষিণ মেরুতে গ্রীষ্মকাল ছিল । দক্ষিণ মেরু এখন গ্রহের '' অন্ধকার দিকে '', দৃশ্যের বাইরে এবং মহাকাশের অন্ধকারের মুখোমুখি । ভয়েজার ০২ মহাকাশযান যখন ইউরেনাসের দিকে তাকায়, তখন এর ক্যামেরায় দৃশ্যমান তরঙ্গদৈর্ঘ্যে গ্রহটি প্রায় বৈশিষ্ট্যহীন নীল-সবুজ বল দেখায় । কিন্তু Webb এর অবলোহিত তরঙ্গদৈর্ঘ্য এবং অতিরিক্ত সংবেদনশীলতার সাথে আমরা এটিকে আরো বিশদ দেখতে পাই যে, ইউরেনাসের বায়ুমণ্ডল সত্যিই কতোটা গতিশীল । গ্রহের ডানদিকে সূর্যের মুখোমুখি মেরুতে উজ্জ্বল হওয়ার একটি এলাকা রয়েছে, যা মেরু টুপি (Polar cap) নামে পরিচিত । এই মেরু টুপিটি ইউরেনাসের জন্য অনন্য –  গ্রীষ্মে যখন মেরুটি সরাসরি সূর্যালোকে প্রবেশ করে এবং শরৎকালে অদৃশ্য হয়ে যায় তখন এটি প্রদর্শিত হয় ৷ মেরু টুপিটি আগামী ২০২৮ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবীর মুখোমুখি হবে । তাই ওয়েব (Webb) এবং হাবল (Hubble) দূরবীক্ষণ যন্ত্রকে এটির কাঠামো সম্পর্কে আরো বিশদে চিত্রিত করার সুযোগ দেবে । এছাড়া Webb এর তথ্য বিজ্ঞানীদের বর্তমান রহস্যময় প্রক্রিয়া বা বিশেষ কৌশল বা পদ্ধতি বুঝতে সাহায্য করবে । সত্যিকার অর্থে দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি ইউরেনাস গ্রহের মেরু টুপির একটি আশ্চর্যজনক দিক প্রকাশ করেছে, যেখানে মেরু টুপির কেন্দ্রে একটি সূক্ষ্ম বর্ধিত উজ্জ্বলতা । Webb দূরবীক্ষণ যন্ত্রের NIRCam এর সংবেদনশীলতা এবং দীর্ঘতর তরঙ্গদৈর্ঘ্যে এই বর্ধিত ইউরেনাসের মেরু বৈশিষ্ট্য আমরা দেখতে পাচ্ছি, যখন হাবল স্পেস টেলিস্কোপ (Hubble Space Telescope) কিংবা কেক পর্যবেক্ষণিকার (Keck Observatory) মতো অন্যান্য শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে এটিকে স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি । মেরু টুপির প্রান্তে একটি উজ্জ্বল মেঘের পাশাপাশি টুপির প্রান্তের ঠিক বাইরে অল্পসংখ্যক ক্ষীণ বর্ধিত বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং আরেকটি খুব উজ্জ্বল মেঘ গ্রহের বাম অঙ্গে বা প্রধান শাখায় দেখা যায় । এই ধরনের মেঘগুলো ইউরেনাসের আদর্শস্বরূপ বা প্রতিরূপ এবং সম্ভবত ঝড়ের কার্যকলাপের সাথে যুক্ত । তাই এর আকাশে ঝড়ের মেঘের আধিপত্য রয়েছে । যদিও NASA এর Hubble Space Telescope গত বছর নভেম্বরে ইউরেনাসের উজ্জ্বল সাদা মেরু টুপির চিত্র ধারণ করেছিল । এই গ্রহটিকে তার অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক গঠনের কারণে একটি 'বরফ দৈত্য' (Ice giant) হিসেবে চিহ্নিত করা হয় । এর বেশিরভাগ ভর গরম বলে মনে করা হয়, " বরফযুক্ত " (Icy) পদার্থের ঘন তরল – জল (৮০% বা তার বেশি), মিথেন এবং অ্যামোনিয়া – একটি ছোট পাথুরে কেন্দ্র বা অন্তস্তলের উপরে ৷ সূর্য থেকে ১.৮ বিলিয়ন মাইল (প্রায় ৩ বিলিয়ন কিলোমিটার) দূরে বৃষ নক্ষত্রমণ্ডলে এর অবস্থান ৷ এর আয়তন পৃথিবীর প্রায় ৬৪ গুণ বড় এবং ওজন প্রায় ১৫ গুণ ৷ গ্রহের আবহমণ্ডলে অত্যধিক পরিমাণ মিথেন, হিলিয়াম এবং হাইড্রোজেন গ্যাসীয় বলয় রয়েছে ৷ এই গ্যাসের কারণেই গ্রহটি নীল দেখায় ৷ গড় তাপমাত্রা -১৯৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস এবং শীতলতম অবস্থায় তাপমাত্রা -২২৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস । বিষুব অঞ্চলে বাতাসের গতিবেগ প্রায় ২৫০ মিটার/সেকেন্ড ৷ সম্ভবত প্রাণের কোনো অস্তিত্ব নেই ৷ অনেক জ্যোতির্বিদ পূর্বে গ্রহটিকে লক্ষ্য করলেও স্যার উইলিয়াম হার্শেল (Sir William Herschel) প্রথম ১৩ মার্চ ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দে এটি আবিষ্কার করেন ৷ জার্মান বিজ্ঞানী Johann Elert Bode এই গ্রহের নাম দেন ইউরেনাস ৷ সৌরজগতের তৃতীয় বৃহত্তম গ্রহ ইউরেনাস বিশিষ্ট ঘনকেন্দ্রিক বলয় (Ring) দ্বারা ঘিরে রয়েছে । এর ১৩টি পরিচিত ধূলিময় বলয় রয়েছে । এদের মধ্যে ১১টি বলয় Webb এর ধারণকৃত ছবিতে দৃশ্যমান । ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে এবং ২০২২ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে হাবল স্পেস টেলিস্কোপ (Hubble Space Telescope) দ্বারা ধারণকৃত চিত্রে ইউরেনাসের বলয় তন্ত্রটি আরো ক্ষীণভাবে দৃশ্যমান ছিল । সৌরজগতের কক্ষপথের সমতলের তুলনায় ইউরেনাসের একটি চরম কাত রয়েছে, যেমন এর উত্তর মেরু বর্তমানে সূর্যের দিকে অভিমুখী । গ্রহটি তার পাশে কাত হয়ে অনন্য, যার ফলে শনি গ্রহের অনুভূমিক বলয় তন্ত্রের বিপরীতে এর বলয়গুলো উল্লম্বভাবে প্রদর্শিত হয় । চরম ঋতু এবং ঝড়ো আবহাওয়ার কারণে ইউরেনাস কাত হয় । এই বলয়গুলোর মধ্যে কিছু এতোই উজ্জ্বল যে যখন তারা একত্রে কাছাকাছি থাকে এবং তখন তাদের একটি বৃহত্তর বলয়ে একত্রিত হতে দেখা যায় । ০৯টি বলয়কে গ্রহের প্রধান বলয় হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয় এবং ০২টি হচ্ছে অস্পষ্ট বা ক্ষীণ ধূলিকণার বলয় (যেমন গ্রহের সবচেয়ে কাছের ডিফিউজ জেটা বলয় বা Diffuse zeta ring), যেগুলো ভয়েজার ০২ মহাকাশযান মিশন ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের উড়ান (Flyby) পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি । যদিও এই ০২টি বলয়কে তাদের ধুলোময় গঠনপ্রণালীর (Makeup) কারণে ক্যামেরাবন্দি বা ধারণ করা কঠিন । তবে বিজ্ঞানীরা আশা করছেন যে Webb ভবিষ্যতে ইউরেনাসের অস্পষ্ট বাইরের বলয় ০২টির ছবি ধারণ করে প্রকাশ করবে, যেগুলো ২০০৭ রিং-প্লেন ক্রসিংয়ের (2007 ring-plane crossing) সময় হাবল স্পেস টেলিস্কোপ (Hubble Space Telescope) দ্বারা আবিষ্কৃত হয়েছিল ৷ NASA এর গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের (Goddard Space Flight Center) গবেষণা বিজ্ঞানী Dr. Naomi Rowe-Gurney বলেন, ''একটি গ্রহের বলয় তন্ত্র বা প্রণালী তার উৎপত্তি এবং গঠন সম্পর্কে আমাদের অনেক কিছু বলে । ইউরেনাস একটি অদ্ভুত জগত, যার পাশের দিকে কাত এবং অভ্যন্তরীণ তাপের অভাব যা আমরা এর ইতিহাস সম্পর্কে যে কোনো সূত্র পেতে পারি তা অত্যন্ত মূল্যবান । তিনি আশা করেন Webb দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি ইউরেনাসের বায়ুমণ্ডলীয় রচনা সম্পর্কে আরো উন্মোচন করবে এবং বিজ্ঞানীদেরকে এই অস্বাভাবিক গ্যাস দৈত্যটি সম্পর্কে আরো ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে । এছাড়া অবলোহিত তরঙ্গদৈর্ঘ্যে নতুন গভীরতা এবং বৈশিষ্ট্যগুলো দেখাতে পারে যা ভূমি থেকে বায়ুমণ্ডলে দেখা কঠিন ।" Webb ইউরেনাসের ২৭টি পরিচিত চাঁদ বা উপগ্রহের অনেকগুলো ধারণ করেছে, যেগুলোর বেশিরভাগই এখানে দেখা যায় না কারণ খুব ছোট এবং অস্পষ্ট ৷ সবচেয়ে উজ্জ্বল ০৬টি চাঁদকে বিস্তৃত বা প্রশস্ত-দর্শন ছবিতে (Wide-view image) চিহ্নিত করা হয়েছে যেমন: পাক (Puck), এরিয়েল (Ariel), মিরান্ডা (Miranda), আমব্রিয়েল (Umbriel), বহির্মুখী টাইটানিয়া (Titania) এবং ওবেরন (Oberon) । অভ্যন্তরীণ চাঁদগুলো প্রায় অর্ধেক জল বরফ এবং অর্ধেক পাথর বলে মনে করা হয় । তবে, বাইরের চাঁদের গঠন সম্পর্কে কম জানা যায় । নীলাভ এই রহস্যময় গ্রহটি পর্যবেক্ষণ করার সময় Webb কি করতে পারে, এটি শুধু Tip of the iceberg । ২০২২ খ্রিস্টাব্দে ন্যাশনাল একাডেমি অফ সায়েন্সেস, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মেডিসিন (National Academies of Sciences, Engineering and Medicine) তার ২০২৩ - ২০৩৩ প্ল্যানেটারি সায়েন্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোবায়োলজি (2023 - 2033 Planetary Science and Astrobiology) দশকীয় সমীক্ষায় ইউরেনাস বিজ্ঞানকে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে । বর্তমানে ইউরেনাস গ্রহকে নিয়ে অতিরিক্ত গবেষণা বা অধ্যয়ন চলছে এবং Webb এর বিজ্ঞান ক্রিয়াকলাপের প্রথম বছরে আরো অনেক কিছুর পরিকল্পনা করা হয়েছে । 

তথ্যসূত্র: https://www.nasa.gov/ ,  https://edition.cnn.com/ ,  https://gizmodo.com/  , আন্তর্জাল  ।

চিত্র:  https://www.nasa.gov/ 






Sunday, 9 April 2023

বহিঃসৌর গ্রহের কাছে বারবার একটি বেতার সংকেত সনাক্ত

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর মতোই বহিঃসৌর একটি গ্রহের কাছ থেকে পুনরাবৃত্তি করা বেতার সংকেত সনাক্ত করেছেন ৷ গ্রহটি যে নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে উভয়ই পৃথিবী থেকে প্রায় ১২ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত । এই শক্তিশালী বেতার সংকেতটি ইঙ্গিত দেয় যে, পৃথিবী আকারের ঐ গ্রহটির একটি চৌম্বক ক্ষেত্র এবং সম্ভবত বায়ুমণ্ডল থাকতে পারে । উত্তর দিকে দিঙ্নির্ণায়ক (Compass) সূঁচ নির্দেশ করার পাশাপাশি পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র আমাদের এই সবুজ গ্রহের বায়ুমণ্ডলকে রক্ষা করে, যা বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন । পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র সূর্য থেকে নিয়মিতভাবে বিস্ফোরিত উচ্চ শক্তিসম্পন্ন কণা এবং প্লাজমাকে (Plasma) প্রতিফলিত করে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে রক্ষা করে, যার ফলে গ্রহে জীবন টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে । গবেষকরা বলেছেন, ওয়াইজেড সেটি বি (YZ Ceti b) নামক বহিঃসৌর গ্রহে একটি চৌম্বক ক্ষেত্রের সম্ভাব্য অস্তিত্ব যা সম্ভাব্যভাবে সেই গ্রহে জীবনধারণ বা প্রাণের বাসযোগ্যতার সংকেত দিতে পারে । আমাদের সৌরজগতের বাইরে অবস্থিত বহিঃসৌর গ্রহগুলোর চারপাশে বায়ুমণ্ডল খুঁজে পাওয়া অন্যান্য বিশ্বের দিকে নির্দেশ করতে পারে যা সম্ভাব্যভাবে জীবনকে সমর্থন করার ক্ষমতা রাখে ৷ নিউ মেক্সিকোতে ইউনিভার্সিটি অফ কলোরাডো এবং বাকনেল ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিজ্ঞানী সেবাস্তিয়ান পিনেদা (Sebastian Pineda) ও জ্যাকি ভিলাডসেন (Jackie Villadsen) 'কার্ল জি. জানস্কি ভেরি লার্জ অ্যারে (ভিএলএ)' বেতার দূরবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে ওয়াইজেড সেটি (YZ Ceti) নামক একটি ছোট লাল বামন নক্ষত্র থেকে নির্গত পুনরাবৃত্তিমূলক শক্তিশালী বেতার সংকেত পর্যবেক্ষণ করেছেন । বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণের সময় ঐ নক্ষত্র থেকে আসা বেতার তরঙ্গ এবং এটিকে প্রদক্ষিণকারী পৃথিবীর মতোই একটি পাথুরে বহিঃসৌর গ্রহ লক্ষ্য করেছেন, যেটিকে ওয়াইজেড সেটি বি (YZ Ceti b) বলা হয় । তারা বিস্ফোরিত এক শক্তিশালী বেতার সংকেত খুঁজে পেয়েছেন এবং বিশ্বাস করেন যে, বেতার সংকেতটি গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্র ও নক্ষত্রের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া দ্বারা তৈরি হয়েছিল । গবেষক দলটি বেতার তরঙ্গ শক্তির উপর ভিত্তি করে গবেষণাপত্রে ব্যাখ্যা করেছেন যে, ''শক্তিশালী বেতার তরঙ্গগুলো 'প্রায়' গ্রহের কক্ষপথের সাথে সারিবদ্ধ ছিল । এটি গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্রের কাত হওয়ার কারণেও হতে পারে । যেমন বৃহস্পতির চৌম্বক ক্ষেত্রের কাত হওয়ার মতো । কিন্তু আমরা কি দেখছি তা নিশ্চিত হওয়ার আগে আরো পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে ।'' গত ০৩রা মে ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে নেচার জ্যোতির্বিজ্ঞান সাময়িকীতে (Nature Astronomy Journal) ফলাফলের বিস্তারিত একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে । পেনসিলভানিয়ার বাকনেল ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জ্যাকি ভিলাডসেন বলেন, "আমি এই জিনিসটি দেখছি যা আগে কেউ দেখেনি ।" এছাড়া কলোরাডো বোল্ডার ইউনিভার্সিটির গবেষণা জ্যোতির্পদার্থবিদ ও গবেষণার প্রধান লেখক সেবাস্টিয়ান পিনেদা এক বিবৃতিতে বলেন, "আমরা প্রাথমিক বিস্ফোরণ দেখেছি এবং এটি দেখতে সুন্দর ছিল । যখন আমরা এটি আবার দেখলাম এটি খুব ইঙ্গিতপূর্ণ ছিল, ঠিক আছে, সম্ভবত আমাদের এখানে সত্যিই কিছু আছে । চৌম্বকীয় ক্ষেত্রগুলো একটি গ্রহের বায়ুমণ্ডলকে শক্তিশালী নাক্ষত্রিক বায়ু দ্বারা দূরে সরিয়ে নেয়া বা হ্রাস করা থেকে আটকাতে পারে । মূলত নক্ষত্র থেকে কণা নির্গত হয়ে সময়ের সাথে সাথে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং এটি উচ্চগতিসম্পন্ন কণা বর্ষণ করে । কোনো গ্রহ বায়ুমন্ডলের সাথে টিকে আছে কি-না তা নির্ভর করে গ্রহটির একটি শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র আছে কি-না তার উপর ।" জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তত্ত্ব দিয়েছিলেন যে, গ্রহটির চৌম্বকীয় ক্ষেত্র এবং এটি যে নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে তার মধ্যে মিথস্ক্রিয়ায় নাক্ষত্রিক বেতার তরঙ্গের জন্ম দিচ্ছে, যা তারা সনাক্ত করেছেন । তবে তারা বলেছেন যে, দীর্ঘ দূরত্বে এই ধরনের তরঙ্গ শনাক্ত করতে হলে তাদের অবশ্যই খুব শক্তিশালী হতে হবে । বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুন গ্রহের এখনো চৌম্বক ক্ষেত্র রয়েছে আমাদের সৌরজগতে । অতীতে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই গ্রহগুলোর নিজস্ব চৌম্বকক্ষেত্রসহ বৃহত্তম গ্রহ বৃহস্পতির সমান বহিঃসৌর গ্রহ সনাক্ত করেছেন ৷ কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা আমাদের সৌরজগতের বাইরে ছোট পাথুরে বিশ্বের চৌম্বক ক্ষেত্র সনাক্ত করতে সক্ষম হইনি । এই রকম দূরবর্তী পৃথিবী আকৃতির ছোট গ্রহে চৌম্বক ক্ষেত্র খুঁজে পাওয়া আরো কঠিন কারণ চৌম্বক ক্ষেত্রগুলো মূলত অদৃশ্য । বর্তমান অনুমান হচ্ছে যে, গ্রহের চৌম্বকীয় ক্ষেত্র তার নক্ষত্র দ্বারা উত্থিত প্লাজমার মধ্য দিয়ে সজোরে ধাক্কা লাগায় শক্তিশালী বেতার তরঙ্গ উৎপন্ন হচ্ছে । অধ্যাপক জ্যাকি ভিলাডসেন আরো বলেন যে, "আমরা যা করছি তা তাদের দেখার উপায় খুঁজছি । আমরা এমন গ্রহ খুঁজছি যেগুলো সত্যিই তাদের নক্ষত্রের কাছাকাছি এবং পৃথিবীর সমান আকারের । এই গ্রহগুলো তাদের নক্ষত্রের খুব কাছাকাছি যেখানে আপনি বাস করতে পারেন, কিন্তু গ্রহগুলো খুব কাছাকাছি থাকায় নক্ষত্র থেকে আসা একগুচ্ছ উপাদানের মধ্য দিয়ে চাষ বা হলকর্ষণ করে । যদি গ্রহের একটি চৌম্বক ক্ষেত্র থাকে এবং এটি পর্যাপ্ত নক্ষত্রের মধ্যে দিয়ে চষে বেড়ায়, তাহলে নক্ষত্রটি উজ্জ্বল বেতার তরঙ্গ নির্গত করবে ।" বহিঃসৌর গ্রহ 'ওয়াইজেড সেটি বি' তার মূল নক্ষত্র 'ওয়াইজেড সেটি' এর খুব কাছাকাছি হওয়ায় চারপাশে একটি একক কক্ষপথ সম্পূর্ণ করতে মাত্র ০২ পৃথিবী দিন সময় নেয় । এদিকে, আমাদের সূর্যের সবচেয়ে কাছের ও সৌরজগতের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত কক্ষপথ হচ্ছে বুধ গ্রহের, যা সূর্যের চারপাশে একটি কক্ষপথ (আনুকূল্য বা অধিস্থাপন বা Lap) সম্পূর্ণ করতে ৮৮ পৃথিবী দিন সময় নেয় । যখন 'ওয়াইজেড সেটি বি' গ্রহটি তার মূল নক্ষত্রের চারপাশে কশাঘাত (Whips) দেয় তখন নক্ষত্র থেকে গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্রের সাথে প্লাজমার (Plasma) সংঘর্ষ হয়, লাফাইয়া সরিয়া যায় এবং নক্ষত্রের চৌম্বক ক্ষেত্রের সাথে যোগাযোগ করে । এই সমস্ত তেজোময় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং শক্তিশালী বেতার তরঙ্গ মুক্তি বা ছেড়ে দেয় যা পৃথিবীতে সনাক্ত করা যায় । গবেষকরা গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি নির্ধারণ করতে তাদের সনাক্ত করা বেতার তরঙ্গ পরিমাপ করেছেন । জ্যোতির্বিজ্ঞানী সেবাস্টিয়ান পিনেদা বলেন, ''নক্ষত্রের চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে এটি আমাদের নতুন তথ্য দিচ্ছে । এই ধারণাটিকেই আমরা বলি 'বহির্ভূত মহাকাশ আবহাওয়া' ।'' আমাদের সৌরজগতে সূর্যের ক্রিয়াকলাপ মহাকাশে আবহাওয়া তৈরি করতে পারে যা পৃথিবীতে মারাত্মক প্রভাব ফেলে । সূর্য থেকে শক্তিশালী বিস্ফোরণ বা সৌর অগ্নি শিখা বিস্তারণের ফলে বৈশ্বিক টেলি-বেতার যোগাযোগ, বৈদ্যুতিক শক্তির বিদ্যুদ্বাহী তারজালি, বিমান-নৌযাত্রা সংকেতকে প্রভাবিত করতে পারে । কৃত্রিম উপগ্রহ (Satellite), মহাকাশযান এবং নভোচারী বা মহাকাশচারীদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে । এছাড়া পৃথিবীর মেরুগুলোর কাছে মেরুপ্রভা বা আকাশে দৃষ্ট আলোকচ্ছটা বা মেরুজ্যোতি (Aurora borealis / Aurora australis) বা উত্তরের আলোর (Northern light) মতো চকচকে আলো দেখাতে পারে । বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে, 'ওয়াইজেড সেটি' নক্ষত্র এবং এর 'ওয়াইজেড সেটি বি' গ্রহের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া একটি মেরুপ্রভা তৈরি করে ৷ কিন্তু এই উজ্জ্বল রঙিন আলোক প্রদর্শনটি আসলে নক্ষত্রের উপর সঞ্চালিত হয় । সেবাস্টিয়ান পিনেদা আরো বলেন, " প্রকৃতপক্ষে আমরা নক্ষত্রে মেরুপ্রভা দেখতে পাচ্ছি —   এটিই এই বেতার নির্গমন কি, গ্রহের নিজস্ব বায়ুমণ্ডল থাকলে মেরুপ্রভাও থাকা উচিত ।" গবেষকরা মনে করেন যে, চৌম্বক ক্ষেত্রসহ একটি বহিঃসৌর পাথুরে গ্রহের জন্য 'ওয়াইজেড সেটি বি' গ্রহটি এখন পর্যন্ত দেখা সেরা প্রার্থী । জ্যাকি ভিলাডসেন বলেন, "এটি সত্যিই প্রশংসনীয়ভাবে হতে পারে । কিন্তু আমি মনে করি, একটি গ্রহের কারণে সৃষ্ট বেতার তরঙ্গের একটি সত্যিই শক্তিশালী নিশ্চিতকরণ বেরিয়ে আসার আগে এটি অনেক অনুপ্রেরিত কাজ (Follow-up) হতে চলেছে ।'' এই দশকে সচল হওয়ার জন্য প্রস্তুত নতুন বেতার দূরবীক্ষণযন্ত্রগুলো জ্যোতির্বিজ্ঞানীদেরকে আরো বেশি সংকেত সনাক্তের সাহায্য করতে পারে যা চৌম্বক ক্ষেত্র প্রস্তাব করে । এক বিবৃতিতে ন্যাশনাল রেডিও অ্যাস্ট্রোনমি অবজারভেটরির প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জো পেস (Joe Pesce) বলেন, "অন্যান্য সৌরজগতে সম্ভাব্য বাসযোগ্য বা জীবন-ধারণকারী পাথুরে পৃথিবীর মতো বহিঃসৌর গ্রহে আসলেই চৌম্বক ক্ষেত্র আছে কি-না তা নির্ধারণ করতে জগতগুলোর অনুসন্ধান সক্ষম হওয়ার উপর আংশিকভাবে নির্ভর করে । এই গবেষণাটি দেখায় না যে এই বহিঃসৌর বিশেষ পাথুরে গ্রহের সম্ভবত একটি চৌম্বক ক্ষেত্র রয়েছে কিন্তু আরো খুঁজে পেতে একটি প্রতিশ্রুতিশীল পদ্ধতি সরবরাহ বা শর্ত আরোপ করে ।"

* তথ্যসূত্র: https://edition.cnn.com/ (By ),  

https://www.ndtv.com/  https://www.sciencealert.com/ (By FIONA MACDONALD) 

Wednesday, 5 April 2023

সূর্যের চেয়ে ৩২.৭ বিলিয়ন গুণ ভারী কৃঞ্চগহ্বর সনাক্ত


ছবি:https://cosmosmagazine.com/ 

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সূর্যের ভরের প্রায় ৩২.৭ বিলিয়ন গুণ একটি অতি বৃহদাকার কৃঞ্চগহ্বর বা কৃষ্ণবিবর (Black hole) আবিষ্কার করেছেন ৷ যেটি কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরে অপার মহাবিশ্বের গভীরে লুকিয়ে আছে । গত ২৯শে মার্চ ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে দি রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির জটিল দৃষ্টিপাত-পর্যালোচিত সাময়িকীর মাসিক বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত একটি গবেষণার কথা বিজ্ঞানীরা বলেছেন । এই বিরল বৃহদায়তন কৃষ্ণগহ্বরটি 'আবেল ১২০১' (Abell 1201) ছায়াপথের কেন্দ্রে বসে আছে ৷ পৃথিবী থেকে প্রায় ২.৭ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে 'আবেল ১২০১' নামের একটি ছায়াপথ স্তবকে ছড়িয়ে থাকা অতি দানবীয় এই উপবৃত্তাকার 'আবেল ১২০১' উজ্জ্বল ছায়াপথটি মহাজাগতিক কলোসাসে (Colossus) লুকিয়ে আছে ৷ যেটি একটি শক্তিশালী মহাকর্ষীয় অক্ষিকাচ (Lens) হিসেবে সুপরিচিত । এই মহাজাগতিক দানবটি এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে বড় কৃষ্ণগহ্বরগুলোর মধ্যে একটি । কৃষ্ণগহ্বর মহাবিশ্বের এমন একটি বস্তু যা ঘন সন্নিবিষ্ট বা অতি ক্ষুদ্র আয়তনের ভর এতোই বেশি যে এর মহাকর্ষীয় শক্তি তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ যেমন আলো থেকে শুরু করে যেকোনো কিছুই এর ভিতর থেকে বের হতে পারে না । একটি বৃহৎ নক্ষত্র জীবনের শেষ পর্যায়ে বিস্ফোরিত (Supernova) হয়ে নিজের ওজনের চাপে ভেঙে পড়ে এবং এক বিন্দুতে সংকুচিত হয় যার ফলে কৃষ্ণগহ্বর সৃষ্টি হয় । কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রকে বলা হয় Singularity, আর এর চারপাশের সীমা হচ্ছে Event Horizon, যার ভেতরে প্রবেশ করলে আর কিছুই ফিরে আসতে পারে না । কৃষ্ণগহ্বর মানে কালো গর্ত ৷ কারণ এটি নিজের দিকে আসা সকল আলোকরশ্মিকে শুষে নেয় । কৃঞ্চগহ্বরগুলো ভারী । কিন্তু মনে হচ্ছে কৃঞ্চগহ্বরের জগতেও এমন দানবীয় বস্তু রয়েছে যে তাদের নিজস্ব একটি দৈর্ঘ্যের মাপ (League) আছে । কৃঞ্চগহ্বর হচ্ছে বিশাল নক্ষত্রের ধসে পড়া অন্তস্তল বা কেন্দ্র যা শক্তি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে । ছোট কৃঞ্চগহ্বরগুলো সূর্যের ভরের ১০ থেকে ১০০ গুণের মধ্যে এবং অতি বৃহদায়তন কৃঞ্চগহ্বরগুলো মিলিয়ন বা এমনকি বিলিয়ন সৌর ভরের মধ্যে হতে পারে । মহাবিশ্বের সবচেয়ে ভারী কৃঞ্চগহ্বরটির নাম টিওএন ৬১৮ (TON 618), যেটি আমাদের সূর্যের ভরের ৬৬ বিলিয়ন গুণ । সেই তুলনায় 'আবেল ১২০১' ছায়াপথের কেন্দ্রে নতুন আবিষ্কৃত বৃহদায়তন কৃষ্ণগহ্বরটির ভর মাত্র অর্ধেক হলেও এটি এখনো একটি দানব । আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথ কেন্দ্রের রেডিও তরঙ্গের প্রবল উৎস ও অতিভার বিশিষ্ট কৃষ্ণগহ্বর ধনু A* এর চেয়ে এটি ৮০০০ গুণ বেশি ভারী । এই বিশাল মহাবিশ্বে প্রচুর পরিমাণে কৃঞ্চগহ্বর রয়েছে, কিন্তু যতক্ষণ না তারা সক্রিয়ভাবে উপাদান সংগ্রহ করছে । এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যা উপাদানটি কৃঞ্চগহ্বরে পড়ার আগে উত্তপ্ত হয়ে প্রচুর পরিমাণে আলো তৈরি করে– যেগুলো সনাক্ত করা সহজ নয় । কৃঞ্চগহ্বরগুলো নিজেরাই এমন কোনো আলো নির্গত করে যা আমরা সনাক্ত করতে পারি না । তাই আমাদের চারপাশের জিনিসপত্রের উপর তাদের প্রভাব খুঁজে বের করতে হবে । যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের গবেষকরা হাবল স্পেস টেলিস্কোপ দ্বারা ধারণকৃত উচ্চ-নির্ণয়কর ছবিগুলোর সাথে সুপার কম্পিউটার সিমুলেশনের সমন্বয়ে একটি উদ্ভাবনী কৌশল ব্যবহার করে এই দৈত্যাকার কৃষ্ণগহ্বরটি আবিষ্কার করেছেন । যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের গবেষণা লেখক ও মহাবিশ্বতত্ত্ববিদ জেমস নাইটিংগেল (James Nightingale) বলেন, ''কতোটা বড় তা বোঝা আমার পক্ষে কঠিন । অতিবৃহদায়তন এই কৃঞ্চগহ্বরটি এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় গর্তগুলোর মধ্যে একটি হতে পারে, কারণ পদার্থবিদরা মনে করেন কৃঞ্চগহ্বর এর চেয়ে বেশি বড় হতে পারে না । এই বিশেষ-বিশাল কৃঞ্চগহ্বরটি যা সূর্যের ভরের প্রায় ৩২.৭ বিলিয়ন গুণ, এটি এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় এবং আমরা বিশ্বাস করি যে কৃঞ্চগহ্বর তাত্ত্বিকভাবে কতোটা বড় হতে পারে তার ঊর্ধ্বসীমার কাছাকাছি । তাই এটি একটি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ আবিষ্কার এবং গবেষকরা যে কৌশলটি ব্যবহার করেছেন তা দূরবর্তী কৃঞ্চগহ্বরগুলোর উপর ভবিষ্যৎ অধ্যয়ন বা গবেষণার জন্য প্রভাব ফেলবে ।'' কৃঞ্চগহ্বরটির আকার নির্ণয় করতে বিজ্ঞানীরা মহাকর্ষীয় লেন্সিং (Gravitational Lensing) নামক প্রাকৃতিক ঘটনা নিয়ে গবেষণা করেছেন । ছায়াপথের মতো অতিবৃহদায়তন বস্তুগুলোর একটি মহাকর্ষীয় টান থাকতে পারে, যা এতোই তীব্র যে এটি আলোর রশ্মিকে বাঁকিয়ে দেয় । যখন একটি ছায়াপথ অন্য ছায়াপথের সামনে থাকে, তখন অগ্রভাগের ছায়াপথটি পিছনের ছায়াপথের আলোকে বিকৃত করতে পারে । পটভূমিতে ছায়াপথ থেকে আলো তখন বড় হয়ে যায়, যা পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের কাছে দৃশ্যমান হয় । কিন্তু জেমস নাইটিংগেল এবং এই গবেষণার অন্যান্য বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তারা পটভূমিতে ছায়াপথ গবেষণা বা অধ্যয়ন করতে চান না । পরিবর্তে, তারা মহাকর্ষীয় লেন্সিং ব্যবহার করে সেই প্রভাব তৈরি করতে পটভূমিতে ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকা কৃঞ্চগহ্বরটি কতো বড় হওয়া দরকার তা মূল্যায়ন করেন । 'আবেল ১২০১' ছায়াপথের পিছনে অন্য একটি ছায়াপথ থেকে আলো এমনভাবে পৃথিবীতে পৌঁছেছিল যা নির্দেশ করে যে এটি পথে একটি অত্যন্ত বিশাল বস্তুর চারপাশে বাঁকছে—  একটি লেন্সিং এর মধ্যে প্রভাব তৈরি করেছে যাতে আরো দূরবর্তী ছায়াপথ উভয়ই বিবর্ধিত বা প্রসারিত এবং আপাতদৃষ্টিতে একটি বাঁকা প্রান্তের চারপাশে বহুগুণ । গবেষকরা হাবল স্পেস টেলিস্কোপে ধারণকৃত দূরবর্তী ছায়াপথগুলোর ছবি দেখেছিলেন এবং একটি ছায়াপথ খুঁজে পেয়েছিলেন যেটি এই লেন্সিং এর মধ্যে প্রভাব তৈরি করেছে । তারা এই কৌশলটি ব্যবহার করে পটভূমিতে ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকা কৃঞ্চগহ্বরের আকার নির্ধারণ করেছিলেন । মহাকর্ষীয় লেন্সিং হচ্ছে যখন একটি বিশাল লক্ষ্যবস্তু যেমন একটি ছায়াপথ, আরো দূরবর্তী বস্তু থেকে আলোকে বাঁকিয়ে দেয় যার ফলে এটি বিবর্ধিত হয় । তাই লেন্সিং ভরের বৈশিষ্ট্যগুলো অনুসন্ধান করতে এই বিকৃত আলো অধ্যয়ন বা গবেষণা করার প্রয়োজন রয়েছে । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, প্রতিটি বড় ছায়াপথের কেন্দ্রে কমপক্ষে অতি বৃহদাকার (সূর্যের ভরের ১০০০০০ গুণেরও বেশি) একটি কৃঞ্চগহ্বর রয়েছে । গবেষকরা ডারহামের ডিআইআরএসি সিওএসএমএ৮ (Durham's DiRAC COSMA8) সুপার কম্পিউটার ব্যবহার করে ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকা কৃঞ্চগহ্বরের ভরকে পরিবর্তন করে মহাবিশ্বের মধ্য দিয়ে চলমান আলোর কয়েক হাজার সিমুলেশন (Simulation) পরিচালনা করেন । যখন একটি অতিবৃহদায়তন কৃঞ্চগহ্বর সূর্যের ভরের প্রায় ৩২.৭ বিলিয়ন গুণ সিমুলেশনে অন্তর্ভুক্ত ছিল, তারা এমন ছবি তৈরি করেছে যা হাবল স্পেস টেলিস্কোপের তোলা বাস্তব ছবির সাথে মিলে যায় । জেমস নাইটিংগেল আরো বলেন যে, ''কৌশলটি 'নিষ্ক্রিয়' কৃঞ্চগহ্বর উন্মোচন করতে পারে । এই কৃঞ্চগহ্বরের আবিষ্কার বিশ্বতত্ত্ব বা মহাজাগতিকতার সীমাকে পিছনে ঠেলে দেয় । কিভাবে মহাবিশ্বের অস্তিত্বের মাত্র ১৩ বিলিয়ন বছরের মধ্যে এতো বড় একটি কৃঞ্চগহ্বর তৈরি হয়েছে? কিন্তু এই বিজ্ঞানীরাও সত্যিই তাদের উদ্ঘাটিত কৌশলটি কি করতে পারে তা খুঁজে বের করতে আগ্রহী । আমরা যে সকল বড় বড় কৃঞ্চগহ্বর সম্পর্কে জানি তার বেশিরভাগই সক্রিয় অবস্থায় আছে, যেখানে কৃঞ্চগহ্বরের কাছে টেনে নেয়া পদার্থ বা বস্তু উত্তপ্ত হয়ে আলো, রঞ্জন-রশ্মি এবং অন্যান্য বিকিরণের আকারে শক্তি প্রকাশ করে । তবে, মহাকর্ষীয় লেন্সিং নিষ্ক্রিয় কৃঞ্চগহ্বরগুলোর গবেষণা বা অধ্যয়ন করা সম্ভব করে তোলে, যা বর্তমানে দূরবর্তী ছায়াপথগুলোতে কিছু সম্ভব নয় ৷ এই পদ্ধতির সাহায্যে আমরা আমাদের স্থানীয় মহাবিশ্ব (আমাদের ছায়াপথের কাছাকাছি মহাবিশ্বের এলাকা) ছাড়িয়ে বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আরো অনেক কৃঞ্চগহ্বর সনাক্ত করতে পারি এবং মহাজাগতিক সময়ের মধ্যে এই বহিরাগত বস্তুগুলো কিভাবে আরো বিবর্তিত হয়েছিল তা প্রকাশ করতে পারে ।'' বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে তারা সবচেয়ে বড় নথিভুক্ত করা কৃঞ্চগহ্বরগুলোর মধ্যে একটি আবিষ্কার করেছেন, যা এতোটাই বিশাল যে এটি পিছনের ছায়াপথ থেকে আলোকে বিকৃত করে । *তথ্যসূত্র: https://www.businessinsider.com/ https://www.abc.net.au/  https://cosmosmagazine.com/  https://www.sciencealert.com/  *ছবি: https://cosmosmagazine.com/ 

Monday, 3 April 2023

বহিঃসৌর মহাপৃথিবী TRAPPIST-1 b গ্রহে প্রথম তাপ নির্গমন সনাক্ত

চিত্র: https://www.wikiwand.com/  


আমাদের সৌরজগতের বাইরে এক বহিঃসৌর মহাপৃথিবী (Super Earth Exoplanet) হচ্ছে TRAPPIST-1 b । এ পাথুরে গ্রহটি 2MASS J23062928-0502285 b নামেও পরিচিত । গত ০২রা মে, ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে Michaël Gillon et al প্রথম গ্রহটি আবিষ্কার করেন । পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০.৭ আলোকবর্ষ (১২.৫ parsecs) দূরে Aquarius নক্ষত্রমণ্ডলের কুম্ভ রাশিতে এটি অবস্থিত । গ্রহটি পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ৩৭% বেশি বৃহদায়তন এবং প্রায় ১২% বড় । TRAPPIST-1b গ্রহটির ভর, ব্যাসার্ধ এবং মাধ্যাকর্ষণ উভয় ক্ষেত্রেই পৃথিবীর সাথে অনেকটা মিল রয়েছে । এর ব্যাসার্ধ ১.১১৬ R, ভর ১.৩৭৪ M এবং প্রায় ১১০% পৃথিবীর পৃষ্ঠ মাধ্যাকর্ষণ । এটি পৃথিবীর চেয়ে প্রায় চারগুণ বেশি শক্তি গ্রহণ করে এবং সামান্য কম ঘন । একটি বায়ুমণ্ডলের উপস্থিতি অনুমান করে এর পৃষ্ঠের প্রাথমিকভাবে তাপমাত্রা: ৭৫০ কেলভিন (৪৭৭ °C বা ৮৯০ °F), ১৫০০ কেলভিন (১২৩০ °C বা ২২৪০ °F) এবং সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ২০০০ কেলভিন (১৭৩০ °C বা ৩১৪০ °F) । গ্রহটি শুক্র গ্রহপৃষ্ঠের চেয়ে অনেক বেশি গরম এবং সম্ভবত এ গ্রহের পৃষ্ঠটি গলিত লাভা’র কারণে যথেষ্ট গরম । TRAPPIST-1 b বহিঃসৌর গ্রহটি হচ্ছে TRAPPIST-1 নক্ষত্রের গ্রহতন্ত্রে পরিচিত সাতটি গ্রহের মধ্যে সবচেয়ে ভিতরে অবস্থিত । অভ্যন্তরীণ এ গ্রহটির একটি খুব বৃত্তাকার কক্ষপথও আছে যার উত্কেন্দ্রতা বা কেন্দ্রীয় দূরত্ব ০.০০৬২২, যেটি পৃথিবীর কক্ষপথের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বৃত্তাকার । কক্ষপথের দূরত্ব পৃথিবীর তুলনায় একশত ভাগের মতো এবং পৃথিবী তার মূল বা কেন্দ্রীয় নক্ষত্র সূর্য থেকে যে পরিমাণ শক্তি পেয়ে থাকে তার প্রায় চারগুণ শক্তি এটি গ্রহণ করে । গ্রহটি ০.০১১ AU (১.৭২ মিলিয়ন কিলোমিটার বা ১.০৭ মিলিয়ন মাইল) দূরত্বে তার মূল বা কেন্দ্রীয় নক্ষত্র TRAPPIST-1 কে খুব কাছাকাছি প্রদক্ষিণ করে, পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যে দূরত্বের মাত্র ১.২% । একটি কক্ষপথ (বর্তনী বা আবর্তন) সম্পূর্ণ করতে মাত্র ৩৬ ঘন্টা বা প্রায় ১.৫১ পৃথিবী দিন সময় লাগে । মূল বা কেন্দ্রীয় নক্ষত্রের নিকটবর্তী হওয়ার অর্থ হচ্ছে TRAPPIST-1b গ্রহে সম্ভবত জোয়ার-ভাটা তালাবদ্ধ রয়েছে । যদিও গ্রহটি TRAPPIST-1 এর গ্রহতন্ত্রের বসবাসযোগ্য অঞ্চলের মধ্যে নয় । তবুও গ্রহের পর্যবেক্ষণগুলো থেকে এর ভাই-বোন গ্রহগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য M-বামন নক্ষত্রগুলোর গ্রহতন্ত্র সম্পর্কেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে । ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের গোড়ার দিকে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবী থেকে ৪০ আলোকবর্ষ দূরে একটি অতিশীতল লাল বামন (Ultracool Red Dwarf বা M dwarf) নক্ষত্রকে সাতটি পাথুরে গ্রহ প্রদক্ষিণ করে, এমন একটি আবিষ্কারের কথা জানিয়েছিলেন । ঐ বহিঃসৌর গ্রহগুলো সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে যে, আমাদের নিজস্ব সৌরজগতের অভ্যন্তরীণ পাথুরে গ্রহগুলোর আকার এবং ভরের সাথে তাদের মিল রয়েছে । আমাদের সৌরজগতের যে কোনো গ্রহ সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার চেয়ে যদিও বহিঃসৌর গ্রহগুলো সকলেই তাদের মূল নক্ষত্রের অনেক কাছাকাছি প্রদক্ষিণ করে ৷ সকলেই বুধের কক্ষপথের মধ্যে আরামে মানানসই করতে পারে– তারা তাদের এ ক্ষুদ্র কেন্দ্রীয় বা মূল নক্ষত্র থেকে তুলনামূলক পরিমাণে শক্তি পায় । TRAPPIST-1 নক্ষত্র হচ্ছে একটি অতি শীতল লাল বামন (প্রয়াত M বামন) । যার ভর ০.০৮৯ সৌর ভর (M☉) (সূর্যের ভরের মাত্র ০.০৯ গুণ) এবং ০.১২১ সৌর ব্যাসার্ধ (R☉) । নক্ষত্রটির তাপমাত্রা ২৫৬৬ কেলভিন এবং ৩ থেকে ৮ বিলিয়ন বছরের পুরনো । সে তুলনায়, সূর্য ৪.৬ বিলিয়ন বছর পুরনো এবং সূর্যের তাপমাত্রা ৫৭৭৮ কেলভিন । ক্ষুদ্র বামন নক্ষত্রটি সূর্যের চেয়ে প্রায় ০.০০০৫ গুণ উজ্জ্বলতায় খুবই ম্লান বা অনুজ্জ্বল ৷ ১৮.৮০ আপাত মাত্রায় এটিকে খালি চোখে দেখা খুবই মূর্ছাপ্রবণ । এ নক্ষত্র তার কেন্দ্রে হাইড্রোজেন পোড়াতে সক্ষম । নক্ষত্রটি ধাতব সমৃদ্ধ, যার ধাতবতা ([Fe/H]) ০.০৪ বা ১০৯% সৌর পরিমাণ । বিশেষ করে এটি অদ্ভুত, কারণ বাদামী বামন এবং হাইড্রোজেন-অদৃশ্য বা উত্তাপে গলিয়া যাত্তয়া (Hydrogen-fusing) নক্ষত্রের মধ্যে সীমানার কাছাকাছি এ ধরনের কম ভরের নক্ষত্রগুলোতে সূর্যের তুলনায় যথেষ্ট কম ধাতব উপাদান রয়েছে বলে ধারণা করা হয় । এর দীপ্তি (L☉) সূর্যের ০.০৫২২% । TRAPPIST-1 System বা গ্রহতন্ত্রে পৃথিবীর মতো এ নক্ষত্রের চারপাশে মোট সাতটি বহিঃসৌর গ্রহ রয়েছে । তাদের মধ্যে তিনটি— TRAPPIST-1e, TRAPPIST-1f এবং TRAPPIST-1g তাদের মূল নক্ষত্র TRAPPIST-1 এর “বসবাসযোগ্য অঞ্চলে” (The TRAPPIST-1 Habitable Zone) বাস করে । যদিও TRAPPIST-1b, TRAPPIST-1c ও TRAPPIST-1d গ্রহগুলো TRAPPIST-1 নক্ষত্রের গ্রহতন্ত্রে সম্ভাব্য বাসযোগ্য অঞ্চলের খুবই কাছাকাছি এবং TRAPPIST-1h গ্রহটির অবস্থান অনেক দূরে । ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে Spitzer Space Telescope দিয়ে TRAPPIST-1b বহিঃসৌর গ্রহের বায়ুমণ্ডল পরীক্ষা করা হয় । প্রকাশিত পর্যবেক্ষণগুলোতে দেখা যায় যে, গ্রহটির বায়ুমণ্ডল পৃথিবী ও শুক্রের তুলনায় অনেক বড় । বর্ণালিবীক্ষণ দ্বারা নিশ্চিত করে গ্রহটির তুলনামূলকভাবে কম ঘনত্ব, অত্যন্ত পুরু, সম্ভাব্যভাবে COসমৃদ্ধ, জলীয় বাষ্পযুক্ত এবং সালফিউরিক এসিড মেঘ গঠনের কারণে খুবই গরম বায়ুমণ্ডল রয়েছে । একই বছর ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, TRAPPIST-1b গ্রহে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের পৃষ্ঠ চাপের ১০০০০ গুণ পর্যন্ত জল-সমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল রয়েছে । সৌরজগতের উষ্ণতম গ্রহ শুক্রের সাথে গ্রহটির বেশ মিল রয়েছে । এদিকে আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি দল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীন সংস্থা ”জাতীয় বিমানচালনা ও মহাকাশ প্রশাসন” (NASA) এর James Webb Space Telescope (JWST) ব্যবহার করে ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে গ্রহটির তাপমাত্রা পরিমাপ করে । গ্রহের তাপীয় নির্গমনের উপর ভিত্তি করে এ পরিমাপ করা হয় । Mid-Infrared Instrument (MIRI) এর দ্বারা অবলোহিত আলো আকারে তাপ শক্তি সনাক্ত করে । কিন্তু বিস্ময়কর হচ্ছে যে, এ বার ঘোষিত পর্যবেক্ষণগুলো থেকে বোঝা যায়-  গ্রহটির কোনো উল্লেখযোগ্য বায়ুমণ্ডল নেই । যার পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৫০৩ কেলভিন (২৩০ °C বা ৪৪৬ °F) । উপরন্তু, বৃহস্পতির চাঁদ Io এর মতো জোয়ার-ভাটার কারণে গ্রহটি খুব ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় হতে পারে, যা একই রকম কক্ষপথের সময়কাল এবং উত্কেন্দ্রতা বা কেন্দ্রীয় দূরত্বের সাথে ঘটে থাকে । গ্রহটির সম্ভাব্য বড় বায়ুমণ্ডল নিশ্চিত করতে আরো অধ্যয়ন বা গবেষণা করতে হবে । TRAPPIST-1b গ্রহ থেকে কোনো হিলিয়াম নির্গমন সনাক্ত করা যায়নি । এছাড়া, কার্বন ডাই অক্সাইড দ্বারা শোষিত হওয়ার (বায়ুমণ্ডলীয় শোষণ) কোনো লক্ষণও দেখা যায়নি, যা এ পরিমাপে স্পষ্ট হবে । তা সত্ত্বেও, TRAPPIST-1 নক্ষত্রের মতো ক্ষুদ্র সক্রিয় নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণকারী বহিঃসৌর গ্রহগুলো প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় বায়ুমণ্ডল বজায় রাখতে পারে কি-না তা নির্ধারণে গবেষণার ফলাফলটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ চিহ্নিত করে । MIRI যন্ত্র ব্যবহার করে পরিমিত তাপসম্পন্ন বা নাতিশীতোষ্ণ বৈশিষ্ট্য, পৃথিবী আকৃতির বহিঃসৌর গ্রহগুলোকে চিহ্নিত করতে Webb দূরবীক্ষণ যন্ত্রটির ক্ষমতার বিষয়টিও ভালো পূর্বাভাস নির্দেশ করে । NASA এর Ames Research Center এর জ্যোতির্পদার্থবিদ এবং Nature সাময়িকীতে ২৭শে মার্চ ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত এ গবেষণার প্রধান লেখক Thomas Greene বলেন যে: ”এ পর্যবেক্ষণগুলো সত্যিই Webb এর মধ্য-অবলোহিত ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করে । পূর্বের কোনো দূরবীক্ষণযন্ত্রগুলোতে এ জাতীয় অনুজ্জ্বল বা অস্পষ্ট মধ্য-অবলোহিত আলো পরিমাপ করার সংবেদনশীলতা ছিল না । আকাশগঙ্গায় সূর্যের মতো G নক্ষত্রের চেয়ে TRAPPIST-1 নক্ষত্রগুলোর মতো প্রায় দশ গুণ বেশি M নক্ষত্র আছে এবং সূর্যের মতো নক্ষত্রের তুলনায় তাদের দ্বিগুণ পাথুরে গ্রহ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে । কিন্তু তারা খুব সক্রিয়–  তারা অল্প বয়সে খুবই উজ্জ্বল হয়, তারা দাউদাউ করিয়া জ্বলা অগ্নিশিখা এবং রঞ্জন-রশ্মি ছেড়ে দেয় যা একটি বায়ুমণ্ডলকে নিশ্চিহ্ন করতে পারে ।” French Alternative Energies and Atomic Energy Commission (CEA) এর সহ-লেখক Elsa Ducrot বলেন: ”ছোট, শীতল নক্ষত্রের চারপাশে পার্থিব গ্রহগুলো চিহ্নিত করা সহজ । কিন্তু আমরা যদি M নক্ষত্রের চারপাশে বসবাসযোগ্যতা বুঝতে চাই তাহলে TRAPPIST-1 এর গ্রহতন্ত্রটি একটি দুর্দান্ত পরীক্ষাগার । পাথুরে গ্রহে বায়ুমণ্ডল দেখার জন্য এগুলো আমাদের কাছে সেরা লক্ষ্য ।” Hubble Space Telescope এবং Spitzer Space Telescope দ্বারা TRAPPIST-1 b গ্রহের পূর্ববর্তী পর্যবেক্ষণগুলোতে এক স্ফীত বা দমকা বায়ুমণ্ডলের কোনো প্রমাণ খুঁজে পায়নি, তবে এর একটি ঘন বায়ুমণ্ডলের সম্ভাবনাও নাকচ করেনি । CEA এর আরেকজন জ্যেষ্ঠ জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী ও সহ-লেখক Pierre-Olivier Lagage বলেন: “যদি গ্রহটিতে তাপ সঞ্চালন এবং পুনঃবন্টন করার জন্য বায়ুমণ্ডল না থাকে তবে দিনের দিকটি শীতল হবে । এ গ্রহটি সম্ভবত জোয়ারে তালাবদ্ধ, একপাশ সর্বদা মূল নক্ষত্রের দিকে মুখ করে এবং অন্যটি স্থায়ী অন্ধকারে থাকে ।” জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মধ্য-অবলোহিত আলোর উজ্জ্বলতা পরিমাপ করতে Webb এর Mid-Infrared Instrument (MIRI) যন্ত্র ব্যবহার করেন । যখন গ্রহটি নক্ষত্রের পাশে থাকে, তখন নক্ষত্র ও গ্রহের দিনের বেলা উভয়ের দ্বারা নির্গত আলো দূরবীক্ষণ যন্ত্রে পৌঁছায় এবং তন্ত্র বা পদ্ধতিটি আরো উজ্জ্বল দেখায় । যখন গ্রহটি নক্ষত্রের পিছনে থাকে, তখন গ্রহ থেকে নির্গত আলো অবরুদ্ধ হয়ে যায় এবং শুধুমাত্র নক্ষত্রের আলো দূরবীক্ষণ যন্ত্রে পৌঁছায়, যার ফলে আপাত উজ্জ্বলতা হ্রাস পায় । গবেষক দলটি ‘মাধ্যমিক গ্রাস বা গ্রহণ আলোকমিতি’ (Secondary eclipse photometry) নামে একটি কৌশল ব্যবহার করে ৷ যেখানে এ গ্রহটি নক্ষত্রের পিছনে চলে যাওয়ার সাথে সাথে তন্ত্র বা পদ্ধতি থেকে উজ্জ্বলতার পরিবর্তন পরিমাপ করে MIRI যন্ত্রটি । যদিও TRAPPIST-1 b গ্রহ তার নিজের দৃশ্যমান আলো দিতে যথেষ্ট গরম নয়, তবে এর একটি অবলোহিত আভা রয়েছে । নক্ষত্র এবং গ্রহের একত্রিত উজ্জ্বলতা থেকে নক্ষত্রের নিজস্ব উজ্জ্বলতা (মাধ্যমিক গ্রাস বা গ্রহণের সময়) বিয়োগ করে তারা সফলভাবে গণনা করতে সক্ষম হয়েছেন যে, গ্রহটি কতোটা অবলোহিত আলো দিচ্ছে । পরবর্তীতে MIRI যন্ত্রটি দিনের তাপমাত্রা পরিমাপ করতে ব্যবহৃত হয় । লেখচিত্রটি MIRI যন্ত্রের F1500W ছাঁকনি ব্যবহার করে পাঁচটি পৃথক পর্যবেক্ষণ থেকে সম্মিলিত তথ্য দেখায়, যা শুধুমাত্র ১৩.৫-১৬.৬ মাইক্রন পর্যন্ত তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকে আবিষ্কারক যন্ত্রে যেতে অনুমতি দেয় । নীল বর্গগুলো হচ্ছে স্বতন্ত্র উজ্জ্লতার পরিমাপ । লাল বৃত্তগুলো পরিমাপ দেখায় যা “বাঁধা” (Binned) বা গড় করা হয় যাতে সময়ের সাথে পরিবর্তনটি দেখতে সহজ হয় ৷ মাধ্যমিক গ্রাস বা গ্রহণের সময় ০.১% এর কম উজ্জ্বলতা হ্রাস পায় । মানে, গ্রহের চেয়ে ১০০০ গুণ বেশি উজ্জ্বল নক্ষত্রের সাথে উজ্জ্বলতার পরিবর্তন ০.১% এর কম । MIRI যন্ত্রটি ০.০২৭% (৩৭০০ এর মধ্যে ১ অংশ) এর মতো ছোট পরিবর্তন সনাক্ত করতে সক্ষম হয় । Webb এর একটি মাধ্যমিক গ্রাস বা গ্রহন সনাক্তকরণের জন্য নিজেই একটি বড় মাইলফলক । এ গবেষণাটি Webb Guaranteed Time Observation (GTO) কর্মসূচী ১১৭৭ এর অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়েছিল । এটি তাদের দেখতে অনুমতি দেয় যে, দিনের থেকে রাতের দিকে তাপমাত্রা কিভাবে পরিবর্তিত হয় এবং গ্রহের বায়ুমণ্ডল আছে কি-না তা নিশ্চিত করা । জ্যোতির্পদার্থবিদ Pierre-Olivier Lagage বলেন: “একটি লক্ষ্য ছিল যা আমি পাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম এবং ইহা এটি একটি । এ প্রথম আমরা একটি পাথুরে, নাতিশীতোষ্ণ বা পরিমিত তাপসম্পন্ন গ্রহ থেকে তাপ নির্গমন সনাক্ত করতে পেরেছি । বহিঃসৌর গ্রহ আবিষ্কারের গল্পে এটি সত্যিই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ।” এটি আমাদের নিজস্ব সৌরজগতের বাইরে পৃথিবীর মতোই পাথুরে যেকোনো শীতল একটি বহিঃসৌর গ্রহের প্রথম তাপ নির্গমনের পর্যবেক্ষণ । 

তথ্যসূত্র: https://www.nasa.gov/&nbsphttps://hubblesite.org/ https://en.wikipedia.org/wiki/Main_Page

https://astronomical.fandom.com/wiki/Astronomy_Wiki &nbsphttps://www.space.com/ (By: Tereza Pultarova)

চিত্র: https://www.wikiwand.com/

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...