ছবি:https://cosmosmagazine.com/
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সূর্যের ভরের প্রায় ৩২.৭ বিলিয়ন গুণ একটি অতি বৃহদাকার কৃঞ্চগহ্বর বা কৃষ্ণবিবর (Black hole) আবিষ্কার করেছেন ৷ যেটি কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরে অপার মহাবিশ্বের গভীরে লুকিয়ে আছে । গত ২৯শে মার্চ ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে দি রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির জটিল দৃষ্টিপাত-পর্যালোচিত সাময়িকীর মাসিক বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত একটি গবেষণার কথা বিজ্ঞানীরা বলেছেন । এই বিরল বৃহদায়তন কৃষ্ণগহ্বরটি 'আবেল ১২০১' (Abell 1201) ছায়াপথের কেন্দ্রে বসে আছে ৷ পৃথিবী থেকে প্রায় ২.৭ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে 'আবেল ১২০১' নামের একটি ছায়াপথ স্তবকে ছড়িয়ে থাকা অতি দানবীয় এই উপবৃত্তাকার 'আবেল ১২০১' উজ্জ্বল ছায়াপথটি মহাজাগতিক কলোসাসে (Colossus) লুকিয়ে আছে ৷ যেটি একটি শক্তিশালী মহাকর্ষীয় অক্ষিকাচ (Lens) হিসেবে সুপরিচিত । এই মহাজাগতিক দানবটি এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে বড় কৃষ্ণগহ্বরগুলোর মধ্যে একটি । কৃষ্ণগহ্বর মহাবিশ্বের এমন একটি বস্তু যা ঘন সন্নিবিষ্ট বা অতি ক্ষুদ্র আয়তনের ভর এতোই বেশি যে এর মহাকর্ষীয় শক্তি তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ যেমন আলো থেকে শুরু করে যেকোনো কিছুই এর ভিতর থেকে বের হতে পারে না । একটি বৃহৎ নক্ষত্র জীবনের শেষ পর্যায়ে বিস্ফোরিত (Supernova) হয়ে নিজের ওজনের চাপে ভেঙে পড়ে এবং এক বিন্দুতে সংকুচিত হয় যার ফলে কৃষ্ণগহ্বর সৃষ্টি হয় । কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রকে বলা হয় Singularity, আর এর চারপাশের সীমা হচ্ছে Event Horizon, যার ভেতরে প্রবেশ করলে আর কিছুই ফিরে আসতে পারে না । কৃষ্ণগহ্বর মানে কালো গর্ত ৷ কারণ এটি নিজের দিকে আসা সকল আলোকরশ্মিকে শুষে নেয় । কৃঞ্চগহ্বরগুলো ভারী । কিন্তু মনে হচ্ছে কৃঞ্চগহ্বরের জগতেও এমন দানবীয় বস্তু রয়েছে যে তাদের নিজস্ব একটি দৈর্ঘ্যের মাপ (League) আছে । কৃঞ্চগহ্বর হচ্ছে বিশাল নক্ষত্রের ধসে পড়া অন্তস্তল বা কেন্দ্র যা শক্তি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে । ছোট কৃঞ্চগহ্বরগুলো সূর্যের ভরের ১০ থেকে ১০০ গুণের মধ্যে এবং অতি বৃহদায়তন কৃঞ্চগহ্বরগুলো মিলিয়ন বা এমনকি বিলিয়ন সৌর ভরের মধ্যে হতে পারে । মহাবিশ্বের সবচেয়ে ভারী কৃঞ্চগহ্বরটির নাম টিওএন ৬১৮ (TON 618), যেটি আমাদের সূর্যের ভরের ৬৬ বিলিয়ন গুণ । সেই তুলনায় 'আবেল ১২০১' ছায়াপথের কেন্দ্রে নতুন আবিষ্কৃত বৃহদায়তন কৃষ্ণগহ্বরটির ভর মাত্র অর্ধেক হলেও এটি এখনো একটি দানব । আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথ কেন্দ্রের রেডিও তরঙ্গের প্রবল উৎস ও অতিভার বিশিষ্ট কৃষ্ণগহ্বর ধনু A* এর চেয়ে এটি ৮০০০ গুণ বেশি ভারী । এই বিশাল মহাবিশ্বে প্রচুর পরিমাণে কৃঞ্চগহ্বর রয়েছে, কিন্তু যতক্ষণ না তারা সক্রিয়ভাবে উপাদান সংগ্রহ করছে । এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যা উপাদানটি কৃঞ্চগহ্বরে পড়ার আগে উত্তপ্ত হয়ে প্রচুর পরিমাণে আলো তৈরি করে– যেগুলো সনাক্ত করা সহজ নয় । কৃঞ্চগহ্বরগুলো নিজেরাই এমন কোনো আলো নির্গত করে যা আমরা সনাক্ত করতে পারি না । তাই আমাদের চারপাশের জিনিসপত্রের উপর তাদের প্রভাব খুঁজে বের করতে হবে । যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের গবেষকরা হাবল স্পেস টেলিস্কোপ দ্বারা ধারণকৃত উচ্চ-নির্ণয়কর ছবিগুলোর সাথে সুপার কম্পিউটার সিমুলেশনের সমন্বয়ে একটি উদ্ভাবনী কৌশল ব্যবহার করে এই দৈত্যাকার কৃষ্ণগহ্বরটি আবিষ্কার করেছেন । যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের গবেষণা লেখক ও মহাবিশ্বতত্ত্ববিদ জেমস নাইটিংগেল (James Nightingale) বলেন, ''কতোটা বড় তা বোঝা আমার পক্ষে কঠিন । অতিবৃহদায়তন এই কৃঞ্চগহ্বরটি এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় গর্তগুলোর মধ্যে একটি হতে পারে, কারণ পদার্থবিদরা মনে করেন কৃঞ্চগহ্বর এর চেয়ে বেশি বড় হতে পারে না । এই বিশেষ-বিশাল কৃঞ্চগহ্বরটি যা সূর্যের ভরের প্রায় ৩২.৭ বিলিয়ন গুণ, এটি এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় এবং আমরা বিশ্বাস করি যে কৃঞ্চগহ্বর তাত্ত্বিকভাবে কতোটা বড় হতে পারে তার ঊর্ধ্বসীমার কাছাকাছি । তাই এটি একটি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ আবিষ্কার এবং গবেষকরা যে কৌশলটি ব্যবহার করেছেন তা দূরবর্তী কৃঞ্চগহ্বরগুলোর উপর ভবিষ্যৎ অধ্যয়ন বা গবেষণার জন্য প্রভাব ফেলবে ।'' কৃঞ্চগহ্বরটির আকার নির্ণয় করতে বিজ্ঞানীরা মহাকর্ষীয় লেন্সিং (Gravitational Lensing) নামক প্রাকৃতিক ঘটনা নিয়ে গবেষণা করেছেন । ছায়াপথের মতো অতিবৃহদায়তন বস্তুগুলোর একটি মহাকর্ষীয় টান থাকতে পারে, যা এতোই তীব্র যে এটি আলোর রশ্মিকে বাঁকিয়ে দেয় । যখন একটি ছায়াপথ অন্য ছায়াপথের সামনে থাকে, তখন অগ্রভাগের ছায়াপথটি পিছনের ছায়াপথের আলোকে বিকৃত করতে পারে । পটভূমিতে ছায়াপথ থেকে আলো তখন বড় হয়ে যায়, যা পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের কাছে দৃশ্যমান হয় । কিন্তু জেমস নাইটিংগেল এবং এই গবেষণার অন্যান্য বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তারা পটভূমিতে ছায়াপথ গবেষণা বা অধ্যয়ন করতে চান না । পরিবর্তে, তারা মহাকর্ষীয় লেন্সিং ব্যবহার করে সেই প্রভাব তৈরি করতে পটভূমিতে ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকা কৃঞ্চগহ্বরটি কতো বড় হওয়া দরকার তা মূল্যায়ন করেন । 'আবেল ১২০১' ছায়াপথের পিছনে অন্য একটি ছায়াপথ থেকে আলো এমনভাবে পৃথিবীতে পৌঁছেছিল যা নির্দেশ করে যে এটি পথে একটি অত্যন্ত বিশাল বস্তুর চারপাশে বাঁকছে— একটি লেন্সিং এর মধ্যে প্রভাব তৈরি করেছে যাতে আরো দূরবর্তী ছায়াপথ উভয়ই বিবর্ধিত বা প্রসারিত এবং আপাতদৃষ্টিতে একটি বাঁকা প্রান্তের চারপাশে বহুগুণ । গবেষকরা হাবল স্পেস টেলিস্কোপে ধারণকৃত দূরবর্তী ছায়াপথগুলোর ছবি দেখেছিলেন এবং একটি ছায়াপথ খুঁজে পেয়েছিলেন যেটি এই লেন্সিং এর মধ্যে প্রভাব তৈরি করেছে । তারা এই কৌশলটি ব্যবহার করে পটভূমিতে ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকা কৃঞ্চগহ্বরের আকার নির্ধারণ করেছিলেন । মহাকর্ষীয় লেন্সিং হচ্ছে যখন একটি বিশাল লক্ষ্যবস্তু যেমন একটি ছায়াপথ, আরো দূরবর্তী বস্তু থেকে আলোকে বাঁকিয়ে দেয় যার ফলে এটি বিবর্ধিত হয় । তাই লেন্সিং ভরের বৈশিষ্ট্যগুলো অনুসন্ধান করতে এই বিকৃত আলো অধ্যয়ন বা গবেষণা করার প্রয়োজন রয়েছে । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, প্রতিটি বড় ছায়াপথের কেন্দ্রে কমপক্ষে অতি বৃহদাকার (সূর্যের ভরের ১০০০০০ গুণেরও বেশি) একটি কৃঞ্চগহ্বর রয়েছে । গবেষকরা ডারহামের ডিআইআরএসি সিওএসএমএ৮ (Durham's DiRAC COSMA8) সুপার কম্পিউটার ব্যবহার করে ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকা কৃঞ্চগহ্বরের ভরকে পরিবর্তন করে মহাবিশ্বের মধ্য দিয়ে চলমান আলোর কয়েক হাজার সিমুলেশন (Simulation) পরিচালনা করেন । যখন একটি অতিবৃহদায়তন কৃঞ্চগহ্বর সূর্যের ভরের প্রায় ৩২.৭ বিলিয়ন গুণ সিমুলেশনে অন্তর্ভুক্ত ছিল, তারা এমন ছবি তৈরি করেছে যা হাবল স্পেস টেলিস্কোপের তোলা বাস্তব ছবির সাথে মিলে যায় । জেমস নাইটিংগেল আরো বলেন যে, ''কৌশলটি 'নিষ্ক্রিয়' কৃঞ্চগহ্বর উন্মোচন করতে পারে । এই কৃঞ্চগহ্বরের আবিষ্কার বিশ্বতত্ত্ব বা মহাজাগতিকতার সীমাকে পিছনে ঠেলে দেয় । কিভাবে মহাবিশ্বের অস্তিত্বের মাত্র ১৩ বিলিয়ন বছরের মধ্যে এতো বড় একটি কৃঞ্চগহ্বর তৈরি হয়েছে? কিন্তু এই বিজ্ঞানীরাও সত্যিই তাদের উদ্ঘাটিত কৌশলটি কি করতে পারে তা খুঁজে বের করতে আগ্রহী । আমরা যে সকল বড় বড় কৃঞ্চগহ্বর সম্পর্কে জানি তার বেশিরভাগই সক্রিয় অবস্থায় আছে, যেখানে কৃঞ্চগহ্বরের কাছে টেনে নেয়া পদার্থ বা বস্তু উত্তপ্ত হয়ে আলো, রঞ্জন-রশ্মি এবং অন্যান্য বিকিরণের আকারে শক্তি প্রকাশ করে । তবে, মহাকর্ষীয় লেন্সিং নিষ্ক্রিয় কৃঞ্চগহ্বরগুলোর গবেষণা বা অধ্যয়ন করা সম্ভব করে তোলে, যা বর্তমানে দূরবর্তী ছায়াপথগুলোতে কিছু সম্ভব নয় ৷ এই পদ্ধতির সাহায্যে আমরা আমাদের স্থানীয় মহাবিশ্ব (আমাদের ছায়াপথের কাছাকাছি মহাবিশ্বের এলাকা) ছাড়িয়ে বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আরো অনেক কৃঞ্চগহ্বর সনাক্ত করতে পারি এবং মহাজাগতিক সময়ের মধ্যে এই বহিরাগত বস্তুগুলো কিভাবে আরো বিবর্তিত হয়েছিল তা প্রকাশ করতে পারে ।'' বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে তারা সবচেয়ে বড় নথিভুক্ত করা কৃঞ্চগহ্বরগুলোর মধ্যে একটি আবিষ্কার করেছেন, যা এতোটাই বিশাল যে এটি পিছনের ছায়াপথ থেকে আলোকে বিকৃত করে । *তথ্যসূত্র: https://www.businessinsider.com/ https://www.abc.net.au/ https://cosmosmagazine.com/ https://www.sciencealert.com/ *ছবি: https://cosmosmagazine.com/

No comments:
Post a Comment