Tuesday, 29 April 2025

ল্যানিয়াকিয়া ছায়পথ মহাস্তবক (The Laniakea Galaxy Supercluster)



"Our Place in the Cosmos" 

অপার বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এক মহাবিস্ময়, রহস্যময় এবং অনাবিল সুন্দর যা আজো আমাদেরকে হাতছানি দেয় । 

অসংখ্য নক্ষত্র, নাক্ষত্রিক অবশেষ, গ্রহাণু, উল্কা, ধূমকেতু, আন্তঃগ্রহীয় ধূলি মেঘ, আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাস, ধূলিকণা, নীহারিকা, সৌরজগৎ, কৃষ্ণগহ্বর এবং অদৃশ্য পদার্থসহ মহাজাগতিক নানা বস্তুর সমন্বয়ে গঠিত হয় এক একটি ছায়াপথ । একটি ছায়াপথে গড়ে প্রায় ১০০ – ৫০০ বিলিয়ন নক্ষত্র থাকে । ছায়াপথের উচ্চ ঘনত্বসহ বর্ধিত অঞ্চলগুলোকে মহাস্তবক (Supercluster) বলে । তবে সুনির্দিষ্টভাবে একটি মহাস্তবক হচ্ছে ছোট ছোট ছায়াপথ গুচ্ছ বা ছায়াপথ দলের একটি বড় দল বা গোষ্ঠী । এরা মহাবিশ্বের বৃহত্তম পরিচিত কাঠামোগুলোর মধ্যে একটি । পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বে মহাস্তবকের সংখ্যা ১০ মিলিয়ন বলে অনুমান করা হয় । ল্যানিয়াকিয়া মহাস্তবক হচ্ছে একটি 'ছায়াপথ মহাস্তবক' বা 'স্থানীয় ছায়াপথ মহাস্তবক' (Local Supercluster/LSC/LS) বা হাওয়াইয়ান 'উন্মুক্ত আকাশ', 'অমোঘ স্বর্গ' । বৃহদাকৃতির মহাস্তবকটি ৫২১৬০০০০০ আলোকবর্ষেরও (১৬০ মেঘাপারসেক) বেশি এলাকা নিয়ে বিস্তৃত যেখানে আমাদের নিজস্ব বাসস্থান আকাশগঙ্গা ছায়াপথসহ আশেপাশে প্রায় ১০০০০০ অন্যান্য ছায়াপথের আবাসস্থল । ঐ আকাশগঙ্গা ছায়াপথের ছোট সর্পিল-বাহুতে জলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্য নামক নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়েছে আমাদের সৌরজগৎ যেটি সবুজ গ্রহ পৃথিবীকে ধারণ করে । হ্যাঁ, সেখানেই আমাদের অবস্থান । হাওয়াইয়ান ভাষায় Laniakea নামের অর্থ হচ্ছে 'অমোঘ স্বর্গ' । Lani হচ্ছে 'স্বর্গ' এবং Akea হচ্ছে 'প্রশস্ত বা অপরিমেয়' । University of Hawaiʻi Kapiʻolani Community College এর হাওয়াইয়ান ভাষার সহযোগী অধ্যাপক Nawaʻa Napoleon সমুদ্রপথ সন্ধানকারী বা পলিনেশিয়ান নাবিকদের সম্মানার্থে Laniakea নামটি প্রস্তাব করেন, যারা আকাশের জ্ঞান ব্যবহার করে প্রশান্ত মহাসাগরের যাত্রাপথ বা অবস্থান নির্ণয় করতেন । এ দানব ছায়াপথ মহাস্তবকের আনুমানিক ভর হচ্ছে ১০১৭ সৌর ভরের সমান (১০০ কোয়াড্রিলিয়নেরও বেশি) । মহাস্তবকটি আকাশগঙ্গা ছায়াপথের ১০০০০০ গুণ, যা প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ জুড়ে বিস্তৃত আরেকটি বিশাল হোরোলজিয়াম রেটিকুলাম ছায়াপথ মহাস্তবকের সমতুল্য । সত্যিই, এক বিস্ময়কর আকার! তাই, আমাদের স্থানীয় ছায়াপথ গোষ্ঠীটি ল্যানিয়াকিয়ার হৃদয়ের দিকে টানছে । আশ্চর্যজনক এ ছায়াপথ মহাস্তবকটি চারটি উপভাগ নিয়ে গঠিত, যেটি পূর্বে আলাদা মহাস্তবক হিসেবে পরিচিত ছিল যেমন (ক) Virgo Supercluster: যে অংশে আকাশগঙ্গা ছায়াপথ থাকে (খ) Hydra–Centaurus Supercluster: [১] মহা আকর্ষক যেটি Norma এর কাছে ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকের কেন্দ্রীয় মহাকর্ষ বিন্দু [২] Antlia Wall যেটি Hydra Supercluster নামে পরিচিত [৩] Centaurus Supercluster (গ) Pavo–Indus Supercluster (ঘ) Southern Supercluster: [১] Fornax Cluster (S373) [২] Dorado এবং Eridanus cloud । মহাজাগতিক অনুপম সৌন্দর্যের অধিকারী ল্যানিয়াকিয়া ছায়পথ মহাস্তবকের আবিষ্কার, গ্যালাকটিক অবস্থান এবং বেগের পরিমাপ থেকে উদ্ভূত হয়েছে যে কিভাবে ছায়াপথগুলো কাছাকাছি বস্তুর ঘনত্ব ও মহাজগতের সামগ্রিক প্রসারণের সাথে সম্পর্কিত । অসীম মহাবিশ্বের এক ক্ষুদ্রতম অংশে ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকই আমাদের 'Home Supercluster’ । পরম বিস্ময়কর এ ছায়াপথ মহাস্তবকটির আশপাশে সবচেয়ে বড় ছায়াপথ স্তবকগুলো হচ্ছে: Virgo, Hydra (Abell 1060), Centaurus (A 3526), Abell 3565, Abell 3574, Abell 3521, Southern, Pavo- Indus, Fornax, Norma (ACO 3627 বা Abell 3627), Endorus, Pegasus, Puppis, Coma, Antlia, Cancer, Ursa Major এবং Eridanus । ধারণা করা হয়, সম্পূর্ণ ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকে প্রায় ৩০০ - ৫০০টি পরিচিত ছায়পথ স্তবক বা গুচ্ছ এবং দল বা গোষ্ঠী রয়েছে । তবে প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতে পারে, কারণ এর মধ্যে কিছু এড়িয়ে চলা অঞ্চল অতিক্রম করছে । এটি মহাকাশের এমন একটি এলাকা যা আংশিকভাবে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের গ্যাস ও ধূলিকণা দ্বারা অস্পষ্ট থাকার কারণে সেই অঞ্চলকে মূলত সনাক্ত করা যায় না । রহস্যেঘেরা প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যময় ছায়াপথ মহাস্তবকটি মহাবিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ কিছু কাঠামোর মধ্যে একটি এবং এটির যে সীমানা রয়েছে তা নির্দিষ্ট করা খুবই কঠিন, বিশেষ করে ভেতর থেকে । অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবক নিজেই মীন-সেটাস মহাস্তবকের এক জটিল উপাদানের অংশ (Pisces–Cetus Supercluster Complex) । গভীর মহাকাশে আধিপত্য বিস্তারকারী এক দুর্দান্ত ল্যানিয়াকিয়া মহাস্তবকটি একটি ছায়াপথ অংশু বা সূক্ষ্ম-সূত্র, যা অনেক বড় মহাকর্ষীয় কাঠামো তৈরি করে । একটি ছায়াপথ মহাস্তবকের মধ্যে বেশিরভাগ ছায়পথের গতি ও ভর কেন্দ্রের দিকে আকৃষ্ট করে অভ্যন্তরীণভাবে পরিচালিত হয় । তাই, ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকের ক্ষেত্রে এ মহাকর্ষীয় কেন্দ্রবিন্দুকে মহা আকর্ষক বলা হয়, যেটি ল্যানিয়াকিয়া মহাস্তবকের স্থানীয় গোষ্ঠীর গতিকে প্রভাবিত করে যেখানে আকাশগঙ্গা ছায়াপথ রয়েছে এবং ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবক জুড়ে বিদ্যমান অন্যান্য সকল ছায়াপথকেও । ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকের উপাদান বা গঠক বা নির্বাচন-কর্তা (Constituent) ছায়াপথ স্তবকগুলো থেকে ভিন্ন । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেন যে, অদ্ভুত ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকটি মহাকর্ষীয়ভাবে একে অপরের থেকে আবদ্ধ নয় । আপাত কাঠামোগুলো ক্ষণস্থায়ী । ল্যানিয়াকিয়া আশেপাশের অঞ্চলের তুলনায় অতিরিক্ত ঘনত্বের ছায়াপথ মহাস্তবক হিসেবে নিজেকে বজায় রাখার পরিবর্তে অন্ধকার শক্তি (Dark Energy) দ্বারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে বলে অনুমান করা হয় । তবে গবেষণায় প্রস্তাব করা হয় যে, লাল স্থানান্তর (Redshift) অনুযায়ী পরিচিত কয়েকটি মহাস্তবক যেমন: Vigro Supercluster এবং Hydra-Centaurus Supercluster সংযুক্ত হয়ে যেতে পারে । এ বিশাল মহাকাশে ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকের প্রতিবেশী অন্যান্য মহাস্তবকগুলো হচ্ছে: Shapley Supercluster (SCI 124), Southern Supercluster, Virgo Supercluster (LSC বা LS), Pavo-Indus Supercluster, Centaurus Supercluster (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), Perseus-Pisces Supercluster (SCI 40), Hercules Supercluster (SCI 160) (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), Coma Supercluster (SCI 117), Ursa Major Supercluster (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), Columba Supercluster (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), Piscis-Cetus Supercluster Complex (Galaxy filament), Horologium Supercluster (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), Hydra Supercluster (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), Leo Supercluster (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), Sextans Supercluster (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), Capricornus Supercluster (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), Bootes Supercluster (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), Sculptor Supercluster এবং Corona Borealis Supercluster (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে) । আমরা জানি, প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর পূর্বে একটি বৃহৎ পরমাণুর মহাশক্তিশালী মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাবিশ্বের উৎপত্তি হয় । পদার্থ, প্রতিপদার্থ, বিকিরণ এবং শক্তি ইত্যাদিতে মহাবিশ্ব পরিপূর্ণ ছিল; সমস্ত কণা ও ক্ষেত্র যা আমরা আজ জানি এবং সম্ভবত আরো বেশি । সেই মহাবিস্ফোরণের পর থেকে মহাবিশ্বের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সময়ের পরিমাপে লক্ষ লক্ষ বছর থেকে বিলিয়ন বছর অতিবাহিত হয়েছে । কিন্তু মহাবিশ্ব নিয়ে মানবজাতির কৌতূহলের অন্ত নেই । তাই, মানুষকে কাছে টানে । ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি দল ছায়াপথের আপেক্ষিক বেগ অনুযায়ী ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবককে সংজ্ঞায়িত করার সময় এর প্রতিবেশী কয়েকটি ছায়পথ মহাস্তবক এবং ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকের প্রান্ত সম্পর্কে স্পষ্টভাবে জানতে পারেনি । যদিও বর্তমানে এদের প্রান্ত এবং বাইরের কাঠামোর অধ্যয়ন উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে । ফলে মহাবিশ্ব জুড়ে পর্যবেক্ষণযোগ্য ছায়াপথ মহাস্তবকগুলো খুঁজে পাওয়া গেছে এবং নকশা বা তালিকা করা হয়েছে, যেখানে তারা বৃহত্তম পরিচিত ছায়পথ স্তবকের চেয়ে দশগুণ বেশি সমৃদ্ধ । দুর্ভাগ্যবশত, মহাবিশ্বে অন্ধকার শক্তির উপস্থিতির কারণে এ মহাস্তবকগুলো— আমাদের নিজস্বটিসহ শুধুমাত্র দৃশ্যমান কাঠামো । বাস্তবে, তারা আমাদের চোখের সামনে দ্রবীভূত হওয়ার প্রক্রিয়াতে নিছক কল্পনা । 

উৎস: উইকিপিডিয়া, www.scientificamerican.com 

ছবি: www.researchgate.net , www.sci.news । 

Monday, 28 April 2025

M51 ছায়াপথ

M51 হচ্ছে একটি সর্পিল ছায়াপথ । এটি The Whirlpool Galaxy নামেও পরিচিত । ছায়াপথটি একটি সাধারণ সর্পিল ছায়াপথের বৈশিষ্ট্যগুলোকে তুলে ধরে যার মধ্যে রয়েছে সুন্দর বাঁকানো বাহু, গোলাপী নক্ষত্র তৈরির অঞ্চল এবং উজ্জ্বল নীল নক্ষত্রগুচ্ছ । 

রাজকীয় M51 ছায়াপথের মনোমুগ্ধকর বাঁকানো বাহুগুলো মহাকাশের মধ্যে বিস্তৃত একটি বিশাল সর্পিল সিঁড়ির মতো দেখায় । আসলে এগুলো ধুলোয় আবৃত নক্ষত্র এবং গ্যাসের দীর্ঘ রেখা । এ ধরনের আকর্ষণীয় বাহুগুলো অভিজাত নকশার সর্পিল ছায়াপথগুলোর একটি বৈশিষ্ট্য । এর বাহুগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য সাধন করে যেমন: এগুলো নক্ষত্র গঠনের কারখানা, হাইড্রোজেন গ্যাস সংকুচিত করে এবং নতুন নক্ষত্রের গুচ্ছ তৈরি করে । 

কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানী মনে করেন যে NGC 5195 ছায়াপথের সাথে ঘনিষ্ঠ সংঘর্ষের প্রভাবের কারণে M51 ছায়াপথের বাহুগুলো বিশেষভাবে বিশিষ্ট, যেটি বাহুর বাইরের প্রান্তে অবস্থিত ছোট একটি হলুদাভ ছায়াপথ । মনোমুগ্ধকর ছবিতে গতিশীল M51 ছায়াপথটি মনে হচ্ছে বাহুতে টান দিচ্ছে এবং জোয়ারের স্রোতের শক্তি থেকে নতুন নক্ষত্র তৈরি করছে । এখানে স্পষ্ট দৃশ্য দেখায় যে, NGC 5195 ছায়াপথটি M51 ছায়াপথের পিছনে চলে যাচ্ছে । ঐ ছোট ছায়াপথটি লক্ষ লক্ষ বছর ধরে M51 ছায়াপথের পাশ দিয়ে হেঁটে চলছে । ছবিতে লাল রঙগুলো বিশাল নক্ষত্র তৈরির অঞ্চলের মধ্যে অবলোহিত আলোর পাশাপাশি হাইড্রোজেনকেও প্রতিনিধিত্ব করে । নীল রঙকে উষ্ণ ও তরুণ নক্ষত্রের জন্য দায়ী করা যেতে পারে, যেখানে হলুদ রঙ হচ্ছে বয়স্ক নক্ষত্র । 

১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি জ্যোতির্বিদ চার্লস মেসিয়ার M51 ছায়াপথটি আবিষ্কার করেন । এটি পৃথিবী থেকে ৩১ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে Canes Venatici নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত । মহাজাগতিক অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী M51 ছায়াপথের আপাত মাত্রা ৮.৪ এবং মে মাসে এটি খুব সহজেই দেখা যায় । এ ছায়াপথের সুন্দর মুখের দৃশ্য এবং পৃথিবীর সাথে ঘনিষ্ঠতা জ্যোতির্বিদদের একটি উচ্চ শ্রেণীর সর্পিল ছায়াপথের গঠন এবং নক্ষত্র তৈরির প্রক্রিয়াগুলো অধ্যয়ন করার সুযোগ করে দেয় । 

তথ্যসূত্র: www.science.nasa.gov 

ছবি: Stefan Muckenhuber ( AstroBin, Facebook page) । 

Monday, 21 April 2025

প্রাকৃতিক স্পেসারটাইন গারনেট স্ফটিক


পৃথিবীতে অনেক রত্ন ও ধাতু রয়েছে । বিভিন্ন প্রকার দুর্লভ রত্ন খুবই মূল্যবান । রত্নপাথর তার বৈচিত্র্যময় রঙ, অসাধারণ সৌন্দর্য, বিশুদ্ধতা, গুণগত মান ও দুষ্প্রাপ্যতার কারণে কখনো সে অমূল্য হয়ে থাকে । তবে সকল প্রকার স্বচ্ছ, সূক্ষ্ম ও রঙিন পাথরগুলো তাদের বিশুদ্ধতম অবস্থানে থাকলেও শুধুমাত্র ব্যতিক্রম হচ্ছে হীরক । হীরক খুবই কঠিন রত্ন । হীরকের কাঠিন্য ৮ থেকে ১০ । এ বর্ণহীন রত্নটি একটি মাত্র বিশুদ্ধ উপাদান কার্বন থেকে সৃষ্ট । পৃথিবীর বিচিত্র পাথরকে তার রঙ, স্বচ্ছতা এবং কঠোরতা দিয়ে পৃথকীকরণ করা হয় । রত্নপাথর মানুষের কাছে অন্যতম প্রিয় বস্তু । এ রত্নপাথর নিয়ে রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক কিংবদন্তি, এমনকি মর্মান্তিক রক্তপাতের ইতিহাস । একটি প্রাকৃতিক খনিজ স্ফটিক কেটে পালিশ করে রত্নপাথর অলংকার তৈরীতে ব্যবহৃত হয় । বর্তমানে বেশ আকর্ষণীয় কৃত্রিম রত্নপাথর পাওয়া যায় । প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ অলংকার হিসেবে রত্নপাথর ব্যবহার করে আসছে । রত্নপাথর সৌভাগ্যের প্রতীক এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে । এর উজ্জ্বলতা এবং অদ্ভুত রঙ মানুষকে মুগ্ধ ও আকৃষ্ট করে । কিছু রত্নপাথর মানুষকে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী করে তোলে । জ্যোতিষীশাস্ত্রে রাশিফলের ক্ষেত্রে রত্নপাথর খুবই গুরুত্ব বহন করে । মানুষের বিশ্বাস অনুসারে পবিত্র রত্নপাথরকে অত্যন্ত শক্তিশালী বলে মনে করা হয় । মূল্যবান রত্নপাথর একটি দেশের শিল্প, ইতিহাস, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে বিশেষ ভুমিকা রাখে ।

সিলিকন (Silicone) একটি প্রতিক্রিয়াহীন মৌল । এর প্রতীক হচ্ছে Si এবং পারমাণবিক সংখ্যা ১৪ । এটি পৃথিবীর ভূত্বকে অক্সিজেনের পর দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রাপ্ত মৌল । সিলিকন বিশুদ্ধ অবস্থায় প্রকৃতিতে খুব কমই পাওয়া যায় । এটি শক্ত, ভঙ্গুর এবং সহজে চেপ্টা করা যায় । সিলিকন কক্ষ তাপমাত্রায় কঠিন পদার্থ এবং এর গলনাঙ্ক ১৪১৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস ও হিমাঙ্ক ৩২৬৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস । সিলিকনের একটি উল্লেখযোগ্য উপাদান উদ্ভিদের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় এবং বিপাকীয় প্রক্রিয়ার জন্য অপরিহার্য । বিভিন্ন বৈদ্যুতিক ট্রানজিস্টর, সৌর কোষ ও ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট ইত্যাদিতে সিলিকনকে বহুমুখী প্রয়োগ করা হয় । এর পলিমার অণু বা ম্যাক্রোমোলিকিউল অনেক উপাদান তৈরি করে । বেশিরভাগ সিলিকনকে আলাদা না করে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হয় । উৎপাদন, প্রযুক্তিগত এবং শৈল্পিক প্রয়োজনের জন্য নানা ক্ষেত্রে বহুমুখী উপকরণ হিসেবে প্রাকৃতিক (যেমন: গ্রানাইট, নুড়ি এবং গারনেট ) এবং কৃত্রিম (যেমন: পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট, জিওপলিমার সিমেন্ট, সিরামিক এবং কাচ শিল্পে যা পানিতে দ্রবণীয় বর্ণহীন স্বচ্ছ কঠিন পদার্থ বা সাদা গুঁড়ো সোডিয়াম সিলিকেট হিসেবে) উভয় ভাবেই সিলিকন ব্যবহৃত হয় । সিলিকন আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে । সিলিকন মূলত ধুলি, বালি, মহাজাগতিক ধূলিকণা, গ্রহাণুপুঞ্জ, গ্রহসমূহ এবং ধূমকেতুতে সিলিকনের অক্সাইড (সিলিকা) বা সিলিকেট আকারে থাকে । সিলিকেট (Silicate) হচ্ছে সিলিকন এবং অক্সিজেন সমন্বিত বহু-পরমাণু আয়ন বা আণবিক আয়ন (পলিঅ্যাটমিক আয়ন যেমন: অর্থোসিলিকেট, মেটাসিলিকেট, পাইরোসিলিকেট) পরিবারের যেকোনো সদস্য । এটি সিলিকন এবং অক্সিজেনের সাথে মিলিত ধাতু দিয়ে তৈরি একটি প্রাকৃতিক খনিজ । সিলিকেট সাধারণত রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকে বলেই খনিজ হিসেবে পাওয়া যায় । সিলিকেট মূলত শিলা, বালি, কাদামাটি, মাটি, গ্রানাইট, ইট, সিমেন্ট, সিরামিক এবং কাচের মধ্যে পাওয়া যায় । সিলিকেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ সিমেন্ট, সিরামিক এবং কাচ শিল্পগুলো তাদের রাসায়নিক গঠনের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয় । সিলিকেট নামটি কখনো কখনো সিলিকন ধারণকারী যেকোনো আয়নের জন্যও ব্যবহৃত হয় । 

তামড়ি পাথর (Garnet stone) হচ্ছে সিলিকেট খনিজ পদার্থের একটি দল যেটি ব্রোঞ্জ যুগ থেকে রত্নপাথর হিসেবে এবং মসৃণ-সুন্দর কাজ করার জন্য ঘষে তুলে ফেলতে সক্ষম এমন পদার্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে । গারনেট অর্থ গাঢ় লাল । এটি মূলত স্বচ্ছ ও গাঢ় লাল রঙের একটি প্রাকৃতিক উপ-রত্নপাথর । ভারতীয় সাহিত্যে হ্যাসোনাইট গারনেটকে গোমেদ বলা হয় । গোমেদ হচ্ছে জটিল সিলিকেট খনিজ । বিভিন্ন শিলায় নানা জাতের গারনেট পাওয়া যায় । গারনেটের বিভিন্ন রঙ ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে । গারনেট খনিজের নানা রঙ যেমন: কমলা, হলুদ, বাদামী, বেগুনি, গোলাপী, কালো এবং বর্ণহীন । গারনেটের একটি আইসোমেট্রিক (ঘনক) স্ফটিক কাঠামো রয়েছে । দানাদার, পূঞ্জীভূত এবং পিণ্ড আকারে এটি পাওয়া যায় । গারনেট কণা হিসেবেও পাওয়া যেতে পারে । গারনেটের স্ফটিক বা কণা সূর্যের আলোতে দারুণ চকচক করে । রত্নকার এটিকে পালিশ করলে বেশ দীপ্তিমান হয়ে ওঠে । প্রকৃতিতে সচরাচর নিষ্প্রভ স্ফটিক পাওয়া যায় । কেনিয়া, তানজানিয়া, রাশিয়া, নামিবিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারত এবং মাদাগাস্কার প্রভৃতি দেশে এটি পাও‌য়া যায় । গারনেটের কাঠিন্য হচ্ছে ৬.৫ থেকে ৭.৫, আপেক্ষিক গুরুত্ব ৩.৫ থেকে ৪.২ এবং প্রতিসরাঙ্ক ১.৭২ থেকে ১.৯৪ । গারনেট মাঝারি ধরণের তাপ সহ্য করতে পারে । কিন্তু কাটার ক্ষেত্রে বা বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের সময় এটি চরম তাপমাত্রার সংস্পর্শে এলে ফেটে যেতে পারে কিংবা তার উজ্জ্বলতা হারাতে পারে । গারনেটের রঙ গোলাপী-লাল, গাঢ় লাল, খয়েরি, হালকা হলুদ, কালো, হালকা সবুজ, উজ্জ্বল সবুজ অথবা বর্ণহীন । গারনেট দলটি রঙের বর্ণালীকে বিস্তৃত করে এবং গাঢ় লাল ও সূক্ষ্ম কমলা থেকে শুরু করে হলুদ, সবুজ, বেগুনি, এমনকি বিরল নীল রঙে পরিণত হয় । কমলা রঙের গারনেট সোডিয়াম সমৃদ্ধ পেগমাটাইট থেকে উৎপন্ন হয় । শক্ত কাঠ, কাচ, চামড়া, শক্ত রাবার, বিভিন্ন প্রকার ধাতব দ্রব্য, সেলুলয়েড জাতীয় দ্রব্যসামগ্রী এবং শিরিষ কাগজ বা কাপড় হিসেবে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় । গারনেটকে আর্থ্রাইটিস রোগ, ভ্যারিকোজ শিরা এবং পিঠের ব্যথার জন্য সহায়ক বলে মনে করা হয় ।

স্পেসারটাইন (Spessartine) [Mn2+3Al2(SiO4)3] হচ্ছে একটি নিসোসিলিকেট, ম্যাঙ্গানিজ অ্যালুমিনিয়াম গারনেট প্রজাতি । এ খনিজটিকে কখনো কখনো ভুল করে গাঢ় রঙের আগ্নেয় শিলা ল্যাম্প্রোফায়ার বা স্পেসারটাইট বলা হয় । নেসোসিলিকেট বা সিলিকেট খনিজ হচ্ছে একটি অজৈব যৌগ যেটি শিলা-গঠনকারী খনিজ যা সিলিকেট দল দিয়ে তৈরি । এগুলো খনিজ পদার্থের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণী যা পৃথিবীর ভূত্বকের প্রায় ৯০ শতাংশ (সিলিকেট যৌগ দ্বারা) তৈরি করে । সিলিকা এর স্ফটিক রূপগুলোকে (সিলিকন ডাই অক্সাইড বা SiO2 ) সাধারণত টেকটোসিলিকেট হিসেবে বিবেচনা করা হয় । সিলিকা প্রকৃতিতে খনিজ কোয়ার্টজ এবং এর বহুরূপ হিসেবে পাওয়া যায় । পৃথিবীতে কোটি কোটি বছর ধরে ভূত্বক গঠন এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার ফলে আরো বিস্তৃত পরিসরে বিভিন্ন ধরণের সিলিকেট খনিজ পদার্থের সংমিশ্রণ ঘটে । এ প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে রয়েছে আংশিক গলন, স্ফটিকীকরণ, ভগ্নাংশকরণ, রূপান্তর, আবহাওয়া এবং ডায়াজেনেসিস । জীবন্ত প্রাণীরাও এ ভূতাত্ত্বিক চক্রে অবদান রাখে । উদাহরণস্বরূপ, ডায়াটম নামে পরিচিত এক ধরণের প্লাঙ্কটন সমুদ্রের জল থেকে নিষ্কাশিত সিলিকা থেকে তাদের বহিঃকঙ্কাল (ফ্রাস্টুলস) তৈরি করে । মৃত ডায়াটমের ফ্রাস্টুলস গভীর সমুদ্রের পলি এবং ডায়াটোমাসিয়াস পৃথিবীর একটি প্রধান উপাদান । স্পেসারটাইন নামটি জার্মানির দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত বাভারিয়া রাজ্যের অ্যাসচাফেনবার্গ শহরের পূর্বে স্পেসার্ট পর্বতমালা থেকে উদ্ভূত, যেখানে এটি প্রথম আবিষ্কৃত হয়েছিল এবং এখান থেকেই এ খনিজটির নামকরণ হয়েছে । রঙ ও স্বচ্ছতার জন্য এটি একটি আধা-মূল্যবান রত্ন বা স্ফটিক । স্পেসারটাইন বিরল হওয়ার কারণে গয়না তৈরিতে খুব কমই ব্যবহৃত হয় । এটি সাধারণত গ্রানাইট, ফাইলাইট, ফেলসিক লাভা, পেগমেটাইট শিরা এবং রূপান্তরিত শিলাতে সৃষ্টি হয় । অস্ট্রেলিয়া, মায়ানমার, ভারত, আফগানিস্তান, ইসরায়েল, মাদাগাস্কার, নামিবিয়া, নাইজেরিয়া, মোজাম্বিক, তানজানিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্পেসারটাইন পাওয়া যায় । মাদাগাস্কারের সাহাতানি উপত্যকার উচ্চভূমিতে অবস্থিত শিলাস্তরে এবং দক্ষিণ মাদাগাস্কারের মায়েভাতানা অঞ্চলের পলিমাটিতে কমলা-হলুদ রঙের স্পেসারটাইন পাওয়া যায়, যেটিকে ম্যান্ডারিন গারনেট বলে । স্পেসারটাইন গারনেট হচ্ছে একটি উজ্জ্বল কমলা থেকে লালচে-কমলা রঙের রত্নপাথর যেটি তার অনন্য রঙ এবং কঠোরতার জন্য পরিচিত । এটি একটি ম্যাঙ্গানিজ অ্যালুমিনিয়াম গারনেট, যার অর্থ হচ্ছে এটির রঙ ম্যাঙ্গানিজের উপস্থিতি থেকে উদ্ভূত । উজ্জ্বল কমলা স্পেসারটাইনগুলোকে প্রায়শই 'ম্যান্ডারিন গারনেট' বলা হয় । যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো এবং মেইন রাজ্যের রাইওলাইট আগ্নেয়শিলায় বেগুনি-লাল স্পেসারটাইন পাওয়া যায় । স্পেসারটাইন খনিজ পদার্থটি গারনেট প্রজাতির অ্যালম্যান্ডিনের সাথে মিলিত হয়ে এটির রঙ ফ্যাকাশে কমলা হলুদ থেকে শুরু করে প্রায় বিশুদ্ধ হয়ে কমলা এবং গাঢ় লাল হয় । উজ্জ্বল কমলা রঙ থেকে লালচে-কমলা রঙ এটিকে সাধারণ গারনেট জাত থেকে আলাদা করে এক প্রাণবন্ত ও স্বতন্ত্র রত্নপাথর করে তোলে । স্পেসারটাইন একটি অবিচ্ছিন্ন কঠিন দ্রবণ সিরিজ গঠন করে । এ সিরিজের সুগঠিত স্ফটিকগুলো খুব গাঢ়-লাল থেকে উজ্জ্বল হলুদ-কমলা রঙের হয় যা বুলগেরিয়ার কার্দজালি প্রদেশের রোডোপ পর্বতমালার ল্যাটিঙ্কায় পাওয়া গেছে । অন্যান্য গারনেটের মতো স্পেসারটাইন সর্বদা অন্য প্রজাতির সাথে মিশ্রিত হয় । উচ্চ স্পেসারটাইনযুক্ত রত্নগুলো হালকা কমলা রঙের দিকে ঝুঁকে, অন্যদিকে অ্যালম্যান্ডিনের প্রাদুর্ভাব লাল বা বাদামী রঙের সৃষ্টি করে । রত্নপাথরের সৌন্দর্য, নান্দনিকতা এবং বৈশিষ্ট্যের জন্য অনেক রত্নপ্রেমী বিশ্বাস করেন যে এটি উদ্দীপনা, সৃজনশীলতা, মানসিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, কর্কটরোগ থেকে মুক্তি, রক্ত পরিস্কার, সুস্থতা, অর্থনৈতিক মুক্তি, দুঃখ-দুর্দশা হ্রাস এবং যৌক্তিক চিন্তাভাবনাকে উৎসাহিত করে সাহস ও উদ্ভাবনী সমাধানের মাধ্যমে এক প্রাণবন্ত জীবনের জন্য চ্যালেঞ্জগুলোকে কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করে ।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, ব্রিটানিকা, আন্তর্জাল । 

ছবি: Amazing Geologist (Image by: Masha Milshina CC) [চীন থেকে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক স্পেসারটাইন গারনেট স্ফটিক] । 



Saturday, 19 April 2025

ভিনগ্রহে প্রাণের সম্ভাবনা


আমাদের সৌরজগতের বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে মহাকাশ বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের অন্ত নেই । এ অপার মহাবিশ্বে আমরা কি একা? যদিও সৌরজগতের পৃথিবী গ্রহের চাঁদ, লোহিত মঙ্গল, প্রেম ও সৌন্দর্যের দেবী শুক্র এবং সর্ববৃহৎ গ্যাস দানব বৃহস্পতি গ্রহের বরফাচ্ছাদিত চাঁদে জীবন বা প্রাণের জন্য অনুকূল পরিবেশ ও লক্ষণ রয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন যাবৎ বলিষ্ঠ দাবি করে আসছেন । পৃথিবী ছাড়া মহাবিশ্বের অন্য কোনো প্রান্তে কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে কি-না তা খুঁজতে গিয়েই সৌরজগতের বাইরে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৮০০টি বহিঃসৌর গ্রহ বা ভিনগ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে । সৌরজগতের বাইরে বিশাল মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা এমন গ্রহকে বহিঃসৌর গ্রহ (Exoplanet) বলে, যেটি পৃথিবীর মতোই অন্য কোনো একটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে । এ সকল বহিঃসৌর গ্রহের কোনোটিতে জীবাণু বা অণুজীবের বসবাসযোগ্য মহাসাগর রয়েছে যেখানে হাইড্রোজেন সমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল বিদ্যমান । কিন্ত, বহিঃসৌর গ্রহগুলোর বেশিরভাগেই প্রাণ বা জীবন থাকা একেবারেই অসম্ভব । যেহেতু এ গ্রহগুলো তাদের স্বাগতিক নক্ষত্রের এতোই কাছাকাছি অবস্থিত যে, সেখানে চরম তাপমাত্রার কারণে জীবনের উদ্ভব মোটেই সম্ভব নয় । তবে, স্বাগতিক নক্ষত্রকে কেন্দ্র করা প্রদক্ষিণরত কোনো কোনো দূরবর্তী গ্রহে তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ার কারণে সেখানে প্রাণ বা জীবন উদ্ভবের সম্ভাবনা অনেক বেশি রয়েছে ।
সম্প্রতি সৌরজগতের বাইরে একটি বহিঃসৌর গ্রহে প্রাণ থাকার সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রমাণ মহাকাশ বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন । নাসা এর জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে আমাদের সৌরজগৎ থেকে প্রায় ১২৪ আলোকবর্ষ (৩৮ পারসেক) দূরে K2-18b নামক বহিঃসৌর গ্রহের বায়ুমণ্ডলে প্রাণের সম্ভাব্য রাসায়নিক চিহ্ন ডাইমিথাইল সালফাইড এবং ডাইমিথাইল ডিসালফাইড যৌগের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে যেগুলো পৃথিবীতে শুধুমাত্র জীবিত প্রাণী বা উদ্ভিদ থেকেই জন্ম নেয় । সাধারণত সামুদ্রিক ফাইটোপ্লাঙ্কটন বা উদ্ভিদ প্লাঙ্কটন হচ্ছে অটোট্রফিক (স্ব-ভোজী) অণুজীব বা প্রাকৃতিকভাবে তৈরি অতিক্ষুদ্র সবুজ কণা বা জীবকণা যেটি মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় (যেমন: শেওলা, নষ্টক, এনাবিনা ইত্যাদি) যেগুলো পৃথিবীতে পাওয়া যায় । আশ্চর্যের বিষয় যে, এ রাসায়নিক যৌগ পৃথিবীর তুলনায় ২০ গুণ বেশি পরিমাণে সেখানে পাওয়া গেছে । মহাজাগতিক বিস্ময়ের অধিকারী K2-18b বা EPIC 201912552b বহিঃসৌর গ্রহটি গ্যাসীয় বরফ দৈত্য উপ-নেপচুন গ্রহের মতোই । এটি সিংহ রাশির নক্ষত্রমণ্ডলে (Leo constellation) অবস্থিত । গ্রহটি পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ৯ গুণ ভারী এবং ২.৬ গুণ বড় । জলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্যের চেয়ে ছোট, কম আলোকিত, শীতল এবং লাল বামন K2-18 নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে প্রতি ৩৩ দিনে গ্রহটি পরিভ্রমণ করছে । নতুন আবিষ্কৃত গ্রহটি স্বাগতিক নক্ষত্র থেকে বাসযোগ্য অঞ্চলের (Habitable zone) মধ্যে অবস্থিত, ফলে সেই পরিবেশে প্রাণ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে যেখানে সূর্য থেকে পৃথিবী যে পরিমাণ আলো পায় সেই পরিমাণ আলো এ গ্রহটিও পেয়ে থাকে । এছাড়া, ঐ নক্ষত্রের কক্ষপথের ভিতরে K2-18c নামে আরো একটি গ্রহ রয়েছে । উল্লেখ্য যে, বিজ্ঞানীরা ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে হাবল মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে K2-18b গ্রহের বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের সন্ধান পেয়েছিলেন এবং তখন থেকেই সৌরজগতের বাইরে এ বহিঃসৌর গ্রহটিকে সবচেয়ে বাসযোগ্য গ্রহ হিসেবে বিবেচনা করা হয় । পরবর্তীতে দেখা যায় যে, গ্রহটিতে মূলত মিথেন গ্যাসের একটি আবরণ ছিল । যদিও বিজ্ঞানীরা মনে করেন, K2-18b হচ্ছে একটি হাইসিয়ান জগৎ । এ গ্রহের হাইড্রোজেনপূর্ণ বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে মিথেন ও কার্বন ডাই অক্সাইড রয়েছে এবং অ্যামোনিয়া গ্যাস পরিমাণে কম থাকায় সেখানে মহাসাগর থাকতে পারে যেখানে রয়েছে এক প্রকার আণুবীক্ষণিক এককোষী অণুজীব বা জীবাণু । এ মহাসাগরই হচ্ছে জীবনের মূল উপাদান । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, আবিষ্কৃত গ্রহের বায়ুমণ্ডলে এ সকল যৌগের উপস্থিতির কারণে সেখানে প্রাণ থাকার জোরালো ইঙ্গিত দিচ্ছে । সুতরাং, সৌরজগতের বাইরে প্রাণের সন্ধান এটি একটি যুগান্তকারী অগ্রগতি বলে বিবেচিত হচ্ছে ।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, আনন্দবাজার, প্রথম আলো, উইকিপিডিয়া ।

Thursday, 10 April 2025

বৃহস্পতি গ্রহের আইও চাঁদ


জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের লালিত বাসনা যে, সূর্য থেকে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন মাইল দূরে থাকা বৃহস্পতি গ্রহ, তার হীমশীতল চাঁদে নোনা জলের সমুদ্র, প্রাণের অস্তিত্ব এবং  বসবাসযোগ্যতার লক্ষণগুলোকে অন্বেষণ করা ৷ এছাড়া, বিজ্ঞানীদের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে পৃথিবীর চাঁদে প্রাণের অস্তিত্বের পাশাপাশি বাসযোগ্যতার বিষয়টি ৷ আমরা ছোট একটি পাথুরে গ্রহ পৃথিবীতে বাস করি । এ বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে বিদ্যমান দুই ট্রিলিয়ন ছায়াপথের মধ্যে একটি ছায়াপথ হচ্ছে আমাদের নিজস্ব ছায়াপথ আকাশগঙ্গা । আকাশগঙ্গায় প্রায় ৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে তার মধ্যে একটি নক্ষত্র সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে পৃথিবী । প্রতিটি ছায়াপথে শত শত কোটি নক্ষত্র এবং অসংখ্য গ্রহ-উপগ্রহ রয়েছে ট্রিলিয়ন কিলোমিটার দূরে । আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রের খুব কাছের নক্ষত্রটি হচ্ছে জলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্য ৷ এ সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে ৮টি গ্রহ, ৫টি বামন গ্রহ (যেমন: Pluto, Haumea, Eris, Makemake এবং Ceres), অগণিত গ্রহাণুপুঞ্জ, উল্কা এবং ধূমকেতু ইত্যাদি ৷ সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহ বৃহস্পতি এবং গ্রহদের রাজা । একজন প্রাচীন রোমান দেবতার নামে এর নামকরণ হয়েছে । সূর্য থেকে পঞ্চম দূরত্বে ৭৭.৮৪ কোটি কিলোমিটার দূরে বৃহস্পতির অবস্থান । পৃথিবী থেকে বৃহস্পতির দূরত্ব প্রায় ৮০ কোটি কিলোমিটার । বৃহস্পতি একটি গ্যাস দৈত্য গ্রহ ৷ কঠিন পদার্থের পরিবর্তে গ্যাস এবং তরল দ্বারা এটি গঠিত । বৃহস্পতির উপরিতল সম্পূর্ণ বরফে ঢাকা । তাই গ্যাসীয় পদার্থ জমাট বেঁধে এ বৃহৎ দৈত্যাকার গ্রহটি তৈরি হয়েছে । বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, ৪৬৫ কোটি বছর পূর্বে সূর্য জন্ম নেয়ার পরপরই গ্রহগুলো আবির্ভূত হয়েছিল । এদের মধ্যে সর্বপ্রথমে জন্ম নেয় বৃহস্পতি গ্রহ ৷ বৃহস্পতির ভর সৌরজগতের অন্য সকল গ্রহগুলোর ভরকে একত্রিত করলে তার থেকে আড়াই গুণ বেশি (ভর ১.৯০ * ১০২৭ কিঃগ্রাঃ) । এতোই বিশাল যে সূর্যের সাথে এর বেরিকেন্দ্র (Barycentre) সূর্যের কেন্দ্র থেকে ১.০৬৮ সৌর ব্যাসার্ধে সূর্যের পৃষ্ঠের উপরে অবস্থিত । কিন্তু সূর্যের ভরের ১০৪৭ ভাগের এক ভাগ থেকে সামান্য কম । অর্থাৎ বৃহস্পতির ভর আর একটু বেশি হলেই এর আভ্যন্তরীণ মহাকর্ষ হাইড্রোজেন পরমাণুগুলোকে নিষ্ক্রিয় গ্যাস হিলিয়ামে পরিণত করার পাশাপাশি ফোটন আলোক কণা উৎপাদন করতো । তার মানে, বৃহস্পতি একটি নক্ষত্রে পরিণত হতো । বৃহস্পতি গ্রহটি পৃথিবীর চেয়ে অনেক বড় এবং যথেষ্ট কম ঘন । বৃহস্পতি গ্রহের আয়তন পৃথিবীর ১৩২১ গুণ কিন্তু ভর মাত্র ৩১৮ গুণ । এ বৃহত্তম গ্রহটির ব্যাস নিরক্ষরেখা বা বিষুবরেখা বরাবর ১৪২৯৮৪ কিলোমিটার (৮৮৮৪৬ মাইল) । বৃহস্পতির গড় ঘনত্ব প্রতি ঘনসেন্টিমিটারে ১.৩২৬ গ্রাম, যা বৃহৎ গ্যাসীয় গ্রহগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ । সৌরজগতের গ্যাসীয় দানব নেপচুন গ্রহের ঘনত্ব সর্বোচ্চ । বৃহস্পতি হচ্ছে পৃথিবীর চাঁদ এবং শুক্র গ্রহের পরেই পৃথিবী থেকে রাতের আকাশে দৃশ্যমান মহাজাগতিক তৃতীয় উজ্জ্বল প্রাকৃতিক বস্তু ৷ গ্যাস দানব বৃহস্পতি এতোটাই বিশাল যে সৌরজগতের অন্য সমস্ত গ্রহগুলো এর ভিতরে সুন্দরভাবে মানানসই বা জায়গা করে নিতে পারে । এটি প্রায় ১৩০০ টিরও বেশি পৃথিবীর সমান । বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুন গ্রহ চারটিকে একত্রে জোভিয়ান গ্রহ বলে । বৃহস্পতি গ্রহকে প্রদক্ষিণকারী ৯৫টি উপগ্রহ বা চাঁদের মধ্যে চারটি হচ্ছে গ্যালিলীয় চাঁদ যেমন: ইউরোপা (Europa), ক্যালিস্টো (Callisto), আইও (Io) এবং গ্যানিমিড (Ganymede) । এ চাঁদগুলোর কোনোটি তার বরফ পৃষ্ঠের নিচে গভীর তরল জলের মহাসাগরকে আশ্রয় দেয়, যেখানে সামুদ্রিক প্রাণ থাকতে পারে । ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ এবং দার্শনিক গ্যালিলিও গ্যালিলি ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম এ চারটি চাঁদকে আবিষ্কার করেন বলেই তার নামানুসারে চাঁদগুলোর নামকরণ হয় গ্যালিলীয় চাঁদ । 

বৃহস্পতি গ্রহের চারটি গ্যালিলিয়ান চাঁদের মধ্যে সবচেয়ে ভেতরের এবং দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম চাঁদ হচ্ছে আইও । সম্ভবত একই বছর জার্মান জ্যোতির্বিদ সাইমন মারিয়াস স্বাধীনভাবে পুনরায় আইও চাঁদটি আবিষ্কার করেন এবং গ্রীক পৌরাণিক চরিত্র ও কিংবদন্তী আইও এর নামে এ চাঁদটির তিনি নামকরণ করেছিলেন । আইও হচ্ছেন প্রাচীন গ্রীক ধর্মে হেরার একজন ধর্মযাজিকা যিনি দেবরাজ জিউসের প্রেমিকাদের একজন । আইও চাঁদ পৃথিবীর চাঁদের চেয়ে সামান্য বড় । এর গড় ব্যাসার্ধ ১৮২১.৩ কিলোমিটার ( ১১৩১.৭ মাইল) । ভর ৯১২৮.৪০ কেজি । আইও চাঁদের গড় ঘনত্ব প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে প্রায় ৩.৫২ গ্রাম যা শিলার বৈশিষ্ট্য, কিন্তু বরফের নয় । আইও চাঁদ হচ্ছে সৌরজগতের চতুর্থ বৃহত্তম প্রাকৃতিক চাঁদ এবং এর সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব ও শক্তিশালী পৃষ্ঠের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি রয়েছে । আইও চাঁদের উচ্চ ঘনত্ব এবং সৌরজগতের যেকোনো পরিচিত বস্তুর তুলনায় এ চাঁদে সর্বনিম্ন পরিমাণে জল রয়েছে । যদিও জলীয় বরফ বা জলীয় খনিজ পদার্থের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ এ চাঁদের গিশ বার মনস পর্বতের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে শনাক্ত করা হয়েছে । জলের এ স্বল্পতা বা অভাবে সম্ভবত সৌরজগতের বিবর্তনের প্রথম দিকে বৃহস্পতি গ্রহ যথেষ্ট উত্তপ্ত ছিল যা আইও চাঁদের আশেপাশের জলের মতো উদ্বায়ী পদার্থগুলোকে তাড়িয়ে দিয়ে থাকতে পারে । তবে হয়তো, এতোটা উত্তপ্ত ছিল না যে চাঁদটি আরো দূরে যেতে পারে । আইও চাঁদ বৃহস্পতির চারপাশে সমান্তরালভাবে ঘুরছে (১.৭৬৯ পৃথিবী দিন) এবং যার একটি মুখ সর্বদা বৃহস্পতির দিকে থাকে । বৃহস্পতির কেন্দ্র থেকে ৪২১৭০০ কিলোমিটার (২৬২০০০ মাইল) এবং মেঘের চূড়া থেকে ৩৫০০০০ কিলোমিটার (২১৭০০০ মাইল) দূরে আইও চাঁদ বৃহস্পতি গ্রহকে প্রদক্ষিণ করে । বৃহস্পতি গ্রহের চারপাশে একটি কক্ষপথ সম্পূর্ণ করতে আইও চাঁদের প্রায় ৪২.৫ ঘন্টা (১.৭৭ দিন) সময় লাগে । আইও চাঁদ এবং জোভিয়ান চাঁদ ইউরোপার মধ্যে মহাকর্ষীয় অনুরণনের কারণে কক্ষপথটি কিছুটা অদ্ভুত বা বিকেন্দ্রীকরণ হতে বাধ্য হয় । এ জোরপূর্বক অদ্ভুততা বা খামখেয়ালীপনার কারণে বৃহস্পতির শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মাধ্যমে আইও চাঁদের তীব্র জোয়ারের টানে তাপ উৎপন্ন হয় যা চাঁদের ক্রমাগত নমনের কারণে অভ্যন্তরীণ ঘর্ষণ থেকে ঘটে এবং যেটি আগ্নেয়গিরিগুলোকে শক্তি প্রদানকারী শক্তির উৎস । বৃহস্পতির চাঁদ আইও এর বায়ুমণ্ডল অত্যন্ত পাতলা এবং প্রধানত সালফার ডাই অক্সাইড, সালফার মনোক্সাইড, সোডিয়াম ক্লোরাইড, পারমাণবিক সালফার ও অক্সিজেনসহ গৌণ উপাদান রয়েছে । আইও চাঁদ গ্রহনকালে মেরুপ্রভার (Aurora) মতো আভা প্রকাশ করে । পৃথিবীর মতোই এটি বায়ুমণ্ডলে কণা বিকিরণের আঘাতের কারণে ঘটে থাকে । যদিও এ ক্ষেত্রে চার্জিত কণাগুলো সৌর বায়ুর পরিবর্তে বৃহস্পতির চৌম্বক ক্ষেত্র থেকে আসে । মেরুপ্রভা সাধারণত গ্রহের চৌম্বক মেরুর কাছে ঘটে । তবে আইও চাঁদের মেরুপ্রভাগুলো এর বিষুবরেখার কাছে সবচেয়ে উজ্জ্বল রূপ ধারণ করে । আইও চাঁদের নিজস্ব কোনো অন্তর্নিহিত চৌম্বক ক্ষেত্র নেই । তাই, আইও চাঁদের কাছাকাছি বৃহস্পতির চৌম্বকক্ষেত্র বরাবর ভ্রমণকারী ইলেকট্রনগুলো সরাসরি আইও চাঁদের বায়ুমণ্ডলকে প্রভাবিত করে । আর এ ইলেকট্রনগুলোই চাঁদের বায়ুমণ্ডলের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, যার ফলে সবচেয়ে উজ্জ্বল অনন্য সুন্দর মেরুপ্রভা তৈরি হয় । আইও চাঁদের পৃষ্ঠে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মুখ, গভীর অংশ এবং লাভার ঘনীভূত প্রবাহ রয়েছে । ৫০০ কিলোমিটারের (৩০০ মাইল) বেশি দৈর্ঘ্যের অসংখ্য বিস্তৃত লাভা প্রবাহও পৃষ্ঠে দেখা যায় । আইও চাঁদের পৃষ্ঠের বেশিরভাগ অংশই সিলিকেট (যেমন অর্থোপাইরক্সিন), সালফার এবং সালফার ডাই অক্সাইডের দ্বারা হিমশীতল আবরণসহ বিস্তৃত সমভূমি গঠিত । মূলত এ সকল যৌগের জমা থাকার কারণে চাঁদটি চমৎকার, প্রাণবন্ত, উজ্জ্বল ও রঙিন ভূদৃশ্যে আবির্ভূত হয় । আইও চাঁদের আগ্নেয়গিরিময়তা অনেক অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী । চাঁদের আগ্নেয়গিরির শিখা এবং লাভা প্রবাহ পৃষ্ঠের উপর বিশাল পরিবর্তন আনে এবং পৃষ্ঠকে হলুদ, লাল, সাদা, কালো এবং সবুজ রঙের বিভিন্ন সূক্ষ্ম ছায়ায় রঙ করে, যা মূলত অ্যালোট্রপ (Allotrope) এবং সালফার যৌগের কারণে । ভূতাত্ত্বিকভাবে চাঁদের তরুণ পৃষ্ঠে আঘাতজনিত গর্তের কোনো প্রমাণ নেই । এখানে আগ্নেয়গিরির প্রবাহ এতোটাই বিস্তৃত এবং ঘন ঘন যে, তারা প্রতি কয়েক হাজার বছরে সমগ্র চাঁদটিকে কয়েক মিটার গভীরতায় পুনরুজ্জীবিত করছে । ভূত্বকের নিচে গলিত শিলার একটি স্তর এবং প্রায় ১৮০০ কিলোমিটার (১১১০ মাইল) ব্যাসের গলিত লোহা ও লোহা সালফাইডের একটি কেন্দ্রস্থল রয়েছে যার ব্যাস প্রায় ১৮০০ কিলোমিটার (১১১০ মাইল), ফলে এটি সিলিকেট শিলা দ্বারা গঠিত । আইও চাঁদ ভূতাত্ত্বিকভাবে সৌরজগতের সবচেয়ে আগ্নেয়গিরির দিক থেকে সক্রিয়, যেখানে শত শত আগ্নেয়গিরি রয়েছে । এ চরম ভূতাত্ত্বিক কার্যকলাপটি বৃহস্পতি এবং অন্যান্য গ্যালিলিয়ান চাঁদ ইউরোপা, গ্যানিমেড এবং ক্যালিস্টোর মধ্যে আকর্ষণ বা টানের কারণে আইও চাঁদের অভ্যন্তরে সৃষ্ট ঘর্ষণ থেকে জোয়ারের উত্তাপের ফলে এটি ঘটে থাকে । বেশ কয়েকটি আগ্নেয়গিরি পৃষ্ঠ থেকে ৫০০ কিলোমিটার (৩০০ মাইল) পর্যন্ত সালফার এবং সালফার ডাই অক্সাইডের শিখা তৈরি করে । কিছু শৃঙ্গ পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থান মাউন্ট এভারেস্টের চেয়েও উঁচু । আগ্নেয়গিরি দ্বারা উৎপাদিত উপকরণগুলো আইও চাঁদের পাতলা ও বিক্ষিপ্ত বায়ুমণ্ডল তৈরি করে এবং উপাদানগুলো বৃহস্পতির বিস্তৃত চৌম্বকমণ্ডলের প্রকৃতি ও বিকিরণ স্তরকেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে । আইও চাঁদের আগ্নেয়গিরির নির্গমন বৃহস্পতির চারপাশে একটি বৃহৎ ও তীব্র প্লাজমা টরাস তৈরি করে, যা চাঁদে এবং তার চারপাশে এক প্রতিকূল বিকিরণ পরিবেশের সৃষ্টি হয় । কয়েক কিলোমিটার উঁচু কিছু আগ্নেয়গিরির ফোয়ারা থেকে লাভা উদ্গত হয় । আইও চাঁদের লাভা হ্রদ লোকি প্যাটেরা যা প্রায় ৭৭০০ বর্গমাইল (২০০০০ বর্গকিলোমিটার) জুড়ে বিস্তৃত । এ জোভিয়ান চাঁদে আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ এতোটাই তীব্র যে, এটি ধূমকেতুর চেয়ে দ্রুত নতুন কিছু উপাদান জমার মাধ্যমে আইও চাঁদের আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মুখকে পুনরুজ্জীবিত করে এবং গ্রহাণুগুলো এতে বড় বড় গর্ত তৈরি করতে পারে । ভয়েজার ১ মহাকাশযান ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের ৫ই মার্চ যখন আইও চাঁদের পাশ দিয়ে উড়ে যায় তখন নয়টি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি পর্যবেক্ষণ করে যা কয়েকশ কিলোমিটার দূরে সূক্ষ্ম কণার ঝর্ণা নির্গত করে । পরবর্তীতে প্রায় ২০ বছর পরে গ্যালিলিও মহাকাশযানের উচ্চতর রেজ্যুলিউশনের পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে আইও চাঁদে প্রায় ৩০০টি আগ্নেয়গিরি সক্রিয় থাকতে পারে । আগ্নেয়গিরি থেকে যে সিলিকেট লাভা নির্গত হয় তা অত্যন্ত উত্তপ্ত (প্রায় ১৯০০ কেলভিন বা ৩০০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ১৬৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এবং তিন বিলিয়ন বছরেরও বেশি সময় আগে পৃথিবীতে উৎপন্ন লাভার মতো । চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে নির্গত আগ্নেয়গিরির উপাদানগুলো চার্জযুক্ত কণার একটি টরয়েডাল মেঘ তৈরি করে (Doughnut-shaped toroidal cloud) যা আইও চাঁদের কক্ষপথ অনুসরণ করে এবং বৃহস্পতির চারপাশের পথের কিছু অংশ আবৃত করে । আগ্নেয়গিরির নির্গত পদার্থে অক্সিজেন, সোডিয়াম, সালফার, হাইড্রোজেন এবং পটাসিয়াম থাকে । আইও চাঁদ কক্ষপথ ভ্রমণ করে বৃহস্পতির চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় এটি সর্পিল ইলেকট্রনের প্রবাহ নল (Flux tube) বরাবর প্রায় পাঁচ মিলিয়ন অ্যাম্পিয়ার বৈদ্যুতিক প্রবাহ উৎপন্ন করে যা আইও চাঁদকে বিশাল গ্রহ বৃহস্পতির সাথে সংযুক্ত করে । বৈদ্যুতিক প্রবাহটি বিশ্বের সমস্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট শক্তির ছয় গুণ বেশি অগ্ন্যুৎপাতের উৎস । এ বৈদ্যুতিক প্রবাহটি বৃহস্পতির মেরু অঞ্চলে আইও পদচিহ্ন নামে পরিচিত একটি অরোরাল আভা তৈরি করে এবং সেইসাথে আইও চাঁদের বায়ুমণ্ডলেও দৃষ্টিনন্দন মেরুপ্রভা তৈরি করে । অরোরাল মিথস্ক্রিয়া থেকে প্রাপ্ত কণাগুলো কখনো দৃশ্যমান তরঙ্গদৈর্ঘ্যে জোভিয়ান মেরু অঞ্চলগুলোকে অন্ধকার করে তোলে । বর্তমান পর্যবেক্ষণ থেকে অনুমান করা হয় যে, এখানে প্রায় ৪০০ টিরও বেশি শক্তিশালী সক্রিয় আগ্নেয়িরি রয়েছে । তবে, সবচেয়ে তীব্র আগ্নেয়গিরিগুলো থেকেই অগ্ন্যুৎপাত হয় । আইও চাঁদের দক্ষিণ গোলার্ধে চরম অবলোহিত তেজস্ক্রিয়তার এক বিশাল উষ্ণ স্থান (Hot spot) সনাক্ত হয়েছে । বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন যে, বৈশিষ্ট্যটি ৪০০০০ বর্গমাইল (১০০০০০ বর্গকিলোমিটার) জুড়ে ছড়িয়ে আছে । উষ্ণ স্থানের তেজস্ক্রিয়তার মোট শক্তি ৮০ ট্রিলিয়ন ওয়াটেরও বেশি পরিমাপ করা হয়েছে । বিজ্ঞানীদের ধারণা, আইও চাঁদের পৃষ্ঠের এ ধরনের পরিবর্তনগুলো উষ্ণ স্থান এবং আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপের সাথে সম্পর্কিত । আইও চাঁদের বৃহৎ ও চরম মাত্রার অগ্ন্যুৎপাতগুলো দীর্ঘস্থায়ী স্বাক্ষর রেখে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে পাশাপাশি বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে যেমন: পাইরোক্লাস্টিক জমা (আগ্নেয়গিরি দ্বারা নির্গত শিলাখণ্ড), ফাটল দ্বারা পুষ্ট ছোট লাভা প্রবাহ এবং সালফার ও সালফার ডাই অক্সাইড সমৃদ্ধ আগ্নেয়গিরি শিখা । বৃহস্পতির চৌম্বক ক্ষেত্র গঠনে আইও চাঁদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । এটি একটি বৈদ্যুতিক জেনারেটর হিসেবে কাজ করে যা নিজের উপর ৪০০০০০ ভোল্ট তৈরি করতে পারে এবং ৩ মিলিয়ন অ্যাম্পিয়ার বৈদ্যুতিক প্রবাহ সৃষ্টি ও আয়ন নির্গত করে বৃহস্পতিকে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করার সুযোগ করে দেয় যেটি তার দ্বিগুণেরও বেশি আকার ধারণ করে । বৃহস্পতির চৌম্বকমণ্ডল আইও চাঁদের পাতলা বায়ুমণ্ডল থেকে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১ টন হারে গ্যাস এবং ধূলিকণা টেনে নেয় । এ উপাদানগুলো বেশিরভাগই আয়নযুক্ত ও পারমাণবিক সালফার, অক্সিজেন এবং ক্লোরিন; পারমাণবিক সোডিয়াম ও পটাসিয়াম; আণবিক সালফার ডাই অক্সাইড ও সালফার; এবং সোডিয়াম ক্লোরাইড ধুলো দিয়ে গঠিত । এ সকল পদার্থ বা উপাদানগুলো আইও চাঁদের আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ থেকে উদ্ভূত হয় এবং এগুলো সরাসরি আইও চাঁদের বায়ুমণ্ডল থেকে বৃহস্পতির চৌম্বক ক্ষেত্র ও আন্তঃগ্রহীয় স্থানে আসে । যদিও পদার্থগুলো তাদের আয়নিত অবস্থা এবং গঠনের উপর নির্ভর করে । বৃহস্পতির চৌম্বকমণ্ডলের বিভিন্ন নিরপেক্ষ (অ-আয়নিত) মেঘ ও বিকিরণগুলো বলয়ে পরিণত হয়ে জোভিয়ান সিস্টেম থেকে নির্গত হয় । আইও চাঁদকে ঘিরে নিরপেক্ষ সালফার, অক্সিজেন, সোডিয়াম এবং পটাসিয়াম পরমাণুর মেঘ রয়েছে । কণাগুলো আইও চাঁদের উপরের বায়ুমণ্ডলে উৎপন্ন হয় এবং প্লাজমা টরাসে আয়নগুলোর সাথে সংঘর্ষের মাধ্যমে আইও চাঁদের পার্বত্য গোলক পূরণ করার জন্য বিভিন্ন প্রক্রিয়া দ্বারা উত্তেজিত হয়, যা সেই অঞ্চল যেখানে আইও চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ বৃহস্পতির উপর প্রাধান্য পায় । পৃথিবী এবং তার চাঁদের বিপরীতে, আইও চাঁদের অভ্যন্তরীণ তাপের প্রধান উৎসটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ক্ষয়ের পরিবর্তে জোয়ারের অপচয় থেকে আসে যেটি ইউরোপা এবং গ্যানিমিড চাঁদের সাথে আইও চাঁদের কক্ষীয় অনুরণনের ফলে ঘটে । এ ধরনের উত্তাপ বৃহস্পতি গ্রহ থেকে আইও চাঁদের দূরত্ব, এর কক্ষীয় বিকেন্দ্রীকরণ, এর অভ্যন্তরীণ গঠন এবং এর ভৌত অবস্থার উপর নির্ভর করে । আইও চাঁদের জোরপূর্বক কক্ষপথের বিকেন্দ্রীকরণের ফলে সৃষ্ট জোয়ারের উত্তাপ এটিকে সৌরজগতের সবচেয়ে আগ্নেয়গিরির দিক থেকে সক্রিয় জগতে পরিণত করেছে, যেখানে শত শত আগ্নেয়গিরি কেন্দ্র এবং বিস্তৃত লাভা প্রবাহ রয়েছে । একটি বড় অগ্ন্যুৎপাতের সময় দশ বা এমনকি শত শত কিলোমিটার দীর্ঘ লাভা প্রবাহ তৈরি হতে পারে, যার বেশিরভাগই ব্যাসাল্ট সিলিকেট লাভা দিয়ে তৈরি যেখানে ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ ম্যাফিক বা আল্ট্রাম্যাফিক বা আগ্নেয় শিলা রয়েছে । লাভা প্রবাহ আইও চাঁদে আরেকটি প্রধান আগ্নেয়গিরির ভূখণ্ডের প্রতিনিধিত্ব করে । বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, এ প্রবাহগুলো বেশিরভাগই গলিত সালফারের বিভিন্ন যৌগ দিয়ে গঠিত । তবে পৃথিবী-ভিত্তিক ইনফ্রারেড গবেষণা এবং গ্যালিলিও মহাকাশযানের পরিমাপ থেকে জানা যায় যে, এ প্রবাহগুলো ম্যাফিক থেকে আল্ট্রাম্যাফিক রচনাসহ বেসালটিক লাভা দিয়ে গঠিত । আইও চাঁদে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী শিখাগুলোর (Plume) মধ্যে রয়েছে প্রোমিথিউস, আমিরানি এবং মাসুবি । আইও চাঁদে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি পর্বত রয়েছে । পর্বতগুলো প্রায়শই বৃহৎ (গড়ে পর্বত ১৫৭ কিলোমিটার বা ৯৮ মাইল লম্বা) এবং বিচ্ছিন্ন কাঠামো হিসেবে দেখা যায় যার কোনো আপাত বৈশ্বিক টেকটোনিক নিদর্শন নেই যেটি পৃথিবীর ক্ষেত্রে দেখা যায় । দক্ষিণ বোসোল মন্টেসে এ স্থাপনাগুলোর গড় উচ্চতা ৬ কিলোমিটার (৩.৭ মাইল) এবং সর্বোচ্চ ১৭.৫ কিলোমিটার (১০.৯ মাইল) । আইও চাঁদে অবস্থিত পর্বতমালা বিভিন্ন ধরণের আকার ধারণ করে । মালভূমিগুলো সবচেয়ে সাধারণ । এ কাঠামোগুলো বৃহৎ যেটি বিচ্ছিন্ন, সমতল-শীর্ষ উচ্চতা, শৈলশিরা মেসা (Mesa) এর মতো যার পৃষ্ঠতল শক্ত । অন্যান্য পর্বতগুলো হেলানো ভূত্বকীয় ব্লক বলে মনে হয় । আইও চাঁদে কয়েকটি পাহাড়ের ছোট ঢাল আগ্নেয়গিরির উৎপত্তি রয়েছে । প্রায় সকল পর্বতই অবক্ষয়ের কোনো না কোনো পর্যায়ে রয়েছে বলে মনে হয় । আয়োনিয়ান পর্বতমালার পাদদেশে বড় বড় ভূমিধস সাধারণ ঘটনা, যা ইঙ্গিত করে যে ভরের অবক্ষয়ই অবক্ষয়ের প্রাথমিক রূপ । আইও চাঁদের মেসা এবং মালভূমিতে Scalloped প্রান্তগুলো ভূত্বক থেকে সালফার ডাই অক্সাইড শোষণের ফলে পর্বত প্রান্ত বরাবর দুর্বলতার অঞ্চল তৈরি করে ।আইও চাঁদে বিভিন্ন আগ্নেয়গিরি, পর্বত, মালভূমি এবং বৃহৎ অ্যালবেডো বৈশিষ্ট্য রয়েছে । যেমন: প্যাটেরা (সসার বা আগ্নেয়গিরির নিম্নচাপ), ফ্লকটাস (প্রবাহ বা লাভা প্রবাহ), ভ্যালিস (উপত্যকা বা লাভা চ্যানেল) এবং সক্রিয় অগ্ন্যুৎপাত কেন্দ্র ইত্যাদি । 

উল্লেখ্য যে: বিভিন্ন মহাকাশ সংস্থা এবং মহাকাশযান এ চমকপ্রদ আইও চাঁদকে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ করে আসছে । বিজ্ঞানীদের এ জোভিয়ান চাঁদ সম্পর্কে নানা ধরণের ভবিষ্যৎ মিশন ও পরিকল্পনা রয়েছে । বিশেষ করে জুনো মিশন হচ্ছে NASA এর একটি মহাকাশ অনুসন্ধান, যা বৃহস্পতি গ্রহকে প্রদক্ষিণ করছে । এটির উদ্দেশ্য হচ্ছে বৃহস্পতি গ্রহের উৎপত্তি ও গঠন, এর চাঁদ সম্পর্কে, গ্রহে পাথুরে কেন্দ্রস্থল আছে কি-না, গ্রহের বায়ুমণ্ডলে জলের পরিমাণ, ভর বিতরণ, মহা লাল বিন্দু, গভীর বাতাস, মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র, চৌম্বক ক্ষেত্র এবং মেরু চুম্বকমণ্ডল ইত্যাদি পরিমাপ করা । জুনো মিশনটি NASA এর New Frontiers Program এর অংশ, যেটি ওয়াশিংটনে এজেন্সির বিজ্ঞান মিশন অধিদপ্তরের (Science Mission Directorate) জন্য আলাবামার হান্টসভিলে নাসার Marshall Space Flight Center এ পরিচালিত হয় ৷ যুক্তরাষ্ট্রের (ডেনভার) মহাকাশ, প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা বিষয়ক কোম্পানি লকহিড মার্টিন স্পেস (Lockheed Martin Space) মহাকাশযান তৈরি এবং পরিচালনা করে । এছাড়া, ইতালীয় মহাকাশ সংস্থা (ASI) জোভিয়ান ইনফ্রারেড অরোরাল ম্যাপারের জন্য অর্থায়ন করেছে । বৃহস্পতি গ্রহে জুনো মহাকাশযানটি ৫০ বার বৃহস্পতির চারপাশে ঘুরে বর্তমানে ৫১তম মিশনে রয়েছে । 


তথ্যসূত্র:  https://www.nasa.gov/ , www.britannica.com,  https://www.cbc.ca/   ,  https://www.space.com/ , আন্তর্জাল (The Internet), ছবি: উইকিপিডিয়া ।

Tuesday, 1 April 2025

মানব মস্তিষ্কের কোষ ও মহাবিশ্বের ছায়াপথ জাল কাঠামো

ছবি: Sacred Geometry (Facebook থেকে) । 


মানব মস্তিষ্ক হচ্ছে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের স্ফীত, তরলে পূর্ণ গহ্বরযুক্ত ও মেনিনজেস নামক পর্দা বা আবরণী দ্বারা আবৃত করোটির ভেতরের অংশ । মানুষের মস্তিষ্কের প্রধান তিনটি অংশ যেমন: গুরুমস্তিষ্ক, মধ্যমস্তিষ্ক এবং লঘুমস্তিষ্ক । মস্তিষ্কের দুইটি প্রধান কোষ হচ্ছে নিউরন বা স্নায়ুকোষ এবং নিউরোগ্লিয়া বা গ্লিয়াল কোষ । মস্তিষ্কের কোষগুলো মস্তিষ্কের কার্যকরী টিস্যু তৈরি করে । মস্তিষ্কের বাকি টিস্যু হচ্ছে স্ট্রাকচারাল স্ট্রোমা যেখানে মেনিনজেস, রক্তনালী এবং নালীগুলোর মতো সংযোগকারী টিস্যু অন্তর্ভুক্ত থাকে । মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেক্স বা সেরিব্রাল ম্যান্টেল নামক অংশটি মানুষ এবং অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মস্তিষ্কের সেরিব্রামের স্নায়ু টিস্যুর বাইরের স্তর । সেরিব্রাল কর্টেক্স কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের স্নায়ু সংহতকরণের বৃহত্তম স্থান এবং এটি মনোযোগ , উপলব্ধি , সচেতনতা , চিন্তাভাবনা , স্মৃতি , ভাষা ও চেতনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । মানুষের সেরিব্রাল কর্টেক্সে প্রায় ১৪ থেকে ১৬ বিলিয়ন নিউরন থাকে । এ নিউরন বা স্নায়ুকোষই হচ্ছে মানবমস্তিষ্কের মূল গঠন উপাদান । উত্তেজনাপূর্ণ নিউরন কোষগুলো বৈদ্যুতিক সংকেতের আকারে অনুভূতি পরিবহন করতে পারে যা নিউরাল সার্কিট এবং বৃহত্তর মস্তিষ্কের নেটওয়ার্কগুলোতে অন্যান্য নিউরন এবং ইন্টারনিউরনের সাথে (সিন্যাপ্সের মাধ্যমে) যোগাযোগ রক্ষা করে কাজ করে থাকে । নিউরোগ্লিয়া বা গ্লিয়া হচ্ছে নিউরনের সহায়ক কোষ যার অনেক কাজ রয়েছে । যদিও এর সবগুলো কাজ স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না । তবে নিউরনগুলোকে সহায়তা এবং পুষ্টি সরবরাহ করাই তার মূল কাজ । গ্লিয়াল কোষগুলো নিউরনের চেয়ে সংখ্যায় অনেক বেশি এবং নিউরনের জন্য তাদের সহায়ক ভূমিকা ছাড়াও এ কোষগুলো বিশেষ করে অ্যাস্ট্রোসাইটগুলোকে গ্লিয়াট্রান্সমিশন নামক নিউরোট্রান্সমিশনের অনুরূপ একটি সংকেত প্রক্রিয়ায় জড়িত নিউরনের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম বলে স্বীকৃত হয়েছে । 

অপরদিকে অসংখ্য নক্ষত্র, নাক্ষত্রিক অবশেষ, গ্রহাণু, উল্কা, ধূমকেতু, আন্তঃগ্রহীয় ধূলি মেঘ, আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাস, ধূলিকণা, নীহারিকা, সৌরজগৎ, কৃষ্ণগহ্বর এবং অদৃশ্য পদার্থসহ মহাজাগতিক নানা বস্তুর সমন্বয়ে গঠিত হয় এক একটি ছায়াপথ । একটি ছায়াপথে গড়ে প্রায় ১০০ – ৫০০ বিলিয়ন নক্ষত্র থাকে । আকাশগঙ্গা ছায়াপথের (Milky Way Galaxy) ব্যাস ১০০০০০ আলোকবর্ষ । এ বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে বিদ্যমান ২ ট্রিলিয়ন ছায়াপথের মধ্যে আমাদের ছায়াপথ একটি । এ রকম প্রায় অর্ধশতাধিক ছায়াপথের সমন্বয়ে গঠিত হয় এক একটি ছায়াপথ স্তবক বা গুচ্ছ (Galaxy Cluster) । ছায়াপথ স্তবকগুলোই গঠন করে একটি ছায়াপথ মহাস্তবক (Galaxy Supercluster) যেটি মহাবিশ্বে এক বিশাল মহাকর্ষীয় কাঠামো তৈরি করে যেখানে কয়েক লক্ষ ছায়াপথের আবাসস্থল । এ সকল ছায়াপথ মহাস্তবকের মাঝে বিদ্যমান একটি ছায়াপথ স্তবক থেকে অন্য এক একটি ছায়াপথের মধ্যকার দূরত্ব থাকে লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ । সুতরাং একটি ছায়াপথ মহাস্তবকের আকার কতো বৃহৎ, তা নিশ্চয়ই চিন্তার বিষয়? ল্যানিয়াকিয়া ছায়পথ মহাস্তবক (Laniakea Galaxy Supercluster) হচ্ছে আমাদের নিজস্ব বাসস্থান আকাশগঙ্গা ছায়াপথসহ আশেপাশে প্রায় ১০০০০০ অন্যান্য ছায়াপথের আবাসস্থল । যেখানে ঐ আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৭০০০ আলোকবর্ষ দূরে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের এক অতি ক্ষুদ্র অংশের সর্পিল কালপুরুষ বাহুর (The Orion Arm) এক প্রান্তে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর পূর্বে জলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্য নামক নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে একাধিক গ্রহ নিয়ে গঠিত হয়েছে আমাদের সৌরজগৎ । যদিও, আদি মহাবিশ্বের ইতিহাস খুবই হিংস্র । এক মহা দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মহাবিশ্বের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সৌরজগতের সৃষ্টি । কালের আবর্তে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে প্রচণ্ড উত্তপ্ত অবস্থা থেকে পৃথিবী গ্রহটি এক সময় ঠান্ডা, শান্ত এবং জীবন ধারণের উপযোগী হলে এখানে প্রাণের উদ্ভব হয় । এ সবুজ গ্রহটিই আমাদের বাড়ি । মায়ের কোলের মতোই নিরাপদ আশ্রয়স্থল । কিন্তু, এ মৃত্যুন্মুখ গ্রহটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে! মানবজাতি টিকবে তো? 

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া । 

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...