"Our Place in the Cosmos"
অপার বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এক মহাবিস্ময়, রহস্যময় এবং অনাবিল সুন্দর যা আজো আমাদেরকে হাতছানি দেয় ।
অসংখ্য নক্ষত্র, নাক্ষত্রিক অবশেষ, গ্রহাণু, উল্কা, ধূমকেতু, আন্তঃগ্রহীয় ধূলি মেঘ, আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাস, ধূলিকণা, নীহারিকা, সৌরজগৎ, কৃষ্ণগহ্বর এবং অদৃশ্য পদার্থসহ মহাজাগতিক নানা বস্তুর সমন্বয়ে গঠিত হয় এক একটি ছায়াপথ । একটি ছায়াপথে গড়ে প্রায় ১০০ – ৫০০ বিলিয়ন নক্ষত্র থাকে । ছায়াপথের উচ্চ ঘনত্বসহ বর্ধিত অঞ্চলগুলোকে মহাস্তবক (Supercluster) বলে । তবে সুনির্দিষ্টভাবে একটি মহাস্তবক হচ্ছে ছোট ছোট ছায়াপথ গুচ্ছ বা ছায়াপথ দলের একটি বড় দল বা গোষ্ঠী । এরা মহাবিশ্বের বৃহত্তম পরিচিত কাঠামোগুলোর মধ্যে একটি । পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বে মহাস্তবকের সংখ্যা ১০ মিলিয়ন বলে অনুমান করা হয় । ল্যানিয়াকিয়া মহাস্তবক হচ্ছে একটি 'ছায়াপথ মহাস্তবক' বা 'স্থানীয় ছায়াপথ মহাস্তবক' (Local Supercluster/LSC/LS) বা হাওয়াইয়ান 'উন্মুক্ত আকাশ', 'অমোঘ স্বর্গ' । বৃহদাকৃতির মহাস্তবকটি ৫২১৬০০০০০ আলোকবর্ষেরও (১৬০ মেঘাপারসেক) বেশি এলাকা নিয়ে বিস্তৃত যেখানে আমাদের নিজস্ব বাসস্থান আকাশগঙ্গা ছায়াপথসহ আশেপাশে প্রায় ১০০০০০ অন্যান্য ছায়াপথের আবাসস্থল । ঐ আকাশগঙ্গা ছায়াপথের ছোট সর্পিল-বাহুতে জলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্য নামক নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়েছে আমাদের সৌরজগৎ যেটি সবুজ গ্রহ পৃথিবীকে ধারণ করে । হ্যাঁ, সেখানেই আমাদের অবস্থান । হাওয়াইয়ান ভাষায় Laniakea নামের অর্থ হচ্ছে 'অমোঘ স্বর্গ' । Lani হচ্ছে 'স্বর্গ' এবং Akea হচ্ছে 'প্রশস্ত বা অপরিমেয়' । University of Hawaiʻi Kapiʻolani Community College এর হাওয়াইয়ান ভাষার সহযোগী অধ্যাপক Nawaʻa Napoleon সমুদ্রপথ সন্ধানকারী বা পলিনেশিয়ান নাবিকদের সম্মানার্থে Laniakea নামটি প্রস্তাব করেন, যারা আকাশের জ্ঞান ব্যবহার করে প্রশান্ত মহাসাগরের যাত্রাপথ বা অবস্থান নির্ণয় করতেন । এ দানব ছায়াপথ মহাস্তবকের আনুমানিক ভর হচ্ছে ১০১৭ সৌর ভরের সমান (১০০ কোয়াড্রিলিয়নেরও বেশি) । মহাস্তবকটি আকাশগঙ্গা ছায়াপথের ১০০০০০ গুণ, যা প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ জুড়ে বিস্তৃত আরেকটি বিশাল হোরোলজিয়াম রেটিকুলাম ছায়াপথ মহাস্তবকের সমতুল্য । সত্যিই, এক বিস্ময়কর আকার! তাই, আমাদের স্থানীয় ছায়াপথ গোষ্ঠীটি ল্যানিয়াকিয়ার হৃদয়ের দিকে টানছে । আশ্চর্যজনক এ ছায়াপথ মহাস্তবকটি চারটি উপভাগ নিয়ে গঠিত, যেটি পূর্বে আলাদা মহাস্তবক হিসেবে পরিচিত ছিল যেমন (ক) Virgo Supercluster: যে অংশে আকাশগঙ্গা ছায়াপথ থাকে (খ) Hydra–Centaurus Supercluster: [১] মহা আকর্ষক যেটি Norma এর কাছে ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকের কেন্দ্রীয় মহাকর্ষ বিন্দু [২] Antlia Wall যেটি Hydra Supercluster নামে পরিচিত [৩] Centaurus Supercluster (গ) Pavo–Indus Supercluster (ঘ) Southern Supercluster: [১] Fornax Cluster (S373) [২] Dorado এবং Eridanus cloud । মহাজাগতিক অনুপম সৌন্দর্যের অধিকারী ল্যানিয়াকিয়া ছায়পথ মহাস্তবকের আবিষ্কার, গ্যালাকটিক অবস্থান এবং বেগের পরিমাপ থেকে উদ্ভূত হয়েছে যে কিভাবে ছায়াপথগুলো কাছাকাছি বস্তুর ঘনত্ব ও মহাজগতের সামগ্রিক প্রসারণের সাথে সম্পর্কিত । অসীম মহাবিশ্বের এক ক্ষুদ্রতম অংশে ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকই আমাদের 'Home Supercluster’ । পরম বিস্ময়কর এ ছায়াপথ মহাস্তবকটির আশপাশে সবচেয়ে বড় ছায়াপথ স্তবকগুলো হচ্ছে: Virgo, Hydra (Abell 1060), Centaurus (A 3526), Abell 3565, Abell 3574, Abell 3521, Southern, Pavo- Indus, Fornax, Norma (ACO 3627 বা Abell 3627), Endorus, Pegasus, Puppis, Coma, Antlia, Cancer, Ursa Major এবং Eridanus । ধারণা করা হয়, সম্পূর্ণ ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকে প্রায় ৩০০ - ৫০০টি পরিচিত ছায়পথ স্তবক বা গুচ্ছ এবং দল বা গোষ্ঠী রয়েছে । তবে প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতে পারে, কারণ এর মধ্যে কিছু এড়িয়ে চলা অঞ্চল অতিক্রম করছে । এটি মহাকাশের এমন একটি এলাকা যা আংশিকভাবে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের গ্যাস ও ধূলিকণা দ্বারা অস্পষ্ট থাকার কারণে সেই অঞ্চলকে মূলত সনাক্ত করা যায় না । রহস্যেঘেরা প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যময় ছায়াপথ মহাস্তবকটি মহাবিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ কিছু কাঠামোর মধ্যে একটি এবং এটির যে সীমানা রয়েছে তা নির্দিষ্ট করা খুবই কঠিন, বিশেষ করে ভেতর থেকে । অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবক নিজেই মীন-সেটাস মহাস্তবকের এক জটিল উপাদানের অংশ (Pisces–Cetus Supercluster Complex) । গভীর মহাকাশে আধিপত্য বিস্তারকারী এক দুর্দান্ত ল্যানিয়াকিয়া মহাস্তবকটি একটি ছায়াপথ অংশু বা সূক্ষ্ম-সূত্র, যা অনেক বড় মহাকর্ষীয় কাঠামো তৈরি করে । একটি ছায়াপথ মহাস্তবকের মধ্যে বেশিরভাগ ছায়পথের গতি ও ভর কেন্দ্রের দিকে আকৃষ্ট করে অভ্যন্তরীণভাবে পরিচালিত হয় । তাই, ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকের ক্ষেত্রে এ মহাকর্ষীয় কেন্দ্রবিন্দুকে মহা আকর্ষক বলা হয়, যেটি ল্যানিয়াকিয়া মহাস্তবকের স্থানীয় গোষ্ঠীর গতিকে প্রভাবিত করে যেখানে আকাশগঙ্গা ছায়াপথ রয়েছে এবং ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবক জুড়ে বিদ্যমান অন্যান্য সকল ছায়াপথকেও । ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকের উপাদান বা গঠক বা নির্বাচন-কর্তা (Constituent) ছায়াপথ স্তবকগুলো থেকে ভিন্ন । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেন যে, অদ্ভুত ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকটি মহাকর্ষীয়ভাবে একে অপরের থেকে আবদ্ধ নয় । আপাত কাঠামোগুলো ক্ষণস্থায়ী । ল্যানিয়াকিয়া আশেপাশের অঞ্চলের তুলনায় অতিরিক্ত ঘনত্বের ছায়াপথ মহাস্তবক হিসেবে নিজেকে বজায় রাখার পরিবর্তে অন্ধকার শক্তি (Dark Energy) দ্বারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে বলে অনুমান করা হয় । তবে গবেষণায় প্রস্তাব করা হয় যে, লাল স্থানান্তর (Redshift) অনুযায়ী পরিচিত কয়েকটি মহাস্তবক যেমন: Vigro Supercluster এবং Hydra-Centaurus Supercluster সংযুক্ত হয়ে যেতে পারে । এ বিশাল মহাকাশে ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকের প্রতিবেশী অন্যান্য মহাস্তবকগুলো হচ্ছে: Shapley Supercluster (SCI 124), Southern Supercluster, Virgo Supercluster (LSC বা LS), Pavo-Indus Supercluster, Centaurus Supercluster (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), Perseus-Pisces Supercluster (SCI 40), Hercules Supercluster (SCI 160) (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), Coma Supercluster (SCI 117), Ursa Major Supercluster (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), Columba Supercluster (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), Piscis-Cetus Supercluster Complex (Galaxy filament), Horologium Supercluster (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), Hydra Supercluster (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), Leo Supercluster (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), Sextans Supercluster (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), Capricornus Supercluster (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), Bootes Supercluster (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), Sculptor Supercluster এবং Corona Borealis Supercluster (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে) । আমরা জানি, প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর পূর্বে একটি বৃহৎ পরমাণুর মহাশক্তিশালী মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাবিশ্বের উৎপত্তি হয় । পদার্থ, প্রতিপদার্থ, বিকিরণ এবং শক্তি ইত্যাদিতে মহাবিশ্ব পরিপূর্ণ ছিল; সমস্ত কণা ও ক্ষেত্র যা আমরা আজ জানি এবং সম্ভবত আরো বেশি । সেই মহাবিস্ফোরণের পর থেকে মহাবিশ্বের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সময়ের পরিমাপে লক্ষ লক্ষ বছর থেকে বিলিয়ন বছর অতিবাহিত হয়েছে । কিন্তু মহাবিশ্ব নিয়ে মানবজাতির কৌতূহলের অন্ত নেই । তাই, মানুষকে কাছে টানে । ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি দল ছায়াপথের আপেক্ষিক বেগ অনুযায়ী ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবককে সংজ্ঞায়িত করার সময় এর প্রতিবেশী কয়েকটি ছায়পথ মহাস্তবক এবং ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকের প্রান্ত সম্পর্কে স্পষ্টভাবে জানতে পারেনি । যদিও বর্তমানে এদের প্রান্ত এবং বাইরের কাঠামোর অধ্যয়ন উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে । ফলে মহাবিশ্ব জুড়ে পর্যবেক্ষণযোগ্য ছায়াপথ মহাস্তবকগুলো খুঁজে পাওয়া গেছে এবং নকশা বা তালিকা করা হয়েছে, যেখানে তারা বৃহত্তম পরিচিত ছায়পথ স্তবকের চেয়ে দশগুণ বেশি সমৃদ্ধ । দুর্ভাগ্যবশত, মহাবিশ্বে অন্ধকার শক্তির উপস্থিতির কারণে এ মহাস্তবকগুলো— আমাদের নিজস্বটিসহ শুধুমাত্র দৃশ্যমান কাঠামো । বাস্তবে, তারা আমাদের চোখের সামনে দ্রবীভূত হওয়ার প্রক্রিয়াতে নিছক কল্পনা ।
উৎস: উইকিপিডিয়া, www.scientificamerican.com
ছবি: www.researchgate.net , www.sci.news ।


No comments:
Post a Comment