Saturday, 7 December 2024

একটি দুর্দান্ত বহিঃসৌর গ্রহের আবিষ্কার

 

ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ডের জ্যোতির্বিদ Emma Nabbie এর নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী দল ২০২৪ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে জ্যোতির্বিদ্যা জার্নালে "উত্তপ্ত নেপচুন মরুভূমিতে বেঁচে থাকা: অতি-উষ্ণ নেপচুন TOI-3261b বহিঃসৌর গ্রহের আবিষ্কার” এর বিষয়ে তাদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে । বিজ্ঞানীরা নাসা'র Transiting Exoplanet Survey Satellite (TESS), Las Cumbres Observatory (LCO), ESPRESSO এবং HARPS দূরবীক্ষণ যন্ত্রগুলো ব্যবহার করে আমাদের সৌরজগতের বাইরে গভীর মহাকাশে অবস্থিত একটি বহিঃসৌর গ্রহ TOI-3261b (Exoplanet) আবিষ্কার করেছে । গ্রহটির অন্যান্য নাম হচ্ছে: TIC 358070912b এবং 2MASS J03105467-7331556b । পরবর্তীতে তারা অস্ট্রেলিয়া, চিলি এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত স্থল-ভিত্তিক দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে এ গ্রহটিকে আরো ব্যাপকভাবে পর্যবেক্ষণ করেন । চাঞ্চল্যকর গ্রহটি "উষ্ণ নেপচুন মরুভূমিতে" (Hot Neptune Desert) চৌকোভাবে উচ্চ প্রোজ্জ্বলতায় রয়েছে– যেখানে খুব কম সদস্যের একটি গ্রহগোষ্ঠী বিদ্যমান । এটি ঐ গোষ্ঠীরই অংশ— বড় এবং উত্তপ্ত, যেগুলো একটি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে পরিভ্রমণ করছে । নেপচুন আকারের অতি-স্বল্প সময়ের গ্রহের (Ultra-short period planets বা USPs) সাম্প্রতিক আবিষ্কারটি আমরা মহাকাশ সম্পর্কে যা জানি এবং গ্রহের গঠন তত্ত্ব ও বিবর্তনের বর্তমান উপলব্ধিকে চ্যালেঞ্জ করে । উন্নত দূরবীক্ষণ যন্ত্র এবং ভবিষ্যতের অধ্যয়ন দ্বারা একটি চরম পরিবেশে উষ্ণ মরুভূমির এ বাসিন্দাদেরকে কিভাবে গঠন করে তা সম্পর্কে আরো বিশদভাবে জানতে হলে নতুন আবিষ্কৃত গ্রহটি বিভিন্ন সূত্রের উৎস হতে পারে । লাল রঙের উষ্ণ নেপচুন TOI-3261b বহিঃসৌর গ্রহটি অবিশ্বাস্য! বৈচিত্র্যময় গ্রহটির আকার এবং গঠন আমাদের সৌরজগতের ঘনতম দৈত্য গ্রহ নেপচুনের মতোই । এটি তার মূল নক্ষত্রের (K- type parent star TOI-3261) খুব কাছাকাছি প্রদক্ষিণ করছে । নক্ষত্র থেকে ০.০১৭১৪ AU দূরত্বে রয়েছে এবং চরম তাপমাত্রার কারণে এখানে জীবনধারণ মোটেই সম্ভব না । যদিও নক্ষত্রটির বাসযোগ্য অঞ্চল হচ্ছে ৩৬৪.২ - ৫২৪.৬ AU । এ নিষ্ক্রিয় প্রধান-ক্রম নক্ষত্রটি Hydrus নক্ষত্রমণ্ডলে ৩০০ পার্সেক (৯৭৮.৫ আলোকবর্ষ) দূরে অবস্থিত । অপার মহাকাশের বিস্ময়কর গ্যাস দানব গ্রহটির কোনো পৃষ্ঠ নেই । এটি এমন একটি গ্রহ যে মাত্র ২১ ঘন্টার মধ্যেই তার নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে । যা পৃথিবী'র এক দিনেরও কম । অর্থাৎ একটি 'বছর’ মাত্র ২১ ঘন্টা দীর্ঘ (০.৮৮৩১৩৩ দিন) । সাধারণত নক্ষত্রের কাছাকাছি গ্রহগুলো তীব্র তাপ এবং বিকিরণের কারণে তাদের বায়ুমণ্ডল হারায় । কিন্তু, TOI-3261b গ্রহটি সব নিয়ম ভঙ্গ করছে । আশ্চর্যের বিষয় যে, গ্রহটি নক্ষত্রের কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও এটি একটি ঘন ও ভারী বায়ুমণ্ডল বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে । এ ধরণের কক্ষপথে থাকা বেশিরভাগ গ্রহই সময়ের সাথে সাথে তাদের হালকা গ্যাসগুলো হারিয়ে ফেলে অনুর্বর হয়ে যায় । তবুও, এমন একটি আঁটসাঁট কক্ষপথের কারণে গ্রহটি স্বতন্ত্রভাবে তার গোষ্ঠীতে নিজের স্থান অর্জন করেছে । এখন পর্যন্ত, শুধুমাত্র ৩টি অতি-স্বল্প সময়ের গাঢ় নীল রঙের উষ্ণ নেপচুন বহিঃসৌর গ্রহগুলো যেমন LTT-9779b, TOI-849b এবং TOI-332b এর সাথে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের TOI-3261b গ্রহটিকে চতুর্থ বস্তু হিসেবে পাওয়া গেছে, যা এ নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করা একমাত্র পরিচিত বহিঃসৌর গ্রহ । অনুমান করা হয় যে, হয়তো গ্রহগুলো টিকে থাকতে পারে এবং সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে বায়ুমণ্ডলকে ধরে রাখতে পারবে । মহাজাগতিক বিস্ময়ের অধিকারী TOI-3261b বহিঃসৌর গ্রহের ব্যাসার্ধ হচ্ছে ৩.৮২ R পৃথিবীর ব্যাসার্ধ, যেখানে বৃহস্পতির ০.৩ R । এটির ভর হচ্ছে ৩০.৩ M পৃথিবীর ভর, যেখানে বৃহস্পতির ০.০৯৫৩ M । ঘনত্ব প্রায় ২৯৯৭ kg/m3 । তাপমাত্রা প্রায় ১৭২২ K (১৪৪৯° C) । দূরত্ব ০.০২ AU । উজ্জ্বলতা ৩.৮ R । ওজন প্রায় ৩০.৩ পৃথিবীর ভর । উষ্ণ নেপচুন গ্রহগুলো বিরল তাই নক্ষত্রের এতো কাছাকাছি ঘন গ্যাসীয় বায়ুমণ্ডলকে ধরে রাখা কঠিন । কোনো একটি নক্ষত্র তার চারপাশের বস্তু বা উপাদানগুলোর উপর এক বিশাল মাধ্যাকর্ষণ শক্তি প্রয়োগ করে, যা নিকটবর্তী গ্রহকে ঘিরে থাকা গ্যাসের স্তরগুলোকে ছিনিয়ে নিতে পারে । TOI-3261b গ্রহের মতো অন্যান্য উষ্ণ নেপচুন গ্রহগুলোও বড় হয়ে থাকে । বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, আবিষ্কৃত গ্রহটি সবসময় এরকম ছিল না । হতে পারে, এটি তার ভর হারানোর আগে অনেক বৃহৎ ছিল । সম্ভবত, বৃহস্পতি গ্রহের মতোই বড় এবং তখন থেকেই তার ভরের একটি বড় অংশ হারিয়েছে । জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, এ নক্ষত্র এবং তার গ্রহ ব্যবস্থাটি (TOI-3261 System) প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন বছরের পুরোনো । গ্রহটি এক বিরাট গ্যাস দৈত্য হিসেবে গঠিত হয়েছিল । এটি সম্ভবত দুটি উপায়ে তার ভর হারিয়েছে যেমন (ক) আলোক বাষ্পীভবন (Photoevaporation): নক্ষত্রের শক্তি গ্রহের বায়ুমণ্ডলকে উত্তপ্ত করে, যার ফলে হালকা গ্যাসের কণাগুলোকে মহাকাশে বিলীন করে দেয় । (খ) জোয়ারের টানে (Tidal stripping): যখন নক্ষত্রের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বা শক্তিশালী মহাকর্ষীয় টান গ্রহ থেকে গ্যাসের স্তরগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দূরে সরিয়ে দেয় । তাপীয় বিবর্তন নকশাগুলো থেকে অনুমান করা হয় যে, TOI-3261b গ্রহের মোট ভরের∼৫% সম্ভবত উদ্বায়ী পদার্থ দিয়ে গঠিত । হয়তো, গ্রহটি তার নক্ষত্র থেকে অনেক দূরে গঠিত হয়েছিল যেখানে এ উভয় প্রভাবই কম তীব্র হবে এবং এটি তার বায়ুমণ্ডলকে ধরে রাখার অনুমতি দিয়েছে । এ গ্রহের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে অবশিষ্ট বায়ুমণ্ডল । সুতরাং, অদূর ভবিষ্যতে বায়ুমণ্ডলীয় বিশ্লেষণ “উত্তপ্ত নেপচুন মরুভূমির" এ বাসিন্দার গঠনের ইতিহাস উন্মোচন করতে সহায়তা করবে । রহস্যময় গ্রহটি নেপচুনের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ঘন । এর বায়ুমণ্ডলের হালকা অংশগুলো সময়ের সাথে সাথে দূরে সরে গিয়েছে, শুধুমাত্র ভারী উপাদানগুলোকে রেখে গিয়েছে । গ্রহটি অবশ্যই তার বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন ধরণের উপাদান নিয়ে শুরু করেছে— তবে এ পর্যায়ে ঠিক কি, তা বলা কঠিন । আজ অবধি আবিষ্কৃত অতি-উষ্ণ নেপচুন বহিঃসৌর গ্রহগুলোর মধ্যে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভর ভগ্নাংশের কারণে বায়ুমণ্ডলীয় অনুপ্রেরিত পর্যবেক্ষণের জন্য এ গ্রহকে একটি 'আদর্শ প্রার্থী’ করে তুলেছে । তাই, গ্রহটিকে অবলোহিত আলোতে আরো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এ রহস্যের সমাধান করা যেতে পারে । নতুন আবিষ্কারটি চরম পরিবেশে গ্রহ অধ্যয়নের জন্য দরজা খুলে দিয়েছে । নাসা'র জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মতো উন্নত দূরবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে এ গ্রহের বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন অণু সনাক্তকরণের জন্য এটি একটি শ্রেষ্ঠ উপায় হতে পারে । ফলে, মহাকাশ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদেরকে TOI-3261b গ্রহের অতীত বুঝতেই শুধু সাহায্য করবে না বরং সকল উষ্ণ ও দৈত্যাকার গ্রহগুলোর পিছনের শারীরিক প্রক্রিয়াগুলো এবং এরা কিভাবে কঠোরতম পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেয় বা বেঁচে থাকে সেটি উন্মোচন করতে শুরু করবে ৷ উল্লেখ্য যে, ২০২০ খ্রিস্টাব্দে অতি-স্বল্প সময়ের উষ্ণ নেপচুন বহিঃসৌর গ্রহ LTT-9779b (Cuancoa) প্রথম আবিষ্কার হয়, যেটি একটি জি-টাইপ নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে । গ্রহটি তার নক্ষত্রকে ঘিরে একটি কক্ষপথ সম্পন্ন করতে ০.৮ দিন সময় নেয় এবং নক্ষত্র থেকে প্রায় ০.০১৬৭৯ AU দূরত্বে রয়েছে । পরবর্তীতে TESS পর্যবেক্ষণ যন্ত্র দ্বারা TOI-849b এবং TOI-332b বহিঃসৌর গ্রহ দুটি আবিষ্কৃত হয় । এদের মধ্যে TOI-849b লেট জি-টাইপ নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে যেটি একটি Candidate Chthonian গ্রহ, পৃথিবী থেকে ৭০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত । অপরদিকে, TOI- 332b গ্রহটি জি-টাইপ নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করছে । এটি তার নক্ষত্রকে ঘিরে একটি কক্ষপথ সম্পূর্ণ করতে ০.৮ দিন সময় নেয় এবং নক্ষত্র থেকে ০.০১৫৯ AU দূরত্বে রয়েছে । ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে এ গ্রহটি আবিষ্কৃত হয় । যাই হোক, LTT-9779b এবং TOI-849b উভয় গ্রহই জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের অবলোহিত পর্যবেক্ষণের জন্য সারিতে রয়েছে, যা আগামী বছরগুলোতে এ গ্রহগুলোর বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে আমাদের বোঝার সম্ভাবনাকে প্রসারিত করবে ৷ 

উৎস: www.sci.news , www.science.nasa.gov , www.arxiv.org , www.stellarcatalog.com , www.m.economictimes.com  

ছবি: NASA/JPL-Caltech/K. Miller, Caltech & IPAC

Thursday, 28 November 2024

NGC 2090 ছায়াপথ


 এ অপার মহাবিশ্বের এক রহস্যময় সৌন্দর্য হচ্ছে NGC 2090 ছায়াপথ । মহাবিশ্বের বিশালতা এবং এর মধ্যে যে মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য রয়েছে তা প্রতিনিয়ত আমাদের কল্পনার সীমাকে অতিক্রম করে । সম্প্রতি, দুটি অসাধারণ দূরবীক্ষণ যন্ত্র জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) এবং হাবল স্পেস টেলিস্কোপ (HST) ব্যবহার করে এ বিশেষ NGC 2090 ছায়াপথকে ধারণ করা হয় ৷ এটি এমনই একটি ছায়াপথ যা এর ধুলো, গ্যাস এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ বাহুগুলোর জন্য অনন্য ৷ NGC 2090 হচ্ছে একটি ফ্লোকুলেন্ট সর্পিল ছায়াপথ (Flocculent Spiral Galaxy) যার একটি প্যাঁচানো (Patchy), ধুলোযুক্ত চাকতি এবং বাহুগুলো Flaky বা একেবারেই দৃশ্যমান নয় । এর গঠন SC ধরনের সর্পিল । ছায়াপথটি এখনো ক্রিয়াকলাপে পূর্ণ, চাকতি জুড়ে বিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ে নক্ষত্র গঠনের স্তবক রয়েছে । এ সর্পিল ছায়াপথটি প্রায় ৪০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে Columba এর দক্ষিণ নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত । এটি ২৯শে অক্টোবর ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে স্কটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী James Dunlop আবিষ্কার করেন । বিস্ময়কর এ ছায়াপথটি ESO 363-23, IRAS 05452-3416 বা LEDA 17819 নামেও পরিচিত । এ ছায়াপথের বাহুগুলো আকাশগঙ্গা ছায়াপথ বা সাধারণ সর্পিল ছায়াপথের মতো সারিবদ্ধ নয় । হাবল স্পেস টেলিস্কোপ থেকে দৃশ্যমান আলোর চিত্রগুলোতে ছায়াপথের বাহুগুলো অস্পষ্ট এবং অসম দেখায় । কিন্তু যখন সেই একই ছায়াপথ জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের অবলোহিত ক্যামেরা (Infrared camera) দ্বারা বন্দী করা হয়, তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উঠে আসে । নক্ষত্র জন্মের অঞ্চল এবং ছায়াপথের জটিল গঠনটি ধুলো ও গ্যাস দ্বারা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান । জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের শক্তিশালী অবলোহিত প্রযুক্তি ছায়াপথের গভীরে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য প্রকাশ করতে ধুলোর স্তরকে ভেদ করে । তারকা স্তবকগুলো, ধুলো চলাচল এবং ছায়াপথের গঠন স্পষ্টভাবে ধারণ করা হয় । অন্যদিকে, হাবল স্পেস টেলিস্কোপের ছবিগুলো এ ছায়াপথের বাহু এবং নক্ষত্রের অবস্থানের ভুল বিন্যাস সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য দেয় । এ দুটি দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সম্মিলিত পর্যবেক্ষণ NGC 2090 ছায়াপথে নক্ষত্রের জন্ম, ধূলিকণা এবং ছায়াপথের বিবর্তন সম্পর্কে আরো বিশদভাবে জানতে অনুমতি দেয় । এটি কেবল একটি ছবি নয়, মহাবিশ্বের ইতিহাসের একটি অংশ যা মানবজাতির কৌতূহল এবং অজানাকে জানার চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার প্রতীক । মহাজাগতিক সৌন্দর্যের অধিকারী NGC 2090 ছায়াপথ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মহাবিশ্ব কতোটা বিশাল এবং আমরা কতো কম আবিষ্কার করেছি । এটি আমাদেরকে আরো জানতে, আরো দেখতে এবং এর রহস্যময় সত্যগুলো আবিষ্কার করতে মহাবিশ্বের গভীরে যেতে দুর্দান্তভাবে অনুপ্রাণিত করে । 

ছবি: NASA Solar System Exploration 

তথ্যসূত্র: Science & Cosmic Inside, www.sci.news, উইকিপিডিয়া । 

Wednesday, 27 November 2024

The bird

Bird also have language. 

Which he inherited from his mother. 

The pulse of his soul. 

Invisible divine power. 

However, I do not understand the language of bird. 

What is in his sweet voice? 

Which I got involved in an unknown attraction. 

A rainbow rises in the sky of fickle mind. 

Infinite source of inspiration. 

Bird is the unique beauty of nature. 

I think deeply about him and try to understand. 

The desire of arises to building relationship, love and intimate conversation. 

Competing fly with free bird, the mind wants to mix into the bluey. 

To get an ear I want to listen to the words stored in the depths of his mind. 

But, I can't. 

This is a heartache! 

It hurts me. 

Yet, I feel his language and entity with my heart. 

Where there is absolute peace and heavenly bliss. 


Saturday, 23 November 2024

Glance

Eyes never lie. 
Sweetheart is so in love— 
I saw her joy. 
Waywardness on that dirt road. 
Intense desire for unspoken words. 
Sometimes adventurousness. 
The silence of the millennium in the depths of steadfast glance. 
What as if, hundred ask? 
I saw affection on the sandy sea beach. 
Sometimes the glory of her extraordinary beauty. 
Secret love tryst with the full moon on moonlight night.  
The wailing of a heart burned by the atrocious wildfire of separation. 
I saw a pioneering role in building civilization.
Again ever perk arrogance. 
Or the poignant face of defeat. 
Nevertheless, her indomitable journey. 
Away, far away… 
In an unknown world of silence. 
But what, she is unbeaten? 
At the gentle touch of the beloved the turbulent waves rise in warm blood. 
Her life pulse shakes my being. 
A heavenly feeling. 
Eternal love. 

দৈত্যাকার বেতার ছায়াপথ আবিষ্কার

 


~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ  ও জ্যোতির্পদার্থবিদ Kathleen Charlton এর নেতৃত্বে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক দল আশ্চর্যজনক দানব আকৃতির ছায়াপথের সন্ধান পেয়েছেন । যা পূর্বে কখনোই উন্মোচিত হয়নি । এটি বৃহত্তম মহাজাগতিক কাঠামোর এক নতুন অন্তর্দৃষ্টি । দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাজ্য, স্পেন এবং চীনের গবেষকদের এ নতুন অনুসন্ধানটি সম্প্রতি পরিষেবা সাইট arXiv এ গত ১১ই নভেম্বর প্রকাশিত হয়েছে । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা Cosmological Evolution Survey (COSMOS) এর ক্ষেত্রে এ ছায়পথগুলোকে তদন্ত করতে ৫৪৪ MHz থেকে ১.৬৭ GHz পর্যন্ত বিভিন্ন কম্পাঙ্কে বা স্পন্দনহারে বেতার পর্যবেক্ষণের বিশদ বর্ণালী বিশ্লেষণের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত The MeerKAT radio interferometer বেতার টেলিস্কোপ ব্যবহার করেছেন । উচ্চ কম্পাঙ্কে ছায়াপথগুলোকে অধ্যয়নের জন্য এটি একটি চমৎকার দূরবীক্ষণ যন্ত্র । উক্ত গবেষণাটি The MeerKAT International GHz Tiered Extragalactic Exploration (MIGHTEE) জরিপের অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়েছিল । ফলে, গবেষকগণ ছায়াপথগুলো সম্পর্কে আকর্ষণীয় তথ্যাদি জানতে পেরেছেন । এ ছায়াপথগুলোর অধ্যয়ন মহাজাগতিক-মাপনী প্রক্রিয়াগুলোর সূক্ষদৃষ্টি প্রদান করতে পারে যেমন: প্রত্যেকটি ছায়াপথের গঠন, বিবর্তন, বিকাশ প্রক্রিয়া, আন্তঃগ্যালাকটিক মিথস্ক্রিয়া এবং আন্তঃনাক্ষত্রিক ও আন্তঃগ্যালাকটিক পরিবেশে পারমাণবিক কার্যকলাপের প্রভাব ইত্যাদি । পর্যবেক্ষণগুলোতে বর্ণালী বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিটি ছায়াপথের ফিনকি স্রোত বা প্রবাহে (Jet) প্রাণরসের (Plasma) বয়স মানচিত্রকরণ সম্ভব হয়েছে ।  

এ দৈত্যাকার বেতার ছায়াপথগুলোকে (Giant radio galaxies বা GRGs) পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের বৃহৎ জ্যোতির্পদার্থগত উৎস বা বৃহত্তম কাঠামোগুলোর মধ্যে একটি বিবেচনা করা হয়, যেখানে রয়েছে তেজস্ক্রিয় প্রাণরসের বিশাল ফিনকি স্রোত যা কয়েক হাজার থেকে মিলিয়ন কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত । ছায়াপথগুলো∼০.৭ থেকে ৫ মেগাপারসেক পর্যন্ত রৈখিক আকারের সক্রিয় ছায়াপথগুলোর একটি চরম শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে । এরা স্বাগতিক ছায়াপথ থেকে সমৃদ্ধ উপাদানগুলোকে বড় দূরত্বে পরিবহন করতে পারে এবং অ-তাপীয় কণা ও চৌম্বক ক্ষেত্রগুলোর সাথে আন্তঃগ্যালাকটিক মাধ্যমকে (Intergalactic medium বা IGM) দূষিত করতে পারে । অ-তাপীয় চৌম্বকীয় প্রাণরস কোটি কোটি বছর ধরে আন্তঃগ্যালাকটিক মাধ্যমে লুকিয়ে থাকতে পারে এবং অশান্ত আন্তঃস্তবক মাধ্যম (Turbulent intra-cluster medium), কেন্দ্রীয় বেতার হ্যালোগুলো (Central radio haloes) ও সীমান্তবর্তী বেতার ধ্বংসাবশেষের (Peripheral radio relics) সাথে যুক্ত শক্তিশালী অভিঘাত তরঙ্গগুলো (Shockwaves) উচ্চ-শক্তির বীজ কণাকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উৎস হয়ে উঠতে পারে । 

গবেষণার ক্ষেত্রে জরিপ করা ৩টি বৃহৎ ছায়াপথের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে যেমন: (ক) MGTC J095959.63+024608.6 (খ) MGTC J100016.84+015133.0 এবং (গ) MGTC J100022.85+031520.4 । এদের মধ্য থেকে MGTC J100022.85+031520.4 ছায়াপথটিকে (যাকে GRG3 ছায়াপথ বলে) এ গবেষণার অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো চিহ্নিত করা হয় । নতুন GRG3 বেতার ছায়াপথের প্রত্যাশিত বা অভিক্ষিপ্ত রৈখিক আকার প্রায় ৪.২ মিলিয়ন আলোকবর্ষ, যার ভর ৯৩ ট্রিলিয়ন সৌর ভর এবং ১২৮৪ MHz এ মোট ৫৯৭ ZW/Hz শক্তি । সবচেয়ে উজ্জ্বল একটি স্পার্স ছায়াপথ স্তবকের (Sparse galaxy cluster WHL J100022.9+031521) কেন্দ্রে GRG3 ছায়াপথ অবস্থিত । ধারণা করা হয় যে, ছায়াপথটির উপরের খণ্ডে (Lobe) বাঁকানো অঙ্গবিন্যাস (Wide-angle-tail বা WAT) হচ্ছে এটির বেতার উৎস, যা স্বাগতিক ছায়াপথে অনুরূপ বৈশিষ্ট্য রয়েছে । সাধারণভাবে WAT বেতার উৎসগুলো শক্তিশালী এবং প্রায়শই ছায়াপথ স্তবকের কেন্দ্রে অবস্থিত, যেখানে Intracluster medium ram pressure দ্বারা খণ্ডগুলো তাদের বৈশিষ্ট্যযুক্ত সি-আকৃতিতে বাঁকতে পারে । এ বেতার উৎসগুলো গ্যালাকটিক কেন্দ্রের সক্রিয় নিউক্লিয়াসে জন্মগ্রহণ করে । বেতার উৎসগুলোর গঠন এবং বিবর্তন সম্পর্কে আরো সুনির্দিষ্টভাবে অধ্যয়ন করার জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে দৈত্যাকার বেতার ছায়াপথগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ । অতএব, GRG3 ছায়াপথটিকে স্তবক পরিবেশে বসবাস করার জন্য পরিচিত দৈত্যাকার বেতার ছায়াপথগুলোর মাত্র শতকরা ৪ ভাগের মধ্যে ১টি করে তোলে । অপার বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৌন্দর্য ও কৌতূহলের অধিকারী এ GRG3 ছায়াপথটি স্বাগতিক উপবৃত্তাকার ছায়াপথ SDSS J100022.85+031520 দ্বারা আশ্রিত হয়েছে যার লাল স্থানান্তর (Redshift) প্রায় ০.১০৩৪ । সংগৃহীত তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে, GRG3 ছায়পথের গতিশীল বয়স প্রায় ১ বিলিয়ন বছর (বর্ণালী বয়স প্রায় ৬৭ মিলিয়ন বছর) এবং এর ফিনকি স্রোতের শক্তি ১ মিলিয়ন QW এর স্তরে রয়েছে ।  

আবিষ্কৃত এ অসুর বেতার ছায়াপথগুলোকে তাদের বিশাল আকৃতি দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হয়, যা প্রায় ৭০০ কিলোপারসেক ছাড়িয়ে যায় । এরা সাধারণত কম ঘনত্বের পরিবেশে জন্মানো মহাজাগতিক বিরল বস্তু এবং সিঙ্ক্রোট্রন-নিঃসরণকারী প্রাণরসের (Synchrotron-emitting plasma) ফিনকি স্রোত ও খণ্ডগুলোকে (Lobes) প্রদর্শন করতে দেখা যায় । এ ছায়াপথগুলো Galactic nucleus থেকে নির্গত প্রাণরসের ফিনকি স্রোতগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে । গ্যালাকটিক কেন্দ্রস্থলে একটি অতিবৃহদাকার কৃষ্ণ গহ্বরের কার্যকলাপের ফলে এ স্রোতগুলো তৈরি হয়, যা অত্যন্ত শক্তিশালী তেজস্ক্রিয় বিকিরণ নির্গত করে । “Jet feedback" নামে পরিচিত এ ঘটনাটি আন্তঃগ্যালাক্টিক পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে এবং পরিবেশের গ্যাসকে উত্তপ্ত করে নতুন নক্ষত্রের গঠন প্রতিরোধ করতে পারে কিংবা বাধা দিতে পারে ।  

দানবীয় বেতার ছায়াপথগুলো শনাক্তকরণের ফলে বিশাল গ্যালাকটিক কাঠামো এবং তাদের চারপাশের মধ্যে সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখে । Jaffe-Perola model এবং Tribble model পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে গবেষণাটি করা হয় । এ নকশাগুলো বিভিন্ন কম্পাঙ্কের মাধ্যমে বিকিরণ পরিমাপ করে প্রাণরসের বার্ধক্য বর্ণনা করে । যেখানে GRG1 ছায়াপথ এবং GRG2 ছায়াপথের সাধারণ বয়স বন্টন রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে কনিষ্ঠ প্রাণরস হচ্ছে ছায়াপথের কেন্দ্রস্থলে এবং সবচেয়ে পুরোনো প্রাণরসটি ছায়াপথের বাইরের বাহুতে অবস্থিত । এ গবেষণাটি দৈত্যাকার বেতার ছায়াপথগুলোর শারীরিক প্রক্রিয়া এবং পরিবেশের উপর তাদের প্রভাব বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ । এ বিস্ময়কর আবিষ্কারগুলো কেবল মহাবিশ্বের বোঝার ক্ষেত্রেই অবদান রাখে না,  পাশাপাশি বেতার-জ্যোতির্বিদ্যা বিশ্লেষণের জন্য উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যৎ অধ্যয়নের দরজাও খুলে দেয় ।  

তথ্যসূত্র এবং ছবি: https://phys.org/ , www.hayadan.com  । 

Tuesday, 12 November 2024

নিউট্রন নক্ষত্র (Neutron Star)

 



প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর পূর্বে একটি বৃহৎ পরমাণুর মহাশক্তিশালী মহাবিস্ফোরণের (Big Bang) ফলে মহাবিশ্বের (The Universe) উৎপত্তি হয় । এই মহাবিস্ফোরণটি ভয়ানক হিংস্রভাবে সম্প্রসারিত মহাবিশ্বের মধ্যে শক্তি বিকিরণকারী প্রচণ্ড শক্তিশালী অভিঘাত তরঙ্গের (Shockwave) সৃষ্টি করে । এক সেকেন্ডের এক মিলিয়ন ভাগের এক ভাগ সময়ে মহাবিশ্বের অস্তিত্বের আদিম গঠন তিনটি স্বতন্ত্র পর্যায়গুলোর মধ্য দিয়ে স্থানান্তরিত হয় । যেমন: তড়িচ্চুম্বকীয়, মাধ্যাকর্ষণ এবং দুর্বল বা শক্তিধর শক্তিগুলো মৌলিক শক্তি হিসেবে আকার ধারণ করে । সেই সময় প্রোটন এবং নিউট্রন গঠনের জন্য তাপমাত্রা ছিল অত্যাধিক । পরবর্তীতে তাদের অভ্যন্তরীণ অংশ থেকে তৈরি সুরুয়া (Soup) মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে । এটি Quark বা Gluon নামেও পরিচিত । চোখের পলকেই এই সুরুয়া ঠান্ডা হয়ে সাধারণ বস্তু বা পদার্থের প্রথম লক্ষণগুলোর জন্ম দেয় । বিজ্ঞানীদের ধারণা, অতিক্ষুদ্র মৌলকণার সুরুয়া শুধুমাত্র প্রাকৃতিকভাবেই নিউট্রন নক্ষত্রের কেন্দ্রস্থলে বিদ্যমান থাকতে পারে । প্রলয়ঙ্করী মহাবিস্ফোরণের পর প্রায় ৩ লক্ষ ৮০ হাজার বছর থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক শত মিলিয়ন বছর পর্যন্ত হাইড্রোজেন এবং খুবই সামান্য পরিমাণ হিলিয়াম নিউক্লিয়াস আলফা কণা ছাড়া বিভিন্ন গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ ইত্যাদি বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের কোনো অস্তিত্বই ছিল না । তাই, এই সময়টিকে বলা হয় অন্ধকার যুগ । সময়ের হাত ধরে এই মহাবিশ্ব বা মহাজাগতিক উত্তপ্ত বস্তুগুলো ধীরে ধীরে শীতল হয় । মহাবিস্ফোরণের পরপরই মহাবিশ্বের উপর আধিপত্য বিস্তারকারী প্রচণ্ড গরম ও ঘন পদার্থ Plasma Soup (Quark-Gluon Plasma) থেকে আলো বের হয়ে আসতে পারছিল না । পরবর্তীতে হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো প্লাজমা’র সাথে ধাক্কা খেয়ে ফোটন আলোককণা বের হয়ে আসে । নক্ষত্র জন্ম নেয় । সেটিই হয় আলোর উৎস যেখান থেকে আলো আসতে শুরু করে । তবে, সেই অন্ধকার যুগ নির্দিষ্টভাবে ঠিক কখন শেষ হয়েছিল কিংবা কখনোইবা প্রথম নক্ষত্র, ছায়াপথ, গ্রহ এবং প্রাণের উদ্ভব বা জীবনের শুরু হয়েছিল— তা এখনো অজানা ।

এই মহাবিস্ফোরণের প্রায় ৩ মিনিট থেকে ১০০০০০ বছরের মধ্যে হাইড্রোজেন এবং হিলিয়ামসহ প্রচুর পরিমাণ ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন, ইলেকট্রন প্লাজমা ও ভারি বস্তুকণা তৈরি হয় । অসংখ্য বস্তুকণা প্রচণ্ড গতিতে মহাবিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যায় এবং এদের কণিকাগুলো ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত । এগুলো ধীরে ধীরে শীতল হয় এবং ভিতরের আন্তঃআকর্ষণের কারণে বস্তুকণা বা বস্তুপুঞ্জগুলো কাছাকাছি চলে আসে । দলবদ্ধ বস্তুপুঞ্জের ঘনত্ব বৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত মহাকর্ষীয় আকর্ষণের ফলে একটি ঘূর্ণনগতির সৃষ্টি হয় । এই ঘূর্ণন গতির কারণেই মহাকাশের মেঘগুলো ঘূর্ণায়মান চাকতিতে পরিণত হয় । পর্যায়ক্রমে নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বস্তুপুঞ্জগুলো বিভিন্ন আকৃতির একক দল গঠন করে এই অসীম মহাবিশ্বে ছায়াপথ, ছায়াপথ স্তবক এবং ছায়াপথ মহাস্তবক ইত্যাদি সৃষ্টি করে । এই ছায়াপথ মহাস্তবকের সম্মিলিত ভর একটি মহাকর্ষীয় অক্ষিকাচ (Gravitational Lens) হিসেবে কাজ করে এবং অনেক দূরবর্তী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলোকবিন্দুগুলোকে বিবর্ধিত করে । যেখানে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য লাল-নীল-সবুজ ছায়াপথ, নক্ষত্রপুঞ্জ, অগণিত গোল-চ্যাপ্টা-লম্বাটে বিভিন্ন আকারের নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহ, ধূমকেতু এবং উল্কা ইত্যাদি । এক একটি ছায়াপথ প্রতিটি ছায়াপথগুচ্ছকে ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছে ৷ বিশাল আকৃতির ছায়াপথসহ মহাজাগতিক বিভিন্ন বস্তুগুলোকে সরাসরি কিছু ভর ও মহাকর্ষীয় শক্তি বৃদ্ধি করে এদেরকে মহাকাশে একটি সু-শৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে একসাথে ধরে রেখেছে এক প্রকার রহস্যজনক অদৃশ্য ‘অন্ধকার পদার্থ’ (Dark Matter) ৷ ছায়াপথ থেকে শুরু করে মহাজাগতিক অন্যান্য বস্তু এমনকি আমাদের দেহের উপাদানও এই অন্ধকার পদার্থের অন্তর্ভুক্ত । সৃষ্টিতত্ত্বে এটিকে Baryonic Dark Matter বলে ৷ এই সীমানাহীন মহাবিশ্বে শতকরা ৪.৯ ভাগ পদার্থ হচ্ছে সাধারণ Matter, শতকরা ২৬.৮ ভাগ পদার্থ Dark Matter, শতকরা ৬৮.৩ ভাগ Dark Energy যাদের রয়েছে এক শক্তিশালী অদৃশ্য প্রভাব এবং পাশাপাশি নিউট্রিনো ও ফোটন কণার মতো অন্যান্য উপাদানগুলো খুবই সামান্য পরিমাণে অবদান রাখে ৷ কিন্তু এই Dark Energy (অন্ধকারশক্তি / তমোশক্তি / গুপ্তশক্তি / কৃষ্ণশক্তি) হচ্ছে বিশাল মহাবিশ্বের মহাকর্ষীয় বলের মূল চালিকাশক্তি যেটি সমস্ত মহাশূন্য জুড়ে বিস্তৃত এবং এটি মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে । অসংখ্য নক্ষত্র, নাক্ষত্রিক অবশেষ, গ্রহাণু, উল্কা, ধূমকেতু, আন্তঃগ্রহীয় ধূলি মেঘ, আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাস, ধূলিকণা, নীহারিকা, সৌরজগৎ এবং অদৃশ্য পদার্থসহ মহাজাগতিক নানা বস্তুর সমন্বয়ে গঠিত হয় এক একটি ছায়াপথ । একটি ছায়াপথে গড়ে প্রায় ১০০ – ৫০০ বিলিয়ন নক্ষত্র থাকে । আকাশগঙ্গা ছায়াপথের (Milky Way Galaxy) ব্যাস হচ্ছে ১০০০০০ আলোকবর্ষ । এই রকম প্রায় অর্ধশতাধিক ছায়াপথের সমন্বয়ে গঠিত হয় এক একটি ছায়াপথ স্তবক বা গুচ্ছ (Galaxy cluster) । ছায়াপথ স্তবকগুলোই গঠন করে একটি ছায়াপথ মহাস্তবক (Galaxy Supercluster) যেটি মহাবিশ্বে এক বিশাল মহাকর্ষীয় কাঠামো তৈরি করে যেখানে কয়েক লক্ষ ছায়াপথের আবাসস্থল । এই সকল ছায়াপথ মহাস্তবকের মাঝে বিদ্যমান একটি ছায়াপথ স্তবক থেকে অন্য এক একটি ছায়াপথের মধ্যকার দূরত্ব থাকে লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ । সুতরাং একটি ছায়াপথ মহাস্তবকের আকার কতো বৃহৎ, তা নিশ্চয়ই চিন্তার বিষয়? ল্যানিয়াকিয়া ছায়পথ মহাস্তবক (Laniakea Galaxy Supercluster) হচ্ছে আমাদের নিজস্ব বাসস্থান যেখানে আকাশগঙ্গা ছায়াপথসহ আশেপাশে প্রায় ১০০০০০ অন্যান্য ছায়াপথের আবাসস্থল । আর ঐ আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৭০০০ আলোকবর্ষ দূরে ছায়াপথের এক অতি ক্ষুদ্র অংশের সর্পিল কালপুরুষ বাহুর (The Orion Arm) এক প্রান্তে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর পূর্বে জলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্য নামক নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে একাধিক গ্রহ নিয়ে গঠিত হয়েছে আমাদের সৌরজগৎ (Solar System) । যদিও, আদি মহাবিশ্বের ইতিহাস খুবই হিংস্র । এক মহা দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মহাবিশ্বের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সৌরজগতের সৃষ্টি । কালের আবর্তে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে প্রচণ্ড উত্তপ্ত থেকে পৃথিবী গ্রহটি এক সময় ঠাণ্ডা, শান্ত এবং জীবন ধারণের উপযোগী হলে এখানে প্রাণের উদ্ভব হয় । আজ এই সবুজ গ্রহটিই আমাদের বাড়ি । মায়ের কোলের মতোই নিরাপদ আশ্রয়স্থল । কিন্তু, এই মৃত্যুন্মুখ গ্রহটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে! মানবজাতি টিকবে তো?

বৃষ্টিহীন অন্ধকার রাতে মহাকাশের দিকে তাকালে জ্বলজ্বল করা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অগণিত আলোকবিন্দু দেখা যায় । এদের কোনোটি মিটমিট করে জ্বলে এবং কোনোটি স্থির হয়ে জ্বলছে । মিটমিটে আলোকবিন্দুগুলোই হচ্ছে এক একটি নক্ষত্র । এরা নিজে নিজেই জ্বলে । অন্যদিকে স্থির আলোকবিন্দুগুলো হচ্ছে বিভিন্ন গ্রহ । এগুলো নক্ষত্রের আলোয় আলোকিত । মহাকাশে অবস্থিত কোনো মহাজাগতিক বস্তু নিজের অভ্যন্তরীণ পদার্থকে নিউক্লীয় সংযোজন বা একীকরণ বিক্রিয়া (Nuclear Fusion) ঘটিয়ে ক্রমাগত জ্বালানি উৎপন্ন করে নিজেকে জ্বালিয়ে প্রচুর পরিমাণ আলো ও তাপ সৃষ্টি করে উজ্জ্বলিত থাকে তাকেই নক্ষত্র বলে । এছাড়া, মহাশূন্যে আয়নিত গ্যাস বা প্লাজমা দশায় অবস্থিত অতি উজ্জ্বল এবং সুবৃহৎ জ্বলন্ত অগ্নিগোলককেও নক্ষত্র বলে । নক্ষত্রের জীবনচক্র হতে পারে শত শত মিলিয়ন কিংবা বিলিয়ন বছর সময়কাল । মহাকাশে প্রতিনিয়ত এই নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যুর খেলা চিরকাল ধরে চলছে । একটি নক্ষত্রের জন্মকাল থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে যে বিবর্তন ঘটে থাকে তাকে বলা হয় ‘নাক্ষত্রিক বিবর্তন’ (Stellar Evolution) । নক্ষত্রের হাইড্রোজেন জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার পর বিকিরণের চাপে এর ব্যাসার্ধ বেড়ে গিয়ে একটি লোহিত দানব নক্ষত্রে পরিণত হয় ৷ এক পর্যায় এটি ধীরে ধীরে ‘শ্বেত বামন’ নক্ষত্রে রূপ নেয় । তবে, কখনো দুর্লভভাবে নক্ষত্রটি ভয়ঙ্কর নাক্ষত্রিক বিস্ফারণের মধ্য দিয়ে পুরো সৌরজগতকেও নিমিষেই ধ্বংস করে দিতে সক্ষম । Star শব্দটি গ্রিক শব্দ Aster থেকে এসেছে, যেটি হিত্তীয় ভাষার শব্দ শিত্তার থেকে উদ্ভূত । শিত্তার শব্দের ব্যুৎপত্তি হয়েছে সংস্কৃত শব্দ সিতারা থেকে । একটি নক্ষত্রের আকার, উজ্জ্বলতা‌, বিবর্তন, জীবনচক্র এবং সর্বশেষ নিজের ধ্বংস সবকিছুই নির্ভর করে তার ভরের উপর । ভর যতো বেশি হয়, ততোই দ্রুত জ্বালানি শেষ হয় ৷ এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তম লাল মহাদানব নক্ষত্রটি হচ্ছে UY Scuti । এটি সূর্যের চেয়ে প্রায় ১০০০ গুণেরও বেশি প্রশস্ত । অধিকাংশ নক্ষত্রের বয়স ১০০ – ১০০০ কোটি বছরের মধ্যে । তবে, অতিপ্রাচীন কিছু নক্ষত্রের বয়স এই মহাবিশ্বের বয়সের কাছাকাছি- যেখানে মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর । একটি অতি প্রাচীন নক্ষত্র হচ্ছে HE1523-0901 যেটির বয়স প্রায় ১৩২০ কোটি বছর । মহাকাশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধূলিকণা, বস্তুপুঞ্জ, হাইড্রোজেন গ্যাস এবং প্লাজমা দ্বারা গঠিত এক ধরনের আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘকে ‘নীহারিকা’ বলে । এই নীহারিকায় শতকরা ৫০ – ৭৫ ভাগ হাইড্রোজেন গ্যাস, শতকরা ২০ – ৪৫ ভাগ হিলিয়াম গ্যাস এবং শতকরা ৫ ভাগ অন্যান্য মৌলিক পদার্থ রয়েছে । সুবিশাল আকারের এন্ড্রোমিডা ছায়াপথের পূর্ব নাম ছিল Andromeda Nebula । জমাট বাঁধা ঠাণ্ডা নীহারিকা থেকেই নক্ষত্রের জন্ম ।

নক্ষত্রের জ্বালানি হচ্ছে হাইড্রোজেন বা উদজান । হাইড্রোজেন একটি মৌলিক পদার্থ এবং এর পরমাণুতে ১টি মাত্র ইলেকট্রন থাকে ৷ এই ইলেকট্রনটি নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে ৷ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির সময় তৈরি হওয়া প্রথম মৌল হাইড্রোজেনের ৩টি আইসোটোপ রয়েছে যেমন: (ক) প্রোটিয়াম (খ) ডিউটেরিয়াম (গ) ট্রিটিয়াম ৷ মহাকর্ষ বলের প্রভাবে নক্ষত্রমণ্ডলীয় গ্যাস এবং ধূলিকণা মেঘ বা গ্যাসের ধূলিমেঘ (Dust Cloud) জমাটবদ্ধ হয়ে একটি নক্ষত্রের জন্ম প্রক্রিয়া শুরু হয় । মহাকাশে মেঘ যতো বেশি জমাটবদ্ধ হয় নক্ষত্রের অভ্যন্তরীণ অণুগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের তীব্রতাও ততো বেশি বৃদ্ধি পায় । এতে করে প্রচণ্ড উত্তাপের সৃষ্টি হয় । এই তাপ এমন এক পর্যায় (তাপমাত্রা যখন প্রায় ১ কোটি কেলভিনে উন্নীত হয়) গিয়ে পৌঁছানোর পর নক্ষত্রের অভ্যন্তরে চলতে থাকা নিউক্লীয় কেন্দ্রীন সংযোজন বা একীকরণ বিক্রিয়ার কারণে ৪টি হাইড্রোজেন পরমাণু তার নিজের চেয়ে হালকা, বর্ণহীন, গন্ধহীন এবং স্বাদহীন নিস্ক্রিয় গ্যাস হিলিয়াম পরমাণুতে পরিণত হয় । পরবর্তীতে এই হিলিয়াম পরমাণুগুলো একত্রিত হয়ে সৃষ্টি করে কার্বন এবং সেই কার্বনের সংযোজনে তৈরি হয় নিয়ন, সিলিকন ও লোহা । অবশেষে কেন্দ্রীন বিক্রিয়ায় তাপ শোষীত হয় । যখন নক্ষত্রটির জ্বালানি হাইড্রোজেন তথাপি হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস খুবই দ্রুত দহন হয়ে ফুরিয়ে যায় তখন ‘শেষ হুররাহ’ (Last Hurrah) ঘটে । এর ফলে নক্ষত্রের অভ্যন্তরস্থ বহির্মুখী চাপ যথেষ্ট পরিমাণ কমে যায়, যেখানে মহাজাগতিক বস্তু নক্ষত্রটি আমাদের সূর্যের ভরের চেয়ে অন্তত ৫ গুণে প্রসারিত হয়— যার আকার প্রায় ৩৩৩০০০ পৃথিবীর সমান । এক সময় নক্ষত্রটি নিজের মাধ্যাকর্ষণ বলকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে না, ফলে নক্ষত্রের বেশিরভাগ ভরই এর কেন্দ্রে সংকুচিত হয়ে ফুলে উঠে বাইরে থাকা গ্যাসীয় অঞ্চলটি প্রচণ্ড শক্তিশালী মহাপ্লাবনের মতো ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের (প্রচণ্ড অন্তস্ফোটন বা Implosion) সৃষ্টি করে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৫০০০ – ৪০০০০ কিলোমিটার প্রবলবেগে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে । এই বিশাল মহাজাগতিক বিস্ফোরণের নামই অতিনবতারা (Supernova) । অবশেষে যদি নক্ষত্রটির ভর প্রায় ৩ M সৌর ভরের চেয়ে বেশি হয়, তখন এটি মহাকর্ষীয় পতন ঘটিয়ে একটি কৃষ্ণগহ্বরে (Black Hole) পরিণত করে ।

সূর্য হচ্ছে একটি নক্ষত্র । আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রের খুব কাছের নক্ষত্রটি সূর্য । সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে ১১টি গ্রহ, অসংখ্য গ্রহাণুপুঞ্জ, ধূমকেতু এবং উল্কা ইত্যাদি । সূর্যের ব্যাস প্রায় ১.৩৯২´১০৬ কিলোমিটার যা পৃথিবীর ব্যাস থেকে ১০৯ গুণ বড় । সূর্যের ভর প্রায় ১.৯৮৯১´১০৩০ কিলোগ্রাম, যা পৃথিবীর ভরের চেয়ে ৩৩২৯৫০ গুণ বেশি । এই ভর সৌরজগতের মোট ভরের শতকরা প্রায় ৯৯.৮৬ ভাগ । পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব প্রায় ১৫২১০০০০০ কিলোমিটার বা ৯৪৫০০০০০ মাইল (আলোর গতিতে) । আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব ২৭২০০ আলোকবর্ষ ৷ সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে ৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ড । ফলে সূর্যালোকশক্তি এই সবুজ গ্রহের জলবায়ু এবং আবহাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রায় সকল জীবকে বাঁচিয়ে রাখে । সূর্যের কেন্দ্রভাগের ঘনত্ব ১৫০ গ্রাম/ঘনসেন্টিমিটার এবং তাপমাত্রা প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ কেলভিন (~১৩.৬ MK) ৷ যদিও ছটামণ্ডল বা সৌর করোনায় তাপমাত্রা থাকে ৫ MK এবং সূর্যপৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৫৭৮৫ কেলভিন । সূর্যের অন্যান্য বিকিরণ অঞ্চলের তুলনায় এর কেন্দ্রভাগে ঘূর্ণন বেগ অত্যাধিক বেশি । সূর্য সর্বদা প্রোটন শিকল বিক্রিয়ার (Proton Chain Reaction) মাধ্যমে হাইড্রোজেন কেন্দ্রীন সংযোজন বা একীকরণ প্রক্রিয়া দ্বারা হিলিয়াম গ্যাস উৎপাদন করে । এটিই হচ্ছে সূর্যের শক্তির প্রধান উৎস । ফলে তৈরি হয় ফোটন আলোককণা, উত্তাপ, তেজস্ক্রিয় রশ্মি, শক্তি এবং গ্যাস । সূর্যের বর্ণালী শ্রেণী সংকেত G2V । প্রায় পূর্ণগোলক হলদে বামন নক্ষত্র সূর্যের প্রধান গাঠনিক উপাদান হচ্ছে: হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, অক্সিজেন, কার্বন, নিয়ন, আয়রন, নাইট্রোজেন, সিলিকন, ম্যাগনেসিয়াম এবং সালফার ইত্যাদি ৷ প্লাজমা কণা বা আয়নিত গ্যাস এবং ইলেকট্রনের সমন্বয়ে গঠিত সূর্যের মধ্যে রয়েছে এক মহাশক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র ৷ সূর্যপৃষ্ঠে কিছু কালো দাগ দেখা যায় যেটি ‘সৌরকলঙ্ক’ (Sunspot) নামে পরিচিত । প্রায় ১০০০ কোটি বছর পূর্বে মহাকাশীয় নক্ষত্রের সমাবেশে বা নক্ষত্রমণ্ডলে সূর্যের ভ্রূণ সৃষ্টি হয় । পরবর্তীতে মহাকালের চক্রে এটি প্রায় ৪৫০ – ৫০০ কোটি বছরের মধ্যে স্থিতিবস্থায় ফিরে আসে । অনুমান করা হয় যে, কোটি কোটি বছর ধরে জ্বলতে থাকা এই নক্ষত্রটি মহাকর্ষীয় শক্তির প্রভাবে প্রায় ৫০০ কোটি (৫ বিলিয়ন) বছরের মধ্যে সূর্যের কেন্দ্রীয়ভাগ বা মূল অংশে হাইড্রোজেন পরমাণু হ্রাস পাবে কিংবা হাইড্রোজেনের অভাবে পারমাণবিক সংশ্লেষণ বা একীভবন আর হবে না ৷ ফলে, সূর্যের জ্বালানি সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে ‘লাল দানবে’ রূপ নিয়ে এটির কেন্দ্রে ত্রি-আলফা বিক্রিয়ার মাধ্যমে হিলিয়াম পুড়ে কার্বন ও অক্সিজেন উৎপন্ন করবে । এক সময় প্রচণ্ড উত্তপ্তভাবে অতিনবতারা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে এর ভয়ঙ্কর পরিণতি ঘটবে! অর্থাৎ, এক অগ্নিময় মৃত্যুর (Fiery Death) মাধ্যমে সূর্যের পরিসমাপ্তি হবে ।

অতিনবতারা এক প্রকার নক্ষত্রের বিষ্ফোরণ । যেটি মহাকাশে ঘটে থাকে । অপার মহাবিশ্বের এক মহাবিষ্ময়! অতিনবতারা বিস্ফোরণের ফলে নক্ষত্রটি ধীরে ধীরে উজ্জ্বল থেকে ক্রমশঃ উজ্জ্বলতর হয়ে চিরতরে নিভে যায় বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় ৷ অতিনবতারা হচ্ছে মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী আলোক বিচ্ছুরনকারী বিস্ফোরণ । সূর্যের জীবদ্দশায় যে পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করে অতিনবতারা বিস্ফোরণে এক সেকেন্ড সময়ে সে পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয় । এই বিস্ফোরণের ফলে তীব্র আলোক বিকিরণ, প্রচুর পরিমাণে শক্তি, বিশাল ধ্বংসাবশেষ, ভারী মৌলিক পদার্থ বা বস্তুকণা বা মৌল কণা, পি-নিউক্লিয়াস আইসোটোপ এবং অতি উচ্চ শক্তির মহাজাগতিক তেজস্ক্রিয় রশ্মি নির্গত হয় । এছাড়া, ভয়ানক ধূলিকণা মেঘের সৃষ্টি করে । নক্ষত্রটির বিস্ফোরণের মাত্রা এতই তীব্র যে, এটি পুরো ছায়াপথের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে । যদিও সেই আলোকচ্ছটার ঔজ্জ্বল্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না, ধীরলয়ে নিষ্প্রভ হয়ে যায় । অতিনবতারা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে একটি নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটে । আর এখান থেকেই পুনরায় নতুন প্রজন্মের অত্যন্ত উজ্জ্বল নিউট্রন নক্ষত্র জন্ম নেয় । এছাড়া পালসার নক্ষত্র, গ্রহ, শীতল নীহারিকা এবং কৃষ্ণ গহ্বরের সৃষ্টি করে । যদিও নক্ষত্রটি মৃত্যুর আগে নিউট্রনে ভর্তি দানবে পরিণত হয় । অতিনবতারা বিস্ফোরণের সময় নক্ষত্রের প্রোটন এবং ইলেকট্রন মিলে প্রচুর পরিমাণে নিউট্রন তৈরি করে । অর্থাৎ, অতিনবতারা বিস্ফোরণ হচ্ছে একটি নিউক্লীয় বিক্রিয়া । এতে করে প্রচুর পরিমাণে বৈদ্যুতিক আধানশূন্য এবং ভরহীন মৌলকণা Neutrino তৈরি হয় । এই নিউট্রিনো আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূলি, গ্যাস এবং মহাজাগতিক ধূলি দ্বারা বিক্ষিপ্ত বা শোষিত হয় না । নাক্ষত্রিক বিস্ফোরণের পর নক্ষত্রের যে অবস্থা থাকে বা উৎপন্নকৃত নক্ষত্রকে নিউট্রন নক্ষত্র (Neutron Star) বলে ৷ আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায়, একটি অতিবৃহৎ নক্ষত্রের অতিনবতারা বিস্ফোরণ বা ধ্বংসের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট প্রচণ্ড ঘন অবশেষ বা নক্ষত্রের ভেঙে পড়া কেন্দ্রই হচ্ছে নিউট্রন নক্ষত্র । সূর্যের মতো নক্ষত্রে ইলেকট্রন, প্রোটন এবং সামান্য পরিমাণে নিউট্রন থাকে । কিন্তু, এই নিউট্রন নক্ষত্রের ভেতরটা বেশিরভাগই নিউট্রন (অতিপারমাণবিক কণা বা বৈদ্যুতিক আধানশূন্য বা নিরপেক্ষ কণা) দিয়ে গঠিত এবং এতে প্রোটন (ধনাত্মক চার্জযুক্ত কণা) ও ইলেকট্রনের (ঋণাত্মক চার্জযুক্ত কণা) ছোট ভগ্নাংশের সাথে নিউক্লিয়াস থাকে । একটি বিশাল নক্ষত্রের জ্বালানি ফুরিয়ে অতিনবতারা বিস্ফোরণের পর নক্ষত্রের বহিরাবরণটা প্রচণ্ড বেগে মহাকাশে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে পড়ে । শুধুমাত্র এর কেন্দ্রীয় অঞ্চলটিই বাকি থাকে । অন্তস্তল ভেঙে পড়ে, প্রতিটি প্রোটন এবং ইলেক্ট্রন একত্রিত হয়ে নিউট্রনে পরিণত হয় । Astroseismology, নক্ষত্রের উপর গবেষণা এবং নাক্ষত্রিক দোলনের পর্যবেক্ষিত বর্ণালী বিশ্লেষণ করে নিউট্রন নক্ষত্রের অভ্যন্তরীণ গঠন আরো বিশদভাবে জানা যেতে পারে । একটি নিউট্রন নক্ষত্রপৃষ্ঠের পদার্থটি পারমাণবিক নিউক্লিয়াস (নক্ষত্রের ক্ষয়প্রাপ্ত বা অধঃপতিত উপাদান বা পদার্থ / Degenerate Matter) দ্বারা গঠিত । নিউট্রন নক্ষত্রের কেন্দ্রে পরমাণুগুলো খুবই শক্তভাবে একত্রে লেগে থাকে এবং তাপমাত্রা থাকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড । যখন বিশাল নক্ষত্রগুলো অতিনবতারা হিসেবে বিস্ফোরিত হয়, তখন এরা নিউট্রন নক্ষত্র এবং কৃষ্ণ গহ্বরকে পিছনে ফেলে । কৃষ্ণগহ্বর, শ্বেত গহ্বর, কোয়ার্ক নক্ষত্র, ইলেক্ট্রোউইক নক্ষত্র এবং স্ট্রেঞ্জ নক্ষত্রকে বাদ দিলে নিউট্রন নক্ষত্র হচ্ছে মহাবিশ্বের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম নক্ষত্র । নিউট্রন নক্ষত্র কৃষ্ণগহ্বরের চেয়ে কম ঘন বলেই শুধুমাত্র কৃষ্ণ গহ্বর দ্বারা অতিক্রম করে । এই নিউট্রন নক্ষত্র এবং কৃষ্ণ গহ্বরের মধ্যে কাছাকাছি কিছু সহচর নক্ষত্র রয়েছে যারা রঞ্জন-রশ্মিগুলোর (X-rays) শক্তিশালী উৎস হয়ে উঠে । কারণ, তারা তাদের সঙ্গী বস্তু বা পদার্থকে সরিয়ে দেয় (Ultra এবং Hyperluminous X-ray উৎস হিসেবে পরিচিত) । উজ্জ্বলতম রঞ্জন-রশ্মিগুলোর উৎস সম্ভবত কৃষ্ণ গহ্বরের সহচর নক্ষত্রের সাথে । নিউট্রন নক্ষত্রের অধিকাংশই বেতার তরঙ্গ বা তড়িৎ-চৌম্বকীয় বিকিরণ নির্গত করে । কিছু নিউট্রন নক্ষত্র শুধুমাত্র তাপীয় বিকিরণ নির্গত করে । এছাড়া তড়িৎ-চৌম্বকীয় বর্ণালী জুড়ে নিউট্রন নক্ষত্র চিহ্নিত করা হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে দৃশ্যমান আলো, অবলোহিত বিকিরণ রশ্মি বা বর্ণালী, অতিবেগুনী রশ্মি, রঞ্জন রশ্মি এবং গামা রশ্মি । অতিনবতারা বিস্ফোরণের অবশিষ্টাংশে Central Compact Objects (CCO) নামে পরিচিত রঞ্জন রশ্মি উৎসগুলোর একটি বৈশিষ্ট্য বলে মনে হয়- যা তরুণ, বেতার-শান্ত নিউট্রন নক্ষত্র বলে অনুমান করা হয় ।

নিউট্রন নক্ষত্রকে কখনো কখনো ‘আণুবীক্ষণিক পারমাণবিক নিউক্লিয়াস’ কিংবা ‘দৈত্য নিউক্লিও’ হিসেবে বর্ণনা করা হয় । এই নক্ষত্রের কেন্দ্রে চরম ঘনত্বে নিউট্রনগুলো বিঘ্নিত হয়ে কোয়ার্ক নক্ষত্রের জন্ম দেয় । নিউট্রন নক্ষত্রের উপাদানের উপর নির্ভর করে অন্যান্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে: জড়তার মুহূর্ত (The moment of the inertia), চতুর্ভুজ মুহূর্ত (The quadrupole moment) এবং ভালোবাসা নম্বর (The love number) । একটি নবগঠিত নিউট্রন নক্ষত্রের ভিতরের তাপমাত্রা চারপাশ থেকে ১০০০০০০০০০০০ – ১০০০০০০০০০০০০ কেলভিন । তবে, কিছু নিউট্রন নক্ষত্র শীতল হয়ে থাকে । প্রায় ৩০ কিলোমিটার ব্যাসের একটি নিউট্রন নক্ষত্রে সূর্যের ভরের দ্বিগুণ ভর থাকে (সর্বোচ্চ সীমা ২.১ M সৌর ভর) । এই কারণে এর ঘনত্ব খুবই বেশি । বিস্ময়কর যে, নিউট্রন নক্ষত্রের এক চা-চামচ পরিমাণ পদার্থের ভর ১ কোটি টন! নিউট্রন নক্ষত্রের অকল্পনীয় ও মাত্রাতিরিক্ত ঘনত্বের কারণেই এমন ভর হয়ে থাকে । মূলত এই ঘনত্বের জন্য দায়ী অতিমহাকর্ষীয় টান । ভর, উষ্ণতা এবং শীতল হওয়ার হার অনুসারে এই নক্ষত্রের ধরণ নানা প্রকার হয়ে থাকে । তাই, বিভিন্ন ধরণের নিউট্রন নক্ষত্রকে তাদের বর্ণালী দ্বারা আলাদা করা যেতে পারে । ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে নিউট্রন নক্ষত্রের অদ্ভুত বেতার তরঙ্গ শনাক্ত করা হয় যার থেকে দৃশ্যমান আলো বের হয় না । লম্বা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বেতার তরঙ্গ বের হয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে না এসে ঘুরে ঘুরে আসে । তাই, নিউট্রন নক্ষত্রের বেতার সংকেত একটু পর পর স্পন্দন বা কম্পন আকারে পাওয়া যায় বলেই তাকে Pulsar বলে । নিউট্রন নক্ষত্রের চৌম্বক ক্ষেত্রগুলো পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের তুলনায় ১০০০০০০০০ – ১.০০০০০০০০ই+১৫ (১০০ মিলিয়ন থেকে ১ কোয়াড্রিলিয়ন) গুণ বেশি শক্তিশালী । এইনক্ষত্রপৃষ্ঠের চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি ১০০০০ – ১০০০০০০০০০০০ টেসলা । যদিও নিউট্রন নক্ষত্রের শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের উৎস এখনো অস্পষ্ট । তবে, একটি অনুমান হচ্ছে যে “Flux Freezing” বা নিউট্রন নক্ষত্র গঠনের সময় মূল চৌম্বকীয় প্রবাহের সংরক্ষণ । এখন পর্যন্ত সনাক্ত করা সবচেয়ে বড় নিউট্রন নক্ষত্র হচ্ছে PSR J0952–0607 যার সৌর ভর ২.৩৫ ± ০.১৭ । নিউট্রন নক্ষত্রের গতিবেগ আলোর গতির অর্ধেকেরও বেশি । এই নক্ষত্র খুব উচ্চ ঘূর্ণন গতির সাথে গঠিত হয়ে আস্তে আস্তে ধীর হয়ে যায় । একটি নিউট্রন নক্ষত্রের মাধ্যাকর্ষণশক্তি পদার্থকে প্রচণ্ড গতিতে ত্বরান্বিত করে এবং পৃষ্ঠের কাছাকাছি জোয়ারের শক্তি Spaghettification ঘটাতে পারে । নিউট্রন নক্ষত্রের ঘূর্ণনের সমান হারে পর্যায়ক্রমিক স্পন্দন পরিলক্ষিত হয় । কখনো কখনো নিউট্রন নক্ষত্রটি সহচর নক্ষত্র থেকে প্রদক্ষিণকারী পদার্থ শোষণ করে ঘূর্ণন হার বৃদ্ধি করে এবং এটি একটি স্থূল গোলক আকারে পরিণত হয় । তবে, Anti-glitch একটি নিউট্রন নক্ষত্রের ঘূর্ণন গতিতে হঠাৎ সামান্য হ্রাস বা ঘূর্ণন নিম্নগামী করতে পারে । সবচেয়ে দ্রুত ঘূর্ণায়মান নিউট্রন নক্ষত্রটি হচ্ছে PSR J1748−2446ad, যেটি প্রতি সেকেন্ডে ৭১৬ বার (প্রতি মিনিটে ৪৩০০০ বার) আবর্তন করে । নিউট্রন নক্ষত্রপৃষ্ঠের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র প্রায় পৃথিবীর তুলনায় ২০০০০০০০০০০০ গুণ শক্তিশালী । এই শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রটি মহাকর্ষীয় অক্ষিকাচ হিসেবে কাজ করে এবং নিউট্রন নক্ষত্র দ্বারা নির্গত বিকিরণকে এমনভাবে বাঁকিয়ে দেয় যে সাধারণত পিছনের পৃষ্ঠের অদৃশ্য অংশগুলো দৃশ্যমান হয় । বিশাল মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে একটি নিউট্রন নক্ষত্র এবং পৃথিবীর মধ্যে সময়ের প্রসারণ তাৎপর্যপূর্ণ হয় । বর্তমানে আকাশগঙ্গা ছায়াপথ এবং ম্যাগেলানিক ক্লাউডে প্রায় ৩২০০টি পরিচিত নিউট্রন নক্ষত্র রয়েছে, যার অধিকাংশই উচ্চ চুম্বকীয় ঘূর্ণায়মান Radio Pulsar হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে । পালসার হচ্ছে চৌম্বক আবর্তিত নিউট্রন নক্ষত্র যেটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে উচ্চ তীব্রতার তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ নির্দিষ্ট দিকে বিকিরণ করে থাকে । পালসার নক্ষত্রের শক্তির উৎস হচ্ছে নিউট্রন নক্ষত্রের ঘূর্ণন শক্তি । তবে, বেশিরভাগ পরিচিত নিউট্রন নক্ষত্র ‘পালসার’ হিসেবে আবিষ্কৃত হয়েছে যা নিয়মিত বেতার কম্পন নির্গত করে । নিউট্রন নক্ষত্রগুলো বেশিরভাগই আকাশগঙ্গা ছায়াপথের চাকতির সাথে কেন্দ্রীভূত হয় । নিকটতম পরিচিত নিউট্রন নক্ষত্র RX J1856.5−3754 হচ্ছে ‘The Magnificent Seven’ নামক নিউট্রন নক্ষত্রের একটি ঘনিষ্ঠ দলের সদস্য, যেটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ আলোকবর্ষ দূরে এবং PSR J0108−1431 নিউট্রন নক্ষত্রটি প্রায় ৪২৪ আলোকবর্ষ দূরত্বে রয়েছে । এছাড়া পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের এবং উষ্ণতম একটি বিচ্ছিন্ন নিউট্রন নক্ষত্র ক্যালভেরা (1RXS J141256.0+792204 নামেও পরিচিত), যেটি উর্সা মাইনর নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত । সমস্ত পরিচিত নিউট্রন নক্ষত্রের শতকরা প্রায় ৫ ভাগ Binary System এর সদস্য । ‘বাইনারি নিউট্রন নক্ষত্র’ এবং ‘ডাবল নিউট্রন নক্ষত্র’ গঠন ও বিবর্তন একটি জটিল প্রক্রিয়া । নিউট্রন নক্ষত্র ধারণকারী বাইনারি সিস্টেমগুলো প্রায়ই রঞ্জন রশ্মি নির্গত করে, যা নিউট্রন নক্ষত্রপৃষ্ঠের দিকে পড়ার সাথে সাথে উত্তপ্ত গ্যাস দ্বারা নির্গত হয় । নিউট্রন নক্ষত্র বহিঃসৌর গ্রহের স্বাগতিক বা অতিথিসেবক (Exoplanet Host) হতে পারে । ১৯৯২ – ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে সূর্য থেকে প্রায় ২৩০০ আলোকবর্ষ দূরে আবিষ্কৃত PSR B1257+12 (অন্যান্য নাম হচ্ছে: Lich, PSR B1257+12, PSR 1257+12, PSR J1300+1240) নামক পালসার নক্ষত্রের আশেপাশে ৩টি বহিঃসৌর গ্রহ যেমন: ড্রাগর, পোল্টারজিস্ট এবং ফোবেটরকে শনাক্ত করা হয়েছে । প্রথম আবিষ্কৃত রেডিও-পালসার হচ্ছে LGM-1 (বর্তমানে PSR B1919+21 নামে পরিচিত) । ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির সভায় জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী Wilhelm Heinrich Walter Baade এবং সুইস জ্যোতির্বিজ্ঞানী Fritz Zwicky নিউট্রন নক্ষত্রের অস্তিত্বের কথা প্রস্তাব করেন । পরবর্তীতে ‘নিউট্রন’ আবিষ্কারের দুই বছরেরও কম সময় পরে ইংরেজ পদার্থবিদ Sir James Chadwick এই নিউট্রন নক্ষত্র সম্পর্কে নিজের অভিমত প্রকাশ করেন, যিনি নিউট্রন আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন । গত ২৩শে ফেব্রুয়ারি ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা JWST দূরবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে ‘অতিনবতারা 1987A’ এর বিস্ফোরণের অবশিষ্টাংশের মধ্যে একটি নিউট্রন নক্ষত্র চিহ্নিত করেছেন ।

যাই হোক, অতিনবতারা বিস্ফোরণের সময় নক্ষত্রটি তার বহিরাবরণ বা দৈহিকরূপ পরিত্যাগ করে কার্বন-অক্সিজেন কেন্দ্রভাগটিই অবশিষ্ট থাকে যা অতিক্ষুদ্র এক উত্তপ্ত ‘শ্বেতবামন নক্ষত্রে’ পরিণত হয় । শ্বেত বামন নক্ষত্র হচ্ছে একটি নক্ষত্রের মৃত্যুর প্রথম পর্যায় এবং এর আয়তন পৃথিবীর সমান হলেও সূর্য থেকে ভর বেশি । শ্বেত বামন নক্ষত্রকে ‘অপজাত বামন’ বলা হয় । যেহেতু, শ্বেত বামন নক্ষত্রটি ইলেকট্রন অপজাত বা ক্ষয়প্রাপ্ত পদার্থ নিয়ে গঠিত তাই হাইড্রোজেন স্ফীত হয় না বিধায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং এটি চন্দ্রশেখর সীমা’র কাছে পৌঁছলে Type Ia Supernova হিসেবে বিস্ফোরিত হতে পারে । শ্বেত বামন নক্ষত্রের প্রচণ্ড মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে আশেপাশের নক্ষত্র, মহাজাগতিক গ্যাস এবং ধূলিকণা ইত্যাদি নিজের দিকে টানতে শুরু করে । ফলে, শ্বেত বামনের আকার বৃদ্ধি পেয়ে শুরু হয় নিউক্লীয় কেন্দ্রীন সংযোজন বা একীকরণ বিক্রিয়া এবং সেখানে পুনরায় বিস্ফোরণ ঘটে ‘নবতারা’ (Nova Star / Novae Star) সৃষ্টি করে । যদিও এটি অল্প সময়ের জন্য নক্ষত্রের মতোই দেখায় । কিন্তু, নবতারার বিস্ফোরণ অতিনবতারার মতো তেমন উজ্জ্বল ও শক্তিশালী নয় । একটি সাদা বামন নক্ষত্র সময়ের সাথে সাথে একাধিক নবতারা তৈরি করতে পারে । লাতিন ভাষায় Nova শব্দের অর্থ ‘নতুন’ । খ-গোলকে অবস্থিত নক্ষত্রকে নবতারা বলে । হিলিয়াম, কার্বন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, নিয়ন এবং ম্যাগনেসিয়ামের মতো সমৃদ্ধ উপাদানে নবতারা গঠিত হয় । নবতারা অতিপ্রাচীন নক্ষত্রের অবশিষ্টাংশ । এই নবতারা গামা রশ্মি নির্গত করে । আকাশগঙ্গা ছায়াপথে প্রতি বছর প্রায় ৩০ – ৬০টি নবতারার দেখা মিলে । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অভিমত প্রকাশ করেন যে, ধ্রুপদী বা সর্বোৎকৃষ্ট নবতারার বিস্ফোরণে Galactic হচ্ছে লিথিয়াম উপাদানের উৎপাদক ।

আমরা যদি আকাশের দিকে তাকাই তাহলে এই বিশাল মহাবিশ্বের খুবই ক্ষুদ্রতম একটি অংশ আমাদের চোখে পড়ে । রাতের মেঘমুক্ত আকাশে খালি চোখে প্রায় ৬ হাজার নক্ষত্র দেখা যায় । তবে, দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখলে প্রায় ৫০ হাজার নক্ষত্রের দেখা মিলে । উন্নতমানের অত্যাধুনিক দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে পর্যবেক্ষণ করলে প্রায় ৩ লক্ষাধিক নক্ষত্র, কয়েক হাজার ছায়াপথ ও বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তু দেখা সম্ভব । কিন্তু, এদের মধ্য থেকে অনুসন্ধান করে একটি অতিনবতারা বের করা দুষ্প্রাপ্য ঘটনা । তবে, প্রতি মুহূর্তই এই সীমানাহীন মহাবিশ্বের কোথাও না কোথাও অতিনবতারার বিস্ফোরণ ঘটে চলছে । কিন্তু আমরা সেগুলোকে দেখতে পাইনা । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন যে, প্রতি শতাব্দীতে ২ – ৩টি অতিনবতারার বিস্ফোরণ আকাশগঙ্গা ছায়াপথে ঘটে থাকে । হয়তো, দুর্লভভাবে খালি চোখে শুধুমাত্র আকাশগঙ্গা ছায়াপথের খুব কাছাকাছি যদি কোনো একটি অতিনবতারার বিস্ফোরণ ঘটে সেটি দেখা যেতে পারে । অতিনবতারা বিস্ফোরণ খুবই বিরল ঘটনা । অসীম মহাকাশের শত শত বিলিয়ন নক্ষত্র সমৃদ্ধ কোনো ছায়াপথে ২ – ৩ শত বছরে ১টি মাত্র অতিনবতারার বিস্ফোরণ সংঘটিত হয় । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এমন অভিমত ব্যক্ত করেন যে, আমরা এবং আমাদের সব কিছুই নক্ষত্রিক ধূলিকণায় (Star Dust) তৈরি । যখন কোনো অতিনবতারার বিস্ফোরণ ঘটে তখন এর থেকে এতই উজ্জ্বল আলো তৈরি হয় যে পুরো ছায়াপথজুড়েই আলোকচ্ছটা বিস্তৃত হয় এবং নক্ষত্রটির নানা উপাদান সমস্ত ছায়াপথে ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি অন্যান্য নক্ষত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখে । এছাড়াও নক্ষত্রের এই সকল উপাদান আশপাশে থাকা বিভিন্ন গ্রহ এবং সেই সকল গ্রহে যদি কোনো প্রকার প্রাণ থাকে সেই প্রাণেরও উপাদান হয় । অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা মহাকাশে নতুন আরো এক ধরনের নক্ষত্রের বিস্ফোরণ আবিষ্কার করেছেন, যেটি সাধারণ অতিনবতারার চেয়ে দশ গুণ বেশি শক্তিশালী । এই বিস্ফোরণের নাম হচ্ছে অধিনবতারা বা অতিসক্রিয় নবতারা বা অস্বাভাবিক নবতারা (Hypernova) । যে নক্ষত্রটির বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে এই অধিনবতারার সৃষ্টি হয় সেটির ভর সূর্যের ভরের চেয়ে প্রায় ২৫ গুণ বেশি । যদিও এতদিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল যে অতিদানব কোনো নক্ষত্র বিস্ফোরণ ঘটায় না, কারণ এটি খুবই ধীরে ধীরে তার সমস্ত শক্তি হারিয়ে মহাকাশে বিলীন হয়ে যায় । কিন্তু, তাদের সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে ।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, আন্তর্জাল (The Internet)

ছবি / Illustration of a Neutron Star 🌟 : Som ET ছবি: উইকিপিডিয়া । 

Sunday, 10 November 2024

Messier 74 ছায়াপথ


 


মেসিয়ার ৭৪ (এম৭৪) হচ্ছে নিরক্ষীয় নক্ষত্র মীন রাশির এক বৃহৎ সর্পিল ছায়াপথ । এটি NGC 628 অথবা Phantom Galaxy নামেও পরিচিত । এ ছায়াপথটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৩২ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত । অনুমান করা হয় যে, এম৭৪ ছায়াপথে প্রায় ১০০ বিলিয়ন নক্ষত্রের আবাসস্থল । ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে চার্লস মেসিয়ারের পর্যবেক্ষক সহকারী ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী Pierre Méchain এ মহাজাগতিক সৌন্দর্যের অধিকারী এম৭৪ ছায়াপথ আবিষ্কার করেন । পরবর্তীতে তিনি চার্লস মেসিয়ারকে তার আবিষ্কারের কথা জানালে এটি 'মেসিয়ার ক্যাটালগে' তালিকাভুক্ত হয় । গত ২০২২ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে এম৭৪ ছায়াপথটি জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ দ্বারা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল । এ ছায়াপথ হচ্ছে পর্যবেক্ষণ করা সবচেয়ে কঠিন মেসিয়ার বস্তুগুলোর মধ্যে একটি । এটিকে আকাশে দেখার জন্য সবচেয়ে সেরা সময় হচ্ছে নভেম্বর মাস । এম৭৪ ছায়াপথে স্পষ্টভাবে দু'টি সর্পিল বাহু রয়েছে, তাই এটি একটি দুর্দান্ত নকশার সর্পিল ছায়াপথের নিখুঁত প্রত্নতাত্ত্বিক উদাহরণ । জ্বলন্ত গ্যাসের উজ্জ্বল গিঁটগুলো সর্পিল বাহুগুলোকে আলোকিত করে, যা নক্ষত্র গঠনের একটি সমৃদ্ধ পরিবেশ নির্দেশ করে । প্রতিসাম্য সর্পিল বাহুগুলো ছায়াপথের কেন্দ্রীয় নিউক্লিয়াস থেকে বেরিয়ে আসে এবং ধূলিকণার গলি দ্বারা চিহ্নিত হয় । এ বাহুগুলো তরুণ নীল নক্ষত্রগুচ্ছ এবং হাইড্রোজেনের (হাইড্রোজেন পরমাণু যা তাদের ইলেকট্রন হারিয়েছে)  উজ্জ্বল গোলাপী অঞ্চলে বিন্দুযুক্ত । যেখানে ঐ তরুণ নক্ষত্র থেকে আসা অতিবেগুনী আলো হাইড্রোজেনের মেঘকে আয়নিত এবং আলোকিত করেছে । নক্ষত্র গঠনের এ অঞ্চলগুলো অতিবেগুনী তরঙ্গদৈর্ঘ্যে অতিরিক্ত আলোকিত দেখায় । এম৭৪ ছায়াপথের সর্পিল বাহু দুটির বাতাস ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে । সর্পিল বাহুগুলো ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে দূরে যাওয়ার সাথে সাথে প্রশস্ত হয় । তবে, একটি বাহু শেষের দিকে সরু হয়ে যায় এবং বাহুগুলো একটি ধ্রুবক কোণ থেকে সামান্য বিচ্যুত হয় । এ ছায়াপথে ৩টি বিস্ময়কর অতিনবতারা (Supernova) দেখা যায়: (ক) SN 2002ap (খ) SN 2003gd (গ) SN 2013ej । এছাড়া, গত ৬ই জুলাই ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে একটি ক্ষণস্থায়ী দৈত্যাকার অগ্নুৎপাত AT 2019krl বা LBV আবিষ্কৃত হয়েছিল । এ ছায়াপথটি এম৭৪ নামক ছায়াপথ দলের সবচেয়ে উজ্জ্বল সদস্য । ৫ থেকে ৭টি ছায়াপথের একটি দল যার মধ্যে রয়েছে অদ্ভুত এক সর্পিল ছায়াপথ NGC 660 এবং কয়েকটি অনিয়মিত ছায়াপথ । ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে The Chandra X-ray Observatory এম৭৪ ছায়াপথের মধ্যে একটি অতি আলোকিত রঞ্জনরশ্মির উৎস (ULX) পর্যবেক্ষণ করে, যা প্রায় দুই ঘন্টা পর্যায়ক্রমিক ব্যবধানে একটি নিউট্রন নক্ষত্রের চেয়ে বেশি রঞ্জনরশ্মির শক্তি বিকিরণ করে । এম৭৪ ছায়াপথের আনুমানিক ভর হচ্ছে ১০০০০ M সৌর ভর ☉ । এটি মধ্যবর্তী-ভর কৃষ্ণ গহ্বরের (An intermediate-mass black hole) একটি সূচক । নাক্ষত্রিক কৃষ্ণ গহ্বরের আকার এবং অনেক ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক বিশাল কৃষ্ণগহ্বরগুলোর মধ্যে এটি একটি বরং এটি অস্বাভাবিক শ্রেণী হবে । এ ধরনের বস্তু একটি নক্ষত্র স্তবকের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম (নাক্ষত্রিক) কৃষ্ণগহ্বর থেকে তৈরি হয় বলে বিশ্বাস করা হয় । এ উৎসটিকে CXOU J013651.1+154547 হিসেবে শনাক্তকরণ করা হয় । 

তথ্যসূত্র: www.science.nasa.gov , Wikipedia 
Image Processing: Mark Hanson 
https://www.hansonastronomy.com/m-74 
📸 Mikhail Vasilev

Sunday, 14 July 2024

ছায়াপথ M63



M63 হচ্ছে দারুণ একটি ছায়াপথ । এটি Messier 63 বা M63 বা NGC 5055 বা সূর্যমুখী ছায়াপথ (Sunflower Galaxy) নামেও পরিচিত । এ ছায়াপথে আনুমানিক ৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে যা উত্তরের Canes Venatici নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত । এটি একটি সর্পিল ছায়াপথ । ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী Pierre Méchain সর্বপ্রথম M63 ছায়াপথটি আবিষ্কার করেন । পরবর্তীতে তার সহকর্মী Charles Messier ১৪ই জুন ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে বিশদভাবে যাচাই করার মধ্য দিয়ে আবিষ্কার করেন । এ ছায়াপথটি মেসিয়ার ক্যাটালগে অবজেক্ট 63 হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে । ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে অ্যাংলো-আইরিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী Lord Rosse এ ছায়াপথের মধ্যে সর্পিল কাঠামো শনাক্ত করেন । এটিকে প্রথম ছায়াপথগুলোর মধ্যে একটি তৈরি করে যেখানে এ ধরনের কাঠামো চিহ্নিত করা হয়েছিল । এ ছায়াপথের আকৃতি বা রূপবিদ্যায় SAbc এর একটি শ্রেণীবিভাগ রয়েছে, যা একটি সর্পিল রূপ নির্দেশ করে যার কোনো কেন্দ্রীয় দণ্ড বৈশিষ্ট্য নেই (SA) এবং মাঝারি থেকে ঢিলেঢালাভাবে ক্ষত বা মর্মাঘাত বাহুগুলো (bc) ।  দৃশ্যমান আলোতে বড় আকারের ক্রমাগত সর্পিল কাঠামোর সাধারণ ঘাটতি বা অভাব রয়েছে, তাই এটিকে একটি Flocculent Galaxy বিবেচনা করা হয় । যাইহোক, যখন অবলোহিত আলোর কাছাকাছি পর্যবেক্ষণ করা হয়, তখন এর একটি প্রতিসম এবং দুই-বাহুর গঠন দেখা যায় । প্রতিটি বাহু ছায়াপথের চারপাশে ১৫০° টানে বা মোচড়ানো অবস্থার সৃষ্টি করে এবং নিউক্লিয়াস থেকে ১৩০০০ আলোকবর্ষ (৪০০০ পার্সেক) পর্যন্ত প্রসারিত হয় । M63 ছায়াপথ হচ্ছে দুর্বলভাবে সক্রিয় একটি ছায়াপথ যার একটি LINER নিউক্লিয়াসে রয়েছে একটি সংক্ষিপ্ত 'নিম্ন-আয়নকরণ পারমাণবিক নির্গমন-রেখা অঞ্চল' । এটি গ্যালাকটিক নিউক্লিয়াসে এক অমীমাংসিত উৎস হিসেবে প্রদর্শিত হয় যা একটি বিচ্ছুরিত নির্গমনে আবৃত বা লুকাইয়া থাকে ।  পরবর্তীটি উত্তর মহাকাশীয় মেরু সাপেক্ষে ১১০° অবস্থান কোণ বরাবর প্রসারিত হয় এবং নরম রঞ্জন-রশ্মি (Soft X-rays) ও হাইড্রোজেন আলফা (H-alpha) উভয়কে প্রায় একই দিক থেকে আসা লক্ষ্য করা যায় । নিউক্লিয়াসে একটি অতি বৃহদায়তন কৃষ্ণ গহ্বরের (SMBH) অস্তিত্ব অনিশ্চিত ।  যদি এটি বিদ্যমান থাকে, তাহলে ভর অনুমান করা হয় (8.5±1.9)×108 M সৌর ভর অথবা সূর্যের ভরের প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন গুণ । ২১ সেঃমিঃ হাইড্রোজেন লাইনে বেতার পর্যবেক্ষণগুলো দেখায় যে M63 ছায়াপথের গ্যাসীয় চাকতি ১৩০০০০ আলোকবর্ষ (৪০ কিলোপারসেক) ব্যাসার্ধের বাইরের দিকে প্রসারিত, উজ্জ্বল আলোকিত চাকতি ভালোভাবে অতীত । এ গ্যাস একটি প্রতিসম গঠন বা আকৃতি দেখায় যা ৩৩০০০ আলোকবর্ষ (১০ কিলোপারসেক) ব্যাসার্ধ থেকে শুরু করে একটি উচ্চারিত পদ্ধতিতে টানে বা মোচড়ায় বা বিকৃত (Warp) করে । গঠনটি একটি Dark Matter Halo কে নির্দেশ করে যা অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের ক্ষেত্রে ভারসাম্য (Offset) হয় । টানা বা বিকৃত বা মোচড়ানো অবস্থার কারণ অস্পষ্ট, কিন্তু অবস্থান কোণটি ছোট সহচর ছায়াপথ UGC 8313 এর দিকে নির্দেশ করে । আলোক-দূরত্ব পরিমাপের উপর ভিত্তি করে M63 ছায়াপথের দূরত্ব হচ্ছে ২৯৩০০০০০ আলোকবর্ষ (৮.৯৯ মেগাপারসেক) । স্থানীয় ছায়াপথ গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত অরীয় গতিবেগ ১৫২০০০০০ আলোকবর্ষ (৪.৬৫ মেগাপারসেক) অনুমান করা হয় । Tully-Fisher সম্পর্কের পরিসরের উপর ভিত্তি করে অনুমান ১৬০০০০০০–৩৪০০০০০০ আলোকবর্ষের (৫.০-১০.৩ মেগাপারসেক) বেশি । লাল-দৈত্য শাখা কৌশল 28,930,000 ± 950,000 আলোকবর্ষ (8.87 ± 0.29 মেগাপারসেক) দূরত্বের ইঙ্গিত দেয়। M63 হল M51 গ্রুপের অংশ, গ্যালাক্সির একটি গোষ্ঠী যার মধ্যে রয়েছে M51 ('Whirlpool Galaxy' ') । উল্লেখ্য যে: জ্যোতির্বিদ্যায় Tully-Fisher Relation (TFR) হচ্ছে একটি সর্পিল ছায়াপথের ভর বা অন্তর্নিহিত উজ্জ্বলতা এবং এর Asymptotic ঘূর্ণন বেগ বা নির্গমন রেখার প্রস্থের মধ্যে একটি ব্যাপকভাবে যাচাইকৃত পরীক্ষামূলক সম্পর্ক । যেহেতু উজ্জ্বলতা দূরত্ব-নির্ভর, তাই সম্পর্কটি তাদের ঘূর্ণন বেগের পরিমাপ থেকে ছায়াপথের দূরত্ব অনুমান করতে ব্যবহার করা যেতে পারে । ২৪শে মে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে এ ছায়াপথের একটি বাহুতে ১১.৮ মাত্রার একটি অতিনবতারা (Supernova) দেখা গিয়েছিল যা প্রায় সর্বোচ্চ আলোতে পৌঁছেছিল । এ SN 1971I অতিনবতারার বর্ণচ্ছটা নমুনা-I এর অতিনবতারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ । যাইহোক, এটির বর্ণালিবীক্ষনিক আচরণ অস্বাভাবিক প্রদর্শিত হয়েছিল । 

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, আন্তর্জাল (The Internet) ।

ছবি: https://www.jpl.nasa.gov/images/pia13900-spitzers-sunflower-galaxy 


Saturday, 6 July 2024

সর্পিল ছায়াপথ M83



M83 (Messier 83) ছায়াপথ তার উচ্চারিত সর্পিল বাহুগুলোর জন্য Southern Pinwheel Galaxy এবং NGC 5236 নামে পরিচিত । বৃহদায়তন, উজ্জ্বল এবং সুন্দর এ বাধা সর্পিল ছায়াপথটি Hydra এবং Centaurus নক্ষত্রমণ্ডলীর দক্ষিণ-পূর্ব সীমানার শীর্ষে প্রায় ১৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত । এটি প্রায় ৪০০০০ আলোকবর্ষ জুড়ে বিস্তৃত । ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী Nicolas-Louis de Lacaille ১৭ই ফেব্রুয়ারি ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে Cape of Good Hope এর মধ্যে M83 ছায়াপথ আবিষ্কার করেন । বিখ্যাত ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী Charles Messier ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে পর্যবেক্ষিত বস্তু হিসেবে M83 ছায়াপথকে মেসিয়ার তালিকায় যুক্ত করেন । এর আইসোফোটাল ব্যাস প্রায় ৩৬.২৪ কিলোপারসেক (১১৮০০০ আলোকবর্ষ) । একটি অদ্ভুত বামন ও অনিয়মিত ছায়াপথ NGC 5253 এর কাছে এ দৈত্যাকার M83 ছায়াপথটি অবস্থিত এবং এ দুটি ছায়াপথ সম্ভবত গত বিলিয়ন বছরের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া করেছে যার ফলে তাদের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে নক্ষত্রের বিশাল গঠন তৈরির প্রক্রিয়া বা জ্যোতির্পদার্থগত প্রক্রিয়ার (Starburst) কার্যকলাপ হয়েছে । ঘনত্ব তরঙ্গ তত্ত্ব অনুসারে, সর্পিল বাহুগুলোর অগ্রভাগের প্রান্ত বরাবর M83 ছায়াপথে নক্ষত্র গঠনের হার বেশি । NASA এর Galaxy Evolution Explorer প্রকল্পের গবেষকরা ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে ২০ কিলোপারসেক বাইরের দিকে প্রচুর সংখ্যক নতুন নক্ষত্র খুঁজে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন । এতোদিন মনে করা হতো যে, এ অঞ্চলগুলোতে তারকা গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব ছিল । এছাড়া ছায়াপথের বাহুগুলোর ঘন ধূলিকণার গলির প্রান্তের কাছে লাল রঙের নক্ষত্র গঠনের অঞ্চলগুলোর সম্পদ পাওয়া যায় । পরামর্শ দেয় যে, M83 হাজার-রুবি ছায়াপথের (Thousand-Ruby Galaxy) জন্য আরেকটি জনপ্রিয় মনিকার । এ নতুন গভীর দূরবীক্ষণিক ডিজিটাল চিত্রটি উজ্জ্বল ছায়াপথের ক্ষীণ, প্রসারিত Halo কেও প্রমাণ করে । মহাজাগতিক কাঠামোর নিচের দিকে ধাবমান একটি নাক্ষত্রিক জোয়ারের স্রোতের ধ্বংসাবশেষ বিশাল M83 ছায়াপথ থেকে একটি ছোট একত্রিত উপগ্রহ ছায়াপথের মহাকর্ষীয় বিঘ্ন দ্বারা ঘটেছে । ব্রিটিশ-অস্ট্রেলিয়ান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ফটোগ্রাফার David Frederick Malin AM এবং Brian Hadley ১৯৯০ এর দশকের মাঝামাঝি Photographic plateগুলোকে উন্নত করে অধরা নক্ষত্র প্রবাহ (Elusive star stream) খুঁজে পান । M83 ছায়াপথে ৬টি অতিনবতারা বিস্ফোরণ (Supernovae) দেখা গেছে যেমন: SN 1923A (mag. 14), SN 1945B (mag. 14.2), SN 1950B (mag. 14.5), SN 1957D (mag. 15), SN 1968L (mag. 11.9) এবং SN 1983N (ধরণ Ia, mag. 11.9) । সর্পিল M83 ছায়াপথ কাছাকাছি ছায়াপথ গোষ্ঠী Centaurus A/M83 Group এর মধ্যে দুটি উপগোষ্ঠীর একটির কেন্দ্রে রয়েছে । Centaurus A হচ্ছে Centaurus নক্ষত্রমণ্ডলের একটি ছায়াপথ ।  Centaurus A ছায়াপথটি রয়েছে অন্য একটি ছায়াপথ উপগোষ্ঠীর কেন্দ্রে । এগুলো কখনো একটি দল হিসেবে এবং কখনো কখনো দুটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় । যাইহোক, Centaurus A ছায়াপথের আশেপাশের ছায়াপথ এবং বৃহৎ M83 ছায়াপথের আশেপাশের ছায়াপথগুলো শারীরিকভাবে একে অপরের কাছাকাছি এবং উভয় ছায়াপথ উপগোষ্ঠী একে অপরের সাথে তুলনামূলক সরে যাচ্ছে না বলে মনে হয় ।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, Cristi Agapi । ছবির কপিরাইট ©: Michael Sidonio । 

হাওয়াই দ্বীপের বিস্ময়কর উদ্ভিদ ওহিয়া লেহুয়া

                                                        https://bn.photo-ac.com/ 


                                                           https://portal.ehawaii.gov/


                                                          https://www.inaturalist.org/ 


                                                             https://www.inaturalist.org/ 


ওহিয়া লেহুয়া ('Ohi’a Lehua) হচ্ছে হাওয়াইয়ের স্থানীয় চিরহরিৎ বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ । এর আরেকটি নাম লেহুয়া ওহিয়া (Lehua 'Ohi'a) । উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য হাওয়াইয়ে এটিকে একচেটিয়াভাবে পাওয়া যায় । এর বৈজ্ঞানিক নাম Metrosideros polymorpha এবং এটি Myrtaceae পরিবারের সদস্য (Myrtle family) । ওহিয়া লেহুয়া হাওয়াইয়ের রাষ্ট্রীয় গাছ । এটি প্রথম প্রজাতির এমন একটি বৈচিত্র্যময় গাছ যেটি কঠিন লাভা শিলা এবং শুষ্ক-অনুর্বর লাভা প্রবাহের উপর জন্মগ্রহণ করে । হাওয়াইয়ান ভাষার শব্দ ʻŌhiʻa শুধুমাত্র গাছকে বোঝায় এবং Lehua শব্দটি তার ফুলকে বোঝায় । ʻŌhiʻa শব্দটি তার পূর্বপুরুষ প্রোটো-ওশেনিক শব্দ *কাফিকা (Ancestral Proto-Oceanic word *Kafika) থেকে উদ্ভূত হয়েছে বলে মনে করা হয় । তবে Lehua শব্দের কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যুৎপত্তি অস্পষ্ট । দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে Metrosideros গণের প্রায় ৫০টি প্রজাতি এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ১টি প্রজাতি রয়েছে । এ উদ্ভিদের ৫টি প্রজাতি যেমন: Metrosideros polymorpha, M. macropus, M. rugosa, M. tremuloides এবং M. waialealae এর আবাসস্থল হচ্ছে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে যারা এ দ্বীপের স্থানীয় অর্থাৎ এগুলো বিশ্বের আর কোথাও পাওয়া যায় না । আর্দ্র এবং শুষ্ক বন এদের বাসস্থান । পাতাগুলো ডিম্বাকৃতি । হাল্কা ধূসর রঙের কচি বাকল মসৃণ যা বয়সের সাথে সাথে রুক্ষ ও খসখসে হয়ে যায় । পাকা ফলগুলো ফেটে বাতাসের মাধ্যমে বীজ ছড়িয়ে পড়ে । ওহিয়া লেহুয়া প্রায় সমস্ত হাওয়াইয়ান বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে পাওয়া যায় যেখানে নিম্নভূমির শুষ্ক ঝোপ ভূমি থেকে বৃষ্টিবর্ষণ বন (Rainforest) এবং উচ্চ-উচ্চতার ভিজে নরম মাটি (Bog) থেকে শুষ্ক লাভা প্রবাহ পর্যন্ত । Niihau দ্বীপ এবং Kaho'olawe দ্বীপ ছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি থেকে প্রায় ৮৫০০ ফুট উচ্চতায় প্রধান হাওয়াইয়ান দ্বীপগুলোর পর্বত বা বনে এ প্রভাবশালী গাছটি দেখা যায় । উচ্চতা, মাটি এবং আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে এটি ছোট ঝোপ থেকে শুরু করে প্রায় ১০০ ফুট পর্যন্ত লম্বা বিশাল আকৃতির রূপ নিতে পারে । ওহিয়া লেহুয়া অন্যান্য গাছের সাথে বিভিন্ন বনের মধ্যে বেড়ে উঠে এবং প্রায় ৫০০ বছরেরও বেশি বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে । হাওয়াই দ্বীপে বৃষ্টিবর্ষণ বনের আবাসস্থলে তরুণ আগ্নেয়গিরির স্তরগুলোতে প্রজাতিটি তার সর্বোচ্চ তলদেশীয় এলাকায় অবস্থান (Stand basal) করতে পেরেছে । যদিও গাছটি ৫০০ মিলিমিটারের (২০ ইঞ্চি) কম বৃষ্টিপাতের উপকূলীয় অঞ্চলে এটি জন্মায় না । হাওয়াইয়ের সবচেয়ে সাধারণ এ গাছটি মূল্যবান জলবিভাজিকায় সুরক্ষা প্রদান করে । 

ওহিয়া লেহুয়া গাছ বিভিন্ন প্রকার দেশীয় পোকামাকড় এবং গাছপালাকে সমর্থন করে এদের আশ্রয় দেয় । বসন্ত বা গ্রীষ্মে ওহিয়া লেহুয়া গাছে একটি দুর্দান্ত লাল মুকুট ফুল ফোটে । তবে কিছু জাতের উদ্ভিদের নান্দনিক সৌন্দর্যের ফুল ফোটে শরৎ বা শীতকালে । Powder puff ফুলের মতো দেখতে অসাধারণ সুন্দর ফুলগুলো সাধারণত লাল রঙের হয়ে থাকে । এছাড়া উজ্জ্বল হলুদ, কমলা, কমলা-লাল, গোলাপী, স্যামন এবং কিংবদন্তি সাদা লেহুয়া থেকে শুরু করে অনেক রঙের হতে পারে । এ ফুল বেশ উজ্জ্বল এবং অসংখ্য লম্বা পুংকেশর ফুলটিকে বৈচিত্র্যময় বৈশিষ্ট্যের পম-পম আকৃতি (Pom-pom shape) দেয় । টকটকে লাল মোহনীয় ফুলগুলো দেশীয় প্রজাতির প্রতীক হিসেবে এসেছে । ওহিয়া লেহুয়া ফুল স্থানীয় পাখিদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করে । বেশিরভাগ পাখির ক্ষেত্রে ফুলের অমৃত (Nectar) এবং পোকামাকড় শিকারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস । এ পাখিদের মধ্যে কিছু বিপন্ন প্রজাতি রয়েছে যেমন: Akepa (Loxops coccinea), Crested honeycreeper (Palmeria dolei) এবং Hemignathus ইত্যাদি । স্থানীয় হাওয়াইয়ান পাখি (Hawaiian honeycreepers বা Drepanididae) এবং রকমারি কীটপতঙ্গ হচ্ছে ওহিয়া লেহুয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরাগায়নকারী । ওহিয়া লেহুয়া প্রায়শই পতিত গাছের ডালপালা থেকে উদ্ভিজ্জভাবে প্রজনন করে । বিভিন্ন বিকাশের পর্যায়ে সাধারণত ১৮ থেকে ২৪টি ফুল থাকে এবং ফল পরিপক্ক হতে প্রায় ৪ থেকে ১২ মাস সময় লাগে । কান্ডের অঙ্কুর বা কচি বৃক্ষশাখা (Sprout) আগাম শিকড় তৈরি করতে পারে এবং অবশেষে স্বাধীন হয়ে উঠে । স্থায়ী দুর্বল বা মরে যাওয়া গাছের ডালপালাগুলো কখোনো মূল গাছের চেয়ে বেশি বেঁচে থাকতে পারে । একটি গবেষণায় দেখা যায় ওহিয়া লেহুয়া বীজের সর্বাধিক অঙ্কুরোদগম ২৫° C (৭৭° ফারেনহাইট) এবং ৪ থেকে ১৫ শতাংশ পূর্ণ সূর্যালোকে । ওহিয়া লেহুয়া গাছ বিভিন্ন মাটি এবং এলাকায় জন্মে থাকে । এ গাছটি ভূতাত্ত্বিকভাবে ছোট আগ্নেয়গিরিতে প্লাইস্টোসিন লাভা প্রবাহের (Pleistocene lava flows) দিকে মৃদুভাবে ঢালু হওয়া Histosol এবং Inceptisol গুলোতে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে । Histosol, Mollisol, Spodosol, Oxisol, Ultisol ও Alfisol মাটির সংমিশ্রণে এবং হাওয়াইয়ান দ্বীপপুঞ্জের ভূতাত্ত্বিকভাবে পুরোনো আগ্নেয়গিরির উপর অশ্রেণীবদ্ধ পাহাড়ী ভূমিতে গাছটি জন্মাতে পছন্দ করে । এছাড়া উন্মুক্ত শৈলশিরা, খাড়া ঢাল ও সুনিষ্কাশিত স্থানে এটি জন্মে থাকে । 

হাওয়াইয়ের আগ্নেয়গিরিময় জাতীয় উদ্যান একটি উদ্ভিদ স্বর্গকে আশ্রয় দেয় (Harbors a Plant Paradise) । ওহিয়া লেহুয়া হাওয়াই দেশীয় গাছের মধ্যে সর্বাধিক এবং সম্ভবত সবচেয়ে আইকনিক । ৮ প্রকার ওহিয়া লেহুয়া গাছের মধ্যে ৪টিই পাওয়া যায় জাতীয় উদ্যানে । হাওয়াইয়ান স্থানীয় গাছগুলো হাওয়াই দ্বীপের মতো আগ্নেয়গিরির প্রাকৃতিক ভূচিত্রের উন্নতির জন্য বিশেষভাবে অভিযোজিত হয় । এটি নতুন লাভা প্রবাহের উপর উপনিবেশ স্থাপনকারী প্রথম উদ্ভিদগুলোর মধ্যে একটি এবং পত্ররন্ধ্র ধারণ করে যা ক্ষতিকর গ্যাসের উপস্থিতিতে বন্ধ হয়ে যাবে যখন অনেক অ-স্থানীয় গাছ লড়াই করবে বা মারা যাবে । বিশেষ করে চাপের সময় গাছটি আর্দ্রতা সংগ্রহের জন্য তাদের শাখা থেকে তন্তুযুক্ত বায়বীয় শিকড় ভের করতে পারে । কুয়াশাচ্ছন্ন ঘনবর্ষণ বনাঞ্চলের পরিবেশে (Rainforest environment) এ উন্মুক্ত শিকড়গুলো গাছকে আর্দ্রতা সংগ্রহ করতে সাহায্য করে । হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের পরিবর্তনশীল ওহিয়া লেহুয়া গাছ হচ্ছে বনের মেরুদণ্ড । এটি অন্যান্য উদ্ভিদের জন্য ছায়া ও মাটি তৈরি করে । কখনো কখনো কঠোর আবহাওয়ার সাথে অভিযোজিত হয় । ঝড়ের পর গাছটি জল ধরে রেখে, পরবর্তী ক্ষয় ও বন্যা প্রতিরোধ করে জলাশয় সুরক্ষা এবং জল সংরক্ষণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে । স্থানীয় হাওয়াইয়ান ঐতিহ্যে ওহিয়া লেহুয়া গাছ আগ্নেয় বা আগ্নেয়গিরির দেবতা পেলের (Pele) সাথে ব্যাপকভাবে জড়িত । ঐতিহ্যগতভাবে নেটিভ হাওয়াইয়ানরা নির্মাণ, সরঞ্জাম, জ্বালানি, Kapa beater, Poi board এবং অস্ত্রের জন্য এ গাছের কাঠ ব্যবহার করে যখন এখানে লেই বা পুষ্পস্তবক (Lei) শোভা পায়, হুলা নৃত্য (Hula dence) এবং কাও গল্প (Kaʻao stories) অনুপ্রাণিত করে । ওহিয়া লেহুয়ার কচি ফুল হুলা বেদীর অলঙ্করণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং অনুশীলনে ব্যবহৃত হয় । গাছের পাতাগুলো ঔষধি চা হিসেবে ব্যবহৃত হয় । ওহিয়া লেহুয়া পবিত্র বলে বিবেচিত এবং এটি হাওয়াইয়ান সংস্কৃতিতে পিলিনা বা আন্তঃসংযোগের (Pilina বা Interconnection) প্রতীক ।

বৈচিত্র্যময় Metrosideros polymorpha একটি অত্যন্ত পরিবর্তনশীল চিরহরিৎ উদ্ভিদ । স্বনামধন্য ট্যাক্সোনমিস্টরা এ প্রজাতির ১১টি শ্রেণী চিনতে পেরেছেন । শুধুমাত্র M. polymorpha var. Prostrata শ্রেণীটি গাছের মর্যাদা বা দৈহিক উচ্চতা অর্জন করে না । ওহিয়া লেহুয়াতে উপ-প্রজাতি (বাস্তুপ্রজাতি) এবং জাতিগুলোর মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট নয় । এ পরিবর্তনশীল প্রজাতির মধ্যে Altitudinal, Edaphic এবং Successional উপ-প্রজাতিগুলোকে প্রস্তাব করা হয়েছে । কিছু উপ-প্রজাতি অগ্রগামী উদ্ভিদের প্রাথমিক উত্তরাধিকার বলে মনে করা হয় । Mauna Loa সক্রিয় আগ্নেয়গিরিতে গাছটিকে প্রায় ২৫০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত পাওয়া যায় । পুরোনো উচ্চ দ্বীপগুলোতে প্রজাতিগুলো ক্রমাগত আর্দ্র বৃষ্টি বন (Moist rain forest) পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে মনে হয় । জাতগুলোর রূপবিদ্যাও আলাদা, যাদের সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত (Pubescent) পাতাগুলো দৃশ্যত প্রজাতির অগ্রগামী রূপ এবং চকচকে পাতার জাতগুলো পরবর্তী ধারাবাহিক পর্যায়ে পাওয়া যায় । ওহিয়া লেহুয়াতে প্রায়শই জিনগতভাবে স্বতন্ত্র বংশের মধ্যে প্রজাতির মিলন প্রক্রিয়া (Intraspecific hybridization) প্রদর্শিত হয়েছে কিন্তু আংশিক অসামঞ্জস্যতারও কিছু প্রমাণ রয়েছে । ওহিয়া লেহুয়া অপেক্ষাকৃত ধীর গতির একটি বৃক্ষ । তরুণ আগ্নেয়গিরির স্তরগুলোর একটি অগ্রগামী প্রজাতির ওহিয়া লেহুয়া অপেক্ষাকৃত পুরোনো মাটিতে আধিপত্য বজায় রাখে । গাছটি ঋতুভেদে আর্দ্র বনাঞ্চলেও সাধারণত প্রভাবশালী হতে পারে বা স্থানীয় Acacia koa গাছের সাথে মিশ্রণ তৈরি করতে পারে । যদিও Acacia koa প্রজাতি ভেজা বনে শামিয়ানা বা ছাউনি (Canopy) আধিপত্যের কারণে এটির প্রাথমিক প্রতিযোগী । গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফার্ন গাছ Cibotium spp. (Tree fern বা Manfern বা Arborescent fern) বৃদ্ধির কারণে সর্বোত্তম অবস্থার সাথে সেই জায়গাগুলোতে ওহিয়া লেহুয়াকে স্থানচ্যুত করতে পারে । তবে অনেক পোকামাকড় ওহিয়া লেহুয়া গাছকে মারাত্মকভাবে আক্রমণ করে । এদের মধ্যে স্থানীয় Cerambycid borer Plagithmysus bilineatus পোকার সম্ভাব্য প্রভাব সবচেয়ে বেশি । এটি দুর্বল গাছের জন্য মহামারী ও ভয়ঙ্কর হতে পারে এবং ব্যাপক শামিয়ানা ছত্রাক বা রোগের (Extensive canopy dieback) সাথে জড়িত । পাশাপাশি অন্যান্য Borer পোকাগুলো যেমন: Ceresium Unicolor, Xyleborus saxesensi, X. simillimus, Defoliator এবং Sapsucking insect ইত্যাদি ওহিয়া লেহুয়া গাছের সম্ভাব্য ক্ষতিকারক । এছাড়া The root rots, Phytophthora cinnamomi, Pythium vexans, Shoestring root rot, Armillaria mellea ইত্যাদি স্থানীয়ভাবে ক্ষতিকারক হতে পারে এবং শামিয়ানা ছত্রাক বা রোগের সাথেও জড়িত । তবে Rhizoctonia spp. ছত্রাক দ্বারা স্যাঁতসেঁতে বন্ধ হওয়ার সংবাদ জানা গেছে ।

হাওয়াইয়ের এ অনন্য বনের জীব-বৈচিত্র্য এবং ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । দুঃখজনকভাবে হাওয়াই একটি পরিবেশগত সংকটের সম্মুখীন । সহস্রাব্দ ধরে বেঁচে থাকা গাছগুলো এখন ছত্রাকজনিত মারাত্মক রোগ (Myrtle rust), দাবানল, বন্যপ্রাণী (Feral ungulates) প্রজাতি এবং আক্রমণকারী ভিনদেশী গাছপালা (Alien invasive plants) যেমন: Strawberry guava (Psidium cattleyanum), Albizia (Falcataria falcata), Purple plague (Miconia calvescens), Faya tree (Myrica faya), Christmasberry (Schinus terebinthifolia), Silk oak (Grevillea robusta), Fountain grass (Cenchrus setaceus) দ্বারা প্রচণ্ড হুমকির সম্মুখীন যা সম্পদ ব্যবস্থাপকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে । হাওয়াই আগ্নেয়গিরিময় জাতীয় উদ্যানে ২৩ প্রজাতির বিপন্ন সংবহনতান্ত্রিক উদ্ভিদ (Vascular plants) রয়েছে যার মধ্যে ১৫টিই বিপন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ । সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ গুরুত্বপূর্ণ গাছগুলোর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়েছে ROD ছড়িয়ে পড়ে এবং বন ধ্বংস করার কারণে । উল্লেখ্য যে ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে হাওয়াই দ্বীপে আবিষ্কৃত ROD বা Rapid Ohiʻa Death বা 'দ্রুত ওহিয়া মৃত্যু' হচ্ছে একটি নতুন ছত্রাক রোগ, যা বর্তমানে হাওয়াই দ্বীপে ওহিয়া উদ্ভিদকে সাংঘাতিকভাবে আক্রমণ এবং হত্যা করে । ভয়ঙ্কর এ ছত্রাকের নাম Ceratocystis fimbriata । ছত্রাকটি গাছের সংবহনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে (Vascular system) বাধাগ্রস্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং জলের ছাউনি থেকে বঞ্চিত করে খুব দ্রুতই ওহিয়া লেহুয়া গাছকে মেরে ফেলতে পারে । হাওয়াইতে হাজার হাজার ওহিয়া লেহুয়া গাছ ইতিমধ্যেই ROD দ্বারা নিহত হয়েছে । ওহিয়া লেহুয়া হচ্ছে হাওয়াইয়ান বনের মূল প্রজাতি (Keystone species) যার উপর বাস্তুতন্ত্রের অন্যান্য প্রজাতিগুলো নির্ভর করে এবং এটি কোনো কারণে অপসারিত হলে বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে । গবেষকরা বিশ্বাস করেন যে এ ছত্রাকটি দীর্ঘ দূরত্বে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং সমগ্র রাষ্ট্র জুড়ে ওহিয়া লেহুয়া গাছকে হত্যা করার ক্ষমতা ROD এর রয়েছে । সুতরাং ROD এর মাধ্যমে বনের বিশাল বাস্তুতন্ত্রে এমন ভয়ানক ব্যাঘাত সৃষ্টি হলে হাওয়াইয়ের জলাধার, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জীবনযাত্রার মানকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে । যদিও প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক সংস্থা (IUCN) বিপদগ্রস্ত ওহিয়া লেহুয়া গাছকে সংস্থাটির লাল তালিকার্ভূক্ত করেছে । 

উদ্যানের ওয়েবসাইটে গাছপালা সম্পর্কে আরো জানা যেতে পারে: https://ow.ly/BIOa50Ssf3n , 

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া,  https://research.fs.usda.gov/ , https://www.inaturalist.org/ 

 ছবি: https://bn.photo-ac.com/ , https://portal.ehawaii.gov/ ,  https://www.inaturalist.org/ 

Sunday, 23 June 2024

স্পেনীয় শৈবাল বা শ্যাওলা (Spanish moss)






শৈবাল একটি সালোক-সংশ্লেষক, Eukaryotic জীবের বৃহৎ এবং বৈচিত্র্যময় গোষ্ঠী । স্পেনীয় শৈবাল বা শ্যাওলা হচ্ছে Epiphytic ফুলের উদ্ভিদ যা প্রায়শই গ্রীষ্মমন্ডলীয় এবং উপক্রান্তীয় জলবায়ুতে বড় গাছ (ছাল এবং ডালে), বন, পর্বত, নদী, হ্রদ এবং মরুভূমিতে জন্মে থাকে । এটি বেশিরভাগ মেক্সিকো, বারমুডা, বাহামা, মধ্য আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং ওয়েস্টইন্ডিজের স্থানীয় উদ্ভিদ । এর প্রাথমিক প্রাকৃতিক পরিসর হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (পুয়ের্তো রিকো এবং ইউ.এস. ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জসহ) থেকে আর্জেন্টিনা পর্যন্ত যেখানে যথেষ্ট পরিমাণে উষ্ণ জলবায়ু বিদ্যমান এবং তুলনামূলকভাবে উচ্চ গড় আর্দ্রতা ঘটে থাকে । উত্তর আমেরিকায় এটি মেক্সিকো উপসাগর এবং দক্ষিণ আটলান্টিক উপকূল অনুসরণ করে বিস্তৃতি ঘটায় । এছাড়া নর্থ্যাম্পটন কাউন্টি, ভার্জিনিয়া, দক্ষিণ মেরিল্যান্ড এবং হাওয়াই দ্বীপসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে জন্মে থাকে । অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে স্পেনীয় শৈবালকে প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিকীকৃত (Naturalized) করা হয়েছে । এটি ফরাসি পলিনেশিয়াতে ‘দাদার দাড়ি’ (Grandpa’s beard) নামে পরিচিত । এছাড়া স্পেনীয় শৈবাল ও মোজেসের (Moses) দাড়ি নামেও পরিচিতি রয়েছে । এর অন্যান্য নামগুলো হচ্ছে : Air-plant, Grandfather’s Whiskers, Graybeard, Long Moss, Old Man’s Beard, Spanish Moss, Wool Crepe ইত্যাদি । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এটি সর্বাধিক পরিচিত, সাধারণত দক্ষিণ লাইভ ওক (Quercus virginiana) ও পালকহীন বা বাল্ড সাইপ্রেসের (Taxodium distichum) নিম্নভূমি, জলাভূমি, মধ্য আটলান্টিক ও দক্ষিণ-পূর্ব রাজ্যগুলোর জলাভূমি, দক্ষিণ-পূর্ব ভার্জিনিয়ার উপকূল থেকে ফ্লোরিডা এবং পশ্চিমে দক্ষিণ আরকানসাস ও টেক্সাস পর্যন্ত বিস্তৃত । স্পেনীয় শৈবাল Bromeliaceae (bromeliads) পরিবারের অন্তর্ভূক্ত একটি বায়ু উদ্ভিদ । পূর্বে Anoplophytum, Caraguata এবং Renealmia বংশের মধ্যে এটি স্থাপিত হয়েছিল । এ উদ্ভিদের নির্দিষ্ট নাম হচ্ছে Usneoides । যদিও এটি Lichen Usnea গণের কিছু প্রজাতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং স্পেনের স্থানীয় নয় । এর বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে: Tillandsia usneoides L. ।
স্পেনীয় শৈবাল একটি বহুবর্ষজীবী ভেষজ । এক বা একাধিক সরু ডালপালা নিয়ে গঠিত । বিকল্প পাতলা, বাঁকা বা কোঁকড়ানো এবং ভারী আকারের পাতাগুলো চওড়া হয়ে শিকল আকৃতির গাছপালায় রূপ নিয়ে একটি ঝুলন্ত কাঠামো গঠন করে । পাতা শুকিয়ে গেলে রূপালী থেকে ধূসর কিন্তু ভিজে গেলে হাল্কা সবুজ । ঘন ও ঝুলে পড়া শৈবালের গোছা বা ঝোপের মতো কোনো শিকড় নেই । কান্ড ও পাতার ধূসর আঁশগুলো আর্দ্রতা এবং পুষ্টি পাওয়ার মাধ্যম । এটি বৃদ্ধির জন্য উচ্চ আর্দ্রতা এবং দূষণমুক্ত অবস্থার প্রয়োজন । সর্পিল (Zigzagging) আকারে বৃদ্ধি পায়, তবে রৈখিকও হতে পারে । Peltate চুলের একটি পুরু স্তর (Trichomes) আঁশের মতো পাতাগুলোকে জল শোষণ এবং ধরে রাখার একটি বড় ক্ষমতা প্রদান করে । উদ্ভিদের ছোট ফুলগুলো হলুদ-সবুজ এবং পাপড়ি ছড়ানো থাকে । বৃন্তটি (Scape) আংশিকভাবে পাতার খাপের মধ্যে লুকিয়ে থাকে । বসন্ত থেকে শরৎ পর্যন্ত পুষ্পমঞ্জুরি ফুটে উঠে এবং লোম দ্বারা ঢেকে একটি মাত্র ডোরাকাটা ফুলে পরিণত হয় । একটি ফুলের সমস্ত পাপড়ির সংগ্রহকে করোলা (Corolla) বলে । পাপড়ি, ৮-১৪ মিঃমিঃ লম্বা ও সবুজ-হলুদ-নীল রঙ দ্বারা করোলা গঠিত হয় । ফুল রাতে সুগন্ধি ছড়ায় এবং পোকামাকড় দ্বারা পরাগায়ন হয় । ১.৫-৩ সেঃমিঃ লম্বা ফলগুলো Septicidal । ক্যাপসুলগুলো প্রায় ছয় মাস গাছে থাকে এবং পাকার পরে বীজগুলো বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে যেতে পারে । স্পেনীয় শৈবাল বীজ দ্বারা ও উদ্ভিজ্জভাবে বংশবিস্তার ঘটে এবং গাছের অঙ্গে লেগে থাকে যেগুলো বাসা বাঁধার উপাদান হিসেবে পাখিরা অন্য স্থানে নিয়ে যায় । স্পেনীয় শৈবাল পরজীবী নয়, কারণ এটি সূর্য থেকে তার নিজস্ব শক্তি সালোকসংশ্লেষ করে এবং সালোক-সংশ্লেষণের জন্য Crassulacean acid বিপাকের জল-সংরক্ষণ কৌশল ব্যবহার করে । এটি একটি Epiphyte (ফুলের উদ্ভিদ বা Angiosperm), যেখানে উদ্ভিদ তার নিজের পাতার আঁশগুলোর মাধ্যমে বাতাস ও বৃষ্টিপাত থেকে পুষ্টি এবং জল শোষণ করে, যার বেশিরভাগই স্বাগতিক গাছের পাতা থেকে প্রাপ্ত খনিজ পদার্থ থেকে আসে । যদিও এটি যে গাছে বেড়ে উঠে তাকে ক্ষতিসাধন বা কদাচিৎ হত্যা করে । তবে এটি মাঝে মধ্যে এতোই ঘন হয়ে যায় যে, গাছের পাতায় ছায়া দিয়ে গাছের বৃদ্ধির হার কমিয়ে দেয় । দক্ষিণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উদ্ভিদটি দক্ষিণী লাইভ ওক (Quercus virginiana) এবং পালকহীন বা বাল্ড সাইপ্রেসের (Taxodium distichum) জন্য পছন্দে অগ্রাধিকার বলে মনে হয় কারণ তাদের Foliar mineral leaching (ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম এবং ফসফরাস) এর উচ্চ হার যা এপিফাইটিক উদ্ভিদে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি সরবরাহ করে । এটি অন্যান্য গাছের প্রজাতি যেমন Sweetgum (Liquidambar styraciflua), Crepe-myrtles (Lagerstroemia spp.), Other oaks এবং এমনকি Pine গাছেও উপনিবেশ করতে সক্ষম । স্পেনীয় শৈবাল লাইভ ওক, মৃত গাছের ডালপালা, বেড়া এবং টেলিফোন লাইনের মতো কৃত্রিম কাঠামোতে আরো অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় । এটি এখনো অনেক প্রাণীর জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ । স্পেনীয় শৈবাল ইঁদুর, সাপ, তিন প্রজাতির বাদুড়, টিক, মাইট, মিলিপিডসহ বেশ কয়েকটি প্রাণীকে আশ্রয় দেয় বা পোষন করে বা আবাসস্থল । জাম্পিং মাকড়সার (Jumping spider) একটি প্রজাতি এবং Pelegrina tillandsiae শুধুমাত্র স্পেনীয় শৈবালেই পাওয়া যায় । যদিও ব্যাপকভাবে স্পেনীয় শৈবাল আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয় এবং উদ্ভিদের বাস্তুশাস্ত্রের এক গবেষণায় দেখা যায় উদ্ভিদে শনাক্ত করা অন্যান্য হাজার হাজার আর্থ্রোপডের মধ্যে Chigger উপস্থিত ছিল না । স্পেনীয় শৈবালের সবুজ আঁশগুলোতে Chlorococcum গণের একটি সবুজ শৈবাল পাওয়া যায় । স্পেনীয় শৈবাল বায়ুবাহিত দূষকগুলোর প্রতি সংবেদনশীল । এটি এমন এলাকায় বৃদ্ধি পায় না যেখানে ধোঁয়া প্রচলিত বা নিকৃষ্ট মানের, যেমন চিমনির কাছাকাছি । ক্রমবর্ধমান বায়ু দূষণের কারণে এটি শহরাঞ্চল থেকে হ্রাস পেয়েছে । স্পেনীয় শৈবাল প্রায়শই দক্ষিণ গথিক চিত্র (Gothic imagery) এবং গভীর দক্ষিণ সংস্কৃতির সাথে যুক্ত থাকে কারণ আলাবামা, দক্ষিণ আরকানসাস, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, লুইসিয়ানা, মিসিসিপি, উত্তর ক্যারোলিনা, দক্ষিণ ক্যারোলিনা, পূর্ব ও দক্ষিণ টেক্সাস এবং দক্ষিণ ভার্জিনিয়ার মতো উপক্রান্তীয় আর্দ্র দক্ষিণ অকুস্থলে বেড়ে উঠার প্রবণতা রয়েছে । স্পেনীয় শৈবালের উৎপত্তি সম্পর্কে একটি উপাখ্যানে বলা হয় ‘সর্বদা বেঁচে থাকা নিকৃষ্ট মানুষ’ (The Meanest Man Who Ever Lived), যেখানে লোকটির সাদা চুল অনেক লম্বা হয়ে গাছে ধরা পড়ে । ঊনবিংশ শতাব্দীতে হাওয়াই দ্বীপে স্পেনীয় শৈবাল প্রবর্তিত হয়েছিল । এটি একটি জনপ্রিয় শোভাময় এবং লেই উদ্ভিদ (Lei plant) হয়ে উঠে । হাওয়াইয়ের অস্থায়ী সরকারের প্রথম রাষ্ট্রপতি Sanford B. Dole এর দাড়ির নামানুসারে এটির নামকরণ করা হয় ‘Umiʻumi-o-Dole’ । এটি হিনাহিনা (Hinahina) নামেও পরিচিত এবং সমারোহের জন্য ব্যবহৃত লেই উদ্ভিদের স্থানীয় হিনাহিনার বিকল্প হয়ে উঠেছে । একুশ শতকের গোড়ার দিকে গাছটি ‘Pele’s hair’ / ‘Lauoho-o-Pele’ হিসেবে ব্যাপকভাবে বাজারজাত করা হয়েছিল, যা আসলে এক ধরণের ফিলামেন্টাস আগ্নেয়গিরিময় কাঁচকে (Filamentous volcanic glass) বোঝায় ।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রজাতিটির একটি নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক মূল্য রয়েছে । স্পেনীয় শৈবাল Building insulation, Mulch, Packing material, Mattress stuffing এবং Fiber সহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয় । এটি ফুলের রচনা এবং কারুশিল্পের সজ্জায় শোভাময় উদ্ভিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয় । এটি যান্ত্রিক টিস্যু, সজ্জিত, অত্যন্ত প্রতিরোধী ইলাস্টিক ফাইবার প্রদান করে যা প্রায়শই ঘোড়ার চুলের পরিবর্তে, গৃহসজ্জার সামগ্রী হিসেবে এবং গদির প্যাডিংয়ে ব্যবহৃত হয় । ১৯০০ দশকের গোড়ার দিকে এটি গাড়ির আসন বা বিছানায় (Padding) বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল । ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে ১০০০০ টন প্রক্রিয়াজাত স্পেনীয় শৈবাল উৎপাদিত হয়েছিল । বর্তমানে শিল্প ও কারুশিল্পে ব্যবহারের জন্য, ফুল বাগানের বিছানা হিসেবে, Bousillage এর উপাদান হিসেবে এবং ঐতিহ্যগত প্রাচীর আচ্ছাদন উপাদান হিসেবে এটি সংগ্রহ করা হয় । লাতিন আমেরিকা এবং লুইসিয়ানার কিছু অংশে এটি জন্মের দৃশ্যে (Nativity scenes) ব্যবহৃত হয় । দক্ষিণ-পশ্চিম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মরুভূমি অঞ্চলে শুকনো স্পেনীয় শৈবাল জলাভূমি শীতলক বা ঠাণ্ডিঘর (Swamp cooler) নামে পরিচিত (কিছু এলাকায় ‘মরুভূমির শীতলক’ নামে পরিচিত) যা বাতাস নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (Air conditioner) থেকে অনেক কম খরচে ঘরবাড়ি এবং অফিস ঠান্ডা করতে ব্যবহৃত হয় । শীতলকরণ প্রযুক্তির সাহায্যে একটি দমকল যা স্পেনীয় শৈবাল দিয়ে তৈরি প্যাড বা বিছানার (Pad) উপর পানি ছিটিয়ে দেয় তারপর একটি পাখা প্যাডের মধ্য দিয়ে ভবনে বাতাস টেনে নেয় । প্যাডের উপর পানির বাষ্পীভবন বাতাসের তাপমাত্রা হ্রাস করে ভবনকে শীতল করতে সাহায্য করে । বিভিন্ন জাত সমূহ হচ্ছে: Tillandsia ‘Maurice’s Robusta’, Tillandsia ‘Munro’s Filiformis’, Tillandsia usneoides var. filiformis (André) Mez (বিলুপ্ত জাত), Tillandsia ‘Odin’s Genuina’, Tillandsia ‘Spanish Gold’, Tillandsia ‘Tight and Curly’ ইত্যাদি । সংকর (Hybrids) জাত সমূহ হচ্ছে: Tillandsia ‘Nezley’, Tillandsia ‘Kimberly’, Tillandsia ‘Old Man’s Gold’ । স্পেনীয় শৈবাল হচ্ছে মারকিউরি, ক্যাডমিয়াম, সায়ানাইড, লেড, নিকেল, কপার, ক্রোমিয়াম, কার্বন ও জিঙ্কের একটি ভালো বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চয়কারী এবং জৈব অবক্ষয়ের মাধ্যমে এগুলোকে নিরপেক্ষ করতে পারে । এটি বায়ুমণ্ডল থেকে PM2,5 এবং PM10 কণা বাজেয়াপ্ত ও অপসারণ করতে পারে । এ সমস্ত বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে উদ্ভিদটি Phytoremediation এ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় । প্রাচীনকাল থেকেই আমেরিকান আদিবাসীরা বিভিন্ন কাজে স্পেনীয় শৈবাল ব্যবহার করে আসছে । Houma এবং সেমিনোল উপজাতিরা (Seminole tribes) কাঠের বাসস্থানের খুঁটিগুলোকে একত্রে বেঁধে রাখার জন্য, গদি, মাদুর এবং পেঁচানো দড়ি তৈরি করতে তন্তু হিসেবে ব্যবহার করতেন । উত্তর আমেরিকার জনগণ আগুনের তীরগুলোর জন্য শুকনো তন্তুগুলো ব্যবহার করেছিলেন যা শতাব্দী ধরে শিকার এবং যুদ্ধের জন্য অপরিহার্য হাতিয়ার ছিল । লুইসিয়ানার নাচেজ উপজাতিরা (Natchez tribes) মানুষের জ্বর কমাতে উদ্ভিদটি সেদ্ধ করে চা প্রস্তুত করতে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করতেন । মেক্সিকোতে ধর্মীয় ছুটির দিনগুলোতে উদ্ভিদটি শোভাময় উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে Cribs এবং অন্যান্য ক্রিসমাস সজ্জায় বা অলঙ্করণে । এছাড়া এটি মাটির মৃৎপাত্র, ক্যানো শক্তিবৃদ্ধি এবং এমনকি ডায়াপার প্যাডিংসহ নানা কাজে ব্যবহৃত হয় । তবে এটি Anticonvulsant এবং Astringent হিসেবে ঔষধি উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে । কিছু মার্কিন অঞ্চলে মাঝে মধ্যে পশুদের খাদ্য হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয় । স্পেনীয় শৈবাল বা T. usneoides উদ্ভিদ সহজেই চাষ করা যায় কারণ এটির মাটি প্রয়োজন হয় না । ঠান্ডা জলবায়ুতে কেবল স্বাস্থ্য, আর্দ্রতা ও জলের প্রয়োজন হয় এবং এটির জন্য একটি শীতের আশ্রয় প্রয়োজন । এটিকে নিয়মিত কুয়াশাচ্ছন্ন এবং আর্দ্র অবস্থায় বাড়ির ভিতরে জন্মানো যেতে পারে । 

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, মোনাকোনেচারএনসাইক্লোপিডিয়া । 

ছবি: https://www.monaconatureencyclopedia.com/?lang=en 

Friday, 14 June 2024

মঙ্গল গ্রহের অলিম্পাস মন্স আগ্নেয়গিরির চূড়ায় হিম আবিষ্কার


ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (European Space Agency বা ESA) ও রাশিয়ান রসকসমস সংস্থার (Russian Roscosmos Agency) মধ্যে একটি সহযোগিতামূলক প্রকল্প ExoMars Trace Gas Orbiter (TGO বা ExoMars Orbiter) এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার Mars Express Orbiter মঙ্গল গ্রহের বিষুবরেখার কাছে Olympus Mons আগ্নেয়গিরিতে প্রথমবারের মতো হিম বা তুষার দেখেছে, যেখানে হিমের অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব বলে মনে করা হয়েছিল । সত্যিই, এক বিস্ময়কর ঘটনা! Olympus Mons শুধুমাত্র মঙ্গলেরই নয়, সৌরজগতের সর্ববৃহৎ-সর্বোচ্চ পর্বত ও আগ্নেয়গিরি যেখানে Tharsis অঞ্চলে এ হিম আবিষ্কৃত হয়েছে । বিশাল ঢাল আগ্নেয়গিরিটি সর্বশেষ বিস্ফোরিত হয়েছিল ২৫ মিলিয়ন বছর আগে । নেতৃত্বদানকারী উদ্ভাবক Adomas Valantinas যিনি সুইজারল্যান্ডের বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ছাত্র হিসেবে এটি আবিষ্কার করেছিলেন এবং বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্টডক্টরাল ফেলো ও গ্রহবিজ্ঞানী তিনি বলেছেন: "আমরা ভেবেছিলাম মঙ্গল গ্রহে বিষুবরেখার চারপাশে হিম হওয়া অসম্ভব । কারণ, এখানে সূর্যালোক ও পাতলা বায়ুমণ্ডলের মিশ্রণ ভূপৃষ্ঠ এবং পর্বতচূড়া উভয় স্থানেই তাপমাত্রা অপেক্ষাকৃত বেশি বজায় রাখে । আমরা পৃথিবীতে যা দেখি তার থেকে ভিন্ন যেখানে আপনি হিমশীতল শিখর দেখার আশা করতে পারেন । এখানে হিমের অস্তিত্ব উত্তেজনাপূর্ণ এবং ইঙ্গিত দেয় যে খেলার মধ্যে ব্যতিক্রমী প্রক্রিয়া রয়েছে যা হিম গঠনের অনুমতি দিচ্ছে । আমরা যা দেখছি তা অতীতের মঙ্গল জলবায়ুর একটি চিহ্ন হতে পারে । হয়তো এটি বায়ুমণ্ডলীয় জলবায়ু প্রক্রিয়াগুলোর সাথে সম্পর্কিত যা মঙ্গল গ্রহের ইতিহাসে আগে কাজ করেছিল, সম্ভবত লক্ষ লক্ষ বছর আগে ।"

থার্সিস (Tharsis) হচ্ছে মঙ্গল গ্রহের পশ্চিম গোলার্ধে বিষুবরেখার কাছে কেন্দ্রীভূত একটি বিশাল আগ্নেয় মালভূমি । এ অঞ্চলটি সৌরজগতের বৃহত্তম আগ্নেয়গিরির আবাসস্থল, যার মধ্যে কয়েকটি বৃহদাকার ঢাল আগ্নেয়গিরি Arsia Mons, Pavonis Mons এবং Ascraeus Mons যেগুলো সম্মিলিতভাবে Tharsis Montes নামে পরিচিত । এখানে Olympus Mons আগ্নেয়গিরিসহ প্রায় এক ডজন আগ্নেয়গিরির বসতি । এ আগ্নেয়গিরিগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই দৈত্যাকার, যা পৃথিবীর মাউন্ট এভারেস্টের চেয়ে এক থেকে তিন গুণ পর্যন্ত উচ্চতায় আশেপাশের সমভূমির উপরে বিস্তৃত । মঙ্গল গ্রহের সবচেয়ে উঁচু আগ্নেয়গিরি হচ্ছে Olympus Mons যেটি থার্সিস অঞ্চলের সাথে যুক্ত কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মালভূমির পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত । থার্সিস থেকে পূর্ব দিকে প্রসারিত ক্যানিয়ন ব্যবস্থা হচ্ছে Valles Marineris । উত্তরে ডিম্বাকৃতির বৈশিষ্ট্য Alba Mons । থার্সিস অঞ্চল মঙ্গল গ্রহের পশ্চিম গোলার্ধে আধিপত্য বিস্তার করে । থার্সিস নামটি হচ্ছে বাইবেলের Tarshish এর Greco-Latin প্রতিবর্ণীকরণ বা বর্ণান্তরণ, যা পরিচিত জগতের পশ্চিম প্রান্তের ভূমি । আগ্নেয়গিরিগুলোর চূড়ায় জ্বালামুখ বা গর্ত (Caldera) এবং বিশাল ফাঁপা (Hollow) রয়েছে যা অতীতে অগ্ন্যুৎপাতের সময় ম্যাগমা প্রকোষ্ঠ খালি হওয়ার কারণে ঘটেছিল । গবেষকরা অনুমান করেন যে, থার্সিসের উপরে একটি অদ্ভুত উপায়ে বাতাস সঞ্চালিত হয় এবং এটি সেখানে আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের মধ্যে এক অনন্য ছোট জলবায়ু (Unique microclimate) গঠন করে যেটি হিমের Patch বা টুকরো বা তাপ্পি তৈরি করতে সাহায্য করে । মানুষের চুলের চেয়ে পাতলা (সম্ভবত এক মিলিমিটারের মাত্র একশতাংশ পুরু) বরফের সূক্ষ্ম কণা আগ্নেয়গিরির চূড়ার জ্বালামুখ এবং তার চক্রবেড়ের (Rim) অংশগুলোতে রাতারাতি তৈরি হতে দেখা যায় । সূর্যালোকে বাষ্পীভূত হওয়ার আগ পর্যন্ত সূর্যোদয়ের সময় চারপাশে হিম টুকরো বা সূক্ষ্ম বরফ কণা বা তাপ্পিগুলো (The patches of frost) কয়েক ঘন্টার জন্য উপস্থিত থাকে । হিমশীতল স্তরটি ব্যতিক্রমভাবে পাতলা হওয়া সত্ত্বেও এটি একটি বিশাল এলাকা জুড়ে আবরণ করে । হিমের পরিমাণ ঠাণ্ডা ঋতুতে প্রতিদিন প্রায় ১৫০০০০ টন জল পৃষ্ঠতল ও বায়ুমণ্ডলের মধ্যে অদলবদল হয়, যা প্রায় ৬০টি অলিম্পিক সুইমিং পুলের সমতুল্য এবং উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় প্রতিদিন ঘনীভূত হয় । TGO অরবিটারের Colour and Stereo Surface Imaging System (CaSSIS) এর প্রধান তদন্তকারী, বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের Adomas এর পিএইচডি সুপারভাইজার এবং সহ-উদ্ভাবক Nicolas Thomas বলেছেন: "বাতাস পাহাড়ের ঢালে ভ্রমণ করে, তুলনামূলকভাবে আর্দ্র বাতাস ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি থেকে উচ্চ-উচ্চতায় নিয়ে আসে যেখানে এটি ঘনীভূত হয় এবং বছরের নির্দিষ্ট সময়ে হিমের মতো স্থায়ী হয় । আমরা আসলে পৃথিবী এবং মঙ্গল গ্রহের অন্যান্য অংশে এটি ঘটতে দেখি, একই ঘটনা ঘটাচ্ছে মৌসুমী মঙ্গলের Arsia Mons Elongated Cloud । আমরা মঙ্গল গ্রহের আগ্নেয়গিরির শিখরে যে হিম দেখতে পাই তা বিশেষ করে জ্বালামুখের ছায়াযুক্ত অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে বলে মনে হয়, যেখানে তাপমাত্রা বেশি ঠাণ্ডা ।" 

মঙ্গল গ্রহ পর্যবেক্ষণকারী মহাকাশযানগুলো এর আগে মঙ্গলে হিমায়িত এবং তরল জলের প্রমাণ দিয়েছে । এ গ্রহের উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে যথেষ্ট পরিমাণে বরফ দেখা গেছে । ভূদৃশ্যের নিদর্শনগুলো থেকে বোঝা যায় যে রক্তিম গ্রহটি একসময় অনেক বেশি আর্দ্র, ছড়িয়ে পড়া দৈত্যাকার হ্রদ, চঞ্চল বা আঁকিয়া বাঁকিয়া যাচ্ছে এমন নদী এবং সম্ভবত বাসযোগ্যও ছিল । মঙ্গল গ্রহের বর্তমান জলচক্রটি বাসযোগ্যতা এবং ভবিষ্যত মানুষের অনুসন্ধানের জন্য প্রভাব ফেলছে । যেমন থার্সিস আগ্নেয়গিরি অঞ্চলের উপরে জলের বরফ মেঘ এবং জলীয় বাষ্প সনাক্ত করা হয়েছে, যা Regolith এবং বায়ুমণ্ডলের মধ্যে জলের সক্রিয় বিনিময়কে অনুমান করা হয় । আনন্দের বিষয় হচ্ছে গ্রহ বিজ্ঞানী Adomas Valantinas, Nicolas Thomas এবং তাদের সহকর্মীরা Olympus Mons, Arsia Mons, Ascraeus Mons এবং Ceraunius Tholus এর থার্সিস আগ্নেয়গিরিতে হিম আবিষ্কার করেছেন । এ হিমগুলো কিভাবে তৈরি হয় তার মডেলিং বিজ্ঞানীদের মঙ্গল গ্রহের অবশিষ্ট গোপন রহস্যগুলোকে প্রকাশ করার অনুমতি দিতে পারে যেখানে জলের অস্তিত্ব রয়েছে ও কিভাবে এটি জলাধারগুলোর মধ্যে চলে যায় এবং গ্রহের জটিল বায়ুমণ্ডলীয় গতিবিদ্যা বোঝার ক্ষেত্রে । মঙ্গল গ্রহের ভবিষ্যৎ অনুসন্ধান এবং পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সম্ভাব্য লক্ষণগুলো অনুসন্ধানের জন্য এ ধরণের জ্ঞান অপরিহার্য । Adomas Valantinas আরো বলেন: ''এ আবিষ্কারটি মঙ্গল গ্রহের বিষুবরেখায় প্রথমবারের মতো হিম পাওয়া গেছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে । কিন্তু আগে কেন দেখা গেল না? কয়েকটি কারণ রয়েছে: প্রথমত, আমাদের একটি কক্ষপথ দরকার যা ভোরবেলা একটি অবস্থান পর্যবেক্ষণ করতে হয় । যদিও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার মঙ্গল গ্রহ পর্যবেক্ষণ করার ক্ষেত্রে TGO অরবিটার এবং Mars Express অরবিটারে এ ধরনের কক্ষপথ রয়েছে যা দিনের সব সময় পর্যবেক্ষণ করতে পারে । এছাড়া অন্যান্য সংস্থা থেকে অনেকগুলো সূর্যের সাথে সমলয় (Synchronised) করা হয় যা শুধুমাত্র বিকেলে পর্যবেক্ষণ করতে পারে । দ্বিতীয়ত, জমাট শীতল মঙ্গল ঋতুর সাথে যুক্ত থাকে হিম যা জানালাটিকে আরো সংকীর্ণ করে দেয় । আমাদের জানতে হবে কোথায় এবং কখন ক্ষণস্থায়ী নীলাভ হিম খুঁজতে হবে । বিষুবরেখার কাছে গবেষণার জন্য আমরা অন্য কিছু খুঁজছিলাম, কিন্তু মঙ্গলের আগ্নেয়গিরির শীর্ষে এটি দেখার আশা করিনি !'' ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার TGO অরবিটার এবং Mars Express অরবিটারের প্রকল্প বিজ্ঞানী Colin Wilson বলেছেন: "মঙ্গল গ্রহের উপরিভাগে জল খোঁজা সবসময়ই উত্তেজনাপূর্ণ, বৈজ্ঞানিক স্বার্থ ও এর প্রভাবের জন্য মানব এবং রোবোটিক উভয় অনুসন্ধানই গুরুত্ব বহন করে । এমনকি এ আবিষ্কারটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয় । মঙ্গল গ্রহের নিম্ন বায়ুমণ্ডলীয় চাপ একটি অপরিচিত পরিস্থিতি তৈরি করে যেখানে গ্রহের পাহাড় চূড়াগুলো সাধারণত তার সমভূমির চেয়ে বেশি ঠাণ্ডা হয় না, কিন্তু মনে হচ্ছে আর্দ্র বাতাস পাহাড়ের ঢালে প্রবাহিত হয়ে এখনো হিমে পরিণত বা ঘনীভূত হতে পারে, এটি নিশ্চিতভাবে পৃথিবীর মতো একটি ঘটনা ৷''

আশ্চর্যজনক আবিষ্কারটি ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা এবং রাশিয়ান রসকসমস সংস্থার প্রদক্ষিণকারী দুই মঙ্গল অভিযাত্রী TGO অরবিটার এবং Mars Express অরবিটারের কৃতিত্ব । তারা মঙ্গল গ্রহে দুর্দান্তভাবে হিম আবিষ্কার করেছে । TGO অরবিটার ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে মঙ্গলে পৌঁছেছিল এবং ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে সম্পূর্ণ বিজ্ঞান মিশন শুরু হওয়ার পর থেকে মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠ, বায়ুমণ্ডল এবং জলের ছবি ও মানচিত্রকরণ করেছে । ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে Mars Express অরবিটার মঙ্গল গ্রহকে প্রদক্ষিণ করার মধ্য দিয়ে মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠ, উপ পৃষ্ঠ, খনিজ পদার্থ, বায়ুমণ্ডল এবং নানা ঘটনা অন্বেষণে দুই দশক অতিবাহিত করছে । গবেষণা দলটি প্রথমে TGO অরবিটারের CaSSIS যন্ত্রের সাহায্যে হিম দেখেছে । তারপর তারা TGO অরবিটারের Nadir and Occultation for Mars Discovery (NOMAD) স্পেকট্রোমিটার এবং Mars Express অরবিটারের High Resolution Stereo Camera (HRSC) ব্যবহার করে এলাকাটি পুনরায় দেখে তাদের অনুসন্ধান নিশ্চিত করেছে । 

তথ্যসূত্র: https://www.esa.int/ , https://www.theguardian.com/ 

অলিম্পাস মন্স আগ্নেয়গিরির অত্যাশ্চর্য ছবি : ESA - European Space Agency   https://www.esa.int/ https://web.facebook.com/EuropeanSpaceAgency

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...