Sunday, 9 June 2024

বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৪ এবং ভূমি পুনরুদ্ধার, মরুকরণ রোধ ও খরা সহনশীলতা

৫ই জুন ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ (World Environment Day বা WED) । বিশেষ দিবসটি ‘ইকো দিবস’ নামেও পরিচিত । সারাবিশ্বে কিংবা কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের সম্মুখীন পরিবেশগত নানা জটিল সমস্যা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে এ দিবস পালন করা হয় । প্রতি বছরই পরিবেশ দিবসের একটি প্রতিপাদ্য বিষয় থাকে । উক্ত দিবসে নানা কর্মসূচী, রাজনৈতিক কর্মোদ্যোগ ও জনসচেতনতার মাধ্যমে এ গ্রহের মানুষকে পরিবেশ সচেতন করে তোলে । বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সময় পানি, বৈশ্বিক উষ্ণায়ণ, ওজোন স্তর, এসিড বৃষ্টি, দারিদ্র, জলবায়ু পরিবর্তন, মরুকরণ, বন্যপ্রাণ ও আবাসস্থল, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, জলজ প্রাণী ও সামুদ্রিক পরিবেশ, সবুজ অর্থনীতি, প্লাস্টিক দূষণ, বায়ুদূষণ এবং বাস্তুতন্ত্রসহ পরিবেশগত নানা প্রকার জটিল বিষয়ের উপর প্রতিপাদ্য করে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হয় । বিশ্ব পরিবেশ দিবসে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই বিভিন্ন পরিবেশ সচেতনতামূলক কর্মসূচী গ্রহণ করে থাকে । জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মতিতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ৫ই জুন থেকে ১৬ই জুন পর্যন্ত ‘জাতিসংঘ মানব পরিবেশ সম্মেলন’ (United Nations Conference on the Human Environment) অনুষ্ঠিত হয় । এখানেই প্রথম পরিবেশ দিবস পালিত হয় । সুইডেনের বিশেষ উদ্যোগে জাতিসঙ্ঘ ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে ৫ই জুনকে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে এবং তখন থেকেই প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন শহরে আলাদা প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে । যেমন: ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজক রাষ্ট্র এবং যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘একমাত্র পৃথিবী’ (Only one Earth) । ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ছিল বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজক শহর এবং যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘মানব বসতি’ (Human Settlements) । গত ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে আয়োজক দেশ ছিল আইভরি কোস্ট, ‘প্লাস্টিক দূষণ সমাধানে শামিল হই সকলে’ এ প্রতিপাদ্য নিয়ে সারাবিশ্বে প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করার লক্ষ্যে দিবসটি পালন করা হয় । ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজক দেশ সৌদি আরব । এ বছর জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির  United Nations Environment Programme (UNEP) নির্ধারিত প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ‘করবো ভূমি পুনরুদ্ধার, রুখবো মরুময়তা, অর্জন করতে হবে মোদের খরা সহনশীলতা’ (Land restoration, desertification and drought resilence) । বৈশ্বিকভাবে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে বসন্তকালে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে শরতকালে দিবসটি পালিত হয় । যথাযথভাবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রেখে পৃথিবীর মানুষ যাতে অন্যান্য সকল জীবের সাথে একাত্ম হয়ে (স্বতন্ত্রভাবে) এক সুন্দর পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করাই হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল উদ্দেশ্য । বর্তমানে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হচ্ছে বনভূমি উজাড় হয়ে যাওয়া । এ বনভূমি শুধুমাত্র অসংখ্য প্রজাতির আবাসস্থলই নয় এটি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । বনভূমি উজাড় হয়ে যাওয়ার ফলে ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, মরুময়, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি করে । এছাড়া ব্যাপক শিল্পায়নের ফলে তীব্রভাবে গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ হয় । গত ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ বিলিয়ন টন যা ২০২২ খ্রিস্টাব্দের তুলনায় শতকরা ১.১ ভাগ বেশি । কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক উষ্ণায়ণের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে । ফলে অতিবৃষ্টি, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবন ও প্রকৃতিতে । তাই, ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় ব্যাপক বনায়নের কোনো বিকল্প নেই । বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ৩.৯২ বিলিয়ন হেক্টর বনভূমি রয়েছে যার মধ্যে অর্ধেকেরই বেশি রাশিয়ায় শতকরা ২০.১ ভাগ, ব্রাজিলে শতকরা ১২.২ ভাগ, কানাডায় শতকরা ৮.৬ ভাগ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শতকরা ৭.৬ ভাগ এবং চীনে শতকরা ৫.৪ ভাগ । অবশিষ্ট বনভূমি পৃথিবীর অন্যান্য অংশে । এখন বাংলাদেশে মোট বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১৪৩২৮০০ হেক্টর । পরিবেশ সুরক্ষায় একটি দেশের আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন এবং সেই তুলনায় বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ প্রায় অর্ধেক । বনভূমি স্বল্পতা ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে । প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা এবং এর থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে দেশের মানুষকে পরিবেশ সচেতন, পরিবেশকে ভালোবাসা, প্রকৃতির সাথে সংযুক্ত হওয়া, নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করা এবং প্রচুর পরিমাণে বৃক্ষ রোপণ করতে হবে । প্রাণের স্পন্দনে, প্রকৃতির বন্ধনে ৷ সবুজ গাছ, সবুজ প্রাণ ৷ একটি গাছ, একটি প্রাণ ৷ একটি গাছ, শত প্রাণ ৷ আমি প্রকৃতির, প্রকৃতি আমার ৷ দূষণ মুক্ত পরিবেশ গড়ি, প্রকৃতিকে রক্ষা করি ৷ বৃক্ষরোপণে এগিয়ে আসি, পৃথিবীকে নিরাপদ রাখি ৷ নিজে বাঁচি, আগামী প্রজন্মের জন্য সবুজ পৃথিবী গড়ে তুলি । তাই, আমাদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, সুুরক্ষিত, টেকসই ও শান্তিময় বিশ্ব নির্মাণে পরিবেশ রক্ষার কোনো বিকল্প নেই । 
বর্তমান বিশ্বে অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির কল্যাণে মানব জাতির জীবনে অসীম সুফল বয়ে আনছে এবং মানুষ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতিসহ সমৃদ্ধ মানব সভ্যতা গড়ে উঠছে । পাশাপাশি মনুষ্য সৃষ্ট বিভিন্ন কর্মকাণ্ড দ্বারা যেমন: শিল্পায়ন, নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোয়া, কলকারখানায় জীবাশ্ম জ্বালানী (তেল ও কয়লা ইত্যাদি পোড়ানো) ব্যবহার, মাইকের আওয়াজ, উচ্চ শক্তির শব্দ ব্যবস্থা, মোটর-নৌ-কলকারখানার যন্ত্রপাতির শব্দ, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা, যেখানে সেখানে মলমূত্র ত্যাগ, হাসপাতালের বর্জ্য, প্লাস্টিক, কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য, যানবাহনের কালো ধোয়া, পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা ও বিস্ফোরণ এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মারাত্মক ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ইত্যাদির মাধ্যমে নানাভাবে মাটি, পানি, বায়ু ও শব্দ দূষণের ফলে ভয়াবহ পরিবেশ দূষিত হচ্ছে । ফলে মানুষের চর্মরোগ, চোখের সমস্যা, শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি, হৃদরোগ, হাইপারটেনশন, মস্তিষ্কের রোগ, যকৃত ও বৃক্কের দীর্ঘ মেয়াদী সমস্যা, শিশুর বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ব্যহত, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, গর্ভপাত, অপরিপক্ব শিশু জন্মদান, মৃত শিশু জন্মের সম্ভাবনা, বধির হওয়া এবং দুরারোগ্য ব্যধিসহ নানাবিধ রোগের কারণ ঘটিয়ে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ডেকে আনছে । বাংলাদেশে প্রতিবছর যে সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয় তার শতকরা প্রায় ২৮ ভাগ ঘটে থাকে পরিবেশ দূষণের কারণে । অতএব, পরিবেশ দূষণের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে এর ক্ষতিকর প্রভাবকে কার্যকর সমাধানের জন্য সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে । বনায়ন, নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন বন্ধ, ইটভাটায় কাঠ না পোড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তির পরিবেশ বান্ধব ইটভাটা স্থাপন, ইটভাটার চিমনী উচ্চতায় নির্মাণ, শিল্পকারখানার বর্জ্য খাল-বিল-নদীতে না ফেলে Effluent Treatment Plant (ETP) এর মাধ্যমে বিশোধন, প্লাস্টিক ব্যাগের বিকল্প হিসেবে পরিবেশ বান্ধব পাটজাত পণ্য ব্যবহার, যানবাহনে সীসা মুক্ত জ্বালানী ব্যবহার, সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস (CNG বা Compressed Natural Gas) ব্যবহার, শিল্পকারখানা-গৃহস্থালি-হাসপাতাল-ইলেকট্রনিক্স বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে না ফেলে তা পুনর্ব্যবহারযোগ্য (Recycling) করে তোলা, কীটনাশক পদার্থের ব্যবহার কমিয়ে কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহার বৃদ্ধি, কাঠের আসবাবপত্রের বিকল্প ব্যবহার বৃদ্ধি, পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি ও পণ্য ব্যবহার, পরিবেশ ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণে কঠোর আইন প্রয়োগ, সঠিক পরিকল্পনায় ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সবুজ নগরায়ন, উন্নয়ন প্রকল্প ও শিল্প কারখানায় সুন্দর-সুশৃঙ্খল পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, ব্যাংকের ক্ষেত্রে সবুজ অর্থনীতি, দূষণ কর আরোপ (Green tax), গবেষণার মাধ্যমে খরা সহনশীল বিভিন্ন জাতের ক‌ৃষি বীজ উদ্ভাবন, কৃষি বনায়ন, ভূগর্ভস্থ ও বৃষ্টির পানির সঠিক ব্যবহার, সৌরশক্তি ব্যবহার এবং মরুকরণ রোধ করে দূষণমুক্ত একটি সুন্দর পরিবেশ নির্মাণ করা যেতে পারে । জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা । জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বে উষ্ণায়ণের কারণে মানুষ, মানব সমাজ, পরিবেশ, প্রকৃতি এবং জীববৈচিত্র্যের উপর ভয়ঙ্কর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে । তাপমাত্রা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, মাটির উর্বরতা হ্রাস, বন্যা, খরা, দাবানল, সুনামি, বজ্রপাত, ঘূর্ণিঝড়, ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়, গ্রীস্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্পের কার্যকলাপ বৃদ্ধি, তুষারঝড়, তাপপ্রবাহ (Heat wave), তীব্র গরমের কারণে তাপজনিত অসুস্থতা (Heat stress), সামুদ্রিক বরফ গলন (Ice-albedo feedback), বহুবর্ষজমা বরফের (Permafrost) গলন, মহাসাগরে স্তরীভবন বৃদ্ধি ও অক্সিজেন মাত্রা হ্রাস, সামুদ্রিক স্রোতের দুর্বলতা, স্থল ও সামুদ্রিক বা মহাসাগরীয় বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, মানব বসতি ক্ষতিগ্রস্ত ও অভিযোজন সমস্যা, সংঘাত বা হিংসাত্মক অপরাধ বৃদ্ধি, অ্যান্টার্কটিকার বিশাল হিমশৈল গলে গিয়ে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে পৃথিবীর নিম্নাঞ্চলের দেশ ও ক্ষুদ্র দ্বীপসমূহ তলিয়ে যাওয়া বা নিশ্চিহ্ন হয়ে কোটি কোটি মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা, বরফাবৃত উত্তরমেরুর আকাশে ওজোন স্তরে প্রায় ১০ লাখ বর্গ কিলোমিটারের বিশাল গর্ত তৈরি, মেরু ঘূর্ণি (Polar vortex) দুর্বল হয়ে ফিনকি স্রোত (Jet stream) ক্রমশ তীব্রতর রূপ ধারণ করে তুষারপাত-শৈত্য প্রবাহ-তীব্র গরম সৃষ্টি, মরুকরণ এবং ভূমি অবক্ষয়ের মাধ্যমে পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীকুল, মানব স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ বাতাস, নিরাপদ বাসস্থান, বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা, পানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে । বিশেষকরে প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের উপর একটি বৃহৎ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য সামগ্রী নির্ভরশীল হওয়ায় তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন ও ভুক্তভোগী । এতে করে আশঙ্কাজনকভাবে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে । তাছাড়া মানুষের জীবনে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে ব্যাপক প্রভাব পড়ে । ফলে টেকসই উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয় না । ধারণা করা হয়, প্রায় দুই হাজার কোটি টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে জমা হয়েছে । যার পরিণতি বর্তমানে বিশ্বব্যাপী গড়ে শতকরা ১৬ ভাগ মানুষের মৃত্যু হার বৃদ্ধি করছে । ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ রোধ চুক্তি সম্পাদনের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিগত ২০০৫ খ্রিস্টাব্দের তুলনায় ২০২৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে শতকরা ২০-২৮ ভাগ গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনার কথা অঙ্গীকার করে । যদিও উল্লেখিত চুক্তিতে চীন কোনো প্রকার লক্ষ্য নির্ধারণ না করেই আগামী ২০৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনার কথা বলেছে । গত ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে সারাবিশ্বে ৫২ গিগাটন গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণের মধ্যে ২৭ শতাংশই নিঃসরণ করে চীন, ১১ শতাংশ নিঃসরণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বাকি অংশ নিঃসরণ করে শিল্পোন্নত দেশগুলো যাদের তালিকার প্রথম দিকেই অবস্থান । এদিকে মূলত জি-২০ ভুক্ত দেশগুলোই সারাবিশ্বে শতকরা ৮০ ভাগ কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী । পরিবেশ সুরক্ষা, জীব-বৈচিত্র্য রক্ষা ও বাস্তুতন্ত্রের উন্নয়ন ঘটিয়ে মরুকরণ এবং ভূমির অবক্ষয় রোধ করে কিভাবে টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় সৌদি আরব সরকার সেদিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে । জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সৌদি আরব সরকার ২০৩৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ৪.১ মিলিয়ন টন কার্বন হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে । তাই, ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার যে প্রতিশ্রুতি বিশ্ব নেতৃবৃন্দ দিয়েছিলেন তা কার্যকর করতে আরো উদ্যোগী হয়ে সকলের এগিয়ে আসতে হবে । জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বিশ্বব্যাপী পড়লেও উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ক্ষতির পরিমাণ বেশি । কারণ ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থান, জীবিকা নির্বাহের বিভিন্ন খাত ধ্বংসপ্রাপ্ত, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, প্রাকৃতিক সম্পদের স্বল্পতা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার অক্ষমতা এবং অভিযোজন ব্যবস্থার সমস্যা ইত্যাদি কারণে দেশগুলো তীব্রভাবে ক্ষতিসাধিত হয়ে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি করছে । অন্যদিকে শিল্পোন্নত দেশগুলোকে এমন ভয়ঙ্কর এবং জটিল সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় না । কিছু প্রভাশালী শিল্পোন্নত দেশের অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের ফলে গ্যাস নিঃসরণের মাত্রা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে । যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে আশাব্যঞ্জক বৈচিত্র্যময় উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে । তবে, তা অতি নগন্য । অতএব জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভূমি অবক্ষয়, মরুকরণ এবং খরার প্রভাব মোকাবেলার মতো বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে এ সংক্রান্ত বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে । নেট-শূন্য কার্বন নির্গমন (Net-zero carbon emission) অর্জনের লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে । পাশাপাশি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু অর্থায়ন ও পরিবেশ রক্ষায় এর ভূমিকা ও গুরুত্ব, আদিখেত্যা নকশা (Simulation model) ব্যবহার করে কৃষকদের খরা মোকাবেলায় সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন ও প্রশমন, স্মার্ট কৃষি, মুঠোফোনের মাধ্যমে খরার প্রাক-সতর্কবার্তা প্রদান এবং বাংলাদেশে একটি ‘পরিবেশ গবেষণা ইনস্টিটিউট’ গঠন করা যেতে পারে । 
এদিকে অপরিকল্পিতভাবে ও ব্যাপকহারে ভূমি ব্যবহার, বনভূমি ধ্বংস, পহাড়-নদীর মাটি কর্তন ও স্থানান্তর, লবণাক্ততা এবং ফসলী জমিতে অধিক পরিমাণে রাসায়নিক সার ব্যবহার করার কারণে ভূমি অবক্ষয় ও মরুকরণ প্রক্রিয়া বৃদ্ধি পাচ্ছে । খরা, মরুকরণ ও ভূমি অবক্ষয়ের কারণে সারাবিশ্বে প্রাণীকুল, মানব স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ বাতাস, নিরাপদ বাসস্থান, বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা, পানি নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে । বিশ্বব্যাপী প্রতিনিয়ত তাপমাত্রা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়ছে ভূমির উপর । ভূমি অবক্ষয়ের কারণে মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস, কৃষি জমি চাষাবাদের অনুপযোগী এবং সুপেয় পানির অভাব হচ্ছে । খরা, মরুকরণ এবং ভূমিক্ষয় আগামীতে পৃথিবীর জন্য এক অশনি সংকেত! United Nations Convention to Combat Desertification (UNCCD) এর তথ্যানুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় ৪০ শতাংশ ভূমি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে এবং সারাবিশ্বে জিডিপির অর্ধেক (৪৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার) হুমকির সম্মুখীন । তাই তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, অনাবৃষ্টি, লবণাক্ততা, নগরায়ন, মরুময়তা, বনাঞ্চলের পরিমাণ হ্রাস, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, জমিতে রাসায়নিক সার প্রয়োগ, কৃষিকাজে সেচ, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলাশয়-নদী-খাল-জলাধার-জলাভূমি ইত্যাদি ভরাট, নদী শুকিয়ে মৃত অবস্থা, বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ এবং জলবায়ুর প্রভাববিস্তারকারী মৌসুমী বায়ুপ্রবাহজনিত বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে বাংলাদেশে মরুময়তার ঝুঁকি বাড়ছে । এ মরুকরণের ফলে কৃষি জমি হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে । বর্তমানে খরা এবং মরুকরণ পৃথিবীর জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ । বিশ্বের মোট ভূমির শতকরা প্রায় ২৫ ভাগ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে । খরা ও মরুকরণ সারাবিশ্বে পরিবেশগত নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য, দারিদ্র্য বিমোচন, আর্থ-সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভয়াবহ সমস্যা সৃষ্টি করছে । ফলে আগামী দশকে পৃথিবীতে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে । ধারণা করা হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে ২০৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রায় ৩.৩ মিলিয়ন মানুষ এবং ২০৮০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রায় ৪.৩ মিলিয়ন মানুষের নিজস্ব জমি হারিয়ে যেতে পারে । অতএব, আমাদের দেশে যাতে মরুকরণ সৃষ্টি না হয় সেদিকে অতি জরুরী ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে । এর সাথে পরিবেশ দূষণ রোধ, বনায়ন, মানুষের সচেতেনতা বৃদ্ধি এবং খরা সহনশীল বীজ উদ্ভাবন করতে হবে । 
বর্তমান গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বনভূমির পরিমাণ উন্নীত করতে ব্যাপকভাবে বৃক্ষ রোপণ ও নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যেমন: জলবায়ু পরিবর্তনের সংপ্রশ্ন (Challenge) মোকাবেলা, সবুজায়ন, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানী এবং প্রকৃতিনির্ভর সমাধান ইত্যাদি । জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা ও ফলপ্রসূ সমাধানের প্রধান কৌশল হিসেবে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১ এবং ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ গ্রহণ করেছে । পাশাপাশি বাংলাদেশের মহান জাতীয় সংসদে Planetary Emergency Bill (গ্রহগত জরুরী অবস্থা) বিল পাস হয়েছে । এছাড়া পৃথিবীর প্রথম স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ Climate Change Trust Fund গঠন করে যেখানে গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব সম্পদ থেকে ৪৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে । মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী জলাবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর স্বার্থরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ও এর রোধকল্পে নানা উদ্যোগ গ্রহণের স্বীকৃতস্বরূপ তাকে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ পরিবেশগত পুরস্কার ‘Champions of the Earth’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয় । জলবায়ু নেতাদের শীর্ষ সম্মেলন Climate Leaders Summit নামে ভার্চুয়াল সম্মেলনে তিনি অংশ নেন এবং জলবায়ু বিপন্ন ৪৮টি দেশের জোট Vulnerable Twenty (V20) ও Climate Vulnerable Forum (CVF) এর সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন । 
Global Center on Adaptation (GCA) এর দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয় ঢাকায় অবস্থিত । জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবেলা, অভিযোজন সমস্যার সমাধান বা বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবের সাথে খাপ খাওয়ানোর উপায় বের করা এবং এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সরকার, বিভিন্ন শহরের মেয়র, ব্যবসায়ী নেতা, সুশীল সমাজ ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করে থাকে GCA কার্যালয়টি । তাই আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশ, সংস্থা এবং সংগঠনের সাথে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে পরিবেশ দূষণ, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব এবং পরিবেশগত সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে কূটনৈতিকভাবে আরো জোরালো সম্পর্ক স্থাপনের পাশাপাশি দূষণ রোধ, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা ও সমাধানের ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে । জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে ‘জলবায়ু সংকট’ হিসেবে দেখা দিয়েছে । জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম । আমি মনে করি, বৈশ্বিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবেলা ও সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ক্ষতিপূরণ আদায় ও গ্রীন হাউস গ্যাস নিঃসরণ চুক্তির নানা বিষয়গুলোর অগ্রগতি নিয়ে বাংলাদেশ সরকার প্রধান নেতৃত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশের সাথে শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে পারেন । কার্বন নিঃসরণের জন্য জলবায়ু তহবিলে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থাকে Carbon pricing বলে । এছাড়া, বিপন্ন দেশগুলোর পক্ষে তিনি শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে জলবায়ু তহবিলের প্রাপ্য কিস্তি প্রদানে জোর প্রচেষ্টা চালাতে পারেন । বিগত দিনে আয়োজক হিসেবে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য বিষয়ের উপর ১০ বার বিশ্ব পরিবেশ দিবস উৎযাপিত হয়েছিল । তাই আগামীতে এ ধরনের অনুষ্ঠানের পুনরায় আয়োজক হওয়ার জন্য সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে বলিষ্ঠভাবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে । পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে পরিবেশ দূষণরোধী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে, Green Technology এর বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে হবে এবং Track diplomacy সহ পরিবেশগত বিষয়গুলোর উপর অধিক জোর দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে । সর্বোপরি, পরিবেশের বাস্তুতন্ত্র ও জীব বৈচিত্র্যকে রক্ষা করতে হবে । তাহলে প্রকৃতি হবে সুুরক্ষিত । টিকে থাকবে এ মৃৃত্যুন্মুখ গ্রহ । নইলে অনিবার্য ধ্বংস । সুতরাং, সবুজ গ্রহ গঠনের মধ্য দিয়েই আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তৈরি হবে একটি সুন্দর ও শান্তিময় আবাসস্থল । 

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, আন্তর্জাল (The Internet) । 

No comments:

Post a Comment

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...