Tuesday, 18 January 2022

মহাকাশ / Mohakash (The space)



                                                                 ছবি: https://banglametro.live/ 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীন সংস্থা ‘জাতীয় বিমানচালনবিদ্যা ও মহাকাশ প্রশাসন’ (National Aeronautics and Space Administration বা NASA) আয়োজিত NASA Space Apps Challenge 2021 এর Best Mission Concept বিভাগে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয়বারের মতো World Champion হিসেবে দুর্লভ গৌরব অর্জন করেছে বাংলাদেশের ‘মহাকাশ’ (Mohakash) (The space) । ‘মহাকাশ’ এর উদ্ভাবিত Advanced Regolith Sampler System (ARSS) নামক সরঞ্জামটির (Toolset) সাহায্যে চন্দ্র ও ভিনগ্রহের পৃষ্ঠে বা বায়ুমন্ডলে মুক্তভাবে উড়তে থাকা ধূলিকণা কৌশলগতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে । ‘মহাকাশ’ দলের উদ্ভাবিত এ প্রযুক্তির মাধ্যমে ভাসমান ধূলিকণাকে আবদ্ধ কক্ষে (Chamber) আটকে ফেলা সম্ভব । যার ফলে ধুলোবালি প্রতিরোধ করা যাবে এবং বায়ুমন্ডলে ধূলিকণা ভেসে থাকার মত পরিস্থিতি তৈরি হবে না । শুধু তাই নয়, মহাজাগতিক তেজষ্ক্রিয়তা বা বিকিরণের (Radiation) হাত থেকে মহাকাশচারীদের পরিধেয় Space suite কে রক্ষা করতে সাহায্য করবে এ প্রযুক্তি । ‘মহাকাশ’ এর প্রকল্পটির বাস্তবিক সার্বিক দিক বিচার বিশ্লেষণ এবং যাচাই-বাছাই করবেন NASA এর মহাকাশ গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা ৷ যদিও NASA ইতিমধ্যেই ‘মহাকাশ’ দলের সাথে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ।

সারাবিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহী প্রতিযোগীরা সম্মানজনক বৈশ্বিক এ প্রতিযোগিতায় প্রতিবছরই অংশগ্রহণ করে থাকেন । সে প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে যুগের পর যুগ ধরে আজ অবধি মানুষ জ্ঞানের পরিধির প্রসার ঘটিয়ে অজানাকে জানতে এবং নতুন কিছু আবিষ্কার করতে বদ্ধপরিকর ৷ এ গ্রহের নানা প্রান্তের বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার জ্ঞানী-গুনী-মেধাবী মানুষ তাদের শিক্ষা, সৃষ্টিশীল প্রতিভা, কৌশল এবং গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানব জাতির কল্যাণে নানারকম সূত্র, তত্ত্ব, প্রযুক্তি এবং বস্তু ইত্যাদি আবিষ্কার করে খ্যাতি অর্জন করেন ৷ মানব সভ্যতাকে আরো সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন । কিছু মানুষ পৃথিবীর এ জগৎ ছাড়িয়ে বহির্জগতের রহস্যময় অনন্ত মহাকাশ নিয়ে বিশদ অনুসন্ধান, পরিমাপ ও পর্যবেক্ষণ করে অর্জিত যুগান্তকারী ধারণাকে সৃষ্টিশীল কর্মের মধ্য দিয়ে এর বাস্তবিক প্রতিফলন ঘটান । তেমনিভাবে- সুজলা, সুফলা, শস্য, শ্যামল, নদীমাতৃক, অপার সৌন্দর্যময় রূপসী বাংলাদেশের কৃতীমান তরুণরা ‘মহাকাশ’ এর মাধ্যমে এক গৌরবময় কৃতিত্ব অর্জন করেছেন ৷ প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ১৬২টি দেশের ২৮০০০ এর বেশি প্রতিযোগী এবং ৪৫৩৪টি দলের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে Khulna University of Engineering and Technology (KUET) এবং Bangladesh Army University of Engineering and Technology (BAUET) এর তরুণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত ছয় সদস্যের সম্মিলিত দল ‘মহাকাশ’ বিজয়ী হয় । বাংলাদেশের জন্য এ অর্জন একটি বড় মাইলফলক । বাঙালি জাতির জন্য গর্বের বিষয় । Digital Bangladesh এর অগ্রযাত্রায় আরেকটি অনন্য দৃষ্টান্ত । বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে আরো উচুঁতে আসীন এবং গৌরবান্বিত করার জন্য ‘মহাকাশ’ দলকে অভিনন্দন! মহাকাশ প্রকৌশলীদের চমৎকার এ বিজয় অর্জনে ‘Team Mohakash’ এর সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ ৷ আসলে ‘মহাকাশ’ দলটি এমন একটি অবিশ্বাস্য, জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান করেছে যেটি নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ NASAসহ পৃথিবীর নানা দেশের বড় বড় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা এখনো গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে । ‘মহাকাশ’ এর আবিষ্কার সত্যিই একটি অনুপ্রেরণাদায়ী ঘটনা, যা আগামী প্রজন্মকে এ বিশাল-বৈচিত্র্যময় মহাকাশ নিয়ে গবেষণা এবং নতুন নতুন অসংখ্য উদ্ভাবনের জন্য অনুপ্রাণিত করবে ৷ ২৮টি চ্যালেঞ্জ এবং ০২ হাজার ৮০০টির বেশি প্রকল্প এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে । World Champion হওয়া ‘মহাকাশ’ দলটি Bangladesh Association of Software and Information Services (BASIS) https://basis.org.bd/ এবং BASIS Student’s Forum https://bsf.basis.org.bd/ এর সহযোগিতায় বাংলাদেশের নয়টি শহর ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ এবং কুমিল্লায় আয়োজিত NASA Space Apps Challenge (National Hack-a-Thon) আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বাংলাদেশ পর্বে খুলনা বিভাগ থেকে Champion দল হিসেবে NASA তে মনোনয়ন পায় । উল্লেখ্য যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের NASA এবং The US Space Agency আয়োজন করে থাকে এ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার Hack-a-Thon কার্যক্রম । যেখানে শিক্ষার্থীরা কম্পিউটার ভাষা সারসংগ্রহ করে (Coding computer language) মহাকাশ উন্নয়ন এবং পৃথিবীর আদিরূপ (Prototype) সম্পর্কিত সমস্যার সমাধান করে । বাংলাদেশ থেকে নির্বাচিত ২৭টি প্রকল্প NASA এর প্রতিযোগিতার জন্য চূড়ান্ত মনোনীত হয় । Khulna University of Engineering and Technology (KUET) এর যন্ত্র প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী সুমিত চন্দ্রের নেতৃত্বে ‘মহাকাশ’ দলের অন্যান্য সদস্যরা হচ্ছেন: KUET এর কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (CSE) বিভাগের সামির ইমতিয়াজ, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিশির কাইরি, চামড়া প্রকৌশল বিভাগের ছাত্র আলভি রওনক এবং Bangladesh Army University of Engineering and Technology (BAUET) এর কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (CSE) বিভাগের ছাত্রী বর্ণিতা বসাক তৃষা, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (CSE) বিভাগের ছাত্র মোমিনুল হক । এর আগে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে NASA এর আন্তর্জাতিক NASA Space Apps Challenge এ অংশ নিয়ে Best Data Utilization বিভাগে ‘Lunar VR’ তৈরি করে প্রথমবারের মত World Champion হয়েছিল বাংলাদেশের Shahjalal University of Science and Technology (SUST) বা (শাবিপ্রবি) এর দল ‘Team Olik’ ।

এ বছর চ্যালেঞ্জের মূল বিষয় ছিল ‘Virtual Planetary Exploration Version 2.0’ । এর জন্য অংশগ্রহণকারীদের Interactive 3D Model of Geology Tool তৈরি করতে হয়েছে । যার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে চন্দ্র ও বাইরের গ্রহে অভিযানের সময় গমনকারী মহাকাশচারীদের জন্য সুবিধাজনক প্রযুক্তি তৈরি করা । যা দ্বারা চন্দ্র ও ভিনগ্রহের পৃষ্ঠতলে বা উপরিভাগে মহাকাশ অভিযাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ চলাচল, স্বর্গীয় বস্তুর (Celestial bodies) অন্বেষণ, নমুনা সংগ্রহ এবং বিভিন্ন অনুসন্ধান কার্যক্রম যেন আরো সহজতর হয় । বিশেষ করে বিগত সময়ে চাঁদে পরিচালিত মানব Mission গুলোর মহাকাশচারীকে চলাচল ও বিশেষ কাজের ক্ষেত্রে চাঁদের পৃষ্ঠতলে উপস্থিত বা সেখানকার বায়ুমন্ডলে ভাসমান ধূলিকণা নানাবিদ সমস্যার সৃষ্টি করে । এছাড়া মহাকাশে পরকদের (Aliens) অবাধে উড়ে যাওয়া ও তাদের কার্যক্রমে সৃষ্ট ধুলোবালি সমস্যাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে । প্রাকৃতিক শক্তি দ্বারা কিংবা উদ্ভিদ-প্রাণীর জৈবিক আবহবিকারের (Weathering) ফলে ভূ-পৃষ্ঠের শিলাস্তর ক্রমাগত চূর্ণ-বিচূর্ণ ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র শিলাকণায় পরিণত হয়ে ভূ-ত্বক বা ভূমির উপর এক প্রকার আলগা ও নরম ধূলিকণা বা বস্তুকণার আবরণ সৃষ্টি করে তাকে ভূ-আস্তরণ বা Regolith বলে ৷ এ Regolithই মাটি বা মৃত্তিকা সৃষ্টির প্রাথমিক অবস্থা বা কাঁচামাল ৷ মহাকালের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় নানা প্রকার জৈবিক ও জৈব রাসায়নিক জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ভূ-আস্তরণের এ সকল আলগা ও নরম ধূলিকণা বা বস্তকণাগুলো বিচ্ছিন্ন এবং স্তরীভূত হয়ে মাটি সৃষ্টি করে ৷ এ Regolith (বস্তুকণা বা ধূলিকণার আস্তরণ) চন্দ্র ও গ্রহের পৃষ্ঠকে ঢেকে রাখে বা আবৃত করে এবং এটি গ্রহাণুর প্রভাবের কারণে উৎপাদিত হয় । চাঁদে ওজোন স্তর (Ozone layer) না থাকায় সময়ের আবর্তে মহাজাগতিক তেজষ্ক্রিয় রশ্মির প্রভাবে Regolith গুলো আয়নিত বা চার্জিত (Ionized or Charged) হয়ে চাঁদের উপরিভাগে ধূলিকণার আস্তরণ সৃষ্টি করে । তাছাড়া সেখানকার মাধ্যাকর্ষণ (Gravity) শক্তি কম হওয়ায় ধূলিকণা সহজেই উৎক্ষিপ্ত হয়ে বায়ুমন্ডলে মুক্তভাবে ভাসতে থাকে । কোনো মহাকাশচারী চাঁদের ভূ-পৃষ্ঠে নমুনা সংগ্রহের জন্য বিশেষ ধরনের বেলচা বা এক হাতা দিয়ে (Scoop) খুঁড়তে যাওয়ার সময় সেখানকার কম মাধ্যাকর্ষণে ভাসমান আয়নযুক্ত Regolith কণাগুলো উদ্বর্তিত ও আয়নিত হয়ে ক্ষয়কারী ঘর্ষণ ধর্মের (Abrasive) কারণে Space suite এবং অন্যান্য স্পর্শকাতর যন্ত্রপাতির গায়ে ঐ সকল ধূলিকণা চুম্বকের মতো সহজেই লেগে থাকে এবং Space suite কে নষ্ট করে দেয় । ফলে নভোচারীকে চন্দ্রের ভূ-পৃষ্ঠে বা উপরিভাগে অবতরণ, নমুনা সংগ্রহ এবং কাজ করার সময় তাকে ভূ-পৃষ্ঠের ধূলিকণার জন্য বেশ প্রতিকূল পরিস্থিতি ও জটিলতার সম্মুখীন হতে হয় । অদূর ভবিষ্যতে মানুষ শুধু চাঁদেই নয়, মঙ্গলসহ অন্যান্য গ্রহে বসতি স্থাপনের জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা করছে । সারাবিশ্বের বৃহত্তম ও প্রভাবশালী মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলো এ বিশেষকার্য বা উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সকল প্রকার Technology এবং Systemকে উন্নয়নের জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । বৈজ্ঞানিকভাবে এ প্রকল্পকে In-Situ Resource Utilization (ISRU) বলে । মানুষের চাঁদে বসতি স্থাপনের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অক্সিজেন এবং অত্যাধুনিক-উন্নত প্রযুক্তিতে অক্সিজেন তৈরির Re-actor ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে । সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে যে, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অক্সিজেন তৈরি করা হচ্ছে এ Regolith থেকেই । সম্প্রতি উন্নত গবেষণাগুলো প্রমাণ করেছে যে, চন্দ্রের Regolith কণাগুলো শতকরা ৪৫ ভাগ অক্সিজেন রাসায়নিকভাবে Iron এবং Titanium এর সাথে সংযুক্ত রয়েছে । তাই, Regolith এর কণাগুলো থেকে অক্সিজেন আহরণ করার ফলে বাইরের গ্রহে (Outer planet) উপনিবেশ স্থাপনের ধাপে একটি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার । এছাড়াও, বিজ্ঞানীরা এ Regolith কণাগুলো থেকে জল এবং জ্বালানী উৎপাদন করার পরিকল্পনা করছেন । সুতরাং Regolith এর ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি কার্যকর, বাস্তবসম্মত ও নিরাপদ উপায় ভের করতে বর্তমানে NASAসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলো এক মহাগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে ।

https://2021.spaceappschallenge.org/challenges/statements/virtual-planetary-exploration-v20/teams/mohakash-1/project

https://mohakash.web.app/

 

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...