জংলি ঢেঁড়স হচ্ছে গুল্মজাতীয় বুনো ভেষজ উদ্ভিদ । এর বৈজ্ঞানিক নাম: Abelmoschus moschatus এবং সমনাম Hibiscus abelmoschus । এটি Malvaceae পরিবারের অন্তর্গত একটি ক্রান্তীয় এশীয় বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ । এই উদ্ভিদের সুন্দর ফুল অত্যন্ত আকর্ষণীয় । গ্রীষ্ম, হেমন্ত এবং বসন্তকালে এর ফুল ফোটে । প্রায় জবা ফুলের মত দেখতে অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী এই ফুলগুলো সাধারণত উজ্জ্বল হলুদ, লাল ও গোলাপী রঙের হয় এবং মাঝখানে বেগুনি বা গাঢ় লাল বা গাঢ় খয়েরি আভা থাকে । ফুলগুলো গন্ধহীন এবং ৫টি নমনীয় কোমল পাপড়ি থাকে, যার মাঝে পরাগ অবস্থিত । ফুল ফোটার পর দুপুর না গড়াতেই ফুল ঝিমিয়ে পড়ে । এই উদ্ভিদের ফল অনেকটা ছোট ঢেঁড়সের মত যার শুং বা রোম রয়েছে এবং বীজ থাকে । এই বীজে কস্তুরীর মত তীব্র গন্ধ আছে, যার কারণে এটিকে লতা কস্তুরী বলে । লাতিন ভাষায় Moschatus এর অর্থ হচ্ছে কস্তুরী । বীজের অদ্ভুত মিষ্টি সুগন্ধের জন্যই এটি ঐতিহাসিকভাবে সুগন্ধি (Perfume) তৈরিতে এবং কফিতে স্বাদ যোগ করতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে । আদিবাসী তরুণী বা নারীরা এই বীজকে সুতোয় গেঁথে বাহুতে অলঙ্কার হিসেবে পরিধান করে । পরিপক্ক ফলের বীজ উপযুক্ত সময়ে সংগ্রহ করা না হলে এটি নিজ থেকেই ঝরে পড়ে বংশ বিস্তার করে । আশ্চর্যজনকভাবে এই মূল্যবান ভেষজ উদ্ভিদের রয়েছে অনেক ঔষধি গুণ । ইউনানি, আয়ুর্বেদিক ও হারবাল চিকিৎসায় এটি বহুবিধ ব্যবহৃত হয় । এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ চমৎকার একটি উদ্ভিদ । ফলে, এই গুরুত্বপূর্ণ লতানো উদ্ভিদটি শারীরিক ক্লান্তি, অবসাদ, হৃৎপিন্ডের দুর্বলতা, হাঁপানি, খিঁচুনি, যৌন রোগ, শুক্রস্বল্পতা, শুক্রতারুল্যে, অরুচি, পেট ফাঁপা, বদহজম, কীটনাশক, মুখের দুর্গন্ধ, স্নায়বিক দুর্বলতা, চর্ম রোগ, মূত্রনালীর সমস্যা, দাঁতের গোড়া ফোলা ও ব্যথা, জিহ্বার ঘাঁ, সাপের কামড়ের প্রতিষেধক, শ্লেষ্মা জনিত মাথাব্যথা এবং চোখের অসুখ ইত্যাদি রোগে ব্যবহৃত হয় । তবে, গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানকালে এর ব্যবহার নিরাপদ বলে প্রমাণিত হয়নি । এছাড়া, প্রকৃতির এক দুর্লভ বস্তু মৃগনাভী বা কস্তুরীর বিকল্প হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হয় । বাংলাদেশের অঞ্চলভেদে এর প্রচলিত নাম হচ্ছে: লতা কস্তুরী বা লতা কস্তুরীকা, কল কস্তুরী, কালো কস্তুরী, মুশকদান এবং বন ঢেঁড়স ইত্যাদি । এর অন্যান্য ইংরেজি নাম হচ্ছে: Musk Mallow, Musk Okra, Ambrette, Ornamental Okra, Annual Hibiscus, Yorka Okra, Galu Gasturi, Bamia Moschata, Rose Mallow এবং Tropical Jewel Hibiscus ইত্যাদি । এই উদ্ভিদের আকার, আকৃতি, ফুল, ফল ও পাতা সবকিছুই প্রায় ঢেঁড়স গাছের মত । বন, জঙ্গল, ঝোপঝাড়, রাস্তা ও রেল লাইনের কিনারায় এটি জন্মে থাকে । বাংলাদেশ, ভারত, দক্ষিণ এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় এই উদ্ভিদের দেখা মেলে । রৌদ্রজ্জল, স্যাঁতসেঁতে এবং উর্বর জায়গায় এটি বেড়ে ওঠে । জংলি ঢেঁড়সের কচি ফল এবং পাতা সবজি হিসেবে খাওয়া যায় । কখনো কখনো এর বীজ অন্যান্য খাদ্যের স্বাদ বাড়াতে ব্যবহৃত হয় । এটি একটি কোমল উদ্ভিদ, ফলে এটিকে তুষারপাত থেকে সুরক্ষা করা প্রয়োজন । শীতল জলবায়ুতে এটি একবর্ষজীবী উদ্ভিদ হিসেবেও চাষ করা হয় । শিল্পক্ষেত্রে এই উদ্ভিদের মূলের আঠালো রস কাগজ তৈরিতে ব্যবহৃত হয় এবং এর ফুল দিয়ে তামাককে সুগন্ধযুক্ত করা হয় ।
ছবি: নিজ
তথ্যসূত্র: শিক্ষক বাতায়ন, গুগল, আন্তর্জাল ।
