Wednesday, 3 June 2026

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)



প্রত্যাখ্যান
কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো
অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল

প্রিয়তম,
অন্য কোনো জীবনে বা দেশে
আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করেছি
তোমার হাত
তোমার নির্ভীক হাসি
বিদ্রূপাত্মক ।
সেই সব মধুর বাড়াবাড়ি
যা আমি খুব পছন্দ করি ।
কি নিশ্চয়তা আছে
যে আমাদের আবার দেখা হবে,
অন্য কোনো জগতে
ভবিষ্যতের কোনো অনির্ধারিত সময়ে ।
আমি আমার দেহের তাড়নাকে উপেক্ষা করি ।
আরো একটি মধুর সাক্ষাতের
প্রতিশ্রুতি ছাড়া
আমি মরতে রাজি নই ।

''প্রত্যাখ্যান'' কবিতাটি কবি মায়া অ্যাঞ্জেলোর অন্যতম জনপ্রিয় কবিতা । প্রতিভাময়ী এই আমেরিকান কবি, স্মৃতিকথা লেখক, প্রাবন্ধিক, নাগরিক অধিকার কর্মী, ইতিহাসবিদ, অভিনেত্রী, নাট্যকার, প্রযোজক এবং পরিচালক মায়া অ্যাঞ্জেলো (মার্গারিট জনসন) (জন্ম: ৪ এপ্রিল, ১৯২৮ – মৃত্যু: ২৮ মে, ২০১৪) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশৌরি রাজ্যের সেন্ট লুইস শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং বর্ণবৈষম্যপূর্ণ গ্রামীণ আরকানসাস রাজ্যে বেড়ে ওঠেন । তিনি নর্থ ক্যারোলাইনার ওয়েক ফরেস্ট ইউনিভার্সিটিতে আমেরিকান স্টাডিজের রেনল্ডস অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন । মায়া অ্যাঞ্জেলো আমেরিকার আফ্রিকান-আমেরিকান নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অগ্রণী নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র এবং আমেরিকান নাগরিক অধিকার কর্মী ম্যালকম এক্সের সাথে কাজ করেছিলেন । তিনি দশটি সর্বাধিক বিক্রিত বই এবং অসংখ্য ম্যাগাজিনে প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, যার জন্য পুলিৎজার পুরস্কার ও ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ডের মনোনয়ন লাভ করেন । আমেরিকার সাবেক রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটনের অনুরোধে, তিনি ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে তার রাষ্ট্রপতি অভিষেক অনুষ্ঠানে "অন দ্য পালস অফ মর্নিং'' কবিতাটি আবৃত্তি করেন । মায়া অ্যাঞ্জেলো আফ্রিকান-আমেরিকান এবং নারীদের মুখপাত্র হিসেবে সম্মানিত ছিলেন । তার কাজগুলোকে আফ্রিকান-আমেরিকান সংস্কৃতির একটি প্রতিরক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয় । বিশ্বজুড়ে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তার অনন্য রচনাগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় । যদিও, কিছু মার্কিন গ্রন্থাগার থেকে তার বই নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে । মায়া অ্যাঞ্জেলোর সবচেয়ে প্রশংসিত কাজগুলোকে আত্মজীবনীমূলক কল্পকাহিনী হিসেবে আখ্যায়িত করা হলেও, অনেক সমালোচক সেগুলোকে আত্মজীবনী হিসেবেই গণ্য করেন । তিনি এই ধারাটিকে সমালোচনা, পরিবর্তন এবং প্রসারিত করার মাধ্যমে আত্মজীবনীর প্রচলিত কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করার একটি সচেতন প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন । তার বইগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বর্ণবাদ, পরিচয়, পরিবার এবং ভ্রমণের মত বিষয়বস্তু । তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া ।
----------------------------------------


Refusal 

by Maya Angelou 

Translation: Muhammad Asraful Alam Sohel


Beloved,

In what other lives or lands

Have I known your lips

Your Hands

Your Laughter brave

Irreverent.

Those sweet excesses that

I do adore.

What surety is there

That we will meet again,

On other worlds some

Future time undated.

I defy my body's haste.

Without the promise 

Of one more sweet encounter

I will not deign to die. 

-------------------------------------

https://new.allpoetry.com/Refusal

https://www.poetryfoundation.org/poets/maya-angelou 

ছবি: https://britishonlinearchives.com/



Tuesday, 2 June 2026

ওর্ট মেঘ (The Oort Cloud)


ওর্ট মেঘ হচ্ছে আমাদের সৌরজগতের একেবারে বাইরের প্রান্তে অবস্থিত এক বিশাল, অদৃশ্য এবং গোলাকার মেঘ, যা কোটি কোটি বরফময় বস্তু বা ধ্বংসাবশেষ এবং ধুমকেতু দিয়ে তৈরি । এটি মূলত সৌরজগতের দূরবর্তী সীমানা হিসেবে চিহ্নিত হয় । ওর্ট ক্লাউড মেঘ সূর্য থেকে প্রায় ২০০০-১০০০০০ AU (Astronomical unit) (প্রায় ১-২ আলোকবর্ষ) দূরে অবস্থান করছে । ধারণা করা হয়, সৌরজগত সৃষ্টির শুরুর দিকে (প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে) বৃহস্পতি ও অন্যান্য গ্রহের মহাকর্ষীয় টানে এই বরফখণ্ড বা বস্তগুলো সৌরজগতের ভেতরের অংশ থেকে বাইরের দিকে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল । যেসব ধূমকেতু সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে ২০০ বছরেরও বেশি সময় লাগে (যেমন: হ্যালির ধূমকেতু) তাদের বেশিরভাগই এই ওর্ট মেঘ থেকে আসে । এটি এখনো সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যায়নি । কারণ, ওর্ট মেঘ অত্যন্ত দূরে অন্ধকারময় অঞ্চলে অবস্থিত এবং ঠান্ডা বস্তুগুলো অনেক ছোট । ডাচ জ্যোতির্বিজ্ঞানী Jan Oort ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম এই মেঘের অস্তিত্বের তাত্ত্বিক ধারণা দেন । ওর্ট মেঘ আমাদের সৌরজগতের প্রকৃত সীমানার প্রতিনিধিত্ব করে । সৌরজগতের ভেতরের অংশটি পরিচিত মনে হলেও— যেখানে নেপচুন গ্রহ গড়ে প‍্রায় ৩০ AU এবং বামন গ্রহ প্লুটো প্রায় ৪০ AU দূরে অবস্থিত । ওর্ট মেঘ কয়েক হাজার AU দূর থেকে শুরু হয়ে ১০০০০০ AU বা তারও বেশি দূরত্ব পর্যন্ত বিস্তৃত । ১ AU হচ্ছে পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব, যা প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটারের সমান । প্রতি সেকেন্ডে আলো ৩০০০০০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলে এবং প্রায় আট মিনিটে ১ AU দূরত্ব অতিক্রম করে । কিন্তু এই আলো ওর্ট মেঘের ভেতরের প্রান্তে পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে এবং এর বাইরের প্রান্ত ১ আলোকবর্ষেরও বেশি দূরে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে আলো পৌঁছাতে এক বছরেরও বেশি সময় প্রয়োজন হয় । এই বিশালতা আমাদের দৈনন্দিন ধারণাকে ম্লান করে দেয় । ভয়েজার-১ হচ্ছে পৃথিবী থেকে পাঠানো মানবসৃষ্ট রোবোটিক মহাকাশযান বা বিস্ময়কর বস্তু, যেটি ৬৪০০০ কিঃমিঃ/ঘন্টা বা ৪০০০০ মাইল/ঘন্টা গতিতে ভ্রমণরত সবচেয়ে দূরবর্তী আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে তার অনন্য কার্যক্রম পরিচালনা করছে । পৃথিবী থেকে এটি প্রায় ২৫.৪ বিলিয়ন কিলোমিটার (১৫.৮ বিলিয়ন মাইল) বা ১৭০ AU দূরে অবস্থান করছে । ভয়েজার-১ এমন গতিতে চললে ওর্ট ক্লাউডে প্রবেশ করতে এর ৩০০ বছর এবং এটি অতিক্রম করতে ৩০০০০ বছর সময় লাগবে । এখানে সূর্যের মহাকর্ষীয় প্রভাব নাটকীয়ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, যা এই হিমায়িত বস্তুগুলোকে চলমান নক্ষত্র এবং ছায়াপথীয় জোয়ারের বিপরীতে কোনোমতে বেঁধে রেখেছে । আমরা আকাশে যে ধূমকেতুগুলোকে ছুটে যেতে দেখি, সেগুলো প্রায়শই এই দূরবর্তী আধার থেকেই উৎপন্ন হয়, যা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে আলোড়িত হয়ে ভেতরের দিকে ধাবিত হয়েছে । সুতরাং, ওর্ট মেঘ কেবল দূরত্বই নয়, বরং একটি ধারণাগত সীমানাও চিহ্নিত করে । এটি আমাদের সৌরজগতের প্রান্ত গ্রহগুলোকে ছাড়িয়ে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত, যা প্রকাশ করে যে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের মধ্যে আমরা কতটা বিচ্ছিন্ন অথচ সংযুক্ত । ওর্ট মেঘের চরম দূরবর্তীতা সৌরজগতের শ্বাসরুদ্ধকর, প্রায় অকল্পনীয় বিশালতাকেই তুলে ধরে । 

তথ্যসূত্র: Google, Science Acumen 

ছবি: Science Acumen । 

Thursday, 28 May 2026

মঙ্গলে হিমায়িত বরফের ঘূর্ণি


🔴❄️ মঙ্গল হচ্ছে মরুভূমির মত একটি পাথুরে গ্রহ । সূর্য থেকে এই চতুর্থ গ্রহটি কমলা-লাল রঙের জন্য "লাল গ্রহ" নামেও পরিচিত । মঙ্গলের ঘূর্ণন অক্ষ (Axial tilt, মঙ্গলের জন্য ২৫.১৯°, পৃথিবীর জন্য ২৩.৪৫°) আমাদের পৃথিবীর কাছাকাছি কোণে হেলে থাকার কারণে এখানে পৃথিবীর মতই চমৎকার ঋতু পরিবর্তন হয় । এই লাল গ্রহের মাটি ও বায়ুমণ্ডলের পাতলা স্তরে কিছু জলীয় বাষ্প রয়েছে যা কুয়াশা, সিরাস মেঘ, তুষার, পারমাফ্রস্ট এবং বরফ টুপিসহ বৃহত্তর মেরু অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে । কিন্তু গ্রহপৃষ্ঠে কোনো তরল জলের আধার নেই । মঙ্গল গ্রহের একটি পাতলা বায়ুমণ্ডল রয়েছে, যেটি প্রধানত কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস (CO₂) দ্বারা গঠিত । প্রতি বছর শীতকালে উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে এই কার্বন ডাই অক্সাইড বরফ হয়ে জমে থাকার কারণে গ্রহটির মহাকর্ষ পরিবর্তিত হয় । এক গবেষণায় দেখা যায়, দক্ষিণ মেরুর কাছে হিমায়িত কার্বন ডাই অক্সাইডের একটি বিশাল ভান্ডার রয়েছে । গ্রহটির হেলে থাকার কোণ বেড়ে যাওয়ায় এই ভান্ডারের বেশিরভাগই সম্ভবত মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেছিল । আর যখন এমনটা ঘটে, তখন বায়ুমণ্ডল ঘন হয়ে ওঠে, বায়ুপ্রবাহ আরো শক্তিশালী হয় এবং ভূপৃষ্ঠের আরো বৃহত্তর এলাকা জুড়ে তরল জল ধরে রাখা সম্ভব হয় । প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, যদি এই ভান্ডার সম্পূর্ণরূপে গ্যাসে রূপান্তরিত হয় তাহলে মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডলীয় চাপ দ্বিগুণ হয়ে যাবে । প্রতিবছর শীতকালে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন থেকে ৪ ট্রিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল থেকে মেরু বরফ টুপিতে জমে যায় । এটি সমগ্র মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডলের ভরের ১২ থেকে ১৬ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে । একটি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডলে জলের বিভিন্ন আইসোটোপিক রূপের মানচিত্র তৈরি করার পর, উত্তর মেরু অঞ্চলের বরফে HDO (Semi-heavy water) এবং পানির অনুপাত পরিমাপ করে প্রমাণ পেয়েছে যে, মঙ্গল গ্রহে একসময় অন্তত ১৩৭ মিটার গভীর একটি মহাসাগর তৈরি করার মত যথেষ্ট জল ছিল । মেরু অঞ্চলের বরফ পৃথিবীর মহাসাগরের জলের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি ডিউটেরিয়াম সমৃদ্ধ । এর অর্থ হচ্ছে, মঙ্গল গ্রহ আজকের মেরু অঞ্চলে সঞ্চিত জলের চেয়ে ৬.৫ গুণ বেশি পরিমাণ জল হারিয়েছে । এই জল কিছু সময়ের জন্য নিম্নভূমি Vastitas Borealis এবং সংলগ্ন নিম্নভূমিতে (Acidalia, Arcadia এবং Utopia planitiae) মহাসাগর তৈরি করে থাকতে পারে । আর যদি সেই সমস্ত জল কখনো তরল আকারে ভূপৃষ্ঠে উঠে আসে, তবে তা পৃথিবী পৃষ্ঠের ২০ শতাংশ ঢেকে ফেলবে এবং কিছু কিছু জায়গায় এর গভীরতা প্রায় এক মাইল হবে । উল্লেখ্য যে, প্রোটিয়ামের তুলনায় ভারী পরমাণু ডিউটেরিয়াম হচ্ছে হাইড্রোজেনের একটি স্থিতিশীল আইসোটোপ ।
মঙ্গল গ্রহের দুই মেরু অঞ্চলে স্থায়ী বরফ টুপি রয়েছে, যা মূলত জমাট বাঁধা জলীয় বরফ এবং হিমায়িত কার্বন ডাই অক্সাইডের (শুষ্ক বরফ) আস্তরণ দ্বারা গঠিত । এটি একটি স্থায়ী বরফের চাদর । উভয় মেরু টুপিতেই স্তরযুক্ত বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, যাকে মেরু-স্তরযুক্ত সঞ্চয় (Polar Layer Deposit) বলে, যেটি মঙ্গল গ্রহের ধূলিঝড় থেকে আসা ধূলিকণার সাথে বরফের ঋতুভিত্তিক ক্ষয় এবং সঞ্চয়ের ফলে তৈরি হয়েছে । উভয় মেরু টুপিতেই খাঁজকাটা বৈশিষ্ট্যও দেখা যায়, যা সম্ভবত বায়ুপ্রবাহের ধরণ দ্বারা সৃষ্ট । এই খাঁজগুলো ধূলিকণার পরিমাণ দ্বারাও প্রভাবিত হয় । ধূলিকণা যত বেশি, পৃষ্ঠতল তত গাঢ় হয় । পৃষ্ঠতল যত গাঢ় হয়, গলনও তত বেশি হয় । গাঢ় পৃষ্ঠতল বেশি আলোক শক্তি শোষণ করে । মঙ্গল গ্রহের দক্ষিণ মেরুর বরফের স্তর বা টুপিটি (South Polar Cap) উত্তর মেরুর বরফের স্তর বা টুপির (North Polar Cap) তুলনায় অনেক ছোট । দক্ষিণ মেরু অঞ্চলটি উত্তর মেরুর চেয়ে অধিক উচ্চতায় অবস্থিত এবং চরম শীতল, গভীর ও দুর্গম অঞ্চল- যেটি মঙ্গল গ্রহের দক্ষিণ গোলার্ধের Planum Australe নামক এক বিশাল মেরু মালভূমিতে অবস্থিত । দক্ষিণ মেরুর বরফের চাদর বা আচ্ছাদনের ব্যাস প্রায় ৪০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার এবং এর পুরুত্ব প্রায় ৩ কিলোমিটার (৩০০০ মিটার বা ২ মাইল) পর্যন্ত হতে পারে । এই বরফের চাদরে ধূলিকণা এবং বরফের পর্যায়ক্রমিক স্তর রয়েছে, যা গ্রহটির প্রাচীন জলবায়ু ও ঋতু পরিবর্তনের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে । ধারণা করা হয়, দক্ষিণ মেরুর বরফস্তর এবং সংলগ্ন স্তরযুক্ত জমাট বরফের মোট আয়তন প্রায় ১.৬ মিলিয়ন ঘন কিলোমিটার । মঙ্গলীয় শীতকালে দক্ষিণ মেরুতে তাপমাত্রা নাটকীয়ভাবে -১৩০° (ডিগ্রি) সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায় । ফলে, প্রচণ্ড ঠান্ডায় বায়ুমণ্ডলীয় কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস জমে বরফে পরিণত হয় এবং মূল বরফ টুপির উপরে তুষারের মত ঝরে পড়ে আরো একটি শুষ্ক বরফের পাতলা স্তর তৈরি করে, যা আকারে বৃদ্ধি পায় । বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে এই বরফ গলে বায়ুমণ্ডলে বাষ্পীভূত হয়ে যায় এবং এর আয়তন সংকুচিত করে । বরফ টুপির উপরিভাগে শক্তিশালী বাতাসের কারণে এর পৃষ্ঠে গভীর খাদ এবং সর্পিল নকশা সৃষ্টি করে । দক্ষিণের বরফ টুপির নিকটবর্তী কিছু এলাকায় ঋতুগতভাবে বরফ জমার ফলে ভূপৃষ্ঠের উপরে ১ মিটার পুরু স্বচ্ছ ও শুষ্ক বরফের চাঁই তৈরি হয় । বসন্তের আগমনে সূর্যের আলো ভূগর্ভস্থ স্তরকে উষ্ণ করে এবং ঊর্ধ্বপাতিত কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে সৃষ্ট চাপ বরফের চাঁইয়ের নিচে তৈরি হয়, যা এটিকে উপরে তুলে আনে এবং অবশেষে ফাটিয়ে দেয় । যার ফলে, কালো ব্যাসল্টিক বালি (Basaltic sand) বা ধূলিকণার সাথে মিশ্রিত কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসের উষ্ণপ্রস্রবণের মত অগ্ন্যুৎপাত ঘটে । এই প্রক্রিয়াটি দ্রুত- যা কয়েক দিন, সপ্তাহ ও মাসের মধ্যে ঘটতে দেখা যায় । ভূতত্ত্বে, বিশেষ করে মঙ্গল গ্রহের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের হার বেশ অস্বাভাবিক । বরফের চাঁইয়ের নিচে উষ্ণপ্রস্রবণের স্থানে ছুটে আসা গ্যাস মাকড়সার জালের মত বৃত্তাকার প্রণালী তৈরি করে । ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে European Space Agency (ESA) এর Mars Express Orbiter থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ইতালীয় বিজ্ঞানীরা জানান যে, এই মেরু অঞ্চলের বরফের স্তরীভূত সঞ্চয়ের পৃষ্ঠ থেকে ১.৫ কিঃমিঃ বা ০.৯৩ মাইল গভীরে (দৃশ্যমান স্থায়ী বরফের টুপির নিচে নয়) অবস্থিত বরফ ও ধূলিকণার স্তরের নিচে চাপা পড়া তরল লবণাক্ত পানির হ্রদ বা জলাধার বা জটিল জলজ ব্যবস্থার অস্তিত্ব থাকতে পারে । হ্রদটি প্রায় ২০ কিলোমিটার বা ১২ মাইল প্রশস্ত । যদি এটি নিশ্চিত হয়, তাহলে এটি হবে গ্রহটিতে প্রথম পরিচিত স্থিতিশীল জলাশয় । তবে, তরল জলের পরিবর্তে কঠিন খনিজ বা লবণাক্ত বরফও থাকতে পারে । Chasms Australe হচ্ছে একটি প্রধান উপত্যকা, যা দক্ষিণ মেরু টুপির স্তরীভূত সঞ্চয়ের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত । এটি প্রায় ১০০ কিলোমিটার চওড়া এবং ২ কিলোমিটার পর্যন্ত গভীর, যা পৃথিবীর গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের চেয়েও গভীর । ৯° পূর্ব দিকে এই সঞ্চয়গুলো Prometheus নামক একটি প্রধান অববাহিকার উপর অবস্থিত । দক্ষিণ মেরুর কিছু স্তরে আয়তক্ষেত্রের আকৃতির বহুভুজীয় ফাটলও দেখা যায় । মনে করা হয় যে, ভূপৃষ্ঠের নিচে জলীয় বরফের প্রসারণ এবং সংকোচনের কারণে এই ফাটলগুলো তৈরি হয়েছে । দক্ষিণ মেরুর চারপাশে হিমবাহের বরফ গলে গিয়ে তৈরি হওয়া Dorsa Argentea Formation নামে এক বিশাল দীর্ঘ ও আঁকাবাঁকা শৈলশিরা (Esker) বিদ্যমান । এটি একটি দানব মেরু বরফ চাদরের অবশেষ বলে ধারণা করা হয়, যেটি প্রায় ১.৫ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল । এই এলাকাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস রাজ্যের আয়তনের দ্বিগুণ ।
দক্ষিণের বরফ টুপি স্থানচ্যুত । অর্থাৎ, এটি দক্ষিণ মেরুতে কেন্দ্র করে নেই । দক্ষিণের ঋতুগত টুপি ভৌগোলিক মেরুর কাছাকাছি কেন্দ্র করে থাকে । গবেষণায় দেখা গেছে যে, একপাশের তুলনায় অন্যপাশে বেশি তুষারপাত হওয়ার কারণে কেন্দ্রচ্যুত টুপিটি গঠিত হয় । দক্ষিণ মেরুর প্রভাবশালী হেলাস বেসিন অববাহিকার (Hellas Basin বা Hellas Planitia) কারণে বায়ুপ্রবাহ পরিবর্তিত হওয়ায় একটি নিম্নচাপ ব্যবস্থা তৈরি হয় । বিস্ময়কর এই ব্যবস্থা অনেক বেশি তুষারপাত ঘটায় । অন্যদিকে, কম তুষারপাত এবং বেশি হিম থাকে । গ্রীষ্মকালে তুষার বেশি সূর্যালোক প্রতিফলিত করে, তাই খুব বেশি গলে না বা ঊর্ধ্বপাতিত হয় না (মঙ্গল গ্রহের জলবায়ু তুষারকে সরাসরি কঠিন থেকে গ্যাসে পরিণত করে) । অন্যদিকে, হিমের পৃষ্ঠ আরো অমসৃণ এবং বেশি সূর্যালোক আটকে রাখে, যার ফলে বেশি ঊর্ধ্বপাতন ঘটে । যে অঞ্চলে বেশি অমসৃণ হিম থাকে, সেই অঞ্চলগুলো উষ্ণতর হয় । মঙ্গলের মহাজাগতিক বিকিরণ উচ্চমাত্রায় ।
যাই হোক, এই ছবিতে মঙ্গল গ্রহের হিমায়িত দক্ষিণ মেরু দেখতে প্রায় অবাস্তব মনে হলেও বরফাবৃত সর্পিল আকৃতিটি একেবারেই বাস্তব । হয়তো, এই স্তরগুলোর নিচে লুকিয়ে আছে মঙ্গল গ্রহের প্রাচীন জলবায়ুর সূত্র এবং সম্ভবত ভূগর্ভস্থ জলও । মানুষ কি কোনোদিন এখানে গবেষণা কেন্দ্র তৈরি করবে? 🚀

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, গুগল
ছবি: Beyond Space । 

Saturday, 16 May 2026

অ্যান্টার্কটিকার সমুদ্রে জেগে উঠেছে নতুন দ্বীপ




সম্প্রতি, বিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক দল অ্যান্টার্কটিকার হিমশীতল ওয়েডেল সাগরে ঝুঁকিপূর্ণ একটি এলাকায় গবেষণা করার সময় নতুন একটি দ্বীপ আবিষ্কার করেছে, যা এর আগে বিশ্বের কোনো মানচিত্রেই এটি চিহ্নিত ছিল না । বিস্ময়কর প্রকৃতি কখনো কখনো বরফাবৃত অ্যান্টার্কটিকায় এমন সব রহস্য উন্মোচন করে যে বিজ্ঞানীরাও অবাক হয়ে যান । তাদের এই আবিষ্কারটি এখন বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে । আলফ্রেড ভেগেনার ইনস্টিটিউটের জার্মান গবেষণা বা বরফভাঙা জাহাজ পোলারস্টার্নে থাকা ৯৩ জন সদস্যের আন্তর্জাতিক দলটি গত ৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে অ্যান্টার্কটিকার উত্তর-পশ্চিম ওয়েডেল সাগর এলাকায় সমুদ্রের স্রোত, বরফ গলে যাওয়া এবং জলরাশির মানচিত্র তৈরি করছিল । হঠাৎ খারাপ আবহাওয়ার কারণে গবেষণা কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ করে তারা জয়েনভেল্লি আইল্যান্ডে আশ্রয় নেয়ার সময় একটি দ্বীপ দেখতে পান এবং এই অংশটি নৌ-মানচিত্রে আগে কেবল একটি "রহস্যময় ও বিপজ্জনক এলাকা" হিসেবে চিহ্নিত করা ছিল । প্রথমে এটিকে ময়লা জমে থাকা একটি হিমশৈল (Iceberg) মনে হচ্ছিল । পরে যখন বরফ ও হিমবাহ গলতে শুরু করে তখন জানা যায় যে, এটি আসলে একটি ভূখণ্ড বা পাথুরে দ্বীপ । অ্যান্টার্কটিকায় দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রের বরফ স্থিতিশীল ছিল । কিন্তু গত ১০ বছরে এর অনেক পরিবর্তন ঘটেছে । জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অ্যান্টার্কটিকায় বাতাসের ধরণ বা গতিপথ বদলে যাচ্ছে । ফলে, ঠান্ডা পানি ও বরফ সরে যায় এবং গভীর সমুদ্রতলের উষ্ণ জল উপর দিকে উঠে এসে বরফ গলিয়ে দিতে সাহায্য করে । ঠিক যেন চুলার মত কাজ করে । বিজ্ঞানীরা দ্বীপটির আকার ও অবস্থান মানচিত্রায়নের জন্য একটি ড্রোন এবং একটি ইকো সাউন্ডার ব্যবহার করেছেন । ইকো সাউন্ডার হচ্ছে এমন একটি যন্ত্র যা পানির নিচে দূরত্ব মাপার জন্য শব্দ তরঙ্গ নির্গত করে । বিজ্ঞানীদের হতবাক করে তাদের অনুসন্ধানে দেখা যায় যে, দ্বীপটি আশ্চর্যজনকভাবে বড়— এর দৈর্ঘ্য গিজার মহা পিরামিডের (The Great Pyramid of Giza) প্রায় সমান বলে অনুমান করা হয় । গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, দ্বীপটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬ মিটার উঁচু, প্রস্থ ৪০ মিটার এবং দৈর্ঘ্যে ১৩০ মিটার । এই প্রথমবারের মত ভূখণ্ডটির জরিপ এবং নথিভুক্ত করা হলো । তবে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত নন যে, কেন দ্বীপটিকে নৌ-মানচিত্রে বিপদসীমার মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছিল ।  অথচ অন্যান্য ডেটা সেটে এটিকে উপকূলরেখা হিসেবে দেখানো হয়নি । আরো বিস্ময়ের বিষয় যে, মানচিত্রে নতুন আবিষ্কৃত দ্বীপটির অবস্থান প্রকৃত অবস্থান থেকে প্রায় এক মাইল দূরে দেখানো ছিল । স্যাটেলাইট চিত্রগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, বরফে ঢাকা থাকার কারণে দ্বীপটিকে তার আশেপাশের ভাসমান অসংখ্য হিমশৈল থেকে আলাদা করে চেনা প্রায় অসম্ভব ছিল । নতুন আবিষ্কৃত এই দ্বীপটির এখনো কোনো নাম দেয়া হয়নি । গবেষক দল জানিয়েছে, দ্বীপটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করার পর ভবিষ্যতে এর নামকরণ করা হবে । এদিকে অনেক সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা এর নাম রাখার পরামর্শ দিয়েছেন যেমন: (ক) আইসবার্গ (খ) লুমারল্যান্ড (গ) পাখিদের মিলন দ্বীপ । ভেনিস উপকূলের কাছে আরেকটি গোপন ক্ষুদ্র দ্বীপের আবির্ভাবের পর এই নতুন দ্বীপ আবিষ্কার হলো । তবে, আবিষ্কৃত এই দ্বীপ ঘিরে অনেক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং এর মালিকানা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে । সবচেয়ে কৌতুহলোদ্দীপক প্রশ্ন হচ্ছে: যে বিজ্ঞানীরা এই দ্বীপ খুঁজে পেয়েছেন, তারা বা তাদের দেশ কি এই দ্বীপটির মালিকানা দাবি করতে পারবেন? আন্তর্জাতিক আঞ্চলিক জলসীমা ও সার্বভৌমত্ব বা সমুদ্র আইন (UNCLOS) অনুযায়ী, এর উত্তর হচ্ছে না । আইনে বলা আছে, একটি উপকূলীয় দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে সর্বোচ্চ ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত অঞ্চলকে ‘একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল’ (Exclusive Economic Zone বা EEZ) বলা হয় । যদি এই সীমার মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে কোনো দ্বীপ সৃষ্টি হয়, তাহলে ঐ নতুন দ্বীপের উপর কেবলমাত্র সেই নিকটবর্তী দেশেরই সার্বভৌম অধিকার থাকবে । ২০০ নটিক্যাল মাইলের পর বাইরের সমুদ্র এলাকাকে আন্তর্জাতিক জলসীমা বা উচ্চ সাগর (High Seas) বলা হয় । এটি Common Heritage of Mankind বা সমগ্র মানবজাতির সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয় । ফলে, এই জলসীমায় কোনো দেশ বা ব্যক্তি এককভাবে এর মালিকানা বা সার্বভৌমত্ব দাবি করতে পারে না । তাই, এখানে সৃষ্ট কোনো নতুন দ্বীপে কোনো ব্যক্তি নিজেকে সেই দ্বীপের রাজা ঘোষণা করতে পারেন না । আন্তর্জাতিক জলসীমায় যদি কোনো ব্যক্তি কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করে নিজেকে রাজা ঘোষণা করে, তবে UNCLOS এর আইন অনুসারে সেই দ্বীপের নিজস্ব কোনো জলসীমা বা সার্বভৌমত্বের মর্যাদা থাকে না । বিশ্বের কোনো দেশই সেই তথাকথিত দ্বীপ বা রাজ্য বা ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না । বিজ্ঞানীদের মতে তিনটি কারণে যেমন: (ক) সমুদ্রের গভীরে থাকা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে বের হওয়া লাভা ধীরে ধীরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরে উঠে এসে জলের সংস্পর্শে ঠান্ডায় জমে গিয়ে সেটি দ্বীপ সৃষ্টি করে (খ) পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্লেটগুলোর সংঘর্ষ বা সরে যাওয়ার ফলে বিশেষ করে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণে সমুদ্রের তলদেশের ভূমি উপরে উঠে দ্বীপ তৈরি করে (গ) সমুদ্রের স্রোতের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে বালি ও মাটি জমে ছোট ছোট দ্বীপ বা চরের সৃষ্টি করে । 

তথ্যসূত্র: www.dw.com, www.thesun.ie 

ছবি: www.thesun.ie [Image credit: (Alfred Wegener Institute / Simon Dreutter), Christian Haas] ।

Friday, 15 May 2026

সোনারং মন্দির



মুন্সিগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ী উপজেলার সোনারং ইউনিয়নের সোনারং গ্রামে অবস্থিত এই জোড়া মন্দিরটি অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রাচীন বাংলার এক অপূর্ব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন । মুন্সীগঞ্জ তথাপি প্রাচীন বিক্রমপুরের এই মন্দির ১৮৯ বছরের ঐতিহ্যের জৌলুস হারিয়ে এখনো মাথা উঁচু করে কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । পাশাপাশি অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন মন্দিরটি স্থানীয়ভাবে 'জোড়া মঠ' নামে পরিচিত । সোনারং গ্রামে এক সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল । মন্দিরের একটি প্রস্তরলিপি থেকে জানা যায় যে, স্থানীয় জমিদার রূপচন্দ্র সেন ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে কালী মন্দির এবং ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে আরেকটি শিব মন্দির নির্মাণ করেন । এটি জোড়া মন্দির হলেও দুইটি মন্দিরের উচ্চতা এবং স্থাপত্য গঠনে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে । অষ্টভুজ আকৃতির বিশিষ্ট মন্দিরটি দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ২১ ফুট এবং এর দেয়াল বেশ পুরু । মন্দির দুইটির অভ্যন্তরীণ ছাদ নিচু এবং গোলাকার গম্বুজ আকৃতির । ৫.৩৫ মিটার বর্গাকার স্থানে নির্মিত পশ্চিমের কালী মন্দিরটি বৃহৎ, এর উচ্চতা প্রায় ১৫ মিটার (প্রায় ৫০ ফুট) এবং পূবের শিব মন্দিরটি ছোট । কালী মন্দিরের প্রধান উপাসনালয় কক্ষের সাথে ১.৯৪ মিটার এবং শিব মন্দিরের প্রধান উপাসনালয় কক্ষের সাথে ১.৫ মিটার প্রশস্তের বারান্দা আছে । মন্দিরের বাহির ও ভেতরে অসাধারণ কারুকাজে সজ্জিত । মূলত ইট, চুন এবং সুরকি দ্বারা নির্মিত এই মন্দিরটি প্রাচীন খিলান, সূক্ষ্ম কারুকাজ, কুণ্ডলিত চূড়া এবং এর নকশা তৎকালীন স্থাপত্যশৈলীর অনন্য চিহ্ন বহন করছে । কথিত আছে যে, শ্রী রূপচন্দ্র সেনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এখানেই সম্পন্ন হয়েছিল । এছাড়া, মন্দিরের সম্মুখভাগে রয়েছে একটি বিশাল বড় পুকুর । কালী মন্দিরটি তৈরি করার সময় এই পুকুর খনন করা হয় । কালী মন্দিরের সুউচ্চ শিখরে দন্ডায়মান ত্রিশূলটি কিছুটা বাঁকা হয়ে আছে । ধারণা করা হয়, তীব্র বাতাস বা বজ্রপাতের প্রভাবে এটি এমন হয়েছে । বিস্ময়কর এই মন্দিরের চূড়ার ছোট ছোট গর্তগুলো নীলকণ্ঠ, ঘুঘু, মাছরাঙা, শালিক, টিয়া এবং পায়রাসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাসস্থল, যেখানে তারা উচ্চস্বরে কোলাহল করে । চোর বা দুর্বৃত্তরা এই মন্দিরের পাথর, শিবলিঙ্গ, কষ্টিপাথরের কলস এবং বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যায় । দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন এবং অবহেলায় পড়ে থাকার পর, বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগে কিছুদিন আগে সংস্কারের পর অত্যন্ত সুন্দর এই মন্দিরটি এখন এক নতুন রূপ ধারণ করেছে । কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া মন্দিরের সেই অতীত চেহারা পুনরায় আবির্ভূত হওয়ায় মানুষের সাথে এর নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়েছে । জানি না, এর মধ্যে কি এক দুর্নিবার আকর্ষণ লুকিয়ে আছে । নিপুণ কারুকার্যে অনবদ্যভাবে নির্মিত মন্দিরের নান্দনিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি পরম প্রশান্তি এনে দেয় । পবিত্র এই মন্দিরটি দীর্ঘকালের অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং অজানা রহস্যকে ধারণ করে আছে, যা প্রাচীন বিক্রমপুরের এক দুর্লভ ও সমৃদ্ধ ইতিহাসের অংশ । আমি মনে করি, সোনারং মন্দিরের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং পর্যটন ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হলে এটি হবে মুন্সীগঞ্জ জেলার অন্যতম ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান । উল্লেখ্য যে: কালজয়ী বাঙালি, প্রগতি লেখক ও শিল্পী সমিতি 'উদীচী সাংস্কৃতিক সংগঠন' এর প্রতিষ্ঠাতা, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি বিপ্লবী, সাহিত্যিক এবং শ্রমিক সংগঠক সত্যেন সেন এই সোনারং গ্রামেই হিন্দু সেন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ।  

তথ্যসূত্র: আন্তর্জাল (গুগল, উইকিপিডিয়া) । 

ছবি: নিজ ।

Wednesday, 1 April 2026

জংলি ঢেঁড়স

 


জংলি ঢেঁড়স হচ্ছে গুল্মজাতীয় বুনো ভেষজ উদ্ভিদ । এর বৈজ্ঞানিক নাম: Abelmoschus moschatus এবং সমনাম Hibiscus abelmoschus । এটি Malvaceae পরিবারের অন্তর্গত একটি ক্রান্তীয় এশীয় বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ । এই উদ্ভিদের সুন্দর ফুল অত্যন্ত আকর্ষণীয় । গ্রীষ্ম, হেমন্ত এবং বসন্তকালে এর ফুল ফোটে । প্রায় জবা ফুলের মত দেখতে অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী এই ফুলগুলো সাধারণত উজ্জ্বল হলুদ, লাল ও গোলাপী রঙের হয় এবং মাঝখানে বেগুনি বা গাঢ় লাল বা গাঢ় খয়েরি আভা থাকে । ফুলগুলো গন্ধহীন এবং ৫টি নমনীয় কোমল পাপড়ি থাকে, যার মাঝে পরাগ অবস্থিত । ফুল ফোটার পর দুপুর না গড়াতেই ফুল ঝিমিয়ে পড়ে । এই উদ্ভিদের ফল অনেকটা ছোট ঢেঁড়সের মত যার শুং বা রোম রয়েছে এবং বীজ থাকে । এই বীজে কস্তুরীর মত তীব্র গন্ধ আছে, যার কারণে এটিকে লতা কস্তুরী বলে । লাতিন ভাষায় Moschatus এর অর্থ হচ্ছে কস্তুরী । বীজের অদ্ভুত মিষ্টি সুগন্ধের জন্যই এটি ঐতিহাসিকভাবে সুগন্ধি (Perfume) তৈরিতে এবং কফিতে স্বাদ যোগ করতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে । আদিবাসী তরুণী বা নারীরা এই বীজকে সুতোয় গেঁথে বাহুতে অলঙ্কার হিসেবে পরিধান করে । পরিপক্ক ফলের বীজ উপযুক্ত সময়ে সংগ্রহ করা না হলে এটি নিজ থেকেই ঝরে পড়ে বংশ বিস্তার করে । আশ্চর্যজনকভাবে এই মূল্যবান ভেষজ উদ্ভিদের রয়েছে অনেক ঔষধি গুণ । ইউনানি, আয়ুর্বেদিক ও হারবাল চিকিৎসায় এটি বহুবিধ ব্যবহৃত হয় । এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ চমৎকার একটি উদ্ভিদ । ফলে, এই গুরুত্বপূর্ণ লতানো উদ্ভিদটি শারীরিক ক্লান্তি, অবসাদ, হৃৎপিন্ডের দুর্বলতা, হাঁপানি, খিঁচুনি, যৌন রোগ, শুক্রস্বল্পতা, শুক্রতারুল্যে, অরুচি, পেট ফাঁপা, বদহজম, কীটনাশক, মুখের দুর্গন্ধ, স্নায়বিক দুর্বলতা, চর্ম রোগ, মূত্রনালীর সমস্যা, দাঁতের গোড়া ফোলা ও ব্যথা, জিহ্বার ঘাঁ, সাপের কামড়ের প্রতিষেধক, শ্লেষ্মা জনিত মাথাব্যথা এবং চোখের অসুখ ইত্যাদি রোগে ব্যবহৃত হয় । তবে, গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানকালে এর ব্যবহার নিরাপদ বলে প্রমাণিত হয়নি । এছাড়া, প্রকৃতির এক দুর্লভ বস্তু মৃগনাভী বা কস্তুরীর বিকল্প হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হয় । বাংলাদেশের অঞ্চলভেদে এর প্রচলিত নাম হচ্ছে: লতা কস্তুরী বা লতা কস্তুরীকা, কল কস্তুরী, কালো কস্তুরী, মুশকদান এবং বন ঢেঁড়স ইত্যাদি । এর অন্যান্য ইংরেজি নাম হচ্ছে: Musk Mallow, Musk Okra, Ambrette, Ornamental Okra, Annual Hibiscus, Yorka Okra, Galu Gasturi, Bamia MoschataRose Mallow এবং Tropical Jewel Hibiscus ইত্যাদি । এই উদ্ভিদের আকার, আকৃতি, ফুল, ফল ও পাতা সবকিছুই প্রায় ঢেঁড়স গাছের মত । বন, জঙ্গল, ঝোপঝাড়, রাস্তা ও রেল লাইনের কিনারায় এটি জন্মে থাকে । বাংলাদেশ, ভারত, দক্ষিণ এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় এই উদ্ভিদের দেখা মেলে । রৌদ্রজ্জল, স্যাঁতসেঁতে এবং উর্বর জায়গায় এটি বেড়ে ওঠে । জংলি ঢেঁড়সের কচি ফল এবং পাতা সবজি হিসেবে খাওয়া যায় । কখনো কখনো এর বীজ অন্যান্য খাদ্যের স্বাদ বাড়াতে ব্যবহৃত হয় । এটি একটি কোমল উদ্ভিদ, ফলে এটিকে তুষারপাত থেকে সুরক্ষা করা প্রয়োজন । শীতল জলবায়ুতে এটি একবর্ষজীবী উদ্ভিদ হিসেবেও চাষ করা হয় । শিল্পক্ষেত্রে এই উদ্ভিদের মূলের আঠালো রস কাগজ তৈরিতে ব্যবহৃত হয় এবং এর ফুল দিয়ে তামাককে সুগন্ধযুক্ত করা হয় । 

ছবি: নিজ 

তথ্যসূত্র: শিক্ষক বাতায়ন, গুগল, আন্তর্জাল । 

Tuesday, 31 March 2026

প্রতিধ্বনি


ক্রিস্টিনা জর্জিনা রোসেটি (Christina Georgina Rossetti) ছিলেন একজন ইংরেজ লেখিকা যিনি রোমাঞ্চকর, ভক্তিমূলক এবং শিশুদের জন্য কবিতা লিখতেন । তার জন্ম ৫ই ডিসেম্বর ১৮৩০ খ্রিঃ এবং মৃত্যু ২৯শে ডিসেম্বর ১৮৯৪ খ্রিঃ । ক্রিস্টিনা রোসেটি ভিক্টোরীয় যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইংরেজ কবিদের মধ্যে একজন । তার দৃষ্টিভঙ্গির গভীরতা, কথ্য ভাষার শৈলী এবং কবিতার গীতিময় গুণ আজও আমাদের কাছে শক্তিশালী আবেদন রাখে এবং অনুপ্রাণিত করে । তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে Goblin Market এবং Remember । এই বিখ্যাত "প্রতিধ্বনি" (Echo) কবিতাটি হচ্ছে তার একটি অনন্য সৃষ্টিকর্ম । ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে এই অসাধারণ কবিতাটি প্রকাশিত হয় । প্রতিধ্বনি একটি বিষাদপূর্ণ প্রেমের কবিতা, যা হারানো ভালোবাসাকে স্বপ্নে ফিরে পাওয়ার আকুতি প্রকাশ করে । ক্রিস্টিনা রোসেটি জীবনের একটি সময় বিষণ্ণতায় ভুগেছিলেন । ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিয়ে করেননি । নিজের জীবনকে কবিতা ও ধর্মীয় বিশ্বাসে উৎসর্গ করেছিলেন । 

 ছবি: www.goodreads.com । 

তথ্যসূত্র: English literature 

---------------------

 "Echo" 

 by Christina Rossetti 


Come to me in the silence of the night;

Come in the speaking silence of a dream;

Come with soft rounded cheeks and eyes as bright

As sunlight on a stream;

Come back in tears,

O memory, hope, love of finished years.

Oh dream how sweet, too sweet, too bitter sweet,

Whose wakening should have been in Paradise,

Where souls brimfull of love abide and meet;

Where thirsting longing eyes

Watch the slow door

That opening, letting in, lets out no more.

Yet come to me in dreams, that I may live

 My very life again tho’ cold in death:

Come back to me in dreams, that I may give

Pulse for pulse, breath for breath:

 Speak  low, lean low,

As long ago, my love, how long ago. 


Poetry Link: 

https://www.poetryfoundation.org/poems/50289/echo-56d22d3f77136 

https://poets.org/poem/echo 

------------------

প্রতিধ্বনি 

কবি: ক্রিস্টিনা রোসেটি 

অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল 


রাতের নিস্তব্ধতায় আমার কাছে এসো;

স্বপ্নে কথা বলার নীরবতায় এসো;

কোমল ভরাট গাল এবং উজ্জ্বল চোখ নিয়ে এসো

স্রোতের উপর সূর্যের আলোর মত;

অশ্রুসজল চোখে ফিরে এসো,

হে স্মৃতি, আশা, বিগত বছরগুলোর প্রেম ।

ওহ্ স্বপ্ন, কি মধুর, বড্ড মিষ্টি, খুব বেশি তিক্ত-মধুর, 

যার জাগরণ স্বর্গে হওয়া উচিত ছিল, 

যেখানে ভালোবাসায় পরিপূর্ণ আত্মারা বাস করে আর মিলিত হয়;

যেখানে তৃষ্ণার্ত আকুল চোখ

ধীর গতির দরজাটি দেখে 

যে খোলা পথ দিয়ে ভেতরে ঢোকা যায়, বের হওয়া যায় না । 

তবুও স্বপ্নে আমার কাছে এসো, যেন আমি বাঁচতে পারি 

মৃত্যুর শীতলতায় জমে গেলেও আমার প্রাণ আবার জেগে উঠবে: 

স্বপ্নে আমার কাছে ফিরে এসো, যাতে আমি দিতে পারি 

প্রতিটি স্পন্দনের জন্য স্পন্দন, নিঃশ্বাসের জন্য নিঃশ্বাস:

আস্তে কথা বলো, নিচু হয়ে ঝুঁকে বসো,

কত যে আগে, আমার প্রিয়তম, কত দিন আগের কথা ।


Wednesday, 11 March 2026

তুষার পরী (Snow fairy)



জাপানি তুষার পরী বা শিমা এনাগা (Shima Enaga, বৈজ্ঞানিক নাম: Aegithalos caudatus caudatus) হচ্ছে অবিশ্বাস্য সুন্দর, ক্ষুদ্র এবং তুলতুলে একটি পাখি, যেটি বেশিরভাগই জাপানের উত্তর দ্বীপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে অবস্থিত হোক্কাইডো বনে পাওয়া যায় । তবে, এটি সমগ্র প্যালিয়াট্রিক রাজ্যে বাস করে । বিশুদ্ধ সাদা গোলাকার মুখমণ্ডল, পুঁতির মত কালো চোখ, ছোট ঠোঁট এবং এক লম্বা লেজের জন্য সে বিখ্যাত । অনুপ্রেরণার প্রতীক । এটিকে কখনো কখনো 'Bouncy cotton ball' হিসেবে বর্ননা করা হয় । এই চমৎকার "ডানাওয়ালা তুষারগোলক" পাখিটি শীতকালীন জঙ্গলে বেড়ে ওঠে, যা হোক্কাইডোর বনে এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নিদর্শন । মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের অধিকারী এই পাখি অত্যন্ত তুলতুলে হয়, বিশেষ করে শীতকালে এর ঘন পালক তাকে প্রচণ্ড ঠান্ডা তাপমাত্রা সহ্য করতে সাহায্য করে । শিমা এনাগা হচ্ছে খুবই লাজুক, চটপটে, কৌশলে পলায়ন করা স্বভাব এবং গানের পাখি । বেশিরভাগ সময় ঘন চিরসবুজ গাছে খাবারের সন্ধানে একে দেখা যায় । প্রাথমিকভাবে ছোট পোকামাকড়, আর্থ্রোপড, ডিম, বিশালাকার মথ, মাকড়সা, প্রজাপতি এবং বীজ পছন্দ করে । তবে, মাঝে মাঝে এরা খাদ্যের পরিপূরক হিসেবে উদ্ভিজ্জ পদার্থ ব্যবহার করে । এই পাখি ঠান্ডার প্রতি সংবেদনশীল এবং ঠান্ডাময় রাতে উষ্ণতার জন্য আড্ডা দেয় । পুরুষ ও স্ত্রী পাখি একই রকম এবং অবিরাম উচ্চস্বরে ডাকে । বসন্তকাল থেকে শরৎকাল পর্যন্ত স্ত্রী পাখিরা প্রতিবেশী অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায়, যখন পুরুষ পাখিরা তাদের শীতকালীন অঞ্চলে থাকে । এরা বাবা-মা এবং সন্তানদের নিয়ে পাল তৈরি করে এবং প্রজনন ঋতুতে ছানাগুলো একটি ডালে একসাথে জড়ো হয়ে থাকতে পছন্দ করে । হোক্কাইডোর তুষারাবৃত বনে এরা সামাজিক এবং কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে ঝাঁকে ঝাঁকে ঘুরে বেড়ায় । কখনো কখনো তাদের মল্লক্রীড়া কৌশল (Acrobatic tricks) করতে দেখা যায় । নান্দনিক ছোট পাখিটি অত্যন্ত সক্রিয়, দ্রুত গতির এবং ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের মত নয় । পরম পূজনীয়, গোলাকার, সফেদ এবং তুলতুলে চেহারার জন্যই তাকে তুষার পরী (Snow fairy) ডাকে । তুষার পরী ডাকনামটি তাকে শুভ্রতার প্রতীক এবং দেবদূতের মত চেহারা তুলে ধরে । এই খাঁটি সাদা পাখি জাপানে এতই জনপ্রিয় যে জাপানি সামাজিক মাধ্যম, শিল্প এবং বিভিন্ন পণ্যদ্রব্যে তাকে আইকনিক বিষয় করে তুলেছে । 'হোক্কাইডো তুষার পরী' শীতের মাসগুলোতে বিশেষ করে জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারিতে তাদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায় যখন এরা উষ্ণতার জন্য পালক উঁচিয়ে সর্বোচ্চ ফুলে ওঠে । শীতকালে এদের সাদা পালক তুষারের সাথে মিশে গিয়ে এক অপরূপ দৃশ্যের সৃষ্টি করে । 

তথ্যসূত্র: আন্তর্জাল, গুগল ।https://share.google/J97f7Sod6uwfgpcFI

Sunday, 8 February 2026

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি -আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

 

 "আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি" আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ 

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল
তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল।

তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন
অরণ্য এবং শ্বাপদের কথা বলতেন
পতিত জমি আবাদের কথা বলতেন
তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন।

জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি সত্য শব্দ কবিতা,
কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যদানা কবিতা।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে ঝড়ের আর্তনাদ শুনবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে দিগন্তের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে।

আমি উচ্চারিত সত্যের মতো
স্বপ্নের কথা বলছি।
উনুনের আগুনে আলোকিত
একটি উজ্জ্বল জানালার কথা বলছি।
আমি আমার মা'য়ের কথা বলছি,
তিনি বলতেন প্রবহমান নদী
যে সাতার জানে না তাকেও ভাসিয়ে রাখে।

যে কবিতা শুনতে জানে না
সে নদীতে ভাসতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মাছের সঙ্গে খেলা করতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মা'য়ের কোলে শুয়ে গল্প শুনতে পারে না

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি বিচলিত স্নেহের কথা বলছি
গর্ভবতী বোনের মৃত্যুর কথা বলছি
আমি আমার ভালোবাসার কথা বলছি।
ভালোবাসা দিলে মা মরে যায়
যুদ্ধ আসে ভালোবেসে
মা'য়ের ছেলেরা চলে যায়,
আমি আমার ভাইয়ের কথা বলছি।

যে কবিতা শুনতে জানে না
সে সন্তানের জন্য মরতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে ভালোবেসে যুদ্ধে যেতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে সূর্যকে হৃদপিন্ডে ধরে রাখতে পারে না।

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি
আমি আমার পূর্ব পুরুষের কথা বলছি
তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল
কারণ তিনি ক্রীতদাস ছিলেন।

আমরা কি তা'র মতো কবিতার কথা বলতে পারবো,
আমরা কি তা'র মতো স্বাধীনতার কথা বলতে পারবো!
তিনি মৃত্তিকার গভীরে
কর্ষণের কথা বলতেন
অবগাহিত ক্ষেত্রে
পরিচ্ছন্ন বীজ বপনের কথা বলতেন
সবৎসা গাভীর মত
দুগ্ধবতী শস্যের পরিচর্যার কথা বলতেন
তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন।

যে কর্ষণ করে তাঁর প্রতিটি স্বেদবিন্দু কবিতা
কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যদানা কবিতা।

যে কবিতা শুনতে জানে না
শস্যহীন প্রান্তর তাকে পরিহাস করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মাতৃস্তন্য থেকে বঞ্চিত হবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে আজন্ম ক্ষুধার্ত থেকে যাবে।

যখন প্রবঞ্চক ভূস্বামীর প্রচন্ড দাবদাহ
আমাদের শস্যকে বিপর্যস্ত করলো
তখন আমরা শ্রাবণের মেঘের মত
যূথবদ্ধ হলাম।
বর্ষণের স্নিগ্ধ প্রলেপে
মৃত মৃত্তিকাকে সঞ্জীবিত করলাম।
বারিসিক্ত ভূমিতে
পরিচ্ছন্ন বীজ বপন করলাম।
সুগঠিত স্বেদবিন্দুর মত
শস্যের সৌকর্য অবলোকন করলাম,
এবং এক অবিশ্বাস্য আঘ্রাণ
আনিঃশ্বাস গ্রহণ করলাম।
তখন বিষসর্প প্রভুগণ
অন্ধকার গহ্বরে প্রবেশ করলো
এবং আমরা ঘন সন্নিবিষ্ট তাম্রলিপির মত
রৌদ্রালোকে উদ্ভাসিত হলাম।
তখন আমরা সমবেত কন্ঠে
কবিতাকে ধারণ করলাম।
দিগন্ত বিদীর্ণ করা বজ্রের উদ্ভাসন কবিতা
রক্তজবার মত প্রতিরোধের উচ্চারণ কবিতা।

যে কবিতা শুনতে জানে না
পরভৃতের গ্লানি তাকে ভূলুন্ঠিত করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
অভ্যূত্থানের জলোচ্ছ্বাস তাকে নতজানু করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
পলিমাটির সৌরভ তাকে পরিত্যাগ করবে।

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
তিনি স্বপ্নের মত সত্য ভাষণের কথা বলতেন
সুপ্রাচীন সংগীতের আশ্চর্য ব্যাপ্তির কথা বলতেন
তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন।

যখন কবিকে হত্যা করা হল
তখন আমরা নদী এবং সমুদ্রের মোহনার মত
সৌভ্রত্রে সম্মিলিত হলাম।
প্রজ্জ্বলিত সূর্যের মত অগ্নিগর্ভ হলাম।
ক্ষিপ্রগতি বিদ্যুতের মত
ত্রিভূবন পরিভ্রমণ করলাম।
এবং হিংস্র ঘাতক নতজানু হয়ে
কবিতার কাছে প্রাণভিক্ষা চাইলো।

তখন আমরা দুঃখকে ক্রোধ
এবং ক্রোধকে আনন্দিত করলাম।

নদী এবং সমুদ্রে মোহনার মত
সম্মিলিত কন্ঠস্বর কবিতা
অবদমিত ক্রোধের আনন্দিত উত্সারণ কবিতা।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে তরঙ্গের সৌহার্দ থেকে বঞ্চিত হবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
নিঃসঙ্গ বিষাদ তাকে অভিশপ্ত করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মূক ও বধির থেকে যাবে।
আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল
আমি একগুচ্ছ রক্তজবার কথা বলছি।

আমি জলোচ্ছ্বাসের মত
অভ্যূত্থানের কথা বলছি
উত্‌ক্ষিপ্ত নক্ষত্রের মত
কমলের চোখের কথা বলছি
প্রস্ফুটিত পুষ্পের মত
সহস্র ক্ষতের কথা বলছি
আমি নিরুদ্দিষ্ট সন্তানের জননীর কথা বলছি
আমি বহ্নমান মৃত্যু
এবং স্বাধীনতার কথা বলছি।

যখন রাজশক্তি আমাদের আঘাত করলো
তখন আমরা প্রাচীণ সংগীতের মত
ঋজু এবং সংহত হলাম।
পর্বত শৃংগের মত
মহাকাশকে স্পর্শ করলাম।
দিকচক্রবালের মত
দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হলাম;
এবং শ্বেত সন্ত্রাসকে
সমূলে উত্পাটিত করলাম।

তখন আমরা নক্ষত্রপুঞ্জের মত
উজ্জ্বল এবং প্রশান্ত হলাম।

উত্‌ক্ষিপ্ত নক্ষত্রের প্রস্ফুটিত ক্ষতচিহ্ন কবিতা
স্পর্ধিত মধ্যাহ্নের আলোকিত উম্মোচন কবিতা।

যে কবিতা শুনতে জানে না
সে নীলিমাকে স্পর্শ করতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মধ্যাহ্নের প্রত্যয়ে প্রদীপ্ত হতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে সন্ত্রাসের প্রতিহত করতে পারে না।

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি শ্রমজীবী মানুষের
উদ্বেল অভিযাত্রার কথা বলছি
আদিবাস অরণ্যের
অনার্য সংহতির কথা বলছি
শৃংখলিত বৃক্ষের
উর্দ্ধমুখী অহংকারের কথা বলছি,
আমি অতীত এবং সমকালের কথা বলছি।
শৃংখলিত বৃক্ষের উর্দ্ধমুখী অহংকার কবিতা
আদিবাস অরণ্যের অনার্য সংহতি কবিতা।

যে কবিতা শুনতে জানে না
যূথভ্রষ্ট বিশৃংখলা তাকে বিপর্যস্ত করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
বিভ্রান্ত অবক্ষয় তাকে দৃষ্টিহীন করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে আজন্ম হীনমন্য থেকে যাবে।

যখন আমরা নগরীতে প্রবেশ করলাম
তখন চতুর্দিকে ক্ষুধা।
নিঃসঙ্গ মৃত্তিকা শস্যহীন
ফলবতী বৃক্ষরাজি নিস্ফল
এবং ভাসমান ভূখন্ডের মত
ছিন্নমূল মানুষেরা ক্ষুধার্ত।

যখন আমরা নগরীতে প্রবেশ করলাম
তখন আদিগন্ত বিশৃংখলা।
নিরুদ্দিষ্ট সন্তানের জননী শোকসন্তপ্ত
দীর্ঘদেহ পুত্রগণ বিভ্রান্ত
এবং রক্তবর্ণ কমলের মত
বিস্ফোরিত নেত্র দৃষ্টিহীন।
তখন আমরা পূর্বপুরুষকে
স্মরণ করলাম।
প্রপিতামহের বীর গাঁথা
স্মরণ করলাম।
আদিবাসী অরণ্য এবং নতজানু শ্বাপদের কথা
স্মরণ করলাম।

তখন আমরা পর্বতের মত অবিচল
এবং ধ্রুবনক্ষত্রের মত স্থির লক্ষ্য হলাম।

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি স্থির লক্ষ্য মানুষের
সশস্ত্র অভ্যুত্থানের কথা বলছি
শ্রেণীযুদ্ধের অলিন্দে
ইতিহাসের বিচরণের কথা বলছি
আমি ইতিহাস এবং স্বপ্নের কথা বলছি।

স্বপ্নের মত সত্যভাষণ ইতিহাস
ইতিহাসের আনন্দিত অভিজ্ঞান কবিতা
যে বিনিদ্র সে স্বপ্ন দেখতে পারে না
যে অসুখী সে কবিতা লিখতে পারে না।

যে উদ্গত অংকুরের মত আনন্দিত
সে কবি
যে সত্যের মত স্বপ্নভাবী
সে কবি
যখন মানুষ মানুষকে ভালবাসবে
তখন প্রত্যেকে কবি।

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি বিচলিত বর্তমান
এবং অন্তিম সংগ্রামের কথা বলছি।

খন্ডযুদ্ধের বিরতিতে
আমরা ভূমি কর্ষণ করেছি।
হত্যা এবং ঘাতকের সংকীর্ণ ছায়াপথে
পরিচ্ছন্ন বীজ বপন করেছি।
এবং প্রবহমান নদীর সুকুমার দাক্ষিণ্যে
শস্যের পরিচর্যা করছি।

আমাদের মুখাবয়ব অসুন্দর
কারণ বিকৃতির প্রতি ঘৃণা
মানুষকে কুশ্রী করে দ্যায়।
আমাদের কণ্ঠস্বর রূঢ়
কারণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ
কণ্ঠকে কর্কশ করে তোলে।
আমাদের পৃষ্ঠদেশে নাক্ষত্রিক ক্ষতচিহ্ন
কারণ উচ্চারিত শব্দ আশ্চর্য বিশ্বাসঘাতক
আমাদেরকে বারবার বধ্যভূমিতে উপনীত করেছে।

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমার সন্তানেরা
আমি তোমাদের বলছি।
যেদিন প্রতিটি উচ্চারিত শব্দ
সূর্যের মত সত্য হবে
সেই ভবিষ্যতের কথা বলছি,
সেই ভবিষ্যতের কবিতার কথা বলছি।

আমি বিষসর্প প্রভুদের
চির প্রয়াণের কথা বলছি
দ্বন্দ্ব এবং বিরোধের
পরিসমাপ্তির কথা বলছি
সুতীব্র ঘৃণার
চূড়ান্ত অবসানের কথা বলছি।

আমি সুপুরুষ ভালবাসার
সুকণ্ঠ সংগীতের কথা বলছি।

যে কর্ষণ করে
শস্যের সম্ভার তাকে সমৃদ্ধ করবে।
যে মত্স্য লালন করে
প্রবহমান নদী তাকে পুরস্কৃত করবে।
যে গাভীর পরিচর্যা করে
জননীর আশীর্বাদ তাকে দীর্ঘায়ু করবে।
যে লৌহখন্ডকে প্রজ্জ্বলিত করে
ইস্পাতের তরবারি তাকে সশস্ত্র করবে।
দীর্ঘদেহ পুত্রগণ
আমি তোমাদের বলছি।
আমি আমার মায়ের কথা বলছি
বোনের মৃত্যুর কথা বলছি
ভাইয়ের যুদ্ধের কথা বলছি
আমি আমার ভালবাসার কথা বলছি।
আমি কবি এবং কবিতার কথা বলছি।

সশস্ত্র সুন্দরের অনিবার্য অভ্যুত্থান কবিতা
সুপুরুষ ভালবাসার সুকণ্ঠ সংগীত কবিতা
জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি মুক্ত শব্দ কবিতা
রক্তজবার মতো প্রতিরোধের উচ্চারণ কবিতা।

আমরা কি তাঁর মত কবিতার কথা বলতে পারবো
আমরা কি তাঁর মত স্বাধীনতার কথা বলতে পারবো। 

****
আমি কিংবদন্তির কথা বলছি | PDF https://share.google/mwVBDHXpsATieA4JU

Saturday, 22 November 2025

গুস্তাভ ক্লিম্টের এক রহস্যময় চিত্রকর্ম

 




কিছু ছবি এতটাই প্রতীকী হয়ে ওঠে যে সেগুলো আসলেই অসাধারণ । অস্ট্রিয়ান চিত্রশিল্পী গুস্তাভ ক্লিম্ট (Gustav Klimt) এর আঁকা এলিজাবেথ লেডেরারের (Elisabeth Lederer) প্রতিকৃতিটি তেমনই একটি । গত কয়েক দশক ধরে জনসাধারণের দৃষ্টির আড়ালে থাকা এই চিত্রকর্মটি এখন সোথেবি এর নিলামে রেকর্ড পরিমাণ অর্থে বিক্রি হয়েছে ।কেন এটি এত মূল্যবান? চিত্রশিল্পী গুস্তাভ ক্লিম্টের এই হৃদয়গ্রাহী চিত্রকর্মটি আধুনিক শিল্পের সবচেয়ে ব্যয়বহুল কাজ । শিল্পীর সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ পৃষ্ঠপোষকদের একজন তরুণী উত্তরাধিকারী এবং কন্যা এলিজাবেথ লেডেরারের বিখ্যাত প্রতিকৃতিটি ১৯১৪-১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি এঁকেছিলেন । ছবিতে চীনা ঢিলা গাঊনে আবৃত বা সুন্দর ভাঁজে সাজানো এলিজাবেথ লেডেরারকে দেখা যাচ্ছে । এই পূর্ণ দৈর্ঘ্যের উত্তেজনাপূর্ণ জটিল প্রতিকৃতিটি গত ১৮ই নভেম্বর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে ২৩৬.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে (১৮০ মিলিয়ন পাউন্ড) বিক্রি হয়েছে, যেটি দুই বছর আগে ১৯১৭-১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে শিল্পী গুস্তাভ ক্লিম্টের Lady with a Fan চিত্রকর্মের মূল্যকে ছাড়িয়ে গেছে এবং ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে ১০৮ মিলিয়ন ডলার (৮২ মিলিয়ন পাউন্ড) বিক্রি হওয়ার রেকর্ড ভেঙে দেয় । ফলে, এটি ইউরোপে নিলামে বিক্রি হওয়া সবচেয়ে ব্যয়বহুল চিত্রকর্মে পরিণত হয় । এছাড়া, এলিজাবেথ লেডেরারের ভাই রোনাল্ড ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে গুস্তাভ ক্লিম্টের আরেকটি বিখ্যাত Portrait of Adele Bloch-Bauer 1 চিত্রকর্ম নিলামের পরিবর্তে ব্যক্তিগতভাবে ১৩৫ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি করেছিলেন, যেটি ব্যাপকভাবে ’সোনার নারী’ নামে পরিচিত (Woman in Gold) । যাই হোক, চিত্রশিল্পী গুস্তাভ ক্লিম্টের এই মনোরম এলিজাবেথ লেডেরার চিত্রকর্মটি ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে আঁকা কৃতি চিত্রকর অ্যান্ডি ওয়ারহলের দুর্দান্ত মেরিলিন মনরোর প্রতিকৃতি Shot Sage Blue Marilyn কে ছাড়িয়ে যায়, যেটি ২০২২ খ্রিস্টাব্দে নিউ ইয়র্কের ক্রিস্টি’স হাউজে ১৯৫ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়েছিল । এই পর্যন্ত নিলামে বিক্রি হওয়া সবচেয়ে দামী শিল্পকর্ম হচ্ছে জগদ্বিখ্যাত ইতালিয়ান চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা Salvator Mundi, যেটি ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে ৪৫০.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়েছিল । কিন্তু এলিজাবেথ লেডেরারের চিত্রকর্মটি মনস্তাত্ত্বিকভাবে উত্যক্ত করার তীব্রতা আসলে কি? প্রায় দুই মিটার লম্বা ২০ বছর বয়সী উত্তরাধিকারীর প্রতিকৃতিতে কি এমন আছে যে অদ্ভুত লম্বা দেহটি ঝলমলে সাদা রেশমের তৈরি কোকুন-সদৃশ (Cocoon-like) গাঊনের সুরক্ষিত আবরণে (Chrysalis) এক স্বর্গীয় পরী হয়ে উঠেছে, যার দাম এতটাই চড়া? এলিজাবেথের প্রতিকৃতিটিতে চিত্রশিল্পী গুস্তাভ ক্লিম্টের তথাকথিত ‘স্বর্নযুগ’ এর সুপরিচিত চিত্রকর্মের প্রকাশ্য ঐশ্বর্যের অভাব রয়েছে বলে মনে হতে পারে, যে যুগে শিল্পী প্রথম ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে তার ’পোর্ট্রেট অফ অ্যাডেল ব্লোচ-বাউয়ার’ এবং ১৯০৭-১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে ’দ্য কিস’ এর মত ঝলমলে কাজ তৈরি করেছিলেন । যেখানে সেই জাঁকজমকপূর্ণ মাস্টারপিসগুলো ভিয়েনা বিচ্ছিন্নতার (চিত্রশিল্পী ক্লিম্ট যে প্রভাবশালী শৈল্পিক স্বাধীনতার উপর জোর দিয়েছিলেন যা খুঁজে পেতে সাহায্য করেছিলেন) মায়াজালের সাথে ঝলমল করে । শিল্পীর জীবনের শেষ বছরগুলোতে (গুস্তাভ ক্লিম্ট পঞ্চান্ন বছর বয়সে ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন) তৈরি এলিজাবেথ লেডেরারের গীতিমূলক উপমাটি আরো মানসিকভাবে উত্তেজনাপূর্ণ তীব্রতার সাথে স্পন্দিত হয় । ক্যানভাসের নান্দনিক ঐশ্বর্য যদি আরো গোপন থাকে, তাহলে তা প্রচুর । ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়া অধিগ্রহণ বা দখলের পর নাৎসি কর্মকর্তারা চিত্রকর গুস্তাভ ক্লিম্টের অঙ্কিত এলিজাবেথ লেডেরারের চিত্রকর্মটিসহ তার বিশাল সংগ্রহকে বাজেয়াপ্ত করে । এলিজাবেথ লেডেরারের প্রতিকৃতিটি আগুনে প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল । কিন্তু ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে এলিজাবেথের ভাই এরিকের কাছে এটি ফেরৎ দেওয়া হয়, যিনি চিত্রশিল্পী গুস্তাভ ক্লিম্টের বন্ধু ও সহশিল্পী এগন শিয়েলের আঁকা এবং চিত্রকর্মের প্রায়শই বিষয়বস্তু ছিলেন । এই বিস্ময়কর এলিজাবেথ লেডেরারের চিত্রকর্মটি এরিকের জীবনের বেশিরভাগ সময়েই তার দখলে ছিল, যতক্ষণ না তিনি ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যুর দুই বছর আগে এটি বিক্রি করে দেন । ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে এলিজাবেথ লেডেরারের চিত্রকর্মটি বাজারে আসে । তখনই এটি এস্তি লডার প্রসাধনী কোম্পানির কোটিপতি উত্তরাধিকারী লিওনার্ড এ লডারের ব্যক্তিগত শিল্প সংগ্রহের অংশ হয়ে ওঠে । যিনি চিত্রকর্মটিকে নিউ ইয়র্কের পঞ্চম অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে প্রদর্শন করেছিলেন অল্প সময়ের জন্য । লিওনার্ড এ লডার বিরানব্বই বছর বয়সে ২০২৫ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে মারা যান । গত কয়েক দশক ধরে জনসাধারণের দৃষ্টি থেকে লুকিয়ে থাকা এই অনুপম সুন্দর প্রতিকৃতিটি এক অর্থে তার সময়ের অপেক্ষায় রয়েছে পুনরায় আলোচনায় ফিরে আসার জন্য । মূল্য যাই হোক না কেন, মনোমুগ্ধকর এই চিত্রকর্মটি অবশেষে তার গোপন রহস্য প্রকাশ করার জন্য প্রস্তুত । অনন্য সৌন্দর্যের অধিকারী চিত্রকর্মটির গল্পটি সত্য এবং প্রতীকীবাদকে একটি সমৃদ্ধ চাক্ষুষ পর্দাতে রূপান্তরিত করে, যার গুপ্ত কৌশল চিত্রকলার পৃষ্ঠের ভিতরে এবং বাইরেও বিস্তৃত । প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর বছরগুলোতে গৃহীত ভিয়েনার অন্যতম ধনী ইহুদি পরিবারের অগাস্ট লেডেরার এবং সেরেনা লেডেরারের কন্যা এলিজাবেথ লেডেরারের আকর্ষণীয় প্রতিকৃতির উজ্জ্বল উত্থানকে স্বর্ণযুগের শেষ গৌরবময় নিঃশ্বাস (হাঁপান) হিসেবে পড়া যেতে পারে, যেখান থেকে এটি উদ্ভূত হয়েছিল । পূর্ব এশীয় প্রভাবশালী শিল্প ও সাহিত্যের মূল উপাদান বা মোটিফের বিস্তৃত বিন্যাস- যা তরুণীকে স্বর্গীয় নীলের এক ঝলমলে কালজয়ী পর্যায়ে প্রদক্ষিণ করে এবং তার অন্ধকার চোখের প্রেরণাদায়ক প্রশান্তি আমাদের সময় ও স্থান অতিক্রম করে ইউরোপীয় ইতিহাসের ত্বরান্বিত অস্থিরতা থেকে সরিয়ে নিয়ে যায় । চিত্রকর গুস্তাভ ক্লিম্ট পূর্বে যে সোনার সাহসের উপর নির্ভর করতেন, তা এতটা অদৃশ্য হয়ে যায়নি বরং এক ধরণের বিপরীত মধ্যযুগীয় রসায়ন-শাস্ত্রের মধ্য দিয়ে প্রাণবন্ত ও উদ্দীপক রঙের নির্ভীকতায় রূপান্তরিত হয়েছে যা অভিব্যক্তিবাদের সাহসিকতার সীমানায় অবস্থিত । আরো ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এই অদ্ভুত প্রতিকৃতিটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং সাংস্কৃতিকভাবে জটিল বিবরণে ভরা । এলিজাবেথ লেডেরারের বিস্তৃত পোশাক এবং গাঊনের নকশার মধ্যে শিল্পী গুস্তাভ ক্লিম্ট আকৃতি বা কাঠামোর এক মোহনীয় ষড়যন্ত্র বুনেছেন । এগুলো পূর্ব এশীয় শিল্পকলা এবং অণুবীক্ষণিক চিকিৎসা চিত্রকল্পের জগৎ থেকে সারগ্রাহীভাবে আঁকা প্রতীক ও রূপের রূপরেখার প্রতিধ্বনি করে । যেখানে শিল্পী গুস্তাভ ক্লিম্ট ভিয়েনায় বসবাস করতেন, সেই বৈজ্ঞানিক বৃত্তের মধ্যে এটি আরো স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল । এলিজাবেথ লেডেরারের পোশাকের উপর ড্রাগনগুলো কিং রাজবংশের (Qing Dynasty) বস্ত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে এই প্রাণীগুলো মহাজাগতিক কর্তৃত্ব এবং সম্রাটের ঐশ্বরিকভাবে অনুমোদিত কর্তৃত্বের প্রতিনিধিত্ব করে । এলিজাবেথের উরুর চারপাশে তাদের ধীর, বৃত্তাকার চলাচল, শৈলীযুক্ত বা নান্দনিক ঢেউ থেকে উঠে আসা ইত্যাদি এলিজাবেথকে উপাদান এবং অতিপ্রাকৃত প্রাণীদের প্রতিপালক হিসেবে প্রায় পৌরাণিক উপস্থিতি দিয়েছে । এলিজাবেথ লেডেরারের সৌন্দর্যকে কাল্পনিক ভাষায় অমর করে শিল্পী গুস্তাভ ক্লিম্ট কেবল তার পৃষ্ঠপোষকদের তোষামোদ করছেন না । তিনি আসলে, একটি নতুন যুগের জন্য ইতালীয় চিত্রশিল্পী স্যান্ড্রো বোটিচেলির চিত্রকর্ম ‘শুক্র গ্রহের জন্ম’কে নতুন রূপে উপস্থাপন বা পুনর্নবীকরণ করেছেন (Reinventing Sandro Botticelli’s Birth of Venus) । গুস্তাভ ক্লিম্টের জীবনের শেষ দিকের আঁকা এলিজাবেথ লেডেরারের চিত্রকর্মটি তার ‘স্বর্ণযুগে’ আঁকা চিত্রকর্মগুলোর চেয়ে আলাদা । ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে তার তৈরি চিত্রকর্ম Danaë, The Kiss এবং Portrait of Adele Bloch-Bauer 1 সহ এই ধরনের কাজগুলোতে দেখা যায় কোষীয় আকারগুলো এমন এক অস্পষ্ট ভাষায় মিশে যেতে শুরু করে যা কেবল গুস্তাভ ক্লিম্টই তৈরি করতে পারতেন । সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রতীকগুলোকে জৈবিক উৎপত্তি এবং রক্তরেখার ইঙ্গিতের সাথে মিলিয়ে তিনি এমন একটি প্রতিকৃতি তৈরি করেন যা প্রাচীন পুরাণ এবং আধুনিক বিজ্ঞানের ক্রমবর্ধমান স্তরের উপর কাজ করে । আরো উল্লেখযোগ্যভাবে, বংশ এবং পরিচয়ের এই সূক্ষ্ম উল্লেখগুলো বহু বছর পরে নাৎসি শাসনামলে এলিজাবেথ লেডেরারের সাথে কি ঘটেছিল তার উপর এক অদ্ভুত দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে । এলিজাবেথ লেডেরার তার ইহুদি বংশধরের কারণে অস্ট্রিয়ায় চরম দুর্দশার মুখে পড়ে ক্রমবর্ধমান বিধিনিষেধ এবং বিপদের মুখোমুখি হতে থাকেন । নিপীড়ন থেকে বাঁচতে আত্মরক্ষার জন্য এক অসাধারণ পদক্ষেপ হিসেবে তিনি মিথ্যা দাবি করেছিলেন যে, গুস্তাভ ক্লিম্ট একজন অ-ইহুদি শিল্পী যিনি তার বহু প্রেমের সম্পর্কের জন্য পরিচিত, আসলে তিনি তার জৈবিক পিতা ছিলেন । এলিজাবেথ লেডেরারের মা সেরেনা লেডেরার একটি শপথপত্রে স্বাক্ষর করে তার মেয়ের বানোয়াট দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেছিলেন । কর্তৃপক্ষ এই কল্পকাহিনী গ্রহণ করে এবং এলিজাবেথকে একটি সংশোধিত মর্যাদা দেয় যা তাকে সুরক্ষিত করে । চিত্রশিল্পী গুস্তাভ ক্লিম্ট তার এই রহস্যময় চিত্রকর্মের গঠন বা কাঠামো বা ফ্রেমের ভেতরে এবং বাইরে এলিজাবেথের এক অসাধারণ রূপান্তর, পুনর্জন্ম এবং রূপান্তরিত বেঁচে থাকার গল্প তুলে ধরেছেন । গুস্তাভ ক্লিম্ট এলিজাবেথের জন্য যে সূক্ষ্ম পোশাক বুনেছিলেন তার গঠনকে সংজ্ঞায়িত করে এমন সূক্ষ্ম আকারের আঁটসাঁট আভাস থেকে এক ঐন্দ্রজালিক অনুভূতি সৃষ্টি করে এবং তরুণীর শরীরের গঠন যেন অলৌকিকভাবে একটি প্রজাপতির আকৃতির সাথে মিলে যাচ্ছে (ক্লিম্টের শিল্পে একটি পুনরাবৃত্তিমূলক মোটিফ), যা তার রেশমী গুটি বা খোল (Silken chrysalis) থেকে মুক্তি পেয়েছে । মেয়েটির রঙিন গাঊন তার পিছনে মার্জিতভাবে পড়ে আছে এবং হঠাৎ করেই তার মসৃণ প্রিজম-ঘটিত ডানার (Prismatic wings) মত চেহারা চমৎকারভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে । চিত্রশিল্পী গুস্তাভ ক্লিম্টের শেষের মাস্টারপিসটি (এলিজাবেথ লেডেরার) এই মুহূর্তে যে আশ্চর্যজনক পরিমাণ অঙ্কের আয় করেছে তার যোগ্য কি না, শিল্পীর এই প্রতিকৃতির অবিরাম পুনর্জন্মমূলক প্রতিভার শক্তি, নির্মাণশৈলী এবং অমূল্যতা নিয়ে সন্দেহ করার কিছুই নেই ।

তথ্যসূত্র: www.bbc.com (by Kelly Grovier), www.theguardian.com

ছবি: গুস্তাভ ক্লিম্টের আঁকা এলিজাবেথ লেডেরারের প্রতিকৃতি (১৯১৪-১৯১৬ খ্রিঃ), এটি এখন শিল্পীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল চিত্রকর্ম (সৌজন্যে: Alamy) । 

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...