ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ডের জ্যোতির্বিদ Emma Nabbie এর নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী দল ২০২৪ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে জ্যোতির্বিদ্যা জার্নালে "উত্তপ্ত নেপচুন মরুভূমিতে বেঁচে থাকা: অতি-উষ্ণ নেপচুন TOI-3261b বহিঃসৌর গ্রহের আবিষ্কার” এর বিষয়ে তাদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে । বিজ্ঞানীরা নাসা'র Transiting Exoplanet Survey Satellite (TESS), Las Cumbres Observatory (LCO), ESPRESSO এবং HARPS দূরবীক্ষণ যন্ত্রগুলো ব্যবহার করে আমাদের সৌরজগতের বাইরে গভীর মহাকাশে অবস্থিত একটি বহিঃসৌর গ্রহ TOI-3261b (Exoplanet) আবিষ্কার করেছে । গ্রহটির অন্যান্য নাম হচ্ছে: TIC 358070912b এবং 2MASS J03105467-7331556b । পরবর্তীতে তারা অস্ট্রেলিয়া, চিলি এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত স্থল-ভিত্তিক দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে এ গ্রহটিকে আরো ব্যাপকভাবে পর্যবেক্ষণ করেন । চাঞ্চল্যকর গ্রহটি "উষ্ণ নেপচুন মরুভূমিতে" (Hot Neptune Desert) চৌকোভাবে উচ্চ প্রোজ্জ্বলতায় রয়েছে– যেখানে খুব কম সদস্যের একটি গ্রহগোষ্ঠী বিদ্যমান । এটি ঐ গোষ্ঠীরই অংশ— বড় এবং উত্তপ্ত, যেগুলো একটি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে পরিভ্রমণ করছে । নেপচুন আকারের অতি-স্বল্প সময়ের গ্রহের (Ultra-short period planets বা USPs) সাম্প্রতিক আবিষ্কারটি আমরা মহাকাশ সম্পর্কে যা জানি এবং গ্রহের গঠন তত্ত্ব ও বিবর্তনের বর্তমান উপলব্ধিকে চ্যালেঞ্জ করে । উন্নত দূরবীক্ষণ যন্ত্র এবং ভবিষ্যতের অধ্যয়ন দ্বারা একটি চরম পরিবেশে উষ্ণ মরুভূমির এ বাসিন্দাদেরকে কিভাবে গঠন করে তা সম্পর্কে আরো বিশদভাবে জানতে হলে নতুন আবিষ্কৃত গ্রহটি বিভিন্ন সূত্রের উৎস হতে পারে । লাল রঙের উষ্ণ নেপচুন TOI-3261b বহিঃসৌর গ্রহটি অবিশ্বাস্য! বৈচিত্র্যময় গ্রহটির আকার এবং গঠন আমাদের সৌরজগতের ঘনতম দৈত্য গ্রহ নেপচুনের মতোই । এটি তার মূল নক্ষত্রের (K- type parent star TOI-3261) খুব কাছাকাছি প্রদক্ষিণ করছে । নক্ষত্র থেকে ০.০১৭১৪ AU দূরত্বে রয়েছে এবং চরম তাপমাত্রার কারণে এখানে জীবনধারণ মোটেই সম্ভব না । যদিও নক্ষত্রটির বাসযোগ্য অঞ্চল হচ্ছে ৩৬৪.২ - ৫২৪.৬ AU । এ নিষ্ক্রিয় প্রধান-ক্রম নক্ষত্রটি Hydrus নক্ষত্রমণ্ডলে ৩০০ পার্সেক (৯৭৮.৫ আলোকবর্ষ) দূরে অবস্থিত । অপার মহাকাশের বিস্ময়কর গ্যাস দানব গ্রহটির কোনো পৃষ্ঠ নেই । এটি এমন একটি গ্রহ যে মাত্র ২১ ঘন্টার মধ্যেই তার নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে । যা পৃথিবী'র এক দিনেরও কম । অর্থাৎ একটি 'বছর’ মাত্র ২১ ঘন্টা দীর্ঘ (০.৮৮৩১৩৩ দিন) । সাধারণত নক্ষত্রের কাছাকাছি গ্রহগুলো তীব্র তাপ এবং বিকিরণের কারণে তাদের বায়ুমণ্ডল হারায় । কিন্তু, TOI-3261b গ্রহটি সব নিয়ম ভঙ্গ করছে । আশ্চর্যের বিষয় যে, গ্রহটি নক্ষত্রের কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও এটি একটি ঘন ও ভারী বায়ুমণ্ডল বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে । এ ধরণের কক্ষপথে থাকা বেশিরভাগ গ্রহই সময়ের সাথে সাথে তাদের হালকা গ্যাসগুলো হারিয়ে ফেলে অনুর্বর হয়ে যায় । তবুও, এমন একটি আঁটসাঁট কক্ষপথের কারণে গ্রহটি স্বতন্ত্রভাবে তার গোষ্ঠীতে নিজের স্থান অর্জন করেছে । এখন পর্যন্ত, শুধুমাত্র ৩টি অতি-স্বল্প সময়ের গাঢ় নীল রঙের উষ্ণ নেপচুন বহিঃসৌর গ্রহগুলো যেমন LTT-9779b, TOI-849b এবং TOI-332b এর সাথে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের TOI-3261b গ্রহটিকে চতুর্থ বস্তু হিসেবে পাওয়া গেছে, যা এ নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করা একমাত্র পরিচিত বহিঃসৌর গ্রহ । অনুমান করা হয় যে, হয়তো গ্রহগুলো টিকে থাকতে পারে এবং সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে বায়ুমণ্ডলকে ধরে রাখতে পারবে । মহাজাগতিক বিস্ময়ের অধিকারী TOI-3261b বহিঃসৌর গ্রহের ব্যাসার্ধ হচ্ছে ৩.৮২ R পৃথিবীর ব্যাসার্ধ, যেখানে বৃহস্পতির ০.৩ R । এটির ভর হচ্ছে ৩০.৩ M পৃথিবীর ভর, যেখানে বৃহস্পতির ০.০৯৫৩ M । ঘনত্ব প্রায় ২৯৯৭ kg/m3 । তাপমাত্রা প্রায় ১৭২২ K (১৪৪৯° C) । দূরত্ব ০.০২ AU । উজ্জ্বলতা ৩.৮ R । ওজন প্রায় ৩০.৩ পৃথিবীর ভর । উষ্ণ নেপচুন গ্রহগুলো বিরল তাই নক্ষত্রের এতো কাছাকাছি ঘন গ্যাসীয় বায়ুমণ্ডলকে ধরে রাখা কঠিন । কোনো একটি নক্ষত্র তার চারপাশের বস্তু বা উপাদানগুলোর উপর এক বিশাল মাধ্যাকর্ষণ শক্তি প্রয়োগ করে, যা নিকটবর্তী গ্রহকে ঘিরে থাকা গ্যাসের স্তরগুলোকে ছিনিয়ে নিতে পারে । TOI-3261b গ্রহের মতো অন্যান্য উষ্ণ নেপচুন গ্রহগুলোও বড় হয়ে থাকে । বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, আবিষ্কৃত গ্রহটি সবসময় এরকম ছিল না । হতে পারে, এটি তার ভর হারানোর আগে অনেক বৃহৎ ছিল । সম্ভবত, বৃহস্পতি গ্রহের মতোই বড় এবং তখন থেকেই তার ভরের একটি বড় অংশ হারিয়েছে । জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, এ নক্ষত্র এবং তার গ্রহ ব্যবস্থাটি (TOI-3261 System) প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন বছরের পুরোনো । গ্রহটি এক বিরাট গ্যাস দৈত্য হিসেবে গঠিত হয়েছিল । এটি সম্ভবত দুটি উপায়ে তার ভর হারিয়েছে যেমন (ক) আলোক বাষ্পীভবন (Photoevaporation): নক্ষত্রের শক্তি গ্রহের বায়ুমণ্ডলকে উত্তপ্ত করে, যার ফলে হালকা গ্যাসের কণাগুলোকে মহাকাশে বিলীন করে দেয় । (খ) জোয়ারের টানে (Tidal stripping): যখন নক্ষত্রের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বা শক্তিশালী মহাকর্ষীয় টান গ্রহ থেকে গ্যাসের স্তরগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দূরে সরিয়ে দেয় । তাপীয় বিবর্তন নকশাগুলো থেকে অনুমান করা হয় যে, TOI-3261b গ্রহের মোট ভরের∼৫% সম্ভবত উদ্বায়ী পদার্থ দিয়ে গঠিত । হয়তো, গ্রহটি তার নক্ষত্র থেকে অনেক দূরে গঠিত হয়েছিল যেখানে এ উভয় প্রভাবই কম তীব্র হবে এবং এটি তার বায়ুমণ্ডলকে ধরে রাখার অনুমতি দিয়েছে । এ গ্রহের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে অবশিষ্ট বায়ুমণ্ডল । সুতরাং, অদূর ভবিষ্যতে বায়ুমণ্ডলীয় বিশ্লেষণ “উত্তপ্ত নেপচুন মরুভূমির" এ বাসিন্দার গঠনের ইতিহাস উন্মোচন করতে সহায়তা করবে । রহস্যময় গ্রহটি নেপচুনের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ঘন । এর বায়ুমণ্ডলের হালকা অংশগুলো সময়ের সাথে সাথে দূরে সরে গিয়েছে, শুধুমাত্র ভারী উপাদানগুলোকে রেখে গিয়েছে । গ্রহটি অবশ্যই তার বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন ধরণের উপাদান নিয়ে শুরু করেছে— তবে এ পর্যায়ে ঠিক কি, তা বলা কঠিন । আজ অবধি আবিষ্কৃত অতি-উষ্ণ নেপচুন বহিঃসৌর গ্রহগুলোর মধ্যে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভর ভগ্নাংশের কারণে বায়ুমণ্ডলীয় অনুপ্রেরিত পর্যবেক্ষণের জন্য এ গ্রহকে একটি 'আদর্শ প্রার্থী’ করে তুলেছে । তাই, গ্রহটিকে অবলোহিত আলোতে আরো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এ রহস্যের সমাধান করা যেতে পারে । নতুন আবিষ্কারটি চরম পরিবেশে গ্রহ অধ্যয়নের জন্য দরজা খুলে দিয়েছে । নাসা'র জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মতো উন্নত দূরবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে এ গ্রহের বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন অণু সনাক্তকরণের জন্য এটি একটি শ্রেষ্ঠ উপায় হতে পারে । ফলে, মহাকাশ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদেরকে TOI-3261b গ্রহের অতীত বুঝতেই শুধু সাহায্য করবে না বরং সকল উষ্ণ ও দৈত্যাকার গ্রহগুলোর পিছনের শারীরিক প্রক্রিয়াগুলো এবং এরা কিভাবে কঠোরতম পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেয় বা বেঁচে থাকে সেটি উন্মোচন করতে শুরু করবে ৷ উল্লেখ্য যে, ২০২০ খ্রিস্টাব্দে অতি-স্বল্প সময়ের উষ্ণ নেপচুন বহিঃসৌর গ্রহ LTT-9779b (Cuancoa) প্রথম আবিষ্কার হয়, যেটি একটি জি-টাইপ নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে । গ্রহটি তার নক্ষত্রকে ঘিরে একটি কক্ষপথ সম্পন্ন করতে ০.৮ দিন সময় নেয় এবং নক্ষত্র থেকে প্রায় ০.০১৬৭৯ AU দূরত্বে রয়েছে । পরবর্তীতে TESS পর্যবেক্ষণ যন্ত্র দ্বারা TOI-849b এবং TOI-332b বহিঃসৌর গ্রহ দুটি আবিষ্কৃত হয় । এদের মধ্যে TOI-849b লেট জি-টাইপ নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে যেটি একটি Candidate Chthonian গ্রহ, পৃথিবী থেকে ৭০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত । অপরদিকে, TOI- 332b গ্রহটি জি-টাইপ নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করছে । এটি তার নক্ষত্রকে ঘিরে একটি কক্ষপথ সম্পূর্ণ করতে ০.৮ দিন সময় নেয় এবং নক্ষত্র থেকে ০.০১৫৯ AU দূরত্বে রয়েছে । ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে এ গ্রহটি আবিষ্কৃত হয় । যাই হোক, LTT-9779b এবং TOI-849b উভয় গ্রহই জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের অবলোহিত পর্যবেক্ষণের জন্য সারিতে রয়েছে, যা আগামী বছরগুলোতে এ গ্রহগুলোর বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে আমাদের বোঝার সম্ভাবনাকে প্রসারিত করবে ৷
উৎস: www.sci.news , www.science.nasa.gov , www.arxiv.org , www.stellarcatalog.com , www.m.economictimes.com
ছবি: NASA/JPL-Caltech/K. Miller, Caltech & IPAC
