Sunday, 5 May 2024

জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের দৈত্য ছায়াপথ আবিষ্কার


এ বিশাল মহাবিশ্ব অনেক গোপনীয়তা ধারণ করে । উপবৃত্তাকার বা বৃত্তাকার দানবীয় ছায়াপথগুলো সময়ের সাথে সাথে তাদের রূপ পরিবর্তন করে । এরা কখনো বেশ দৈত্যাকার, শান্ত এবং কিছু ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে রূপ ধারণ করে । ইয়েল ইউনিভার্সিটির Pieter van Dokkum এর নেতৃত্বে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি দল এ ধরনের একটি নতুন ছায়াপথ সনাক্তকরণের বিবরণ প্রকাশ করেছে । যেখানে বস্তুটিকে NASA এর জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের Near Infrared Camera (NIRCam) দিয়ে ১ মিলিয়ন পর্যন্ত ছায়াপথের চলমান JWST COSMOS-Web এর প্রশস্ত ও গভীর সমীক্ষার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর বৃহত্তম, সবচেয়ে জটিল এবং শক্তিশালী James Webb Space Telescope (JWST) ব্যবহার করে এ নতুন ছায়াপথ JWST-ER1g আবিষ্কারের কথা জানিয়েছেন । গত ১৪ই সেপ্টেম্বর ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে arXiv preprint server এর মাধ্যমে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে । অতি প্রাচীন এ বৃহৎ ছায়াপথটি তৈরি হয়েছিল যখন মহাবিশ্ব তার বর্তমান বয়সের মাত্র এক চতুর্থাংশ ছিল । নতুন আবিষ্কৃত ছায়াপথটি হচ্ছে বৃহদাকার, নিচ্ছিদ্র এবং শান্ত । অসীম বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে জন্ম নেয়া এমন বৃহদায়তন ছায়াপথগুলো তাদের জীবদ্দশায় শুরুতেই নতুন নক্ষত্র গঠন বন্ধ করে দেয়, তারা উপবৃত্তাকার দানব ছায়াপথের অনুমানযোগ্য পূর্বপুরুষ । মহাজাগতিক এ বস্তুগুলো পরবর্তীতে নক্ষত্র গঠন করে এবং তাদের নাক্ষত্রিক ভরগুলোকে আরো দ্রুত একত্রিত করেছিল । উত্তেজনাপূর্ণ অনুসন্ধানে দেখা যায়, নতুন পাওয়া ছায়াপথটিকে আলাদা করে তুলেছে এক অসাধারণ বৈশিষ্ট্য উপস্থিতির কারণে । যেখানে রয়েছে রহস্যময়, আকর্ষণীয় এবং সম্পূর্ণ বৃত্তাকার একটি আইনস্টাইন বলয় (Einstein Ring) । যেটি JWST-ER1r নামে পরিচিত । এটি হচ্ছে এক ধরণের মহাজাগতিক আলোক বলয় । আবিষ্কৃত ছায়াপথটি একটি অক্ষিকাচ (Lens) হিসেবে কাজ করে এবং দূরবর্তী উৎস থেকে আলোকে বাঁকিয়ে দেয়, যা পরবর্তীতে একটি বলয় হিসেবে উপস্থিত হয় । এ ঘটনাকে শক্তিশালী মহাকর্ষীয় লেন্সিং (Gravitational lensing) বলা হয় । আলবার্ট আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রকাশের পূর্বে একটি মহাকর্ষীয় বস্তু দ্বারা আলোর অবনমনের ভবিষ্যদ্বাণী করেন । আইনস্টাইন বলয় ব্যাসার্ধের মধ্যে আবদ্ধ মোট ভর হচ্ছে নাক্ষত্রিক এবং অদৃশ্য পদার্থের উপাদান । মহাকর্ষীয় লেন্সিং প্রভাবের কারণে আলো একটি বলয় আকারে বেঁকে গিয়ে ঘটনাটি ঘটায় । এ ছায়াপথে একটি সুস্পষ্ট লাল কেন্দ্র ও একটি নীল চাকতি রয়েছে । চাকতির অংশগুলোই বলয় তৈরি করে । বলয় কেন্দ্রের ব্যাস প্রায় ১.৫৪ আর্কসেকেন্ডে বিস্তৃত । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন যে এটি একটি পটভূমি ছায়াপথ দ্বারা বলয়টি ২.৯৮ এর একটি Photometric redshift এ তৈরি হয়েছে । সমীক্ষায় আরো দেখা গেছে যে ছায়াপথের প্রায় নিখুঁত বৃত্তাকার আকৃতি রয়েছে এবং NIRCam imaging এ কোনো সুস্পষ্ট তারকা-গঠনকারী অঞ্চল, জোয়ার বা স্রোতের লেজ ও অন্যান্য অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়নি । পৃথিবী থেকে প্রায় ১৭ বিলিয়ন আলোকবর্ষেরও বেশি দূরে JWST-ER1g ছায়াপথ অবস্থিত । ধারণা করা হয়, বিস্ময়কর এ নতুন ছায়াপথটির বয়স প্রায় ১.৯ বিলিয়ন বছর এবং এটি প্রতি বছর আমাদের সূর্যের ভরের স্তরে প্রায় চারগুণ মাঝারি গতিতে নতুন তারকা গঠন করে । ছায়াপথের লাল স্থানান্তর (Redshift) হচ্ছে ১.৯৪, ব্যাসার্ধ প্রায় ২১৫০০ আলোকবর্ষ প্রশস্ত একটি অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত এবং ভর প্রায় ৬৫০ বিলিয়ন সৌর ভর যা এটিকে তার আকারের জন্য অদ্ভুতভাবে ঘন একটি ছায়াপথ করে তুলেছে । আদি মহাবিশ্বের গতিশীল এ দৈত্য ছায়াপথের একটি নতুন বিশ্লেষণ পরামর্শ দেয় যে, গুপ্ত বা অদৃশ্য বা অন্ধকার পদার্থ (Dark Matter) নিজের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে । অন্ধকার পদার্থ হচ্ছে পদার্থের একটি কাল্পনিক রূপ যা আলো বা তড়িচ্চুম্বকীয় ক্ষেত্রের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে না বলে মনে হয় । এটি মহাকর্ষীয় প্রভাব দ্বারা আবদ্ধ । ছায়াপথটি মহাবিস্ফোরণের (Big Bang) মাত্র ৩.৪ বিলিয়ন বছর পরে গঠিত হয়েছিল ৷ যার ফলে অদৃশ্য পদার্থ সম্পর্কে জানার একটি দুর্দান্ত সুযোগ এনে দিয়েছে । মোট অনুমানকৃত ভর থেকে দৃশ্যমান নাক্ষত্রিক ভরকে বিয়োগ করে পরিমাপ করা হয় একটি ছায়াপথে কতটুকু অদৃশ্য পদার্থ । পদার্থবিদরা নিশ্চিত যে, একটি অদৃশ্য পদার্থ যা আমাদের মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থের শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ তৈরি করে বলে মনে করা হয় । অদৃশ্য পদার্থের Halo যা নতুন ছায়াপথটিকে ঘিরে থাকে । কয়েক দশকের পর্যবেক্ষণ এবং পরিস্থিতিগত প্রমাণের স্তুপ সত্ত্বেও, অদৃশ্য পদার্থটি এখনো সরাসরি পরীক্ষাগারে সনাক্ত করা যায়নি । এ ছায়াপথ আবিষ্কার দলটি নির্ধারণ করেছে যে অদৃশ্য পদার্থ প্রায় অর্ধেক ভরের ব্যবধানকে ব্যাখ্যা করে এবং লেন্সিং ফলাফল ব্যাখ্যা করার জন্য অতিরিক্ত ভরের প্রয়োজন বলে মনে হয় । ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যার অধ্যাপক এবং নতুন গবেষণার সহ-লেখক Hai-Bo Yu এক বিবৃতিতে বলেছেন: 'আমরা যদি মোট ভর থেকে নাক্ষত্রিক ভরকে বিয়োগ করি, তাহলে আমরা আইনস্টাইন ব্যাসার্ধের মধ্যে অদৃশ্য পদার্থের ভর পাই । অদৃশ্য পদার্থ ভরের মান প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বলে মনে হচ্ছে । এটি বিস্ময়কর! তিনি এবং তার সহকর্মীরা পরামর্শ দিয়েছেন যে, নতুন এ ছায়াপথের অস্বাভাবিক উচ্চ ঘনত্ব বর্তমানে চিন্তার চেয়ে বেশি নক্ষত্র জনসংখ্যা দ্বারা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে ।' একটি অদৃশ্য পদার্থ Halo হচ্ছে অদৃশ্য পদার্থের Halo যা JWST-ER1g ছায়াপথের মতো একটি ছায়াপথকে ঘিরে থাকে । একটি সংকোচন প্রক্রিয়া যার দ্বারা সাধারণ পদার্থের উপাদানগুলো গ্যাস এবং নক্ষত্র তৈরি করে JWST-ER1g ছায়াপথের অদৃশ্য পদার্থের Halo তে ধসে পড়ে ও ঘনীভূত হয়ে মোড়ক বাঁধাই করতে পারে, যার ফলে উচ্চ ঘনত্বের দিকে পরিচালিত হয় । ছায়াপথের কেন্দ্রে সবচেয়ে ঘন অদৃশ্য পদার্থের Halo হচ্ছে মহাকর্ষীয় আঠা যা ঘূর্ণায়মান ছায়াপথগুলোকে উড়তে বাধা দেয় । আমরা এখনো পরিপূর্ণভাবে জানি না, অদৃশ্য পদার্থ আসলে কি? তবে, পর্যবেক্ষণমূলক সূত্র থেকে জানা যায় এটি একটি নতুন ধরনের কণা যার উপস্থিতি শুধুমাত্র সাধারণ পদার্থের সাথে এর মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়া থেকে অনুমান করা যেতে পারে । অদৃশ্য পদার্থ হতে পারে শুধুমাত্র এক ধরনের কণা বা স্বাভাবিক পদার্থের মতো বিভিন্ন ধরনের জটিল বৈচিত্র্য, যা সম্ভবত অদৃশ্য পদার্থের সাথে এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত অজানা শক্তিগুলোর উপস্থিতিতে একচেটিয়া কাজ করে । অধ্যাপক Hai-Bo Yu গত ডিসেম্বর ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে স্ব-মিথস্ক্রিয়া অদৃশ্য পদার্থকে (Self-interacting dark matter) অন্তর্ভুক্ত করে কাঠামো গঠনের আদিখ্যেতার (Simulation) নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে, এ ধরনের স্ব-মিথস্ক্রিয়া নির্দিষ্ট ছায়াপথগুলোতে অত্যন্ত ঘন অদৃশ্য পদার্থের Halo গুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারে । পাশাপাশি অন্যদের মধ্যে বিস্ময়করভাবে কম ঘনত্ব যে, দুটিই প্রচলিত 'ঠান্ডা অদৃশ্য পদার্থ' তত্ত্ব দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না । তিনি বলেন: মহাবিশ্বের প্রথম দিকের ছায়াপথগুলোর আসন্ন অনুসন্ধান থেকে ঐ অদৃশ্য পদার্থের কণা এবং তাদের আচরণ সম্পর্কে এক আশ্চর্যজনক সূত্র প্রকাশ করতে পারে । NASA এর জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি (JWST) মহাবিশ্ব যখন তরুণ ছিল সে সময় গঠিত প্রাচীন ছায়াপথগুলোকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য আমাদেরকে একটি অভূতপূর্ব সুযোগ প্রদান করে । পদার্থবিদরা আশা করেন যে, জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি অদৃশ্য পদার্থের উপর আরো বেশি আলোকপাত করতে পারে । কারণ, এ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের দুর্লভ অবলোহিত চোখ অন্য যে কোনো দূরবীক্ষণ যন্ত্রের চেয়ে সময়ের সাথে আরো জটিল দৃষ্টিপাত করে থাকে । হয়তো, আগামীতে আমরা এ দূরবীক্ষণ যন্ত্র থেকে আরো চমক দেখতে পাবো এবং শীঘ্রই অদৃশ্য পদার্থ সম্পর্কে আরো বিশদ জানতে পারবো । গবেষণা দলটি JWST-ER1g ছায়াপথের ভবিষ্যৎ পর্যবেক্ষণের জন্য অপেক্ষা করছে । এ শক্তিশালী লেন্সিং বস্তু বা ছায়াপথটি অনন্য কারণ এখানে একটি নিখুঁত আইনস্টাইন বলয় রয়েছে যেখান থেকে আমরা আইনস্টাইন ব্যাসার্ধের মধ্যে মোট ভর সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পেতে পারি । এছাড়া কাছাকাছি কোনো ছায়াপথ বা দৃষ্টি রেখা বরাবর কাঠামোগুলো এ ছায়াপথের ভরকে প্রভাবিত করছে কি-না, এ ছায়াপথটি একটি স্তবকের পূর্বপুরুষের কেন্দ্রীয় ছায়াপথ কি-না, এটি ক্রমবর্ধমান Galactic Cluster এর বিকাশে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে কি-না এবং অদৃশ্য পদার্থের বৈশিষ্ট্যগুলো পরীক্ষা করার জন্য এটি হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ । এমনকি, ছায়াপথগুলো কিভাবে পরিবর্তিত হয় এবং বিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ উৎসকে বোঝার উন্নতির চাবিকাঠি হতে পারে । নতুন গবেষণাটি গত ১১ই এপ্রিল ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে The Astrophysical Journal Letters এ প্রকাশিত হয় । গবেষণাটি John Templeton Foundation এবং The U.S. Department of Energy দ্বারা সমর্থিত ছিল । 
তথ্যসূত্র: www.space.com, www.phys.org, www.sciencedaily.com 
 
ছবি: www.greekreporter.com 
Credit: NASA’s Marshall Space Flight Center / Flickr / CC BY-NC 2.0

No comments:

Post a Comment

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...