https://solarsystem.nasa.gov/
NASA, ESA, JPL, SSI, Cassini Imaging Team
বৃহস্পতি গ্রহের পরই সৌরজগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রহ হচ্ছে শনি । শনি গ্রহের নাম হয়েছে হিন্দু গ্রহদেবতা শনির নামানুসারে । রোমান ধনসম্পদ ও কৃষিদেবতা স্যাটার্ন এর নাম থেকে ইংরেজি Saturn শব্দটি এসেছে । সূর্য থেকে ষষ্ঠ গ্রহটিকে নিয়ে এখনো অনেক রহস্য ধারণ করে । বরফ বলয়গুলোর চকচকে তন্ত্রের সাথে গ্রহটি প্রাচীনকাল থেকেই মুগ্ধতার বিষয় হয়ে উঠেছে । সূর্য থেকে এর গড় দূরত্ব প্রায় ৮৮৬ মিলিয়ন মাইল (১.৪ বিলিয়ন কিলোমিটার) । শনি গ্রহ ২৯.৫ পৃথিবী বছরে একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে । ধারণা করা হয়, শনির বৈচিত্র্যময় ১৪৬টি চাঁদ বা উপগ্রহ রয়েছে কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তাদের মধ্য থেকে ৮৩টি চাঁদ আবিষ্কার করেছেন । শনি গ্রহের ব্যাস প্রায় ৭২৩৬৭ মাইল (১১৬৪৬০ কিলোমিটার), যা পৃথিবীর ব্যাসের প্রায় ৯.৫ গুণ । এটি পৃথিবীর তুলনায় ৯৫ গুণ বেশি ভারী । শনি গ্রহের কেন্দ্রস্থল লোহা, নিকেল ও পাথর (সিলিকন ও অক্সিজেন যৌগ) দ্বারা গঠিত। এ কেন্দ্রস্থলটিকে ঘিরে রয়েছে ধাতব ও তরল হাইড্রোজেন, তরল হিলিয়াম এবং গ্যাসীয় স্তর । ধাতব হাইড্রোজেনে প্রবহমান তড়িৎ প্রবাহটিকে শনি গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্রের উৎস মনে করা হয় । দূর থেকে শনিকে অত্যাশ্চর্য বলয়সহ একটি নির্মল গ্যাস দৈত্যের মতো দেখায়, যা তার কক্ষপথে সামান্য বা কোনো ঝামেলা ছাড়াই ঘুরছে । শনি গ্রহের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর আকর্ষণীয় বলয় ব্যবস্থা (Ring system)। মহাজাগতিক এক বিমূর্ত চিত্র । ইতালীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী, পদার্থবিদ, পলিম্যাথ এবং প্রকৌশলী গ্যালিলিও গ্যালিলি ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবারের মতো গ্রহের বলয়গুলো দেখেছিলেন । মূলত বরফ কণা দিয়ে গঠিত দৃষ্টিনন্দন এ বলয়গুলোতে অল্প পরিমাণে পাথুরে ভগ্নাবশেষ এবং ধূলিকণা রয়েছে । মেঘের চূড়া ছাড়িয়ে, গ্রহের নজরকাড়া বলয়ের বৃত্তপরিধির অংশগুলো (Arc) উজ্জ্বল নীল রঙের । দীর্ঘদিন চেষ্টার পর নাসা (NASA) এর বিজ্ঞানীরা সৌরজগতের বিশাল গ্রহ শনির চারপাশে ঘূর্ণায়মান বৃহদাকার নতুন একটি বলয়ের সন্ধান পেয়েছেন । শনির বায়ুমণ্ডলে শতকরা ৯৬ ভাগ হাইড্রোজেন, শতকরা ০৩ ভাগ হিলিয়াম এবং সামান্য পরিমাণ মিথেন, অ্যামোনিয়া, জলীয় বাষ্পসহ অন্যান্য উপাদান রয়েছে । বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে অ্যামোনিয়া কেলাসের উপস্থিতির কারণে গ্রহটির রং ফিকে হলুদ । গ্যাস দৈত্যের কোনো শক্ত পৃষ্ঠ নেই । যদিও শনি ঘোরে, এটি পৃথিবীর প্রায় ০১ শতাংশ সূর্যালোক গ্রহণ করে । তাই দিন ও রাতের মধ্যে শক্তি যোগানের পার্থক্য পৃথিবীর তুলনায় অনেক কম তীক্ষ্ণ । বৈচিত্র্যময় গঠনের কারণেই পৃথিবী থেকে এটি ভিন্ন । এর বায়ুমণ্ডলে ঝড়ের আবাসস্থল । শনির বায়ুমণ্ডলের অত্যাশ্চর্য বৈশিষ্ট্য ও সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে শনির উত্তর মেরুতে অবস্থিত ষড়ভুজ আকারের এক বিশাল ঘূর্ণিঝড় । তবে ঝড়টি সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে খুব কমই জানা যায়, কারণ গ্রহটি সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে এক দীর্ঘ সময় নেয় এবং সেই সময়ের জন্য উভয় মেরুকে অন্ধকারে রেখে যায় । এছাড়া শনির মেঘের আড়ালে কিছু দেখতে পাওয়াও খুব কঠিন ব্যাপার কারণ সেখানে সূর্যের আলো খুব বেশি প্রবেশ করে না । শনির কক্ষপথ, ঋতু এবং পৃথিবীর দিকে এর কাত হওয়ার কারণে ছবি তোলা সবসময় সম্ভব নয় । এটির দূরত্ব সরাসরি পর্যবেক্ষণকে কঠিন করে তোলে । যদিও শনি গ্রহটিকে দেখা সম্ভব হতে পারে কারণ এটি আকাশে উজ্জ্বলভাবে জ্বলছে । কখনো কখনো গ্রহটি যখন অন্ধকারের সময় দিগন্তের উপরে থাকে, সৌর অয়নবৃত্ত বা গ্রহণ (Ecliptic) বা তার কাছাকাছি গ্যাস দৈত্য গ্রহটিকে দেখা যায় । যদি শনির উত্তর গোলার্ধটি আমাদের দিকে ঝুঁকে থাকে (এটি প্রতি ১৪ থেকে ১৫ বছরে একবার হয়) এবং ব্যতিক্রমী অন্ধকার আকাশ থাকে তাহলে খুব শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে উত্তর মেরুতে বিশাল ষড়ভুজ ঝড়টি দেখা যাবে । ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে শনি গ্রহে ভয়েজার ১ মহাকাশযান উড়ানের (Voyager 1 spacecraft flyby) সময় প্রথম আবিষ্কৃত হয় যে, একটি অশান্ত ষড়ভুজ আকৃতির ঝড় কমপক্ষে চার দশক ধরে শনির উত্তর মেরুর কাছে আছড়ে পড়ছে । সৌরজগতের অন্য কোথাও কেউ এর মতো কিছু দেখেনি । শনির মেরু ষড়ভুজ ঝড়টি ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে ডেভিড গডফ্রে (David Godfrey) আবিষ্কার করেন ।
শনির ষড়ভুজ ঝড় হচ্ছে শনি গ্রহের উত্তর মেরুতে প্রায় ৭৮ ° (ডিগ্রি) উত্তর অক্ষাংশে অবস্থিত একটি অবিরাম প্রায় ষড়ভুজ মেঘের নমুনা বা কারুকার্যের নকশা (Pattern) । মেঘের গভীরে বিখ্যাত ষড়ভুজের উষ্ণতা, উচ্চ-উচ্চতার ঘূর্ণি সত্যিই বিস্ময়কর । প্রতি ঘন্টায় প্রায় ৩০০ মাইল (৫০০ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা) বেগে পূর্ব দিকে চলাচলকারী বায়ুমণ্ডলীয় গ্যাস দ্বারা তৈরি একটি ফিনকি জলপ্রবাহ বা স্রোত (Jet stream) যেটি ষড়ভুজ তৈরি করে তা একটি প্রতিবন্ধক বা আত্মরক্ষামূলক বেড়ার (Barrier) মতো কাজ করে বলে মনে হয়, যার ফলে অ্যান্টার্কটিকের " ওজোন গর্ত " (Ozone hole) এর মতো কিছু হয় । উত্তর মেরু ঘূর্ণিঝড়টি (NPV) প্রায় সমান দৈর্ঘ্যের ছয়টি সুনির্দিষ্ট দিক বা বাহু বা পার্শ্ব যুক্ত আকারে ভাঁজ করে কারণ ষড়ভুজ হচ্ছে একটি স্থির তরঙ্গ যা ফিনকি জলপ্রবাহ বা স্রোতে গ্যাসের পথ নির্দেশ করে । ষড়ভুজ ঝড়ের বাহুগুলো প্রায় ১৪৫০০ কিঃমিঃ (৯০০০ মাইল) দীর্ঘ, যা পৃথিবীর ব্যাসের চেয়ে প্রায় ২০০০ কিঃমিঃ (১২০০ মাইল) বেশি । ষড়ভুজটি প্রায় ৩০০০০ কিঃমিঃ (২০০০০ মাইল) জুড়ে বিস্তৃত এবং ৩০০ কিঃমিঃ (১৯০ মাইল) উচ্চ । এটি ১০ ঘন্টা ৩৯ মিনিট ২৪ সেকেন্ড সময়ে একবার আবর্তিত হয়, যা শনির অভ্যন্তর থেকে বেতার নির্গমনের (Radio emission) একই সময়কাল । ষড়ভুজটি প্রথম শ্রেণীর বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘূর্ণি কাঠামো (Classic vortex structure) । এটির ফিনকি জলপ্রবাহ বা স্রোত শুধুমাত্র উত্তরে, দক্ষিণে নয় । ষড়ভুজের ভিতরে চারটি পৃথিবী মানানসই হতে পারে । দৃশ্যমান বায়ুমণ্ডলে অন্যান্য মেঘের মতো ষড়ভুজ ঝড় দ্রাঘিমাংশ বরাবর পরিবর্তিত হয় না । রাক্ষস ষড়ভুজ ঝড়ের বিশাল কাঠামোর কেন্দ্রে একটি মন্থন ঝড় রয়েছে । বিজ্ঞানীরা এ ষড়ভুজ ঝড়ের মধ্যে থাকা বিভিন্ন ধরণের মেঘের কাঠামোর গতি দেখতে পান । উত্তর মেরুতে শক্তভাবে কেন্দ্রীভূত এ বিশাল প্রবল বাত্যাটি (Hurricane) পৃথিবীর গড় প্রবল বাত্যা চোখের চেয়ে প্রায় ৫০ গুণ বড় একটি চোখ । অসংখ্য ছোট ঘূর্ণিও উপস্থিত রয়েছে, যা লালচে ডিম্বাকৃতি । এর মধ্যে কিছু ঘূর্ণি ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরে যখন ষড়ভুজীয় প্রবল বাত্যা (Hexagonand hurricane) ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘোরে । এ ছোট বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে কয়েকটি ষড়ভুজের ফিনকি জলপ্রবাহ বা স্রোত প্রবাহিত হয়, যেন একটি ঘোড়দৌড়ের মাঠের উপর । এ ঘূর্ণিগুলোর মধ্যে ষড়ভুজের নিচে ডানদিকের কোণে সবচেয়ে দানবাকৃতি সাদা প্রচণ্ড ঝড়টি দ্য গ্রেট হোয়াইট স্পট (The Great White Spot) প্রায় ২২০০ মাইল (৩৫০০ কিলোমিটার) বিস্তৃত, যা পৃথিবীর বৃহত্তম প্রবল বাত্যার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ । এটি বায়ুর ভয়ঙ্কর ঘূর্ণন তাপমাত্রাকে স্বাভাবিকের চেয়ে ৮৩ কেলভিন বাড়িয়ে তোলে, যা আগে কখনোই কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডলে দেখা যায়নি । ষড়ভুজ ঝড়ের বিন্দুগুলো তার কেন্দ্রের চারপাশে প্রায় ঠিক একই হারে ঘোরে, যা শনি তার অক্ষের উপর ঘোরে । কয়েক শতক ধরে এ ঝড় শনি গ্রহে তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে ।
একদিকে এটি গ্যাস দৈত্য শনি গ্রহের বায়ুমণ্ডলে অগভীর, পর্যায়ক্রমে গ্যাস ফিনকি থেকে শত শত কিলোমিটার গভীরে গঠিত হতে পারে যেখানে প্রায় ১০ বার (Bar) বা তার চেয়ে বেশি চাপ থাকে এবং যেখানে গ্যাস বেশি উত্তাল । অন্যদিকে হাজার হাজার কিলোমিটার নিচে প্রসারিত গভীর বলয়িত ফিনকি (Deep zonal jet) থেকে এসে এটি আরো গভীরভাবে প্রোথিত হতে পারে, যেখানে চাপ কয়েক হাজার গুণ বেশি এবং গ্রহের ঘূর্ণন ও ভূ-সংস্থান একটি উন্মাদনা তৈরি করতে পারে । কারণ এর মেজাজ অনেক বেশি অস্থির । এর অর্থ হচ্ছে গ্রহের ঘূর্ণন এবং সম্ভবত এর অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলো এমন একটি জায়গায় ঝড়ের উদ্রেক করছে যেখানে শনির গভীর বলয়িত ফিনকিগুলো উচ্চতায় তাদের শক্তি ধরে রাখে এবং চাপ উপরের স্তরের তুলনায় আশ্চর্যজনক ১০০০০০ বার (Bar) বা তার চেয়েও বেশি । এ অদ্ভুত ষড়ভুজ ঘূর্ণিগুলো গভীর এবং আরো স্থিতিশীল । শনির ষড়ভুজ তৈরি হয়েছে গভীর তাপীয় পরিচলনের কারণে । যখন শনির গভীরে গ্যাস উত্তপ্ত হয় এবং তারপর আরো বাইরে চলে যায়, তখন এটি তার সাথে সমস্ত তাপ শক্তি নিয়ে যায় । উপরের গ্যাসের স্তরগুলোকে প্রসারিত করতে, ঘনত্ব হারাতে এবং বৃদ্ধি পেতে বাধ্য করে । এটিই পরিচলন । পরিচলন একই শক্তি যা পৃথিবীতে ঘূর্ণিবাত বা ঘূর্ণিঝড় (Tornado) এবং প্রবল বাত্যা (Hurricane) সৃষ্টি করে । এটি ঘটে যখন তাপ গ্রহের মধ্যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করে, ফিনকি জলপ্রবাহ বা স্রোতগুলোকে জাগরিত করে ছেড়ে যায় । এ ফিনকি জলপ্রবাহ বা স্রোতগুলো সংখ্যায় অনেক এবং যখন তারা শনির বায়ুমণ্ডলের শীর্ষে মিশে যায়, তখন তারা বিভিন্ন আকার তৈরি করে । এটি একটি পূর্বমুখী বলয়িত ফিনকির সাথে যুক্ত এবং শনির মতো একই সময়ে ঘোরে । গঠনটি শনির বায়ুমণ্ডলের প্রায় ২০০ মাইল গভীরে । যদিও গবেষকরা পুরোপুরি নিশ্চিত নন যে, ফিনকি জলপ্রবাহ বা স্রোতগুলো ঠিক কিভাবে ষড়ভুজ আকার তৈরি করে । হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ষড়ভুজের উৎপত্তি সম্পর্কে মনে করেন যে, একটি ঘূর্ণায়মান গোলাকার খোলকে গভীর অশান্ত পরিচলনের ক্ষেত্রে কি ঘটে তা অনুসরণ করা । কেন শনির বিশাল রহস্যময় ষড়ভুজ বিদ্যমান এখন মনে হয় তাদের কাছে এর একটি যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা আছে । ত্রিমাত্রিক নমুনায় (3D model) দেখা যায় যে, গ্রহে যখন পরিচলন ঘটে তখন হিংস্রভাবে অশান্ত সংকোচনযোগ্য গ্যাস শনি গ্রহের বাইরের স্তরে গভীর তাপীয় পরিচলন স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিশাল মেরু ঘূর্ণিঝড়ের জন্ম দিতে পারে এবং পর্যায়ক্রমে ভয়াবহ বলায়কার প্রবাহ একটি পূর্বমুখী ফিনকির নমুনা ( Jet pattern) সৃষ্টি করতে পারে । এ বলয়কিত ফিনকিগুলো গুণগত এবং পরিমাণগতভাবে শনি গ্রহে যা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে ঠিক তার মতোই । ভান বা আদিখেত্যা (Simulation) বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় যে প্রাকৃতিক চেহারার ঘূর্ণিঝড়টি ঘটে যখন শনির গভীরে বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহ অনেক বড় এবং ছোট ঘূর্ণিঝড় তৈরি করে, যা গ্রহের উত্তর মেরুর কাছে পূর্ব দিকে প্রবাহিত একটি বৃহত্তর অনুভূমিক ফিনকি প্রবাহকে ঘিরে থাকে যার মধ্যে অনেক ঝড়ও রয়েছে । এর মধ্যে ছোট ঝড়গুলো বৃহত্তর তন্ত্রের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে ও দৈত্যাকার ঘূর্ণি আকারে স্ব-সংগঠিত হয়ে আলোড়নপূর্ণ বা অশান্ত পূর্বমুখী ফিনকিকে চিমটি দেয় এবং এটিকে গ্রহের শীর্ষে সীমাবদ্ধ করে । এ চিমটি প্রক্রিয়াই প্রবাহকে একটি ভয়ঙ্কর ষড়ভুজ ঝড়ের সূত্রপাত করে । কিংবা বহুভুজ কাঠামো তৈরি করে যা শনি গ্রহে দেখা যায় । গবেষকরা যুক্তি দিয়েছেন যে, শনির ষড়ভুজ প্রবাহের ধরণকে উত্তেজনাপূর্ণ করার জন্য অনুরূপ প্রক্রিয়া দায়ী । তাদের নমুনাটি শনির বায়ুমণ্ডলের প্রতিটি দিককে বন্দি বা নিয়ন্ত্রণে আনে না, এটি শুধুমাত্র গ্রহের ব্যাসার্ধের বাইরের দশমাংশকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং তাদের মেরু ফিনকিগুলো ষড়ভুজের পরিবর্তে ত্রিভুজ গঠন করতে থাকে । তারা আত্মবিশ্বাসী যে, এ সরলীকৃত পরিস্থিতি শনি গ্রহে দেখা কিছু বৈশিষ্ট্য খুঁজে বের করতে সাহায্য করবে । উত্তর মেরুকে কেন্দ্র করে একটি বৃহৎ ঘূর্ণিঝড় উঠেছিল, যখন বেশ কয়েকটি ছোট ঘূর্ণিঝড় বিষুব রেখা বা নিরক্ষরেখার সামান্য উত্তরে একটি শক্তিশালী পূর্বমুখী ফিনকিতে যোগ দেয় । যদিও এ কেন্দ্রীয় ঘূর্ণিঝড়টি ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি গ্যাসের অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল । আশেপাশের ঘূর্ণিগুলো অগভীর স্তরে এ সমস্ত অস্থিরতার দ্বারা মুখোশিত বা মুখোশযুক্ত ছিল, যা তাদের ঘূর্ণিবাতের চেয়ে বহুভুজ ফিনকির মতো দেখায় । গবেষকরা লিখেছেন, শনি গ্রহের জন্য অনুরূপ দৃশ্য কল্পনা করা যেতে পারে যেখানে ফিনকির ষড়ভুজ আকারটি সংলগ্ন ছয়টি বড় ঘূর্ণি দ্বারা টিকে থাকে, যা অগভীর স্তরগুলোতে আরো বিশৃঙ্খল পরিচলন দ্বারা লুকিয়ে থাকে । এ কারণেই কিছু অন্যান্য নমুনা হতে পারে এবং পর্যবেক্ষণগুলো শনির ষড়ভুজের কিছু এলাকায় একটি অগভীর ফিনকির উপস্থিতি নির্দেশ করে, যখন প্রকৃতপক্ষে সত্য মিথ্যা অনেক নিচে । কিন্তু এটি ধারণার একটি প্রমাণ মাত্র এবং এ নমুনাটির বাস্তবতাকে আরো ভালোভাবে প্রতিফলিত করতে আমাদের শনি গ্রহ থেকে আরো অনেক বেশি বায়ুমণ্ডলীয় তথ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে । তবুও, মনে হচ্ছে আমরা হয়তো সঠিক পথেই আছি । পৃথিবীতে নিয়মিত ঝড় দেখি এবং সেগুলো সর্বদা সর্পিল হয়, কখনো কখনো বৃত্তাকার । তবে কখনোই ষড়ভুজ রেখাংশ বা প্রান্তসহ বহুভুজ হয় না । এটি সত্যিই আকর্ষণীয় এবং সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত । কিন্তু শনি গ্রহ নিয়ে প্রশ্ন হচ্ছে কিভাবে এতো বড় তন্ত্র (System) তৈরি হয়েছে এবং কিভাবে এতো বড় তন্ত্র এ বৃহৎ গ্রহে অপরিবর্তিত থাকতে পারে? পৃথিবীতে একটি প্রবল বাত্যার স্থায়িত্বকাল হতে পারে প্রায় এক সপ্তাহ বা আরো কয়েক দিন । কিন্তু এ ঝড় কয়েক দশক এমনকি শতক ধরে এখানে বিদ্যমান রয়েছে তা কেউই বলতে পারে না । ষড়ভুজ ঝড়টির মতো প্রবল বাত্যা আর কোনো জগতে বা চাঁদে কখনো দেখা যায়নি ।
NASA এর Pioneer 11 robotic space probe শনি গ্রহে উড়ে যাওয়া প্রথম মহাকাশযান । ভয়েজার ১ এবং ২ মহাকাশযানসহ বেশ কয়েকটি মহাকাশযান শনিকে অন্বেষণ করে । নাসা (NASA) এর ক্যাসিনি মহাকাশযানটি (The Cassini orbiter) ২০০৪ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে যখন প্রথম শনি গ্রহে পৌঁছেছিল তখন উত্তর মেরুতে শীতকাল ও অন্ধকার এবং দক্ষিণ গোলার্ধ গ্রীষ্মকাল ছিল । এটি গ্রহ এবং এর বলয়গুলোর প্রথম কাছাকাছি চিত্রগুলো সরবরাহ করে । আলোর দৃশ্যমান তরঙ্গদৈর্ঘ্যে ষড়ভুজ দেখতে বিজ্ঞানীদের আরো কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল কারণ শনির ঋতু পৃথিবীর তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী হয় । এছাড়া যখন শনির উত্তর মেরুতে সূর্য উঠে তখনো মেঘগুলো এতো ঘন যে আলো গ্রহের গভীরে প্রবেশ করে না । তাই সূর্য সত্যিই শুধুমাত্র ষড়ভুজের সমগ্র অভ্যন্তর আলোকিত করতে শুরু করে যখন উত্তরে বসন্তের শুরু হয় ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে যখন শনি গ্রহে মার্কিন-ইউরোপীয় ক্যাসিনি-হুইজেনস মিশন (Cassini-Huygens mission) দ্বারা পুনরায় পর্যবেক্ষণ শুরু করে । ক্যাসিনি মহাকাশযান Visual and Infrared Mapping Spectrometer (VIMS) যন্ত্র ব্যবহার করে ষড়ভুজ পর্যবেক্ষণ করে । ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে সূর্যের আলোতে প্রবেশ না করা পর্যন্ত এবং আগস্টে উত্তরে বসন্তের সূচনাকালে ক্যাসিনি মহাকাশযান Imaging Science Subystem (ISS) যন্ত্র দিয়ে ষড়ভুজের চিত্রগুলো ধারণ করতে সক্ষম হয় । ২০১২ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে শনি গ্রহের সুদূর উত্তর মেরুতে প্রথম সূর্যালোক দৃশ্যগুলো Composite Infrared Spectrometer (CIRS) ধারণ করে যখন ক্যাসিনি মহাকাশযানটি গ্রহের সবচেয়ে কাছে ছিল । ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে ষড়ভুজের পুরো অভ্যন্তরটি নীল দেখায় । শনির ঋতু পরিবর্তন এবং ক্যাসিনি মহাকাশযানের কক্ষপথ পরিবর্তনের কারণে সম্প্রতি ষড়ভুজ ঝড়টির তরঙ্গদৈর্ঘ্য, অতিবেগুনী ও অবলোহিত উচ্চ-নির্ণয়কর (High resolution) চিত্র ধারণ করা সম্ভব হয়েছে । ক্যাসিনি মহাকাশযানের প্রশস্ত-ত্রিকোণী ক্যামেরা দিয়ে বলয়যুক্ত শনি গ্রহের উত্তর মেরুতে ষড়ভুজের অনন্য ছয় বাহুযুক্ত ফিনকি জলপ্রবাহ বা স্রোতের উচ্চ-নির্ণয়কর মেকী-রঙের অত্যাশ্চর্য চিত্র নথিভুক্ত করেছে । কাছাকাছি অবলোহিত যৌগিক চিত্রের তথ্যে নিচু মেঘের জন্য লাল এবং উঁচু মেঘের জন্য সবুজ রঙ দেখা যায়, যা শনীয় মেঘ দৃশ্যকে (Saturnian cloudscape) একটি প্রাণবন্ত চেহারা দেয় । পরবর্তীতে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ষড়ভুজ অভ্যন্তরের বেশিরভাগ অংশই হলুদাভ কুয়াশায় ঢেকে গিয়েছিল । নীল রঙ থেকে সোনালি রঙে পরিবর্তিত হয়েছিল । শুধুমাত্র মেরু ঘূর্ণির কেন্দ্র নীল রঙ ধরে রেখেছিল । এর জন্য একটি তত্ত্ব হচ্ছে যে, ঋতু পরিবর্তনের কারণে মেরুটি সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মির সংস্পর্শে আসায় সূর্যের আলো কুয়াশার সৃষ্টি করেছে । মেরু অঞ্চলের সাধারণ হলুদ হওয়াটি মেরু অঞ্চলে সৌর বিকিরণ বৃদ্ধির ফলে উৎপন্ন ধোঁয়াশা কণার কারণে ঘটেছে বলে মনে করা হয় । এ পরিবর্তনগুলো ক্যাসিনি মহাকাশযান দ্বারা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল । লাল, সবুজ এবং নীল বর্ণালী ছাঁকনি ব্যবহার করে চিত্রগুলোকে এ প্রাকৃতিক রঙের দৃশ্য তৈরি করতে একত্রিত করা হয়েছিল, আমরা শনি গ্রহে থাকলে মানুষের চোখ যা দেখতে পাবে । এ চিত্র সংস্করণে অতিবেগুনী থেকে অবলোহিত পর্যন্ত দৃশ্যমান আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের রঙ নির্ধারণ করা হয়েছে । ষড়ভুজের ভিতরে এবং বাইরে বায়ুমণ্ডলীয় কণার প্রকারের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র বৈসাদৃশ্য দেখা যায় । ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই সেপ্টেম্বর শনির গায়ে আছড়ে পড়ে ক্যাসিনি মহাকাশযান ধ্বংস হয় । হাবল দূরবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারা পর্যবেক্ষণ করে জানা যায় শনির দক্ষিণ মেরুতে কোনো ষড়ভুজ নেই, তবে এখানে একটি ঘূর্ণি রয়েছে এবং উত্তর মেরুতে ষড়ভুজের ভিতরেও একটি ঘূর্ণি রয়েছে ।
Cassini-Huygens mission হচ্ছে নাসা (NASA) এর European Space Agency এবং Italian Space Agency এর একটি সহযোগিতামূলক প্রকল্প । নাসা এর Jet Propulsion Laboratory হচ্ছে প্যাসাডেনা শহরে অবস্থিত California Institute of Technology এর একটি বিভাগ । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির নাসা এর Science Mission Directorate মিশন পরিচালনা করে ।
তথ্যসূত্র: https://solarsystem.nasa.gov/ , https://www.sciencealert.com/ , https://www.sciencedaily.com/ , আন্তর্জাল (The Internet) ।