Sunday, 12 May 2024

হিমালয়ান মোনাল (Himalayan Monal)


মোনাল হচ্ছে বেশ কয়েকটি এশীয় তিতির পাখি প্রজাতির মধ্যে একটি । হিমালয় মোনালের এক আকর্ষণীয় রঙের বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা একে অন্যান্য শোভাময় তিতির পাখি থেকে আলাদা করে । অবিশ্বাস্য সুন্দর ও বৈচিত্র্যময় রঙের পুরুষ পাখিটি একটি মুরগির মতো । প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মোনালকে রংধনু রঙের উজ্জ্বল পালকের (Iridescent plumage) কারণে চমৎকার লাগে । হিমালয়ান পুরুষ মোনালের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে মাথায় লম্বা ধাতব সবুজ ঝুঁটি, পিঠে ও ঘাড়ের পালকে উজ্জ্বল নীল-সবুজ রঙের আধিপত্য, গলায় উজ্জ্বল কমলা রঙের নিচে কিঞ্চিৎ হলুদের বাহারি মিশ্রণ এবং কিছু বিশিষ্ট সাদা পালক পিঠ বরাবর নীলের সাথে মিশে থাকে যা পাখিটি উড়ে যাওয়ার সময় সবচেয়ে বেশি দেখা যায় । পুরুষ পাখির সুদর্শন লেজের পালক লালচে বাদামী রঙের এবং অগ্রভাগের দিকে গাঢ় রঙ । পুরুষ মোনাল আকর্ষণীয় উজ্জ্বল রঙের হয়ে থাকে । যেখানে নারী মোনাল অস্পষ্টভাবে রঙিন । নারী মোনালের বর্ণ হচ্ছে বাদামী এবং ঈষৎ পীতাভ মিশ্রণ । চোখের চারপাশে ফ্যাকাশে-নীল বৃত্তাকার রঙ ও চিবুকের নিচে বিশিষ্ট সফেদ দাগ থাকে । লেজের উপর সামান্য পরিমাণে সাদা ফালা এবং কালো ও হাল্কা লাল রঙে পালক বাধা থাকার কারণে উড়ে যাওয়ার সময় নারী মোনালকে আলাদা করে চেনা যায় । নারী মোনালের নিঃশব্দ সুর বেশি থাকে । একটি বড় আকারের মোনাল প্রায় ৭০ সেঃমিঃ (২৮ ইঞ্চি) লম্বা হয় । পুরুষ পাখির ওজন প্রায় ২৩৮০ গ্রাম (৮৪ oz) এবং নারী পাখির ওজন প্রায় ২১৫০ গ্রাম (৭৬ oz) পর্যন্ত । হিমালয় মোনাল ২১০০ - ৪৫০০ মিটার (৬৯০০ - ১৪৮০০ ফুট) উচ্চতায় তুষারময় হিমালয় বন এবং ঝোপঝাড়ের আদি বাসিন্দা । উন্মুক্ত বনভূমি, ঘাসযুক্ত ঢাল, দুরারোহ পর্বতগাত্র, আলপাইন তৃণভূমি এবং উচ্চ নাতিশীতোষ্ণ ওক-কনিফার বনে পাখিটি বাস করে যেখানে ২৭০০ - ৩৭০০ মিটার (৮৯০০ - ১২১০০ ফুট) উচ্চতার মধ্যে এটিকে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় । এলাকার অন্যান্য তিতির প্রজাতির পাখির তুলনায় এ পাখিটির অধিক মৌসুমী গতিবিধি লক্ষ্য করা যায় এবং শীতকালে প্রায় ২০০০ মিটার (৬৬০০ ফুট) পর্যন্ত অনেক নিচে নেমে আসে । সাধারণত এমন উচ্চতায় ঘাসের মধ্যে খাদ্যের সন্ধান করে । হিমালয় মোনাল মাংসাশী (পতঙ্গভুক প্রাণী) এবং তৃণভোজী (শস্য/বীজভোজী, ফলভোজী) । সর্বভুক মোনাল পাখি তার শক্ত বাঁকা চঞ্চু ও নখর ব্যবহার করে পোকামাকড়, শিকড়, বীজ এবং কন্দের মতো খাদ্য খুঁজে বের করার জন্য মাটি আঁচড়ে ফেলে । বিশেষ করে অমেরুদণ্ডী প্রাণীর শিকার খুঁজে পেতে উদ্ভিদের শিকড়ের মধ্যে খনন করে । মোনাল প্রাথমিকভাবে শস্য, বীজ, বেরি, পোকামাকড়, কোমল পাতা এবং বাদাম ইত্যাদি খাদ্যগ্রহণ করে । প্রায়শঃ খাদ্য হিসেবে অমেরুদণ্ডী প্রাণীকে শিকার করার জন্য তুষার খনন করে থাকে । হিমালয় মোনাল হচ্ছে সামাজিক পাখি, যেটিকে প্রায়ই জোড়া বা ছোট দলে দেখা যায় । শীতকালে এ পাখি সাধারণত বৃহৎ পক্ষীদলে জড়ো হয় এবং বিশ্রাম বা ঘুমানোর জায়গায় সাম্প্রদায়িকভাবে বসবাস করে । মোনাল পাখি দিনের বেলায় সক্রিয় থাকে এবং তন্ন তন্ন করে খাদ্যের খোঁজে এটি বেশিরভাগ সময় ব্যয় করে । প্রজনন মৌসুমে শক্তিশালী জোড়া বন্ধন গঠন করে যা এপ্রিল থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত হয় । এ সময় লড়াইপ্রিয় একটি পুরুষ মোনালের পায়ে এক বা একাধিক Spurs এবং মুখে মাংসল অলঙ্কার থাকতে পারে । প্রণয়প্রার্থনাকারী পুরুষ মোনাল কখনো কখনো নারী মোনালের উপস্থিতিতে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে, যারা হট্টগোলের প্রতি একেবারেই উদাসীন বলে মনে হয় । উচ্চ-উচ্চতার হিমালয় মোনাল অত্যন্ত যোগাযোগকারী । সঙ্গীকে আকৃষ্ট করতে এটি চমৎকার শরীর প্রদর্শন, নৃত্য এবং কণ্ঠস্বর সবই ব্যবহার করে । সঙ্গীর জন্য সন্তুষ্টি, আগ্রাসন এবং সংকেত প্রকাশ বা সঙ্গীকে আকৃষ্ট করতে বিস্তৃত পরিসরে তাকে আহ্বান করে । সত্যিই, রোমাঞ্চকর । প্রজনন ঋতুতে পুরুষ মোনাল তার সঙ্গীকে আকৃষ্ট করার চেষ্টায় সারা দিন খুব সোচ্চার থাকে । সঙ্গমের সময় পুরুষ মোনাল বহুগামী হয় যেখানে সে বেশ কিছু নারীর সাথে সঙ্গম করে । অন্যদিকে নারী মোনাল পালাক্রমে শুধুমাত্র নির্বাচিত পুরুষের সাথে সঙ্গম করে এবং একগামী সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করে । হিমালয় মোনালের প্রজনন শুরু হয় যখন সে উচ্চ উচ্চতায় অভিপ্রয়াণ করে । নারী মোনাল পাখি মাটিতে একটি অগভীর বাসা খনন করে এবং প্রতি মৌসুমে ৩ - ৫টি ডিম পাড়ে । সে প্রায় ২৭ দিন ধরে ডিমে তা দেয় এবং ডিমগুলোতে তা দেয়ার সময় (Incubation period) পুরুষ মোনাল সুরক্ষার জন্য কাছাকাছি থেকে পাহারা দেয় ও প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত বাচ্চাকে বড় করতে সাহায্য করে । হিমালয় মোনাল হচ্ছে তিতির পাখির Phasianidae পরিবারের Lophophorus প্রজাতির একটি পাখি । Phasianinae পরিবারের ১৬টি বংশের প্রায় ৫০টি প্রজাতি রয়েছে । চাইনিজ মোনাল (L. lhuysii) এখন শুধুমাত্র পশ্চিম চীনে পাওয়া যায়, যদিও এটি একটি বিপন্ন প্রজাতি । হিমালয় মোনালকে Impeyan monal এবং Impeyan pheasant বলা হয় । মোনাল পাখির বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে: Lophophorus impejanus । এ বৈজ্ঞানিক নামটি বাংলার ব্রিটিশ প্রধান বিচারপতি Sir Elijah Impey এর স্ত্রী Lady Mary Impey কে স্মরণ করে । হিমালয় মোনাল তুষার সহ্য করতে পারে । এ পাখিটি পূর্ব আফগানিস্তান থেকে হিমালয় হয়ে পাকিস্তান, ভারত, ভুটান, নেপাল, মায়ানমার এবং চীন পর্যন্ত প্রাকৃতিক পরিসরে বসবাস করে । ভারতের জম্মু-কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম এবং অরুণাচল প্রদেশে মোনালকে দেখা যায় । এ পাখিটি ভারতের উত্তরাখণ্ডের রাষ্ট্রীয় পাখি এবং সেখানে এটি মোনাল নামে পরিচিত । পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশ, কাগান, পালাস উপত্যকা এবং আজাদ কাশ্মীরেও এটির দেখা মেলে । মোনাল নেপালের জাতীয় পাখি এবং স্থানীয়ভাবে এটি Danphe বা Danfe নামে পরিচিত । বন্দিদশায় এ পাখি ১০ - ১২ বছর যে কোনো জায়গায় বেঁচে থাকে । কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এ সুন্দর পাখিটিকে খাবারের জন্য শিকার করা হয় । কিছু কিছু এলাকায় বাসস্থান ধ্বংস, শিকার এবং অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক কারণের ফলে হিমালয় মোনাল আজ হুমকির সম্মুখীন । পশ্চিম হিমালয় অঞ্চলে জলবিদ্যুৎ উন্নয়নের সাথে জড়িত মানুষের কর্মকাণ্ডেও এটির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে । বিস্ময়কর যে, কোথাও কোথাও মোনাল জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ মাইলে মাত্র পাঁচ জোড়ার মতো । ফলে, পাখিটি বিরল কিংবা এটির জনসংখ্যা বিপন্ন হয়ে পড়ছে । International Union for Conservation of Nature (IUCN) এর লাল তালিকায় মোনাল পাখিকে ন্যূনতম উদ্বেগ (Least Concern বা LC) হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে । হিমালয় মোনাল প্রকৃতির অনুপম সৌন্দর্য । কিন্তু, আজ এটির সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে । আবার কিছু এলাকায় মোনালকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয় । এছাড়া, মোনালের প্রধান হুমকি হচ্ছে চোরাশিকার । পুরুষ মোনালের সৌন্দর্যময় ঝুঁটি পালকগুচ্ছ বেশ মূল্যবান । এগুলো অলঙ্কারাদি হিসেবে বা সাজসজ্জায় ব্যবহৃত হয় বলে মায়াবী সুন্দর এ পাখিটিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় । কারণ, হিমালয় মোনালের ঝুঁটি পালকগুচ্ছকে মর্যাদা এবং কর্তৃত্বের প্রতীক বলে মনে করা হয় । যাই হোক, মোনালকে রক্ষা করা এবং এটির আবাসস্থলকে সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখতে হবে । একে অবাধ বিচরণের সুযোগ করে দিতে হবে । পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে চোরাশিকারীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে । তবেই, প্রকৃতি হবে সুরক্ষিত । 

তথ্যসূত্র: https://en.wikipedia.org/ , https://www.inaturalist.org/ , https://wildlifepark.novascotia.ca/ , https://www.elmwoodparkzoo.org/ , https://animalia.bio/

Thursday, 9 May 2024

বৃহস্পতি গ্রহের মহা লাল বিন্দু (Great red spot)

 




বৃহস্পতি গ্রহের মহা লাল বিন্দু 
Great red spot 
~~~~~~~~~~
বৃহস্পতি গ্রহের বিষুবরেখার চারপাশে সামান্য স্ফীতি রয়েছে । বাইরের বায়ুমণ্ডল অক্ষাংশীয় মণ্ডলের বিভিন্ন বন্ধনীতে বিভক্ত এবং একটি বন্ধনীর সাথে অন্য আরেকটি বন্ধনীর সংযোগস্থলে ঝড়-ঝঞ্ঝাপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করে । এ ধরণের পরিবেশের একটি হচ্ছে ‘মহা লাল বিন্দু’ বা Great red spot (GRS) । বৃহস্পতি গ্রহের সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য মহা লাল বিন্দুটি হচ্ছে একটি ভয়ঙ্কর ঝড় । এটি এতোই বড় যে দুই-তিনটি পৃথিবীর সমতুল্য । ডিম্বাকৃতির এক জটিল দানবীয় ঝড় । ঝড়টির বর্তমান অবস্থান হচ্ছে দক্ষিণ নিরক্ষীয় বলয়ে । তবে, এটি সম্ভবত বৃহস্পতির স্থানান্তরিত চাঁদ (Transiting moon) ক্যালিস্টো এর ছায়ায় ছিল । ঝড়টি বৃহস্পতির দক্ষিণ গোলার্ধে নিরক্ষরেখা বা বিষুবরেখার ২২° দক্ষিণে অবস্থিত । ইটের মতো লাল থেকে গোলাপী এবং সাদাসহ রঙের ভিন্নতা রয়েছে । বিশাল এ ঝড়টি দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল এবং সক্রিয় অবস্থায় আছে । ধারণা করা হয়, অতি শক্তিশালী এ ঝড়টি সপ্তদশ শতাব্দী থেকে একটানা বয়ে চলছে ।  অসংখ্য ছোট ঝড়ের পাশাপাশি দৃশ্যমান আরো একটি বৃত্তাকার সাদা অংশ উজ্জ্বলভাবে অবস্থান করছে । কারণ, ঝড়গুলো প্রচুর সূর্যালোক প্রতিফলিত করে কিংবা একটি গভীর প্রধান মেঘ থেকে প্রতিফলিত আলো প্রদর্শন করে থাকে । এ মহা লাল বিন্দুর উচ্চ-ঊর্ধ্বতা বা গভীরতায় ধোঁয়াশা রয়েছে, যেমন নিরক্ষীয় অঞ্চলে আছে । অসংখ্য উজ্জ্বল সাদা এবং আঁকাবাঁকা দাগ বা পাতলা স্তর যেগুলো সম্ভবত ঘনীভূত সংবহনশীল ঝড়ের খুব উচ্চ-খাড়াইয়ের মেঘের চূড়া । বিপরীত দিকে, নিরক্ষীয় অঞ্চলের উত্তরে গাঢ় বন্ধনী বা ফিতাগুলোতে সামান্য মেঘের আচ্ছাদন রয়েছে । ঝড়টির অভ্যন্তরে বায়ু প্রবাহের গতি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২৭০ মাইল । 'মহা লাল বিন্দু' হচ্ছে বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলে একটি উচ্চ-চাপ অঞ্চল, যা অবিরাম একটি Anticyclonic ঝড় তৈরি করে । যেটি আমাদের সৌরজগতের বৃহত্তম ঝড় । এ দানব ঝড়টি ৪৩২ কিঃমিঃ/ঘন্টা (২৬৮ মাইল) পর্যন্ত বাতাসের গতিবেগ তৈরি করে । ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭১৩ খ্রিস্টাব্দের পর্যবেক্ষণগুলো থেকে ধারণা করা হয় যে, ভয়ানক শক্তিশালী এ ঝড়টি কমপক্ষে ৩৫৭ বছর ধরে বিদ্যমান রয়েছে । ১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে ইংরেজ Polymath, বিজ্ঞানী এবং স্থপতি Robert Hooke FRS মহা লাল বিন্দু ঝড়টি পর্যবেক্ষণ করেন । পরবর্তীতে ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইতালীয় গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ এবং প্রকৌশলী Giovanni Domenico Cassini (Jean-Dominique Cassini) বিস্ময়কর এ ঝড়টি পর্যবেক্ষণ করেন । জার্মানির একজন Pharmacist ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী Samuel Heinrich Schwabe ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে মহা লাল বিন্দুর প্রথম পরিচিত অঙ্কন তৈরি করেন । মহা লাল বিন্দুটি ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে বেশ সুস্পষ্ট হওয়ার আগে ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭০৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বেশ কয়েকটি পর্যবেক্ষণে এটি দৃষ্টি থেকে হারিয়ে গিয়েছিল । ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আবার ঝড়টি ম্লান বা অদৃশ্য হয়ে যায় । ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে মহা লাল বিন্দুর প্রান্তে ফলকায়িত (Flaking) শুরু করে ঝড়টি টুকরো হয়ে ভেঙ্গে যাওয়া কিংবা বিলুপ্ত হওয়ার অবস্থা ঘটেছিল । ঝড়টির সঙ্কুচিত হওয়া এবং Flaking এর কারণে এটি সম্পর্কে কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের উদ্বেগকে আরো উস্কে দিয়েছিল যে, মহা লাল বিন্দুটি আগামী ২০ বছরের মধ্যে বিলীন হয়ে যেতে পারে । যদিও কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে এ বিষয়ে দ্বি-মত ছিল । বৃহস্পতি গ্রহের মহা লাল বিন্দুটি ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘোরে, ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের হিসেব অনুযায়ী যার সময়কাল প্রায় ৪.৫ পৃথিবী দিন বা ১১ Jovian দিন । ৩রা এপ্রিল ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এ ঝড়টির প্রস্থ ১৬৩৫০ কিঃমিঃ (১০১৬০ মাইল) পরিমাপ করা হয় । মহা লাল বিন্দুর ব্যাস হচ্ছে পৃথিবীর ব্যাসের ১.৩ গুণ । এ ঝড়ের চূড়াগুলো (Cloud-tops) আশেপাশের মেঘ চূড়া থেকে প্রায় ৮ কিঃমিঃ (৫.০ মাইল) উপরে । মহা লাল বিন্দুটি বৃহস্পতি গ্রহের অন্যান্য মেঘের তুলনায় উচ্চ-ঊর্ধ্বতায় শীতল । তবে ঝড়ের উপরের বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা গ্রহের বাকি অংশের তুলনায় যথেষ্ট বেশি । নিচের ঝড়ের উত্তালতা থেকে ক্রমবর্ধমান শব্দ তরঙ্গগুলো এ অঞ্চলের উত্তাপের জন্য এটি একটি ব্যাখ্যা হিসেবে প্রস্তাব করা হয় । মহা লাল বিন্দুটি তার দক্ষিণে একটি পরিমিত পূর্বমুখী Jet স্রোত এবং উত্তরে একটি খুব শক্তিশালী পশ্চিমমুখী স্রোত দ্বারা সীমাবদ্ধ । যদিও ঝড়টির শিখর প্রান্তের চারপাশে বাতাস প্রায় ৪৩২ কিঃমিঃ/ঘন্টা (২৬৮ মাইল প্রতি ঘন্টা) বেগে প্রবাহিত হয় । মহা লাল বিন্দুর গভীরতা, অভ্যন্তরীণ কাঠামো এবং সামান্য আন্তঃ-বহিঃপ্রবাহসহ ঝড়টির ভিতরে স্রোত কয়েক দশক ধরে স্থবির রয়েছে বলে মনে হয় । তবে, এর ঘূর্ণন সময়ের সাথে সাথে হ্রাস পেয়েছে । মহা লাল বিন্দুর Anticyclonic সঞ্চালনের মধ্যে ফসফিন (PH₃), অ্যামোনিয়া (NH₃) এবং অ্যারোসলের (Para-H₂) সংমিশ্রণ রয়েছে । কিন্তু Jet স্রোতগুলো যে শক্তি সরবরাহ করে মহা লাল বিন্দুর ঘূর্ণিকে শক্তি দেয়, সেগুলো কাঠামোর ভিত্তির নিচে রয়েছে । মহা লাল বিন্দুর গঠন এবং এর লাল রঙের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি । তবে পরীক্ষাগারে নানা পরীক্ষা দ্বারা সমর্থিত অনুমান করা হয় যে: Ammonium hydrosulfide এবং জৈব যৌগ Acetylene এর সংস্পর্শে সূর্যের অতিবেগুনী বিকিরণ থেকে সৃষ্ট রাসায়নিক উপাদানগুলোর কারণে এমন রঙ হতে পারে, যা একটি লালচে উপাদান তৈরি করে । সম্ভবত এটি একটি জটিল জৈব যৌগ, যেটি Tholin নামে পরিচিত । যৌগগুলোর উচ্চ-ঊর্ধ্বতাও এ রঙে অবদান রাখতে পারে । Laboratory অধ্যয়নগুলোতে বৃহস্পতির মেঘের রাসায়নিক সংমিশ্রণে সূর্যের মহাজাগতিক অতিবেগুনী রশ্মির (Cosmic UV rays) প্রভাব পরীক্ষা করা হয় । বৃহস্পতি গ্রহের বাইরের বায়ুমণ্ডলে Ammonium hydrosulfide এবং জৈব যৌগ Acetylene এর সাথে সূর্যের অতিবেগুনী বিকিরণ থেকে সৃষ্ট রাসায়নিক উপাদানগুলোর বিক্রিয়া করে গভীর লাল রঙ তৈরি করে । মহা লাল বিন্দু বর্ণে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়, প্রায় ইট-লাল থেকে ফ্যাকাশে সালমন বা এমনকি সাদা । মহা লাল বিন্দুটি মাঝে মাঝে অদৃশ্য হয়ে যায় । শুধুমাত্র Red Spot Hollow এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠে, যা দক্ষিণ নিরক্ষীয় বলয় বা অঞ্চলে (South Equatorial Belt বা SEB) এটির অবস্থান । এর দৃশ্যমানতা দৃশ্যত দক্ষিণ নিরক্ষীয় বলয়ের সাথে মিলিত হয় যখন বলয়টি উজ্জ্বল সাদা হয় ও মহা লাল বিন্দুটি অন্ধকার হতে থাকে এবং যখন এটি অন্ধকার হয় মহা লাল বিন্দুটি সাধারণত হালকা হয় । ঐ গবেষণা থেকে পরামর্শ দেয়া হয় যে, ঝড়ের অশান্তি বা আলোড়নপূর্ণতার কারণে ঝড়টি চরম পরিমাণে শব্দ তরঙ্গ সৃষ্টি করে । শব্দ তরঙ্গগুলো ঝড়ের উপরে ৮০০ কিলোমিটার (৫০০ মাইল) উচ্চতায় উল্লম্বভাবে ভ্রমণ করে থাকে । যেখানে তারা উপরের বায়ুমণ্ডলে ভেঙে যায় এবং তরঙ্গ শক্তিকে তাপে রূপান্তর করে । এটি উপরের বায়ুমণ্ডলের একটি অঞ্চল তৈরি করে যা ১৬০০ Kelvin (১৩৩০°C বা ২৪২০°F)—  এ উচ্চতায় গ্রহের বাকি অংশের তুলনায় কয়েক শত Kelvin বেশি উষ্ণ থাকে । এ প্রভাবটিকে "সৈকতে সমুদ্রের ঢেউ বিধ্বস্ত হওয়ার মতো" অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে । ঘর্ষণ প্রদানের জন্য কোনো গ্রহের পৃষ্ঠ (শুধুমাত্র হাইড্রোজেনের একটি আবরণ) না থাকার কারণে ঝড়টি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিদ্যমান বা অব্যাহত রয়েছে । সঞ্চালনকারী গ্যাস ঘূর্ণিগুলো (Eddies) বায়ুমণ্ডলে খুব দীর্ঘ সময় ধরে থাকে, কারণ তাদের কৌণিক গতিবেগ বা ভরবেগের বিরোধিতা করার মতো কিছুই নেই । মহা লাল বিন্দুর সংলগ্নে দুটি ‘লাল দাগ’ এবং ঝড়টিতে ১২ সেঃমিঃ বড় একটি ছ্যাঁদা দেখা যায় । এ ঝড়ের সর্বোচ্চ ঊর্ধ্বতা আশেপাশের মেঘ চূড়াগুলো (Cloud-tops) থেকে প্রায় ৮ কিঃমিঃ (৫ মাইল) উপরে । ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের প্রথমদিকে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, প্রায় ৪১০০০ কিঃমিঃ (২৫৫০০ মাইল) জুড়ে ঝড়টির অবস্থান ছিল । ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে Voyager নভোযানের উড়ান (Flyby) থেকে পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ঝড়টির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩৩০০ কিঃমিঃ (১৪৫০০ মাইল) এবং প্রস্থ প্রায় ১৩০০০ কিঃমিঃ (৮০০০মাইল) ছিল । ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে Hubble Space Telescope এর পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, ঝড়টি আকারে ২০৯৫০ কিঃমিঃ (১৩০২০ মাইল) কমেছে এবং পরবর্তীতে ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের পর্যবেক্ষণে ঝড়টির আকার দেখা যায় প্রায় ১৭৯১০ কিঃমিঃ (১১১৩০ মাইল) । ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের হিসেবে ঝড়টি প্রায় ১৬৫০০ কিঃমিঃ থেকে ১০৯৪০ কিঃমিঃ (১০২৫০ মাইল থেকে ৬৮০০ মাইল) পরিমাপ করা হয় এবং প্রতি বছর এটির প্রায় ৯৩০ কিঃমিঃ (৫৮০ মাইল) দৈর্ঘ্য কমেছিল । ২০২১ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে প্রেরিত Juno spacecraft মহাকাশযান দ্বারা মহা লাল বিন্দুর গভীরতা পরিমাপ করা হয় প্রায় ৩০০-৫০০ কিঃমিঃ (১৯০-৩১০ মাইল) । এছাড়া, বৃহস্পতির মেরুতে বেশ কয়েকটি মেরু ঘূর্ণিঝড়পুঞ্জ বা ঘূর্ণিঝড়মণ্ডলী রয়েছে । উত্তর ঘূর্ণিঝড়পুঞ্জে ৯টি ঘূর্ণিঝড় রয়েছে, যার কেন্দ্রে বড় ১টি এবং এটির চারপাশে রয়েছে ৮টি ঘূর্ণিঝড় । অন্যদিকে দক্ষিণ অংশটিও ১টি কেন্দ্রীয় ঘূর্ণি বা ঘূর্ণিবাত্যা নিয়ে গঠিত, যার ৫টি বড় এবং ১টি ছোট ঘূর্ণিঝড় দ্বারা বেষ্টিত । এ মেরু কাঠামোগুলো বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলের তীব্র অশান্তি বা আলোড়নপূর্ণতার কারণে ঘটে থাকে । যেটিকে শনি গ্রহের উত্তর মেরুর ষট্কোণ বা ষড়ভুজ ক্ষেত্রের (Hexagon) সাথে তুলনা করা যেতে পারে । ২০০০ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ গোলার্ধে একটি বায়ুমণ্ডলীয় বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছিল যেটি মহা লাল বিন্দুর মতোই, কিন্তু এটি ছিল ছোট । সাদা ডিম্বাকার আকৃতির ঝড়গুলো একত্রিত হয়ে একটি একক বৈশিষ্ট্য তৈরি করে । ১৯৩৯-১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে এ তিনটি ছোট সাদা ডিম্বাকার আকৃতির ঝড় একত্রিত হয়ে গঠিত হয়েছিল । এ একত্রিত বৈশিষ্ট্যটির নাম Oval BA । ওভাল ঝড়টি পরবর্তীতে সাদা থেকে লালচে রঙে পরিণত হয়ে তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এটিকে "ছোট লাল বিন্দু" বা Little red spot বা Red junior নামকরণ করেছেন । গত ৫ই জুন ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে Great red spot এবং Oval BA এক-কেন্দ্রাভিমুখতা বা অভিসারণের (Convergence) দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়েছিল । ঝড় দুটি প্রায় প্রতি দুই বছর পর পর একে অপরকে অতিক্রম করে । তবে ২০০২ খ্রিস্টাব্দে এবং ২০০৪ খ্রিস্টাব্দের এ অতিক্রমগুলো খুব কম তাৎপর্যপূর্ণ ছিল । NASA এর Goddard space flight center এর আমেরিকান গ্রহ বিজ্ঞানী Amy Simon-Miller ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, ঝড়গুলো তাদের সবচেয়ে কাছাকাছি চলে যাবে । কিন্তু 'ছোট লাল বিন্দুটি' স্বল্প মেয়াদে তার আকৃতি বা গঠন ও তীব্রতা পরিবর্তন করে এবং ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বায়ুমণ্ডলে তার সাধারণ অবস্থান বজায় রেখেছে । ধারণা করা হয়, 'ছোট লাল বিন্দু'টি এক সময় মহা লাল বিন্দুর মতোই একটি দৈত্যাকার ঘূর্ণি বা ঘূর্ণিবাত্যা বা ঘূর্ণিঝড়ে (Giant vortex) পরিণত হতে পারে । এটিকে পৃথিবীর তাপমণ্ডলের (Thermosphere) ঘূর্ণিগুলোর মতোই অর্ধ-স্থিতিশীল বলে মনে হয় । এ বৈশিষ্ট্যই সম্ভবত বৃহস্পতির আইও (Io) চাঁদ থেকে উৎপন্ন চার্জিত কণার মধ্যে মিথস্ক্রিয়া দ্বারা গঠিত হতে পারে । আইও চাঁদের আগ্নেয়গিরিগুলো প্রচুর পরিমাণে সালফার ডাই অক্সাইড নির্গত করে, যা চাঁদের কক্ষপথে একটি Gas torus তৈরি করেছে । উল্লেখ্য যে: 'The Great Red Spot' বা মহা লাল বিন্দুকে Great Dark Spot এর সাথে বিভ্রান্ত করা উচিত নয় । কারণ ২০০০ খ্রিস্টাব্দে বৃহস্পতির উত্তর মেরুর কাছে Cassini–Huygens মহাকাশযান দ্বারা Great Dark Spot এর মতো একটি বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করা হয়, যে বেশিষ্ট্য নেপচুনের বায়ুমণ্ডলে রয়েছে আর সেটিই হচ্ছে Great Dark Spot । 
ছবি: http://www.nasa.gov/ , http://blogs.nasa.gov/ 
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, আন্তর্জাল (The Internet) ।





Tuesday, 7 May 2024

পৃথিবীর নিষ্প্রভ নীল বিন্দু (Pale Blue Dot of Earth)


‘নিষ্প্রভ নীল বিন্দু’ হচ্ছে পৃথিবী গ্রহের একটি আশ্চর্যজনক ছবি । এটি এমন একটি দুর্দান্ত ও দুর্লভ ছবি, যেটিকে ১৪ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবী থেকে ৬.৪ বিলিয়ন কিলোমিটার (৪ বিলিয়ন মাইল বা ৬৪০ কোটি কিলোমিটার) দূরে মহাশূন্যে থাকা ভয়েজার ১ রোবোটিক মহাকাশ যান থেকে ধারণ করা হয় । যে ছবিতে মহাকাশের বিশালতার মাঝে বিস্তৃত সূর্যালোক রশ্মির বন্ধনীতে “পৃথিবী” অতি ক্ষুদ্র একটি বিন্দুর মতো দেখা যায় । এখানে ফ্যাকাশে বিন্দুটিই পৃথিবী । অপার মহাশূন্যের প্রেক্ষাপটে এক ফালি সূর্যরশ্মির ভিতর পৃথিবী ধূলিকণার মতো ভাসছে । আমাদের এ সবুজ পৃথিবীতে সূর্য থেকে আলো আসতে সময় লাগে ০৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ড এবং দূরত্ব ১৫ কোটি কিলোমিটার । তাহলে একবার চিন্তা করুন ছবির ঐ ক্ষুদ্র বিন্দুটি কতদূর, যেখানে আপনি বসবাস করেন? এ ছবিতে পৃথিবীর আকার ০.১২ Pixel (১ মেগাপিক্সেল = ১ মিলিয়ন পিক্সেল) । পৃথিবীর এ প্রস্ফুটিত অনন্য চিত্রটি বেগুনি, নীল এবং সবুজ রঙে বিশোধন (ফিল্টার) করার মাধ্যমে নেয়া হয়েছিল । দিনটি ছিল Valentine’s Day । নাসা এর ভয়েজার ১ মিশনের জন্য ভালোবাসা দিবসটি বিশেষ হয় । দূরবর্তী মহাশূন্য থেকে ভয়েজার ১ মহাকাশ যানের ১৫০০ মিঃমিঃ উচ্চ-নির্ণয়কর সংকীর্ণ কোণের ক্যামেরার (Narrow-Angle Camera) সাহায্যে পৃথিবী গ্রহের ধারণকৃত Family Portrait সিরিজের আইকনিক ‘নিষ্প্রভ নীল বিন্দু’ ছবিটি সত্যিই উত্তেজনাকর । যা হৃদয়কে টানছে । বিশাল মহাবিশ্বে ক্ষুদ্র পৃথিবীকে আরো নাটকীয় করে তুলছে । এটি সেই নম্রতা যা বিজ্ঞান আমাদের দেয় । বিশদ বিশ্লেষণে পরামর্শ দেয়া হয়েছে যে ক্যামেরাটি চাঁদকেও শনাক্ত করেছে, তবে বিশেষ প্রক্রিয়াকরণ ছাড়াই দৃশ্যমান হওয়ার মতো অস্পষ্ট । যাক সে কথা, এটি এমন একটি অনুপ্রেরণাদায়ী পৃথিবী গ্রহের বিখ্যাত ছবি যেখানে ‘নিষ্প্রভ নীল বিন্দু’ অর্থাৎ পৃথিবী নামক ক্ষুদ্র বিন্দুটি আমাদের আবাসস্থল এবং সে সম্পর্কে পরম বিস্ময় জাগিয়ে তুলছে । অসীম বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মাঝে এ গ্রহটি নিতান্তই ক্ষুদ্র একটি বিন্দু, যেখানে আমাদের সবকিছু এবং নিরাপদ আশ্রয়স্থল । মায়ের কোলের মতোই একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়স্থল । যদিও কিছু মানুষের নির্বিচার, হিংসাত্মক ও নৃশংস কর্মকাণ্ড এমন সুন্দর ধরিত্রীকে অনিরাপদ করে তুলছে । প্রকৃতপক্ষে, যা অপ্রত্যাশিত । তবুও, স্বপ্ন দেখি এ মৃত্যুন্মুখ গ্রহে টিকে থাকার । পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে সূর্যালোকের স্থিতিস্থাপক আলোর বিচ্ছুরণ বা তড়িচ্চুম্বকীয় বিকিরণ (Rayleigh Scattering ) ছড়িয়ে পড়ার কারণে বিস্ময়কর এ ছবিতে পৃথিবী একটি ফ্যাকাসে নীল বিন্দুর মতোই আবির্ভূত হয়েছে । ভয়েজার ১ মহাকাশ যানটি যখন তার মিশনের উদ্দেশে সৌরজগৎ ছেড়ে অসীম মহাকাশের আরো গভীরে অগ্রসর হচ্ছিল সে সময় কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গ্রহ বিজ্ঞানী, বিজ্ঞান যোগাযোগকারী এবং ভয়েজার বিজ্ঞান দলের সদস্য Edward Carl Sagan নাসাকে অনুরোধ করে যে, ঐ দূরত্ব থেকে যানটির ক্যামেরা দ্বারা যেনো পৃথিবীর একটি চিত্র ধারণ করে রাখা হয় । মহাকাশযানটি গভীর মহাশূন্যের দিকে যাওয়ার পথে হঠাৎ চারদিকে ঘুরতে থাকে এবং পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখে নক্ষত্রে ভরা আকাশের উপর গ্রহগুলোর এক চমকপ্রদ বিন্যাস । যেখানে নীলাভ নেপচুন, নীল-সবুজ বরফ দৈত্য ইউরেনাস, বলয়যুক্ত শনি, গ্যাসীয় দানব বিশাল বৃহস্পতি, উজ্জ্বল সাদা শুক্র, ক্যামেরার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সূর্যালোক দ্বারা অস্পষ্ট লোহিত মঙ্গল, সূর্যের খুব কাছাকাছি বুধ, ভীষণ অন্ধকারে ম্লান হওয়া বামন গ্রহ প্লুটো খুব দূরে খুব ছোট এবং একটি অত্যাশ্চর্য ফ্যাকাশে নীল জলময় পৃথিবী । অপার মহাশূন্যের দূরবর্তী স্থান থেকে এটি সৌরজগতের প্রথম প্রতিকৃতি । অসাধারণ সুন্দর পৃথিবীর এ ছবিটি ধারণ করার চৌত্রিশ মিনিট পর ভয়েজার ১ মহাকাশ যানের ক্যামেরা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় এবং এটিই ছিল তার শেষ ছবি । যদিও কিছু বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ ছিল যে, সূর্যের এতো কাছাকাছি (মহাজাগতিক রশ্মির প্রভাবে) পৃথিবীর ছবি তোলা মহাকাশযানটির Imaging System কে অপূরণীয় ক্ষতিগ্রস্ত করার ঝুঁকি থাকতে পারে । যাই হোক, পরবর্তীতে এ অদ্ভুত ছবিটি দেখে জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান মহাশূন্যে সূর্যের আলোয় ভেসে থাকা ধুলোর ন্যায় ঐ ছোট্টো কণাটির (পৃথিবী) নাম দেন ‘নিষ্প্রভ নীল বিন্দু’ বা ‘Pale Blue Dot’ । তিনি ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে ‘নিষ্প্রভ নীল বিন্দু: মহাকাশে মানব ভবিষ্যতের দৃষ্টিভঙ্গি’ (Pale Blue Dot: A Vision of the Human Future in Space) নামক তার রচিত বইয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছবিটি নিয়ে গভীর চিন্তা ব্যাখ্যা করেন । যেখানে তিনি লিখেছেন: “সেই বিন্দুটির দিকে আবার তাকান । এটিই এখানে । এটিই বাড়ি । এটিই আমরা । এটিতে আপনি যাকে ভালোবাসেন, আপনার পরিচিত প্রত্যেকে, যাদের সম্পর্কে আপনি কখনো শুনেছেন, প্রত্যেক মানুষ যারা ছিলেন, তাদের জীবন কাটান । আমাদের ক্ষুদ্র পৃথিবীর এ দূরবর্তী চিত্রের চেয়ে মানবিক অহঙ্কারের মূর্খতার উত্তম প্রদর্শন সম্ভবত আর নেই ।” তিনি স্বীকার করেছেন যে, “এ ধরণের ছবির খুব বেশি বৈজ্ঞানিক মূল্য থাকবে না । কারণ, মহাকাশ যানটির ক্যামেরার জন্য পৃথিবী খুব ছোট বলে মনে হবে, কোনো বিস্তারিত জানার জন্য । কিন্তু, এটি মহাবিশ্বে মানবজাতির অবস্থানের এক দৃষ্টিকোণ হিসেবে অর্থবহ হবে ।” উল্লেখ্য যে, মার্কিন মহাকাশ বৈজ্ঞানিক কর্মসূচীর অংশ হিসেবে NASA ৫ই সেপ্টেম্বর ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে মনুষ্যবিহীন ভয়েজার ১ রোবোটিক মহাকাশ যানকে (Robotic Space Probe) সৌরজগতের বাইরের পরিবেশ, বহিঃসৌর গ্রহজনিত বিষয়, Heliosphere, Heliopause, Interstellar Wind এবং নক্ষত্রমণ্ডলের মধ্যবর্তী এলাকা গবেষণার জন্য মহাশূন্যে প্রেরণ করে । মহাকাশ যানটির ওজন: ৭২২ কিলোগ্রাম বা ১৫৯২ পাউন্ড । ভয়েজার ১ মহাকাশ যান ৫ই মার্চ ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে সৌরজগতের সর্ববৃহৎ গ্যাস দানব গ্রহ বৃহস্পতিকে অতিক্রম করে এবং ১২ই নভেম্বর ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে সৌরজগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাসীয় দৈত্য শনি গ্রহ ব্যবস্থার সম্মুখীন হয় । এটিই সর্বপ্রথম আমাদের সৌরজগতের বিশাল দুটি গ্রহ এবং তাদের প্রধান উপগ্রহগুলো সম্পর্কে বিশদ তথ্য ও চিত্র পাঠাতে সক্ষম হয় । ভয়েজার ১ হচ্ছে প্রথম মহাকাশযান যেটি Heliosphere অতিক্রম করে, এটি সেই সীমানা যেখানে আমাদের সৌরজগতের বাইরের প্রভাবগুলো সূর্যের তুলনায় অত্যধিক শক্তিশালী । পরবর্তীতে ২৫শে আগস্ট ২০১২ খ্রিস্টাব্দে ভয়েজার ১ মহাকাশ যানটি Hydrogen Wall এবং Heliopause এর সীমানা অতিক্রম করে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে প্রবেশ করে । বিস্ময়কর যে, মানবজাতির ইতিহাসে এটিই হচ্ছে মানবনির্মিত প্রথম বস্তু যেটি সৌরজগতের সীমানাকে ছাড়িয়ে যায় । ১১ই নভেম্বর ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে ভয়েজার ১ মহাকাশ যান পৃথিবী থেকে ১৩০.২৯ AU (প্রায় ১২ বিলিয়ন মাইল) দূরত্ব অতিক্রম করে, যা পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ দূরত্ব । এ মিশনটি পরিচালনা করে NASA (National Aeronautics and Space Administration) এবং JPL (Jet Propulsion Laboratory) । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডোনায় অবস্থিত জেপিএল সংস্থাটি নাসা এর জন্য মনুষ্যবিহীন নভোযান তৈরি এবং পরিচালনা করে থাকে । চলমান মিশনে থাকা ভয়েজার ১ মহাকাশ যানটি ৬৪০০০ কিঃমিঃ/ঘন্টা বা ৪০০০০ মাইল/ঘন্টা গতিতে বর্তমানে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে (Interstellar Space) তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে । তবে, এর ক্যামেরার ছবি তোলার ক্ষমতা আর নেই । এটি নাসা এর মাধ্যমে Deep Space Network (DSN) এর সাথে নিত্যনৈমিত্তিক আদেশ পেতে যোগাযোগ অব্যাহত রাখছে এবং চারটি স্থির-কার্যকর যন্ত্র থেকে যেমন: মহাজাগতিক রশ্মি, চৌম্বক ক্ষেত্র, কম শক্তি চার্জযুক্ত কণা এবং প্লাজমা তরঙ্গের বৈজ্ঞানিক তদন্ত করে তথ্য ফেরৎ পাঠায় । ২০২৪ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল পর্যন্ত এটি পৃথিবী থেকে ১৬২.৭ AU (২৪.৩ বিলিয়ন কিঃমিঃ বা ১৫.১ বিলিয়ন মাইল) দূরত্বে থাকবে এবং তার পূর্বের রেকর্ডটি অতিক্রম করবে । Voyager 1 হচ্ছে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী মহাশূন্যে ভ্রমণরত মানবসৃষ্ট বস্তু । সম্ভবত ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে এ মহাকাশ যানটির জ্বালানি শেষ হয়ে যাবে । হয়তো, পৃথিবীর মানুষ ভয়েজার ১ মহাকাশ যান থেকে আর কোনো সংকেত (Signal) পাবেন না । যদিও, নাসা এর বিজ্ঞানীরা মহাকাশ যানটিতে সংকেত পাঠানোর মাধ্যমে এর কয়েকটি ইউনিট বন্ধ রেখে জ্বালানি কম ব্যবহার করে আরো কিছু সময় এটিকে সচল রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন । তবুও, মহাকাশ যানটি মহাবিশ্বের মধ্য দিয়ে তার অনন্য যাত্রা চালিয়ে যাচ্ছে । 

* তথ্যসূত্র: আন্তর্জাল (The Internet), উইকিপিডিয়া । 

ছবি: https://science.nasa.gov/

Sunday, 5 May 2024

জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের দৈত্য ছায়াপথ আবিষ্কার


এ বিশাল মহাবিশ্ব অনেক গোপনীয়তা ধারণ করে । উপবৃত্তাকার বা বৃত্তাকার দানবীয় ছায়াপথগুলো সময়ের সাথে সাথে তাদের রূপ পরিবর্তন করে । এরা কখনো বেশ দৈত্যাকার, শান্ত এবং কিছু ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে রূপ ধারণ করে । ইয়েল ইউনিভার্সিটির Pieter van Dokkum এর নেতৃত্বে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি দল এ ধরনের একটি নতুন ছায়াপথ সনাক্তকরণের বিবরণ প্রকাশ করেছে । যেখানে বস্তুটিকে NASA এর জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের Near Infrared Camera (NIRCam) দিয়ে ১ মিলিয়ন পর্যন্ত ছায়াপথের চলমান JWST COSMOS-Web এর প্রশস্ত ও গভীর সমীক্ষার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর বৃহত্তম, সবচেয়ে জটিল এবং শক্তিশালী James Webb Space Telescope (JWST) ব্যবহার করে এ নতুন ছায়াপথ JWST-ER1g আবিষ্কারের কথা জানিয়েছেন । গত ১৪ই সেপ্টেম্বর ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে arXiv preprint server এর মাধ্যমে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে । অতি প্রাচীন এ বৃহৎ ছায়াপথটি তৈরি হয়েছিল যখন মহাবিশ্ব তার বর্তমান বয়সের মাত্র এক চতুর্থাংশ ছিল । নতুন আবিষ্কৃত ছায়াপথটি হচ্ছে বৃহদাকার, নিচ্ছিদ্র এবং শান্ত । অসীম বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে জন্ম নেয়া এমন বৃহদায়তন ছায়াপথগুলো তাদের জীবদ্দশায় শুরুতেই নতুন নক্ষত্র গঠন বন্ধ করে দেয়, তারা উপবৃত্তাকার দানব ছায়াপথের অনুমানযোগ্য পূর্বপুরুষ । মহাজাগতিক এ বস্তুগুলো পরবর্তীতে নক্ষত্র গঠন করে এবং তাদের নাক্ষত্রিক ভরগুলোকে আরো দ্রুত একত্রিত করেছিল । উত্তেজনাপূর্ণ অনুসন্ধানে দেখা যায়, নতুন পাওয়া ছায়াপথটিকে আলাদা করে তুলেছে এক অসাধারণ বৈশিষ্ট্য উপস্থিতির কারণে । যেখানে রয়েছে রহস্যময়, আকর্ষণীয় এবং সম্পূর্ণ বৃত্তাকার একটি আইনস্টাইন বলয় (Einstein Ring) । যেটি JWST-ER1r নামে পরিচিত । এটি হচ্ছে এক ধরণের মহাজাগতিক আলোক বলয় । আবিষ্কৃত ছায়াপথটি একটি অক্ষিকাচ (Lens) হিসেবে কাজ করে এবং দূরবর্তী উৎস থেকে আলোকে বাঁকিয়ে দেয়, যা পরবর্তীতে একটি বলয় হিসেবে উপস্থিত হয় । এ ঘটনাকে শক্তিশালী মহাকর্ষীয় লেন্সিং (Gravitational lensing) বলা হয় । আলবার্ট আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রকাশের পূর্বে একটি মহাকর্ষীয় বস্তু দ্বারা আলোর অবনমনের ভবিষ্যদ্বাণী করেন । আইনস্টাইন বলয় ব্যাসার্ধের মধ্যে আবদ্ধ মোট ভর হচ্ছে নাক্ষত্রিক এবং অদৃশ্য পদার্থের উপাদান । মহাকর্ষীয় লেন্সিং প্রভাবের কারণে আলো একটি বলয় আকারে বেঁকে গিয়ে ঘটনাটি ঘটায় । এ ছায়াপথে একটি সুস্পষ্ট লাল কেন্দ্র ও একটি নীল চাকতি রয়েছে । চাকতির অংশগুলোই বলয় তৈরি করে । বলয় কেন্দ্রের ব্যাস প্রায় ১.৫৪ আর্কসেকেন্ডে বিস্তৃত । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন যে এটি একটি পটভূমি ছায়াপথ দ্বারা বলয়টি ২.৯৮ এর একটি Photometric redshift এ তৈরি হয়েছে । সমীক্ষায় আরো দেখা গেছে যে ছায়াপথের প্রায় নিখুঁত বৃত্তাকার আকৃতি রয়েছে এবং NIRCam imaging এ কোনো সুস্পষ্ট তারকা-গঠনকারী অঞ্চল, জোয়ার বা স্রোতের লেজ ও অন্যান্য অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়নি । পৃথিবী থেকে প্রায় ১৭ বিলিয়ন আলোকবর্ষেরও বেশি দূরে JWST-ER1g ছায়াপথ অবস্থিত । ধারণা করা হয়, বিস্ময়কর এ নতুন ছায়াপথটির বয়স প্রায় ১.৯ বিলিয়ন বছর এবং এটি প্রতি বছর আমাদের সূর্যের ভরের স্তরে প্রায় চারগুণ মাঝারি গতিতে নতুন তারকা গঠন করে । ছায়াপথের লাল স্থানান্তর (Redshift) হচ্ছে ১.৯৪, ব্যাসার্ধ প্রায় ২১৫০০ আলোকবর্ষ প্রশস্ত একটি অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত এবং ভর প্রায় ৬৫০ বিলিয়ন সৌর ভর যা এটিকে তার আকারের জন্য অদ্ভুতভাবে ঘন একটি ছায়াপথ করে তুলেছে । আদি মহাবিশ্বের গতিশীল এ দৈত্য ছায়াপথের একটি নতুন বিশ্লেষণ পরামর্শ দেয় যে, গুপ্ত বা অদৃশ্য বা অন্ধকার পদার্থ (Dark Matter) নিজের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে । অন্ধকার পদার্থ হচ্ছে পদার্থের একটি কাল্পনিক রূপ যা আলো বা তড়িচ্চুম্বকীয় ক্ষেত্রের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে না বলে মনে হয় । এটি মহাকর্ষীয় প্রভাব দ্বারা আবদ্ধ । ছায়াপথটি মহাবিস্ফোরণের (Big Bang) মাত্র ৩.৪ বিলিয়ন বছর পরে গঠিত হয়েছিল ৷ যার ফলে অদৃশ্য পদার্থ সম্পর্কে জানার একটি দুর্দান্ত সুযোগ এনে দিয়েছে । মোট অনুমানকৃত ভর থেকে দৃশ্যমান নাক্ষত্রিক ভরকে বিয়োগ করে পরিমাপ করা হয় একটি ছায়াপথে কতটুকু অদৃশ্য পদার্থ । পদার্থবিদরা নিশ্চিত যে, একটি অদৃশ্য পদার্থ যা আমাদের মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থের শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ তৈরি করে বলে মনে করা হয় । অদৃশ্য পদার্থের Halo যা নতুন ছায়াপথটিকে ঘিরে থাকে । কয়েক দশকের পর্যবেক্ষণ এবং পরিস্থিতিগত প্রমাণের স্তুপ সত্ত্বেও, অদৃশ্য পদার্থটি এখনো সরাসরি পরীক্ষাগারে সনাক্ত করা যায়নি । এ ছায়াপথ আবিষ্কার দলটি নির্ধারণ করেছে যে অদৃশ্য পদার্থ প্রায় অর্ধেক ভরের ব্যবধানকে ব্যাখ্যা করে এবং লেন্সিং ফলাফল ব্যাখ্যা করার জন্য অতিরিক্ত ভরের প্রয়োজন বলে মনে হয় । ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যার অধ্যাপক এবং নতুন গবেষণার সহ-লেখক Hai-Bo Yu এক বিবৃতিতে বলেছেন: 'আমরা যদি মোট ভর থেকে নাক্ষত্রিক ভরকে বিয়োগ করি, তাহলে আমরা আইনস্টাইন ব্যাসার্ধের মধ্যে অদৃশ্য পদার্থের ভর পাই । অদৃশ্য পদার্থ ভরের মান প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বলে মনে হচ্ছে । এটি বিস্ময়কর! তিনি এবং তার সহকর্মীরা পরামর্শ দিয়েছেন যে, নতুন এ ছায়াপথের অস্বাভাবিক উচ্চ ঘনত্ব বর্তমানে চিন্তার চেয়ে বেশি নক্ষত্র জনসংখ্যা দ্বারা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে ।' একটি অদৃশ্য পদার্থ Halo হচ্ছে অদৃশ্য পদার্থের Halo যা JWST-ER1g ছায়াপথের মতো একটি ছায়াপথকে ঘিরে থাকে । একটি সংকোচন প্রক্রিয়া যার দ্বারা সাধারণ পদার্থের উপাদানগুলো গ্যাস এবং নক্ষত্র তৈরি করে JWST-ER1g ছায়াপথের অদৃশ্য পদার্থের Halo তে ধসে পড়ে ও ঘনীভূত হয়ে মোড়ক বাঁধাই করতে পারে, যার ফলে উচ্চ ঘনত্বের দিকে পরিচালিত হয় । ছায়াপথের কেন্দ্রে সবচেয়ে ঘন অদৃশ্য পদার্থের Halo হচ্ছে মহাকর্ষীয় আঠা যা ঘূর্ণায়মান ছায়াপথগুলোকে উড়তে বাধা দেয় । আমরা এখনো পরিপূর্ণভাবে জানি না, অদৃশ্য পদার্থ আসলে কি? তবে, পর্যবেক্ষণমূলক সূত্র থেকে জানা যায় এটি একটি নতুন ধরনের কণা যার উপস্থিতি শুধুমাত্র সাধারণ পদার্থের সাথে এর মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়া থেকে অনুমান করা যেতে পারে । অদৃশ্য পদার্থ হতে পারে শুধুমাত্র এক ধরনের কণা বা স্বাভাবিক পদার্থের মতো বিভিন্ন ধরনের জটিল বৈচিত্র্য, যা সম্ভবত অদৃশ্য পদার্থের সাথে এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত অজানা শক্তিগুলোর উপস্থিতিতে একচেটিয়া কাজ করে । অধ্যাপক Hai-Bo Yu গত ডিসেম্বর ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে স্ব-মিথস্ক্রিয়া অদৃশ্য পদার্থকে (Self-interacting dark matter) অন্তর্ভুক্ত করে কাঠামো গঠনের আদিখ্যেতার (Simulation) নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে, এ ধরনের স্ব-মিথস্ক্রিয়া নির্দিষ্ট ছায়াপথগুলোতে অত্যন্ত ঘন অদৃশ্য পদার্থের Halo গুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারে । পাশাপাশি অন্যদের মধ্যে বিস্ময়করভাবে কম ঘনত্ব যে, দুটিই প্রচলিত 'ঠান্ডা অদৃশ্য পদার্থ' তত্ত্ব দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না । তিনি বলেন: মহাবিশ্বের প্রথম দিকের ছায়াপথগুলোর আসন্ন অনুসন্ধান থেকে ঐ অদৃশ্য পদার্থের কণা এবং তাদের আচরণ সম্পর্কে এক আশ্চর্যজনক সূত্র প্রকাশ করতে পারে । NASA এর জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি (JWST) মহাবিশ্ব যখন তরুণ ছিল সে সময় গঠিত প্রাচীন ছায়াপথগুলোকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য আমাদেরকে একটি অভূতপূর্ব সুযোগ প্রদান করে । পদার্থবিদরা আশা করেন যে, জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি অদৃশ্য পদার্থের উপর আরো বেশি আলোকপাত করতে পারে । কারণ, এ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের দুর্লভ অবলোহিত চোখ অন্য যে কোনো দূরবীক্ষণ যন্ত্রের চেয়ে সময়ের সাথে আরো জটিল দৃষ্টিপাত করে থাকে । হয়তো, আগামীতে আমরা এ দূরবীক্ষণ যন্ত্র থেকে আরো চমক দেখতে পাবো এবং শীঘ্রই অদৃশ্য পদার্থ সম্পর্কে আরো বিশদ জানতে পারবো । গবেষণা দলটি JWST-ER1g ছায়াপথের ভবিষ্যৎ পর্যবেক্ষণের জন্য অপেক্ষা করছে । এ শক্তিশালী লেন্সিং বস্তু বা ছায়াপথটি অনন্য কারণ এখানে একটি নিখুঁত আইনস্টাইন বলয় রয়েছে যেখান থেকে আমরা আইনস্টাইন ব্যাসার্ধের মধ্যে মোট ভর সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পেতে পারি । এছাড়া কাছাকাছি কোনো ছায়াপথ বা দৃষ্টি রেখা বরাবর কাঠামোগুলো এ ছায়াপথের ভরকে প্রভাবিত করছে কি-না, এ ছায়াপথটি একটি স্তবকের পূর্বপুরুষের কেন্দ্রীয় ছায়াপথ কি-না, এটি ক্রমবর্ধমান Galactic Cluster এর বিকাশে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে কি-না এবং অদৃশ্য পদার্থের বৈশিষ্ট্যগুলো পরীক্ষা করার জন্য এটি হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ । এমনকি, ছায়াপথগুলো কিভাবে পরিবর্তিত হয় এবং বিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ উৎসকে বোঝার উন্নতির চাবিকাঠি হতে পারে । নতুন গবেষণাটি গত ১১ই এপ্রিল ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে The Astrophysical Journal Letters এ প্রকাশিত হয় । গবেষণাটি John Templeton Foundation এবং The U.S. Department of Energy দ্বারা সমর্থিত ছিল । 
তথ্যসূত্র: www.space.com, www.phys.org, www.sciencedaily.com 
 
ছবি: www.greekreporter.com 
Credit: NASA’s Marshall Space Flight Center / Flickr / CC BY-NC 2.0

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...