Monday, 26 June 2023

বিশ্বের গভীরতম গিরিখাতে এশিয়ার সবচেয়ে লম্বা গাছের আবাসস্থল

এ পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চিত্রটি উপর থেকে নিচ পর্যন্ত বিশাল একটি সাইপ্রেস গাছ (চিত্র : পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়) ।



চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে সাইপ্রেস গাছের একটি ত্রিমাত্রিক (3D) চিত্র, (চিত্র: পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়) ।


সম্প্রতি চীনা বিজ্ঞানীরা বিশ্বের গভীরতম গিরিখাতে এশিয়ার সবচেয়ে লম্বা গাছের আবাসস্থল খুঁজে পেয়েছেন ৷ ৩৩৫ ফুট (১০২ মিটার) উচ্চতার নতুন আবিষ্কৃত এক বিশাল সাইপ্রেস গাছ (Cypress tree) চীনের তিব্বত অঞ্চলের একটি জঙ্গলে পাওয়া গিয়েছে, যেটি স্ট্যাচু অফ লিবার্টি (Statue of Liberty) থেকেও উচ্চ হয়ে উঠেছে । এটি একটি সরলবর্গীয় চিরহরিৎ বৃক্ষ । চীনে আবিষ্কৃত সাইপ্রেস গাছটি এশিয়ার সবচেয়ে লম্বা গাছ । এ আশ্চর্যজনক গাছটি বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গাছ বলেও বিশ্বাস করা হয় । বিস্ময়কর যে, এ উচ্চতায় গাছটি স্ট্যাচু অফ লিবার্টির (৩০৫ ফুট বা ৯৩ মিটার) চেয়েও উঁচু । চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক বিবৃতি অনুসারে জানা যায় যে, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষক বা অনুসন্ধানিক দল গত মে মাসে অতিকায় সাইপ্রেস গাছটি হিমালয়ের উত্তর দিকে সুউচ্চ ‘পৃথিবীর ছাদ’ খ্যাত তিব্বত মালভূমিতে অবস্থিত চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের নিইংচি শহরের (Nyingchi City) বোমে বিভাগ বা জেলার (Bome County) ইয়ারলুং জাংবো গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন জাতীয় প্রকৃতি সংরক্ষিত (Yarlung Zangbo Grand Canyon National Nature Reserve) ভূমিতে আবিষ্কার করে । এ স্থানটি বিশ্বের গভীরতম স্থলজ গিরিখাত বলে মনে করা হয় । কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে ইয়ারলুং জাংবো নদী দ্বারা এটি গঠিত হয়েছে । যেখানে প্রকৃতি সংরক্ষণের গড় গভীরতা ১৬০০০ ফুট এবং সর্বোচ্চ গভীরতা ১৯৭১৪ ফুট । এ ঘন বনাঞ্চল থেকে গাছের উচ্চতা অনুমান করা সহজ ছিল না এবং উপত্যকায় অবস্থানের কারণে এ গাছের উচ্চতা এক নজরে বোঝা খুব কঠিন । জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তিব্বতের বনভূমি সবচেয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে একটি । এ কারণেই গবেষকরা এখন এ অঞ্চলে উদ্ভিদ জীববৈচিত্র্যের একটি বিশদ গবেষণা পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন । এ সমস্ত লম্বা গাছ একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ভাগ করে । এগুলো সবই নিইংচি শহরের মধ্যে বিশেষত মেডগ কাউন্টি (Medog County), জায়ু কাউন্টি (Zayu County) এবং বোমে কাউন্টিতে (Bome County) আবিষ্কৃত হয়েছে । দেশের এ অঞ্চলে প্রচুর সংখ্যক বিশালাকার গাছ রয়েছে । সাইপ্রেস গাছটি কোন প্রজাতির অন্তর্গত তা স্পষ্ট নয়, যদিও চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত যে এটি হয় হিমালয়ান সাইপ্রেস (Himalayan cypress, বৈজ্ঞানিক নাম: Cupressus torulosa) কিংবা একটি তিব্বতি সাইপ্রেস (Tibetan cypress, বৈজ্ঞানিক নাম: Cupressus gigantea) প্রজাতি ৷ হিমালয় এবং তিব্বতীয় সাইপ্রেস প্রজাতিগুলো বন্য অঞ্চলে বিরল প্রজাতি এবং মাত্র কয়েকটি ইয়ারলুং জাংবো গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন জাতীয় প্রকৃতি সংরক্ষিত ভূমিতে পাওয়া যায় । এ গাছগুলো চীনের প্রথম শ্রেণীর সংরক্ষিত উদ্ভিদ প্রজাতির অন্তর্গত । রাষ্ট্র পরিচালিত চীনা প্রকাশনা পিপলস ডেইলি অনলাইন অনুসারে গাছটির ব্যাস হচ্ছে ৯.৬ ফুট (২.৯ মিটার) । এটি আবিষ্কারের আগে এশিয়ার সবচেয়ে লম্বা গাছটি ছিল ৩৩১ ফুট লম্বা (১০০.৮ মিটার) হলুদ মেরান্টি (Yellow Meranti, বৈজ্ঞানিক নাম: Shorea faguetiana), যেটি মালয়েশিয়ার সাবাহ (Sabah) এর ড্যানুম উপত্যকা সংরক্ষিত এলাকায় (Danum Valley Conservation Area) অবস্থিত । তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের একটি অনন্য বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem) রয়েছে যা ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে । উল্লেখ্য যে: বাস্তুতন্ত্র হচ্ছে জৈব, অজৈব পদার্থ ও বিভিন্ন জীবসমন্বিত এমন প্রাকৃতিক একক যেখানে বিভিন্ন জীবসমষ্টি পরস্পরের সাথে এবং তাদের পারিপার্শ্বিক জৈব ও অজৈব উপাদানের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে একটি জীবনধারা গড়ে তোলে । যাইহোক, এলাকাটি বিশেষ করে নিইংচি শহর সম্প্রতি উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতকে রক্ষা করার জন্য সংরক্ষণ প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে । বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এলাকার পরিবেশগত বৈচিত্র্যকে আরো ভালোভাবে বুঝতে এবং পরিবেশগত সুরক্ষা প্রচেষ্টায় সাহায্য করার জন্য এ অঞ্চলে লম্বা গাছের নথিভুক্ত করেছেন । গত বছরের মে মাসে গবেষক দলটি দক্ষিণ-পশ্চিম চীনে ২৭২ ফুট লম্বা (৮৩ মিটার) প্রাচীনতম একটি ফার গাছ (Fir tree) খুঁজে পেয়েছিল, যেটিকে তারা প্রাথমিকভাবে বিশ্বাস করেছিলেন যে এটিই চীনের বৃহত্তম গাছ । এছাড়াও দলটি এক মাস আগে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের আবহাওয়া প্রতিকূল ও বিপদসঙ্কুল মেডগ বিভাগ বা জেলাতে (Medog County) ২৫২ ফুট (৭৭ মিটার) উচ্চতার আরেকটি গাছ উদ্ঘাটিত বা উন্মোচন করেছিল । এ বছর গবেষকরা তাদের জরিপ অব্যাহত রেখে ড্রোন, লেজার এবং রাডার সরঞ্জাম ব্যবহার করে এলাকার গাছের মানচিত্র তৈরি করেন এবং মাটি থেকে তাদের উচ্চতা চিহ্নিত করেছেন । কয়েকদিনের মাঠ জরিপের পর দৈত্যাকার সাইপ্রেস গাছটি পাওয়া গেছে ৷ তারা ড্রোন (Drone) ব্যবহার করে একটি থ্রিডি লেজার স্ক্যানার (3D laser scanner) এবং লিডার প্রযুক্তি (Lidar technology) দ্বারা যা দূরত্ব পরিমাপ প্রদান করতে হালকা মরীচি বা রশ্মি (Beam) ব্যবহার করেন । গবেষক দলটি সঠিক মাত্রা প্রদান করে এ বিশাল গাছের একটি থ্রিডি মডেল তৈরি করেছে । এটি ব্যবহার করে তারা নিশ্চিত করেছেন যে, এটিই এশিয়ার সবচেয়ে লম্বা গাছ । ক্রিমানা ফর্মটিও (Krimana form) প্রকৃত গাছের সঠিক মাত্রা অনুসরণ করে প্রস্তুত করা হয় । গবেষকরা আশা করছেন যে, এ ত্রিমাত্রিক মডেল তাদের একই প্রজাতির অন্যান্য গাছ সম্পর্কে আরো বুঝতে সাহায্য করবে । পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের রিমোট সেন্সিং ইনস্টিটিউটের (Institute of Remote Sensing) অধ্যাপক গুও কিংহুয়া (Guo Qinghua) রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমসকে বলেছেন যে, এ গাছের বিশেষত্ব হচ্ছে এর সহায়ক শিকড় সম্পূর্ণরূপে মাটির নিচে থাকে না । অনেক বিরল উদ্ভিদ প্রজাতিও ছড়িয়ে থাকা শিকড়ের নিচে বাস করে । গাছটির একটি জটিল শাখা ব্যবস্থাও রয়েছে যা “কিছু বিপন্ন উদ্ভিদ এবং প্রাণীদের জন্য আদর্শ স্বল্প জলবায়ু এবং স্বাভাবিক আবাসস্থল” প্রদান করে । বর্তমানে ৩৮১ ফুট (১১৬ মিটার) উচ্চতার বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা উপকূলীয় রেডউড (Coastal redwood, বৈজ্ঞানিক নাম: Sequoia sempervirens) গাছটির অবস্থান হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ার রেডউড ন্যাশনাল পার্কে । এ প্রাচীন গাছটি ৬০০ থেকে ৮০০ বছরের মধ্যে পুরোনো বলে মনে করা হয় এবং গ্রীক পৌরাণিক কাহিনীতে টাইটানদের একজনের নাম অনুসারে এর ডাকনাম হাইপেরিয়ন (Hyperion), এটি ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে আবিষ্কৃত হয়েছে । গত বছর ইউ. এস. পার্ক সার্ভিস (U.S. Park Service) হাইপারিয়নে জনসাধারণের প্রবেশাধিকার সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয় কারণ দর্শনার্থীদেরকে গাছে আরোহণ এবং এলাকায় বর্জ্য ফেলতে দেখা যায়, ফলে আশেপাশের নিচের পুষ্টি বা ক্রমবিকাশকে (Undergrowth) ক্ষতিগ্রস্ত করে । বিশ্বের তৃতীয় উচ্চতম গাছ হওয়ার রেকর্ড মালয়েশিয়ার ৩৩১ ফুট (১০০.৮ মিটার) হলুদ মেরান্টি গাছটি । চতুর্থ স্থান অস্ট্রেলিয়ার পর্বত ছাইকে (Mountain Ash) দেয়া হয়েছে যার পরিমাপ ৩২৯.৭ ফুট (১০০.৫ মিটার) । বিশ্বের পঞ্চম স্থানের অধিকারী গাছটি হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের প্রেইরি ক্রিক রেডউডস স্টেট পার্কের ৩২৯ ফুট (১০০.২ মিটার) Sitka spruce (Picea sitchensis) । এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের রাজ্য ওরেগন এর ব্রুমিট ক্রিক, কুস কাউন্টিতে ৩২৭ ফুট (৯৯.৭ মিটার) Coast Douglas-fir (Pseudotsuga menziesii var. menziesii) গাছটি বিশ্বের ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে । সাইপ্রেস বলতে ১২ প্রজাতির আলংকারিক এবং কাঠ চিরসবুজ শঙ্কুযুক্ত উদ্ভিদের যে কোনো একটিকে বোঝায়, যা Cupressus গণের অন্তর্গত । এগুলো এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা বিশেষত উষ্ণ নাতিশীতোষ্ণ এবং উপক্রান্তীয় অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃতি লাভ করেছে । সাইপ্রেস গাছগুলো তাদের অদ্ভুত এবং অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিচিত । এ গাছগুলো মানুষ এবং পরিবেশের জন্য বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করে । মাথাব্যথা, প্রদাহ এবং কাশি চিকিৎসার জন্য ঐতিহ্যগত ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয় । যেহেতু এগুলোতে একটি সক্রিয় উপাদান রয়েছে যা উইপোকা বিকর্ষণ করে, তাই এগুলো পোকামাকড় তাড়ানোর বৈশিষ্ট্যযুক্ত পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয় । সর্বোপরি সাইপ্রাস গাছগুলো নির্মাণ সামগ্রীর একটি ভালো উৎস হিসেবে বিবেচিত হয় । বিশেষ করে মেঝে, দরজা এবং স্থাপত্য কাঠের কাজ তৈরিতে । তারা ৫০ থেকে ১৫০ ফুট পর্যন্ত ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে এবং ১০০ থেকে ৬০০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় বাঁচতে পারে । দীর্ঘমেয়াদে গবেষকরা গিরিখাতের সাইপ্রাস গাছগুলোকে তাদের বৈশিষ্ট্য যেমন জনসংখ্যা, বন্টন ঘনত্ব এবং বয়স সম্পর্কে গবেষণা বা অধ্যয়ন করার জন্য নিরীক্ষণ করার পরিকল্পনা করেছেন । তারা ইয়ারলুং জাংবো গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের জীববৈচিত্র্য এবং অনাবিষ্কৃত গাছগুলো বিশ্লেষণ করতে আরো অনেকাংশে অন্বেষণ করার লক্ষ্য রাখে ।

তথ্যসূত্র: livescience.com (by science writer Lydia Smith),  https://www.sciencetimes.com/ , উইকিপিডিয়া ৷  ছবি: https://www.livescience.com/


Monday, 19 June 2023

জুনো মহাকাশযান বৃহস্পতির ঘূর্ণিঝড়ে বজ্রপাতের আভা ধারণ করেছে



NASA এর জুনো মহাকাশযান আমাদের অদ্ভুত সৌরজগতের একটি প্রাণবন্ত চিত্র ধারণ করেছে  ৷ এটি বৃহস্পতি গ্রহের ঝড়ের ভিতরে বজ্রপাতের গগনচারী সৌন্দর্যের অনুপম দৃশ্য ধারণ করে আরেকটি অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জন করেছে । যা বৃহস্পতি-প্রদক্ষিণ মিশনের একটি মাইল ফলক । বৃহস্পতির উত্তর মেরুর কাছে ঘূর্ণায়মান ঘূর্ণি ঝড় বা ঘূর্ণিবাত্যার মধ্যে বজ্রপাতের চমক বা আভা দেখাচ্ছে । এটি সম্ভবত বাদামী অ্যামোনিয়া-জল দ্রবণযুক্ত মেঘ থেকে উদ্ভূত হয়েছে, যা পৃথিবীতে ফুঁপানো জলীয় বাষ্পের মেঘের চেয়ে কিছুটা আলাদা । পৃথিবীর মতো এ মেঘগুলোর মধ্যে প্রায়শই বজ্রপাত হয় এবং বেশিরভাগ বজ্রপাত প্রধানত মেরুগুলোর কাছাকাছি দেখা যায় । পৃথিবীতে বজ্রপাতগুলো জলের মেঘ থেকে উদ্ভূত হয় এবং প্রায়শই বিষুবরেখার কাছাকাছি ঘটে । 

বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের লালিত বাসনা যে, সূর্য থেকে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন মাইল দূরে থাকা আমাদের সৌরজগতের সর্ববৃহৎ গ্রহ বৃহস্পতি সম্পর্কে এবং তার হীমশীতল চাঁদে নোনা জলের সমুদ্র, জীবন বা প্রাণের অস্তিত্ব ও বাসযোগ্যতার লক্ষণগুলো অন্বেষণ করা ৷ বেশ কিছুদিন যাবৎ বিজ্ঞানীদের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে চাঁদে প্রাণের অস্তিত্বের পাশাপাশি বাসযোগ্যতার বিষয়টি ৷ পৃথিবী একটি অপেক্ষাকৃত ছোট পাথুরে গ্রহ । কিন্তু বৃহস্পতি বিশাল গ্রহ, যার নাম হচ্ছে একজন প্রাচীন রোমান দেবতার নাম । এ গ্যাস দৈত্য এতোটাই বিশাল যে আমাদের সৌরজগতের অন্য সমস্ত গ্রহগুলো এর ভিতরে সুন্দরভাবে মানানসই করতে পারে —  ১৩০০ টিরও বেশি পৃথিবী সহ । গ্যাস দানব বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুন গ্রহ চারটিকে একত্রে 'জোভিয়ান গ্রহ' (Jovian planet ) বলে । বৃহস্পতি গ্রহকে প্রদক্ষিণকারী ৯৫টি উপগ্রহ বা চাঁদের মধ্যে চারটি হচ্ছে গ্যালিলীয় চাঁদ যেমন: ইউরোপা (Europa), ক্যালিস্টো (Callisto), আইও (Io) এবং গ্যানিমিড (Ganymede) –  যেগুলোর কোনোটি বরফ পৃষ্ঠের নিচে গভীর তরল জলের মহাসাগরকে আশ্রয় দেয়, যেখানে সামুদ্রিক প্রাণ বা জীবন থাকতে পারে । ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ এবং দার্শনিক গ্যালিলিও গ্যালিলি প্রথম এ চারটি উপগ্রহ বা চাঁদকে আবিষ্কার করেন বলে তার নামানুসারে চাঁদগুলোর নামকরণ হয় গ্যালিলীয় চাঁদ । বৃহস্পতি প্রধানত হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের সমন্বয়ে গঠিত এবং সামান্য পরিমাণ অন্যান্য গ্যাস । ফিতে (Stripes) এবং কয়েকটি ঘূর্ণিঝড় বৃহস্পতির রঙিন চেহারায় প্রাধান্য পায় । এটি সূর্য থেকে পঞ্চম গ্রহ, যার ব্যাস প্রায় ১৪৩০০০ কিলোমিটার । বৃহস্পতি গ্রহ বিখ্যাতভাবে প্রচণ্ড জটিকাপূর্ণ । এর মহা লাল বিন্দু (Great Red Spot) পৃথিবীর চেয়েও বিশাল বড় একটি ঘূর্ণি, যা শতাব্দী কাল ধরে ঘুরছে । হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম প্রধান বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে জল ও অ্যামোনিয়ার ঝড়ো মেঘগুলো ঘূর্ণায়মান হয় । যাই হোক, সেই বৃহস্পতি গ্রহেই জুনো মহাকাশযানটি আশ্চর্যজনক এক আবিষ্কার করেছে । মহাকাশযানটি ৫০ বার বৃহস্পতির চারপাশে ঘুরেছে । এখন এটি বৃহস্পতির ৫১তম মিশনে রয়েছে, যার ফলে আগামী জুলাই, অক্টোবর এবং ডিসেম্বরের শেষের দিকে বৃহস্পতির আইও (Io) চাঁদের সবচেয়ে কাছ দিয়ে অতিক্রম করবে এবং পরের বছরের ফেব্রুয়ারিতে আইও চাঁদের সাথে যমজ উড়ান (Twin flyby) মুখোমুখি হবে ৷ এ সমস্ত উড়ানগুলো পরম বিস্ময়কর আইও চাঁদের আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপের দর্শনীয় দৃশ্য প্রদান করছে বা করবে ৷ মহাকাশযানটি জোভিয়ান চাঁদ আইও এবং এর অগ্ন্যুৎপাত হওয়া আগ্নেয়গিরি থেকে মাত্র ৯৩০ মাইল দূরে চলে যাবে । 

বৃহস্পতির বজ্রপাত পৃথিবীর মতোই আশ্চর্যজনকভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ । একটি নতুন সমীক্ষায় দেখা গেছে যে বজ্রপাত জীবনকে চমকে দেয় এবং বৃহস্পতিতে একইভাবে বিবর্তিত হয় যেভাবে এটি পৃথিবীতে ঘটে । জোভিয়ান বজ্রপাত পৃথিবীর মতো একই "ধাপ-ভিত্তিক" (Step-wise) উপায়ে ঘটে । দুটি গ্রহ তাদের আকার ও গঠনে বিপরীত হওয়া সত্ত্বেও বৃহস্পতি এবং পৃথিবীতে বজ্রপাত প্রক্রিয়ায় গ্রহ দুটিতে বজ্রপাতের হার একই । যদিও বৃহস্পতিতে বজ্রপাতের বন্টন পৃথিবীর থেকে আলাদা । তবুও, উভয়ই একই ধরণের বৈদ্যুতিক ঝড়ের অতিথিসেবক বা স্বাগতিক । NASA এর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন যে, এ ঘূর্ণিঝড়ের মেঘে আরো বজ্রপাত দেখা যাবে । আসন্ন মাসগুলোতে জুনোর কক্ষপথগুলো বারবার এটিকে বৃহস্পতির কাছাকাছি নিয়ে যাবে কারণ মহাকাশযানটি দৈত্য গ্রহের রাতের পাশ দিয়ে চলে যাবে, যা জুনো মহাকাশযানের বিজ্ঞান যন্ত্রের অনুচরবৃন্দকে বজ্রপাত দৃশ্য ধারণের সাক্ষী হওয়ার জন্য আরো বেশি অতুলনীয় সুযোগ প্রদান করবে । বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলের রহস্যময় কার্যকারিতা সম্পর্কে অমূল্য অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করবে । বজ্রপাত পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাকৃতিকভাবে ঘটে যাওয়া বৈদ্যুতিক উৎস । চেক একাডেমি অফ সায়েন্সেস (Czech Academy of Sciences) এর গ্রহ বিজ্ঞানী ইভানা কোলমাসোভা (Ivana Kolmasova) বলেন, "বজ্রপাত হচ্ছে একটি বৈদ্যুতিক নিঃসরণ, যা বজ্রঝড়ের মধ্যে শুরু হয় । মেঘের অভ্যন্তরে থাকা বরফ এবং জলের কণা সংঘর্ষের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক বা তড়িৎ আধান (Charge) হয়ে যায় এবং একই মেরুত্বের আধানে কণার স্তর তৈরি করে । এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি বিশাল বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নির্গত করতে পারে । যদিও ব্যাখ্যাটি কিছুটা সরলীকৃত, কারণ বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নন যে, বজ্রপাতের ভিতরে ঠিক কি ঘটছে ।" ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে NASA এর ভয়েজার ০১ মহাকাশযান দ্বারা বৃহস্পতি গ্রহে বজ্রপাতের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছিল যা শ্রবণযোগ্য ফ্রিকোয়েন্সিতে টেলটালে রেডিও নির্গমনের (Telltale radio emissions) সময় রেকর্ড করা হয় যখন এটি সৌরজগতের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল । জুনো মহাকাশযানের তরঙ্গ যন্ত্রটি তার পূর্বসূরীদের তুলনায় দশ গুণ বেশি রেডিও নির্গমন সংগ্রহ করেছে । এটি এক মিলিসেকেন্ডের কাছাকাছি দ্বারা পৃথক করা বজ্রপাতের সংকেতগুলোকে তুলে ধরে । বিজ্ঞানী ইভানা কোলমাসোভা আরো বলেন, সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং এবং কাজের সবচেয়ে সময়সাপেক্ষ অংশ ছিল তরঙ্গ যন্ত্রের রেকর্ডে বজ্রপাতের সংকেত অনুসন্ধান করা । বৃহস্পতি গ্রহে বজ্রপাতের এমন একটি ধাপ কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার মিটার দীর্ঘ যে কোনো জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে পারে । যদিও বিদ্যমান জুনো মহাকাশযানের তথ্য দিয়ে নিশ্চিত করা কঠিন । যখন পৃথিবী এবং বৃহস্পতি গ্রহে একইভাবে বজ্রপাত হয়, যেখানে এ ঘটনাগুলো ঘটে উভয় জগতেই সম্পূর্ণ আলাদা । গ্যাস দৈত্যের উপর, বজ্রঝড়ের একটি বড় অংশ মধ্য অক্ষাংশ ও উচ্চতর এবং মেরু অঞ্চলে পাওয়া গেছে । তারা বিশাল গ্রহের বিষুবরেখায় অনুপস্থিত, যা ঘরে ফিরে বজ্রঝড়ের বিপরীত, যেখানে বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলগুলো সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতের বিবরণ করে ৷ পৃথিবীতে মেরুগুলোর কাছাকাছি আমাদের প্রায় কোনো বজ্রপাতের কার্যকলাপ নেই । এর মানে হচ্ছে যে, জোভিয়ান এবং স্থলজ বা পার্থিব বজ্র মেঘের গঠনের শর্তগুলো সম্ভবত খুব আলাদা । বৃহস্পতিতে বজ্রপাত একপাশে ছড়িয়ে পড়ে, উত্তর গোলার্ধে এর দক্ষিণ অর্ধেকের চেয়ে বেশি আঘাত হানে । এর কারণ অবশ্য এখনো স্পষ্ট নয় । আমরা এটিও জানি না, কেন আমরা এখনো পর্যন্ত মহা লাল বিন্দু (Great Red Spot) থেকে কোনো বজ্রপাত দেখতে পাইনি ।'' এ গবেষণাটি গত ২৩শে মে ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে নেচার কমিউনিকেশন (Nature Communication) সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বর্ণিত হয়েছে । সৌরজগতের অন্যান্য গ্যাস গ্রহ যেমন: শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুনেও বজ্রপাত দেখা যায় । পাথুরে গ্রহ শুক্রের মেঘেও বজ্রপাতের কিছু প্রমাণ রয়েছে, যদিও এটি এখনো বিতর্কের বিষয় । পৃথিবীতে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলগুলো সবচেয়ে সক্রিয় । বেশিরভাগ জোভিয়ান বজ্রপাত (Jovian lightning) মধ্য-অক্ষাংশে এবং মেরু অঞ্চলেও ঘটে । আমাদের পৃথিবীর মেরুগুলোর কাছাকাছি কোনো বজ্রপাতের কার্যকলাপ নেই । এর অর্থ হচ্ছে যে, গঠনের জন্য শর্তগুলো জোভিয়ান এবং স্থলজ বা পার্থিব বজ্রপাত সম্ভবত খুব আলাদা । অপটিক্যাল পরিমাপের উপর ভিত্তি করে বজ্রপাতের শক্তি তুলনা করার কিছু প্রচেষ্টা করা হয়েছিল এবং এর উপসংহারে পৌঁছেছিল যে, বৃহস্পতিতে বজ্রপাত সবচেয়ে শক্তিশালী স্থলজ বজ্রপাতের সাথে তুলনীয় হতে পারে । পৃথিবীতে বজ্রপাতের উৎপত্তি হয় উত্তাল মেঘের অভ্যন্তরে । যার ঊর্ধ্বমুখী বাতাস জলের ফোঁটা তুলে বরফে পরিণত করে । যখন নিম্নগামী বাতাস সেই হিমশীতল ব্লবগুলোকে (Blob) মেঘের নিচে ঠেলে দেয় । যেখানে পতিত বরফ ক্রমবর্ধমান জলের ফোঁটাগুলোর সাথে মিলিত হয়, ইলেকট্রনগুলো পূর্বের থেকে ছিনিয়ে নেয় । যার ফলে একটি মেঘ তৈরি হয়, যেটির ভিত্তি ঋণাত্মক বৈদ্যুতিক আধানযুক্ত ও শীর্ষটি ধনাত্মক এবং বায়ু নিরোধক দ্বারা পৃথক হয় । যখন এ বৈদ্যুতিক আধানগুলো তৈরি হয়, তখন সুপরিচিত বজ্রপাত চমক আঘাত করে একটি মেঘের মধ্যে বা কখনো কখনো মেঘের ভিত্তি থেকে মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে । যদিও পৃথিবীতে বজ্রপাতকে দূর থেকে লম্বা, মসৃণ আভার মতো দেখায় । গবেষকরা জানান যে, বিদ্যুতের প্রতিটি স্ফুলিঙ্গ প্রকৃতপক্ষে স্বতন্ত্র পদক্ষেপ দ্বারা তৈরি । প্রতিটি পদক্ষেপ বিচ্ছিন্ন রেডিও নির্গমনকে বের করে দেয়, যার সনাক্তকরণ প্রায়শই বজ্র মেঘের ভিতরে কি ঘটছে তা বোঝার একমাত্র উপায় । গ্রহ বিজ্ঞানী Ivana Kolmasova বলেন, "এটি স্পষ্ট ছিল না যে এ ধরনের পদক্ষেপের প্রক্রিয়া জোভিয়ান মেঘেও ঘটে কি না ।" 

জুনো মহাকাশযানটি ৩০শে ডিসেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দে বৃহস্পতির ৩১তম কাছাকাছি উড়ান (flyby) সফলভাবে সম্পন্ন করার সময় উত্তর মেরুর কাছে বজ্রপাত থেকে নির্গত আলোকিত আভার মন্ত্রমুগ্ধকর দৃশ্যটি ধারণ করেছিল । ২০২২ খ্রিস্টাব্দে নাগরিক বিজ্ঞানী কেভিন এম. গিল (Kevin M. Gill) মহাকাশযানে থাকা জুনোক্যাম (JunoCam) যন্ত্রের কাঁচা বা অশোধিত তথ্য (Raw data) থেকে ছবিটি প্রক্রিয়া করেছেন । কাঁচা চিত্রটি তোলার সময় জুনো মহাকাশযান বৃহস্পতির মেঘের শীর্ষ থেকে প্রায় ১৯৯০০ মাইল (৩২০০০ কিলোমিটার) উপরে ছিল, প্রায় ৭৮ ডিগ্রি অক্ষাংশে মহাকাশযানটি গ্রহের কাছে আসার সময় । এ চিত্তাকর্ষক আবিষ্কারটি আমাদের প্রতিবেশী গ্যাস দৈত্য গ্রহে ঘটতে থাকা স্বর্গীয় ঘটনার উপর নতুন আলোকপাত করে এবং বৃহস্পতি গ্রহের বিশাল বিস্তৃতির মধ্যে লুকানো রহস্য উদঘাটনের জন্য কৌতূহলী মনকে ইঙ্গিত করে । জুনোক্যাম দ্বারা ধারণ করা কাঁচা ছবিগুলোকে অসাধারণ ইমেজ পণ্যগুলোতে অন্বেষণ এবং প্রক্রিয়াকরণের জন্য জনসাধারণের কাছে সুগম বা সহজগম্য করা হয়েছে । তথ্য ভাগ করে নেয়ার এ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিটি উৎসাহী এবং বিশেষজ্ঞদের একইভাবে বৃহস্পতির রহস্যময় বায়ুমণ্ডলের জটিলতাগুলো অনুসন্ধান করার পাশাপাশি মহাজাগতিক এ প্রতিবেশীর চলমান বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে অবদান রাখতে সাহায্য করবে । জুনো মিশন (Juno Mission) দ্বারা বৃহস্পতির বজ্রপাতের ঝড় পর্যবেক্ষণ এবং নথিভুক্ত করার ক্ষমতা আমাদের সৌরজগতের বিস্ময়কর এবং গতিশীল প্রকৃতির একটি আভাস দেয় । মহাজাগতিক বৃহত্তম গ্রহের চারপাশের রহস্য উন্মোচন করে এবং অন্বেষণের জন্য নতুন দরজা খুলে দেয় । মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের বুঝতে (জ্ঞানের পরিধিকে) সমৃদ্ধ করে যাকে আমরা বাড়ি বলে থাকি । উল্লেখ্য যে: জুনো মিশন হচ্ছে NASA এর একটি মহাকাশ অনুসন্ধান, যা বৃহস্পতি গ্রহকে প্রদক্ষিণ করছে । এটির উদ্দেশ্য হচ্ছে বৃহস্পতি গ্রহের উৎপত্তি ও গঠন, এর চাঁদ সম্পর্কে, গ্রহে পাথুরে কেন্দ্রস্থল আছে কি-না, গ্রহের বায়ুমণ্ডলে জলের পরিমাণ, ভর বিতরণ, মহা লাল বিন্দু, গভীর বাতাস, মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র, চৌম্বক ক্ষেত্র এবং মেরু চুম্বকমণ্ডল ইত্যাদি পরিমাপ করা । জুনো মিশনটি NASA এর New Frontiers Program এর অংশ, যেটি ওয়াশিংটনে এজেন্সির বিজ্ঞান মিশন অধিদপ্তরের (Science Mission Directorate) জন্য আলাবামার হান্টসভিলে নাসা’র Marshall Space Flight Center এ পরিচালিত হয় ৷ যুক্তরাষ্ট্রের (ডেনভার) মহাকাশ, প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা বিষয়ক কোম্পানি লকহিড মার্টিন স্পেস (Lockheed Martin Space) মহাকাশযান তৈরি এবং পরিচালনা করে । 

তথ্যসূত্র:  https://www.nasa.gov/ ,  https://www.cbc.ca/   ,  https://www.space.com/  ,  আন্তর্জাল (The Internet) ।   ছবি: https://www.nasa.gov/

Tuesday, 13 June 2023

এশিয়ার শীর্ষ ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় বাংলাদেশের দু'জন নারী

                                                                          Senjuti Saha


                                                    Dr. Gawsia Wahidunnessa Chowdhury


গবেষণায় অনবদ্য অবদান রাখার জন্য সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি বিষয়ক 'Asian Scientist' সাময়িকীতে এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশের দু'জন নারী বিজ্ঞানী । Asia's Top 100 🌏 । জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহ চক্র, কাঠামোগত ভূতত্ত্ব অনুসন্ধান এবং মহাকাশ গবেষণা ইত্যাদির মতো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা মোকাবিলায় অবদান রাখা বিশ্বের নানা গবেষক এবং উদ্ভাবকদের বেছে নেয়া হয়েছে । গত ১১ই জুন ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে এ তালিকা প্রকাশ করা হয় । এদের মধ্যে একজন হচ্ছেন সেঁজুতি সাহা (Senjuti Saha) এবং অন্যজন অধ্যাপক ডঃ গাওসিয়া ওয়াহিদুন্নেছা চৌধুরী (Dr. Gawsia Wahidunnessa Chowdhury) । সেঁজুতি সাহা 'Life Science' এবং ডঃ গাওসিয়া ওয়াহিদুন্নেছা চৌধুরী টেকসই জলবায়ুর ‘Sustainability’ এর ক্ষেত্রে অবদানের জন্য মর্যাদাপূর্ণ এ তালিকায় স্থান পেয়েছেন । সত্যিই, বিশ্বের বুকে নারীদের অগ্রযাত্রার জয়গান । তারা দু'জনই তাদের কর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য এক বিরল সম্মান বয়ে এনেছেন । আমরা গর্বিত । তাদেরকে অভিনন্দন! তারা আমাদের অনুপ্রেরণা ।

বাংলাদেশের উজ্জ্বল নক্ষত্র, তরুণ প্রতিভাময়ী অণুজীব বিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহা ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র (WHO) একজন পরামর্শক । তিনিই প্রথম বাংলাদেশি বিজ্ঞানী হিসেবে সংস্থাটির বিশ্বব্যাপী পোলিও নির্মূল কর্মোদ্যোগ সম্পর্কিত The Polio Transition Independent Monitoring Board (TIMB) এর একজন সদস্য । উল্লেখ্য যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র বৈশ্বিক পোলিও নির্মূল উদ্যোগ (Global Polio Eradication Initiative / GPEI) সম্পর্কিত বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে সারা পৃথিবীর খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে The Independent Monitoring Board (IMB) গঠিত ৷ এটি মূলত বিশ্বব্যাপী পোলিও রোগ বিস্তার সম্পর্কে তথ্য, পোলিওভাইরাস সনাক্তকরণ, রোগ প্রতিরোধ বা নির্মূলকরণ, স্বাধীন পর্যবেক্ষণ, অভীষ্ট লক্ষ্যপূরণ, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং পোলিও মুক্ত বিশ্ব অর্জনের জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে থাকে ৷ এছাড়া বৈশ্বিকভাবে পোলিও মহামারীর উপর ভিত্তি করে এটি রোধকল্পে মূল মাইলফলকের দিকে অগ্রগতির মূল্যায়ন করে ৷ মাইলফলক যদি At risk, Off track বা Missed হয়েছে বলে দেখা যায় তবে সংক্রামিত স্থানকে কেন্দ্র করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বাস্তবায়নকারী অংশীদার অথবা দাতা সংস্থাগুলোকে দিক নির্দেশনাসহ প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক কর্ম পরিকল্পনা (আর্থিক দিকও হতে পারে) এবং পথ প্রদর্শনের মাধ্যমে এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকে । এছাড়া অন্যান্য কার্যক্রমের উপর তথ্যের ভিত্তিতে গৃহীত বা সম্পাদিত কার্যের গুণমান মূল্যায়ন করে সঠিক পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে । ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদে (World Health Assembly) পোলিও সম্পর্কিত বিল অনুমোদনের পর থেকে ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’ পোলিও সংক্রমণ পরিস্থিতি ও বিশ্বের দেশগুলোর জনস্বাস্থ্যের অবকাঠামো ব্যবস্থা সুরক্ষিত করা বা এটিকে টিকিয়ে রাখতে বিশেষ করে অপরিহার্য টিকাদান, বৃহত্তর সংক্রামক রোগের নজরদারি, পর্যবেক্ষণ, সতর্কতা এবং জরুরি প্রতিক্রিয়ার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে । আণবিক জিনতত্ত্বের গবেষক সেঁজুতি সাহা মনিটরিং বোর্ডের অন্যান্য সদস্যদের সাথে তিনি ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’কে পোলিও নির্মূল প্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে মহাপরিচালক পর্যায়ে পরামর্শ দিয়ে থাকেন । এতে করে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে নানা সংক্রামক ব্যাধি রোধকল্পে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য এক তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফল বয়ে নিয়ে আসছে, যা এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে । সেঁজুতি সাহা মূলত Microbiology, Epidemiology এবং Global Health নিয়ে গবেষণা করেন । ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে বৈশ্বিকভাবে শ্বাসযন্ত্রের সংক্রামক রোগ করোনা ভাইরাস (Covid-19) ছড়িয়ে পড়ার পর সেঁজুতি সাহা তার বাবার সাথে যৌথভাবে বাংলাদেশে বেসরকারি শিশু স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (Child Health Research Foundation / CHRF) গবেষণাগারে প্রথমবারের মতো তীব্র শ্বাসযন্ত্রীয় রোগলক্ষণসমষ্টি সৃষ্টিকারী নভেল করোনাভাইরাসের (SARS-CoV-2) জিন-নকশা বা বিন্যাসক্রমের (Genome sequencing) কাজে গবেষকদের একটি দলকে নেতৃত্ব দিয়ে সফলভাবে শেষ করেছেন । CHRF এর এ প্রকল্পটিকে স্বাস্থ্য পরিষেবা মহাপরিদপ্তর (Directorate General of Health Services), রোগবিস্তার বা মহামারী-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান (Institute of Epidemiology), রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা (Disease Control and Research), বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন (Bill and Melinda Gates Foundation) এবং চ্যান জাকারবার্গ বায়ো হাব (Chan Zuckerberg Biohub) থেকে সহায়তা করে । সেঁজুতি সাহার বাবা অধ্যাপক ডাঃ সমীর কুমার সাহা একজন অণুজীব বিজ্ঞানী ৷ তিনি বাংলাদেশের শিশুরোগ চিকিৎসা সংক্রান্ত বৃহত্তম হাসপাতাল ঢাকা শিশু হাসপাতালের অনুজীববিজ্ঞান বা জীবার্ণুবিজ্ঞান (Microbiology) বিভাগের প্রধান এবং CHRF এর নির্বাহী পরিচালক । ডাঃ সমীর কুমার সাহা শিশুদের জন্য সরকারের গৃহীত টিকাদান কর্মসূচী, স্বাস্থ্যসেবায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগীতার পাশাপাশি CHRF কর্তৃক এ সকল রোগের টিকা ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিশুমৃত্যু হার কমিয়ে আনতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন । বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংক্রামক রোগ থেকে শিশুমৃত্যু হার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ডাঃ সমীর কুমার সাহা CHRF গড়ে তুলেছেন নিজ মেধা, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং পরম মমতায় । এখানে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে RSV সংক্রমণ এবং নিউমোনিয়া (Pneumonia) রোগ সম্পর্কে নানাবিদ গবেষণা চলছে । সেঁজুতি সাহা বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে একজন অণুজীব বিজ্ঞানী (Microbiologist) হিসেবে কাজ করছেন । Meningitis (মস্তিষ্কের সংক্রমণ) হচ্ছে মস্তিষ্কে এক ধরণের সংক্রমণ বা প্রদাহ এবং Pneumonia হচ্ছে ব্যাকটিরিয়া, ভাইরাস ও ছত্রাক দ্বারা মানবদেহের অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ফুসফুসকে সংক্রমণ করে ৷ ফলে ফুসফুসের বায়ু থলিতে (Alveoli) প্রদাহ সৃষ্টি করে এক প্রকার তরল বা পুঁজের সৃষ্টি হয় ৷ এতে করে আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাসে তীব্র কষ্ট এবং ব্যথা অনুভূত হয়, এমনকি মৃত্যুও ঘটে ৷ নিউমোনিয়া এবং মেনিনজাইটিস এ দু’টি মরণব্যাধি হচ্ছে শিশুমৃত্যুর বড় কারণ । ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে নবজাতক ও শিশুদের মধ্যে মেনিনজাইটিস রোগ বেড়ে গেলে সেঁজুতি সাহা শিশুদের জিনগত উপাদানগুলো বিশ্লেষণ করে এর রহস্য উন্মোচন করতে সক্ষম হন । তিনি আবিষ্কার করেন যে, মেনিনজাইটিসের প্রকোপ বৃদ্ধি পায় মশা এর দ্বারা ছড়িয়ে পড়া চিকুনগুনিয়া জ্বরের (Chikungunya fever) প্রাদুর্ভাবের কারণে । তিনি বিশ্বে প্রথম দেখান যে, চিকুনগুনিয়া ভাইরাস শিশুদের মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে ও বাংলাদেশী শিশুদের মেনিনজাইটিস রোগ সৃষ্টি করে । ভবিষ্যতে মেনিনজাইটিস এবং অন্যান্য মারাত্মক রোগের প্রাদুর্ভাব দ্রুত সমাধানের জন্য দেশকে সহায়তা করতে তিনি তখন থেকেই বাংলাদেশে একটি স্বল্প ব্যয়ে রোগ নির্ণয় সংক্রান্ত বিশেষ যন্ত্রপাতি শিশুস্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান CHRF এ স্থাপন করেন ৷ মেনিনজাইটিসের কারণে যে সমস্ত শিশুদেরকে দীর্ঘকালীন অক্ষমতা নিয়ে বাঁচতে হয়, তাদের জন্য সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি একজন সামাজিক কর্মী এবং অণুজীব বিজ্ঞানী হিসেবে ‘মেনিনজাইটিস’ নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন । সেঁজুতি সাহা Bangladesh International Tutorial থেকে তার বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে প্রথমে BSc ডিগ্রি, John Hopkins Bloomberg School এ জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানী (Public Health Scientist), কানাডায় প্রাণরসায়নে (Biochemistry) স্নাতক ডিগ্রি এবং পরবর্তীতে University of Toronto https://www.utoronto.ca/ থেকে আণবিক জীনতত্ত্ব বিষয়ে (Molecular Genetics) PhD ডিগ্রি অর্জন করেন । তিনি Visiting Post Doctoral Scholar এ পড়াশোনার আগে Stanford School Of Medicine Associate Faculty তে পড়াশোনা করেন । সেজুঁতি সাহা ২৩শে এপ্রিল ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন । তার মা ডাঃ সেতারুন্নাহার সেতারা একজন অণুজীব বিজ্ঞানী । তার ছোট ভাই সুদীপ্ত কুমার সাহা University of Toronto বিশ্ববিদ্যালয়ে Microbiology and Global Health বিষয়ে পড়াশোনা করছেন । বলতে গেলে একটি বিজ্ঞানী পরিবার ৷ ব্যক্তিগত জীবনে সেজুঁতি সাহা বিবাহিত এবং তার স্বামী যোগেশ হুদা (Yogesh Hooda) একজন ভারতীয় নাগরিক । যিনি Medical Research Council Laboratory of Molecular Biology (MRC LMB) তে এবং যুক্তরাজ্যে একজন প্রাণরসায়নবিদ (Biochemist) হিসেবে কাজ করছেন । ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে তারা বিয়ে করেন । সেজুঁতি সাহা ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে 'Bil And Melinda Gates Award' পুরস্কারে ভূষিত হন । সারাবিশ্বে যারা নিজেদের সৃষ্টিশীল প্রতিভার মাধ্যমে সমাজকে বদলে দিয়ে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে অবদান রেখে চলেছেন, তাদেরকে নিয়ে মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস 'Heroes in the field' শিরোনাম করে Blog লিখে থাকেন । বিল গেটস (Bill Gates) বাংলাদেশের অণুজীব বিজ্ঞানী অধ্যাপক ডাঃ সমীর কুমার সাহা এবং তার মেয়ে সেঁজুতি সাহার ভূয়সী প্রশংসা করে লিখেন যে: https://www.gatesnotes.com/The-Sahas-are-battling-global-health-inequity?WT.mc_id=20200114193000_RLMForum_BG-FB&WT.tsrc=BGFB&linkId=80625611 '' বাংলাদেশি এ বাবা-মেয়ে বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্যের গতিশীল এক জুটি । এক্ষেত্রে তারা সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তথ্য-উপাত্ত, রোগ নির্ণয়ের সর্বাধুনিক পদ্ধতি এবং সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে টিকাদান কর্মসূচীকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের নিম্ন আয়ের দেশগুলোর সাথে সম্পদশালী দেশগুলোর স্বাস্থ্যসেবার যে পার্থক্য রয়েছে যেখানে শিশু মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি এবং এ ধরণের পার্থক্য কমিয়ে আনতে তারা সেখানে স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহের ফাঁকগুলো বন্ধ করতে কাজ করছেন । Child Health Research Foundation (CHRF) এর কাজের বদৌলতে এবং শিশুদের জন্য বর্তমান সরকারের গৃহীত টিকাদান কর্মসূচীর পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে পাঁচ বছর বয়সের নিচে শিশুমৃত্যু হার কমেছে । ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশ এখন প্রায় ৯৮ শতাংশ টিকাদান কর্মসূচীর আওতায় এসেছে । তাদের কাজের জন্য ধন্যবাদ ৷ বাংলাদেশ যদি রোগ প্রতিরোধে আরো বেশি কিছু করতে পারে তাহলে বাংলাদেশ এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে, যেখানে সংক্রামক ব্যাধি খুব কম থাকবে এবং হাসপাতালের বিছানাগুলো এক সময় ফাঁকা থাকবে ৷ CHRF বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশুমৃত্যু হার হ্রাস করার ক্ষেত্রে সাহায্যকারী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান । তাদের এ মহৎ কর্মকাণ্ড এবং গবেষণা শুধুমাত্র বাংলাদেশের জন্যই নয় বরং একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন দক্ষিণ এশিয়া তথাপি সারাবিশ্বে এর সুফল বয়ে নিয়ে আসবে ।'' ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ নিউইয়র্কে তৃতীয় বার্ষিক 'Gates Goalkeepers Event' এ সেঁজুতি সাহা বক্তব্য রাখেন, যেখানে ৪০০টি নীতিমালা গৃহীত হয় ৷ উক্ত অনুষ্ঠানে সরকারী প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ, সক্রিয় অংশগ্রহণকারী কর্মী, সংবাদ মাধ্যম, ব্যবসায়ী এবং এ গ্রহের সবচেয়ে ধনী ও সর্বাধিক দানশীল ব্যক্তিদের একজন বিল গেটস সহ বিভিন্ন গণ্যমান্য নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করেন । সেঁজুতি সাহা বিশ্বাস করেন “Science by and for the many, not the few” । তার দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বজুড়ে প্রত্যেকেরই বিজ্ঞানের অনুশীলন এবং এর সুবিধাগুলোতে সমান প্রবেশাধিকার পাওয়া উচিৎ । তিনি মনে করেন স্বাস্থ্য এবং গবেষণায় সাম্যভাব সৃষ্টি করাই তার কাজ এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মূল ভিত্তি । সেঁজুতি সাহা বাংলাদেশের একজন নেতৃস্থানীয় তরুণ বিজ্ঞানী যিনি বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য গবেষণায় সাম্যভাব বা সমদর্শিতার কারণ হিসেবে কাজ করছেন । জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চিকিৎসা বিজ্ঞান গবেষণায় অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি Junior Chamber International, Webby 2020 Award, Women of Inspiration 2021 Award এবং Chan Zuckerberg Initiative ইত্যাদি পুরষ্কার অর্জন করেন । শিক্ষা, মেধা, মনন, নিষ্ঠা এবং অধ্যবসায়ের কারণে সেজুঁতি সাহা এ যোগ্যতা অর্জন করেছেন, যা আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে ।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডঃ গাওসিয়া ওয়াহিদুন্নেছা চৌধুরী একজন শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং লেখক । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণীবিদ্যা (জলভূমি পরিবেশবিদ্যা) বিষয়ে Ph.D করেন । প্রাণী বৈচিত্র্য, জলাভূমি বাস্তুবিদ্যা এবং প্রাণিবিদ্যায় প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে তার ১৪ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে । তিনি বাংলাদেশের নৌপথে প্লাস্টিক দূষণের ঝুঁকির দিকে মনোনিবেশ করেন । প্লাস্টিক দূষণের ফলে পরিবেশ ও মানুষের উপর যে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে তা নিয়ে তিনি একাধিক গবেষণা করেছেন । বর্তমানে বাংলাদেশে বিপন্ন প্রজাতি এবং আবাসস্থল সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করছেন । বাংলাদেশে জলজ বাস্তুতন্ত্র এবং বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী সংরক্ষণে তার অবদানের জন্য ২০২২ খ্রিস্টাব্দে তাকে 'OWSD-Elsevier Foundation Award' দেয়া হয় । তিনি বাংলাদেশের প্রাণীবিদ্যাবিষয়ক সমিতির আজীবন সদস্য এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা Wild Team এর একজন বোর্ড সদস্য । এছাড়া আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সঙ্ঘের (IUCN) দক্ষিণ এশীয় 'Invertebrate Special Group' এর সহ-সভাপতি হিসেবেও নিযুক্ত হয়েছেন । অধ্যাপক ডঃ গাওসিয়া ওয়াহিদুন্নেছা চৌধুরী দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারীদের কর্মসংস্থান এবং ক্ষমতায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছেন । মাছ ধরার পরিত্যক্ত জালকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন করে কার্পেটের মতো প্রস্তুত করে (পদ্ধতি উদ্ভাবন) ব্যবহার উপযোগী পণ্যে পরিণত করার ফলে জলজ আবাসস্থল রক্ষার পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের জন্য আয়ের বিকল্প উৎস তৈরি করছেন । তিনি Commonwealth Academic Staff Scholarship এবং Wildlife Conservation Society Fellowship সহ অনেক পুরষ্কার এবং অনুদান পেয়েছেন । সরকারি, বেসরকারি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে কাজ করেন । এছাড়াও তিনি শিক্ষা ও যোগাযোগ কমিশন এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক মৈত্রীর Species Survival Commission সহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত গোষ্ঠীর সদস্য । অধ্যাপক ডঃ গাওসিয়া ওয়াহিদুন্নেছা চৌধুরী National Geographic Society এর সাগর থেকে উৎস গঙ্গা নদী অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন এবং বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন । সম্প্রতি তিনি Cambridge Prisms: প্লাস্টিক সম্পাদকীয় বোর্ড ( cambridge.org ) জার্নালের সম্পাদকীয় বোর্ডের সদস্য হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন ।

তথ্যসূত্র: https://www.asianscientist.com/ , https://du.ac.bd/ , আন্তর্জাল (Internet )। 

ছবি: Senjuti Saha

ছবি: Organization for Women in Science for the Developing World

https://www.asianscientist.com/as100/ 

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...