Thursday, 6 August 2026

এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় লেখা [কবি: জন কিটস]

"Written on a Summer Evening" 

(Written in Disgust of Vulgar Superstition)

by John Keats 

---------------------

The church bells toll a melancholy round,

Calling the people to some other prayers,

Some other gloominess, more dreadful cares,

More harkening to the sermon's horrid sound.

Surely the mind of man is closely bound

In some blind spell: seeing that each one tears

Himself from fireside joys and Lydian airs,

And converse high of those with glory crowned.

Still, still they toll, and I should feel a damp,

A chill as from a tomb, did I not know

That they are dying like an outburnt lamp, -

That 'tis their sighing, wailing, ere they go

Into oblivion -that fresh flowers will grow,

And many glories of immortal stamp.  

----------------

এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় লেখা 

(কুরুচিপূর্ণ কুসংস্কারের প্রতি বিতৃষ্ণা থেকে লেখা)

কবি: জন কিটস 

অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল 


গির্জার ঘণ্টাগুলো এক বিষাদময় সুরে বেজে ওঠে, 

মানুষকে ডাকছে অন্য কোনো প্রার্থনার দিকে,   

অন্য কোনো বিষণ্ণতা, আরো ভয়ঙ্কর দুশ্চিন্তা,  

ধর্মোপদেশের বিকট ধ্বনি আরো বেশি মনোযোগ দিয়ে শুনতে । 

নিশ্চয়ই মানুষের মন ঘনিষ্ঠভাবে আবদ্ধ 

কোনো এক অন্ধ জাদুমন্ত্রে: যখন দেখি প্রত্যেকের চোখে জল

নিজেকে বাসগৃহের আনন্দ, লিডিয়ান সুর 

এবং গৌরবের মুকুটধারীদের সাথে উচ্চমার্গীয় আলাপ থেকে দূরে সরিয়ে নেয় । 

তবুও, তবুও তারা বেজেই চলেছে, 

আর আমার এক আর্দ্রতা অনুভব করা উচিৎ, 

কবরের মত শীতলতা, 

আমি জানতাম না কি যে তারা নিভে যাওয়া প্রদীপের মত মরে যাচ্ছে,

সেটিই তাদের দীর্ঘশ্বাস, বিলাপ, 

তারা বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়ার পূর্বে— তাজা ফুল জন্ম নিবে

এবং অবিনাশী চিহ্নের অনেক মহিমা ।

Thursday, 30 July 2026

উজ্জ্বল নক্ষত্র [কবি: জন কিটস]

Bright Star

by John Keats 

----------------------

Bright star, would I were steadfast as thou art--

Not in lone splendour hung aloft the night

And watching, with eternal lids apart,

Like nature's patient, sleepless Eremite,

The moving waters at their priest like task

Of pure ablution round earth's human shores,

Or gazing on the new soft-fallen mask

Of snow upon the mountains and the moors--

No--yet still steadfast, still unchangeable,

Pillow'd upon my fair love's ripening breast,

To feel for ever its soft fall and swell,

Awake for ever in a sweet unrest,

Still, still to hear her tender-taken breath,

And so live ever--or else swoon to death. 


উজ্জ্বল নক্ষত্র 

কবি: জন কিটস 

অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল 


উজ্জ্বল নক্ষত্র, আমি যদি তোমার মত অবিচল হতাম— 

নিঃসঙ্গ দ্যুতি ছড়িয়ে রাতের আকাশে না ঝুলে থেকে 

এবং অনন্তকাল চেয়ে না থেকে, 

প্রকৃতির ধৈর্যশীল, নিদ্রাহীন সন্ন্যাসীর মত, 

প্রবহমান জলরাশি পুরোহিতের মত পবিত্র পুণ্যস্নানের কাজ করে চলেছে পৃথিবীর মানব উপকূলজুড়ে,

কিংবা পাহাড় ও বিস্তীর্ণ প্রান্তরের উপর সদ্য ঝরে পড়া বরফের নরম আবরণের দিকে তাকিয়ে থেকে—

না— তবুও অবিচল, এখনো অপরিবর্তনীয়, 

আমার প্রিয়তমার পরিণত বুকের উপর বালিশের মত মাথা রেখে,  

চিরকাল এর মৃদু ওঠা-নামা অনুভব করা, 

এক মধুর অস্থিরতায় সর্বদা জেগে থেকে,

অবিরাম তার কোমল নিঃশ্বাস শুনে যাওয়া, 

আর এভাবেই চিরকাল বেঁচে থাকা— 

নয়তো বিমুগ্ধ হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা । 

Saturday, 25 July 2026

আইলসা শিলার প্রতি [কবি: জন কিটস]


আইলসা শিলা (Ailsa Rock), ছবি: উইকিপিডিয়া


To Ailsa Rock 

by John Keats 

---------------------

Hearken, thou craggy ocean-pyramid,

Give answer by thy voice—the sea-fowls' screams!

When were thy shoulders mantled in huge streams?

When from the sun was thy broad forehead hid?

How long is't since the mighty Power bid

Thee heave to airy sleep from fathom dreams—

Sleep in the lap of thunder or sunbeams—

Or when grey clouds are thy cold coverlid!

Thou answer'st not; for thou art dead asleep.

Thy life is but two dead eternities

The last in air, the former in the deep!

First with the whales, last with the eagle-skies!

Drowned wast thou till an earthquake made thee steep,

Another cannot wake thy giant-size.


আইলসা শিলার প্রতি 

কবি: জন কিটস 

অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল 

----------------------------

আইলসা শিলার প্রতি 

কবি: জন কিটস 

অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল 

---------------------------

শোনো, হে পাথুরে মহাসমুদ্র পিরামিড!

তোমার কণ্ঠস্বরে উত্তর দাও, 

সামুদ্রিক পাখির তীক্ষ্ণ চিৎকারে!

কখন তোমার কাঁধ বিশাল জলপ্রবাহে আবৃত ছিল?

কবে তোমার প্রশস্ত কপাল সূর্য থেকে আড়াল হয়েছিল?

কত দিন হয়ে গেছে সেই পরাক্রমশালী শক্তি 

তোমাকে অতল স্বপ্ন থেকে জেগে ওঠে মুক্ত বাতাসে ঘুমাতে আদেশ করেছিলেন?

বজ্রপাত বা সূর্যরশ্মির কোলে ঘুমিয়ে পড়ো, 

কিংবা যখন ধূসর মেঘই তোমার শীতল শয্যাবরণী । 

তুমি উত্তর দিচ্ছ না; কারণ তুমি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ।  

তোমার জীবনতো কেবল দুটি মৃত অনন্তকাল— 

শেষটি বাতাসে, আগেরটি গভীরে;

প্রথমে তিমিদের সাথে, অবশেষে ঈগলের আকাশে! 

তুমি ডুবে ছিলে যতক্ষণ না এক ভূমিকম্প তোমাকে খাড়া করে তুলেছে, 

অন্য কেউ তোমার এই দৈত্য আকারকে জাগরণ করতে পারবে না । 


Thursday, 23 July 2026

নিঃসঙ্গতার প্রতি [কবি: জন কিটস]


To Solitude

by John Keats 

-----------------------

O Solitude! if I must with thee dwell,

Let it not be among the jumbled heap

Of murky buildings; , -- climb with me the steep,--

Nature's observatory -- whence the dell,

Its flowery slopes, its river's crystal swell,

May seem a span; let me thy vigils keep

'Mongst boughs pavilion'd, where the deer's swift leap

Startles the wild bee from the foxglove bell.

But though I'll gladly trace these scenes with thee,

Yet the sweet converse of an innocent mind,

Whose words are images of thoughts refin'd,

Is my soul's pleasure; and it sure must be

Almost the highest bliss of human-kind,

When to thy haunts two kindred spirits flee. 


ইংরেজ গীতিকবি জন কিটস ৩১শে অক্টোবর ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনের মুরফিল্ডসের একটি ভাড়াটে ঘোড়ার আস্তাবলে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২৩শে ফেব্রুয়ারি ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে ইতালির রোমে মারা যান । তিনি ইংরেজি সাহিত্যের একজন রোম্যান্টিক কবি । চিরসুন্দরের কবি জন কিটস এর কাব্যশৈলী ছিল কামনাপ্রবণতায় ভরপুর, বিশেষত তার গীতিকাব্য বা স্তবগানগুলোতে (Odes) । আজো তার কবিতা ও চিঠিপত্র ইংরেজি সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় সৃষ্টিকর্ম । পরবর্তী ভিক্টোরীয় যুগে জন কিটস এর The Eve of St Agnes এবং La Belle Dame Sans Merci কবিতাদ্বয় Pre-Raphaelite movement আন্দোলনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল এবং অ্যালগারন চার্লস সুইনবার্ন, দান্তে গ্যাব্রিয়েল রসেটি ও উইলিয়াম মরিসের মত কবিদের অনুপ্রাণিত করেছিল । কল্পনাশক্তি, মনন ও সৌন্দর্যের প্রতি এক তীব্র আকর্ষণে জীবন গড়া এই প্রতিভাময়ী কবির ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে ৩০টি কবিতা ও সনেটের সমন্বয়ে Poems শিরোনামে বই প্রকাশিত হয় । জন কিটস এর বিখ্যাত কবিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে: The Eve of St Agnes, La Belle Dame Sans Merci, Endymion, Hyperion, Ode to a Nightingale, To Autumn, Ode On A Gracian Urn ইত্যাদি । ইংরেজি ভাষায় পাঁচটি বিখ্যাত স্তবগানগুলোর মধ্যে Ode to a Nightingale অন্যতম । প্রশান্তি, সৌন্দর্য ও তারুণ্যের প্রতীক জন কিটস এর এক অমর রচনা Ode On A Gracian Urn গীতিকাব্যে তার একটি বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে: "Beauty is truth, truth beauty that is all Ye know on earth, and all ye need to know". 

ছবি: ব্রিটানিকা (Joseph Severn আঁকা ছবি, ঊনবিংশ শতাব্দী) । * তথ্যসূত্র: গুগল, উইকিপিডিয়া । 


নিঃসঙ্গতার প্রতি

কবি: জন কিটস 

অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল 

-------------------------------------

হে নিঃসঙ্গতা! 

যদি আমাকে তোমার সাথেই বাস করতে হয়, 

তা যেন ঝাপসা দালানকোঠার জটলাপূর্ণ স্তূপের মধ্যে না থাকে;

আমার সাথে চড়ো সেই খাড়া পথে,

প্রকৃতির মানমন্দিরে— যেখান থেকে উপত্যকা,

এর পুষ্পময় ঢাল, এর নদীর অচ্ছ ঢেউ, 

মনে হতে পারে এক বিঘত; 

আমি তোমার প্রহরা পালন করি

বৃক্ষশাখায় ঘেরা চাঁদোয়ার মধ্যে, 

যেখানে হরিণের ক্ষিপ্র লাফে 

শেয়াল মোজা ঘণ্টা ফুল থেকে বুনো মৌমাছি চমকে ওঠে ।

কিন্তু যাই হোক আমি সানন্দে তোমার সাথে এই দৃশ্যগুলো খুঁজে বের করব,

তবুও এক নিষ্পাপ মনের মিষ্টি আলাপ,

যার কথাগুলো পরিশীলিত চিন্তার প্রতিচ্ছবি,

এটিই আমার আত্মার তৃপ্তি; 

আর নিশ্চয়ই তা হবে মানবজাতির প্রায় সর্বোৎকৃষ্ট পরমানন্দ,

যখন দুটি সমমনা আত্মা তোমার সান্নিধ্যে চলে যায় ।


Monday, 20 July 2026

প্রণয়াভিলাষী কথোপকথন [কবি: টি.এস. এলিয়ট]

CONVERSATION GALANTE

By T. S Eliot

----------------

I observe: "Our sentimental friend the moon!

Or possibly (fantastic, I confess)

It may be Prester John's balloon

Or an old battered lantern hung aloft

To light poor travellers to their distress."

 She then: "How you digress!"

And I then: "Some one frames upon the keys

That exquisite nocturne, with which we explain

The night and moonshine; music which we seize

To body forth our vacuity."

 She then: "Does this refer to me?"

 "Oh no, it is I who am inane."

"You, madam, are the eternal humorist,

The eternal enemy of the absolute,

Giving our vagrant moods the slightest twist!

With your aid indifferent and imperious

At a stroke our mad poetics to confute—"

 And—"Are we then so serious?" 

---------------- 

প্রণয়াভিলাষী কথোপকথন 

কবি: টি.এস. এলিয়ট 

অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল 


আমি লক্ষ্য করি: “আমাদের আবেগপ্রবণ বন্ধু চাঁদ!

অথবা সম্ভবত (চমৎকার, আমি স্বীকার করছি)
ওটা হতে পারে প্রেস্টার জন এর বেলুন 

কিংবা শূন্যে ঝুলে থাকা একটি পুরোনো জীর্ণ লণ্ঠন  

নিঃস্ব পথিকদের দুর্দশায় আলোকিত করে।"

তখন সে: “তুমি কিভাবে প্রসঙ্গ থেকে সরে যাচ্ছো!” 

আর আমি তখন: "কেউ একজন পিয়ানোর চাবিগুলোতে সেই অপূর্ব স্বপ্নমদির সুর তৈরি করছে,  
যা দিয়ে আমরা রাত ও চাঁদের আলোকে ব্যাখ্যা করি;  
যে সঙ্গীতকে আমরা আঁকড়ে ধরি আমাদের শূন্যতাকে মূর্ত করে তুলতে।"  
খন সে: “এটি কি আমাকে উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে?” 
 
“ওহ্ না, বরং আমিই অর্থহীন।” 

তুমি, মহীয়সী, চিরকালের রসিক, 
রম সত্যের চিরন্তন শত্রু, 
আমাদের ভবঘুরে মেজাজকে সামান্য বাঁক দেয়! 
তোমার ঔদাসীন্য ও কর্তৃত্বপরায়ণ প্রভাবে  
এক নিমিষেই আমাদের পাগলাটে কাব্যিকতাকে খণ্ডন করে—” 
আর— “তাহলে কি আমরা এতই গম্ভীর?”

Sunday, 19 July 2026

পৃথিবীর গান [কবি: ল্যাংস্টন হিউজ]

An Earth Song 

by Langston Hughes

 (1901-1967)

---------------------

It’s an earth song,—

And I’ve been waiting long for an earth song. 

It’s a spring song,—

And I’ve been waiting long for a spring song. 

Strong as the shoots of a new plant 

Strong as the bursting of new buds 

Strong as the coming of the first child from its mother’s womb. 

It’s an earth song, 

A body song, 

A spring song, 

I have been waiting long for this spring song.  

----------


পৃথিবীর গান

কবি: ল্যাংস্টন হিউজ 

অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল 

-----------------------------------

এটি পৃথিবীর গান,—

আর আমি বহুদিন ধরে পৃথিবীর একটি গানের জন্য অপেক্ষা করছি ।

এটি বসন্তের গান,—

আর আমি বহুদিন ধরে বসন্তের একটি গানের জন্য অপেক্ষা করছি ।

নতুন গাছের কচি ডগার মত বলিষ্ঠ

নতুন কুঁড়ি ফোটার মতই বলিষ্ঠ

মায়ের গর্ভ থেকে প্রথম সন্তানের ভূমিষ্ঠ হওয়ার মতই বলিষ্ঠ ।

এটি পৃথিবীর গান,

দেহের গান,

এক বসন্তের গান,

আমি বহুদিন ধরে এই বসন্তের গানের জন্য অপেক্ষা করছি । 

আবাবিল [কবি: আব্রাহাম কাউলি]

The Swallow

By Abraham Cowley

---------------------------

FOOLISH prater, what dost thou

So early at my window do?

Cruel bird, thou’st ta’en away

A dream out of my arms to-day;

A dream that ne’er must equall’d be

By all that waking eyes may see.

Thou this damage to repair

Nothing half so sweet and fair,

Nothing half so good, canst bring,

Tho’ men say thou bring’st the Spring.

---------

আবাবিল 

কবি: আব্রাহাম কাউলি 

অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল 

----------------------

মূর্খ বাচাল, কি করছো তুমি

এত সকালে আমার জানালায়?

নিষ্ঠুর পাখি, তুমি কেড়ে নিয়েছো  

আজ আমার কোল থেকে একটি স্বপ্ন;

এমন এক স্বপ্ন যার তুলনা কোনো কিছুই হবে না

জাগ্রত চোখে যা কিছু দেখা যায় তার কোনোটি দিয়েই ।

তোমার এই ক্ষতি পূরণ করতে 

এর অর্ধেকটা এত মিষ্টি ও সুন্দর যা কিছুই না,  

অর্ধেকটা খুব ভালো কিছু আনতে পারে না,

যদিও লোকেরা বলে তুমিই বসন্ত নিয়ে আসো ।


Friday, 17 July 2026



William Shakespeare (1564-1616)

Love’s Labour’s Lost, Act V, Scene 2 [Winter] --------------------------


When icicles hang by the wall

   And Dick the shepherd blows his nail

And Tom bears logs into the hall

   And milk comes frozen home in pail,

When blood is nipp’d and ways be foul,

Then nightly sings the staring owl,

                        Tu-whit;

Tu-who, a merry note,

While greasy Joan doth keel the pot.


When all aloud the wind doth blow

   And coughing drowns the parson’s saw

And birds sit brooding in the snow

   And Marian’s nose looks red and raw,

When roasted crabs hiss in the bowl,

Then nightly sings the staring owl,

                        Tu-whit;

Tu-who, a merry note,

While greasy Joan doth keel the pot.  

----

উইলিয়াম শেক্সপিয়ার একজন ইংরেজ নাট্যকার, কবি এবং অভিনেতা । জন্ম ১৫৬৪ খ্রিঃ এবং মৃত্যু ১৬১৬ খ্রিঃ । তিনি ব্যাপকভাবে ইংরেজি ভাষা এবং বিশ্ব সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক ও নাট্যকার হিসেবে বিবেচিত । তিনি ইংল্যান্ডের জাতীয় কবি এবং তাকে Bard of Avon নামে ডাকা হয় ।   * ছবি: ব্রিটানিকা 


প্রেমের শ্রম হারিয়ে গেছে 

উইলিয়াম শেক্সপিয়ার (১৫৬৪-১৬১৬) 

অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল 

[নাটকের পঞ্চম অঙ্গ, দ্বিতীয় দৃশ্য, শীতকাল] 


যখন দেয়ালের গায়ে বরফখণ্ড ঝুলে থাকে 

আর মেষপালক ডিক তার নখে ফুঁ দেয় 

এবং টম হলঘরে কাঠের গুঁড়ি বয়ে আনে 

আর বালতিতে করে হিমায়িত দুধ বাড়িতে আসে,

যখন রক্ত ​​জমে যায় ও পথঘাট নোংরা হয়ে ওঠে,

তখন প্রতি রাতে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা পেঁচা গান গায়, 

টু-হুইট; 

টু-হু, এক আনন্দময় সুর,

যেই মুহূর্তে তেলচিটে জোন হাঁড়ির গরম খাবার ঠাণ্ডা করছে ।

যখন সশব্দে বাতাস বইতে থাকে 

আর কাশির শব্দে ডুবে যায় যাজকের প্রবচন 

এবং পাখিরা বরফের মধ্যে বিষন্ন মনে বসে থাকে 

আর মেরিয়ানের নাকটা লালচে ও ছাল ওঠা দেখায়,

যখন বাটিতে ভাজা কাঁকড়াগুলো হিসহিস শব্দ করে,

তখন প্রতি রাতে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা পেঁচা গান গায়,

টু-হুইট;

টু-হু, এক আনন্দময় সুর, 

যেই মুহূর্তে তেলচিটে জোন হাঁড়ির গরম খাবার ঠাণ্ডা করছে ।

Tuesday, 14 July 2026

কবি ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টক ও তার কবিতা


ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টক (Friedrich Gottlieb Klopstock) ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত জার্মান কবি, লেখক, গীতিকার ও ভাষাতাত্ত্বিক । তার আবেগপূর্ণ সাহিত্যকর্ম জার্মান সাহিত্যে যুক্তিবাদের আধিপত্য ভেঙে রোমান্টিক ধারার সূচনা করেছিল । প্রতিভাময়ী এই কবি ২রা জুলাই ১৭২৪ খ্রিস্টাব্দে জার্মানির কুয়েডলিনবার্গে জন্মগ্রহণ এবং ১৪ই মার্চ ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে জার্মানির হামবুর্গে মৃত্যুবরণ করেন । তার সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম ফরাসি অনুকরণ থেকে বেরিয়ে এসে জার্মান সাহিত্যকে নব যুগের পথ দেখায় । ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টক প্রাচীন গ্রিসের সর্বশ্রেষ্ঠ গীতিকার কবি Pindar (অন্য নাম: Pindaros বা Pindarus) দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে একটি ছন্দ ও সুর ব্যবহার করে জার্মান কবিতাকে কঠোর-ঐতিহ্যবাহী সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করেছিলেন । তার সবচেয়ে জনপ্রিয় কাজগুলোর মধ্যে অগ্রগণ্য হচ্ছে বিখ্যাত মহাকাব্য Der Messias (The Messiah বা মসিহ) এবং Die Auferstehung (The Resurrection বা পুনরুত্থান) স্তবগান বা স্তোত্র বা ছন্দোবদ্ধ আধ্যাত্মিক কবিতা । এদের মধ্যে দ্বিতীয়টি রচিত হয় ঈশ্বর, দেব-দেবী, শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বের প্রতি প্রশংসা ও গুণগান করার জন্য, যেটি ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে প্রভাবশালী জার্মান পিয়ানোবাদক, সুরকার ও অর্কেস্ট্রা পরিচালক হান্স ফন বুলোর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় কবি ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টকের গাওয়া Die Auferstehung স্তোত্রটি একজন অস্ট্রো-বোহেমিয়ান কল্পনাবিলাসী সুরকার Gustav Mahler কে অনুপ্রাণিত করে এবং তিনি তার দ্বিতীয় সিম্ফনির (পশ্চিমা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত) শেষাংশে সুরারোপিত করে স্তোত্রটিকে অমরত্ব দেন । 

ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টক যিনি তার মহাকাব্যিক ধর্মীয় কবিতা Der Messias বা মসিহ এর জন্য সর্বাধিক পরিচিত । মসিহ হচ্ছে খ্রিস্টধর্মের ত্রাণকর্তা যিশু খ্রিস্টের জীবন ও মানবজাতি উদ্ধারের উপর লেখা ২০ খন্ডের একটি বিখ্যাত বাইবেলীয় মহাকাব্য । এটি গ্রিক ও ল্যাটিন ধ্রুপদী মহাকাব্যের অনুকরণে ষড়্মাত্রিক কবিতা বা চরণের ছন্দে (Hexameter verse) রচিত হয় । এর মূলভাব হচ্ছে মানুষের মুক্তি এবং যিশুখ্রিস্টের আত্মত্যাগ ও পুনরুত্থান । ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টক তার এই অমর রচনায় স্বর্গের বর্ণনা, শয়তানের পরিষদ, মহাবিশ্বে দেবদূতদের যাত্রা এবং শেষ বিচারের মনোজ্ঞ ইতিহাস বর্ণনা করেছেন । উল্লেখ্য যে, বিখ্যাত ইংরেজ কবি জন মিল্টনের (John Milton) রচিত কালজয়ী মহাকাব্য হচ্ছে Paradise Lost এবং এর পরের পর্ব Paradise Regained । ১৬৬৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ১২ খন্ডের প্যারাডাইস লস্ট মহাকাব্যে বাইবেলের আদিপুস্তকের কাহিনী অবলম্বন করে শয়তানের প্ররোচনায় আদম ও হাওয়ার (অ্যাডাম ও ঈভ) স্বর্গ চ্যুত হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে । কবি জন মিল্টনের সেই প্যারাডাইস লস্ট মহাকাব্যের প্রতি ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টক গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে মসিহ মহাকাব্যটি রচনা করেছেন । এছাড়া, ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টক তার প্রথম জীবনে মহাকাব্যিক কবি হওয়ার জন্য মনের মাঝে যে সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন, তা থেকেও মসিহ রচনা করতে উৎসাহ পেয়েছেন । তিনি উচ্চমার্গের আখ্যানমূলক এই মহাকাব্যে গির্জার মতবাদের গণ্ডিতে বিষয়বস্তুকে আবদ্ধ করার প্রয়াস নিয়ে খ্রিস্টান সাহিত্যিক ঐতিহ্যের আশ্রয় নিয়েছিলেন । ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টকের মসিহ মহাকাব্যটি লিখতে ২৫ বছর সময় লেগেছিল । এই শ্রেষ্ঠ মহাকাব্যের প্রথম খণ্ড ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে এবং এর চূড়ান্ত ও সম্পূর্ণ খণ্ড ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় । তার এই বিস্ময়কর ও অসামান্য কাজটি শুরু হওয়ার সময় তীব্র জনউচ্ছ্বাস জাগিয়েছিল । মসিহ মহাকাব্য ১৭টি ভাষায় অনূদিত হওয়ায় অসংখ্য অনুকরণ তৈরি হয়েছে । 

ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টক গ্রীক এবং ল্যাটিন ছন্দ রচনায় পারদর্শী ছিলেন । তিনি জার্মান ভাষায় বেশ কিছু প্রশংসনীয় গদ্য বা সংক্ষিপ্ত কবিতা (Idyll বা Idyl) এবং গীতিকাব্য বা গাথা (Ode) রচনা করেন । এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত গীতিকাব্য বা স্তবগান An meine Freunde (আমার বন্ধুদের প্রতি বা To My Friends) ১৭৪৭ খ্রিস্টাব্দে রচিত হয়, যা পরবর্তীতে ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে তার Wingolf নামক কবিতায় রূপান্তরিত হয়েছিল (প্রাচীন নর্স পৌরাণিক শব্দ Wingolf অর্থ বন্ধুদের হল) । তিনি লিপজিগে ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়নের সময় An meine Freunde স্তবগান রচনা করেন যা গভীর, অন্তরঙ্গ ও আদর্শায়িত বন্ধুত্বের রূপান্তরকারী শক্তিকে মহিমান্বিত করে এক পবিত্র বন্ধনে উন্নীত করে । এটি এমন এক সময়ে লিখেছিলেন যখন তিনি কবিতার প্রচলিত কাব্যশৈলী বা রীতি থেকে সরে এসে তীব্র আবেগ ও ব্যাপক ছন্দের বৈশিষ্ট্যে এক অভিব্যক্তিপূর্ণ পিন্ডারীয় শৈলী গ্রহণ করছিলেন । 

১৭৫০ এর দশকে ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টক সুইজারল্যান্ডের জুরিখ হ্রদে ভ্রমণের সময় Au peninsula উপদ্বীপের অনুপম সৌন্দর্য, শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ, সূর্যাস্ত ও ইতিহাসের প্রশংসা করে বিখ্যাত Ode an den Zürichsee (Ode to Lake Zurich বা জুরিখ হ্রদের প্রতি স্তবগান) গীতিমূলক সাহিত্যকর্ম বা কবিতাটি উৎসর্গের মাধ্যমে অমর করে রেখেছেন । 

এই গুণী প্রাণপুরুষ অনেক আবেগপূর্ণ স্তোত্র ও দেশাত্মবোধক কবিতা রচনা করেন যা জার্মান ভাষা এবং সংস্কৃতির বিশুদ্ধতা তুলে ধরে । তিনি জার্মান ষড়্মাত্রিক কবিতা বা চরণের ছন্দকে জনপ্রিয় করে তোলেন । তার লেখনীতে আবেগ, মুক্ত ছন্দ এবং জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রকাশ পায়, যা প্রবল আবেগ ও মানসিক অশান্তি হিসেবে পরিচিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক 'ঝড় ও চাপ' (Sturm und Drang বা Storm and Stress) আন্দোলনকে পরবর্তীকালে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল । 

ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টক তার গীতিকাব্যগুলোতে স্বতন্ত্র প্রতিভা প্রদর্শনের অনেক সুযোগ পেয়েছিলেন ।এর মধ্যে কয়েকটি নর্ডিক পৌরাণিক অনুপ্রেরণায় রচিত হয়েছে এবং কিছু সংখ্যকে ধর্মীয় বিষয়বস্তুর ওপর জোর দিয়েছেন । তার সবচেয়ে বিখ্যাত এবং অনূদিত গীতিকাব্য বা স্তবগানগুলোর মধ্যে রয়েছে: An Fanny, Der Zürchersee, Die tote Klarissa, An Cidli, Die beiden Musen, Der Rheinwein, Die frühen Gräber, Mein Vaterland ইত্যাদি । তবে ধর্মীয় গীতিকাব্যগুলোর বেশিরভাগই স্তোত্রের আকারে রচিত, যার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর হচ্ছে Die Frühlingsfeier (The Spring Festival বা বসন্ত উৎসব) । তিনি এই গীতিকাব্য বা কবিতায় ঝড়ের মত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে ঈশ্বরের উপস্থিতি ও মহিমান্বিত রূপ চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন । সাধারণত জার্মানিতে বসন্তকাল উদযাপনের সময় যেকোনো অনুষ্ঠান বা উৎসবে এই Frühlingsfest শব্দটি ব্যবহৃত হয় । 

ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টক খ্রিস্টান বাইবেলের প্রথম ও প্রাচীনতম অংশ Old Testament এর ইতিহাস থেকে তার উপাদান গ্রহণ করে কিছু নাটক রচনা করেছেন । এগুলো তার সমগ্র কর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ । যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে রচিত বিখ্যাত ধ্রুপদী বিয়োগান্তক নাটক Der Tod Adams (The death of Adam বা আদমের মৃত্যু) । ভাবাবেগপূর্ণ এই নাটকে বাইবেলীয় চরিত্র প্রথম মানব হযরত আদম (আ.) এর পরিবার, তার সন্তান, সেই সময়ের ধর্মীয় ও নৈতিক দ্বন্দ্ব, আদম (আ.) এর জীবনের শেষ মুহূর্ত এবং তার মৃত্যুর পরের পরিস্থিতি এখানে তিনি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন । এছাড়া, ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে Salomo (সলোমন) নামক ধর্মোপদেশমূলক তার আরেকটি নাটক প্রকাশিত হয় । ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টক এই বিষাদময় নাটকে রাজা সলোমনের মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক দ্বিধাদ্বন্দ্বকে তুলে ধরেছেন । বিশেষত ঈশ্বরের প্রতি রাজার ভক্তি, বিশ্বাস, আবেগ, ঐশ্বরিক আইন, আধ্যাত্মিক বিশুদ্ধতা, রাজকীয় ক্ষমতা এবং রাজত্বকালের পার্থিব প্রলোভন ইত্যাদি এক জটিল অভ্যন্তরীণ সংগ্রামকে তিনি উপস্থাপন করেছেন । নাটকটিকে জার্মান Sturm und Drang (Storm and Stress বা ঝড় ও চাপ) যুগের সাহিত্যের একটি প্রধান উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় । 

১৭৫৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টকের বিখ্যাত জার্মান ভাষার খ্রিষ্টীয় স্তোত্র বা স্তবগান Der am Kreuz ist meine Liebe (ক্রুশের উপর যিনি আছেন তিনিই আমার প্রেম বা He on the Cross is my love) । ছয়টি পদে বিভক্ত এই স্তোত্রটিতে যিশুর করুণ দুঃখভোগের প্রতি এক গভীর ভক্তিভাব তুলে ধরা হয়েছে, যার প্রথম পদটি হচ্ছে 'যিনি ক্রুশের উপর আছেন তিনিই আমার প্রেম' । এই স্তোত্রটি ছাড়াও তার আরো কিছু গীতিকাব্য এবং স্তোত্র প্রকাশিত হয়েছে, যা গত ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের ক্যাথলিক স্তোত্রসংগ্রহ Gotteslob এর একটি সংক্ষিপ্ত ও পরিমার্জিত অংশ । 

টিউটোবার্গ বনের যুদ্ধকে (Battle of the Teutoburg Forest) কেন্দ্র করে ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টকের রচিত Hermanns Schlacht (হারম্যানের যুদ্ধ) হচ্ছে একটি ঐতিহাসিক জার্মান নাটক । ৯ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত এই যুদ্ধে জার্মানির চেরাস্কি (Cherusci) উপজাতির নেতা Arminius (যিনি হারম্যান নামেও পরিচিত) এর নেতৃত্বে শক্তিধর রোমান জেনারেল ভ্যারাসের (Varus) নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে । 

১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত Die deutsche Gelehrtenrepublik (জার্মান পণ্ডিতদের প্রজাতন্ত্র) হচ্ছে ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টকের একটি যুগান্তকারী রচনা । এটি একটি কাল্পনিক-ব্যঙ্গাত্মক প্রবন্ধ, যেখানে তিনি জার্মান সাহিত্যের পুনরুজ্জীবন এবং স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরিতে তার নিজস্ব  দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পায় । এই প্রবন্ধে ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টক সাহিত্যের শৈল্পিক মানোন্নয়ন, সাহিত্যিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা এবং লেখকদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পণ্ডিত, বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী ও কবিদের নিয়ে একটি স্বাধীন প্রজাতন্ত্রের কথা প্রস্তাব করেছিলেন । 

ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টক তার কয়েকটি অনন্য সৃষ্টিকর্মের জন্য ভাষাতত্ত্ব এবং জার্মান কবিতার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত আছেন । যেমন, ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে Fragmente über Sprache und Dichtkunst (ভাষা এবং কবিতার খণ্ডাংশ) নামে তার একটি প্রবন্ধ ও চিন্তাসমগ্র প্রকাশিত হয় । জার্মান ভাষার বানান পদ্ধতি ও শব্দগঠন কিভাবে আরো নিখুঁত ও পরিমার্জিত করা যায় এবং কবিতা রচনার ক্ষেত্রে ভাষা ব্যবহার, ছন্দ ও ভাব প্রকাশ কতটা শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন তা এই প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে । এছাড়া, ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে জার্মান ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে তার একটি কার্যকরী পদ্ধতি বা অনুশীলনমূলক বই Grammatische Gespräche (ব্যাকরণগত কথোপকথন) প্রকাশিত হয় । ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে রচিত হয় বিখ্যাত জার্মান ঐতিহাসিক দেশাত্মবোধক নাটক Hermann und die Fürsten (হারম্যান ও রাজপুত্ররা বা রাজন্যবর্গ) । এই নাটকে প্রাচীন জার্মানির চেরুস্কি উপজাতির একজন মহান বীর ও নেতা Hermann (যিনি Arminius নামেও পরিচিত) এর বীরত্বপূর্ণ কীর্তিগাথা রচিত হয়েছে, যিনি রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে জার্মান উপজাতিদের একত্রিত করে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন । এটি রোমানদের বিরুদ্ধে জার্মান জাতির ঐক্যের প্রতীক হিসেবে 'হারম্যান' ও অন্যান্য জার্মান রাজাদের সংগ্রাম নিয়ে রচিত একটি পদ্য নাটক । নাটকটি জার্মান জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলতে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে । 

ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টকের কাব্যিক শব্দভাণ্ডারের সমৃদ্ধি এবং ছন্দশাস্ত্রের প্রতি মনোযোগ তার পরবর্তী কবিদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হয়েছিল । ধ্রুপদী ফরাসি আলেকজান্দ্রিন থেকে উদ্ভূত স্বতন্ত্র ধরণের পদ্যের পংক্তি আলেকজান্দ্রীয় ছন্দের প্রতি একচেটিয়া আগ্রহ থেকে জার্মান কবিতাকে মুক্ত করার মাধ্যমে তিনি জার্মান সাহিত্যে একটি নতুন যুগের প্রতিষ্ঠাতা হয়েছিলেন- যার ফলে জার্মান নাট্যকার, কবি, দার্শনিক ও ঐতিহাসিক Johann Christoph Friedrich von Schiller (Friedrich Schiller) এবং আরেকজন জার্মান লেখক, কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রনায়ক, নাট্য-পরিচালক ও সমালোচক Johann Wolfgang von Goethe শৈল্পিকভাবে তার কাছে ঋণী ছিলেন । এছাড়া, নরওয়েজীয়-ড্যানিশ সুরকার Sigrid Ingeborg Henriette Wienecke ইতিহাসের এই কীর্তিমান লেখক ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টকের রচনা থেকে তার সঙ্গীতধর্মী জনপ্রিয় স্তোত্র বা নাটক Fader Vor (প্রভু যিশুর প্রার্থনা বা Lord's Prayer) এর জন্য মূল পাঠ্য গ্রহণ করেছিলেন । 

কবি ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টক ওক গাছকে জার্মানির প্রতীক হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলেন এবং এটিকে প্রাচীন জার্মানিক জাতিগোষ্ঠী বা উপজাতিদের সাথে সংযুক্ত করে এক দৃঢ় সেতুবন্ধন তৈরি করেন । তার সম্মানে বেশ কয়েকটি প্রাচীন ওক গাছের নামকরণ 'Klopstock Oaks' করা হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনের ঐতিহাসিক Kongens Lyngby শহরে অবস্থিত হাঁটা ও সাইকেল চলাচলের জন্য Prinsessestien পথের উপর একটি ৮০০ বছরের পুরোনো গাছ, যেখানে তিনি সময় কাটিয়েছিলেন । 


কবিতা: তোমার নিদ্রা

কবি: ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টক 

অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল 


সে ঘুমিয়ে আছে । 

ওহ তার কোমল হৃদয়ে ঢেলে দাও সুবাসিত জীবনের পক্ষল ঘুম! 

স্বর্গের আদি উৎস থেকে

স্বচ্ছ স্ফটিকের মত ফোঁটাটি তুলে নাও! 

এবং তাকে যেতে দাও, যেখানে গালের লালচে ভাব পালিয়ে গিয়েছে, 

সেখানে সুগন্ধে গলে যাক! আর তুমি, 

ওহ শ্রেষ্ঠ পুণ্য ও ভালোবাসা শান্তিতে থাকুক, 

হে অলিম্পাস, তোমার লাবণ্যের ডানা দিয়ে সিডলিকে ঢেকে দাও । 

কি গভীর ঘুমে সে মগ্ন, কি নিস্তব্ধ! 

ওহ বীণা'র নরম সুর, তুমিও নীরব হও!

তোমার লরেল চারাটি নেতিয়ে পড়ে,

যখন তুমি ঘুম থেকে তোতলিয়ে ওঠো, সিডলি!


* তথসূত্র: গুগল, উইকিপিডিয়া 

ছবি: www.nzz.ch (Jens Juel এর আঁকা ছবি) ।

Monday, 13 July 2026

তোমার নিদ্রা [কবি: ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টক]

Your slumber

by Friedrich Gottlieb Klopstock


She sleeps. O pour her, slumber, winged

Balsamic life over her gentle heart!

From Eden's pristine source

Scoop the clear, crystalline drop!

And let him, where the redness of the cheek escaped,

There fragrantly thaw! And you, oh better

virtue and love rest,

Grace of thy Olympus, cover

With your Fittig Cidli. how she slumbers

How silent! Be silent, O softer string itself!

Your laurel sprout wilts,

When you lisp out of slumber, Cidli! 

তোমার নিদ্রা

কবি: ফ্রিডরিখ গটলিব ক্লোপস্টক 

অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল 


সে ঘুমিয়ে আছে । 

ওহ তার কোমল হৃদয়ে ঢেলে দাও সুবাসিত জীবনের পক্ষল ঘুম! 

স্বর্গের আদি উৎস থেকে

স্বচ্ছ স্ফটিকের মত ফোঁটাটি তুলে নাও! 

এবং তাকে যেতে দাও, যেখানে গালের লালচে ভাব পালিয়ে গিয়েছে, 

সেখানে সুগন্ধে গলে যাক! আর তুমি, 
ওহ শ্রেষ্ঠ পুণ্য ও ভালোবাসা শান্তিতে থাকুক, 

হে অলিম্পাস, তোমার লাবণ্যের ডানা দিয়ে সিডলিকে ঢেকে দাও । 

কি গভীর ঘুমে সে মগ্ন, কি নিস্তব্ধ! 

ওহ বীণা'র নরম সুর, তুমিও নীরব হও!

তোমার লরেল চারাটি নেতিয়ে পড়ে,

যখন তুমি ঘুম থেকে তোতলিয়ে ওঠো, সিডলি! 

Wednesday, 8 July 2026

অনুপস্থিতি, কবি: পাবলো নেরুদা

Absence

by Pablo Neruda 


I have scarcely left you

When you go in me, crystalline,

Or trembling,

Or uneasy, wounded by me

Or overwhelmed with love, as

when your eyes

Close upon the gift of life

That without cease I give you.

My love,

We have found each other

Thirsty and we have

Drunk up all the water and the Blood,

We found each other

Hungry

And we bit each other

As fire bites,

Leaving wounds in us.

But wait for me,

Keep for me your sweetness.

I will give you too

A rose.

--------

প্রেম ও বিপ্লবের কবিতার জন্য বিশ্বখ্যাত এবং চিলির কূটনীতিক, রাজনীতিক ও নোবেলজয়ী জনপ্রিয় কবি পাবলো নেরুদার (রিকার্দো এলিসের নেফতালি রেইয়েস বাসোয়ালতো) একটি কবিতা: 

অনুপস্থিতি  

পাবলো নেরুদা 

অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল 

----------------------------------------

আমি সবেমাত্র তোমাকে ছেড়ে এসেছি

তুমি যখন আমার ভিতরে প্রবেশ করো, 

স্ফটিকের মত,

না হয় কম্পিত হয়ে, 

কিংবা অস্বস্তিতে, আমার দ্বারা আহত হয়ে 

নয়তো প্রেমে অভিভূত হয়ে, 

ঠিক যখন তোমার চোখ বন্ধ হয়  

জীবনের সেই উপহারের উপর

যা আমি তোমাকে নিরন্তর দিয়ে যাই ।

আমার ভালোবাসা,

আমরা একে অপরকে খুঁজে পেয়েছি 

তৃষ্ণার্ত হয়ে আমরা 

সমস্ত জল আর রক্ত পান করেছি, 

আমরা পরস্পরের দেখা পেয়েছি

ক্ষুধার্ত হয়ে আমরা 

একে অপরকে দংশন করেছি 

আগুনের দংশনের মত,

আমাদের মাঝে ক্ষত রেখে যাচ্ছে ।

কিন্তু আমার জন্য অপেক্ষা করো,

তোমার মাধুর্য আমার জন্য রেখে দিও ।

আমিও তোমাকে দেবো

একটি গোলাপ । 

Thursday, 25 June 2026

যে চোখগুলো শেষবার আমি অশ্রুসিক্ত দেখেছিলাম কবি: টি.এস. এলিয়ট

আমেরিকার নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক, সাহিত্য সমালোচক এবং বিংশ শতকের অন্যতম প্রতিভাশালী ও ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম কবি হচ্ছেন T.S. Eliot (Thomas Stearns Eliot) । তিনি ইংরেজি ভাষার আধুনিকতাবাদী কবিতার একজন অগ্রণী ব্যক্তিত্ব ছিলেন । যেখানে তিনি তার ভাষা, লেখনী শৈলী এবং শ্লোক বা পদ্য গঠনের কৌশল ব্যবহারের মাধ্যমে এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন । সমসাময়িক কবিতায় তার অগ্রণী ভূমিকা ও অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে তাকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয় । কবি টি.এস. এলিয়টের একটি বিখ্যাত কবিতা হচ্ছে "যে চোখগুলো শেষবার আমি অশ্রুসিক্ত দেখেছিলাম" (Eyes That Last I Saw in Tears) । এটি একটি অসামান্য আধুনিক কবিতা । কবিতাটি ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় এবং পরবর্তীতে কবি এটিকে Doris's Dream Songs এর অন্তর্ভুক্ত করেন । কবিতাটি মূলত শোক, স্মৃতি এবং মানসিক দূরত্ব নিয়ে একটি মর্মস্পর্শী রচনা । কবি তার প্রিয়জনের বিদায়ের মুহূর্তের কথা স্মরণ করেছেন, যখন তার চোখে জল ছিল । অশ্রু মুছে গেলেও, তার চোখের সেই স্থির দৃষ্টি বা অভিব্যক্তি কবির মনে গেঁথে আছে । সেই অশ্রুসিক্ত চোখগুলোর সোনালী স্মৃতি বারবার তার মনের মাঝে ফিরে আসে । মানুষ যখন কাঁদে তখন তার চোখের জল দ্রুত মুছে যায়, কিন্তু সেই কান্নারত চোখের স্মৃতি বা চাহনি মনের গভীরে আরো অনেক বেশি সময় টিকে থাকে । এই কবিতাটিতে সময় এবং স্মৃতির স্থায়িত্বকে বোঝানো হয়েছে । কবি পার্থিব জীবনের একঘেয়েমি, আবেগহীনতা, বিচ্ছিন্নতা, নিঃসঙ্গতা এবং বিবর্ণ সময়কে 'মৃত্যুর স্বপ্নের জগৎ' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন । কবির সবচেয়ে বড় কষ্ট হচ্ছে— তিনি স্মৃতিময় সেই চোখগুলো দেখতে পেলেও, চোখের জল আর দেখতে পান না । এখানে তিনি বিচ্ছেদ বা মৃত্যুর পর স্মৃতিতে থেকে যাওয়া প্রিয়জনের চোখের বেদনাবিধুর রূপ তুলে ধরেছেন । সময়ের সাথে সাথে দুঃখ-বেদনা ম্লান হয়ে গেলেও সেই চোখগুলো কবির কাছে এখনো এক গভীর অনুভূতির প্রতীক এবং এটি তাকে নিজের আত্মিক যন্ত্রণা, সিদ্ধান্তহীনতা ও আবেগের কথা মনে করিয়ে দেয় । কবির মনে হয়, একসময় এই চোখগুলোই হয়তো তাদের আবেগকে ছাপিয়ে যাবে এবং তাদের এই দীর্ঘশ্বাস ও কষ্টকে যেন একপ্রকার উপহাস করবে । 

Eyes That Last I Saw In Tears 

by T S Eliot 

Eyes that last I saw in tears
Through division
Here in death's dream kingdom
The golden vision reappears
I see the eyes but not the tears
This is my affliction
This is my affliction
Eyes I shall not see again
Eyes of decision
Eyes I shall not see unless
At the door of death's other kingdom
Where, as in this,
The eyes outlast a little while
A little while outlast the tears
And hold us in derision. 

-------------------------------------

যে চোখগুলো শেষবার আমি অশ্রুসিক্ত দেখেছিলাম 
কবি: টি.এস. এলিয়ট 
অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল 

যে চোখগুলো শেষবার আমি অশ্রুসিক্ত দেখেছিলাম 
বিভাজনের মধ্য দিয়ে
এখানে মৃত্যুর স্বপ্নরাজ্যে 
স্বর্ণালী সুন্দর দৃশ্য পুনরায় আবির্ভূত হয় 
আমি চোখগুলো দেখি কিন্তু অশ্রু দেখি না 
এটিই আমার যন্ত্রণা 
এটিই আমার পরিতাপ 
যে চোখগুলো আমি আর কখনো দেখবো না 
সিদ্ধান্তের চোখ 
যে চোখগুলো আমি দেখবো না 
তা না হলে মৃত্যুর অন্য রাজ্যের দ্বারপ্রান্তে  
যেখানে, এই রাজ্যের মতই, 
চোখগুলো আরো কিছুটা সময় টিকে থাকে 
কিছুক্ষণের জন্য অশ্রুকেও ছাড়িয়ে যায় 
আর আমাদের উপহাস করে । 


তথ্যসূত্র: গুগল, উইকিপিডিয়া, অলপোয়েট্রি.কম 

কবিতার লিঙ্ক: https://allpoetry.com/Eyes-That-Last-I-Saw-In-Tears 

কবির ছবি: www.ndbooks.com । 


Wednesday, 3 June 2026

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)



প্রত্যাখ্যান
কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো
অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল

প্রিয়তম,
অন্য কোনো জীবনে বা দেশে
আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করেছি
তোমার হাত
তোমার নির্ভীক হাসি
বিদ্রূপাত্মক ।
সেই সব মধুর বাড়াবাড়ি
যা আমি খুব পছন্দ করি ।
কি নিশ্চয়তা আছে
যে আমাদের আবার দেখা হবে,
অন্য কোনো জগতে
ভবিষ্যতের কোনো অনির্ধারিত সময়ে ।
আমি আমার দেহের তাড়নাকে উপেক্ষা করি ।
আরো একটি মধুর সাক্ষাতের
প্রতিশ্রুতি ছাড়া
আমি মরতে রাজি নই ।

''প্রত্যাখ্যান'' কবিতাটি কবি মায়া অ্যাঞ্জেলোর অন্যতম জনপ্রিয় কবিতা । প্রতিভাময়ী এই আমেরিকান কবি, স্মৃতিকথা লেখক, প্রাবন্ধিক, নাগরিক অধিকার কর্মী, ইতিহাসবিদ, অভিনেত্রী, নাট্যকার, প্রযোজক এবং পরিচালক মায়া অ্যাঞ্জেলো (মার্গারিট জনসন) (জন্ম: ৪ এপ্রিল, ১৯২৮ – মৃত্যু: ২৮ মে, ২০১৪) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশৌরি রাজ্যের সেন্ট লুইস শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং বর্ণবৈষম্যপূর্ণ গ্রামীণ আরকানসাস রাজ্যে বেড়ে ওঠেন । তিনি নর্থ ক্যারোলাইনার ওয়েক ফরেস্ট ইউনিভার্সিটিতে আমেরিকান স্টাডিজের রেনল্ডস অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন । মায়া অ্যাঞ্জেলো আমেরিকার আফ্রিকান-আমেরিকান নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অগ্রণী নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র এবং আমেরিকান নাগরিক অধিকার কর্মী ম্যালকম এক্সের সাথে কাজ করেছিলেন । তিনি দশটি সর্বাধিক বিক্রিত বই এবং অসংখ্য ম্যাগাজিনে প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, যার জন্য পুলিৎজার পুরস্কার ও ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ডের মনোনয়ন লাভ করেন । আমেরিকার সাবেক রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটনের অনুরোধে, তিনি ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে তার রাষ্ট্রপতি অভিষেক অনুষ্ঠানে "অন দ্য পালস অফ মর্নিং'' কবিতাটি আবৃত্তি করেন । মায়া অ্যাঞ্জেলো আফ্রিকান-আমেরিকান এবং নারীদের মুখপাত্র হিসেবে সম্মানিত ছিলেন । তার কাজগুলোকে আফ্রিকান-আমেরিকান সংস্কৃতির একটি প্রতিরক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয় । বিশ্বজুড়ে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তার অনন্য রচনাগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় । যদিও, কিছু মার্কিন গ্রন্থাগার থেকে তার বই নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে । মায়া অ্যাঞ্জেলোর সবচেয়ে প্রশংসিত কাজগুলোকে আত্মজীবনীমূলক কল্পকাহিনী হিসেবে আখ্যায়িত করা হলেও, অনেক সমালোচক সেগুলোকে আত্মজীবনী হিসেবেই গণ্য করেন । তিনি এই ধারাটিকে সমালোচনা, পরিবর্তন এবং প্রসারিত করার মাধ্যমে আত্মজীবনীর প্রচলিত কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করার একটি সচেতন প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন । তার বইগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বর্ণবাদ, পরিচয়, পরিবার এবং ভ্রমণের মত বিষয়বস্তু । তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া ।
----------------------------------------


Refusal 

by Maya Angelou 

Translation: Muhammad Asraful Alam Sohel


Beloved,

In what other lives or lands

Have I known your lips

Your Hands

Your Laughter brave

Irreverent.

Those sweet excesses that

I do adore.

What surety is there

That we will meet again,

On other worlds some

Future time undated.

I defy my body's haste.

Without the promise 

Of one more sweet encounter

I will not deign to die. 

-------------------------------------

https://new.allpoetry.com/Refusal

https://www.poetryfoundation.org/poets/maya-angelou 

ছবি: https://britishonlinearchives.com/



Tuesday, 2 June 2026

ওর্ট মেঘ (The Oort Cloud)


ওর্ট মেঘ হচ্ছে আমাদের সৌরজগতের একেবারে বাইরের প্রান্তে অবস্থিত এক বিশাল, অদৃশ্য এবং গোলাকার মেঘ, যা কোটি কোটি বরফময় বস্তু বা ধ্বংসাবশেষ এবং ধুমকেতু দিয়ে তৈরি । এটি মূলত সৌরজগতের দূরবর্তী সীমানা হিসেবে চিহ্নিত হয় । ওর্ট ক্লাউড মেঘ সূর্য থেকে প্রায় ২০০০-১০০০০০ AU (Astronomical unit) (প্রায় ১-২ আলোকবর্ষ) দূরে অবস্থান করছে । ধারণা করা হয়, সৌরজগত সৃষ্টির শুরুর দিকে (প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে) বৃহস্পতি ও অন্যান্য গ্রহের মহাকর্ষীয় টানে এই বরফখণ্ড বা বস্তগুলো সৌরজগতের ভেতরের অংশ থেকে বাইরের দিকে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল । যেসব ধূমকেতু সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে ২০০ বছরেরও বেশি সময় লাগে (যেমন: হ্যালির ধূমকেতু) তাদের বেশিরভাগই এই ওর্ট মেঘ থেকে আসে । এটি এখনো সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যায়নি । কারণ, ওর্ট মেঘ অত্যন্ত দূরে অন্ধকারময় অঞ্চলে অবস্থিত এবং ঠান্ডা বস্তুগুলো অনেক ছোট । ডাচ জ্যোতির্বিজ্ঞানী Jan Oort ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম এই মেঘের অস্তিত্বের তাত্ত্বিক ধারণা দেন । ওর্ট মেঘ আমাদের সৌরজগতের প্রকৃত সীমানার প্রতিনিধিত্ব করে । সৌরজগতের ভেতরের অংশটি পরিচিত মনে হলেও— যেখানে নেপচুন গ্রহ গড়ে প‍্রায় ৩০ AU এবং বামন গ্রহ প্লুটো প্রায় ৪০ AU দূরে অবস্থিত । ওর্ট মেঘ কয়েক হাজার AU দূর থেকে শুরু হয়ে ১০০০০০ AU বা তারও বেশি দূরত্ব পর্যন্ত বিস্তৃত । ১ AU হচ্ছে পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব, যা প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটারের সমান । প্রতি সেকেন্ডে আলো ৩০০০০০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলে এবং প্রায় আট মিনিটে ১ AU দূরত্ব অতিক্রম করে । কিন্তু এই আলো ওর্ট মেঘের ভেতরের প্রান্তে পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে এবং এর বাইরের প্রান্ত ১ আলোকবর্ষেরও বেশি দূরে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে আলো পৌঁছাতে এক বছরেরও বেশি সময় প্রয়োজন হয় । এই বিশালতা আমাদের দৈনন্দিন ধারণাকে ম্লান করে দেয় । ভয়েজার-১ হচ্ছে পৃথিবী থেকে পাঠানো মানবসৃষ্ট রোবোটিক মহাকাশযান বা বিস্ময়কর বস্তু, যেটি ৬৪০০০ কিঃমিঃ/ঘন্টা বা ৪০০০০ মাইল/ঘন্টা গতিতে ভ্রমণরত সবচেয়ে দূরবর্তী আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে তার অনন্য কার্যক্রম পরিচালনা করছে । পৃথিবী থেকে এটি প্রায় ২৫.৪ বিলিয়ন কিলোমিটার (১৫.৮ বিলিয়ন মাইল) বা ১৭০ AU দূরে অবস্থান করছে । ভয়েজার-১ এমন গতিতে চললে ওর্ট ক্লাউডে প্রবেশ করতে এর ৩০০ বছর এবং এটি অতিক্রম করতে ৩০০০০ বছর সময় লাগবে । এখানে সূর্যের মহাকর্ষীয় প্রভাব নাটকীয়ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, যা এই হিমায়িত বস্তুগুলোকে চলমান নক্ষত্র এবং ছায়াপথীয় জোয়ারের বিপরীতে কোনোমতে বেঁধে রেখেছে । আমরা আকাশে যে ধূমকেতুগুলোকে ছুটে যেতে দেখি, সেগুলো প্রায়শই এই দূরবর্তী আধার থেকেই উৎপন্ন হয়, যা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে আলোড়িত হয়ে ভেতরের দিকে ধাবিত হয়েছে । সুতরাং, ওর্ট মেঘ কেবল দূরত্বই নয়, বরং একটি ধারণাগত সীমানাও চিহ্নিত করে । এটি আমাদের সৌরজগতের প্রান্ত গ্রহগুলোকে ছাড়িয়ে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত, যা প্রকাশ করে যে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের মধ্যে আমরা কতটা বিচ্ছিন্ন অথচ সংযুক্ত । ওর্ট মেঘের চরম দূরবর্তীতা সৌরজগতের শ্বাসরুদ্ধকর, প্রায় অকল্পনীয় বিশালতাকেই তুলে ধরে । 

তথ্যসূত্র: Google, Science Acumen 

ছবি: Science Acumen । 

Thursday, 28 May 2026

মঙ্গলে হিমায়িত বরফের ঘূর্ণি


🔴❄️ মঙ্গল হচ্ছে মরুভূমির মত একটি পাথুরে গ্রহ । সূর্য থেকে এই চতুর্থ গ্রহটি কমলা-লাল রঙের জন্য "লাল গ্রহ" নামেও পরিচিত । মঙ্গলের ঘূর্ণন অক্ষ (Axial tilt, মঙ্গলের জন্য ২৫.১৯°, পৃথিবীর জন্য ২৩.৪৫°) আমাদের পৃথিবীর কাছাকাছি কোণে হেলে থাকার কারণে এখানে পৃথিবীর মতই চমৎকার ঋতু পরিবর্তন হয় । এই লাল গ্রহের মাটি ও বায়ুমণ্ডলের পাতলা স্তরে কিছু জলীয় বাষ্প রয়েছে যা কুয়াশা, সিরাস মেঘ, তুষার, পারমাফ্রস্ট এবং বরফ টুপিসহ বৃহত্তর মেরু অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে । কিন্তু গ্রহপৃষ্ঠে কোনো তরল জলের আধার নেই । মঙ্গল গ্রহের একটি পাতলা বায়ুমণ্ডল রয়েছে, যেটি প্রধানত কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস (CO₂) দ্বারা গঠিত । প্রতি বছর শীতকালে উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে এই কার্বন ডাই অক্সাইড বরফ হয়ে জমে থাকার কারণে গ্রহটির মহাকর্ষ পরিবর্তিত হয় । এক গবেষণায় দেখা যায়, দক্ষিণ মেরুর কাছে হিমায়িত কার্বন ডাই অক্সাইডের একটি বিশাল ভান্ডার রয়েছে । গ্রহটির হেলে থাকার কোণ বেড়ে যাওয়ায় এই ভান্ডারের বেশিরভাগই সম্ভবত মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেছিল । আর যখন এমনটা ঘটে, তখন বায়ুমণ্ডল ঘন হয়ে ওঠে, বায়ুপ্রবাহ আরো শক্তিশালী হয় এবং ভূপৃষ্ঠের আরো বৃহত্তর এলাকা জুড়ে তরল জল ধরে রাখা সম্ভব হয় । প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, যদি এই ভান্ডার সম্পূর্ণরূপে গ্যাসে রূপান্তরিত হয় তাহলে মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডলীয় চাপ দ্বিগুণ হয়ে যাবে । প্রতিবছর শীতকালে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন থেকে ৪ ট্রিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল থেকে মেরু বরফ টুপিতে জমে যায় । এটি সমগ্র মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডলের ভরের ১২ থেকে ১৬ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে । একটি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডলে জলের বিভিন্ন আইসোটোপিক রূপের মানচিত্র তৈরি করার পর, উত্তর মেরু অঞ্চলের বরফে HDO (Semi-heavy water) এবং পানির অনুপাত পরিমাপ করে প্রমাণ পেয়েছে যে, মঙ্গল গ্রহে একসময় অন্তত ১৩৭ মিটার গভীর একটি মহাসাগর তৈরি করার মত যথেষ্ট জল ছিল । মেরু অঞ্চলের বরফ পৃথিবীর মহাসাগরের জলের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি ডিউটেরিয়াম সমৃদ্ধ । এর অর্থ হচ্ছে, মঙ্গল গ্রহ আজকের মেরু অঞ্চলে সঞ্চিত জলের চেয়ে ৬.৫ গুণ বেশি পরিমাণ জল হারিয়েছে । এই জল কিছু সময়ের জন্য নিম্নভূমি Vastitas Borealis এবং সংলগ্ন নিম্নভূমিতে (Acidalia, Arcadia এবং Utopia planitiae) মহাসাগর তৈরি করে থাকতে পারে । আর যদি সেই সমস্ত জল কখনো তরল আকারে ভূপৃষ্ঠে উঠে আসে, তবে তা পৃথিবী পৃষ্ঠের ২০ শতাংশ ঢেকে ফেলবে এবং কিছু কিছু জায়গায় এর গভীরতা প্রায় এক মাইল হবে । উল্লেখ্য যে, প্রোটিয়ামের তুলনায় ভারী পরমাণু ডিউটেরিয়াম হচ্ছে হাইড্রোজেনের একটি স্থিতিশীল আইসোটোপ ।
মঙ্গল গ্রহের দুই মেরু অঞ্চলে স্থায়ী বরফ টুপি রয়েছে, যা মূলত জমাট বাঁধা জলীয় বরফ এবং হিমায়িত কার্বন ডাই অক্সাইডের (শুষ্ক বরফ) আস্তরণ দ্বারা গঠিত । এটি একটি স্থায়ী বরফের চাদর । উভয় মেরু টুপিতেই স্তরযুক্ত বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, যাকে মেরু-স্তরযুক্ত সঞ্চয় (Polar Layer Deposit) বলে, যেটি মঙ্গল গ্রহের ধূলিঝড় থেকে আসা ধূলিকণার সাথে বরফের ঋতুভিত্তিক ক্ষয় এবং সঞ্চয়ের ফলে তৈরি হয়েছে । উভয় মেরু টুপিতেই খাঁজকাটা বৈশিষ্ট্যও দেখা যায়, যা সম্ভবত বায়ুপ্রবাহের ধরণ দ্বারা সৃষ্ট । এই খাঁজগুলো ধূলিকণার পরিমাণ দ্বারাও প্রভাবিত হয় । ধূলিকণা যত বেশি, পৃষ্ঠতল তত গাঢ় হয় । পৃষ্ঠতল যত গাঢ় হয়, গলনও তত বেশি হয় । গাঢ় পৃষ্ঠতল বেশি আলোক শক্তি শোষণ করে । মঙ্গল গ্রহের দক্ষিণ মেরুর বরফের স্তর বা টুপিটি (South Polar Cap) উত্তর মেরুর বরফের স্তর বা টুপির (North Polar Cap) তুলনায় অনেক ছোট । দক্ষিণ মেরু অঞ্চলটি উত্তর মেরুর চেয়ে অধিক উচ্চতায় অবস্থিত এবং চরম শীতল, গভীর ও দুর্গম অঞ্চল- যেটি মঙ্গল গ্রহের দক্ষিণ গোলার্ধের Planum Australe নামক এক বিশাল মেরু মালভূমিতে অবস্থিত । দক্ষিণ মেরুর বরফের চাদর বা আচ্ছাদনের ব্যাস প্রায় ৪০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার এবং এর পুরুত্ব প্রায় ৩ কিলোমিটার (৩০০০ মিটার বা ২ মাইল) পর্যন্ত হতে পারে । এই বরফের চাদরে ধূলিকণা এবং বরফের পর্যায়ক্রমিক স্তর রয়েছে, যা গ্রহটির প্রাচীন জলবায়ু ও ঋতু পরিবর্তনের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে । ধারণা করা হয়, দক্ষিণ মেরুর বরফস্তর এবং সংলগ্ন স্তরযুক্ত জমাট বরফের মোট আয়তন প্রায় ১.৬ মিলিয়ন ঘন কিলোমিটার । মঙ্গলীয় শীতকালে দক্ষিণ মেরুতে তাপমাত্রা নাটকীয়ভাবে -১৩০° (ডিগ্রি) সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায় । ফলে, প্রচণ্ড ঠান্ডায় বায়ুমণ্ডলীয় কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস জমে বরফে পরিণত হয় এবং মূল বরফ টুপির উপরে তুষারের মত ঝরে পড়ে আরো একটি শুষ্ক বরফের পাতলা স্তর তৈরি করে, যা আকারে বৃদ্ধি পায় । বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে এই বরফ গলে বায়ুমণ্ডলে বাষ্পীভূত হয়ে যায় এবং এর আয়তন সংকুচিত করে । বরফ টুপির উপরিভাগে শক্তিশালী বাতাসের কারণে এর পৃষ্ঠে গভীর খাদ এবং সর্পিল নকশা সৃষ্টি করে । দক্ষিণের বরফ টুপির নিকটবর্তী কিছু এলাকায় ঋতুগতভাবে বরফ জমার ফলে ভূপৃষ্ঠের উপরে ১ মিটার পুরু স্বচ্ছ ও শুষ্ক বরফের চাঁই তৈরি হয় । বসন্তের আগমনে সূর্যের আলো ভূগর্ভস্থ স্তরকে উষ্ণ করে এবং ঊর্ধ্বপাতিত কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে সৃষ্ট চাপ বরফের চাঁইয়ের নিচে তৈরি হয়, যা এটিকে উপরে তুলে আনে এবং অবশেষে ফাটিয়ে দেয় । যার ফলে, কালো ব্যাসল্টিক বালি (Basaltic sand) বা ধূলিকণার সাথে মিশ্রিত কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসের উষ্ণপ্রস্রবণের মত অগ্ন্যুৎপাত ঘটে । এই প্রক্রিয়াটি দ্রুত- যা কয়েক দিন, সপ্তাহ ও মাসের মধ্যে ঘটতে দেখা যায় । ভূতত্ত্বে, বিশেষ করে মঙ্গল গ্রহের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের হার বেশ অস্বাভাবিক । বরফের চাঁইয়ের নিচে উষ্ণপ্রস্রবণের স্থানে ছুটে আসা গ্যাস মাকড়সার জালের মত বৃত্তাকার প্রণালী তৈরি করে । ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে European Space Agency (ESA) এর Mars Express Orbiter থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ইতালীয় বিজ্ঞানীরা জানান যে, এই মেরু অঞ্চলের বরফের স্তরীভূত সঞ্চয়ের পৃষ্ঠ থেকে ১.৫ কিঃমিঃ বা ০.৯৩ মাইল গভীরে (দৃশ্যমান স্থায়ী বরফের টুপির নিচে নয়) অবস্থিত বরফ ও ধূলিকণার স্তরের নিচে চাপা পড়া তরল লবণাক্ত পানির হ্রদ বা জলাধার বা জটিল জলজ ব্যবস্থার অস্তিত্ব থাকতে পারে । হ্রদটি প্রায় ২০ কিলোমিটার বা ১২ মাইল প্রশস্ত । যদি এটি নিশ্চিত হয়, তাহলে এটি হবে গ্রহটিতে প্রথম পরিচিত স্থিতিশীল জলাশয় । তবে, তরল জলের পরিবর্তে কঠিন খনিজ বা লবণাক্ত বরফও থাকতে পারে । Chasms Australe হচ্ছে একটি প্রধান উপত্যকা, যা দক্ষিণ মেরু টুপির স্তরীভূত সঞ্চয়ের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত । এটি প্রায় ১০০ কিলোমিটার চওড়া এবং ২ কিলোমিটার পর্যন্ত গভীর, যা পৃথিবীর গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের চেয়েও গভীর । ৯° পূর্ব দিকে এই সঞ্চয়গুলো Prometheus নামক একটি প্রধান অববাহিকার উপর অবস্থিত । দক্ষিণ মেরুর কিছু স্তরে আয়তক্ষেত্রের আকৃতির বহুভুজীয় ফাটলও দেখা যায় । মনে করা হয় যে, ভূপৃষ্ঠের নিচে জলীয় বরফের প্রসারণ এবং সংকোচনের কারণে এই ফাটলগুলো তৈরি হয়েছে । দক্ষিণ মেরুর চারপাশে হিমবাহের বরফ গলে গিয়ে তৈরি হওয়া Dorsa Argentea Formation নামে এক বিশাল দীর্ঘ ও আঁকাবাঁকা শৈলশিরা (Esker) বিদ্যমান । এটি একটি দানব মেরু বরফ চাদরের অবশেষ বলে ধারণা করা হয়, যেটি প্রায় ১.৫ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল । এই এলাকাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস রাজ্যের আয়তনের দ্বিগুণ ।
দক্ষিণের বরফ টুপি স্থানচ্যুত । অর্থাৎ, এটি দক্ষিণ মেরুতে কেন্দ্র করে নেই । দক্ষিণের ঋতুগত টুপি ভৌগোলিক মেরুর কাছাকাছি কেন্দ্র করে থাকে । গবেষণায় দেখা গেছে যে, একপাশের তুলনায় অন্যপাশে বেশি তুষারপাত হওয়ার কারণে কেন্দ্রচ্যুত টুপিটি গঠিত হয় । দক্ষিণ মেরুর প্রভাবশালী হেলাস বেসিন অববাহিকার (Hellas Basin বা Hellas Planitia) কারণে বায়ুপ্রবাহ পরিবর্তিত হওয়ায় একটি নিম্নচাপ ব্যবস্থা তৈরি হয় । বিস্ময়কর এই ব্যবস্থা অনেক বেশি তুষারপাত ঘটায় । অন্যদিকে, কম তুষারপাত এবং বেশি হিম থাকে । গ্রীষ্মকালে তুষার বেশি সূর্যালোক প্রতিফলিত করে, তাই খুব বেশি গলে না বা ঊর্ধ্বপাতিত হয় না (মঙ্গল গ্রহের জলবায়ু তুষারকে সরাসরি কঠিন থেকে গ্যাসে পরিণত করে) । অন্যদিকে, হিমের পৃষ্ঠ আরো অমসৃণ এবং বেশি সূর্যালোক আটকে রাখে, যার ফলে বেশি ঊর্ধ্বপাতন ঘটে । যে অঞ্চলে বেশি অমসৃণ হিম থাকে, সেই অঞ্চলগুলো উষ্ণতর হয় । মঙ্গলের মহাজাগতিক বিকিরণ উচ্চমাত্রায় ।
যাই হোক, এই ছবিতে মঙ্গল গ্রহের হিমায়িত দক্ষিণ মেরু দেখতে প্রায় অবাস্তব মনে হলেও বরফাবৃত সর্পিল আকৃতিটি একেবারেই বাস্তব । হয়তো, এই স্তরগুলোর নিচে লুকিয়ে আছে মঙ্গল গ্রহের প্রাচীন জলবায়ুর সূত্র এবং সম্ভবত ভূগর্ভস্থ জলও । মানুষ কি কোনোদিন এখানে গবেষণা কেন্দ্র তৈরি করবে? 🚀

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, গুগল
ছবি: Beyond Space । 

Saturday, 16 May 2026

অ্যান্টার্কটিকার সমুদ্রে জেগে উঠেছে নতুন দ্বীপ




সম্প্রতি, বিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক দল অ্যান্টার্কটিকার হিমশীতল ওয়েডেল সাগরে ঝুঁকিপূর্ণ একটি এলাকায় গবেষণা করার সময় নতুন একটি দ্বীপ আবিষ্কার করেছে, যা এর আগে বিশ্বের কোনো মানচিত্রেই এটি চিহ্নিত ছিল না । বিস্ময়কর প্রকৃতি কখনো কখনো বরফাবৃত অ্যান্টার্কটিকায় এমন সব রহস্য উন্মোচন করে যে বিজ্ঞানীরাও অবাক হয়ে যান । তাদের এই আবিষ্কারটি এখন বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে । আলফ্রেড ভেগেনার ইনস্টিটিউটের জার্মান গবেষণা বা বরফভাঙা জাহাজ পোলারস্টার্নে থাকা ৯৩ জন সদস্যের আন্তর্জাতিক দলটি গত ৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে অ্যান্টার্কটিকার উত্তর-পশ্চিম ওয়েডেল সাগর এলাকায় সমুদ্রের স্রোত, বরফ গলে যাওয়া এবং জলরাশির মানচিত্র তৈরি করছিল । হঠাৎ খারাপ আবহাওয়ার কারণে গবেষণা কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ করে তারা জয়েনভেল্লি আইল্যান্ডে আশ্রয় নেয়ার সময় একটি দ্বীপ দেখতে পান এবং এই অংশটি নৌ-মানচিত্রে আগে কেবল একটি "রহস্যময় ও বিপজ্জনক এলাকা" হিসেবে চিহ্নিত করা ছিল । প্রথমে এটিকে ময়লা জমে থাকা একটি হিমশৈল (Iceberg) মনে হচ্ছিল । পরে যখন বরফ ও হিমবাহ গলতে শুরু করে তখন জানা যায় যে, এটি আসলে একটি ভূখণ্ড বা পাথুরে দ্বীপ । অ্যান্টার্কটিকায় দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রের বরফ স্থিতিশীল ছিল । কিন্তু গত ১০ বছরে এর অনেক পরিবর্তন ঘটেছে । জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অ্যান্টার্কটিকায় বাতাসের ধরণ বা গতিপথ বদলে যাচ্ছে । ফলে, ঠান্ডা পানি ও বরফ সরে যায় এবং গভীর সমুদ্রতলের উষ্ণ জল উপর দিকে উঠে এসে বরফ গলিয়ে দিতে সাহায্য করে । ঠিক যেন চুলার মত কাজ করে । বিজ্ঞানীরা দ্বীপটির আকার ও অবস্থান মানচিত্রায়নের জন্য একটি ড্রোন এবং একটি ইকো সাউন্ডার ব্যবহার করেছেন । ইকো সাউন্ডার হচ্ছে এমন একটি যন্ত্র যা পানির নিচে দূরত্ব মাপার জন্য শব্দ তরঙ্গ নির্গত করে । বিজ্ঞানীদের হতবাক করে তাদের অনুসন্ধানে দেখা যায় যে, দ্বীপটি আশ্চর্যজনকভাবে বড়— এর দৈর্ঘ্য গিজার মহা পিরামিডের (The Great Pyramid of Giza) প্রায় সমান বলে অনুমান করা হয় । গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, দ্বীপটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬ মিটার উঁচু, প্রস্থ ৪০ মিটার এবং দৈর্ঘ্যে ১৩০ মিটার । এই প্রথমবারের মত ভূখণ্ডটির জরিপ এবং নথিভুক্ত করা হলো । তবে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত নন যে, কেন দ্বীপটিকে নৌ-মানচিত্রে বিপদসীমার মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছিল ।  অথচ অন্যান্য ডেটা সেটে এটিকে উপকূলরেখা হিসেবে দেখানো হয়নি । আরো বিস্ময়ের বিষয় যে, মানচিত্রে নতুন আবিষ্কৃত দ্বীপটির অবস্থান প্রকৃত অবস্থান থেকে প্রায় এক মাইল দূরে দেখানো ছিল । স্যাটেলাইট চিত্রগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, বরফে ঢাকা থাকার কারণে দ্বীপটিকে তার আশেপাশের ভাসমান অসংখ্য হিমশৈল থেকে আলাদা করে চেনা প্রায় অসম্ভব ছিল । নতুন আবিষ্কৃত এই দ্বীপটির এখনো কোনো নাম দেয়া হয়নি । গবেষক দল জানিয়েছে, দ্বীপটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করার পর ভবিষ্যতে এর নামকরণ করা হবে । এদিকে অনেক সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা এর নাম রাখার পরামর্শ দিয়েছেন যেমন: (ক) আইসবার্গ (খ) লুমারল্যান্ড (গ) পাখিদের মিলন দ্বীপ । ভেনিস উপকূলের কাছে আরেকটি গোপন ক্ষুদ্র দ্বীপের আবির্ভাবের পর এই নতুন দ্বীপ আবিষ্কার হলো । তবে, আবিষ্কৃত এই দ্বীপ ঘিরে অনেক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং এর মালিকানা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে । সবচেয়ে কৌতুহলোদ্দীপক প্রশ্ন হচ্ছে: যে বিজ্ঞানীরা এই দ্বীপ খুঁজে পেয়েছেন, তারা বা তাদের দেশ কি এই দ্বীপটির মালিকানা দাবি করতে পারবেন? আন্তর্জাতিক আঞ্চলিক জলসীমা ও সার্বভৌমত্ব বা সমুদ্র আইন (UNCLOS) অনুযায়ী, এর উত্তর হচ্ছে না । আইনে বলা আছে, একটি উপকূলীয় দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে সর্বোচ্চ ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত অঞ্চলকে ‘একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল’ (Exclusive Economic Zone বা EEZ) বলা হয় । যদি এই সীমার মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে কোনো দ্বীপ সৃষ্টি হয়, তাহলে ঐ নতুন দ্বীপের উপর কেবলমাত্র সেই নিকটবর্তী দেশেরই সার্বভৌম অধিকার থাকবে । ২০০ নটিক্যাল মাইলের পর বাইরের সমুদ্র এলাকাকে আন্তর্জাতিক জলসীমা বা উচ্চ সাগর (High Seas) বলা হয় । এটি Common Heritage of Mankind বা সমগ্র মানবজাতির সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয় । ফলে, এই জলসীমায় কোনো দেশ বা ব্যক্তি এককভাবে এর মালিকানা বা সার্বভৌমত্ব দাবি করতে পারে না । তাই, এখানে সৃষ্ট কোনো নতুন দ্বীপে কোনো ব্যক্তি নিজেকে সেই দ্বীপের রাজা ঘোষণা করতে পারেন না । আন্তর্জাতিক জলসীমায় যদি কোনো ব্যক্তি কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করে নিজেকে রাজা ঘোষণা করে, তবে UNCLOS এর আইন অনুসারে সেই দ্বীপের নিজস্ব কোনো জলসীমা বা সার্বভৌমত্বের মর্যাদা থাকে না । বিশ্বের কোনো দেশই সেই তথাকথিত দ্বীপ বা রাজ্য বা ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না । বিজ্ঞানীদের মতে তিনটি কারণে যেমন: (ক) সমুদ্রের গভীরে থাকা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে বের হওয়া লাভা ধীরে ধীরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরে উঠে এসে জলের সংস্পর্শে ঠান্ডায় জমে গিয়ে সেটি দ্বীপ সৃষ্টি করে (খ) পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্লেটগুলোর সংঘর্ষ বা সরে যাওয়ার ফলে বিশেষ করে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণে সমুদ্রের তলদেশের ভূমি উপরে উঠে দ্বীপ তৈরি করে (গ) সমুদ্রের স্রোতের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে বালি ও মাটি জমে ছোট ছোট দ্বীপ বা চরের সৃষ্টি করে । 

তথ্যসূত্র: www.dw.com, www.thesun.ie 

ছবি: www.thesun.ie [Image credit: (Alfred Wegener Institute / Simon Dreutter), Christian Haas] ।

Friday, 15 May 2026

সোনারং মন্দির



মুন্সিগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ী উপজেলার সোনারং ইউনিয়নের সোনারং গ্রামে অবস্থিত এই জোড়া মন্দিরটি অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রাচীন বাংলার এক অপূর্ব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন । মুন্সীগঞ্জ তথাপি প্রাচীন বিক্রমপুরের এই মন্দির ১৮৯ বছরের ঐতিহ্যের জৌলুস হারিয়ে এখনো মাথা উঁচু করে কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । পাশাপাশি অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন মন্দিরটি স্থানীয়ভাবে 'জোড়া মঠ' নামে পরিচিত । সোনারং গ্রামে এক সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল । মন্দিরের একটি প্রস্তরলিপি থেকে জানা যায় যে, স্থানীয় জমিদার রূপচন্দ্র সেন ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে কালী মন্দির এবং ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে আরেকটি শিব মন্দির নির্মাণ করেন । এটি জোড়া মন্দির হলেও দুইটি মন্দিরের উচ্চতা এবং স্থাপত্য গঠনে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে । অষ্টভুজ আকৃতির বিশিষ্ট মন্দিরটি দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ২১ ফুট এবং এর দেয়াল বেশ পুরু । মন্দির দুইটির অভ্যন্তরীণ ছাদ নিচু এবং গোলাকার গম্বুজ আকৃতির । ৫.৩৫ মিটার বর্গাকার স্থানে নির্মিত পশ্চিমের কালী মন্দিরটি বৃহৎ, এর উচ্চতা প্রায় ১৫ মিটার (প্রায় ৫০ ফুট) এবং পূবের শিব মন্দিরটি ছোট । কালী মন্দিরের প্রধান উপাসনালয় কক্ষের সাথে ১.৯৪ মিটার এবং শিব মন্দিরের প্রধান উপাসনালয় কক্ষের সাথে ১.৫ মিটার প্রশস্তের বারান্দা আছে । মন্দিরের বাহির ও ভেতরে অসাধারণ কারুকাজে সজ্জিত । মূলত ইট, চুন এবং সুরকি দ্বারা নির্মিত এই মন্দিরটি প্রাচীন খিলান, সূক্ষ্ম কারুকাজ, কুণ্ডলিত চূড়া এবং এর নকশা তৎকালীন স্থাপত্যশৈলীর অনন্য চিহ্ন বহন করছে । কথিত আছে যে, শ্রী রূপচন্দ্র সেনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এখানেই সম্পন্ন হয়েছিল । এছাড়া, মন্দিরের সম্মুখভাগে রয়েছে একটি বিশাল বড় পুকুর । কালী মন্দিরটি তৈরি করার সময় এই পুকুর খনন করা হয় । কালী মন্দিরের সুউচ্চ শিখরে দন্ডায়মান ত্রিশূলটি কিছুটা বাঁকা হয়ে আছে । ধারণা করা হয়, তীব্র বাতাস বা বজ্রপাতের প্রভাবে এটি এমন হয়েছে । বিস্ময়কর এই মন্দিরের চূড়ার ছোট ছোট গর্তগুলো নীলকণ্ঠ, ঘুঘু, মাছরাঙা, শালিক, টিয়া এবং পায়রাসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাসস্থল, যেখানে তারা উচ্চস্বরে কোলাহল করে । চোর বা দুর্বৃত্তরা এই মন্দিরের পাথর, শিবলিঙ্গ, কষ্টিপাথরের কলস এবং বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যায় । দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন এবং অবহেলায় পড়ে থাকার পর, বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগে কিছুদিন আগে সংস্কারের পর অত্যন্ত সুন্দর এই মন্দিরটি এখন এক নতুন রূপ ধারণ করেছে । কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া মন্দিরের সেই অতীত চেহারা পুনরায় আবির্ভূত হওয়ায় মানুষের সাথে এর নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়েছে । জানি না, এর মধ্যে কি এক দুর্নিবার আকর্ষণ লুকিয়ে আছে । নিপুণ কারুকার্যে অনবদ্যভাবে নির্মিত মন্দিরের নান্দনিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি পরম প্রশান্তি এনে দেয় । পবিত্র এই মন্দিরটি দীর্ঘকালের অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং অজানা রহস্যকে ধারণ করে আছে, যা প্রাচীন বিক্রমপুরের এক দুর্লভ ও সমৃদ্ধ ইতিহাসের অংশ । আমি মনে করি, সোনারং মন্দিরের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং পর্যটন ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হলে এটি হবে মুন্সীগঞ্জ জেলার অন্যতম ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান । উল্লেখ্য যে: কালজয়ী বাঙালি, প্রগতি লেখক ও শিল্পী সমিতি 'উদীচী সাংস্কৃতিক সংগঠন' এর প্রতিষ্ঠাতা, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি বিপ্লবী, সাহিত্যিক এবং শ্রমিক সংগঠক সত্যেন সেন এই সোনারং গ্রামেই হিন্দু সেন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ।  

তথ্যসূত্র: আন্তর্জাল (গুগল, উইকিপিডিয়া) । 

ছবি: নিজ ।

Wednesday, 1 April 2026

জংলি ঢেঁড়স

 


জংলি ঢেঁড়স হচ্ছে গুল্মজাতীয় বুনো ভেষজ উদ্ভিদ । এর বৈজ্ঞানিক নাম: Abelmoschus moschatus এবং সমনাম Hibiscus abelmoschus । এটি Malvaceae পরিবারের অন্তর্গত একটি ক্রান্তীয় এশীয় বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ । এই উদ্ভিদের সুন্দর ফুল অত্যন্ত আকর্ষণীয় । গ্রীষ্ম, হেমন্ত এবং বসন্তকালে এর ফুল ফোটে । প্রায় জবা ফুলের মত দেখতে অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী এই ফুলগুলো সাধারণত উজ্জ্বল হলুদ, লাল ও গোলাপী রঙের হয় এবং মাঝখানে বেগুনি বা গাঢ় লাল বা গাঢ় খয়েরি আভা থাকে । ফুলগুলো গন্ধহীন এবং ৫টি নমনীয় কোমল পাপড়ি থাকে, যার মাঝে পরাগ অবস্থিত । ফুল ফোটার পর দুপুর না গড়াতেই ফুল ঝিমিয়ে পড়ে । এই উদ্ভিদের ফল অনেকটা ছোট ঢেঁড়সের মত যার শুং বা রোম রয়েছে এবং বীজ থাকে । এই বীজে কস্তুরীর মত তীব্র গন্ধ আছে, যার কারণে এটিকে লতা কস্তুরী বলে । লাতিন ভাষায় Moschatus এর অর্থ হচ্ছে কস্তুরী । বীজের অদ্ভুত মিষ্টি সুগন্ধের জন্যই এটি ঐতিহাসিকভাবে সুগন্ধি (Perfume) তৈরিতে এবং কফিতে স্বাদ যোগ করতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে । আদিবাসী তরুণী বা নারীরা এই বীজকে সুতোয় গেঁথে বাহুতে অলঙ্কার হিসেবে পরিধান করে । পরিপক্ক ফলের বীজ উপযুক্ত সময়ে সংগ্রহ করা না হলে এটি নিজ থেকেই ঝরে পড়ে বংশ বিস্তার করে । আশ্চর্যজনকভাবে এই মূল্যবান ভেষজ উদ্ভিদের রয়েছে অনেক ঔষধি গুণ । ইউনানি, আয়ুর্বেদিক ও হারবাল চিকিৎসায় এটি বহুবিধ ব্যবহৃত হয় । এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ চমৎকার একটি উদ্ভিদ । ফলে, এই গুরুত্বপূর্ণ লতানো উদ্ভিদটি শারীরিক ক্লান্তি, অবসাদ, হৃৎপিন্ডের দুর্বলতা, হাঁপানি, খিঁচুনি, যৌন রোগ, শুক্রস্বল্পতা, শুক্রতারুল্যে, অরুচি, পেট ফাঁপা, বদহজম, কীটনাশক, মুখের দুর্গন্ধ, স্নায়বিক দুর্বলতা, চর্ম রোগ, মূত্রনালীর সমস্যা, দাঁতের গোড়া ফোলা ও ব্যথা, জিহ্বার ঘাঁ, সাপের কামড়ের প্রতিষেধক, শ্লেষ্মা জনিত মাথাব্যথা এবং চোখের অসুখ ইত্যাদি রোগে ব্যবহৃত হয় । তবে, গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানকালে এর ব্যবহার নিরাপদ বলে প্রমাণিত হয়নি । এছাড়া, প্রকৃতির এক দুর্লভ বস্তু মৃগনাভী বা কস্তুরীর বিকল্প হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হয় । বাংলাদেশের অঞ্চলভেদে এর প্রচলিত নাম হচ্ছে: লতা কস্তুরী বা লতা কস্তুরীকা, কল কস্তুরী, কালো কস্তুরী, মুশকদান এবং বন ঢেঁড়স ইত্যাদি । এর অন্যান্য ইংরেজি নাম হচ্ছে: Musk Mallow, Musk Okra, Ambrette, Ornamental Okra, Annual Hibiscus, Yorka Okra, Galu Gasturi, Bamia MoschataRose Mallow এবং Tropical Jewel Hibiscus ইত্যাদি । এই উদ্ভিদের আকার, আকৃতি, ফুল, ফল ও পাতা সবকিছুই প্রায় ঢেঁড়স গাছের মত । বন, জঙ্গল, ঝোপঝাড়, রাস্তা ও রেল লাইনের কিনারায় এটি জন্মে থাকে । বাংলাদেশ, ভারত, দক্ষিণ এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় এই উদ্ভিদের দেখা মেলে । রৌদ্রজ্জল, স্যাঁতসেঁতে এবং উর্বর জায়গায় এটি বেড়ে ওঠে । জংলি ঢেঁড়সের কচি ফল এবং পাতা সবজি হিসেবে খাওয়া যায় । কখনো কখনো এর বীজ অন্যান্য খাদ্যের স্বাদ বাড়াতে ব্যবহৃত হয় । এটি একটি কোমল উদ্ভিদ, ফলে এটিকে তুষারপাত থেকে সুরক্ষা করা প্রয়োজন । শীতল জলবায়ুতে এটি একবর্ষজীবী উদ্ভিদ হিসেবেও চাষ করা হয় । শিল্পক্ষেত্রে এই উদ্ভিদের মূলের আঠালো রস কাগজ তৈরিতে ব্যবহৃত হয় এবং এর ফুল দিয়ে তামাককে সুগন্ধযুক্ত করা হয় । 

ছবি: নিজ 

তথ্যসূত্র: শিক্ষক বাতায়ন, গুগল, আন্তর্জাল । 

Tuesday, 31 March 2026

প্রতিধ্বনি


ক্রিস্টিনা জর্জিনা রোসেটি (Christina Georgina Rossetti) ছিলেন একজন ইংরেজ লেখিকা যিনি রোমাঞ্চকর, ভক্তিমূলক এবং শিশুদের জন্য কবিতা লিখতেন । তার জন্ম ৫ই ডিসেম্বর ১৮৩০ খ্রিঃ এবং মৃত্যু ২৯শে ডিসেম্বর ১৮৯৪ খ্রিঃ । ক্রিস্টিনা রোসেটি ভিক্টোরীয় যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইংরেজ কবিদের মধ্যে একজন । তার দৃষ্টিভঙ্গির গভীরতা, কথ্য ভাষার শৈলী এবং কবিতার গীতিময় গুণ আজও আমাদের কাছে শক্তিশালী আবেদন রাখে এবং অনুপ্রাণিত করে । তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে Goblin Market এবং Remember । এই বিখ্যাত "প্রতিধ্বনি" (Echo) কবিতাটি হচ্ছে তার একটি অনন্য সৃষ্টিকর্ম । ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে এই অসাধারণ কবিতাটি প্রকাশিত হয় । প্রতিধ্বনি একটি বিষাদপূর্ণ প্রেমের কবিতা, যা হারানো ভালোবাসাকে স্বপ্নে ফিরে পাওয়ার আকুতি প্রকাশ করে । ক্রিস্টিনা রোসেটি জীবনের একটি সময় বিষণ্ণতায় ভুগেছিলেন । ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিয়ে করেননি । নিজের জীবনকে কবিতা ও ধর্মীয় বিশ্বাসে উৎসর্গ করেছিলেন । 

 ছবি: www.goodreads.com । 

তথ্যসূত্র: English literature 

---------------------

 "Echo" 

 by Christina Rossetti 


Come to me in the silence of the night;

Come in the speaking silence of a dream;

Come with soft rounded cheeks and eyes as bright

As sunlight on a stream;

Come back in tears,

O memory, hope, love of finished years.

Oh dream how sweet, too sweet, too bitter sweet,

Whose wakening should have been in Paradise,

Where souls brimfull of love abide and meet;

Where thirsting longing eyes

Watch the slow door

That opening, letting in, lets out no more.

Yet come to me in dreams, that I may live

 My very life again tho’ cold in death:

Come back to me in dreams, that I may give

Pulse for pulse, breath for breath:

 Speak  low, lean low,

As long ago, my love, how long ago. 


Poetry Link: 

https://www.poetryfoundation.org/poems/50289/echo-56d22d3f77136 

https://poets.org/poem/echo 

------------------

প্রতিধ্বনি 

কবি: ক্রিস্টিনা রোসেটি 

অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল 


রাতের নিস্তব্ধতায় আমার কাছে এসো;

স্বপ্নে কথা বলার নীরবতায় এসো;

কোমল ভরাট গাল এবং উজ্জ্বল চোখ নিয়ে এসো

স্রোতের উপর সূর্যের আলোর মত;

অশ্রুসজল চোখে ফিরে এসো,

হে স্মৃতি, আশা, বিগত বছরগুলোর প্রেম ।

ওহ্ স্বপ্ন, কি মধুর, বড্ড মিষ্টি, খুব বেশি তিক্ত-মধুর, 

যার জাগরণ স্বর্গে হওয়া উচিত ছিল, 

যেখানে ভালোবাসায় পরিপূর্ণ আত্মারা বাস করে আর মিলিত হয়;

যেখানে তৃষ্ণার্ত আকুল চোখ

ধীর গতির দরজাটি দেখে 

যে খোলা পথ দিয়ে ভেতরে ঢোকা যায়, বের হওয়া যায় না । 

তবুও স্বপ্নে আমার কাছে এসো, যেন আমি বাঁচতে পারি 

মৃত্যুর শীতলতায় জমে গেলেও আমার প্রাণ আবার জেগে উঠবে: 

স্বপ্নে আমার কাছে ফিরে এসো, যাতে আমি দিতে পারি 

প্রতিটি স্পন্দনের জন্য স্পন্দন, নিঃশ্বাসের জন্য নিঃশ্বাস:

আস্তে কথা বলো, নিচু হয়ে ঝুঁকে বসো,

কত যে আগে, আমার প্রিয়তম, কত দিন আগের কথা ।


Wednesday, 11 March 2026

তুষার পরী (Snow fairy)



জাপানি তুষার পরী বা শিমা এনাগা (Shima Enaga, বৈজ্ঞানিক নাম: Aegithalos caudatus caudatus) হচ্ছে অবিশ্বাস্য সুন্দর, ক্ষুদ্র এবং তুলতুলে একটি পাখি, যেটি বেশিরভাগই জাপানের উত্তর দ্বীপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে অবস্থিত হোক্কাইডো বনে পাওয়া যায় । তবে, এটি সমগ্র প্যালিয়াট্রিক রাজ্যে বাস করে । বিশুদ্ধ সাদা গোলাকার মুখমণ্ডল, পুঁতির মত কালো চোখ, ছোট ঠোঁট এবং এক লম্বা লেজের জন্য সে বিখ্যাত । অনুপ্রেরণার প্রতীক । এটিকে কখনো কখনো 'Bouncy cotton ball' হিসেবে বর্ননা করা হয় । এই চমৎকার "ডানাওয়ালা তুষারগোলক" পাখিটি শীতকালীন জঙ্গলে বেড়ে ওঠে, যা হোক্কাইডোর বনে এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নিদর্শন । মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের অধিকারী এই পাখি অত্যন্ত তুলতুলে হয়, বিশেষ করে শীতকালে এর ঘন পালক তাকে প্রচণ্ড ঠান্ডা তাপমাত্রা সহ্য করতে সাহায্য করে । শিমা এনাগা হচ্ছে খুবই লাজুক, চটপটে, কৌশলে পলায়ন করা স্বভাব এবং গানের পাখি । বেশিরভাগ সময় ঘন চিরসবুজ গাছে খাবারের সন্ধানে একে দেখা যায় । প্রাথমিকভাবে ছোট পোকামাকড়, আর্থ্রোপড, ডিম, বিশালাকার মথ, মাকড়সা, প্রজাপতি এবং বীজ পছন্দ করে । তবে, মাঝে মাঝে এরা খাদ্যের পরিপূরক হিসেবে উদ্ভিজ্জ পদার্থ ব্যবহার করে । এই পাখি ঠান্ডার প্রতি সংবেদনশীল এবং ঠান্ডাময় রাতে উষ্ণতার জন্য আড্ডা দেয় । পুরুষ ও স্ত্রী পাখি একই রকম এবং অবিরাম উচ্চস্বরে ডাকে । বসন্তকাল থেকে শরৎকাল পর্যন্ত স্ত্রী পাখিরা প্রতিবেশী অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায়, যখন পুরুষ পাখিরা তাদের শীতকালীন অঞ্চলে থাকে । এরা বাবা-মা এবং সন্তানদের নিয়ে পাল তৈরি করে এবং প্রজনন ঋতুতে ছানাগুলো একটি ডালে একসাথে জড়ো হয়ে থাকতে পছন্দ করে । হোক্কাইডোর তুষারাবৃত বনে এরা সামাজিক এবং কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে ঝাঁকে ঝাঁকে ঘুরে বেড়ায় । কখনো কখনো তাদের মল্লক্রীড়া কৌশল (Acrobatic tricks) করতে দেখা যায় । নান্দনিক ছোট পাখিটি অত্যন্ত সক্রিয়, দ্রুত গতির এবং ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের মত নয় । পরম পূজনীয়, গোলাকার, সফেদ এবং তুলতুলে চেহারার জন্যই তাকে তুষার পরী (Snow fairy) ডাকে । তুষার পরী ডাকনামটি তাকে শুভ্রতার প্রতীক এবং দেবদূতের মত চেহারা তুলে ধরে । এই খাঁটি সাদা পাখি জাপানে এতই জনপ্রিয় যে জাপানি সামাজিক মাধ্যম, শিল্প এবং বিভিন্ন পণ্যদ্রব্যে তাকে আইকনিক বিষয় করে তুলেছে । 'হোক্কাইডো তুষার পরী' শীতের মাসগুলোতে বিশেষ করে জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারিতে তাদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায় যখন এরা উষ্ণতার জন্য পালক উঁচিয়ে সর্বোচ্চ ফুলে ওঠে । শীতকালে এদের সাদা পালক তুষারের সাথে মিশে গিয়ে এক অপরূপ দৃশ্যের সৃষ্টি করে । 

তথ্যসূত্র: আন্তর্জাল, গুগল ।https://share.google/J97f7Sod6uwfgpcFI

Sunday, 8 February 2026

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি -আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

 

 "আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি" আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ 

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল
তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল।

তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন
অরণ্য এবং শ্বাপদের কথা বলতেন
পতিত জমি আবাদের কথা বলতেন
তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন।

জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি সত্য শব্দ কবিতা,
কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যদানা কবিতা।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে ঝড়ের আর্তনাদ শুনবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে দিগন্তের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে।

আমি উচ্চারিত সত্যের মতো
স্বপ্নের কথা বলছি।
উনুনের আগুনে আলোকিত
একটি উজ্জ্বল জানালার কথা বলছি।
আমি আমার মা'য়ের কথা বলছি,
তিনি বলতেন প্রবহমান নদী
যে সাতার জানে না তাকেও ভাসিয়ে রাখে।

যে কবিতা শুনতে জানে না
সে নদীতে ভাসতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মাছের সঙ্গে খেলা করতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মা'য়ের কোলে শুয়ে গল্প শুনতে পারে না

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি বিচলিত স্নেহের কথা বলছি
গর্ভবতী বোনের মৃত্যুর কথা বলছি
আমি আমার ভালোবাসার কথা বলছি।
ভালোবাসা দিলে মা মরে যায়
যুদ্ধ আসে ভালোবেসে
মা'য়ের ছেলেরা চলে যায়,
আমি আমার ভাইয়ের কথা বলছি।

যে কবিতা শুনতে জানে না
সে সন্তানের জন্য মরতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে ভালোবেসে যুদ্ধে যেতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে সূর্যকে হৃদপিন্ডে ধরে রাখতে পারে না।

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি
আমি আমার পূর্ব পুরুষের কথা বলছি
তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল
কারণ তিনি ক্রীতদাস ছিলেন।

আমরা কি তা'র মতো কবিতার কথা বলতে পারবো,
আমরা কি তা'র মতো স্বাধীনতার কথা বলতে পারবো!
তিনি মৃত্তিকার গভীরে
কর্ষণের কথা বলতেন
অবগাহিত ক্ষেত্রে
পরিচ্ছন্ন বীজ বপনের কথা বলতেন
সবৎসা গাভীর মত
দুগ্ধবতী শস্যের পরিচর্যার কথা বলতেন
তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন।

যে কর্ষণ করে তাঁর প্রতিটি স্বেদবিন্দু কবিতা
কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যদানা কবিতা।

যে কবিতা শুনতে জানে না
শস্যহীন প্রান্তর তাকে পরিহাস করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মাতৃস্তন্য থেকে বঞ্চিত হবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে আজন্ম ক্ষুধার্ত থেকে যাবে।

যখন প্রবঞ্চক ভূস্বামীর প্রচন্ড দাবদাহ
আমাদের শস্যকে বিপর্যস্ত করলো
তখন আমরা শ্রাবণের মেঘের মত
যূথবদ্ধ হলাম।
বর্ষণের স্নিগ্ধ প্রলেপে
মৃত মৃত্তিকাকে সঞ্জীবিত করলাম।
বারিসিক্ত ভূমিতে
পরিচ্ছন্ন বীজ বপন করলাম।
সুগঠিত স্বেদবিন্দুর মত
শস্যের সৌকর্য অবলোকন করলাম,
এবং এক অবিশ্বাস্য আঘ্রাণ
আনিঃশ্বাস গ্রহণ করলাম।
তখন বিষসর্প প্রভুগণ
অন্ধকার গহ্বরে প্রবেশ করলো
এবং আমরা ঘন সন্নিবিষ্ট তাম্রলিপির মত
রৌদ্রালোকে উদ্ভাসিত হলাম।
তখন আমরা সমবেত কন্ঠে
কবিতাকে ধারণ করলাম।
দিগন্ত বিদীর্ণ করা বজ্রের উদ্ভাসন কবিতা
রক্তজবার মত প্রতিরোধের উচ্চারণ কবিতা।

যে কবিতা শুনতে জানে না
পরভৃতের গ্লানি তাকে ভূলুন্ঠিত করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
অভ্যূত্থানের জলোচ্ছ্বাস তাকে নতজানু করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
পলিমাটির সৌরভ তাকে পরিত্যাগ করবে।

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
তিনি স্বপ্নের মত সত্য ভাষণের কথা বলতেন
সুপ্রাচীন সংগীতের আশ্চর্য ব্যাপ্তির কথা বলতেন
তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন।

যখন কবিকে হত্যা করা হল
তখন আমরা নদী এবং সমুদ্রের মোহনার মত
সৌভ্রত্রে সম্মিলিত হলাম।
প্রজ্জ্বলিত সূর্যের মত অগ্নিগর্ভ হলাম।
ক্ষিপ্রগতি বিদ্যুতের মত
ত্রিভূবন পরিভ্রমণ করলাম।
এবং হিংস্র ঘাতক নতজানু হয়ে
কবিতার কাছে প্রাণভিক্ষা চাইলো।

তখন আমরা দুঃখকে ক্রোধ
এবং ক্রোধকে আনন্দিত করলাম।

নদী এবং সমুদ্রে মোহনার মত
সম্মিলিত কন্ঠস্বর কবিতা
অবদমিত ক্রোধের আনন্দিত উত্সারণ কবিতা।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে তরঙ্গের সৌহার্দ থেকে বঞ্চিত হবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
নিঃসঙ্গ বিষাদ তাকে অভিশপ্ত করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মূক ও বধির থেকে যাবে।
আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল
আমি একগুচ্ছ রক্তজবার কথা বলছি।

আমি জলোচ্ছ্বাসের মত
অভ্যূত্থানের কথা বলছি
উত্‌ক্ষিপ্ত নক্ষত্রের মত
কমলের চোখের কথা বলছি
প্রস্ফুটিত পুষ্পের মত
সহস্র ক্ষতের কথা বলছি
আমি নিরুদ্দিষ্ট সন্তানের জননীর কথা বলছি
আমি বহ্নমান মৃত্যু
এবং স্বাধীনতার কথা বলছি।

যখন রাজশক্তি আমাদের আঘাত করলো
তখন আমরা প্রাচীণ সংগীতের মত
ঋজু এবং সংহত হলাম।
পর্বত শৃংগের মত
মহাকাশকে স্পর্শ করলাম।
দিকচক্রবালের মত
দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হলাম;
এবং শ্বেত সন্ত্রাসকে
সমূলে উত্পাটিত করলাম।

তখন আমরা নক্ষত্রপুঞ্জের মত
উজ্জ্বল এবং প্রশান্ত হলাম।

উত্‌ক্ষিপ্ত নক্ষত্রের প্রস্ফুটিত ক্ষতচিহ্ন কবিতা
স্পর্ধিত মধ্যাহ্নের আলোকিত উম্মোচন কবিতা।

যে কবিতা শুনতে জানে না
সে নীলিমাকে স্পর্শ করতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মধ্যাহ্নের প্রত্যয়ে প্রদীপ্ত হতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে সন্ত্রাসের প্রতিহত করতে পারে না।

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি শ্রমজীবী মানুষের
উদ্বেল অভিযাত্রার কথা বলছি
আদিবাস অরণ্যের
অনার্য সংহতির কথা বলছি
শৃংখলিত বৃক্ষের
উর্দ্ধমুখী অহংকারের কথা বলছি,
আমি অতীত এবং সমকালের কথা বলছি।
শৃংখলিত বৃক্ষের উর্দ্ধমুখী অহংকার কবিতা
আদিবাস অরণ্যের অনার্য সংহতি কবিতা।

যে কবিতা শুনতে জানে না
যূথভ্রষ্ট বিশৃংখলা তাকে বিপর্যস্ত করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
বিভ্রান্ত অবক্ষয় তাকে দৃষ্টিহীন করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে আজন্ম হীনমন্য থেকে যাবে।

যখন আমরা নগরীতে প্রবেশ করলাম
তখন চতুর্দিকে ক্ষুধা।
নিঃসঙ্গ মৃত্তিকা শস্যহীন
ফলবতী বৃক্ষরাজি নিস্ফল
এবং ভাসমান ভূখন্ডের মত
ছিন্নমূল মানুষেরা ক্ষুধার্ত।

যখন আমরা নগরীতে প্রবেশ করলাম
তখন আদিগন্ত বিশৃংখলা।
নিরুদ্দিষ্ট সন্তানের জননী শোকসন্তপ্ত
দীর্ঘদেহ পুত্রগণ বিভ্রান্ত
এবং রক্তবর্ণ কমলের মত
বিস্ফোরিত নেত্র দৃষ্টিহীন।
তখন আমরা পূর্বপুরুষকে
স্মরণ করলাম।
প্রপিতামহের বীর গাঁথা
স্মরণ করলাম।
আদিবাসী অরণ্য এবং নতজানু শ্বাপদের কথা
স্মরণ করলাম।

তখন আমরা পর্বতের মত অবিচল
এবং ধ্রুবনক্ষত্রের মত স্থির লক্ষ্য হলাম।

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি স্থির লক্ষ্য মানুষের
সশস্ত্র অভ্যুত্থানের কথা বলছি
শ্রেণীযুদ্ধের অলিন্দে
ইতিহাসের বিচরণের কথা বলছি
আমি ইতিহাস এবং স্বপ্নের কথা বলছি।

স্বপ্নের মত সত্যভাষণ ইতিহাস
ইতিহাসের আনন্দিত অভিজ্ঞান কবিতা
যে বিনিদ্র সে স্বপ্ন দেখতে পারে না
যে অসুখী সে কবিতা লিখতে পারে না।

যে উদ্গত অংকুরের মত আনন্দিত
সে কবি
যে সত্যের মত স্বপ্নভাবী
সে কবি
যখন মানুষ মানুষকে ভালবাসবে
তখন প্রত্যেকে কবি।

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি বিচলিত বর্তমান
এবং অন্তিম সংগ্রামের কথা বলছি।

খন্ডযুদ্ধের বিরতিতে
আমরা ভূমি কর্ষণ করেছি।
হত্যা এবং ঘাতকের সংকীর্ণ ছায়াপথে
পরিচ্ছন্ন বীজ বপন করেছি।
এবং প্রবহমান নদীর সুকুমার দাক্ষিণ্যে
শস্যের পরিচর্যা করছি।

আমাদের মুখাবয়ব অসুন্দর
কারণ বিকৃতির প্রতি ঘৃণা
মানুষকে কুশ্রী করে দ্যায়।
আমাদের কণ্ঠস্বর রূঢ়
কারণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ
কণ্ঠকে কর্কশ করে তোলে।
আমাদের পৃষ্ঠদেশে নাক্ষত্রিক ক্ষতচিহ্ন
কারণ উচ্চারিত শব্দ আশ্চর্য বিশ্বাসঘাতক
আমাদেরকে বারবার বধ্যভূমিতে উপনীত করেছে।

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমার সন্তানেরা
আমি তোমাদের বলছি।
যেদিন প্রতিটি উচ্চারিত শব্দ
সূর্যের মত সত্য হবে
সেই ভবিষ্যতের কথা বলছি,
সেই ভবিষ্যতের কবিতার কথা বলছি।

আমি বিষসর্প প্রভুদের
চির প্রয়াণের কথা বলছি
দ্বন্দ্ব এবং বিরোধের
পরিসমাপ্তির কথা বলছি
সুতীব্র ঘৃণার
চূড়ান্ত অবসানের কথা বলছি।

আমি সুপুরুষ ভালবাসার
সুকণ্ঠ সংগীতের কথা বলছি।

যে কর্ষণ করে
শস্যের সম্ভার তাকে সমৃদ্ধ করবে।
যে মত্স্য লালন করে
প্রবহমান নদী তাকে পুরস্কৃত করবে।
যে গাভীর পরিচর্যা করে
জননীর আশীর্বাদ তাকে দীর্ঘায়ু করবে।
যে লৌহখন্ডকে প্রজ্জ্বলিত করে
ইস্পাতের তরবারি তাকে সশস্ত্র করবে।
দীর্ঘদেহ পুত্রগণ
আমি তোমাদের বলছি।
আমি আমার মায়ের কথা বলছি
বোনের মৃত্যুর কথা বলছি
ভাইয়ের যুদ্ধের কথা বলছি
আমি আমার ভালবাসার কথা বলছি।
আমি কবি এবং কবিতার কথা বলছি।

সশস্ত্র সুন্দরের অনিবার্য অভ্যুত্থান কবিতা
সুপুরুষ ভালবাসার সুকণ্ঠ সংগীত কবিতা
জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি মুক্ত শব্দ কবিতা
রক্তজবার মতো প্রতিরোধের উচ্চারণ কবিতা।

আমরা কি তাঁর মত কবিতার কথা বলতে পারবো
আমরা কি তাঁর মত স্বাধীনতার কথা বলতে পারবো। 

****
আমি কিংবদন্তির কথা বলছি | PDF https://share.google/mwVBDHXpsATieA4JU

এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় লেখা [কবি: জন কিটস]

"Written on a Summer Evening"  (Written in Disgust of Vulgar Superstition) by John Keats  --------------------- The church bells t...