Wednesday, 12 August 2026

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্পকার, সঙ্গীতস্রষ্টা, চিত্রকর, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী, সমাজ সংস্কারক এবং দার্শনিক ৷ তিনি বাংলা সাহিত্যে গদ্য ও পদ্যকে নতুন আঙ্গিকে রূপ দিয়েছেন এবং কথ্য ভাষা ব্যবহারে একজন পথপ্রদর্শক ছিলেন । সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় সংস্কৃতিকে পাশ্চাত্যে পরিচয় করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর বাড়ির এক ধনাঢ্য ও সংস্কৃতিবান ব্রাহ্ম পিরালী ব্রাহ্মণ পরিবারে ৭ই মে ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দ (২৫শে বৈশাখ ১২৬৮ বঙ্গাব্দে) জন্মগ্রহণ করেন এবং ৭ই আগস্ট ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে (২২শে শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দে) কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা হচ্ছেন ব্রাক্ষ্ম আধ্যাত্মিক ধর্মগুরু (মহর্ষি) ও জমিদার দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মা সারদাসুন্দরী দেবী । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন পিতা ও মাতার চতুর্দশ সন্তান । তার স্ত্রীর নাম মৃণালিনী দেবী (ভবতারিণী দেবী) । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শৈশবে কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, নর্ম্যাল স্কুল, বেঙ্গল অ্যাকাডেমি এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুলে কিছুদিন পড়াশোনা করেন । তবে, বিদ্যালয়ে প্রথাগত শিক্ষা গ্রহণ না করে বাড়িতেই গৃহশিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষা নেন । তিনি পিতার কাছ থেকে সংস্কৃত ব্যাকরণ, ইংরেজি, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সাধারণ বিজ্ঞান ও ইতিহাস বিষয়ে নিয়মিত পাঠ নেন । তার পিতা তাকে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের জীবনী, কালিদাস রচিত ধ্রুপদি সংস্কৃত কাব্য ও নাটক এবং উপনিষদ পাঠেও উৎসাহিত করতেন । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আট বছর বয়সেই কবিতা লেখা শুরু করেন । ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় তার প্রথম কবিতা অভিলাষ প্রকাশিত হয় । পরবর্তীতে তিনি ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে আইনবিদ্যায় পড়াশোনা করেন ৷ যদিও তিনি ইংল্যান্ডে পড়াশোনা অসমাপ্ত করে ১৮৭০ এর দশকের শেষের দিকে ভারতে ফিরে আসেন । ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দশ বছরের জন্য শিলাইদহ ও শাহজাদপুরে তার পারিবারিক জমিদারির দেখাশোনা করতে পূর্ববঙ্গে (বর্তমানে বাংলাদেশ) আসেন । সেখানে তিনি প্রায়শই পদ্মা নদীর (গঙ্গা নদীর মূল শাখা) উপর একটি বাসযোগ্য বজরা বা কিস্তিতে থাকতেন । গ্রাম্য মানুষের দৈনন্দিন জীবন, তাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিই পরবর্তীকালে তার লেখার মূল সুর হয়ে ওঠে । কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের জাতীয় কবি । বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক । বাংলা সাহিত্যের ঋষিতুল্য । তিনি বাংলা ভাষা এবং বাঙালি জাতিকে এই গ্রহের মানুষের কাছে প্রথম পরিচিত করে তোলেন । রবি ঠাকুরের অসাধারণ সৃষ্টিকর্মগুলো বাঙালির হৃদয়কে স্পর্শ করে ৷ সারা পৃথিবীর মানুষকে অনুপ্রাণিত করে । বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে তার রচিত গান ও কবিতা বাঙালি জাতিকে সাহস আর অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে ৷ ১৯০১ খ্রিস্টাব্দের ২২শে ডিসেম্বর (৭ই পৌষ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলার বোলপুরের শান্তিনিকেতনে (শান্তির আবাস) একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে তিনি ভারতীয় ও পাশ্চাত্য ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠ দিকগুলোর সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেন । যদিও তার পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে এটিকে একটি আধ্যাত্মিক নিভৃতবাস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । যা পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত করে এখানেই তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও নিজের কর্ম ও প্রতিভা দ্বারা স্ব-যত্নে গড়েছেন বিশ্ববিখ্যাত বিদ্যাপীঠ শান্তিনিকেতন ৷ যেখানে স্থান পেয়েছে তার অনন্য কীর্তিগুলো । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ২৩শে ডিসেম্বর ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে (৮ই পৌষ ১৩২৫ বঙ্গাব্দ) এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং তার নাম দেন বিশ্বভারতী, যার অর্থ ভারতের সঙ্গে বিশ্বের মিলনস্থল । যেটি পরবর্তীকালে ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে ডিসেম্বর (১৩২৮ বঙ্গাব্দের ৮ই পৌষ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপস্থিতিতে আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল কর্তৃক বিশ্বভারতীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয় । ইউনেস্কো ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে এই কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়টিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করে । উল্লেখ্য যে, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় বোন স্বর্ণকুমারী দেবী (জন্ম: ১৮৫৫ বা ১৮৫৬ – মৃত্যু: ১৯৩২ খ্রিঃ) একজন স্বনামধন্য লেখক ছিলেন । তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রথম সারির নারী লেখিকা হিসেবে বিবেচিত হন, যিনি ২৫টি বই এবং বেশ কিছু প্রবন্ধ রচনা করেছেন । ১৯১২ খ্রিস্টাব্দ থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দীর্ঘ সময় ভারতের বাইরে বসবাস করেন । এই সময় বিভিন্ন দেশে তিনি তার সাহিত্য কর্ম নিয়ে কাজ করেন এবং ভারতীয় স্বাধীনতার পক্ষে একজন বাগ্মী মুখপাত্র হয়ে ওঠেন । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে গুরুদেব, কবিগুরু এবং বিশ্বকবি হিসেবে ভূষিত করা হয় । তার রয়েছে অসংখ্য সাহিত্যকর্ম, যা বাঙালি এবং বিশ্ব সংস্কৃতিতে অদম্য প্রভাব ফেলেছে । তার রচিত অসাধারণ শিল্পকর্মগুলো বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উৎকর্ষতায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে ৷ তার বৈচিত্র্যময় রচনাবলী সারাবিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে । প্রতিভাময়ী এই কবির সুবিশাল ও বহুল সমাদৃত সৃজনশীল সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য কবিতা, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ছোটগল্প, অনুবাদ এবং গান ইত্যাদি । তার প্রায় দুই হাজারেরও বেশি গান রয়েছে, যা বাঙালি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সবচেয়ে বিখ্যাত কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে: কাব্যগ্রন্থ মানসী (১৮৯০ খ্রিঃ), নাটক চিত্রাঙ্গদা (১৮৯২ খ্রিঃ, চিত্র), কাব্যগ্রন্থ সোনার তরী (১৮৯৪ খ্রিঃ), ছোটগল্প নষ্টনীড় (১৯০১ খ্রিঃ), উপন্যাস চোখের বালি (১৯০৩ খ্রিঃ), উপন্যাস নৌকাডুবি (১৯০৬ খ্রিঃ), কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি (১৯১০ খ্রিঃ), উপন্যাস গোরা (১৯১০ খ্রিঃ), উপন্যাস ঘরে-বাইরে (১৯১৬ খ্রিঃ) এবং উপন্যাস শেষের কবিতা (১৯২৯ খ্রিঃ) ইত্যাদি । তিনি একজন গীতিকার ও সুরকার হিসেবে রবীন্দ্রসঙ্গীত নামে গুরুত্বপূর্ণ ধারার গান রচনা করেছেন, যা বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে এক শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করে । এছাড়া, তিনি প্রায় দুই হাজার ছবি এঁকেছেন । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যতম বিখ্যাত একটি কবিতা যেখানে মন নির্ভয় ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে নৈবেদ্য সংকলনে বাংলায় প্রকাশিত হয় । এছাড়া, এটি ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত এবং ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজি অনুবাদ আকারেও প্রকাশিত হয় । প্রসিদ্ধ এই কবিতাটি (ইংরেজি সংস্করণ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের কলকাতায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে আবৃত্তি করেন । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জগদ্বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি রচনা করে ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথম একজন অ-ইউরোপীয় ও প্রথম এশীয় হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন । সেই নোবেল পুরস্কারের অর্থ দিয়ে তিনি শান্তিনিকেতন এবং বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরের দরিদ্র কৃষকদের ঋণ প্রদানে কৃষি ব্যাংক গড়ে তোলেন । ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৩ই এপ্রিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে ইংরেজ শাসকদের অনুমোদিত রাওলাট আইন এর বিরুদ্ধে নিরস্ত্র জনগন প্রতিবাদ করলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ারের অধীনে থাকা ব্রিটিশ সৈন্যরা নিরস্ত্র মানুষের উপর গুলি চালিয়ে ৩৬৯ জনকে নৃশংস হত্যা করে । ফলে, এই ঘটনায় সমগ্র ভারতজুড়ে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয় । ভারতের স্বাধীনতা ইতিহাসে এটি ছিল এক মর্মান্তিক ঘটনা! ব্রিটিশ রাজপরিবার তথাপি ইংরেজ সরকার কর্তৃক (জুন, ১৯১৫ খ্রিঃ প্রদত্ত) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দেয়া নাইটহুড উপাধিকে তিনি জালিয়ানওয়ালাবাগের ঐ হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদস্বরূপ প্রত্যাখ্যান করেন । পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৩১শে মে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার জোড়াসাঁকোস্থ ৫ নং দ্বারকানাথ ঠাকুর লেন থেকে ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের অফিসকে তারবার্তায় বিষয়টি জানিয়ে দেন । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাইটহুড খেতাব প্রত্যাখ্যানের ফলে সেই সময় প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক সংবাদপত্র দ্য ইংলিশম্যান তাচ্ছিল্যের সুরে লিখে যে বাঙালি কবিটি স্যার খেতাবধারী থাকলেন, না-কি স্রেফ বাবু হয়ে রইলেন, তাতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কিছুই যায় আসে না । তবে, অনেকেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন এবং সেই সময় জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের পর পাঞ্জাবে সামরিক আইন জারির বিরুদ্ধে এটি অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক প্রতিবাদে পরিণত হয়েছিল । নিঃসন্দেহে বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের মধ্যে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাধারা গঠনে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখেছেন বা রাখছেন । এছাড়া, তিনি ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন বিশিষ্ট নেতা ছিলেন । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হচ্ছেন পৃথিবীর একমাত্র গীতিকবি, যার রচিত ভিন্ন তিনটি ভাষায় তিনটি ভিন্ন সঙ্গীত স্বাধীন-সার্বভৌম তিনটি ভিন্ন দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গীত হয় । যেমন: (ক) আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি, এটি হচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত (খ) জন গণ মন- অধিনায়ক জয় হে, এটি হচ্ছে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত (গ) নমো নমো মাতা, এটি হচ্ছে শ্রীলংকার জাতীয় সঙ্গীত, যেগুলো তিনটি দেশেই সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত । বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহান রচনাবলী চির শাশ্বত । যা মানুষের মনকে নাড়া দেয় । তার এই অমূল্য সাহিত্যকর্মকে যুগে যুগে মানুষ পরম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং স্ব-যত্নে লালন করবে এবং এটিকে বয়ে নিয়ে যাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ।। লেখক: ফার্মাসিস্ট; তথ্যসূত্র: ব্রিটানিকা, উইকিপিডিয়া; ছবি: ইউ.এস. অ্যাম্বাসি ঢাকা ।

No comments:

Post a Comment

আমার প্রণয়িনীর চোখ সূর্যের মত নয়

 My mistress’ eyes are nothing like the sun (Sonnet 130)  --------  William Shakespeare , 1564 –1616 My mistress’ eyes are nothing like the ...