Friday, 15 May 2026

সোনারং মন্দির



মুন্সিগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ী উপজেলার সোনারং ইউনিয়নের সোনারং গ্রামে অবস্থিত এই জোড়া মন্দিরটি অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রাচীন বাংলার এক অপূর্ব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন । মুন্সীগঞ্জ তথাপি প্রাচীন বিক্রমপুরের এই মন্দির ১৮৯ বছরের ঐতিহ্যের জৌলুস হারিয়ে এখনো মাথা উঁচু করে কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । পাশাপাশি অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন মন্দিরটি স্থানীয়ভাবে 'জোড়া মঠ' নামে পরিচিত । সোনারং গ্রামে এক সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল । মন্দিরের একটি প্রস্তরলিপি থেকে জানা যায় যে, স্থানীয় জমিদার রূপচন্দ্র সেন ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে কালী মন্দির এবং ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে আরেকটি শিব মন্দির নির্মাণ করেন । এটি জোড়া মন্দির হলেও দুইটি মন্দিরের উচ্চতা এবং স্থাপত্য গঠনে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে । অষ্টভুজ আকৃতির বিশিষ্ট মন্দিরটি দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ২১ ফুট এবং এর দেয়াল বেশ পুরু । মন্দির দুইটির অভ্যন্তরীণ ছাদ নিচু এবং গোলাকার গম্বুজ আকৃতির । ৫.৩৫ মিটার বর্গাকার স্থানে নির্মিত পশ্চিমের কালী মন্দিরটি বৃহৎ, এর উচ্চতা প্রায় ১৫ মিটার (প্রায় ৫০ ফুট) এবং পূবের শিব মন্দিরটি ছোট । কালী মন্দিরের প্রধান উপাসনালয় কক্ষের সাথে ১.৯৪ মিটার এবং শিব মন্দিরের প্রধান উপাসনালয় কক্ষের সাথে ১.৫ মিটার প্রশস্তের বারান্দা আছে । মন্দিরের বাহির ও ভেতরে অসাধারণ কারুকাজে সজ্জিত । মূলত ইট, চুন এবং সুরকি দ্বারা নির্মিত এই মন্দিরটি প্রাচীন খিলান, সূক্ষ্ম কারুকাজ, কুণ্ডলিত চূড়া এবং এর নকশা তৎকালীন স্থাপত্যশৈলীর অনন্য চিহ্ন বহন করছে । কথিত আছে যে, শ্রী রূপচন্দ্র সেনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এখানেই সম্পন্ন হয়েছিল । এছাড়া, মন্দিরের সম্মুখভাগে রয়েছে একটি বিশাল বড় পুকুর । কালী মন্দিরটি তৈরি করার সময় এই পুকুর খনন করা হয় । কালী মন্দিরের সুউচ্চ শিখরে দন্ডায়মান ত্রিশূলটি কিছুটা বাঁকা হয়ে আছে । ধারণা করা হয়, তীব্র বাতাস বা বজ্রপাতের প্রভাবে এটি এমন হয়েছে । বিস্ময়কর এই মন্দিরের চূড়ার ছোট ছোট গর্তগুলো নীলকণ্ঠ, ঘুঘু, মাছরাঙা, শালিক, টিয়া এবং পায়রাসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাসস্থল, যেখানে তারা উচ্চস্বরে কোলাহল করে । চোর বা দুর্বৃত্তরা এই মন্দিরের পাথর, শিবলিঙ্গ, কষ্টিপাথরের কলস এবং বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যায় । দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন এবং অবহেলায় পড়ে থাকার পর, বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগে কিছুদিন আগে সংস্কারের পর অত্যন্ত সুন্দর এই মন্দিরটি এখন এক নতুন রূপ ধারণ করেছে । কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া মন্দিরের সেই অতীত চেহারা পুনরায় আবির্ভূত হওয়ায় মানুষের সাথে এর নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়েছে । জানি না, এর মধ্যে কি এক দুর্নিবার আকর্ষণ লুকিয়ে আছে । নিপুণ কারুকার্যে অনবদ্যভাবে নির্মিত মন্দিরের নান্দনিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি পরম প্রশান্তি এনে দেয় । পবিত্র এই মন্দিরটি দীর্ঘকালের অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং অজানা রহস্যকে ধারণ করে আছে, যা প্রাচীন বিক্রমপুরের এক দুর্লভ ও সমৃদ্ধ ইতিহাসের অংশ । আমি মনে করি, সোনারং মন্দিরের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং পর্যটন ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হলে এটি হবে মুন্সীগঞ্জ জেলার অন্যতম ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান । উল্লেখ্য যে: কালজয়ী বাঙালি, প্রগতি লেখক ও শিল্পী সমিতি 'উদীচী সাংস্কৃতিক সংগঠন' এর প্রতিষ্ঠাতা, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি বিপ্লবী, সাহিত্যিক এবং শ্রমিক সংগঠক সত্যেন সেন এই সোনারং গ্রামেই হিন্দু সেন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ।  

তথ্যসূত্র: আন্তর্জাল (গুগল, উইকিপিডিয়া) । 

ছবি: নিজ ।

No comments:

Post a Comment

আমার প্রণয়িনীর চোখ সূর্যের মত নয়

 My mistress’ eyes are nothing like the sun (Sonnet 130)  --------  William Shakespeare , 1564 –1616 My mistress’ eyes are nothing like the ...