Sunday, 23 June 2024

স্পেনীয় শৈবাল বা শ্যাওলা (Spanish moss)






শৈবাল একটি সালোক-সংশ্লেষক, Eukaryotic জীবের বৃহৎ এবং বৈচিত্র্যময় গোষ্ঠী । স্পেনীয় শৈবাল বা শ্যাওলা হচ্ছে Epiphytic ফুলের উদ্ভিদ যা প্রায়শই গ্রীষ্মমন্ডলীয় এবং উপক্রান্তীয় জলবায়ুতে বড় গাছ (ছাল এবং ডালে), বন, পর্বত, নদী, হ্রদ এবং মরুভূমিতে জন্মে থাকে । এটি বেশিরভাগ মেক্সিকো, বারমুডা, বাহামা, মধ্য আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং ওয়েস্টইন্ডিজের স্থানীয় উদ্ভিদ । এর প্রাথমিক প্রাকৃতিক পরিসর হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (পুয়ের্তো রিকো এবং ইউ.এস. ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জসহ) থেকে আর্জেন্টিনা পর্যন্ত যেখানে যথেষ্ট পরিমাণে উষ্ণ জলবায়ু বিদ্যমান এবং তুলনামূলকভাবে উচ্চ গড় আর্দ্রতা ঘটে থাকে । উত্তর আমেরিকায় এটি মেক্সিকো উপসাগর এবং দক্ষিণ আটলান্টিক উপকূল অনুসরণ করে বিস্তৃতি ঘটায় । এছাড়া নর্থ্যাম্পটন কাউন্টি, ভার্জিনিয়া, দক্ষিণ মেরিল্যান্ড এবং হাওয়াই দ্বীপসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে জন্মে থাকে । অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে স্পেনীয় শৈবালকে প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিকীকৃত (Naturalized) করা হয়েছে । এটি ফরাসি পলিনেশিয়াতে ‘দাদার দাড়ি’ (Grandpa’s beard) নামে পরিচিত । এছাড়া স্পেনীয় শৈবাল ও মোজেসের (Moses) দাড়ি নামেও পরিচিতি রয়েছে । এর অন্যান্য নামগুলো হচ্ছে : Air-plant, Grandfather’s Whiskers, Graybeard, Long Moss, Old Man’s Beard, Spanish Moss, Wool Crepe ইত্যাদি । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এটি সর্বাধিক পরিচিত, সাধারণত দক্ষিণ লাইভ ওক (Quercus virginiana) ও পালকহীন বা বাল্ড সাইপ্রেসের (Taxodium distichum) নিম্নভূমি, জলাভূমি, মধ্য আটলান্টিক ও দক্ষিণ-পূর্ব রাজ্যগুলোর জলাভূমি, দক্ষিণ-পূর্ব ভার্জিনিয়ার উপকূল থেকে ফ্লোরিডা এবং পশ্চিমে দক্ষিণ আরকানসাস ও টেক্সাস পর্যন্ত বিস্তৃত । স্পেনীয় শৈবাল Bromeliaceae (bromeliads) পরিবারের অন্তর্ভূক্ত একটি বায়ু উদ্ভিদ । পূর্বে Anoplophytum, Caraguata এবং Renealmia বংশের মধ্যে এটি স্থাপিত হয়েছিল । এ উদ্ভিদের নির্দিষ্ট নাম হচ্ছে Usneoides । যদিও এটি Lichen Usnea গণের কিছু প্রজাতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং স্পেনের স্থানীয় নয় । এর বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে: Tillandsia usneoides L. ।
স্পেনীয় শৈবাল একটি বহুবর্ষজীবী ভেষজ । এক বা একাধিক সরু ডালপালা নিয়ে গঠিত । বিকল্প পাতলা, বাঁকা বা কোঁকড়ানো এবং ভারী আকারের পাতাগুলো চওড়া হয়ে শিকল আকৃতির গাছপালায় রূপ নিয়ে একটি ঝুলন্ত কাঠামো গঠন করে । পাতা শুকিয়ে গেলে রূপালী থেকে ধূসর কিন্তু ভিজে গেলে হাল্কা সবুজ । ঘন ও ঝুলে পড়া শৈবালের গোছা বা ঝোপের মতো কোনো শিকড় নেই । কান্ড ও পাতার ধূসর আঁশগুলো আর্দ্রতা এবং পুষ্টি পাওয়ার মাধ্যম । এটি বৃদ্ধির জন্য উচ্চ আর্দ্রতা এবং দূষণমুক্ত অবস্থার প্রয়োজন । সর্পিল (Zigzagging) আকারে বৃদ্ধি পায়, তবে রৈখিকও হতে পারে । Peltate চুলের একটি পুরু স্তর (Trichomes) আঁশের মতো পাতাগুলোকে জল শোষণ এবং ধরে রাখার একটি বড় ক্ষমতা প্রদান করে । উদ্ভিদের ছোট ফুলগুলো হলুদ-সবুজ এবং পাপড়ি ছড়ানো থাকে । বৃন্তটি (Scape) আংশিকভাবে পাতার খাপের মধ্যে লুকিয়ে থাকে । বসন্ত থেকে শরৎ পর্যন্ত পুষ্পমঞ্জুরি ফুটে উঠে এবং লোম দ্বারা ঢেকে একটি মাত্র ডোরাকাটা ফুলে পরিণত হয় । একটি ফুলের সমস্ত পাপড়ির সংগ্রহকে করোলা (Corolla) বলে । পাপড়ি, ৮-১৪ মিঃমিঃ লম্বা ও সবুজ-হলুদ-নীল রঙ দ্বারা করোলা গঠিত হয় । ফুল রাতে সুগন্ধি ছড়ায় এবং পোকামাকড় দ্বারা পরাগায়ন হয় । ১.৫-৩ সেঃমিঃ লম্বা ফলগুলো Septicidal । ক্যাপসুলগুলো প্রায় ছয় মাস গাছে থাকে এবং পাকার পরে বীজগুলো বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে যেতে পারে । স্পেনীয় শৈবাল বীজ দ্বারা ও উদ্ভিজ্জভাবে বংশবিস্তার ঘটে এবং গাছের অঙ্গে লেগে থাকে যেগুলো বাসা বাঁধার উপাদান হিসেবে পাখিরা অন্য স্থানে নিয়ে যায় । স্পেনীয় শৈবাল পরজীবী নয়, কারণ এটি সূর্য থেকে তার নিজস্ব শক্তি সালোকসংশ্লেষ করে এবং সালোক-সংশ্লেষণের জন্য Crassulacean acid বিপাকের জল-সংরক্ষণ কৌশল ব্যবহার করে । এটি একটি Epiphyte (ফুলের উদ্ভিদ বা Angiosperm), যেখানে উদ্ভিদ তার নিজের পাতার আঁশগুলোর মাধ্যমে বাতাস ও বৃষ্টিপাত থেকে পুষ্টি এবং জল শোষণ করে, যার বেশিরভাগই স্বাগতিক গাছের পাতা থেকে প্রাপ্ত খনিজ পদার্থ থেকে আসে । যদিও এটি যে গাছে বেড়ে উঠে তাকে ক্ষতিসাধন বা কদাচিৎ হত্যা করে । তবে এটি মাঝে মধ্যে এতোই ঘন হয়ে যায় যে, গাছের পাতায় ছায়া দিয়ে গাছের বৃদ্ধির হার কমিয়ে দেয় । দক্ষিণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উদ্ভিদটি দক্ষিণী লাইভ ওক (Quercus virginiana) এবং পালকহীন বা বাল্ড সাইপ্রেসের (Taxodium distichum) জন্য পছন্দে অগ্রাধিকার বলে মনে হয় কারণ তাদের Foliar mineral leaching (ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম এবং ফসফরাস) এর উচ্চ হার যা এপিফাইটিক উদ্ভিদে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি সরবরাহ করে । এটি অন্যান্য গাছের প্রজাতি যেমন Sweetgum (Liquidambar styraciflua), Crepe-myrtles (Lagerstroemia spp.), Other oaks এবং এমনকি Pine গাছেও উপনিবেশ করতে সক্ষম । স্পেনীয় শৈবাল লাইভ ওক, মৃত গাছের ডালপালা, বেড়া এবং টেলিফোন লাইনের মতো কৃত্রিম কাঠামোতে আরো অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় । এটি এখনো অনেক প্রাণীর জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ । স্পেনীয় শৈবাল ইঁদুর, সাপ, তিন প্রজাতির বাদুড়, টিক, মাইট, মিলিপিডসহ বেশ কয়েকটি প্রাণীকে আশ্রয় দেয় বা পোষন করে বা আবাসস্থল । জাম্পিং মাকড়সার (Jumping spider) একটি প্রজাতি এবং Pelegrina tillandsiae শুধুমাত্র স্পেনীয় শৈবালেই পাওয়া যায় । যদিও ব্যাপকভাবে স্পেনীয় শৈবাল আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয় এবং উদ্ভিদের বাস্তুশাস্ত্রের এক গবেষণায় দেখা যায় উদ্ভিদে শনাক্ত করা অন্যান্য হাজার হাজার আর্থ্রোপডের মধ্যে Chigger উপস্থিত ছিল না । স্পেনীয় শৈবালের সবুজ আঁশগুলোতে Chlorococcum গণের একটি সবুজ শৈবাল পাওয়া যায় । স্পেনীয় শৈবাল বায়ুবাহিত দূষকগুলোর প্রতি সংবেদনশীল । এটি এমন এলাকায় বৃদ্ধি পায় না যেখানে ধোঁয়া প্রচলিত বা নিকৃষ্ট মানের, যেমন চিমনির কাছাকাছি । ক্রমবর্ধমান বায়ু দূষণের কারণে এটি শহরাঞ্চল থেকে হ্রাস পেয়েছে । স্পেনীয় শৈবাল প্রায়শই দক্ষিণ গথিক চিত্র (Gothic imagery) এবং গভীর দক্ষিণ সংস্কৃতির সাথে যুক্ত থাকে কারণ আলাবামা, দক্ষিণ আরকানসাস, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, লুইসিয়ানা, মিসিসিপি, উত্তর ক্যারোলিনা, দক্ষিণ ক্যারোলিনা, পূর্ব ও দক্ষিণ টেক্সাস এবং দক্ষিণ ভার্জিনিয়ার মতো উপক্রান্তীয় আর্দ্র দক্ষিণ অকুস্থলে বেড়ে উঠার প্রবণতা রয়েছে । স্পেনীয় শৈবালের উৎপত্তি সম্পর্কে একটি উপাখ্যানে বলা হয় ‘সর্বদা বেঁচে থাকা নিকৃষ্ট মানুষ’ (The Meanest Man Who Ever Lived), যেখানে লোকটির সাদা চুল অনেক লম্বা হয়ে গাছে ধরা পড়ে । ঊনবিংশ শতাব্দীতে হাওয়াই দ্বীপে স্পেনীয় শৈবাল প্রবর্তিত হয়েছিল । এটি একটি জনপ্রিয় শোভাময় এবং লেই উদ্ভিদ (Lei plant) হয়ে উঠে । হাওয়াইয়ের অস্থায়ী সরকারের প্রথম রাষ্ট্রপতি Sanford B. Dole এর দাড়ির নামানুসারে এটির নামকরণ করা হয় ‘Umiʻumi-o-Dole’ । এটি হিনাহিনা (Hinahina) নামেও পরিচিত এবং সমারোহের জন্য ব্যবহৃত লেই উদ্ভিদের স্থানীয় হিনাহিনার বিকল্প হয়ে উঠেছে । একুশ শতকের গোড়ার দিকে গাছটি ‘Pele’s hair’ / ‘Lauoho-o-Pele’ হিসেবে ব্যাপকভাবে বাজারজাত করা হয়েছিল, যা আসলে এক ধরণের ফিলামেন্টাস আগ্নেয়গিরিময় কাঁচকে (Filamentous volcanic glass) বোঝায় ।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রজাতিটির একটি নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক মূল্য রয়েছে । স্পেনীয় শৈবাল Building insulation, Mulch, Packing material, Mattress stuffing এবং Fiber সহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয় । এটি ফুলের রচনা এবং কারুশিল্পের সজ্জায় শোভাময় উদ্ভিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয় । এটি যান্ত্রিক টিস্যু, সজ্জিত, অত্যন্ত প্রতিরোধী ইলাস্টিক ফাইবার প্রদান করে যা প্রায়শই ঘোড়ার চুলের পরিবর্তে, গৃহসজ্জার সামগ্রী হিসেবে এবং গদির প্যাডিংয়ে ব্যবহৃত হয় । ১৯০০ দশকের গোড়ার দিকে এটি গাড়ির আসন বা বিছানায় (Padding) বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল । ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে ১০০০০ টন প্রক্রিয়াজাত স্পেনীয় শৈবাল উৎপাদিত হয়েছিল । বর্তমানে শিল্প ও কারুশিল্পে ব্যবহারের জন্য, ফুল বাগানের বিছানা হিসেবে, Bousillage এর উপাদান হিসেবে এবং ঐতিহ্যগত প্রাচীর আচ্ছাদন উপাদান হিসেবে এটি সংগ্রহ করা হয় । লাতিন আমেরিকা এবং লুইসিয়ানার কিছু অংশে এটি জন্মের দৃশ্যে (Nativity scenes) ব্যবহৃত হয় । দক্ষিণ-পশ্চিম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মরুভূমি অঞ্চলে শুকনো স্পেনীয় শৈবাল জলাভূমি শীতলক বা ঠাণ্ডিঘর (Swamp cooler) নামে পরিচিত (কিছু এলাকায় ‘মরুভূমির শীতলক’ নামে পরিচিত) যা বাতাস নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (Air conditioner) থেকে অনেক কম খরচে ঘরবাড়ি এবং অফিস ঠান্ডা করতে ব্যবহৃত হয় । শীতলকরণ প্রযুক্তির সাহায্যে একটি দমকল যা স্পেনীয় শৈবাল দিয়ে তৈরি প্যাড বা বিছানার (Pad) উপর পানি ছিটিয়ে দেয় তারপর একটি পাখা প্যাডের মধ্য দিয়ে ভবনে বাতাস টেনে নেয় । প্যাডের উপর পানির বাষ্পীভবন বাতাসের তাপমাত্রা হ্রাস করে ভবনকে শীতল করতে সাহায্য করে । বিভিন্ন জাত সমূহ হচ্ছে: Tillandsia ‘Maurice’s Robusta’, Tillandsia ‘Munro’s Filiformis’, Tillandsia usneoides var. filiformis (André) Mez (বিলুপ্ত জাত), Tillandsia ‘Odin’s Genuina’, Tillandsia ‘Spanish Gold’, Tillandsia ‘Tight and Curly’ ইত্যাদি । সংকর (Hybrids) জাত সমূহ হচ্ছে: Tillandsia ‘Nezley’, Tillandsia ‘Kimberly’, Tillandsia ‘Old Man’s Gold’ । স্পেনীয় শৈবাল হচ্ছে মারকিউরি, ক্যাডমিয়াম, সায়ানাইড, লেড, নিকেল, কপার, ক্রোমিয়াম, কার্বন ও জিঙ্কের একটি ভালো বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চয়কারী এবং জৈব অবক্ষয়ের মাধ্যমে এগুলোকে নিরপেক্ষ করতে পারে । এটি বায়ুমণ্ডল থেকে PM2,5 এবং PM10 কণা বাজেয়াপ্ত ও অপসারণ করতে পারে । এ সমস্ত বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে উদ্ভিদটি Phytoremediation এ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় । প্রাচীনকাল থেকেই আমেরিকান আদিবাসীরা বিভিন্ন কাজে স্পেনীয় শৈবাল ব্যবহার করে আসছে । Houma এবং সেমিনোল উপজাতিরা (Seminole tribes) কাঠের বাসস্থানের খুঁটিগুলোকে একত্রে বেঁধে রাখার জন্য, গদি, মাদুর এবং পেঁচানো দড়ি তৈরি করতে তন্তু হিসেবে ব্যবহার করতেন । উত্তর আমেরিকার জনগণ আগুনের তীরগুলোর জন্য শুকনো তন্তুগুলো ব্যবহার করেছিলেন যা শতাব্দী ধরে শিকার এবং যুদ্ধের জন্য অপরিহার্য হাতিয়ার ছিল । লুইসিয়ানার নাচেজ উপজাতিরা (Natchez tribes) মানুষের জ্বর কমাতে উদ্ভিদটি সেদ্ধ করে চা প্রস্তুত করতে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করতেন । মেক্সিকোতে ধর্মীয় ছুটির দিনগুলোতে উদ্ভিদটি শোভাময় উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে Cribs এবং অন্যান্য ক্রিসমাস সজ্জায় বা অলঙ্করণে । এছাড়া এটি মাটির মৃৎপাত্র, ক্যানো শক্তিবৃদ্ধি এবং এমনকি ডায়াপার প্যাডিংসহ নানা কাজে ব্যবহৃত হয় । তবে এটি Anticonvulsant এবং Astringent হিসেবে ঔষধি উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে । কিছু মার্কিন অঞ্চলে মাঝে মধ্যে পশুদের খাদ্য হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয় । স্পেনীয় শৈবাল বা T. usneoides উদ্ভিদ সহজেই চাষ করা যায় কারণ এটির মাটি প্রয়োজন হয় না । ঠান্ডা জলবায়ুতে কেবল স্বাস্থ্য, আর্দ্রতা ও জলের প্রয়োজন হয় এবং এটির জন্য একটি শীতের আশ্রয় প্রয়োজন । এটিকে নিয়মিত কুয়াশাচ্ছন্ন এবং আর্দ্র অবস্থায় বাড়ির ভিতরে জন্মানো যেতে পারে । 

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, মোনাকোনেচারএনসাইক্লোপিডিয়া । 

ছবি: https://www.monaconatureencyclopedia.com/?lang=en 

Friday, 14 June 2024

মঙ্গল গ্রহের অলিম্পাস মন্স আগ্নেয়গিরির চূড়ায় হিম আবিষ্কার


ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (European Space Agency বা ESA) ও রাশিয়ান রসকসমস সংস্থার (Russian Roscosmos Agency) মধ্যে একটি সহযোগিতামূলক প্রকল্প ExoMars Trace Gas Orbiter (TGO বা ExoMars Orbiter) এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার Mars Express Orbiter মঙ্গল গ্রহের বিষুবরেখার কাছে Olympus Mons আগ্নেয়গিরিতে প্রথমবারের মতো হিম বা তুষার দেখেছে, যেখানে হিমের অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব বলে মনে করা হয়েছিল । সত্যিই, এক বিস্ময়কর ঘটনা! Olympus Mons শুধুমাত্র মঙ্গলেরই নয়, সৌরজগতের সর্ববৃহৎ-সর্বোচ্চ পর্বত ও আগ্নেয়গিরি যেখানে Tharsis অঞ্চলে এ হিম আবিষ্কৃত হয়েছে । বিশাল ঢাল আগ্নেয়গিরিটি সর্বশেষ বিস্ফোরিত হয়েছিল ২৫ মিলিয়ন বছর আগে । নেতৃত্বদানকারী উদ্ভাবক Adomas Valantinas যিনি সুইজারল্যান্ডের বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ছাত্র হিসেবে এটি আবিষ্কার করেছিলেন এবং বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্টডক্টরাল ফেলো ও গ্রহবিজ্ঞানী তিনি বলেছেন: "আমরা ভেবেছিলাম মঙ্গল গ্রহে বিষুবরেখার চারপাশে হিম হওয়া অসম্ভব । কারণ, এখানে সূর্যালোক ও পাতলা বায়ুমণ্ডলের মিশ্রণ ভূপৃষ্ঠ এবং পর্বতচূড়া উভয় স্থানেই তাপমাত্রা অপেক্ষাকৃত বেশি বজায় রাখে । আমরা পৃথিবীতে যা দেখি তার থেকে ভিন্ন যেখানে আপনি হিমশীতল শিখর দেখার আশা করতে পারেন । এখানে হিমের অস্তিত্ব উত্তেজনাপূর্ণ এবং ইঙ্গিত দেয় যে খেলার মধ্যে ব্যতিক্রমী প্রক্রিয়া রয়েছে যা হিম গঠনের অনুমতি দিচ্ছে । আমরা যা দেখছি তা অতীতের মঙ্গল জলবায়ুর একটি চিহ্ন হতে পারে । হয়তো এটি বায়ুমণ্ডলীয় জলবায়ু প্রক্রিয়াগুলোর সাথে সম্পর্কিত যা মঙ্গল গ্রহের ইতিহাসে আগে কাজ করেছিল, সম্ভবত লক্ষ লক্ষ বছর আগে ।"

থার্সিস (Tharsis) হচ্ছে মঙ্গল গ্রহের পশ্চিম গোলার্ধে বিষুবরেখার কাছে কেন্দ্রীভূত একটি বিশাল আগ্নেয় মালভূমি । এ অঞ্চলটি সৌরজগতের বৃহত্তম আগ্নেয়গিরির আবাসস্থল, যার মধ্যে কয়েকটি বৃহদাকার ঢাল আগ্নেয়গিরি Arsia Mons, Pavonis Mons এবং Ascraeus Mons যেগুলো সম্মিলিতভাবে Tharsis Montes নামে পরিচিত । এখানে Olympus Mons আগ্নেয়গিরিসহ প্রায় এক ডজন আগ্নেয়গিরির বসতি । এ আগ্নেয়গিরিগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই দৈত্যাকার, যা পৃথিবীর মাউন্ট এভারেস্টের চেয়ে এক থেকে তিন গুণ পর্যন্ত উচ্চতায় আশেপাশের সমভূমির উপরে বিস্তৃত । মঙ্গল গ্রহের সবচেয়ে উঁচু আগ্নেয়গিরি হচ্ছে Olympus Mons যেটি থার্সিস অঞ্চলের সাথে যুক্ত কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মালভূমির পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত । থার্সিস থেকে পূর্ব দিকে প্রসারিত ক্যানিয়ন ব্যবস্থা হচ্ছে Valles Marineris । উত্তরে ডিম্বাকৃতির বৈশিষ্ট্য Alba Mons । থার্সিস অঞ্চল মঙ্গল গ্রহের পশ্চিম গোলার্ধে আধিপত্য বিস্তার করে । থার্সিস নামটি হচ্ছে বাইবেলের Tarshish এর Greco-Latin প্রতিবর্ণীকরণ বা বর্ণান্তরণ, যা পরিচিত জগতের পশ্চিম প্রান্তের ভূমি । আগ্নেয়গিরিগুলোর চূড়ায় জ্বালামুখ বা গর্ত (Caldera) এবং বিশাল ফাঁপা (Hollow) রয়েছে যা অতীতে অগ্ন্যুৎপাতের সময় ম্যাগমা প্রকোষ্ঠ খালি হওয়ার কারণে ঘটেছিল । গবেষকরা অনুমান করেন যে, থার্সিসের উপরে একটি অদ্ভুত উপায়ে বাতাস সঞ্চালিত হয় এবং এটি সেখানে আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের মধ্যে এক অনন্য ছোট জলবায়ু (Unique microclimate) গঠন করে যেটি হিমের Patch বা টুকরো বা তাপ্পি তৈরি করতে সাহায্য করে । মানুষের চুলের চেয়ে পাতলা (সম্ভবত এক মিলিমিটারের মাত্র একশতাংশ পুরু) বরফের সূক্ষ্ম কণা আগ্নেয়গিরির চূড়ার জ্বালামুখ এবং তার চক্রবেড়ের (Rim) অংশগুলোতে রাতারাতি তৈরি হতে দেখা যায় । সূর্যালোকে বাষ্পীভূত হওয়ার আগ পর্যন্ত সূর্যোদয়ের সময় চারপাশে হিম টুকরো বা সূক্ষ্ম বরফ কণা বা তাপ্পিগুলো (The patches of frost) কয়েক ঘন্টার জন্য উপস্থিত থাকে । হিমশীতল স্তরটি ব্যতিক্রমভাবে পাতলা হওয়া সত্ত্বেও এটি একটি বিশাল এলাকা জুড়ে আবরণ করে । হিমের পরিমাণ ঠাণ্ডা ঋতুতে প্রতিদিন প্রায় ১৫০০০০ টন জল পৃষ্ঠতল ও বায়ুমণ্ডলের মধ্যে অদলবদল হয়, যা প্রায় ৬০টি অলিম্পিক সুইমিং পুলের সমতুল্য এবং উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় প্রতিদিন ঘনীভূত হয় । TGO অরবিটারের Colour and Stereo Surface Imaging System (CaSSIS) এর প্রধান তদন্তকারী, বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের Adomas এর পিএইচডি সুপারভাইজার এবং সহ-উদ্ভাবক Nicolas Thomas বলেছেন: "বাতাস পাহাড়ের ঢালে ভ্রমণ করে, তুলনামূলকভাবে আর্দ্র বাতাস ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি থেকে উচ্চ-উচ্চতায় নিয়ে আসে যেখানে এটি ঘনীভূত হয় এবং বছরের নির্দিষ্ট সময়ে হিমের মতো স্থায়ী হয় । আমরা আসলে পৃথিবী এবং মঙ্গল গ্রহের অন্যান্য অংশে এটি ঘটতে দেখি, একই ঘটনা ঘটাচ্ছে মৌসুমী মঙ্গলের Arsia Mons Elongated Cloud । আমরা মঙ্গল গ্রহের আগ্নেয়গিরির শিখরে যে হিম দেখতে পাই তা বিশেষ করে জ্বালামুখের ছায়াযুক্ত অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে বলে মনে হয়, যেখানে তাপমাত্রা বেশি ঠাণ্ডা ।" 

মঙ্গল গ্রহ পর্যবেক্ষণকারী মহাকাশযানগুলো এর আগে মঙ্গলে হিমায়িত এবং তরল জলের প্রমাণ দিয়েছে । এ গ্রহের উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে যথেষ্ট পরিমাণে বরফ দেখা গেছে । ভূদৃশ্যের নিদর্শনগুলো থেকে বোঝা যায় যে রক্তিম গ্রহটি একসময় অনেক বেশি আর্দ্র, ছড়িয়ে পড়া দৈত্যাকার হ্রদ, চঞ্চল বা আঁকিয়া বাঁকিয়া যাচ্ছে এমন নদী এবং সম্ভবত বাসযোগ্যও ছিল । মঙ্গল গ্রহের বর্তমান জলচক্রটি বাসযোগ্যতা এবং ভবিষ্যত মানুষের অনুসন্ধানের জন্য প্রভাব ফেলছে । যেমন থার্সিস আগ্নেয়গিরি অঞ্চলের উপরে জলের বরফ মেঘ এবং জলীয় বাষ্প সনাক্ত করা হয়েছে, যা Regolith এবং বায়ুমণ্ডলের মধ্যে জলের সক্রিয় বিনিময়কে অনুমান করা হয় । আনন্দের বিষয় হচ্ছে গ্রহ বিজ্ঞানী Adomas Valantinas, Nicolas Thomas এবং তাদের সহকর্মীরা Olympus Mons, Arsia Mons, Ascraeus Mons এবং Ceraunius Tholus এর থার্সিস আগ্নেয়গিরিতে হিম আবিষ্কার করেছেন । এ হিমগুলো কিভাবে তৈরি হয় তার মডেলিং বিজ্ঞানীদের মঙ্গল গ্রহের অবশিষ্ট গোপন রহস্যগুলোকে প্রকাশ করার অনুমতি দিতে পারে যেখানে জলের অস্তিত্ব রয়েছে ও কিভাবে এটি জলাধারগুলোর মধ্যে চলে যায় এবং গ্রহের জটিল বায়ুমণ্ডলীয় গতিবিদ্যা বোঝার ক্ষেত্রে । মঙ্গল গ্রহের ভবিষ্যৎ অনুসন্ধান এবং পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সম্ভাব্য লক্ষণগুলো অনুসন্ধানের জন্য এ ধরণের জ্ঞান অপরিহার্য । Adomas Valantinas আরো বলেন: ''এ আবিষ্কারটি মঙ্গল গ্রহের বিষুবরেখায় প্রথমবারের মতো হিম পাওয়া গেছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে । কিন্তু আগে কেন দেখা গেল না? কয়েকটি কারণ রয়েছে: প্রথমত, আমাদের একটি কক্ষপথ দরকার যা ভোরবেলা একটি অবস্থান পর্যবেক্ষণ করতে হয় । যদিও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার মঙ্গল গ্রহ পর্যবেক্ষণ করার ক্ষেত্রে TGO অরবিটার এবং Mars Express অরবিটারে এ ধরনের কক্ষপথ রয়েছে যা দিনের সব সময় পর্যবেক্ষণ করতে পারে । এছাড়া অন্যান্য সংস্থা থেকে অনেকগুলো সূর্যের সাথে সমলয় (Synchronised) করা হয় যা শুধুমাত্র বিকেলে পর্যবেক্ষণ করতে পারে । দ্বিতীয়ত, জমাট শীতল মঙ্গল ঋতুর সাথে যুক্ত থাকে হিম যা জানালাটিকে আরো সংকীর্ণ করে দেয় । আমাদের জানতে হবে কোথায় এবং কখন ক্ষণস্থায়ী নীলাভ হিম খুঁজতে হবে । বিষুবরেখার কাছে গবেষণার জন্য আমরা অন্য কিছু খুঁজছিলাম, কিন্তু মঙ্গলের আগ্নেয়গিরির শীর্ষে এটি দেখার আশা করিনি !'' ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার TGO অরবিটার এবং Mars Express অরবিটারের প্রকল্প বিজ্ঞানী Colin Wilson বলেছেন: "মঙ্গল গ্রহের উপরিভাগে জল খোঁজা সবসময়ই উত্তেজনাপূর্ণ, বৈজ্ঞানিক স্বার্থ ও এর প্রভাবের জন্য মানব এবং রোবোটিক উভয় অনুসন্ধানই গুরুত্ব বহন করে । এমনকি এ আবিষ্কারটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয় । মঙ্গল গ্রহের নিম্ন বায়ুমণ্ডলীয় চাপ একটি অপরিচিত পরিস্থিতি তৈরি করে যেখানে গ্রহের পাহাড় চূড়াগুলো সাধারণত তার সমভূমির চেয়ে বেশি ঠাণ্ডা হয় না, কিন্তু মনে হচ্ছে আর্দ্র বাতাস পাহাড়ের ঢালে প্রবাহিত হয়ে এখনো হিমে পরিণত বা ঘনীভূত হতে পারে, এটি নিশ্চিতভাবে পৃথিবীর মতো একটি ঘটনা ৷''

আশ্চর্যজনক আবিষ্কারটি ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা এবং রাশিয়ান রসকসমস সংস্থার প্রদক্ষিণকারী দুই মঙ্গল অভিযাত্রী TGO অরবিটার এবং Mars Express অরবিটারের কৃতিত্ব । তারা মঙ্গল গ্রহে দুর্দান্তভাবে হিম আবিষ্কার করেছে । TGO অরবিটার ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে মঙ্গলে পৌঁছেছিল এবং ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে সম্পূর্ণ বিজ্ঞান মিশন শুরু হওয়ার পর থেকে মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠ, বায়ুমণ্ডল এবং জলের ছবি ও মানচিত্রকরণ করেছে । ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে Mars Express অরবিটার মঙ্গল গ্রহকে প্রদক্ষিণ করার মধ্য দিয়ে মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠ, উপ পৃষ্ঠ, খনিজ পদার্থ, বায়ুমণ্ডল এবং নানা ঘটনা অন্বেষণে দুই দশক অতিবাহিত করছে । গবেষণা দলটি প্রথমে TGO অরবিটারের CaSSIS যন্ত্রের সাহায্যে হিম দেখেছে । তারপর তারা TGO অরবিটারের Nadir and Occultation for Mars Discovery (NOMAD) স্পেকট্রোমিটার এবং Mars Express অরবিটারের High Resolution Stereo Camera (HRSC) ব্যবহার করে এলাকাটি পুনরায় দেখে তাদের অনুসন্ধান নিশ্চিত করেছে । 

তথ্যসূত্র: https://www.esa.int/ , https://www.theguardian.com/ 

অলিম্পাস মন্স আগ্নেয়গিরির অত্যাশ্চর্য ছবি : ESA - European Space Agency   https://www.esa.int/ https://web.facebook.com/EuropeanSpaceAgency

Sunday, 9 June 2024

বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৪ এবং ভূমি পুনরুদ্ধার, মরুকরণ রোধ ও খরা সহনশীলতা

৫ই জুন ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ (World Environment Day বা WED) । বিশেষ দিবসটি ‘ইকো দিবস’ নামেও পরিচিত । সারাবিশ্বে কিংবা কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের সম্মুখীন পরিবেশগত নানা জটিল সমস্যা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে এ দিবস পালন করা হয় । প্রতি বছরই পরিবেশ দিবসের একটি প্রতিপাদ্য বিষয় থাকে । উক্ত দিবসে নানা কর্মসূচী, রাজনৈতিক কর্মোদ্যোগ ও জনসচেতনতার মাধ্যমে এ গ্রহের মানুষকে পরিবেশ সচেতন করে তোলে । বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সময় পানি, বৈশ্বিক উষ্ণায়ণ, ওজোন স্তর, এসিড বৃষ্টি, দারিদ্র, জলবায়ু পরিবর্তন, মরুকরণ, বন্যপ্রাণ ও আবাসস্থল, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, জলজ প্রাণী ও সামুদ্রিক পরিবেশ, সবুজ অর্থনীতি, প্লাস্টিক দূষণ, বায়ুদূষণ এবং বাস্তুতন্ত্রসহ পরিবেশগত নানা প্রকার জটিল বিষয়ের উপর প্রতিপাদ্য করে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হয় । বিশ্ব পরিবেশ দিবসে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই বিভিন্ন পরিবেশ সচেতনতামূলক কর্মসূচী গ্রহণ করে থাকে । জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মতিতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ৫ই জুন থেকে ১৬ই জুন পর্যন্ত ‘জাতিসংঘ মানব পরিবেশ সম্মেলন’ (United Nations Conference on the Human Environment) অনুষ্ঠিত হয় । এখানেই প্রথম পরিবেশ দিবস পালিত হয় । সুইডেনের বিশেষ উদ্যোগে জাতিসঙ্ঘ ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে ৫ই জুনকে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে এবং তখন থেকেই প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন শহরে আলাদা প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে । যেমন: ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজক রাষ্ট্র এবং যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘একমাত্র পৃথিবী’ (Only one Earth) । ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ছিল বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজক শহর এবং যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘মানব বসতি’ (Human Settlements) । গত ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে আয়োজক দেশ ছিল আইভরি কোস্ট, ‘প্লাস্টিক দূষণ সমাধানে শামিল হই সকলে’ এ প্রতিপাদ্য নিয়ে সারাবিশ্বে প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করার লক্ষ্যে দিবসটি পালন করা হয় । ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজক দেশ সৌদি আরব । এ বছর জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির  United Nations Environment Programme (UNEP) নির্ধারিত প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ‘করবো ভূমি পুনরুদ্ধার, রুখবো মরুময়তা, অর্জন করতে হবে মোদের খরা সহনশীলতা’ (Land restoration, desertification and drought resilence) । বৈশ্বিকভাবে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে বসন্তকালে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে শরতকালে দিবসটি পালিত হয় । যথাযথভাবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রেখে পৃথিবীর মানুষ যাতে অন্যান্য সকল জীবের সাথে একাত্ম হয়ে (স্বতন্ত্রভাবে) এক সুন্দর পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করাই হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল উদ্দেশ্য । বর্তমানে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হচ্ছে বনভূমি উজাড় হয়ে যাওয়া । এ বনভূমি শুধুমাত্র অসংখ্য প্রজাতির আবাসস্থলই নয় এটি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । বনভূমি উজাড় হয়ে যাওয়ার ফলে ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, মরুময়, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি করে । এছাড়া ব্যাপক শিল্পায়নের ফলে তীব্রভাবে গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ হয় । গত ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ বিলিয়ন টন যা ২০২২ খ্রিস্টাব্দের তুলনায় শতকরা ১.১ ভাগ বেশি । কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক উষ্ণায়ণের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে । ফলে অতিবৃষ্টি, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবন ও প্রকৃতিতে । তাই, ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় ব্যাপক বনায়নের কোনো বিকল্প নেই । বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ৩.৯২ বিলিয়ন হেক্টর বনভূমি রয়েছে যার মধ্যে অর্ধেকেরই বেশি রাশিয়ায় শতকরা ২০.১ ভাগ, ব্রাজিলে শতকরা ১২.২ ভাগ, কানাডায় শতকরা ৮.৬ ভাগ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শতকরা ৭.৬ ভাগ এবং চীনে শতকরা ৫.৪ ভাগ । অবশিষ্ট বনভূমি পৃথিবীর অন্যান্য অংশে । এখন বাংলাদেশে মোট বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১৪৩২৮০০ হেক্টর । পরিবেশ সুরক্ষায় একটি দেশের আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন এবং সেই তুলনায় বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ প্রায় অর্ধেক । বনভূমি স্বল্পতা ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে । প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা এবং এর থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে দেশের মানুষকে পরিবেশ সচেতন, পরিবেশকে ভালোবাসা, প্রকৃতির সাথে সংযুক্ত হওয়া, নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করা এবং প্রচুর পরিমাণে বৃক্ষ রোপণ করতে হবে । প্রাণের স্পন্দনে, প্রকৃতির বন্ধনে ৷ সবুজ গাছ, সবুজ প্রাণ ৷ একটি গাছ, একটি প্রাণ ৷ একটি গাছ, শত প্রাণ ৷ আমি প্রকৃতির, প্রকৃতি আমার ৷ দূষণ মুক্ত পরিবেশ গড়ি, প্রকৃতিকে রক্ষা করি ৷ বৃক্ষরোপণে এগিয়ে আসি, পৃথিবীকে নিরাপদ রাখি ৷ নিজে বাঁচি, আগামী প্রজন্মের জন্য সবুজ পৃথিবী গড়ে তুলি । তাই, আমাদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, সুুরক্ষিত, টেকসই ও শান্তিময় বিশ্ব নির্মাণে পরিবেশ রক্ষার কোনো বিকল্প নেই । 
বর্তমান বিশ্বে অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির কল্যাণে মানব জাতির জীবনে অসীম সুফল বয়ে আনছে এবং মানুষ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতিসহ সমৃদ্ধ মানব সভ্যতা গড়ে উঠছে । পাশাপাশি মনুষ্য সৃষ্ট বিভিন্ন কর্মকাণ্ড দ্বারা যেমন: শিল্পায়ন, নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোয়া, কলকারখানায় জীবাশ্ম জ্বালানী (তেল ও কয়লা ইত্যাদি পোড়ানো) ব্যবহার, মাইকের আওয়াজ, উচ্চ শক্তির শব্দ ব্যবস্থা, মোটর-নৌ-কলকারখানার যন্ত্রপাতির শব্দ, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা, যেখানে সেখানে মলমূত্র ত্যাগ, হাসপাতালের বর্জ্য, প্লাস্টিক, কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য, যানবাহনের কালো ধোয়া, পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা ও বিস্ফোরণ এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মারাত্মক ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ইত্যাদির মাধ্যমে নানাভাবে মাটি, পানি, বায়ু ও শব্দ দূষণের ফলে ভয়াবহ পরিবেশ দূষিত হচ্ছে । ফলে মানুষের চর্মরোগ, চোখের সমস্যা, শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি, হৃদরোগ, হাইপারটেনশন, মস্তিষ্কের রোগ, যকৃত ও বৃক্কের দীর্ঘ মেয়াদী সমস্যা, শিশুর বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ব্যহত, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, গর্ভপাত, অপরিপক্ব শিশু জন্মদান, মৃত শিশু জন্মের সম্ভাবনা, বধির হওয়া এবং দুরারোগ্য ব্যধিসহ নানাবিধ রোগের কারণ ঘটিয়ে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ডেকে আনছে । বাংলাদেশে প্রতিবছর যে সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয় তার শতকরা প্রায় ২৮ ভাগ ঘটে থাকে পরিবেশ দূষণের কারণে । অতএব, পরিবেশ দূষণের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে এর ক্ষতিকর প্রভাবকে কার্যকর সমাধানের জন্য সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে । বনায়ন, নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন বন্ধ, ইটভাটায় কাঠ না পোড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তির পরিবেশ বান্ধব ইটভাটা স্থাপন, ইটভাটার চিমনী উচ্চতায় নির্মাণ, শিল্পকারখানার বর্জ্য খাল-বিল-নদীতে না ফেলে Effluent Treatment Plant (ETP) এর মাধ্যমে বিশোধন, প্লাস্টিক ব্যাগের বিকল্প হিসেবে পরিবেশ বান্ধব পাটজাত পণ্য ব্যবহার, যানবাহনে সীসা মুক্ত জ্বালানী ব্যবহার, সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস (CNG বা Compressed Natural Gas) ব্যবহার, শিল্পকারখানা-গৃহস্থালি-হাসপাতাল-ইলেকট্রনিক্স বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে না ফেলে তা পুনর্ব্যবহারযোগ্য (Recycling) করে তোলা, কীটনাশক পদার্থের ব্যবহার কমিয়ে কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহার বৃদ্ধি, কাঠের আসবাবপত্রের বিকল্প ব্যবহার বৃদ্ধি, পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি ও পণ্য ব্যবহার, পরিবেশ ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণে কঠোর আইন প্রয়োগ, সঠিক পরিকল্পনায় ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সবুজ নগরায়ন, উন্নয়ন প্রকল্প ও শিল্প কারখানায় সুন্দর-সুশৃঙ্খল পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, ব্যাংকের ক্ষেত্রে সবুজ অর্থনীতি, দূষণ কর আরোপ (Green tax), গবেষণার মাধ্যমে খরা সহনশীল বিভিন্ন জাতের ক‌ৃষি বীজ উদ্ভাবন, কৃষি বনায়ন, ভূগর্ভস্থ ও বৃষ্টির পানির সঠিক ব্যবহার, সৌরশক্তি ব্যবহার এবং মরুকরণ রোধ করে দূষণমুক্ত একটি সুন্দর পরিবেশ নির্মাণ করা যেতে পারে । জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা । জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বে উষ্ণায়ণের কারণে মানুষ, মানব সমাজ, পরিবেশ, প্রকৃতি এবং জীববৈচিত্র্যের উপর ভয়ঙ্কর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে । তাপমাত্রা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, মাটির উর্বরতা হ্রাস, বন্যা, খরা, দাবানল, সুনামি, বজ্রপাত, ঘূর্ণিঝড়, ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়, গ্রীস্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্পের কার্যকলাপ বৃদ্ধি, তুষারঝড়, তাপপ্রবাহ (Heat wave), তীব্র গরমের কারণে তাপজনিত অসুস্থতা (Heat stress), সামুদ্রিক বরফ গলন (Ice-albedo feedback), বহুবর্ষজমা বরফের (Permafrost) গলন, মহাসাগরে স্তরীভবন বৃদ্ধি ও অক্সিজেন মাত্রা হ্রাস, সামুদ্রিক স্রোতের দুর্বলতা, স্থল ও সামুদ্রিক বা মহাসাগরীয় বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, মানব বসতি ক্ষতিগ্রস্ত ও অভিযোজন সমস্যা, সংঘাত বা হিংসাত্মক অপরাধ বৃদ্ধি, অ্যান্টার্কটিকার বিশাল হিমশৈল গলে গিয়ে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে পৃথিবীর নিম্নাঞ্চলের দেশ ও ক্ষুদ্র দ্বীপসমূহ তলিয়ে যাওয়া বা নিশ্চিহ্ন হয়ে কোটি কোটি মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা, বরফাবৃত উত্তরমেরুর আকাশে ওজোন স্তরে প্রায় ১০ লাখ বর্গ কিলোমিটারের বিশাল গর্ত তৈরি, মেরু ঘূর্ণি (Polar vortex) দুর্বল হয়ে ফিনকি স্রোত (Jet stream) ক্রমশ তীব্রতর রূপ ধারণ করে তুষারপাত-শৈত্য প্রবাহ-তীব্র গরম সৃষ্টি, মরুকরণ এবং ভূমি অবক্ষয়ের মাধ্যমে পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীকুল, মানব স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ বাতাস, নিরাপদ বাসস্থান, বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা, পানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে । বিশেষকরে প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের উপর একটি বৃহৎ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য সামগ্রী নির্ভরশীল হওয়ায় তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন ও ভুক্তভোগী । এতে করে আশঙ্কাজনকভাবে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে । তাছাড়া মানুষের জীবনে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে ব্যাপক প্রভাব পড়ে । ফলে টেকসই উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয় না । ধারণা করা হয়, প্রায় দুই হাজার কোটি টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে জমা হয়েছে । যার পরিণতি বর্তমানে বিশ্বব্যাপী গড়ে শতকরা ১৬ ভাগ মানুষের মৃত্যু হার বৃদ্ধি করছে । ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ রোধ চুক্তি সম্পাদনের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিগত ২০০৫ খ্রিস্টাব্দের তুলনায় ২০২৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে শতকরা ২০-২৮ ভাগ গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনার কথা অঙ্গীকার করে । যদিও উল্লেখিত চুক্তিতে চীন কোনো প্রকার লক্ষ্য নির্ধারণ না করেই আগামী ২০৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনার কথা বলেছে । গত ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে সারাবিশ্বে ৫২ গিগাটন গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণের মধ্যে ২৭ শতাংশই নিঃসরণ করে চীন, ১১ শতাংশ নিঃসরণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বাকি অংশ নিঃসরণ করে শিল্পোন্নত দেশগুলো যাদের তালিকার প্রথম দিকেই অবস্থান । এদিকে মূলত জি-২০ ভুক্ত দেশগুলোই সারাবিশ্বে শতকরা ৮০ ভাগ কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী । পরিবেশ সুরক্ষা, জীব-বৈচিত্র্য রক্ষা ও বাস্তুতন্ত্রের উন্নয়ন ঘটিয়ে মরুকরণ এবং ভূমির অবক্ষয় রোধ করে কিভাবে টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় সৌদি আরব সরকার সেদিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে । জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সৌদি আরব সরকার ২০৩৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ৪.১ মিলিয়ন টন কার্বন হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে । তাই, ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার যে প্রতিশ্রুতি বিশ্ব নেতৃবৃন্দ দিয়েছিলেন তা কার্যকর করতে আরো উদ্যোগী হয়ে সকলের এগিয়ে আসতে হবে । জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বিশ্বব্যাপী পড়লেও উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ক্ষতির পরিমাণ বেশি । কারণ ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থান, জীবিকা নির্বাহের বিভিন্ন খাত ধ্বংসপ্রাপ্ত, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, প্রাকৃতিক সম্পদের স্বল্পতা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার অক্ষমতা এবং অভিযোজন ব্যবস্থার সমস্যা ইত্যাদি কারণে দেশগুলো তীব্রভাবে ক্ষতিসাধিত হয়ে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি করছে । অন্যদিকে শিল্পোন্নত দেশগুলোকে এমন ভয়ঙ্কর এবং জটিল সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় না । কিছু প্রভাশালী শিল্পোন্নত দেশের অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের ফলে গ্যাস নিঃসরণের মাত্রা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে । যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে আশাব্যঞ্জক বৈচিত্র্যময় উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে । তবে, তা অতি নগন্য । অতএব জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভূমি অবক্ষয়, মরুকরণ এবং খরার প্রভাব মোকাবেলার মতো বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে এ সংক্রান্ত বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে । নেট-শূন্য কার্বন নির্গমন (Net-zero carbon emission) অর্জনের লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে । পাশাপাশি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু অর্থায়ন ও পরিবেশ রক্ষায় এর ভূমিকা ও গুরুত্ব, আদিখেত্যা নকশা (Simulation model) ব্যবহার করে কৃষকদের খরা মোকাবেলায় সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন ও প্রশমন, স্মার্ট কৃষি, মুঠোফোনের মাধ্যমে খরার প্রাক-সতর্কবার্তা প্রদান এবং বাংলাদেশে একটি ‘পরিবেশ গবেষণা ইনস্টিটিউট’ গঠন করা যেতে পারে । 
এদিকে অপরিকল্পিতভাবে ও ব্যাপকহারে ভূমি ব্যবহার, বনভূমি ধ্বংস, পহাড়-নদীর মাটি কর্তন ও স্থানান্তর, লবণাক্ততা এবং ফসলী জমিতে অধিক পরিমাণে রাসায়নিক সার ব্যবহার করার কারণে ভূমি অবক্ষয় ও মরুকরণ প্রক্রিয়া বৃদ্ধি পাচ্ছে । খরা, মরুকরণ ও ভূমি অবক্ষয়ের কারণে সারাবিশ্বে প্রাণীকুল, মানব স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ বাতাস, নিরাপদ বাসস্থান, বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা, পানি নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে । বিশ্বব্যাপী প্রতিনিয়ত তাপমাত্রা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়ছে ভূমির উপর । ভূমি অবক্ষয়ের কারণে মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস, কৃষি জমি চাষাবাদের অনুপযোগী এবং সুপেয় পানির অভাব হচ্ছে । খরা, মরুকরণ এবং ভূমিক্ষয় আগামীতে পৃথিবীর জন্য এক অশনি সংকেত! United Nations Convention to Combat Desertification (UNCCD) এর তথ্যানুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় ৪০ শতাংশ ভূমি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে এবং সারাবিশ্বে জিডিপির অর্ধেক (৪৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার) হুমকির সম্মুখীন । তাই তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, অনাবৃষ্টি, লবণাক্ততা, নগরায়ন, মরুময়তা, বনাঞ্চলের পরিমাণ হ্রাস, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, জমিতে রাসায়নিক সার প্রয়োগ, কৃষিকাজে সেচ, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলাশয়-নদী-খাল-জলাধার-জলাভূমি ইত্যাদি ভরাট, নদী শুকিয়ে মৃত অবস্থা, বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ এবং জলবায়ুর প্রভাববিস্তারকারী মৌসুমী বায়ুপ্রবাহজনিত বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে বাংলাদেশে মরুময়তার ঝুঁকি বাড়ছে । এ মরুকরণের ফলে কৃষি জমি হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে । বর্তমানে খরা এবং মরুকরণ পৃথিবীর জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ । বিশ্বের মোট ভূমির শতকরা প্রায় ২৫ ভাগ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে । খরা ও মরুকরণ সারাবিশ্বে পরিবেশগত নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য, দারিদ্র্য বিমোচন, আর্থ-সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভয়াবহ সমস্যা সৃষ্টি করছে । ফলে আগামী দশকে পৃথিবীতে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে । ধারণা করা হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে ২০৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রায় ৩.৩ মিলিয়ন মানুষ এবং ২০৮০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রায় ৪.৩ মিলিয়ন মানুষের নিজস্ব জমি হারিয়ে যেতে পারে । অতএব, আমাদের দেশে যাতে মরুকরণ সৃষ্টি না হয় সেদিকে অতি জরুরী ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে । এর সাথে পরিবেশ দূষণ রোধ, বনায়ন, মানুষের সচেতেনতা বৃদ্ধি এবং খরা সহনশীল বীজ উদ্ভাবন করতে হবে । 
বর্তমান গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বনভূমির পরিমাণ উন্নীত করতে ব্যাপকভাবে বৃক্ষ রোপণ ও নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যেমন: জলবায়ু পরিবর্তনের সংপ্রশ্ন (Challenge) মোকাবেলা, সবুজায়ন, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানী এবং প্রকৃতিনির্ভর সমাধান ইত্যাদি । জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা ও ফলপ্রসূ সমাধানের প্রধান কৌশল হিসেবে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১ এবং ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ গ্রহণ করেছে । পাশাপাশি বাংলাদেশের মহান জাতীয় সংসদে Planetary Emergency Bill (গ্রহগত জরুরী অবস্থা) বিল পাস হয়েছে । এছাড়া পৃথিবীর প্রথম স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ Climate Change Trust Fund গঠন করে যেখানে গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব সম্পদ থেকে ৪৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে । মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী জলাবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর স্বার্থরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ও এর রোধকল্পে নানা উদ্যোগ গ্রহণের স্বীকৃতস্বরূপ তাকে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ পরিবেশগত পুরস্কার ‘Champions of the Earth’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয় । জলবায়ু নেতাদের শীর্ষ সম্মেলন Climate Leaders Summit নামে ভার্চুয়াল সম্মেলনে তিনি অংশ নেন এবং জলবায়ু বিপন্ন ৪৮টি দেশের জোট Vulnerable Twenty (V20) ও Climate Vulnerable Forum (CVF) এর সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন । 
Global Center on Adaptation (GCA) এর দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয় ঢাকায় অবস্থিত । জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবেলা, অভিযোজন সমস্যার সমাধান বা বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবের সাথে খাপ খাওয়ানোর উপায় বের করা এবং এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সরকার, বিভিন্ন শহরের মেয়র, ব্যবসায়ী নেতা, সুশীল সমাজ ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করে থাকে GCA কার্যালয়টি । তাই আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশ, সংস্থা এবং সংগঠনের সাথে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে পরিবেশ দূষণ, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব এবং পরিবেশগত সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে কূটনৈতিকভাবে আরো জোরালো সম্পর্ক স্থাপনের পাশাপাশি দূষণ রোধ, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা ও সমাধানের ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে । জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে ‘জলবায়ু সংকট’ হিসেবে দেখা দিয়েছে । জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম । আমি মনে করি, বৈশ্বিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবেলা ও সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ক্ষতিপূরণ আদায় ও গ্রীন হাউস গ্যাস নিঃসরণ চুক্তির নানা বিষয়গুলোর অগ্রগতি নিয়ে বাংলাদেশ সরকার প্রধান নেতৃত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশের সাথে শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে পারেন । কার্বন নিঃসরণের জন্য জলবায়ু তহবিলে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থাকে Carbon pricing বলে । এছাড়া, বিপন্ন দেশগুলোর পক্ষে তিনি শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে জলবায়ু তহবিলের প্রাপ্য কিস্তি প্রদানে জোর প্রচেষ্টা চালাতে পারেন । বিগত দিনে আয়োজক হিসেবে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য বিষয়ের উপর ১০ বার বিশ্ব পরিবেশ দিবস উৎযাপিত হয়েছিল । তাই আগামীতে এ ধরনের অনুষ্ঠানের পুনরায় আয়োজক হওয়ার জন্য সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে বলিষ্ঠভাবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে । পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে পরিবেশ দূষণরোধী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে, Green Technology এর বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে হবে এবং Track diplomacy সহ পরিবেশগত বিষয়গুলোর উপর অধিক জোর দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে । সর্বোপরি, পরিবেশের বাস্তুতন্ত্র ও জীব বৈচিত্র্যকে রক্ষা করতে হবে । তাহলে প্রকৃতি হবে সুুরক্ষিত । টিকে থাকবে এ মৃৃত্যুন্মুখ গ্রহ । নইলে অনিবার্য ধ্বংস । সুতরাং, সবুজ গ্রহ গঠনের মধ্য দিয়েই আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তৈরি হবে একটি সুন্দর ও শান্তিময় আবাসস্থল । 

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, আন্তর্জাল (The Internet) । 

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...