ওর্ট মেঘ হচ্ছে আমাদের সৌরজগতের একেবারে বাইরের প্রান্তে অবস্থিত এক বিশাল, অদৃশ্য এবং গোলাকার মেঘ, যা কোটি কোটি বরফময় বস্তু বা ধ্বংসাবশেষ এবং ধুমকেতু দিয়ে তৈরি । এটি মূলত সৌরজগতের দূরবর্তী সীমানা হিসেবে চিহ্নিত হয় । ওর্ট ক্লাউড মেঘ সূর্য থেকে প্রায় ২০০০-১০০০০০ AU (Astronomical unit) (প্রায় ১-২ আলোকবর্ষ) দূরে অবস্থান করছে । ধারণা করা হয়, সৌরজগত সৃষ্টির শুরুর দিকে (প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে) বৃহস্পতি ও অন্যান্য গ্রহের মহাকর্ষীয় টানে এই বরফখণ্ড বা বস্তগুলো সৌরজগতের ভেতরের অংশ থেকে বাইরের দিকে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল । যেসব ধূমকেতু সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে ২০০ বছরেরও বেশি সময় লাগে (যেমন: হ্যালির ধূমকেতু) তাদের বেশিরভাগই এই ওর্ট মেঘ থেকে আসে । এটি এখনো সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যায়নি । কারণ, ওর্ট মেঘ অত্যন্ত দূরে অন্ধকারময় অঞ্চলে অবস্থিত এবং ঠান্ডা বস্তুগুলো অনেক ছোট । ডাচ জ্যোতির্বিজ্ঞানী Jan Oort ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম এই মেঘের অস্তিত্বের তাত্ত্বিক ধারণা দেন । ওর্ট মেঘ আমাদের সৌরজগতের প্রকৃত সীমানার প্রতিনিধিত্ব করে । সৌরজগতের ভেতরের অংশটি পরিচিত মনে হলেও— যেখানে নেপচুন গ্রহ গড়ে প্রায় ৩০ AU এবং বামন গ্রহ প্লুটো প্রায় ৪০ AU দূরে অবস্থিত । ওর্ট মেঘ কয়েক হাজার AU দূর থেকে শুরু হয়ে ১০০০০০ AU বা তারও বেশি দূরত্ব পর্যন্ত বিস্তৃত । ১ AU হচ্ছে পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব, যা প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটারের সমান । প্রতি সেকেন্ডে আলো ৩০০০০০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলে এবং প্রায় আট মিনিটে ১ AU দূরত্ব অতিক্রম করে । কিন্তু এই আলো ওর্ট মেঘের ভেতরের প্রান্তে পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে এবং এর বাইরের প্রান্ত ১ আলোকবর্ষেরও বেশি দূরে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে আলো পৌঁছাতে এক বছরেরও বেশি সময় প্রয়োজন হয় । এই বিশালতা আমাদের দৈনন্দিন ধারণাকে ম্লান করে দেয় । ভয়েজার-১ হচ্ছে পৃথিবী থেকে পাঠানো মানবসৃষ্ট রোবোটিক মহাকাশযান বা বিস্ময়কর বস্তু, যেটি ৬৪০০০ কিঃমিঃ/ঘন্টা বা ৪০০০০ মাইল/ঘন্টা গতিতে ভ্রমণরত সবচেয়ে দূরবর্তী আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে তার অনন্য কার্যক্রম পরিচালনা করছে । পৃথিবী থেকে এটি প্রায় ২৫.৪ বিলিয়ন কিলোমিটার (১৫.৮ বিলিয়ন মাইল) বা ১৭০ AU দূরে অবস্থান করছে । ভয়েজার-১ এমন গতিতে চললে ওর্ট ক্লাউডে প্রবেশ করতে এর ৩০০ বছর এবং এটি অতিক্রম করতে ৩০০০০ বছর সময় লাগবে । এখানে সূর্যের মহাকর্ষীয় প্রভাব নাটকীয়ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, যা এই হিমায়িত বস্তুগুলোকে চলমান নক্ষত্র এবং ছায়াপথীয় জোয়ারের বিপরীতে কোনোমতে বেঁধে রেখেছে । আমরা আকাশে যে ধূমকেতুগুলোকে ছুটে যেতে দেখি, সেগুলো প্রায়শই এই দূরবর্তী আধার থেকেই উৎপন্ন হয়, যা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে আলোড়িত হয়ে ভেতরের দিকে ধাবিত হয়েছে । সুতরাং, ওর্ট মেঘ কেবল দূরত্বই নয়, বরং একটি ধারণাগত সীমানাও চিহ্নিত করে । এটি আমাদের সৌরজগতের প্রান্ত গ্রহগুলোকে ছাড়িয়ে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত, যা প্রকাশ করে যে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের মধ্যে আমরা কতটা বিচ্ছিন্ন অথচ সংযুক্ত । ওর্ট মেঘের চরম দূরবর্তীতা সৌরজগতের শ্বাসরুদ্ধকর, প্রায় অকল্পনীয় বিশালতাকেই তুলে ধরে ।
তথ্যসূত্র: Google, Science Acumen
ছবি: Science Acumen ।

No comments:
Post a Comment