Saturday, 23 November 2024

দৈত্যাকার বেতার ছায়াপথ আবিষ্কার

 


~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ  ও জ্যোতির্পদার্থবিদ Kathleen Charlton এর নেতৃত্বে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক দল আশ্চর্যজনক দানব আকৃতির ছায়াপথের সন্ধান পেয়েছেন । যা পূর্বে কখনোই উন্মোচিত হয়নি । এটি বৃহত্তম মহাজাগতিক কাঠামোর এক নতুন অন্তর্দৃষ্টি । দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাজ্য, স্পেন এবং চীনের গবেষকদের এ নতুন অনুসন্ধানটি সম্প্রতি পরিষেবা সাইট arXiv এ গত ১১ই নভেম্বর প্রকাশিত হয়েছে । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা Cosmological Evolution Survey (COSMOS) এর ক্ষেত্রে এ ছায়পথগুলোকে তদন্ত করতে ৫৪৪ MHz থেকে ১.৬৭ GHz পর্যন্ত বিভিন্ন কম্পাঙ্কে বা স্পন্দনহারে বেতার পর্যবেক্ষণের বিশদ বর্ণালী বিশ্লেষণের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত The MeerKAT radio interferometer বেতার টেলিস্কোপ ব্যবহার করেছেন । উচ্চ কম্পাঙ্কে ছায়াপথগুলোকে অধ্যয়নের জন্য এটি একটি চমৎকার দূরবীক্ষণ যন্ত্র । উক্ত গবেষণাটি The MeerKAT International GHz Tiered Extragalactic Exploration (MIGHTEE) জরিপের অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়েছিল । ফলে, গবেষকগণ ছায়াপথগুলো সম্পর্কে আকর্ষণীয় তথ্যাদি জানতে পেরেছেন । এ ছায়াপথগুলোর অধ্যয়ন মহাজাগতিক-মাপনী প্রক্রিয়াগুলোর সূক্ষদৃষ্টি প্রদান করতে পারে যেমন: প্রত্যেকটি ছায়াপথের গঠন, বিবর্তন, বিকাশ প্রক্রিয়া, আন্তঃগ্যালাকটিক মিথস্ক্রিয়া এবং আন্তঃনাক্ষত্রিক ও আন্তঃগ্যালাকটিক পরিবেশে পারমাণবিক কার্যকলাপের প্রভাব ইত্যাদি । পর্যবেক্ষণগুলোতে বর্ণালী বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিটি ছায়াপথের ফিনকি স্রোত বা প্রবাহে (Jet) প্রাণরসের (Plasma) বয়স মানচিত্রকরণ সম্ভব হয়েছে ।  

এ দৈত্যাকার বেতার ছায়াপথগুলোকে (Giant radio galaxies বা GRGs) পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের বৃহৎ জ্যোতির্পদার্থগত উৎস বা বৃহত্তম কাঠামোগুলোর মধ্যে একটি বিবেচনা করা হয়, যেখানে রয়েছে তেজস্ক্রিয় প্রাণরসের বিশাল ফিনকি স্রোত যা কয়েক হাজার থেকে মিলিয়ন কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত । ছায়াপথগুলো∼০.৭ থেকে ৫ মেগাপারসেক পর্যন্ত রৈখিক আকারের সক্রিয় ছায়াপথগুলোর একটি চরম শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে । এরা স্বাগতিক ছায়াপথ থেকে সমৃদ্ধ উপাদানগুলোকে বড় দূরত্বে পরিবহন করতে পারে এবং অ-তাপীয় কণা ও চৌম্বক ক্ষেত্রগুলোর সাথে আন্তঃগ্যালাকটিক মাধ্যমকে (Intergalactic medium বা IGM) দূষিত করতে পারে । অ-তাপীয় চৌম্বকীয় প্রাণরস কোটি কোটি বছর ধরে আন্তঃগ্যালাকটিক মাধ্যমে লুকিয়ে থাকতে পারে এবং অশান্ত আন্তঃস্তবক মাধ্যম (Turbulent intra-cluster medium), কেন্দ্রীয় বেতার হ্যালোগুলো (Central radio haloes) ও সীমান্তবর্তী বেতার ধ্বংসাবশেষের (Peripheral radio relics) সাথে যুক্ত শক্তিশালী অভিঘাত তরঙ্গগুলো (Shockwaves) উচ্চ-শক্তির বীজ কণাকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উৎস হয়ে উঠতে পারে । 

গবেষণার ক্ষেত্রে জরিপ করা ৩টি বৃহৎ ছায়াপথের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে যেমন: (ক) MGTC J095959.63+024608.6 (খ) MGTC J100016.84+015133.0 এবং (গ) MGTC J100022.85+031520.4 । এদের মধ্য থেকে MGTC J100022.85+031520.4 ছায়াপথটিকে (যাকে GRG3 ছায়াপথ বলে) এ গবেষণার অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো চিহ্নিত করা হয় । নতুন GRG3 বেতার ছায়াপথের প্রত্যাশিত বা অভিক্ষিপ্ত রৈখিক আকার প্রায় ৪.২ মিলিয়ন আলোকবর্ষ, যার ভর ৯৩ ট্রিলিয়ন সৌর ভর এবং ১২৮৪ MHz এ মোট ৫৯৭ ZW/Hz শক্তি । সবচেয়ে উজ্জ্বল একটি স্পার্স ছায়াপথ স্তবকের (Sparse galaxy cluster WHL J100022.9+031521) কেন্দ্রে GRG3 ছায়াপথ অবস্থিত । ধারণা করা হয় যে, ছায়াপথটির উপরের খণ্ডে (Lobe) বাঁকানো অঙ্গবিন্যাস (Wide-angle-tail বা WAT) হচ্ছে এটির বেতার উৎস, যা স্বাগতিক ছায়াপথে অনুরূপ বৈশিষ্ট্য রয়েছে । সাধারণভাবে WAT বেতার উৎসগুলো শক্তিশালী এবং প্রায়শই ছায়াপথ স্তবকের কেন্দ্রে অবস্থিত, যেখানে Intracluster medium ram pressure দ্বারা খণ্ডগুলো তাদের বৈশিষ্ট্যযুক্ত সি-আকৃতিতে বাঁকতে পারে । এ বেতার উৎসগুলো গ্যালাকটিক কেন্দ্রের সক্রিয় নিউক্লিয়াসে জন্মগ্রহণ করে । বেতার উৎসগুলোর গঠন এবং বিবর্তন সম্পর্কে আরো সুনির্দিষ্টভাবে অধ্যয়ন করার জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে দৈত্যাকার বেতার ছায়াপথগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ । অতএব, GRG3 ছায়াপথটিকে স্তবক পরিবেশে বসবাস করার জন্য পরিচিত দৈত্যাকার বেতার ছায়াপথগুলোর মাত্র শতকরা ৪ ভাগের মধ্যে ১টি করে তোলে । অপার বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৌন্দর্য ও কৌতূহলের অধিকারী এ GRG3 ছায়াপথটি স্বাগতিক উপবৃত্তাকার ছায়াপথ SDSS J100022.85+031520 দ্বারা আশ্রিত হয়েছে যার লাল স্থানান্তর (Redshift) প্রায় ০.১০৩৪ । সংগৃহীত তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে, GRG3 ছায়পথের গতিশীল বয়স প্রায় ১ বিলিয়ন বছর (বর্ণালী বয়স প্রায় ৬৭ মিলিয়ন বছর) এবং এর ফিনকি স্রোতের শক্তি ১ মিলিয়ন QW এর স্তরে রয়েছে ।  

আবিষ্কৃত এ অসুর বেতার ছায়াপথগুলোকে তাদের বিশাল আকৃতি দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হয়, যা প্রায় ৭০০ কিলোপারসেক ছাড়িয়ে যায় । এরা সাধারণত কম ঘনত্বের পরিবেশে জন্মানো মহাজাগতিক বিরল বস্তু এবং সিঙ্ক্রোট্রন-নিঃসরণকারী প্রাণরসের (Synchrotron-emitting plasma) ফিনকি স্রোত ও খণ্ডগুলোকে (Lobes) প্রদর্শন করতে দেখা যায় । এ ছায়াপথগুলো Galactic nucleus থেকে নির্গত প্রাণরসের ফিনকি স্রোতগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে । গ্যালাকটিক কেন্দ্রস্থলে একটি অতিবৃহদাকার কৃষ্ণ গহ্বরের কার্যকলাপের ফলে এ স্রোতগুলো তৈরি হয়, যা অত্যন্ত শক্তিশালী তেজস্ক্রিয় বিকিরণ নির্গত করে । “Jet feedback" নামে পরিচিত এ ঘটনাটি আন্তঃগ্যালাক্টিক পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে এবং পরিবেশের গ্যাসকে উত্তপ্ত করে নতুন নক্ষত্রের গঠন প্রতিরোধ করতে পারে কিংবা বাধা দিতে পারে ।  

দানবীয় বেতার ছায়াপথগুলো শনাক্তকরণের ফলে বিশাল গ্যালাকটিক কাঠামো এবং তাদের চারপাশের মধ্যে সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখে । Jaffe-Perola model এবং Tribble model পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে গবেষণাটি করা হয় । এ নকশাগুলো বিভিন্ন কম্পাঙ্কের মাধ্যমে বিকিরণ পরিমাপ করে প্রাণরসের বার্ধক্য বর্ণনা করে । যেখানে GRG1 ছায়াপথ এবং GRG2 ছায়াপথের সাধারণ বয়স বন্টন রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে কনিষ্ঠ প্রাণরস হচ্ছে ছায়াপথের কেন্দ্রস্থলে এবং সবচেয়ে পুরোনো প্রাণরসটি ছায়াপথের বাইরের বাহুতে অবস্থিত । এ গবেষণাটি দৈত্যাকার বেতার ছায়াপথগুলোর শারীরিক প্রক্রিয়া এবং পরিবেশের উপর তাদের প্রভাব বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ । এ বিস্ময়কর আবিষ্কারগুলো কেবল মহাবিশ্বের বোঝার ক্ষেত্রেই অবদান রাখে না,  পাশাপাশি বেতার-জ্যোতির্বিদ্যা বিশ্লেষণের জন্য উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যৎ অধ্যয়নের দরজাও খুলে দেয় ।  

তথ্যসূত্র এবং ছবি: https://phys.org/ , www.hayadan.com  । 

No comments:

Post a Comment

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...