প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর পূর্বে একটি বৃহৎ পরমাণুর মহাশক্তিশালী মহাবিস্ফোরণের (Big Bang) ফলে মহাবিশ্বের (The Universe) উৎপত্তি হয় । এই মহাবিস্ফোরণটি ভয়ানক হিংস্রভাবে সম্প্রসারিত মহাবিশ্বের মধ্যে শক্তি বিকিরণকারী প্রচণ্ড শক্তিশালী অভিঘাত তরঙ্গের (Shockwave) সৃষ্টি করে । এক সেকেন্ডের এক মিলিয়ন ভাগের এক ভাগ সময়ে মহাবিশ্বের অস্তিত্বের আদিম গঠন তিনটি স্বতন্ত্র পর্যায়গুলোর মধ্য দিয়ে স্থানান্তরিত হয় । যেমন: তড়িচ্চুম্বকীয়, মাধ্যাকর্ষণ এবং দুর্বল বা শক্তিধর শক্তিগুলো মৌলিক শক্তি হিসেবে আকার ধারণ করে । সেই সময় প্রোটন এবং নিউট্রন গঠনের জন্য তাপমাত্রা ছিল অত্যাধিক । পরবর্তীতে তাদের অভ্যন্তরীণ অংশ থেকে তৈরি সুরুয়া (Soup) মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে । এটি Quark বা Gluon নামেও পরিচিত । চোখের পলকেই এই সুরুয়া ঠান্ডা হয়ে সাধারণ বস্তু বা পদার্থের প্রথম লক্ষণগুলোর জন্ম দেয় । বিজ্ঞানীদের ধারণা, অতিক্ষুদ্র মৌলকণার সুরুয়া শুধুমাত্র প্রাকৃতিকভাবেই নিউট্রন নক্ষত্রের কেন্দ্রস্থলে বিদ্যমান থাকতে পারে । প্রলয়ঙ্করী মহাবিস্ফোরণের পর প্রায় ৩ লক্ষ ৮০ হাজার বছর থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক শত মিলিয়ন বছর পর্যন্ত হাইড্রোজেন এবং খুবই সামান্য পরিমাণ হিলিয়াম নিউক্লিয়াস আলফা কণা ছাড়া বিভিন্ন গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ ইত্যাদি বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের কোনো অস্তিত্বই ছিল না । তাই, এই সময়টিকে বলা হয় অন্ধকার যুগ । সময়ের হাত ধরে এই মহাবিশ্ব বা মহাজাগতিক উত্তপ্ত বস্তুগুলো ধীরে ধীরে শীতল হয় । মহাবিস্ফোরণের পরপরই মহাবিশ্বের উপর আধিপত্য বিস্তারকারী প্রচণ্ড গরম ও ঘন পদার্থ Plasma Soup (Quark-Gluon Plasma) থেকে আলো বের হয়ে আসতে পারছিল না । পরবর্তীতে হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো প্লাজমা’র সাথে ধাক্কা খেয়ে ফোটন আলোককণা বের হয়ে আসে । নক্ষত্র জন্ম নেয় । সেটিই হয় আলোর উৎস যেখান থেকে আলো আসতে শুরু করে । তবে, সেই অন্ধকার যুগ নির্দিষ্টভাবে ঠিক কখন শেষ হয়েছিল কিংবা কখনোইবা প্রথম নক্ষত্র, ছায়াপথ, গ্রহ এবং প্রাণের উদ্ভব বা জীবনের শুরু হয়েছিল— তা এখনো অজানা ।
এই মহাবিস্ফোরণের প্রায় ৩ মিনিট থেকে ১০০০০০ বছরের মধ্যে হাইড্রোজেন এবং হিলিয়ামসহ প্রচুর পরিমাণ ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন, ইলেকট্রন প্লাজমা ও ভারি বস্তুকণা তৈরি হয় । অসংখ্য বস্তুকণা প্রচণ্ড গতিতে মহাবিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যায় এবং এদের কণিকাগুলো ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত । এগুলো ধীরে ধীরে শীতল হয় এবং ভিতরের আন্তঃআকর্ষণের কারণে বস্তুকণা বা বস্তুপুঞ্জগুলো কাছাকাছি চলে আসে । দলবদ্ধ বস্তুপুঞ্জের ঘনত্ব বৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত মহাকর্ষীয় আকর্ষণের ফলে একটি ঘূর্ণনগতির সৃষ্টি হয় । এই ঘূর্ণন গতির কারণেই মহাকাশের মেঘগুলো ঘূর্ণায়মান চাকতিতে পরিণত হয় । পর্যায়ক্রমে নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বস্তুপুঞ্জগুলো বিভিন্ন আকৃতির একক দল গঠন করে এই অসীম মহাবিশ্বে ছায়াপথ, ছায়াপথ স্তবক এবং ছায়াপথ মহাস্তবক ইত্যাদি সৃষ্টি করে । এই ছায়াপথ মহাস্তবকের সম্মিলিত ভর একটি মহাকর্ষীয় অক্ষিকাচ (Gravitational Lens) হিসেবে কাজ করে এবং অনেক দূরবর্তী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলোকবিন্দুগুলোকে বিবর্ধিত করে । যেখানে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য লাল-নীল-সবুজ ছায়াপথ, নক্ষত্রপুঞ্জ, অগণিত গোল-চ্যাপ্টা-লম্বাটে বিভিন্ন আকারের নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহ, ধূমকেতু এবং উল্কা ইত্যাদি । এক একটি ছায়াপথ প্রতিটি ছায়াপথগুচ্ছকে ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছে ৷ বিশাল আকৃতির ছায়াপথসহ মহাজাগতিক বিভিন্ন বস্তুগুলোকে সরাসরি কিছু ভর ও মহাকর্ষীয় শক্তি বৃদ্ধি করে এদেরকে মহাকাশে একটি সু-শৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে একসাথে ধরে রেখেছে এক প্রকার রহস্যজনক অদৃশ্য ‘অন্ধকার পদার্থ’ (Dark Matter) ৷ ছায়াপথ থেকে শুরু করে মহাজাগতিক অন্যান্য বস্তু এমনকি আমাদের দেহের উপাদানও এই অন্ধকার পদার্থের অন্তর্ভুক্ত । সৃষ্টিতত্ত্বে এটিকে Baryonic Dark Matter বলে ৷ এই সীমানাহীন মহাবিশ্বে শতকরা ৪.৯ ভাগ পদার্থ হচ্ছে সাধারণ Matter, শতকরা ২৬.৮ ভাগ পদার্থ Dark Matter, শতকরা ৬৮.৩ ভাগ Dark Energy যাদের রয়েছে এক শক্তিশালী অদৃশ্য প্রভাব এবং পাশাপাশি নিউট্রিনো ও ফোটন কণার মতো অন্যান্য উপাদানগুলো খুবই সামান্য পরিমাণে অবদান রাখে ৷ কিন্তু এই Dark Energy (অন্ধকারশক্তি / তমোশক্তি / গুপ্তশক্তি / কৃষ্ণশক্তি) হচ্ছে বিশাল মহাবিশ্বের মহাকর্ষীয় বলের মূল চালিকাশক্তি যেটি সমস্ত মহাশূন্য জুড়ে বিস্তৃত এবং এটি মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে । অসংখ্য নক্ষত্র, নাক্ষত্রিক অবশেষ, গ্রহাণু, উল্কা, ধূমকেতু, আন্তঃগ্রহীয় ধূলি মেঘ, আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাস, ধূলিকণা, নীহারিকা, সৌরজগৎ এবং অদৃশ্য পদার্থসহ মহাজাগতিক নানা বস্তুর সমন্বয়ে গঠিত হয় এক একটি ছায়াপথ । একটি ছায়াপথে গড়ে প্রায় ১০০ – ৫০০ বিলিয়ন নক্ষত্র থাকে । আকাশগঙ্গা ছায়াপথের (Milky Way Galaxy) ব্যাস হচ্ছে ১০০০০০ আলোকবর্ষ । এই রকম প্রায় অর্ধশতাধিক ছায়াপথের সমন্বয়ে গঠিত হয় এক একটি ছায়াপথ স্তবক বা গুচ্ছ (Galaxy cluster) । ছায়াপথ স্তবকগুলোই গঠন করে একটি ছায়াপথ মহাস্তবক (Galaxy Supercluster) যেটি মহাবিশ্বে এক বিশাল মহাকর্ষীয় কাঠামো তৈরি করে যেখানে কয়েক লক্ষ ছায়াপথের আবাসস্থল । এই সকল ছায়াপথ মহাস্তবকের মাঝে বিদ্যমান একটি ছায়াপথ স্তবক থেকে অন্য এক একটি ছায়াপথের মধ্যকার দূরত্ব থাকে লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ । সুতরাং একটি ছায়াপথ মহাস্তবকের আকার কতো বৃহৎ, তা নিশ্চয়ই চিন্তার বিষয়? ল্যানিয়াকিয়া ছায়পথ মহাস্তবক (Laniakea Galaxy Supercluster) হচ্ছে আমাদের নিজস্ব বাসস্থান যেখানে আকাশগঙ্গা ছায়াপথসহ আশেপাশে প্রায় ১০০০০০ অন্যান্য ছায়াপথের আবাসস্থল । আর ঐ আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৭০০০ আলোকবর্ষ দূরে ছায়াপথের এক অতি ক্ষুদ্র অংশের সর্পিল কালপুরুষ বাহুর (The Orion Arm) এক প্রান্তে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর পূর্বে জলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্য নামক নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে একাধিক গ্রহ নিয়ে গঠিত হয়েছে আমাদের সৌরজগৎ (Solar System) । যদিও, আদি মহাবিশ্বের ইতিহাস খুবই হিংস্র । এক মহা দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মহাবিশ্বের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সৌরজগতের সৃষ্টি । কালের আবর্তে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে প্রচণ্ড উত্তপ্ত থেকে পৃথিবী গ্রহটি এক সময় ঠাণ্ডা, শান্ত এবং জীবন ধারণের উপযোগী হলে এখানে প্রাণের উদ্ভব হয় । আজ এই সবুজ গ্রহটিই আমাদের বাড়ি । মায়ের কোলের মতোই নিরাপদ আশ্রয়স্থল । কিন্তু, এই মৃত্যুন্মুখ গ্রহটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে! মানবজাতি টিকবে তো?
বৃষ্টিহীন অন্ধকার রাতে মহাকাশের দিকে তাকালে জ্বলজ্বল করা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অগণিত আলোকবিন্দু দেখা যায় । এদের কোনোটি মিটমিট করে জ্বলে এবং কোনোটি স্থির হয়ে জ্বলছে । মিটমিটে আলোকবিন্দুগুলোই হচ্ছে এক একটি নক্ষত্র । এরা নিজে নিজেই জ্বলে । অন্যদিকে স্থির আলোকবিন্দুগুলো হচ্ছে বিভিন্ন গ্রহ । এগুলো নক্ষত্রের আলোয় আলোকিত । মহাকাশে অবস্থিত কোনো মহাজাগতিক বস্তু নিজের অভ্যন্তরীণ পদার্থকে নিউক্লীয় সংযোজন বা একীকরণ বিক্রিয়া (Nuclear Fusion) ঘটিয়ে ক্রমাগত জ্বালানি উৎপন্ন করে নিজেকে জ্বালিয়ে প্রচুর পরিমাণ আলো ও তাপ সৃষ্টি করে উজ্জ্বলিত থাকে তাকেই নক্ষত্র বলে । এছাড়া, মহাশূন্যে আয়নিত গ্যাস বা প্লাজমা দশায় অবস্থিত অতি উজ্জ্বল এবং সুবৃহৎ জ্বলন্ত অগ্নিগোলককেও নক্ষত্র বলে । নক্ষত্রের জীবনচক্র হতে পারে শত শত মিলিয়ন কিংবা বিলিয়ন বছর সময়কাল । মহাকাশে প্রতিনিয়ত এই নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যুর খেলা চিরকাল ধরে চলছে । একটি নক্ষত্রের জন্মকাল থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে যে বিবর্তন ঘটে থাকে তাকে বলা হয় ‘নাক্ষত্রিক বিবর্তন’ (Stellar Evolution) । নক্ষত্রের হাইড্রোজেন জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার পর বিকিরণের চাপে এর ব্যাসার্ধ বেড়ে গিয়ে একটি লোহিত দানব নক্ষত্রে পরিণত হয় ৷ এক পর্যায় এটি ধীরে ধীরে ‘শ্বেত বামন’ নক্ষত্রে রূপ নেয় । তবে, কখনো দুর্লভভাবে নক্ষত্রটি ভয়ঙ্কর নাক্ষত্রিক বিস্ফারণের মধ্য দিয়ে পুরো সৌরজগতকেও নিমিষেই ধ্বংস করে দিতে সক্ষম । Star শব্দটি গ্রিক শব্দ Aster থেকে এসেছে, যেটি হিত্তীয় ভাষার শব্দ শিত্তার থেকে উদ্ভূত । শিত্তার শব্দের ব্যুৎপত্তি হয়েছে সংস্কৃত শব্দ সিতারা থেকে । একটি নক্ষত্রের আকার, উজ্জ্বলতা, বিবর্তন, জীবনচক্র এবং সর্বশেষ নিজের ধ্বংস সবকিছুই নির্ভর করে তার ভরের উপর । ভর যতো বেশি হয়, ততোই দ্রুত জ্বালানি শেষ হয় ৷ এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তম লাল মহাদানব নক্ষত্রটি হচ্ছে UY Scuti । এটি সূর্যের চেয়ে প্রায় ১০০০ গুণেরও বেশি প্রশস্ত । অধিকাংশ নক্ষত্রের বয়স ১০০ – ১০০০ কোটি বছরের মধ্যে । তবে, অতিপ্রাচীন কিছু নক্ষত্রের বয়স এই মহাবিশ্বের বয়সের কাছাকাছি- যেখানে মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর । একটি অতি প্রাচীন নক্ষত্র হচ্ছে HE1523-0901 যেটির বয়স প্রায় ১৩২০ কোটি বছর । মহাকাশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধূলিকণা, বস্তুপুঞ্জ, হাইড্রোজেন গ্যাস এবং প্লাজমা দ্বারা গঠিত এক ধরনের আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘকে ‘নীহারিকা’ বলে । এই নীহারিকায় শতকরা ৫০ – ৭৫ ভাগ হাইড্রোজেন গ্যাস, শতকরা ২০ – ৪৫ ভাগ হিলিয়াম গ্যাস এবং শতকরা ৫ ভাগ অন্যান্য মৌলিক পদার্থ রয়েছে । সুবিশাল আকারের এন্ড্রোমিডা ছায়াপথের পূর্ব নাম ছিল Andromeda Nebula । জমাট বাঁধা ঠাণ্ডা নীহারিকা থেকেই নক্ষত্রের জন্ম ।
নক্ষত্রের জ্বালানি হচ্ছে হাইড্রোজেন বা উদজান । হাইড্রোজেন একটি মৌলিক পদার্থ এবং এর পরমাণুতে ১টি মাত্র ইলেকট্রন থাকে ৷ এই ইলেকট্রনটি নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে ৷ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির সময় তৈরি হওয়া প্রথম মৌল হাইড্রোজেনের ৩টি আইসোটোপ রয়েছে যেমন: (ক) প্রোটিয়াম (খ) ডিউটেরিয়াম (গ) ট্রিটিয়াম ৷ মহাকর্ষ বলের প্রভাবে নক্ষত্রমণ্ডলীয় গ্যাস এবং ধূলিকণা মেঘ বা গ্যাসের ধূলিমেঘ (Dust Cloud) জমাটবদ্ধ হয়ে একটি নক্ষত্রের জন্ম প্রক্রিয়া শুরু হয় । মহাকাশে মেঘ যতো বেশি জমাটবদ্ধ হয় নক্ষত্রের অভ্যন্তরীণ অণুগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের তীব্রতাও ততো বেশি বৃদ্ধি পায় । এতে করে প্রচণ্ড উত্তাপের সৃষ্টি হয় । এই তাপ এমন এক পর্যায় (তাপমাত্রা যখন প্রায় ১ কোটি কেলভিনে উন্নীত হয়) গিয়ে পৌঁছানোর পর নক্ষত্রের অভ্যন্তরে চলতে থাকা নিউক্লীয় কেন্দ্রীন সংযোজন বা একীকরণ বিক্রিয়ার কারণে ৪টি হাইড্রোজেন পরমাণু তার নিজের চেয়ে হালকা, বর্ণহীন, গন্ধহীন এবং স্বাদহীন নিস্ক্রিয় গ্যাস হিলিয়াম পরমাণুতে পরিণত হয় । পরবর্তীতে এই হিলিয়াম পরমাণুগুলো একত্রিত হয়ে সৃষ্টি করে কার্বন এবং সেই কার্বনের সংযোজনে তৈরি হয় নিয়ন, সিলিকন ও লোহা । অবশেষে কেন্দ্রীন বিক্রিয়ায় তাপ শোষীত হয় । যখন নক্ষত্রটির জ্বালানি হাইড্রোজেন তথাপি হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস খুবই দ্রুত দহন হয়ে ফুরিয়ে যায় তখন ‘শেষ হুররাহ’ (Last Hurrah) ঘটে । এর ফলে নক্ষত্রের অভ্যন্তরস্থ বহির্মুখী চাপ যথেষ্ট পরিমাণ কমে যায়, যেখানে মহাজাগতিক বস্তু নক্ষত্রটি আমাদের সূর্যের ভরের চেয়ে অন্তত ৫ গুণে প্রসারিত হয়— যার আকার প্রায় ৩৩৩০০০ পৃথিবীর সমান । এক সময় নক্ষত্রটি নিজের মাধ্যাকর্ষণ বলকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে না, ফলে নক্ষত্রের বেশিরভাগ ভরই এর কেন্দ্রে সংকুচিত হয়ে ফুলে উঠে বাইরে থাকা গ্যাসীয় অঞ্চলটি প্রচণ্ড শক্তিশালী মহাপ্লাবনের মতো ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের (প্রচণ্ড অন্তস্ফোটন বা Implosion) সৃষ্টি করে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৫০০০ – ৪০০০০ কিলোমিটার প্রবলবেগে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে । এই বিশাল মহাজাগতিক বিস্ফোরণের নামই অতিনবতারা (Supernova) । অবশেষে যদি নক্ষত্রটির ভর প্রায় ৩ M সৌর ভরের চেয়ে বেশি হয়, তখন এটি মহাকর্ষীয় পতন ঘটিয়ে একটি কৃষ্ণগহ্বরে (Black Hole) পরিণত করে ।
সূর্য হচ্ছে একটি নক্ষত্র । আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রের খুব কাছের নক্ষত্রটি সূর্য । সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে ১১টি গ্রহ, অসংখ্য গ্রহাণুপুঞ্জ, ধূমকেতু এবং উল্কা ইত্যাদি । সূর্যের ব্যাস প্রায় ১.৩৯২´১০৬ কিলোমিটার যা পৃথিবীর ব্যাস থেকে ১০৯ গুণ বড় । সূর্যের ভর প্রায় ১.৯৮৯১´১০৩০ কিলোগ্রাম, যা পৃথিবীর ভরের চেয়ে ৩৩২৯৫০ গুণ বেশি । এই ভর সৌরজগতের মোট ভরের শতকরা প্রায় ৯৯.৮৬ ভাগ । পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব প্রায় ১৫২১০০০০০ কিলোমিটার বা ৯৪৫০০০০০ মাইল (আলোর গতিতে) । আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব ২৭২০০ আলোকবর্ষ ৷ সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে ৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ড । ফলে সূর্যালোকশক্তি এই সবুজ গ্রহের জলবায়ু এবং আবহাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রায় সকল জীবকে বাঁচিয়ে রাখে । সূর্যের কেন্দ্রভাগের ঘনত্ব ১৫০ গ্রাম/ঘনসেন্টিমিটার এবং তাপমাত্রা প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ কেলভিন (~১৩.৬ MK) ৷ যদিও ছটামণ্ডল বা সৌর করোনায় তাপমাত্রা থাকে ৫ MK এবং সূর্যপৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৫৭৮৫ কেলভিন । সূর্যের অন্যান্য বিকিরণ অঞ্চলের তুলনায় এর কেন্দ্রভাগে ঘূর্ণন বেগ অত্যাধিক বেশি । সূর্য সর্বদা প্রোটন শিকল বিক্রিয়ার (Proton Chain Reaction) মাধ্যমে হাইড্রোজেন কেন্দ্রীন সংযোজন বা একীকরণ প্রক্রিয়া দ্বারা হিলিয়াম গ্যাস উৎপাদন করে । এটিই হচ্ছে সূর্যের শক্তির প্রধান উৎস । ফলে তৈরি হয় ফোটন আলোককণা, উত্তাপ, তেজস্ক্রিয় রশ্মি, শক্তি এবং গ্যাস । সূর্যের বর্ণালী শ্রেণী সংকেত G2V । প্রায় পূর্ণগোলক হলদে বামন নক্ষত্র সূর্যের প্রধান গাঠনিক উপাদান হচ্ছে: হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, অক্সিজেন, কার্বন, নিয়ন, আয়রন, নাইট্রোজেন, সিলিকন, ম্যাগনেসিয়াম এবং সালফার ইত্যাদি ৷ প্লাজমা কণা বা আয়নিত গ্যাস এবং ইলেকট্রনের সমন্বয়ে গঠিত সূর্যের মধ্যে রয়েছে এক মহাশক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র ৷ সূর্যপৃষ্ঠে কিছু কালো দাগ দেখা যায় যেটি ‘সৌরকলঙ্ক’ (Sunspot) নামে পরিচিত । প্রায় ১০০০ কোটি বছর পূর্বে মহাকাশীয় নক্ষত্রের সমাবেশে বা নক্ষত্রমণ্ডলে সূর্যের ভ্রূণ সৃষ্টি হয় । পরবর্তীতে মহাকালের চক্রে এটি প্রায় ৪৫০ – ৫০০ কোটি বছরের মধ্যে স্থিতিবস্থায় ফিরে আসে । অনুমান করা হয় যে, কোটি কোটি বছর ধরে জ্বলতে থাকা এই নক্ষত্রটি মহাকর্ষীয় শক্তির প্রভাবে প্রায় ৫০০ কোটি (৫ বিলিয়ন) বছরের মধ্যে সূর্যের কেন্দ্রীয়ভাগ বা মূল অংশে হাইড্রোজেন পরমাণু হ্রাস পাবে কিংবা হাইড্রোজেনের অভাবে পারমাণবিক সংশ্লেষণ বা একীভবন আর হবে না ৷ ফলে, সূর্যের জ্বালানি সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে ‘লাল দানবে’ রূপ নিয়ে এটির কেন্দ্রে ত্রি-আলফা বিক্রিয়ার মাধ্যমে হিলিয়াম পুড়ে কার্বন ও অক্সিজেন উৎপন্ন করবে । এক সময় প্রচণ্ড উত্তপ্তভাবে অতিনবতারা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে এর ভয়ঙ্কর পরিণতি ঘটবে! অর্থাৎ, এক অগ্নিময় মৃত্যুর (Fiery Death) মাধ্যমে সূর্যের পরিসমাপ্তি হবে ।
অতিনবতারা এক প্রকার নক্ষত্রের বিষ্ফোরণ । যেটি মহাকাশে ঘটে থাকে । অপার মহাবিশ্বের এক মহাবিষ্ময়! অতিনবতারা বিস্ফোরণের ফলে নক্ষত্রটি ধীরে ধীরে উজ্জ্বল থেকে ক্রমশঃ উজ্জ্বলতর হয়ে চিরতরে নিভে যায় বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় ৷ অতিনবতারা হচ্ছে মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী আলোক বিচ্ছুরনকারী বিস্ফোরণ । সূর্যের জীবদ্দশায় যে পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করে অতিনবতারা বিস্ফোরণে এক সেকেন্ড সময়ে সে পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয় । এই বিস্ফোরণের ফলে তীব্র আলোক বিকিরণ, প্রচুর পরিমাণে শক্তি, বিশাল ধ্বংসাবশেষ, ভারী মৌলিক পদার্থ বা বস্তুকণা বা মৌল কণা, পি-নিউক্লিয়াস আইসোটোপ এবং অতি উচ্চ শক্তির মহাজাগতিক তেজস্ক্রিয় রশ্মি নির্গত হয় । এছাড়া, ভয়ানক ধূলিকণা মেঘের সৃষ্টি করে । নক্ষত্রটির বিস্ফোরণের মাত্রা এতই তীব্র যে, এটি পুরো ছায়াপথের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে । যদিও সেই আলোকচ্ছটার ঔজ্জ্বল্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না, ধীরলয়ে নিষ্প্রভ হয়ে যায় । অতিনবতারা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে একটি নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটে । আর এখান থেকেই পুনরায় নতুন প্রজন্মের অত্যন্ত উজ্জ্বল নিউট্রন নক্ষত্র জন্ম নেয় । এছাড়া পালসার নক্ষত্র, গ্রহ, শীতল নীহারিকা এবং কৃষ্ণ গহ্বরের সৃষ্টি করে । যদিও নক্ষত্রটি মৃত্যুর আগে নিউট্রনে ভর্তি দানবে পরিণত হয় । অতিনবতারা বিস্ফোরণের সময় নক্ষত্রের প্রোটন এবং ইলেকট্রন মিলে প্রচুর পরিমাণে নিউট্রন তৈরি করে । অর্থাৎ, অতিনবতারা বিস্ফোরণ হচ্ছে একটি নিউক্লীয় বিক্রিয়া । এতে করে প্রচুর পরিমাণে বৈদ্যুতিক আধানশূন্য এবং ভরহীন মৌলকণা Neutrino তৈরি হয় । এই নিউট্রিনো আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূলি, গ্যাস এবং মহাজাগতিক ধূলি দ্বারা বিক্ষিপ্ত বা শোষিত হয় না । নাক্ষত্রিক বিস্ফোরণের পর নক্ষত্রের যে অবস্থা থাকে বা উৎপন্নকৃত নক্ষত্রকে নিউট্রন নক্ষত্র (Neutron Star) বলে ৷ আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায়, একটি অতিবৃহৎ নক্ষত্রের অতিনবতারা বিস্ফোরণ বা ধ্বংসের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট প্রচণ্ড ঘন অবশেষ বা নক্ষত্রের ভেঙে পড়া কেন্দ্রই হচ্ছে নিউট্রন নক্ষত্র । সূর্যের মতো নক্ষত্রে ইলেকট্রন, প্রোটন এবং সামান্য পরিমাণে নিউট্রন থাকে । কিন্তু, এই নিউট্রন নক্ষত্রের ভেতরটা বেশিরভাগই নিউট্রন (অতিপারমাণবিক কণা বা বৈদ্যুতিক আধানশূন্য বা নিরপেক্ষ কণা) দিয়ে গঠিত এবং এতে প্রোটন (ধনাত্মক চার্জযুক্ত কণা) ও ইলেকট্রনের (ঋণাত্মক চার্জযুক্ত কণা) ছোট ভগ্নাংশের সাথে নিউক্লিয়াস থাকে । একটি বিশাল নক্ষত্রের জ্বালানি ফুরিয়ে অতিনবতারা বিস্ফোরণের পর নক্ষত্রের বহিরাবরণটা প্রচণ্ড বেগে মহাকাশে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে পড়ে । শুধুমাত্র এর কেন্দ্রীয় অঞ্চলটিই বাকি থাকে । অন্তস্তল ভেঙে পড়ে, প্রতিটি প্রোটন এবং ইলেক্ট্রন একত্রিত হয়ে নিউট্রনে পরিণত হয় । Astroseismology, নক্ষত্রের উপর গবেষণা এবং নাক্ষত্রিক দোলনের পর্যবেক্ষিত বর্ণালী বিশ্লেষণ করে নিউট্রন নক্ষত্রের অভ্যন্তরীণ গঠন আরো বিশদভাবে জানা যেতে পারে । একটি নিউট্রন নক্ষত্রপৃষ্ঠের পদার্থটি পারমাণবিক নিউক্লিয়াস (নক্ষত্রের ক্ষয়প্রাপ্ত বা অধঃপতিত উপাদান বা পদার্থ / Degenerate Matter) দ্বারা গঠিত । নিউট্রন নক্ষত্রের কেন্দ্রে পরমাণুগুলো খুবই শক্তভাবে একত্রে লেগে থাকে এবং তাপমাত্রা থাকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড । যখন বিশাল নক্ষত্রগুলো অতিনবতারা হিসেবে বিস্ফোরিত হয়, তখন এরা নিউট্রন নক্ষত্র এবং কৃষ্ণ গহ্বরকে পিছনে ফেলে । কৃষ্ণগহ্বর, শ্বেত গহ্বর, কোয়ার্ক নক্ষত্র, ইলেক্ট্রোউইক নক্ষত্র এবং স্ট্রেঞ্জ নক্ষত্রকে বাদ দিলে নিউট্রন নক্ষত্র হচ্ছে মহাবিশ্বের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম নক্ষত্র । নিউট্রন নক্ষত্র কৃষ্ণগহ্বরের চেয়ে কম ঘন বলেই শুধুমাত্র কৃষ্ণ গহ্বর দ্বারা অতিক্রম করে । এই নিউট্রন নক্ষত্র এবং কৃষ্ণ গহ্বরের মধ্যে কাছাকাছি কিছু সহচর নক্ষত্র রয়েছে যারা রঞ্জন-রশ্মিগুলোর (X-rays) শক্তিশালী উৎস হয়ে উঠে । কারণ, তারা তাদের সঙ্গী বস্তু বা পদার্থকে সরিয়ে দেয় (Ultra এবং Hyperluminous X-ray উৎস হিসেবে পরিচিত) । উজ্জ্বলতম রঞ্জন-রশ্মিগুলোর উৎস সম্ভবত কৃষ্ণ গহ্বরের সহচর নক্ষত্রের সাথে । নিউট্রন নক্ষত্রের অধিকাংশই বেতার তরঙ্গ বা তড়িৎ-চৌম্বকীয় বিকিরণ নির্গত করে । কিছু নিউট্রন নক্ষত্র শুধুমাত্র তাপীয় বিকিরণ নির্গত করে । এছাড়া তড়িৎ-চৌম্বকীয় বর্ণালী জুড়ে নিউট্রন নক্ষত্র চিহ্নিত করা হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে দৃশ্যমান আলো, অবলোহিত বিকিরণ রশ্মি বা বর্ণালী, অতিবেগুনী রশ্মি, রঞ্জন রশ্মি এবং গামা রশ্মি । অতিনবতারা বিস্ফোরণের অবশিষ্টাংশে Central Compact Objects (CCO) নামে পরিচিত রঞ্জন রশ্মি উৎসগুলোর একটি বৈশিষ্ট্য বলে মনে হয়- যা তরুণ, বেতার-শান্ত নিউট্রন নক্ষত্র বলে অনুমান করা হয় ।
নিউট্রন নক্ষত্রকে কখনো কখনো ‘আণুবীক্ষণিক পারমাণবিক নিউক্লিয়াস’ কিংবা ‘দৈত্য নিউক্লিও’ হিসেবে বর্ণনা করা হয় । এই নক্ষত্রের কেন্দ্রে চরম ঘনত্বে নিউট্রনগুলো বিঘ্নিত হয়ে কোয়ার্ক নক্ষত্রের জন্ম দেয় । নিউট্রন নক্ষত্রের উপাদানের উপর নির্ভর করে অন্যান্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে: জড়তার মুহূর্ত (The moment of the inertia), চতুর্ভুজ মুহূর্ত (The quadrupole moment) এবং ভালোবাসা নম্বর (The love number) । একটি নবগঠিত নিউট্রন নক্ষত্রের ভিতরের তাপমাত্রা চারপাশ থেকে ১০০০০০০০০০০০ – ১০০০০০০০০০০০০ কেলভিন । তবে, কিছু নিউট্রন নক্ষত্র শীতল হয়ে থাকে । প্রায় ৩০ কিলোমিটার ব্যাসের একটি নিউট্রন নক্ষত্রে সূর্যের ভরের দ্বিগুণ ভর থাকে (সর্বোচ্চ সীমা ২.১ M সৌর ভর) । এই কারণে এর ঘনত্ব খুবই বেশি । বিস্ময়কর যে, নিউট্রন নক্ষত্রের এক চা-চামচ পরিমাণ পদার্থের ভর ১ কোটি টন! নিউট্রন নক্ষত্রের অকল্পনীয় ও মাত্রাতিরিক্ত ঘনত্বের কারণেই এমন ভর হয়ে থাকে । মূলত এই ঘনত্বের জন্য দায়ী অতিমহাকর্ষীয় টান । ভর, উষ্ণতা এবং শীতল হওয়ার হার অনুসারে এই নক্ষত্রের ধরণ নানা প্রকার হয়ে থাকে । তাই, বিভিন্ন ধরণের নিউট্রন নক্ষত্রকে তাদের বর্ণালী দ্বারা আলাদা করা যেতে পারে । ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে নিউট্রন নক্ষত্রের অদ্ভুত বেতার তরঙ্গ শনাক্ত করা হয় যার থেকে দৃশ্যমান আলো বের হয় না । লম্বা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বেতার তরঙ্গ বের হয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে না এসে ঘুরে ঘুরে আসে । তাই, নিউট্রন নক্ষত্রের বেতার সংকেত একটু পর পর স্পন্দন বা কম্পন আকারে পাওয়া যায় বলেই তাকে Pulsar বলে । নিউট্রন নক্ষত্রের চৌম্বক ক্ষেত্রগুলো পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের তুলনায় ১০০০০০০০০ – ১.০০০০০০০০ই+১৫ (১০০ মিলিয়ন থেকে ১ কোয়াড্রিলিয়ন) গুণ বেশি শক্তিশালী । এইনক্ষত্রপৃষ্ঠের চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি ১০০০০ – ১০০০০০০০০০০০ টেসলা । যদিও নিউট্রন নক্ষত্রের শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের উৎস এখনো অস্পষ্ট । তবে, একটি অনুমান হচ্ছে যে “Flux Freezing” বা নিউট্রন নক্ষত্র গঠনের সময় মূল চৌম্বকীয় প্রবাহের সংরক্ষণ । এখন পর্যন্ত সনাক্ত করা সবচেয়ে বড় নিউট্রন নক্ষত্র হচ্ছে PSR J0952–0607 যার সৌর ভর ২.৩৫ ± ০.১৭ । নিউট্রন নক্ষত্রের গতিবেগ আলোর গতির অর্ধেকেরও বেশি । এই নক্ষত্র খুব উচ্চ ঘূর্ণন গতির সাথে গঠিত হয়ে আস্তে আস্তে ধীর হয়ে যায় । একটি নিউট্রন নক্ষত্রের মাধ্যাকর্ষণশক্তি পদার্থকে প্রচণ্ড গতিতে ত্বরান্বিত করে এবং পৃষ্ঠের কাছাকাছি জোয়ারের শক্তি Spaghettification ঘটাতে পারে । নিউট্রন নক্ষত্রের ঘূর্ণনের সমান হারে পর্যায়ক্রমিক স্পন্দন পরিলক্ষিত হয় । কখনো কখনো নিউট্রন নক্ষত্রটি সহচর নক্ষত্র থেকে প্রদক্ষিণকারী পদার্থ শোষণ করে ঘূর্ণন হার বৃদ্ধি করে এবং এটি একটি স্থূল গোলক আকারে পরিণত হয় । তবে, Anti-glitch একটি নিউট্রন নক্ষত্রের ঘূর্ণন গতিতে হঠাৎ সামান্য হ্রাস বা ঘূর্ণন নিম্নগামী করতে পারে । সবচেয়ে দ্রুত ঘূর্ণায়মান নিউট্রন নক্ষত্রটি হচ্ছে PSR J1748−2446ad, যেটি প্রতি সেকেন্ডে ৭১৬ বার (প্রতি মিনিটে ৪৩০০০ বার) আবর্তন করে । নিউট্রন নক্ষত্রপৃষ্ঠের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র প্রায় পৃথিবীর তুলনায় ২০০০০০০০০০০০ গুণ শক্তিশালী । এই শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রটি মহাকর্ষীয় অক্ষিকাচ হিসেবে কাজ করে এবং নিউট্রন নক্ষত্র দ্বারা নির্গত বিকিরণকে এমনভাবে বাঁকিয়ে দেয় যে সাধারণত পিছনের পৃষ্ঠের অদৃশ্য অংশগুলো দৃশ্যমান হয় । বিশাল মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে একটি নিউট্রন নক্ষত্র এবং পৃথিবীর মধ্যে সময়ের প্রসারণ তাৎপর্যপূর্ণ হয় । বর্তমানে আকাশগঙ্গা ছায়াপথ এবং ম্যাগেলানিক ক্লাউডে প্রায় ৩২০০টি পরিচিত নিউট্রন নক্ষত্র রয়েছে, যার অধিকাংশই উচ্চ চুম্বকীয় ঘূর্ণায়মান Radio Pulsar হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে । পালসার হচ্ছে চৌম্বক আবর্তিত নিউট্রন নক্ষত্র যেটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে উচ্চ তীব্রতার তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ নির্দিষ্ট দিকে বিকিরণ করে থাকে । পালসার নক্ষত্রের শক্তির উৎস হচ্ছে নিউট্রন নক্ষত্রের ঘূর্ণন শক্তি । তবে, বেশিরভাগ পরিচিত নিউট্রন নক্ষত্র ‘পালসার’ হিসেবে আবিষ্কৃত হয়েছে যা নিয়মিত বেতার কম্পন নির্গত করে । নিউট্রন নক্ষত্রগুলো বেশিরভাগই আকাশগঙ্গা ছায়াপথের চাকতির সাথে কেন্দ্রীভূত হয় । নিকটতম পরিচিত নিউট্রন নক্ষত্র RX J1856.5−3754 হচ্ছে ‘The Magnificent Seven’ নামক নিউট্রন নক্ষত্রের একটি ঘনিষ্ঠ দলের সদস্য, যেটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ আলোকবর্ষ দূরে এবং PSR J0108−1431 নিউট্রন নক্ষত্রটি প্রায় ৪২৪ আলোকবর্ষ দূরত্বে রয়েছে । এছাড়া পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের এবং উষ্ণতম একটি বিচ্ছিন্ন নিউট্রন নক্ষত্র ক্যালভেরা (1RXS J141256.0+792204 নামেও পরিচিত), যেটি উর্সা মাইনর নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত । সমস্ত পরিচিত নিউট্রন নক্ষত্রের শতকরা প্রায় ৫ ভাগ Binary System এর সদস্য । ‘বাইনারি নিউট্রন নক্ষত্র’ এবং ‘ডাবল নিউট্রন নক্ষত্র’ গঠন ও বিবর্তন একটি জটিল প্রক্রিয়া । নিউট্রন নক্ষত্র ধারণকারী বাইনারি সিস্টেমগুলো প্রায়ই রঞ্জন রশ্মি নির্গত করে, যা নিউট্রন নক্ষত্রপৃষ্ঠের দিকে পড়ার সাথে সাথে উত্তপ্ত গ্যাস দ্বারা নির্গত হয় । নিউট্রন নক্ষত্র বহিঃসৌর গ্রহের স্বাগতিক বা অতিথিসেবক (Exoplanet Host) হতে পারে । ১৯৯২ – ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে সূর্য থেকে প্রায় ২৩০০ আলোকবর্ষ দূরে আবিষ্কৃত PSR B1257+12 (অন্যান্য নাম হচ্ছে: Lich, PSR B1257+12, PSR 1257+12, PSR J1300+1240) নামক পালসার নক্ষত্রের আশেপাশে ৩টি বহিঃসৌর গ্রহ যেমন: ড্রাগর, পোল্টারজিস্ট এবং ফোবেটরকে শনাক্ত করা হয়েছে । প্রথম আবিষ্কৃত রেডিও-পালসার হচ্ছে LGM-1 (বর্তমানে PSR B1919+21 নামে পরিচিত) । ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির সভায় জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী Wilhelm Heinrich Walter Baade এবং সুইস জ্যোতির্বিজ্ঞানী Fritz Zwicky নিউট্রন নক্ষত্রের অস্তিত্বের কথা প্রস্তাব করেন । পরবর্তীতে ‘নিউট্রন’ আবিষ্কারের দুই বছরেরও কম সময় পরে ইংরেজ পদার্থবিদ Sir James Chadwick এই নিউট্রন নক্ষত্র সম্পর্কে নিজের অভিমত প্রকাশ করেন, যিনি নিউট্রন আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন । গত ২৩শে ফেব্রুয়ারি ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা JWST দূরবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে ‘অতিনবতারা 1987A’ এর বিস্ফোরণের অবশিষ্টাংশের মধ্যে একটি নিউট্রন নক্ষত্র চিহ্নিত করেছেন ।
যাই হোক, অতিনবতারা বিস্ফোরণের সময় নক্ষত্রটি তার বহিরাবরণ বা দৈহিকরূপ পরিত্যাগ করে কার্বন-অক্সিজেন কেন্দ্রভাগটিই অবশিষ্ট থাকে যা অতিক্ষুদ্র এক উত্তপ্ত ‘শ্বেতবামন নক্ষত্রে’ পরিণত হয় । শ্বেত বামন নক্ষত্র হচ্ছে একটি নক্ষত্রের মৃত্যুর প্রথম পর্যায় এবং এর আয়তন পৃথিবীর সমান হলেও সূর্য থেকে ভর বেশি । শ্বেত বামন নক্ষত্রকে ‘অপজাত বামন’ বলা হয় । যেহেতু, শ্বেত বামন নক্ষত্রটি ইলেকট্রন অপজাত বা ক্ষয়প্রাপ্ত পদার্থ নিয়ে গঠিত তাই হাইড্রোজেন স্ফীত হয় না বিধায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং এটি চন্দ্রশেখর সীমা’র কাছে পৌঁছলে Type Ia Supernova হিসেবে বিস্ফোরিত হতে পারে । শ্বেত বামন নক্ষত্রের প্রচণ্ড মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে আশেপাশের নক্ষত্র, মহাজাগতিক গ্যাস এবং ধূলিকণা ইত্যাদি নিজের দিকে টানতে শুরু করে । ফলে, শ্বেত বামনের আকার বৃদ্ধি পেয়ে শুরু হয় নিউক্লীয় কেন্দ্রীন সংযোজন বা একীকরণ বিক্রিয়া এবং সেখানে পুনরায় বিস্ফোরণ ঘটে ‘নবতারা’ (Nova Star / Novae Star) সৃষ্টি করে । যদিও এটি অল্প সময়ের জন্য নক্ষত্রের মতোই দেখায় । কিন্তু, নবতারার বিস্ফোরণ অতিনবতারার মতো তেমন উজ্জ্বল ও শক্তিশালী নয় । একটি সাদা বামন নক্ষত্র সময়ের সাথে সাথে একাধিক নবতারা তৈরি করতে পারে । লাতিন ভাষায় Nova শব্দের অর্থ ‘নতুন’ । খ-গোলকে অবস্থিত নক্ষত্রকে নবতারা বলে । হিলিয়াম, কার্বন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, নিয়ন এবং ম্যাগনেসিয়ামের মতো সমৃদ্ধ উপাদানে নবতারা গঠিত হয় । নবতারা অতিপ্রাচীন নক্ষত্রের অবশিষ্টাংশ । এই নবতারা গামা রশ্মি নির্গত করে । আকাশগঙ্গা ছায়াপথে প্রতি বছর প্রায় ৩০ – ৬০টি নবতারার দেখা মিলে । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অভিমত প্রকাশ করেন যে, ধ্রুপদী বা সর্বোৎকৃষ্ট নবতারার বিস্ফোরণে Galactic হচ্ছে লিথিয়াম উপাদানের উৎপাদক ।
আমরা যদি আকাশের দিকে তাকাই তাহলে এই বিশাল মহাবিশ্বের খুবই ক্ষুদ্রতম একটি অংশ আমাদের চোখে পড়ে । রাতের মেঘমুক্ত আকাশে খালি চোখে প্রায় ৬ হাজার নক্ষত্র দেখা যায় । তবে, দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখলে প্রায় ৫০ হাজার নক্ষত্রের দেখা মিলে । উন্নতমানের অত্যাধুনিক দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে পর্যবেক্ষণ করলে প্রায় ৩ লক্ষাধিক নক্ষত্র, কয়েক হাজার ছায়াপথ ও বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তু দেখা সম্ভব । কিন্তু, এদের মধ্য থেকে অনুসন্ধান করে একটি অতিনবতারা বের করা দুষ্প্রাপ্য ঘটনা । তবে, প্রতি মুহূর্তই এই সীমানাহীন মহাবিশ্বের কোথাও না কোথাও অতিনবতারার বিস্ফোরণ ঘটে চলছে । কিন্তু আমরা সেগুলোকে দেখতে পাইনা । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন যে, প্রতি শতাব্দীতে ২ – ৩টি অতিনবতারার বিস্ফোরণ আকাশগঙ্গা ছায়াপথে ঘটে থাকে । হয়তো, দুর্লভভাবে খালি চোখে শুধুমাত্র আকাশগঙ্গা ছায়াপথের খুব কাছাকাছি যদি কোনো একটি অতিনবতারার বিস্ফোরণ ঘটে সেটি দেখা যেতে পারে । অতিনবতারা বিস্ফোরণ খুবই বিরল ঘটনা । অসীম মহাকাশের শত শত বিলিয়ন নক্ষত্র সমৃদ্ধ কোনো ছায়াপথে ২ – ৩ শত বছরে ১টি মাত্র অতিনবতারার বিস্ফোরণ সংঘটিত হয় । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এমন অভিমত ব্যক্ত করেন যে, আমরা এবং আমাদের সব কিছুই নক্ষত্রিক ধূলিকণায় (Star Dust) তৈরি । যখন কোনো অতিনবতারার বিস্ফোরণ ঘটে তখন এর থেকে এতই উজ্জ্বল আলো তৈরি হয় যে পুরো ছায়াপথজুড়েই আলোকচ্ছটা বিস্তৃত হয় এবং নক্ষত্রটির নানা উপাদান সমস্ত ছায়াপথে ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি অন্যান্য নক্ষত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখে । এছাড়াও নক্ষত্রের এই সকল উপাদান আশপাশে থাকা বিভিন্ন গ্রহ এবং সেই সকল গ্রহে যদি কোনো প্রকার প্রাণ থাকে সেই প্রাণেরও উপাদান হয় । অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা মহাকাশে নতুন আরো এক ধরনের নক্ষত্রের বিস্ফোরণ আবিষ্কার করেছেন, যেটি সাধারণ অতিনবতারার চেয়ে দশ গুণ বেশি শক্তিশালী । এই বিস্ফোরণের নাম হচ্ছে অধিনবতারা বা অতিসক্রিয় নবতারা বা অস্বাভাবিক নবতারা (Hypernova) । যে নক্ষত্রটির বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে এই অধিনবতারার সৃষ্টি হয় সেটির ভর সূর্যের ভরের চেয়ে প্রায় ২৫ গুণ বেশি । যদিও এতদিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল যে অতিদানব কোনো নক্ষত্র বিস্ফোরণ ঘটায় না, কারণ এটি খুবই ধীরে ধীরে তার সমস্ত শক্তি হারিয়ে মহাকাশে বিলীন হয়ে যায় । কিন্তু, তাদের সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে ।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, আন্তর্জাল (The Internet)
ছবি / Illustration of a Neutron Star 🌟 : Som ET ছবি: উইকিপিডিয়া ।


No comments:
Post a Comment