প্রাণী হচ্ছে বহুকোষী এবং সুকেন্দ্রিক জীবের একটি বৃহৎ গোষ্ঠী যারা সচল, পরভোজী ও খাদ্যগ্রহণ করে বেঁচে থাকে । অপরদিকে জীব (Organism বা Life form) হচ্ছে জ্ঞাত মহাবিশ্বের যে সমস্ত সত্তা জীবনের বৈশিষ্ট্যাবলি ধারণ ও প্রদর্শন করে যেমন: গাছ, প্রাণী, মানুষ, শৈবাল, ছত্রাক, অ্যামিবোজোয়া, আর্কিয়া, প্রোটোজোয়া, ইউক্যারিয়া, ব্যাকটেরিয়া এবং এমনকি ভাইরাস ইত্যাদি । উল্লেখ্য: কিছু ভাইরাসকে "জীবনের প্রান্তে থাকা জীব" (Organisms at the edge of life) এবং প্রতিলিপিকারক (Replicator) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে ।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জীব কি?
আমরা জানি নীল তিমিই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী । কারণ, এটি প্রাণীজগতের সর্ববৃহৎ সদস্য । কিন্তু বিস্ময়কর যে, প্রকৃতির সবচেয়ে বড় জীব হচ্ছে একটি ছত্রাক! এ ছত্রাকটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের ওরেগন রাজ্যের নীল পর্বতে (Blue Mountains) পাওয়া যায় । ছত্রাকটির নাম Armillaria ostoyae (সমার্থক শব্দ Armillaria solidipes) । আর্মিলারিয়া অস্টোয়ে হচ্ছে Physalacriaceae পরিবারের একটি রোগ-জীবাণু সৃষ্টিকারী ছত্রাক প্রজাতি । বৃহৎ আর্মিলারিয়া অস্টোয়ে ছত্রাকের সাধারণ নাম Humongous fungus । এটি স্থানীয়ভাবে মধু মাশরুম (Honey Mushroom) নামে পরিচিত । কারণ, শরৎকালে ছত্রাকের ভূগর্ভস্থ অংশগুলো মাটির উপরে হলুদ-আবরণযুক্ত এবং মিষ্টি মধু মাশরুম ফলের দেহ উৎপন্ন করে । ছত্রাকটি মূলত উত্তর গোলার্ধের শীতল অঞ্চলে দেখা যায় । বিশেষকরে উত্তর আমেরিকা, ব্রিটিশ কলাম্বিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় উত্তর-পশ্চিমের বনাঞ্চলে অবস্থিত শঙ্কুযুক্ত গাছে এ ছত্রাকের দেখা মেলে । এছাড়া, এশিয়া মহাদেশের কিছু অংশে জন্মে থাকে ।
এটি সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন রাজ্যের ক্যাসকেড রেঞ্জের পশ্চিমে অবস্থিত বনাঞ্চলের শক্ত কাঠ এবং শঙ্কুযুক্ত কাঠ উভয় ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় । এ প্রজাতির ছত্রাকে ফুলকা আছে এবং কাণ্ডে একটি বলয় থাকে । ছত্রাকটি রোগ সৃষ্টি করে । এটি Armillaria root নামক রোগের কারণ হয়, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার অনেক অংশে প্রচুর পরিমাণে শঙ্কুযুক্ত গাছকে মেরে ফেলে । ছত্রাকটি মূলত গাছের শিকড় বরাবর Hyphae নামে পরিচিত সূক্ষ্ম তন্তুর মাধ্যমে বৃদ্ধি পেয়ে একসাথে মিশে যায় এবং পাচক উৎসেচক (Enzyme) নিঃসরণ করে । এটি Hyphae এর একটি নেটওয়ার্ক নিয়ে গঠিত । সম্মিলিতভাবে এ নেটওয়ার্কটিকে Mycelium বলে, যার অনির্দিষ্ট গঠন ও আকার রয়েছে । ছত্রাকের মাইসেলিয়ামগুলো পরস্পর যুক্ত হয়ে স্থুল ও শক্ত রশি বা জুতার ফিতার মতো অঙ্গ সৃষ্টি করে রাইজোমর্ফ (Rhizomorph) গঠন করে । এ রাইজোমর্ফ (বা Mycelial cord) গাছের বাকলের নিচে কিংবা গাছের মধ্য দিয়ে অনন্য কাঠামো তৈরি করে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম । রাইজোমর্ফ মূলত ভূগর্ভে বৃদ্ধি পায় এবং বিশাল পরিমাণে ছড়িয়ে পড়ে । এ ছত্রাকের বেশিরভাগ অংশ ভূপৃষ্ঠ থেকে দেখা যায় না । রাইজোমর্ফগুলো ছত্রাকটিকে দূর থেকে পুষ্টি গ্রহণ করতে সাহায্য করে । এগুলোও এর রোগজীবাণু সৃষ্টির প্রধান কারণ । একটি মাশরুম ফল বৃদ্ধি পেয়ে এবং পুষ্টি গ্রহণ করে পরিপক্ক মাশরুমে পরিণত হয় । ছত্রাকটি এক প্রশস্ত এবং পাতলা পাতার মতো ফলক বা থালা তৈরি করে যা কাণ্ড থেকে নির্গত হয়ে এর ফুলকা গঠন করে । ফুলকাগুলো একটি পরিপক্ক মাশরুমের বীজগুটি বা বীজাণু (Spore) ধরে রাখে । এ ছত্রাকে সাদা বীজগুটি ছাপ থাকে । বেশিরভাগ পরজীবী ছত্রাকের মতো এ ছত্রাকও যৌনভাবে প্রজনন বা বংশবৃদ্ধি করে । একবার বীজগুটি গঠন সম্পূর্ণ হলে এটি একটি পরিপক্ক মাশরুমের মাধ্যমে পরিবেশে নতুন প্রজন্ম শুরু করার জন্য তার বীজগুটিকে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয় । একটি বৃহৎ মাশরুম খামার বছরে এক মিলিয়ন পাউন্ড (৪৫৪ মেট্রিক টন) মাশরুম উৎপাদন করতে পারে । এ ছত্রাক খুবই অদ্ভুত জীব । এটির বিভিন্ন প্রজাতি রয়েছে । প্রায়শই ছত্রাকটি বিরাট পরিমাণে বৃদ্ধি পেতে পারে এবং এটি সম্ভবত অন্য যেকোনো একক জীবের তুলনায় মোট ভৌগোলিক এলাকা জুড়ে বিস্তৃত । আসলে, ছত্রাক প্রকৃতিগতভাবেই বিশাল হতে পারে ।
এ ছত্রাক প্রজাতিটি দীর্ঘদিন ধরে Armillaria ostoyae Romagn. নামে পরিচিত ছিল । ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের ছত্রাক বিশেষজ্ঞ Charles Horton Peck এবং ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি ছত্রাক বিশেষজ্ঞ Henri Charles Louis Romagnesi প্রজাতিটির পূর্ব নাম Armillaria solidipes হিসেবে বর্ননা করেছিলেন । ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব ওরেগনে ছত্রাক জনসংখ্যার মানচিত্র তৈরি করার সময় বন বিজ্ঞানীদের একটি দল দৈত্যাকার আর্মিলারিয়া ওস্টোয়ে ছত্রাকটি আবিষ্কার করে । এছাড়া, ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন রাজ্যের The United States Forest Service (USFS) এর গবেষণা পরিবেশবিদ Catherine G. Parks এবং তার সহকর্মীরা ২৩৮৪ একর এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকারী দুর্দান্ত আর্মিলারিয়া ওস্টোয়ে ছত্রাক আবিষ্কারের কথা প্রকাশ করেন । পরবর্তীতে ২০১১ খ্রিস্টাব্দে আর্মিলারিয়া ওস্টোয়ে নামটি সংরক্ষণের একটি প্রস্তাব প্রকাশিত হয় এবং ছত্রাকের নামকরণ কমিটি কর্তৃক এটি অনুমোদিত হয় ।
সম্ভবত ভর, ক্ষেত্রফল এবং আয়তনের দিক থেকে এ ছত্রাকটি পৃথিবীর বৃহত্তম জীবন্ত প্রাণী । এটি ৩.৭ বর্গ মাইল (২৪০০ একর বা ৯.৬ বর্গ কিঃমিঃ) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত । এর ওজন আনুমানিক ৩৫০০০ টন, যা এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ প্রাচীনতম জীবন্ত প্রাণীতে পরিণত করেছে । এ ছত্রাকের বর্তমান বৃদ্ধির হারের উপর ভিত্তি করে এটি প্রায় ২৪০০ বছর বয়সী বলে অনুমান করা হয় । তবে, এটি ৮৬৫০ বছরেরও বেশি প্রাচীন জীব হতে পারে । একটি গাছে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সনাক্ত করার পর এ পরজীবী ছত্রাকটি ধরা পড়ে । আর্মিলারিয়া ওস্টোয়ে ছত্রাকের রোগজীবাণু অভ্যন্তরীণ স্থানে বেশি দেখা যায়, তবে উপকূলীয় শঙ্কুযুক্ত গাছগুলোতে এর তীব্রতা বেশি । Douglas-fir (Pseudotsuga menziesii), True firs (Abies spp.), Pine trees (Pinus) এবং Western Hemlock (Tsuga heterophylla) ইত্যাদি বেশ কিছু বাণিজ্যিক নরম কাঠের জন্য এ ছত্রাকটি অত্যন্ত রোগ-জীবাণু সৃষ্টি করে । সাধারণভাবে নির্ধারিত চিকিৎসা হচ্ছে সংক্রামিত গাছ পরিষ্কারভাবে কেটে ফেলা এবং তারপর Western redcedar (Thuja plicata) বা পর্ণমোচী চারা জাতীয় গাছের মতো আরো প্রতিরোধী প্রজাতি রোপণ করা ।
অজানা রহস্যেঘেরা বৈচিত্র্যময় এ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী হচ্ছে জলজ স্তন্যপায়ী নীল তিমি । এটি বহুকোষী প্রাণী । বিশাল মহাসাগরে দুর্দান্ত প্রতাপে চলাফেরা করে, শ্বাস নেয়, লেজ দিয়ে পানিতে আঘাত করে খেলায় মেতে ওঠে, সুরেলা শব্দ করে প্রিয়জনের সাথে যোগাযোগ করে, দুর্ধর্ষ শিকার করে, খাদ্য খায়, ঘুমায় এবং বাচ্চা প্রসব করে । কিন্তু, এ নীল তিমির চেয়েও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জীব হচ্ছে আর্মিলারিয়া ওস্টোয়ে ছত্রাক, যা পূর্ব ওরেগন রাজ্য জুড়ে বিস্তৃত । কারণ, এটি এমন একটি একক জিনগত জীব যেটি হাজার হাজার একর জায়গা দখল করে আছে । সময়ের হাত ধরে নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও পরিবেশ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজো এটি টিকে রয়েছে । যদিও এ ছত্রাক প্রজাতিটিকে পছন্দের ভোজ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় । যুক্তরাষ্ট্রের উপদ্বীপীয় রাজ্য মিশিগানের নিকটবর্তী Crystal Falls শহরে প্রতি বছর "ছত্রাক উৎসব" পালিত হয় ।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, সায়েন্টিফিকআমেরিকান
ছবি: www.scientificamerican.com ।

No comments:
Post a Comment