পৃথিবীতে অনেক রত্ন ও ধাতু রয়েছে । বিভিন্ন প্রকার দুর্লভ রত্ন খুবই মূল্যবান । রত্নপাথর তার বৈচিত্র্যময় রঙ, অসাধারণ সৌন্দর্য, বিশুদ্ধতা, গুণগত মান ও দুষ্প্রাপ্যতার কারণে কখনো সে অমূল্য হয়ে থাকে । তবে সকল প্রকার স্বচ্ছ, সূক্ষ্ম ও রঙিন পাথরগুলো তাদের বিশুদ্ধতম অবস্থানে থাকলেও শুধুমাত্র ব্যতিক্রম হচ্ছে হীরক । হীরক খুবই কঠিন রত্ন । হীরকের কাঠিন্য ৮ থেকে ১০ । এ বর্ণহীন রত্নটি একটি মাত্র বিশুদ্ধ উপাদান কার্বন থেকে সৃষ্ট । পৃথিবীর বিচিত্র পাথরকে তার রঙ, স্বচ্ছতা এবং কঠোরতা দিয়ে পৃথকীকরণ করা হয় । রত্নপাথর মানুষের কাছে অন্যতম প্রিয় বস্তু । এ রত্নপাথর নিয়ে রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক কিংবদন্তি, এমনকি মর্মান্তিক রক্তপাতের ইতিহাস । একটি প্রাকৃতিক খনিজ স্ফটিক কেটে পালিশ করে রত্নপাথর অলংকার তৈরীতে ব্যবহৃত হয় । বর্তমানে বেশ আকর্ষণীয় কৃত্রিম রত্নপাথর পাওয়া যায় । প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ অলংকার হিসেবে রত্নপাথর ব্যবহার করে আসছে । রত্নপাথর সৌভাগ্যের প্রতীক এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে । এর উজ্জ্বলতা এবং অদ্ভুত রঙ মানুষকে মুগ্ধ ও আকৃষ্ট করে । কিছু রত্নপাথর মানুষকে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী করে তোলে । জ্যোতিষীশাস্ত্রে রাশিফলের ক্ষেত্রে রত্নপাথর খুবই গুরুত্ব বহন করে । মানুষের বিশ্বাস অনুসারে পবিত্র রত্নপাথরকে অত্যন্ত শক্তিশালী বলে মনে করা হয় । মূল্যবান রত্নপাথর একটি দেশের শিল্প, ইতিহাস, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে বিশেষ ভুমিকা রাখে ।
সিলিকন (Silicone) একটি প্রতিক্রিয়াহীন মৌল । এর প্রতীক হচ্ছে Si এবং পারমাণবিক সংখ্যা ১৪ । এটি পৃথিবীর ভূত্বকে অক্সিজেনের পর দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রাপ্ত মৌল । সিলিকন বিশুদ্ধ অবস্থায় প্রকৃতিতে খুব কমই পাওয়া যায় । এটি শক্ত, ভঙ্গুর এবং সহজে চেপ্টা করা যায় । সিলিকন কক্ষ তাপমাত্রায় কঠিন পদার্থ এবং এর গলনাঙ্ক ১৪১৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস ও হিমাঙ্ক ৩২৬৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস । সিলিকনের একটি উল্লেখযোগ্য উপাদান উদ্ভিদের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় এবং বিপাকীয় প্রক্রিয়ার জন্য অপরিহার্য । বিভিন্ন বৈদ্যুতিক ট্রানজিস্টর, সৌর কোষ ও ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট ইত্যাদিতে সিলিকনকে বহুমুখী প্রয়োগ করা হয় । এর পলিমার অণু বা ম্যাক্রোমোলিকিউল অনেক উপাদান তৈরি করে । বেশিরভাগ সিলিকনকে আলাদা না করে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হয় । উৎপাদন, প্রযুক্তিগত এবং শৈল্পিক প্রয়োজনের জন্য নানা ক্ষেত্রে বহুমুখী উপকরণ হিসেবে প্রাকৃতিক (যেমন: গ্রানাইট, নুড়ি এবং গারনেট ) এবং কৃত্রিম (যেমন: পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট, জিওপলিমার সিমেন্ট, সিরামিক এবং কাচ শিল্পে যা পানিতে দ্রবণীয় বর্ণহীন স্বচ্ছ কঠিন পদার্থ বা সাদা গুঁড়ো সোডিয়াম সিলিকেট হিসেবে) উভয় ভাবেই সিলিকন ব্যবহৃত হয় । সিলিকন আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে । সিলিকন মূলত ধুলি, বালি, মহাজাগতিক ধূলিকণা, গ্রহাণুপুঞ্জ, গ্রহসমূহ এবং ধূমকেতুতে সিলিকনের অক্সাইড (সিলিকা) বা সিলিকেট আকারে থাকে । সিলিকেট (Silicate) হচ্ছে সিলিকন এবং অক্সিজেন সমন্বিত বহু-পরমাণু আয়ন বা আণবিক আয়ন (পলিঅ্যাটমিক আয়ন যেমন: অর্থোসিলিকেট, মেটাসিলিকেট, পাইরোসিলিকেট) পরিবারের যেকোনো সদস্য । এটি সিলিকন এবং অক্সিজেনের সাথে মিলিত ধাতু দিয়ে তৈরি একটি প্রাকৃতিক খনিজ । সিলিকেট সাধারণত রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকে বলেই খনিজ হিসেবে পাওয়া যায় । সিলিকেট মূলত শিলা, বালি, কাদামাটি, মাটি, গ্রানাইট, ইট, সিমেন্ট, সিরামিক এবং কাচের মধ্যে পাওয়া যায় । সিলিকেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ সিমেন্ট, সিরামিক এবং কাচ শিল্পগুলো তাদের রাসায়নিক গঠনের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয় । সিলিকেট নামটি কখনো কখনো সিলিকন ধারণকারী যেকোনো আয়নের জন্যও ব্যবহৃত হয় ।
তামড়ি পাথর (Garnet stone) হচ্ছে সিলিকেট খনিজ পদার্থের একটি দল যেটি ব্রোঞ্জ যুগ থেকে রত্নপাথর হিসেবে এবং মসৃণ-সুন্দর কাজ করার জন্য ঘষে তুলে ফেলতে সক্ষম এমন পদার্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে । গারনেট অর্থ গাঢ় লাল । এটি মূলত স্বচ্ছ ও গাঢ় লাল রঙের একটি প্রাকৃতিক উপ-রত্নপাথর । ভারতীয় সাহিত্যে হ্যাসোনাইট গারনেটকে গোমেদ বলা হয় । গোমেদ হচ্ছে জটিল সিলিকেট খনিজ । বিভিন্ন শিলায় নানা জাতের গারনেট পাওয়া যায় । গারনেটের বিভিন্ন রঙ ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে । গারনেট খনিজের নানা রঙ যেমন: কমলা, হলুদ, বাদামী, বেগুনি, গোলাপী, কালো এবং বর্ণহীন । গারনেটের একটি আইসোমেট্রিক (ঘনক) স্ফটিক কাঠামো রয়েছে । দানাদার, পূঞ্জীভূত এবং পিণ্ড আকারে এটি পাওয়া যায় । গারনেট কণা হিসেবেও পাওয়া যেতে পারে । গারনেটের স্ফটিক বা কণা সূর্যের আলোতে দারুণ চকচক করে । রত্নকার এটিকে পালিশ করলে বেশ দীপ্তিমান হয়ে ওঠে । প্রকৃতিতে সচরাচর নিষ্প্রভ স্ফটিক পাওয়া যায় । কেনিয়া, তানজানিয়া, রাশিয়া, নামিবিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারত এবং মাদাগাস্কার প্রভৃতি দেশে এটি পাওয়া যায় । গারনেটের কাঠিন্য হচ্ছে ৬.৫ থেকে ৭.৫, আপেক্ষিক গুরুত্ব ৩.৫ থেকে ৪.২ এবং প্রতিসরাঙ্ক ১.৭২ থেকে ১.৯৪ । গারনেট মাঝারি ধরণের তাপ সহ্য করতে পারে । কিন্তু কাটার ক্ষেত্রে বা বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের সময় এটি চরম তাপমাত্রার সংস্পর্শে এলে ফেটে যেতে পারে কিংবা তার উজ্জ্বলতা হারাতে পারে । গারনেটের রঙ গোলাপী-লাল, গাঢ় লাল, খয়েরি, হালকা হলুদ, কালো, হালকা সবুজ, উজ্জ্বল সবুজ অথবা বর্ণহীন । গারনেট দলটি রঙের বর্ণালীকে বিস্তৃত করে এবং গাঢ় লাল ও সূক্ষ্ম কমলা থেকে শুরু করে হলুদ, সবুজ, বেগুনি, এমনকি বিরল নীল রঙে পরিণত হয় । কমলা রঙের গারনেট সোডিয়াম সমৃদ্ধ পেগমাটাইট থেকে উৎপন্ন হয় । শক্ত কাঠ, কাচ, চামড়া, শক্ত রাবার, বিভিন্ন প্রকার ধাতব দ্রব্য, সেলুলয়েড জাতীয় দ্রব্যসামগ্রী এবং শিরিষ কাগজ বা কাপড় হিসেবে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় । গারনেটকে আর্থ্রাইটিস রোগ, ভ্যারিকোজ শিরা এবং পিঠের ব্যথার জন্য সহায়ক বলে মনে করা হয় ।
স্পেসারটাইন (Spessartine) [Mn2+3Al2(SiO4)3] হচ্ছে একটি নিসোসিলিকেট, ম্যাঙ্গানিজ অ্যালুমিনিয়াম গারনেট প্রজাতি । এ খনিজটিকে কখনো কখনো ভুল করে গাঢ় রঙের আগ্নেয় শিলা ল্যাম্প্রোফায়ার বা স্পেসারটাইট বলা হয় । নেসোসিলিকেট বা সিলিকেট খনিজ হচ্ছে একটি অজৈব যৌগ যেটি শিলা-গঠনকারী খনিজ যা সিলিকেট দল দিয়ে তৈরি । এগুলো খনিজ পদার্থের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণী যা পৃথিবীর ভূত্বকের প্রায় ৯০ শতাংশ (সিলিকেট যৌগ দ্বারা) তৈরি করে । সিলিকা এর স্ফটিক রূপগুলোকে (সিলিকন ডাই অক্সাইড বা SiO2 ) সাধারণত টেকটোসিলিকেট হিসেবে বিবেচনা করা হয় । সিলিকা প্রকৃতিতে খনিজ কোয়ার্টজ এবং এর বহুরূপ হিসেবে পাওয়া যায় । পৃথিবীতে কোটি কোটি বছর ধরে ভূত্বক গঠন এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার ফলে আরো বিস্তৃত পরিসরে বিভিন্ন ধরণের সিলিকেট খনিজ পদার্থের সংমিশ্রণ ঘটে । এ প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে রয়েছে আংশিক গলন, স্ফটিকীকরণ, ভগ্নাংশকরণ, রূপান্তর, আবহাওয়া এবং ডায়াজেনেসিস । জীবন্ত প্রাণীরাও এ ভূতাত্ত্বিক চক্রে অবদান রাখে । উদাহরণস্বরূপ, ডায়াটম নামে পরিচিত এক ধরণের প্লাঙ্কটন সমুদ্রের জল থেকে নিষ্কাশিত সিলিকা থেকে তাদের বহিঃকঙ্কাল (ফ্রাস্টুলস) তৈরি করে । মৃত ডায়াটমের ফ্রাস্টুলস গভীর সমুদ্রের পলি এবং ডায়াটোমাসিয়াস পৃথিবীর একটি প্রধান উপাদান । স্পেসারটাইন নামটি জার্মানির দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত বাভারিয়া রাজ্যের অ্যাসচাফেনবার্গ শহরের পূর্বে স্পেসার্ট পর্বতমালা থেকে উদ্ভূত, যেখানে এটি প্রথম আবিষ্কৃত হয়েছিল এবং এখান থেকেই এ খনিজটির নামকরণ হয়েছে । রঙ ও স্বচ্ছতার জন্য এটি একটি আধা-মূল্যবান রত্ন বা স্ফটিক । স্পেসারটাইন বিরল হওয়ার কারণে গয়না তৈরিতে খুব কমই ব্যবহৃত হয় । এটি সাধারণত গ্রানাইট, ফাইলাইট, ফেলসিক লাভা, পেগমেটাইট শিরা এবং রূপান্তরিত শিলাতে সৃষ্টি হয় । অস্ট্রেলিয়া, মায়ানমার, ভারত, আফগানিস্তান, ইসরায়েল, মাদাগাস্কার, নামিবিয়া, নাইজেরিয়া, মোজাম্বিক, তানজানিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্পেসারটাইন পাওয়া যায় । মাদাগাস্কারের সাহাতানি উপত্যকার উচ্চভূমিতে অবস্থিত শিলাস্তরে এবং দক্ষিণ মাদাগাস্কারের মায়েভাতানা অঞ্চলের পলিমাটিতে কমলা-হলুদ রঙের স্পেসারটাইন পাওয়া যায়, যেটিকে ম্যান্ডারিন গারনেট বলে । স্পেসারটাইন গারনেট হচ্ছে একটি উজ্জ্বল কমলা থেকে লালচে-কমলা রঙের রত্নপাথর যেটি তার অনন্য রঙ এবং কঠোরতার জন্য পরিচিত । এটি একটি ম্যাঙ্গানিজ অ্যালুমিনিয়াম গারনেট, যার অর্থ হচ্ছে এটির রঙ ম্যাঙ্গানিজের উপস্থিতি থেকে উদ্ভূত । উজ্জ্বল কমলা স্পেসারটাইনগুলোকে প্রায়শই 'ম্যান্ডারিন গারনেট' বলা হয় । যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো এবং মেইন রাজ্যের রাইওলাইট আগ্নেয়শিলায় বেগুনি-লাল স্পেসারটাইন পাওয়া যায় । স্পেসারটাইন খনিজ পদার্থটি গারনেট প্রজাতির অ্যালম্যান্ডিনের সাথে মিলিত হয়ে এটির রঙ ফ্যাকাশে কমলা হলুদ থেকে শুরু করে প্রায় বিশুদ্ধ হয়ে কমলা এবং গাঢ় লাল হয় । উজ্জ্বল কমলা রঙ থেকে লালচে-কমলা রঙ এটিকে সাধারণ গারনেট জাত থেকে আলাদা করে এক প্রাণবন্ত ও স্বতন্ত্র রত্নপাথর করে তোলে । স্পেসারটাইন একটি অবিচ্ছিন্ন কঠিন দ্রবণ সিরিজ গঠন করে । এ সিরিজের সুগঠিত স্ফটিকগুলো খুব গাঢ়-লাল থেকে উজ্জ্বল হলুদ-কমলা রঙের হয় যা বুলগেরিয়ার কার্দজালি প্রদেশের রোডোপ পর্বতমালার ল্যাটিঙ্কায় পাওয়া গেছে । অন্যান্য গারনেটের মতো স্পেসারটাইন সর্বদা অন্য প্রজাতির সাথে মিশ্রিত হয় । উচ্চ স্পেসারটাইনযুক্ত রত্নগুলো হালকা কমলা রঙের দিকে ঝুঁকে, অন্যদিকে অ্যালম্যান্ডিনের প্রাদুর্ভাব লাল বা বাদামী রঙের সৃষ্টি করে । রত্নপাথরের সৌন্দর্য, নান্দনিকতা এবং বৈশিষ্ট্যের জন্য অনেক রত্নপ্রেমী বিশ্বাস করেন যে এটি উদ্দীপনা, সৃজনশীলতা, মানসিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, কর্কটরোগ থেকে মুক্তি, রক্ত পরিস্কার, সুস্থতা, অর্থনৈতিক মুক্তি, দুঃখ-দুর্দশা হ্রাস এবং যৌক্তিক চিন্তাভাবনাকে উৎসাহিত করে সাহস ও উদ্ভাবনী সমাধানের মাধ্যমে এক প্রাণবন্ত জীবনের জন্য চ্যালেঞ্জগুলোকে কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করে ।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, ব্রিটানিকা, আন্তর্জাল ।
ছবি: Amazing Geologist (Image by: Masha Milshina CC) [চীন থেকে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক স্পেসারটাইন গারনেট স্ফটিক] ।

No comments:
Post a Comment