আমাদের সৌরজগতের বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে মহাকাশ বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের অন্ত নেই । এ অপার মহাবিশ্বে আমরা কি একা? যদিও সৌরজগতের পৃথিবী গ্রহের চাঁদ, লোহিত মঙ্গল, প্রেম ও সৌন্দর্যের দেবী শুক্র এবং সর্ববৃহৎ গ্যাস দানব বৃহস্পতি গ্রহের বরফাচ্ছাদিত চাঁদে জীবন বা প্রাণের জন্য অনুকূল পরিবেশ ও লক্ষণ রয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন যাবৎ বলিষ্ঠ দাবি করে আসছেন । পৃথিবী ছাড়া মহাবিশ্বের অন্য কোনো প্রান্তে কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে কি-না তা খুঁজতে গিয়েই সৌরজগতের বাইরে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৮০০টি বহিঃসৌর গ্রহ বা ভিনগ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে । সৌরজগতের বাইরে বিশাল মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা এমন গ্রহকে বহিঃসৌর গ্রহ (Exoplanet) বলে, যেটি পৃথিবীর মতোই অন্য কোনো একটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে । এ সকল বহিঃসৌর গ্রহের কোনোটিতে জীবাণু বা অণুজীবের বসবাসযোগ্য মহাসাগর রয়েছে যেখানে হাইড্রোজেন সমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল বিদ্যমান । কিন্ত, বহিঃসৌর গ্রহগুলোর বেশিরভাগেই প্রাণ বা জীবন থাকা একেবারেই অসম্ভব । যেহেতু এ গ্রহগুলো তাদের স্বাগতিক নক্ষত্রের এতোই কাছাকাছি অবস্থিত যে, সেখানে চরম তাপমাত্রার কারণে জীবনের উদ্ভব মোটেই সম্ভব নয় । তবে, স্বাগতিক নক্ষত্রকে কেন্দ্র করা প্রদক্ষিণরত কোনো কোনো দূরবর্তী গ্রহে তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ার কারণে সেখানে প্রাণ বা জীবন উদ্ভবের সম্ভাবনা অনেক বেশি রয়েছে ।
সম্প্রতি সৌরজগতের বাইরে একটি বহিঃসৌর গ্রহে প্রাণ থাকার সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রমাণ মহাকাশ বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন । নাসা এর জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে আমাদের সৌরজগৎ থেকে প্রায় ১২৪ আলোকবর্ষ (৩৮ পারসেক) দূরে K2-18b নামক বহিঃসৌর গ্রহের বায়ুমণ্ডলে প্রাণের সম্ভাব্য রাসায়নিক চিহ্ন ডাইমিথাইল সালফাইড এবং ডাইমিথাইল ডিসালফাইড যৌগের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে যেগুলো পৃথিবীতে শুধুমাত্র জীবিত প্রাণী বা উদ্ভিদ থেকেই জন্ম নেয় । সাধারণত সামুদ্রিক ফাইটোপ্লাঙ্কটন বা উদ্ভিদ প্লাঙ্কটন হচ্ছে অটোট্রফিক (স্ব-ভোজী) অণুজীব বা প্রাকৃতিকভাবে তৈরি অতিক্ষুদ্র সবুজ কণা বা জীবকণা যেটি মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় (যেমন: শেওলা, নষ্টক, এনাবিনা ইত্যাদি) যেগুলো পৃথিবীতে পাওয়া যায় । আশ্চর্যের বিষয় যে, এ রাসায়নিক যৌগ পৃথিবীর তুলনায় ২০ গুণ বেশি পরিমাণে সেখানে পাওয়া গেছে । মহাজাগতিক বিস্ময়ের অধিকারী K2-18b বা EPIC 201912552b বহিঃসৌর গ্রহটি গ্যাসীয় বরফ দৈত্য উপ-নেপচুন গ্রহের মতোই । এটি সিংহ রাশির নক্ষত্রমণ্ডলে (Leo constellation) অবস্থিত । গ্রহটি পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ৯ গুণ ভারী এবং ২.৬ গুণ বড় । জলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্যের চেয়ে ছোট, কম আলোকিত, শীতল এবং লাল বামন K2-18 নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে প্রতি ৩৩ দিনে গ্রহটি পরিভ্রমণ করছে । নতুন আবিষ্কৃত গ্রহটি স্বাগতিক নক্ষত্র থেকে বাসযোগ্য অঞ্চলের (Habitable zone) মধ্যে অবস্থিত, ফলে সেই পরিবেশে প্রাণ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে যেখানে সূর্য থেকে পৃথিবী যে পরিমাণ আলো পায় সেই পরিমাণ আলো এ গ্রহটিও পেয়ে থাকে । এছাড়া, ঐ নক্ষত্রের কক্ষপথের ভিতরে K2-18c নামে আরো একটি গ্রহ রয়েছে । উল্লেখ্য যে, বিজ্ঞানীরা ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে হাবল মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে K2-18b গ্রহের বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের সন্ধান পেয়েছিলেন এবং তখন থেকেই সৌরজগতের বাইরে এ বহিঃসৌর গ্রহটিকে সবচেয়ে বাসযোগ্য গ্রহ হিসেবে বিবেচনা করা হয় । পরবর্তীতে দেখা যায় যে, গ্রহটিতে মূলত মিথেন গ্যাসের একটি আবরণ ছিল । যদিও বিজ্ঞানীরা মনে করেন, K2-18b হচ্ছে একটি হাইসিয়ান জগৎ । এ গ্রহের হাইড্রোজেনপূর্ণ বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে মিথেন ও কার্বন ডাই অক্সাইড রয়েছে এবং অ্যামোনিয়া গ্যাস পরিমাণে কম থাকায় সেখানে মহাসাগর থাকতে পারে যেখানে রয়েছে এক প্রকার আণুবীক্ষণিক এককোষী অণুজীব বা জীবাণু । এ মহাসাগরই হচ্ছে জীবনের মূল উপাদান । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, আবিষ্কৃত গ্রহের বায়ুমণ্ডলে এ সকল যৌগের উপস্থিতির কারণে সেখানে প্রাণ থাকার জোরালো ইঙ্গিত দিচ্ছে । সুতরাং, সৌরজগতের বাইরে প্রাণের সন্ধান এটি একটি যুগান্তকারী অগ্রগতি বলে বিবেচিত হচ্ছে ।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, আনন্দবাজার, প্রথম আলো, উইকিপিডিয়া ।

No comments:
Post a Comment