Thursday, 10 April 2025

বৃহস্পতি গ্রহের আইও চাঁদ


জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের লালিত বাসনা যে, সূর্য থেকে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন মাইল দূরে থাকা বৃহস্পতি গ্রহ, তার হীমশীতল চাঁদে নোনা জলের সমুদ্র, প্রাণের অস্তিত্ব এবং  বসবাসযোগ্যতার লক্ষণগুলোকে অন্বেষণ করা ৷ এছাড়া, বিজ্ঞানীদের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে পৃথিবীর চাঁদে প্রাণের অস্তিত্বের পাশাপাশি বাসযোগ্যতার বিষয়টি ৷ আমরা ছোট একটি পাথুরে গ্রহ পৃথিবীতে বাস করি । এ বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে বিদ্যমান দুই ট্রিলিয়ন ছায়াপথের মধ্যে একটি ছায়াপথ হচ্ছে আমাদের নিজস্ব ছায়াপথ আকাশগঙ্গা । আকাশগঙ্গায় প্রায় ৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে তার মধ্যে একটি নক্ষত্র সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে পৃথিবী । প্রতিটি ছায়াপথে শত শত কোটি নক্ষত্র এবং অসংখ্য গ্রহ-উপগ্রহ রয়েছে ট্রিলিয়ন কিলোমিটার দূরে । আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রের খুব কাছের নক্ষত্রটি হচ্ছে জলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্য ৷ এ সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে ৮টি গ্রহ, ৫টি বামন গ্রহ (যেমন: Pluto, Haumea, Eris, Makemake এবং Ceres), অগণিত গ্রহাণুপুঞ্জ, উল্কা এবং ধূমকেতু ইত্যাদি ৷ সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহ বৃহস্পতি এবং গ্রহদের রাজা । একজন প্রাচীন রোমান দেবতার নামে এর নামকরণ হয়েছে । সূর্য থেকে পঞ্চম দূরত্বে ৭৭.৮৪ কোটি কিলোমিটার দূরে বৃহস্পতির অবস্থান । পৃথিবী থেকে বৃহস্পতির দূরত্ব প্রায় ৮০ কোটি কিলোমিটার । বৃহস্পতি একটি গ্যাস দৈত্য গ্রহ ৷ কঠিন পদার্থের পরিবর্তে গ্যাস এবং তরল দ্বারা এটি গঠিত । বৃহস্পতির উপরিতল সম্পূর্ণ বরফে ঢাকা । তাই গ্যাসীয় পদার্থ জমাট বেঁধে এ বৃহৎ দৈত্যাকার গ্রহটি তৈরি হয়েছে । বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, ৪৬৫ কোটি বছর পূর্বে সূর্য জন্ম নেয়ার পরপরই গ্রহগুলো আবির্ভূত হয়েছিল । এদের মধ্যে সর্বপ্রথমে জন্ম নেয় বৃহস্পতি গ্রহ ৷ বৃহস্পতির ভর সৌরজগতের অন্য সকল গ্রহগুলোর ভরকে একত্রিত করলে তার থেকে আড়াই গুণ বেশি (ভর ১.৯০ * ১০২৭ কিঃগ্রাঃ) । এতোই বিশাল যে সূর্যের সাথে এর বেরিকেন্দ্র (Barycentre) সূর্যের কেন্দ্র থেকে ১.০৬৮ সৌর ব্যাসার্ধে সূর্যের পৃষ্ঠের উপরে অবস্থিত । কিন্তু সূর্যের ভরের ১০৪৭ ভাগের এক ভাগ থেকে সামান্য কম । অর্থাৎ বৃহস্পতির ভর আর একটু বেশি হলেই এর আভ্যন্তরীণ মহাকর্ষ হাইড্রোজেন পরমাণুগুলোকে নিষ্ক্রিয় গ্যাস হিলিয়ামে পরিণত করার পাশাপাশি ফোটন আলোক কণা উৎপাদন করতো । তার মানে, বৃহস্পতি একটি নক্ষত্রে পরিণত হতো । বৃহস্পতি গ্রহটি পৃথিবীর চেয়ে অনেক বড় এবং যথেষ্ট কম ঘন । বৃহস্পতি গ্রহের আয়তন পৃথিবীর ১৩২১ গুণ কিন্তু ভর মাত্র ৩১৮ গুণ । এ বৃহত্তম গ্রহটির ব্যাস নিরক্ষরেখা বা বিষুবরেখা বরাবর ১৪২৯৮৪ কিলোমিটার (৮৮৮৪৬ মাইল) । বৃহস্পতির গড় ঘনত্ব প্রতি ঘনসেন্টিমিটারে ১.৩২৬ গ্রাম, যা বৃহৎ গ্যাসীয় গ্রহগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ । সৌরজগতের গ্যাসীয় দানব নেপচুন গ্রহের ঘনত্ব সর্বোচ্চ । বৃহস্পতি হচ্ছে পৃথিবীর চাঁদ এবং শুক্র গ্রহের পরেই পৃথিবী থেকে রাতের আকাশে দৃশ্যমান মহাজাগতিক তৃতীয় উজ্জ্বল প্রাকৃতিক বস্তু ৷ গ্যাস দানব বৃহস্পতি এতোটাই বিশাল যে সৌরজগতের অন্য সমস্ত গ্রহগুলো এর ভিতরে সুন্দরভাবে মানানসই বা জায়গা করে নিতে পারে । এটি প্রায় ১৩০০ টিরও বেশি পৃথিবীর সমান । বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুন গ্রহ চারটিকে একত্রে জোভিয়ান গ্রহ বলে । বৃহস্পতি গ্রহকে প্রদক্ষিণকারী ৯৫টি উপগ্রহ বা চাঁদের মধ্যে চারটি হচ্ছে গ্যালিলীয় চাঁদ যেমন: ইউরোপা (Europa), ক্যালিস্টো (Callisto), আইও (Io) এবং গ্যানিমিড (Ganymede) । এ চাঁদগুলোর কোনোটি তার বরফ পৃষ্ঠের নিচে গভীর তরল জলের মহাসাগরকে আশ্রয় দেয়, যেখানে সামুদ্রিক প্রাণ থাকতে পারে । ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ এবং দার্শনিক গ্যালিলিও গ্যালিলি ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম এ চারটি চাঁদকে আবিষ্কার করেন বলেই তার নামানুসারে চাঁদগুলোর নামকরণ হয় গ্যালিলীয় চাঁদ । 

বৃহস্পতি গ্রহের চারটি গ্যালিলিয়ান চাঁদের মধ্যে সবচেয়ে ভেতরের এবং দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম চাঁদ হচ্ছে আইও । সম্ভবত একই বছর জার্মান জ্যোতির্বিদ সাইমন মারিয়াস স্বাধীনভাবে পুনরায় আইও চাঁদটি আবিষ্কার করেন এবং গ্রীক পৌরাণিক চরিত্র ও কিংবদন্তী আইও এর নামে এ চাঁদটির তিনি নামকরণ করেছিলেন । আইও হচ্ছেন প্রাচীন গ্রীক ধর্মে হেরার একজন ধর্মযাজিকা যিনি দেবরাজ জিউসের প্রেমিকাদের একজন । আইও চাঁদ পৃথিবীর চাঁদের চেয়ে সামান্য বড় । এর গড় ব্যাসার্ধ ১৮২১.৩ কিলোমিটার ( ১১৩১.৭ মাইল) । ভর ৯১২৮.৪০ কেজি । আইও চাঁদের গড় ঘনত্ব প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে প্রায় ৩.৫২ গ্রাম যা শিলার বৈশিষ্ট্য, কিন্তু বরফের নয় । আইও চাঁদ হচ্ছে সৌরজগতের চতুর্থ বৃহত্তম প্রাকৃতিক চাঁদ এবং এর সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব ও শক্তিশালী পৃষ্ঠের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি রয়েছে । আইও চাঁদের উচ্চ ঘনত্ব এবং সৌরজগতের যেকোনো পরিচিত বস্তুর তুলনায় এ চাঁদে সর্বনিম্ন পরিমাণে জল রয়েছে । যদিও জলীয় বরফ বা জলীয় খনিজ পদার্থের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ এ চাঁদের গিশ বার মনস পর্বতের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে শনাক্ত করা হয়েছে । জলের এ স্বল্পতা বা অভাবে সম্ভবত সৌরজগতের বিবর্তনের প্রথম দিকে বৃহস্পতি গ্রহ যথেষ্ট উত্তপ্ত ছিল যা আইও চাঁদের আশেপাশের জলের মতো উদ্বায়ী পদার্থগুলোকে তাড়িয়ে দিয়ে থাকতে পারে । তবে হয়তো, এতোটা উত্তপ্ত ছিল না যে চাঁদটি আরো দূরে যেতে পারে । আইও চাঁদ বৃহস্পতির চারপাশে সমান্তরালভাবে ঘুরছে (১.৭৬৯ পৃথিবী দিন) এবং যার একটি মুখ সর্বদা বৃহস্পতির দিকে থাকে । বৃহস্পতির কেন্দ্র থেকে ৪২১৭০০ কিলোমিটার (২৬২০০০ মাইল) এবং মেঘের চূড়া থেকে ৩৫০০০০ কিলোমিটার (২১৭০০০ মাইল) দূরে আইও চাঁদ বৃহস্পতি গ্রহকে প্রদক্ষিণ করে । বৃহস্পতি গ্রহের চারপাশে একটি কক্ষপথ সম্পূর্ণ করতে আইও চাঁদের প্রায় ৪২.৫ ঘন্টা (১.৭৭ দিন) সময় লাগে । আইও চাঁদ এবং জোভিয়ান চাঁদ ইউরোপার মধ্যে মহাকর্ষীয় অনুরণনের কারণে কক্ষপথটি কিছুটা অদ্ভুত বা বিকেন্দ্রীকরণ হতে বাধ্য হয় । এ জোরপূর্বক অদ্ভুততা বা খামখেয়ালীপনার কারণে বৃহস্পতির শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মাধ্যমে আইও চাঁদের তীব্র জোয়ারের টানে তাপ উৎপন্ন হয় যা চাঁদের ক্রমাগত নমনের কারণে অভ্যন্তরীণ ঘর্ষণ থেকে ঘটে এবং যেটি আগ্নেয়গিরিগুলোকে শক্তি প্রদানকারী শক্তির উৎস । বৃহস্পতির চাঁদ আইও এর বায়ুমণ্ডল অত্যন্ত পাতলা এবং প্রধানত সালফার ডাই অক্সাইড, সালফার মনোক্সাইড, সোডিয়াম ক্লোরাইড, পারমাণবিক সালফার ও অক্সিজেনসহ গৌণ উপাদান রয়েছে । আইও চাঁদ গ্রহনকালে মেরুপ্রভার (Aurora) মতো আভা প্রকাশ করে । পৃথিবীর মতোই এটি বায়ুমণ্ডলে কণা বিকিরণের আঘাতের কারণে ঘটে থাকে । যদিও এ ক্ষেত্রে চার্জিত কণাগুলো সৌর বায়ুর পরিবর্তে বৃহস্পতির চৌম্বক ক্ষেত্র থেকে আসে । মেরুপ্রভা সাধারণত গ্রহের চৌম্বক মেরুর কাছে ঘটে । তবে আইও চাঁদের মেরুপ্রভাগুলো এর বিষুবরেখার কাছে সবচেয়ে উজ্জ্বল রূপ ধারণ করে । আইও চাঁদের নিজস্ব কোনো অন্তর্নিহিত চৌম্বক ক্ষেত্র নেই । তাই, আইও চাঁদের কাছাকাছি বৃহস্পতির চৌম্বকক্ষেত্র বরাবর ভ্রমণকারী ইলেকট্রনগুলো সরাসরি আইও চাঁদের বায়ুমণ্ডলকে প্রভাবিত করে । আর এ ইলেকট্রনগুলোই চাঁদের বায়ুমণ্ডলের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, যার ফলে সবচেয়ে উজ্জ্বল অনন্য সুন্দর মেরুপ্রভা তৈরি হয় । আইও চাঁদের পৃষ্ঠে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মুখ, গভীর অংশ এবং লাভার ঘনীভূত প্রবাহ রয়েছে । ৫০০ কিলোমিটারের (৩০০ মাইল) বেশি দৈর্ঘ্যের অসংখ্য বিস্তৃত লাভা প্রবাহও পৃষ্ঠে দেখা যায় । আইও চাঁদের পৃষ্ঠের বেশিরভাগ অংশই সিলিকেট (যেমন অর্থোপাইরক্সিন), সালফার এবং সালফার ডাই অক্সাইডের দ্বারা হিমশীতল আবরণসহ বিস্তৃত সমভূমি গঠিত । মূলত এ সকল যৌগের জমা থাকার কারণে চাঁদটি চমৎকার, প্রাণবন্ত, উজ্জ্বল ও রঙিন ভূদৃশ্যে আবির্ভূত হয় । আইও চাঁদের আগ্নেয়গিরিময়তা অনেক অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী । চাঁদের আগ্নেয়গিরির শিখা এবং লাভা প্রবাহ পৃষ্ঠের উপর বিশাল পরিবর্তন আনে এবং পৃষ্ঠকে হলুদ, লাল, সাদা, কালো এবং সবুজ রঙের বিভিন্ন সূক্ষ্ম ছায়ায় রঙ করে, যা মূলত অ্যালোট্রপ (Allotrope) এবং সালফার যৌগের কারণে । ভূতাত্ত্বিকভাবে চাঁদের তরুণ পৃষ্ঠে আঘাতজনিত গর্তের কোনো প্রমাণ নেই । এখানে আগ্নেয়গিরির প্রবাহ এতোটাই বিস্তৃত এবং ঘন ঘন যে, তারা প্রতি কয়েক হাজার বছরে সমগ্র চাঁদটিকে কয়েক মিটার গভীরতায় পুনরুজ্জীবিত করছে । ভূত্বকের নিচে গলিত শিলার একটি স্তর এবং প্রায় ১৮০০ কিলোমিটার (১১১০ মাইল) ব্যাসের গলিত লোহা ও লোহা সালফাইডের একটি কেন্দ্রস্থল রয়েছে যার ব্যাস প্রায় ১৮০০ কিলোমিটার (১১১০ মাইল), ফলে এটি সিলিকেট শিলা দ্বারা গঠিত । আইও চাঁদ ভূতাত্ত্বিকভাবে সৌরজগতের সবচেয়ে আগ্নেয়গিরির দিক থেকে সক্রিয়, যেখানে শত শত আগ্নেয়গিরি রয়েছে । এ চরম ভূতাত্ত্বিক কার্যকলাপটি বৃহস্পতি এবং অন্যান্য গ্যালিলিয়ান চাঁদ ইউরোপা, গ্যানিমেড এবং ক্যালিস্টোর মধ্যে আকর্ষণ বা টানের কারণে আইও চাঁদের অভ্যন্তরে সৃষ্ট ঘর্ষণ থেকে জোয়ারের উত্তাপের ফলে এটি ঘটে থাকে । বেশ কয়েকটি আগ্নেয়গিরি পৃষ্ঠ থেকে ৫০০ কিলোমিটার (৩০০ মাইল) পর্যন্ত সালফার এবং সালফার ডাই অক্সাইডের শিখা তৈরি করে । কিছু শৃঙ্গ পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থান মাউন্ট এভারেস্টের চেয়েও উঁচু । আগ্নেয়গিরি দ্বারা উৎপাদিত উপকরণগুলো আইও চাঁদের পাতলা ও বিক্ষিপ্ত বায়ুমণ্ডল তৈরি করে এবং উপাদানগুলো বৃহস্পতির বিস্তৃত চৌম্বকমণ্ডলের প্রকৃতি ও বিকিরণ স্তরকেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে । আইও চাঁদের আগ্নেয়গিরির নির্গমন বৃহস্পতির চারপাশে একটি বৃহৎ ও তীব্র প্লাজমা টরাস তৈরি করে, যা চাঁদে এবং তার চারপাশে এক প্রতিকূল বিকিরণ পরিবেশের সৃষ্টি হয় । কয়েক কিলোমিটার উঁচু কিছু আগ্নেয়গিরির ফোয়ারা থেকে লাভা উদ্গত হয় । আইও চাঁদের লাভা হ্রদ লোকি প্যাটেরা যা প্রায় ৭৭০০ বর্গমাইল (২০০০০ বর্গকিলোমিটার) জুড়ে বিস্তৃত । এ জোভিয়ান চাঁদে আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ এতোটাই তীব্র যে, এটি ধূমকেতুর চেয়ে দ্রুত নতুন কিছু উপাদান জমার মাধ্যমে আইও চাঁদের আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মুখকে পুনরুজ্জীবিত করে এবং গ্রহাণুগুলো এতে বড় বড় গর্ত তৈরি করতে পারে । ভয়েজার ১ মহাকাশযান ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের ৫ই মার্চ যখন আইও চাঁদের পাশ দিয়ে উড়ে যায় তখন নয়টি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি পর্যবেক্ষণ করে যা কয়েকশ কিলোমিটার দূরে সূক্ষ্ম কণার ঝর্ণা নির্গত করে । পরবর্তীতে প্রায় ২০ বছর পরে গ্যালিলিও মহাকাশযানের উচ্চতর রেজ্যুলিউশনের পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে আইও চাঁদে প্রায় ৩০০টি আগ্নেয়গিরি সক্রিয় থাকতে পারে । আগ্নেয়গিরি থেকে যে সিলিকেট লাভা নির্গত হয় তা অত্যন্ত উত্তপ্ত (প্রায় ১৯০০ কেলভিন বা ৩০০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ১৬৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এবং তিন বিলিয়ন বছরেরও বেশি সময় আগে পৃথিবীতে উৎপন্ন লাভার মতো । চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে নির্গত আগ্নেয়গিরির উপাদানগুলো চার্জযুক্ত কণার একটি টরয়েডাল মেঘ তৈরি করে (Doughnut-shaped toroidal cloud) যা আইও চাঁদের কক্ষপথ অনুসরণ করে এবং বৃহস্পতির চারপাশের পথের কিছু অংশ আবৃত করে । আগ্নেয়গিরির নির্গত পদার্থে অক্সিজেন, সোডিয়াম, সালফার, হাইড্রোজেন এবং পটাসিয়াম থাকে । আইও চাঁদ কক্ষপথ ভ্রমণ করে বৃহস্পতির চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় এটি সর্পিল ইলেকট্রনের প্রবাহ নল (Flux tube) বরাবর প্রায় পাঁচ মিলিয়ন অ্যাম্পিয়ার বৈদ্যুতিক প্রবাহ উৎপন্ন করে যা আইও চাঁদকে বিশাল গ্রহ বৃহস্পতির সাথে সংযুক্ত করে । বৈদ্যুতিক প্রবাহটি বিশ্বের সমস্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট শক্তির ছয় গুণ বেশি অগ্ন্যুৎপাতের উৎস । এ বৈদ্যুতিক প্রবাহটি বৃহস্পতির মেরু অঞ্চলে আইও পদচিহ্ন নামে পরিচিত একটি অরোরাল আভা তৈরি করে এবং সেইসাথে আইও চাঁদের বায়ুমণ্ডলেও দৃষ্টিনন্দন মেরুপ্রভা তৈরি করে । অরোরাল মিথস্ক্রিয়া থেকে প্রাপ্ত কণাগুলো কখনো দৃশ্যমান তরঙ্গদৈর্ঘ্যে জোভিয়ান মেরু অঞ্চলগুলোকে অন্ধকার করে তোলে । বর্তমান পর্যবেক্ষণ থেকে অনুমান করা হয় যে, এখানে প্রায় ৪০০ টিরও বেশি শক্তিশালী সক্রিয় আগ্নেয়িরি রয়েছে । তবে, সবচেয়ে তীব্র আগ্নেয়গিরিগুলো থেকেই অগ্ন্যুৎপাত হয় । আইও চাঁদের দক্ষিণ গোলার্ধে চরম অবলোহিত তেজস্ক্রিয়তার এক বিশাল উষ্ণ স্থান (Hot spot) সনাক্ত হয়েছে । বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন যে, বৈশিষ্ট্যটি ৪০০০০ বর্গমাইল (১০০০০০ বর্গকিলোমিটার) জুড়ে ছড়িয়ে আছে । উষ্ণ স্থানের তেজস্ক্রিয়তার মোট শক্তি ৮০ ট্রিলিয়ন ওয়াটেরও বেশি পরিমাপ করা হয়েছে । বিজ্ঞানীদের ধারণা, আইও চাঁদের পৃষ্ঠের এ ধরনের পরিবর্তনগুলো উষ্ণ স্থান এবং আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপের সাথে সম্পর্কিত । আইও চাঁদের বৃহৎ ও চরম মাত্রার অগ্ন্যুৎপাতগুলো দীর্ঘস্থায়ী স্বাক্ষর রেখে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে পাশাপাশি বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে যেমন: পাইরোক্লাস্টিক জমা (আগ্নেয়গিরি দ্বারা নির্গত শিলাখণ্ড), ফাটল দ্বারা পুষ্ট ছোট লাভা প্রবাহ এবং সালফার ও সালফার ডাই অক্সাইড সমৃদ্ধ আগ্নেয়গিরি শিখা । বৃহস্পতির চৌম্বক ক্ষেত্র গঠনে আইও চাঁদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । এটি একটি বৈদ্যুতিক জেনারেটর হিসেবে কাজ করে যা নিজের উপর ৪০০০০০ ভোল্ট তৈরি করতে পারে এবং ৩ মিলিয়ন অ্যাম্পিয়ার বৈদ্যুতিক প্রবাহ সৃষ্টি ও আয়ন নির্গত করে বৃহস্পতিকে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করার সুযোগ করে দেয় যেটি তার দ্বিগুণেরও বেশি আকার ধারণ করে । বৃহস্পতির চৌম্বকমণ্ডল আইও চাঁদের পাতলা বায়ুমণ্ডল থেকে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১ টন হারে গ্যাস এবং ধূলিকণা টেনে নেয় । এ উপাদানগুলো বেশিরভাগই আয়নযুক্ত ও পারমাণবিক সালফার, অক্সিজেন এবং ক্লোরিন; পারমাণবিক সোডিয়াম ও পটাসিয়াম; আণবিক সালফার ডাই অক্সাইড ও সালফার; এবং সোডিয়াম ক্লোরাইড ধুলো দিয়ে গঠিত । এ সকল পদার্থ বা উপাদানগুলো আইও চাঁদের আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ থেকে উদ্ভূত হয় এবং এগুলো সরাসরি আইও চাঁদের বায়ুমণ্ডল থেকে বৃহস্পতির চৌম্বক ক্ষেত্র ও আন্তঃগ্রহীয় স্থানে আসে । যদিও পদার্থগুলো তাদের আয়নিত অবস্থা এবং গঠনের উপর নির্ভর করে । বৃহস্পতির চৌম্বকমণ্ডলের বিভিন্ন নিরপেক্ষ (অ-আয়নিত) মেঘ ও বিকিরণগুলো বলয়ে পরিণত হয়ে জোভিয়ান সিস্টেম থেকে নির্গত হয় । আইও চাঁদকে ঘিরে নিরপেক্ষ সালফার, অক্সিজেন, সোডিয়াম এবং পটাসিয়াম পরমাণুর মেঘ রয়েছে । কণাগুলো আইও চাঁদের উপরের বায়ুমণ্ডলে উৎপন্ন হয় এবং প্লাজমা টরাসে আয়নগুলোর সাথে সংঘর্ষের মাধ্যমে আইও চাঁদের পার্বত্য গোলক পূরণ করার জন্য বিভিন্ন প্রক্রিয়া দ্বারা উত্তেজিত হয়, যা সেই অঞ্চল যেখানে আইও চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ বৃহস্পতির উপর প্রাধান্য পায় । পৃথিবী এবং তার চাঁদের বিপরীতে, আইও চাঁদের অভ্যন্তরীণ তাপের প্রধান উৎসটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ক্ষয়ের পরিবর্তে জোয়ারের অপচয় থেকে আসে যেটি ইউরোপা এবং গ্যানিমিড চাঁদের সাথে আইও চাঁদের কক্ষীয় অনুরণনের ফলে ঘটে । এ ধরনের উত্তাপ বৃহস্পতি গ্রহ থেকে আইও চাঁদের দূরত্ব, এর কক্ষীয় বিকেন্দ্রীকরণ, এর অভ্যন্তরীণ গঠন এবং এর ভৌত অবস্থার উপর নির্ভর করে । আইও চাঁদের জোরপূর্বক কক্ষপথের বিকেন্দ্রীকরণের ফলে সৃষ্ট জোয়ারের উত্তাপ এটিকে সৌরজগতের সবচেয়ে আগ্নেয়গিরির দিক থেকে সক্রিয় জগতে পরিণত করেছে, যেখানে শত শত আগ্নেয়গিরি কেন্দ্র এবং বিস্তৃত লাভা প্রবাহ রয়েছে । একটি বড় অগ্ন্যুৎপাতের সময় দশ বা এমনকি শত শত কিলোমিটার দীর্ঘ লাভা প্রবাহ তৈরি হতে পারে, যার বেশিরভাগই ব্যাসাল্ট সিলিকেট লাভা দিয়ে তৈরি যেখানে ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ ম্যাফিক বা আল্ট্রাম্যাফিক বা আগ্নেয় শিলা রয়েছে । লাভা প্রবাহ আইও চাঁদে আরেকটি প্রধান আগ্নেয়গিরির ভূখণ্ডের প্রতিনিধিত্ব করে । বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, এ প্রবাহগুলো বেশিরভাগই গলিত সালফারের বিভিন্ন যৌগ দিয়ে গঠিত । তবে পৃথিবী-ভিত্তিক ইনফ্রারেড গবেষণা এবং গ্যালিলিও মহাকাশযানের পরিমাপ থেকে জানা যায় যে, এ প্রবাহগুলো ম্যাফিক থেকে আল্ট্রাম্যাফিক রচনাসহ বেসালটিক লাভা দিয়ে গঠিত । আইও চাঁদে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী শিখাগুলোর (Plume) মধ্যে রয়েছে প্রোমিথিউস, আমিরানি এবং মাসুবি । আইও চাঁদে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি পর্বত রয়েছে । পর্বতগুলো প্রায়শই বৃহৎ (গড়ে পর্বত ১৫৭ কিলোমিটার বা ৯৮ মাইল লম্বা) এবং বিচ্ছিন্ন কাঠামো হিসেবে দেখা যায় যার কোনো আপাত বৈশ্বিক টেকটোনিক নিদর্শন নেই যেটি পৃথিবীর ক্ষেত্রে দেখা যায় । দক্ষিণ বোসোল মন্টেসে এ স্থাপনাগুলোর গড় উচ্চতা ৬ কিলোমিটার (৩.৭ মাইল) এবং সর্বোচ্চ ১৭.৫ কিলোমিটার (১০.৯ মাইল) । আইও চাঁদে অবস্থিত পর্বতমালা বিভিন্ন ধরণের আকার ধারণ করে । মালভূমিগুলো সবচেয়ে সাধারণ । এ কাঠামোগুলো বৃহৎ যেটি বিচ্ছিন্ন, সমতল-শীর্ষ উচ্চতা, শৈলশিরা মেসা (Mesa) এর মতো যার পৃষ্ঠতল শক্ত । অন্যান্য পর্বতগুলো হেলানো ভূত্বকীয় ব্লক বলে মনে হয় । আইও চাঁদে কয়েকটি পাহাড়ের ছোট ঢাল আগ্নেয়গিরির উৎপত্তি রয়েছে । প্রায় সকল পর্বতই অবক্ষয়ের কোনো না কোনো পর্যায়ে রয়েছে বলে মনে হয় । আয়োনিয়ান পর্বতমালার পাদদেশে বড় বড় ভূমিধস সাধারণ ঘটনা, যা ইঙ্গিত করে যে ভরের অবক্ষয়ই অবক্ষয়ের প্রাথমিক রূপ । আইও চাঁদের মেসা এবং মালভূমিতে Scalloped প্রান্তগুলো ভূত্বক থেকে সালফার ডাই অক্সাইড শোষণের ফলে পর্বত প্রান্ত বরাবর দুর্বলতার অঞ্চল তৈরি করে ।আইও চাঁদে বিভিন্ন আগ্নেয়গিরি, পর্বত, মালভূমি এবং বৃহৎ অ্যালবেডো বৈশিষ্ট্য রয়েছে । যেমন: প্যাটেরা (সসার বা আগ্নেয়গিরির নিম্নচাপ), ফ্লকটাস (প্রবাহ বা লাভা প্রবাহ), ভ্যালিস (উপত্যকা বা লাভা চ্যানেল) এবং সক্রিয় অগ্ন্যুৎপাত কেন্দ্র ইত্যাদি । 

উল্লেখ্য যে: বিভিন্ন মহাকাশ সংস্থা এবং মহাকাশযান এ চমকপ্রদ আইও চাঁদকে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ করে আসছে । বিজ্ঞানীদের এ জোভিয়ান চাঁদ সম্পর্কে নানা ধরণের ভবিষ্যৎ মিশন ও পরিকল্পনা রয়েছে । বিশেষ করে জুনো মিশন হচ্ছে NASA এর একটি মহাকাশ অনুসন্ধান, যা বৃহস্পতি গ্রহকে প্রদক্ষিণ করছে । এটির উদ্দেশ্য হচ্ছে বৃহস্পতি গ্রহের উৎপত্তি ও গঠন, এর চাঁদ সম্পর্কে, গ্রহে পাথুরে কেন্দ্রস্থল আছে কি-না, গ্রহের বায়ুমণ্ডলে জলের পরিমাণ, ভর বিতরণ, মহা লাল বিন্দু, গভীর বাতাস, মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র, চৌম্বক ক্ষেত্র এবং মেরু চুম্বকমণ্ডল ইত্যাদি পরিমাপ করা । জুনো মিশনটি NASA এর New Frontiers Program এর অংশ, যেটি ওয়াশিংটনে এজেন্সির বিজ্ঞান মিশন অধিদপ্তরের (Science Mission Directorate) জন্য আলাবামার হান্টসভিলে নাসার Marshall Space Flight Center এ পরিচালিত হয় ৷ যুক্তরাষ্ট্রের (ডেনভার) মহাকাশ, প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা বিষয়ক কোম্পানি লকহিড মার্টিন স্পেস (Lockheed Martin Space) মহাকাশযান তৈরি এবং পরিচালনা করে । এছাড়া, ইতালীয় মহাকাশ সংস্থা (ASI) জোভিয়ান ইনফ্রারেড অরোরাল ম্যাপারের জন্য অর্থায়ন করেছে । বৃহস্পতি গ্রহে জুনো মহাকাশযানটি ৫০ বার বৃহস্পতির চারপাশে ঘুরে বর্তমানে ৫১তম মিশনে রয়েছে । 


তথ্যসূত্র:  https://www.nasa.gov/ , www.britannica.com,  https://www.cbc.ca/   ,  https://www.space.com/ , আন্তর্জাল (The Internet), ছবি: উইকিপিডিয়া ।

No comments:

Post a Comment

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...