(নতুন আবিষ্কৃত Ross 508 গ্রহ ব্যবস্থার পরিকল্পিত চিত্র) ছবি: https://bigganbarta.org/
এ মহাবিশ্বে পৃথিবীই কি একমাত্র গ্রহ যেখানে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে? না-কি এ গ্রহের বাইরেও প্রাণের উৎস আছে? এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মানুষই কি একমাত্র সৃষ্টির সেরা জীব? না-কি ভিনগ্রহে কোনো অপরিচিত আগন্তুক বা সভ্যতায় অগ্রগামী বুদ্ধিমান প্রাণী পরকদের (Aliens) অস্তিত্ব রয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে সৌরজগৎ (Solar system) ছেড়ে অপার মহাবিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হন্য হয়ে এখনো খুঁজে চলেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা । হয়তো নির্দিষ্ট করে আজো মেলেনি এর সঠিক উত্তর ৷ কিন্তু থেমে থাকেননি বিজ্ঞানীরা ৷ সৃষ্টিশীল প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে অদম্য স্পৃহা, উৎসাহ, উদ্দীপনা এবং নানা কৌতূহল নিয়ে তারা দুর্বার গতিতে এ মহাবিশ্বের নানা অজানা রহস্যকে ভেদ করে মহৎ-কল্যাণকর অসংখ্য সৃষ্টি বা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে শাশ্বত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ৷ আরো নতুন কিছু আবিষ্কার বা উদ্ঘাটন করতে এখনো তারা বদ্ধপরিকর ৷ কখনো তারা অসম্ভকেও হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে চায় ৷ এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে লুকিয়ে থাকা অসংখ্য অজানা রহস্যকে নিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা চিন্তা-ভাবনার পাশাপাশি বিরামহীনভাবে তারা গবেষণা কার্যক্রম ও পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছেন । কেউ কেউ সৌরজগৎ ছাড়িয়ে অসীম মহাকাশে নতুন নতুন গ্রহের সন্ধান করছেন । কেউ অনন্ত মহাবিশ্বে তন্ন তন্ন করে প্রাণের উৎস খুঁজে চলেছেন ৷ কেউবা পরকদের অস্তিত্ব কিংবা এদের বৈচিত্র্যময় জীবনের নানা দিক পর্যবেক্ষণ করছেন । আবার কেউ কেউ পৃথিবীবাসী মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নিরাপদ ও শান্তিময় বসতি স্থাপনের জন্য ভিনগ্রহে একটি বিকল্প আবাসস্থলের সন্ধান করছেন । যাই হোক আশার সংবাদ যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বিমানচালনা ও মহাকাশ প্রশাসন (NASA) কর্তৃক হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের Mauna Kea তে অবস্থিত National Astronomical Observatory of Japan (NAOJ) এর Subaru Telescope (IRD-SSP) এর মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একটি লাল বামন নক্ষত্রের বসবাসযোগ্য অঞ্চলে এক বিরল বহিসৌর গ্রহের চমকপ্রদ খোঁজ পেয়েছেন । যদিও জাপানের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ২০২২ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে সর্বপ্রথম এ গ্রহটিকে দেখেছিলেন । গত ০৪ই আগস্ট ২০২২ খ্রিস্টাব্দে NASA এ গ্রহটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেছে । অজানা রহস্যেঘেরা এ গ্রহটি মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং পদার্থবিদ Frank Elmore Ross এর নামে নামকরণ করা হয়েছে । এটি আমাদের প্রাণবান্ধব পৃথিবীর মতোই আরেকটি গ্রহ । হয়তো সেখানে এক অভাবনীয় উত্তর অপেক্ষা করছে মানব জাতির জন্য । এ বহিসৌর পাথুরে গ্রহটি পৃথিবী থেকে মাত্র ৩৬.৬ আলোকবর্ষ (১১.২১৮৩ parsecs) দূরে Serpen নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত । সারা পৃথিবীর মানুষের মধ্যে গ্রহটিকে ঘিরে নানা কৌতূহল সৃষ্টি করেছে এবং শুরু হয়েছে বিশদ জল্পনা-কল্পনা ৷ গ্রহটির বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে: Ross 508b । এটি বসবাসযোগ্য অঞ্চলের (Star habitat zone) মধ্যে মূল নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে এবং বাতাসে ভাসছে । এ ধরনের গ্রহকে বলা হয় বহিসৌর গ্রহ বা Exoplanet । গ্রহটি পৃথিবী থেকে বড় হওয়ায় এটিকে 'Super Earth' হিসেবেও অভিহিত করা হয় । মহাকাশ বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন যে, হয়তো সেখানে জীবনের সম্ভাবনা থাকতে পারে এবং মানব অপেক্ষা উন্নত জীবের দেখাও মিলতে পারে । এছাড়া ধারণা করা হচ্ছে যে, লাল বামন কেন্দ্রীয় বা মূল নক্ষত্রটির বসবাসযোগ্য অঞ্চলের (Habitable zone) অভ্যন্তরীণ প্রান্তের কাছে এ বহিসৌর গ্রহটি প্রদক্ষিণ করার ফলে এখানকার অনুকূল তাপমাত্রায় গ্রহটির পৃষ্ঠে জল ধরে রাখার সক্ষমতা রয়েছে । এ অঞ্চলটি Goldilocks zone নামেও পরিচিত । কারণ এ স্থানের গ্রহগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত গরম বা ঠাণ্ডা থাকে না । সেজন্য এ স্থানকে সৌরজগতের (বাইরেও) বসবাসযোগ্য অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয় । তবে এটিও মনে রাখতে হবে যে, কোনো গ্রহ তার কেন্দ্রীয় বা মূল নক্ষত্রের (Host star) বসবাসযোগ্য অঞ্চলে থাকা মানেই এ নয় যে, ঐ গ্রহটিও প্রাণের বসবাসযোগ্য হবে । কারণ, মঙ্গল গ্রহও কিন্তু নিজের মূল নক্ষত্র (Host star) সূর্যের বসবাসযোগ্য অঞ্চলে (Habitable zone) অবস্থান করছে । তবে সেখানে এখনো পর্যন্ত প্রাণের অস্তিত্বের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি । আমাদের এ সবুজ পৃথিবীও সূর্যের Habitable zone এর মধ্যে অবস্থিত । কিন্তু আমরা এ সুন্দর পৃথিবীতে প্রাণ খুলে বসবাস করছি ৷ উল্লেখ্য যে, কোনো গ্রহ নিজের মূল নক্ষত্র থেকে যে দূরত্বে থাকে সেখানে প্রাণ বেড়ে উঠার জন্য যে উপযুক্ত তাপমাত্রা বিরাজ করে বা আদর্শ পরিবেশগত অবস্থা বজায় থাকে তাকে Habitable zone বা বসবাসযোগ্য অঞ্চল বলে । যদি সেখানে কোনো জলের অস্তিত্ব থাকে তাহলে গ্রহটি পৃথিবীর সহযোগী বা সমকক্ষ হতে পারে । এতে করে সেখানে বসবাসের জন্য প্রবল সম্ভাবনা থাকে । তবে, এখনো পর্যন্ত ঐ লাল গ্রহে প্রাণের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি । Ross 508b গ্রহটি মাত্র ০৫ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরত্বে তার কেন্দ্রীয় বা মূল নক্ষত্র (Host star) বা একটি লাল বামন নক্ষত্রকে (Red dwarf star) কেন্দ্র করে ঘনিষ্ঠভাবে চারপাশে প্রদক্ষিণ করছে । ঠিক যেমন আমাদের পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে । গ্রহটির কক্ষপথ ছোট হওয়ার কারণে প্রায় ১০.৮ দিনে বছর পূর্ণ করে । যেখানে পৃথিবীতে ৩৬৫ দিনে এক বছর হয় । লাল বামন কেন্দ্রীয় বা মূল নক্ষত্রটিকে ০৩টি গ্রহ যথাক্রমে (ক) Proxima Centauri B, ১১.২ দিনে (খ) Proxima Centauri C, ১৯০০ দিনে (গ) Proxima Centauri D, ০৫ দিনে প্রদক্ষিণ করে থাকে ৷ দূরত্বের দিক দিয়ে Ross 508b গ্রহটি পৃথিবীর দ্বিতীয় নিকটবর্তী গ্রহ । পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রটি হচ্ছে Proxima Centauri B (Alpha Centauri Cb) । যেটি সূর্যের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র । সূর্য থেকে Proxima Centauri B এর দূরত্ব ৪.২৩ আলোকবর্ষ এবং ভর খুব কম ৷ Scottish জ্যোতির্বিদ Robert Thorburn Ayton Innes ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে Proxima Centauri B আবিষ্কার করেন । এটি Centaurus নক্ষত্রমণ্ডলে পৃথিবী থেকে আনুমানিক ৪.২ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত । Proxima Centauri B নক্ষত্র থেকে প্রচুর পরিমাণে রঞ্জন-রশ্মি (X-rays) এবং অতিবেগুনী রশ্মি (Ultraviolet rays) নির্গত হয় । তীব্র ক্ষতিকর এ রশ্মির কারণে এর অধীনস্থ গ্রহগুলো বিরান এবং নিষ্প্রাণ হয়ে যাবে অনিবার্যভাবে । সুতরাং তুলনামূলকভাবে নতুন আবিষ্কৃত Ross 508b গ্রহটি নিয়ে যথেষ্ট আশাবাদী । Ross 508b বহিসৌর গ্রহটি সূর্য থেকে প্রায় ৬০ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত (আনুমানিক ০.০৫৩৬৬ AU বা Astronomical Units) । এ গ্রহটির তাপমাত্রা ৩০৭১ কেলভিন (K) । এটি রুক্ষ, পাথুরে এবং পুরোপুরি গ্যাসীয় নয় । আকার এবং ভর আমাদের পৃথিবীর চেয়ে প্রায় চারগুণেরও বেশি । নাক্ষত্রিক ভর (Msun): ০.২ । গ্রহটির উচ্চ বিকেন্দ্রতা (অতিকেন্দ্রিকতা ০.৩৩) রয়েছে । নাক্ষত্রিক ব্যাসার্ধ (Rsun): ০.২ । পৃথিবীর ব্যাসার্ধের প্রায় ১.৮৩ গুণ । সৌরজগতের কেন্দ্রের খুব কাছের নক্ষত্রটি হচ্ছে সূর্য । ১৩ তম মাত্রায় উজ্জ্বল লাল বামন মূল নক্ষত্রটি সূর্যের তুলনায় অনেক ছোট । এ লাল বামন মূল নক্ষত্রটি Gliese 585, LTT 14584, LHS 396, LSPM J1523+1727 নামেও পরিচিত । নক্ষত্রটি খুব বেশি ক্ষমতাশালী নয় । এটি M4.5-type নক্ষত্র, যেটি সূর্যের চেয়ে লাল, ঠাণ্ডা এবং দানবীয় । এর উত্তাপ সূর্যের তুলনায় অনেক কম । সবচেয়ে অস্পষ্ট এবং ক্ষুদ্রতম নক্ষত্র হিসেবে এটি বিবেচিত হয় । কারণ এটি এতোই ম্লান যে, খালি চোখে দেখা প্রায় অসম্ভব । নক্ষত্রটির ভর সূর্যের ভরের প্রায় ০.১৮ গুণ এবং ব্যাসার্ধ ০.২১ গুণ । কিন্তু লাল বামন নক্ষত্রটি সূর্যের চেয়ে ছোট হওয়ার কারণে এর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রগুলোও সূর্যের মতো বিস্তৃত নয় । এ লাল বামন তারকা বা নক্ষত্র, যা আকাশগঙ্গা ছায়াপথের (Milky way galaxy) তিন-চতুর্থাংশ নক্ষত্র গঠন করে এবং এ ধরনের তারকা আমাদের সৌরজগৎ বা সৌর প্রতিবেশে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে । অন্যান্য তারকাদের তুলনায় লাল বামন নক্ষত্রগুলো শীতল এবং কম আলো নির্গত করে যাতে তাদের কম দৃশ্যমান হয় । লাল বামন নক্ষত্রকে দৃশ্যমান আলোর মধ্যে নজরদারি বা পর্যবেক্ষণ করা খুবই কঠিন, স্পর্শকাতর এবং জটিল । কেননা লাল বামন নক্ষত্রের নিম্ন পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ০৪ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকে । যাই হোক, উচ্চ-নির্ভুলতার সাথে রশ্মীয় বা দূরপ্রসারী বেগ (Radial velocity) পদ্ধতি ব্যবহার করে লাল বামন মূল নক্ষত্রটি আবিষ্কৃত হয়েছে । তবে বিস্ময়ের ব্যাপার যে, এ গ্রহটি তার চেয়ে ছোট একটি লাল বামন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে সে ঘুরছে বা প্রদক্ষিণ করছে । গবেষকদের মতে, Ross 508b গ্রহটির সম্ভবত একটি উপ-বৃত্তাকার কক্ষপথ রয়েছে । ফলে গ্রহটি তার লাল বামন মূল নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণের সময় মাঝে মধ্যে নক্ষত্রটির কাছাকাছি থাকে না এবং নিজের বসবাসযোগ্য অঞ্চলের কখনো ভিতরে ও অনেক নিম্নদিকে ঝোঁকে কখনো বাইরে চলে যায় । তার মানে, গ্রহটি নিজের লাল বামন কেন্দ্রীয় বা মূল নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে কক্ষপথে পরিভ্রমণের সময় প্রায়ই নিজের অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে । এ বহিসৌর গ্রহ এবং এর লাল বামন কেন্দ্রীয় নক্ষত্রের মধ্যে স্বল্প দূরত্ব নিয়ে প্রশ্ন জাগিয়েছে যে, এটি আদৌ বসবাসের যোগ্য কিনা? যদিও বিজ্ঞানীরা এটিকে নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন । সুতরাং এ গ্রহটিতে সত্যিই প্রাণ রয়েছে কি-না সেটিই এখন দেখার বিষয় । হয়তো James Webb Space Telescope আমাদেরকে এ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক গবেষণা করে আরো গুরুত্বপূর্ণ নতুন কোনো তথ্য দিতে পারবে ।
* তথ্যসূত্র: আন্তর্জাল (The Internet) ।

No comments:
Post a Comment