Wednesday, 23 December 2020

দুধকোশী নদী (Dhudh Koshi River / Milk-Koshi River)


এশিয়ার ছয় দেশ আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, চীন, নেপাল এবং ভূটানে বিস্তৃত হিমালয় পর্বতমালা (হিম+আলয় = বরফের ঘর) পর্বতমালা অবস্থিত, যা তিব্বতীয় মালভুমি থেকে ভারতীয় উপমহাদেশকে পৃথক করেছে । উঁচু এ পর্বতমালায় উল্লেখযোগ্য পর্বত শৃঙ্গ হচ্ছে: মাউন্ট এভারেস্ট, কে-টু (K2), কাঞ্চনজঙ্ঘা, লোৎসে, মাকালু, চো ওইয়ু, ধবলগিরি, মানাসলু, নাংগা, অন্নপূর্ণা, গাশারব্রুম-১, ব্রড পিক, গাশারব্রুম-২, শিশাপাংমা, নন্দা দেবী । এটি ক্রমাগত একে অন্যের প্রায় সমান্তরাল ধারায় উল্লম্বভাবে দূরত্ব স্থাপন করেছে । কোথাও দুটি ধারা একত্রিত হয়ে মিশে গিয়ে সৃষ্টি করেছে অসংখ্য উপত্যকা, অধিত্যকা এবং বালিয়াড়ি । পর্বত পাদদেশীয় ঘনজঙ্গল, জলাভূমি এবং সমভূমি থেকে সারিবদ্ধ অনুচ্চ পাহাড়ের ভিত ধরে উচ্চ থেকে আরও উচ্চে উঠে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে হিমালয় শ্রেণীর তুষার আবৃত শিখর । হিমালয়ের গগনস্পর্শী সুউচ্চ চূড়াগুলো বিস্তীর্ণভাবে জমাট হিমশীতল বরফে ঢাকা থাকে, যেখান থেকে নেমে আসে অসংখ্য ছোট-বড় হিমেল রসনা (Tongues of Ice) যেগুলো হিমবাহ (Glacier) নামে পরিচিত । তুষার আর কঠিন বরফে হিমায়িত এ পর্বতমালা থেকে আন্তর্জাতিক প্রধান নদী সিন্ধুগঙ্গা,  ব্রহ্মপুত্র, কালি, তিস্তা এবং শতদ্রু ইত্যাদি প্রধান নদী ও উপ-নদী উৎপন্ন হয়েছে । মেসোজোয়িক যুগে (The Mesozoic Era) ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় সঞ্চার (Drift), ক্রিটেসিয়াস-প্রাক-তৃতীয় যুগে (The Cretaceous-pre-Tertiary Era) সিন্ধু-সাংপো (Tsangpo) সন্ধিবলয় এবং সেনোজোয়িক যুগে (The Cenozoic Era) ভারতীয় ­প্লেট ও এশিয়ান প্লেট এর মধ্যে এক সংঘর্ষের কারণে সৃষ্ট সংকোচন ও বিকৃতি হিমালয় পর্বত সৃষ্টি করেছে । ট্রেকারদের (Trekker) স্বর্গ হচ্ছে হিমালয় পর্বত । সর্বাধিক জনপ্রিয় হিমালয়ের ট্রেক (Himalayan trek) হচ্ছে Everest Basecamp Trek, যেগুলো মাউন্ট এভারেস্ট এর বিপরীত দিক থেকে অবস্থিত । দক্ষিণ Base camp নেপালে, যা ৫,৩৬৪ মিটার (১৭,৫৯৮ ফুট) (২৮°০′২৬″ উত্তর ৮৬°৫১′৩৪″ পূর্ব) উচ্চতায় অবস্থিত এবং উত্তর Base camp তিব্বতে, যা ৫,৩৬৪ মিটার (১৭,৫৯৮ ফুট) (২৮°৮′২৯″ উত্তর ৮৬°৫১′৫″ পূর্ব) উচ্চতায় অবস্থিত । এ ঘাঁটিগুলো মাউন্ট এভারেস্টের উপর প্রাথমিক Resort camp, যা পর্বত আরোহণ এবং নামার সময় পর্বতারোহীরা ব্যবহার করে থাকেন ৷ সারা বিশ্বে ট্রেকাররা সংক্ষেপে একে Everest Base Camp (E B C) বলে থাকেন । অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এ পর্বতমালায় তথাপি চীন এবং নেপাল সীমান্তে অবস্থিত বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট (Mount Everest) / সগরমাথা / সাগরমাতা (সাগরের মাতা) / চোমোলংমা বা কোমোলংমা (মহাবিশ্বের মাতা) । এ শৃঙ্গটি হিমালয়ের মহালঙ্গুর হিমাল পর্বতমালায় অবস্থিত । আদিম কাল থেকেই মানুষ বিস্ময়কর অজানা রহস্যকে জানবার ইচ্ছায় দুঃসাহসিক অভিযাত্রায় অংশ নিয়ে কখনো সীমাহীন মহাকাশে, মহাসমুদ্রে, পর্বতশৃঙ্গে, দুর্গম মরুভূমিতে, জলপ্রপাতে, হিমবাহে, গভীর জঙ্গলে, পর্বতগুহায়, গিরিখাদে, তটভূমিতে এবং উপত্যকায় কঠিন প্রকৃতির সাথে তীব্র লড়াই করে নতুন নতুন আবিষ্কার ও নানাবিদ বিষয়াদি উদঘাটন করে চলেছেন ৷ শিক্ষা, চিন্তা-চেতনা, জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে আজও মানুষ দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে অসাধ্যকে সাধ্য করে এ গ্রহকে নিজ হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে বদ্ধপরিকর । 

দুর্গম পাহাড় ঘেরা গ্রাম । সমতল থেকে উচ্চতা প্রায় ১৪ হাজার ফুট এরও বেশি । সবুজ অরণ্যের মাঝে অপূর্ব সুন্দর সে গ্রাম । পাহাড়ের বুক চিড়ে দুর্বার গতিতে বয়ে চলেছে পাহাড়ি নদী দুধকোশী । এঁকেবেঁকে হারিয়ে গেছে পাহাড়ি জঙ্গলের মধ্য দিয়ে । জমাট বরফে ঢাকা পাহাড় চূড়ায় সূর্যের আলো পতিত হয়ে মেঘ ও কুয়াশার ফাঁকে অতি বেগুণি- নীলাভ আলোর বিচ্ছুরণ, প্রকৃতির এ এক বিস্ময়কর অনন্য সৌন্দর্য! পাহাড়ের ঢালে অথবা নানা বাঁকে বাঁকে টুপরি ঘর, কোথাও ছোটো ছোটো গ্রাম । যেখানে চা, গম, যব, জুম, আনারস, আলু, কলা, ভূট্টা ইত্যাদি চাষ হয় । দুধকোশী নদীর তীরবর্তী সবুজ এক অঞ্চল সলুখুম্বু উপত্যকা, এখানেই এক ছোট্ট গ্রাম সা-চু । নেপালি ভাষায় যার অর্থ হচ্ছে ‘গরম জলের উৎস’ । ঐতিহ্যবাহী এ গ্রামেই শেরপাদের বসবাস । শেরপারা নেপালি পর্যটন ইতিহাস এবং পর্বত আরোহী হিসেবে বিখ্যাত । এরা চাষাবাদের পাশাপাশি কেউ ব্যবসা করছে, আবার কেউ পর্বতারোহীদের মালামাল বহন করে থাকে । নামগিয়াল ওয়ান্দি ওরফে তেনজিং নোরগে নেপালের এক শেরপা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং একজন নেপালি শেরপা পর্বতারোহী ছিলেন । নেপালি ভাষায় তেনজিং অর্থ ধর্মবিশ্বাসী এবং নোরগে অর্থ ভাগ্যবান । তেনজিং নোরগের বাবা বলতেন, ”ঐ দিকে যাওয়া যায় না, চোমোলোংমা (Mount Everest) পাহাড়কে পাখিও অতিক্রম করতে পারে না” । কিন্তু সাহসী তেনজিং নোরগের মন এ কথা মানত না, সামনের উঁচু পাহাড়টা পেড়িয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন । অনেকেই এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন দেখেন, হয়তো এমন স্বপ্নই তাকে তাড়া করে বেড়াতো । তেনজিং নোরগে এভারেস্ট চূড়ায় পদার্পণের স্বপ্ন নিয়েই বড় হয়েছেন । এ পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পাহাড় এটি- তাই তার অদম্য ইচ্ছা একে জয় করবেনই । এরিক শিপটনের নেতৃত্বে ১৯৩৫ ব্রিটিশ এভারেস্ট পর্বত অভিযানতেনজিংয়ের জীবনে প্রথম পর্বতারোহণ অভিযানের (মালবাহক হিসেবে) সুবর্ণ সুযোগ আসে এবং পরবর্তীতে আরও কিছু অভিযানে অংশ নেন । ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২৯শে মে যৌথভাবে এভারেস্ট জয়ের স্বপ্নের অভিযানে অংশ নিয়ে নিউজিল্যান্ড অধিবাসী স্যার এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগে নেপালের দিক থেকে দক্ষিণ-পূর্ব শৈলশিরা ধরে সর্বপ্রথম পৃথিবীর সর্বোচ্চ গিরিশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টে আরোহণ করে এ শৃঙ্গ জয় করেন । 

আর এ সর্ব্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট চূড়ায় সৃষ্টি হয়েছে অপরূপ সৌন্দর্যের রাণী দুধকোশী নদী । মনোরম পরিবেশে এ নদীর উৎপত্তি হয়েছে খুম্বু হিমবাহ (Khumbu Glacier) থেকে । সমুদ্রতল থেকে পৃথিবীর সর্ব্বোচ্চ ২৯,০২৯ ফুট (৮৮৪৮ মিটার) উচ্চতায় বহমান এ নদীটি পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গ এভারেস্টের বিশাল পর্বতপ্রাচীর থেকে নির্গত হয় । সাদা ধবধবে দুধের মতো কুয়াশাচ্ছন্ন দুধকোশী নদী উদ্দাম বেগে বয়ে চলে । পর্বতশৃঙ্গের তুষার এবং হিমবাহ গলিত পানিই এর উৎস, যা নদীর জলপ্রবাহে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখে । পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দুর্দান্তভাবে বয়ে চলা এ নদীটি অসাধারণ সৌন্দর্য ধারণ করে আছে । সাধারণত পাহাড়ি নদীগুলো এক নৈসর্গিক আর ভয়ঙ্কর সৌন্দর্যের অধিকারী হয়ে থাকে । দুধকোশী নদীর শীতল বাঁকে প্রবাহিত স্বচ্ছ জল প্রশান্তি এনে দেয় । কোথাও টলমলে জল, আবার কোনো অংশ প্রচন্ড ঠান্ডায় বরফে জমাট বেঁধে থাকে দুধকোশী নদী । কখনও নদীর প্রাণচাঞ্চল্যতা, আবার কখনও স্থবির বা নিস্তেজতা, কখনও আকাশজুড়ে তুষারমৌলি কিংবা হিমালয়ের পাদদেশে বরফাবৃত সফেদ নৈঃশব্দময় প্রকৃতির অবিশ্বাস্য এ সৌন্দর্য সত্যিই রোমাঞ্চকর! এ নদীটি কোশী বা সপ্তকোশী নামে পরিচিত । পূর্ব নেপালে সাতটি নদী (সানকোশী নদী, ইন্দ্রাবতী নদী, ভোতেকোশী নদী, দুধকোশী নদী, অরুণ নদী, বরুণ নদী এবং তামুর নদী) মিলে এ নদী সৃষ্টি হয় । শুষ্ক ঋতুতে পাহাড় থেকে নির্গত হয়ে নদীটি ছত্র গিরিসঙ্কট এর মধ্যে দিয়ে দক্ষিণ দিকে বইতে থাকে । গোকিও লেকসমূহের পূর্ব থেকে শুরু হয়ে দক্ষিণে শেরপাদের পীঠস্থান বা রাজধানী বা এভারেস্টের প্রবেশ দ্বার নামচে বাজার অভিমুখে যায় এবং সাগরমাথা জাতীয় উদ্যান হয়ে পশ্চিমে লুকলা অতিক্রম করে । সুরক এর দক্ষিণ-পশ্চিমে লামডিং খোলা দুধকোশী নদীতে মিলিত হয়ে দক্ষিণে বয়ে চলে এবং হরকপুর গিয়ে সানকোশী নদীর সঙ্গে মিলিত হয় । এ নদীর চরম সাদা জল এবং প্রচণ্ড বিপজ্জনক খরস্রোত বৈশিষ্ট্যের কারণে সাধারণত জল ক্রীড়া (Water sports) ক্ষেত্রে এ নদী ব্যবহার হয় না । তবে কখনও কখনও অভিযাত্রীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ নদীতে Kayaking করে থাকেন । ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবার ব্রিটিশ অধিবাসী মাইক জোন্স Mike Jones (canoeist) (QGM- Queen’s Gallantry Medal) এর নেতৃত্বে একটি ব্রিটিশ অভিযান পরিচালিত হয় । একটি চলচ্চিত্র ‘দুধ কোসি- এভারেস্টের নিরলস নদী’ (Dudh Kosi – Relentless River of Everest) । এ অভিযানটি The Observer Colour Magazine অনুসরণ করে এবং HTV Cardiff এ প্রদর্শিত হয়েছিল । অভিযানটি রেকর্ড করে এবং এটি ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে ১২টি আন্তর্জাতিক পুরষ্কার জিতে নেয় ।  

* তথ্যসূত্র: অন্তর্জাল (The Internet)

ছবি: Razib Rahman 


No comments:

Post a Comment

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...