আজ থেকে প্রায় নয় হাজার বছর পূর্বে নব্যপ্রস্তর যুগে ধাদার, বেলুচিস্তান, পাকিস্তান অঞ্চলে সৃষ্টি হয় বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতা 'মেহেরগড় সভ্যতা' এবং এটি ৭০০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ৩২০০ খ্রিষ্টপূর্বে আবিস্কৃত হয় । মহাদীর্ঘকালের ধারাবাহিকতায় এবং বিভিন্ন পট- পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পরবর্তীকালে সিন্ধু সভ্যতার (বা হড়প্পা সভ্যতা) সূচনা, বিকাশ, বিস্তৃতি, ধ্বংস বা বিলুপ্তি ঘটে । আর্য সভ্যতা, ঋক্বৈদিক কিংবা পরবর্তী-বৈদিক সভ্যতার (Vedic Civilization) গোড়াপত্তনের সময়কালীন প্রাচীন ভারতে এক ঐতিহাসিক যুগের সূচনা হয় । শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় জীবন ও সাহিত্যে উৎকর্ষতার সুদৃঢ় ভিত সৃষ্টি করে এখানে এক অতি উন্নত মানের সভ্যতা এবং সংস্কৃতি গড়ে উঠে । যেখান থেকে পূর্ব- পুরুষদের অনুপ্রেরণা নিয়ে উত্তরাধিকার সূত্রে আজ অবধি আমরা আমাদের অস্তিত্ব, সে ইতিহাস এবং ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছি ।
রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী জেলা মুন্সীগঞ্জের অন্তর্গত 'বিক্রমপুর' । বাংলার একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল । ধারণা করা হয়, বৈদিক যুগ (ছয় হাজার বছরেরও বেশি পূর্বেকার বেদবর্ণিত সময়কাল) থেকে ভাওয়াল এবং সোনারগাঁও (সুবর্ণ গ্রাম) রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পূর্বে এটিই ছিল বাংলার প্রাচীনতম রাজধানী । উল্লেখ্য যে, ভাওয়াল জমিদার বংশের পূর্বপুরুষগণ মুন্সীগঞ্জের অন্তর্গত বজ্রযোগিনী গ্রামের বিখ্যাত পুশিলাল শোত্রীয় ব্রাহ্মণগোত্রের বাসিন্দা ছিলেন । বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর তীর থেকে ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকা পার হয়ে সুসং পাহাড় পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ভূ-ভাগের মধ্যে জয়ানশাহি গহীন অরণ্য অঞ্চলের উত্তরাংশকে মধুুপুর অরণ্য অঞ্চল এবং দক্ষিণাংশকে ভাওয়াল অরণ্য অঞ্চল বলা হয় । প্রাচীন ভাওয়াল পরগনা তথা বর্তমান বাংলাদেশের গাজীপুর জেলা যেটি সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে (২৭৩-২৩২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) মৌর্য সম্রাজ্যের অধিকারে ছিল । প্রাচীন কাল থেকেই বৌদ্ধ জ্ঞান চর্চা এবং পরবর্তীতে সাংস্কৃতিক প্রভাবের জন্য বিক্রমপুর বেশ সুপরিচিত । বিক্রমপুর ছিল প্রাচীন বঙ্গের (বঙ্গ জনপদের) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র । বিক্রমপুর নামের ‘বিক্রম’ অর্থ সাহস বা বীরত্ব এবং ‘পুর’ অর্থ নগর বা এলাকা । বিক্রমপুর নামটির উৎপত্তি বিক্রমাদিত্য থেকে । প্রাচীন ভারতীয় সাম্রাজ্য ছিল গুপ্ত সাম্রাজ্য (Gupta Empire)। মহারাজ চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য [যিনি গ্রিকদের নিকট সান্দ্রোকোত্তোস বা আন্দ্রাকোত্তাস নামে পরিচিত (৩৪০ খ্রিস্টপূর্ব- ২৯৮ খ্রিষ্টপূর্ব)] মৌর্য্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা । ভারতবর্ষের ইতিহাসে শ্রীগুপ্ত ছিলেন প্রথম সম্রাট যিনি ভারত উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ অংশকে এক শাসনের অধীনে নিয়ে এসে শাসনকার্য পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন । পরবর্তীকালে তারই বংশধরগণ ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্রাজ্য স্থাপন ও বিস্তার প্রসারিত করেন । জ্ঞান- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, আবিষ্কার, বাস্তুবিদ্যা, শিল্প, ন্যায়শাস্ত্র, সাহিত্য, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, ধর্ম ও দর্শন শাস্ত্রে উৎকর্ষতার ফলে গুপ্তযুগকে বলা হয় ভারতের স্বর্ণযুগ । বর্তমান হিন্দু সংস্কৃতি মূলত গুপ্তযুগেরই প্রতিনিধিত্ব করছে । মহারাজ চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের উত্তরসূরী দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বা চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্য (রাজত্বকাল: ৩৭৫ খ্রিষ্টাব্দ- ৪১৫ খ্রিষ্টাব্দ) একজন রাজা ছিলেন যা হিন্দু পুরানে বর্ণিত আছে । বিক্রমপুর ছিল রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজধানী । বিক্রমাদিত্য এর অর্থ হলো সূর্যের প্রতাপ । বিক্রমাদিত্য প্রাচীন উত্তর ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজা ও শক্তিশালী শাসক ছিলেন । হিন্দু পঞ্জিকা ‘বিক্রম সম্বৎ’ এর রচয়িতা তিনি । প্রাচীন ভারতবর্ষের সম্রাটদের কাছে 'বিক্রমাদিত্য' অত্যন্ত গর্ব, বীরত্ব, আভিজাত্য ও জনপ্রিয় উপাধি । শৌর্য- বীর্যের এ উপাধির ধারক ছিলেন প্রাচীন গুপ্ত, চালুক্য, চোল, একাধিক হিন্দু সাম্রাজ্যের সম্রাটগণ ও কাশ্মীরি রাজারা । মধ্যযুগ এবং তারও পরবর্তীকালীন সময়ে অনেক শাসকগণ এ উপাধি বা পদবি গ্রহণ করেছিলেন । চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্য 'বিক্রম' ও 'মহাকালদেব' নামে ভারতের প্রাচীন রাজাদের মধ্যে একজন আদর্শবান, সৎ, ন্যায়পরায়ণ, বুদ্ধিমান এবং সাহসী শাসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন । মহারাজ শ্রীগুপ্তের পৌত্র, মৌর্য সাম্রাজ্যের তৃতীয়, ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্রাট অশোক (৩০৪ খ্রিস্টপূর্ব- ২৩২ খ্রিস্টপূর্ব) দাক্ষিণাত্যের কিছু অংশ বাদ দিয়ে ভারতবর্ষের অধিকাংশ অঞ্চল শাসন করেন । সম্রাট অশোকের জন্ম হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৩০৪ সালে । ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য ছিল অশোকের । গৌতম বুদ্ধের অনুসারি হিসেবে তিনি তার সাম্রাজ্য জুড়ে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার করেছিলেন, যার মধ্যে তার সাম্রাজ্যের পূর্বে অবস্থিত এ বিক্রমপুরও ছিল । পরবর্তীকালে পাল, সেন, বর্মণ, চন্দ্র, দেব, বারোভুঁইয়া এবং মুঘল'রা বিক্রমপুরে এসে এ অঞ্চল শাসন করেন ।
প্রাচীন বঙ্গদেশের প্রথম সার্বভৌম বাঙালি নৃপতি (রাজত্বকাল: ৫৯০ থেকে ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ) ও শৈব ধর্মের উপাসক শ্রী মহাসামন্ত শশাঙ্ক (Shashanka) এর রাজ্য পতনের পর বাংলা অঞ্চলে নৈরাজ্য দেখা দিলে পাল রাজা গোপাল ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে গৌড়ের সম্রাট পদে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পাল শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন (রাজত্বকাল: ৭৫০ থেকে ৭৮১ কিংবা ৭৯৫ খ্রিস্টাব্দ) এবং পাল সাম্রাজ্য (Pala Empire) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেন । পাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা রাজা গোপালের পিতৃভূমি (জনকভূ) বরেন্দ্র (উত্তরবঙ্গ) অঞ্চলে । (প্রাচীন) প্রাকৃত ভাষায় 'পাল' শব্দের অর্থ ‘রক্ষাকর্তা’ । পাল সাম্রাজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিল বাংলা ও বিহার ভূখণ্ড এবং প্রধান শহরগুলো ছিল পাটলীপুত্র, বিক্রমপুর, রামাবতী (বরেন্দ্র), মুঙ্গের, তাম্রলিপ্ত এবং জগদ্দল । পাল সম্রাটরা প্রাজ্ঞ কূটনৈতিক, যুদ্ধজয়ী এবং বৌদ্ধধর্মের মহাযান ও তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের অনুগামী ছিলেন । তারা সাহিত্য, চিত্রকলা, ধ্রুপদি ভারতীয় দর্শন এবং ভাস্কর্যশিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন । তাদের শাসনামলে প্রোটো- বাংলা ভাষা, গাণিতিক, জ্যোতির্বিজ্ঞান, শিল্পকলা ও স্থাপত্য শিল্পের বিকাশ এবং বাংলা অঞ্চলে প্রথম ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ঘটে । বাংলা ভাষার ভিত রচনা ও বাংলায় প্রথম সাহিত্যকীর্তি 'চর্যাপদ' পাল শাসনামলেই রচিত হয়েছিল । রাজ্য প্রতিষ্ঠা, প্রভাব- প্রতিপত্তি, পাল বংশের গৌরব ধরে রাখা ইত্যাদির মাধ্যমে প্রায় চার শত বৎসর ছিল পাল রাজ বংশের রাজত্বকাল । পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম রাজবংশই এতটা সময় ধরে একচ্ছত্রাধিপত্যের মাধ্যমে রাজত্ব ধরে রাখতে পেরেছিল । রাজা গোপাল রাজ্য প্রতিষ্ঠার সূচনা করলেও পাল সাম্রাজ্যকে আরও সুসংহত করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন তার পুত্র ধর্মপাল । তবে, পঞ্চদশ পাল সম্রাট রামপাল ছিলেন অতি শক্তিশালী পাল সম্রাট । ১১৬১ খ্রিস্টাব্দে সর্বশেষ পাল রাজা মদনপালের রাজত্বকালের সময়ে দীর্ঘকাল যাবৎ পালদের তিলে তিলে গড়ে তোলা সাম্রাজ্যর চূড়ান্ত পতন ঘটে । সে সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বশেষ প্রধান বৌদ্ধ সাম্রাজ্যের অবসান হয় । বাংলার ইতিহাসে পাল যুগকে অন্যতম 'সুবর্ণযুগ' মনে করা হয় । বাংলার ইতিহাসে সৃষ্ট রাজনৈতিক পালা বদলে শক্তিশালী রাজবংশ হিসেবে পাল রাজবংশের পরই উল্লেখ করা যায় সেন রাজবংশের কথা । প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে একাদশ শতাব্দীর অন্তিম লগ্নে পাল সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে হিন্দু সেন রাজবংশের (Sena dynasty) উত্থান এবং সেন রাজবংশ পরাক্রমশালীভাবে বাংলা শাসন করতে শুরু করে । বাংলায় সেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা সামন্ত সেন এবং তার আদি নিবাস বর্ধমান অঞ্চলে । বসতি স্থাপন করেন রাঢ় অঞ্চলে গঙ্গা নদীর তীরে । সেন বংশের রাজারা সমগ্র বাংলার উপর তাদের নিরঙ্কুশ শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন । ভারতবর্ষে বাংলার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে সেন বংশীয় রাজাদের মধ্যে বিজয় সেন, বল্লাল সেন এবং লক্ষ্মণ সেন বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন । সেন রাজারা প্রায় একশ বছরেরও অধিক সময়কাল ধরে (রাজত্বকাল: ১০৯৭- ১২২৫ খ্রিঃ) বাংলা অঞ্চলকে শাসন করেন । সেনদের আদিনিবাস ছিল দাক্ষিণাত্যের কর্ণাট অঞ্চলে (বর্তমান ভারতের মহীশূর, কর্ণাটক এবং অন্ধ্র প্রদেশের কানাড়ী ভাষাভাষি অঞ্চল) । চন্দ্রবংশীয় বীরসেন এবং অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ কর্ণাট অঞ্চলে শাসন করতেন । চন্দ্র বংশোদ্ভূত সামন্ত সেনের বংশধরগণই বাংলা শাসন করেন । সেন বংশের লোকেরা কর্ণাট থেকে বাংলায় আসেন এবং পাল বংশীয় রাজাদের অধীনে উচ্চ রাজকার্যে নিয়োজিত হন । কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস! পাল বংশ দুর্বল হয়ে পড়লে সেন'রা বাংলার শাসন ক্ষমতা করায়ত্ত করেন । দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বিজয়সেন (রাজত্বকাল: ১০৯৫- ১১৫৮ খ্রিস্টাব্দ) পাল ও বর্মনদের পরাভূত করে সমগ্র বাংলায় নিজ বংশের শাসন প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন । সেন রাজারা ছিলেন গোঁড়া হিন্দু এবং চন্দ্রবংশীয় ‘ব্রহ্মক্ষত্রিয়’ । তারা ব্রাহ্মণ্য আচার, রাজ্যশাসন, শাস্ত্র বিদ্যা ও অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন । বিক্রমপুরের রামপাল নগরে ১০৬০ খ্রিস্টাব্দে বিজয় সেনের ঘরে জন্ম নেয় বল্লাল সেন । বিজয়সেন গৌড়াধিপতি চন্দ্রসেনের কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন । শৈব বরে বল্লাল সেনের জন্ম হওয়ায় বিজয়সেন পুত্রের নাম রাখেন 'বরলাল', পরবর্তীতে 'বল্লাল' শব্দটি তারই অপভ্রংশ হয়ে দাঁড়ায় । বিজয় সেনের পুত্র এবং উত্তরসূরি বল্লাল সেন চৌদ্দ বছর বয়সেই অস্ত্রবিদ্যায় ও শাস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠেন । তিনি দক্ষিণ ভারতের পশ্চিম চালুক্য সাম্রাজ্যের চালুক্যরাজ ২য় জগদেবমল্লের কন্যা রামদেবীকে বিয়ে করেন । বল্লাল সেন ছিলেন বঙ্গের সেন রাজবংশের দ্বিতীয় রাজা । ১১৬০ থেকে ১১৭৯ খ্রিঃ পর্যন্ত তিনি সেন বংশের রাজত্ব করেন । রামপালে (ঢাকায় বিক্রমপুর) তিনি তার নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । রামপালে একটি দীঘি আছে, যা বল্লাল সেনের নির্দেশে খনন করা হয় । বর্তমানে দীঘিটির অস্তিত্ব বিলীনপ্রায়, গ্রীস্মকালে পানি শুকিয়ে দীঘির কিছু অংশ ছাড়া প্রায় সবটাই ফসলের চাষ হয়ে থাকে । তবে বর্ষার পানিতে সে দীঘি কিছুটা প্রাণ ফিরে পায় । ঢাকায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্দির ঢাকেশ্বরী মন্দির তার আদেশে নির্মাণ করা হয় । বিক্রমপুর কৃষ্ণনগরের মায়াপুরে বল্লাল ঢিবি নামে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অস্তিত্ব ছিল ব্রিটিশ শাসনামলেও । পিতার মতো তিনিও শিবের উপাসক ছিলেন । শাসক হিসেবে অন্যান্য রাজকীয় উপাধির সঙ্গে তিনি 'অরিরাজ নিঃশঙ্ক শঙ্কর' ও 'গৌড়েশ্বর' উপাধি গ্রহণ করেছিলেন । সেন রাজাদের শাসন শেষ হলে বাংলায় তুর্কি শাসন শুরু হয় । একপর্যায় বর্মণদের রাজত্বকাল । বর্মণ বংশ দক্ষিণ- পূর্ব বাংলা শাসনকারী রাজবংশ । কামরূপ রাজ্যের প্রথম রাজা পুষ্যবর্মণ ঐতিহাসিক বর্মণ রাজবংশের (Varman dynasty) প্রতিষ্ঠাতা (৩৫০- ৩৭৪ খ্রিস্টাব্দ) । এ রাজবংশের শাসকরা গুপ্ত সাম্রাজ্যের সামন্ত ছিলেন । বর্মণ রাজারা ছিলেন বৈষ্ণব, কিন্তু তারা বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেন । ০৭ শতকের মধ্যভাগে শালস্তম্ভ নামক এক আদিবাসী নেতা বর্মণ রাজবংশের রাজা অবন্তীবর্মণকে (৬৫০- ৬৫৫ খ্রিস্টাব্দ) সিংহাসনচ্যুত করে ম্লেচ্ছদের অধিকার (মুসলমানদের ম্লেচ্ছ বলা হতো, যে মুসলমানদের অস্পৃশ্য- অভিশপ্ত- পাপী বলতো হিন্দুরা) প্রতিষ্ঠিত হয় । কিছুকাল অতিবাহিত হওয়ার পর পুনরায় বাংলার শাসন ক্ষমতায় রদ-বদল । পাল রাজশক্তি দুর্বল হয়ে পড়লে একাদশ শতাব্দীর শেষ এবং দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বর্মণরাজগণ বাংলার শাসনভার গ্রহণ করেন । বর্মদের রাজধানী ছিল বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুর । বর্ম্ম রাজন্যে এবং তাম্র শাসনে (একমাত্র প্রাথমিক সূত্র হিসেবে তামার পাতে প্রাচীনতম লিখিত দলিল বা তাম্রপত্র) বিক্রমপুর রাজধানীর কথা উল্লেখ আছে । শ্রীচন্দ্রের তাম্র শাসন থেকে রাজধানী হিসেবে যে বিক্রমপুর পাওয়া যায় সে বিক্রমপুর নামটি আজও পর্যন্ত চলমান রয়েছে । দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার সবচেয়ে শক্তিশালী স্বাধীন রাজবংশ ছিল চন্দ্র বংশ (Lunar dynasty) । চন্দ্রবংশের প্রথম নৃপতি পূর্ণচন্দ্র ও তার পুত্র সুবর্ণচন্দ্র রোহিতগিরির ভূ- স্বামী ছিলেন । সুবর্ণচন্দ্রের পুত্র ত্রৈলোক্যচন্দ্র হরিকেল, চন্দ্রদ্বীপ (বরিশাল ও পার্শ্ববর্তী এলাকা), বঙ্গ এবং সমতট (সমগ্র পূর্ব ও দক্ষিণ- পূর্ব বাংলায়) নিজ বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন (৯০০- ৯৩০ খ্রিঃ) । লালমাই পাহাড় ছিল চন্দ্র বংশীয় রাজাদের মূল কেন্দ্র এবং প্রাচীনকালে এ পাহাড় 'রোহিতগিরি' নামে পরিচিত ছিল । ত্রৈলোক্যচন্দ্রের পুত্র শ্রীচন্দ্র চন্দ্র রাজবংশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজা ও সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক (চন্দ্র শাসনের দ্বিতীয় শাসক, ৯৩০- ৯৭৫ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন এবং ‘পরমেশ্বর পরম ভট্টারক মহারাজাধিরাজ’ উপাধি ধারণ করেছিলেন । তার রাজ্য দক্ষিণ- পূর্ব বাংলা ছাড়াও উত্তর- পূর্ব কামরূপ ও উত্তরে গৌড় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল । বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে তিনি তার রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন । শ্রীচন্দ্রের পুত্র কল্যাণচন্দ্র (৯৭৫- ১০০০ খ্রিঃ) এবং পৌত্র লডহ চন্দ্র (১০০০- ১০২০ খ্রিঃ) চন্দ্র বংশের মান- মর্যাদা, গৌরব বংশানুক্রমে অক্ষুণ্ণ রাখেন । লডহ চন্দ্রের পুত্র গোবিন্দচন্দ্র ছিলেন সর্বশেষ চন্দ্র রাজা । দশম শতাব্দীর শুরু থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত প্রায় দেড়শত বৎসর এ বংশের রাজারা শাসন করেন । খড়গ বংশের শাসনের পর এ অঞ্চলে দেব বংশের (Deva dynasty ) উত্থান ঘটে । খ্রিস্টীয় ৮ম- ৯ম শতাব্দীতে সমতট অঞ্চলে রাজত্বকারী হিন্দু 'দেব রাজবংশ' এর রাজধানী ছিল দেবপর্বত এবং মধ্যযুগে (খ্রিস্টীয় ১২শ- ১৩শ শতাব্দীতে) বঙ্গে হিন্দু 'দেব রাজবংশ' (হিন্দু- বৈষ্ণব দেব রাজবংশ) এর রাজধানী ছিল বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুর । সেন, বর্মণ, চন্দ্র রাজাদের (খ্রিস্টীয় ১০০০- ১৩০০ প্রথম পর্যন্ত) এবং বারোভুঁইয়াদের অন্যতম কেদার রায় ও তার ভাই চাঁদ রায়ের রাজধানী ছিল তৎকালীন ঢাকার শ্রীপুর বা বিক্রমপুর । মুঘল বা মোগল আমলে বিক্রমপুর সোনার গাঁয়ের অন্তর্গত একটি পরগনা ছিল (ব্রিটিশ East India Company এর পঞ্চম রিপোর্টে বিক্রমপুর পরগনার বিষয় উল্লেখ আছে) । মুঘল সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট, ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক, জালালুদ্দিন মুহাম্মদ আকবর (মহামতি আকবর) এর সময়ে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বারো জন শাসনকারী জমিদার বা ভূস্বামী ও শাসক ছিলেন তাদেরকে 'বারো ভূঁইয়া' বলে (কিংবা অনুমিত হয় যে, অতি প্রাচীনকালে বাংলায় বারো জন শক্তিশালী সামন্তরাজা হয়তো ছিলেন যে কারণে ‘বারোভুঁইয়া’ শব্দটি জনশ্রুতিতে পরিণত হয়) । ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট আকবর বাংলা দখল করার পর এ সকল জমিদার ঐক্যবদ্ধ হয়ে মোগল সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন । এদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ভূঁইয়া কেদার রায় শক্তিশালী বীর ও চরিত্রবান । তিনি ছিলেন বিক্রমপুরের জমিদার । শাসন ও বীরত্বে তার খ্যাতি ছিল । কেদার রায় ও তার ভাই চাঁদ রায় এর রাজধানী ছিল তৎকালীন ঢাকার শ্রীপুর বা বিক্রমপুর । বর্তমানে দক্ষিণ বিক্রমপুর তথা শরীয়তপুর জেলা (যা ছিল কালীগঙ্গা নদীর তীরবর্তী অঞ্চল যেটি মুন্সিগঞ্জ টঙ্গিবাড়ী উপজেলার দীঘিরপাড় ইউনিয়নের দক্ষিণে নদীতে বিলীন) । পদ্মার দুইপারের বিস্তীর্ণ জনপদ এ ভ্রাতৃদ্বয় শাসন করতেন । বিক্রমপুর, ইদ্রাকপুর, ইদিলপুর, কেদারপুর, চাঁদপুরের বৃহৎ অংশ জুড়ে ছিল তাদের রাজত্ব । কালের পরিক্রমায় বিক্রমপুরের অনেক পরিবর্তন ঘটে । ঢাকায় মুঘল শাসন দৃঢ় হলে মুন্সীগঞ্জে ফৌজদারী আদালত সৃষ্টি হয় । মুঘলদের সময়ে এ স্থানে মুন্সী হায়াদার হোসেন নামে একজন ফৌজদার থাকতেন, তারই নামানুসারে মুন্সীগঞ্জ নামকরণ হয় । বৌদ্ধ, হিন্দু, পাঠান আর মুঘল শাসনামলের সমাপ্তি টেনে বিক্রমপুর অবশেষে ব্রিটিশ দুঃশাসনের কবলে চলে যায় । ১৮৪৫ খ্রিষ্টাব্দে বিক্রমপুর 'মুন্সীগঞ্জ মহকুমায়' স্থাপিত হয় । তখন জন ফ্রেঞ্চ (John French) নামের একজন ইংরেজ ব্যক্তি মহকুমার সর্বপ্রথম বিচারক নিযুক্ত হন । হিন্দু ও মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় দর্শন, সামাজিক আচার আচরণ, মূল্যবোধ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সভ্যতার মতাদর্শ ও ধ্যানধারণার ভিন্নতার কারণে ভারতীয় মুসলমান এবং হিন্দু দুটি স্বতন্ত্র জাতীয়তার উপর নির্ভর করে (দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে বা ধর্মীয় ভিত্তিতে) ভারতীয় উপমহাদেশ তথাপি ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্যকে দুটি স্বাধীন অধিরাজ্য ভারত ও পাকিস্তানে (ভারত বিভাজন বা দেশভাগ) বিভক্ত করা হয় ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে প্রায় দুইশত বছরের ইতি টেনে । এর ফলে ভারতে ব্রিটিশ রাজ বা Crown শাসনের অবসান ঘটে । দু'টি স্ব-শাসিত দেশ পাকিস্তান এবং ভারত আইনত ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই ও ১৫ই আগস্ট অস্তিত্ব লাভ করে । ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানাধীন 'মুন্সীগঞ্জ' মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত হয় এবং মুন্সীগঞ্জের প্রথম মহকুমা প্রশাসক ছিলেন গঙ্গাচরণ চট্টোপাধ্যায় । পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ২৪ বছরের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগণ বাংলা ভাষার অধিকার হরণ, আঞ্চলিক বৈষম্য ও শোষণের কারণে পূর্ব বাংলার জনগণ মহান স্বাধীনতার জন্যে বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র লড়াই করে দুই লক্ষ ষাট হাজার মা- বোনের সম্ভ্রমহানি আর ত্রিশ লক্ষ শহীদের মহা আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বর মহান বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সৃষ্টি করেন । বর্তমানে মুন্সীগঞ্জের ছয়টি উপজেলা । ঢাকা জেলার অধিকাংশ, ফরিদপুর জেলার কিছু অংশ বিক্রমপুরের অংশ ছিল । পূর্বে বিক্রমপুরের আয়তন ছিল প্রায় ৯০০ বর্গমাইল । ঐতিহাসিক বিক্রমপুরের পশ্চিমে পদ্মানদী, উত্তর ও পূর্বে ধলেশ্বরী নদী, দক্ষিণে আড়িয়াল খাঁ ও মেঘনা নদীর সংযোগস্থল এবং এর মধ্যখানে প্রবাহিত কালিগঙ্গা নদী বিক্রমপুরকে উত্তর- দক্ষিণে দু'ভাগ করেছে । মুন্সীগঞ্জ তথাপি বিক্রমপুর এক অতি প্রাচীনতম জনপদ । নবদ্বীপ, গৌড়, সোনার গাঁ, সপ্তগ্রাম, ঢাকা প্রভৃতি স্থানসমূহ পরিচিত ও খ্যাতি লাভ করার অনেক আগে থেকেই বিক্রমপুর শিক্ষা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, ধর্ম, শিল্প, বাণিজ্য, সংস্কৃতি, সভ্যতা, ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এক ঐতিহাসিক প্রত্নতত্ত্ব নগরী । এক সুদীর্ঘ ইতিহাসের কারণে এর রয়েছে ব্যাপক পরিচিতি ও সুনাম । মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান প্রভৃতি স্থানসমূহ বিক্রমপুরের অনেক পরে খ্যাতি অর্জন করে । প্রাচীনকাল থেকেই কালের পরিক্রমায় বিভিন্ন শাসকগণ শাসন করেছেন এ জনপদ বা অঞ্চলকে । যার পিছনে রয়েছে হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ আর হৃদয় বিদারক এক মর্মান্তিক রক্তপাতের ইতিহাস! নানা ধর্মের মানুষের বসতি এবং অনেক কীর্তিমান ও সু-মহান গুণীজনের নাড়ির শিকড় এ মুন্সীগঞ্জে । বৌদ্ধ বাঙালি পন্ডিত ও বৌদ্ধধর্মপ্রচারক মহাতান্ত্রিক জ্ঞানতাপস শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর, উদ্ভিদের প্রাণ আছে ও রেডিওর আবিষ্কারক জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, প্রগতিশীল লেখক ও শিল্পীদের সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী'র প্রতিষ্ঠাতা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি বিপ্লবী-সাহিত্যিক ও শ্রমিক সংগঠক সত্যেন সেন, বাঙালি আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিযুগের শহীদ বিপ্লবী সন্তোষচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়, প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি ঔপন্যাসিক সমরেশ বসু, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সক্রিয় যোদ্ধা-বিশিষ্ট বাগ্মী-Indo Anglian যশস্বী কবি-The Nightingale of India সরোজিনী নাইড়ু, ইংলিশ চ্যানেল সাঁতরিয়ে অতিক্রমের গৌরবের অধিকারী দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম সাঁতারু ব্রজেন দাস, ব্রিটিশ বিরোধী বাঙালি বিপ্লবী বিনয় কৃষ্ণ বসু, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধান্ত শংকর রায়, ভারতীয় বাঙালি ঔপন্যাসিক-ছোটোগল্পকার ও প্রাবন্ধিক প্রতিভা বসু, মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার গণকপাড়া গ্রামের শীলভদ্র সহ আরও অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব এ মাটিতে জন্ম নিয়েছেন । যারা শিক্ষা- জ্ঞান- গুণ- মেধা- শ্রমে সমস্ত পৃথিবীর মানুষের কল্যাণকর কাজের মধ্য দিয়ে মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়েছেন । মুন্সীগঞ্জের অনেক প্রাচীন অমূল্য সম্পদ ও অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহাসিক নিদর্শনসমূহ বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘর এবং বরেন্দ্র জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে । যা আমাদের জাতীয় সম্পদ, বাংলাদেশ তথাপি সারাবিশ্বের মানুষ এ নিয়ে গর্ব করতে পারে । এছাড়া, টঙ্গিবাড়ী উপজেলার চুরাইন থেকে প্রাপ্ত একটি রূপা'র বিষ্ণুমূর্তি বর্তমানে ভারতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে । প্রাচীন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ শাসকগণ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি শাসনকার্য, রাজ্যবিস্তার, শিল্প-সাহিত্য ও হিন্দু ধর্মসহ বিভিন্ন ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন । মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে তৎকালীন শাসকদের স্মৃতিচিহ্ন এবং অনেক ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থাপনা বা নিদর্শন আজও বহন করে চলছে সে মহাকালের ইতিহাসকে । যদিও ক্রমাগত নদী ভাঙ্গনের ফলে প্রাচীন বিক্রমপুর শহর এবং এর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ প্রায় পুরোটাই কালের আবর্তে বিলীন হয়ে গেছে! এ অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংস সাধন করার পাশাপাশি অমূল্য এবং মহৎ পুরাকীর্তিগুলিকে গ্রাস করে কীর্তিনাশা পদ্মা নদী । ঐতিহাসিক প্রাচীন নিদর্শনসমূহ, লোককাহিনী এবং প্রাচীন বিক্রমপুরের অতীতের গৌরবের কথা আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় । বর্তমান মুন্সীগঞ্জের সদর উপজেলাধীন রামপালের বল্লাল বাড়িতে তৎকালীন সেন রাজবংশের রাজপ্রাসাদ অনুসন্ধান করার জন্য বাংলাদেশ ও চীনের প্রত্নতাত্ত্বিকদের যৌথ উদ্যোগে গত সোমবার ২১/০১/২০১৯ খ্রিস্টাব্দে খনন কাজ শুরু হয় । তবে কালের বিবর্তনে এটি ইতিহাসে অংশ নিলেও রাজা বল্লাল সেনের প্রাসাদ বা দুর্গ হাড়িয়ে গিয়েছিল বহুকাল আগেই । এখন এ প্রত্ন খননে সেখান থেকে বেরিয়ে আসছে হাজার বছরের পুরনো ঐতিহাসিক রাজা বল্লাল সেনের দুর্গের প্রাচীর বা দেওয়ালসহ প্রাচীন ইট, ইটের টুকরো, মৃৎ পাথরের টুকরো ও কাঠকয়লা ইত্যাদি । ধারণা করা হচ্ছে, মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার রামপালের বল্লাল বাড়িখ্যাত এ এলাকাটিই ছিল সেন বংশের রাজা বল্লাল সেনের রাজপ্রাসাদ । রামপালের বল্লাল বাড়ি এলাকার স্থানীয় নুরুল ইসলাম শেখের কাঠবাগানে চলছে এ খনন কাজ ।
সত্যিই মহাবিস্ময়কর ঘটনা! এক নতুন দিগন্তের সূচনা হবে, অনেক অজানা রহস্য উন্মোচিত হবে । আরেক নতুন ইতিহাসের সম্মুখীন হবো আমরা । প্রাগৈতিহাসিক অনেক অজানা প্রশ্ন হাতছানি দিবে আমাদের । অনুপ্রাণিত হবে পরবর্তী প্রজন্ম । উল্লেখ্য, বাংলাদেশের ঐতিহ্য অন্বেষণের নির্বাহী পরিচালক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান ও চীনের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. চাই হুয়ান বো এর নেতৃত্বে এবং অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে পরীক্ষামূলকভাবে বড় একটি অনুসন্ধানী দল এ খনন কাজে অংশ নিয়েছেন ।
সত্যিই আমি আশ্চর্য, আনন্দিত এবং কালের প্রত্যক্ষ সাক্ষী পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নের একজন অধিবাসী হিসেবে । তবে উদ্বিগ্ন যে, এ অমূল্য সম্পদের পরিবেশগত দিক, তত্ত্বাবধান ও যথোপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারবে কি না? এ কর্মসূচীকে সফল করতে সরকারের পাশাপাশি সকলের সর্বাত্মক সাহায্য- সহযোগীতা একান্ত প্রয়োজন । এর যাবতীয় তথ্য, উৎস, উপাত্ত, নথিপত্র এবং পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস বিজ্ঞানসম্মত সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যাতে বিলুপ্ত বা ধ্বংসপ্রাপ্ত না হয় । আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য এগুলি অবশ্যই রক্ষা করতে হবে । এর গবেষণা, জরিপ, অনুসন্ধান, পরিবেশগত তথ্যের মনোস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, প্রত্নস্থান চিহ্নিতকরণ, উৎখনন, সংগ্রহ, নথিভুক্তকরণ, বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যালোচনা করে তা জনসাধারণ্যে উপস্থাপন ও বিকাশ করতে হবে । আমি এ কর্মসূচীর সাফল্য কামনা করছি ।

No comments:
Post a Comment