জবা একটি চিরহরিৎ অসাধারণ সুন্দর, আকর্ষণীয়, গন্ধহীন ফুল । একে জবা, জপা, জবাপুষ্পম, ঝুমকো জবা, জবা কুসুমও বলে । বৈজ্ঞানিক নাম: Hibiscus rosa-sinensis L. । জবা ফুল Rosids বর্গের Malvaceae পরিবারের অন্তর্ভূক্ত । শ্রেণী: Magnoliopsida, ক্রম: Malvales । এটি একটি গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ । ধারণা করা হয় এর আদি নিবাস চীন । এটি দ্রুততম হারে বৃদ্ধি ঘটে । প্রায় সারা বছর পাতা হয়ে থাকে । এর চকচকে সবুজ পাতাগুলি সরল, বিকল্প, সর্পিল, একান্তর, বোঁটাযুক্ত এবং ডিম্বাকার । পাতার কিনারা করাতের মতো খাঁজ কাটা থাকে এবং অগ্রভাগ সরু ও পিচ্ছিল পদার্থ যুক্ত । জবা ফুল দেখতে ঠোঙ্গা আকৃতি, পঞ্চমুখি এবং থোকা’র মতো । Hermaphrodite (পুরুষ এবং মহিলা উভয় অঙ্গের) প্রজাতির পোকা-মাকড়ের মাধ্যমে এর পরাগায়ণ হয় । প্রধানতঃ গ্রীষ্ম ও বসন্তে এ ফুল ফোটে । Genetically জবা গাছ হচ্ছে একটি Polyploid । এর পুষ্প একক, বৃহৎ ফানেলের মতো এবং এটি উভলিঙ্গ । বৃতি'র নিচে উপবৃতি বিদ্যমান । সবুজ বৃত্যংশ পাঁচটি মুক্তভাবে থাকে । দলমন্ডল পাঁচটি পাপড়ি বিশিষ্ট এবং বহু পুংকেশর অবস্থিত । পুংদন্ড মিলিতভাবে একটি নলের সৃষ্টি করে । পরাগধানী মুক্ত এবং বৃক্কাকার । স্ত্রী কেশর পাঁচটি এবং গর্ভদন্ডটি পুং নলের ভিতরে অবস্থিত । সাধারণত এর ফল হয় না । কমলা, বেগুনী, গোলাপী, লাল, সালমন, সাদা, হলুদ, হালকা গোলাপী রঙের জবা ফুল দেখা যায় । টকটকে লাল পাপড়ি বিশিষ্ট জবাকেই রক্ত জবা বা ‘পঞ্চমুখী’ জবা বলে । এছাড়া পাকা মরিচের মতো গাছ থেকে নিম্নমুখী হয়ে ঝুলে থাকা জবাকে ‘লঙ্কাজবা’ বলে । Hibiscus rosa-sinensis প্রজাতি উদ্ভিদের আরেকটি সাধারণ নাম হচ্ছে চীনা গোলাপ । Hibiscus rosa-sinensis মালয়েশিয়ার জাতীয় ফুল । প্রতিটি পাপড়ি (০৫টি) মালয়েশিয়া সরকার দ্বারা নির্ধারিত অন্যতম জাতীয় মূলনীতি হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করে যেমন; (ক) ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস (খ) রাজা ও দেশের প্রতি আনুগত্য (গ) সম্প্রীতির সর্বজনীনতা (ঘ) আইনের শাসন (ঙ) সৌজন্য এবং (চ) নৈতিকতা । লাল রং মালয়েশিয়ানদের সাহসকে প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করে । বিভিন্ন প্রজাতির জবা গাছ আছে Chinese Hibiscus, Vermilion Hibiscus, Shoeblackplant, Hawaiian Hibiscus, Tropical Hibiscus, China Rose, Rose-of-China ইত্যাদি । এ গাছটি হালকা বালুকাময়, মাঝারি (loamy), ভারী কাদামাটি, ভালো আপীত (drained humus ) এবং সমৃদ্ধ উর্বর মাটিতে বেশ ভালো হয় । পাশাপাশি আর্দ্র বা বৃষ্টিময়, উপযুক্ত অম্লীয়, নিরপেক্ষ এবং মৌলিক (ক্ষারীয়) মাটি এর জন্য যথেষ্ট উপযোগী । সম্পূর্ণ সূর্যের আলো বা আংশিক ছায়ায় এটি দ্রুত বৃদ্ধি পায় । তবে অবহেলিত অবস্হায় বা পূর্ণ ছায়াময় স্থানে এর জন্ম নেয়া কষ্টসাধ্য । বিশ্বব্যাপী এ গাছটি শোভাময় বা শোভাবর্ধন (Ornamental tree) গাছ হিসেবে পরিচিত । এটি পর্যাপ্ত পরিমাণ গুণাগুণ সমৃদ্ধ ঔষধি উদ্ভিদ । ফুল, পাতা, মূল, ছাল ব্যবহৃত হয় । খুব সতেজ তরুণ পাতা কখনো কখনো শাকের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয় । পুষ্টি বিশ্লেষণে পাওয়া যায় যে এর ফুল কাঁচা বা রান্না করে (জারিত করার মাধ্যমে / Pickle) বিশেষ উপাদান তৈরি করা যেতে পারে । সংরক্ষণকৃত ফুল এবং এর রান্না করা সবজিকে যেমন খাবারের রঙ তৈরিতে বেগুনি রং হিসেবে ব্যবহৃত হয় । এটি ভোজ্য কিন্তু খুব অংশুময় (Fibrousy), গঁদ বা নির্যাস (Mucilaginous) স্বাদহীন হয় । জবা থেকে চা উৎপাদন করা হয় । ভবিষ্যতের জন্য এ উদ্ভিদের ব্যবহার থেকে কোনো প্রকার প্রতিকূল প্রভাব পরে না । তবে, ঔষধগতভাবে এ উদ্ভিদ ব্যবহার করার আগে সর্বদা একজন পেশাদার চিকিৎসক থেকে পরামর্শ নেয়া উচিৎ । চীনে এটি খুবই মিষ্টি (Sweet) জাতীয় হিসেবে গন্য করা হয়। সংকোচক বা ধারক (Astringent), শীতল ঔষধ হিসেবে যা রক্তপাত রোধ করে ও দেহের ক্ষত বা কাটা জায়গার জ্বালাতনযুক্ত কলা বা কোষকে শুকিয়ে দেয় এবং তড়কা বা খিঁচুনিকে (Spasms) শিথিল করে । জবা ফুল কামোদ্দীপক ঔষধ-পানীয়-খাবার, বিশ্রামরত, প্রাণবন্ত, প্রশমিত এবং স্নিগ্ধকারী হিসেবে ব্যবহৃত হয় । এটি দেহের অভ্যন্তরীণভাবে অত্যধিক বেদনাদায়ক ঋতুস্রাব, Cystitis, যৌনব্যাধি (Venereal diseases), জ্বর (Feverish illnesses), শ্বাসনালী সংক্রান্ত শ্লেষ্মা (Bronchial catarrh), কাশির চিকিৎসায় এবং চুলের উজ্জ্বলতা-কোমলতা-মজবুত-তরতাজা-বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হয় । এ ফুলের তরলসার (Infusion) অসুস্থ মানুষকে শীতলকরণ পানীয় হিসেবে দেয়া হয় । জবা গাছের পাতাগুলি বেদনানাশক, রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করা, মূত্রনালীর সংক্রমণ, বহুমূত্ররোগ, বিরেচক বা জোলাপ এবং প্রলেপ হিসেবে ব্যবহৃত হয় । এটির ক্বাথ বা রস জ্বরের চিকিৎসায় লোশন হিসেবে ব্যবহার করা হয় । এ গাছের পাতা ও ফুল ব্যবহার করে ক্ষয়জনক স্ফীতি বা ফোলা (Cancerous swellings) এবং মাম্পস (Mumps) রোগে লেইয়ের প্রলেপ দেওয়া হয় । ফুলগুলি বিস্ফোটক বা ফোঁড়া (Carbuncles), Mumps, জ্বর এবং কালশিটে বা ক্ষতে ব্যবহৃত হয় । জবা গাছের মূল হচ্ছে গঁদ এর জন্য একটি ভালো উৎস এবং এটি কাশি ও ঠান্ডা চিকিৎসার ক্ষেত্রে Marsh mallow (Althaea officinalis) এর বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয় । মূল থেকে তৈরি লেই বা আঠা যৌনব্যাধিতে (Venereal diseases) ব্যবহৃত হয় । এটি নানা কাজে যেমন প্রসাধন বা অলঙ্করণ, তন্তু, পোলিশ, এ গাছকে আশেপাশে দেয়ালের মতো করে ক্ষুদ্র বৃক্ষনির্মিত বেড়া বা প্রতিবন্ধক হিসেবে এবং অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হয় । চীনে এ ফুলের পাপড়ি থেকে রং তৈরি করে ৷ পাপড়ির রস জুতা কালো রং করা এবং মাস্কারায় (Mascara) ব্যবহৃত হয় । জবা গাছের কান্ড থেকে একটি ভালো মানের তন্তু বা আঁশ পাওয়া যায় এবং মোটা কাপড়, জাল ও কাগজ তৈরিতে তন্তু ব্যবহার করা হয় । ভিটামিন সি সমৃদ্ধ এ জবা ফুল চর্ম রোগ বা ব্রণ নির্মূল করে এবং Antioxidant সমৃদ্ধের কারণে চিরযৌবন এনে দিতে পারে । বর্ষাকাল বা এর পরপরই জবা ফুল গাছের ডাল কেটে লাগালেই খুব সহজে চারা জন্মে । এ উদ্ভিদটি খুব ঠান্ডা সহনশীল নয়, তাই ঠান্ডামুক্ত অঞ্চলে ভালো জন্মে । এছাড়া উষ্ণ সবুজঘরে (Greenhouse) একটি স্নেহপূর্ণ পরিবেশে উদ্ভিদটি জন্মানো সম্ভব । প্রচন্ড শীতকালীন আবহাওয়াতে ঠান্ডায় পাতা বেশিরভাগই ঝরে যায়, যদিও স্বাভাবিক বা উষ্ণ আবহাওয়ায় পাতাগুলি স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠে । স্বতন্ত্রভাবে ফুলগুলি স্বল্পকালীন এবং ২৪- ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ফুলগুলি শুকিয়ে যায় । এ গাছের ভালো আকৃতি বজায় রাখতে নিয়মিত পরিচর্যা ও ছাঁটা প্রয়োজন । পৃথিবীর অনেক দেশেই এ গাছ জন্মে থাকে, ফলে এর নামেরও ভিন্নতা রয়েছে । তবে কোথাও কোথাও এ গাছ প্রতিকূল পরিবেশে অভিযোজন করে টিকে থাকার ক্ষমতাও রাখে । জবা ফুল হিন্দুধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় ও ভক্তিমূলক অনুষ্ঠানে পবিত্রতার প্রতীক (বিশেষভাবে এটি পবিত্র ও পূজনীয় হাতি ঈশ্বর গণেশ এর ক্ষেত্রে) ।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)
প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...
-
এ বিশাল মহাবিশ্ব অনেক গোপনীয়তা ধারণ করে । উপবৃত্তাকার বা বৃত্তাকার দানবীয় ছায়াপথগুলো সময়ের সাথে সাথে তাদের রূপ পরিবর্তন করে । এরা কখনো বেশ...
-
জংলি ঢেঁড়স হচ্ছে গুল্মজাতীয় বুনো ভেষজ উদ্ভিদ । এর বৈজ্ঞানিক নাম: Abelmoschus moschatus এবং সমনাম Hibiscus abelmoschus । এটি Malvaceae পর...
-
মুন্সিগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ী উপজেলার সোনারং ইউনিয়নের সোনারং গ্রামে অবস্থিত এই জোড়া মন্দিরটি অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রাচীন বাংলার এক অপূর্ব প্রত্নতা...

No comments:
Post a Comment