Friday, 15 May 2020

হীরা (Diamond)

অঙ্গার বা অঙ্গারক (Carbon) একটি মৌলিক পদার্থ । এটি অধাতু । কার্বনের রাসায়নিক সংকেত C । পারমাণবিক সংখ্যা ০৬ । ভর সংখ্যা ১২ ৷ ০৬টি প্রোটন, ০৬টি নিউট্রন এবং ০৬টি ইলেকট্রন ধারণ করে ৷ কার্বনের দুটি স্থিতিশীল অতেজষ্ক্রীয় সমস্থানিক (Isotope ) হচ্ছে ১২C এবং ১৩C ৷ কিন্তু অস্থায়ী তেজষ্ক্রীয় সমস্থানিক (Isotope ) ১৪C শুধুমাত্র Radionuclide রুপে পাওয়া যায় । কার্বন পৃথিবীর জীবজগতের প্রধান গাঠনিক উপাদান এবং প্রাচীন মৌল । কার্বন ক্ষয়িষ্ণু হওয়ার কারণে এর অর্ধায়ু (Half-life) প্রায় ৫৭৩০ বছর । সম্ভবতঃ আগুন আবিষ্কারের পূর্ব থেকেই মানুষ কার্বনের সাথে পরিচিত ছিল । কারণ, বজ্রাঘাতের ফলে পুড়ে যাওয়া শুকনো গাছ-কাঠের মাধ্যমেই মানুষ প্রথম কার্বনের সাথে পরিচিত হয় । কার্বনের সুপরিচিত Allotrope গুলোর মধ্যে রয়েছে Graphite, Diamond, Amorphous carbon এবং Fullerene । ফুলেরিন মৌলকে সংশ্লেষ করে Nanotechnology এর মাধ্যমে কার্বন পরমাণু দ্বারা কিছু অ্যালোট্রপ আবিষ্কৃত হয়েছে যেমন: Buckyball, Carbon nanotube, Carbon nanobud, Nanofiber, Lonsdaleite, Glassy carbon, Carbon nanofoam এবং Linear acetylenic carbon (Carbyne) । মানবসৃষ্ট অ্যালোট্রপ পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন পদার্থ । তাই কার্বনকে "King of the elements" হিসেবে উল্লেখ করা হয় ।

গ্রাফাইট (Graphite) হচ্ছে কার্বনের একটি বহুরূপ বা ভিন্ন অবস্থা । প্রত্নতাত্ত্বিক হিসেবে উল্লেখ করা হয় কৃষ্ণসীস (Plumbago) । গ্রাফাইটের বন্ধনগুলো Sp2 সংকর কার্বন পরমাণু দিয়ে তৈরি (Orbital hybridization) এবং পরমাণুগুলো সমতলে গঠিত হয়ে একটি ষড়ভুজ কাঠামোতে সাজানো থাকে । প্রত্যেকটি পরমাণু তিনটি নিকটতম প্রতিবেশীর সাথে ১২০º (ডিগ্রী) ব্যবধানে আবদ্ধ থাকে (বন্ধুত্বপূর্ণ) এবং রাসায়নিক বন্ধন আরও শক্তিশালী । কিন্তু সমান্তরাল সংলগ্ন সমতলের মধ্যে বন্ধন দুর্বল । তাই বন্ধনগুলো সহজেই একে অপরকে অতিক্রম করে । স্বতন্ত্র স্তরগুলোকে Graphene বলে । গ্রাফাইট খনিজটি হীরার চেয়ে অনেক নরম, পিচ্ছিল, অস্বচ্ছ, স্তরীভূত, আঁশযুক্ত, দানাদার এবং পিণ্ডের মত কালো বা গাঢ় ধূসর বর্ণের পদার্থ । গ্রাফাইটের সাথে যুক্ত খনিজগুলোর মধ্যে রয়েছে Quartz, Calcite, Mica, Tourmaline । শক্তিশালী বন্ধন গ্রাফাইটকে কম দাহ্য করে তোলে । গ্রাফাইটে কার্বনের পরিমাণ শতকরা ৯৫ - ৯৬ ভাগ । কাঠিন্য প্রাকৃতিক বস্তুর মধ্যে গ্রাফাইটের কঠিনতা হচ্ছে ১.০ - ২.০ এবং আপেক্ষিক গুরুত্ব ১.৯ - ২.৩ । গ্রাফাইট উচ্চ তাপরোধক চুল্লির আস্তর / ঢালাই কাজে, পারমাণবিক চুল্লিতে বিক্রিয়ার গতি মন্থর করতে, জ্বালানি তেল (Lubricant), রঙ, ব্যাটারি, সৌর প্যানেল, পেন্সিল এবং ঝালাই দণ্ড তৈরি করতে ব্যবহৃত হয় । এটিই একমাত্র অধাতু, যা তাপ ও বিদ্যুৎ পরিবহনে সক্ষম । গ্রাফাইটের সাথে যুক্ত খনিজগুলোর মধ্যে রয়েছে Quartz, Calcite, Mica, Tourmaline ।

হীরা (Diamond) হচ্ছে কার্বনের একটি শুদ্ধতম এবং গাঢ়তর রূপ । হীরক বা হীরে বা হীরা গ্রিক শব্দ Adamo (Adámas) থেকে উদ্ভূত হয়েছে । যার অর্থ কঠিন ইস্পাত (যথাযথ, অপরিবর্তনীয়, অটুট, অটল) । গ্রিক শব্দ Adámas অর্থ ''অপরাজেয়'', মূলত এখানে অনন্তকালের ভালোবাসা (Eternity of Love) হিসেবে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে । Adamo কে রুশ ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে "অবিনাশী", "অপরিবর্তনীয়" হিসেবে । আরবীতে হীরাকে Olympus বলা হয় । হীরা অত্যন্ত বিরল এবং আলো-ঝলমলে ধাতু । হীরা হচ্ছে ফরাসি শব্দ । রুশ ভাষায় এর অর্থ "ঝলকানি"। পৃথিবীতে প্রাপ্ত প্রাচীনতম উপকরণগুলোর মধ্যে হীরা একটি । অনন্য এ হীরার বন্ধনগুলো Sp3 সংকর কার্বন পরমাণুর সমন্বয়ে গঠিত । পরমাণুগুলো চারটি নিকটতম প্রতিবেশীর সাথে আবদ্ধ হয়ে Tetrahedra গঠন করে । টেট্রাহেড্রা অনমনীয় এবং বন্ধনগুলো শক্তিশালী । হীরার স্ফটিক (Crystal) কাঠামোতে কার্বন পরমাণুর একটি ঘন বিন্যাস রয়েছে । হীরার মধ্যে এ কার্বন পরমাণুর স্ফটিক জালিকা বিন্যাসকে মুখ-কেন্দ্রিক ঘনক শ্রেণির স্ফটিক কাঠামো বলে (Face centered cubic crystal structure) । মোট ১৪টি পরমাণু নিয়ে স্ফটিক কোষ গঠিত হয় । সকল পরিচিত পদার্থের মধ্যে হীরার প্রতি একক আয়তনে সর্বাধিক সংখ্যক পরমাণু রয়েছে । যে কারণে হীরা সবচেয়ে কঠিন, স্বচ্ছ এবং সর্বনিম্ন সংকোচনযোগ্য । হীরা বিদ্যুৎ সঞ্চালন করে না এবং এর গলনাঙ্ক অনেক বেশি । প্রাকৃতিক হীরার ঘনত্ব ৩১৫০ - ৩৫৩০ কিলোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারে (পানির ঘনত্বের তিনগুণ বেশি) এবং বিশুদ্ধ হীরার ঘনত্ব ৩৫২০ কিলোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারে । হীরার সর্বোচ্চ শব্দ বেগ রয়েছে । হীরায় কম আনুগত্য এবং বাতাসে (ধাতুর ঘর্ষণ) তাপ সম্প্রসারণের সহগ অত্যন্ত কম । হীরার অতি উচ্চ প্রতিসরাঙ্ক সূচক (Very high refractive index), অপেক্ষাকৃত উচ্চ আলোকিক বিচ্ছুরণ (High optical dispersion) এবং উচ্চ বৈদ্যুতিক প্রতিরোধশক্তি (High electrical resistance) রয়েছে । হীরা রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয় বা জড় । বেশিরভাগ ক্ষয়কারী পদার্থের সাথে প্রতিক্রিয়া করে না । এর চমৎকার জৈবিক সামঞ্জস্য রয়েছে । হীরা গ্রাফাইটের সমগোত্রীয় হলেও এটি বিপরীত ধর্মী । 

আধুনিক রসায়ন শাস্ত্রের জনক ফরাসি রসায়নবিদ (Antoine-Laurent de Lavoisier) অঁতোয়ান-লোরঁ দ্য লাভোয়াজিয়ে ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে একটি স্বচ্ছ কাঁচের জারের মধ্যে এক টুকরো হীরক খণ্ড রেখে একটি শক্তিশালী বিবর্ধক কাঁচ (Lens) দিয়ে সেটির উপর সূর্যরশ্মি কেন্দ্রীভূত করেন । আস্তে আস্তে এক সময় সম্পূর্ণ হীরাটি পুড়ে অদৃশ্য হয়ে যায় । এরপর তিনি জারের ওজন পরিমাপ করে দেখেন যে, তা পূর্বের সমানই রয়ে গেছে । ঠিক একই পরীক্ষা তিনি কাঠকয়লার (Charcoal) ক্ষেত্রেও করেন এবং বিস্ময়ের সাথে দেখেন যে, উভয় ক্ষেত্রে একই গ্যাস Carbon-dioxide (CO2) উৎপন্ন হয় । এ থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, হীরা এবং কাঠকয়লা একই মৌলের দুটি ভিন্ন রূপ মাত্র । বিজ্ঞানী অঁতোয়ান-লোরঁ দ্য লাভোয়াজিয়ে ঐ মৌলটির নাম দেন কার্বন (Carbon) । ১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ রসায়নবিদ Smithson Tennant আবিষ্কার করেন যে, সমপরিমাণ হীরা এবং গ্রাফাইটের দহনে সমআয়তন Carbon-dioxide উৎপন্ন হয় । কিছুদিন পর আরেক বিজ্ঞানী L. Guiton d. Marview ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করেন যে হীরা, গ্রাফাইট এবং কোমল পানীয় বা কোকের (দ্রবীভূত অবস্থায় কার্বনসমৃদ্ধ পানি) একমাত্র উপাদান হচ্ছে কার্বন । পরবর্তীতে তিনি পরীক্ষাগারে হীরা থেকে গ্রাফাইট এবং গ্রাফাইট থেকে কার্বন-ডাই অক্সাইডে (CO2) পরিণত করতে সমর্থ হন । কিন্তু গ্রাফাইট থেকে হীরা তৈরির মত উন্নত প্রযুক্তি তখনও ছিল না । অবশেষে ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা ১০৯ Pascal চাপে এবং ৩০০০° (ডিগ্রী) সেলসিয়াস বা সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় গ্রাফাইটকে ক্রোমিয়াম, নিকেল, লোহা চুর্ণের সঙ্গে মিশিয়ে বৈদ্যুতিক চুল্লির মধ্যে উত্তপ্ত করে গ্রাফাইট থেকে হীরা সংশ্লেষণ করতে সক্ষম হন । প্রায় ৪৫০০ K (Kelvin) এর উপর তাপমাত্রায় হীরা দ্রুত গ্রাফাইটে রূপান্তরিত হয় । গ্রাফাইটকে হীরাতে রূপান্তরের জন্য ভারসাম্য রেখার উপরে ২০০০ K (Kelvin) এ, ৩৫ GPa (Gigapascal) চাপ প্রয়োজন । বৈজ্ঞানিক সাময়িকী Nature Physics এর এক গবেষণায় দেখা যায় যে, অতি উচ্চ চাপ এবং তাপমাত্রায় প্রায় ১০ মিলিয়ন বা ০১ TPa (Terapascal) বায়ুমণ্ডলীয় চাপে এবং ৫০০০০º (ডিগ্রী) সেলসিয়াস তাপমাত্রায় হীরা একটি ধাতব তরলে গলে যায় {Gigapascal (1 GPa = 10,000 bars) / Terapascal (1 TPa = 10,000,000 bars)} । কিন্তু এটি ঘটার জন্য প্রয়োজনীয় চরম পরিস্থিতি বা সেরকম পরিবেশ উপস্থিত রয়েছে পৃথিবী থেকে অনেক দূরে বরফের দৈত্য গ্রহ Neptune এবং Uranus এ । উভয় গ্রহই প্রায় ১০ শতাংশ কার্বন দ্বারা গঠিত । কল্পনা করা হয় যে, সেখানে তরল কার্বনের মহাসাগর থাকতে পারে । যেহেতু প্রচুর পরিমাণ ধাতব তরল চৌম্বক ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করতে পারে, তাই কেন এ দুটি গ্রহের ভৌগলিক এবং চৌম্বকীয় মেরু অসংলগ্ন (Unaligned) ? কার্বনের বহুরূপকের মধ্যে হীরা হচ্ছে সবচেয়ে মূল্যবান এবং খুবই কঠিন প্রাকৃতিক পদার্থ । হীরা নিজের কঠোরতা, শক্তি, স্বচ্ছতা, উজ্জ্বলতা এবং সৌন্দর্যের জন্য সুপরিচিত । হীরার কঠোরতার কারণেই পৃথিবীর সকল ধাতুর মধ্যে হীরা হচ্ছে সর্বোচ্চ । এর আপেক্ষিক গুরুত্ব ৩.৫ । হীরার ঘনত্ব ৩.৫ - ৩.৫৩ গ্রাম প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে ৷ পানি, অম্ল এবং ক্ষারজে অদ্রবণীয় । সাধারণ তাপমাত্রায় হীরাকে কোন জারকই জারিত করতে পারে না । বায়ুতে ৯০০º (ডিগ্রী) সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বা বিশুদ্ধ অক্সিজেনে ৭০০º (ডিগ্রী) সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করলে অক্সিজেন দ্বারা জারিত হয়ে কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO2) গ্যাস উৎপন্ন করে । আবার ৭০০º (ডিগ্রী) সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফ্লুরিনে (Fluorine) জ্বলে উঠে এবং Carbon tetrafluoride (CF4) উৎপন্ন করে । হীরার গঠন প্রণালী বা এর আলোক প্রতিসরণ ক্ষমতা সর্বাধিক হওয়ার কারণে আলোর পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন ঘটে বলেই হীরা উজ্জ্বল দেখায় । তাই সাধারণ মানের আলো প্রবেশ করলে হীরাকে অনেকগুণ উজ্জ্বল মনে হয় । আলোক প্রতিসরণ বৈশিষ্ট্যের কারণে হীরা আলো ধরে রাখতে পারে- যেখানে কাঁচ (Glass), কোয়ার্টজ (Quartz), জিরকোনিয়াম (Zirconium) তা করতে পারে না । হীরার বহুতলে আলো বারবার এঁকে বেঁকে যায় বলেই বহু বর্ণের আলোর ফোয়ারা তৈরি হয় । হীরার ভেতরের উজ্জ্বলতা অনুযায়ী বর্ণের দিক থেকে হীরাকে চার ভাগে ভাগ করা হয়: (ক) ব্রাহ্মণ-সাদা রঙের হীরা (খ) ক্ষত্রিয়-লাল রঙের হীরা (গ) বৈশ্য-হলুদ রঙের হীরা (ঘ) শুদ্র-কালো রঙের হীরা । বিন্দু ও রেখাবর্জিত শ্বেত হীরাকে 'কমলহীরা' বলে । হীরার ঘনত্ব এবং প্রতিসরণাঙ্ক বেশি বলে বাতাসে হীরার ক্রান্তি বা সংকট কোণ ২৪.৪° (ডিগ্রী) । অন্যদিকে পানিতে হীরার ক্রান্তি কোণ ৩৩° (ডিগ্রী) এবং প্রতিসরণ কোণ ৯০° (ডিগ্রী) । হীরার উপর আলোকরশ্মি সামান্য কোণে আপতিত হলেই আপতন কোণ সংকট কোণের চেয়ে বড় হয় । ফলে অধিক পরিমাণ আলোকরশ্মির পূর্ণ প্রতিফলন ঘটিয়ে চোখে এসে পড়ে । তাই হীরা অতিমাত্রায় উজ্জ্বল দেখায় । ধারণা করা হয়, মানব সভ্যতার প্রাগৈতিহাসিক কালের পুরাতাত্ত্বিক দ্বিতীয় ভাগের ব্রোঞ্জ যুগে (সিন্ধু সভ্যতা) খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ - খ্রিস্টপূর্ব ১৭০০ অব্দের মাঝামাঝি সময় হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়ো সভ্যতার রূপকার প্রাচীন দ্রাবিড় জনগোষ্ঠী ভারতীয় উপমহাদেশে সর্বপ্রথম হীরার সন্ধান পায় । মানুষ সুন্দরের পূজারী । আদিকাল থেকেই মানবজাতি সৌন্দর্যের জন্য অলঙ্কার বা গহনা পরিধান করে আসছে । তৎকালীন সময়ে ঝিনুক, শামুক, কড়ি এবং পশু-পাখির হাড়ের টুকরো ইত্যাদি ব্যবহৃত হলেও আধুনিক যুগে ঐগুলোর স্থান দখল করে নেয় বিভিন্ন রকম উজ্জ্বল পাথর এবং রত্নপাথর (Gemstone) । হীরা অতি মূল্যবান রত্ন । এটি গহনা তৈরিতে ব্যবহৃত হয় । হীরা হচ্ছে সৌভাগ্য, মর্যাদা, সাহস, অধ্যবসায়, ভালোবাসা এবং আভিজাত্যের প্রতীক । প্রাচীনকালে সম্রাট-সম্রাজ্ঞী বা রাজা-রাণী হীরাখচিত অলঙ্কার বা গহনা ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের সৌন্দর্য এবং আভিজাত্যকে প্রকাশ করতেন । মানুষ হৃদয়ের গভীর ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে প্রিয়জনকে হীরা উপহার দিতেন, যার রেওয়াজ বিশ্বব্যাপী আজ অবধি চলমান । প্রাচীন যুগে মুদ্রা হিসেবে হীরার বিনিময় প্রথা চালু ছিল । দুর্লভ আর মহামূল্যবান হীরার অধিকার (অধিকারী হতে) গ্রহণের পিছনেও রয়েছে এক রক্তাক্ত ইতিহাস! বৈজ্ঞানিকদের ধারণা, ভূ-অভ্যন্তরে প্রায় ১৫০ থেকে ২৫০ কিলোমিটার (৯৩ - ১৫৫ মাইল) গভীরতায় পৃথিবীর কেন্দ্র এবং আবরণের মাঝে প্রচণ্ড তাপ ও চাপের কারণে হীরা গঠিত হতে প্রায় ০১ থেকে ৩.৩ বিলিয়ন বছর সময় লেগেছে । যদিও পৃথিবীর বয়স যেখানে প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর । এছাড়া কিছু পরিমাণ হীরা ভূ-গর্ভের প্রায় ৮০০ কিলোমিটার (৫০০ মাইল) গভীরে গঠিত হয়েছিল । গবেষকদের মতে সকল হীরাই পৃথিবীতে তৈরি হয়েছে এমন নয়, পৃথিবীতে এমন অনেক হীরা পাওয়া গেছে যেগুলো পৃথিবীর বাইরে তৈরি । অনেক অনেক বছর আগে পৃথিবীর বুকে হীরা সৃষ্টি হয় । অনেকেই ধারণা করেন যে, মাটির অভ্যন্তরে থাকা কয়লা থেকে হীরা সৃষ্টি হয় । তবে এ ধারণাটি সম্পূর্ণ সঠিক নয় । হীরা গঠনে খুব সামান্যই অবদান রাখে কয়লা । প্রোথিত (Buried) প্রাগৈতিহাসিক উদ্ভিদ থেকে গঠিত হয় কয়লা । প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া যেসব হীরা পরীক্ষা করা হয়েছে তাদের বেশিরভাগের বয়সই ছিল পৃথিবীর স্থলভাগের প্রথমদিকের উদ্ভিদের চেয়েও বেশি । এ উদ্ভিদগুলোই ছিল পৃথিবীর কয়লার প্রধান উৎস । তাই কয়লার উপর নির্ভর করে যে হীরা সৃষ্টি হয়নি এটি বোঝা যায় । কয়লা সাধারণত তৈরি হয় ১৫০º (ডিগ্রী) সেলসিয়াস তাপমাত্রায় অথবা এর চেয়েও কম এবং ২.৩ - ৪ কিলোমিটার গভীরে । কয়লাকে পাললিক শিলা বলে । পাললিক শিলায় পলির রূপান্তরের সময় ঘটে যাওয়া ভৌত এবং রাসায়নিক পরিবর্তনের (Diagenesis process) মাধ্যমে কয়লা পাওয়া যায় সমতল ভূমিতে । যদিও স্ফটিকীকরণ প্রক্রিয়ায় (Crystallization process) হীরা সৃষ্টি হয় । হীরা পাওয়া যায় আগ্নেয় শিলা এবং উলম্ব ভূমিতে (Vertical land) । মনে রাখা উচিৎ যে, পৃথিবীর উদ্ভিদ থেকে মূলত কয়লা সৃষ্টি হয়েছে । পৃথিবীর ভূ-ত্বক থেকে গড়ে ৩.২ কিলোমিটার গভীরে এর অবস্থান । এ কয়লার পক্ষে ভূ-গর্ভের আরো ১৫০ কিলোমিটার গভীরে যেয়ে হীরা সৃষ্টি করার সম্ভাবনা খুবই কম । তাহলে, হীরা সৃষ্টির জন্য পৃথিবীর গভীরে কার্বন (Carbon) জমা হয়েছে কিভাবে? কারণ, হীরা হচ্ছে কার্বনের একটি শুদ্ধতম এবং গাঢ়তর রূপ (বহুরূপ মৌল) । কার্বনের উৎস খুঁজতে হলে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে পৃথিবী গঠনকালের সময়ে । বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবী গঠন হওয়ার সময়েই এর অভ্যন্তরে কার্বন আটকা পড়ে যায় এবং অতি উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে ধীরে ধীরে ঐ কার্বন হীরায় পরিণত হয় । প্রায় শতভাগ প্রাকৃতিক হীরা এ প্রক্রিয়াতেই সৃষ্টি হয় । তবে, প্রকৃতিতে হীরা সৃষ্টির জন্য এটিই একমাত্র উপায় নয় । যদিও, সামান্য পরিমাণ হীরা অন্যান্য উপায়ে তৈরি হয়ে থাকে । যেমন অনেক বিজ্ঞানী বিশ্বাস করেন যে, মহাকাশ থেকে উল্কাপাতের ফলেও কিছু পরিমাণ হীরা সৃষ্টি হয় । উল্কা (Meteorite) পৃথিবীর বুকে আঘাত হানার সময় প্রচণ্ড তাপ এবং চাপের সৃষ্টি হয় । এ তাপ এবং চাপ এতই উচ্চমাত্রার যে, তা থেকে হীরা গঠনের জন্য যথেষ্ট । প্রায় ৩৫ মিলিয়ন বছর আগে Eocene যুগের শেষের দিকে (Priabonian stage) রাশিয়ার সাইবেরিয়ার পার্বত্য এলাকা টাঙ্গুস্কায় ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ৩০শে জুুন এক বৃহৎ, ব্যতিক্রমী, উজ্জ্বল উল্কাপাতের (Bolide) কারণে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয় । এর ফলে ধারণা করা হয়, প্রায় ১০০ কিলোমিটার (৬২ মাইল) ব্যাসের রহস্যময় কাঠামোর ঐ পপিগাই গর্তটিতে (Popigai crater / Astrobleme) বিশ্বের সবচেয়ে বড় হীরার আমানত থাকতে পারে । যা আনুমানিক ট্রিলিয়ন ক্যারেটের । এ উল্কাপাতের ফলে বিস্ফোরণের মাত্রা ছিল ১০-১৫ মেগাটন টিএনটি (TNT= Tri nitro toluene) এর সমান শক্তির । তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৫০০০º (ডিগ্রী) সেলসিয়াস । উল্কাপাতের সময় তীব্র বা প্রচণ্ড বেগে বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে সংঘর্ষে বিষ্ফোরণের ফলে কিংবা উল্কা আঘাত হেনে যে গর্ত (Crater) সৃষ্টি করে তারই আশপাশে হীরা পাওয়া যায় (চাঁদের পৃষ্ঠেও) । এছাড়া মহাশূূন্যে যে হীরা সৃষ্টি হয়, এ ধারণাটি একেবারেই নতুন । সম্প্রতি NASA এর এক দল গবেষক দেখাতে সক্ষম হন যে, গ্রহাণুতে হীরা সৃষ্টি হয় । মহাশূূূন্যে গ্রহাণুুগুলো (Asteroid) খুব দ্রুত বেগে চলমান । যখন গ্রহাণুুুগুলো একে অপরের সাথে ধাক্কা খায় তখন প্রচুর পরিমাণ তাপ ও চাপের সৃষ্টি হয়, যার ফলে হীরা উৎপন্ন হয় । তবে, এ হীরাগুলোর ব্যাস মাত্র কয়েক ন্যানোমিটার (Nanometre) । ন্যানোমিটার হচ্ছে মেট্রিক পদ্ধতিতে দৈর্ঘ্যের একটি একক । যা এক মিটারের একশ কোটি ভাগের এক ভাগের সমান (১০−৯ মি.) অথবা এক মিলিমিটারের এক মিলিয়ন ভাগের এক ভাগ । এজন্য এগুলোকে ন্যানো হীরা (Nano diamond / Micro diamond) বলে । কিছুদিন আগে Allan Hills Meteorites থেকে যে হীরা কণা (Diamond particles) পাওয়া যায়, সেগুলোর আকার হচ্ছে Nano diamond থেকে কিছুটা বড় । সৌরজগতের বরফপূর্ণ বিশাল গ্রহ ইউরেনাস এবং নেপচুনে প্রচুর পরিমাণ হীরা মিথেন গ্যাস থেকে "হীরা বৃষ্টিতে" ঘনীভূত হয় । কিছু সৌর গ্রহ প্রায় সম্পূর্ণ হীরা দিয়ে গঠিত । কার্বন-সমৃদ্ধ নক্ষত্রে কিংবা সাদা বামন গ্রহেও হীরা থাকতে পারে । প্রাকৃতিক হীরার মধ্যে সবচেয়ে কঠিন রূপের Carbonado নামক কালো হীরা নাক্ষত্রিক বিস্ফোরণের ফলে অতিনবতারায় (Supernova) উদ্ভূত হয়েছিল । তাই নক্ষত্রে গঠিত হীরা সম্ভবত প্রথম খনিজ । হীরা উচ্চ চাপ এবং তাপমাত্রায় তাপগতিগতভাবে (Thermodynamically) স্থিতিশীল । হীরা তৈরি হওয়ার জন্য প্রচুর পরিমাণ তাপ ও চাপের প্রয়োজন হয় । যা পৃথিবীর উপরিভাগে পাওয়া সম্ভব নয় । প্রায় ৪৫ - ৯০ কিলোবার চাপে এবং ২০০০º (ডিগ্রী) ফারেনহাইট বা ১০৫০º (ডিগ্রী) সেলসিয়াস তাপমাত্রায় হীরা সৃষ্টি হয় । যা ভূ-পৃষ্ঠ বা উপরিভাগ থেকে প্রায় ১৪০ - ১৯০ কিলোমিটার গভীরে পাওয়া যায় । এ তামাত্রায় হীরা স্থায়িত্ব (Stability) পায় এবং এ স্থায়ী অবস্থা বা স্থায়িভাব পৃথিবীর সব জায়গাতে পাওয়া যায় না । শুধুমাত্র মহাদেশীয় প্লেট (Continental plate) এর নিচে Stability zone এ পাওয়া সম্ভব । যে কারণে হীরা বিভিন্ন মহাদেশগুলোতে পাওয়া যায় । Subduction zone হচ্ছে সে জায়গা, যেখানে মহাসাগরীয় প্লেট (Oceanic plate) মহাদেশীয় প্লেটের (Continental plate) নিচে ঢুকে পরে । কয়েক বছর আগে জাপানে সংঘটিত ভুমিকম্প এ Subduction zone এর কারণে হয়েছিল । ভূ-গর্ভস্থে যখন একটি প্লেট আরেকটি প্লেটের কাছে এসে সেটির নিচে চলে গিয়ে পৃথিবীর আভ্যন্তরীণ আঙরাখায় (Mantle) পৌঁছে এবং যে জায়গাতে এ রকম নাটক বা ঘটনা ঘটে থাকে ঐ ঘটনাস্থল বা নাট্যশালাকে বলে Subduction । এ ঘটনাস্থলে মহাসাগরীয় প্লেটটি আঙরাখায় প্রচুর পরিমাণ তাপ ও চাপের সৃষ্টি করে, যার ফলে আঙরাখা গলে গিয়ে ম্যাগমা (Magma) তৈরি হয় । এ ম্যাগমাতেই প্রথম হীরা গঠনকারী পরামাণুগুলো সৃষ্টি হয় । আঙরাখায় প্রায় এক বিলিয়ন গিগাটন কার্বন রয়েছে । পৃথিবীর অনেক গভীরে Metasomatic প্রক্রিয়ার মাধ্যমে C-O-H-N-S (Carbon, Oxygen, Hydrogen, Nitrogen, Sulfur) এর তরল উপাদান শিলার খনিজ পদার্থে দ্রবীভূত হয় । Oxidized carbon (যেমন CO2 বা CO3) বা মিথেনের মতো একটি হ্রাসপ্রাপ্ত পর্যায়ের জারণ দ্বারা ঐ তরল থেকে আঙরাখায় হীরা গঠিত হয় । পৃথিবীর আঙরাখা থেকে দুই ধরনের আগ্নেয় শিলা যেমন Peridotite এবং Eclogite এর মধ্যে হীরা পাওয়া যায় । একমাত্র ক্রোমিয়াম খনিজ Peridotite প্রধানত অলিভিন এবং সিলিকা দ্বারা গঠিত আগ্নেয় শিলা । পেরিডোটিটিক হীরা (Peridotitic diamond) বেশিরভাগই পৃথিবীর আঙরাখা পরিসীমার মধ্যে থাকে । প্রায় ৩.৩ বিলিয়ন বছর আগে শুধুমাত্র Peridotic composition এর সাথে এ হীরা গঠিত হয়েছিল । মনে করা হয়, Subduction এবং মহাদেশীয় সংঘর্ষের (Continental collision) ফলে মহাদেশীয় হীরা-গঠনকারী তরলে Eclogite গঠিত হয়েছিল । পৃথিবীর আঙরাখায় গঠিত ইক্লোজিটিক হীরা (Eclogitic diamond) সামুদ্রিক পলির পরিবর্তে সমুদ্রের ভূত্বক থেকে উদ্ভূত হয় । প্রায় ৩.০ বিলিয়ন বছর আগে ইক্লোজিটিক হীরা প্রবর্তিত হয় । ভূ-গর্ভস্থ প্লেটের সংঘর্ষের কারণে মাটির অনেক গভীরে প্রায় ১৪০ - ১৯০ কিলোমিটার নিচে উচ্চ তাপমাত্রা এবং চাপের মাঝে থাকা হীরার মূল আকরিকগুলো (Ore) পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্রবল অগ্ন্যুৎপাতের ফলে প্রতি সেকেন্ডে ৪ - ২০ মিটার বেগে ছিটকে বেরিয়ে আসে Volcanic pipe দিয়ে উপরিভাগে । বাইরে আসার পর আকরিকগুলো শীতল হয়ে জমাট বেঁধে Kimberlite, Lamproite এবং Lamprophyre নামে আগ্নেয় শিলায় পরিণত হয়, যার বেশির ভাগই দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত । পরবর্তীতে এ আগ্নেয় শিলা ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে নদীর তলদেশ বা সমুদ্র তীরে জমা হয় । এখান থেকেই খনিজ আকাটা হীরা (Rought diamond) পাওয়া যায় । ভূতত্ত্ববিদদের মতে, মাটির নিচে প্রায় ৪৫ - ৯০ কিলোবার চাপে (Kilobar pressure) হীরা সৃষ্টি হয় [ 1 kbar = 100000000 Pa (Kilobar to pascal) ] । হীরা প্রায় ৯০০º - ১৩০০º (ডিগ্রী) সেলসিয়াস তাপমাত্রায় থাকে । এখান থেকে প্রাপ্ত হীরার পরিমাণ খুবই কম । এছাড়া Subduction অঞ্চলগুলোর মধ্যে যে অঞ্চল শীতল সেখানে প্রায় ৮০০° (ডিগ্রী) সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এবং ৩.৫ Gigapascal উচ্চ চাপে হীরা স্থিতিশীল হয় । খনিতে প্রাপ্ত হীরা সুনিপুণভাবে কেটে বিভিন্ন তল এবং কোণের সংখ্যা বৃদ্ধি করে একে খুবই উজ্জ্বল, সৌন্দর্যময়, মসৃণ ও নিখুঁতভাবে গঠন করা হয় । পরবর্তীতে এ হীরকখণ্ড উজ্জ্বল রত্ন হিসেবে অলঙ্কারে ব্যবহৃত হয় । হীরা অত্যাধিক জনপ্রিয়তার কারণে বাগদান-বিবাহের আংটি এবং কণ্ঠহারে পছন্দের রত্ন হিসেবে ব্যবহৃত হয় । যদিও এর সাথে কিছু কিছু অপদ্রব্য (কাঠামোগত ত্রুটি বা অমেধ্য, অশুচি) মিশ্রিত হয়ে অভিনব রঙের গোলাপী, নীল (Boron), লাল, বাদামি (Defects /Nitrogen), হলুদ (Nitrogen), কমলা, সবুজ (Radiation exposure), কালো ইত্যাদি বর্ণের হীরা তৈরি হয়ে থাকে । হীরা প্রায়শই গোলাকার অষ্টহেড্রা (Euhedral) এবং জোড়াযুক্ত অষ্টহেড্রা হিসেবে দেখা যায়, যেটি Macle নামে পরিচিত । হীরার স্ফটিক কাঠামোতে পরমাণুর একটি ঘন বিন্যাস রয়েছে । হীরার অনেকগুলো দিক রয়েছে যেমন: ঘনক (Cube), অষ্টহেড্রন (Octahedron), রম্বিকোসিডোডেকাহেড্রন (Rhombicosidodecahedron), টেট্রাকিস হেক্সাহেড্রন (Tetrakis hexahedron) বা ডিসডায়াকিস ডোডেকাহেড্রনের (Disdyakis dodecahedron) । হীরার স্ফটিকগুলো বৃত্তাকার সুসম্পন্ন করা, অপ্রকাশিত প্রান্ত এবং দীর্ঘায়িত হতে পারে । গোলাকার স্ফটিক মুখের হীরা সাধারণত nyf এ লেপা বা প্রলিপ্তভাবে পাওয়া যায় । কিছু হীরার অস্বচ্ছ তন্তু এবং আঠার মতো ত্বক থাকে । অস্বচ্ছ তন্তুর সাধারণ আকৃতি হচ্ছে Cuboidal । তবে এটি অষ্টহেড্রা (Octahedra), ডোডেকাহেড্রা (Dodecahedra), Macle বা সম্মিলিত আকারও তৈরি করতে পারে । এ হীরা সম্ভবত Kimberlite ম্যাগমাতে গঠিত হয়েছিল । হীরা Polycrystalline সমষ্টিও গঠন করতে পারে যেমন: Boart, Ballas, Stewartite এবং Framesite । কালো বর্ণের বা রঙের হীরাকে Carbonado বলে । মহাজাগতিক আশ্চর্য ও খুবই বিরল কার্বোনাডো হীরা 'The Enigma' প্রায় ২৬০ কোটি বছর আগে সম্ভবত কোন উল্কার অংশ ছিল কিংবা উল্কার সাথে পৃথিবীর সংঘর্ষকালে হীরাটি সৃষ্টি হয়েছিল । মহাকাশ থেকে আসা হীরাটি প্রায় ৫৫৫.৫৫ ক্যারেট । এর কঠিন দানাগুলোকে Sintered করা হয় । কার্বোনাডো হীরা একক স্ফটিক হীরার চেয়েও শক্ত । নক্ষত্র বা তারকা গঠনসহ হীরা উৎপত্তির জন্য অনেক তত্ত্ব আছে । হীরা খনিজটিতে শতকরা প্রায় ৯৯.৮ ভাগ কার্বন রয়েছে । বাকি ০.২ ভাগ বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান হচ্ছে: Nitrogen, Aluminum, Oxygen, Silicone, Boron, Copper, Manganese, Nickel, Ironing, Zinc, Titanium ইত্যাদি । বর্ণহীন এ রত্নটি অন্য সকল প্রাকৃতিক পদার্থ থেকে অনেক বেশি শক্ত বা কঠিন । এটি দিয়ে উচ্চতম তাপমাত্রায় কাজ করা সম্ভব । হীরাকে আদর্শ ধরে তৈরি করা খনিজের কাঠিন্য পরিমাপ করার জন্য Mohs scale of mineral hardness (১ - ১০) অনুযায়ী হীরার কাঠিন্য ১০ । Vickers scale এবং Mohs scale মাপনী দ্বারা হীরার কাঠিন্য পরিমাপ করে প্রমাণিত হয় যে, হীরক রত্নটিতে মহান কঠোরতা রয়েছে । তার মানে এটি অসীম কঠিন, অবিনশ্বর কিংবা অমূল্য নয় । প্রকৃতপক্ষে, শুধুমাত্র হীরা দিয়েই হীরাকে কাটা বা আঁচড় করা বা চিরা যায় । এমনকি Polymerized ভিনাইল যৌগ থেকে গঠিত রজন বা প্লাস্টিকের নরম উপকরণ (Vinyl phonograph record) দ্বারাও জীর্ণ করা যায় । এছাড়া Boron nitride এর মতো উপাদান দিয়ে কিছু হীরাকে চিরা বা আঁচড় করা সম্ভব । কঠিনতম বা শক্ত হীরাকে শুধুমাত্র অন্য হীরা দিয়ে এবং Nanocrystalline হীরার সমষ্টি দ্বারা চিরা বা আঁচড় করা যায় । অধিক কঠিন প্রাকৃতিক হীরা বেশিরভাগই অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের নিউ ইংল্যান্ড এলাকায় অবস্থিত Copeton এবং Bingara ক্ষেত্র থেকে উৎপন্ন হয় । হীরার কঠোরতা সাধারণত এর বিশুদ্ধতা, স্ফটিক পূর্ণতা এবং অভিযোজনের উপর নির্ভর করে । নিশ্ছিদ্র ও বিশুদ্ধ স্ফটিকগুলোর জন্য কঠোরতা বেশি হয় । প্রাকৃতিক হীরার দৃঢ়তা বা শক্ততা ৭.৫ - ১০ MPa·m ১/২ হিসেবে পরিমাপ করা হয়েছে । একটি হীরার Macroscopic geometry তার ভাঙন প্রতিরোধে অবদান রাখে । হীরার একটি Cleavage plane রয়েছে, তাই অন্যদের তুলনায় কিছু Orientation এ এটি বেশি ভঙ্গুর । কৃত্রিম হীরা শিল্পে গুণমান পরিমাপ করার জন্য "Impact toughness" হচ্ছে প্রধান সূচক । হীরার ১৩০ - ১৪০ Gigapascal (GPa) ফলন বা উৎপাদন শক্তি (Compressive yield strength) রয়েছে । Anvil কোষগুলো ৬০০ Gigapascal (GPa) চাপে পৌঁছে । Nanocrystalline হীরা দিয়ে অনেক বেশি চাপ সম্ভব হতে পারে । হীরার স্থিতিস্থাপকতা এবং প্রসার্য শক্তি আছে । সর্বাধিক স্থানীয় প্রসার্য চাপ ~৮৯ থেকে ৯৮ Gigapascal (GPa) । তবে, টান বা বাঁকিয়ে বিশাল আয়তনের স্ফটিক হীরাকে (Bulk diamond crystal) বিকৃত করার চেষ্টা করলে এটি ভঙ্গুর / চিড় ধরে / ফেটে (Brittle fracture) যায় । হীরা হচ্ছে তাপ এবং বিদ্যুৎ অপরিবাহী পদার্থ । হীরার উচ্চ তাপ পরিবাহিতা হচ্ছে (৯০০ - ২৩২০ W·m−১·K−১) । কিছু নীল হীরা প্রাকৃতিক অর্ধপরিবাহী, যা বেশিরভাগ হীরার বিপরীতে চমৎকার বৈদ্যুতিক নিরোধক । পরিবাহিতা এবং নীল রঙ Boron এর অশুদ্ধতা থেকে উদ্ভূত হয় । হীরার জালিতে কার্বন পরমাণুর জন্য Boron প্রতিস্থাপিত হয় এবং Valence band এর মধ্যে একটি গর্ত দান করে । তবে রাসায়নিক বাষ্প জমা করার মাধ্যমে সৃষ্ট অপরিবর্তিত হীরাতে উল্লেখযোগ্য তড়িৎ পরিবাহিতা পরিলক্ষিত হয় । হীরা পর্দাকে প্রতিরোধ এবং এর Solar panel কে কার্যকর, Laser কে শক্তিশালী, Hard drive কে আরও ছোট এবং ভালো মানের Electronic device তৈরি করতে পারে ৷ হীরা প্রাকৃতিকভাবে Lipophilic এবং Hydrophobic । ফলে, হীরার পৃষ্ঠটি জলকে বিকর্ষণ করে বা জল শোষণ করে না । তবে চর্বি, তেল, লিপিড, হেক্সেন এবং টলুইনে দ্রবীভূত হওয়ার ক্ষমতা আছে । হীরার পৃষ্ঠ আংশিকভাবে Oxidized হয় । সাধারণ তাপমাত্রায় হীরা শক্তিশালী অম্ল এবং ঘাঁটিসহ কোনও রাসায়নিক বিকারকের সাথে প্রতিক্রিয়া করে না । বিশুদ্ধ অক্সিজেনের পরিবেশে হীরার একটি Ignition point রয়েছে, যা ৬৯০° (ডিগ্রী) সেলসিয়াস (১২৭৪°F) থেকে ৮৪০° (ডিগ্রী) সেলসিয়াস (১৫৪০°F) । হীরা প্রায় ৭০০° (ডিগ্রী) সেলসিয়াসের উপরে Fluorine gas এর সাথেও বিক্রিয়া করে । হীরা অত্যন্ত উচ্চ প্রতিসরাঙ্ক সূচক এবং উচ্চ বিচ্ছুরণ ধারণ করে । বেশিরভাগ হীরা ''চোখ দ্বারা" আতস কাঁচের (Magnifying glass) সাহায্যে সনাক্ত করা হয় । হীরা কঠিন পদার্থ বলে এর সাহায্যে কাঁচ, পাথর ইত্যাদি কর্তন করা যায় । হীরক চূর্ণ পালিশ / ঔজ্বল্য / চাকচিক্যের কাজে ব্যবহৃত হয় । বর্তমানে রসায়নাগারে উচ্চ তাপমাত্রা এবং কঠিন চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে অতি বিশুদ্ধ কার্বনকে স্ফটিকীকরণ বা রাসায়নিক বাষ্প অবক্ষেপণ বা তলানি (CVD / Chemical vapor deposition) করার মাধ্যমে Hydrocarbon gas থেকে কৃত্রিম হীরা (Synthetic diamond) সৃষ্টি করা যায় । ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসী রসায়নবিদ ফার্দিনান্দ ফ্রেডেরিক হেনরি ময়সাঁ (Ferdinand Frederick Henri Moissan) কৃত্রিম হীরা তৈরি করতে বিশুদ্ধ লোহার সাথে চিনি-অঙ্গার মিশ্রিত করে গ্রাফাইট গলনপাত্রে (Crusible) রেখে বৈদ্যুতিক চুল্লীতে ৩৫০০º (ডিগ্রী) সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করে । পরবর্তীতে এ দ্রবণকে ৩২৭º (ডিগ্রী) সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বিশিষ্ট সীসার দ্রবণে ডুবানো হয় । এখানে গ্রাফাইটের উপর প্রচণ্ড তাপ ও চাপ প্রয়োগ করা হয় এবং লোহা অনুঘটক (Catalyst) হিসেবে কাজ করে । প্রতি বর্গকিলোমিটারে ০১ লক্ষ কিলোবার পর্যন্ত চাপ এবং বৈদ্যুতিক চুল্লিতে ২৫০০০º (ডিগ্রী) সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপ প্রয়োগ করা হয় । ঠান্ডা হওয়ার পর লৌহ-আবরণের মাঝে শক্তভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কৃত্রিম হীরা সৃষ্টি হয় । অবশেষে নাইট্রিক অ্যাসিডে [Nitric acid (HNO3)] লোহাকে দ্রবীভূত করে হীরা মুক্ত করা হয় । এটি প্রায় খনিজ হীরকের অনুরূপ গুণ সম্পন্ন পদার্থ বিশেষ । কৃত্রিম হীরা বর্ণহীন, তবে রঙিনও হতে পারে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক কোম্পানি General Electric কৃত্রিম হীরা তৈরি করতে সফল হয় । ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবীতে প্রথম প্রচলন হয় কৃত্রিম হীরা । তবে ধারণা করা হয়, রাশিয়ার কিছু কোম্পানি এর অনেক আগেই কৃত্রিম হীরা তৈরি করেছিল । শিল্পে ব্যবহারের জন্য প্রতি বছর প্রায় ৫০০০ মিলিয়ন ক্যারেট (১০০০ টন) কৃত্রিম হীরা (Synthetic diamond) উৎপাদিত হয় । প্রকৃতপক্ষে অতি উচ্চ তাপ এবং চাপের ক্রিয়ায় ভূ-পৃষ্ঠের নিচে অবস্থিত গ্রাফাইট বা অঙ্গার থেকে প্রাকৃতিকভাবে হীরা উৎপন্ন হয়ে থাকে । পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ১৩০০০০০০০ ক্যারেট (২৬০০০ কিলোগ্রাম) খনিজ হীরা উত্তোলন করা হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার । তবে, প্রাকৃতিক হীরার তুলনায় কৃত্রিম হীরার আকার অপেক্ষাকৃত ছোট । Cubic zirconium, Silicon carbide ইত্যাদি উপকরণ থেকেও সবচেয়ে নিখুঁত নকল হীরা (Imitation diamond) তৈরি করা যায় । কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত বৃত্তাকার, ঝকঝকে, অনেকগুলো দিকসহ পরিষ্কার রত্নপাথর হচ্ছে যেমন: Cubic zirconium, Moissanite, Rhinestone, Ferroelectric, Rutile, Fabulite, Serasite ইত্যাদি । Raman spectroscopy এর কৌশল সহজেই প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম হীরার অসম্পূর্ণতা ও ত্রুটি সনাক্তকরণ, সমাধান, হীরার অভিনব রঙ সৃষ্টি কিংবা পাথরের রত্নতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে আরও ভাল করে "হীরার মত" উন্নত রূপ দিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে । Electronic thermal probe এর মাধ্যমে হীরা সনাক্তকরণ বা বেশিরভাগ নকল ও ছদ্মবেশধারী (Simulant) হীরাকে আলাদা করা যায় । হীরার উৎস বা উৎপত্তি নির্ধারণের জন্য সংক্ষিপ্ত তরঙ্গে অতিবেগুনি রশ্মির অধিনে Spectroscopy, Microscopy, Luminescence এর মত কৌশলগুলো ব্যবহার করা হয় । হীরা শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় বিশেষভাবে তৈরি দুটি Screening device হচ্ছে: DiamondSure এবং DiamondView । কৃত্রিম হীরা শনাক্ত করার ক্ষেত্রে যেমন: (ক) CVD হীরা সাধারণত Orange fluorescence (খ) D-J রঙিন হীরা Diamond Spotter (গ) D-Z রঙের পাথর DiamondSure UV / Visible spectrometer এর মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয় । প্রাকৃতিক এবং কৃত্রিম হীরার মধ্যে পার্থক্যকারী বাণিজ্যিক Screening device গুলো হচ্ছে: D-Screen (WTOCD / HRD Antwerp), Alpha Diamond Analyzer (Bruker / HRD Antwerp), D-Secure (DRC Techno) ইত্যাদি । হীরা বা রত্নপাথরের ক্ষেত্রে ক্যারেট হচ্ছে ভরের (মাপের) একক । এক ক্যারেট = ০.০২ গ্রাম বা ২০০ মিলিগ্রাম (০.০০৭০৫৫ আউন্স) । উল্লেখ্য যে, ক্যারেট হচ্ছে স্বর্ণ পরিমাপের ক্ষেত্রে বিশুদ্ধতার একক । ২৪ ক্যারেট বলতে বোঝায় ২৪ ক্যারেট স্বর্ণের মধ্যে ২৪ ভাগই বিশুদ্ধ স্বর্ণ । অর্থাৎ ৯৯.৯ শতাংশ খাঁটি স্বর্ণ । ২২ ক্যারেট স্বর্ণের মধ্যে ২২ ভাগ স্বর্ণ থাকে এবং অন্যান্য ধাতুর ০২ ভাগ খাদ হিসেবে যুক্ত । সাধারনত ১০ ক্যারেট, ১৪ ক্যারেট, ১৮ ক্যারেট, ২০ ক্যারেট, ২২ ক্যারেট, ২৪ ক্যারেট হিসেবে স্বর্ণ পাওয়া যায় । ইংরেজি চারটি C অক্ষরের সর্বোত্তম সমন্বয়ে গঠিত 4C হচ্ছে: Carat (ওজন), Cut (কাটার পর আকৃতি), Clarity (স্বচ্ছতা বা নির্মলতা, স্ফুটন) এবং Color (বর্ণ) দিয়ে হীরার মূল্য, সৌন্দর্য এবং মান নির্ণয় করা হয় । এসব বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতেই হীরার প্রভা এবং মূল্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে । সাধারণভাবে হীরা যত বেশি বর্ণহীন, হীরার চাহিদা এবং মূল্য তত বেশি । একটি আদর্শ খাঁটি হীরা এক ফোঁটা জলের মতো স্বচ্ছ । এটি বর্ণহীন স্ফটিকের মত দেখায় । উন্নতমানের হীরায় আলোকরশ্মি পতিত হলে ধূসর ও সাদা রঙের প্রতিফলন ঘটে । এ প্রতিফলনকে প্রভা বা অত্যুজ্বলতা (Brilliance) বলে । তবে, অতিবেগুনি রঞ্জন-রশ্মির (Cathode) প্রভাবে হীরার ভেতর থেকে বিভিন্ন রঙের আলোক বিকিরণ ঘটায় (আলো বিচ্ছুরিত হয়) । জ্বলজ্বলে রোদে রংধনুর সমস্ত রঙের সাথে খেলা করে । বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে যে, বিশুদ্ধ হীরাকে পানির পাত্রে ডুবানো হলে সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যায় । উজ্জ্বল হীরা থেকে পরিষ্কারভাবে লাল / রক্তাভ, গোলাপি, নীল, সবুজ এবং হালকা হলুদ বর্ণের আভা প্রতিফলিত হয় । এ হীরা সাধারণত খুবই দুর্লভ এবং উচ্চমূল্যের । পৃথিবীতে প্রাপ্ত সকল খনিজের মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান হচ্ছে হীরা । খাঁটি হীরা আগুনে পোড়ালে কয়লা হয়ে যায় । সাধারণত হীরার উচ্চমাত্রার তাপ পরিবাহিতা (Thermal conductivity) থেকে এ রত্ন শনাক্ত করা হয় । প্রাচীন, দুর্লভ, জগদ্বিখ্যাত, বৃহত্তম ও মসৃণকৃত হীরা হচ্ছে কোহিনূর https://web.facebook.com/ashrafulalam715/posts/1940450319401629 । বড় আকৃতির স্বচ্ছ, বিশুদ্ধ এবং উজ্জ্বল নীল বর্ণের হীরাকে বলা হয় Paragon diamond, যার অর্থ 'আপাত সম্পূর্ণ সুন্দর বা পরমোৎকর্ষের মূর্ত রূপ' । ভূগর্ভের প্রায় ৬৬০ কিলোমিটার (৪১০ মাইল) গভীরে Lower mantle এ নীল হীরা সৃষ্টি হয় । স্পেনের রাজার কাছে ছিল ৩৫.৫৬ ক্যারেটের (৭.১১২ গ্রাম) এক অসাধারণ সুন্দর নীল হীরা Wittelsbach diamond । এটি পরবর্তীতে ক্রিস্টির নিলামে (Christie's auction) প্রায় ২৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রী হয় । ২৬শে জানুয়ারী ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিমিয়ার নং ০২ খনিতে আবিষ্কৃত হয় 'কুলিনান' হীরা (Cullinan Diamond) । এটিকে The Great Star of Africa বলা হয় ৷ হীরাটির ওজন ছিল ৩১০৬.৭৫ ক্যারেট ৷ এটি কাটার পর ওজন হয় ৫৩০ ক্যারেট ৷ খনির চেয়ারম্যান Thomas Culinan এর নামানুসারে হীরাটির নামকরণ করা হয় । ১৬ নভেম্বর ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ আফ্রিকার বতসোয়ানার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় Karowe খনিতে ১১০৯ ক্যারেটের 'Lesedi La Rona' (পূর্বনাম ছিল: Karowe AK6, Quad 1) নামক তৃতীয় বৃহত্তম হীরা পাওয়া যায় । এছাড়া উজ্জ্বল, মনোমুগ্ধকর জ্যাকব হীরাটি (Jacob Diamond) ছিল বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ হীরা । এটি Victoria Diamond, Imperial Diamond, Great White Diamond নামেও পরিচিত । ১৮৫.৭৫ ক্যারেট ওজনের জ্যাকব হীরাটি দক্ষিণ আফ্রিকার Kimberley খনি থেকে ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে আহরণ করা হয় । ভারতের হিমাচল প্রদেশ রাজ্য শিমলা এর ইহুদি রত্ন ব্যবসায়ী Alexander Malcolm Jacob তেলেঙ্গানা রাজ্য হায়দ্রাবাদের ষষ্ঠ আসাফ জাহ মীর মাহবুব আলি খান সিদ্দিকির (ষষ্ঠ নিজাম, ১৭ই আগস্ট ১৮৬৬ – ২৯শে আগস্ট ১৯১১খ্রিস্টাব্দ) নিকট জ্যাকব হীরাটি বিক্রি করেন । Alexander Malcolm Jacob এর নামানুসারে হীরাটির নামকরণ করা হয় । ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান খনিতে ৭৫৫ ক্যারেটের The Golden Jubilee হীরা আবিস্কৃত হয় এবং কাটার পর এটি হয় ৫৪৫ ক্যারেট ৷ The Star of Sierra Leone নামের ৬৮.৮০ ক্যারেট এবং ২২৫ গ্রামের একটি হীরা ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে সিয়েরা লিওনে পাওয়া যায় । ৫৯.৬০ ক্যারেটের The Pink Star নামের দুর্লভ হীরাটি বিশ্বের সবচেয়ে দামি হীরা । এছাড়া, নাশপাতি আকৃতির "The Key 10138" নামের ১০১ ক্যারেটের একটি হীরার বাজার মূল্য প্রায় ১২.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার । পাথর বিশেষজ্ঞগণ (Gamologist) বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও পদ্ধতি দ্বারা আসল হীরার গুণগত মান বের করে হীরার মূল্যমান নিশ্চিত করেন । বিদ্যুৎ পরীক্ষা (Electricity test), কুয়াশা পরীক্ষা (Fog test ), স্ক্র্যাচ পরীক্ষা (Scratch test), স্বচ্ছতা পরীক্ষা (Clarity test), আল্ট্রা ভায়োলেট পরীক্ষা (Ultra violet test), হিট টেস্টের (Heat test) মতো বেশ কয়েকটি পরীক্ষা দ্বারা আসল হীরা চিহ্নিত করা হয় । পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার প্রত্যন্ত উত্তরে পূর্ব Kimberley অঞ্চলে অবস্থিত Argyle হীরার খনি ওজনের দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম হীরা উৎপাদক । যা প্রতি বছর ৩৫০০০০০০ ক্যারেট (৭০০০ কিলোগ্রাম) হীরাসহ প্রাকৃতিক হীরার বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, যার মধ্যে প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ বাদামী হীরা । ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে Argyle হীরা খনি  আবিষ্কৃত হয় এবং এখানে প্রায় ৯৩.১ মিলিয়ন ক্যারেট হীরা মজুদ আছে । আফ্রিকা মহাদেশে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ হীরার খনি । দক্ষিণ আফ্রিকার Kimberleyতে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহত্তম হীরা খনি রয়েছে । রাজনৈতিকভাবে অস্থির মধ্য আফ্রিকা এবং পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে কিছু দুর্নীতিগ্রস্থ সরকার ও যুদ্ধবাজ বিদ্রোহী / বিপ্লবী গোষ্ঠী হীরার খনির নিয়ন্ত্রণ করে থাকে । এ সকল খনি থেকে উত্তোলিত হীরা বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ যুদ্ধ, সন্ত্রাস, জঙ্গী তৎপরতা ইত্যাদি কাজে ব্যবহৃত হয় বলেই এ হীরাকে 'রক্ত হীরক' নামে অভিহিত করা হয় । যদিও জাতিসংঘ এবং হীরা শিল্প ও হীরা ব্যবসায়ী দেশগুলো ২০০২ খ্রিস্টাব্দে কিম্বার্লি প্রক্রিয়া (Kimberley Process) চালু করে । কিম্বার্লি প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হচ্ছে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয় এমন হীরাগুলোর সাথে যেন বিরোধপূর্ণ (দ্বন্দ্ব যুক্ত) হীরা মিশে না যায় তা নিশ্চিত করা । কানাডা সরকার কানাডীয় হীরাকে প্রমাণীকরণে সহায়তা করার জন্য Canadian Diamond Code of Conduct নামে পরিচিত একটি সংস্থা গঠন করেছে । এটি হীরার জন্য এক কঠোর Tracking system এবং কানাডা উৎপাদিত হীরার গায়ে "দ্বন্দ্ব মুক্ত" (Conflict free) চিহ্ন আঁটা / সেঁটে দেওয়ার ফলে তার পরিচয় রক্ষা করতে সাহায্য করে ৷ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Arkansas, Colorado, New Mexico, Wyoming, Montana রাজ্যে হীরা পাওয়া যায় । Arkansas রাজ্যের The Crater of Diamonds State Park জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এবং এটি বিশ্বের একমাত্র খনি যেখানে জনসাধারণ হীরা খনন করতে পারে । বিস্ময়কর হচ্ছে যে, Matryoshka দ্বৈত হীরা (Double diamond) রাশিয়ার Yakutiaতে ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবার বিরলভাবে আবিষ্কৃত হয় । ২০২১ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার Ellendale Diamond Field এর মধ্যেও দ্বৈত হীরা পাওয়া যায় । হীরা সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি De Beers হচ্ছে খনি থেকে হীরা উৎপাদনকারী বিশ্বের বৃহত্তম প্রভাবশালী কোম্পানি এবং এটি প্রায় শতকরা ৪০ ভাগ হীরা উৎপাদন করে । ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ার পূর্ব সাইবেরিয়ার মেরিনা অঞ্চলে বিশ্বের দ্বিতীয় গভীর হীরা খনি মির (Mir Mine) আবিষ্কৃত হয় । মিরের ব্যাসরেখার দৈর্ঘ্য ১.২ কিলোমিটার এবং ১২০০ মিটার বা ৩৯০০ ফুট গভীরতা । এখানে প্রায় ৯৭.৪ মিলিয়ন ক্যারেট হীরা মজুদ রয়েছে । ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ Botswanaতে সবচেয়ে বড় উত্তোলনকারী খনি (Orapa Diamond Mine) আবিষ্কৃত হয় । এখানে প্রায় ১৫১.৪ মিলিয়ন ক্যারেট হীরা মজুদ রয়েছে । Orapa অর্থ ''সিংহের কুস্তি খেলার স্থান'' । এছাড়া অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ হীরা খনি কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে অষ্ট্রেলিয়ার BHP Billiton, রাশিয়ার Alrosa, ইউক্রেনের Rio Tinto, কানাডার Diavik Diamond Mine, দক্ষিণ মধ্য জিম্বাবুয়ের Murowa Diamond Mine ইত্যাদি । হীরার বাজারে সুপরিচিত বিশ্ব বিখ্যাত শীর্ষস্থানীয় পণ্যচিহ্ন (Brand) যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে: Tiffany & Co, Harry Winston, Cartier, Chopard, Van Cleef, Arpel ইত্যাদি । হীরার কঠোরতা এবং একে বিদীর্ণ করার ক্ষমতা দৃঢ়ভাবে নির্ভর করে স্ফটিক স্থিতি-বোধ বা অভিযোজনের উপর । অতএব, হীরা কাটার জন্য হীরার স্ফটিক কাঠামো X-ray diffraction ব্যবহার করে বিশ্লেষণ করা হয় । কারণ, বেশিরভাগ হীরাতে দৃশ্যমান অ-হীরা অন্তর্ভুক্তি এবং স্ফটিক ত্রুটি রয়েছে । ঐতিহ্যবাহী হীরা কর্তন কেন্দ্রগুলো হচ্ছে: Antwerp, Amsterdam, Johannesburg, New York City, Tel Aviv এবং সম্প্রতি China, India, Thailand, Namibia, Botswanaতে হীরা কর্তন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । কিংবদন্তি যে, মূল্যবান হীরা খনিজটি প্রাচীনকাল থেকেই ঔষধি হিসেবে ব্যবহৃত হয় । বিশেষভাবে মানসিক ব্যাধি নিরাময়ের ক্ষেত্রে যেমন: Phobia, Nervous breakdown, Depression, Neurosis, Unreasonable fear ইত্যাদি । ভেষজবিজ্ঞানীদের (Litho therapist) অভিমত, হীরা খনিজটি ব্যক্তির স্নায়ুতন্ত্রকে সংশোধন করতে সক্ষম এবং এর ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে । বিশ্বাস করা হয়- ধূমপান, মদ্যপান এবং মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে এটি লড়াই করতে সহায়তা করে । জ্যোতিষশাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত মূল্যবান এ সূক্ষ্ম স্ফটিক খনিজটিতে ব্যতিক্রমী যাদুকরী শক্তি রয়েছে । এছাড়া প্রাচীনকালে হীরার সাথে ধর্মীয় নানা বিষয় জড়িত ছিল, যেমন হীরাকে দেবতাদের অশ্রু এবং পতনশীল কোন নক্ষত্র বা তারকা মনে করা হতো । হীরা পাথরকে (Diamond stone) শুক্র গ্রহের পাথর বলা হয় । শুক্র গ্রহ সৌভাগ্য, সৌন্দর্য ও আভিজাত্যের প্রতীক । বৃষ রাশি (Taurus, April 21- May20), মিথুন রাশি (Gemeni, May 21– Jun 20), তুলা রাশি (Libra, Sept: 21– Oct 20), কন্যা রাশির (Virgo, Aug 21– Sept 20) জাতক-জাতিকাদের জন্য বিশেষ উপকারী হচ্ছে হীরা পাথর । ফলে হীরা পাথর ব্যবহারে যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে ।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি হীরা উত্তোলন করে: রাশিয়া শতকরা ২৩.৫, বোতসোয়ানা ১৫, কানাডা ১৩, অ্যাঙ্গোলা ৮.১, দক্ষিণ আফ্রিকা ২.৮, কঙ্গো ২.৮, নামিবিয়া ০২, অস্ট্রেলিয়া ১.৫, ব্রাজিল, চীনসহ অন্যান্য দেশ ২.৮ ভাগ । Clarity grading system (GIA) এর উপর ভিত্তি করে হীরাকে মোট ১১টি শ্রেণীতে (Grade) ভাগ করা হয় । এদের মধ্যে Internally Flawless (IF) বা Flawless (F) শ্রেণীর হীরা খুবই নিখুঁত বা চমৎকার বা সর্বোৎকৃষ্ট । এ সকল হীরার মধ্যে কোন রকম ত্রুটি বা অপদ্রব্য থাকে না । পুরোটাই খাঁটি, স্বচ্ছ এবং Carbon পরমাণুর বর্ণহীন স্ফটিক । বিভিন্ন আকার হীরা হচ্ছে: Round Brilliant, Princess, Oval, Radiant, Cushion, Asscher, Pear, Emerald, Square Cushion, Rectangle Cushion, Trillion, Heart, Marquise, Rose ইত্যাদি । প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হওয়া দীপ্তিময় শ্বেত হীরা (White diamond) সচরাচর দেখা যায় । তবে ভিন্ন রঙের মনকাড়া হীরা যেমন: Ruby (লাল), Sapphire (নীল), Emerald (সবুজ) খুবই দুষ্প্রাপ্য । এগুলোর মূল্যও আকাশচুম্বী । তাই এক চমৎকার অভিব্যক্তি− 'A diamond is forever' ।

https://web.facebook.com/muhammadashraful.alam/posts/1949252648521396

No comments:

Post a Comment

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...