প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর পূর্বে একটি বৃহৎ পরমাণুর শক্তিশালী মহাবিস্ফোরণের ফলে মহাবিশ্বের উৎপত্তি হয় । এ মহাবিস্ফোরণ ভয়ানক হিংস্রভাবে সম্প্রসারিত মহাবিশ্বের মধ্যে শক্তি বিকিরণকারী প্রচণ্ড শক্তিশালী অভিঘাত তরঙ্গের (Shockwave) সৃষ্টি করে । এক সেকেন্ডের এক মিলিয়ন ভাগের এক ভাগ সময়ে মহাবিশ্বের অস্তিত্বের আদিম গঠন ৩টি স্বতন্ত্র পর্যায়গুলোর মধ্য দিয়ে স্থানান্তরিত হয় । তড়িচ্চুম্বকীয়, মাধ্যাকর্ষণ এবং দুর্বল বা শক্তিধর শক্তিগুলো মৌলিক শক্তি হিসেবে আকার ধারণ করে । সেই সময় প্রোটন মৌলিক কণিকা এবং অতিপারমাণবিক নিউট্রন কণিকা গঠনের জন্য তাপমাত্রা ছিল অত্যাধিক । পরবর্তীতে তাদের অভ্যন্তরীণ অংশ থেকে তৈরি সুরুয়া (Soup) মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে । এটি Quark বা Gluon নামেও পরিচিত । চোখের পলকেই এ সুরুয়া ঠান্ডা হয়ে সাধারণ বস্তু বা পদার্থের প্রথম লক্ষণগুলোর জন্ম দেয় । বিজ্ঞানীদের ধারণা, অতিক্ষুদ্র মৌলকণার সুরুয়া শুধুমাত্র প্রাকৃতিকভাবেই নিউট্রন নক্ষত্রের কেন্দ্রস্থলে বিদ্যমান থাকতে পারে । প্রলয়ঙ্করী মহাবিস্ফোরণের পর প্রায় ৩ লক্ষ ৮০ হাজার বছর থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক শত মিলিয়ন বছর পর্যন্ত হাইড্রোজেন এবং খুবই সামান্য পরিমাণ আলফা কণিকা হিলিয়াম নিউক্লিয়াস ছাড়া গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ ইত্যাদি বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের কোনো অস্তিত্বই ছিল না । তাই, এ সময়টিকে বলা হয় অন্ধকার যুগ । সময়ের হাত ধরে এ মহাবিশ্ব বা মহাজাগতিক উত্তপ্ত বস্তুগুলো ধীরে ধীরে শীতল হয় । মহাবিস্ফোরণের পরপরই মহাবিশ্বের উপর আধিপত্য বিস্তারকারী প্রচণ্ড গরম ও ঘন পদার্থ Plasma Soup (Quark-Gluon Plasma) থেকে আলোকরশ্মি বের হয়ে আসতে পারছিল না । পরবর্তীতে হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো প্লাজমার সাথে ধাক্কা খেয়ে ফোটন আলোক কণিকা বের হয়ে আসে । নক্ষত্র জন্ম নেয় । সেটিই হয় আলোর উৎস যেখান থেকে আলো আসতে শুরু করে । তবে, সেই অন্ধকার যুগ নির্দিষ্টভাবে ঠিক কখন শেষ হয়েছিল কিংবা কখনইবা প্রথম নক্ষত্র, ছায়াপথ, গ্রহ এবং প্রাণের উদ্ভব বা জীবনের শুরু হয়েছিল— তা এখনো অজানা ।
এ মহাবিস্ফোরণের প্রায় ৩ মিনিট থেকে ১০০০০০ বছরের মধ্যে হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম মৌলিক পরমাণুসহ প্রচুর পরিমাণ ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন, ইলেকট্রন প্লাজমা ও ভারি বস্তুকণা তৈরি হয় । অসংখ্য বস্তুকণা প্রচণ্ড গতিতে মহাবিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যায় এবং এদের কণিকাগুলো ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত । এগুলো ধীরে ধীরে শীতল হয় এবং ভিতরের আন্তঃআকর্ষণের কারণে বস্তুপুঞ্জগুলো কাছাকাছি চলে আসে । দলবদ্ধ বস্তুপুঞ্জের ঘনত্ব বৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত মহাকর্ষীয় আকর্ষণের ফলে একটি ঘূর্ণনগতির সৃষ্টি হয় । এ ঘূর্ণন গতির কারণেই মহাকাশের মেঘগুলো ঘূর্ণায়মান চাকতিতে পরিণত হয় । পর্যায়ক্রমে নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বস্তুপুঞ্জগুলো বিভিন্ন আকৃতির একক দল গঠন করে এ অসীম মহাবিশ্বে ছায়াপথ, ছায়াপথ স্তবক এবং ছায়াপথ মহাস্তবক ইত্যাদি সৃষ্টি করে । ছায়াপথ মহাস্তবকের সম্মিলিত ভর একটি মহাকর্ষীয় অক্ষিকাচ (Gravitational Lens) হিসেবে কাজ করে এবং অনেক দূরবর্তী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলোকবিন্দুগুলোকে বিবর্ধিত করে । যেখানে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য লাল-নীল-সবুজ ছায়াপথ, নক্ষত্রপুঞ্জ, অগণিত গোল-চ্যাপ্টা-লম্বাটে বিভিন্ন আকারের নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহ, ধূমকেতু এবং উল্কা ইত্যাদি । এক একটি ছায়াপথ প্রতিটি ছায়াপথগুচ্ছকে ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছে ৷ বিশাল আকৃতির ছায়াপথসহ মহাজাগতিক বিভিন্ন বস্তুগুলোকে সরাসরি কিছু ভর ও মহাকর্ষীয় শক্তি বৃদ্ধি করে এদেরকে মহাকাশে একটি সু-শৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে একসাথে ধরে রেখেছে এক প্রকার রহস্যজনক অদৃশ্য ‘অন্ধকার পদার্থ’ (Dark Matter) ৷ ছায়াপথ থেকে শুরু করে মহাজাগতিক অন্যান্য বস্তু এমনকি আমাদের দেহের উপাদানও এ অন্ধকার পদার্থের অন্তর্ভুক্ত । সৃষ্টিতত্ত্বে এটিকে Baryonic Dark Matter বলে ৷ এ সীমানাহীন মহাবিশ্বে শতকরা ৪.৯ ভাগ পদার্থ Normal Matter (নক্ষত্র, গ্রহ, ছায়াপথ, গ্যাস ও ধূলিকণা), শতকরা ২৬.৮ ভাগ পদার্থ Dark Matter, শতকরা ৬৮.৩ ভাগ Dark Energy এর অদৃশ্য প্রভাব এবং নিউট্রিনো ও ফোটন কণার মতো অন্যান্য উপাদানগুলো খুবই সামান্য পরিমাণে অবদান রাখে ৷ কিন্তু এ Dark Energy (অন্ধকারশক্তি বা তমোশক্তি বা গুপ্তশক্তি বা কৃষ্ণশক্তি) হচ্ছে বিশাল মহাবিশ্বের মহাকর্ষীয় বলের মূল চালিকাশক্তি যেটি সমস্ত মহাশূন্য জুড়ে বিস্তৃত এবং এটি মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে । অসংখ্য নক্ষত্র, নাক্ষত্রিক অবশেষ, গ্রহাণু, উল্কা, ধূমকেতু, আন্তঃগ্রহীয় ধূলি মেঘ, আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাস, ধূলিকণা, নীহারিকা, সৌরজগৎ, কৃষ্ণগহ্বর এবং অদৃশ্য পদার্থসহ মহাজাগতিক নানা বস্তুর সমন্বয়ে গঠিত হয় এক একটি ছায়াপথ । একটি ছায়াপথে গড়ে প্রায় ১০০ – ৫০০ বিলিয়ন নক্ষত্র থাকে । আকাশগঙ্গা ছায়াপথের (Milky Way Galaxy) ব্যাস ১০০০০০ আলোকবর্ষ । এ বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে বিদ্যমান দুই ট্রিলিয়ন ছায়াপথের মধ্যে আমাদের ছায়াপথ একটি । এ রকম প্রায় অর্ধশতাধিক ছায়াপথের সমন্বয়ে গঠিত হয় এক একটি ছায়াপথ স্তবক বা গুচ্ছ (Galaxy Cluster) । ছায়াপথ স্তবকগুলোই গঠন করে একটি ছায়াপথ মহাস্তবক (Galaxy Supercluster) যেটি মহাবিশ্বে এক বিশাল মহাকর্ষীয় কাঠামো তৈরি করে যেখানে কয়েক লক্ষ ছায়াপথের আবাসস্থল । এ সকল ছায়াপথ মহাস্তবকের মাঝে বিদ্যমান একটি ছায়াপথ স্তবক থেকে অন্য এক একটি ছায়াপথের মধ্যকার দূরত্ব থাকে লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ । সুতরাং একটি ছায়াপথ মহাস্তবকের আকার কতো বৃহৎ, তা নিশ্চয়ই চিন্তার বিষয়? ল্যানিয়াকিয়া ছায়পথ মহাস্তবক (Laniakea Galaxy Supercluster) হচ্ছে আমাদের নিজস্ব বাসস্থান আকাশগঙ্গা ছায়াপথসহ আশেপাশে প্রায় ১০০০০০ অন্যান্য ছায়াপথের আবাসস্থল । যেখানে ঐ আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৭০০০ আলোকবর্ষ দূরে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের এক অতি ক্ষুদ্র অংশের সর্পিল কালপুরুষ বাহুর (The Orion Arm) এক প্রান্তে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর পূর্বে জলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্য নামক নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে একাধিক গ্রহ নিয়ে গঠিত হয়েছে আমাদের সৌরজগৎ । যদিও, আদি মহাবিশ্বের ইতিহাস খুবই হিংস্র । এক মহা দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মহাবিশ্বের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সৌরজগতের সৃষ্টি । কালের আবর্তে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে প্রচণ্ড উত্তপ্ত অবস্থা থেকে পৃথিবী গ্রহটি এক সময় ঠান্ডা, শান্ত এবং জীবন ধারণের উপযোগী হলে এখানে প্রাণের উদ্ভব হয় । এ সবুজ গ্রহটিই আমাদের বাড়ি । মায়ের কোলের মতোই নিরাপদ আশ্রয়স্থল । কিন্তু, এ মৃত্যুন্মুখ গ্রহটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে! মানবজাতি টিকবে তো?
বৃষ্টিহীন অন্ধকার রাতে মহাকাশের দিকে তাকালে জ্বলজ্বল করা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অগণিত আলোকবিন্দু দেখা যায় । এদের কোনোটি মিটমিট করে জ্বলে এবং কোনোটি স্থির হয়ে জ্বলছে । মিটমিটে আলোকবিন্দুগুলোই হচ্ছে এক একটি নক্ষত্র । এরা নিজে নিজেই জ্বলে । অন্যদিকে স্থির আলোকবিন্দুগুলো হচ্ছে বিভিন্ন গ্রহ । এরা নক্ষত্রের আলোয় আলোকিত । মহাকাশে অবস্থিত কোনো মহাজাগতিক বস্তু নিজের অভ্যন্তরীণ পদার্থকে নিউক্লীয় সংযোজন বা একীকরণ (Nuclear Fusion) বিক্রিয়া ঘটিয়ে ক্রমাগত জ্বালানি উৎপাদন করে নিজেকে জ্বালিয়ে প্রচুর পরিমাণ আলো ও তাপ উৎপন্ন করে উজ্জ্বলিত থাকে তাকেই নক্ষত্র বলে । এছাড়া, মহাশূন্যে আয়নিত গ্যাস বা প্লাজমা দশায় অবস্থিত অতি উজ্জ্বল এবং সুবৃহৎ গোলাকার জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ডকেও নক্ষত্র বলে । নক্ষত্রের জীবনচক্র হতে পারে শত শত মিলিয়ন কিংবা বিলিয়ন বছর সময়কাল । মহাকাশে প্রতিনিয়ত এ নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যুর খেলা চিরকাল ধরে চলছে । একটি নক্ষত্রের জন্মকাল থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে যে বিবর্তন ঘটে থাকে তাকে বলা হয় ‘নাক্ষত্রিক বিবর্তন’ (Stellar Evolution) । নক্ষত্রের হাইড্রোজেন জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার পর বিকিরণের চাপে ব্যাসার্ধ বেড়ে গিয়ে এটি একটি লোহিত দানব নক্ষত্রে পরিণত হয় ৷ এক পর্যায় ধীরে ধীরে ‘শ্বেত বামন’ নক্ষত্রে রূপ নেয় । তবে, কখনো দুর্লভভাবে এটি ভয়ঙ্কর নাক্ষত্রিক বিস্ফারণের মধ্য দিয়ে পুরো সৌরজগতকেও নিমিষেই ধ্বংস করে দিতে সক্ষম । Star শব্দটি গ্রিক শব্দ Aster থেকে এসেছে, যেটি হিত্তীয় ভাষার শব্দ শিত্তার থেকে উদ্ভূত । শিত্তার শব্দের ব্যুৎপত্তি হয়েছে সংস্কৃত শব্দ সিতারা থেকে । একটি নক্ষত্রের আকার, উজ্জ্বলতা, বিবর্তন, জীবনচক্র এবং সর্বশেষ নিজের ধ্বংস সবকিছুই নির্ভর করে তার ভরের উপর । ভর যতো বেশি হয়, ততোই দ্রুত জ্বালানি শেষ হয় ৷ এ মহাবিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তম লাল মহাদানব নক্ষত্রটি হচ্ছে UY Scuti । এটি সূর্যের চেয়ে প্রায় ১০০০ গুণেরও বেশি প্রশস্ত । অধিকাংশ নক্ষত্রের বয়স ১০০ – ১০০০ কোটি বছরের মধ্যে । তবে অতিপ্রাচীন কিছু নক্ষত্রের বয়স এ মহাবিশ্বের বয়সের কাছাকাছি, যেখানে মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর । অতি প্রাচীনতম একটি নক্ষত্র হচ্ছে HE1523-0901 যেটির বয়স প্রায় ১৩২০ কোটি বছর । মহাকাশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধূলিকণা, বস্তুপুঞ্জ, হাইড্রোজেন গ্যাস এবং প্লাজমা দ্বারা গঠিত এক ধরনের আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘকে ‘নীহারিকা’ বলে । এ নীহারিকায় শতকরা ৫০ – ৭৫ ভাগ হাইড্রোজেন গ্যাস, শতকরা ২০ – ৪৫ ভাগ হিলিয়াম গ্যাস এবং শতকরা ৫ ভাগ অন্যান্য মৌলিক পদার্থ রয়েছে । সুবিশাল আকারের এন্ড্রোমিডা ছায়াপথের পূর্ব নাম ছিল Andromeda Nebula । জমাট বাঁধা ঠাণ্ডা নীহারিকা থেকেই নক্ষত্রের জন্ম ।
নক্ষত্রের জ্বালানি হচ্ছে উদজান বা হাইড্রোজেন । হাইড্রোজেন একটি মৌলিক পদার্থ ৷ হাইড্রোজেনের পরমাণুতে ১টি মাত্র ইলেকট্রন থাকে ৷ এ অধঃপরমাণু মৌলিক কণা ইলেকট্রনটি নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে ৷ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির সময় তৈরি হওয়া প্রথম মৌল হাইড্রোজেনের ৩টি আইসোটোপ রয়েছে যেমন: (ক) প্রোটিয়াম (খ) ডিউটেরিয়াম (গ) ট্রিটিয়াম ৷ মহাকর্ষ বলের প্রভাবে নক্ষত্রমণ্ডলীয় গ্যাস এবং ধূলিকণা মেঘ বা গ্যাসের ধূলিমেঘ (Dust Cloud) জমাটবদ্ধ হয়ে একটি নক্ষত্রের জন্ম প্রক্রিয়া শুরু হয় । মহাকাশে মেঘ যতো বেশি জমাটবদ্ধ হয় নক্ষত্রের অভ্যন্তরীণ অণুগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের তীব্রতাও ততো বেশি বৃদ্ধি পায় । এতে করে প্রচণ্ড উত্তাপের সৃষ্টি হয় । এ তাপ এমন এক পর্যায় (তাপমাত্রা যখন প্রায় ১ কোটি কেলভিনে উন্নীত হয়) গিয়ে পৌঁছানোর পর নক্ষত্রের অভ্যন্তরে চলতে থাকা নিউক্লীয় কেন্দ্রীন সংযোজন বা একীকরণ বিক্রিয়ার কারণে ৪টি হাইড্রোজেন পরমাণু তার নিজের চেয়ে হালকা, বর্ণহীন, গন্ধহীন এবং স্বাদহীন নিস্ক্রিয় গ্যাস হিলিয়াম পরমাণুতে পরিণত হয় । পরবর্তীতে এ হিলিয়াম পরমাণুগুলো একত্রিত হয়ে সৃষ্টি করে কার্বন এবং সেই কার্বনের সংযোজনে তৈরি হয় নিয়ন, সিলিকন ও লোহা । অবশেষে কেন্দ্রীন বিক্রিয়ায় তাপ শোষীত হয় । যখন নক্ষত্রটির জ্বালানি হাইড্রোজেন (হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস) খুবই দ্রুত দহন হয়ে ফুরিয়ে যায় তখন এখানে ‘শেষ হুররাহ’ (Last Hurrah) ঘটে । এর ফলে নক্ষত্রের অভ্যন্তরস্থ বহির্মুখী চাপ যথেষ্ট পরিমাণ কমে গিয়ে নক্ষত্রটি সূর্যের ভরের চেয়ে অন্তত ৫ গুণ বেশি প্রসারিত হয়— যার আকার প্রায় ৩৩৩০০০ পৃথিবীর সমান । এক সময় নক্ষত্রটি নিজের মাধ্যাকর্ষণ বলকে আর ঠেকিয়ে রাখতে পারে না, ফলে নক্ষত্রের বেশিরভাগ ভরই কেন্দ্রে সংকুচিত হয়ে ফুলে ওঠে বাইরে থাকা গ্যাসীয় অঞ্চলটি প্রচণ্ড শক্তিশালী মহাপ্লাবনের মতো ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের (প্রচণ্ড অন্তস্ফোটন বা Implosion) সৃষ্টি করে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৫০০০ – ৪০০০০ কিলোমিটার প্রবলবেগে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে । এ বিশাল মহাজাগতিক বিস্ফোরণের নামই অতিনবতারা (Supernova) । অবশেষে যদি নক্ষত্রটির ভর প্রায় ৩ M সৌর ভরের চেয়ে বেশি হয়, তখন এটি মহাকর্ষীয় পতন ঘটিয়ে একটি কৃষ্ণগহ্বরে (Black Hole) পরিণত করে ।
সূর্য হচ্ছে একটি নক্ষত্র । আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রের খুব কাছের নক্ষত্রটি সূর্য । সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে ৮টি গ্রহ (এছাড়া আরো ৫টি বামন গ্রহ Pluto, Haumea, Eris, Makemake এবং Ceres), অগণিত গ্রহাণুপুঞ্জ, উল্কা এবং ধূমকেতু ইত্যাদি ৷ সূর্যের ব্যাস প্রায় ১৩ লক্ষ ৯২ হাজার কিলোমিটার যা পৃথিবীর ব্যাস থেকে ১০৯ গুণ বড় । সূর্যের ভর প্রায় ১.৯৮৯ই৩০ কিলোগ্রাম যা পৃথিবীর ভরের চেয়ে প্রায় ৩৩২৯৫০ গুণ বেশি এবং এ ভর সৌরজগতের মোট ভরের শতকরা প্রায় ৯৯.৮৬ ভাগ । ভর-শক্তি রূপান্তরের মাধ্যমে সূর্যে প্রতি সেকেন্ডে ৪২ লক্ষ মেট্রিক টন শক্তি বিমুক্ত হয় । ভর ধ্বংস হয় না বরং এ ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয় যা বিকিরণ হিসেবে মহাশূন্য ছড়িয়ে পড়ে । পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব আলোর গতিতে প্রায় ১৫২১০০০০০ কিলোমিটার বা ৯৪৫০০০০০ মাইল । আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব প্রায় ২৭২০০ আলোকবর্ষ ৷ সৌরজগৎ তথাপি সূর্য তার নিজ কক্ষপথে আকাশগঙ্গা ছায়াপথ বা নক্ষত্র জগতের কেন্দ্রস্থলকে কেন্দ্র করে চারপাশে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২৩০ কিলোমিটার গতিতে ২২.৫ - ২৫ কোটি বছরে একবার পরিভ্রমণ করে । এ পরিভ্রমণের সময়কালকে তারাজাগতিক বর্ষ (Galactic year) বা মহাজাগতিক বর্ষ (Cosmic year) বলে । আমাদের সৌরজগৎ Galactic core কে প্রদক্ষিণ করার সময় এটি মহাজাগতিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে চলাচল করে যা সময়ের সাথে সাথে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে । সেই পরিপ্রেক্ষিতে পৃথিবী গ্রহটি তার গঠনের পর থেকে মাত্র ২০ থেকে ২৫ মহাজাগতিক বছর পূর্ণ করেছে এবং সৌরজগৎ শেষবার যখন এ অবস্থানে ছিল তখন ডাইনোসররা পৃথিবী গ্রহে বিচরণ করেছিল । সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে ৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ড । ফলে সূর্যালোকশক্তি এ সবুজ গ্রহের জলবায়ু এবং আবহাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রায় সকল জীবকে বাঁচিয়ে রাখে । সূর্যের কেন্দ্রভাগের ঘনত্ব ১৫০ গ্রাম প্রতি ঘনসেন্টিমিটারে এবং তাপমাত্রা প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ কেলভিন (~১৩.৬ MK) ৷ যদিও ছটামণ্ডল বা সৌর করোনায় তাপমাত্রা থাকে ৫ MK এবং সূর্যপৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৫৭৮৫ কেলভিন । সূর্যের অন্যান্য বিকিরণ অঞ্চলের তুলনায় কেন্দ্রভাগে ঘূর্ণন বেগ অত্যাধিক বেশি । মহাবিশ্বের সমস্ত নক্ষত্রের মতো সূর্যও একটি বিশাল পারমাণবিক চুল্লি, যেটির জ্বালানি উপাদান হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম গ্যাস ৷ সূর্য সর্বদাই প্রোটন শিকল বিক্রিয়ার (Proton Chain Reaction) মাধ্যমে হাইড্রোজেনকে কেন্দ্রীন সংযোজন বা একীকরণ প্রক্রিয়া দ্বারা হিলিয়াম গ্যাস উৎপাদন করে । এটিই হচ্ছে সূর্যের শক্তির প্রধান উৎস । ফলে এখানে তৈরি হয় ফোটন আলোককণা, উত্তাপ, তেজস্ক্রিয় রশ্মি, শক্তি এবং গ্যাস । সূর্য প্রতি সেকেন্ডে কেন্দ্রে ৬২ কোটি মেট্রিক টন হাইড্রোজেন পোড়ায় । সূর্যের কেন্দ্রভাগে পারমাণবিক বিক্রিয়ার কারণে এর বাইরের দিকের গ্যাস (প্লাজমা কণা) খুব বেশি উত্তপ্ত থাকে । এটিই সূর্যের আলো বিকিরণের মূল উৎস । সূর্যের বর্ণালী শ্রেণী সংকেত জি২ভি । পূর্ণগোলক হলদে বামন নক্ষত্র সূর্যের প্রধান গাঠনিক উপাদান হচ্ছে: হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, অক্সিজেন, কার্বন, নিয়ন, আয়রন, নাইট্রোজেন, সিলিকন, ম্যাগনেসিয়াম এবং সালফার ইত্যাদি ৷ প্লাজমা কণা বা আয়নিত গ্যাস এবং ইলেকট্রনের সমন্বয়ে গঠিত সূর্যের মধ্যে রয়েছে এক মহাশক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র ৷ সূর্যপৃষ্ঠে কিছু কালো দাগ দেখা যায় যেটি ‘সৌরকলঙ্ক’ (Sunspot) নামে পরিচিত । প্রায় ১০০০ কোটি বছর পূর্বে মহাকাশীয় নক্ষত্রের সমাবেশে বা নক্ষত্রমণ্ডলে সূর্যের ভ্রূণ সৃষ্টি হয় । পরবর্তীতে মহাকালের চক্রে এটি প্রায় ৪৫০ – ৫০০ কোটি বছরের মধ্যে স্থিতিবস্থায় ফিরে আসে ।
এ সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে এবং পশ্চিমে অস্ত যায় ।
আসলেই কি তাই?
কিন্তু পদার্থবিদ্যা বলে, পৃথিবী গ্রহটি জলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্যকে কেন্দ্র করে অনবরত ঘুরছে । তাই, সূর্য ডুবেও না ওঠেও না ।
তবে, আমরা যারা পৃথিবীতে বসবাস করি সেই পরিপ্রেক্ষিত বা দৃষ্টিকোণ থেকে সূর্য পূর্ব থেকে ওঠে এবং পশ্চিম দিকে অস্ত যায় ।
সূর্যের রঙ সাদা হলেও ভূপৃষ্ঠ থেকে একে হলুদ দেখাতে পারে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে নীল আলোর বিচ্ছুরণের কারণে । অপার বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে উত্তপ্ত নক্ষত্রগুলোতে থাকে বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক উপাদান । সূর্যের মতো নক্ষত্রগুলোতে জন্মের সময়ই ছিল প্রচুর পরিমাণ লিথিয়ামের উপস্থিতি । তবে, মহাবিস্ফোরণের পর প্রথম ১০ কোটি বছরের মধ্যেই তা পুড়ে শেষ হয়েছে । কারণ বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে, আগামী প্রায় ৫০০ কোটি বছরের মধ্যেই সূর্যের জ্বালানি বা আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাবে । কোটি কোটি বছর ধরে জ্বলতে থাকা এ নক্ষত্রটিতে মহাকর্ষীয় শক্তির প্রভাবে কেন্দ্রীয়ভাগ বা মূল অংশে হাইড্রোজেন পরমাণু হ্রাস পাবে কিংবা হাইড্রোজেনের অভাবে পারমাণবিক সংশ্লেষণ বা একীভবন আর হবে না ৷ ফলে, সূর্যের জ্বালানি সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে ‘লাল দানবে’ রূপ নিয়ে এটির কেন্দ্রে ত্রি-আলফা বিক্রিয়ার মাধ্যমে হিলিয়াম পুড়ে কার্বন ও অক্সিজেন উৎপন্ন করবে । এক সময় সূর্যের উজ্জ্বলতা বহুগুণ বেড়ে গিয়ে প্রচণ্ড উত্তপ্তভাবে অতিনবতারা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে এর ভয়ঙ্কর পরিণতি ঘটবে! ফলে সূর্য নামক নক্ষত্রটি গ্রহগুলোসহ পুরো সৌরজগতকে গ্রাস করবে । চরম উত্তাপের কারণে পৃথিবীতে আর কোনো প্রাণের অস্তিত্বই থাকবে না । চারপাশের সবকিছুই ছাই হয়ে যাবে । অর্থাৎ, এক অগ্নিময় মৃত্যুর (Fiery Death) মাধ্যমে সূর্যের পরিসমাপ্তি হবে ।
তথ্যসূত্র ও ছবি: উইকিপিডিয়া ।

No comments:
Post a Comment