Saturday, 5 February 2022

দাবানল (Wildfire)

দাবানল, দাবাগ্নি, আগুনঝড় (Wildfire) হচ্ছে শুষ্ক বনভূমি কিংবা বনাঞ্চলে সংঘটিত এক অনিয়ন্ত্রিত আগুন । প্রখর সূর্যের তাপের কারণে অধিক ঘনত্বের বনে তাপমাত্রা অত্যাধিক বেড়ে যায় । ফলে মৃত গাছপালার ঘর্ষণে আগুনের ফুলকি'র (Sparkle) সৃষ্টি হয় । প্রচণ্ড গরম, অনাবৃষ্টি এবং উত্তপ্ত আবহাওয়ায় বনভূমির যে কোন স্থানে দাবানল দেখা দিতে পারে ৷ সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে এবং ঘন পাহাড়িয়া অঞ্চলে দাবানল সৃষ্টির ঘটনা তুলনামূলকভাব‌ে বেশি । দাবানলের জ্বলন্ত অগ্নিশিখা ক্রমশ উপরের দিকে উঠতে থাকে আর বাতাসের সংস্পর্শে পুড়িয়ে ছাই করে সমস্ত বনাঞ্চল । ঘন বনের উচুঁ গাছের চাঁদোয়া বা ছাউনি বা শামিয়ানাগুলোর (Canopy) আগুন অনায়াসে উড়তে থাকে যত্রতত্র । অগ্নিকাণ্ড সহজেই ভয়াবহ রূপ নেয় । এ আগুন নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে । মহাউল্লাসে যতক্ষণ খুশি আপন মনে জ্বলতে থাকে আগুনের লেলিহান শিখা ।

কিন্তু কেন দাবানল সৃষ্টি হয়?

আদিম যুগ থেকে মানব জাতি আগুন আবিষ্কার এবং কল্যাণকর নানা কাজে এর ব্যবহার করে সুফল ভোগ করছে । মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিচ্ছে । এছাড়া আগুনের ইতিবাচক দিক হচ্ছে বৃদ্ধি উদ্দীপক এবং বাস্তুতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে (Ecological system) টিকিয়ে রাখা । অপরদিকে এর নেতিবাচক দিক হচ্ছে বিধ্বংসী রূপ । আগুন আবিষ্কার, ব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রণ মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে এক মহাগুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ । আগুন হচ্ছে প্রজ্জ্বলনশীল বা সহজদাহ্য পদার্থের রাসায়নিক বিক্রিয়া । দহন বিক্রিয়ায় পদার্থের দ্রুত জারণ ক্রিয়ার ফলে তাপ, আলো এবং শক্তি উৎপন্ন হয় । এ আগুনই প্রচণ্ড তাপ এবং বাতাসের (অক্সিজেন) উপস্থিতিতে অগ্নিদাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে এসে দাবানল সৃষ্টি করে ৷ যে অঞ্চলে অতিরিক্ত পরিমাণ আর্দ্র আবহাওয়ায় গাছপালা দ্রুত বৃদ্ধি পায়, কিন্তু সেখানে দীর্ঘদিন যাবৎ উত্তপ্ত এবং শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করলে পরিবেশ রুক্ষ থাকে । গাছপালার দেহসঞ্চিত পানি বাষ্পীভূত হয় । গাছ বা উদ্ভিদ পানির সমতা রক্ষা করতে পারে না বিধায় এটি শুষ্ক এবং দাহ্য হয়ে উঠে ৷ যদিও পরবর্তীতে মাটি, জলীয় বাষ্প এবং বৃষ্টির পানি থেকে গাছ শোষণের মাধ্যমে পানির ঘাটতি পূরণ করে নেয় ৷ সে তীব্র দাবদাহ, দীর্ঘ খরা, প্রচণ্ড প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে শুকনো এবং দাহ্য হয়ে উঠা গাছ-খরপাতা-কাঠে আগুন ধরে দাবানল আকারে বিস্তীর্ণ এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ৷ দুরন্ত বাতাস জ্বলন্ত আগুনে ফুঁ দিয়ে এর তেজ আরও বাড়িয়ে দেয় । সর্বগ্রাসী দাবানলের অগ্নিদাহ এক নৃশংস, দানবীয় এবং ধ্বংসাত্মক রূপ প্রকাশ করে বনভূমির শুকনো গাছ-খরপাতা-কাঠ, জীবাশ্ম, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা কয়লা (Legacy Carbon) দহনের ফলে বা পুড়ে বিষাক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, অ্যারোসল কণা, গ্রীন হাউস গ্যাসের (Greenhouse gas: কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, মিথেন, জলীয়বাষ্প, ওজোন, নাইট্রাস অক্সাইড, ক্লোরো ফ্লোরো কার্বন, হাইড্রোফ্লুরো কার্বন ইত্যাদি) পরিমাণ বৃদ্ধি করে পৃথিবীর উষ্ণতাসহ জলবায়ু পরিবর্তনে (Climate change) বিশেষ ভূমিকা পালন করছে । ফলে পৃথিবীর জলবায়ুর কাঠামোই বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে । 

প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ বায়ুর অন্যতম উপাদান হচ্ছে অক্সিজেন । যা গ্রহণ করে আমরা বেঁচে থাকি এবং কার্বন ডাই অক্সাইড ত্যাগ করি । উদ্ভিদ বা গাছপালা কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করার মাধ্যমে খাদ্য তৈরি করে এবং অক্সিজেন পরিত্যাগ করে । গাছ অক্সিজেন দিয়ে আমাদের প্রাণ বাঁচায় । যদিও আমরা বিভিন্নভাবে পরিবেশ দূষণ করছি । প্রকৃতিকে বিনাশ করছি । পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের দুই তৃতীয়াংশ কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে নেয় গাছ এবং শতকরা ২০ ভাগ অক্সিজেন উৎপত্তি হয় বিস্তৃত চিরহরিৎ ঘনবর্ষণ বনাঞ্চল (Rain forest) আমাজন অরণ্য থেকে । বৃক্ষ নিধন বা গাছ কাটা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রধান কারণ । বিগত কয়েক যুগ থেকে শুরু করে জুম চাষ এবং নিয়মিত চাষাবাদের জন্য পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আমাজন অরণ্য, আফ্রিকার কঙ্গো বর্ষাবন এবং ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের লক্ষ লক্ষ একর জায়গায় জন্মে থাকা বৃক্ষরাজিকে নিষ্ঠুরভাবে ধ্বংস করে কৃষি জমি প্রস্তুত করা হয়েছে । বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের বসবাসের জন্য ঘরবাড়ি নির্মাণ, রাস্তাঘাট প্রশস্তকরণ, শিল্পায়নসহ নানা কারণে বনভূমি বা কৃষি জমি ধ্বংস করা হচ্ছে- যা আজ অবধি চলমান । এছাড়া দাবানল, ঝড় ঝঞ্ঝা, কীট পতঙ্গের আক্রমণ, খনিজ সম্পদ উত্তোলন, ভূমিধ্বস, অগ্ন্যুৎপাত ইত্যাদি কারণে বনভূমি তথাপি গাছপালা ধ্বংসের ফলে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে । কিছু ভূমির উর্বরা শক্তি ফিরিয়ে আনতে এবং গবাদি পশু চারণের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে মাঝে মধ্যে নতুন করে জমিতে লতাপাতা বা গাছপালা পোড়াতে হয় । এতে করে ব্যাপকভাবে বায়ু-নদীর জল দুষণের ফলে পরিবেশের ক্ষতিসাধন ও জলবায়ু পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে । মহাদেশীয় ড্রিফট বা মহীসঞ্চরণ (Continental drift), আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ভূ-ত্বক গঠণের পাততত্ত্ব (Plate tectonics), পৃথিবীর গতি পরিবর্তন, বহির্জগতের প্রভাব, সৌর বিকিরণের মাত্রার তারতম্য, সামুদ্রিক স্রোত, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, জৈব প্রক্রিয়া, উত্তর মেরুর জমাট বাধা বরফক্ষেত্র (Ice field) ও হিমবাহের (Glacier) দ্রুত গলে যাওয়া ইত্যাদি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রাকৃতিক কারণ । অন্যদিকে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি বা কার্বন নিঃসরণ, খনিজ জ্বালানি ব্যবহার, বাতাসে নাইট্রাস অক্সাইড বৃদ্ধি, পাহাড় নিধন, বন্যভূমি উজাড় করা ইত্যাদি জলবায়ু পরিবর্তনের মনুষ্য সৃষ্ট কারণ ।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বা উষ্ণতা বৃদ্ধি, বায়ুচাপ, বাতাস ইত্যাদির পরিবর্তন ঘটে বিপজ্জনক হয়ে পড়ে প্রকৃতি, প্রাণীজগত, পরিবেশ এবং বিশেষ করে মানুষের জীবন । এর ফলে অতি বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, খরা, দাবদাহ, জলোচ্ছ্বাস, দাবানল, বজ্রপাত, অগ্ন্যুৎপাত, এল নিনো, লা নিনা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিক্ষয়, উত্তর মেরু ও হিমালয় পর্বতের হিমবাহ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উষ্ণতার কারণে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের দেশগুলো মরুভূমিতে পরিণত, বৃহৎ দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড ও সাইবেরিয়ার জমাট বরফ গলে বরফের নিচে জমাকৃত মিথেন গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়া, বরফ গলার কারণে উত্তর মেরুর শ্বেত ভল্লুকের (Polar bear) অস্তিত্ব হুমকির মুখে, বায়ুমণ্ডলের অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড সমুদ্রের পানিতে মিশে অম্লের মাত্রা (Acid level) বৃদ্ধি, আবহাওয়ার মৌসুমি ধারাবাহিকতা নষ্ট এবং উপকূলীয় অঞ্চলে খাবার পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায় । শিক্ষা-সামাজিক প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, কৃষি উৎপাদন, প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর মারাত্মক প্রভাব বিস্তার করে মানুষের খাদ্য বা জীবিকা সংকট, পুষ্টিহীনতা, ডায়রিয়া-প্রাণঘাতী রোগ দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার ক্ষতিসাধন, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদিকে বাধাগ্রস্ত করে । এছাড়া সম্পদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন এবং প্রাণ হানি করে । তাই মানুষের জন্য অতি জরুরি হচ্ছে: কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাস, বনভূমি বৃদ্ধি, সচেতনতা বৃদ্ধি, দুষণ পদার্থের পরিমাণ হ্রাস এবং Greenhouse gas নির্গমনকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপর্যয়কর পরিণতি এড়ানো যাবে । গড়ে উঠবে সবুজ পৃথিবী । উপকৃত হব সকলে । রক্ষা পাবে আমাদের নীল গ্রহ পৃথিবী ৷ নইলে ধ্বংস অনিবার্য!

সুতরাং এ ভয়াবহ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রচণ্ড শুষ্ক আবহাওয়া বা দাবদাহ, অনাবৃষ্টি, খরা, বজ্রপাত, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, Coal-seam fire, এল নিনো (El Nino) এবং লা নিনা (La Nina) প্রাকৃতিক প্রাণঘাতী দুর্যোগের চক্রাকার পরিবর্তন ইত্যাদি বন-জঙ্গলে আগুন লাগার প্রাকৃতিক কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, এ সকল প্রাকৃতিক কারণগুলো দ্বারা বনভূমিতে আগুন লাগার হার খুবই নগণ্য । কিন্তু মানুষের অযত্ন-অবহেলায় ফেলে রাখা Campfire এর আগুন, সিগারেটের অবশিষ্টাংশ, অগ্নিকণা বা স্ফুলিঙ্গ (Spark) উৎপন্নকারী সরঞ্জাম (Chainsaw, Grinder, Mower) দ্বারা, আতশবাজি ফাটানো বা প্রদর্শনের সময় জ্বলন্ত অংশ, বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে, কাঁচের মধ্য দিয়ে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে, চাষাবাদের জন্য জমি বৃদ্ধি বা খামার তৈরি বা নগরায়ণের লক্ষ্যে দুর্ঘটনাবশত, ট্রেন চলাকালীন চাকা ও ধাতব রেললাইনের ঘর্ষণের ফলে সৃষ্ট স্ফূলিঙ্গ, ইচ্ছাকৃত-অনিচ্ছাকৃতভাবে এবং কোন দুর্বৃত্ত (বনাঞ্চলে এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পিছনে চোরা কাঠ কারবারিদের চক্রান্ত কিংবা এক শ্রেণীর অসৎ বনকর্মীদের সাথে তাদের আঁতাত থাকতে পারে) বনের মধ্যে আগুন লাগিয়ে দাবানল সৃষ্টি করা ইত্যাদি কারণে আগুন লাগার পেছনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দায়ী মানুষ । অসাবধানতা বশত কিংবা যেভাবেই হোক না কেন, একবার আগুন লাগলে প্রকৃতি তাকে ইন্ধন যোগায় পাগলা ঘোড়ার মতো । এ আগুন পরাক্রমশালী হয়ে Fire storm, Fire cyclone, Fire tornado রূপ ধারণ করে বনানীসহ দিকবিদিক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে । এরই সাথে শুষ্ক বায়ুপ্রবাহ অগ্নি স্ফূলিঙ্গকে মাইলের পর মাইল দূরে অনায়াসে উড়িয়ে নেয় । যা থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডের ফলে আগুনের তীব্রতা বেড়ে ভয়াবহ দাবানলে পরিণত হয় । দাবানলের ভয়ঙ্কর অগ্নিশিখা এমন নৃশংস রূপ ধারণ করে যে, আশপাশ থেকে শুরু করে সামনে-পিছনে এমনকি আকাশের অনেক ঊর্ধ্বে উঠে যায় । যার ফলে কোন বৈমানিক বিমান ও হেলিকপ্টার নিয়ে এ অঞ্চলের উপর দিয়ে উড়াল দিতে ভয়ার্ত বা আতঙ্কগ্রস্ত হয় । অবস্থা এতই শোচনীয় পর্যায় থাকে যে, দুর্যোগপূর্ণ এলাকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও দ্রুত বা তাৎক্ষণিক অপ্রতিরোধ্য ও সর্বসংহারি দাবানলকে নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায়শ ব্যর্থ হয় । এটি যেন প্রকৃতির সাথে মানুষের এক অসম লড়াই । মানুষ অসহায় হয়ে পরে প্রকৃতির কাছে! মুহূর্তেই ভয়াবহ দাবানলের তীব্র দাপদাহে দাউ দাউ করে জ্বলে-পুড়ে নিঃশেষ করে বিস্তৃত বনাঞ্চল ও তৃণভূমি । প্রবল শক্তিশালী বাতাস শুকনো বনভূমির আগুনের পালে হাওয়া দেয় । ঘন্টায় প্রায় ৮০ কিঃ মিঃ গতির প্রচন্ড বাতাসের উস্কানিতে আগুন চরম বেপরোয়াভাবে আগ্রাসন করে ক্রমেই দূর-দূরান্তে পরিধি বিস্তার করে দাবানলের লেলিহান জিভ । বিপজ্জনকভাবে ঘন কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় আশেপাশের এলাকা । অত্যাধিক তাপমাত্রার ফলে গরমের তীব্রতা এবং বিপদের মাত্রা থাকে অনেক বেশি । কখনও তাপমাত্রা বেড়ে যায় প্রায় ৯০° ডিগ্রী পর্যন্ত । জ্বলন্ত আগুন তীব্রবেগে উপরের দিকে এতটাই বিস্তৃত হয় যে, আগুন নেভাতে হিমশিম খেতে হয় দমকল বাহিনীকে । অনেকক্ষেত্রে তাদের জীবনের ঝুঁকি থাকে । প্রকৃতির এ নির্মমতায় মর্মান্তিকভাবে জীবন্ত দগ্ধ হয় অসংখ্য প্রাণ! এ দাবানল মানুষ, জীবজন্তু, গাছপালা, ফসলাদি, বনভূমি, লোকালয়, দোকানপাট, রাস্তা, গাড়ি, বিভিন্ন স্থাপনা ইত্যাদি ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও ক্ষতিসাধনের মাধ্যমে নরকে পরিণত করে । অগভীর জলাধারগুলোর তলানি শুকিয়ে চৌচির হয় । লক্ষ লক্ষ একর জমি পুড়ে যায় দাবানলের করাল গ্রাসে । পোড়া মাটি হারিয়ে ফেলে তার জলশোষণ ক্ষমতা । গৃহহীন হয়ে পরে মানুষ । এ করুণ পরিণতিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় অস্থায়ী শিবিরে । অধিকাংশ এলাকা থাকে বিদ্যুৎবিহীন । গ্যাস, পানি, মোবাইল, টেলিফোন, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন এবং Network অবকাঠামো ধ্বংসপ্রাপ্ত । আবসিক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগ বন্ধ না থাকলে আগুন আরও শক্তিশালী রূপ নেয় । জরুরি অবস্থা জারি হয় দুর্গত এলাকায় । দমকলকর্মী, উদ্ধার- ত্রাণকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবকরা Helicopter, Drone, Ambulance, Fire truck, Fire service vehicle, নৌ-যান, যান-বাহন, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, ভারী যন্ত্রপাতি, আকাশ থেকে অগ্নিনির্বাপণ বিমানের সাহায্যে অগ্নি প্রতিরোধক রাসায়নিক পদার্থ নিক্ষেপ, পানিবাহী বিমানের সাহায্যে পানি নিক্ষেপ করে প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে মোকাবেলা এবং উদ্ধার কাজে আপ্রাণ চেষ্টা করে । কখনও আন্তর্জাতিক সাহায্যের প্রয়োজন হয় । বিনাশী দাবানলে ঝলসে যায় প্রকৃতির অপরূপ সুন্দর চেহারা । অবাধে ক্ষতি করে জীব বৈচিত্র্যকে । পুড়ে যাওয়া বনাঞ্চলের স্বাভাবিক খাদ্য শৃঙ্খল (Food chain system) ব্যবস্থা বদলে গিয়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয় । যদিও অস্ট্রেলিয়ানরা এ দাবানলকে ‘স্থল সুনামি’ (Ground tsunami) বলে । দাবানল পরিবেশে প্রচুর পরিমাণে (Greenhouse gas) গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ছাড়াও বিভিন্ন দুষণ পদার্থের পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে, যা মানুষসহ সকল প্রাণীর জন্যই বড় ধরণের হুমকি ৷

বিগত সময়ে এ ধরিত্রির অনেক দেশেই ভয়াবহ দাবানলের ঘটনা ঘটেছে যেমন: ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনা, ভারত, সাইপ্রাস, পেরু, ভেনিজুয়েলায়, গ্রিনল্যান্ড, জার্মানি, চীন, ইন্দোনেশিয়া, কানাডা, আলজেরিয়া, গ্রীস, রাশিয়া, সাইবেরিয়া, ইউক্রেন, চিলি, ইটালি, ইসরাইল, তুরস্ক, বলিভিয়া, উত্তর মেসিডোনিয়া, আলবেনিয়া, আফ্রিকা ইত্যাদি । বিভিন্ন জায়গায় দাবানল নানা প্রকার নামে যেমন: Wildfire, Forest fire, Bushfire, Wildland fire, Rural fire, Forest fire, Brush fire, Desert fire, Grass fire, Hill fire, Peat fire, Prairie fire, Vegetation fire, Veld fire নামে পরিচিত ।

সাইবেরিয়ার পূর্বে ও আলাস্কার মধ্যাঞ্চলে পৃথিবীর বৃহত্তম বনাঞ্চল 'তাইগা বন' (Taiga forest) । এ তাইগা অরণ্যে পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ বৃক্ষ রয়েছে । এ বন দাবানলের আগুনে পুড়ে এর ঘন কালো বিষাক্ত ধোঁয়া প্রায় ০৩ হাজার মাইল দূরে জাপানের ওসাকা শহরকে অন্ধকার করে দেয় । গত ২০১৯ - ২০২০ খ্রিস্টাব্দে আমাজন অরণ্যে সংঘটিত দাবানলে প্রায় ৮৫ শতাংশ বন পুড়ে নিঃশ্চিন্ন হয়ে গেছে (প্রায় ০৬ মিলিয়ন হেক্টর) এবং ঘন কালো ধোঁয়া আটলান্টিক উপকূল ও ব্রাজিলের বৃহত্তম শহর সাও পাওলোর আকাশে ছড়িয়ে পড়ে । আমাজন বন আগুনে পুড়ে যাওয়ার ফলে প্রায় ২২৮ মেগাটন কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গত হয় এবং দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল জুড়ে কার্বন মনোঅক্সাইড ছড়িয়ে পড়ে । ধারণা করা হয়, কোটি কোটি বন্যপ্রাণীর মৃত্যু হয়েছে । স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি এবং সরীসৃপ, প্লাটিপাস, ক্যাঙ্গারু এবং নিউ সাউথ ওয়েলসের মধ্য-দক্ষিণ উপকূলবর্তী অঞ্চলে বসবাসরত বিপন্ন প্রজাতির কোয়ালা দাবানলের আগুনে পুড়ে মারা যায় । অসংখ্য বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ প্রজাতি জ্বলে ছাই হয় । তবে এটি ঠিক যে, এ দাবানল এক ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের অশনি সঙ্কেত! এছাড়া বিগত সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ অঙ্গরাজ্য ভিক্টোরিয়ায় ১৯৩৮-১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে সর্বনাশা দাবানলের (The Black Friday bushfires) আগুন পুরো গ্রীষ্মকাল জুড়ে জ্বলতে থাকে । প্রচুর পরিমাণে আগুনের ঘন কালো ধোঁয়া এবং ছাই উড়ে গিয়ে প্রায় ০২ হাজার মাইল দূরের নিউজিল্যান্ডে পড়ে । দাবানলের কয়েকদিন আগে ভিক্টোরিয়া রাজ্যের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর মেলবোর্নে সর্বোচ্চ ৪৫.৬°C (১১৪.১°F) তাপমাত্রা বেড়ে যায় । এ দাবানলের কারণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভিক্টোরিয়া রাজ্যের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকায় মহাবিপর্যয় ঘটে । অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী Canberra এর অঞ্চলগুলোসহ অন্যান্য রাজ্য উত্তরের প্রবল বাতাসের সাথে ধ্বংসাত্মক দাবানলের আগুন ও চরম উত্তাপে খারাপভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল । প্রায় দুই মিলিয়ন হেক্টর এলাকা পুড়ে যায়, এর মধ্যে প্রায় ৫৭৫০০০ হেক্টর সংরক্ষিত বন এবং ৭৮০০০০ হেক্টর বনভূমি (Crown land) । ৭১ জন নিহত হয় । ০৫টি জনপদ Hill End, Narbethong, Nayook West, Noojee, Woods Point সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল । Omeo, Pomonal, Warrandyte, Yarra Glen ইত্যাদি শহরগুলো অতিমাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় । দাবানলের তীব্র আগুনে মাটির এতই গভীরে পুড়ে গিয়েছিল যে- এর পুনরুদ্ধার বা উর্বরা শক্তি ফিরে পেতে অনেক বছর সময় লেগে যায় । Grampians National Park, পর্বত, আলপাইন এলাকা, উপত্যকা, অনেক করাতকল, হাজার হাজার ভেড়া, গবাদি পশু, ক্যাঙ্গারু এবং ঘোড়া সহ পুরো জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ।

প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম যেভাবেই হোক না কেন আগুন লাগার পর দাবানল হিসেবে এটি মারাত্মক বিধ্বংসী রূপ নিলেও বিপরীতভাবে এর কিছু কল্যাণকর দিকও রয়েছে । পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, মোটামুটি চক্রাকারে দাবানলের পুনরাবৃত্তি ঘটে ৷ প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে দাবানল বেশ গুরুত্বপূর্ণ ৷ অনাকাংক্ষিত হলেও এটিই বাস্তবতা যে, প্রাকৃতিকভাবে কখনও কখনও প্রকৃতি বা বনানীতে অগ্নিকাণ্ড না ঘটলে বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র (Natural ecosystem) নষ্ট হয়ে যায় । কারণ আগুনের মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া দাবানল থেকে উৎপন্ন ধোঁয়া, তীব্র উত্তাপ ও পোড়া কাঠ কোন কোন উদ্ভিদের অঙ্কুরোদ্গম এবং বৃদ্ধির জন্য সহায়ক ৷ গাছের কাণ্ডে জমে থাকা পুষ্টি উপাদান অগ্নিকাণ্ডের পর পুনরায় ফেরৎ আসে মাটিতে এবং উর্বর হয় জমি । ঘন বনের উচুঁ গাছের চাঁদোয়া বা ছাউনি (Canopy) পুড়ে গিয়ে অন্ধকারময় স্যাঁতসেতে বনের ভেতর সূর্যের আলো প্রবেশ করে । ছাউনি ও গাছপালা পুড়ে যাওয়া ছাইয়ের গাদায় বা স্তূপে প্রাকৃতিকভাবেই উদ্ভিদ (বৃক্ষ, গুল্ম, বিরুৎ) জন্ম নিয়ে নতুন জীবন শুরু করে । পরবর্তীতে গাছপালা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় এবং বংশবিস্তারের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে এক বিশাল-ছায়াময়-নিবিড় অরণ্যের সৃষ্টি করে । প্রকৃতির নিয়মেই আবার কখনও প্রখর সূর্যের তাপে এ অরণ্যের তাপমাত্রা অত্যাধিক বেড়ে গিয়ে মরা গাছের ঘর্ষণে, বজ্রপাত দ্বারা কিংবা কৃত্রিমভাবে নিজে পুড়ে যাওয়ার জন্য তৈরি হয় । সৃষ্টিকর্তার অমোঘ নিয়মে এভাবেই চলতে থাকে প্রাকৃতিক অগ্নি-চক্র । দাবানলের কারণে মৃত এবং পচনশীল দ্রব্যাদি পুড়ে গিয়ে বিশুদ্ধ বা দূষণমুক্ত হয় পরিবেশ । ক্ষতিকর জীবাণু এবং পোকামাকড় ধ্বংস করে দুর্গন্ধযুক্ত বিষাক্ত জায়গাগুলোকে জীবাণুমুক্ত করে । তাই এসব অঞ্চলে নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় দাবানল অনেকটাই গ্রহণযোগ্য ৷

বীভৎস্য এ দাবানলের ফলে প্রকৃতির উপর কি প্রভাব পড়তে যাচ্ছে তা নিয়ে বিশ্লেষণে নেমেছেন নাসা (NASA) এর বিজ্ঞানীরা ৷ নাসা'র Armstrong Flight Research Center এর ইআর-০২ বিমানটি মাটি থেকে প্রায় ২১ হাজার ৩০০ মিটার উচ্চতায় যেতে সক্ষম । যেটি যাত্রীবাহী বিমানের উড়ান ক্ষমতার দ্বি-গুণ ৷ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এ বিমানে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন Everis Camera সংযুক্ত আছে । যেটির সাহায্যে আগুন-ধোঁয়ার মধ্যেও পরিবেশ ও জমির অবস্থা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া সম্ভব ৷ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিস্থিতির বিশ্লেষণ, উষ্ণতা বা আগুনের তাপমাত্রা কতটুকু ইত্যাদি সঠিকভাবে জানাতেও সক্ষম এ যন্ত্রটি ৷

এছাড়া বিজ্ঞানীরা উপগ্রহ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে দাবানলের বৈজ্ঞানিক Model বা Software তৈরি করছে । National Center for Atmospheric Research (NCAR) এবং University of Maryland এর বিজ্ঞানীরা একটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন । যার মাধ্যমে আবহাওয়া এবং আগুনের মিথষ্ক্রিয়ায় Cutting Edge Simulation এর সাথে উপগ্রহ (Satellite) দ্বারা পর্যবেক্ষণকৃত সক্রিয় দাবানলের তথ্যাদি বা অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায় । সম্ভবত এটিই সর্বপ্রথম Computer modeling, যেটি অবিচ্ছিন্ন এবং হালনাগাদকৃত দিনভর আবহাওয়ার ভবিষ্যতবাণী বা পূর্বাভাস দেয় । এ কম্পিউটার মডেলটি আগুনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ যেমন ফুলকি'র বিস্তার এবং আগুনের আচরণ অনুমান করে প্রতি ১২ ঘণ্টা পর পর নানা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে । NCAR এর বিজ্ঞানী Janice Coen কম্পিউটার মডেল বা যন্ত্র Coupled Atmosphere-Wildland Fire Environment (CAWFE) আবিষ্কার করেছেন । বন্যভূমির আগুন, বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থা, জ্বালানী বৈশিষ্ট্য, স্থায়িত্ব ও সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি, ভূখণ্ডের ঢাল এবং আগুন কত দ্রুত ও কোন দিকে ছড়িয়ে পড়ে তা নির্ধারণ করে । কিভাবে আবহাওয়া বা জলবায়ু আগুনকে পরিচালিত করে । কিভাবে আগুন দ্বারা নির্গত সংবেদনশীল ও সুপ্ত তাপ প্রবাহ তার আশেপাশের বাতাসকে প্রভাবিত করে এবং বড় ধরণের দাবানল সৃষ্টি করে । তবে এর জন্য প্রয়োজন হয় সবচেয়ে হালনাগাদ তথ্য । কারণ অনেকগুলো উপাদান বা ঘটনা দাবানলের আকার এবং এর পথ পরিবর্তন করতে পারে । পরিবেশবিদরা বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন যে, দাবানলের উত্তাপে আরও দ্রুত গলে যেতে পারে হিমবাহগুলো । ফলে বন্যা, নিচু এলাকা ডুবে যাওয়ার পাশাপাশি নদীর জলে দগ্ধ পোড়ামাটি, কাদা এবং ধোঁয়া-ছাই থেকে তৈরি Black carbon মিশে গিয়ে ব্যাপক দুষণের সম্ভাবনা দেখা দিবে ।

পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলেই যে শুধু দাবানলের আগ্রাসন তা কিন্তু নয় । গ্রিনল্যান্ডের (Greenland) মত বরফাচ্ছাদিত শীতপ্রধান দেশেও দাবানল আঘাত হানে । যেখানে তাপমাত্রা বছরের বেশিরভাগ সময়েই মাইনাস শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের (-০°C) নিচে থাকে । এমনকি তাপমাত্রা -২০°C বা তার চেয়েও বেশি নিচে নেমে যায় । এ রকম প্রতিকূল আবহাওয়ায় সাধারণভাবে মানুষের বসবাস উপযোগী নয় । ফলে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলেই মূলত জনবসতি গড়ে উঠেছে । সে অংশে তাপমাত্রা সাধারণত -০৭°C থেকে ১০°C সেলসিয়াসের মধ্যেই থাকে । এমন তীব্র শীতের দেশে দাবানল হতে পারে সেটি বিজ্ঞানীদের কল্পনাতেই আসেনি । পশ্চিম গ্রীনল্যান্ডের একটি ছোট শহর Kangerlussuaq এর কাছে বেশ কিছুদিন আগে দাবানলের সূত্রপাত হয় এবং তা ধরা পড়ে ঐ এলাকার কাছাকাছি ঘাঁটি (Base camp) করে  বরফের চাঁই (Iceberg) নিয়ে গবেষণারত বিজ্ঞানীদের কম্পিউটারে । উপগ্রহ (Satellite) থেকে প্রাপ্ত ছবিতে দেখা যায় তাদের কাছাকাছি একটি এলাকা থেকে ধোঁয়া উড়ছে । বিজ্ঞানীরা প্রথমে এটিকে উপগ্রহ ছবির ত্রুটি মনে করলেও পরবর্তীতে দেখা যায় সত্যিই সেখানে আগুন লেগেছে । অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, শুধু ঘাস এবং পাথর ছাড়া ঐ এলাকায় গাছপালা একেবারেই নেই । তাহলে আগুন লাগলো কিভাবে? গবেষকদের ধারণা, সেখানকার Peat সমৃদ্ধ (প্রাচীন কার্বন) কালো মাটিতেই প্রথমে আগুন লাগে । হয়তো কারো সিগারেটের আগুন, Campfire কিংবা বজ্রপাত থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে । তবে এক্ষেত্রে বজ্রপাতকেই সম্ভাব্য কারণ বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা । তাদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে গ্রিনল্যান্ডের জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে । সেখানকার তাপমাত্রাও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে । কোথাও জমাট বরফ (Frozen ice) গলে গ্রিনল্যান্ডের সে স্থানের মাটি ধীরভাবে শুকিয়ে আসছে এবং তার সাথে শুকিয়ে যাচ্ছে ঘাস । এ পরিবর্তিত আবহাওয়ায় বৃষ্টিপাত এবং বজ্রপাতের পরিমাণও বাড়ছে । সুতরাং ঘন ঘন বজ্রপাতের ফলে শুকনো Peat মিশ্রিত মাটিতে আগুন ধরে শুকনো ঘাসের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ে দাবানল সৃষ্টি করে এবং ক্রমান্বয়ে বিস্তৃত হয় । জলবায়ু পরিবর্তনই যে এ অঞ্চলে বজ্রপাত বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ- সে সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এখন অনেকটাই নিশ্চিত । কারণ বোরিয়াল বনগুলোতে (Boreal forest: রাশিয়া, আলাস্কা, কানাডা, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন) বিশেষ করে কানাডা ও আলাস্কাতে প্রচুর পরিমাণে গাছপালা থাকার কারণে গত কয়েক বছরে বজ্রপাতের পরিমাণ আগের তুলনায় অনেক বেশি । আর এরই ধারাবাহিকতায় ঐ অঞ্চলগুলোর চেয়েও বেশি বজ্রপাত বৃদ্ধি পেয়েছে উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক মহাসাগরের মধ্যে অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডে । দিগন্ত বিস্তৃত বৃক্ষহীন সমতল ভূমি, গ্রীষ্মকালে জলপূর্ণ এবং শীতকালে বরফ জমে শক্ত হয়ে যাওয়া তুন্দ্রা অঞ্চল (Tundra) গ্রিনল্যান্ডের মত এখন আর বজ্রপাত থেকে মুক্ত নয় । বিজ্ঞানীদের ধারণা, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলে বজ্রপাতের পরিমাণ ভবিষ্যতে আরও বেড়ে যাবে । এতে করে বৃদ্ধি পাবে দাবানলের মত ঘটনাও । তবে দুঃশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে, ঘন ঘন দাবানল সৃষ্টি হলে গ্রিনল্যান্ডের মাটি অতিমাত্রায় উত্তপ্ত হয়ে এর গুণগত বৈশিষ্ট্যও পাল্টে যাওয়ার আশংকা রয়েছে । ভূ-গর্ভের মাটির চির বরফ শীতল অংশ পারমা ফ্রস্ট (Permafrost) গলে গিয়ে গ্রিনল্যান্ডের ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তন ঘটে যেতে পারে । এছাড়া দাবানলের কারণে সৃষ্ট কালো ঝুল বরফে ছড়িয়ে পড়ার কারণে সূর্যের তাপ অধিকমাত্রায় শোষিত হবে এবং এর ফলে ঐ অঞ্চলে তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে । ঘন ঘন দাবানলের কারণে Permafrost গলে গিয়ে বায়ুমন্ডলে মিথেন গ্যাস (Methane gas) অতিমাত্রায় নিঃসৃত হবে । এর ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের (Global warming) গতি আরও ত্বরান্বিত হবে । তবে গ্রিনল্যান্ডের পশ্চিমাংশের এ ভূ-প্রাকৃতিক এবং জলবায়ুগত পরিবর্তন যে দেশটির বরফাচ্ছাদিত অন্যান্য অংশেও বিস্তৃত হবে না, তাই-বা কে হলফ করে বলতে পারে? কিন্তু এটি ঘটলে মহাবিপদ । কারণ মনে রাখতে হবে, গ্রিনল্যান্ডের বরফের বিশাল চাঁই (Iceberg) গলে গেলে পৃথিবীর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ০৭ মিটার (২৩ ফুট) পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে । আর সেটি হলে আমাদের বাংলাদেশের নিম্নভূমি (Lowland) সহ বিশ্বের নিম্নাঞ্চলের বিভিন্ন দেশ ডুবে যাবে কিংবা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ছোট ছোট অনেক দ্বীপ বা দ্বীপরাষ্ট্র বিলীন হয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে গৃহহীন এবং স্থানচ্যুত করে সৃষ্টি করবে এক প্রাকৃতিক মহাবিপর্যয়! যার প্রভাব পড়বে এ গ্রহের সর্বত্রে ।

* তথ্যসূত্র: অন্তর্জাল (The Internet)


No comments:

Post a Comment

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...