Thursday, 2 November 2017

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ



বাঙালি জাতির রয়েছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস । ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দ্বি-জাতিতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকশ্রেণী বাঙালিদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করতে থাকে । পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তারা অন্যায় ভাবে নানা প্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে । ৫২ এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ৫৪ এর যুক্ত ফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ, ৫৬ এর সংবিধান প্রণয়নের আন্দোলন, ৫৮ এর সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ৬২ এর শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন, ৬৬ এর বাঙালির মুক্তির সনদ ছয়দফা'র আন্দোলন, ৬৮ এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ৬৯ এর রক্তঝরা গণঅভ্যুত্থান এবং ছয়দফা দাবীর উপর ভিত্তি করে ৭০ এর ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে । এ দীর্ঘ পথ পরিক্রমার মধ্য দিয়ে অসহায়, নিপীড়িত, শোষিত আর অধিকার বঞ্চিত বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের জন্য ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন লড়াই করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । দীর্ঘ সময়কাল কারাবরণ, নির্যাতন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ও ষড়যন্ত্র মামলা এমনকি ফাঁসির কাষ্ঠেও তিনি দাঁড়িয়েছেন । সে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস । যাক সে কথা । তবে বিশেষ করে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ বাঙালি জাতির জীবনে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা । বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ৭ই মার্চ ঢাকার রমনায় অবস্থিত রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) অনুষ্ঠিত প্রায় ১০ লক্ষ জনতার সমাবেশে বজ্রকণ্ঠে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন ''এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ।'' এ অগ্নিঝরা ভাষণ মুক্তিকামী মানুষের রক্তে দ্রোহের মহাপ্লাবন সৃষ্টি করেছিল । বাঙালি জাতিকে দেখিয়েছিলেন স্বাধীনতার স্বপ্ন । মূলত ভাষণটি ছিল স্বাধীনতারই ঘোষণা ৷ বঙ্গবন্ধুর ডাকে উত্তাল হয়ে উঠে সারা বাংলা । ৭ই মার্চের ভাষণ সমগ্র জাতিকে স্বাধীনতার চেতনায় ঐক্যবদ্ধ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত করেছিল । সাড়ে সাত কোটি বাঙালির দীর্ঘদিনের স্বাধীনতার আবশ্যকতা ও আকাঙ্খা বাস্তবে রূপ পেয়েছিল । বাঙালি জাতির প্রতি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অপরিমিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ স্পৃহাকে শাণিত করেছিল । বঙ্গবন্ধুর এ জ্বালাময়ী ভাষণ অধিকার বঞ্চিত একটি জাতিকে মুক্তির পথ দেখিয়েছে । নির্যাতিত, নিপীড়িত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত ও শোষিত মানুষকে মুক্তির জন্য তীব্রভাবে আন্দোলিত করেছিল । সাহস এবং অনুপ্রেরণা জুগিয়ে একটি জাতি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখিয়েছে । এ ভাষণটি মহান মুক্তিযুদ্ধে দৃঢ় প্রত্যয়ে লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে আনার জন্য বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করেছিল । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজের অসাধারণ বাগ্মিতা, দূরদর্শিতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে বাঙালি জাতির আবেগ, অনুভূতি, স্বপ্ন এবং আকাঙ্খাকে ৭ই মার্চের ভাষণে তুলে ধরেন । প্রকৃতপক্ষে, ৭ই মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন । মুক্তিপাগল জনতার মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য কি করা প্রয়োজন সেই দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন । বাঙালি জাতি তার এ ভাষণ থেকে উপলব্ধি করেছিলেন যে, পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর সাথে তাদের সশস্ত্র সংগ্রাম অনিবার্য । মুক্তিকামী বাঙালি জাতি ৭ই মার্চের ভাষণের পরই সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি গ্রহণের পাশাপাশি মাতৃভূমিকে শত্রু'র কবল থেকে মুক্ত করতে (Independent) যা যা করণীয় তা করার জন্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয় । স্বাধীনতা বিরোধী কতিপয় ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ছাড়া সমগ্র জাতি বঙ্গবন্ধুর ডাকে ঐক্যবদ্ধ । তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে । কয়েকটি সেনানিবাস ও সেনা পরিবেষ্টিত বিমানবন্দর ছাড়া তার নির্দেশে দেশ পরিচালিত হয় এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়তে থাকে । ইতিমধ্যে ২৫শে মার্চ ভয়ঙ্কর কালো রাতে Operation Searchlight নামক সামরিক অভিযানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকার পিলখানা (EPR Headquarter), রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, আশপাশের এলাকা এবং পার্শ্ববর্তী জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুমন্ত নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালির উপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে হত্যা করে হাজার হাজার মানুষকে । ২৬শে মার্চ (১৯৭১ খ্রিঃ) প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বেতার যন্ত্রের (Wireless) মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন এবং মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন । এ রাতেই ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর নিজ বাসভবনে গ্রেফতার হন বঙ্গবন্ধু । বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মুক্তির মহামন্ত্রে অনুপ্রাণিত এবং উজ্জীবিত হয়ে দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করতে শত্রু'র বিরুদ্ধে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে । একপর্যায় প্রতিবেশি বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ভারত আমাদেরকে সাহায্য করে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয় ৷ 

পাকিস্তানপন্থী এ দেশীয় কিছু কুলাঙ্গার বাঙালি বিশ্বাসঘাতক রাজাকার, দালাল, আল বদর এবং আল শামস্ মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাক হানাদার বাহিনীকে সার্বিক সহযোগিতা করে ৷ পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগণ যুদ্ধের অনিবার্য পরাজয় বুঝতে পেরে স্বাধীনতা লাভের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে তাদের নির্দেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং এ দেশীয় রাজাকার, দালাল, আল বদর ও আল শামস্ বাহিনীর সহযোগীতায় বাংলাদেশের অসংখ্য বুদ্ধিজীবীদের সুপরিকল্পিতভাবে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে ৷ অবশেষে বীর বাঙালি জাতি অর্জন করে আমাদের মুক্তির ইতিহাস, স্বাধীনতার ইতিহাস এবং আত্ম-পরিচয়ের ইতিহাস । দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রায় দুই লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমহানি এবং ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মহান বিজয় অর্জিত হয় । পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ । যার স্রষ্টা শেখ মুজিবুর রহমান এবং এটি তার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন । বাঙালি, বাংলা, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ এক অবিচ্ছেদ্য সত্তা । 

এক সুবিশাল হৃদয়ের এ বীর শেখ মুজিব বাঙালি জাতির জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন । কিন্তু কয়েকজন অকৃতজ্ঞ, কুলাঙ্গার, স্বাধীনতা বিরোধী জাতীয়-আন্তর্জাতিক পরাজিত শত্রু এবং স্বার্থান্বেষীচক্রের চক্রান্ত দ্বারা বাঙালি জাতিকে চিরতরে নেতৃত্বশূন্য করার লক্ষ্যে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই আগস্ট সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি এবং বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে বর্বর, নৃশংস ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ৷ ধিক্কার তাদেরকে । 

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতির স্বাধীনতার এক অনন্য দলিল । বাঙালির মুক্তিসনদ । প্রাণস্পর্শী এ ভাষণ বঙ্গবন্ধুর অমর রচনা এবং শাশ্বত সৃষ্টি ৷ বাঙালির মহাকাব্য ৷ চেতনার বহ্নিশিখা ৷ অনুপ্রেরণার অন্তহীন উৎস ৷ 

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (UNESCO) গত ৩০শে অক্টোবর, ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ ফ্রান্সের প্যারিসে সদর দপ্তরের মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা (Irina Bokova) সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বিশ্ববন্ধু ও বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের কালজয়ী ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য (World documentary heritage) হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন । 

এ ভাষণ মানব জাতির এক অমূল্য সম্পদ । বিশ্বের ধ্রুপদী বক্তৃতাগুলোর { Abraham Lincoln Speech (Gettysburg Address), Martin Luther King Speech (I have a dream), Winston Churchill (We shall fight on the beaches), Charles de Gaulle (The flame of French resistance), Emmeline Pankhurst (Freedom or death), Vladimir Ilich Lenin (All Power to the Soviets), Joseph Stalin (Scorched earth), Mao Tse Tung, Dr. Fidel Castro, Ernesto Che Guevara, Nelson Mandela Speech (Changed the World)} অন্যতম শ্রেষ্ঠ হিসেবে '৭ই মার্চের ভাষণ' Memory of The World International Heritage এ অন্তর্ভূক্ত হওয়ার ফলে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা এ মহামূল্যবান ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে । যার ফলশ্রুতিতে বঙ্গবন্ধু'র ৭ই মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে সারাবিশ্বের জনগণ বাঙালি জাতি, বাংলা ভাষা, বঙ্গবন্ধু, মহান স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে আরো ঘনিষ্ঠভাবে জানতে পারবেন । অসহায়, নির্যাতিত, নিপীড়িত ও স্বাধীনতা প্রিয় মুক্তিকামী মানুষের কাছে বঙ্গবন্ধু'র আদর্শ অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করবে এবং শক্তি জোগাবে । তিনি এ গ্রহের মানুষের কাছে মহামানব হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন । 

UNESCO এর এ স্বীকৃতি বাঙালি জাতি, বাংলা ভাষা, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গৌরব ও সম্মানের । আমি ধন্যবাদ জানাই জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৮ মিনিট ৩১ সেকেন্ডের এ উজ্জীবনী, ধ্রুপদী এবং অনুপ্রেরণাদায়ী ভাষণটি ১৩টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে । জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক প্রাজ্ঞ ব্যক্তি, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গবেষকগণ ৭ই মার্চের ভাষণের বহুমাত্রিকতা নিয়ে গবেষণা করছেন । বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ যুগে যুগে বাঙালি জাতিকে শক্তি, সাহস, দৃঢ়তা এবং অনুপ্রেরণা জোগাবে । ভাষণটি হবে চির শাশ্বত এবং সার্বজনীন ।  


* তথ্যসূত্র: অন্তর্জাল (The Internet) ।


#বাংলাদেশ #Bangladesh #7thMarchSpeech #Bangabandhu  #Historic7March 

#March1971 #Independence #MonthOfIndependence #৭ইমার্চ #SheikhMujib #AwamiLeague #বঙ্গবন্ধু #শেখমুজিব #অগ্নিঝরা_মার্চ 


https://www.youtube.com/watch?v=Wh0q8vdH-ro 

https://bn.wikipedia.org/wiki/সাতই_মার্চের_ভাষণ 

https://en.wikipedia.org/wiki/7th_March_Speech_of_Bangabandhu 

https://web.facebook.com/awamileague.1949/

https://www.youtube.com/watch?v=Uu967gl03MU&feature=emb_title  


No comments:

Post a Comment

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...