ধূমপান (Smoking)
ধূমপান,
পক্ষান্তরে বিষপান ৷
ধূমপানের প্রধানতম উপাদান তামাক (Tobacco) ৷ তামাক উৎকট গন্ধযুক্ত, নেশাদায়ক এবং বিষাক্ত পদার্থ । তামাকের মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে মানব স্বাস্থ্যের উপর । ধোঁয়াযুক্ত বা ধোঁয়াবিহীন তামাক এবং তামাকজাত বিভিন্ন দ্রব্য যেমন: সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুটখা, নস্যি, খৈনি, গুল, সাদা পাতা, চুরূট, হুঁকো ইত্যাদিতে রয়েছে নিকোটিন (Nicotine) ৷ নিকোটিন হচ্ছে তামাকের তীব্র Psychopharmacological বৈশিষ্ট্যগুলির জন্য সর্বাধিক পরিচিত ও প্রধান উপাদান এবং এটি তামাক থেকে উদ্ভূত অত্যন্ত বিষাক্ত ক্ষারক । নিকোটিন ধূমপানে আসক্তি সৃষ্টির জন্য দায়ী । এছাড়া তামাকে বিদ্যমান Coniine, Anabasine, Lobeline, Pyridine, Piperidine ইত্যাদি ক্ষারকগুলি অনুরূপ বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে । নিকোটিন এক প্রকার স্নায়ু বিষ (Neurotoxin), যা এক ধরণের Cholinergic acetylcholine receptor এর উপর কাজ করে । Acetylcholine (ACH) হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ Neuro-transmitter যেটি মস্তিষ্কের এক নিউরন থেকে অন্য নিউরনে তথ্য সংবাহন (Massage) করে এবং এটি মানবদেহের উত্তেজনা, শিক্ষাগ্রহণ এবং স্মৃতির সাথে নিবিড় সম্পর্কযুক্ত । Acetylcholine এর সংস্পর্শে নিকোটিন এক প্রকার Trigger Impulse হিসেবে কাজ করে । নিকোটিনের বাণিজ্যিক নাম Nicorette, Nicotrol । এটি জলে দ্রবণীয়, বর্ণহীন, তিক্ত স্বাদযুক্ত এবং দ্রবীভূত হাইড্রোজেন আয়নের ঘনত্ব pH ৮.৫ । নিকোটিন পাওয়া যায় মূলত Solanaceae বা Nightshade গোত্রের তামাক উদ্ভিদে ( https://en.wikipedia.org/wiki/Solanaceae ) । এ উদ্ভিদের পাতা এবং মূল হচ্ছে নিকোটিনের প্রধান উৎস । তবে নিকোটিনকে Nicotinic acid এর সাথে বিভ্রান্ত করা উচিৎ নয় । নিকোটিনিক অ্যাসিড চর্বিযুক্ত Vitamin B₃ তে দ্রবণীয় । এটি একটি জৈব যৌগ ও অপরিহার্য মানব পুষ্টি, যেটি উদ্ভিদ এবং প্রাণী দ্বারা Amino acid tryptophan থেকে তৈরি করা যায় । নিকোটিনিক অ্যাসিডকে Niacin বলে । নায়াসিন বা নিকোটিনিক অ্যাসিড Pellagra রোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত হয় ।
তামাকের ইংরেজি নাম Tobacco ( https://en.wikipedia.org/wiki/Tobacco ) । ইংরেজি Tobacco শব্দের উদ্ভব হয়েছে পশ্চিম ভারতীয় West Indian (Caribbean) শব্দ Tabaco এবং স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ শব্দ Tobaco (Tobago বা Tobah) থেকে । ধারণা করা হয়, এ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে প্রাচীন দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসীদের মধ্যে গড়ে উঠা আরাওয়াক (Arawak) বা মেইপুরীয় ভাষা থেকে । পশ্চিম ভারতীয়রা ইংরেজি Y বর্ণ আকৃতির পাইপ বা নলের মধ্যে তামাক উদ্ভিদকে ধূমপানের জন্য ব্যবহার করতো । তামাক বা তামাক গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Nicotiana tabacum / Nicotiana rustica । তামাক গাছের শুকনো পাতাকেই বলে 'তামাক' । Narcotic poison, Alcohol, Fencidil, Cocaine, Heroin, Cannabis (Cannabinoid), Caffeine, Ethanol, Opium ইত্যাদি তন্দ্রাজনক, নিদ্রাকারক ও চৈতন্য বিলোপকারক মাদক দ্রব্যের মতোই অল্প পরিমাণে তামাক মস্তিষ্কে কাজ করে ৷ তামাক গাছ থেকে তামাক উৎপন্ন হয় । তামাকজাত পণ্যের মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার বিষ জাতীয় রাসায়নিক উপাদান রয়েছে । তামাক থেকে তৈরি হয় সিগারেট (Cigarette) এবং বিভিন্ন তামাকজাত পণ্য ৷ সিগারেট একটি তামাকজাত পণ্য, যেটি নিঃশ্বাসের সাথে ধোঁয়া গ্রহণ করে ধূমপান করা হয় । Injection এর পর এটি একটি সহজ মাধ্যম যার দ্বারা খুব দ্রুত ও সহজে কোনো যৌগকে রক্তে এবং দশ সেকেন্ডের মধ্যে মস্তিষ্কে পৌঁছানো যায় । সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা জৈব রাসায়নিক যৌগ Ethanal বা Acetaldehyde থেকে Mono-amine oxidase inhibitor তৈরি হয়, যা আসক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । সিগারেটে প্রায় ৫৭টি রাসায়নিক পদার্থ যেমন: Carbon monoxide, Cyanide, Menthol, Tar, Levulinic acid, Nitrogen oxides, Volatile nitrosamines, Hydrogen cyanide, Volatile sulfur, Alcohol, Volatile hydrocarbon, Aldehyde, Ketone, Alkaline, Sugar (acetaldehyde), Ammonia, Mono-amine oxidase inhibitors এবং শক্তিশালী তেজস্ক্রিয় Carcinogen বা DNA এর সাথে যুক্ত হয়ে Genetic mutation করে এমন কিছু বহুচক্রী Pyrolytic জৈব যৌগ যেমন: Benzopyrine / Polycyclic aromatic hydrocarbon, Acroline, Nitrosamine, Nicotine, Lead-210, Polonium-210 ইত্যাদি রয়েছে যা মানবদেহে Cancer নামক মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে । যদিও, যুক্তরাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগ ধূমপায়ীদেরকে ধূমপান ছাড়তে বিকল্প হিসেবে Gum, Skin patches, Mouth spray, Cytarabine (Cytosine) drug এবং Electronic cigarette ব্যবহারের পরামর্শ দেয় । কারণ E-cigarette (Vaping) এর ভেতরে সামান্য পরিমাণ Nicotine, Propylene glycol, Vegetable glycerin, পানি এবং সুগন্ধির দ্রবণ মিশ্রিত থাকে, যা তামাকের বিষাক্ত রাসায়নিক Tar, Carbon monoxide, Nicotine এর চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতি করে । তামাক বা তামাকজাত পণ্য সেবনের পর নিকোটিন খুব দ্রুত মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে । এ নিকোটিন স্নায়ুতন্ত্র এবং মানব মস্তিষ্কের Dopaminergic System কে উদ্দীপ্ত বা প্রভাবিত করে । নিকোটিনের উত্তেজনা বা উদ্দীপনার ফলে মস্তিষ্কের Nucleus accumbens থেকে প্রাকৃতিকভাবেই উৎপন্ন Dopamine হরমোন (Neurotransmitter) ক্ষরণ হয়, যার দরুণ মানুষ ক্রমশঃ আসক্ত হয়ে পড়ে তামাক বা তামাকজাত পণ্যের মধ্যে । ফলে পুরোশরীরের স্থিতিস্থাপকতা, মূল্যবান ক্ষমতা এবং প্রতিরোধ শক্তিকে হ্রাস করে ৷ এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, দুটি সিগারেটে যে পরিমান নিকোটিন থাকে তা একজন সুস্থ মানুষের দেহে পিচকিরির (Syringe) সাহায্যে প্রবিষ্ট করা হলে (Injected) সে মানুষটির তৎক্ষণাৎ মৃত্যু ঘটবে । অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধূমপান থেকে আস্তে আস্তে মাদকাসক্ত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে, যা অনিবার্য ধ্বংস ছাড়া সেখান থেকে ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই নগণ্য ।
ধূমপানের ইতিহাস দীর্ঘকালের । প্রাচীন কাল থেকেই বাণিজ্য, রাজনীতি, চিকিৎসা এবং কিছু ধর্মীয় আচারের অংশ হিসেবে ধূমপানের ব্যবহার ছিল । তখন থেকেই ব্যাবেলনীয় এবং মিশরীয়দের মধ্যে ধূমপানের প্রচলন ছিল । খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দে মিশরীয়রা ‘Cannabis' (মাদকদ্রব্যবিশেষ) নামক ধূমপান প্রচলন করেন । খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ শতাব্দীর দিকে মায়া সভ্যতার অধিবাসীগণ তামাক পাতা চিবানাে বা চর্বণ (Chewing Tobacco) এবং ধূমপান করতে শুরু করেন । Native American জনগোষ্ঠী (American Indian, Amerindian, Amerind, Aboriginal American, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসী জনগোষ্ঠী, আদিম আমেরিকান বা প্রথম জাতির ব্যক্তি, পশ্চিম গোলার্ধের যে কোনো আদিম জনগোষ্ঠীর সদস্য) আদিকাল থেকেই তামাক চাষ করতেন । এ জনগোষ্ঠী তামাক পাতার সাথে নানারকম ভেষজ উপাদান সংমিশ্রণ করে অসুস্থ্য ও আহতদের চিকিৎসায়, দাঁতের ব্যথা ও মাজন হিসেবে, ঘরে ধুনো দিতে এবং কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করতেন ৷ ধূমপান ছাড়াও বিনিময়ের বিশেষ মাধ্যম ছিল তামাক পাতা । প্রাচীন গুহাচিত্র থেকে জানা যায় মায়ান পুরোহিতরা ধূমপান করতেন । কিছু কিছু সমাজে তামাক পাতাকে স্রষ্টার উপহার বিবেচনা করে ধূমপানের মাধ্যমে আত্মার সাথে স্রষ্টার নিবিড় যোগাযোগের এক মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হতো । পরবর্তীকালে মায়ানরা পুরো আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে তামাকেরও বিস্তার ঘটে সেখানে । তামাক গাছের আদি নিবাস উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকায় । তামাকের প্রায় ৭০ টিরও বেশি পরিচিত প্রজাতি রয়েছে । যেমন Nicotiana tabacum, Nicotiana glauca (Tree tobacco), Nicotiana trigonophylla (Desert tobacco), Nicotiana attenuata (Coyote tobacco), Conium maculatum (Poison hemlock), Aethusa cynaprium (Fool's parsley) Lobelia inflata (Indian tobacco), Lobelia cardinalis, Laburnum anagyroides (Golden chain tree), Sophora secundiflora (Mescal bush bean), Sophora tomentosa (Necklace pod Sophora), Gymnocladus dioicus (Kentucky coffee bean), Areca catechu (Betel palm বা Betel nut) ইত্যাদি । তামাক উদ্ভিদের Nicotiana Tabacum (Common tobacco) প্রজাতি বৎসরের সব সময় জন্মে থাকে । সাধারণত গোলাপী বা লাল ফুল (কখনো কখনো সাদা) হয়ে থাকে । এ গাছের তামাকে শতকরা ০.৫% থেকে ৯% ভাগ পর্যন্ত নিকোটিন রয়েছে । স্থানীয়ভাবে এটিকে আদিমেনু 'Adimenu' বলে । এটি একটি ঔষধি গাছ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়, তাই অসুস্থতায় বেশ কার্যকরী । সিগারেট, চুরূট এবং অন্যান্য তামাক পণ্যের উৎস হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে এ উদ্ভিদ চাষ করা হয় । মাথা ব্যথা (Headache), কোমর ব্যথা (Waist pain), দাঁত ব্যথা (Toothache), গর্ভাবস্থায় বমি বমি ভাব (Pregnancy nausea) ইত্যাদি চিকিৎসায় এটি ব্যবহৃত হয় । Nicotiana প্রজাতির সমস্ত তামাক গাছের মধ্যে এটি সবচেয়ে বেশি জন্মে এবং এর পাতা প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয় । এ তামাক গাছকে Nicotiana sylvestris, Nicotiana tomentosiformis এবং সম্ভবত Nicotiana otophora এর বর্ণসঙ্কর (Hybrid ) বলে মনে করা হয় । এ উদ্ভিদটিকে মূলত ক্যারিবীয় অঞ্চলে বসবাসকারী Arawak বা Taino অধিবাসীরা প্রথমে ব্যবহার এবং পরবর্তীতে চাষ করেছিলেন । এটি গ্রীষ্মমন্ডলীয় ও উপ-গ্রীষ্মমন্ডলীয় উদ্ভিদ । তাপমাত্রা, বায়ু, স্থল আর্দ্রতা এবং জমির ধরণের ক্ষেত্রে এ গাছ সংবেদনশীল । Phthorimaea operculella Parasite নামক পরজীবী পোকা এ তামাক গাছের ক্ষতি করে । শিঙ্গা আকৃতির বড় সবুজ পাতা হয় । গাছটির প্রায় সম্পূর্ণ অংশই আঠালো ৷ ছোট বহুসংখ্যক বাদামী বীজগুলি বৃক্ক বা ডিম্বাকৃতির । বীজ ব্যতীত গাছের প্রায় প্রতিটি অংশেই নিকোটিন থাকে । উদ্ভিদের বয়সের সাথে নিকোটিনের ঘনত্বও বৃদ্ধি পায় । এ তামাক উদ্ভিদ আশেপাশের মাটি থেকে ভারী ধাতুগুলিকে সহজেই শোষণ করে এবং তার পাতায় জমা রাখে । গাছের পাতা বা বিভিন্ন অংশকে শ্বাস গ্রহণে ধূমপান বা অন্য কোনো মাধ্যমে সেবনের পর এর উপাদান ব্যবহারকারীর শরীরে সহজেই শোষিত হয়ে আসক্তি সৃষ্টি করে । এ তামাক গাছে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ রাসায়নিক পদার্থ Phytochemicals । তামাকের আরেক প্রজাতি Nicotiana rustica (Aztec tobacco / Wild tobacco) । এটি বন্য তামাক, ঔষধি গুণে সমৃদ্ধ ৷ সামাজিকভাবে আসক্তিযুক্ত উদ্দীপক হিসেবে এটি ব্যবহারের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে । প্রাক-কলম্বিয়ার সময়কালে মেক্সিকো, উত্তর আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে এটিকে ব্যাপকভাবে চাষ করা হতো । Rheumatic swelling, Skin diseases, Scorpion stings এর চিকিৎসায় এ উদ্ভিদ ব্যবহৃত হয় । এটি গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলের তামাক উদ্ভিদ ৷ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৮০০ মিটার উচ্চতায়ও এটি জন্মে । Aztec তামাকে শতকরা ১৮% ভাগ নিকোটিন রয়েছে । দক্ষিণ মেক্সিকোতে এটি Ucuch নামে পরিচিত । এটি তামাকের অত্যন্ত শক্তিশালী জাত এবং Solanaceae পরিবারের একটি Rain forest উদ্ভিদ ৷ সাধারণ প্রজাতির তামাক গাছের (Nicotiana tabacum) চেয়ে এটি নয় গুণ বেশি নিকোটিন ধারণ করে । গাছের সমস্ত অংশে নিকোটিন থাকে বলেই এটি একটি শক্তিশালী মাদকদ্রব্য ৷ Nicotiana rustica প্রায়শই দক্ষিণ আমেরিকার Shaman দের দ্বারা Entheogenic উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় । এ তামাক গাছটিতে অত্যন্ত আসক্তিযুক্ত উদ্দীপক ক্ষারযুক্ত নিকোটিনের উচ্চ উপাদান এবং তুলনামূলকভাবে উচ্চ স্তরের Beta-carboline এর কারণে Harmala alkaloids harmane এবং Norharmane রয়েছে । রাশিয়ায় এ উদ্ভিদকে 'মাখোরকা'(Makhorka) এবং ভিয়েতনামে থুওক লোও (Thuoc lao) বলে । মারায় ওটু (Maraş otu) (ইংরেজি: Maraş weed) হচ্ছে Nicotiana rustica তামাকের একটি চিবানো রূপ, যা সাধারণত তুরস্কের মারায় (Maraş) বসবাসকারী লোকেরা ব্যবহার করে থাকে । মারায় ওটু হচ্ছে Oak গাছের ছাই এবং Nicotiana rustica তামাকের মিশ্রণ, যেটিকে দেখতে মেহেদির মতো । মারায় বসবাসকারী লোকেরা Swedish Snus বা Afghan Naswar দের মতো ঠোঁটের নীচে মিশ্রণটি রেখে ব্যবহার করে থাকে । সিগারেট, বিড়ি, হুঁকা, চুরূট ইত্যাদির পাশাপাশি এ তামাক চিবিয়ে, পাইপ এবং শিশায় ব্যবহৃত হয় । এটি একটি মাদক হিসেবে স্বীকৃত । বেশি মাত্রায় গ্রহণের ফলে Vomiting, Diarrhoea, Slow pulse, Dizziness, Collapse, Respiratory failure ইত্যাদির পাশাপাশি কখনো পরিস্থিতি অবনতি ঘটিয়ে মৃত্যুর কারণ হতে পারে । Pythium spp, Rhizoctonia solani, Pseudomonas solanacearum, Phytophthora nicotianae কীট-পতঙ্গগুলি এ উদ্ভিদের ক্ষতি করে থাকে । তামাক গাছ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, চীন, ভিয়েতনাম, ভারত, আলজেরিয়া, পাকিস্তান, কানাডা, রাশিয়া, জাপান, তুরস্ক, মধ্য প্রাচ্য, আফ্রিকা এবং বলকান অঞ্চলে জন্মে । প্রায় সকল মাটিতেই তামাক গাছ ভালো হয় । বিশেষ করে হালকা দো-আঁশ মাটি এর জন্য বেশ উপযুক্ত । অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা তামাক চাষের জন্য ক্ষতিকর । বাংলাদেশে তামাক রবিশস্য হিসেবে চাষ করা হয় । বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রধানতঃ Nicotiana Tabacum (ভার্জিনিয়া, বার্লি) এবং স্বল্প প্রচলিত Nicotiana rustica (মতিহারি) তামাক চাষাবাদ করে । ভার্জিনিয়া ও বার্লি জাত তামাক থেকে সিগারেট, চুরূট এবং মতিহারি জাত তামাক থেকে হুঁকায় ব্যবহৃত তামাক, জর্দা, অন্যান্য ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্য তৈরি করা হয় । বিশ্বে সর্বোচ্চ তামাক ব্যবহারকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম অবস্থান ধরে রেখেছে, যা সত্যিই বিপদজনক!
ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপন এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য তৎকালীন বৃহৎ, শক্তিশালী ক্যাস্টিল রাজ্যের (Kingdom of Castile, Spain) ক্যাথলিক রাণী Isabella-I এর অনুদানে ইতালীয় নাবিক, অভিযাত্রী এবং ঔপনিবেশিক ক্রিস্টোফার কলম্বাসের (Christopher Colombus) নেতৃত্বে একটি স্পেনীয় অভিযাত্রীদল ইউরোপ থেকে আটলান্টিক হয়ে পশ্চিমের দিকে Indies বা West India (Asia) তে যাওয়ার পরিকল্পনা হিসেবে নৌযাত্রা শুরু করেন । কিন্তু এর পরিবর্তে তারা ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দের ০৫ই ডিসেম্বর ক্যারিবীয় হিস্পানিওলা দ্বীপের উত্তরাংশে নোঙর ফেলে আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার করেন । ইউরোপীয়রা নব্য-আবিষ্কৃত বিচ্ছিন্ন এ ভূখণ্ডের নাম দেন 'নতুন বিশ্ব' (The new world) । উত্তর আমেরিকা থেকে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ হয়ে দক্ষিণ আমেরিকার একেবারে দক্ষিণতম প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সুবিশাল এক ভূখণ্ড স্পেনীয় সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়ে আসে । যেখানে ৭ম শতাব্দী থেকেই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী তাইনো (Taino) আদিম অধিবাসীদের বসবাস ছিল । ক্রিস্টোফার কলম্বাসকে সেখানকার স্থানীয় অধিবাসীরা দেখে মনে করেন ঈশ্বর প্রেরিত স্বর্গীয় জীব । কলম্বাসকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে খুশি করার জন্য নানা প্রকার ফল, কাঠের তৈরী অস্ত্র এবং শুকনো তামাক উপহার দেন । আর এ তামাক পাতাই সারা পৃথিবী জুড়ে এক নির্মম অভিশাপ বয়ে আনে! ক্রিস্টোফার কলম্বাস তামাক পাতাকে গুরুত্ব না দিলেও স্থানীয় অদিবাসীদের মধ্যে তামাকের সাথে তাদের এক নিবিড় সম্পর্ক এবং প্রবল উৎসাহ লক্ষ্য করেন । কলম্বাসের সমুদ্রযাত্রায় স্পেনীয় সহযাত্রী Rodrigo De Jerez সে সময় কিউবা অদিবাসীদেরকে ধূমপান করতে দেখেন এবং কিউবানদের কাছ থেকে নিজেই ধূমপানের সংস্পর্শে আসেন প্রথম ইউরোপীয়ান হিসেবে । একসময় তিনি ধূমপানে তীব্র আসক্ত হয়ে পড়েন এবং স্বদেশে ফিরে আসার সময় তাদের কাছ থেকে বদ অভ্যাসটি সাথে করে নিয়ে আসেন । কিন্তু তার প্রতিবেশীরা কখনোই ধূমপানের সাথে পরিচিত না হওয়ার কারণে যখন তিনি ধূমপান করতেন সে সময় তার নাক-মুখ থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং অভূতপূর্ব এ ঘটনার জন্য প্রতিবেশীরা তাকে শয়তানের সহচর হিসেবে গণ্য করেন । যার দরুণ তাকে The Holy Inquisition of the Catholic Church কর্তৃক গ্রেফতার হয়ে ০৭ বছর কারাবন্দী থাকতে হয় । ১৫০৮ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজরা ভারতীয় উপমহাদেশে তামাক গাছ নিয়ে আসেন । তবে সেটি তামাকেরই ভিন্ন প্রজাতি Nicotiana rustica । সম্ভবত এটি ছিল প্রাক-কলম্বীয় যুগে (প্রাচীন আন্দীয় সভ্যতায়) মেক্সিকোতে প্রথম চাষকৃত আদি তামাক । ভার্জিনিয়া জাত তামাক প্রবর্তনের পূর্বে পৃথিবীতে ব্যাপকভাবে এ জাতের তামাক চাষ হতো । তবে ভারতীয় উপমহাদেশে ধূমপানের প্রচলন হয় মুঘলদের মাধ্যমে । নবাবদের বিলাসিতা এবং আভিজ্যাত্যের প্রতীক হিসেবে তামাকের সাথে নানা ধরণের সুগন্ধি মিশিয়ে তামাক ব্যবহার এবং পরবর্তীকালীন সময়ে হুঁকা, ছিলাম বা ছিলম (Chillum / Chilam) (তামাক খাইবার কলিকা) সাহায্যে ধূমপান করা হতো । ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপীয়রা ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে তামাক চাষ শুরু করেন এবং পরবর্তীতে তামাকের ব্যবহার ও বাণিজ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে । ইংরেজ জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতবিদ, নৃতাত্ত্বিক এবং অনুবাদক Thomas Harriet তামাক পাতা পুড়িয়ে ধোঁয়া টেনে নতুন নেশার জন্ম দেন । আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কারের পর উত্তর আমেরিকার মেক্সিকো থেকে স্পেনীয়রা ১৫৫৮ খ্রিস্টাব্দে তামাকের বীজ নিয়ে আসেন ইউরোপে (স্পেনের রাজা Philip II of Spain এর আদেশে) ৷ স্পেনীয় এবং পর্তুগিজরা প্রাচ্য-দূরপ্রাচ্য ও আফ্রিকা মহাদেশে তামাকের প্রসার ঘটান । ১৫৬০ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগালের তৎকালীন ফরাসী রাষ্ট্রদূত জাঁ নিকোট ডি ভিলামেইন (Jean Nicot de Villemain) ফ্রান্সে তামাকের বীজ এবং পাতা এনে এর ব্যবহার প্রচলন করেন । ফলে তার নামানুসারেই তামাক গাছের নাম দেওয়া হয় Nicotiana । পরবর্তীতে ইউরোপীয়রা তামাকের সাহায্যে ধূমপানকে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দেন এবং সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে বিভিন্ন দেশে ধূমপানের প্রচলন হয় । ইংরেজ রাজনীতিক, সৈনিক, গুপ্তচর, লেখক, কবি, অভিযাত্রী Sir Walter Raleigh ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের রানী Queen Elizabeth-I কে ধূমপান করার জন্য একটি পাইপ উপহার দেন । ধূমপান করার পর রানী অসুস্থ হয়ে পড়েন, যদিও মনে করা হয় তাকে বিষ দেওয়া হয়েছিল । উত্তর আমেরিকার প্রথম টেকসই ইংরেজ উপনিবেশ The Colony of Virginia সমস্ত ইংল্যান্ডের জন্য ছিল তামাকের একটি উৎকৃষ্ট স্থান । ১৬০৪ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের প্রথম স্টুয়ার্ট রাজা James-I, যিনি নিজেকে 'King of Great Britain' মনে করতেন, তিনিই সর্ব প্রথম তামাকের উপর উচ্চহারে কর আরোপ করেন । ইংল্যান্ডের Berkshire এর Eton শহরে Eton Public School (Eton College) এ ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে প্লেগ (Plague) আক্রান্ত শিশুদেরকে শক্তি বৃদ্ধির জন্য ধূমপান করার নির্দেশ দেওয়া হয় । সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইউরোপের দেশগুলি যখন একে অপরের সাথে যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত, সে সময় 'ধূমপানে আসক্তি' একটি বড় সমস্যা হয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে ৷ তখন ধূমপান নিষিদ্ধকরণ আইন জারি ও কঠোর শাস্তির বিধান করা হয় । কোনো কোনো দেশে মৃত্যুদণ্ড চালু করে এবং এতেও তামাকের জয়যাত্রা রোধ করা যায়নি ৷ উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যস্থলে, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের বৃহত্তম ও সবচেয়ে পশ্চিমে অবস্থিত দ্বীপ কিউবা এবং ক্যারিবীয় দ্বীপ-পুঞ্জে ১৮ শতকে বিক্রয়ের জন্য তামাক চাষ করা হয় । ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে সিগারেট বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে । ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে জার্মান পদার্থবিদ Wilhelm Heinrich এবং রসায়নবিদ Ludwig Weimann তামাক থেকে নিকোটিন পৃথক করে নিকোটিনের বিশুদ্ধ রূপ (Pure form of Nicotine) বুঝতে পারেন, এটি মারত্মক বিষাক্ত পদার্থ । ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে বেলজিয়ামের চিকিৎসক ও রসায়নবিদ Jean Stas তামাকের নির্যাস ব্যবহারকে হত্যার বিষ হিসেবে নথিভুক্ত করেন । তৎকালীন সময়ে সৈনিকদের কাছে সিগারেট খুবই প্রিয় বস্তু হয়ে উঠে । ক্লান্তি, অলসতা এবং হতাশা দূর করতে সৈন্যদের সিগারেট সরবরাহ করা হয় । অনেকেই ধূমপানের জন্য ব্যবহৃত তামাককে 'Brain tonic' বলে থাকেন । ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে ক্রিমিয়া যুদ্ধ ফেরৎ সৈনিকরা তুর্কি থেকে সিগারেট নিয়ে আসে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তামাক শিল্পপতি এবং সমাজসেবী Washington Duke যিনি The Confederate States Navy এর জন্য আমেরিকার গৃহযুদ্ধে লড়াই করেছিলেন, তিনি প্রথম হাতে তৈরি সিগারেট উদ্ভাবন করেন এবং ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে "W. Duke, Sons & Co." প্রতিষ্ঠা করেন । আরও এক আমেরিকান উদ্ভাবক James Albert Bonsack ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে প্রারম্ভিক সিগারেট ঘূর্ণায়মান মেশিন (Cigarette rolling machine) উদ্ভাবনের ফলে সিগারেট শিল্পে নব দিগন্তের সূচনা হয় । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিখ্যাত সিগারেট প্রস্তুতকারী বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান Marlboro (সিগারেট) এর উৎপাদন কারখানা Richmond, Virginia তে অবস্থিত (বর্তমানে Philip Morris USA) । American brand এ সিগারেটের বিপনন কার্যক্রম শুরু হয় ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে । ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে ১৬ বৎসরের নিচে কারো কাছে সিগারেট বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয় । ১৯১৪-১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে মহাযুদ্ধ বা প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময় সেনা সদস্যদের (সৈন্যবাহিনী) রেশনের সাথে সিগারেটও যুক্ত করা হয় । জার্মানিতে নাৎসি শাসনামলে ধূমপান রোধ করতে কঠোর মনোভাব পোষণ করে দেশব্যাপী ধূমপান বিরোধী বিভিন্ন প্রকার আইন প্রনয়ণ করা হয় । ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে চীন সর্বপ্রথম বাণিজ্যিকভাবে Transgenic তামাক চাষের বৈধতা দেয় । মানব সভ্যতার ইতিহাসে সংঘটিত সর্ববৃহৎ, নৃশংস, জঘন্য এবং সবচেয়ে ভয়াবহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ) পর ইউরোপে বিশেষ করে জার্মানিতে এক শক্তিশালী তামাক শিল্প গড়ে উঠে । প্রথম দিকে পুরুষ ধূমপান অভ্যাস করলেও পরবর্তীতে নারী ধূমপানে আকৃষ্ট হয়ে এর সংস্পর্শে আসে । সে সময় ইউরোপ মহাদেশে চিকিৎসাশাস্ত্রে গাছপালার ঔষধি গুণাগুণ নিয়ে প্রবল আগ্রহের সৃষ্টি হয় এবং আধুনিক চিকিৎসার জন্মলগ্নে তামাক গাছ প্রায় সর্বরোগের মহৌষধ হিসেবে খুবই উপকারী এবং নন্দিত হয়ে আবির্ভাব ঘটে । তবে তামাক শুধু ধূমপান হিসেবেই ব্যবহৃত ছিল না, তামাক কারখানার বর্জ্যগুলিকে কীটনাশক হিসেবেও ব্যবহার করা হয় । ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে সিগারেটের উপর কর বৃদ্ধি করা হয় । ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে সিগারেটের ক্ষতিকর দিক বিবেচনা করে সর্বপ্রথম প্রচারণামূলক কার্যক্রম শুরু হয় ৷ ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে রেডিও-টিভিসহ বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে সিগারেটের প্রচারণা নিষিদ্ধ করে সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে জন-সচেতনতামূলক বা সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি যেমন: Smoking cause cancer, Smoking kills, Smoking highly injurious to health, তামাক মৃত্যু ঘটায়, Smoking harmful to health, সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, Smoking is highly addictive don’t start ইত্যাদি দিয়ে বিশ্বের দেশগুলি ধূমপান রোধ বা নিষিদ্ধ করতে নানারকম পদক্ষেপ নেয়া শুরু করে । ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে জিন প্রকৌশল (Genetic engineering) ব্যবহার করে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধক্ষমতা (Antibiotic resistance) সম্পন্ন তামাক গাছে নকশার মাধ্যমে Transgenic শস্যের মধ্যে তামাক গাছই সর্বপ্রথম মাঠ পর্যায়ে চাষাবাদ করা হয় । ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে আন্তর্জাতিকভাবে ৩১শে মে 'বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস' পালন করে আসছে । বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ৫৬তম সম্মেলনে ধূমপান এবং তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার জন্য Framework Convention on Tobacco Control Convention এ বাংলাদেশ ১৬ই জুন ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষর এবং ১০ই মে ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে অনুস্বাক্ষর করে । বাংলাদেশে প্রচলিত ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ এর ০৪ ধারা অনুসারে প্রকাশ্যে বা জনসম্মক্ষে ধূমপানের জন্যে জরিমানা হিসেবে প্রথমে অনধিক তিন শত টাকা এবং পরবর্তীতে প্রতিবারের জন্য দ্বি-গুণ টাকা জরিমানা করে আইন করা হয় । তামাকের চাষ পৃথিবীতে অতি লাভজনক হওয়ার ফলে বিভিন্ন তামাক প্রতিষ্ঠান অর্থ, তামাক বীজ, সার, কৃষি উপকরণ সহায়তা ও কীটনাশক ইত্যাদি দিয়ে তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ করে কৃষকদেরকে । এক সময় তামাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা এবং সিগারেট ও চুরূট প্রতিষ্ঠানগুলি অধিকহারে মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষমতার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠে । এছাড়া বিশ্বের প্রায় প্রত্যেক দেশের সরকার সিগারেটসহ তামাকজাত বিভিন্ন পণ্য থেকে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আয় করে থাকে । যদিও বর্তমানে উন্নত বিশ্বে তামাক উৎপাদন কিছুটা হ্রাস পাচ্ছে, পক্ষান্তরে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে তামাক চাষ বেড়েই চলছে লাগামহীনভাবে । তামাক বা তামাকজাত বিভিন্ন পণ্যের সহজলভ্যতা, জনপ্রিয়তা, ব্যবহার, উৎপাদন, ব্যবসা, প্রচার-প্রসারতার কারণে এটি দুনিয়া জুড়ে মানুষের নানাবিদ জটিল রোগ এবং অসংখ্য মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে । সাধারণ নাগরিক, পেশাজীবী শ্রেণী, পরিবেশবাদী, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তরফ থেকে সারাবিশ্বে তামাক বিরোধী তীব্র আন্দোলন করার ফলে এর উৎপাদন, ব্যবহার ও বিক্রির উপর কিছু ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করে নীতিমালা প্রনয়ণ বা আইন প্রয়োগের কারণে কিঞ্চিৎ সাফল্য ছাড়া কার্যকর তেমন কোনো অগ্রগতি নেই । তবুও তামাকের দিগ্বিজয় রোধ করা সম্ভব হয়নি তামাক অর্থনীতির কারণে ।
ধূমপান দুর্গন্ধময়, অর্থ ব্যয়, চরম অস্বস্থিকর, মস্তিষ্কবিকৃতি, আত্মার শুদ্ধতা নষ্ট করে, অপবিত্র এবং এক ভয়ানক সর্বগ্রাসী প্রাণঘাতক ৷ ধূমপানের সময় সিগারেট ঠোঁটে লেগে (নিকোটিনের প্রভাবে) ধীরে ধীরে ঠোঁট, হাতের আঙুল, জিহ্বার ডগা, নাকের ছিদ্র, দাঁত ও মাড়িতে এক ধরনের কালচে দাগ পড়ে মুখের সৌন্দর্য নষ্ট করে, যা দৃষ্টিকটু ও বিব্রতকর । ধূমপানের ফলে Heart disease (হৃদরোগ), Brain stroke, Heart attack, Stroke, Hypertension, Chronic Obstructive Pulmonary Disease (COPD) (Emphysema এবং Chronic Bronchitis), Atherosclerosis disease, Lung (ফুসফুস) cancer, Larynx এবং Oral cancer (Leukoplakia, Periodontitis) (স্বরযন্ত্র ও মুখগহ্বরে), Colorectal cancer (মলদ্বার), Squamous cell sino-nasal cancer, Erectile dysfunction (যৌন অক্ষমতা বা লিঙ্গ উত্থান অক্ষমতা), Reduces sperm count and mobility, Esophagus (খাদ্যনালী) cancer, Liver (যকৃৎ) cancer, Gallbladder (পিত্তকোষ) cancer, Kidney (বৃক্ক) cancer বা Berger's disease, Brain hemorrhage (মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ), Adrenal gland (অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি) cancer, Small intestine (ক্ষুদ্রান্ত্র) cancer, Pancreatic (অগ্ন্যাশয়) cancer, Bladder cancer (মূত্রাশয় বা মূত্রথলি), Stomach (পাকস্থলী) cancer, Can prevent Parkinson's disease (পারকিনসন রোগ প্রতিরোধ করতে পারে), Influenza infected (ইনফ্লুয়েঞ্জা আক্রান্ত), Dementia disease, Causes rapid drug metabolism (ঔষধের বিপাক ঘটায়), Myeloid leukemia, Uterus (জরায়ু) cancer, Tuberculosis (যক্ষ্মা), Pneumococcal infections, Bleeding during pregnancy (গর্ভাবস্থায় রক্তপাত), Ectopic pregnancy (Miscarriage / Abortion), Diabetes (Diabetic nephropathy) (মধুমেহ), Cardiovascular disease (হৃৎপিণ্ড-রক্তনালী সংক্রান্ত রোগ), Atherosclerosis, Thrombosis, Marginal vascular disease, Pneumonia (নিউমোনিয়া), Increased symptoms of Crohn's disease (ক্রন'স রোগের উপসর্গ বৃদ্ধি), Kaposi Sarcoma, Asthma (হাঁপানি), Reduces stamina (মানসিক শক্তি বা মনোবল কমিয়ে দেয়), Myeloid leukemia, Damage to the Ovaries (ডিম্বাশয়ের ক্ষতি), The main cause of Infertility (বন্ধ্যাত্বের প্রধান কারণ), Interrupts the production of the Estrogen hormone (হরমোন তৈরিতে বিঘ্ন ঘটায়), Memory and Intellectuality are reduced (স্মৃতিশক্তি ও বোধশক্তি হ্রাস), Increases the risk of Alzheimer's disease (আলঝাইমার রোগের ঝুঁকি বাড়ায়), Accelerates lipid breakdown (লিপিড ভাঙ্গন ত্বরান্বিত করে), Cerebral atrophy (মস্তিষ্ক ছোট হয়ে যাওয়া) এবং তামাক পাতা থেকে নিকোটিন সংক্রমণের কারণে তামাক চাষী বা শ্রমিকের Green Tobacco Sickness রোগ হতে পারে । যুক্তরাষ্ট্রে এক গবেষণায় দেখা গেছে, মা-বাবার ধূমপানের কারণে তাদের অধিকাংশ শিশু গণিত ও যুক্তিবিদ্যায় কম পারদর্শী হয় । এমনকি এ সকল শিশুরা শিক্ষক ও সহপাঠীর সঙ্গে সঠিক আচরণ করতেও শেখে না । গর্ভাবস্থায় ধূমপান করলে তামাকের Carbon monoxide গর্ভস্থ সন্তানের শরীরের রক্তে Oxygen এর ধারণক্ষমতা কমিয়ে দেয় । তামাকের নিকোটিন গর্ভফুলের (Placenta) রক্ত সরবরাহ হ্রাস করে, ফলে মায়ের শরীর থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টি গর্ভস্থ সন্তানের শরীরে যেতে পারে না, তাই শিশুর বৃদ্ধিও ব্যাহত হয় । মায়ের ধূমপানের কারণে গর্ভপাত (Abortion), জন্মগত সমস্যা (Birth defects) ও অপরিপক্ক বা অপরিণত (Premature / Immature birth) শিশু জন্মগ্রহণ করে এবং এ সকল অপরিণত শিশুর (LBW) নানবিদ সংক্রমণ বা অন্য কোনো কারণে মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে অধিক হারে (SIDS) । বিশেষজ্ঞরা বলেছেন যে, বর্তমান করোনা ভাইরাস (Covid 19) বিশ্ব মহামারিতে ধূমপায়ীরা অধিকাংশ সময় Face mask না পরার কারণে ধূমপানের সময় যখন তারা ধোঁয়া ছাড়েন অথবা হাঁচি- কাশি দেওয়ার সময় নাক-মুখ থেকে Droplets বা ক্ষুদ্র লালাবিন্দু বের হয়, ফলে অন্য ব্যক্তিকে সংক্রমিত করার ঝুঁকি তৈরি হয় । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে প্রতিবৎসর সারাবিশ্বে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ তামাকের ক্ষতিকর প্রভাবে মৃত্যুবরণ করছে । কোনো ব্যক্তি নিজে ধূমপান না করেও, অন্য ব্যক্তির ধূমপানের কারণে বা পরোক্ষ ধূমপানের প্রভাবে প্রতি বৎসর প্রায় ৬০০০০০ মানুষ মৃত্যুবরণ করে । পরোক্ষ ধূমপানের কারণে পুরুষের তুলনায় নারী ও শিশুর উপর বেশি ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে, এতে করে সারাবিশ্বে প্রতিবৎসর প্রায় ৮১০০০ নারী এবং ১৬৫০০০ শিশু মৃত্যুবরণ করে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Disease Control and Prevention কেন্দ্রের মতে তামাক সারা পৃথিবীতে অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ । ধূমপানে বিষপান জানা সত্ত্বেও, অপরদিকে ধূমপানের সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি । তবে ধারণা করা হয়, Ulcerative colitis (বৃহদন্ত্রে ক্ষত সৃষ্টি), Alzheimer (স্নায়বিক ক্ষয়রোগ), Parkinson (স্নায়ু ক্ষয়ের ফলে ক্রমাগত হাত-পা কাঁপতে থাকা), Aphthous ulcer (মুখে ঘা), Breast cancer (স্তন ক্যান্সার) এবং Uterine fibroids (জরায়ুর রোগ), Sarcoidosis (লসিকা গ্রন্থির রোগ) রোগে এর সামান্য পরিমাণ উপকারী প্রভাব রয়েছে ।
একজন মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে, কৈশোর বা তারুণ্যের খামখেয়ালিপনায়, আবেগপ্রবণ হয়ে বা কোনো বিদ্রোহের কারণে, Rothmans / Benson & Hedges / 555 / Marlboro সিগারেটের জাঁকজমকপূর্ণ বিজ্ঞাপন দেখে, বদ অভ্যাসের প্রবণতা থেকে, সামাজিকতা রক্ষার অজুহাতে বা অন্যের দেখাদেখি, জিনগত কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে, সমবয়সীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কিংবা নির্বিচার সঙ্গদোষে ধূমপানে অভ্যস্ত হয় ৷ হতে পারে এখানে তার সু-শিক্ষা, মূল্যবোধ বা পারিবারিক শিক্ষার অভাব রয়েছে ৷ এছাড়া ধূমপান ধর্মীয়ভাবে অবৈধ বা নিষিদ্ধ, নীতি- আদর্শের লংঘন এবং মহাপাপ ৷ বেয়াদবি বা লোক সমাজে ধরা পড়ার ভয়ে ধূমপান শুরুটা হয় লুকিয়ে বা গোপনে । ধূমপানের সময় বড়দের কাছ থেকে সিগারেট আড়াল করতে যেয়ে হাত পুড়ে যাওয়ার অবস্থা হয়! একপর্যায় সহ্য করতে না পেরে দেহের পিছনে হাতের মধ্যে লুকানো জ্বলন্ত সিগারেটটি অগোচরে ফেলে দিয়ে রক্ষা পায় ৷ আবার কোনো একদিন সিগারেট পানের অপরাধে শাস্তি হিসেবে বড়দের কাছে কান ধরে উঠবস করতে হয় ৷ কদাচিৎ বন্ধুদের সাথে পাল্লা দিয়ে একটি সিগারেটকে ভাগ করে টেনে নেয় বা ধূমপান করে ৷ ভেজা সিগারেট জ্বলন্ত ফিলিপস্ বাতির নিচে আড়ালে শুকিয়ে নেয়ার কৌশলী ভাবনা থেকে ধূমপানের তৃপ্ততায় ধীরে ধীরে আকৃষ্ট হয় ৷ এক সময় সে Occasional smoker এবং পরবর্তীতে সিগারেটের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে সক্রিয় ধূমপায়ী হওয়ার কারণে তামাকের বিষাক্ত রাসায়নিক N-Nitrosonornicotine জৈব যৌগের সরাসরি সংস্পর্শে এসে নিজ দেহকে দূষিত করেন ৷ কোনো ব্যক্তি ধূমপানের ভয়াবহতা এবং বীভৎস রূপ তাৎক্ষণিকভাবে অনুধাবন করতে পারেন না বা বুঝেন না ৷ কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী মারাত্মক প্রভাব রয়েছে । এছাড়া Passive smoking এবং Second hand smoking বা নিস্ক্রিয় ধূমপানের (অন্য কারো ধূমপানের ধোঁয়া অনৈচ্ছিকভাবে মানুষের দেহে নিঃশ্বাসের মাধ্যমে প্রবেশ করে) ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হয় পরিবার-পরিজন ও কলুষিত হয় সমাজ-পরিবেশ ৷ একজন ধূমপায়ীর এমন শিষ্টাচার বহির্ভূত নিকৃষ্ট কাজে সকলের কাছে কখনো সে হয় অপ্রিয় এবং ঘৃণিত ৷
এতো কিছুর পরও সে মনে করে সিগারেট যেন কতো সুখ, তৃপ্তি, আনন্দ, আকর্ষণীয় এবং আভিজাত্যের ৷ দুরন্ত-উচ্ছ্বসিত মন ক্ষণিকের তৃষ্ণায় তৃষ্ণার্ত ৷ সে খুব কায়দা করে সিগারেট ঠোঁটে লাগিয়ে, আয়েস করে, সুখটানে (Nicotine hit) ধোঁয়ার তীব্রতায় আসক্ত হয়ে পড়ে ৷ Dopamine neurotransmission এর ফলে জিনের আচরণগত পরিবর্তন হয়ে খুবই দ্রুত ও সহজে এ যৌগ তার রক্ত ও মস্তিষ্কে পৌঁছে উদ্দীপনা, মানসিক প্রশান্তি এবং স্মৃতিশক্তির সক্রিয়তা, ক্ষিপ্রতা ও তৎপরতা বৃদ্ধি করে ৷
সে কখনো ভাবে নিজেকে সারা বিশ্বের অধিকর্তা ৷
মনে করে ক্লান্তি, মানসিক চাপ, বেদনা, অসৎ ভাবনা ও নৈরাশাকে দূর করে ৷
তার সামাজিক মর্যাদা ও ব্যক্তিত্ব সুদৃঢ় হচ্ছে ।
একান্ত আপনজনকে আকৃষ্ট করতে Smart মনে করে ৷
বিরহে প্রশান্তির পরিতৃপ্তি অনুভব করে ৷
একাকীত্বে সাহস ও শক্তি যোগানোর মতো কেউ পাশে না থাকলেও সিগারেটকে তার বিশ্বস্ত সঙ্গী মনে করে ৷
বিলাসী মনে সিগারেট হাতে প্রেয়সীর পথ চেয়ে বসে থাকে ৷
কখনো কোনো বিশেষ মুহূর্ত, লোমহর্ষক বা শিহরণ জাগানো প্রেম কাহিনী পড়ে, সৃষ্টিশীল কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে সে হয় Chain smoker ৷
আসলে এখানেই কি এর রহস্য?
না- কি হাস্যকর ।
কে জানে?
হয়তো, মিছে মিছেই মরীচিকার পিছনে অবিরাম ছুটছে ৷ কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সিগারেটের প্রতিটি টানে টানে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা ।
প্রকাশ্যে ধূমপান একটি সামাজিক অপরাধ এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত । তামাক বা ধূমপান বিরোধী জন-সচেতনতামূলক ও সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তির পাশাপাশি এ সম্পর্কিত Global Adult Tobacco Survey, তামাক বিরোধী দিবস, Tobacco and Lung Health, Earth Smoking and Human, বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস, Stop Tobacco Bangladesh ইত্যাদি তামাক বিরোধী নানাবিদ কর্মকান্ড, প্রচার- প্রচারণা ও ক্ষতি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনেও মানুষ এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন এবং সতর্ক হয়নি ।
সর্বনাশা তামাকের নৃশংস ভয়াবহতা, মরণঘাতি করোনাভাইরাস (Covid 19) দ্বারা ধূমপায়ী ব্যক্তির দ্রুত গতিতে সংক্রমিত হওয়া, জীবন ধ্বংসের সম্মূখীন আর অনিবার্য মৃত্যু জেনেও নিজ সত্তার বিপরীতে ধাবমান মানুষ!
জীবনের অনেক কিছুই এখন অতীত, ধূমপান আজো চলমান । দিব্যি করে কতোই না... ছেড়ে দিবে ৷
দৃঢ় সংকল্পে নিভৃতে যুদ্ধ করে মনের সাথে ৷ কিছুদিন পারে, আবার যে - সে ৷
তীব্র কঠিন ৷
পারেনি, কতো বার চেষ্টা করেও ব্যর্থ!
তবে কি, সে পরাজিত?
না, তাকে পারতেই হবে ৷
উপলব্ধি, কঠোর সিদ্ধান্ত, কার্যকর প্রচেষ্টা এবং প্রবল ইচ্ছাই বড় শক্তি ৷ ধূমপানের ক্ষণিক তৃষ্ণাকে ছিন্ন ভিন্ন করে এটি বর্জন করতে হবে ৷ পরিহার করাই হবে মনের সত্যিকার সৌন্দর্য এবং সাহসী-মহৎ কাজ ৷
সে পেরেছে ৷
জীবনের রূঢ় বাস্তবতা চূড়ান্তভাবে তাকে পারতে শিখিয়েছে ৷ ধূমপান পরিহার করা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না ৷
অধঃপতন এবং ধ্বংসের সূচনাকে খুব কাছ থেকে দেখেছে ৷ হয়তো বিলম্ব ও নূন্যতম ক্ষতির পরও আজ সে ধূমপান মুক্ত মানুষ ৷ সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক । তার শারীরিক-মানসিক সুস্থতার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে একটি সুখী পরিবার এবং সুরক্ষিত থাকবে পরিবেশ ৷ তৈরি হবে সুস্থ, সুন্দর, পরিচ্ছন্ন এবং মানবিক রাষ্ট্র । ধূমপানমুক্ত হবে ধরিত্রি ৷ যা মানবজাতির জন্য মহা কল্যাণ বয়ে আনবে ৷ আর সেখানেই অর্জিত হবে মনুষ্যত্বের বিশালতম জয় ৷
সুতরাং, ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর । ধূমপান নানাবিদ জটিল মরণব্যাধি সৃষ্টি করে মানুষকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করে । জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক অপরাধের কথা বিবেচনা করে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে অতিদ্রুত তামাক, তামাকজাত পণ্যের বিস্তার রোধ ও মাদক দ্রব্যকে নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে । তামাক উৎপাদন নিরুৎসাহিত করে এর পরিবর্তে নানা জাতের ফসল চাষাবাদের ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তামাক শিল্পকে পর্যায়ক্রমে ভিন্ন খাতে স্থানান্তর করে এর সাথে যুক্ত শ্রমিকদের বিকল্প কর্ম-সংস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে । তামাক প্রতিষ্ঠানগুলির (Tobacco Company) উপর নিয়ন্ত্রণ এবং E-cigarette, Heated tobacco products (HTP) বা Emerging tobacco products আমদানি এবং বিক্রয় নিষিদ্ধ করতে হবে । এছাড়া মাদকাসক্তি একটি মারাত্মক ব্যাধি । এর ফলে মানসিক ও স্বাস্থ্যগত প্রভাবে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে একটি দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হয় । একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি একটি পরিবারকে নিমিষেই ধ্বংস করতে পারে । মাদক নির্ভরশীলতা হচ্ছে পুনর্বার আসক্তিমূলক জটিল মস্তিস্কের রোগ (A chronic relapsing brain disease) । তাই মাদকাসক্ত বা মাদক নির্ভরশীল ব্যক্তিকে দীর্ঘমেয়াদী সমন্বিত সঠিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ও পরিচর্যার {চিকিৎসা ধরণ ও পদ্ধতি: Assessment (রোগ নির্ণয়), Medical planning (চিকিৎসা পরিকল্পনা), Detoxification (নির্বিষকরণ) এবং Physical therapy (শারিরীক চিকিৎসা), Psychiatry (মানসিক রোগের চিকিৎসা), Counseling services (কাউন্সেলিং সেবা), Psychosocial education (মনো-সামাজিক শিক্ষা) এবং Life skills training (জীবন দক্ষতামূলক প্রশিক্ষণ) , Narcotics anonymous meeting (অজ্ঞাতনামা মাদকদ্রব্য সভা), চিকিৎসা পরবর্তী সেবা ও পরিচর্যা (Post-medical services and care), রোগীর ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা (Confidentiality of patient's personal information)} মধ্যদিয়ে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন-যাপনে ফিরিয়ে এনে তাকে মাদক থেকে দূরে রাখতে হবে (পুনর্বাসিত করতে হবে) । জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের তামাক নিবারণ কেন্দ্র, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল এবং কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে জাতীয় পর্যায়ে আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর মাদক নিরাময় বা পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন এবং এর সাথে কেন্দ্রগুলির সংস্কার, ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে । ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি সামষ্টিকভাবে তামাক তথাপি ধূমপান এবং মাদকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করে তীব্র প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করে ধূমপান ও মাদকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে । শিশু, কিশোর-কিশোরী, ধূমপায়ী-অধূমপায়ীদেরকে চিকিৎসকের শিক্ষা, সেবা, পরামর্শ এবং Counseling এর মাধ্যমে তামাক ব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে কার্যকরভাবে সকলকে বুঝাতে হবে যে, শুধুই ক্ষতি ছাড়া এর কোনো উপকার নেই । উন্মুক্ত স্থান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যান-বাহন, আদালত প্রাঙ্গন, প্রেক্ষাগৃহ এবং হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পুরোপুরিভাবে ধূমপান মুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে । সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে এর বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনকে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে । ধূমপান এবং মাদকের কুফল বা ক্ষতিকর দিক ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব সম্পর্কে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম ও সকল প্রকার ধর্মীয় উপসনালয়ে জনগণের কাছে সরাসরি প্রচার করতে হবে । জাতীয় উৎসব ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে তামাক পণ্য বর্জনের পাশাপাশি দেশব্যাপী ধূমপান ও মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে । একটি সুস্থ জাতি গঠনে তামাক এবং মাদকমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ করা একান্ত প্রয়োজন । তাই সুস্থ এবং সুন্দরভাবে বাঁচতে মাদক, তামাক তথাপি ধূমপানকে না বলি ৷ তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ি ।
No comments:
Post a Comment