Thursday, 2 April 2020



কৃষ্ণচূড়া ৷
বৈজ্ঞানিক নাম: Delonix regia । প্রচলিত ইংরেজি নাম গুলো: Royal poinciana, Peacock flower, Gold mohair, Royal flame tree, Arbol de Fuego, Gulmohar, Flamboyant tree, Flame tree । এটি Fabaceae পরিবারের অন্তর্গত ৷ বৃক্ষ জাতীয় পর্ণমোচী উদ্ভিদ ৷ অগ্নিবর্ণ এ গাছ রক্তচূড়া কিংবা গুলমোহর নামেও পরিচিত ৷ আগুনলাল ফুলের জন্যেও প্রসিদ্ধ । অপূর্ব এ ফুলের রঙ টকটকে লাল, কমলা, সাদা, বেগুনী ও হলুদ এবং পাতা উজ্জল সবুজ ৷ বাংলাদেশে বসন্ত কালে এ ফুল ফোটে ৷ প্রখর রৌদ্রে ফিরে পায় প্রাণের উচ্ছ্বাস । চমৎকার রঙে প্রকৃতিতে আগুন ঝরে ৷ ঋতুরাজ বসন্তের প্রতীক ৷ রাজকীয় গাছ ৷ দৃষ্টিনন্দন এ কৃষ্ণচূড়াকে নিয়ে বিশ্বকবি রবি ঠাকুর কবিতা রচনা করেছেন— ''গন্ধে উদাস হাওয়ার মত উড়ে তোমার উত্তরী- কর্ণে তোমার কৃষ্ণচূড়ার মঞ্জরি'' ... বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম কৃষ্ণচূড়ার মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যকে রচনা করেছেন— ''কৃষ্ণচূড়ার রাঙা মঞ্জরি কর্ণে- আমি ভুবন ভোলাতে আসি গন্ধে ও বর্ণে'' ... কিংবা, কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন— ''আবার ফুটেছে দ্যাখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে শহরের পথে কেমন নিবিড় হয়ে, কখনো মিছিলে কখনো-বা একা হেঁটে যেতে যেতে মনে হয়- ফুল নয়, ওরা শহীদের ঝলকিত রক্তের বুদ্বুদ, স্মৃতিগন্ধে ভরপুর ।'' কৃষ্ণচূড়া প্রকৃতির মাঝে নিজেকে মেলে ধরে আপন মহিমা, সৌন্দর্য, মাহাত্ম্য আর আভিজাত্যে । এর রঙ এতই তীব্র যে অনেক দূর থেকে চোখে পড়ে মনকে আকর্ষিত ও উদ্বেলিত করে । গ্রীষ্মের রুক্ষ- শুষ্ক প্রকৃতিতে বিশেষ করে বৈশাখের কাঠফাটা রোদ্দুরে কৃষ্ণচূড়া দেয় এক অনাবিল শীতল পরশ, ক্লান্তি দূর করে নিবিড় প্রশান্তিময় প্রাণে জাগিয়ে তোলে নব উদ্দীপনা । রক্তিম কৃষ্ণচূড়ার রঙে কখনও কখনও প্রকৃতি প্রেমী কবি তার আবেগ, ভালোবাসা আর প্রেমে রাঙিয়ে তোলে হৃদয়ের নীল আকাশের ক্যানভাস । ''চৈত্রে হয়তো ফোটেনি কৃষ্ণচুড়া, তাতে ক্ষতি নেই; তোমার ঠোঁটেই দেখি এসেছে আবার কৃষ্ণচুড়ার ঋতু, তুমি আছো তাই অভাব বুঝিনি তার; না হলে চৈত্রে কোথায়ইবা পাবো বলো, কৃষ্ণচুড়ার অযাচিত উপহার ।'' বাংলা সাহিত্যে, বাঙালি সংস্কৃতিতে এবং কতিপয় আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কৃষ্ণচুড়া গাছের নিবিড় সম্পৃক্ততা রয়েছে । অতিদ্রুত বর্ধনশীল, চির সবুজ ও সৌন্দর্য বর্ধনের অধিকারী এ কৃষ্ণচূড়া গাছের আদি নিবাস পূর্ব আফ্রিকার দেশ (Madagascar) মাদাগাস্কারে ৷ গ্রীষ্মপ্রধান বনাঞ্চলীয় ও প্রায় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে উষ্ণ, আর্দ্র পরিবেশে এটি খুব ভাল জন্মে এবং গ্রীষ্মকালে দ্বিখণ্ডিতভাবে যৌগিক পাতাগুলি হলদে রূপ ধারণ করে ঝরে যায় ৷ তবে, নাতিষীতোষ্ণ অঞ্চলে এটি থাকে চিরসবুজ ৷ ৪৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচে তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে না । শুষ্ক ও লবণাক্ততা সহ্য করার ক্ষমতা বেশি ৷ শুকনো মাটি বিশেষ করে দো-আঁশ, বেলে বা কঙ্করযুক্ত মাটি এর জন্য উপযুক্ত এবং বীজের অঙ্কুরোদগম ও গুটি কলম পদ্ধতিতে বংশবিস্তার করা যায় । কোনও বড় কীট বা রোগের সমস্যা নেই, তবে Phellinus noxious নামক এক জাতীয় ছত্রাক যার কারণে গাছের শিকড় পচে যেতে পারে । একটি পরিপক্ক গাছের আকার প্রায় ২০ থেকে ৪০ ফুট হয় । নতুনভাবে লাগানো একটি গাছ প্রথমবারের মতো ফুল ফোটতে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে । যদিও কিছু গাছ বারো বছর বা তারও বেশি সময় নেয় বলে জানা গেছে । লাল রঙের আকর্ষণীয়, দৃষ্টিনন্দন ও বিস্ময়কর সুন্দর ফুলগুলো মে থেকে জুলাই মাসে থোকায় থোকায় বা গুচ্ছবদ্ধ ভাবে প্রদর্শিত হয় এবং এক মাস বা আরও বেশি সময় ধরে গাছে দীর্ঘস্থায়ী হয় । এটি লম্বা'র চেয়ে আরও প্রশস্ত বা বিস্তীর্ণ চাঁদোয়া'র (Canopy) মতো একটি পরিণত কৃষ্ণচূড়া গাছ একটি ছাতার মতো মনে হতে পারে । সূক্ষ্ম, ফার্ন-জাতীয় কচিপাতা গুলো হালকা শীতল ছায়া দেয় এবং উজ্জ্বল রক্তবর্ণ ফুলগুলো ঝলমলে হয়ে উঠে । এ গাছের বাকল মসৃণ এবং ধূসর । যদিও গাছটি ঝড়ের মধ্যে দৃঢ় বা বলিষ্ঠভাবে টিকে থাকতে পারে না, প্রায়শই ডালপালা ভেঙ্গে যাওয়ার পরে দ্রুত নিজেকে পুনরুদ্ধার করে তোলে । সুগন্ধহীন কৃষ্ণচূড়া ফুলের পাঁচটি থেকে আটটি পাপড়ির প্রতিটি লালচে কমলা বা টকটকে লাল বর্ণের । একটি পাপড়ি অন্যের চেয়ে বড় এবং এর মাঝে হলুদ ও সাদা চিহ্ন রয়েছে । আগস্ট থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি ফল ধরে । শিমের মতো ফল একটি বীজের শুঁটি, যা দীর্ঘ এক ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে । অসাধারণ সুন্দর আর দুর্দান্ত রঙের কারণে সারাবিশ্বেই এর কদর রয়েছে । West Indies (ক্যারিবীয় অববাহিকা ও উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরীয় অঞ্চল), আফ্রিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, আরব- আমিরাত, হংকং, তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন, বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশেই কৃষ্ণচূড়া গাছ জন্মে ৷ যুক্তরাষ্ট্রে শুধুমাত্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিম Florida, Texas এর Rio Grande Valleyতে এবং Hawaii এ কৃষ্ণচূড়া গাছ দেখা যায় ৷ তবে, শীতপ্রধান রাজ্যে এ গাছ Greenhouse (সবুজঘর/উষ্ণগৃহ), সংরক্ষণাগার কিংবা একটি বন্ধ বারান্দায় রাখতে হয় । ফলে, পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় কৃষ্ণচূড়া ফুল ফোটার সময়কালও ভিন্ন ৷ অনেকে এটিকে বিশ্বের অন্যতম সুন্দর গাছ বলে মনে করে থাকেন । এ গাছে প্রচুর পরিমাণ ঔষধি গুণাগুণ রয়েছে । কৃষ্ণচূড়ার পাতা পানিতে ফুটিয়ে সে পানি পান করলে সন্ধিবাত ভালো হয়, পাতা চিবিয়ে খেলে গলায় স্বরভঙ্গের স্বাস্থ্যকর অবস্থা ফিরে আসে, পাতা পিষে রস করে এর সাথে মধু মিশ্রিত করে প্রতিদিন ভোরে পান করলে জ্বর থেকে মুক্তিলাভ করা যায় এবং পিত্ত রস বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে । এর মূল, ছাল গুঁড়ো করে সাথে পানি মিশ্রিত করে পান করলে শ্লেষ্মা তরল করে বের করে দেয় । কৃষ্ণচূড়ার ফুল রোদে শুকিয়ে চূর্ণ করে বা রস করে গোসলের পূর্বে মাথায় ব্যবহার করলে খুশকি (Dandruff) দূর হয় এবং চুল ভাল থাকে । কৃষ্ণচূড়া নামের সাথে আংশিক মিল পাওয়া যায় এমন আরো দুটি সুন্দর ফুল রয়েছে- রাধাচূড়া, কনকচূড়া ৷ রাধাচূড়া (Caesalpinia pulcherrima) ফুলের রঙ হয় গাঢ় লাল ও হলুদ, এর আদি নিবাস West Indies এ ৷ কনকচূড়া ( Peltophorum roxburghii ) ফুলের রঙ হলুদ ৷ এটির নিবাস শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়ায় ৷ সুতরাং তিনটি ফুলই ভিনদেশী ৷
নজরকাড়া এত সুন্দর ফুল কৃষ্ণচূড়ার নাম কেন যে হল 'কৃষ্ণচূড়া'?
সত্যিই, রহস্যময়! তবে, কেউ কেউ মনে করেন মহাভারতের যুগে রাধাকৃষ্ণের (মহাভারত পুরাণে বর্ণিত রাধা ও কৃষ্ণ) নামানুসারে ফুল দুটির নামকরণ হয় ৷ কৃষ্ণ হচ্ছে- কালো এবং চূড়া হচ্ছে- উপরে, আগায়, মাথায় বা শীর্ষে ৷ বলা যায়, কালোর মাথায় ৷ তবে কি, সে অর্থে- কৃষ্ণের মাথায় চুলে চূড়া বাঁধার ধরণ থেকে এর নাম হতে পারে ৷ রাধাচূড়ার ক্ষেত্রেও মনে করা হয়, রাধাকৃষ্ণের অমর প্রেমকে মহীয়ান করে শ্রীমতি রাধাকে অমর করে রাখতে রাধাচূড়া নাম দেওয়া হয় ৷ তবে, সেটি প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরনো ইতিহাস ৷ কিন্তু, ভিনদেশী এ বৃক্ষগুলো ভারত উপমহাদেশে এসেছে প্রায় তিন থেকে চারশ বছর আগে ৷ সে হিসেবে ফুলগুলোর নামকরণ অনেক পরের ঘটনা ৷ এছাড়া, এ ফুলের নামগুলো কোন কবি, প্রকৃতি প্রেমী কিংবা উদ্ভিদ বিজ্ঞানীও দিয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হয় ৷ প্রকৃতপক্ষে কে, কখন, কোথায়, কিভাবে এ ফুলগুলোর নামকরণ করেন তার সঠিক তথ্য এবং পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না । https://web.facebook.com/muhammadashraful.alam/posts/1284920688287932 https://wordpress.com/posts/muhammadashrafulalam.wordpress.com

No comments:

Post a Comment

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...