Thursday, 18 September 2025

ঐতিহাসিক মিরকাদিম সেতু



মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার রামপাল ইউনিয়নের পানাম গ্রামে তথাপি প্রাচীন বাংলার রাজধানী বিলুপ্ত শ্রীবিক্রমপুর মহানগরের সীমানা পরিখা মিরকাদিম খালের উপর ইট, সুরকি এবং চুন ব্যবহার করে তিন খিলান বিশিষ্ট এই পুল বা সেতুটি নির্মাণ করা হয় । এটি পুলঘাটা বা পানামের পুল অথবা মিরকাদিমের পুল নামে পরিচিত । বিক্রমপুর এক অতি প্রাচীনতম জনপদ । বিক্রমপুর প্রাচীন বঙ্গের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র । নানা ধর্মের মানুষের বসতি এবং অনেক কীর্তিমান ও সু-মহান গুণীজনের নাড়ির শিকড় এই বিক্রমপুরেগৌরবোজ্জ্বল স্থান বিক্রমপুরের রয়েছে প্রাচীন এক সমৃদ্ধ ইতিহাস । ঐতিহ্যবাহী এই নগরীতে গড়ে উঠেছে বহুমুখী স্থাপনা । এর মধ্যে একটি হচ্ছে মিরকাদিম সেতু । এই বিক্রমপুর পরগনার ঐতিহাসিক মুঘল আমলের নান্দনিক ও বিস্ময়কর মিরকাদিম সেতুটি মুঘল স্থাপত্যের এক মহামূল্যবান স্মারকচিহ্ন মিরকাদিম সেতুর নির্মাণ সম্পর্কিত কোনো শিলালিপি না থাকলেও হারানো নিধি পর্ব-১ এর বিবরণ থেকে জানা যায় যে, ষষ্ঠ ও সর্বশেষ মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের (১৬৫৮ খ্রিঃ ১৭০৭ খ্রিঃ) রাজত্ব কালে ঢাকার প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় এবং সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে জলদুর্গ নির্মাণের পাশাপাশি ১৬৫৮ থেকে ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মুঘল সুবাদার মীর জুমলা (১৫৯১ খ্রিঃ – ১৬৬৩ খ্রিঃ) মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার ইদ্রাকপুর কেল্লা থেকে ঢাকা জেলার দোহার উপজেলায় অবস্থিত মুসা খানের কেল্লা পর্যন্ত দুইটি সেতু নির্মাণ করেন । এর মধ্যে একটি হচ্ছে মিরকাদিম সেতু এবং অপরটি তালতলা সেতু । তবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংরেজরা বোমা হামলা করে তালতলা সেতুটি উড়িয়ে দেয় । ধুনক আকৃতি এই সেতুর রয়েছে এক চমৎকার নির্মাণশৈলী । সেতুটি পুরোটাই ইটের পলেস্তরা করা । এটির দৈর্ঘ্য ঢালসহ প্রায় ১৭২ ফুট (প্রায় ৫২.৪২ মিটার ) এবং প্রস্থ ১৬ ফুট ৬ ইঞ্চি । পানির উপরিভাগ থেকে সেতুর উচ্চতা প্রায় ৩০ ফুট । স্তম্ভ বা ভিমের পরিধি ৪ হাত পুরু সেতুটির মাঝের খিলানের উচ্চতা প্রায় ১৯ হাত এবং পাঁচ হাত প্রস্থসহ দুই পাশের প্রতিটি খিলানের উচ্চতা প্রায় ১১ হাত । চির সবুজ এবং অনাবিল সুন্দর প্রকৃতির মাঝে বয়ে যাওয়া এই খরস্রোতা খালে বড় বড় মালবাহী নৌকা চলাচলের সুবিধার জন্য সেতুর মাঝখানের খিলানটিকে উঁচু করা হয়েছে । মূল সেতু থেকে ৭ কিলোমিটার দক্ষিণে টংগিবাড়ী উপজেলা এবং ৭ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে মুন্সীগঞ্জ শহর অবস্থিত । প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের এক অমূল্য ও অনন্য মহাকীর্তি হিসেবে এটি এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে । নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে কালের সাক্ষী হয়ে এই সেতুটি মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা এবং টঙ্গীবাড়ী উপজেলাকে বিভক্ত করেছে । সেতুর পূর্বপ্রান্তটি মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার রামপাল ইউনিয়নের পানাম গ্রামে এবং পশ্চিমপ্রান্তটি মুন্সিগঞ্জ জেলার টঙ্গিবাড়ী উপজেলার আব্দুল্লাপুর ইউনিয়নের মিরকাদিম গ্রামে পড়েছে । ঐতিহ্যবাহী সেতুটির ঢালে রয়েছে এক বিশাল অশ্বত্থ গাছ । যদিও এই সেতু এবং এর ইতিহাস সম্পর্কে স্থানীয়ভাবে অল্পসংখ্যক মানুষের জনশ্রুতি বা কল্পিত বা ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে, এটি একটি 'জিনের সেতু' বা 'গায়েবী সেতু' । দৃষ্টিনন্দন সেতুটি বিভিন্ন সময়ে সংস্কারের ফলে এটির আদিরূপ অনেকটাই বিলীন হয়ে গেছে । দীর্ঘদিনের অযত্ন ও অবহেলায় সেতুটির দুই পাশের কাঠগড়া বা বেড়ার (Railing) কিছু অংশ ভেঙ্গে গেছে । এছাড়া, সেতুর নিচ দিয়ে ট্রলার বা অন্যান্য নৌযান চলাচলের সময় এটিতে আঘাতের ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে । প্রাচীন বিক্রমপুরের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য ধারণকারী মিরকাদিম সেতুটি মুন্সীগঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীনতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন । পর্যটকদের জন্য এটি একটি আকর্ষণীয় স্থান । গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বর্তমানে সেতুটির রক্ষণাবেক্ষণ করছে ।

ছবি: নিজ
তথ্যসূত্র: আন্তর্জাল, https://www.teachers.gov.bd/

No comments:

Post a Comment

প্রত্যাখ্যান (কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো)

প্রত্যাখ্যান কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল প্রিয়তম, অন্য কোনো জীবনে বা দেশে আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করে...