Sunday, 25 October 2026

ভ্যান গগের বিখ্যাত চিত্রকর্ম 'নক্ষত্রময় রাত্রি'








ভ্যান গগের বিখ্যাত চিত্রকর্ম 'নক্ষত্রময় রাত্রি'

জগদ্বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গগ (Vincent Van Gogh) নেদারল্যান্ডসের জুন্ডার্টে ৩০শে মার্চ ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং ফ্রান্সের ওভের সুর ওয়াজে ২৯শে জুলাই ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন । গম্ভীর, শান্ত ও চিন্তাশীল শিল্পী ভ্যান গগ ২৭ বছর বয়সে শৈল্পিক জীবনের পথচলা শুরু করেন । যাকে সাধারণত উত্তর-প্রভাববাদীদের (Post-Impressionist) মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ হিসেবে গণ্য করা হয় । তিনি প্রায় ৮৬০টি তৈলচিত্র এবং ১২৪০টি অঙ্কন নিয়ে এক বিস্ময়কর শিল্পকর্মের বিশাল সম্ভার তৈরি করেছেন । স্বতন্ত্র শৈলী, আকর্ষণীয় রঙ, জোরালো তুলির আঁচড় এবং বক্রাকার রূপের নৈপুণ্যময় সৌন্দর্যই তার শিল্প সত্তাকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করেছে । জীবনের কোনো এক সময় তিনি মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হন, যেখানে চিত্রশিল্পী পল গগুইন (Paul Gauguin) এর সাথে তর্কের সময় ক্ষুর দিয়ে নিজের বাম কানের একটি অংশ কেটে ফেলেছিলেন । ভ্যান গগ তার জীবদ্দশায় খুব কম শিল্পকর্মই বিক্রি করেছিলেন । আধুনিক শিল্পের অভিব্যক্তিবাদী আন্দোলনের উপর তার শিল্পকর্মের এক শক্তিশালী প্রভাব ছিল, যা তার মৃত্যুর পর আশ্চর্যজনকভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে । যদিও শিল্পীর মানসিক স্বাস্থ্য ও দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম সম্ভবত একারণেই সাধারণ মানুষের কল্পনায় তিনি এক আদর্শ যন্ত্রণাক্লিষ্ট শিল্পী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন । 
জগদ্বিখ্যাত এই প্রভাবশালী ডাচ চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গগের একটি আইকনিক চিত্রকর্ম হচ্ছে "নক্ষত্রময় রাত্রি" (The Starry Night) । তিনি ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে ফ্রান্সের Saint-Rémy-de-Provence এ অবস্থিত Saint-Paul de Mausole পাগলাগারদ বা মানসিক হাসপাতালে থাকাকালীন সময়ে সূর্যোদয়ের ঠিক আগে পূর্বমুখী জানালা থেকে তারাভরা রাতের আকাশের একটি দৃশ্য চিত্রিত করেন, যা 'নক্ষত্রময় রাত্রি' নামে পরিচিত । এটিই সেই জগদ্বিখ্যাত বিস্ময়কর চিত্রকর্ম । যেখানে তিনি সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র অ্যালডেবারান, হায়াডিস নক্ষত্রপুঞ্জ এবং বৃষ রাশির অন্যান্য নক্ষত্রের মত মহাজাগতিক বস্তুগুলোকে বিশেষভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন । দুর্দান্ত চিত্রকর্মটিতে নীল ও সাদা রঙের ঘূর্ণিতে পূর্ণ ভোরের আগে রাতের এক উচ্ছল আকাশ, একটি উজ্জ্বল হলুদ অর্ধচন্দ্র এবং আলো বিকিরণকারী নক্ষত্ররাজি রয়েছে । বাম দিকের সম্মুখে সাইপ্রেস গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যেগুলোকে প্রায়শই অগ্নিশিখার মত বলে বর্ণনা করা হয় । গাছের কালো ডালপালাগুলো আংশিকভাবে আড়াল করে রাখা আকাশের গতির সাথে তাল মিলিয়ে কোঁকড়ে ও দুলে চলেছে । এমন প্রাণবন্ততার মাঝে নিচের ডানদিকে দূরে একটি সুবিন্যস্ত পাহাড়ী গ্রাম দেখা যায় । সরল ও নিয়ন্ত্রিত রেখা দিয়ে ছোট ছোট কুটিরগুলো এবং একটি গির্জার সরু চূড়া তৈরি হয়েছে, যা ঢেউ খেলানো নীল পাহাড়ের পটভূমিতে বাতিঘরের মত মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে । নৈঃশব্দময় ঘরের উজ্জ্বল হলুদ আলো যেন চিত্রকর্মটির অস্থিরতার মাঝে এক শান্ত আবেশ তৈরি করে । যদিও এই চিত্রকর্মটিই ছিল ভ্যান গগের শেষ জীবনের অন্যতম কাজ, কারণ এর পরের বছরই তিনি আত্মহত্যা করেন । 
ভ্যান গগ আকর্ষণীয় চিত্রকর্মটিতে রাতের আকাশের এক আবেগময় ও কাল্পনিক দৃশ্যের মাধ্যমে গভীর নীল আকাশ, আবর্তিত নক্ষত্র, উজ্জ্বল চাঁদ এবং নিচের ছোট্ট গ্রাম মনোমুগ্ধকরভাবে চিত্রিত করেছেন । এই 'নক্ষত্রময় রাত্রি'র দুর্লভ চিত্রটি পশ্চিমা শিল্প এবং ধ্রুপদী সাহিত্যের এক অনন্য শিল্পকর্ম । নান্দনিক সৃষ্টিশীলতার প্রতীক । অনাবিল সৌন্দর্যের প্রাচুর্য । বিখ্যাত চিত্রকর্মটি ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক সিটির মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্টের স্থায়ী সংগ্রহে সংরক্ষিত আছে । লিলি পি. ব্লিস উইলের মাধ্যমে এটি অর্জিত । এই অনুপম চিত্রকর্মকে "আধুনিক শিল্পের স্পর্শকাতর" এবং পশ্চিমা নৈতিক আদর্শের (Western Canon) সবচেয়ে স্বীকৃত চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয় । ঘূর্ণায়মান শৈলীতে আঁকা বৈচিত্র্যময় দৃশ্যের অভিজাত শিল্পকর্মটি এই চিত্রকরের মানসিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি, যেখানে হয়তো বাস্তবতা ও কল্পনার এক অসাধারণ মিশ্রণ ঘটেছে । তাই, অপার সুন্দর এই চিত্রকর্মটি বিশ্বজুড়ে শিল্পপ্রেমীদের অনুপ্রেরণার উৎস । 

কিন্তু, সম্প্রতি একদল জ্যোতির্বিজ্ঞানী বিশ্ববিখ্যাত চিত্রকর ভিনসেন্ট ভ্যান গগের "নক্ষত্রময় রাত্রি" (The Starry Night) চিত্রকর্মটি ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দের বাস্তব আকাশের দৃশ্যের সঙ্গে মিলে যেতে পারে বলে দাবি করেছেন । তারা এই চিত্রকর্মটির উৎস এক মহাজাগতিক দৃশ্যে খুঁজে পেয়েছেন, যা বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত এই চিত্রকর্মটির একটি নতুন তারিখ নির্দেশ করে । মানে, এই চিত্রকর্মটির অঙ্কনের তারিখ সম্পর্কে মানুষ এ যাবৎ যা জেনে এসেছে, তা থেকে এটি এক মাস পরে অঙ্কিত হয়েছে বলে তারা দাবী করেছেন । দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলের একটি টেলিস্কোপ প্রস্তুতকারক সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সিউলের কিয়ং হী বিশ্ববিদ্যালয়ের (Kyung Hee University) পিএইচডি গবেষক এলাইজা জিয়ং-হিউন কিম (Elijah Jeong-hyun Kim) এর নেতৃত্বে এক দল গবেষক The Journal Scientific Reports নামক বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণার মাধ্যমে সেই তারিখ বা সময়কে চ্যালেঞ্জ করেছে । তাদের গবেষণালব্ধ ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে, ‘নক্ষত্রময় রাত্রি’ চিত্রকর্মটি ভ্যান গগের কল্পনাপ্রসূত কোনো শিল্পকর্ম নয়, বরং ১৩৭ বছর আগে ফ্রান্সের মানসিক হাসপাতালে এক বছর অবস্থানকালীন সময়ে তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে যা দেখেছিলেন, তা থেকেই হয়তো অনুপ্রাণিত হয়ে ক্যানভাসের উপর তেলরঙে ছবিটি এঁকেছিলেন । তবে, ভ্যান গগ বাস্তব দৃশ্যকে নিজের কল্পনা ও শিল্পীসত্তার সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করেছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয় । যদিও ছবিটি ঠিক কবে আঁকা হয়েছিল, তা নিয়ে বিতর্ক রয়ে গিয়েছে । প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ভ্যান গগ ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে ছবিটি এঁকেছিলেন । এদিকে, নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে অবস্থিত ভ্যান গগ মিউজিয়ামও (Van Gogh Museum) নতুন গবেষণার ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয় । দক্ষিণ কোরিয়ার মহাকাশ বিজ্ঞান সংস্থা এসএলএলএবি এবং সিউলের কিয়ং হি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা চিত্রশিল্পী ভ্যান গগের উপর বছরের পর বছর ধরে ফরেনসিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গবেষণার পর, তারা এই শিল্পীর শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মটিকে  ফ্রান্সের সাঁ-রেমি দে প্রোভঁসের (France’s Saint-Remy de Provence) ভোররাতের আকাশের সাথে মিলিয়ে দেখেছে, যেখানে গবেষকরা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ করে ছবির নক্ষত্রের বিন্যাস, শুক্র গ্রহ এবং চাঁদের অবস্থানের সঙ্গে ১৮৮৯ সালের ২২শে জুলাই ভোরের আকাশের মিল খুঁজে পেয়েছেন । যেখানে চাঁদ উপরের ডান কোণায় ও শুক্র গ্রহটি নিচের বাম কোণায় রয়েছে এবং তাদের উভয়ের মাঝখানে অবস্থিত হায়াডিস নক্ষত্রপুঞ্জ (The Hyades star cluster), যা বৃষ রাশিতে শত শত নক্ষত্র নিয়ে গঠিত । এই নক্ষত্রপুঞ্জের পাঁচটি উজ্জ্বল তারাকে দূরবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়াই খালি চোখে দেখা যায় বলে জানা যায় এবং হায়াডিস নক্ষত্রপুঞ্জটি একটি উজ্জ্বল ভি (V) আকৃতি গঠন করে । 

তথ্যসূত্র ও চিত্র: www.ebay.ca / Infinity Cosmic /
https://www.britannica.com/topic/The-Starry-Night 

Wednesday, 14 October 2026

হেমন্তের নিঃসঙ্গতা

হেমন্তের নিঃসঙ্গতা

মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম 


হেমন্তের মিষ্টি রোদ, 

হিমঝুরির সুবাসে দিশেহারা ভ্রমর, 

পাকা ডালিমের চৌচির মুখ, 

নীলিমায় মিলিয়ে যায় শুভ্র মেঘমালা, 

তবুও মরা কার্তিকের রুদ্রমূর্তি । 

বিস্তীর্ণ প্রান্তর জুড়ে হাহাকার, 

খাদ্যসংকট ও মহাজনের চড়া সুদে ঋণ, 

ঝরে পড়া ধূসর পাতার মর্মর ধ্বনি, 

নিস্তেজ কাশফুলের মর্মব্যথা, 

কান পেতে শোনা যায় । 

অগ্রহায়ণের পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধ, 

গোধূলি বেলার রক্তিম আভা, 

উত্তর-পশ্চিমা শান্ত বাতাস, 

শীতকে স্বাগত জানায় । 

খেজুর রসের প্রাচুর্য, 

ঘরে ঘরে নবান্ন উৎসবের আমেজ, 

পিঠা-পুলি ও পায়েসের বৈচিত্র্য আয়োজন, 

অষ্টাদশীর প্রাণ স্পর্শ করে কুয়াশা, 

আর জনাকীর্ণ মেলা ঘিরে মানুষের উচ্ছ্বাস । 

কখনো উদাসী মন, 

প্রকৃতির এক অদ্ভুত শূন্যতা, বিষণ্ণতা ও নীরবতা, 

যেখানে হেমন্তের নিঃসঙ্গতা! 

আহ প্রেমের ক্ষুদ্র বিষাদময় উচ্ছ্বাস (কবি: অ্যান কারসন)


O Small Sad Ecstasy of Love 

by Anne Carson 


I like being with you all night with closed eyes.
What luck—here you are
coming
along the stars!
I did a road trip
all over my mind and heart
and
there you were
kneeling by the roadside
with your little toolkit
fixing something.

Give me a world, you have taken the world I was. 


আহ প্রেমের ক্ষুদ্র বিষাদময় উচ্ছ্বাস 

কবি: অ্যান কারসন

অনুবাদ: মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম 


আমি চোখ বন্ধ করে সারারাত তোমার সাথে থাকতে পছন্দ করি । 

কি ভাগ্য— তুমি তো নক্ষত্রদের পথ ধরে এখানে চলে এলে! 

আমি আমার মন আর হৃদয় জুড়ে এক পথ পাড়ি দিলাম

আর সেখানেই তুমি

রাস্তার ধারে হাঁটু গেড়ে বসেছিলে

তোমার ছোট্ট যন্ত্রপাতির বাক্সটি নিয়ে 

কিছু একটা ঠিক করছিলে ।

আমাকে একটি জগৎ দাও, 

যে জগতে আমি ছিলাম যা তুমি কেড়ে নিয়েছো । 


উৎস: https://poets.org/poem/o-small-sad-ecstasy-love 

ছবি: www.lemonde.fr 

ভ্যান গগের বিখ্যাত চিত্রকর্ম 'নক্ষত্রময় রাত্রি'

ভ্যান গগের বিখ্যাত চিত্রকর্ম 'নক্ষত্রময় রাত্রি' জগদ্বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গগ (Vincent Van Gogh) নেদারল্যান্ডসের জুন্ডার...