Sunday, 9 June 2024

বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৪ এবং ভূমি পুনরুদ্ধার, মরুকরণ রোধ ও খরা সহনশীলতা

৫ই জুন ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ (World Environment Day বা WED) । বিশেষ দিবসটি ‘ইকো দিবস’ নামেও পরিচিত । সারাবিশ্বে কিংবা কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের সম্মুখীন পরিবেশগত নানা জটিল সমস্যা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে এ দিবস পালন করা হয় । প্রতি বছরই পরিবেশ দিবসের একটি প্রতিপাদ্য বিষয় থাকে । উক্ত দিবসে নানা কর্মসূচী, রাজনৈতিক কর্মোদ্যোগ ও জনসচেতনতার মাধ্যমে এ গ্রহের মানুষকে পরিবেশ সচেতন করে তোলে । বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সময় পানি, বৈশ্বিক উষ্ণায়ণ, ওজোন স্তর, এসিড বৃষ্টি, দারিদ্র, জলবায়ু পরিবর্তন, মরুকরণ, বন্যপ্রাণ ও আবাসস্থল, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, জলজ প্রাণী ও সামুদ্রিক পরিবেশ, সবুজ অর্থনীতি, প্লাস্টিক দূষণ, বায়ুদূষণ এবং বাস্তুতন্ত্রসহ পরিবেশগত নানা প্রকার জটিল বিষয়ের উপর প্রতিপাদ্য করে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হয় । বিশ্ব পরিবেশ দিবসে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই বিভিন্ন পরিবেশ সচেতনতামূলক কর্মসূচী গ্রহণ করে থাকে । জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মতিতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ৫ই জুন থেকে ১৬ই জুন পর্যন্ত ‘জাতিসংঘ মানব পরিবেশ সম্মেলন’ (United Nations Conference on the Human Environment) অনুষ্ঠিত হয় । এখানেই প্রথম পরিবেশ দিবস পালিত হয় । সুইডেনের বিশেষ উদ্যোগে জাতিসঙ্ঘ ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে ৫ই জুনকে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে এবং তখন থেকেই প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন শহরে আলাদা প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে । যেমন: ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজক রাষ্ট্র এবং যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘একমাত্র পৃথিবী’ (Only one Earth) । ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ছিল বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজক শহর এবং যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘মানব বসতি’ (Human Settlements) । গত ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে আয়োজক দেশ ছিল আইভরি কোস্ট, ‘প্লাস্টিক দূষণ সমাধানে শামিল হই সকলে’ এ প্রতিপাদ্য নিয়ে সারাবিশ্বে প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করার লক্ষ্যে দিবসটি পালন করা হয় । ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজক দেশ সৌদি আরব । এ বছর জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির  United Nations Environment Programme (UNEP) নির্ধারিত প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ‘করবো ভূমি পুনরুদ্ধার, রুখবো মরুময়তা, অর্জন করতে হবে মোদের খরা সহনশীলতা’ (Land restoration, desertification and drought resilence) । বৈশ্বিকভাবে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে বসন্তকালে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে শরতকালে দিবসটি পালিত হয় । যথাযথভাবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রেখে পৃথিবীর মানুষ যাতে অন্যান্য সকল জীবের সাথে একাত্ম হয়ে (স্বতন্ত্রভাবে) এক সুন্দর পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করাই হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল উদ্দেশ্য । বর্তমানে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হচ্ছে বনভূমি উজাড় হয়ে যাওয়া । এ বনভূমি শুধুমাত্র অসংখ্য প্রজাতির আবাসস্থলই নয় এটি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । বনভূমি উজাড় হয়ে যাওয়ার ফলে ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, মরুময়, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি করে । এছাড়া ব্যাপক শিল্পায়নের ফলে তীব্রভাবে গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ হয় । গত ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ বিলিয়ন টন যা ২০২২ খ্রিস্টাব্দের তুলনায় শতকরা ১.১ ভাগ বেশি । কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক উষ্ণায়ণের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে । ফলে অতিবৃষ্টি, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবন ও প্রকৃতিতে । তাই, ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় ব্যাপক বনায়নের কোনো বিকল্প নেই । বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ৩.৯২ বিলিয়ন হেক্টর বনভূমি রয়েছে যার মধ্যে অর্ধেকেরই বেশি রাশিয়ায় শতকরা ২০.১ ভাগ, ব্রাজিলে শতকরা ১২.২ ভাগ, কানাডায় শতকরা ৮.৬ ভাগ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শতকরা ৭.৬ ভাগ এবং চীনে শতকরা ৫.৪ ভাগ । অবশিষ্ট বনভূমি পৃথিবীর অন্যান্য অংশে । এখন বাংলাদেশে মোট বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১৪৩২৮০০ হেক্টর । পরিবেশ সুরক্ষায় একটি দেশের আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন এবং সেই তুলনায় বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ প্রায় অর্ধেক । বনভূমি স্বল্পতা ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে । প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা এবং এর থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে দেশের মানুষকে পরিবেশ সচেতন, পরিবেশকে ভালোবাসা, প্রকৃতির সাথে সংযুক্ত হওয়া, নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করা এবং প্রচুর পরিমাণে বৃক্ষ রোপণ করতে হবে । প্রাণের স্পন্দনে, প্রকৃতির বন্ধনে ৷ সবুজ গাছ, সবুজ প্রাণ ৷ একটি গাছ, একটি প্রাণ ৷ একটি গাছ, শত প্রাণ ৷ আমি প্রকৃতির, প্রকৃতি আমার ৷ দূষণ মুক্ত পরিবেশ গড়ি, প্রকৃতিকে রক্ষা করি ৷ বৃক্ষরোপণে এগিয়ে আসি, পৃথিবীকে নিরাপদ রাখি ৷ নিজে বাঁচি, আগামী প্রজন্মের জন্য সবুজ পৃথিবী গড়ে তুলি । তাই, আমাদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, সুুরক্ষিত, টেকসই ও শান্তিময় বিশ্ব নির্মাণে পরিবেশ রক্ষার কোনো বিকল্প নেই । 
বর্তমান বিশ্বে অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির কল্যাণে মানব জাতির জীবনে অসীম সুফল বয়ে আনছে এবং মানুষ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতিসহ সমৃদ্ধ মানব সভ্যতা গড়ে উঠছে । পাশাপাশি মনুষ্য সৃষ্ট বিভিন্ন কর্মকাণ্ড দ্বারা যেমন: শিল্পায়ন, নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোয়া, কলকারখানায় জীবাশ্ম জ্বালানী (তেল ও কয়লা ইত্যাদি পোড়ানো) ব্যবহার, মাইকের আওয়াজ, উচ্চ শক্তির শব্দ ব্যবস্থা, মোটর-নৌ-কলকারখানার যন্ত্রপাতির শব্দ, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা, যেখানে সেখানে মলমূত্র ত্যাগ, হাসপাতালের বর্জ্য, প্লাস্টিক, কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য, যানবাহনের কালো ধোয়া, পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা ও বিস্ফোরণ এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মারাত্মক ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ইত্যাদির মাধ্যমে নানাভাবে মাটি, পানি, বায়ু ও শব্দ দূষণের ফলে ভয়াবহ পরিবেশ দূষিত হচ্ছে । ফলে মানুষের চর্মরোগ, চোখের সমস্যা, শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি, হৃদরোগ, হাইপারটেনশন, মস্তিষ্কের রোগ, যকৃত ও বৃক্কের দীর্ঘ মেয়াদী সমস্যা, শিশুর বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ব্যহত, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, গর্ভপাত, অপরিপক্ব শিশু জন্মদান, মৃত শিশু জন্মের সম্ভাবনা, বধির হওয়া এবং দুরারোগ্য ব্যধিসহ নানাবিধ রোগের কারণ ঘটিয়ে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ডেকে আনছে । বাংলাদেশে প্রতিবছর যে সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয় তার শতকরা প্রায় ২৮ ভাগ ঘটে থাকে পরিবেশ দূষণের কারণে । অতএব, পরিবেশ দূষণের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে এর ক্ষতিকর প্রভাবকে কার্যকর সমাধানের জন্য সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে । বনায়ন, নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন বন্ধ, ইটভাটায় কাঠ না পোড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তির পরিবেশ বান্ধব ইটভাটা স্থাপন, ইটভাটার চিমনী উচ্চতায় নির্মাণ, শিল্পকারখানার বর্জ্য খাল-বিল-নদীতে না ফেলে Effluent Treatment Plant (ETP) এর মাধ্যমে বিশোধন, প্লাস্টিক ব্যাগের বিকল্প হিসেবে পরিবেশ বান্ধব পাটজাত পণ্য ব্যবহার, যানবাহনে সীসা মুক্ত জ্বালানী ব্যবহার, সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস (CNG বা Compressed Natural Gas) ব্যবহার, শিল্পকারখানা-গৃহস্থালি-হাসপাতাল-ইলেকট্রনিক্স বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে না ফেলে তা পুনর্ব্যবহারযোগ্য (Recycling) করে তোলা, কীটনাশক পদার্থের ব্যবহার কমিয়ে কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহার বৃদ্ধি, কাঠের আসবাবপত্রের বিকল্প ব্যবহার বৃদ্ধি, পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি ও পণ্য ব্যবহার, পরিবেশ ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণে কঠোর আইন প্রয়োগ, সঠিক পরিকল্পনায় ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সবুজ নগরায়ন, উন্নয়ন প্রকল্প ও শিল্প কারখানায় সুন্দর-সুশৃঙ্খল পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, ব্যাংকের ক্ষেত্রে সবুজ অর্থনীতি, দূষণ কর আরোপ (Green tax), গবেষণার মাধ্যমে খরা সহনশীল বিভিন্ন জাতের ক‌ৃষি বীজ উদ্ভাবন, কৃষি বনায়ন, ভূগর্ভস্থ ও বৃষ্টির পানির সঠিক ব্যবহার, সৌরশক্তি ব্যবহার এবং মরুকরণ রোধ করে দূষণমুক্ত একটি সুন্দর পরিবেশ নির্মাণ করা যেতে পারে । জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা । জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বে উষ্ণায়ণের কারণে মানুষ, মানব সমাজ, পরিবেশ, প্রকৃতি এবং জীববৈচিত্র্যের উপর ভয়ঙ্কর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে । তাপমাত্রা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, মাটির উর্বরতা হ্রাস, বন্যা, খরা, দাবানল, সুনামি, বজ্রপাত, ঘূর্ণিঝড়, ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়, গ্রীস্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্পের কার্যকলাপ বৃদ্ধি, তুষারঝড়, তাপপ্রবাহ (Heat wave), তীব্র গরমের কারণে তাপজনিত অসুস্থতা (Heat stress), সামুদ্রিক বরফ গলন (Ice-albedo feedback), বহুবর্ষজমা বরফের (Permafrost) গলন, মহাসাগরে স্তরীভবন বৃদ্ধি ও অক্সিজেন মাত্রা হ্রাস, সামুদ্রিক স্রোতের দুর্বলতা, স্থল ও সামুদ্রিক বা মহাসাগরীয় বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, মানব বসতি ক্ষতিগ্রস্ত ও অভিযোজন সমস্যা, সংঘাত বা হিংসাত্মক অপরাধ বৃদ্ধি, অ্যান্টার্কটিকার বিশাল হিমশৈল গলে গিয়ে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে পৃথিবীর নিম্নাঞ্চলের দেশ ও ক্ষুদ্র দ্বীপসমূহ তলিয়ে যাওয়া বা নিশ্চিহ্ন হয়ে কোটি কোটি মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা, বরফাবৃত উত্তরমেরুর আকাশে ওজোন স্তরে প্রায় ১০ লাখ বর্গ কিলোমিটারের বিশাল গর্ত তৈরি, মেরু ঘূর্ণি (Polar vortex) দুর্বল হয়ে ফিনকি স্রোত (Jet stream) ক্রমশ তীব্রতর রূপ ধারণ করে তুষারপাত-শৈত্য প্রবাহ-তীব্র গরম সৃষ্টি, মরুকরণ এবং ভূমি অবক্ষয়ের মাধ্যমে পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীকুল, মানব স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ বাতাস, নিরাপদ বাসস্থান, বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা, পানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে । বিশেষকরে প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের উপর একটি বৃহৎ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য সামগ্রী নির্ভরশীল হওয়ায় তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন ও ভুক্তভোগী । এতে করে আশঙ্কাজনকভাবে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে । তাছাড়া মানুষের জীবনে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে ব্যাপক প্রভাব পড়ে । ফলে টেকসই উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয় না । ধারণা করা হয়, প্রায় দুই হাজার কোটি টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে জমা হয়েছে । যার পরিণতি বর্তমানে বিশ্বব্যাপী গড়ে শতকরা ১৬ ভাগ মানুষের মৃত্যু হার বৃদ্ধি করছে । ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ রোধ চুক্তি সম্পাদনের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিগত ২০০৫ খ্রিস্টাব্দের তুলনায় ২০২৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে শতকরা ২০-২৮ ভাগ গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনার কথা অঙ্গীকার করে । যদিও উল্লেখিত চুক্তিতে চীন কোনো প্রকার লক্ষ্য নির্ধারণ না করেই আগামী ২০৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনার কথা বলেছে । গত ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে সারাবিশ্বে ৫২ গিগাটন গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণের মধ্যে ২৭ শতাংশই নিঃসরণ করে চীন, ১১ শতাংশ নিঃসরণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বাকি অংশ নিঃসরণ করে শিল্পোন্নত দেশগুলো যাদের তালিকার প্রথম দিকেই অবস্থান । এদিকে মূলত জি-২০ ভুক্ত দেশগুলোই সারাবিশ্বে শতকরা ৮০ ভাগ কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী । পরিবেশ সুরক্ষা, জীব-বৈচিত্র্য রক্ষা ও বাস্তুতন্ত্রের উন্নয়ন ঘটিয়ে মরুকরণ এবং ভূমির অবক্ষয় রোধ করে কিভাবে টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় সৌদি আরব সরকার সেদিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে । জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সৌদি আরব সরকার ২০৩৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ৪.১ মিলিয়ন টন কার্বন হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে । তাই, ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার যে প্রতিশ্রুতি বিশ্ব নেতৃবৃন্দ দিয়েছিলেন তা কার্যকর করতে আরো উদ্যোগী হয়ে সকলের এগিয়ে আসতে হবে । জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বিশ্বব্যাপী পড়লেও উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ক্ষতির পরিমাণ বেশি । কারণ ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থান, জীবিকা নির্বাহের বিভিন্ন খাত ধ্বংসপ্রাপ্ত, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, প্রাকৃতিক সম্পদের স্বল্পতা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার অক্ষমতা এবং অভিযোজন ব্যবস্থার সমস্যা ইত্যাদি কারণে দেশগুলো তীব্রভাবে ক্ষতিসাধিত হয়ে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি করছে । অন্যদিকে শিল্পোন্নত দেশগুলোকে এমন ভয়ঙ্কর এবং জটিল সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় না । কিছু প্রভাশালী শিল্পোন্নত দেশের অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের ফলে গ্যাস নিঃসরণের মাত্রা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে । যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে আশাব্যঞ্জক বৈচিত্র্যময় উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে । তবে, তা অতি নগন্য । অতএব জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভূমি অবক্ষয়, মরুকরণ এবং খরার প্রভাব মোকাবেলার মতো বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে এ সংক্রান্ত বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে । নেট-শূন্য কার্বন নির্গমন (Net-zero carbon emission) অর্জনের লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে । পাশাপাশি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু অর্থায়ন ও পরিবেশ রক্ষায় এর ভূমিকা ও গুরুত্ব, আদিখেত্যা নকশা (Simulation model) ব্যবহার করে কৃষকদের খরা মোকাবেলায় সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন ও প্রশমন, স্মার্ট কৃষি, মুঠোফোনের মাধ্যমে খরার প্রাক-সতর্কবার্তা প্রদান এবং বাংলাদেশে একটি ‘পরিবেশ গবেষণা ইনস্টিটিউট’ গঠন করা যেতে পারে । 
এদিকে অপরিকল্পিতভাবে ও ব্যাপকহারে ভূমি ব্যবহার, বনভূমি ধ্বংস, পহাড়-নদীর মাটি কর্তন ও স্থানান্তর, লবণাক্ততা এবং ফসলী জমিতে অধিক পরিমাণে রাসায়নিক সার ব্যবহার করার কারণে ভূমি অবক্ষয় ও মরুকরণ প্রক্রিয়া বৃদ্ধি পাচ্ছে । খরা, মরুকরণ ও ভূমি অবক্ষয়ের কারণে সারাবিশ্বে প্রাণীকুল, মানব স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ বাতাস, নিরাপদ বাসস্থান, বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা, পানি নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে । বিশ্বব্যাপী প্রতিনিয়ত তাপমাত্রা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়ছে ভূমির উপর । ভূমি অবক্ষয়ের কারণে মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস, কৃষি জমি চাষাবাদের অনুপযোগী এবং সুপেয় পানির অভাব হচ্ছে । খরা, মরুকরণ এবং ভূমিক্ষয় আগামীতে পৃথিবীর জন্য এক অশনি সংকেত! United Nations Convention to Combat Desertification (UNCCD) এর তথ্যানুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় ৪০ শতাংশ ভূমি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে এবং সারাবিশ্বে জিডিপির অর্ধেক (৪৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার) হুমকির সম্মুখীন । তাই তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, অনাবৃষ্টি, লবণাক্ততা, নগরায়ন, মরুময়তা, বনাঞ্চলের পরিমাণ হ্রাস, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, জমিতে রাসায়নিক সার প্রয়োগ, কৃষিকাজে সেচ, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলাশয়-নদী-খাল-জলাধার-জলাভূমি ইত্যাদি ভরাট, নদী শুকিয়ে মৃত অবস্থা, বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ এবং জলবায়ুর প্রভাববিস্তারকারী মৌসুমী বায়ুপ্রবাহজনিত বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে বাংলাদেশে মরুময়তার ঝুঁকি বাড়ছে । এ মরুকরণের ফলে কৃষি জমি হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে । বর্তমানে খরা এবং মরুকরণ পৃথিবীর জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ । বিশ্বের মোট ভূমির শতকরা প্রায় ২৫ ভাগ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে । খরা ও মরুকরণ সারাবিশ্বে পরিবেশগত নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য, দারিদ্র্য বিমোচন, আর্থ-সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভয়াবহ সমস্যা সৃষ্টি করছে । ফলে আগামী দশকে পৃথিবীতে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে । ধারণা করা হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে ২০৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রায় ৩.৩ মিলিয়ন মানুষ এবং ২০৮০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রায় ৪.৩ মিলিয়ন মানুষের নিজস্ব জমি হারিয়ে যেতে পারে । অতএব, আমাদের দেশে যাতে মরুকরণ সৃষ্টি না হয় সেদিকে অতি জরুরী ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে । এর সাথে পরিবেশ দূষণ রোধ, বনায়ন, মানুষের সচেতেনতা বৃদ্ধি এবং খরা সহনশীল বীজ উদ্ভাবন করতে হবে । 
বর্তমান গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বনভূমির পরিমাণ উন্নীত করতে ব্যাপকভাবে বৃক্ষ রোপণ ও নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যেমন: জলবায়ু পরিবর্তনের সংপ্রশ্ন (Challenge) মোকাবেলা, সবুজায়ন, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানী এবং প্রকৃতিনির্ভর সমাধান ইত্যাদি । জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা ও ফলপ্রসূ সমাধানের প্রধান কৌশল হিসেবে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১ এবং ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ গ্রহণ করেছে । পাশাপাশি বাংলাদেশের মহান জাতীয় সংসদে Planetary Emergency Bill (গ্রহগত জরুরী অবস্থা) বিল পাস হয়েছে । এছাড়া পৃথিবীর প্রথম স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ Climate Change Trust Fund গঠন করে যেখানে গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব সম্পদ থেকে ৪৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে । মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী জলাবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর স্বার্থরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ও এর রোধকল্পে নানা উদ্যোগ গ্রহণের স্বীকৃতস্বরূপ তাকে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ পরিবেশগত পুরস্কার ‘Champions of the Earth’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয় । জলবায়ু নেতাদের শীর্ষ সম্মেলন Climate Leaders Summit নামে ভার্চুয়াল সম্মেলনে তিনি অংশ নেন এবং জলবায়ু বিপন্ন ৪৮টি দেশের জোট Vulnerable Twenty (V20) ও Climate Vulnerable Forum (CVF) এর সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন । 
Global Center on Adaptation (GCA) এর দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয় ঢাকায় অবস্থিত । জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবেলা, অভিযোজন সমস্যার সমাধান বা বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবের সাথে খাপ খাওয়ানোর উপায় বের করা এবং এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সরকার, বিভিন্ন শহরের মেয়র, ব্যবসায়ী নেতা, সুশীল সমাজ ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করে থাকে GCA কার্যালয়টি । তাই আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশ, সংস্থা এবং সংগঠনের সাথে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে পরিবেশ দূষণ, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব এবং পরিবেশগত সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে কূটনৈতিকভাবে আরো জোরালো সম্পর্ক স্থাপনের পাশাপাশি দূষণ রোধ, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা ও সমাধানের ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে । জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে ‘জলবায়ু সংকট’ হিসেবে দেখা দিয়েছে । জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম । আমি মনে করি, বৈশ্বিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবেলা ও সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ক্ষতিপূরণ আদায় ও গ্রীন হাউস গ্যাস নিঃসরণ চুক্তির নানা বিষয়গুলোর অগ্রগতি নিয়ে বাংলাদেশ সরকার প্রধান নেতৃত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশের সাথে শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে পারেন । কার্বন নিঃসরণের জন্য জলবায়ু তহবিলে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থাকে Carbon pricing বলে । এছাড়া, বিপন্ন দেশগুলোর পক্ষে তিনি শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে জলবায়ু তহবিলের প্রাপ্য কিস্তি প্রদানে জোর প্রচেষ্টা চালাতে পারেন । বিগত দিনে আয়োজক হিসেবে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য বিষয়ের উপর ১০ বার বিশ্ব পরিবেশ দিবস উৎযাপিত হয়েছিল । তাই আগামীতে এ ধরনের অনুষ্ঠানের পুনরায় আয়োজক হওয়ার জন্য সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে বলিষ্ঠভাবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে । পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে পরিবেশ দূষণরোধী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে, Green Technology এর বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে হবে এবং Track diplomacy সহ পরিবেশগত বিষয়গুলোর উপর অধিক জোর দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে । সর্বোপরি, পরিবেশের বাস্তুতন্ত্র ও জীব বৈচিত্র্যকে রক্ষা করতে হবে । তাহলে প্রকৃতি হবে সুুরক্ষিত । টিকে থাকবে এ মৃৃত্যুন্মুখ গ্রহ । নইলে অনিবার্য ধ্বংস । সুতরাং, সবুজ গ্রহ গঠনের মধ্য দিয়েই আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তৈরি হবে একটি সুন্দর ও শান্তিময় আবাসস্থল । 

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, আন্তর্জাল (The Internet) । 

Sunday, 12 May 2024

হিমালয়ান মোনাল (Himalayan Monal)


মোনাল হচ্ছে বেশ কয়েকটি এশীয় তিতির পাখি প্রজাতির মধ্যে একটি । হিমালয় মোনালের এক আকর্ষণীয় রঙের বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা একে অন্যান্য শোভাময় তিতির পাখি থেকে আলাদা করে । অবিশ্বাস্য সুন্দর ও বৈচিত্র্যময় রঙের পুরুষ পাখিটি একটি মুরগির মতো । প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মোনালকে রংধনু রঙের উজ্জ্বল পালকের (Iridescent plumage) কারণে চমৎকার লাগে । হিমালয়ান পুরুষ মোনালের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে মাথায় লম্বা ধাতব সবুজ ঝুঁটি, পিঠে ও ঘাড়ের পালকে উজ্জ্বল নীল-সবুজ রঙের আধিপত্য, গলায় উজ্জ্বল কমলা রঙের নিচে কিঞ্চিৎ হলুদের বাহারি মিশ্রণ এবং কিছু বিশিষ্ট সাদা পালক পিঠ বরাবর নীলের সাথে মিশে থাকে যা পাখিটি উড়ে যাওয়ার সময় সবচেয়ে বেশি দেখা যায় । পুরুষ পাখির সুদর্শন লেজের পালক লালচে বাদামী রঙের এবং অগ্রভাগের দিকে গাঢ় রঙ । পুরুষ মোনাল আকর্ষণীয় উজ্জ্বল রঙের হয়ে থাকে । যেখানে নারী মোনাল অস্পষ্টভাবে রঙিন । নারী মোনালের বর্ণ হচ্ছে বাদামী এবং ঈষৎ পীতাভ মিশ্রণ । চোখের চারপাশে ফ্যাকাশে-নীল বৃত্তাকার রঙ ও চিবুকের নিচে বিশিষ্ট সফেদ দাগ থাকে । লেজের উপর সামান্য পরিমাণে সাদা ফালা এবং কালো ও হাল্কা লাল রঙে পালক বাধা থাকার কারণে উড়ে যাওয়ার সময় নারী মোনালকে আলাদা করে চেনা যায় । নারী মোনালের নিঃশব্দ সুর বেশি থাকে । একটি বড় আকারের মোনাল প্রায় ৭০ সেঃমিঃ (২৮ ইঞ্চি) লম্বা হয় । পুরুষ পাখির ওজন প্রায় ২৩৮০ গ্রাম (৮৪ oz) এবং নারী পাখির ওজন প্রায় ২১৫০ গ্রাম (৭৬ oz) পর্যন্ত । হিমালয় মোনাল ২১০০ - ৪৫০০ মিটার (৬৯০০ - ১৪৮০০ ফুট) উচ্চতায় তুষারময় হিমালয় বন এবং ঝোপঝাড়ের আদি বাসিন্দা । উন্মুক্ত বনভূমি, ঘাসযুক্ত ঢাল, দুরারোহ পর্বতগাত্র, আলপাইন তৃণভূমি এবং উচ্চ নাতিশীতোষ্ণ ওক-কনিফার বনে পাখিটি বাস করে যেখানে ২৭০০ - ৩৭০০ মিটার (৮৯০০ - ১২১০০ ফুট) উচ্চতার মধ্যে এটিকে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় । এলাকার অন্যান্য তিতির প্রজাতির পাখির তুলনায় এ পাখিটির অধিক মৌসুমী গতিবিধি লক্ষ্য করা যায় এবং শীতকালে প্রায় ২০০০ মিটার (৬৬০০ ফুট) পর্যন্ত অনেক নিচে নেমে আসে । সাধারণত এমন উচ্চতায় ঘাসের মধ্যে খাদ্যের সন্ধান করে । হিমালয় মোনাল মাংসাশী (পতঙ্গভুক প্রাণী) এবং তৃণভোজী (শস্য/বীজভোজী, ফলভোজী) । সর্বভুক মোনাল পাখি তার শক্ত বাঁকা চঞ্চু ও নখর ব্যবহার করে পোকামাকড়, শিকড়, বীজ এবং কন্দের মতো খাদ্য খুঁজে বের করার জন্য মাটি আঁচড়ে ফেলে । বিশেষ করে অমেরুদণ্ডী প্রাণীর শিকার খুঁজে পেতে উদ্ভিদের শিকড়ের মধ্যে খনন করে । মোনাল প্রাথমিকভাবে শস্য, বীজ, বেরি, পোকামাকড়, কোমল পাতা এবং বাদাম ইত্যাদি খাদ্যগ্রহণ করে । প্রায়শঃ খাদ্য হিসেবে অমেরুদণ্ডী প্রাণীকে শিকার করার জন্য তুষার খনন করে থাকে । হিমালয় মোনাল হচ্ছে সামাজিক পাখি, যেটিকে প্রায়ই জোড়া বা ছোট দলে দেখা যায় । শীতকালে এ পাখি সাধারণত বৃহৎ পক্ষীদলে জড়ো হয় এবং বিশ্রাম বা ঘুমানোর জায়গায় সাম্প্রদায়িকভাবে বসবাস করে । মোনাল পাখি দিনের বেলায় সক্রিয় থাকে এবং তন্ন তন্ন করে খাদ্যের খোঁজে এটি বেশিরভাগ সময় ব্যয় করে । প্রজনন মৌসুমে শক্তিশালী জোড়া বন্ধন গঠন করে যা এপ্রিল থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত হয় । এ সময় লড়াইপ্রিয় একটি পুরুষ মোনালের পায়ে এক বা একাধিক Spurs এবং মুখে মাংসল অলঙ্কার থাকতে পারে । প্রণয়প্রার্থনাকারী পুরুষ মোনাল কখনো কখনো নারী মোনালের উপস্থিতিতে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে, যারা হট্টগোলের প্রতি একেবারেই উদাসীন বলে মনে হয় । উচ্চ-উচ্চতার হিমালয় মোনাল অত্যন্ত যোগাযোগকারী । সঙ্গীকে আকৃষ্ট করতে এটি চমৎকার শরীর প্রদর্শন, নৃত্য এবং কণ্ঠস্বর সবই ব্যবহার করে । সঙ্গীর জন্য সন্তুষ্টি, আগ্রাসন এবং সংকেত প্রকাশ বা সঙ্গীকে আকৃষ্ট করতে বিস্তৃত পরিসরে তাকে আহ্বান করে । সত্যিই, রোমাঞ্চকর । প্রজনন ঋতুতে পুরুষ মোনাল তার সঙ্গীকে আকৃষ্ট করার চেষ্টায় সারা দিন খুব সোচ্চার থাকে । সঙ্গমের সময় পুরুষ মোনাল বহুগামী হয় যেখানে সে বেশ কিছু নারীর সাথে সঙ্গম করে । অন্যদিকে নারী মোনাল পালাক্রমে শুধুমাত্র নির্বাচিত পুরুষের সাথে সঙ্গম করে এবং একগামী সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করে । হিমালয় মোনালের প্রজনন শুরু হয় যখন সে উচ্চ উচ্চতায় অভিপ্রয়াণ করে । নারী মোনাল পাখি মাটিতে একটি অগভীর বাসা খনন করে এবং প্রতি মৌসুমে ৩ - ৫টি ডিম পাড়ে । সে প্রায় ২৭ দিন ধরে ডিমে তা দেয় এবং ডিমগুলোতে তা দেয়ার সময় (Incubation period) পুরুষ মোনাল সুরক্ষার জন্য কাছাকাছি থেকে পাহারা দেয় ও প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত বাচ্চাকে বড় করতে সাহায্য করে । হিমালয় মোনাল হচ্ছে তিতির পাখির Phasianidae পরিবারের Lophophorus প্রজাতির একটি পাখি । Phasianinae পরিবারের ১৬টি বংশের প্রায় ৫০টি প্রজাতি রয়েছে । চাইনিজ মোনাল (L. lhuysii) এখন শুধুমাত্র পশ্চিম চীনে পাওয়া যায়, যদিও এটি একটি বিপন্ন প্রজাতি । হিমালয় মোনালকে Impeyan monal এবং Impeyan pheasant বলা হয় । মোনাল পাখির বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে: Lophophorus impejanus । এ বৈজ্ঞানিক নামটি বাংলার ব্রিটিশ প্রধান বিচারপতি Sir Elijah Impey এর স্ত্রী Lady Mary Impey কে স্মরণ করে । হিমালয় মোনাল তুষার সহ্য করতে পারে । এ পাখিটি পূর্ব আফগানিস্তান থেকে হিমালয় হয়ে পাকিস্তান, ভারত, ভুটান, নেপাল, মায়ানমার এবং চীন পর্যন্ত প্রাকৃতিক পরিসরে বসবাস করে । ভারতের জম্মু-কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম এবং অরুণাচল প্রদেশে মোনালকে দেখা যায় । এ পাখিটি ভারতের উত্তরাখণ্ডের রাষ্ট্রীয় পাখি এবং সেখানে এটি মোনাল নামে পরিচিত । পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশ, কাগান, পালাস উপত্যকা এবং আজাদ কাশ্মীরেও এটির দেখা মেলে । মোনাল নেপালের জাতীয় পাখি এবং স্থানীয়ভাবে এটি Danphe বা Danfe নামে পরিচিত । বন্দিদশায় এ পাখি ১০ - ১২ বছর যে কোনো জায়গায় বেঁচে থাকে । কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এ সুন্দর পাখিটিকে খাবারের জন্য শিকার করা হয় । কিছু কিছু এলাকায় বাসস্থান ধ্বংস, শিকার এবং অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক কারণের ফলে হিমালয় মোনাল আজ হুমকির সম্মুখীন । পশ্চিম হিমালয় অঞ্চলে জলবিদ্যুৎ উন্নয়নের সাথে জড়িত মানুষের কর্মকাণ্ডেও এটির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে । বিস্ময়কর যে, কোথাও কোথাও মোনাল জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ মাইলে মাত্র পাঁচ জোড়ার মতো । ফলে, পাখিটি বিরল কিংবা এটির জনসংখ্যা বিপন্ন হয়ে পড়ছে । International Union for Conservation of Nature (IUCN) এর লাল তালিকায় মোনাল পাখিকে ন্যূনতম উদ্বেগ (Least Concern বা LC) হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে । হিমালয় মোনাল প্রকৃতির অনুপম সৌন্দর্য । কিন্তু, আজ এটির সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে । আবার কিছু এলাকায় মোনালকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয় । এছাড়া, মোনালের প্রধান হুমকি হচ্ছে চোরাশিকার । পুরুষ মোনালের সৌন্দর্যময় ঝুঁটি পালকগুচ্ছ বেশ মূল্যবান । এগুলো অলঙ্কারাদি হিসেবে বা সাজসজ্জায় ব্যবহৃত হয় বলে মায়াবী সুন্দর এ পাখিটিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় । কারণ, হিমালয় মোনালের ঝুঁটি পালকগুচ্ছকে মর্যাদা এবং কর্তৃত্বের প্রতীক বলে মনে করা হয় । যাই হোক, মোনালকে রক্ষা করা এবং এটির আবাসস্থলকে সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখতে হবে । একে অবাধ বিচরণের সুযোগ করে দিতে হবে । পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে চোরাশিকারীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে । তবেই, প্রকৃতি হবে সুরক্ষিত । 

তথ্যসূত্র: https://en.wikipedia.org/ , https://www.inaturalist.org/ , https://wildlifepark.novascotia.ca/ , https://www.elmwoodparkzoo.org/ , https://animalia.bio/

Thursday, 9 May 2024

বৃহস্পতি গ্রহের মহা লাল বিন্দু (Great red spot)

 




বৃহস্পতি গ্রহের মহা লাল বিন্দু 
Great red spot 
~~~~~~~~~~
বৃহস্পতি গ্রহের বিষুবরেখার চারপাশে সামান্য স্ফীতি রয়েছে । বাইরের বায়ুমণ্ডল অক্ষাংশীয় মণ্ডলের বিভিন্ন বন্ধনীতে বিভক্ত এবং একটি বন্ধনীর সাথে অন্য আরেকটি বন্ধনীর সংযোগস্থলে ঝড়-ঝঞ্ঝাপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করে । এ ধরণের পরিবেশের একটি হচ্ছে ‘মহা লাল বিন্দু’ বা Great red spot (GRS) । বৃহস্পতি গ্রহের সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য মহা লাল বিন্দুটি হচ্ছে একটি ভয়ঙ্কর ঝড় । এটি এতোই বড় যে দুই-তিনটি পৃথিবীর সমতুল্য । ডিম্বাকৃতির এক জটিল দানবীয় ঝড় । ঝড়টির বর্তমান অবস্থান হচ্ছে দক্ষিণ নিরক্ষীয় বলয়ে । তবে, এটি সম্ভবত বৃহস্পতির স্থানান্তরিত চাঁদ (Transiting moon) ক্যালিস্টো এর ছায়ায় ছিল । ঝড়টি বৃহস্পতির দক্ষিণ গোলার্ধে নিরক্ষরেখা বা বিষুবরেখার ২২° দক্ষিণে অবস্থিত । ইটের মতো লাল থেকে গোলাপী এবং সাদাসহ রঙের ভিন্নতা রয়েছে । বিশাল এ ঝড়টি দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল এবং সক্রিয় অবস্থায় আছে । ধারণা করা হয়, অতি শক্তিশালী এ ঝড়টি সপ্তদশ শতাব্দী থেকে একটানা বয়ে চলছে ।  অসংখ্য ছোট ঝড়ের পাশাপাশি দৃশ্যমান আরো একটি বৃত্তাকার সাদা অংশ উজ্জ্বলভাবে অবস্থান করছে । কারণ, ঝড়গুলো প্রচুর সূর্যালোক প্রতিফলিত করে কিংবা একটি গভীর প্রধান মেঘ থেকে প্রতিফলিত আলো প্রদর্শন করে থাকে । এ মহা লাল বিন্দুর উচ্চ-ঊর্ধ্বতা বা গভীরতায় ধোঁয়াশা রয়েছে, যেমন নিরক্ষীয় অঞ্চলে আছে । অসংখ্য উজ্জ্বল সাদা এবং আঁকাবাঁকা দাগ বা পাতলা স্তর যেগুলো সম্ভবত ঘনীভূত সংবহনশীল ঝড়ের খুব উচ্চ-খাড়াইয়ের মেঘের চূড়া । বিপরীত দিকে, নিরক্ষীয় অঞ্চলের উত্তরে গাঢ় বন্ধনী বা ফিতাগুলোতে সামান্য মেঘের আচ্ছাদন রয়েছে । ঝড়টির অভ্যন্তরে বায়ু প্রবাহের গতি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২৭০ মাইল । 'মহা লাল বিন্দু' হচ্ছে বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলে একটি উচ্চ-চাপ অঞ্চল, যা অবিরাম একটি Anticyclonic ঝড় তৈরি করে । যেটি আমাদের সৌরজগতের বৃহত্তম ঝড় । এ দানব ঝড়টি ৪৩২ কিঃমিঃ/ঘন্টা (২৬৮ মাইল) পর্যন্ত বাতাসের গতিবেগ তৈরি করে । ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭১৩ খ্রিস্টাব্দের পর্যবেক্ষণগুলো থেকে ধারণা করা হয় যে, ভয়ানক শক্তিশালী এ ঝড়টি কমপক্ষে ৩৫৭ বছর ধরে বিদ্যমান রয়েছে । ১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে ইংরেজ Polymath, বিজ্ঞানী এবং স্থপতি Robert Hooke FRS মহা লাল বিন্দু ঝড়টি পর্যবেক্ষণ করেন । পরবর্তীতে ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইতালীয় গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ এবং প্রকৌশলী Giovanni Domenico Cassini (Jean-Dominique Cassini) বিস্ময়কর এ ঝড়টি পর্যবেক্ষণ করেন । জার্মানির একজন Pharmacist ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী Samuel Heinrich Schwabe ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে মহা লাল বিন্দুর প্রথম পরিচিত অঙ্কন তৈরি করেন । মহা লাল বিন্দুটি ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে বেশ সুস্পষ্ট হওয়ার আগে ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭০৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বেশ কয়েকটি পর্যবেক্ষণে এটি দৃষ্টি থেকে হারিয়ে গিয়েছিল । ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আবার ঝড়টি ম্লান বা অদৃশ্য হয়ে যায় । ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে মহা লাল বিন্দুর প্রান্তে ফলকায়িত (Flaking) শুরু করে ঝড়টি টুকরো হয়ে ভেঙ্গে যাওয়া কিংবা বিলুপ্ত হওয়ার অবস্থা ঘটেছিল । ঝড়টির সঙ্কুচিত হওয়া এবং Flaking এর কারণে এটি সম্পর্কে কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের উদ্বেগকে আরো উস্কে দিয়েছিল যে, মহা লাল বিন্দুটি আগামী ২০ বছরের মধ্যে বিলীন হয়ে যেতে পারে । যদিও কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে এ বিষয়ে দ্বি-মত ছিল । বৃহস্পতি গ্রহের মহা লাল বিন্দুটি ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘোরে, ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের হিসেব অনুযায়ী যার সময়কাল প্রায় ৪.৫ পৃথিবী দিন বা ১১ Jovian দিন । ৩রা এপ্রিল ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এ ঝড়টির প্রস্থ ১৬৩৫০ কিঃমিঃ (১০১৬০ মাইল) পরিমাপ করা হয় । মহা লাল বিন্দুর ব্যাস হচ্ছে পৃথিবীর ব্যাসের ১.৩ গুণ । এ ঝড়ের চূড়াগুলো (Cloud-tops) আশেপাশের মেঘ চূড়া থেকে প্রায় ৮ কিঃমিঃ (৫.০ মাইল) উপরে । মহা লাল বিন্দুটি বৃহস্পতি গ্রহের অন্যান্য মেঘের তুলনায় উচ্চ-ঊর্ধ্বতায় শীতল । তবে ঝড়ের উপরের বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা গ্রহের বাকি অংশের তুলনায় যথেষ্ট বেশি । নিচের ঝড়ের উত্তালতা থেকে ক্রমবর্ধমান শব্দ তরঙ্গগুলো এ অঞ্চলের উত্তাপের জন্য এটি একটি ব্যাখ্যা হিসেবে প্রস্তাব করা হয় । মহা লাল বিন্দুটি তার দক্ষিণে একটি পরিমিত পূর্বমুখী Jet স্রোত এবং উত্তরে একটি খুব শক্তিশালী পশ্চিমমুখী স্রোত দ্বারা সীমাবদ্ধ । যদিও ঝড়টির শিখর প্রান্তের চারপাশে বাতাস প্রায় ৪৩২ কিঃমিঃ/ঘন্টা (২৬৮ মাইল প্রতি ঘন্টা) বেগে প্রবাহিত হয় । মহা লাল বিন্দুর গভীরতা, অভ্যন্তরীণ কাঠামো এবং সামান্য আন্তঃ-বহিঃপ্রবাহসহ ঝড়টির ভিতরে স্রোত কয়েক দশক ধরে স্থবির রয়েছে বলে মনে হয় । তবে, এর ঘূর্ণন সময়ের সাথে সাথে হ্রাস পেয়েছে । মহা লাল বিন্দুর Anticyclonic সঞ্চালনের মধ্যে ফসফিন (PH₃), অ্যামোনিয়া (NH₃) এবং অ্যারোসলের (Para-H₂) সংমিশ্রণ রয়েছে । কিন্তু Jet স্রোতগুলো যে শক্তি সরবরাহ করে মহা লাল বিন্দুর ঘূর্ণিকে শক্তি দেয়, সেগুলো কাঠামোর ভিত্তির নিচে রয়েছে । মহা লাল বিন্দুর গঠন এবং এর লাল রঙের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি । তবে পরীক্ষাগারে নানা পরীক্ষা দ্বারা সমর্থিত অনুমান করা হয় যে: Ammonium hydrosulfide এবং জৈব যৌগ Acetylene এর সংস্পর্শে সূর্যের অতিবেগুনী বিকিরণ থেকে সৃষ্ট রাসায়নিক উপাদানগুলোর কারণে এমন রঙ হতে পারে, যা একটি লালচে উপাদান তৈরি করে । সম্ভবত এটি একটি জটিল জৈব যৌগ, যেটি Tholin নামে পরিচিত । যৌগগুলোর উচ্চ-ঊর্ধ্বতাও এ রঙে অবদান রাখতে পারে । Laboratory অধ্যয়নগুলোতে বৃহস্পতির মেঘের রাসায়নিক সংমিশ্রণে সূর্যের মহাজাগতিক অতিবেগুনী রশ্মির (Cosmic UV rays) প্রভাব পরীক্ষা করা হয় । বৃহস্পতি গ্রহের বাইরের বায়ুমণ্ডলে Ammonium hydrosulfide এবং জৈব যৌগ Acetylene এর সাথে সূর্যের অতিবেগুনী বিকিরণ থেকে সৃষ্ট রাসায়নিক উপাদানগুলোর বিক্রিয়া করে গভীর লাল রঙ তৈরি করে । মহা লাল বিন্দু বর্ণে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়, প্রায় ইট-লাল থেকে ফ্যাকাশে সালমন বা এমনকি সাদা । মহা লাল বিন্দুটি মাঝে মাঝে অদৃশ্য হয়ে যায় । শুধুমাত্র Red Spot Hollow এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠে, যা দক্ষিণ নিরক্ষীয় বলয় বা অঞ্চলে (South Equatorial Belt বা SEB) এটির অবস্থান । এর দৃশ্যমানতা দৃশ্যত দক্ষিণ নিরক্ষীয় বলয়ের সাথে মিলিত হয় যখন বলয়টি উজ্জ্বল সাদা হয় ও মহা লাল বিন্দুটি অন্ধকার হতে থাকে এবং যখন এটি অন্ধকার হয় মহা লাল বিন্দুটি সাধারণত হালকা হয় । ঐ গবেষণা থেকে পরামর্শ দেয়া হয় যে, ঝড়ের অশান্তি বা আলোড়নপূর্ণতার কারণে ঝড়টি চরম পরিমাণে শব্দ তরঙ্গ সৃষ্টি করে । শব্দ তরঙ্গগুলো ঝড়ের উপরে ৮০০ কিলোমিটার (৫০০ মাইল) উচ্চতায় উল্লম্বভাবে ভ্রমণ করে থাকে । যেখানে তারা উপরের বায়ুমণ্ডলে ভেঙে যায় এবং তরঙ্গ শক্তিকে তাপে রূপান্তর করে । এটি উপরের বায়ুমণ্ডলের একটি অঞ্চল তৈরি করে যা ১৬০০ Kelvin (১৩৩০°C বা ২৪২০°F)—  এ উচ্চতায় গ্রহের বাকি অংশের তুলনায় কয়েক শত Kelvin বেশি উষ্ণ থাকে । এ প্রভাবটিকে "সৈকতে সমুদ্রের ঢেউ বিধ্বস্ত হওয়ার মতো" অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে । ঘর্ষণ প্রদানের জন্য কোনো গ্রহের পৃষ্ঠ (শুধুমাত্র হাইড্রোজেনের একটি আবরণ) না থাকার কারণে ঝড়টি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিদ্যমান বা অব্যাহত রয়েছে । সঞ্চালনকারী গ্যাস ঘূর্ণিগুলো (Eddies) বায়ুমণ্ডলে খুব দীর্ঘ সময় ধরে থাকে, কারণ তাদের কৌণিক গতিবেগ বা ভরবেগের বিরোধিতা করার মতো কিছুই নেই । মহা লাল বিন্দুর সংলগ্নে দুটি ‘লাল দাগ’ এবং ঝড়টিতে ১২ সেঃমিঃ বড় একটি ছ্যাঁদা দেখা যায় । এ ঝড়ের সর্বোচ্চ ঊর্ধ্বতা আশেপাশের মেঘ চূড়াগুলো (Cloud-tops) থেকে প্রায় ৮ কিঃমিঃ (৫ মাইল) উপরে । ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের প্রথমদিকে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, প্রায় ৪১০০০ কিঃমিঃ (২৫৫০০ মাইল) জুড়ে ঝড়টির অবস্থান ছিল । ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে Voyager নভোযানের উড়ান (Flyby) থেকে পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ঝড়টির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩৩০০ কিঃমিঃ (১৪৫০০ মাইল) এবং প্রস্থ প্রায় ১৩০০০ কিঃমিঃ (৮০০০মাইল) ছিল । ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে Hubble Space Telescope এর পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, ঝড়টি আকারে ২০৯৫০ কিঃমিঃ (১৩০২০ মাইল) কমেছে এবং পরবর্তীতে ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের পর্যবেক্ষণে ঝড়টির আকার দেখা যায় প্রায় ১৭৯১০ কিঃমিঃ (১১১৩০ মাইল) । ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের হিসেবে ঝড়টি প্রায় ১৬৫০০ কিঃমিঃ থেকে ১০৯৪০ কিঃমিঃ (১০২৫০ মাইল থেকে ৬৮০০ মাইল) পরিমাপ করা হয় এবং প্রতি বছর এটির প্রায় ৯৩০ কিঃমিঃ (৫৮০ মাইল) দৈর্ঘ্য কমেছিল । ২০২১ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে প্রেরিত Juno spacecraft মহাকাশযান দ্বারা মহা লাল বিন্দুর গভীরতা পরিমাপ করা হয় প্রায় ৩০০-৫০০ কিঃমিঃ (১৯০-৩১০ মাইল) । এছাড়া, বৃহস্পতির মেরুতে বেশ কয়েকটি মেরু ঘূর্ণিঝড়পুঞ্জ বা ঘূর্ণিঝড়মণ্ডলী রয়েছে । উত্তর ঘূর্ণিঝড়পুঞ্জে ৯টি ঘূর্ণিঝড় রয়েছে, যার কেন্দ্রে বড় ১টি এবং এটির চারপাশে রয়েছে ৮টি ঘূর্ণিঝড় । অন্যদিকে দক্ষিণ অংশটিও ১টি কেন্দ্রীয় ঘূর্ণি বা ঘূর্ণিবাত্যা নিয়ে গঠিত, যার ৫টি বড় এবং ১টি ছোট ঘূর্ণিঝড় দ্বারা বেষ্টিত । এ মেরু কাঠামোগুলো বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলের তীব্র অশান্তি বা আলোড়নপূর্ণতার কারণে ঘটে থাকে । যেটিকে শনি গ্রহের উত্তর মেরুর ষট্কোণ বা ষড়ভুজ ক্ষেত্রের (Hexagon) সাথে তুলনা করা যেতে পারে । ২০০০ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ গোলার্ধে একটি বায়ুমণ্ডলীয় বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছিল যেটি মহা লাল বিন্দুর মতোই, কিন্তু এটি ছিল ছোট । সাদা ডিম্বাকার আকৃতির ঝড়গুলো একত্রিত হয়ে একটি একক বৈশিষ্ট্য তৈরি করে । ১৯৩৯-১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে এ তিনটি ছোট সাদা ডিম্বাকার আকৃতির ঝড় একত্রিত হয়ে গঠিত হয়েছিল । এ একত্রিত বৈশিষ্ট্যটির নাম Oval BA । ওভাল ঝড়টি পরবর্তীতে সাদা থেকে লালচে রঙে পরিণত হয়ে তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এটিকে "ছোট লাল বিন্দু" বা Little red spot বা Red junior নামকরণ করেছেন । গত ৫ই জুন ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে Great red spot এবং Oval BA এক-কেন্দ্রাভিমুখতা বা অভিসারণের (Convergence) দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়েছিল । ঝড় দুটি প্রায় প্রতি দুই বছর পর পর একে অপরকে অতিক্রম করে । তবে ২০০২ খ্রিস্টাব্দে এবং ২০০৪ খ্রিস্টাব্দের এ অতিক্রমগুলো খুব কম তাৎপর্যপূর্ণ ছিল । NASA এর Goddard space flight center এর আমেরিকান গ্রহ বিজ্ঞানী Amy Simon-Miller ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, ঝড়গুলো তাদের সবচেয়ে কাছাকাছি চলে যাবে । কিন্তু 'ছোট লাল বিন্দুটি' স্বল্প মেয়াদে তার আকৃতি বা গঠন ও তীব্রতা পরিবর্তন করে এবং ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বায়ুমণ্ডলে তার সাধারণ অবস্থান বজায় রেখেছে । ধারণা করা হয়, 'ছোট লাল বিন্দু'টি এক সময় মহা লাল বিন্দুর মতোই একটি দৈত্যাকার ঘূর্ণি বা ঘূর্ণিবাত্যা বা ঘূর্ণিঝড়ে (Giant vortex) পরিণত হতে পারে । এটিকে পৃথিবীর তাপমণ্ডলের (Thermosphere) ঘূর্ণিগুলোর মতোই অর্ধ-স্থিতিশীল বলে মনে হয় । এ বৈশিষ্ট্যই সম্ভবত বৃহস্পতির আইও (Io) চাঁদ থেকে উৎপন্ন চার্জিত কণার মধ্যে মিথস্ক্রিয়া দ্বারা গঠিত হতে পারে । আইও চাঁদের আগ্নেয়গিরিগুলো প্রচুর পরিমাণে সালফার ডাই অক্সাইড নির্গত করে, যা চাঁদের কক্ষপথে একটি Gas torus তৈরি করেছে । উল্লেখ্য যে: 'The Great Red Spot' বা মহা লাল বিন্দুকে Great Dark Spot এর সাথে বিভ্রান্ত করা উচিত নয় । কারণ ২০০০ খ্রিস্টাব্দে বৃহস্পতির উত্তর মেরুর কাছে Cassini–Huygens মহাকাশযান দ্বারা Great Dark Spot এর মতো একটি বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করা হয়, যে বেশিষ্ট্য নেপচুনের বায়ুমণ্ডলে রয়েছে আর সেটিই হচ্ছে Great Dark Spot । 
ছবি: http://www.nasa.gov/ , http://blogs.nasa.gov/ 
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, আন্তর্জাল (The Internet) ।





Tuesday, 7 May 2024

পৃথিবীর নিষ্প্রভ নীল বিন্দু (Pale Blue Dot of Earth)


‘নিষ্প্রভ নীল বিন্দু’ হচ্ছে পৃথিবী গ্রহের একটি আশ্চর্যজনক ছবি । এটি এমন একটি দুর্দান্ত ও দুর্লভ ছবি, যেটিকে ১৪ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবী থেকে ৬.৪ বিলিয়ন কিলোমিটার (৪ বিলিয়ন মাইল বা ৬৪০ কোটি কিলোমিটার) দূরে মহাশূন্যে থাকা ভয়েজার ১ রোবোটিক মহাকাশ যান থেকে ধারণ করা হয় । যে ছবিতে মহাকাশের বিশালতার মাঝে বিস্তৃত সূর্যালোক রশ্মির বন্ধনীতে “পৃথিবী” অতি ক্ষুদ্র একটি বিন্দুর মতো দেখা যায় । এখানে ফ্যাকাশে বিন্দুটিই পৃথিবী । অপার মহাশূন্যের প্রেক্ষাপটে এক ফালি সূর্যরশ্মির ভিতর পৃথিবী ধূলিকণার মতো ভাসছে । আমাদের এ সবুজ পৃথিবীতে সূর্য থেকে আলো আসতে সময় লাগে ০৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ড এবং দূরত্ব ১৫ কোটি কিলোমিটার । তাহলে একবার চিন্তা করুন ছবির ঐ ক্ষুদ্র বিন্দুটি কতদূর, যেখানে আপনি বসবাস করেন? এ ছবিতে পৃথিবীর আকার ০.১২ Pixel (১ মেগাপিক্সেল = ১ মিলিয়ন পিক্সেল) । পৃথিবীর এ প্রস্ফুটিত অনন্য চিত্রটি বেগুনি, নীল এবং সবুজ রঙে বিশোধন (ফিল্টার) করার মাধ্যমে নেয়া হয়েছিল । দিনটি ছিল Valentine’s Day । নাসা এর ভয়েজার ১ মিশনের জন্য ভালোবাসা দিবসটি বিশেষ হয় । দূরবর্তী মহাশূন্য থেকে ভয়েজার ১ মহাকাশ যানের ১৫০০ মিঃমিঃ উচ্চ-নির্ণয়কর সংকীর্ণ কোণের ক্যামেরার (Narrow-Angle Camera) সাহায্যে পৃথিবী গ্রহের ধারণকৃত Family Portrait সিরিজের আইকনিক ‘নিষ্প্রভ নীল বিন্দু’ ছবিটি সত্যিই উত্তেজনাকর । যা হৃদয়কে টানছে । বিশাল মহাবিশ্বে ক্ষুদ্র পৃথিবীকে আরো নাটকীয় করে তুলছে । এটি সেই নম্রতা যা বিজ্ঞান আমাদের দেয় । বিশদ বিশ্লেষণে পরামর্শ দেয়া হয়েছে যে ক্যামেরাটি চাঁদকেও শনাক্ত করেছে, তবে বিশেষ প্রক্রিয়াকরণ ছাড়াই দৃশ্যমান হওয়ার মতো অস্পষ্ট । যাক সে কথা, এটি এমন একটি অনুপ্রেরণাদায়ী পৃথিবী গ্রহের বিখ্যাত ছবি যেখানে ‘নিষ্প্রভ নীল বিন্দু’ অর্থাৎ পৃথিবী নামক ক্ষুদ্র বিন্দুটি আমাদের আবাসস্থল এবং সে সম্পর্কে পরম বিস্ময় জাগিয়ে তুলছে । অসীম বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মাঝে এ গ্রহটি নিতান্তই ক্ষুদ্র একটি বিন্দু, যেখানে আমাদের সবকিছু এবং নিরাপদ আশ্রয়স্থল । মায়ের কোলের মতোই একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়স্থল । যদিও কিছু মানুষের নির্বিচার, হিংসাত্মক ও নৃশংস কর্মকাণ্ড এমন সুন্দর ধরিত্রীকে অনিরাপদ করে তুলছে । প্রকৃতপক্ষে, যা অপ্রত্যাশিত । তবুও, স্বপ্ন দেখি এ মৃত্যুন্মুখ গ্রহে টিকে থাকার । পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে সূর্যালোকের স্থিতিস্থাপক আলোর বিচ্ছুরণ বা তড়িচ্চুম্বকীয় বিকিরণ (Rayleigh Scattering ) ছড়িয়ে পড়ার কারণে বিস্ময়কর এ ছবিতে পৃথিবী একটি ফ্যাকাসে নীল বিন্দুর মতোই আবির্ভূত হয়েছে । ভয়েজার ১ মহাকাশ যানটি যখন তার মিশনের উদ্দেশে সৌরজগৎ ছেড়ে অসীম মহাকাশের আরো গভীরে অগ্রসর হচ্ছিল সে সময় কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গ্রহ বিজ্ঞানী, বিজ্ঞান যোগাযোগকারী এবং ভয়েজার বিজ্ঞান দলের সদস্য Edward Carl Sagan নাসাকে অনুরোধ করে যে, ঐ দূরত্ব থেকে যানটির ক্যামেরা দ্বারা যেনো পৃথিবীর একটি চিত্র ধারণ করে রাখা হয় । মহাকাশযানটি গভীর মহাশূন্যের দিকে যাওয়ার পথে হঠাৎ চারদিকে ঘুরতে থাকে এবং পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখে নক্ষত্রে ভরা আকাশের উপর গ্রহগুলোর এক চমকপ্রদ বিন্যাস । যেখানে নীলাভ নেপচুন, নীল-সবুজ বরফ দৈত্য ইউরেনাস, বলয়যুক্ত শনি, গ্যাসীয় দানব বিশাল বৃহস্পতি, উজ্জ্বল সাদা শুক্র, ক্যামেরার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সূর্যালোক দ্বারা অস্পষ্ট লোহিত মঙ্গল, সূর্যের খুব কাছাকাছি বুধ, ভীষণ অন্ধকারে ম্লান হওয়া বামন গ্রহ প্লুটো খুব দূরে খুব ছোট এবং একটি অত্যাশ্চর্য ফ্যাকাশে নীল জলময় পৃথিবী । অপার মহাশূন্যের দূরবর্তী স্থান থেকে এটি সৌরজগতের প্রথম প্রতিকৃতি । অসাধারণ সুন্দর পৃথিবীর এ ছবিটি ধারণ করার চৌত্রিশ মিনিট পর ভয়েজার ১ মহাকাশ যানের ক্যামেরা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় এবং এটিই ছিল তার শেষ ছবি । যদিও কিছু বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ ছিল যে, সূর্যের এতো কাছাকাছি (মহাজাগতিক রশ্মির প্রভাবে) পৃথিবীর ছবি তোলা মহাকাশযানটির Imaging System কে অপূরণীয় ক্ষতিগ্রস্ত করার ঝুঁকি থাকতে পারে । যাই হোক, পরবর্তীতে এ অদ্ভুত ছবিটি দেখে জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান মহাশূন্যে সূর্যের আলোয় ভেসে থাকা ধুলোর ন্যায় ঐ ছোট্টো কণাটির (পৃথিবী) নাম দেন ‘নিষ্প্রভ নীল বিন্দু’ বা ‘Pale Blue Dot’ । তিনি ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে ‘নিষ্প্রভ নীল বিন্দু: মহাকাশে মানব ভবিষ্যতের দৃষ্টিভঙ্গি’ (Pale Blue Dot: A Vision of the Human Future in Space) নামক তার রচিত বইয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছবিটি নিয়ে গভীর চিন্তা ব্যাখ্যা করেন । যেখানে তিনি লিখেছেন: “সেই বিন্দুটির দিকে আবার তাকান । এটিই এখানে । এটিই বাড়ি । এটিই আমরা । এটিতে আপনি যাকে ভালোবাসেন, আপনার পরিচিত প্রত্যেকে, যাদের সম্পর্কে আপনি কখনো শুনেছেন, প্রত্যেক মানুষ যারা ছিলেন, তাদের জীবন কাটান । আমাদের ক্ষুদ্র পৃথিবীর এ দূরবর্তী চিত্রের চেয়ে মানবিক অহঙ্কারের মূর্খতার উত্তম প্রদর্শন সম্ভবত আর নেই ।” তিনি স্বীকার করেছেন যে, “এ ধরণের ছবির খুব বেশি বৈজ্ঞানিক মূল্য থাকবে না । কারণ, মহাকাশ যানটির ক্যামেরার জন্য পৃথিবী খুব ছোট বলে মনে হবে, কোনো বিস্তারিত জানার জন্য । কিন্তু, এটি মহাবিশ্বে মানবজাতির অবস্থানের এক দৃষ্টিকোণ হিসেবে অর্থবহ হবে ।” উল্লেখ্য যে, মার্কিন মহাকাশ বৈজ্ঞানিক কর্মসূচীর অংশ হিসেবে NASA ৫ই সেপ্টেম্বর ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে মনুষ্যবিহীন ভয়েজার ১ রোবোটিক মহাকাশ যানকে (Robotic Space Probe) সৌরজগতের বাইরের পরিবেশ, বহিঃসৌর গ্রহজনিত বিষয়, Heliosphere, Heliopause, Interstellar Wind এবং নক্ষত্রমণ্ডলের মধ্যবর্তী এলাকা গবেষণার জন্য মহাশূন্যে প্রেরণ করে । মহাকাশ যানটির ওজন: ৭২২ কিলোগ্রাম বা ১৫৯২ পাউন্ড । ভয়েজার ১ মহাকাশ যান ৫ই মার্চ ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে সৌরজগতের সর্ববৃহৎ গ্যাস দানব গ্রহ বৃহস্পতিকে অতিক্রম করে এবং ১২ই নভেম্বর ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে সৌরজগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাসীয় দৈত্য শনি গ্রহ ব্যবস্থার সম্মুখীন হয় । এটিই সর্বপ্রথম আমাদের সৌরজগতের বিশাল দুটি গ্রহ এবং তাদের প্রধান উপগ্রহগুলো সম্পর্কে বিশদ তথ্য ও চিত্র পাঠাতে সক্ষম হয় । ভয়েজার ১ হচ্ছে প্রথম মহাকাশযান যেটি Heliosphere অতিক্রম করে, এটি সেই সীমানা যেখানে আমাদের সৌরজগতের বাইরের প্রভাবগুলো সূর্যের তুলনায় অত্যধিক শক্তিশালী । পরবর্তীতে ২৫শে আগস্ট ২০১২ খ্রিস্টাব্দে ভয়েজার ১ মহাকাশ যানটি Hydrogen Wall এবং Heliopause এর সীমানা অতিক্রম করে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে প্রবেশ করে । বিস্ময়কর যে, মানবজাতির ইতিহাসে এটিই হচ্ছে মানবনির্মিত প্রথম বস্তু যেটি সৌরজগতের সীমানাকে ছাড়িয়ে যায় । ১১ই নভেম্বর ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে ভয়েজার ১ মহাকাশ যান পৃথিবী থেকে ১৩০.২৯ AU (প্রায় ১২ বিলিয়ন মাইল) দূরত্ব অতিক্রম করে, যা পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ দূরত্ব । এ মিশনটি পরিচালনা করে NASA (National Aeronautics and Space Administration) এবং JPL (Jet Propulsion Laboratory) । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডোনায় অবস্থিত জেপিএল সংস্থাটি নাসা এর জন্য মনুষ্যবিহীন নভোযান তৈরি এবং পরিচালনা করে থাকে । চলমান মিশনে থাকা ভয়েজার ১ মহাকাশ যানটি ৬৪০০০ কিঃমিঃ/ঘন্টা বা ৪০০০০ মাইল/ঘন্টা গতিতে বর্তমানে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে (Interstellar Space) তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে । তবে, এর ক্যামেরার ছবি তোলার ক্ষমতা আর নেই । এটি নাসা এর মাধ্যমে Deep Space Network (DSN) এর সাথে নিত্যনৈমিত্তিক আদেশ পেতে যোগাযোগ অব্যাহত রাখছে এবং চারটি স্থির-কার্যকর যন্ত্র থেকে যেমন: মহাজাগতিক রশ্মি, চৌম্বক ক্ষেত্র, কম শক্তি চার্জযুক্ত কণা এবং প্লাজমা তরঙ্গের বৈজ্ঞানিক তদন্ত করে তথ্য ফেরৎ পাঠায় । ২০২৪ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল পর্যন্ত এটি পৃথিবী থেকে ১৬২.৭ AU (২৪.৩ বিলিয়ন কিঃমিঃ বা ১৫.১ বিলিয়ন মাইল) দূরত্বে থাকবে এবং তার পূর্বের রেকর্ডটি অতিক্রম করবে । Voyager 1 হচ্ছে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী মহাশূন্যে ভ্রমণরত মানবসৃষ্ট বস্তু । সম্ভবত ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে এ মহাকাশ যানটির জ্বালানি শেষ হয়ে যাবে । হয়তো, পৃথিবীর মানুষ ভয়েজার ১ মহাকাশ যান থেকে আর কোনো সংকেত (Signal) পাবেন না । যদিও, নাসা এর বিজ্ঞানীরা মহাকাশ যানটিতে সংকেত পাঠানোর মাধ্যমে এর কয়েকটি ইউনিট বন্ধ রেখে জ্বালানি কম ব্যবহার করে আরো কিছু সময় এটিকে সচল রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন । তবুও, মহাকাশ যানটি মহাবিশ্বের মধ্য দিয়ে তার অনন্য যাত্রা চালিয়ে যাচ্ছে । 

* তথ্যসূত্র: আন্তর্জাল (The Internet), উইকিপিডিয়া । 

ছবি: https://science.nasa.gov/

Sunday, 5 May 2024

জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের দৈত্য ছায়াপথ আবিষ্কার


এ বিশাল মহাবিশ্ব অনেক গোপনীয়তা ধারণ করে । উপবৃত্তাকার বা বৃত্তাকার দানবীয় ছায়াপথগুলো সময়ের সাথে সাথে তাদের রূপ পরিবর্তন করে । এরা কখনো বেশ দৈত্যাকার, শান্ত এবং কিছু ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে রূপ ধারণ করে । ইয়েল ইউনিভার্সিটির Pieter van Dokkum এর নেতৃত্বে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি দল এ ধরনের একটি নতুন ছায়াপথ সনাক্তকরণের বিবরণ প্রকাশ করেছে । যেখানে বস্তুটিকে NASA এর জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের Near Infrared Camera (NIRCam) দিয়ে ১ মিলিয়ন পর্যন্ত ছায়াপথের চলমান JWST COSMOS-Web এর প্রশস্ত ও গভীর সমীক্ষার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর বৃহত্তম, সবচেয়ে জটিল এবং শক্তিশালী James Webb Space Telescope (JWST) ব্যবহার করে এ নতুন ছায়াপথ JWST-ER1g আবিষ্কারের কথা জানিয়েছেন । গত ১৪ই সেপ্টেম্বর ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে arXiv preprint server এর মাধ্যমে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে । অতি প্রাচীন এ বৃহৎ ছায়াপথটি তৈরি হয়েছিল যখন মহাবিশ্ব তার বর্তমান বয়সের মাত্র এক চতুর্থাংশ ছিল । নতুন আবিষ্কৃত ছায়াপথটি হচ্ছে বৃহদাকার, নিচ্ছিদ্র এবং শান্ত । অসীম বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে জন্ম নেয়া এমন বৃহদায়তন ছায়াপথগুলো তাদের জীবদ্দশায় শুরুতেই নতুন নক্ষত্র গঠন বন্ধ করে দেয়, তারা উপবৃত্তাকার দানব ছায়াপথের অনুমানযোগ্য পূর্বপুরুষ । মহাজাগতিক এ বস্তুগুলো পরবর্তীতে নক্ষত্র গঠন করে এবং তাদের নাক্ষত্রিক ভরগুলোকে আরো দ্রুত একত্রিত করেছিল । উত্তেজনাপূর্ণ অনুসন্ধানে দেখা যায়, নতুন পাওয়া ছায়াপথটিকে আলাদা করে তুলেছে এক অসাধারণ বৈশিষ্ট্য উপস্থিতির কারণে । যেখানে রয়েছে রহস্যময়, আকর্ষণীয় এবং সম্পূর্ণ বৃত্তাকার একটি আইনস্টাইন বলয় (Einstein Ring) । যেটি JWST-ER1r নামে পরিচিত । এটি হচ্ছে এক ধরণের মহাজাগতিক আলোক বলয় । আবিষ্কৃত ছায়াপথটি একটি অক্ষিকাচ (Lens) হিসেবে কাজ করে এবং দূরবর্তী উৎস থেকে আলোকে বাঁকিয়ে দেয়, যা পরবর্তীতে একটি বলয় হিসেবে উপস্থিত হয় । এ ঘটনাকে শক্তিশালী মহাকর্ষীয় লেন্সিং (Gravitational lensing) বলা হয় । আলবার্ট আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রকাশের পূর্বে একটি মহাকর্ষীয় বস্তু দ্বারা আলোর অবনমনের ভবিষ্যদ্বাণী করেন । আইনস্টাইন বলয় ব্যাসার্ধের মধ্যে আবদ্ধ মোট ভর হচ্ছে নাক্ষত্রিক এবং অদৃশ্য পদার্থের উপাদান । মহাকর্ষীয় লেন্সিং প্রভাবের কারণে আলো একটি বলয় আকারে বেঁকে গিয়ে ঘটনাটি ঘটায় । এ ছায়াপথে একটি সুস্পষ্ট লাল কেন্দ্র ও একটি নীল চাকতি রয়েছে । চাকতির অংশগুলোই বলয় তৈরি করে । বলয় কেন্দ্রের ব্যাস প্রায় ১.৫৪ আর্কসেকেন্ডে বিস্তৃত । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন যে এটি একটি পটভূমি ছায়াপথ দ্বারা বলয়টি ২.৯৮ এর একটি Photometric redshift এ তৈরি হয়েছে । সমীক্ষায় আরো দেখা গেছে যে ছায়াপথের প্রায় নিখুঁত বৃত্তাকার আকৃতি রয়েছে এবং NIRCam imaging এ কোনো সুস্পষ্ট তারকা-গঠনকারী অঞ্চল, জোয়ার বা স্রোতের লেজ ও অন্যান্য অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়নি । পৃথিবী থেকে প্রায় ১৭ বিলিয়ন আলোকবর্ষেরও বেশি দূরে JWST-ER1g ছায়াপথ অবস্থিত । ধারণা করা হয়, বিস্ময়কর এ নতুন ছায়াপথটির বয়স প্রায় ১.৯ বিলিয়ন বছর এবং এটি প্রতি বছর আমাদের সূর্যের ভরের স্তরে প্রায় চারগুণ মাঝারি গতিতে নতুন তারকা গঠন করে । ছায়াপথের লাল স্থানান্তর (Redshift) হচ্ছে ১.৯৪, ব্যাসার্ধ প্রায় ২১৫০০ আলোকবর্ষ প্রশস্ত একটি অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত এবং ভর প্রায় ৬৫০ বিলিয়ন সৌর ভর যা এটিকে তার আকারের জন্য অদ্ভুতভাবে ঘন একটি ছায়াপথ করে তুলেছে । আদি মহাবিশ্বের গতিশীল এ দৈত্য ছায়াপথের একটি নতুন বিশ্লেষণ পরামর্শ দেয় যে, গুপ্ত বা অদৃশ্য বা অন্ধকার পদার্থ (Dark Matter) নিজের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে । অন্ধকার পদার্থ হচ্ছে পদার্থের একটি কাল্পনিক রূপ যা আলো বা তড়িচ্চুম্বকীয় ক্ষেত্রের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে না বলে মনে হয় । এটি মহাকর্ষীয় প্রভাব দ্বারা আবদ্ধ । ছায়াপথটি মহাবিস্ফোরণের (Big Bang) মাত্র ৩.৪ বিলিয়ন বছর পরে গঠিত হয়েছিল ৷ যার ফলে অদৃশ্য পদার্থ সম্পর্কে জানার একটি দুর্দান্ত সুযোগ এনে দিয়েছে । মোট অনুমানকৃত ভর থেকে দৃশ্যমান নাক্ষত্রিক ভরকে বিয়োগ করে পরিমাপ করা হয় একটি ছায়াপথে কতটুকু অদৃশ্য পদার্থ । পদার্থবিদরা নিশ্চিত যে, একটি অদৃশ্য পদার্থ যা আমাদের মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থের শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ তৈরি করে বলে মনে করা হয় । অদৃশ্য পদার্থের Halo যা নতুন ছায়াপথটিকে ঘিরে থাকে । কয়েক দশকের পর্যবেক্ষণ এবং পরিস্থিতিগত প্রমাণের স্তুপ সত্ত্বেও, অদৃশ্য পদার্থটি এখনো সরাসরি পরীক্ষাগারে সনাক্ত করা যায়নি । এ ছায়াপথ আবিষ্কার দলটি নির্ধারণ করেছে যে অদৃশ্য পদার্থ প্রায় অর্ধেক ভরের ব্যবধানকে ব্যাখ্যা করে এবং লেন্সিং ফলাফল ব্যাখ্যা করার জন্য অতিরিক্ত ভরের প্রয়োজন বলে মনে হয় । ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যার অধ্যাপক এবং নতুন গবেষণার সহ-লেখক Hai-Bo Yu এক বিবৃতিতে বলেছেন: 'আমরা যদি মোট ভর থেকে নাক্ষত্রিক ভরকে বিয়োগ করি, তাহলে আমরা আইনস্টাইন ব্যাসার্ধের মধ্যে অদৃশ্য পদার্থের ভর পাই । অদৃশ্য পদার্থ ভরের মান প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বলে মনে হচ্ছে । এটি বিস্ময়কর! তিনি এবং তার সহকর্মীরা পরামর্শ দিয়েছেন যে, নতুন এ ছায়াপথের অস্বাভাবিক উচ্চ ঘনত্ব বর্তমানে চিন্তার চেয়ে বেশি নক্ষত্র জনসংখ্যা দ্বারা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে ।' একটি অদৃশ্য পদার্থ Halo হচ্ছে অদৃশ্য পদার্থের Halo যা JWST-ER1g ছায়াপথের মতো একটি ছায়াপথকে ঘিরে থাকে । একটি সংকোচন প্রক্রিয়া যার দ্বারা সাধারণ পদার্থের উপাদানগুলো গ্যাস এবং নক্ষত্র তৈরি করে JWST-ER1g ছায়াপথের অদৃশ্য পদার্থের Halo তে ধসে পড়ে ও ঘনীভূত হয়ে মোড়ক বাঁধাই করতে পারে, যার ফলে উচ্চ ঘনত্বের দিকে পরিচালিত হয় । ছায়াপথের কেন্দ্রে সবচেয়ে ঘন অদৃশ্য পদার্থের Halo হচ্ছে মহাকর্ষীয় আঠা যা ঘূর্ণায়মান ছায়াপথগুলোকে উড়তে বাধা দেয় । আমরা এখনো পরিপূর্ণভাবে জানি না, অদৃশ্য পদার্থ আসলে কি? তবে, পর্যবেক্ষণমূলক সূত্র থেকে জানা যায় এটি একটি নতুন ধরনের কণা যার উপস্থিতি শুধুমাত্র সাধারণ পদার্থের সাথে এর মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়া থেকে অনুমান করা যেতে পারে । অদৃশ্য পদার্থ হতে পারে শুধুমাত্র এক ধরনের কণা বা স্বাভাবিক পদার্থের মতো বিভিন্ন ধরনের জটিল বৈচিত্র্য, যা সম্ভবত অদৃশ্য পদার্থের সাথে এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত অজানা শক্তিগুলোর উপস্থিতিতে একচেটিয়া কাজ করে । অধ্যাপক Hai-Bo Yu গত ডিসেম্বর ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে স্ব-মিথস্ক্রিয়া অদৃশ্য পদার্থকে (Self-interacting dark matter) অন্তর্ভুক্ত করে কাঠামো গঠনের আদিখ্যেতার (Simulation) নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে, এ ধরনের স্ব-মিথস্ক্রিয়া নির্দিষ্ট ছায়াপথগুলোতে অত্যন্ত ঘন অদৃশ্য পদার্থের Halo গুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারে । পাশাপাশি অন্যদের মধ্যে বিস্ময়করভাবে কম ঘনত্ব যে, দুটিই প্রচলিত 'ঠান্ডা অদৃশ্য পদার্থ' তত্ত্ব দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না । তিনি বলেন: মহাবিশ্বের প্রথম দিকের ছায়াপথগুলোর আসন্ন অনুসন্ধান থেকে ঐ অদৃশ্য পদার্থের কণা এবং তাদের আচরণ সম্পর্কে এক আশ্চর্যজনক সূত্র প্রকাশ করতে পারে । NASA এর জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি (JWST) মহাবিশ্ব যখন তরুণ ছিল সে সময় গঠিত প্রাচীন ছায়াপথগুলোকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য আমাদেরকে একটি অভূতপূর্ব সুযোগ প্রদান করে । পদার্থবিদরা আশা করেন যে, জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি অদৃশ্য পদার্থের উপর আরো বেশি আলোকপাত করতে পারে । কারণ, এ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের দুর্লভ অবলোহিত চোখ অন্য যে কোনো দূরবীক্ষণ যন্ত্রের চেয়ে সময়ের সাথে আরো জটিল দৃষ্টিপাত করে থাকে । হয়তো, আগামীতে আমরা এ দূরবীক্ষণ যন্ত্র থেকে আরো চমক দেখতে পাবো এবং শীঘ্রই অদৃশ্য পদার্থ সম্পর্কে আরো বিশদ জানতে পারবো । গবেষণা দলটি JWST-ER1g ছায়াপথের ভবিষ্যৎ পর্যবেক্ষণের জন্য অপেক্ষা করছে । এ শক্তিশালী লেন্সিং বস্তু বা ছায়াপথটি অনন্য কারণ এখানে একটি নিখুঁত আইনস্টাইন বলয় রয়েছে যেখান থেকে আমরা আইনস্টাইন ব্যাসার্ধের মধ্যে মোট ভর সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পেতে পারি । এছাড়া কাছাকাছি কোনো ছায়াপথ বা দৃষ্টি রেখা বরাবর কাঠামোগুলো এ ছায়াপথের ভরকে প্রভাবিত করছে কি-না, এ ছায়াপথটি একটি স্তবকের পূর্বপুরুষের কেন্দ্রীয় ছায়াপথ কি-না, এটি ক্রমবর্ধমান Galactic Cluster এর বিকাশে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে কি-না এবং অদৃশ্য পদার্থের বৈশিষ্ট্যগুলো পরীক্ষা করার জন্য এটি হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ । এমনকি, ছায়াপথগুলো কিভাবে পরিবর্তিত হয় এবং বিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ উৎসকে বোঝার উন্নতির চাবিকাঠি হতে পারে । নতুন গবেষণাটি গত ১১ই এপ্রিল ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে The Astrophysical Journal Letters এ প্রকাশিত হয় । গবেষণাটি John Templeton Foundation এবং The U.S. Department of Energy দ্বারা সমর্থিত ছিল । 
তথ্যসূত্র: www.space.com, www.phys.org, www.sciencedaily.com 
 
ছবি: www.greekreporter.com 
Credit: NASA’s Marshall Space Flight Center / Flickr / CC BY-NC 2.0

Sunday, 21 April 2024

Triangulum Galaxy




ট্রায়াঙ্গুলাম হচ্ছে একটি সর্পিল ছায়াপথ, যেটি পৃথিবী থেকে প্রায় ২.৭৩ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে Triangulam নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত । এটিকে Messier 33 (M33) বা NGC (New General Catalouge) 598 লক্ষিত বস্তু হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে । এ ছায়াপথে একটি H II নিউক্লিয়াস রয়েছে । যদিও ছায়াপথের নিউক্লিয়াসে একটি অতিভারবিশিষ্ট কৃষ্ণ গহ্বর আছে বলে মনে হয় না । কারণ একটি ছায়াপথের কেন্দ্রীয় বৃহদায়তন কৃষ্ণ গহ্বরের ভর ছায়াপথের কেন্দ্রীয় স্ফীতির আকারের সাথে সম্পর্কযুক্ত । M33 বা ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথটি অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথ (Andromeda Galaxy) এবং আমাদের নিজস্ব আকাশগঙ্গা ছায়াপথ (Milky Way Galaxy) থেকে ভিন্ন একটি ছায়াপথ । ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথ হচ্ছে একটি বিশুদ্ধ চাকতি ছায়াপথ যার কোনো স্ফীতি নেই । তবে, ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা Chandra X-ray Observatory থেকে তথ্য ব্যবহার করে এ ছায়াপথের মধ্যে সূর্যের ভরের প্রায় ১৫.৭ গুণ একটি কৃষ্ণ গহ্বর সনাক্ত করেন । M33 X-7 নামক ঐ কৃষ্ণ গহ্বরটি একটি সহচর নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে যেটি প্রতি ৩.৫ দিনে গ্রহন (Eclipse) করে । জানা যায়, এটি সবচেয়ে বড় নাক্ষত্রিক ভরের একটি কৃষ্ণ গহ্বর । ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথ হচ্ছে অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথ এবং আকাশগঙ্গা ছায়াপথের পিছনে অবস্থিত ছায়াপথগুলোর স্থানীয় গোষ্ঠীর তৃতীয় বৃহত্তম সদস্য (যদিও ছোট-বড় এবং ছোট Magellanic মেঘগুলো আকাশগঙ্গা ছায়াপথের সাথে মুখোমুখি হওয়ার আগে সর্পিল হয়ে থাকতে পারে) এবং রাতের আকাশে তাদের মিথস্ক্রিয়া, বেগ ও একে অপরের নৈকট্যের কারণে এন্ড্রোমিডা ছায়াপথের একটি উপগ্রহ বা পরবর্তীতে এটির প্রত্যাবর্তন বলে মনে করা হয় । ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথ প্রায় ৪০ বিলিয়ন নক্ষত্রের আবাসস্থল, যেখানে আকাশগঙ্গা ছায়াপথে ৪০০ বিলিয়ন এবং অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথে ১ ট্রিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে । স্কটল্যান্ডের ঔপন্যাসিক ও এডিনবার্গ সংবাদপত্রের প্রাক্তন সাহিত্য সম্পাদক Andrew Crumey দেখিয়েছেন যে, এ ছায়াপথের মোট প্রতীয়মান বা দৃশ্যমান উজ্জ্বলতার মাত্রা ৫.৭২ এবং কার্যকর দৃশ্যমান মাত্রা প্রায় ৬.৬ । ক্ষীণ আলো বা খুব অন্ধকার স্থান থেকেও এটিকে দেখা যায় । ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথকে কখনো কখনো অনানুষ্ঠানিকভাবে Pinwheel Galaxy বলা হয় । ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথটি সম্ভবত ১৬৫৪ খ্রিস্টাব্দের আগে ইতালীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী Giovanni Battista Hodierna আবিষ্কার করেন । ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দের ২৫-২৬ আগস্ট রাতে ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী Charles Messier ছায়াপথটি স্বাধীনভাবে আবিষ্কার করেন এবং এটি তার Catalog of Nebulae and Star Clusters (1771) এ লক্ষিত বস্তু নম্বর ৩৩ হিসেবে প্রকাশিত হয় । তাই ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথটির নাম Messier 33 (M33) । জার্মান-ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং সুরকার Frederick William Herschel ১১ই সেপ্টেম্বর ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে এ মহাজাগতিক বস্তুটিকে H V-17 হিসেবে তালিকাভুক্ত করেন । ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে আইরিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী, প্রকৃতিবিদ এবং প্রকৌশলী Lord Rosse একটি সর্পিল নীহারিকার (Spiral nebulae) মধ্যে ছায়াপথটি ছিল এটিকে তিনি প্রথম চিহ্নিত করেন । ১৯২২-২৩ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী John Charles Duncan এবং জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী Maximilian Franz Joseph Cornelius Wolf (Max Wolf) নীহারিকাতে পরিবর্তনশীল নক্ষত্র আবিষ্কার করেন । মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী Edwin Powell Hubble ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে দেখিয়েছিলেন যে, ঐ নক্ষত্রগুলোর মধ্যে ৩৫টি হচ্ছে Classical Cepheid । ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথের ডি২৫ আইসোফোটাল ব্যাস হচ্ছে ১৮.৭৪ কিলোপারসেক (৬১১০০ আলোকবর্ষ), যেখানে ছায়াপথ পৃষ্ঠের উজ্জ্বলতা ২৫ম্যাগ/আর্কসেক২ এ পৌঁছায় এবং এটি শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ আকাশগঙ্গা ছায়াপথের আকারে পরিণত করে । ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথটি অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথের মহাকর্ষীয়ভাবে আবদ্ধ সঙ্গী হতে পারে ।
ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথ চাকতির আনুমানিক ভর হচ্ছে (৩–৬)×১০০০০০০০০০ সৌর ভর, যেখানে গ্যাসের উপাদান প্রায় ৩২০০০০০০০০ সৌর ভর । সুতরাং, ছায়াপথের সমস্ত Baryonic পদার্থের মিলিত ভর ১০০০০০০০০০০ সৌর ভর হতে পারে । ৫৫০০০ আলোকবর্ষ (১৭ কিলোপারসেক) ব্যাসার্ধে অন্ধকার পদার্থের (Dark matter) উপাদানের অবদান প্রায় ৫০০০০০০০০০০ সৌর ভরের সমতুল্য । ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথ হচ্ছে H2O Maser (Astrophysical Maser) নিঃসরণের উৎস । অনুমান করা হয়, ছায়াপথটি অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথের দিকে অগ্রসর হচ্ছে । ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে হাইড্রোজেন গ্যাসের একটি অগোছালো স্রোত (Clumpy stream of hydrogen gas) ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথের সাথে অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথকে যুক্ত করার প্রমাণ পাওয়া যায় । মীন বামন (The Pisces Dwarf বা মীন l বা LGS 3 হচ্ছে ছোট একটি স্থানীয় গোষ্ঠীর সদস্য ছায়াপথগুলোর মধ্যে একটি এবং সূর্য থেকে ২০২২৩০০০ আলোকবর্ষ (৬২০ কিলোপারসেক) দূরে অবস্থিত । মীন রাশি নক্ষত্রমণ্ডলের নামানুসারেই এর নামকরণ করা হয়েছে । এ অনিয়মিত মীন বামন ছায়াপথটি অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথ থেকে ২০° এবং ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথ থেকে ১১° দূরে অবস্থিত । যেহেতু, মীন বামন LGS 3 ছায়াপথ ঐ ছায়াপথ দুটি থেকে ৯১৩০০০ আলোকবর্ষ (২৮০ কিলোপারসেক) দূরত্বে অবস্থিত, হয়তো এটি অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথ কিংবা ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথের একটি উপগ্রহ ছায়াপথ হতে পারে । মীন বামন LGS 3 ছায়াপথের মূল ব্যাসার্ধ ৪৮৩ আলোকবর্ষ (১৪৮ কিলোপারসেক) এবং এর সৌর ভর হচ্ছে ২৬০০০০০০ । মীন VII / Triangulum (Tri) III ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথের আরেকটি উপগ্রহ হতে পারে ।
ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী Gérard de Vaucouleur ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথকে SA(s)cd নমুনা হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেন । ট্রায়াঙ্গুলাম একটি চাকতি আকৃতির ছায়াপথ যার বিশিষ্ট বাহুগুলো গ্যাস এবং ধূলিকণা নিউক্লিয়াস থেকে সর্পিলাকার হয়— যে কারণে এটি সর্পিল ছায়াপথ নামে পরিচিত । ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথের ভিতরের অংশে দুটি আলোকিত সর্পিল বাহু রয়েছে এবং সাথে একাধিক স্ফটিক বা শক্ত খুঁটি (Spar) রয়েছে যা ভিতরের অংশকে বাইরের সর্পিল বৈশিষ্ট্যের সাথে সংযুক্ত করে । তাই, এখানে গ্যাস ও ধূলিকণা থাকার কারণে খুব দ্রুত নক্ষত্র গঠন করে ।
ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথের চারপাশে একটি বর্ণবলয় (Halo) থাকতে পারে, কিন্তু নিউক্লিয়াসে কোনো স্ফীতি নেই । ট্রায়াঙ্গুলাম একটি বিচ্ছিন্ন ছায়াপথ এবং অন্যান্য ছায়াপথগুলোর সাথে সাম্প্রতিক একত্রিতকরণ বা মিথস্ক্রিয়ার কোনো ইঙ্গিত নেই । এ ছায়াপথের কেন্দ্রীয় ৪′ অঞ্চলে পারমাণবিক গ্যাস দক্ষতার সাথে আণবিক গ্যাসে রূপান্তরিত হচ্ছে, যার ফলে কার্বন মনোস্কাইডের একটি শক্তিশালী বর্ণালী নির্গমন ঘটে । আশেপাশের আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যম থেকে বিশাল আণবিক মেঘ ঘনীভূত হওয়ার কারণে এ প্রভাবটি ঘটে থাকে । কেন্দ্রীয় ৪′ এর বাইরে অনুরূপ প্রক্রিয়া চলছে, তবে কম কার্যকর গতিতে । এ ছায়াপথে শতকরা প্রায় ১০ ভাগ গ্যাসের উপাদান আণবিক আকারে রয়েছে । নক্ষত্র গঠন এমন একটি হারে ঘটছে যা স্থানীয় গ্যাসের ঘনত্বের সাথে দৃঢ়ভাবে সম্পর্কযুক্ত এবং প্রতি একক অঞ্চলের হার প্রতিবেশী অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথের চেয়ে বেশি । ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথে নক্ষত্র গঠনের হার প্রায় ৩.৪ Gyr−১ pc−২, যা অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথে ০.৭৪ এর তুলনায় । ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথে নক্ষত্র গঠনের মোট সমন্বিত হার প্রতি বছর প্রায় ০.৪৫ ± ০.১ সৌর ভর । তবে এটি অনিশ্চিত যে, এ নেট হার বর্তমানে কমছে না-কি স্থির আছে । ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি দল ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথে একটি গ্রহনকারী বাইনারি নক্ষত্র (Eclipsing Binary Star) আবিষ্কার করেন ।
স্পিটজার স্পেস টেলিস্কোপ থেকে অবলোহিত পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করে ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের হিসেব অনুযায়ী ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথের মধ্যে ২৪ μm নির্গমনের মোট ৫১৫টি পৃথক প্রার্থী উৎস তালিকাভুক্ত করা হয়েছে ৷ উজ্জ্বল উৎসগুলো ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে এবং সর্পিল বাহু বরাবর রয়েছে ৷ নির্গমনের অনেক উৎসই নক্ষত্র গঠনের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও বৃহত্তম H II অঞ্চলের সাথে যুক্ত । চারটি উজ্জ্বল HII অঞ্চলকে NGC 588, NGC 592, NGC 595 এবং NGC 604 হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে । এ অঞ্চলগুলো (১.২-৪) ×১০০০০০ সৌর ভরযুক্ত আণবিক মেঘের সাথে যুক্ত । এ সকল অঞ্চলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল হচ্ছে NGC 604, যা প্রায় তিন মিলিয়ন বছর আগে একটি বিচ্ছিন্ন বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে নক্ষত্র গঠন হয়ে থাকতে পারে । এ নীহারিকা হচ্ছে স্থানীয় গোষ্ঠীর ছায়াপথের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বাধিক আলোকিত HII অঞ্চল, সূর্যের আলোর (৪.৫ ± ১.৫)×১০০০০০০০ গুণ বেশি । ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথের অন্যান্য বিশিষ্ট HII অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে IC 132, IC 133 এবং IK 53 । ছায়াপথের উত্তর অংশের প্রধান সর্পিল বাহুতে চারটি বৃহৎ HII অঞ্চলের অবস্থান, যেখানে দক্ষিণ বাহুতে তরুণ ও উষ্ণ নক্ষত্রের ঘনত্ব বেশি । ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথে অতিনবতারা (Supernova) বিস্ফোরণের আনুমানিক হার হচ্ছে ০.০৬ নমুনার Ia এবং ০.৬২ নমুনার Ib / নমুনা II প্রতি শতকে । এটি গড়ে প্রতি ১৪৭ বছরে একটি অতিনবতারা বিস্ফোরণের সমতুল্য । ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের হিসেব অনুযায়ী, ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথে মোট ১০০টি অতিনবতারার অবশিষ্টাংশ সনাক্ত করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই সর্পিল ছায়াপথের দক্ষিণ অংশের অর্ধেকের মধ্যে অবস্থিত । H I ও H II অঞ্চলগুলোর জন্য অনুরূপ অসামঞ্জস্য এবং বিশাল O (O V) নমুনার প্রধান নক্ষত্রগুলোর উচ্চ আলোকিত ঘনত্ব রয়েছে । এ বৈশিষ্ট্যগুলোর বিতরণ কেন্দ্রটি দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় দুই আর্ক মিনিট Offset হয় । ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথ একটি স্থানীয় ছায়াপথ হওয়ায় Central Bureau for Astronomical Telegrams (CBAT) মহাবিশ্বের বিস্ময়কর M31 এবং M81 ছায়াপথে নোভা (Novae) চিহ্নিত করে । ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথে প্রায় ৫৪টি Globular cluster সনাক্ত করা হয়েছে । তবে, স্তবকের প্রকৃত সংখ্যা ১২২ বা তারও বেশি হতে পারে । নিশ্চিত হওয়া স্তবকগুলো আকাশগঙ্গা ছায়াপথের Globular cluster এর চেয়ে কয়েক বিলিয়ন বছর তরুণ বা ছোট হতে পারে এবং স্তবক গঠন গত ১০০ মিলিয়ন বছরে বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে । এ বৃদ্ধি ছায়াপথের কেন্দ্রে গ্যাস প্রবাহের সাথে সম্পর্কযুক্ত । ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথে বিশাল নক্ষত্রের অতিবেগুনী নিঃসরণ বা নির্গমন Large Magellanic Cloud এর অনুরূপ নক্ষত্রের স্তরের সাথে মিলিত । ধারণা করা হয়, ট্রায়াঙ্গুলাম ছায়াপথটি নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন এবং নক্ষত্রের বিভিন্ন প্রবাহ দ্বারা M31 ছায়াপথের সাথে যুক্ত, যা পরামর্শ দেয় যে এ দুটি ছায়াপথের মধ্যে একটি অতীত মিথস্ক্রিয়া ২ থেকে ৮ বিলিয়ন বছর আগে ঘটেছিল এবং ভবিষ্যতে ২.৫ বিলিয়ন বছর আরো সহিংস সংঘর্ষ ঘটবে । 
_____
_____
ছবি: @astrobackyard, Beyond The World
উৎস: উইকিপিডিয়া, Albert Einstein: Science & Astronomy ।

Saturday, 13 April 2024

আপেক্ষিক বেগ

পৃথিবী তার অক্ষের উপর ঘূর্ণায়মান । প্রায় প্রতি ২৪ ঘন্টায় একটি ঘূর্ণন সম্পন্ন করে । বিষুবরেখার একটি বিন্দু প্রতি ঘন্টায় প্রায় ১৬৭০ কিলোমিটার (০.৪৬ কিঃমিঃ/সেকেন্ড) বেগে চলে, যা পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে পৃষ্ঠের দ্রুততম গতি ।নিরক্ষরেখা থেকে দূরে মেরুর দিকে যাওয়ার সাথে সাথে ঘূর্ণনের গতি হ্রাস পায় । এর কারণ পৃথিবীর পরিধি বা বৃত্ত ছোট হয়ে যায় । নিরক্ষরেখা ব্যতীত অন্য কোনো অক্ষাংশের বেগকে অক্ষাংশের Cosine দ্বারা নিরক্ষীয় বেগকে গুণ করে হিসেব করা যায় । পৃথিবীও সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে ঘণ্টায় ১০৭২০০ কিলোমিটার (২৯.৮ কিঃমিঃ/সেকেন্ড) বেগে । এ গতি সারা বছর জুড়ে সামান্য পরিবর্তিত হয় কারণ পৃথিবীর কক্ষপথ উপবৃত্তাকার, পুরোপুরি বৃত্তাকার নয় ।পৃথিবীর কক্ষপথে ০.০২ এরও কম একটি বিকেন্দ্রতা বা উদ্ভটতা রয়েছে, যার মানে এটি প্রায় বৃত্তাকার কিন্তু এখনো কিছুটা ডিম্বাকৃতির । সূর্য থেকে দূরত্ব বছরে পরিবর্তিত হয়, যা কক্ষপথের গতিকে প্রভাবিত করে । পৃথিবী দ্রুত গতিতে চলে যখন এটি পেরিহিলিয়নে (Perihelion) (৩রা জানুয়ারির কাছাকাছি) সূর্যের কাছাকাছি থাকে এবং ধীর গতিতে চলে যখন এটি অ্যাফিলিয়নে (৪ঠা জুলাইয়ের কাছাকাছি) দূরে থাকে । সূর্যের চারপাশে একটি কক্ষপথ সম্পূর্ণ করতে পৃথিবীকে প্রায় ৩৬৫.২৪২১৯৯ সৌর দিন লাগে । একটি নিখুঁত ৩৬৫ দিনের এ সামান্য পার্থক্যের কারণেই প্রতি চার বছরে আমাদের অধিবর্ষ (Leap year) হয় । সূর্য প্রতি ঘন্টায় ৮২৮০০০ কিলোমিটার (২৩০ কিঃমিঃ/সেকেন্ড) গড় গতিতে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের (Milky Way Galaxy) কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করে । ছায়াপথের বিশাল মাপনী এবং খেলার মধ্যে মহাকর্ষীয় শক্তির কারণে এ গতিটি বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ । এ উচ্চ গতি সত্ত্বেও, আকাশগঙ্গা ছায়াপথের চারপাশে একটি কক্ষপথ (প্রদক্ষিণ) সম্পূর্ণ করতে সূর্যের প্রায় ২৩০ মিলিয়ন বছর সময় লাগে । এ দীর্ঘ সময়টিকে "Galactic year" বা "Cosmic year" বা "মহাজাগতিক বছর" বলা হয় । পৃথিবীসহ আমাদের সমগ্র সৌরজগত এ বিশাল আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্রের চারপাশে ঘুরছে এবং ছায়াপথটি নিজেই মহাকাশের মধ্য দিয়ে চলছে, পৃথিবীর আপেক্ষিক গতিতে আরো স্তর যুক্ত করছে । আকাশগঙ্গা ছায়াপথ মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমিকে Cosmic Microwave Background (CMB) প্রদক্ষিণ করে না বরং, এটি মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমির সাথে সম্পর্কিত বা আপেক্ষিকভাবে চলে । আপেক্ষিক বেগ ২১৬০০০০ কিঃমিঃ/ঘন্টা বা ৬০০ কিঃমিঃ/সেকেন্ড । মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি একটি সার্বজনীন পটভূমি হিসেবে কাজ করে, যা মহাবিশ্বের বস্তুর গতির জন্য একটি উল্লেখিত কাঠামো (Reference frame) প্রদান করে । মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমির সাথে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের আপেক্ষিক বেগ বা গতি হচ্ছে মহাবিশ্বের মধ্য দিয়ে আমাদের ছায়াপথের গতির একটি পরিমাপ । মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি এ গতির জন্য একটি উল্লেখিত কাঠামো হিসেবে কাজ করে কারণ এটি মহাবিস্ফোরণের (Big bang) পরবর্তী চমক এবং সব দিকেই প্রায় অভিন্ন । গতিবেগ তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি শুধুমাত্র স্থানীয় মহাকর্ষীয় বা মাধ্যাকর্ষণ প্রভাবগুলোই প্রতিফলিত করে না, যেমন নিকটবর্তী ছায়াপথ থেকে টান বরং মহাবিশ্বের সামগ্রিক বিস্তার এবং মহাবিস্ফোরণের প্রাথমিক অবস্থাও প্রতিফলিত করে । 

তথ্যসূত্র: Geology Notes 

Credit: Dr James O'Donoghue via Unilad Tech


Wednesday, 3 April 2024

পহেলা বৈশাখ

চৈত্রের সমাপ্তি ।
বর্ষ বিদায় ।
সকল গ্লানি মিলিয়ে যাক দূর নীলিমায় ।
রুদ্র বৈশাখের আগমনী বার্তা ।
প্রত্যুষের সূর্যোদয় ।
শুভ বাংলা নববর্ষ!
পহেলা বৈশাখে আনন্দময় বর্ষ বরণ ।
হালখাতা, মঙ্গল শোভাযাাত্রা, পান্তাভাত-ইলিশ, রমনা বটমূলের অনুষ্ঠান, বৈশাখী মেলা ইত্যাদি ।
এ দিনটি বাঙালি জাতির প্রাণের উৎসব ।
বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক ।
অসাম্প্রদায়িক চেতনার বহ্নিশিখা ।
অনুপ্রেরণার অপার উৎস ।
বিশাখা নক্ষত্র থেকে বৈশাখ শব্দের উৎপত্তি ।
বৈশাখ মাসে প্রকৃতি বৈচিত্র্যময় রূপ ধারণ করে ।
কালবৈশাখীর হিংস্র তাণ্ডব ।
আমি শঙ্কিত ।
ঝরে পড়া কৃষ্ণচূড়ার নিদারুণ আর্তনাদ!
কানপেতে শুনি ।
কখনো কোকিলের মধুর কুহুতানে ভালোবাসার উচ্ছ্বাস ।
বৈশাখের পথ ধরে আগামীর স্বপ্ন দেখি । 

Tuesday, 19 March 2024

অলিম্পাস মন্স (Olympus Mons) সৌরজগতের সর্ববৃহৎ আগ্নেয়গিরি



সূর্য থেকে চতুর্থ দূরবর্তী গ্রহ হচ্ছে মঙ্গল । এটি বুধ গ্রহের পরেই সৌরজগতের দ্বিতীয়-ক্ষুদ্রতম গ্রহ । রোমানদের রণদেবতা মার্স এর নামানুসারে মঙ্গল গ্রহের নামকরণ করা হয়েছে । পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার আঁতুড়ঘর মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণাংশের প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতার জনগণ মঙ্গল গ্রহকে যুদ্ধ, প্লেগ রোগ এবং মৃত্যু দেবতা নেরগাল (Nergal) এর মতো মনে করতেন । এছাড়া মঙ্গল গ্রহকে বাংলাসহ বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় হিন্দু গ্রহদেবতা মঙ্গল হিসেবে গণ্য করতেন । ইতালীয় পদার্থবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ এবং দার্শনিক গ্যালিলিও গ্যালিলি ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে সর্বপ্রথম মঙ্গল গ্রহটি আবিষ্কার করেন । বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে, এক সময় মঙ্গল গ্রহে পানির প্রাচুর্য ছিল । মঙ্গল গ্রহ শিলাময় । মঙ্গলের পৃষ্ঠ মূলত আগ্নেয়গিরিজাত শিলা (Basalt) এবং এর কেন্দ্রভাগ লৌহ-সালফার (Iron sulphide) দ্বারা গঠিত যা অনেকাংশে তরল ও চারদিকে Silicate দ্বারা ঘিরে আছে । মঙ্গল গ্রহে কোনো অভ্যন্তরীণ চৌম্বকক্ষেত্র নেই । এ গ্রহে চারটি ঋতু বিদ্যমান । মঙ্গল গ্রহের পাতলা বায়ুমণ্ডলে রয়েছে শতকরা ৯৫ ভাগ কার্বন ডাই অক্সাইড, শতকরা ৩ ভাগ নাইট্রোজেন, শতকরা ১.৬ ভাগ আর্গন এবং বাকী অংশ অক্সিজেন ও পানি । হিমায়িত কার্বন ডাই অক্সাইড এবং বরফের কারণে মঙ্গল গ্রহের মেরু বরফাচ্ছাদিত । গ্রহটির পৃষ্ঠতলে Ferric oxide এর আধিক্যের কারণে এটি রক্তিম দেখায় । তাই মঙ্গল গ্রহটি ”লাল গ্রহ” (Red Planet) নামে পরিচিত । মঙ্গল গ্রহে রয়েছে সর্ববৃহৎ ও গভীর গিরিখাত Valles Marineris, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের জ্বালামুখ Airi-0 এবং মহাসাগর Sinus Meridiani । কিছুদিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নৌ-পরিচালন ও মহাকাশ প্রশাসন (NASA) এর Mars Perseverance Rover এক সময়কার একটি উত্তাল নদীর প্রমাণ পেয়েছে যেটি প্রাচীনকালে মঙ্গল গ্রহে প্রবাহিত হতো । মঙ্গল গ্রহের Phobos এবং Deimos নামক দুটি চাঁদ বা প্রাকৃতিক উপগ্রহ রয়েছে । ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের জ্যোতির্বিজ্ঞানী Asaph Hall III মঙ্গল গ্রহের ক্ষুদ্রাকার এ চাঁদ দুটি আবিষ্কার করেন । পৃথিবীর পর মঙ্গলই হচ্ছে একমাত্র গ্রহ যেখানে পানির চিহ্ন এবং প্রাণের সম্ভাবনা রয়েছে । মঙ্গল গ্রহে বেশ কয়েকটি দৈত্যাকার আগ্নেয়গিরি রয়েছে । অলিম্পাস মন্স (Olympus Mons বা Mount Olympus Mons) শুধুমাত্র মঙ্গল গ্রহেরই নয়, এটি সৌরজগতের সর্ববৃহৎ-সর্বোচ্চ পর্বত এবং আগ্নেয়গিরি । এ পর্বতটির (পাহাড়ের মতো) শৃঙ্গ নেই কিন্তু এর রয়েছে অগ্ন্যুৎপাতের এক জ্বালামুখ, যেখান থেকে ভয়ঙ্কর অগ্ন্যুৎপাত হয় । চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে লাভা এবং ছাই । আগ্নেয়গিরি থেকে আগ্নেয়শিলা ছিটকে বেরিয়ে মহাজাগতিক রশ্মির সংস্পর্শে ধূমকেতুর রূপ নেয় । এ ধূমকেতুই মঙ্গল গ্রহ থেকে লাভা এবং আগ্নেয় পাথর বয়ে আনছে আমাদের সবুজ গ্রহ পৃথিবীতে । বিশাল ঢালু অলিম্পাস মন্স আগ্নেয়গিরিটি মঙ্গল গ্রহের বৃহত্তম আগ্নেয়গিরি অঞ্চল Tharsis Montes এর সাথে যুক্ত এবং এটি সর্বশেষ বিস্ফোরিত হয়েছিল প্রায় ২৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে । থার্সিস স্ফীতি (Tharsis Bulge) এলাকায় অবস্থিত প্রধান আগ্নেয়গিরিগুলো যেমন: Olympus Mons, Ascraeus Mons, Pavonis Mons এবং Arsia Mons ইত্যাদি । বৃহত্তম আগ্নেয়গিরিটি হচ্ছে অলিম্পাস মন্স । এদের মধ্যে কয়েকটি আগ্নেয়গিরি লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বিস্ফোরিত হয়নি । জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে দানব অলিম্পাস মন্স পর্বতটি অ্যালবেডো (Albedo) বৈশিষ্ট্যের কারণে Nix Olympica Mountain (Olympic Snow) বা অলিম্পাসের তুষার হিসেবে পরিচিত এবং এর আধুনিক নাম হচ্ছে অলিম্পাস মন্স (অলিম্পাস পর্বত) । NASA এর মেরিনার প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে Mariner 9 রোবোটিক মহাকাশযান মঙ্গল গ্রহে অনুসন্ধানের সময় এ পর্বতটি আবিস্কার করে । উল্লেখ্য যে: ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ৩০শে মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল এয়ার ফোর্স স্টেশন LC-36B থেকে Mariner 9 মহাকাশযানটি মঙ্গল গ্রহের দিকে উৎক্ষেপণ করা হয় এবং একই বছরের ১৪ই নভেম্বর এটি মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথে পৌঁছেছিল যেটি প্রথম মহাকাশযান অন্য একটি গ্রহকে প্রদক্ষিণ করে । Mars Orbiter Laser Altimeter (MOLA) দ্বারা পরিমাপ করা পর্বত তথাপি আগ্নেয়গিরিটির উচ্চতা ২১.৯ কিলোমিটার (১৩.৬ মাইল বা ৭২০০০ ফুট) এবং প্রশস্ত প্রায় ৬০০ কিলোমিটার (৩৭০ মাইল) । পর্বতটি মঙ্গল গ্রহের পশ্চিম গোলার্ধে Tharsis স্ফীতির উত্তর-পশ্চিম প্রান্ত থেকে ১৮° ৩৯′ উত্তর ২২৬° ১২′ পূর্ব কেন্দ্রিক এবং এর পশ্চিম অংশ অ্যামাজোনিস চতুর্ভুজ (MC-8) ও কেন্দ্রীয়-পূর্ব অংশ সংলগ্ন Tharsis চতুর্ভুজে (MC-9) রয়েছে । অলিম্পাস মন্স পর্বতের ১৫.৬ কিলোমিটার ব্যাসের (৯.৭ মাইল) একটি কার্জোক অগ্নিমুখ বা গর্ত (Karzok crater) (১৮° ২৫′ উত্তর ২২৮° ০৫′ পূর্ব) এবং ১০.৪ কিলোমিটার ব্যাসের (৬.৫ মাইল) অপর একটি পাংবোচে অগ্নিমুখ বা গর্ত (Pangboche crater) (১৭° ১০′ উত্তর ২২৬° ২৫′ পূর্ব) রয়েছে । এগুলো মঙ্গলগ্রহের উল্কাপিণ্ডের সবচেয়ে প্রাচুর্য শ্রেণী Shergottite এর বেশ কয়েকটি সন্দেহজনক উৎস এলাকা হিসেবে উল্লেখযোগ্য । পর্বতটি এতোই বড় যে তার প্রান্তে জটিল কাঠামো থাকার কারণে এর উচ্চতা পরিমাপ করা খুবই কঠিন । অলিম্পাস মন্স মঙ্গল গ্রহের Global datum থেকে ২১ কিলোমিটার (১৩ মাইল) উপরে দাঁড়িয়ে আছে যা পাহাড়ের পাদদেশ থেকে উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের শিখর পর্যন্ত । Amazonis Planitia এর সমভূমি থেকে উত্তর-পশ্চিমে ১০০০ কিলোমিটার (৬২০ মাইল) এবং চূড়া পর্যন্ত মোট উচ্চতার পরিবর্তন ২৬ কিলোমিটার (১৬ মাইল) । পর্বতের চূড়ায় ছয়টি বিশাল আকৃতির আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ বা ধ্বসিত গর্ত (Nested caldera) রয়েছে যা ৬০ কিলোমিটার (৩৭ মাইল) × ৮০ কিলোমিটার (৫০ মাইল) জুড়ে এবং ৩.২ কিলোমিটার (২.০ মাইল) গভীর পর্যন্ত একটি অনিয়মিত নিম্নচাপ তৈরি করে । পর্বত বা আগ্নেয়গিরির বাইরের প্রান্তটি ৮ কিলোমিটার (৫.০ মাইল) লম্বা এক দুরারোহ পর্বতগাত্র (Escarpment) নিয়ে গঠিত (যদিও অস্পষ্ট যে ঐ স্থানে লাভা প্রবাহ হয়) । এ আগ্নেয়গিরি থেকে গড়িয়ে পড়া লাভা অনেক দূরে প্রবাহিত হওয়ার কারণে পাহাড়ের নিচের অংশটি চারপাশে বহুদূর পর্যন্ত দিগন্ত বিস্তৃত এক বিশাল সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছে । আগ্নেয়গিরির আশপাশের কোনো কোনো জমিতে অনেকাংশ জুড়ে অসংখ্য অদ্ভুত ভাঁজ সৃষ্টি করেছে । মঙ্গলের ঢালু আগ্নেয়গিরিগুলোর মধ্যে এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য যা বিশাল পার্শ্ববর্তী ভূমিধসের কারণে তৈরি হয়ে থাকতে পারে । মঙ্গল গ্রহের ভূত্বক (Crust) পৃথিবীর মতো সচল নয় । পৃথিবীর তুলনায় মঙ্গল গ্রহের ভূত্বক একটি স্থির বা নিশ্চল হটস্পটের (Stationary hotspot) উপর স্থির থাকে এবং ভূত্বকীয় ফলক (Plate) যখন হটস্পটের উপর দিয়ে চলাচল করে তখন নতুন নতুন আগ্নেয়গিরির উৎপত্তি হয়ে পুরোনো আগ্নেয়গিরিগুলো বিলুপ্তির দিকে ধাবিত হয় । সম্ভবত মঙ্গল গ্রহে মোবাইল টেকটোনিক প্লেটের (Mobile tectonic plates) অভাবের কারণে ভূত্বক স্থির থাকে । গ্রহটির ভূত্বক বা উপরিতলের একই জায়গাতে গলিত শিলা বা ম্যাগমা পর্যায়ক্রমে নিঃসরণ করতে থাকে এবং ধীরে ধীরে এ সঞ্চিত লাভা থেকেই জন্ম নেয় এক একটি সুবিশাল আগ্নেয়গিরি । একটি আগ্নেয়গিরি বিশাল উচ্চতায় না পৌঁছানো পর্যন্ত লাভা নির্গত করতে পারে । হয়তো, এ বৈচিত্র্যময় বৈশিষ্ট্যের কারণেই অলিম্পাস মন্স পর্বতের এমন অসাধারণ আকৃতি । বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে, কোটি কোটি বছর আগে অলিম্পাস মন্স আগ্নেয়গিরির অতিরিক্ত তাপমাত্রায় উত্তপ্ত লাভার গরমে এক সময় মঙ্গল গ্রহে বরফের যে স্তর ছিল তার একটি অংশ গলে গিয়ে ভূমিধ্বস সৃষ্টি করে । অলিম্পাস মন্স পর্বতের আকার এবং অগভীর ঢালের কারণে মঙ্গল পৃষ্ঠে দাঁড়িয়ে থাকা একজন পর্যবেক্ষক এটির সম্পূর্ণ পার্শ্বচিত্র বা নকশা দেখতে অক্ষম হবেন, এমনকি অনেক দূর থেকেও । মঙ্গল গ্রহের বক্রতা এবং পর্বতটি নিজেই এমন একটি সংক্ষিপ্ত দৃশ্যকে অস্পষ্ট করবে । একইভাবে, চূড়ার কাছাকাছি একজন পর্যবেক্ষক খুব উঁচু পাহাড়ে দাঁড়ানোর বিষয়ে অজ্ঞাত থাকবেন, কারণ পর্বতের ঢাল দিগন্তের বাইরে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে প্রসারিত হবে । অলিম্পাস মন্স পর্বত শীর্ষে সাধারণ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ হচ্ছে ৭২ প্যাসকেল, যেখানে গড়ে মঙ্গল পৃষ্ঠের চাপ ৬০০ প্যাসকেলের শতকরা প্রায় ১২ ভাগ । অপরদিকে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এভারেস্ট পর্বত (Mount Everest) চূড়ায় যেখানে বায়ুমণ্ডলীয় চাপ প্রায় ৩২০০০ প্যাসকেল বা পৃথিবীর সমুদ্রপৃষ্ঠের চাপের শতকরা প্রায় ৩২ ভাগ । তা সত্ত্বেও, উচ্চ-ঊর্ধ্বতায় অরোগ্রাফিক মেঘগুলো (Orographic clouds) প্রায়শই অলিম্পাস মন্স শিখর বা সর্বোচ্চ সীমার (Olympus Mons summit) উপর দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং বায়ুবাহিত মঙ্গল ধূলিকণা এখনো বিদ্যমান । যদিও গড়ে মঙ্গল পৃষ্ঠের বায়ুমণ্ডলীয় চাপ পৃথিবীর এক শতাংশেরও কম । মঙ্গলে অনেক কম মাধ্যাকর্ষণের কারণে বায়ুমণ্ডলীয় চাপ বৃদ্ধি পায় । মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডল বিস্তৃত এবং পৃথিবীর মতো তীব্রভাবে উচ্চতার সাথে ঘনত্বে নেমে আসে না ।

অলিম্পাস মন্স পর্বতটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এভারেস্ট পর্বতের উচ্চতার প্রায় আড়াই গুণ । এছাড়া প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধীন হাওয়াই দ্বীপের সুপ্ত আগ্নেয়গিরি মাউনা কেয়ার (Mauna Kea) সমুদ্র তলদেশের ভিত্তি থেকে এর উচ্চতার দ্বিগুণের একটু বেশি । তবে ধারণা করা হয়, বৃহত্তম গ্রহাণু ভেস্তা এর পৃষ্ঠে Rheasilvia নামক এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও প্রভাবশালী গর্ত রয়েছে যেটি অলিম্পাস মন্স পর্বতের চেয়েও উঁচু এবং বর্তমানে সৌরজগতে আবিষ্কৃত সবচেয়ে উচ্চ পর্বত । এছাড়া আলবা মন্স (Alba Mons বা Alba Patera বা Arcadia Ring নামেও পরিচিত) হচ্ছে মঙ্গল গ্রহের উত্তর Tharsis অঞ্চলে অবস্থিত সর্ববৃহৎ আগ্নেয়গিরি যেটি অলিম্পাস মন্স পর্বতের উচ্চতার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ । আলবা মন্স এমন একটি অনন্য আগ্নেয়গিরির কাঠামো যার কোনো সমকক্ষ পৃথিবীতে বা মঙ্গল গ্রহের অন্য কোথাও নেই । যাই হোক, অলিম্পাস মন্স পর্বতটি মঙ্গল গ্রহের হেস্পেরিয়ান যুগে (Hesperian epoch) (৩.৫ বিলিয়ন বছর থেকে ১.৮ বিলিয়ন বছর পূর্ব পর্যন্ত) গঠিত হয়েছিল এবং আমাজনীয় অঞ্চলে অগ্ন্যুৎপাত অব্যাহত ছিল । অলিম্পাস মন্সের আয়তন প্রায় ৩০০০০০ বর্গ কিলোমিটার (১২০০০০ বর্গ মাইল) যেটি ইতালি, ফিলিপাইন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য অ্যারিজোনার মতোই এক বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত । এ পর্বতটি ৭০ কিলোমিটার (৪৩ মাইল) পুরু লিথোস্ফিয়ার (Lithosphere) দ্বারা সমর্থিত এবং এর গঠন শতকরা প্রায় ৪৪ ভাগ সিলিকেট, শতকরা ১৭.৫ ভাগ আয়রন অক্সাইড, শতকরা ৭ ভাগ অ্যালুমিনিয়াম, শতকরা ৭ ভাগ সালফার ডাই অক্সাইড, শতকরা ৬ ভাগ ম্যাগনেসিয়াম এবং শতকরা ৬ ভাগ ক্যালসিয়াম । যেহেতু, মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠটি মূলত ব্যাসাল্ট (Basalt) এবং অন্যান্য ম্যাফিক (Mafic) শিলা দ্বারা গঠিত হওয়ার কারণে ধীরে ধীরে বা নিম্ন সান্দ্রতা লাভা (Viscosity lava) প্রবাহের ফলে সবেগে উৎক্ষিপ্ত বা বিস্ফোরিত হতে পারে এবং গ্রহের পৃষ্ঠ নিম্ন নতিমাত্রার দিকে নিয়ে যাবে । অলিম্পাস মন্স আগ্নেয়গিরিতে সঞ্চিত লাভার পরিমাণ পৃথিবীর বৃহত্তম জীবন্ত আগ্নেয়গিরি মাউনা লোয়া (Mauna Loa) থেকেও প্রায় ১০০ গুণ বেশি । অলিম্পাস মন্স আংশিকভাবে Olympus Mons Aureole নামে পরিচিত স্বতন্ত্র খাঁজকাটা বা ঢেউতোলা ভূখণ্ডের একটি অঞ্চল দ্বারা বেষ্টিত । এ অঞ্চলটি (Aureole) কয়েকটি বড় Lobe নিয়ে গঠিত ।

পৃথিবীর তুলনায় মঙ্গল গ্রহে মাধ্যাকর্ষণ হ্রাসের কারণে ভূত্বক থেকে উঠে আসা ম্যাগমা’র উচ্ছলতা কম এবং ম্যাগমা কক্ষগুলোকে পৃথিবীতে পাওয়া কক্ষ বা প্রকোষ্ঠগুলোর চেয়ে অনেক বড় ও গভীর বলে মনে করা হয় । অলিম্পাস মন্স পর্বতের পার্শ্বদেশগুলো (Flank) অসংখ্য লাভা প্রবাহ এবং নালা দ্বারা গঠিত । অনেক প্রবাহের প্রান্ত বরাবর উঁচু পাড় বা বাঁধ বা স্তর রয়েছে । বাইরের প্রান্তগুলো গলিত প্রবাহিত লাভার একটি কেন্দ্রীয় খাদ ছেড়ে শীতল এবং শক্ত হয়ে যায় । অলিম্পাস মন্সের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে লাভা প্রবাহের বয়স ১১৫ মিলিয়ন বছর (Mya) থেকে মাত্র ২ মিলিয়ন বছর (Mya) পর্যন্ত । ধারণা করা হয়, পর্বত অঞ্চলে এখনো আগ্নেয়গিরি সক্রিয় থাকতে পারে যদিও খুব শান্ত এবং অনিয়মিত চলন বা প্রথায় (Episodic fashion) । বিশাল আকৃতির এ পর্বত বা আগ্নেয়গিরির শিখরে থাকা যৌগিক বা দুর্বোধ্য জ্বালামুখটি (Caldera complex) কমপক্ষে ছয়টি অধিক্রমণ জ্বালামুখ এবং জ্বালামুখের অংশ দিয়ে তৈরি । আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের পর ভূপৃষ্ঠের ম্যাগমা প্রকোষ্ঠের অবক্ষয় এবং প্রত্যাহারের পর ছাদ ধসে পড়ে আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ তৈরি হয় । এভাবে প্রতিটি বৃহদাকার জ্বালামুখ পাহাড়ে আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপের একটি পৃথক স্পন্দনকে প্রতিনিধিত্ব করে । তাই, সবচেয়ে বৃহৎ এবং প্রাচীনতম এ জ্বালামুখ অংশটি একটি একক ও বৃহত্তম লাভা হ্রদ হিসেবে গঠিত বলে মনে হয় । বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন যে, অলিম্পাস মন্স পর্বতের বিশাল জ্বালামুখের সাথে যুক্ত ম্যাগমা প্রকোষ্ঠটি জ্বালামুখের তল থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (১০৫০০০ ফুট) গভীরতায় অবস্থিত । জ্বালামুখের মেঝেতে গর্তের আকার কম্পাঙ্ক বা স্পন্দনহারের বিতরণ (Crater size-frequency distribution) প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন বছর (Mya) থেকে ১৫০ মিলিয়ন বছর (Mya) পর্যন্ত জ্বালামুখের বয়সের পরিসীমা নির্দেশ করে । সবগুলো জ্বালামুখই সম্ভবত একে অপরের ১০০ মিলিয়ন বছরের মধ্যে গঠিত হয়েছিল । অলিম্পাস মন্স পর্বতটি গাঠনিক ও ভূসংস্থানিকভাবে অপ্রতিসম এবং এটি মঙ্গল গ্রহের অন্যতম ধুলোময় অঞ্চলে দাঁড়িয়ে আছে ।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, আন্তর্জাল (The Internet) । ছবি: https://www.wikiwand.com/ । 

https://muhammadashrafulalam.wordpress.com/2024/03/16/%e0%a6%85%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%b8-%e0%a6%ae%e0%a6%a8%e0%a6%b8-olympus-mons%e0%a6%b8%e0%a7%8c%e0%a6%b0%e0%a6%9c%e0%a6%97%e0%a6%a4%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8/?fbclid=IwAR3TJQHVoOVBnFDHPvKEBPpEw0fMgjSr0VWzkZFTRLF1SftpDFyjUBgAVwI

Thursday, 25 January 2024

উল্কা (Meteor)



আমি মহাবিশ্বের এক বিস্ময়কর উল্কা ।
পাথুরে-ধাতব বস্তু যেটি গ্রহাণু ও ধূমকেতুর চূর্ণবিচূর্ণ অংশবিশেষ ।
কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে দুর্বার গতিতে ঝাঁক বেঁধে পৃথিবীর দিকে ধাবিত হই ।
বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় বাতাসে ঘর্ষণ ও রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে জ্বলে উঠি ।
নিজস্ব প্রভাব এবং উত্তাপের কারণে উজ্জ্বল আলোকচ্ছটা সৃষ্টি করি ।
তখন কেউ আমাকে বলে নক্ষত্র-খসা বা ছুটন্ত তারা বা উল্কাপাত ।
বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভেঙে প্রজ্জ্বলিত হওয়াকে কেউ বলে উল্কা বৃষ্টি বা উল্কা ঝড় ।
পৃথিবী, ধূমকেতু এবং মহাজাগতিক অন্যান্য উৎসের সাথে সংঘর্ষ বা বিস্ফোরণে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষ স্রোতকে কেউ বলে উল্কা ঝরনা ।
আবার কেউ বলে আকাশের সন্তান ।
একসময় আকাশেই জ্বলে ছাই হয়ে যাই ।
কদাচিৎ পিণ্ড আকারে পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠে আছড়ে পড়ি ।
আমাকে নিয়ে অনেক কুসংস্কার, ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রাচীন লোককথা এবং পৌরাণিক কাহিনী প্রচলিত আছে ।
সৌরজগৎ গঠনের পূর্বে বা প্রাথমিক সময়ে আমার জন্ম ।
হয়তো কোনো মহাবিস্ফোরণে ।
তবে কি আমি ভ্রুণগ্রহীয় চাকতি কিংবা ধ্বংস হওয়া গ্রহের অবশিষ্টাংশ?
৪৬০ কোটি বছর পূর্বে নীহারিকা বিস্ফোরণ থেকে এক দানবীয় আন্তঃনাক্ষত্রিক আণবিক মেঘের মহাকর্ষীয় পতনের ফলে সৌরজগতের উৎপত্তি ।
আমার আদি পূর্বপুরুষ সৌরজগৎ সৃষ্টির প্রাথমিক উপাদান বহন করে ।
এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ছায়াপথে অন্ধকারে নিমগ্ন জমাটবাঁধা ঠাণ্ডা নীহারিকার হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, প্লাসমা, বস্তুপুঞ্জ এবং ধূলিকণা মেঘের কিছু উপাদান মহাকর্ষের প্রবল টানে কেন্দ্রে ঘনীভূত হয়ে কেন্দ্রিকা (Nucleus) তৈরি করে নক্ষত্রের জন্ম হয় ।
কোটি কোটি বছর ধরে জ্বলে-পুড়ে নিঃশেষ হয়ে নক্ষত্রটির অভ্যন্তরভাগে প্রচণ্ড অন্তস্ফোটন (Implosion) বা অতিনবতারা বিস্ফোরণের (Supernova) মধ্য দিয়ে একসময় মৃত্যু ঘটে ।
অতিনবতারা মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী আলোক বিচ্ছুরনকারী বিস্ফোরণ এবং এ দানবীয় নাক্ষত্রিক বিস্ফোরণের সময় মহাকাশে ধ্বংসপ্রাপ্ত নক্ষত্রটি পুরো ছায়াপথের চেয়েও সর্বাধিক উজ্জ্বল হয়ে প্রচুর পরিমাণে শক্তি, তীব্র আলোক বিকিরণ, ধ্বংসাবশেষ, ভারী মৌল কণা, P-nucleus isotope, অতি উচ্চশক্তির মহাজাগতিক তেজস্ক্রিয় রশ্মি, গ্যাস-ধূলিকণা মেঘের সৃষ্টি করে পুনর্জন্ম দেয় এক একটি নতুন প্রজন্মের নিউট্রন নক্ষত্র, পালসার নক্ষত্র, গ্রহ, শীতল নীহারিকা, কৃষ্ণগহ্বর ও আমাকে ।
কোনো এক সময় জটিল প্রক্রিয়ার মাঝে একটি নক্ষত্রের চতুর্দিকে পরিভ্রমণ করি ।
অথবা কোনো দানব গ্রহকে ঘিরে ।
আমি প্রাণ-অস্তিত্বের প্রাচীনতম কঠিন পাথর বা মহাজাগতিক বস্তু বা সৌরজাগতিক বস্তু ।
অঙ্গারময়, শিলা, কন্ড্রুল এবং ধাতু সমৃদ্ধ ।
আমার আদি পিতৃপুরুষের উপাদান সিলিকন কার্বাইড (কার্বোরান্ডাম) কণার বয়স প্রায় ৭০০ কোটি বছর ।
যেখানে পৃথিবীর বয়স ৪৫৪ কোটি বছর অতিক্রম করেছে ।
এমনকি সৌরজগতের বয়সের চেয়েও বেশি ।
আমার পিতৃপিতামহগণ এ পৃথিবীতে পতনের ফলে প্রাণের উদ্ভবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন ।
হলুদ, কমলা-হলুদ, নীলচে-সবুজ, বেগুনী, কালো এবং লাল রঙ ধারণ করে মহাজাগতিক সৌন্দর্য প্রকাশ করি ।
গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ও ধূমকেতুর কণা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মহাকাশে ধেয়ে যাই তীব্র গতিতে দোর্দণ্ড প্রতাপে ।
কখনো গ্রহ, মহাজাগতিক বস্তু এবং স্ব-জাতির সাথে আকস্মিক সংঘর্ষ ঘটে ।
ডেকে আনি ভয়ঙ্কর মহাবিপর্যয় ।
নক্ষত্র, গ্রহাণু, ধূমকেতু ছাড়াও সম্ভবত অন্য কোনো গ্রহ-উপগ্রহ থেকে উদ্ভূত হয়ে পৃথিবীতে এসে সেই গ্রহের গঠন, উৎপত্তি, বিবর্তন এবং জীবনের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিচিত্র ইঙ্গিত প্রদান করি ।
আদিম বৃহৎ গ্রহের ভ্রূণ Theia এর সাথে পৃথিবীর সংঘর্ষের ফলে পৃথিবী ভেঙ্গে তার টুকরো থেকেই সৃষ্টি হয় চাঁদ ।
প্রায় সাড়ে ৬ কোটি বছর পূর্বে আমার বিধ্বংসী আঘাতে ডাইনোসর জাতি পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায় ।
তবে কেউ কেউ বলেন সেই মুহূর্তে জলবায়ু পরিবর্তন ও অক্সিজেন স্বল্পতার কারণে এটি ঘটেছিল ।
সুতরাং আমি আজ কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন ।
অষ্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যের মার্চিসন গ্রামে ২৮শে সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে মার্চিসন উল্কাপিণ্ডের (Murchison meteorite) খণ্ডাংশ পতিত হয় ।
সৌরজগৎ গঠনের প্রাথমিক সময়ে তার আবির্ভাব ।
এ গ্রহের মানুষ দেখেছে ভয়াবহ ধ্বংসলীলার ভীবৎস রূপ ।
কখনো আমাকে গ্রহাণু বা ক্ষুদ্র বামন গ্রহও বলা হয় ।
আমি পারমাণবিক বোমার চেয়েও ভয়ানক শক্তিশালী হওয়ার কারণে বৃহদাকার গর্ত (জ্বালামুখ), অগ্নিকাণ্ড, উচ্চ তাপমাত্রা, ধূলিঝড় ও প্রবল অভিঘাত-তরঙ্গের সৃষ্টি করি ।
সমস্ত ধ্বংসাবশেষকে বায়ুমণ্ডলে প্রেরণ করে সূর্যরশ্মি গ্রহে আসতে বাঁধা দেই এবং সম্পূর্ণ গ্রহে এর প্রভাব ফেলি ।
সৌরজগতে অগণিত গ্রহাণুর মধ্যে সবচেয়ে বৃহত্তম 2001 KX76 গ্রহাণুটি ছাড়াও আরো কয়েকটি বড় গ্রহাণু হচ্ছে সেরেস, ভেস্টা, প্যালাস, হাইজিয়া, ডেভিডা এবং ট্রোজান ।
গ্রহাণু বলয়ের একমাত্র বামন গ্রহ বা সেরেস ফার্দিনান্দিয়া গ্রহাণুসহ অন্যরাও সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে ।
কয়েকটি প্রকাণ্ড গ্রহাণুর চাঁদ রয়েছে ।
যদি কক্ষপথ থেকে ছিটকে পড়া ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টিকারী বিশাল কোনো গ্রহাণু বা আমার আগ্রাসী আঘাতে কিংবা সৌরজগতের সর্ববৃহৎ গ্যাসীয় দৈত্য বৃহস্পতি গ্রহের মহাকর্ষ বলের ক্ষিপ্র প্রভাবে পৃথিবী কক্ষচ্যুত হয়ে পড়ে তবে এর পরিণতি কি হবে, মানবজাতি টিকবে তো?
হয়তো আধুনিক বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায় পৃথিবীমুখী আসন্ন দৈত্যাকার গ্রহাণু বা আমার গতিপথকে পরিবর্তন করা যেতে পারে ।
তবুও পৃথিবীবাসী শঙ্কিত!
শেষ রক্ষা হবে কি?
কারণ, আমি চরম নৃশংস ও বিনাশী ।

ছবি: https://inews.zoombangla.com/  । 
* তথ্যসূত্র: আন্তর্জাল (The Internet)  ।

আমার প্রণয়িনীর চোখ সূর্যের মত নয়

 My mistress’ eyes are nothing like the sun (Sonnet 130)  --------  William Shakespeare , 1564 –1616 My mistress’ eyes are nothing like the ...