Monday, 26 June 2023

বিশ্বের গভীরতম গিরিখাতে এশিয়ার সবচেয়ে লম্বা গাছের আবাসস্থল

এ পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চিত্রটি উপর থেকে নিচ পর্যন্ত বিশাল একটি সাইপ্রেস গাছ (চিত্র : পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়) ।



চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে সাইপ্রেস গাছের একটি ত্রিমাত্রিক (3D) চিত্র, (চিত্র: পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়) ।


সম্প্রতি চীনা বিজ্ঞানীরা বিশ্বের গভীরতম গিরিখাতে এশিয়ার সবচেয়ে লম্বা গাছের আবাসস্থল খুঁজে পেয়েছেন ৷ ৩৩৫ ফুট (১০২ মিটার) উচ্চতার নতুন আবিষ্কৃত এক বিশাল সাইপ্রেস গাছ (Cypress tree) চীনের তিব্বত অঞ্চলের একটি জঙ্গলে পাওয়া গিয়েছে, যেটি স্ট্যাচু অফ লিবার্টি (Statue of Liberty) থেকেও উচ্চ হয়ে উঠেছে । এটি একটি সরলবর্গীয় চিরহরিৎ বৃক্ষ । চীনে আবিষ্কৃত সাইপ্রেস গাছটি এশিয়ার সবচেয়ে লম্বা গাছ । এ আশ্চর্যজনক গাছটি বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গাছ বলেও বিশ্বাস করা হয় । বিস্ময়কর যে, এ উচ্চতায় গাছটি স্ট্যাচু অফ লিবার্টির (৩০৫ ফুট বা ৯৩ মিটার) চেয়েও উঁচু । চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক বিবৃতি অনুসারে জানা যায় যে, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষক বা অনুসন্ধানিক দল গত মে মাসে অতিকায় সাইপ্রেস গাছটি হিমালয়ের উত্তর দিকে সুউচ্চ ‘পৃথিবীর ছাদ’ খ্যাত তিব্বত মালভূমিতে অবস্থিত চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের নিইংচি শহরের (Nyingchi City) বোমে বিভাগ বা জেলার (Bome County) ইয়ারলুং জাংবো গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন জাতীয় প্রকৃতি সংরক্ষিত (Yarlung Zangbo Grand Canyon National Nature Reserve) ভূমিতে আবিষ্কার করে । এ স্থানটি বিশ্বের গভীরতম স্থলজ গিরিখাত বলে মনে করা হয় । কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে ইয়ারলুং জাংবো নদী দ্বারা এটি গঠিত হয়েছে । যেখানে প্রকৃতি সংরক্ষণের গড় গভীরতা ১৬০০০ ফুট এবং সর্বোচ্চ গভীরতা ১৯৭১৪ ফুট । এ ঘন বনাঞ্চল থেকে গাছের উচ্চতা অনুমান করা সহজ ছিল না এবং উপত্যকায় অবস্থানের কারণে এ গাছের উচ্চতা এক নজরে বোঝা খুব কঠিন । জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তিব্বতের বনভূমি সবচেয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে একটি । এ কারণেই গবেষকরা এখন এ অঞ্চলে উদ্ভিদ জীববৈচিত্র্যের একটি বিশদ গবেষণা পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন । এ সমস্ত লম্বা গাছ একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ভাগ করে । এগুলো সবই নিইংচি শহরের মধ্যে বিশেষত মেডগ কাউন্টি (Medog County), জায়ু কাউন্টি (Zayu County) এবং বোমে কাউন্টিতে (Bome County) আবিষ্কৃত হয়েছে । দেশের এ অঞ্চলে প্রচুর সংখ্যক বিশালাকার গাছ রয়েছে । সাইপ্রেস গাছটি কোন প্রজাতির অন্তর্গত তা স্পষ্ট নয়, যদিও চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত যে এটি হয় হিমালয়ান সাইপ্রেস (Himalayan cypress, বৈজ্ঞানিক নাম: Cupressus torulosa) কিংবা একটি তিব্বতি সাইপ্রেস (Tibetan cypress, বৈজ্ঞানিক নাম: Cupressus gigantea) প্রজাতি ৷ হিমালয় এবং তিব্বতীয় সাইপ্রেস প্রজাতিগুলো বন্য অঞ্চলে বিরল প্রজাতি এবং মাত্র কয়েকটি ইয়ারলুং জাংবো গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন জাতীয় প্রকৃতি সংরক্ষিত ভূমিতে পাওয়া যায় । এ গাছগুলো চীনের প্রথম শ্রেণীর সংরক্ষিত উদ্ভিদ প্রজাতির অন্তর্গত । রাষ্ট্র পরিচালিত চীনা প্রকাশনা পিপলস ডেইলি অনলাইন অনুসারে গাছটির ব্যাস হচ্ছে ৯.৬ ফুট (২.৯ মিটার) । এটি আবিষ্কারের আগে এশিয়ার সবচেয়ে লম্বা গাছটি ছিল ৩৩১ ফুট লম্বা (১০০.৮ মিটার) হলুদ মেরান্টি (Yellow Meranti, বৈজ্ঞানিক নাম: Shorea faguetiana), যেটি মালয়েশিয়ার সাবাহ (Sabah) এর ড্যানুম উপত্যকা সংরক্ষিত এলাকায় (Danum Valley Conservation Area) অবস্থিত । তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের একটি অনন্য বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem) রয়েছে যা ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে । উল্লেখ্য যে: বাস্তুতন্ত্র হচ্ছে জৈব, অজৈব পদার্থ ও বিভিন্ন জীবসমন্বিত এমন প্রাকৃতিক একক যেখানে বিভিন্ন জীবসমষ্টি পরস্পরের সাথে এবং তাদের পারিপার্শ্বিক জৈব ও অজৈব উপাদানের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে একটি জীবনধারা গড়ে তোলে । যাইহোক, এলাকাটি বিশেষ করে নিইংচি শহর সম্প্রতি উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতকে রক্ষা করার জন্য সংরক্ষণ প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে । বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এলাকার পরিবেশগত বৈচিত্র্যকে আরো ভালোভাবে বুঝতে এবং পরিবেশগত সুরক্ষা প্রচেষ্টায় সাহায্য করার জন্য এ অঞ্চলে লম্বা গাছের নথিভুক্ত করেছেন । গত বছরের মে মাসে গবেষক দলটি দক্ষিণ-পশ্চিম চীনে ২৭২ ফুট লম্বা (৮৩ মিটার) প্রাচীনতম একটি ফার গাছ (Fir tree) খুঁজে পেয়েছিল, যেটিকে তারা প্রাথমিকভাবে বিশ্বাস করেছিলেন যে এটিই চীনের বৃহত্তম গাছ । এছাড়াও দলটি এক মাস আগে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের আবহাওয়া প্রতিকূল ও বিপদসঙ্কুল মেডগ বিভাগ বা জেলাতে (Medog County) ২৫২ ফুট (৭৭ মিটার) উচ্চতার আরেকটি গাছ উদ্ঘাটিত বা উন্মোচন করেছিল । এ বছর গবেষকরা তাদের জরিপ অব্যাহত রেখে ড্রোন, লেজার এবং রাডার সরঞ্জাম ব্যবহার করে এলাকার গাছের মানচিত্র তৈরি করেন এবং মাটি থেকে তাদের উচ্চতা চিহ্নিত করেছেন । কয়েকদিনের মাঠ জরিপের পর দৈত্যাকার সাইপ্রেস গাছটি পাওয়া গেছে ৷ তারা ড্রোন (Drone) ব্যবহার করে একটি থ্রিডি লেজার স্ক্যানার (3D laser scanner) এবং লিডার প্রযুক্তি (Lidar technology) দ্বারা যা দূরত্ব পরিমাপ প্রদান করতে হালকা মরীচি বা রশ্মি (Beam) ব্যবহার করেন । গবেষক দলটি সঠিক মাত্রা প্রদান করে এ বিশাল গাছের একটি থ্রিডি মডেল তৈরি করেছে । এটি ব্যবহার করে তারা নিশ্চিত করেছেন যে, এটিই এশিয়ার সবচেয়ে লম্বা গাছ । ক্রিমানা ফর্মটিও (Krimana form) প্রকৃত গাছের সঠিক মাত্রা অনুসরণ করে প্রস্তুত করা হয় । গবেষকরা আশা করছেন যে, এ ত্রিমাত্রিক মডেল তাদের একই প্রজাতির অন্যান্য গাছ সম্পর্কে আরো বুঝতে সাহায্য করবে । পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের রিমোট সেন্সিং ইনস্টিটিউটের (Institute of Remote Sensing) অধ্যাপক গুও কিংহুয়া (Guo Qinghua) রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমসকে বলেছেন যে, এ গাছের বিশেষত্ব হচ্ছে এর সহায়ক শিকড় সম্পূর্ণরূপে মাটির নিচে থাকে না । অনেক বিরল উদ্ভিদ প্রজাতিও ছড়িয়ে থাকা শিকড়ের নিচে বাস করে । গাছটির একটি জটিল শাখা ব্যবস্থাও রয়েছে যা “কিছু বিপন্ন উদ্ভিদ এবং প্রাণীদের জন্য আদর্শ স্বল্প জলবায়ু এবং স্বাভাবিক আবাসস্থল” প্রদান করে । বর্তমানে ৩৮১ ফুট (১১৬ মিটার) উচ্চতার বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা উপকূলীয় রেডউড (Coastal redwood, বৈজ্ঞানিক নাম: Sequoia sempervirens) গাছটির অবস্থান হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ার রেডউড ন্যাশনাল পার্কে । এ প্রাচীন গাছটি ৬০০ থেকে ৮০০ বছরের মধ্যে পুরোনো বলে মনে করা হয় এবং গ্রীক পৌরাণিক কাহিনীতে টাইটানদের একজনের নাম অনুসারে এর ডাকনাম হাইপেরিয়ন (Hyperion), এটি ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে আবিষ্কৃত হয়েছে । গত বছর ইউ. এস. পার্ক সার্ভিস (U.S. Park Service) হাইপারিয়নে জনসাধারণের প্রবেশাধিকার সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয় কারণ দর্শনার্থীদেরকে গাছে আরোহণ এবং এলাকায় বর্জ্য ফেলতে দেখা যায়, ফলে আশেপাশের নিচের পুষ্টি বা ক্রমবিকাশকে (Undergrowth) ক্ষতিগ্রস্ত করে । বিশ্বের তৃতীয় উচ্চতম গাছ হওয়ার রেকর্ড মালয়েশিয়ার ৩৩১ ফুট (১০০.৮ মিটার) হলুদ মেরান্টি গাছটি । চতুর্থ স্থান অস্ট্রেলিয়ার পর্বত ছাইকে (Mountain Ash) দেয়া হয়েছে যার পরিমাপ ৩২৯.৭ ফুট (১০০.৫ মিটার) । বিশ্বের পঞ্চম স্থানের অধিকারী গাছটি হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের প্রেইরি ক্রিক রেডউডস স্টেট পার্কের ৩২৯ ফুট (১০০.২ মিটার) Sitka spruce (Picea sitchensis) । এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের রাজ্য ওরেগন এর ব্রুমিট ক্রিক, কুস কাউন্টিতে ৩২৭ ফুট (৯৯.৭ মিটার) Coast Douglas-fir (Pseudotsuga menziesii var. menziesii) গাছটি বিশ্বের ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে । সাইপ্রেস বলতে ১২ প্রজাতির আলংকারিক এবং কাঠ চিরসবুজ শঙ্কুযুক্ত উদ্ভিদের যে কোনো একটিকে বোঝায়, যা Cupressus গণের অন্তর্গত । এগুলো এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা বিশেষত উষ্ণ নাতিশীতোষ্ণ এবং উপক্রান্তীয় অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃতি লাভ করেছে । সাইপ্রেস গাছগুলো তাদের অদ্ভুত এবং অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিচিত । এ গাছগুলো মানুষ এবং পরিবেশের জন্য বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করে । মাথাব্যথা, প্রদাহ এবং কাশি চিকিৎসার জন্য ঐতিহ্যগত ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয় । যেহেতু এগুলোতে একটি সক্রিয় উপাদান রয়েছে যা উইপোকা বিকর্ষণ করে, তাই এগুলো পোকামাকড় তাড়ানোর বৈশিষ্ট্যযুক্ত পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয় । সর্বোপরি সাইপ্রাস গাছগুলো নির্মাণ সামগ্রীর একটি ভালো উৎস হিসেবে বিবেচিত হয় । বিশেষ করে মেঝে, দরজা এবং স্থাপত্য কাঠের কাজ তৈরিতে । তারা ৫০ থেকে ১৫০ ফুট পর্যন্ত ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে এবং ১০০ থেকে ৬০০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় বাঁচতে পারে । দীর্ঘমেয়াদে গবেষকরা গিরিখাতের সাইপ্রাস গাছগুলোকে তাদের বৈশিষ্ট্য যেমন জনসংখ্যা, বন্টন ঘনত্ব এবং বয়স সম্পর্কে গবেষণা বা অধ্যয়ন করার জন্য নিরীক্ষণ করার পরিকল্পনা করেছেন । তারা ইয়ারলুং জাংবো গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের জীববৈচিত্র্য এবং অনাবিষ্কৃত গাছগুলো বিশ্লেষণ করতে আরো অনেকাংশে অন্বেষণ করার লক্ষ্য রাখে ।

তথ্যসূত্র: livescience.com (by science writer Lydia Smith),  https://www.sciencetimes.com/ , উইকিপিডিয়া ৷  ছবি: https://www.livescience.com/


Monday, 19 June 2023

জুনো মহাকাশযান বৃহস্পতির ঘূর্ণিঝড়ে বজ্রপাতের আভা ধারণ করেছে



NASA এর জুনো মহাকাশযান আমাদের অদ্ভুত সৌরজগতের একটি প্রাণবন্ত চিত্র ধারণ করেছে  ৷ এটি বৃহস্পতি গ্রহের ঝড়ের ভিতরে বজ্রপাতের গগনচারী সৌন্দর্যের অনুপম দৃশ্য ধারণ করে আরেকটি অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জন করেছে । যা বৃহস্পতি-প্রদক্ষিণ মিশনের একটি মাইল ফলক । বৃহস্পতির উত্তর মেরুর কাছে ঘূর্ণায়মান ঘূর্ণি ঝড় বা ঘূর্ণিবাত্যার মধ্যে বজ্রপাতের চমক বা আভা দেখাচ্ছে । এটি সম্ভবত বাদামী অ্যামোনিয়া-জল দ্রবণযুক্ত মেঘ থেকে উদ্ভূত হয়েছে, যা পৃথিবীতে ফুঁপানো জলীয় বাষ্পের মেঘের চেয়ে কিছুটা আলাদা । পৃথিবীর মতো এ মেঘগুলোর মধ্যে প্রায়শই বজ্রপাত হয় এবং বেশিরভাগ বজ্রপাত প্রধানত মেরুগুলোর কাছাকাছি দেখা যায় । পৃথিবীতে বজ্রপাতগুলো জলের মেঘ থেকে উদ্ভূত হয় এবং প্রায়শই বিষুবরেখার কাছাকাছি ঘটে । 

বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের লালিত বাসনা যে, সূর্য থেকে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন মাইল দূরে থাকা আমাদের সৌরজগতের সর্ববৃহৎ গ্রহ বৃহস্পতি সম্পর্কে এবং তার হীমশীতল চাঁদে নোনা জলের সমুদ্র, জীবন বা প্রাণের অস্তিত্ব ও বাসযোগ্যতার লক্ষণগুলো অন্বেষণ করা ৷ বেশ কিছুদিন যাবৎ বিজ্ঞানীদের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে চাঁদে প্রাণের অস্তিত্বের পাশাপাশি বাসযোগ্যতার বিষয়টি ৷ পৃথিবী একটি অপেক্ষাকৃত ছোট পাথুরে গ্রহ । কিন্তু বৃহস্পতি বিশাল গ্রহ, যার নাম হচ্ছে একজন প্রাচীন রোমান দেবতার নাম । এ গ্যাস দৈত্য এতোটাই বিশাল যে আমাদের সৌরজগতের অন্য সমস্ত গ্রহগুলো এর ভিতরে সুন্দরভাবে মানানসই করতে পারে —  ১৩০০ টিরও বেশি পৃথিবী সহ । গ্যাস দানব বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুন গ্রহ চারটিকে একত্রে 'জোভিয়ান গ্রহ' (Jovian planet ) বলে । বৃহস্পতি গ্রহকে প্রদক্ষিণকারী ৯৫টি উপগ্রহ বা চাঁদের মধ্যে চারটি হচ্ছে গ্যালিলীয় চাঁদ যেমন: ইউরোপা (Europa), ক্যালিস্টো (Callisto), আইও (Io) এবং গ্যানিমিড (Ganymede) –  যেগুলোর কোনোটি বরফ পৃষ্ঠের নিচে গভীর তরল জলের মহাসাগরকে আশ্রয় দেয়, যেখানে সামুদ্রিক প্রাণ বা জীবন থাকতে পারে । ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ এবং দার্শনিক গ্যালিলিও গ্যালিলি প্রথম এ চারটি উপগ্রহ বা চাঁদকে আবিষ্কার করেন বলে তার নামানুসারে চাঁদগুলোর নামকরণ হয় গ্যালিলীয় চাঁদ । বৃহস্পতি প্রধানত হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের সমন্বয়ে গঠিত এবং সামান্য পরিমাণ অন্যান্য গ্যাস । ফিতে (Stripes) এবং কয়েকটি ঘূর্ণিঝড় বৃহস্পতির রঙিন চেহারায় প্রাধান্য পায় । এটি সূর্য থেকে পঞ্চম গ্রহ, যার ব্যাস প্রায় ১৪৩০০০ কিলোমিটার । বৃহস্পতি গ্রহ বিখ্যাতভাবে প্রচণ্ড জটিকাপূর্ণ । এর মহা লাল বিন্দু (Great Red Spot) পৃথিবীর চেয়েও বিশাল বড় একটি ঘূর্ণি, যা শতাব্দী কাল ধরে ঘুরছে । হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম প্রধান বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে জল ও অ্যামোনিয়ার ঝড়ো মেঘগুলো ঘূর্ণায়মান হয় । যাই হোক, সেই বৃহস্পতি গ্রহেই জুনো মহাকাশযানটি আশ্চর্যজনক এক আবিষ্কার করেছে । মহাকাশযানটি ৫০ বার বৃহস্পতির চারপাশে ঘুরেছে । এখন এটি বৃহস্পতির ৫১তম মিশনে রয়েছে, যার ফলে আগামী জুলাই, অক্টোবর এবং ডিসেম্বরের শেষের দিকে বৃহস্পতির আইও (Io) চাঁদের সবচেয়ে কাছ দিয়ে অতিক্রম করবে এবং পরের বছরের ফেব্রুয়ারিতে আইও চাঁদের সাথে যমজ উড়ান (Twin flyby) মুখোমুখি হবে ৷ এ সমস্ত উড়ানগুলো পরম বিস্ময়কর আইও চাঁদের আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপের দর্শনীয় দৃশ্য প্রদান করছে বা করবে ৷ মহাকাশযানটি জোভিয়ান চাঁদ আইও এবং এর অগ্ন্যুৎপাত হওয়া আগ্নেয়গিরি থেকে মাত্র ৯৩০ মাইল দূরে চলে যাবে । 

বৃহস্পতির বজ্রপাত পৃথিবীর মতোই আশ্চর্যজনকভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ । একটি নতুন সমীক্ষায় দেখা গেছে যে বজ্রপাত জীবনকে চমকে দেয় এবং বৃহস্পতিতে একইভাবে বিবর্তিত হয় যেভাবে এটি পৃথিবীতে ঘটে । জোভিয়ান বজ্রপাত পৃথিবীর মতো একই "ধাপ-ভিত্তিক" (Step-wise) উপায়ে ঘটে । দুটি গ্রহ তাদের আকার ও গঠনে বিপরীত হওয়া সত্ত্বেও বৃহস্পতি এবং পৃথিবীতে বজ্রপাত প্রক্রিয়ায় গ্রহ দুটিতে বজ্রপাতের হার একই । যদিও বৃহস্পতিতে বজ্রপাতের বন্টন পৃথিবীর থেকে আলাদা । তবুও, উভয়ই একই ধরণের বৈদ্যুতিক ঝড়ের অতিথিসেবক বা স্বাগতিক । NASA এর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন যে, এ ঘূর্ণিঝড়ের মেঘে আরো বজ্রপাত দেখা যাবে । আসন্ন মাসগুলোতে জুনোর কক্ষপথগুলো বারবার এটিকে বৃহস্পতির কাছাকাছি নিয়ে যাবে কারণ মহাকাশযানটি দৈত্য গ্রহের রাতের পাশ দিয়ে চলে যাবে, যা জুনো মহাকাশযানের বিজ্ঞান যন্ত্রের অনুচরবৃন্দকে বজ্রপাত দৃশ্য ধারণের সাক্ষী হওয়ার জন্য আরো বেশি অতুলনীয় সুযোগ প্রদান করবে । বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলের রহস্যময় কার্যকারিতা সম্পর্কে অমূল্য অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করবে । বজ্রপাত পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাকৃতিকভাবে ঘটে যাওয়া বৈদ্যুতিক উৎস । চেক একাডেমি অফ সায়েন্সেস (Czech Academy of Sciences) এর গ্রহ বিজ্ঞানী ইভানা কোলমাসোভা (Ivana Kolmasova) বলেন, "বজ্রপাত হচ্ছে একটি বৈদ্যুতিক নিঃসরণ, যা বজ্রঝড়ের মধ্যে শুরু হয় । মেঘের অভ্যন্তরে থাকা বরফ এবং জলের কণা সংঘর্ষের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক বা তড়িৎ আধান (Charge) হয়ে যায় এবং একই মেরুত্বের আধানে কণার স্তর তৈরি করে । এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি বিশাল বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নির্গত করতে পারে । যদিও ব্যাখ্যাটি কিছুটা সরলীকৃত, কারণ বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নন যে, বজ্রপাতের ভিতরে ঠিক কি ঘটছে ।" ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে NASA এর ভয়েজার ০১ মহাকাশযান দ্বারা বৃহস্পতি গ্রহে বজ্রপাতের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছিল যা শ্রবণযোগ্য ফ্রিকোয়েন্সিতে টেলটালে রেডিও নির্গমনের (Telltale radio emissions) সময় রেকর্ড করা হয় যখন এটি সৌরজগতের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল । জুনো মহাকাশযানের তরঙ্গ যন্ত্রটি তার পূর্বসূরীদের তুলনায় দশ গুণ বেশি রেডিও নির্গমন সংগ্রহ করেছে । এটি এক মিলিসেকেন্ডের কাছাকাছি দ্বারা পৃথক করা বজ্রপাতের সংকেতগুলোকে তুলে ধরে । বিজ্ঞানী ইভানা কোলমাসোভা আরো বলেন, সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং এবং কাজের সবচেয়ে সময়সাপেক্ষ অংশ ছিল তরঙ্গ যন্ত্রের রেকর্ডে বজ্রপাতের সংকেত অনুসন্ধান করা । বৃহস্পতি গ্রহে বজ্রপাতের এমন একটি ধাপ কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার মিটার দীর্ঘ যে কোনো জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে পারে । যদিও বিদ্যমান জুনো মহাকাশযানের তথ্য দিয়ে নিশ্চিত করা কঠিন । যখন পৃথিবী এবং বৃহস্পতি গ্রহে একইভাবে বজ্রপাত হয়, যেখানে এ ঘটনাগুলো ঘটে উভয় জগতেই সম্পূর্ণ আলাদা । গ্যাস দৈত্যের উপর, বজ্রঝড়ের একটি বড় অংশ মধ্য অক্ষাংশ ও উচ্চতর এবং মেরু অঞ্চলে পাওয়া গেছে । তারা বিশাল গ্রহের বিষুবরেখায় অনুপস্থিত, যা ঘরে ফিরে বজ্রঝড়ের বিপরীত, যেখানে বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলগুলো সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতের বিবরণ করে ৷ পৃথিবীতে মেরুগুলোর কাছাকাছি আমাদের প্রায় কোনো বজ্রপাতের কার্যকলাপ নেই । এর মানে হচ্ছে যে, জোভিয়ান এবং স্থলজ বা পার্থিব বজ্র মেঘের গঠনের শর্তগুলো সম্ভবত খুব আলাদা । বৃহস্পতিতে বজ্রপাত একপাশে ছড়িয়ে পড়ে, উত্তর গোলার্ধে এর দক্ষিণ অর্ধেকের চেয়ে বেশি আঘাত হানে । এর কারণ অবশ্য এখনো স্পষ্ট নয় । আমরা এটিও জানি না, কেন আমরা এখনো পর্যন্ত মহা লাল বিন্দু (Great Red Spot) থেকে কোনো বজ্রপাত দেখতে পাইনি ।'' এ গবেষণাটি গত ২৩শে মে ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে নেচার কমিউনিকেশন (Nature Communication) সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বর্ণিত হয়েছে । সৌরজগতের অন্যান্য গ্যাস গ্রহ যেমন: শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুনেও বজ্রপাত দেখা যায় । পাথুরে গ্রহ শুক্রের মেঘেও বজ্রপাতের কিছু প্রমাণ রয়েছে, যদিও এটি এখনো বিতর্কের বিষয় । পৃথিবীতে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলগুলো সবচেয়ে সক্রিয় । বেশিরভাগ জোভিয়ান বজ্রপাত (Jovian lightning) মধ্য-অক্ষাংশে এবং মেরু অঞ্চলেও ঘটে । আমাদের পৃথিবীর মেরুগুলোর কাছাকাছি কোনো বজ্রপাতের কার্যকলাপ নেই । এর অর্থ হচ্ছে যে, গঠনের জন্য শর্তগুলো জোভিয়ান এবং স্থলজ বা পার্থিব বজ্রপাত সম্ভবত খুব আলাদা । অপটিক্যাল পরিমাপের উপর ভিত্তি করে বজ্রপাতের শক্তি তুলনা করার কিছু প্রচেষ্টা করা হয়েছিল এবং এর উপসংহারে পৌঁছেছিল যে, বৃহস্পতিতে বজ্রপাত সবচেয়ে শক্তিশালী স্থলজ বজ্রপাতের সাথে তুলনীয় হতে পারে । পৃথিবীতে বজ্রপাতের উৎপত্তি হয় উত্তাল মেঘের অভ্যন্তরে । যার ঊর্ধ্বমুখী বাতাস জলের ফোঁটা তুলে বরফে পরিণত করে । যখন নিম্নগামী বাতাস সেই হিমশীতল ব্লবগুলোকে (Blob) মেঘের নিচে ঠেলে দেয় । যেখানে পতিত বরফ ক্রমবর্ধমান জলের ফোঁটাগুলোর সাথে মিলিত হয়, ইলেকট্রনগুলো পূর্বের থেকে ছিনিয়ে নেয় । যার ফলে একটি মেঘ তৈরি হয়, যেটির ভিত্তি ঋণাত্মক বৈদ্যুতিক আধানযুক্ত ও শীর্ষটি ধনাত্মক এবং বায়ু নিরোধক দ্বারা পৃথক হয় । যখন এ বৈদ্যুতিক আধানগুলো তৈরি হয়, তখন সুপরিচিত বজ্রপাত চমক আঘাত করে একটি মেঘের মধ্যে বা কখনো কখনো মেঘের ভিত্তি থেকে মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে । যদিও পৃথিবীতে বজ্রপাতকে দূর থেকে লম্বা, মসৃণ আভার মতো দেখায় । গবেষকরা জানান যে, বিদ্যুতের প্রতিটি স্ফুলিঙ্গ প্রকৃতপক্ষে স্বতন্ত্র পদক্ষেপ দ্বারা তৈরি । প্রতিটি পদক্ষেপ বিচ্ছিন্ন রেডিও নির্গমনকে বের করে দেয়, যার সনাক্তকরণ প্রায়শই বজ্র মেঘের ভিতরে কি ঘটছে তা বোঝার একমাত্র উপায় । গ্রহ বিজ্ঞানী Ivana Kolmasova বলেন, "এটি স্পষ্ট ছিল না যে এ ধরনের পদক্ষেপের প্রক্রিয়া জোভিয়ান মেঘেও ঘটে কি না ।" 

জুনো মহাকাশযানটি ৩০শে ডিসেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দে বৃহস্পতির ৩১তম কাছাকাছি উড়ান (flyby) সফলভাবে সম্পন্ন করার সময় উত্তর মেরুর কাছে বজ্রপাত থেকে নির্গত আলোকিত আভার মন্ত্রমুগ্ধকর দৃশ্যটি ধারণ করেছিল । ২০২২ খ্রিস্টাব্দে নাগরিক বিজ্ঞানী কেভিন এম. গিল (Kevin M. Gill) মহাকাশযানে থাকা জুনোক্যাম (JunoCam) যন্ত্রের কাঁচা বা অশোধিত তথ্য (Raw data) থেকে ছবিটি প্রক্রিয়া করেছেন । কাঁচা চিত্রটি তোলার সময় জুনো মহাকাশযান বৃহস্পতির মেঘের শীর্ষ থেকে প্রায় ১৯৯০০ মাইল (৩২০০০ কিলোমিটার) উপরে ছিল, প্রায় ৭৮ ডিগ্রি অক্ষাংশে মহাকাশযানটি গ্রহের কাছে আসার সময় । এ চিত্তাকর্ষক আবিষ্কারটি আমাদের প্রতিবেশী গ্যাস দৈত্য গ্রহে ঘটতে থাকা স্বর্গীয় ঘটনার উপর নতুন আলোকপাত করে এবং বৃহস্পতি গ্রহের বিশাল বিস্তৃতির মধ্যে লুকানো রহস্য উদঘাটনের জন্য কৌতূহলী মনকে ইঙ্গিত করে । জুনোক্যাম দ্বারা ধারণ করা কাঁচা ছবিগুলোকে অসাধারণ ইমেজ পণ্যগুলোতে অন্বেষণ এবং প্রক্রিয়াকরণের জন্য জনসাধারণের কাছে সুগম বা সহজগম্য করা হয়েছে । তথ্য ভাগ করে নেয়ার এ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিটি উৎসাহী এবং বিশেষজ্ঞদের একইভাবে বৃহস্পতির রহস্যময় বায়ুমণ্ডলের জটিলতাগুলো অনুসন্ধান করার পাশাপাশি মহাজাগতিক এ প্রতিবেশীর চলমান বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে অবদান রাখতে সাহায্য করবে । জুনো মিশন (Juno Mission) দ্বারা বৃহস্পতির বজ্রপাতের ঝড় পর্যবেক্ষণ এবং নথিভুক্ত করার ক্ষমতা আমাদের সৌরজগতের বিস্ময়কর এবং গতিশীল প্রকৃতির একটি আভাস দেয় । মহাজাগতিক বৃহত্তম গ্রহের চারপাশের রহস্য উন্মোচন করে এবং অন্বেষণের জন্য নতুন দরজা খুলে দেয় । মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের বুঝতে (জ্ঞানের পরিধিকে) সমৃদ্ধ করে যাকে আমরা বাড়ি বলে থাকি । উল্লেখ্য যে: জুনো মিশন হচ্ছে NASA এর একটি মহাকাশ অনুসন্ধান, যা বৃহস্পতি গ্রহকে প্রদক্ষিণ করছে । এটির উদ্দেশ্য হচ্ছে বৃহস্পতি গ্রহের উৎপত্তি ও গঠন, এর চাঁদ সম্পর্কে, গ্রহে পাথুরে কেন্দ্রস্থল আছে কি-না, গ্রহের বায়ুমণ্ডলে জলের পরিমাণ, ভর বিতরণ, মহা লাল বিন্দু, গভীর বাতাস, মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র, চৌম্বক ক্ষেত্র এবং মেরু চুম্বকমণ্ডল ইত্যাদি পরিমাপ করা । জুনো মিশনটি NASA এর New Frontiers Program এর অংশ, যেটি ওয়াশিংটনে এজেন্সির বিজ্ঞান মিশন অধিদপ্তরের (Science Mission Directorate) জন্য আলাবামার হান্টসভিলে নাসা’র Marshall Space Flight Center এ পরিচালিত হয় ৷ যুক্তরাষ্ট্রের (ডেনভার) মহাকাশ, প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা বিষয়ক কোম্পানি লকহিড মার্টিন স্পেস (Lockheed Martin Space) মহাকাশযান তৈরি এবং পরিচালনা করে । 

তথ্যসূত্র:  https://www.nasa.gov/ ,  https://www.cbc.ca/   ,  https://www.space.com/  ,  আন্তর্জাল (The Internet) ।   ছবি: https://www.nasa.gov/

Tuesday, 13 June 2023

এশিয়ার শীর্ষ ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় বাংলাদেশের দু'জন নারী

                                                                          Senjuti Saha


                                                    Dr. Gawsia Wahidunnessa Chowdhury


গবেষণায় অনবদ্য অবদান রাখার জন্য সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি বিষয়ক 'Asian Scientist' সাময়িকীতে এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশের দু'জন নারী বিজ্ঞানী । Asia's Top 100 🌏 । জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহ চক্র, কাঠামোগত ভূতত্ত্ব অনুসন্ধান এবং মহাকাশ গবেষণা ইত্যাদির মতো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা মোকাবিলায় অবদান রাখা বিশ্বের নানা গবেষক এবং উদ্ভাবকদের বেছে নেয়া হয়েছে । গত ১১ই জুন ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে এ তালিকা প্রকাশ করা হয় । এদের মধ্যে একজন হচ্ছেন সেঁজুতি সাহা (Senjuti Saha) এবং অন্যজন অধ্যাপক ডঃ গাওসিয়া ওয়াহিদুন্নেছা চৌধুরী (Dr. Gawsia Wahidunnessa Chowdhury) । সেঁজুতি সাহা 'Life Science' এবং ডঃ গাওসিয়া ওয়াহিদুন্নেছা চৌধুরী টেকসই জলবায়ুর ‘Sustainability’ এর ক্ষেত্রে অবদানের জন্য মর্যাদাপূর্ণ এ তালিকায় স্থান পেয়েছেন । সত্যিই, বিশ্বের বুকে নারীদের অগ্রযাত্রার জয়গান । তারা দু'জনই তাদের কর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য এক বিরল সম্মান বয়ে এনেছেন । আমরা গর্বিত । তাদেরকে অভিনন্দন! তারা আমাদের অনুপ্রেরণা ।

বাংলাদেশের উজ্জ্বল নক্ষত্র, তরুণ প্রতিভাময়ী অণুজীব বিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহা ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র (WHO) একজন পরামর্শক । তিনিই প্রথম বাংলাদেশি বিজ্ঞানী হিসেবে সংস্থাটির বিশ্বব্যাপী পোলিও নির্মূল কর্মোদ্যোগ সম্পর্কিত The Polio Transition Independent Monitoring Board (TIMB) এর একজন সদস্য । উল্লেখ্য যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র বৈশ্বিক পোলিও নির্মূল উদ্যোগ (Global Polio Eradication Initiative / GPEI) সম্পর্কিত বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে সারা পৃথিবীর খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে The Independent Monitoring Board (IMB) গঠিত ৷ এটি মূলত বিশ্বব্যাপী পোলিও রোগ বিস্তার সম্পর্কে তথ্য, পোলিওভাইরাস সনাক্তকরণ, রোগ প্রতিরোধ বা নির্মূলকরণ, স্বাধীন পর্যবেক্ষণ, অভীষ্ট লক্ষ্যপূরণ, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং পোলিও মুক্ত বিশ্ব অর্জনের জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে থাকে ৷ এছাড়া বৈশ্বিকভাবে পোলিও মহামারীর উপর ভিত্তি করে এটি রোধকল্পে মূল মাইলফলকের দিকে অগ্রগতির মূল্যায়ন করে ৷ মাইলফলক যদি At risk, Off track বা Missed হয়েছে বলে দেখা যায় তবে সংক্রামিত স্থানকে কেন্দ্র করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বাস্তবায়নকারী অংশীদার অথবা দাতা সংস্থাগুলোকে দিক নির্দেশনাসহ প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক কর্ম পরিকল্পনা (আর্থিক দিকও হতে পারে) এবং পথ প্রদর্শনের মাধ্যমে এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকে । এছাড়া অন্যান্য কার্যক্রমের উপর তথ্যের ভিত্তিতে গৃহীত বা সম্পাদিত কার্যের গুণমান মূল্যায়ন করে সঠিক পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে । ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদে (World Health Assembly) পোলিও সম্পর্কিত বিল অনুমোদনের পর থেকে ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’ পোলিও সংক্রমণ পরিস্থিতি ও বিশ্বের দেশগুলোর জনস্বাস্থ্যের অবকাঠামো ব্যবস্থা সুরক্ষিত করা বা এটিকে টিকিয়ে রাখতে বিশেষ করে অপরিহার্য টিকাদান, বৃহত্তর সংক্রামক রোগের নজরদারি, পর্যবেক্ষণ, সতর্কতা এবং জরুরি প্রতিক্রিয়ার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে । আণবিক জিনতত্ত্বের গবেষক সেঁজুতি সাহা মনিটরিং বোর্ডের অন্যান্য সদস্যদের সাথে তিনি ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’কে পোলিও নির্মূল প্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে মহাপরিচালক পর্যায়ে পরামর্শ দিয়ে থাকেন । এতে করে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে নানা সংক্রামক ব্যাধি রোধকল্পে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য এক তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফল বয়ে নিয়ে আসছে, যা এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে । সেঁজুতি সাহা মূলত Microbiology, Epidemiology এবং Global Health নিয়ে গবেষণা করেন । ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে বৈশ্বিকভাবে শ্বাসযন্ত্রের সংক্রামক রোগ করোনা ভাইরাস (Covid-19) ছড়িয়ে পড়ার পর সেঁজুতি সাহা তার বাবার সাথে যৌথভাবে বাংলাদেশে বেসরকারি শিশু স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (Child Health Research Foundation / CHRF) গবেষণাগারে প্রথমবারের মতো তীব্র শ্বাসযন্ত্রীয় রোগলক্ষণসমষ্টি সৃষ্টিকারী নভেল করোনাভাইরাসের (SARS-CoV-2) জিন-নকশা বা বিন্যাসক্রমের (Genome sequencing) কাজে গবেষকদের একটি দলকে নেতৃত্ব দিয়ে সফলভাবে শেষ করেছেন । CHRF এর এ প্রকল্পটিকে স্বাস্থ্য পরিষেবা মহাপরিদপ্তর (Directorate General of Health Services), রোগবিস্তার বা মহামারী-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান (Institute of Epidemiology), রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা (Disease Control and Research), বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন (Bill and Melinda Gates Foundation) এবং চ্যান জাকারবার্গ বায়ো হাব (Chan Zuckerberg Biohub) থেকে সহায়তা করে । সেঁজুতি সাহার বাবা অধ্যাপক ডাঃ সমীর কুমার সাহা একজন অণুজীব বিজ্ঞানী ৷ তিনি বাংলাদেশের শিশুরোগ চিকিৎসা সংক্রান্ত বৃহত্তম হাসপাতাল ঢাকা শিশু হাসপাতালের অনুজীববিজ্ঞান বা জীবার্ণুবিজ্ঞান (Microbiology) বিভাগের প্রধান এবং CHRF এর নির্বাহী পরিচালক । ডাঃ সমীর কুমার সাহা শিশুদের জন্য সরকারের গৃহীত টিকাদান কর্মসূচী, স্বাস্থ্যসেবায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগীতার পাশাপাশি CHRF কর্তৃক এ সকল রোগের টিকা ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিশুমৃত্যু হার কমিয়ে আনতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন । বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংক্রামক রোগ থেকে শিশুমৃত্যু হার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ডাঃ সমীর কুমার সাহা CHRF গড়ে তুলেছেন নিজ মেধা, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং পরম মমতায় । এখানে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে RSV সংক্রমণ এবং নিউমোনিয়া (Pneumonia) রোগ সম্পর্কে নানাবিদ গবেষণা চলছে । সেঁজুতি সাহা বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে একজন অণুজীব বিজ্ঞানী (Microbiologist) হিসেবে কাজ করছেন । Meningitis (মস্তিষ্কের সংক্রমণ) হচ্ছে মস্তিষ্কে এক ধরণের সংক্রমণ বা প্রদাহ এবং Pneumonia হচ্ছে ব্যাকটিরিয়া, ভাইরাস ও ছত্রাক দ্বারা মানবদেহের অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ফুসফুসকে সংক্রমণ করে ৷ ফলে ফুসফুসের বায়ু থলিতে (Alveoli) প্রদাহ সৃষ্টি করে এক প্রকার তরল বা পুঁজের সৃষ্টি হয় ৷ এতে করে আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাসে তীব্র কষ্ট এবং ব্যথা অনুভূত হয়, এমনকি মৃত্যুও ঘটে ৷ নিউমোনিয়া এবং মেনিনজাইটিস এ দু’টি মরণব্যাধি হচ্ছে শিশুমৃত্যুর বড় কারণ । ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে নবজাতক ও শিশুদের মধ্যে মেনিনজাইটিস রোগ বেড়ে গেলে সেঁজুতি সাহা শিশুদের জিনগত উপাদানগুলো বিশ্লেষণ করে এর রহস্য উন্মোচন করতে সক্ষম হন । তিনি আবিষ্কার করেন যে, মেনিনজাইটিসের প্রকোপ বৃদ্ধি পায় মশা এর দ্বারা ছড়িয়ে পড়া চিকুনগুনিয়া জ্বরের (Chikungunya fever) প্রাদুর্ভাবের কারণে । তিনি বিশ্বে প্রথম দেখান যে, চিকুনগুনিয়া ভাইরাস শিশুদের মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে ও বাংলাদেশী শিশুদের মেনিনজাইটিস রোগ সৃষ্টি করে । ভবিষ্যতে মেনিনজাইটিস এবং অন্যান্য মারাত্মক রোগের প্রাদুর্ভাব দ্রুত সমাধানের জন্য দেশকে সহায়তা করতে তিনি তখন থেকেই বাংলাদেশে একটি স্বল্প ব্যয়ে রোগ নির্ণয় সংক্রান্ত বিশেষ যন্ত্রপাতি শিশুস্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান CHRF এ স্থাপন করেন ৷ মেনিনজাইটিসের কারণে যে সমস্ত শিশুদেরকে দীর্ঘকালীন অক্ষমতা নিয়ে বাঁচতে হয়, তাদের জন্য সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি একজন সামাজিক কর্মী এবং অণুজীব বিজ্ঞানী হিসেবে ‘মেনিনজাইটিস’ নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন । সেঁজুতি সাহা Bangladesh International Tutorial থেকে তার বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে প্রথমে BSc ডিগ্রি, John Hopkins Bloomberg School এ জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানী (Public Health Scientist), কানাডায় প্রাণরসায়নে (Biochemistry) স্নাতক ডিগ্রি এবং পরবর্তীতে University of Toronto https://www.utoronto.ca/ থেকে আণবিক জীনতত্ত্ব বিষয়ে (Molecular Genetics) PhD ডিগ্রি অর্জন করেন । তিনি Visiting Post Doctoral Scholar এ পড়াশোনার আগে Stanford School Of Medicine Associate Faculty তে পড়াশোনা করেন । সেজুঁতি সাহা ২৩শে এপ্রিল ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন । তার মা ডাঃ সেতারুন্নাহার সেতারা একজন অণুজীব বিজ্ঞানী । তার ছোট ভাই সুদীপ্ত কুমার সাহা University of Toronto বিশ্ববিদ্যালয়ে Microbiology and Global Health বিষয়ে পড়াশোনা করছেন । বলতে গেলে একটি বিজ্ঞানী পরিবার ৷ ব্যক্তিগত জীবনে সেজুঁতি সাহা বিবাহিত এবং তার স্বামী যোগেশ হুদা (Yogesh Hooda) একজন ভারতীয় নাগরিক । যিনি Medical Research Council Laboratory of Molecular Biology (MRC LMB) তে এবং যুক্তরাজ্যে একজন প্রাণরসায়নবিদ (Biochemist) হিসেবে কাজ করছেন । ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে তারা বিয়ে করেন । সেজুঁতি সাহা ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে 'Bil And Melinda Gates Award' পুরস্কারে ভূষিত হন । সারাবিশ্বে যারা নিজেদের সৃষ্টিশীল প্রতিভার মাধ্যমে সমাজকে বদলে দিয়ে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে অবদান রেখে চলেছেন, তাদেরকে নিয়ে মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস 'Heroes in the field' শিরোনাম করে Blog লিখে থাকেন । বিল গেটস (Bill Gates) বাংলাদেশের অণুজীব বিজ্ঞানী অধ্যাপক ডাঃ সমীর কুমার সাহা এবং তার মেয়ে সেঁজুতি সাহার ভূয়সী প্রশংসা করে লিখেন যে: https://www.gatesnotes.com/The-Sahas-are-battling-global-health-inequity?WT.mc_id=20200114193000_RLMForum_BG-FB&WT.tsrc=BGFB&linkId=80625611 '' বাংলাদেশি এ বাবা-মেয়ে বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্যের গতিশীল এক জুটি । এক্ষেত্রে তারা সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তথ্য-উপাত্ত, রোগ নির্ণয়ের সর্বাধুনিক পদ্ধতি এবং সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে টিকাদান কর্মসূচীকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের নিম্ন আয়ের দেশগুলোর সাথে সম্পদশালী দেশগুলোর স্বাস্থ্যসেবার যে পার্থক্য রয়েছে যেখানে শিশু মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি এবং এ ধরণের পার্থক্য কমিয়ে আনতে তারা সেখানে স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহের ফাঁকগুলো বন্ধ করতে কাজ করছেন । Child Health Research Foundation (CHRF) এর কাজের বদৌলতে এবং শিশুদের জন্য বর্তমান সরকারের গৃহীত টিকাদান কর্মসূচীর পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে পাঁচ বছর বয়সের নিচে শিশুমৃত্যু হার কমেছে । ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশ এখন প্রায় ৯৮ শতাংশ টিকাদান কর্মসূচীর আওতায় এসেছে । তাদের কাজের জন্য ধন্যবাদ ৷ বাংলাদেশ যদি রোগ প্রতিরোধে আরো বেশি কিছু করতে পারে তাহলে বাংলাদেশ এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে, যেখানে সংক্রামক ব্যাধি খুব কম থাকবে এবং হাসপাতালের বিছানাগুলো এক সময় ফাঁকা থাকবে ৷ CHRF বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশুমৃত্যু হার হ্রাস করার ক্ষেত্রে সাহায্যকারী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান । তাদের এ মহৎ কর্মকাণ্ড এবং গবেষণা শুধুমাত্র বাংলাদেশের জন্যই নয় বরং একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন দক্ষিণ এশিয়া তথাপি সারাবিশ্বে এর সুফল বয়ে নিয়ে আসবে ।'' ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ নিউইয়র্কে তৃতীয় বার্ষিক 'Gates Goalkeepers Event' এ সেঁজুতি সাহা বক্তব্য রাখেন, যেখানে ৪০০টি নীতিমালা গৃহীত হয় ৷ উক্ত অনুষ্ঠানে সরকারী প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ, সক্রিয় অংশগ্রহণকারী কর্মী, সংবাদ মাধ্যম, ব্যবসায়ী এবং এ গ্রহের সবচেয়ে ধনী ও সর্বাধিক দানশীল ব্যক্তিদের একজন বিল গেটস সহ বিভিন্ন গণ্যমান্য নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করেন । সেঁজুতি সাহা বিশ্বাস করেন “Science by and for the many, not the few” । তার দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বজুড়ে প্রত্যেকেরই বিজ্ঞানের অনুশীলন এবং এর সুবিধাগুলোতে সমান প্রবেশাধিকার পাওয়া উচিৎ । তিনি মনে করেন স্বাস্থ্য এবং গবেষণায় সাম্যভাব সৃষ্টি করাই তার কাজ এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মূল ভিত্তি । সেঁজুতি সাহা বাংলাদেশের একজন নেতৃস্থানীয় তরুণ বিজ্ঞানী যিনি বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য গবেষণায় সাম্যভাব বা সমদর্শিতার কারণ হিসেবে কাজ করছেন । জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চিকিৎসা বিজ্ঞান গবেষণায় অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি Junior Chamber International, Webby 2020 Award, Women of Inspiration 2021 Award এবং Chan Zuckerberg Initiative ইত্যাদি পুরষ্কার অর্জন করেন । শিক্ষা, মেধা, মনন, নিষ্ঠা এবং অধ্যবসায়ের কারণে সেজুঁতি সাহা এ যোগ্যতা অর্জন করেছেন, যা আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে ।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডঃ গাওসিয়া ওয়াহিদুন্নেছা চৌধুরী একজন শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং লেখক । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণীবিদ্যা (জলভূমি পরিবেশবিদ্যা) বিষয়ে Ph.D করেন । প্রাণী বৈচিত্র্য, জলাভূমি বাস্তুবিদ্যা এবং প্রাণিবিদ্যায় প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে তার ১৪ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে । তিনি বাংলাদেশের নৌপথে প্লাস্টিক দূষণের ঝুঁকির দিকে মনোনিবেশ করেন । প্লাস্টিক দূষণের ফলে পরিবেশ ও মানুষের উপর যে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে তা নিয়ে তিনি একাধিক গবেষণা করেছেন । বর্তমানে বাংলাদেশে বিপন্ন প্রজাতি এবং আবাসস্থল সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করছেন । বাংলাদেশে জলজ বাস্তুতন্ত্র এবং বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী সংরক্ষণে তার অবদানের জন্য ২০২২ খ্রিস্টাব্দে তাকে 'OWSD-Elsevier Foundation Award' দেয়া হয় । তিনি বাংলাদেশের প্রাণীবিদ্যাবিষয়ক সমিতির আজীবন সদস্য এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা Wild Team এর একজন বোর্ড সদস্য । এছাড়া আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সঙ্ঘের (IUCN) দক্ষিণ এশীয় 'Invertebrate Special Group' এর সহ-সভাপতি হিসেবেও নিযুক্ত হয়েছেন । অধ্যাপক ডঃ গাওসিয়া ওয়াহিদুন্নেছা চৌধুরী দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারীদের কর্মসংস্থান এবং ক্ষমতায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছেন । মাছ ধরার পরিত্যক্ত জালকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন করে কার্পেটের মতো প্রস্তুত করে (পদ্ধতি উদ্ভাবন) ব্যবহার উপযোগী পণ্যে পরিণত করার ফলে জলজ আবাসস্থল রক্ষার পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের জন্য আয়ের বিকল্প উৎস তৈরি করছেন । তিনি Commonwealth Academic Staff Scholarship এবং Wildlife Conservation Society Fellowship সহ অনেক পুরষ্কার এবং অনুদান পেয়েছেন । সরকারি, বেসরকারি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে কাজ করেন । এছাড়াও তিনি শিক্ষা ও যোগাযোগ কমিশন এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক মৈত্রীর Species Survival Commission সহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত গোষ্ঠীর সদস্য । অধ্যাপক ডঃ গাওসিয়া ওয়াহিদুন্নেছা চৌধুরী National Geographic Society এর সাগর থেকে উৎস গঙ্গা নদী অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন এবং বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন । সম্প্রতি তিনি Cambridge Prisms: প্লাস্টিক সম্পাদকীয় বোর্ড ( cambridge.org ) জার্নালের সম্পাদকীয় বোর্ডের সদস্য হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন ।

তথ্যসূত্র: https://www.asianscientist.com/ , https://du.ac.bd/ , আন্তর্জাল (Internet )। 

ছবি: Senjuti Saha

ছবি: Organization for Women in Science for the Developing World

https://www.asianscientist.com/as100/ 

Saturday, 27 May 2023

আগ্নেয়গিরি আচ্ছাদিত নতুন গ্রহ LP 791-18 d আবিষ্কার


সম্প্রতি কানাডার মন্ট্রিল ইউনিভার্সিটি (Université de Montréal বা UdeM) এর Trottier Institute for Research on Exoplanets এর জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক দল একটি ছোট নক্ষত্রের চারপাশে ঘূর্ণায়মান একটি গ্রহ বা নতুন নাতিশীতোষ্ণ জগত আবিষ্কার করেছেন । Merrin S. Peterson গ্রহটি আবিষ্কারের নেতৃত্ব দেন । আবিষ্কৃত গ্রহটি হচ্ছে একটি বহিঃসৌর মহাপৃথিবী (Super Earth Exoplanet) । আমাদের সৌরজগতের বাইরে অপার মহাবিশ্বে খুঁজে পাওয়া গ্রহগুলোকেই বহিঃসৌর গ্রহ (Exoplanet) বলে । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বহিঃসৌর গ্রহ শনাক্তের পর থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ হাজার চারশত ঊনিশটি বহিঃসৌর গ্রহ আবিষ্কার করেছেন । এদের মধ্যে Kepler-22 b এর মতো কিছু গ্রহ রয়েছে, যেগুলোতে প্রাণের অস্তিত্ব না থাকলেও প্রাণ বা জীবন ধারণের মতো উপযোগী পরিবেশ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে । যাই হোক, নব্য গ্রহটির নাম আনুষ্ঠানিকভাবে LP 791-18 d হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে । তবে আইসল্যান্ডের রাজধানীর সম্মানে এর আরেকটি নাম রয়েছে: রেইকজাভিক (Reykjavik) ৷ মহাকাশীয় দেহ এবং এর আগ্নেয়গিরির গঠন সম্পর্কে গবেষণা দলের তত্ত্ব থেকে এর ডাকনামটি এসেছে । এ গ্রহটি আমাদের সৌরজগতের আগ্নেয়গিরির সক্রিয় দেহ বৃহস্পতি গ্রহের চাঁদ আইও (Io) এর মতো প্রায়ই আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে যায় বা অভিজ্ঞতা অনুভব করে । তার মানে, সমস্ত গ্রহ জুড়েই রয়েছে ভয়ঙ্কর আগ্নেয়গিরি । বৃহস্পতি গ্রহের তৃতীয় বৃহত্তম চাঁদ আইও হচ্ছে আগ্নেয়গিরির মহাকাশীয় বস্তু যা আমাদের সৌরজগতে । আইও চাঁদ সৌরজগতে সবচেয়ে আগ্নেয়গিরিগতভাবে সক্রিয় দেহ । এর বায়ুমণ্ডল সালফার ডাই অক্সাইড দ্বারা গঠিত । অন্যান্য বস্তুর তুলনায় এর ঘনত্ব বেশি এবং কম জলের অণু রয়েছে । আইও চাঁদের ব্যাস প্রায় ৩৬৪৩ কিলোমিটার । বিজ্ঞানীরা আইও চাঁদে প্রায় চার শতটিরও বেশি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি আবিষ্কার করেছেন এবং এগুলো গরম সিলিকেট ম্যাগমা দ্বারা চালিত । আগ্নেয়গিরিগুলো যে কোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হয়ে অগ্নুৎপাত সৃষ্টি করে লাভা ছড়িয়ে দেয় এবং এর পৃষ্ঠটি তাদের উৎস থেকে শত শত কিলোমিটার দূর পর্যন্ত লাভা প্রবাহে আবৃত থাকে । আইও চাঁদ পৃথিবীর চাঁদের চেয়ে সামান্য বড় এবং ধ্রবক যন্ত্রণা একটি জগৎ । বিশাল বৃহস্পতি গ্রহই যে কেবল শুধু মহাকর্ষীয়ভাবে আইও চাঁদকে চিরতরে কাছে টানছে তা কিন্তু নয়, আইও চাঁদের গ্যালিলিয়ান ভাইবোনরাও – ইউরোপা এবং গ্যানিমিড । জ্বলন্ত আইও চাঁদ ক্রমাগত প্রসারিত এবং চেপে যাচ্ছে, লাভা সৃষ্টির সাথে যুক্ত ক্রিয়াগুলো এর অনেকগুলো আগ্নেয়গিরি থেকে বিস্ফোরিত হতে দেখা যায় ৷ আমাদের অন্তর্দৃষ্টির বিপরীতে LP 791-18 d গ্রহের আগ্নেয়গিরিই একমাত্র জিনিস হতে পারে যা সেখানে যে কোনো প্রাণ বা জীবনকে লড়াই করার সুযোগ দেয় । এ আগ্নেয়গিরিময় বহিঃসৌর গ্রহটি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘নেচার’ (Nature) এর একটি গবেষণাপত্রে গত ১৭ই মে ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে আবিষ্কারের বর্ণনা প্রকাশিত হয়েছে । আবিষ্কৃত LP 791-18 d গ্রহটি একটি ছোট লাল বামন কেন্দ্রীয় নক্ষত্র LP 791- 18 কে প্রদক্ষিণ করছে প্রায় ৯০ আলোকবর্ষ দূরে Crater এর দক্ষিণ নক্ষত্রমণ্ডলে । যেটি আকাশগঙ্গা ছায়াপথের পাশের একটি ছায়াপথে অবস্থিত । M-type এর এ নক্ষত্রটি TOI-736 বা TIC 181804752 নামেও পরিচিত এবং আমাদের সূর্যের চেয়ে অনেক ছোট ও কম উজ্জ্বল । সদ্য আবিষ্কৃত বহিঃসৌর LP 791-18 d গ্রহটিই একমাত্র গ্রহ নয় যেটি ঐ বামন নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে ৷ এটি ছাড়া আরো দুটি গ্রহও একই নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে পরিভ্রমণ করছে । উল্লেখ্য যে, আমাদের সৌরজগতের বাইরে একটি অতিশীতল লাল বামন (Ultracool Red Dwarf বা M dwarf) TRAPPIST-1 নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে পৃথিবী বা তারচেয়েও বৃহদাকার সাতটি বহিঃসৌর পাথুরে গ্রহ প্রদক্ষিণ করছে । TRAPPIST-1 System বা গ্রহতন্ত্রের অধিকর্তা হচ্ছে TRAPPIST-1 লাল বামন নক্ষত্রটি । সেখানেই তার সৌরজগৎ । সম্ভবত LP 791-18 নক্ষত্রটিরও তেমনই একটি নিজস্ব সৌরজগৎ রয়েছে । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নতুন গ্রহটি আবিষ্কারের আগে গত ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে Transiting Exoplanet Survey Satellite (TESS) উপগ্রহ দ্বারা LP 791-18 System বা গ্রহতন্ত্রে (বহু গ্রহীয় ব্যবস্থায়) আরো দুটি গ্রহকে সনাক্ত করেন । গ্রহগুলো LP 791-18 b এবং LP 791-18 c নামে পরিচিত । এ গ্রহতন্ত্রে অভ্যন্তরীণ গ্রহ b হচ্ছে পৃথিবীর চেয়ে প্রায় শতকরা ২০ ভাগ বড় এবং নক্ষত্রটিকে একদিনেরও কম সময়ে প্রদক্ষিণ করে । বাইরের গ্রহ c হচ্ছে বৃহত্তম গ্রহ । পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ২.৫ গুণ বড় এবং ভর ০৭ গুণেরও বেশি । এর পরিক্রমণ সময়কাল প্রায় পাঁচ দিন এবং বায়ুমণ্ডল থাকতে পারে । এটি সম্ভবত নেপচুনের সংমিশ্রণের মতো উল্লেখযোগ্য পরিমাণে গ্যাস বা হালকা পদার্থ ধরে রেখেছে । এছাড়া আবিষ্কৃত LP 791-18 d গ্রহটি তার পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে ছোট (তৃতীয় গ্রহ) । গ্রহটির ১.০৩ পৃথিবীর ব্যাসার্ধ এবং ১.৪৬ পৃথিবীর ভর । এর তাপমাত্রা প্রায় ২৭ থেকে ১২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৮১ – ২৬১ ডিগ্রি ফারেনহাইট), যেখানে স্থায়ী রাতের দিকের তাপমাত্রা সম্ভবত জল ঘনীভবনের জন্য অনুমতি দেয় । গ্রহটি তার কেন্দ্রীয় নক্ষত্রের একটি কক্ষপথ সম্পূর্ণ করতে ২.৮ দিন সময় নেয় এবং নক্ষত্র থেকে এর কাক্ষিক ব্যাসার্ধ ০.০০৯৬৯ AU । গ্রহের তাপমাত্রা পৃথিবীর তুলনায় সামান্য বেশি । নক্ষত্র থেকে মধ্যবর্তী দূরত্বে b এবং c গ্রহের মধ্যে কক্ষপথে ঘুরছে । বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন যে পৃথিবী, শুক্র কিংবা শনির চাঁদ টাইটানের মতোই একটি বায়ুমণ্ডল LP 791-18 d গ্রহে থাকতে পারে । কেন্দ্রীয় নক্ষত্রটির বসবাসযোগ্য অঞ্চলের (Habitable Zone) অভ্যন্তরীণ প্রান্তের কাছে এ বহিঃসৌর গ্রহটি প্রদক্ষিণ করার ফলে ধারণা করা হয় যে, এখানকার অনুকূল তাপমাত্রায় গ্রহটির পৃষ্ঠে জল ধরে রাখার সক্ষমতা রয়েছে । এ অঞ্চলটি Goldilocks Zone নামেও পরিচিত । কারণ এ স্থানের গ্রহগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত গরম বা ঠাণ্ডা থাকে না । সেজন্য এ স্থানকে সৌরজগতের (বাইরেও) বসবাসযোগ্য অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয় । তবে এটিও মনে রাখতে হবে যে, কোনো গ্রহ তার কেন্দ্রীয় বা মূল নক্ষত্রের (Host Star) বসবাসযোগ্য অঞ্চলে থাকা মানেই এ নয় যে, ঐ গ্রহটিও প্রাণের বসবাসযোগ্য হবে । কারণ, মঙ্গল গ্রহও কিন্তু নিজের মূল নক্ষত্র সূর্যের বসবাসযোগ্য অঞ্চলে অবস্থান করছে । তবুও মঙ্গলে এখন পর্যন্ত প্রাণের অস্তিত্বের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি । আমাদের এ সবুজ পৃথিবীও সূর্যের বসবাসযোগ্য অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত । কিন্তু আমরা এ সুন্দর পৃথিবীতে প্রাণ খুলে বসবাস করছি ৷ উল্লেখ্য যে, কোনো গ্রহ নিজের মূল নক্ষত্র থেকে যে দূরত্বে থাকে সেখানে প্রাণ বেড়ে উঠার জন্য যে উপযুক্ত তাপমাত্রা বিরাজ করে বা আদর্শ পরিবেশগত অবস্থা বজায় থাকে তাকে বসবাসযোগ্য অঞ্চল (Habitable Zone) বলে । যদি সেখানে কোনো জলের অস্তিত্ব থাকে তাহলে গ্রহটি পৃথিবীর সহযোগী বা সমকক্ষ হতে পারে । এতে করে সেখানে বসবাসের জন্য প্রবল সম্ভাবনা থাকে । তবে, এখনো পর্যন্ত LP 791-18 d গ্রহে প্রাণের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি । এরপরও যদি সেখানে যে কোনো প্রাণ বা জীবন, স্থানীয় পরক (Alien) বা আক্রমণাত্মক মানব অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকে তাহলে এর যে কোনোটিকেই মোটামুটি রুক্ষভাবে যেতে হবে । প্রতিটি কক্ষপথের সময় LP 791-18 d এবং c গ্রহ দুটি একে অপরের খুব কাছাকাছি চলে আসে । মূল নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণন অতিক্রম (Pass) করার সময় বিশাল c গ্রহটি দ্বারা LP 791-18 d গ্রহের উপর একটি মহাকর্ষীয় জোর টান বা হেঁচকা (Tug) সৃষ্টি করে । ফলে একটি উপবৃত্তাকার কক্ষপথ তৈরি হয় এবং সেখানেই আসল জাদু শুরু করে । এ উপবৃত্তাকার পথে LP 791-18 d গ্রহটি প্রতিবার নক্ষত্রের চারপাশে পরিভ্রমণ করার সময় কিছুটা বিকৃত হয় । গ্রহটিকে নক্ষত্র থেকে মাঝে মাঝে কাছাকাছি এবং দূরে নিয়ে আসে । নক্ষত্র এবং c গ্রহ থেকে ক্রমাগত পরিবর্তনশীল ধাক্কা এবং টানের কারণে গ্রহের অভ্যন্তরে ঘর্ষণ তৈরি হয় । গ্রহে জোয়ারের উত্তাপ দ্বারা উৎপন্ন ঘর্ষণটি এর অভ্যন্তরকে যথেষ্ট পরিমাণে উত্তপ্ত করে ৷ ফলে শেষ পর্যন্ত উপতলে ম্যাগমা মহাসাগরের অস্তিত্বকে সক্ষম করে এবং গ্রহের পৃষ্ঠে আগ্নেয়গিরির ভয়ঙ্কর কার্যকলাপ তৈরি করতে পারে । আমাদের সৌরজগতের সর্ববৃহৎ গ্রহ বৃহস্পতি এবং এর কয়েকটি চাঁদ একইভাবে আইও (Io) চাঁদকে প্রভাবিত করে । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেন যে, বৃহস্পতির চাঁদে অগ্ন্যুৎপাতের কম্পাঙ্কের কারণে বৃহস্পতি গ্রহেও অগ্ন্যুৎপাত ঘটে । নতুন আবিষ্কৃত গ্রহটির এক দিক সর্বদা নক্ষত্রের মুখোমুখি হওয়ার কারণে পরিবেশ খুবই উত্তপ্ত । এতে করে সেখানে জলের সম্ভাবনা কম । Université de Montréal (UdeM) এর পদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক Björn Benneke বলেন, “এটি একটি অসাধারণ আবিষ্কার এবং পৃথিবীর বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে এর সাদৃশ্য রয়েছে । সম্ভবত একটি বহুগ্রহীয় ব্যবস্থায় গ্রহটি আগ্নেয়গিরিতে আচ্ছাদিত ৷ এটি শুধুমাত্র জ্যোতির্বিদ্যাই নয়- বিজ্ঞানের অন্যান্য অনেক ক্ষেত্র বিশেষ করে ভূতত্ত্ব, গ্রহ বিজ্ঞান, বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞান এবং সম্ভবত জ্যোতির্বিজ্ঞানের অগ্রগতির অভূতপূর্ব সুযোগ প্রদান করে । সেই সাথে এটিতে সনাক্তযোগ্য ভূতাত্ত্বিক কার্যকলাপ এবং আগ্নেয়গিরির সম্ভাবনা যা স্থলজগতগুলো কিভাবে উৎপত্তি, গঠন ও বিকশিত হয় তা আরো ভালোভাবে বোঝার জন্য একটি মূল বিষয় করে তোলে । LP 791-18 d গ্রহটি সম্ভবত জোয়ারের সাথে তালাবদ্ধ (Tidally locked) থাকে । যার মানে একই দিক ক্রমাগত তার নক্ষত্রের মুখোমুখি হয় । গ্রহ পৃষ্ঠে তরল জলের অস্তিত্বের জন্য দিনের দিকটি সম্ভবত খুব গরম হবে । কিন্তু আমরা যে পরিমাণ আগ্নেয়গিরির ক্রিয়াকলাপ সন্দেহ করি সমগ্র গ্রহ জুড়ে ঘটে তা একটি বায়ুমণ্ডল বজায় রাখতে পারে, যা রাতের দিকে তাপমাত্রা গ্রহ পৃষ্ঠের জলকে ঘনীভূত করার জন্য যথেষ্ট ঠান্ডা হতে পারে ।” বহিঃসৌর এ মহাপৃথিবীটি নিজ অবস্থানে পরিভ্রমণ করে না । অর্থাৎ এক স্থানে সর্বদা দিন এবং অপর স্থানে সর্বদা রাত থাকে, যেখানে আইও চাঁদেরও এমন অবস্থান । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নাসা (NASA) এর Transiting Exoplanet Survey Satellite (TESS) উপগ্রহ ও স্পিটজার মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র (Spitzer Space Telescope) থেকে বিভিন্ন তথ্যাবলী এবং স্থল-ভিত্তিক মানমন্দিরগুলোর অনুচরবৃন্দ ব্যবহার করে LP 791-18 d গ্রহটি আবিষ্কার করেন । স্পিটজার মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র নক্ষত্রের অবলোহিত আলোকে কিছুটা ম্লান দেখেছিল যখন গ্রহটি তার চাকতির সামনে দিয়ে যায়, এ ঘটনাটিকে ট্রানজিট (Transit) বলা হয় । ইউনিভার্সিটি ডি মন্ট্রিল (Université de Montréal) এবং নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি (New York University) আবুধাবি এর একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী Dr. Mohamad Ali-Dib বলেন, “বাসযোগ্য অঞ্চলে একটি পৃথিবী আকারের গ্রহের আবিষ্কার যেটি সম্ভাব্য আগ্নেয়গিরিগতভাবে সক্রিয় তা সৌরজগতের বাইরে প্রাণের সন্ধানে একটি বিশাল পদক্ষেপ । পরবর্তী ধাপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীন সংস্থা ”জাতীয় বিমানচালনা ও মহাকাশ প্রশাসন” (NASA) এর জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র [James Webb Space Telescope (JWST)] ব্যবহার করে গ্রহতন্ত্র বা বহুগ্রহীয় ব্যবস্থায় নানা পর্যবেক্ষণ এবং এর বায়ুমণ্ডল সনাক্ত করা সম্ভব হবে ।”

তথ্যসূত্র:  https://euro.eseuro.com/ , https://www.sci.news/ , https://astrobiology.com/ , আন্তর্জাল (The Internet) ।

ছবি: https://www.sci.news/ (NASA’s Goddard Space Flight Center / Chris Smith, KRBwyle) ।

Saturday, 20 May 2023

জুনো মহাকাশযান বৃহস্পতির চাঁদ আইও এর কাছাকাছি আসছে

[এ জুনোক্যাম চিত্রটি ০১লা মার্চ ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে জোভিয়ান চাঁদ আইও তে NASA এর জুনো মহাকাশযান উড়ান চলাকালীন সময়ে সংগ্রহ করা হয়েছিল । এটি সবচেয়ে কাছাকাছি আসার সময়, জুনো আইও চাঁদ থেকে প্রায় ৩২০০০ মাইল (৫১৫০০ কিলোমিটার) দূরে ছিল । * ছবির তথ্য: NASA/JPL-Caltech/SwRI/MSSS , * ছবি প্রক্রিয়াকরণ: Kevin M. Gill (CC BY)] 


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA) এর জুনো মহাকাশযান (Juno spacecraft) গত ১৬ই মে মঙ্গলবার ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে বৃহস্পতি গ্রহের আগ্নেয়গিরিপূর্ণ চাঁদ আইও (Io) এর পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার কথা এবং তারপর শীঘ্রই এটি বরফময়-গ্যাস দৈত্য বৃহস্পতি গ্রহের পাশ দিয়ে যাবে । বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের লালিত বাসনা যে, সূর্য থেকে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন মাইল দূরে থাকা বৃহস্পতি গ্রহ সম্পর্কে এবং তার হীমশীতল চাঁদে নোনা জলের সমুদ্র, জীবন বা প্রাণের অস্তিত্ব ও বাসযোগ্যতার লক্ষণগুলো অন্বেষণ করা ৷ আমাদের সৌরজগতের সর্ববৃহৎ গ্রহ হচ্ছে বৃহস্পতি । গ্যাস দানব বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুন গ্রহ ০৪টিকে জোভিয়ান গ্রহ (Jovian planet ) বলে । বৃহস্পতি গ্রহকে প্রদক্ষিণকারী ৯৫টি উপগ্রহ বা চাঁদের মধ্যে ০৪টি হচ্ছে গ্যালিলীয় চাঁদ যেমন: ইউরোপা (Europa), ক্যালিস্টো (Callisto), আইও (Io) এবং গ্যানিমিড (Ganymede) – যেগুলোর কোনোটি বরফ পৃষ্ঠের নীচে গভীর তরল জলের মহাসাগরকে আশ্রয় দেয়, যেখানে সামুদ্রিক প্রাণ বা জীবন থাকতে পারে । ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ এবং দার্শনিক গ্যালিলিও গ্যালিলি প্রথম এ ০৪টি উপগ্রহ বা চাঁদকে আবিষ্কার করেন বলে তার নামানুসারে চাঁদগুলোর নামকরণ হয় গ্যালিলীয় চাঁদ । বেশ কিছুদিন যাবৎ বিজ্ঞানীদের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে চাঁদে প্রাণের অস্তিত্বের পাশাপাশি বাসযোগ্যতার বিষয়টি ৷ ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক প্লেট (Plate tectonics) দ্বারা সৃষ্ট জলতাপ নিঃসরণ ছিদ্র বা ফাটল (Hydrothermal vent) – যা সারা পৃথিবীতে সমুদ্রের তলদেশে বিদ্যমান ৷ যেখানে সূর্যালোক নেই, অন্ধকার, বিষাক্ত তেজষ্ক্রিয় রাসায়নিক পদার্থের সম্ভাবনা, চরম জল চাপ এবং সমুদ্রতলের ভূগর্ভস্থ ম্যাগমা দ্বারা উত্তপ্ত হয়ে ভূত্বক বা পৃথিবী পৃষ্ঠের ফাটল দিয়ে বের হওয়া পানির প্রায় ৭৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বিভিন্ন অণুজীব (Microorgaism), মাছ, Tubeworm, চিংড়ি, Clam, Mussel এবং কাঁকড়া ইত্যাদি প্রাণীর বিস্ময়কর বাসস্থান ৷ এ জলতাপ নিঃসরণ ছিদ্র বা ফাটল এমন ভয়ঙ্কর-রূঢ়-অদ্ভুত পরিবেশে দুর্লভভাবে টিকে থাকা সামুদ্রিক প্রাণ বা জীবনকে সমর্থন করে ৷ যদি তেমন পরিবেশ জোভিয়ান চাঁদে বিদ্যমান থাকে, তবে চাঁদগুলো সেই অন্ধকারের মধ্যেও প্রাণ বা জীবনের উন্নতির জন্য যথেষ্ট উষ্ণতা সরবরাহ করতে পারে । ধারণা করা হয়, জোভিয়ান চাঁদের ইউরোপাতে জীবন আশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে । গ্যালিলীয় চাঁদগুলোর মধ্যে ইউরোপা সবচেয়ে ছোট চাঁদ । এটি সৌরজগতের ষষ্ঠ বৃহত্তম চাঁদ এবং বৃহস্পতির ৯৫টি পরিচিত চাঁদের মধ্যে ষষ্ঠ নিকটতম । ইউরোপা চাঁদ মাত্র ২০০০ মাইল চওড়া এবং পৃথিবীর চাঁদের চেয়ে ছোট । তবে ১০০ মাইল পর্যন্ত গভীর মহাসাগরের সাথে এটি পৃথিবীর সমস্ত মহাসাগরের চেয়ে দ্বিগুণ জল ধরে রাখতে পারে । মনে করা হয়, ইউরোপা চাঁদের মহাসাগর একটি পাথুরে সমুদ্রতলের উপর বসে, যা জীবন্ত প্রাণীদের টিকিয়ে রাখতে পারে এমন জলতাপ নিঃসরণ ছিদ্র বা ফাটল এবং পুষ্টির সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে । ইউরোপা চাঁদটি শিখা (Plume) এবং উষ্ণপ্রস্রবণের (Geyser) মাধ্যমে আগ্নেয়গিরি মুখের জলীয় বাষ্পকে মহাকাশে প্রেরণ বা প্রবাহিত করে । সৌরজগতের বৃহত্তম এবং বৃহস্পতি গ্রহের সর্ববৃহৎ, ভারী ও গর্তযুক্ত চাঁদ গ্যানিমিড হচ্ছে বুধ গ্রহের চেয়েও শতকরা ০৮ ভাগ বড় । এটি পাথুরে পাহাড়ে ভরপুর, ভূ-গর্ভে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি এবং গলিত তপ্ত লৌহ রয়েছে । এ লৌহের কারণে এটিই সৌরজগতের একমাত্র চাঁদ যেটি নিজস্ব চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে ৷ গ্যানিমিড চাঁদের ব্যাস ৫২৬৮ কিলোমিটার এবং একটি কক্ষপথ সম্পূর্ণ করতে ০৭ দিন ০৩ ঘন্টা সময় লাগে । বৃহস্পতি গ্রহ থেকে প্রায় ১০৭০৪০০ কিলোমিটার দূরে গ্যানিমিডের কক্ষপথ অবস্থিত । সৌরজগতের তৃতীয় বৃহত্তম এবং বৃহষ্পতির দ্বিতীয় বৃহত্তম চাঁদ হচ্ছে ক্যালিস্টো । এটি ০৪টি গ্যালিলীয় চাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বাইরের দিকে এবং কম ঘন । ফলে বৃহস্পতি গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্র দ্বারা এটি কম প্রভাবিত হয় । অক্সিজেন এবং কার্বন ডাই অক্সাইড দ্বারা এর বায়ুমণ্ডল গঠিত । সম্ভবতঃ ক্যালিস্টো চাঁদেও তরল জলের মহাসাগর আছে । এছাড়া বৃহস্পতির তৃতীয় বৃহত্তম চাঁদ আইও সৌরজগতে সবচেয়ে আগ্নেয়গিরিগতভাবে সক্রিয় দেহ । আইও চাঁদের বায়ুমণ্ডল সালফার ডাই অক্সাইড দ্বারা গঠিত । অন্যান্য বস্তুর তুলনায় এর ঘনত্ব বেশি এবং কম জলের অণু রয়েছে । আইও চাঁদের ব্যাস প্রায় ৩৬৪৩ কিলোমিটার । বিজ্ঞানীরা আইও চাঁদে প্রায় ৪০০ টিরও বেশি আগ্নেয়গিরি আবিষ্কার করেছেন এবং এগুলো গরম সিলিকেট ম্যাগমা দ্বারা চালিত । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের San Antonio শহরে অবস্থিত Southwest Research Institute (SwRI) এর জুনো’র প্রধান তদন্তকারী Scott J. Bolton বলেন, “আইও চাঁদ হচ্ছে সবচেয়ে আগ্নেয়গিরির মহাকাশীয় বস্তু যা আমাদের সৌরজগতে । জুনো এটিকে একাধিকবার অতিক্রম ও সময়ের সাথে সাথে পর্যবেক্ষণ করে ৷ আমরা দেখতে পারি যে, আগ্নেয়গিরিগুলো কিভাবে পরিবর্তিত হয়– কতো ঘন ঘন তারা বিস্ফোরিত হয়, তারা কতোটা উজ্জ্বল ও উত্তপ্ত হয়, তারা একটি গোষ্ঠী বা এককভাবে যুক্ত কি-না এবং যদি লাভা প্রবাহের আকার পরিবর্তন হয় ।” আইও চাঁদ পৃথিবীর চাঁদের চেয়ে সামান্য বড় এবং ধ্রবক যন্ত্রণা একটি জগৎ । বিশাল বৃহস্পতি গ্রহই যে কেবল শুধু মহাকর্ষীয়ভাবে আইও চাঁদকে চিরতরে কাছে টানছে তা কিন্তু নয়, আইও চাঁদের গ্যালিলিয়ান ভাইবোনরাও – ইউরোপা এবং গ্যানিমিড । ফলাফল হচ্ছে যে আইও চাঁদ ক্রমাগত প্রসারিত এবং চেপে যাচ্ছে, লাভা সৃষ্টির সাথে যুক্ত ক্রিয়াগুলো এর অনেকগুলো আগ্নেয়গিরি থেকে বিস্ফোরিত হতে দেখা যায় ৷ 
[১৪ই ডিসেম্বর ২০২২ খ্রিস্টাব্দে (বামে) এবং ০১লা মার্চ ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে জোভিয়ান চাঁদের উড়ানগুলো চলাকালীন সময়ে NASA এর জুনো মহাকাশযান দ্বারা সংগৃহীত দৃশ্যমান আলো এবং অবলোহিত তথ্য ব্যবহার করে আইও চাঁদে আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপের চিত্রিত এ যৌগিক দৃশ্যগুলো তৈরি করা হয়েছিল । সৌজন্যে: NASA/JPL-Caltech/SwRI/ASI/INAF/JIRAM] 


জোভিয়ান চাঁদে মহাকাশযানটির উড়ান (Flyby) এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কাছের হবে, যা প্রায় ২২০৬০ মাইল (৩৫৫০০ কিলোমিটার) উচ্চতায় । বৃহস্পতি গ্রহের অভ্যন্তরীণ তদন্ত বা অনুসন্ধানের জন্য এখন তার বর্ধিত মিশনের তৃতীয় বর্ষ । সৌর-চালিত মহাকাশযানটি গ্যাস দানব বৃহস্পতির বলয় তন্ত্রেও অন্বেষণ করবে, যেখানে এর আরো কিছু অভ্যন্তরীণ চাঁদ থাকে । আজ অবধি, জুনো মহাকাশযান বৃহস্পতি গ্রহে ৫০টি উড়ান সম্পাদিত করেছে । গ্যালিলীয় ০৪টি চাঁদের মধ্যে ০৩টি যেমন: বরফময় জগৎ ইউরোপা, বৃহৎ গ্যানিমিড এবং জ্বলন্ত আইও চাঁদের সাথে ঘনিষ্ঠ সাক্ষাতের সময় এটি নানা তথ্য সংগ্রহ করেছে । বৃহস্পতি গ্রহকে পর্যবেক্ষণ বা গবেষণার জন্য যখন জুনো মহাকাশযানের নকশা তৈরি করা হয়েছিল, সেখানে এর অনেকগুলো সুবেদী গ্রাহক (Sensor) ছিল যা অতিরিক্তভাবে বৃহস্পতি গ্রহের চাঁদের তথ্য সরবরাহ করেছে । মহাকাশযানটির দৃশ্যমান আলোক চিত্রক জুনোক্যাম (JunoCam), JIRAM (Jovian InfraRed Auroral Mapper), SRU (Stellar Reference Unit) ও MWR (Microwave Radiometer) ইত্যাদি যন্ত্রপাতি বৃহস্পতির আইও চাঁদের আগ্নেয়গিরি ও কিভাবে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বৃহস্পতি গ্রহের শক্তিশালী চুম্বকমণ্ডল এবং মেরুজ্যোতি বা মেরুপ্রভার (Aurora) সাথে যোগাযোগ সৃষ্টি করে তা অধ্যয়ন বা পর্যবেক্ষণ করবে । Scott J. Bolton আরো বলেন, “আমরা জুনো’র মিশনের আরেকটি আশ্চর্যজনক অংশে প্রবেশ করছি কারণ আমরা ক্রমাগত কক্ষপথে আইও চাঁদের আরো কাছাকাছি চলে যাচ্ছি । ৫১তম কক্ষপথটি এখন আমাদের এ অসহ্য যন্ত্রণাদায়ক চাঁদের নিকটতম চেহারা প্রদান করবে । জুলাই এবং অক্টোবরে আসন্ন উড়ানগুলো আমাদের আরো কাছে নিয়ে আসবে যা এ বছরের ডিসেম্বরে এবং পরের বছরের ফেব্রুয়ারিতে আইও চাঁদের সাথে আমাদের যমজ উড়ান (Twin flyby) মুখোমুখি হবে, যখন আমরা এর পৃষ্ঠের ১৫০০ কিলোমিটারের মধ্যে উড়ে যাবো ৷ এ সমস্ত উড়ানগুলো পরম বিস্ময়কর আইও চাঁদের আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপের দর্শনীয় দৃশ্য প্রদান করছে বা করবে ৷ তথ্যটি আশ্চর্যজনক হওয়া উচিত ।” বৃহস্পতির উড়ানগুলো চলাকালীন সময় জুনো মহাকাশযান গ্রহটির মেঘের শীর্ষে বা চূড়ার উপর নিচু হয়ে সাঁইসাঁই করে চলে গেছে– প্রায় ২১০০ মাইল (৩৪০০ কিলোমিটার) কাছাকাছি । এ উড়ানগুলোর সময় উত্তর মেরু থেকে গ্রহের কাছাকাছি যায় এবং দক্ষিণের উপর দিয়ে প্রস্থান করে । মহাকাশযানটি তার যন্ত্র ব্যবহার করে অস্পষ্ট মেঘের আবরণের নীচে অনুসন্ধান করে । এটি দৈত্যাকার গ্রহটির উৎপত্তি, গঠন, বায়ুমণ্ডল এবং চুম্বকমণ্ডল সম্পর্কে আরো বিশদ জানতে বৃহস্পতির অভ্যন্তর এবং মেরুপ্রভা গবেষণা করে । জুনো মহাকাশযান ২৫০৫ পৃথিবী দিনেরও বেশি সময় ধরে বৃহস্পতিকে প্রদক্ষিণ করছে এবং ৫১০ মিলিয়ন মাইল (৮২০ মিলিয়ন কিলোমিটার) পথ উড়েছে । মহাকাশযানটি ০৪ঠা জুলাই ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে বৃহস্পতি গ্রহের বৈজ্ঞানিক তদন্ত শুরু করতে বৃহস্পতিতে পৌঁছেছিল । প্রথম উড়ান ৫৩ দিন পরে ঘটেছিল এবং মহাকাশযানটি ০৭ই জুন ২০২১ খ্রিস্টাব্দে গ্যানিমিড চাঁদের উড়ান পর্যন্ত সেই কক্ষপথের সময়কালের সাথে চলতে থাকে, যা এর কক্ষপথের সময়কালকে ৪৩ দিনে কমিয়ে দেয় । ২৯শে সেপ্টেম্বর ২০২২ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপা চাঁদের উড়ান কক্ষপথের সময়কাল ৩৮ দিনে কমিয়ে এনেছে । গত ১৬ই মে ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে এবং আগামী ৩১শে জুলাই ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে পরবর্তী আইও চাঁদের দু’টি উড়ানের পরে জুনোর কক্ষপথের সময়কাল ৩২ দিনে স্থির থাকবে ।  
[বৃহস্পতির চাঁদ আইও এর আগ্নেয়গিরির ক্রিয়াকলাপের এ অবলোহিত দৃশ্যগুলো ১৬ই অক্টোবর ২০২১ খ্রিস্টাব্দে চাঁদে উড়ান চলাকালীন সময়ে NASA এর জুনো মহাকাশযানে থাকা JIRAM (Jovian Infrared Auroral Mapper) যন্ত্র দ্বারা সংগ্রহ করা হয়েছিল ।
সৌজন্যে: NASA/JPL-Caltech/SwRI/ASI/INAF/JIRAM]  

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় নাসা’র Jet Propulsion Laboratory এর জুনো’র ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প ব্যবস্থাপক Matthew Johnson বলেন, “আইও চাঁদ হচ্ছে শুধুমাত্র একটি মহাকাশীয় বস্তু যা এ বর্ধিত মিশনের সময় জুনো’র অণুবীক্ষণযন্ত্রের অধীনে আসতে থাকে । সেই সাথে ক্রমাগত আমাদের কক্ষপথ পরিবর্তন করে বৃহস্পতি গ্রহের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং গ্রহের রাতের দিকে নীচে উড়ে যাওয়ার অনুমতি দেয় । মহাকাশযানটি বৃহস্পতির কিছু বলয়ের মধ্যে সুই-সুতার যোগসূত্র (Threading the needle) করবে তাদের উৎপত্তি এবং গঠন সম্পর্কে আরো জানতে ।” নাসা’র Jet Propulsion Laboratory, ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনায় ক্যালটেকের (Caltech) একটি বিভাগ এবং টেক্সাসের San Antonio শহরে অবস্থিত Southwest Research Institute (SwRI) এর প্রধান তদন্তকারী Scott J. Bolton জুনো মিশন পরিচালনা করেন । জুনো মিশন হচ্ছে নাসা’র একটি মহাকাশ অনুসন্ধান, যা বৃহস্পতি গ্রহকে প্রদক্ষিণ করছে । এটির উদ্দেশ্য হচ্ছে বৃহস্পতি গ্রহের উৎপত্তি ও গঠন, গ্রহে পাথুরে কেন্দ্রস্থল আছে কি-না, গ্রহের বায়ুমণ্ডলে জলের পরিমাণ, ভর বিতরণ, মহা লাল বিন্দু, গভীর বাতাস, মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র, চৌম্বক ক্ষেত্র এবং মেরু চুম্বকমণ্ডল ইত্যাদি পরিমাপ করা । জুনো মিশনটি নাসা’র New Frontiers Program এর অংশ, যেটি ওয়াশিংটনে এজেন্সির বিজ্ঞান মিশন অধিদপ্তরের (Science Mission Directorate) জন্য আলাবামার হান্টসভিলে নাসা’র Marshall Space Flight Center এ পরিচালিত হয় ৷ যুক্তরাষ্ট্রের (ডেনভার) মহাকাশ, প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা বিষয়ক কোম্পানি লকহিড মার্টিন স্পেস (Lockheed Martin Space) মহাকাশযান তৈরি এবং পরিচালনা করে ।

তথ্যসূত্র: https://www.nasa.gov/ ,  আন্তর্জাল (The Internet) ।






Tuesday, 16 May 2023

সূর্যের মতোই এক দৈত্যাকার নক্ষত্র আস্ত একটি গ্রহকে গিলে ফেলেছে!


পৃথিবীতে একজন সবল ব্যক্তি প্রায়শঃ তার চেয়ে দুর্বলের প্রতি আধিপত্য বিস্তার করে নিজেকে পরাক্রমশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ৷ প্রকৃতির বাস্তুতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি সবল প্রাণী অপর একটি দুর্বল প্রাণীকে শিকার করে বেঁচে থাকে । এটি দুর্বলের প্রতি সবলের আগ্রাসন ৷ প্রকৃতিতে এক চিরাচরিত নিয়ম । ঠিক তেমনি মহাজাগতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও যে এমনটি ঘটে থাকে, এ বার হাতেনাতে তার প্রমাণ মিলেছে । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছেন ৷ বৃহস্পতি গ্রহের চেয়েও বড় একটি উত্তপ্ত ও গ্যাসীয় গ্রহকে গ্রাস করেছে এমন একটি দৈত্যাকার বৃদ্ধ নক্ষত্রকে তারা সনাক্ত করেছেন । সৌরজগতের বাইরে মহাশূন্যে গ্রহটিকে সূর্যের মতোই এক বিশালাকার নক্ষত্র তাকে একেবারে আস্ত গিলে খেয়েছে । এ ঘটনা দেখে বিজ্ঞানীরা স্তম্ভিত । একাধিক স্থল-ভিত্তিক মানমন্দিরে অবস্থিত অতি শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্র এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা 'নাসা' (NASA) কর্তৃক ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে চালু করা NEOWISE (Near-Earth Object Wide Field Infrared Survey Explorer) Infrared Astronomy Space দূরবীক্ষণ যন্ত্র থেকে চাঞ্চল্যকর এ বিরল মহাজাগতিক দৃশ্যটি ধরা পড়েছে । ফলে আমাদের সবুজ গ্রহ পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে এক অশনি সংকেত! গ্রহটি ২০২০ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে প্রথম আবিষ্কৃত হয় ৷ উল্লেখ্য যে: WISE নামে পরিচিত দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি সমস্ত আকাশের মানচিত্র তৈরি করে যা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দেখতে সক্ষম করে যে, কিভাবে মহাজাগতিক বস্তুগুলো সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয় এবং এটি দূরবর্তী মহাকাশের কিছু অস্পষ্ট ছায়াপথ, নক্ষত্র, গ্রহ, ধূমকেতু, গ্রহাণু ও বিভিন্ন বস্তুর চিত্রধারণসহ অবলোহিত আলোতে  মহাকাশকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে । যাই হোক, মহাকাশ বিজ্ঞানীরা চাক্ষুস এমন প্রমাণ পেয়ে উচ্ছ্বসিত হলেও পাশাপাশি তাদের কপালে দুঃশ্চিন্তারও ভাঁজ পড়েছে । কারণ বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে, আগামী ৫০০ কোটি বছরের মধ্যে সূর্যের জ্বালানি বা আয়ু শেষ হয়ে যাবে । ফলে তখন বুধ, শুক্র এবং পৃথিবীরও একই পরিণতি ঘটবে ৷ সৌরজগতের কেন্দ্রের খুব কাছের নক্ষত্রটি হচ্ছে সূর্য । মহাবিশ্বের সমস্ত নক্ষত্রের মতো সূর্যও একটি বিশাল পারমাণবিক চুল্লি, যা হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম গ্যাস দ্বারা গঠিত (প্লাজমা তথাপি আয়নিত পদার্থ) ৷ এছাড়া এর অন্যান্য গাঠনিক উপাদান হচ্ছে অক্সিজেন, কার্বন, নিয়ন এবং লৌহ ইত্যাদি ৷ নক্ষত্রের জ্বালানি হচ্ছে উদজান (Hydrogen) । সূর্যের কেন্দ্রে নিউক্লীয় সংযোজন বিক্রিয়ার মাধ্যমে অনবরত হাইড্রোজেন পুড়ে হিলিয়াম গ্যাস উৎপন্ন হচ্ছে ৷ পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব প্রায় ১৫২১০০০০০ কিলোমিটার বা ৯৪৫০০০০০ মাইল (আলোর গতিতে) । সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে ০৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ড । ফলে সূর্যালোকশক্তি পৃথিবীর জলবায়ু এবং আবহাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রায় সকল জীবকে বাঁচিয়ে রাখে । সূর্যের কেন্দ্রভাগের (Core) ঘনত্ব ১৫০ গ্রাম / ঘনসেন্টিমিটার এবং তাপমাত্রা প্রায় ০১ কোটি ৩৬ লক্ষ Kelvin (~১৩.৬ MK ) ৷ যদিও ছটামণ্ডল বা সৌর করোনায় (Corona) তাপমাত্রা ০৫ MK এবং সূর্যপৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৫৭৮৫ Kelvin (৫৫০৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস) । সূর্য কেন্দ্রিক এ সৌরজগতের সবচেয়ে বৃহৎ গ্রহ বৃহস্পতির তুলনায় পৃথিবী আয়তনে অনেক ছোট ৷ তবে এক সময় সূর্য নামক নক্ষত্রটি রক্তলাল দানবে পরিণত হয়ে এর প্রভাব পৃথিবীর কক্ষপথ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে এবং ভয়ঙ্করভাবে নিমেষেই পৃথিবীকে গিলে ফেলবে! এমনকি পুরো সৌরজগৎকেও ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে পারে ৷ তখন সূর্যের উজ্জ্বলতা বহুগুণ বেড়ে যাবে এবং প্রচণ্ড ভয়াবহ উত্তাপে পৃথিবীতে আর কোনো প্রাণের অস্তিত্বই থাকবে না । চারপাশের সব কিছুই ছাই হয়ে যাবে । অর্থাৎ সমাপ্তি (The End) ৷ জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অনেক লাল দৈত্য নক্ষত্রকে শনাক্ত করেছেন ৷ তারা সন্দেহ করছেন যে, এ বিশাল মহাবিশ্বে সূর্যের মতো যতোগুলো নক্ষত্র আছে তাদের এক-তৃতীয়াংশ নক্ষত্রই সম্ভবত তাদের কাছাকাছি ঘিরে থাকা এক বা একাধিক গ্রহকে ‘গিলে খেয়েছে’ । কিন্তু ঘটনাটি আগে কখনো সরাসরি দেখা যায়নি । এবারই প্রথম সম্ভবপর হয়েছে ৷ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেট্‌স অঙ্গরাজ্যের কেমব্রিজে অবস্থিত Massachusetts Institute of Technology (MIT) এর একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং এ গবেষণার প্রধান লেখক কিশালয় দে বলেন, "এ ধরণের ঘটনা কয়েক দশক ধরে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা কখনোই এ প্রক্রিয়াটি কিভাবে কার্যকর হয় তা পর্যবেক্ষণ করিনি ।" তবে প্রথমবারের মতো এমন একটি বিরল ও বিস্ময়কর ঘটনা খুঁজে পাওয়া সত্যিই উত্তেজনাপূর্ণ । জলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্যকে কেন্দ্র করে আমাদের এ সৌরজগৎ গড়ে উঠেছে । অপার মহাশূন্যে এমন একাধিক সৌরজগতের অস্তিত্ব রয়েছে । পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ হাজার আলোকবর্ষ দূরে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের (Milky Way Galaxy) চাকতিতে ঈগল-সদৃশ নক্ষত্রমণ্ডল অ্যাকিলার (Aquila) কাছে অবস্থিত ZTF SLRN-2020 নামক সূর্যের মতো নক্ষত্রটি এ তুলকালাম কাণ্ডটি ঘটিয়েছে । গ্রহখেকো এ নক্ষত্রটি আয়তনে প্রায় বৃহস্পতি গ্রহের চেয়েও বড় একটি উষ্ণ গ্যাসপূর্ণ গ্রহকে গিলে ফেলেছে (শুষে নিয়েছে)  ৷ সূর্য থেকে বুধ গ্রহের মধ্যে যে দূরত্ব তার চেয়েও কম দূরত্বে এ বহিঃসৌর গ্রহটি (Exoplanet) তার ঐ কেন্দ্রীয় নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছিল । কিন্তু সময়ের সাথে ক্রমেই নক্ষত্রটি তার দৈহিক রূপ পরিবর্তন করে ফুলে-ফেঁপে রক্তবর্ণ হয়ে উঠে এবং নাক্ষত্রীয় বায়ুমণ্ডলে নানা উপাদানকে উত্তপ্ত করে । চক্কর কাটতে থাকা গ্রহটির সাথে ধীরে ধীরে এর দূরত্ব কমতে থাকে ৷ নক্ষত্রের তীব্র মাধ্যাকর্ষণের কারণে এক সময় গ্রহটি একেবারেই নক্ষত্রটির সংস্পর্শে আসে ৷ মহাকাশে গ্রহের গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে ৷ হঠাৎ ঘূর্ণায়মান গ্রহটি বিস্ময়করভাবে নক্ষত্রটির তীব্র তাপে বাষ্পে পরিণত হয়ে অতল গহীনে হারিয়ে যায় । অবশেষে সেখানে অবশিষ্ট গ্যাস ঠান্ডা হয়ে ধুলোয় পরিণত হয়, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে দৃশ্যমান । এ অবস্থাকে বলা হয় নক্ষত্রের মধ্যে গ্রহের বিলীন হয়ে যাওয়া । প্রথমে বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছিলেন যে, বিষয়টি মহাশূন্যে নাক্ষত্রিক সংঘর্ষ কিংবা দুটি নক্ষত্র পরস্পরের সাথে মিশে যাওয়ার ঘটনা । হয়তোবা কোনো রাক্ষুসে হিংস্র কৃষ্ণহ্বরের আগ্রাসনে নক্ষত্রকে কামড়ে ছিঁড়ে খাওয়ার কোনো ঘটনা । যদিও এ ধরণের ঘটনায় মহাকাশে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার ঘটে থাকে । কিন্তু সেখানে শুধুমাত্র ধুলো অবশিষ্ট থাকার কারণে বিজ্ঞানীদের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয় । তারা বিভিন্ন স্থানের কয়েকটি দূরবীক্ষণ যন্ত্র এবং কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ সিদ্ধান্তে উপণীত হন যে, আসলেই এটি ছিল একটি গ্রহকে গিলে খাওয়ার ঘটনা ৷ বর্ণালীবীক্ষণ পরীক্ষা দ্বারা মনে হয়, এমন অনেক মৌল আছে যা কেবল ঠান্ডা তাপমাত্রায় থাকতে পারে । নক্ষত্রটিতে প্রচুর পরিমাণে লিথিয়াম ধাতু রয়েছে ৷ লিথিয়াম হচ্ছে আদি ধাতু বা প্রাথমিক মৌল ৷ প্রায় পৌনে চৌদ্দশত কোটি বছর পূর্বে ভয়ঙ্কর মহাবিস্ফোরণের (Big Bank) সময় এ বিরল ধাতুর উৎপত্তি হয়েছে ৷ লিথিয়াম খুব সহজেই নক্ষত্রের মধ্যে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় ৷ কিন্তু এ বয়স্ক নক্ষত্রে অস্বাভাবিক পরিমাণে লিথিয়ামের উপস্থিতি বিজ্ঞানীদেরকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে ৷ ধারণা করা হয়, সম্ভবত ঐ বিশাল ভরের গ্রহটিকে গিলে ফেলার সময় নক্ষত্রটির অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে নতুন করে প্রচুর পরিমাণে লিথিয়াম উৎপাদন করেছে ৷ অর্থাৎ ঐ গ্রহ থেকেই মৌলটি নক্ষত্রে এসেছে ৷ সবচেয়ে উত্তপ্ত নক্ষত্রগুলোতে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক উপাদান থাকে । সূর্যের মতো নক্ষত্রগুলোতেও জন্মের সময়ই প্রচুর পরিমাণ লিথিয়ামের উপস্থিতি ছিল ৷ কিন্তু ধারণা করা হয় মহাবিস্ফোরণের পর প্রথম ১০ কোটি বছরেই তা পুড়ে শেষ হয়েছে । মহাবিশ্বে প্রতিনিয়তই এমন কিছু ঘটনা ঘটে থাকে যা মানুষের পক্ষে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয় । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেন যে, রাক্ষুসে নক্ষত্রটি বার্ধক্যে পৌঁছে গিয়েছে । নক্ষত্রটি সূর্যের ভরের প্রায় ০.৮ থেকে ১.৫ গুণের মধ্যে এবং এটি তার জীবনের শেষ পর্যায়ের শুরুতে রয়েছে–  এর লাল দৈত্য পর্যায়, যা ১০০০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলতে পারে । এর আভ্যন্তরীণ জ্বালানি শেষ হওয়ার কারণে এটি ফুলে-ফেঁপে দৈহিক রূপ পরিবর্তন করে উজ্জ্বল থেকে আরো উজ্জ্বলতর হয়ে উঠেছে ৷ স্বাভাবিক আকৃতির চেয়ে প্রায় ১০ লক্ষ গুণ বেশি বড় হয়ে মাত্র ১০ দিনের মধ্যেই কয়েকশ গুণ বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠে । প্রবল বিচ্ছুরণ শুরু হয় । নক্ষত্রের তীব্র মাধ্যাকর্ষণের টানে গ্রহটি কাছাকাছি এসে পড়ায় দুর্ভাগ্যজনকভাবে নক্ষত্রটির গর্ভে চলে গিয়ে এর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে ৷ এ ঘটনাটি আনুষ্ঠানিকভাবে 'জেডটিএফ এসএলআরএন-২০২০' নামে পরিচিত ৷ সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণগুলোতে দেখা যায় যে, নক্ষত্রটি গ্রহের সাথে একত্রিত হওয়ার আগে এর আকার এবং উজ্জ্বলতায় ফিরে (পরিবর্তন) এসেছে । যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের পাসাডেনায় অবস্থিত একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় California Institute of Technology (CIT / Caltech) নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মহাকাশবিষয়ক জরিপ সংস্থা Zwicky Transient Facility (ZTF) এর দ্বারা পর্যবেক্ষণে গ্রহটির মৃত্যুর পর আলোকিক আলোর ঝলকানি (মানুষের চোখে দৃশ্যমান) দেখা গেছে ৷ ভারতীয় তরুণ বাঙালি বিজ্ঞানী, জ্যোতির্পদার্থবিদ, পোস্ট ডক্টরাল গবেষক এবং এ গবেষণার প্রধান লেখক কিশলয় দে এর নেতৃত্বে গবেষণাটিতে রয়েছেন Massachusetts Institute of Technology (MIT), Harvard University, California Institute of Technology (CIT / Caltech) সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিশিষ্ট বিজ্ঞানীরা ৷ কিশলয় দে 'নাসা' এর আইনস্টাইন পোস্টডক্টরাল ফেলো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে জ্যোতির্পদার্থবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করছেন । গত ০৩রা মে ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে জ্যোতির্পদার্থবিদ্যা বিষয়ক সাময়িকী নেচার ও লেটারস অনলাইনে এর তথ্য-প্রমাণ প্রকাশিত হয়েছে ।

*তথ্যসূত্র: https://www.nasa.gov/ , আন্তর্জাল (The Internet) । 

* ছবি: https://www.nasa.gov/ [Credits: R. Hurt & K. Miller (Caltech/IPAC)] । 


Thursday, 27 April 2023

অ্যান্টার্কটিকা


I don't know their destination
What their feelings
The words of their mind
I realize the eternal bond of their love
An invisible power
Heavenly relationship
I'm fascinated to their wend
But, they're on their way.

বন্য #antarctica থেকে এক রঙিন অনুপ্রেরণা নিয়ে এসেছে আপনার কাছে ৷ 
পৃথিবীর সর্বদক্ষিণে অবস্থিত মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকার অভ্যন্তরীণ জীবন অত্যন্ত বিরল এবং রূক্ষ ৷ কুমেরু বৃত্তের দক্ষিণে এটি দক্ষিণ মহাসাগর, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণ অতলান্ত মহাসাগর সংলগ্ন দক্ষিণ মেরুদেশীয় (Antarctic) সাগর এবং ভারত মহাসাগরের দক্ষিণভাগ দ্বারা পরিবেষ্টিত । এটিতে ভৌগলিক দক্ষিণ মেরু রয়েছে । মহাদেশটি পূর্ব অ্যান্টার্কটিকা যা মূলত পূর্ব-দক্ষিণ মেরুদেশীয় এক উচ্চ বরফে আচ্ছাদিত মহাসাগরীয় মালভূমি Kerguelen Plateau বা Antarctic Plateau বা ভৌগলিক দক্ষিণ মেরু দ্বারা গঠিত । যেখানে রয়েছে Coats Land, Queen Maud Land, Enderby Land, Mac. Robertson Land, Wilkes Land এবং Victoria Land ইত্যাদি । পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার Dome Argus নামে পরিচিত বরফের গম্বুজটি ৪০৯১ মিটার (১৩৪২২ ফুট), যা দক্ষিণ মেরুদেশীয় বরফের সর্বোচ্চ বৈশিষ্ট্য । পূর্ব অ্যান্টার্কটিকা বেশিরভাগ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত এবং পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার চেয়ে বড়, যা সম্পূর্ণ পশ্চিম দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত ও এর স্থানাঙ্ক ৮০° দক্ষিণ ৯০° পূর্ব । অন্যদিকে পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকা যেটি মূলত পাহাড়ী দ্বীপকে একটি বরফের চাদর দ্বারা আবৃত রাখে ।
ইংরেজী Antarctic শব্দটি মধ্য ফরাসি Antartique / Antarctique (আর্কটিকের বিপরীতে) এবং লাতিন শব্দ Antarcticus (উত্তরের বিপরীতে) থেকে উদ্ভূত হয়েছে । Antarctica নামটি প্রকৃতপক্ষে গ্রিক যৌগিক শব্দ ‘আন্তার্কতিকে’ এর রোমান রূপ । প্রাচীন কাল থেকে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী অ্যান্টার্কটিকা আবিষ্কার এবং অনুসন্ধানে জড়িত ছিলেন । আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০ অব্দে প্রাচীন গ্রীসে ধ্রুপদী যুগে বিশ্ববিখ্যাত গ্রীক বিজ্ঞানী, দার্শনিক, পলিম্যাথ, প্রাণিবিজ্ঞানের জনক Aristotle আবহাওয়াবিদ্যা সংক্রান্ত গ্রন্থ Meteorologica বা Meteora তে দক্ষিণ মেরুদেশীয় (Antarctic) অঞ্চলের কথা উল্লেখ করেন । গ্রীক ভূগোলবিদ, মানচিত্রকার, গণিতবিদ, গাণিতিক ভূগোলের প্রতিষ্ঠাতা Marinus of Tyre খ্রিস্টীয় ২য় শতাব্দীতে তার বিশ্ব মানচিত্রে অ্যান্টার্কটিক নামটি ব্যবহার করেন । লাতিন লেখক, পণ্ডিত Alexander Polyhistor এর ছাত্র, Caesar Augustus এর একজন মুক্ত ব্যক্তি Gaius Julius Hyginus এবং নুমিডিয়ান ল্যাটিন ভাষার গদ্য লেখক, প্লেটোনিস্ট দার্শনিক, অলংকারশাস্ত্রের শিক্ষক Apuleius (খ্রিস্টীয় প্রথম-দ্বিতীয় শতাব্দীতে) দক্ষিণ মেরু বা দক্ষিণ মেরুদেশীয় অর্থে রোমানীকৃত গ্রীক পোলাস আন্তার্কতিকাস (লাতিন: Polus antarcticus) নামটিকে গ্রহণ করেন । ইংরেজ কবি, লেখক এবং ইংরেজি সাহিত্য বা কবিতার জনক Geoffrey Chaucer এর লেখা একটি গ্রন্থে ১২৭০ খ্রিস্টাব্দে প্রত্যয়িত পুরাতন ফরাসি Pole antartike (আধুনিক Pôle antarctique) এবং সেখান থেকে মধ্য ইংরেজি Pol antartik নামটি প্রথম পাওয়া যায় ।

এ মহাদেশটি Terra Australis নামে পরিচিত । প্রায় ৬৫০ খ্রিস্টাব্দেরও অনেক আগে মধ্যযুগ এবং রেনেসাঁ বা নবজাগরণের সময়ে ইউরোপীয় ভূগোলবিদরা সুদূর দক্ষিণে একটি পৌরাণিক ভূমি Terra Australis Incognita (অজানা দক্ষিণাঞ্চলীয় ভূমি) সম্পর্কে অনুমান করেছিলেন । Rarotongan মাওরি ভাষার মৌখিক ঐতিহ্য Ui-te-Rangiora থেকে জানা যায়, একজন পলিনেশিয়ান অভিযাত্রী Tamarereti যিনি নিউজিল্যান্ডের উত্তর দ্বীপের Aotearoa এর দক্ষিণে যাত্রা করেছিলেন এক অতি ঠাণ্ডা বরফপূর্ণ বা হিমায়িত অঞ্চলে । ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা সম্ভবত ১৫২০ খ্রিস্টাব্দের দিকে প্রথম অ্যান্টার্কটিকার কাছে এসেছিলেন । ১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে স্পেনীয় অন্বেষণকারী ও সমুদ্র অভিযাত্রী Gabriel de Castilla অ্যান্টার্কটিকা পর্যবেক্ষণ করেন । পরবর্তীতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অভিযাত্রী, পর্যটক, গবেষক, ভূতত্ত্ববিদ, ভূ-পদার্থবিদ, হিমবিজ্ঞানী, জীববিজ্ঞানী এবং নানা পেশার মানুষ এখানে আসতে শুরু করেন । পর্যায়ক্রমে তারা অদম্য সাহস, শক্তিশালী প্রেরণা ও উদ্দীপনা নিয়ে বীরত্বপূর্ণ নানা প্রকার অভিযান, অন্বেষণ, আবিষ্কার, বাণিজ্য (বিশেষ করে শিকার), সমুদ্র গমনপথ সহজীকরণ, আন্তর-আকাশের (Stratosphere) ওজোন গ্যাস স্তর অধ্যয়ন, আবহাওয়া ও উচ্চ বায়ুমণ্ডলীয় তথ্য সংগ্রহ, বরফ পাত (Ice sheet) জুড়ে চিহ্নিতকরণ, চৌম্বকীয় রূপরেখা তৈরি, জৈবিক সম্ভাবনা (স্থানীয় প্রজাতিতে দরকারী রাসায়নিক যৌগ এবং জিনের অনুসন্ধান), মানচিত্রবৎ (Cartographic) এবং প্রযুক্তিগত উন্নতির পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে দুর্দান্ত অগ্রগতি সাধন করেন । তাদের বৈজ্ঞানিক প্রকল্প এবং গবেষণা প্রচেষ্টাগুলো হচ্ছে: International Antarctic Glaciological Project, Dry Valley Drilling Project, Biomass (Biological Investigations of Antarctic Systems and Stocks), IceCube (South Pole Neutrino Observatory), Southern Ocean Observing System (SOOS) ইত্যাদি । এ কার্যক্রমগুলোর অধীনে পরিচালিত গবেষণায় কার্যত সমস্ত ভৌত বিজ্ঞানের প্রতিনিধিত্ব করা হয় । উল্কাবিদ্যা ও গ্রহসংক্রান্ত ভূতত্ত্ব, মহাদেশীয় প্রবাহ, ভূপদার্থবিদ্যা, জ্যোতির্পদার্থবিদ্যা, আবহবিদ্যা ও জলবায়ু ইতিহাস, জীববিদ্যা এবং জনসংখ্যার অধ্যয়নের মতো ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রগুলোতে সরাসরি প্রভাব ফেলে । জৈবিক কার্যক্রমগুলিো দক্ষিণ মেরুদেশীয় বিষয়গুলোর অন্তর্নিহিত আগ্রহ, বাস্তুবিদ্যা এবং সংরক্ষণে বিশ্বের অন্যত্র প্রতিফলিত করে । দক্ষিণ মেরুদেশীয় তিমি শিকারের ইতিহাস বিজ্ঞানীদের কাছে জৈবিক জনসংখ্যা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্ট করে তুলেছে এবং ৬০° সেলসিয়াসের নিচের এলাকায় দীর্ঘকাল ধরে যেখানে বৃহত্তর বা ক্ষুদ্রতর পরিমাণে প্রকৃতির মজুদ ছিল । এছাড়া সম্ভবত অন্যান্য মহাদেশের মতো এখানেও খনিজ এবং পেট্রোলিয়ামের সম্ভাবনাকে গুরুত্বপূর্ণভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে ।

উত্তর মেরু বা সুমেরু হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরে অবস্থিত বিন্দু (৯০° অক্ষাংশ), যেটি দক্ষিণ মেরুদেশীয় মহাসাগরের (Arctic sea) মধ্যভাগে অবস্থিত । এই মহাসাগরের উত্তরাংশের জল বছরের অধিকাংশ সময়ই ধবধবে সাদা সামুদ্রিক বরফে জমাটবদ্ধ থাকে । উত্তর মেরুর সামুদ্রিক গভীরতা প্রায় ১৩৪১০ ফুট (৪০৮৭ মিটার) । গ্রীষ্ম ও শীত এখানে দুটি ঋতু । ১৮৭ দিন গ্রীষ্মকাল সময়টি সম্পূর্ণই দিন এবং ১৭৮ দিন শীতকাল সময়টি সম্পূর্ণই রাত থাকে । শীতকালে গড় তাপমাত্রা -৩৪° সেন্টিগ্রেড এবং গ্রীষ্মকালে গড় তাপমাত্রা ০° সেন্টিগ্রেড থাকে । উত্তর মেরুতে মাংসাশী হিংস্র প্রাণী শ্বেত মেরু ভাল্লুক (Polar bear) এবং ঠাণ্ডা বরফ জলে কয়েক প্রজাতির মাছ বসবাস করে । উত্তর অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপ এবং সাব-অ্যান্টার্কটিক দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলসমূহে Chinstrap, Gentoo, Rockhopper, Macaroni প্রজাতির অসংখ্য পাখির আবাসস্থল । উত্তর মেরুতে সুনির্দিষ্ট কোনো ঘড়ির সময় নেই এবং এ অঞ্চলটিতে পৃথিবীর অন্যান্য অংশের মতো কোনো সময় অঞ্চলও নেই । এখানে কোনো জনবসতি নেই । উত্তরের মেরু অঞ্চল থেকে ব্যতিক্রমভাবে বরফের নিচে শুষ্ক ভূমি রয়েছে । ধারণা করা হয়, ০৬ই এপ্রিল ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের নেভি'র কর্মকর্তা ও অনুসন্ধানকারী Robert Edwin Peary Sr সর্বপ্রথম উত্তর মেরুতে পদার্পণ করেন । অপরদিকে দক্ষিণ মেরু বা কুমেরু হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষিণে, যেটি অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের কেন্দ্রভাগে অবস্থিত । দক্ষিণ মেরুর চারপাশে প্রায় এককেন্দ্রীয়ভাবে পড়ে থাকা অ্যান্টার্কটিকার নামের অর্থ হচ্ছে ''আর্কটিকের বিপরীত'' (Opposite to the Arctic) ।

অ্যান্টার্কটিকা হচ্ছে বিশ্বের দক্ষিণতম এবং পঞ্চম বৃহত্তম মহাদেশ । ইউরোপের তুলনায় শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ বড় । এটির আয়তন অস্ট্রেলিয়ার দ্বিগুণ এবং প্রায় ১৪২০০০০০ বর্গকিলোমিটার (৫৫০০০০০ বর্গমাইল) । অ্যান্টার্কটিকার শতকরা ৯৮ ভাগ অঞ্চল যা প্রায় ৫৪ লক্ষ বর্গমাইলেরও বেশি জায়গা জুড়ে সম্পূর্ণরূপে শুভ্র বরফের এক বিশাল চাদর দ্বারা আবৃত থাকে । বরফের গড় পুরুত্ব ১.৯ কিলোমিটার (১.২ মাইল) । মহাদেশীয় বরফের পাতে প্রায় ৭ মিলিয়ন ঘন মাইল (প্রায় ২৯ মিলিয়ন কিউবিক কিলোমিটার) বরফ রয়েছে, যা বিশ্বের বরফের প্রায় ৯০ শতাংশ এবং এর ৮০ শতাংশ স্বাদু জলের প্রতিনিধিত্ব করে । বরফের গড় বেধ প্রায় ৫৯০০ ফুট (১৮০০ মিটার) । বরফের তাক বা সমুদ্রের উপর ভাসমান বরফের চাদর Ross Sea এবং Weddell Sea এর অনেক অংশ জুড়ে বিস্তৃত । এ তাকগুলো Ross Ice Shelf এবং Filchner-Ronne Ice Shelf একসাথে মহাদেশীয় কিনারার চারপাশে অন্যান্য তাকগুলোর সাথে— অ্যান্টার্কটিকার প্রায় ৪৫ শতাংশ । দক্ষিণ মেরুদেশীয় উপকূলের চারপাশে তাক, হিমবাহ এবং বরফের পাত ক্রমাগত ‘Calve’ বা ‘Discharge’, সমুদ্রের মধ্যে হিমশৈল । এখানে তরল পানির অভাব । কিন্তু এ মহাদেশেই পৃথিবীর শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ বিশুদ্ধ বা স্বাদু পানি হিমায়িত আকারে মজুত রয়েছে, যা গলে গেলে বৈশ্বিক সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৬০ মিটার (২০০ ফুট) বৃদ্ধি পাবে । যদিও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে এখানে বরফ গলতে শুরু করেছে । বরফের স্তর গলে যাওয়ার গতি ক্রমশই দ্রুততর হচ্ছে এবং প্রতিবছর এর উচ্চতা গড়ে ২ সেন্টিমিটার করে কমে যাচ্ছে । তাই পশ্চিম এন্টার্কটিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিজ্ঞানীরা বেশি উদ্বিগ্ন । কারণ এখানকার হিমশৈল বা হিমবাহগুলো কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে । প্রতিটি হিমবাহের উচ্চতা প্রতি বছর ৯ মিটার করে কমে যাচ্ছে । বিজ্ঞানীরা বলছেন যে, পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বায়ু-স্রোতের মাধ্যমে মহাসাগরগুলোর উষ্ণ পানি এ অঞ্চলে প্রবেশ করে হিমবাহগুলোর সংস্পর্শে এসে বরফ গলে যাচ্ছে । ফলে পৃথিবীর নিম্নাঞ্চলের দেশগুলো তলিয়ে যাচ্ছে । বায়ুমণ্ডলে Chlorofluorocarbon এবং Halon নির্গমনের কারণে কড়া গন্ধযুক্ত হালকা নীল রঙের বিষাক্ত গ্যাস ওজনকে অন্যান্য গ্যাসে ভেঙ্গে দেয় । অ্যান্টার্কটিকার চরম ঠাণ্ডা অবস্থা মেরু Stratospheric cloud তৈরি করতে সাহায্য করে । মেঘ রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য অনুঘটক হিসেবে কাজ করে, যা শেষ পর্যন্ত ওজন গ্যাসকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় । ওজন গ্যাস হ্রাসের ফলে আন্তর-আকাশে (Stratosphere) প্রায় ৬ °C (১১ °F) শীতল হতে পারে । শীতলকরণ মেরু ঘূর্ণিকে শক্তিশালী করে এবং তাই দক্ষিণ মেরুর কাছে ঠাণ্ডা বাতাসের বহিঃপ্রবাহকে বাধা দেয় । যার ফলস্বরূপ পূর্ব-দক্ষিণ মেরুদেশীয় বরফের পাত মহাদেশীয় ভর কে শীতল করে । অ্যান্টার্কটিকার প্রান্তস্থ বা সীমান্তবর্তী এলাকা বিশেষ করে দক্ষিণ মেরুদেশীয় উপদ্বীপ তখন উচ্চ তাপমাত্রার শিকার হয়, যা বরফ গলে যাওয়াকে ত্বরান্বিত করে । ওজন গ্যাস হ্রাস এবং উন্নত মেরু ঘূর্ণির প্রভাবও সমুদ্রের বরফের পরিমাণ বৃদ্ধির সময়কালের জন্য দায়ী হতে পারে । বরফের তাক Buttressing এর ক্ষতিকে পশ্চিম-দক্ষিণ মেরুদেশীয় বরফের পাতে ক্ষতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে । তবে পূর্ব-দক্ষিণ মেরুদেশীয় বরফের আশেপাশেও এটি পরিলক্ষিত হয় । উচ্চ উচ্চতার কারণে পূর্ব অ্যান্টার্কটিকা তার পশ্চিম অংশের তুলনায় শীতল । মহাদেশের প্রান্তে, মেরু মালভূমি থেকে শক্তিশালী Katabatic বাতাস প্রায়ই ঝড়ের শক্তিতে বয়ে যায় । গ্রীষ্মকালে নিরক্ষরেখার তুলনায় দক্ষিণ মেরুতে বেশি সৌর বিকিরণ পৌঁছায় কারণ সেখানে প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা সূর্যালোক পাওয়া যায় । অ্যান্টার্কটিকায় বৃষ্টিপাত তুষার আকারে ঘটে, যা মহাদেশটিকে বিশাল বরফের চাদর ঢেকে দেয় । মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে বরফ উপকূলের দিকে প্রবাহিত হয় । বরফ তখন সাগরে চলে যায় । প্রায়শই বিশাল ভাসমান বরফের তাক তৈরি করে । এ তাকগুলো গলে যেতে পারে বা বরফখণ্ড তৈরি করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সমুদ্রের উষ্ণ জলে পৌঁছানোর সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় । বরফের তাক উষ্ণ জলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, যার ফলে বরফের বড় তাকগুলো সমুদ্রে ভেঙে পড়ে । অ্যান্টার্কটিকাকে স্পন্দিত মহাদেশ বলা হয়, কারণ এর মাধ্যমিক বা গৌণ বরফ-সমন্বিত উপকূলরেখার বার্ষিক নির্মাণ এবং পশ্চাদপসরণ । গবেষকদের মতে প্রায় ৪৫ শতাংশ Ice shell, ৩৮ শতাংশ Ice wall, ১৩ শতাংশ Ice stream এবং ০৪ শতাংশ Rock দিয়ে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ গঠিত । মহাদেশটি একটি ঠাণ্ডা শুষ্ক মরুভূমি, যেখানে পানির প্রবেশাধিকার জীবন বা প্রাণের প্রাচুর্য নির্ধারণ করে । যদিও স্থলজ বাস্তুতন্ত্রে ১০০০ এরও বেশি পরিচিত প্রজাতির জীব রয়েছে, যার মধ্যে বেশিরভাগই অণুজীব । সামুদ্রিক অ্যান্টার্কটিকা, দ্বীপপুঞ্জ ও উপকূলগুলো অভ্যন্তরীণ অ্যান্টার্কটিকার চেয়ে বেশি জীবন বা প্রাণকে সমর্থন করে এবং আশেপাশের সমুদ্র জীবন সমৃদ্ধ, যেহেতু জমি অনুর্বর বা বন্ধ্যা ।

Ross Sea এবং Weddell Sea সাগরের মাঝে বিস্তীর্ণ ভূদৃশ্যময় Cape Adere থেকে Coats Land পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ২১০০ মাইল (প্রায় ৩৪০০ কিলোমিটার) এলাকা নিয়ে বিস্তৃত Transantarctic Mountains পর্বতশ্রেণী দ্বারা পূর্ব ও পশ্চিম দুটি অসমান অংশে মহাদেশটিকে বিভক্ত করেছে । অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের মূল ভূখণ্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হচ্ছে পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকা এবং বাকি দুই-তৃতীয়াংশ পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার অন্তর্ভুক্ত । এ ক্ষুদ্রতম পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকা সম্পূর্ণই বরফে আচ্ছাদিত । সাদা বরফে আবৃত সর্ববৃহৎ পর্বতশ্রেণী হচ্ছে Gamburtsev Mountain Range, যা প্রায় ৭০ মাইল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত । উচ্চতা প্রায় ০৯ হাজার ফুট । অ্যান্টার্কটিকার দু’টি সাগর হচ্ছে Ross Sea এবং Weddell Sea । এখানে রয়েছে অসংখ্য হ্রদ । প্রায় ৪০০টি পরিচিত উপ-হিমবাহ হ্রদের মধ্যে বৃহত্তম হ্রদটি হচ্ছে Lake Vostok । স্বাদু জলের এ হ্রদটি সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৪৮৮ মিটার (১১৪৪৪ ফুট) উপরে অবস্থিত । গ্রীষ্মকালে হ্রদের প্রান্তের বরফ গলে যেতে পারে এবং অস্থায়ীভাবে তরল খাই বা পরিখা তৈরি হয় । অ্যান্টার্কটিকায় লবণাক্ত এবং স্বাদুপানির উভয় ধরণের হ্রদ রয়েছে । প্রায় ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘতম নদী হচ্ছে Onyx River । অনেকগুলো পরিচিত দ্বীপ রয়েছে যেমন: Alexander Island, Berkner Island, Thurston Island, Kenny’s Island ইত্যাদি । প্রবল শৈত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে বেঁচে থাকতে সক্ষম এমন উদ্ভিদ ও প্রাণীরাই অ্যান্টার্কটিকায় টিকে থাকতে পারে । তুন্দ্রা অঞ্চলে স্থানীয় প্রজাতির মধ্যে রয়েছে Mite, Nematode, Crab, Emperor Penguin, Adélie Penguin, Seal, Tardigrade, Pelagic fish, শৈবাল, অন্যান্য ক্ষুদ্র অণুজীব এবং তুন্দ্রাঞ্চলীয় বিভিন্ন উদ্ভিদ ইত্যাদি । এ মেরু অঞ্চলের প্রতীক হচ্ছে পেঙ্গুইন । প্রায় ৩০০ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদের বসবাস এ শৈত্যময় পরিবেশে ।

মূল ভূখণ্ডে বিশেষ করে Mount Melbourne, Berlin Mountain, Mount Hampton, Muhlig-Hofman Mountain পর্বতে কয়েকটি সক্রিয় বা জলন্ত আগ্নেয়গিরি রয়েছে । বরফের খুঁতেল বা দাগযুক্ত সক্রিয় আগ্নেয়গিরিগুলো Dot Western Ellsworth Land, Marie Byrd Land, অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের উপকূলের অংশগুলোতে এবং Victoria Land এর উপকূলের কিছু অংশে অবস্থিত । কিন্তু Scotia Arc এর মধ্যে আগ্নেয়গিরির প্রধান কার্যকলাপ কেন্দ্রীভূত হয় । শুধুমাত্র একটি আগ্নেয়গিরি Gaussberg (৯০° E) পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার সমগ্র উপকূলে দেখা যায় । Mount Sidley হচ্ছে সর্ববৃহৎ সুপ্ত আগ্নেয়গিরি এবং এ আগ্নেয়গিরিটি Volcanic Seven Summit এর সদস্য । এর উচ্চতা ৪১৮১–৪২৮৫ মিটার । এটি একটি বিশাল— প্রধানত তুষার আচ্ছাদিত ঢাল আগ্নেয়গিরি, যা Marie Byrd Land এর Executive Committee Range এর অন্তর্ভুক্ত পাঁচটি আগ্নেয় পর্বতের মধ্যে সর্বোচ্চ । এছাড়া Ross Island দ্বীপে বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষিণের সক্রিয় আগ্নেয়গিরিটি হচ্ছে Mount Erebus । প্রতিদিন প্রায় ১০ বার বিস্ফোরিত হয় । অগ্ন্যুৎপাতের ছাই আগ্নেয়গিরির গর্ত থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার (১৯০ মাইল) দূরেও পাওয়া যায় । এ আগ্নেয়গিরিটি মহাদেশের ষষ্ঠ-সর্বোচ্চ আল্ট্রা পর্বত (Ultra mountain) । মহাদেশের অপর প্রান্তে Deception Island দ্বীপের আগ্নেয়গিরিকুণ্ডটি সবচেয়ে বেশি সক্রিয় রয়েছে । আগ্নেয়গিরি প্রায়শঃ লাভা'র পরিবর্তে বরফের স্ফটিক (Crystal) উদগীরণ করে । এছাড়া ধারণা করা হয় Buckle Island, Penguin Island, Paulet Island এবং Lindenberg Island দ্বীপগুলো ছাড়াও বরফের নীচে প্রচুর পরিমাণে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে, যেগুলোর কার্যকলাপের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে বরফ পাতের (Ice sheet) জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে । অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের উত্তর-পশ্চিমে একটি বড় পর্বতমালা Vinson Massif এর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ বা বিন্দুটি হচ্ছে ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ, ১৩ কিলোমিটার চওড়া এবং ১৬০৬৬ ফুট (৪৮৯৭ মিটার) উচ্চতা । এটি Ellsworth পর্বতমালার Sentinel Range এর মধ্যে অবস্থিত । সর্বনিম্ন বিন্দুটি The Bentley Subglacial Trench হচ্ছে পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার Marie Byrd Land এর একটি বিশাল স্থান বৃত্তান্ত ঘটিত খাদ, যেটি ৮০° S এবং ১১৫° W অবস্থিত । পরিখা বা খাদটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৫৫৫ মিটার (৮৩৮২ ফুট) নিচে । এটি (সংলগ্ন Byrd Subglacial Basin এর গভীরতম বিন্দুগুলোর সাথে) পৃথিবী পৃষ্ঠের সর্বনিম্ন বিন্দুগুলোর মধ্যে রয়েছে যা মহাসাগর দ্বারা আবৃত নয়, যদিও এটি বরফ দ্বারা আবৃত ।  

Neoproterozoic যুগের শেষ থেকে Cretaceous পর্যন্ত, অ্যান্টার্কটিকা ছিল সুপারমহাদেশ Gondwana এর অংশ । আধুনিক অ্যান্টার্কটিকা গঠিত হয়েছিল যখন Gondwana ১৮৩ Ma এর দিকে ধীরে ধীরে ভেঙে যায় । Phanerozoic যুগের একটি বড় অংশের জন্য অ্যান্টার্কটিকায় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বা নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু এবং এটি বনে আচ্ছাদিত ছিল । অ্যান্টার্কটিকা উদ্ভিদ জীবনের বিস্তৃত বৈচিত্র্য দেখেছে । অ্যান্টার্কটিকার বেশিরভাগ প্রজাতি লক্ষ লক্ষ বছর আগে সেখানে বসবাসকারী প্রজাতির বংশধর বলে মনে করা হয় । যেমন, তারা অবশ্যই একাধিক হিমবাহ চক্র থেকে বেঁচে আছে । প্রজাতিগুলো বিচ্ছিন্ন উষ্ণ অঞ্চলে অত্যন্ত ঠাণ্ডা জলবায়ুর সময়কাল থেকে বেঁচে ছিল । কুমেরু বৃত্তের বাইরে অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপ এবং এর আশেপাশের এলাকাগুলোতে তাপমাত্রা বেশি থাকায় এ পরিবেশে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা সহ্য করার ক্ষমতা আছে এমন Moss, Algae এবং বিভিন্ন ধরনের Lichen জাতীয় উদ্ভিদের বসবাস রয়েছে । যদিও এরা প্রচণ্ড শীত বা ঠাণ্ডায় সুপ্ত অবস্থায় থাকে এবং অনুকুল পরিবেশে আবার জীবন্ত হয়ে উঠে । অ্যান্টার্কটিকায় মোট প্রায় ৮০০ প্রজাতির গাছের মধ্যে প্রায় ৩৫০টি প্রজাতিই হচ্ছে ছত্রাক বা শ্যাওলা বা শৈবাল জাতীয় উদ্ভিদ (Lichen) । যদিও লাইকেন ধীর গতিতে বর্ধনশীল, বিশেষ করে অ্যান্টার্কটিকায় বেঁচে থাকার জন্য ভালোভাবে অভিযোজিত । তারা সুপ্ত অবস্থায় দীর্ঘ উচ্চ-চাপ সহ্য করতে পারে এবং অবস্থার উন্নতি হলে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সালোকসংশ্লেষী হয়ে উঠে । প্রায় ১০০ প্রজাতির Bryophytes (Moss এবং Liverwort) রয়েছে । উপকূলীয় এবং সামুদ্রিক অঞ্চলে এগুলো প্রাধান্য পায় । অসংখ্য প্রজাতির Mold, Yeast, Fungi, Diatom, Plankton, মিঠা পানির Algae এবং Bacteria ইত্যাদি দক্ষিণ মেরুদেশীয় উদ্ভিদ বা প্রাণী । যদিও মৃত্তিকা মূলত Humic ধরনের নয় । তবে সাধারণত জীবাণুমুক্ত হয় না । এতে ব্যাকটেরিয়া বা বিভিন্ন ধরণের নীল-সবুজ শৈবালের (Blue-green algae) মতো অণুজীব থাকতে পারে । নীল-সবুজ শৈবাল Nostoc স্থানীয়ভাবে মাটিতে ক্ষুদ্র জৈব যৌগ যোগান দেয় । দক্ষিণ মেরুদেশীয় অঞ্চলের হ্রদগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাক বাস করে । প্রায় ১১৫০ প্রজাতির ছত্রাক তালিকাভূক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৭৫০টি অ-লাইকেন (Non-lichen) গঠনকারী । কিছু প্রজাতি চরম পরিস্থিতিতে বিকশিত হয়ে ছিদ্রযুক্ত শিলাগুলোর মধ্যে কাঠামোগত গহ্বরে উপনিবেশ স্থাপন করেছে । McMurdo Dry Valley এবং পার্শ্ববর্তী পর্বত শৈলশিরাগুলোর শিলা গঠনে অবদান রেখেছে । এ ধরনের ছত্রাকের Simplified morphology তাদের অনুরূপ জৈবিক কাঠামোসহ বিপাক ব্যবস্থা খুব কম তাপমাত্রায় সক্রিয় থাকতে সক্ষম এবং জীবনচক্র হ্রাস করে ও তাদের এ ধরনের পরিবেশের জন্য উপযুক্ত করে তোলে । পুরু-প্রাচীরযুক্ত এবং দৃঢ়ভাবে Melanised কোষগুলো তাদের অতিবেগুনী বিকিরণ (UV) প্রতিরোধী করে তোলে । Algae এবং Cyanobacteria তে একই বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষ্য করা যায়, ধারণা করা হয় তারা অ্যান্টার্কটিকায় বিরাজমান অবস্থার সাথে অভিযোজিত । এর ফলে মঙ্গল গ্রহের প্রাণ বা জীবন হয়তো অ্যান্টার্কটিক ছত্রাকের মতোই ছিল, যেমন Cryomyces antarcticus এবং Cryomyces minteri । ছত্রাকের কিছু প্রজাতি রয়েছে যেগুলো অ্যান্টার্কটিকার স্থানীয় । পাখির গোবরে বাস করে এবং বিবর্তিত হয়েছে, তাই তারা অত্যন্ত ঠাণ্ডা গোবরের ভিতরে বৃদ্ধি পেতে পারে । তবে উষ্ণ রক্তের প্রাণীদের অন্ত্রের মধ্য দিয়েও যেতে পারে । আন্টার্কটিকার দ্বীপ বা উপ-দ্বীপগুলোতে বিভিন্ন জাতের লতা রয়েছে যেমন: Deschampia, Deschampia elegantula, Colobanthus crassifolius ইত্যাাদি এবং ঘাস জাতের মধ্যে যেমন: Poa annua পাওয়া যায় । বরফের নিচে ৮০০ মিটার (০.৫০ মাইল) গভীরে Bacteria পাওয়া গেছে । ধারণা করা হয় যে Lake Vostok হ্রদের ভূগর্ভস্থ জলাশয়ের মধ্যে একটি স্থানীয় Bacteria সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব রয়েছে । সেখানে প্রাণ বা জীবনের অস্তিত্ব বৃহস্পতি গ্রহের চাঁদ Europa তে প্রাণ বা জীবনের সম্ভাবনার পক্ষে যুক্তিকে শক্তিশালী করে বলে মনে করা হয়, যার জল-বরফের ভূত্বকের (Water-ice crust) নিচে পানিতে থাকতে পারে । Lake Untersee হ্রদের অত্যন্ত ক্ষারীয় জলে Extremophile bacteria এর একটি সম্প্রদায় বিদ্যমান আছে । এ ধরনের আতিথেয়তাহীন বা আতিথ্যবিমুখ এলাকায় অত্যন্ত স্থিতিস্থাপক বা স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তী বা প্রাণোচ্ছল প্রাণীর (Highly resilient creature) প্রসার আরো ঠাণ্ডা মিথেন সমৃদ্ধ পরিবেশে বহির্জাগতিক জীবনের পক্ষে যুক্তিকে আরো শক্তিশালী করতে পারে । প্রচণ্ড ঠাণ্ডা দক্ষিণ মেরুদেশীয় সমুদ্রে উদ্ভিদ-প্ল্যাংকটন (Phytoplankton) এবং প্রানী-প্ল্যাংকটনের (Zooplankton) প্রাচূর্যতা রয়েছে । ৭০০ প্রজাতির শৈবালের (Algae) মধ্যে প্রায় অর্ধেকই সামুদ্রিক Phytoplankton । বহু রঙের তুষার শৈবাল বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রচুর দেখা যায় । বিভিন্ন প্রজাতির Krill, Euphausia superba, Penguin, Seal, Squid, Whale ইত্যাদি প্রাণী এখানে বসবাস করে থাকে । নিকটবর্তী অঞ্চলের সমুদ্রের তলদেশের প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে Sessile hydrozoan, Coral, Sponge এবং Bryozoan, Pycnogonid, Isopod, Annelid worm polychaeta, Echinoid, Sea star (Starfish) এবং বিভিন্ন ধরণের Crustacean, Mollusk ইত্যাদি । দক্ষিণ সমুদ্রে মাছের দ্রুত বৃদ্ধির অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে । আধুনিক মাছ প্রায় ৩০০০০ প্রজাতির এবং এদের মধ্যে অ্যান্টার্কটিক অভিসরণের দক্ষিণে সমুদ্র থেকে প্রায় ১০০টিরও বেশি পরিচিত নয় । সমুদ্রের তলদেশের ৯০ প্রজাতির প্রায় তিন-চতুর্থাংশই Antarctic Perches Superfamily Notothenioidea এর অন্তর্গত । এ গহীন সমুদ্রে Zoarcidae বা Eel-pout, Liparidae, Macrouridae, Gadidae বা Cod, Barracuda, Lantern এবং বিরল প্রজাতির Nonbony ধরনের Hagfish ও Skate মাছ রয়েছে । অ্যান্টার্কটিক মাছগুলো ঠাণ্ডা জলের সাথে ভালোভাবেই অভিযোজিত হয়ে থাকে । সাগর তলদেশের মাছগুলো অত্যন্ত স্থানীয়, শতকরা ৯০ ভাগ প্রজাতি অন্য কোথাও পাওয়া যায় না । এটি অন্যান্য জৈবিক এবং ভূতাত্ত্বিক প্রমাণকে সমর্থন করে যে, অ্যান্টার্কটিকা খুব দীর্ঘ সময় ধরে বিচ্ছিন্ন ছিল । Ross sea এবং Weddell sea এর বরফ তাকের মধ্যে ঠান্ডায় জমে যাওয়া বড় বড় মাছ পাওয়া গেছে । কার্বনের তেজষ্ক্রীয় রূপভেদ নির্ণয় বা প্রত্নবস্তুর বয়স নির্ধারণকারী Radiocarbon dating (Carbon-14 dating) করে এ মাছগুলোর বয়স প্রায় ১০০০ বছরেরও বেশি বলে জানা যায় । উল্লেখ্য যে: Radiocarbon dating হচ্ছে কার্বনের একটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ, রেডিওকার্বনের বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে জৈব উপাদান ধারণকারী বস্তুর বয়স নির্ধারণের একটি পদ্ধতি । ধারণা করা হয়, মাছগুলো সমুদ্রের খুব গভীরে পৌঁছে এবং বরফের মধ্যে আটকা পড়েছিল । পরবর্তীতে বরফের তাকগুলো ক্ষয় হয়ে যাওয়ার কারণে মাছগুলো বরফের উপর উঠে আসে । পৃথিবীর বিরান ও হিমশীতল এ মহাদেশে সবুজের কোনো চিহ্ন নেই । মশা, পিঁপড়া ও সরীসৃপের কোনো অস্তিত্ব নেই বললেই চলে । এক প্রকার বিচিত্র Ice fish মাছ রয়েছে, যার রক্ত লাল নয় কিন্তু স্বচ্ছ জলের মতো । প্রচণ্ড ঠাণ্ডার কারণে কিছু মাছের শরীরে বিপাকক্রিয়া (Metabolism) বিলম্বে ঘটে । Dissotichus mawsani এবং Trematomus প্রজাতির মাছের মধ্যে এক অবিশ্বাস্য ক্ষমতা রয়েছে যে, প্রচণ্ড ঠান্ডায়ও এদের রক্ত জমাট বাঁধে না । এছাড়া এদের রক্তে এক ধরনের Antifreeze ক্ষমতাও রয়েছে । এখানে রয়েছে নানা ধরণের কীটপতঙ্গ বা পোকামাকড়, পরজীবী এবং এক প্রকার পাখাবিহীন মাছি । যেমন: স্থানীয় স্থলজ (Antarctic microfauna) সম্পূর্ণরূপে অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে Heliozoan, Rotifer, Tardigrade, Nematode, Ciliate protozoan ইত্যাদি । প্রধান Arthropod গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে Acarina (Mite), Mallophaga (Biting lice), Collembola (Springtail), Anoplura (Sucking lice), Diptera (Midge), Siphonaptera (Flea) ইত্যাদি । দুই প্রজাতির গুবরে পোকা রয়েছে এবং এরা সম্ভবত অস্থানিক, অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের কাছাকাছি দ্বীপ থেকে পরিচিত । আজকের অনুর্বর অ্যান্টার্কটিকের প্রাকৃতিক ভূচিত্রের সাথে প্রাচীন Paleozoic এবং Mesozoic যুগের প্রাকৃতিক ভূচিত্রের পার্থক্য অনেক । Antarctic glaciation সম্ভবত ৫০ মিলিয়ন বছর আগে শুরু হয়েছিল । সমস্ত সংবহনতান্ত্রিক (Vascular) উদ্ভিদ (Fern, Conifer এবং ফুলের গাছ) উত্তর দিকে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছিল । শুধুমাত্র অ-কাঠীয় (Nonwoody) প্রজাতি উপ-দক্ষিণ মেরুদেশীয় অঞ্চলে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং খুব কমই দক্ষিণ মেরুদেশীয় অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করেছে । অ্যান্টার্কটিকার বিপরীতে, দক্ষিণ মেরুদেশীয় অভিসরণের দক্ষিণে, উপ-দক্ষিণ মেরুদেশীয় উদ্ভিদসংক্রান্ত অঞ্চলের অভিসরণের উত্তরে অবস্থিত— South Georgia, Crozet, Kerguelen, Macquarie Island দ্বীপগুলোতে অনেক প্রজাতির সংবহনতান্ত্রিক উদ্ভিদের প্রাচুর্যতা রয়েছে । শুধুমাত্র দক্ষিণ জর্জিয়াতে অন্তত ৫০টি প্রজাতি চিহ্নিত করা হয়েছে । এখানে বীজগুটি (Spore) দ্বারা পুনরুৎপাদনকারী উদ্ভিদগুলো অ্যান্টার্কটিকার বৈশিষ্ট্য এবং বীজ উদ্ভিদগুলো প্রধানত উপ-দক্ষিণ মেরুদেশীয় অঞ্চলগুলোর বৈশিষ্ট্য । দক্ষিণ মেরুদেশীয় এবং উপ-দক্ষিণ মেরুদেশীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রকে মানুষ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে । তিমি শিকারের ঘাঁটি বা স্থানে সংবহনতান্ত্রিক উদ্ভিদের পরক বা অস্থানিক প্রজাতির প্রবর্তন করা হয়েছে এবং নিঃসন্দেহে সমস্ত দক্ষিণ মেরুদেশীয় ঘাঁটির কাছে অনেক অস্থানিক অণুজীব বিদ্যমান । স্থানীয় নয় এমন তৃণভোজী প্রাণী প্রধানত ভেড়া এবং খরগোশ অনেক উপ-দক্ষিণ মেরুদেশীয় দ্বীপের উদ্ভিদ সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছে । এছাড়া পর্যটকদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা অ্যান্টার্কটিকার ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রের উপর প্রভাব ফেলেছে বা ফেলবে । 

আন্টার্কটিকা ও কুমেরু বৃক্তের বাইরে দক্ষিণে মহাদেশের দ্বীপগুলোতে পরিচিত প্রায় ৪৫টি প্রজাতির পাখি বাস করে । এদের মধ্যে রয়েছে Snow petrel (Pagodroma nivea), Antarctic petrel (Thalassoica antarctica), বিপন্ন প্রজাতি ও হিংস্র শিকারী আন্টার্কটিকার বাজ বা ঈগল জাতীয় পাখি South polar skua (Stercorarius McMormic), Fulmer বা Giant Antarctic petrel (Macronectes giganteus), Cormorant (Phalacrocorax atriceps), Diving petrel, পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম আকাশ ভ্রমণকারী (১০ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ৩৪ গ্রাম ওজন) ক্ষুদ্রতম পাখি Storm petrel (Oceanites oceanicus), Pintail, Gull, Tern, Sheathbill এবং Pipit ইত্যাদি । পাখিগুলো সামুদ্রিক খাবারের উপর নির্ভরশীল । বেশিরভাগ পাখি প্রতি শরৎকালে মহাদেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে যায় এবং উত্তর দিকে বরফ গাঁটরি বা ফেটি (Ice pack) তৈরি হওয়ার সাথে সাথে অ্যান্টার্কটিকার “Secondary” উপকূলরেখা অনুসরণ করে । এক গবেষণায় দেখা যায় যে, কিছু অ্যান্টার্কটিক পাখি সারা বিশ্বে ভ্রমণ করে । মহাদেশীয় অভ্যন্তরে, এমনকি দক্ষিণ মেরু ছাড়িয়েও Skuas এবং Petrel পাখিগুলো মাঝে মাঝে মহাদেশ অতিক্রম করতে পারে । উড়ন্ত পেঙ্গুইনসহ অ্যান্টার্কটিক পাখিদের এক শক্তিশালী স্ব-গৃহে প্রত্যাবর্তনের সহজাত প্রবৃত্তি এবং চমৎকার নেভিগেশনাল ক্ষমতা রয়েছে । তাদের একটি উচ্চ বিকশিত বা বেশ উন্নত Sun-azimuth orientation system এবং জৈবিক ঘড়ি প্রক্রিয়া (Biological clock mechanism) রয়েছে যে, এটি ক্রমাগত উচ্চে থাকা সত্ত্বেও এমনকি সূর্যের সাথে কাজ করে । Adélie পেঙ্গুইনগুলো তাদের বাসা থেকে ১৯০০ মাইল পর্যন্ত পথ মুক্তভাবে উড়ে যায় এবং এক বছরের মধ্যে পুনরায় ফিরে আসে । অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের উত্তর প্রান্তে সেমুর দ্বীপ এবং আরো কয়েকটি স্থানে পাওয়া জীবাশ্ম পরীক্ষা করে প্রায় ৪০ মিলিয়ন বছর আগে Eocene যুগের এ উড়ন্ত পাখিদের বিবর্তন ইতিহাস পাওয়া গেছে । এ মহাদেশের শুকনো উপত্যকা অঞ্চল হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্কতম অঞ্চল । এখানে টকটকে লাল পানির রক্ত ঝর্না বা জলপ্রপাত রয়েছে । পানির সাথে প্রচুর পরিমাণে আয়রন অক্সাইড থাকার কারণে এ পানি লাল দেখায় । বিস্ময়কর যে, প্রচণ্ড শীতল ও তুষারমণ্ডিত এ অঞ্চলে কোনো ভাল্লুক নেই । আরেকটি মজার বিষয় হচ্ছে যে, পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের চেয়ে এখানে নক্ষত্র পতনের দৃশ্য সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ।

The International Council for Science (ICSU) ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে Special Committee on Antarctic Research (SCAR) সংক্রান্ত একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে এবং পরবর্তীতে 'অ্যান্টার্কটিক চুক্তি' সম্পন্ন হয় । অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের মালিকানা কারো দখলে নেই । তবে বেশ কয়েকটি দেশ এর বিভিন্ন অংশের উপর নিজেদের আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব বা মালিকানা দাবী করলে ০১লা ডিসেম্বর ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে ১২টি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ‘অ্যান্টার্কটিক চুক্তি’ স্বাক্ষর করার পর শাসিত হচ্ছে এ শীতল মহাদেশটি । ১২টি দেশ হচ্ছে: Argentina, Australia, Belgium, Chile, France, Japan, New Zealand, Norway, South Africa, Russia (The Soviet Union), The United Kingdom, The United States । অ্যান্টার্কটিক চুক্তি রাজনৈতিক কূটনীতিতে একটি অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্য ছিল যে: এটি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য সমগ্র মহাদেশকে সংরক্ষণ করে । এ চুক্তি দ্বারা মহাদেশটিকে বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক অস্ত্র-মুক্ত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং একটি উদ্ভাবনী পদ্ধতিতে আঞ্চলিক দাবির বিষয়টি নিয়ে কাজ করে । বর্তমানে ৪৮টি দেশ এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে । ফলে এখানে সামরিক কার্যকলাপ, খনিজ সম্পদ খনন, পারমানবিক বিস্ফোরণ এবং পারমানবিক বর্জ্য নিষ্পত্তি ইত্যাদি নিষিদ্ধ করা হয়েছে । আন্তর্জাতিক বিরোধের বিষয়বস্তুতে পরিণত না করা, মানবজাতির কল্যাণের জন্য শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে সহায়তা, অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ-সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষিত করা হয়েছে । অধিকন্তু দূরপাল্লার বিমান, রকেট, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং যুদ্ধের পরিবর্তিত প্রকৃতির ক্রমবর্ধমান সামর্থ্যের কারণে ২১ শতকে কৌশলগত সামরিক অবস্থান হিসেবে অ্যান্টার্কটিকার গুরুত্ব হ্রাস পেয়েছে । ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে অ্যান্টার্কটিকার জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য প্রথম আন্তর্জাতিক চুক্তি হয় । অতিরিক্ত Krill মাছ (ইহা একটি প্রাণী যেটি অ্যান্টার্কটিক বাস্তুতন্ত্রে এক বড় ভূমিকা পালন করে) ধরার ফলে এর উপর একটি প্রবিধান প্রণয়ন করে । মৎস্য চাষ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত বা বাস্তুসংস্থানগত সম্পর্ক রক্ষা করার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে The Convention for the Conservation of Antarctic Marine Living Resources (CCAMLR) আন্তর্জাতিক চুক্তিটি কার্যকর হয় । অ্যান্টার্কটিকের খনিজ সম্পদ নিয়ন্ত্রণের জন্যেও ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে একটি প্রবিধান গৃহীত হয়, যেটি ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে কার্যকর করে । এ মহাদেশটিকে একটি 'বিশ্ব উদ্যান' হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য Greenpeace ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত Ross Island দ্বীপে একটি ঘাঁটি স্থাপন এবং ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করে । ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিক তিমি কমিশন দ্বারা 'দক্ষিণ মহাসাগর তিমি অভয়ারণ্য' প্রতিষ্ঠিত হয় । এটি ৫০ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার (১৯ মিলিয়ন বর্গ মাইল) জুড়ে এবং সম্পূর্ণরূপে দক্ষিণ মেরুদেশীয় (Antarctic) মহাদেশকে ঘিরে রয়েছে । অঞ্চলটিতে সমস্ত বাণিজ্যিক তিমি শিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যদিও জাপান গবেষণার উদ্দেশ্যে এই এলাকায় তিমি শিকার অব্যাহত রেখেছে । এই সুরক্ষা সত্ত্বেও, অ্যান্টার্কটিকার জীববৈচিত্র্য এখনও মানুষের কার্যকলাপ থেকে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে । বিশেষভাবে সুরক্ষিত এলাকা শতকরা ২ ভাগ এর কম এলাকা প্রাবরণ করে এবং কম দৃশ্যমান প্রাণীর তুলনায় জনপ্রিয় আবেদনসহ প্রাণীদের জন্য ভাল সুরক্ষা প্রদান করে । সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকার চেয়ে বেশি ভূ-সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে । বাস্তুতন্ত্র স্থানীয় এবং বৈশ্বিক হুমকি দ্বারা প্রভাবিত হয় । বিশেষ করে দূষণ, অ-স্থানীয় প্রজাতির আক্রমণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন প্রভাবে ।

পৃথিবীর হিমঘর অ্যান্টার্কটিকা হচ্ছে একটি মনোরম স্থান । ১৯ শতকের শেষের দিকে এ অঞ্চলে পর্যটন লক্ষ্য করা যায় । বেশিরভাগ ভ্রমণ পরিচালনাকারীরা ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত International Association of Antarctica Tour Operators (IAATO) এর সদস্য । IAATO হচ্ছে একটি স্ব-নিয়ন্ত্রক শিল্প সংস্থা এবং অ্যান্টার্কটিক চুক্তি ব্যবস্থার সাথে যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু বা সম্পর্কযুক্ত । এখানে প্রায় ৮০টি স্থায়ী গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে । বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অসংখ্য বিজ্ঞানী-গবেষক নানা গবেষণা কাজে এখানে নিয়োজিত রয়েছেন । এখানে কোনো স্থায়ী অধিবাসী নেই । তবে গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে গ্রীষ্মকালে প্রায় ৫০০০ লোকের বসবাস রয়েছে, যা শীতকালে প্রায় ১০০০ লোকসংখ্যায় নেমে আসে । দূরবর্তীতা সত্ত্বেও মানুষের নানাবিদ কার্যকলাপের ফলে দূষণ, ওজোন হ্রাস বা নিঃশেষকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মাধ্যমে এ মহাদেশটিতে একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে । যদিও এখানে ভ্রমণ নিয়ন্ত্রিত, ব্যয়বহুল এবং অত্যন্ত কঠিন । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিখ্যাত হেভি মেটাল রক ব্যান্ড ‘Metallica’ এর জনপ্রিয় গান ”Freeze ‘Em All”এর চিত্রায়ন করা হয় এ সফেদ তুষার দেশে । ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে 'মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অ্যান্টার্কটিক গবেষণা কেন্দ্র' বা পরিবেশ বান্ধব পারমাণবিক চুল্লি ‘McMurdo Station’ এর কার্যক্রম শুরু হয় । এ শীতলতম মহাদেশে ০৭টি গির্জা, ০১টি ATM যেটি ১০১৩২৫ bar বা ১০১৩২৫ pascal এবং ০১টি পানশালা রয়েছে । এছাড়া এখানে রয়েছে British Base Camp বা সংগ্রহশালা যেটি সর্ব দক্ষিণের একটি ডাকঘর (Penguin post office) হিসেবে পরিচিত । ইন্টারনেট জগতে অ্যান্টার্কটিকার নিজস্ব ওয়েব ডোমেইন হচ্ছে .aq । নরওয়ের অধিবাসী Roald Amundsen হচ্ছেন প্রথম মানুষ যিনি ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই ডিসেম্বর অ্যান্টার্কটিকার দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছেন । এখানে শীত এবং গ্রীষ্ম দু’টি ঋতু । গ্রীষ্মকালে সূর্য কিরণ থাকলেও শীতকালে প্রায় চার থেকে ছয় মাস সূর্যের মুখ দেখা যায় না । অঞ্চলটির বৈশিষ্ট্য এমনই যে, ঝকঝকে দিনের আলোয় ক্ষণিকেই তুষার ঝড়ের তাণ্ডবে প্রকৃতি তার বৈচিত্র্যময় রূপের আত্মপ্রকাশ করে । শৈত্য প্রবাহ, তুষার ঝড়, আদ্র বাতাস, ঘূর্ণিঝড়, মেঘলা এবং কুয়াশাপূর্ণ আবহাওয়া বিদ্যমান । বৃষ্টি প্রায় অচেনা । মেরু মালভূমিতে প্রতি বছর প্রায় ২ ইঞ্চি (৫০ মিলি মিটার) গড় বৃষ্টিপাত হয় । যদিও উপকূলীয় অঞ্চলে ১০ গুণ বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে । এছাড়া মেরু ঘূর্ণি (Polar vortex) মেঘের সৃষ্টি হয় । এ গ্রহের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে এখানে সবচেয়ে বেশি বাতাস প্রবাহিত হয় । তীব্র ঝড়ো বাতাসের গতিবেগ প্রতি ঘন্টায় প্রায় ২০০ মাইল । অ্যান্টার্কটিকায় শীতকালীন তাপমাত্রা −১২৮.৬ °F (−৮৯.২ °C), যা বিশ্বের সর্বনিম্ন নথিভুক্ত তাপমাত্রা । সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি −৭৬ °F (−৬০ °C) । তবে তাপমাত্রা স্থানভেদে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয় । শীতলতম মাসের গড় তাপমাত্রা হচ্ছে উপকূলে −৪ °F থেকে −২২ °F (−২০ °C থেকে −৩০ °C) এবং অভ্যন্তরীণ অংশে −৪০ °F থেকে −৯৪ °F (−৪০ °C থেকে −৭০ °C) । অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপে গ্রীষ্মের মাঝামাঝি তাপমাত্রা ৫৯ °F (১৫ °C) পর্যন্ত পৌঁছতে পারে । পৃথিবীর সকল মহাদেশের মধ্যে অ্যান্টার্কটিকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭২০০ ফুট (২২০০ মিটার) গড় উচ্চতায় মহাদেশটি সামগ্রিকভাবে সবচেয়ে শীতল, শুষ্ক এবং সর্বাধিক ঝটিকাপূর্ণ । বেঁচে থাকার জন্য অ্যান্টার্কটিকা কঠিন জায়গা ৷

Snow petrel (Pagodroma nivea) #snowpetrels পাখি হচ্ছে Pagodroma গোত্রের একমাত্র সদস্য । এটি প্রায় একটি কবুতরের আকার, খাঁটি বা সম্পূর্ণ সাদা, কয়লা কালো চোখ, একটি ছোট ঠোঁট এবং নীলাভ ধূসর চরণযুগল রয়েছে । প্রাচীন গ্রীক শব্দ Pagos হচ্ছে এর বংশ নাম, যার অর্থ ‘তুষার’ বা ‘সমুদ্র-বরফ’ । Dromos শব্দের সাথে একত্রিত হয়ে যার অর্থ হচ্ছে ‘দৌড়বাজ’ (Racer বা Runner) । নির্দিষ্টভাবে বিশেষণটি লাতিন শব্দ Niveus থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘তুষার-সাদা’ । ‘Petrel’ শব্দটি Peter the Apostle এবং তার জলের উপর হাঁটার গল্প থেকে উদ্ভূত হয়েছে । Snow petrel পাখির দু’টি উপ-প্রজাতি রয়েছে যেমন: P. n. nivea (Forster, G, 1777) এবং P. n. major (Schlegel, 1863) । এ পাখিটি ঘন ঘন দিক পরিবর্তনের সাথে অস্থিরগতিতে উড়ে । প্রায় সম্পূর্ণরূপে ঠাণ্ডা অ্যান্টার্কটিক জলে সীমাবদ্ধ থাকে । ঝাঁকে ঝাঁকে— বিশেষভাবে হিমশৈলের উপর এদেরকে বসে থাকতে দেখা যায় । প্রধানত মাছ, কিছু Cephalopod, Mollusk, Krill, মৃত/মৃতজাত সীল, সীল এর গর্ভফুলের গলিত মাংস, তিমি'র মৃতদেহ এবং মৃত পেঙ্গুইন ছানা খেয়ে থাকে । শীতকালে পাখিগুলো বরফ রাশি, ভাসমান তুষারস্তর এবং খোলা সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে । অ্যান্টার্কটিক মহাদেশ এবং এর বিভিন্ন দ্বীপে বসতি বা উপনিবেশগুলোতে প্রজনন ঘটায় । বাসা বাঁধার মৌসুমে Snow petrel পাখিগুলো দূরবর্তী উঁচু Queen Maude Land পাহাড়ের উপরে বাসা বাঁধতে কয়েকশ মাইল পথ উড়ে যায় ৷ এদের অংশীদাররা (Partners) সারা জীবনের জন্য বিশ্বস্ত (প্রায় ২০ বছর) । খাদ্যের জন্য তাদেরকে কয়েক দিন পর পর সমুদ্রে কঠিন যাত্রা করতে হয় এবং এক সময় ছানাগুলোর জন্য খাদ্য নিয়ে ফিরে আসে ৷ যাই হোক, এ রকম ককর্শ বা কঠোর পরিস্থিতিতে জন্মগ্রহণ কেমন হবে তা কল্পনা করা খুবই কঠিন ৷ সহনশীলতা এখানে বেঁচে থাকার পূর্বশর্ত ৷

২০১২ খ্রিস্টাব্দে @natgeo এর জন্য আন্তর্জাতিক চিত্রগ্রাহক @ladzinski সুদূর অ্যান্টার্কটিকা থেকে Snow petrel পাখির এ চমৎকার ছবিটি ধারণ করেন এবং এখানে তার ৫০ দিনের আরোহণ ও অনুসন্ধান অ্যাসাইনমেন্টের সময় ৷ অ্যান্টার্কটিকা হচ্ছে পৃথিবীর বৃহত্তম মরুভূমি এবং বিশ্বের নথিবদ্ধ ইতিহাসে সর্বশেষ আবিষ্কৃত অঞ্চল ৷ এটি এমন একটি জায়গা যা আপনাকে সমস্ত কিছুর জন্য কাজ করতে তৈরি করে তোলে । এ Snow petrel পাখি’রা কিভাবে বংশ বৃদ্ধির মধ্যদিয়ে যায়— তা দেখে মুগ্ধ করার কোনো কমতি ছিল না ৷ এ রকম একটি রূঢ় ও দুর্গম জায়গায় তার (এবং সাথে অন্যরা) একমাত্র সঙ্গী ছিল এ পাখিগুলো এবং পৃথিবীর অচেনা অংশে এটি পেয়ে সে কৃতজ্ঞ ৷ আমিও মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকি ছবির পাখিগুলোর দিকে ৷ অনুভব করি তাদের জীবন, চলার পথ, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, খাদ্য অন্বেষণ, আবাস, বংশবৃদ্ধি, সহনশীলতা (অভিযোজন ক্ষমতা) এবং #Antarctica কে ৷ এটি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে । সত্যিকার অর্থেই, অজানা রহস্যেঘেরা প্রকৃতির এ এক অনুপম সৌন্দর্য ৷ পৃথিবীর ঐ অচেনা-অজানা অংশে যাওয়া আমার পক্ষে হয়তো কখনোই সম্ভব হবে না! তাই আমিও আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ চিত্রগ্রাহক @ladzinski এর কাছে । কারণ, তার মাধ্যমে অসাধারণ সুন্দর ছবিটি দেখতে পেয়েছি ৷ তা না হলে, এ ক্ষণস্থায়ী জীবনে বৈচিত্র্যময় পৃথিবীর অনেক অজানা-অদেখা’র মাঝে এটিও অপূর্ণ রয়ে যেতো ৷ 

তথ্যসূত্র: আন্তর্জাল (The Internet) ।

ছবি: Keith Ladzinski
https://www.instagram.com/p/B_PwFMkBx-h/?fbclid=IwAR0a9Zz_t-oqMMY75cjbnK4HYTfZ7vtOt2_P738heZ2G6ZpGHY0kEWFzoMg https://www.instagram.com/p/BZzuIXkAa1d/

আমার প্রণয়িনীর চোখ সূর্যের মত নয়

 My mistress’ eyes are nothing like the sun (Sonnet 130)  --------  William Shakespeare , 1564 –1616 My mistress’ eyes are nothing like the ...