Tuesday, 28 January 2025

দূরত্ব

দূর, বহুদূর…

হোক না— শত, হাজার, লক্ষ কিংবা কোটি মাইল দূরত্ব । 

আকাশতো একটাই । 

এ অপার আকাশের রঙ নীল । 

নীলিমায় মিশে আছে তোমার-আমার নীল ভালোবাসা এবং স্বপ্নগুলো । 

আলোর গতির চেয়েও বেশি চোখের পলকের গতি । 

তোমার সংস্পর্শে আসি । 

নীল চোখের চাহনির গভীরতা অনুভব করি । 

এক ঐন্দ্রজালিক প্রসন্নতা । 

আমার অস্তিত্ব জুড়ে তোমার উপস্থিতি । 

যেখানে সুদীপ্ত ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রত্যয় গড়ে ওঠে । 

তোমার অনুপ্রেরণা আত্মবিশ্বাসকে শাণিত করে ।  

আমাদের অগ্রযাত্রাই দ্যুতিময় পথ দেখাবে আগামী প্রজন্মকে । 

জ্যোৎস্না রাতে দুই জনে হাত ধরে হেঁটে যাই মায়াবী সৈকতে । 

এক ফালি পূর্ণিমা চাঁদ । 

নম্র আলোর ঝলক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সমুদ্রের বিস্তীর্ণ জলরাশিতে । 

নয়ন ভরে দেখি তাদের শাশ্বত ভালোবাসার উচ্ছ্বাস । 💙 ©

Saturday, 7 December 2024

একটি দুর্দান্ত বহিঃসৌর গ্রহের আবিষ্কার

 

ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ডের জ্যোতির্বিদ Emma Nabbie এর নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী দল ২০২৪ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে জ্যোতির্বিদ্যা জার্নালে "উত্তপ্ত নেপচুন মরুভূমিতে বেঁচে থাকা: অতি-উষ্ণ নেপচুন TOI-3261b বহিঃসৌর গ্রহের আবিষ্কার” এর বিষয়ে তাদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে । বিজ্ঞানীরা নাসা'র Transiting Exoplanet Survey Satellite (TESS), Las Cumbres Observatory (LCO), ESPRESSO এবং HARPS দূরবীক্ষণ যন্ত্রগুলো ব্যবহার করে আমাদের সৌরজগতের বাইরে গভীর মহাকাশে অবস্থিত একটি বহিঃসৌর গ্রহ TOI-3261b (Exoplanet) আবিষ্কার করেছে । গ্রহটির অন্যান্য নাম হচ্ছে: TIC 358070912b এবং 2MASS J03105467-7331556b । পরবর্তীতে তারা অস্ট্রেলিয়া, চিলি এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত স্থল-ভিত্তিক দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে এ গ্রহটিকে আরো ব্যাপকভাবে পর্যবেক্ষণ করেন । চাঞ্চল্যকর গ্রহটি "উষ্ণ নেপচুন মরুভূমিতে" (Hot Neptune Desert) চৌকোভাবে উচ্চ প্রোজ্জ্বলতায় রয়েছে– যেখানে খুব কম সদস্যের একটি গ্রহগোষ্ঠী বিদ্যমান । এটি ঐ গোষ্ঠীরই অংশ— বড় এবং উত্তপ্ত, যেগুলো একটি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে পরিভ্রমণ করছে । নেপচুন আকারের অতি-স্বল্প সময়ের গ্রহের (Ultra-short period planets বা USPs) সাম্প্রতিক আবিষ্কারটি আমরা মহাকাশ সম্পর্কে যা জানি এবং গ্রহের গঠন তত্ত্ব ও বিবর্তনের বর্তমান উপলব্ধিকে চ্যালেঞ্জ করে । উন্নত দূরবীক্ষণ যন্ত্র এবং ভবিষ্যতের অধ্যয়ন দ্বারা একটি চরম পরিবেশে উষ্ণ মরুভূমির এ বাসিন্দাদেরকে কিভাবে গঠন করে তা সম্পর্কে আরো বিশদভাবে জানতে হলে নতুন আবিষ্কৃত গ্রহটি বিভিন্ন সূত্রের উৎস হতে পারে । লাল রঙের উষ্ণ নেপচুন TOI-3261b বহিঃসৌর গ্রহটি অবিশ্বাস্য! বৈচিত্র্যময় গ্রহটির আকার এবং গঠন আমাদের সৌরজগতের ঘনতম দৈত্য গ্রহ নেপচুনের মতোই । এটি তার মূল নক্ষত্রের (K- type parent star TOI-3261) খুব কাছাকাছি প্রদক্ষিণ করছে । নক্ষত্র থেকে ০.০১৭১৪ AU দূরত্বে রয়েছে এবং চরম তাপমাত্রার কারণে এখানে জীবনধারণ মোটেই সম্ভব না । যদিও নক্ষত্রটির বাসযোগ্য অঞ্চল হচ্ছে ৩৬৪.২ - ৫২৪.৬ AU । এ নিষ্ক্রিয় প্রধান-ক্রম নক্ষত্রটি Hydrus নক্ষত্রমণ্ডলে ৩০০ পার্সেক (৯৭৮.৫ আলোকবর্ষ) দূরে অবস্থিত । অপার মহাকাশের বিস্ময়কর গ্যাস দানব গ্রহটির কোনো পৃষ্ঠ নেই । এটি এমন একটি গ্রহ যে মাত্র ২১ ঘন্টার মধ্যেই তার নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে । যা পৃথিবী'র এক দিনেরও কম । অর্থাৎ একটি 'বছর’ মাত্র ২১ ঘন্টা দীর্ঘ (০.৮৮৩১৩৩ দিন) । সাধারণত নক্ষত্রের কাছাকাছি গ্রহগুলো তীব্র তাপ এবং বিকিরণের কারণে তাদের বায়ুমণ্ডল হারায় । কিন্তু, TOI-3261b গ্রহটি সব নিয়ম ভঙ্গ করছে । আশ্চর্যের বিষয় যে, গ্রহটি নক্ষত্রের কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও এটি একটি ঘন ও ভারী বায়ুমণ্ডল বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে । এ ধরণের কক্ষপথে থাকা বেশিরভাগ গ্রহই সময়ের সাথে সাথে তাদের হালকা গ্যাসগুলো হারিয়ে ফেলে অনুর্বর হয়ে যায় । তবুও, এমন একটি আঁটসাঁট কক্ষপথের কারণে গ্রহটি স্বতন্ত্রভাবে তার গোষ্ঠীতে নিজের স্থান অর্জন করেছে । এখন পর্যন্ত, শুধুমাত্র ৩টি অতি-স্বল্প সময়ের গাঢ় নীল রঙের উষ্ণ নেপচুন বহিঃসৌর গ্রহগুলো যেমন LTT-9779b, TOI-849b এবং TOI-332b এর সাথে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের TOI-3261b গ্রহটিকে চতুর্থ বস্তু হিসেবে পাওয়া গেছে, যা এ নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করা একমাত্র পরিচিত বহিঃসৌর গ্রহ । অনুমান করা হয় যে, হয়তো গ্রহগুলো টিকে থাকতে পারে এবং সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে বায়ুমণ্ডলকে ধরে রাখতে পারবে । মহাজাগতিক বিস্ময়ের অধিকারী TOI-3261b বহিঃসৌর গ্রহের ব্যাসার্ধ হচ্ছে ৩.৮২ R পৃথিবীর ব্যাসার্ধ, যেখানে বৃহস্পতির ০.৩ R । এটির ভর হচ্ছে ৩০.৩ M পৃথিবীর ভর, যেখানে বৃহস্পতির ০.০৯৫৩ M । ঘনত্ব প্রায় ২৯৯৭ kg/m3 । তাপমাত্রা প্রায় ১৭২২ K (১৪৪৯° C) । দূরত্ব ০.০২ AU । উজ্জ্বলতা ৩.৮ R । ওজন প্রায় ৩০.৩ পৃথিবীর ভর । উষ্ণ নেপচুন গ্রহগুলো বিরল তাই নক্ষত্রের এতো কাছাকাছি ঘন গ্যাসীয় বায়ুমণ্ডলকে ধরে রাখা কঠিন । কোনো একটি নক্ষত্র তার চারপাশের বস্তু বা উপাদানগুলোর উপর এক বিশাল মাধ্যাকর্ষণ শক্তি প্রয়োগ করে, যা নিকটবর্তী গ্রহকে ঘিরে থাকা গ্যাসের স্তরগুলোকে ছিনিয়ে নিতে পারে । TOI-3261b গ্রহের মতো অন্যান্য উষ্ণ নেপচুন গ্রহগুলোও বড় হয়ে থাকে । বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, আবিষ্কৃত গ্রহটি সবসময় এরকম ছিল না । হতে পারে, এটি তার ভর হারানোর আগে অনেক বৃহৎ ছিল । সম্ভবত, বৃহস্পতি গ্রহের মতোই বড় এবং তখন থেকেই তার ভরের একটি বড় অংশ হারিয়েছে । জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, এ নক্ষত্র এবং তার গ্রহ ব্যবস্থাটি (TOI-3261 System) প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন বছরের পুরোনো । গ্রহটি এক বিরাট গ্যাস দৈত্য হিসেবে গঠিত হয়েছিল । এটি সম্ভবত দুটি উপায়ে তার ভর হারিয়েছে যেমন (ক) আলোক বাষ্পীভবন (Photoevaporation): নক্ষত্রের শক্তি গ্রহের বায়ুমণ্ডলকে উত্তপ্ত করে, যার ফলে হালকা গ্যাসের কণাগুলোকে মহাকাশে বিলীন করে দেয় । (খ) জোয়ারের টানে (Tidal stripping): যখন নক্ষত্রের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বা শক্তিশালী মহাকর্ষীয় টান গ্রহ থেকে গ্যাসের স্তরগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দূরে সরিয়ে দেয় । তাপীয় বিবর্তন নকশাগুলো থেকে অনুমান করা হয় যে, TOI-3261b গ্রহের মোট ভরের∼৫% সম্ভবত উদ্বায়ী পদার্থ দিয়ে গঠিত । হয়তো, গ্রহটি তার নক্ষত্র থেকে অনেক দূরে গঠিত হয়েছিল যেখানে এ উভয় প্রভাবই কম তীব্র হবে এবং এটি তার বায়ুমণ্ডলকে ধরে রাখার অনুমতি দিয়েছে । এ গ্রহের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে অবশিষ্ট বায়ুমণ্ডল । সুতরাং, অদূর ভবিষ্যতে বায়ুমণ্ডলীয় বিশ্লেষণ “উত্তপ্ত নেপচুন মরুভূমির" এ বাসিন্দার গঠনের ইতিহাস উন্মোচন করতে সহায়তা করবে । রহস্যময় গ্রহটি নেপচুনের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ঘন । এর বায়ুমণ্ডলের হালকা অংশগুলো সময়ের সাথে সাথে দূরে সরে গিয়েছে, শুধুমাত্র ভারী উপাদানগুলোকে রেখে গিয়েছে । গ্রহটি অবশ্যই তার বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন ধরণের উপাদান নিয়ে শুরু করেছে— তবে এ পর্যায়ে ঠিক কি, তা বলা কঠিন । আজ অবধি আবিষ্কৃত অতি-উষ্ণ নেপচুন বহিঃসৌর গ্রহগুলোর মধ্যে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভর ভগ্নাংশের কারণে বায়ুমণ্ডলীয় অনুপ্রেরিত পর্যবেক্ষণের জন্য এ গ্রহকে একটি 'আদর্শ প্রার্থী’ করে তুলেছে । তাই, গ্রহটিকে অবলোহিত আলোতে আরো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এ রহস্যের সমাধান করা যেতে পারে । নতুন আবিষ্কারটি চরম পরিবেশে গ্রহ অধ্যয়নের জন্য দরজা খুলে দিয়েছে । নাসা'র জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মতো উন্নত দূরবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে এ গ্রহের বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন অণু সনাক্তকরণের জন্য এটি একটি শ্রেষ্ঠ উপায় হতে পারে । ফলে, মহাকাশ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদেরকে TOI-3261b গ্রহের অতীত বুঝতেই শুধু সাহায্য করবে না বরং সকল উষ্ণ ও দৈত্যাকার গ্রহগুলোর পিছনের শারীরিক প্রক্রিয়াগুলো এবং এরা কিভাবে কঠোরতম পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেয় বা বেঁচে থাকে সেটি উন্মোচন করতে শুরু করবে ৷ উল্লেখ্য যে, ২০২০ খ্রিস্টাব্দে অতি-স্বল্প সময়ের উষ্ণ নেপচুন বহিঃসৌর গ্রহ LTT-9779b (Cuancoa) প্রথম আবিষ্কার হয়, যেটি একটি জি-টাইপ নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে । গ্রহটি তার নক্ষত্রকে ঘিরে একটি কক্ষপথ সম্পন্ন করতে ০.৮ দিন সময় নেয় এবং নক্ষত্র থেকে প্রায় ০.০১৬৭৯ AU দূরত্বে রয়েছে । পরবর্তীতে TESS পর্যবেক্ষণ যন্ত্র দ্বারা TOI-849b এবং TOI-332b বহিঃসৌর গ্রহ দুটি আবিষ্কৃত হয় । এদের মধ্যে TOI-849b লেট জি-টাইপ নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে যেটি একটি Candidate Chthonian গ্রহ, পৃথিবী থেকে ৭০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত । অপরদিকে, TOI- 332b গ্রহটি জি-টাইপ নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করছে । এটি তার নক্ষত্রকে ঘিরে একটি কক্ষপথ সম্পূর্ণ করতে ০.৮ দিন সময় নেয় এবং নক্ষত্র থেকে ০.০১৫৯ AU দূরত্বে রয়েছে । ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে এ গ্রহটি আবিষ্কৃত হয় । যাই হোক, LTT-9779b এবং TOI-849b উভয় গ্রহই জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের অবলোহিত পর্যবেক্ষণের জন্য সারিতে রয়েছে, যা আগামী বছরগুলোতে এ গ্রহগুলোর বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে আমাদের বোঝার সম্ভাবনাকে প্রসারিত করবে ৷ 

উৎস: www.sci.news , www.science.nasa.gov , www.arxiv.org , www.stellarcatalog.com , www.m.economictimes.com  

ছবি: NASA/JPL-Caltech/K. Miller, Caltech & IPAC

Thursday, 28 November 2024

NGC 2090 ছায়াপথ


 এ অপার মহাবিশ্বের এক রহস্যময় সৌন্দর্য হচ্ছে NGC 2090 ছায়াপথ । মহাবিশ্বের বিশালতা এবং এর মধ্যে যে মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য রয়েছে তা প্রতিনিয়ত আমাদের কল্পনার সীমাকে অতিক্রম করে । সম্প্রতি, দুটি অসাধারণ দূরবীক্ষণ যন্ত্র জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) এবং হাবল স্পেস টেলিস্কোপ (HST) ব্যবহার করে এ বিশেষ NGC 2090 ছায়াপথকে ধারণ করা হয় ৷ এটি এমনই একটি ছায়াপথ যা এর ধুলো, গ্যাস এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ বাহুগুলোর জন্য অনন্য ৷ NGC 2090 হচ্ছে একটি ফ্লোকুলেন্ট সর্পিল ছায়াপথ (Flocculent Spiral Galaxy) যার একটি প্যাঁচানো (Patchy), ধুলোযুক্ত চাকতি এবং বাহুগুলো Flaky বা একেবারেই দৃশ্যমান নয় । এর গঠন SC ধরনের সর্পিল । ছায়াপথটি এখনো ক্রিয়াকলাপে পূর্ণ, চাকতি জুড়ে বিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ে নক্ষত্র গঠনের স্তবক রয়েছে । এ সর্পিল ছায়াপথটি প্রায় ৪০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে Columba এর দক্ষিণ নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত । এটি ২৯শে অক্টোবর ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে স্কটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী James Dunlop আবিষ্কার করেন । বিস্ময়কর এ ছায়াপথটি ESO 363-23, IRAS 05452-3416 বা LEDA 17819 নামেও পরিচিত । এ ছায়াপথের বাহুগুলো আকাশগঙ্গা ছায়াপথ বা সাধারণ সর্পিল ছায়াপথের মতো সারিবদ্ধ নয় । হাবল স্পেস টেলিস্কোপ থেকে দৃশ্যমান আলোর চিত্রগুলোতে ছায়াপথের বাহুগুলো অস্পষ্ট এবং অসম দেখায় । কিন্তু যখন সেই একই ছায়াপথ জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের অবলোহিত ক্যামেরা (Infrared camera) দ্বারা বন্দী করা হয়, তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উঠে আসে । নক্ষত্র জন্মের অঞ্চল এবং ছায়াপথের জটিল গঠনটি ধুলো ও গ্যাস দ্বারা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান । জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের শক্তিশালী অবলোহিত প্রযুক্তি ছায়াপথের গভীরে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য প্রকাশ করতে ধুলোর স্তরকে ভেদ করে । তারকা স্তবকগুলো, ধুলো চলাচল এবং ছায়াপথের গঠন স্পষ্টভাবে ধারণ করা হয় । অন্যদিকে, হাবল স্পেস টেলিস্কোপের ছবিগুলো এ ছায়াপথের বাহু এবং নক্ষত্রের অবস্থানের ভুল বিন্যাস সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য দেয় । এ দুটি দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সম্মিলিত পর্যবেক্ষণ NGC 2090 ছায়াপথে নক্ষত্রের জন্ম, ধূলিকণা এবং ছায়াপথের বিবর্তন সম্পর্কে আরো বিশদভাবে জানতে অনুমতি দেয় । এটি কেবল একটি ছবি নয়, মহাবিশ্বের ইতিহাসের একটি অংশ যা মানবজাতির কৌতূহল এবং অজানাকে জানার চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার প্রতীক । মহাজাগতিক সৌন্দর্যের অধিকারী NGC 2090 ছায়াপথ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মহাবিশ্ব কতোটা বিশাল এবং আমরা কতো কম আবিষ্কার করেছি । এটি আমাদেরকে আরো জানতে, আরো দেখতে এবং এর রহস্যময় সত্যগুলো আবিষ্কার করতে মহাবিশ্বের গভীরে যেতে দুর্দান্তভাবে অনুপ্রাণিত করে । 

ছবি: NASA Solar System Exploration 

তথ্যসূত্র: Science & Cosmic Inside, www.sci.news, উইকিপিডিয়া । 

Wednesday, 27 November 2024

The bird

Bird also have language. 

Which he inherited from his mother. 

The pulse of his soul. 

Invisible divine power. 

However, I do not understand the language of bird. 

What is in his sweet voice? 

Which entangles me in an unknown attraction. 

A rainbow rises in the sky of fickle mind. 

Infinite source of inspiration. 

Bird is the unique beauty of nature. 

I think deeply about him and try to understand. 

The desire of arises to building relationship, love and intimate conversation. 

Competing fly with free bird, the mind wants to mix into the bluey. 

To get an ear I want to listen to the words stored in the depths of his mind. 

But, I can't. 

This is a heartache! 

It hurts me. 

Yet, I feel his language and entity with my heart. 

Where there is absolute peace and heavenly bliss. 


Saturday, 23 November 2024

Glance

Eyes never lie.
Sweetheart is so in love—
I saw her joy.
Waywardness on that dirt road.
Intense desire for unspoken words.
Sometimes adventurousness.
The silence of the millennium in the depths of steadfast glance.
What as if, hundred of question? 
I have seen affection on the sandy sea beach.
Sometimes the glory of her extraordinary beauty.
Secret love tryst with the full moon on moonlight night.
The wailing of a heart burned by the atrocious wildfire of separation.
I have seen her pioneering role in building civilization.
Sometime arrogant pride.
Or the poignant face of defeat.
Nevertheless, her indomitable journey.
Away, far away…
In an unknown world of silence.
But what, she is unbeaten?
At the gentle touch of the beloved the turbulent waves rise in warm blood.
Her heart pulse shakes my being.
A heavenly feeling.
Eternal love.

দৈত্যাকার বেতার ছায়াপথ আবিষ্কার

 


~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ  ও জ্যোতির্পদার্থবিদ Kathleen Charlton এর নেতৃত্বে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক দল আশ্চর্যজনক দানব আকৃতির ছায়াপথের সন্ধান পেয়েছেন । যা পূর্বে কখনোই উন্মোচিত হয়নি । এটি বৃহত্তম মহাজাগতিক কাঠামোর এক নতুন অন্তর্দৃষ্টি । দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাজ্য, স্পেন এবং চীনের গবেষকদের এ নতুন অনুসন্ধানটি সম্প্রতি পরিষেবা সাইট arXiv এ গত ১১ই নভেম্বর প্রকাশিত হয়েছে । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা Cosmological Evolution Survey (COSMOS) এর ক্ষেত্রে এ ছায়পথগুলোকে তদন্ত করতে ৫৪৪ MHz থেকে ১.৬৭ GHz পর্যন্ত বিভিন্ন কম্পাঙ্কে বা স্পন্দনহারে বেতার পর্যবেক্ষণের বিশদ বর্ণালী বিশ্লেষণের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত The MeerKAT radio interferometer বেতার টেলিস্কোপ ব্যবহার করেছেন । উচ্চ কম্পাঙ্কে ছায়াপথগুলোকে অধ্যয়নের জন্য এটি একটি চমৎকার দূরবীক্ষণ যন্ত্র । উক্ত গবেষণাটি The MeerKAT International GHz Tiered Extragalactic Exploration (MIGHTEE) জরিপের অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়েছিল । ফলে, গবেষকগণ ছায়াপথগুলো সম্পর্কে আকর্ষণীয় তথ্যাদি জানতে পেরেছেন । এ ছায়াপথগুলোর অধ্যয়ন মহাজাগতিক-মাপনী প্রক্রিয়াগুলোর সূক্ষদৃষ্টি প্রদান করতে পারে যেমন: প্রত্যেকটি ছায়াপথের গঠন, বিবর্তন, বিকাশ প্রক্রিয়া, আন্তঃগ্যালাকটিক মিথস্ক্রিয়া এবং আন্তঃনাক্ষত্রিক ও আন্তঃগ্যালাকটিক পরিবেশে পারমাণবিক কার্যকলাপের প্রভাব ইত্যাদি । পর্যবেক্ষণগুলোতে বর্ণালী বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিটি ছায়াপথের ফিনকি স্রোত বা প্রবাহে (Jet) প্রাণরসের (Plasma) বয়স মানচিত্রকরণ সম্ভব হয়েছে ।  

এ দৈত্যাকার বেতার ছায়াপথগুলোকে (Giant radio galaxies বা GRGs) পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের বৃহৎ জ্যোতির্পদার্থগত উৎস বা বৃহত্তম কাঠামোগুলোর মধ্যে একটি বিবেচনা করা হয়, যেখানে রয়েছে তেজস্ক্রিয় প্রাণরসের বিশাল ফিনকি স্রোত যা কয়েক হাজার থেকে মিলিয়ন কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত । ছায়াপথগুলো∼০.৭ থেকে ৫ মেগাপারসেক পর্যন্ত রৈখিক আকারের সক্রিয় ছায়াপথগুলোর একটি চরম শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে । এরা স্বাগতিক ছায়াপথ থেকে সমৃদ্ধ উপাদানগুলোকে বড় দূরত্বে পরিবহন করতে পারে এবং অ-তাপীয় কণা ও চৌম্বক ক্ষেত্রগুলোর সাথে আন্তঃগ্যালাকটিক মাধ্যমকে (Intergalactic medium বা IGM) দূষিত করতে পারে । অ-তাপীয় চৌম্বকীয় প্রাণরস কোটি কোটি বছর ধরে আন্তঃগ্যালাকটিক মাধ্যমে লুকিয়ে থাকতে পারে এবং অশান্ত আন্তঃস্তবক মাধ্যম (Turbulent intra-cluster medium), কেন্দ্রীয় বেতার হ্যালোগুলো (Central radio haloes) ও সীমান্তবর্তী বেতার ধ্বংসাবশেষের (Peripheral radio relics) সাথে যুক্ত শক্তিশালী অভিঘাত তরঙ্গগুলো (Shockwaves) উচ্চ-শক্তির বীজ কণাকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উৎস হয়ে উঠতে পারে । 

গবেষণার ক্ষেত্রে জরিপ করা ৩টি বৃহৎ ছায়াপথের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে যেমন: (ক) MGTC J095959.63+024608.6 (খ) MGTC J100016.84+015133.0 এবং (গ) MGTC J100022.85+031520.4 । এদের মধ্য থেকে MGTC J100022.85+031520.4 ছায়াপথটিকে (যাকে GRG3 ছায়াপথ বলে) এ গবেষণার অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো চিহ্নিত করা হয় । নতুন GRG3 বেতার ছায়াপথের প্রত্যাশিত বা অভিক্ষিপ্ত রৈখিক আকার প্রায় ৪.২ মিলিয়ন আলোকবর্ষ, যার ভর ৯৩ ট্রিলিয়ন সৌর ভর এবং ১২৮৪ MHz এ মোট ৫৯৭ ZW/Hz শক্তি । সবচেয়ে উজ্জ্বল একটি স্পার্স ছায়াপথ স্তবকের (Sparse galaxy cluster WHL J100022.9+031521) কেন্দ্রে GRG3 ছায়াপথ অবস্থিত । ধারণা করা হয় যে, ছায়াপথটির উপরের খণ্ডে (Lobe) বাঁকানো অঙ্গবিন্যাস (Wide-angle-tail বা WAT) হচ্ছে এটির বেতার উৎস, যা স্বাগতিক ছায়াপথে অনুরূপ বৈশিষ্ট্য রয়েছে । সাধারণভাবে WAT বেতার উৎসগুলো শক্তিশালী এবং প্রায়শই ছায়াপথ স্তবকের কেন্দ্রে অবস্থিত, যেখানে Intracluster medium ram pressure দ্বারা খণ্ডগুলো তাদের বৈশিষ্ট্যযুক্ত সি-আকৃতিতে বাঁকতে পারে । এ বেতার উৎসগুলো গ্যালাকটিক কেন্দ্রের সক্রিয় নিউক্লিয়াসে জন্মগ্রহণ করে । বেতার উৎসগুলোর গঠন এবং বিবর্তন সম্পর্কে আরো সুনির্দিষ্টভাবে অধ্যয়ন করার জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে দৈত্যাকার বেতার ছায়াপথগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ । অতএব, GRG3 ছায়াপথটিকে স্তবক পরিবেশে বসবাস করার জন্য পরিচিত দৈত্যাকার বেতার ছায়াপথগুলোর মাত্র শতকরা ৪ ভাগের মধ্যে ১টি করে তোলে । অপার বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৌন্দর্য ও কৌতূহলের অধিকারী এ GRG3 ছায়াপথটি স্বাগতিক উপবৃত্তাকার ছায়াপথ SDSS J100022.85+031520 দ্বারা আশ্রিত হয়েছে যার লাল স্থানান্তর (Redshift) প্রায় ০.১০৩৪ । সংগৃহীত তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে, GRG3 ছায়পথের গতিশীল বয়স প্রায় ১ বিলিয়ন বছর (বর্ণালী বয়স প্রায় ৬৭ মিলিয়ন বছর) এবং এর ফিনকি স্রোতের শক্তি ১ মিলিয়ন QW এর স্তরে রয়েছে ।  

আবিষ্কৃত এ অসুর বেতার ছায়াপথগুলোকে তাদের বিশাল আকৃতি দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হয়, যা প্রায় ৭০০ কিলোপারসেক ছাড়িয়ে যায় । এরা সাধারণত কম ঘনত্বের পরিবেশে জন্মানো মহাজাগতিক বিরল বস্তু এবং সিঙ্ক্রোট্রন-নিঃসরণকারী প্রাণরসের (Synchrotron-emitting plasma) ফিনকি স্রোত ও খণ্ডগুলোকে (Lobes) প্রদর্শন করতে দেখা যায় । এ ছায়াপথগুলো Galactic nucleus থেকে নির্গত প্রাণরসের ফিনকি স্রোতগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে । গ্যালাকটিক কেন্দ্রস্থলে একটি অতিবৃহদাকার কৃষ্ণ গহ্বরের কার্যকলাপের ফলে এ স্রোতগুলো তৈরি হয়, যা অত্যন্ত শক্তিশালী তেজস্ক্রিয় বিকিরণ নির্গত করে । “Jet feedback" নামে পরিচিত এ ঘটনাটি আন্তঃগ্যালাক্টিক পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে এবং পরিবেশের গ্যাসকে উত্তপ্ত করে নতুন নক্ষত্রের গঠন প্রতিরোধ করতে পারে কিংবা বাধা দিতে পারে ।  

দানবীয় বেতার ছায়াপথগুলো শনাক্তকরণের ফলে বিশাল গ্যালাকটিক কাঠামো এবং তাদের চারপাশের মধ্যে সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখে । Jaffe-Perola model এবং Tribble model পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে গবেষণাটি করা হয় । এ নকশাগুলো বিভিন্ন কম্পাঙ্কের মাধ্যমে বিকিরণ পরিমাপ করে প্রাণরসের বার্ধক্য বর্ণনা করে । যেখানে GRG1 ছায়াপথ এবং GRG2 ছায়াপথের সাধারণ বয়স বন্টন রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে কনিষ্ঠ প্রাণরস হচ্ছে ছায়াপথের কেন্দ্রস্থলে এবং সবচেয়ে পুরোনো প্রাণরসটি ছায়াপথের বাইরের বাহুতে অবস্থিত । এ গবেষণাটি দৈত্যাকার বেতার ছায়াপথগুলোর শারীরিক প্রক্রিয়া এবং পরিবেশের উপর তাদের প্রভাব বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ । এ বিস্ময়কর আবিষ্কারগুলো কেবল মহাবিশ্বের বোঝার ক্ষেত্রেই অবদান রাখে না,  পাশাপাশি বেতার-জ্যোতির্বিদ্যা বিশ্লেষণের জন্য উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যৎ অধ্যয়নের দরজাও খুলে দেয় ।  

তথ্যসূত্র এবং ছবি: https://phys.org/ , www.hayadan.com  । 

Tuesday, 12 November 2024

নিউট্রন নক্ষত্র (Neutron Star)

 



প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর পূর্বে একটি বৃহৎ পরমাণুর মহাশক্তিশালী মহাবিস্ফোরণের (Big Bang) ফলে মহাবিশ্বের (The Universe) উৎপত্তি হয় । এই মহাবিস্ফোরণটি ভয়ানক হিংস্রভাবে সম্প্রসারিত মহাবিশ্বের মধ্যে শক্তি বিকিরণকারী প্রচণ্ড শক্তিশালী অভিঘাত তরঙ্গের (Shockwave) সৃষ্টি করে । এক সেকেন্ডের এক মিলিয়ন ভাগের এক ভাগ সময়ে মহাবিশ্বের অস্তিত্বের আদিম গঠন তিনটি স্বতন্ত্র পর্যায়গুলোর মধ্য দিয়ে স্থানান্তরিত হয় । যেমন: তড়িচ্চুম্বকীয়, মাধ্যাকর্ষণ এবং দুর্বল বা শক্তিধর শক্তিগুলো মৌলিক শক্তি হিসেবে আকার ধারণ করে । সেই সময় প্রোটন এবং নিউট্রন গঠনের জন্য তাপমাত্রা ছিল অত্যাধিক । পরবর্তীতে তাদের অভ্যন্তরীণ অংশ থেকে তৈরি সুরুয়া (Soup) মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে । এটি Quark বা Gluon নামেও পরিচিত । চোখের পলকেই এই সুরুয়া ঠান্ডা হয়ে সাধারণ বস্তু বা পদার্থের প্রথম লক্ষণগুলোর জন্ম দেয় । বিজ্ঞানীদের ধারণা, অতিক্ষুদ্র মৌলকণার সুরুয়া শুধুমাত্র প্রাকৃতিকভাবেই নিউট্রন নক্ষত্রের কেন্দ্রস্থলে বিদ্যমান থাকতে পারে । প্রলয়ঙ্করী মহাবিস্ফোরণের পর প্রায় ৩ লক্ষ ৮০ হাজার বছর থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক শত মিলিয়ন বছর পর্যন্ত হাইড্রোজেন এবং খুবই সামান্য পরিমাণ হিলিয়াম নিউক্লিয়াস আলফা কণা ছাড়া বিভিন্ন গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ ইত্যাদি বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের কোনো অস্তিত্বই ছিল না । তাই, এই সময়টিকে বলা হয় অন্ধকার যুগ । সময়ের হাত ধরে এই মহাবিশ্ব বা মহাজাগতিক উত্তপ্ত বস্তুগুলো ধীরে ধীরে শীতল হয় । মহাবিস্ফোরণের পরপরই মহাবিশ্বের উপর আধিপত্য বিস্তারকারী প্রচণ্ড গরম ও ঘন পদার্থ Plasma Soup (Quark-Gluon Plasma) থেকে আলো বের হয়ে আসতে পারছিল না । পরবর্তীতে হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো প্লাজমা’র সাথে ধাক্কা খেয়ে ফোটন আলোককণা বের হয়ে আসে । নক্ষত্র জন্ম নেয় । সেটিই হয় আলোর উৎস যেখান থেকে আলো আসতে শুরু করে । তবে, সেই অন্ধকার যুগ নির্দিষ্টভাবে ঠিক কখন শেষ হয়েছিল কিংবা কখনোইবা প্রথম নক্ষত্র, ছায়াপথ, গ্রহ এবং প্রাণের উদ্ভব বা জীবনের শুরু হয়েছিল— তা এখনো অজানা ।

এই মহাবিস্ফোরণের প্রায় ৩ মিনিট থেকে ১০০০০০ বছরের মধ্যে হাইড্রোজেন এবং হিলিয়ামসহ প্রচুর পরিমাণ ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন, ইলেকট্রন প্লাজমা ও ভারি বস্তুকণা তৈরি হয় । অসংখ্য বস্তুকণা প্রচণ্ড গতিতে মহাবিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যায় এবং এদের কণিকাগুলো ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত । এগুলো ধীরে ধীরে শীতল হয় এবং ভিতরের আন্তঃআকর্ষণের কারণে বস্তুকণা বা বস্তুপুঞ্জগুলো কাছাকাছি চলে আসে । দলবদ্ধ বস্তুপুঞ্জের ঘনত্ব বৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত মহাকর্ষীয় আকর্ষণের ফলে একটি ঘূর্ণনগতির সৃষ্টি হয় । এই ঘূর্ণন গতির কারণেই মহাকাশের মেঘগুলো ঘূর্ণায়মান চাকতিতে পরিণত হয় । পর্যায়ক্রমে নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বস্তুপুঞ্জগুলো বিভিন্ন আকৃতির একক দল গঠন করে এই অসীম মহাবিশ্বে ছায়াপথ, ছায়াপথ স্তবক এবং ছায়াপথ মহাস্তবক ইত্যাদি সৃষ্টি করে । এই ছায়াপথ মহাস্তবকের সম্মিলিত ভর একটি মহাকর্ষীয় অক্ষিকাচ (Gravitational Lens) হিসেবে কাজ করে এবং অনেক দূরবর্তী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলোকবিন্দুগুলোকে বিবর্ধিত করে । যেখানে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য লাল-নীল-সবুজ ছায়াপথ, নক্ষত্রপুঞ্জ, অগণিত গোল-চ্যাপ্টা-লম্বাটে বিভিন্ন আকারের নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহ, ধূমকেতু এবং উল্কা ইত্যাদি । এক একটি ছায়াপথ প্রতিটি ছায়াপথগুচ্ছকে ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছে ৷ বিশাল আকৃতির ছায়াপথসহ মহাজাগতিক বিভিন্ন বস্তুগুলোকে সরাসরি কিছু ভর ও মহাকর্ষীয় শক্তি বৃদ্ধি করে এদেরকে মহাকাশে একটি সু-শৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে একসাথে ধরে রেখেছে এক প্রকার রহস্যজনক অদৃশ্য ‘অন্ধকার পদার্থ’ (Dark Matter) ৷ ছায়াপথ থেকে শুরু করে মহাজাগতিক অন্যান্য বস্তু এমনকি আমাদের দেহের উপাদানও এই অন্ধকার পদার্থের অন্তর্ভুক্ত । সৃষ্টিতত্ত্বে এটিকে Baryonic Dark Matter বলে ৷ এই সীমানাহীন মহাবিশ্বে শতকরা ৪.৯ ভাগ পদার্থ হচ্ছে সাধারণ Matter, শতকরা ২৬.৮ ভাগ পদার্থ Dark Matter, শতকরা ৬৮.৩ ভাগ Dark Energy যাদের রয়েছে এক শক্তিশালী অদৃশ্য প্রভাব এবং পাশাপাশি নিউট্রিনো ও ফোটন কণার মতো অন্যান্য উপাদানগুলো খুবই সামান্য পরিমাণে অবদান রাখে ৷ কিন্তু এই Dark Energy (অন্ধকারশক্তি / তমোশক্তি / গুপ্তশক্তি / কৃষ্ণশক্তি) হচ্ছে বিশাল মহাবিশ্বের মহাকর্ষীয় বলের মূল চালিকাশক্তি যেটি সমস্ত মহাশূন্য জুড়ে বিস্তৃত এবং এটি মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে । অসংখ্য নক্ষত্র, নাক্ষত্রিক অবশেষ, গ্রহাণু, উল্কা, ধূমকেতু, আন্তঃগ্রহীয় ধূলি মেঘ, আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাস, ধূলিকণা, নীহারিকা, সৌরজগৎ এবং অদৃশ্য পদার্থসহ মহাজাগতিক নানা বস্তুর সমন্বয়ে গঠিত হয় এক একটি ছায়াপথ । একটি ছায়াপথে গড়ে প্রায় ১০০ – ৫০০ বিলিয়ন নক্ষত্র থাকে । আকাশগঙ্গা ছায়াপথের (Milky Way Galaxy) ব্যাস হচ্ছে ১০০০০০ আলোকবর্ষ । এই রকম প্রায় অর্ধশতাধিক ছায়াপথের সমন্বয়ে গঠিত হয় এক একটি ছায়াপথ স্তবক বা গুচ্ছ (Galaxy cluster) । ছায়াপথ স্তবকগুলোই গঠন করে একটি ছায়াপথ মহাস্তবক (Galaxy Supercluster) যেটি মহাবিশ্বে এক বিশাল মহাকর্ষীয় কাঠামো তৈরি করে যেখানে কয়েক লক্ষ ছায়াপথের আবাসস্থল । এই সকল ছায়াপথ মহাস্তবকের মাঝে বিদ্যমান একটি ছায়াপথ স্তবক থেকে অন্য এক একটি ছায়াপথের মধ্যকার দূরত্ব থাকে লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ । সুতরাং একটি ছায়াপথ মহাস্তবকের আকার কতো বৃহৎ, তা নিশ্চয়ই চিন্তার বিষয়? ল্যানিয়াকিয়া ছায়পথ মহাস্তবক (Laniakea Galaxy Supercluster) হচ্ছে আমাদের নিজস্ব বাসস্থান যেখানে আকাশগঙ্গা ছায়াপথসহ আশেপাশে প্রায় ১০০০০০ অন্যান্য ছায়াপথের আবাসস্থল । আর ঐ আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৭০০০ আলোকবর্ষ দূরে ছায়াপথের এক অতি ক্ষুদ্র অংশের সর্পিল কালপুরুষ বাহুর (The Orion Arm) এক প্রান্তে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর পূর্বে জলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্য নামক নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে একাধিক গ্রহ নিয়ে গঠিত হয়েছে আমাদের সৌরজগৎ (Solar System) । যদিও, আদি মহাবিশ্বের ইতিহাস খুবই হিংস্র । এক মহা দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মহাবিশ্বের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সৌরজগতের সৃষ্টি । কালের আবর্তে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে প্রচণ্ড উত্তপ্ত থেকে পৃথিবী গ্রহটি এক সময় ঠাণ্ডা, শান্ত এবং জীবন ধারণের উপযোগী হলে এখানে প্রাণের উদ্ভব হয় । আজ এই সবুজ গ্রহটিই আমাদের বাড়ি । মায়ের কোলের মতোই নিরাপদ আশ্রয়স্থল । কিন্তু, এই মৃত্যুন্মুখ গ্রহটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে! মানবজাতি টিকবে তো?

বৃষ্টিহীন অন্ধকার রাতে মহাকাশের দিকে তাকালে জ্বলজ্বল করা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অগণিত আলোকবিন্দু দেখা যায় । এদের কোনোটি মিটমিট করে জ্বলে এবং কোনোটি স্থির হয়ে জ্বলছে । মিটমিটে আলোকবিন্দুগুলোই হচ্ছে এক একটি নক্ষত্র । এরা নিজে নিজেই জ্বলে । অন্যদিকে স্থির আলোকবিন্দুগুলো হচ্ছে বিভিন্ন গ্রহ । এগুলো নক্ষত্রের আলোয় আলোকিত । মহাকাশে অবস্থিত কোনো মহাজাগতিক বস্তু নিজের অভ্যন্তরীণ পদার্থকে নিউক্লীয় সংযোজন বা একীকরণ বিক্রিয়া (Nuclear Fusion) ঘটিয়ে ক্রমাগত জ্বালানি উৎপন্ন করে নিজেকে জ্বালিয়ে প্রচুর পরিমাণ আলো ও তাপ সৃষ্টি করে উজ্জ্বলিত থাকে তাকেই নক্ষত্র বলে । এছাড়া, মহাশূন্যে আয়নিত গ্যাস বা প্লাজমা দশায় অবস্থিত অতি উজ্জ্বল এবং সুবৃহৎ জ্বলন্ত অগ্নিগোলককেও নক্ষত্র বলে । নক্ষত্রের জীবনচক্র হতে পারে শত শত মিলিয়ন কিংবা বিলিয়ন বছর সময়কাল । মহাকাশে প্রতিনিয়ত এই নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যুর খেলা চিরকাল ধরে চলছে । একটি নক্ষত্রের জন্মকাল থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে যে বিবর্তন ঘটে থাকে তাকে বলা হয় ‘নাক্ষত্রিক বিবর্তন’ (Stellar Evolution) । নক্ষত্রের হাইড্রোজেন জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার পর বিকিরণের চাপে এর ব্যাসার্ধ বেড়ে গিয়ে একটি লোহিত দানব নক্ষত্রে পরিণত হয় ৷ এক পর্যায় এটি ধীরে ধীরে ‘শ্বেত বামন’ নক্ষত্রে রূপ নেয় । তবে, কখনো দুর্লভভাবে নক্ষত্রটি ভয়ঙ্কর নাক্ষত্রিক বিস্ফারণের মধ্য দিয়ে পুরো সৌরজগতকেও নিমিষেই ধ্বংস করে দিতে সক্ষম । Star শব্দটি গ্রিক শব্দ Aster থেকে এসেছে, যেটি হিত্তীয় ভাষার শব্দ শিত্তার থেকে উদ্ভূত । শিত্তার শব্দের ব্যুৎপত্তি হয়েছে সংস্কৃত শব্দ সিতারা থেকে । একটি নক্ষত্রের আকার, উজ্জ্বলতা‌, বিবর্তন, জীবনচক্র এবং সর্বশেষ নিজের ধ্বংস সবকিছুই নির্ভর করে তার ভরের উপর । ভর যতো বেশি হয়, ততোই দ্রুত জ্বালানি শেষ হয় ৷ এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তম লাল মহাদানব নক্ষত্রটি হচ্ছে UY Scuti । এটি সূর্যের চেয়ে প্রায় ১০০০ গুণেরও বেশি প্রশস্ত । অধিকাংশ নক্ষত্রের বয়স ১০০ – ১০০০ কোটি বছরের মধ্যে । তবে, অতিপ্রাচীন কিছু নক্ষত্রের বয়স এই মহাবিশ্বের বয়সের কাছাকাছি- যেখানে মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর । একটি অতি প্রাচীন নক্ষত্র হচ্ছে HE1523-0901 যেটির বয়স প্রায় ১৩২০ কোটি বছর । মহাকাশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধূলিকণা, বস্তুপুঞ্জ, হাইড্রোজেন গ্যাস এবং প্লাজমা দ্বারা গঠিত এক ধরনের আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘকে ‘নীহারিকা’ বলে । এই নীহারিকায় শতকরা ৫০ – ৭৫ ভাগ হাইড্রোজেন গ্যাস, শতকরা ২০ – ৪৫ ভাগ হিলিয়াম গ্যাস এবং শতকরা ৫ ভাগ অন্যান্য মৌলিক পদার্থ রয়েছে । সুবিশাল আকারের এন্ড্রোমিডা ছায়াপথের পূর্ব নাম ছিল Andromeda Nebula । জমাট বাঁধা ঠাণ্ডা নীহারিকা থেকেই নক্ষত্রের জন্ম ।

নক্ষত্রের জ্বালানি হচ্ছে হাইড্রোজেন বা উদজান । হাইড্রোজেন একটি মৌলিক পদার্থ এবং এর পরমাণুতে ১টি মাত্র ইলেকট্রন থাকে ৷ এই ইলেকট্রনটি নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে ৷ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির সময় তৈরি হওয়া প্রথম মৌল হাইড্রোজেনের ৩টি আইসোটোপ রয়েছে যেমন: (ক) প্রোটিয়াম (খ) ডিউটেরিয়াম (গ) ট্রিটিয়াম ৷ মহাকর্ষ বলের প্রভাবে নক্ষত্রমণ্ডলীয় গ্যাস এবং ধূলিকণা মেঘ বা গ্যাসের ধূলিমেঘ (Dust Cloud) জমাটবদ্ধ হয়ে একটি নক্ষত্রের জন্ম প্রক্রিয়া শুরু হয় । মহাকাশে মেঘ যতো বেশি জমাটবদ্ধ হয় নক্ষত্রের অভ্যন্তরীণ অণুগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের তীব্রতাও ততো বেশি বৃদ্ধি পায় । এতে করে প্রচণ্ড উত্তাপের সৃষ্টি হয় । এই তাপ এমন এক পর্যায় (তাপমাত্রা যখন প্রায় ১ কোটি কেলভিনে উন্নীত হয়) গিয়ে পৌঁছানোর পর নক্ষত্রের অভ্যন্তরে চলতে থাকা নিউক্লীয় কেন্দ্রীন সংযোজন বা একীকরণ বিক্রিয়ার কারণে ৪টি হাইড্রোজেন পরমাণু তার নিজের চেয়ে হালকা, বর্ণহীন, গন্ধহীন এবং স্বাদহীন নিস্ক্রিয় গ্যাস হিলিয়াম পরমাণুতে পরিণত হয় । পরবর্তীতে এই হিলিয়াম পরমাণুগুলো একত্রিত হয়ে সৃষ্টি করে কার্বন এবং সেই কার্বনের সংযোজনে তৈরি হয় নিয়ন, সিলিকন ও লোহা । অবশেষে কেন্দ্রীন বিক্রিয়ায় তাপ শোষীত হয় । যখন নক্ষত্রটির জ্বালানি হাইড্রোজেন তথাপি হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস খুবই দ্রুত দহন হয়ে ফুরিয়ে যায় তখন ‘শেষ হুররাহ’ (Last Hurrah) ঘটে । এর ফলে নক্ষত্রের অভ্যন্তরস্থ বহির্মুখী চাপ যথেষ্ট পরিমাণ কমে যায়, যেখানে মহাজাগতিক বস্তু নক্ষত্রটি আমাদের সূর্যের ভরের চেয়ে অন্তত ৫ গুণে প্রসারিত হয়— যার আকার প্রায় ৩৩৩০০০ পৃথিবীর সমান । এক সময় নক্ষত্রটি নিজের মাধ্যাকর্ষণ বলকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে না, ফলে নক্ষত্রের বেশিরভাগ ভরই এর কেন্দ্রে সংকুচিত হয়ে ফুলে উঠে বাইরে থাকা গ্যাসীয় অঞ্চলটি প্রচণ্ড শক্তিশালী মহাপ্লাবনের মতো ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের (প্রচণ্ড অন্তস্ফোটন বা Implosion) সৃষ্টি করে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৫০০০ – ৪০০০০ কিলোমিটার প্রবলবেগে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে । এই বিশাল মহাজাগতিক বিস্ফোরণের নামই অতিনবতারা (Supernova) । অবশেষে যদি নক্ষত্রটির ভর প্রায় ৩ M সৌর ভরের চেয়ে বেশি হয়, তখন এটি মহাকর্ষীয় পতন ঘটিয়ে একটি কৃষ্ণগহ্বরে (Black Hole) পরিণত করে ।

সূর্য হচ্ছে একটি নক্ষত্র । আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রের খুব কাছের নক্ষত্রটি সূর্য । সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে ১১টি গ্রহ, অসংখ্য গ্রহাণুপুঞ্জ, ধূমকেতু এবং উল্কা ইত্যাদি । সূর্যের ব্যাস প্রায় ১.৩৯২´১০৬ কিলোমিটার যা পৃথিবীর ব্যাস থেকে ১০৯ গুণ বড় । সূর্যের ভর প্রায় ১.৯৮৯১´১০৩০ কিলোগ্রাম, যা পৃথিবীর ভরের চেয়ে ৩৩২৯৫০ গুণ বেশি । এই ভর সৌরজগতের মোট ভরের শতকরা প্রায় ৯৯.৮৬ ভাগ । পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব প্রায় ১৫২১০০০০০ কিলোমিটার বা ৯৪৫০০০০০ মাইল (আলোর গতিতে) । আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব ২৭২০০ আলোকবর্ষ ৷ সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে ৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ড । ফলে সূর্যালোকশক্তি এই সবুজ গ্রহের জলবায়ু এবং আবহাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রায় সকল জীবকে বাঁচিয়ে রাখে । সূর্যের কেন্দ্রভাগের ঘনত্ব ১৫০ গ্রাম/ঘনসেন্টিমিটার এবং তাপমাত্রা প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ কেলভিন (~১৩.৬ MK) ৷ যদিও ছটামণ্ডল বা সৌর করোনায় তাপমাত্রা থাকে ৫ MK এবং সূর্যপৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৫৭৮৫ কেলভিন । সূর্যের অন্যান্য বিকিরণ অঞ্চলের তুলনায় এর কেন্দ্রভাগে ঘূর্ণন বেগ অত্যাধিক বেশি । সূর্য সর্বদা প্রোটন শিকল বিক্রিয়ার (Proton Chain Reaction) মাধ্যমে হাইড্রোজেন কেন্দ্রীন সংযোজন বা একীকরণ প্রক্রিয়া দ্বারা হিলিয়াম গ্যাস উৎপাদন করে । এটিই হচ্ছে সূর্যের শক্তির প্রধান উৎস । ফলে তৈরি হয় ফোটন আলোককণা, উত্তাপ, তেজস্ক্রিয় রশ্মি, শক্তি এবং গ্যাস । সূর্যের বর্ণালী শ্রেণী সংকেত G2V । প্রায় পূর্ণগোলক হলদে বামন নক্ষত্র সূর্যের প্রধান গাঠনিক উপাদান হচ্ছে: হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, অক্সিজেন, কার্বন, নিয়ন, আয়রন, নাইট্রোজেন, সিলিকন, ম্যাগনেসিয়াম এবং সালফার ইত্যাদি ৷ প্লাজমা কণা বা আয়নিত গ্যাস এবং ইলেকট্রনের সমন্বয়ে গঠিত সূর্যের মধ্যে রয়েছে এক মহাশক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র ৷ সূর্যপৃষ্ঠে কিছু কালো দাগ দেখা যায় যেটি ‘সৌরকলঙ্ক’ (Sunspot) নামে পরিচিত । প্রায় ১০০০ কোটি বছর পূর্বে মহাকাশীয় নক্ষত্রের সমাবেশে বা নক্ষত্রমণ্ডলে সূর্যের ভ্রূণ সৃষ্টি হয় । পরবর্তীতে মহাকালের চক্রে এটি প্রায় ৪৫০ – ৫০০ কোটি বছরের মধ্যে স্থিতিবস্থায় ফিরে আসে । অনুমান করা হয় যে, কোটি কোটি বছর ধরে জ্বলতে থাকা এই নক্ষত্রটি মহাকর্ষীয় শক্তির প্রভাবে প্রায় ৫০০ কোটি (৫ বিলিয়ন) বছরের মধ্যে সূর্যের কেন্দ্রীয়ভাগ বা মূল অংশে হাইড্রোজেন পরমাণু হ্রাস পাবে কিংবা হাইড্রোজেনের অভাবে পারমাণবিক সংশ্লেষণ বা একীভবন আর হবে না ৷ ফলে, সূর্যের জ্বালানি সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে ‘লাল দানবে’ রূপ নিয়ে এটির কেন্দ্রে ত্রি-আলফা বিক্রিয়ার মাধ্যমে হিলিয়াম পুড়ে কার্বন ও অক্সিজেন উৎপন্ন করবে । এক সময় প্রচণ্ড উত্তপ্তভাবে অতিনবতারা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে এর ভয়ঙ্কর পরিণতি ঘটবে! অর্থাৎ, এক অগ্নিময় মৃত্যুর (Fiery Death) মাধ্যমে সূর্যের পরিসমাপ্তি হবে ।

অতিনবতারা এক প্রকার নক্ষত্রের বিষ্ফোরণ । যেটি মহাকাশে ঘটে থাকে । অপার মহাবিশ্বের এক মহাবিষ্ময়! অতিনবতারা বিস্ফোরণের ফলে নক্ষত্রটি ধীরে ধীরে উজ্জ্বল থেকে ক্রমশঃ উজ্জ্বলতর হয়ে চিরতরে নিভে যায় বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় ৷ অতিনবতারা হচ্ছে মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী আলোক বিচ্ছুরনকারী বিস্ফোরণ । সূর্যের জীবদ্দশায় যে পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করে অতিনবতারা বিস্ফোরণে এক সেকেন্ড সময়ে সে পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয় । এই বিস্ফোরণের ফলে তীব্র আলোক বিকিরণ, প্রচুর পরিমাণে শক্তি, বিশাল ধ্বংসাবশেষ, ভারী মৌলিক পদার্থ বা বস্তুকণা বা মৌল কণা, পি-নিউক্লিয়াস আইসোটোপ এবং অতি উচ্চ শক্তির মহাজাগতিক তেজস্ক্রিয় রশ্মি নির্গত হয় । এছাড়া, ভয়ানক ধূলিকণা মেঘের সৃষ্টি করে । নক্ষত্রটির বিস্ফোরণের মাত্রা এতই তীব্র যে, এটি পুরো ছায়াপথের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে । যদিও সেই আলোকচ্ছটার ঔজ্জ্বল্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না, ধীরলয়ে নিষ্প্রভ হয়ে যায় । অতিনবতারা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে একটি নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটে । আর এখান থেকেই পুনরায় নতুন প্রজন্মের অত্যন্ত উজ্জ্বল নিউট্রন নক্ষত্র জন্ম নেয় । এছাড়া পালসার নক্ষত্র, গ্রহ, শীতল নীহারিকা এবং কৃষ্ণ গহ্বরের সৃষ্টি করে । যদিও নক্ষত্রটি মৃত্যুর আগে নিউট্রনে ভর্তি দানবে পরিণত হয় । অতিনবতারা বিস্ফোরণের সময় নক্ষত্রের প্রোটন এবং ইলেকট্রন মিলে প্রচুর পরিমাণে নিউট্রন তৈরি করে । অর্থাৎ, অতিনবতারা বিস্ফোরণ হচ্ছে একটি নিউক্লীয় বিক্রিয়া । এতে করে প্রচুর পরিমাণে বৈদ্যুতিক আধানশূন্য এবং ভরহীন মৌলকণা Neutrino তৈরি হয় । এই নিউট্রিনো আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূলি, গ্যাস এবং মহাজাগতিক ধূলি দ্বারা বিক্ষিপ্ত বা শোষিত হয় না । নাক্ষত্রিক বিস্ফোরণের পর নক্ষত্রের যে অবস্থা থাকে বা উৎপন্নকৃত নক্ষত্রকে নিউট্রন নক্ষত্র (Neutron Star) বলে ৷ আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায়, একটি অতিবৃহৎ নক্ষত্রের অতিনবতারা বিস্ফোরণ বা ধ্বংসের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট প্রচণ্ড ঘন অবশেষ বা নক্ষত্রের ভেঙে পড়া কেন্দ্রই হচ্ছে নিউট্রন নক্ষত্র । সূর্যের মতো নক্ষত্রে ইলেকট্রন, প্রোটন এবং সামান্য পরিমাণে নিউট্রন থাকে । কিন্তু, এই নিউট্রন নক্ষত্রের ভেতরটা বেশিরভাগই নিউট্রন (অতিপারমাণবিক কণা বা বৈদ্যুতিক আধানশূন্য বা নিরপেক্ষ কণা) দিয়ে গঠিত এবং এতে প্রোটন (ধনাত্মক চার্জযুক্ত কণা) ও ইলেকট্রনের (ঋণাত্মক চার্জযুক্ত কণা) ছোট ভগ্নাংশের সাথে নিউক্লিয়াস থাকে । একটি বিশাল নক্ষত্রের জ্বালানি ফুরিয়ে অতিনবতারা বিস্ফোরণের পর নক্ষত্রের বহিরাবরণটা প্রচণ্ড বেগে মহাকাশে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে পড়ে । শুধুমাত্র এর কেন্দ্রীয় অঞ্চলটিই বাকি থাকে । অন্তস্তল ভেঙে পড়ে, প্রতিটি প্রোটন এবং ইলেক্ট্রন একত্রিত হয়ে নিউট্রনে পরিণত হয় । Astroseismology, নক্ষত্রের উপর গবেষণা এবং নাক্ষত্রিক দোলনের পর্যবেক্ষিত বর্ণালী বিশ্লেষণ করে নিউট্রন নক্ষত্রের অভ্যন্তরীণ গঠন আরো বিশদভাবে জানা যেতে পারে । একটি নিউট্রন নক্ষত্রপৃষ্ঠের পদার্থটি পারমাণবিক নিউক্লিয়াস (নক্ষত্রের ক্ষয়প্রাপ্ত বা অধঃপতিত উপাদান বা পদার্থ / Degenerate Matter) দ্বারা গঠিত । নিউট্রন নক্ষত্রের কেন্দ্রে পরমাণুগুলো খুবই শক্তভাবে একত্রে লেগে থাকে এবং তাপমাত্রা থাকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড । যখন বিশাল নক্ষত্রগুলো অতিনবতারা হিসেবে বিস্ফোরিত হয়, তখন এরা নিউট্রন নক্ষত্র এবং কৃষ্ণ গহ্বরকে পিছনে ফেলে । কৃষ্ণগহ্বর, শ্বেত গহ্বর, কোয়ার্ক নক্ষত্র, ইলেক্ট্রোউইক নক্ষত্র এবং স্ট্রেঞ্জ নক্ষত্রকে বাদ দিলে নিউট্রন নক্ষত্র হচ্ছে মহাবিশ্বের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম নক্ষত্র । নিউট্রন নক্ষত্র কৃষ্ণগহ্বরের চেয়ে কম ঘন বলেই শুধুমাত্র কৃষ্ণ গহ্বর দ্বারা অতিক্রম করে । এই নিউট্রন নক্ষত্র এবং কৃষ্ণ গহ্বরের মধ্যে কাছাকাছি কিছু সহচর নক্ষত্র রয়েছে যারা রঞ্জন-রশ্মিগুলোর (X-rays) শক্তিশালী উৎস হয়ে উঠে । কারণ, তারা তাদের সঙ্গী বস্তু বা পদার্থকে সরিয়ে দেয় (Ultra এবং Hyperluminous X-ray উৎস হিসেবে পরিচিত) । উজ্জ্বলতম রঞ্জন-রশ্মিগুলোর উৎস সম্ভবত কৃষ্ণ গহ্বরের সহচর নক্ষত্রের সাথে । নিউট্রন নক্ষত্রের অধিকাংশই বেতার তরঙ্গ বা তড়িৎ-চৌম্বকীয় বিকিরণ নির্গত করে । কিছু নিউট্রন নক্ষত্র শুধুমাত্র তাপীয় বিকিরণ নির্গত করে । এছাড়া তড়িৎ-চৌম্বকীয় বর্ণালী জুড়ে নিউট্রন নক্ষত্র চিহ্নিত করা হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে দৃশ্যমান আলো, অবলোহিত বিকিরণ রশ্মি বা বর্ণালী, অতিবেগুনী রশ্মি, রঞ্জন রশ্মি এবং গামা রশ্মি । অতিনবতারা বিস্ফোরণের অবশিষ্টাংশে Central Compact Objects (CCO) নামে পরিচিত রঞ্জন রশ্মি উৎসগুলোর একটি বৈশিষ্ট্য বলে মনে হয়- যা তরুণ, বেতার-শান্ত নিউট্রন নক্ষত্র বলে অনুমান করা হয় ।

নিউট্রন নক্ষত্রকে কখনো কখনো ‘আণুবীক্ষণিক পারমাণবিক নিউক্লিয়াস’ কিংবা ‘দৈত্য নিউক্লিও’ হিসেবে বর্ণনা করা হয় । এই নক্ষত্রের কেন্দ্রে চরম ঘনত্বে নিউট্রনগুলো বিঘ্নিত হয়ে কোয়ার্ক নক্ষত্রের জন্ম দেয় । নিউট্রন নক্ষত্রের উপাদানের উপর নির্ভর করে অন্যান্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে: জড়তার মুহূর্ত (The moment of the inertia), চতুর্ভুজ মুহূর্ত (The quadrupole moment) এবং ভালোবাসা নম্বর (The love number) । একটি নবগঠিত নিউট্রন নক্ষত্রের ভিতরের তাপমাত্রা চারপাশ থেকে ১০০০০০০০০০০০ – ১০০০০০০০০০০০০ কেলভিন । তবে, কিছু নিউট্রন নক্ষত্র শীতল হয়ে থাকে । প্রায় ৩০ কিলোমিটার ব্যাসের একটি নিউট্রন নক্ষত্রে সূর্যের ভরের দ্বিগুণ ভর থাকে (সর্বোচ্চ সীমা ২.১ M সৌর ভর) । এই কারণে এর ঘনত্ব খুবই বেশি । বিস্ময়কর যে, নিউট্রন নক্ষত্রের এক চা-চামচ পরিমাণ পদার্থের ভর ১ কোটি টন! নিউট্রন নক্ষত্রের অকল্পনীয় ও মাত্রাতিরিক্ত ঘনত্বের কারণেই এমন ভর হয়ে থাকে । মূলত এই ঘনত্বের জন্য দায়ী অতিমহাকর্ষীয় টান । ভর, উষ্ণতা এবং শীতল হওয়ার হার অনুসারে এই নক্ষত্রের ধরণ নানা প্রকার হয়ে থাকে । তাই, বিভিন্ন ধরণের নিউট্রন নক্ষত্রকে তাদের বর্ণালী দ্বারা আলাদা করা যেতে পারে । ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে নিউট্রন নক্ষত্রের অদ্ভুত বেতার তরঙ্গ শনাক্ত করা হয় যার থেকে দৃশ্যমান আলো বের হয় না । লম্বা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বেতার তরঙ্গ বের হয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে না এসে ঘুরে ঘুরে আসে । তাই, নিউট্রন নক্ষত্রের বেতার সংকেত একটু পর পর স্পন্দন বা কম্পন আকারে পাওয়া যায় বলেই তাকে Pulsar বলে । নিউট্রন নক্ষত্রের চৌম্বক ক্ষেত্রগুলো পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের তুলনায় ১০০০০০০০০ – ১.০০০০০০০০ই+১৫ (১০০ মিলিয়ন থেকে ১ কোয়াড্রিলিয়ন) গুণ বেশি শক্তিশালী । এইনক্ষত্রপৃষ্ঠের চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি ১০০০০ – ১০০০০০০০০০০০ টেসলা । যদিও নিউট্রন নক্ষত্রের শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের উৎস এখনো অস্পষ্ট । তবে, একটি অনুমান হচ্ছে যে “Flux Freezing” বা নিউট্রন নক্ষত্র গঠনের সময় মূল চৌম্বকীয় প্রবাহের সংরক্ষণ । এখন পর্যন্ত সনাক্ত করা সবচেয়ে বড় নিউট্রন নক্ষত্র হচ্ছে PSR J0952–0607 যার সৌর ভর ২.৩৫ ± ০.১৭ । নিউট্রন নক্ষত্রের গতিবেগ আলোর গতির অর্ধেকেরও বেশি । এই নক্ষত্র খুব উচ্চ ঘূর্ণন গতির সাথে গঠিত হয়ে আস্তে আস্তে ধীর হয়ে যায় । একটি নিউট্রন নক্ষত্রের মাধ্যাকর্ষণশক্তি পদার্থকে প্রচণ্ড গতিতে ত্বরান্বিত করে এবং পৃষ্ঠের কাছাকাছি জোয়ারের শক্তি Spaghettification ঘটাতে পারে । নিউট্রন নক্ষত্রের ঘূর্ণনের সমান হারে পর্যায়ক্রমিক স্পন্দন পরিলক্ষিত হয় । কখনো কখনো নিউট্রন নক্ষত্রটি সহচর নক্ষত্র থেকে প্রদক্ষিণকারী পদার্থ শোষণ করে ঘূর্ণন হার বৃদ্ধি করে এবং এটি একটি স্থূল গোলক আকারে পরিণত হয় । তবে, Anti-glitch একটি নিউট্রন নক্ষত্রের ঘূর্ণন গতিতে হঠাৎ সামান্য হ্রাস বা ঘূর্ণন নিম্নগামী করতে পারে । সবচেয়ে দ্রুত ঘূর্ণায়মান নিউট্রন নক্ষত্রটি হচ্ছে PSR J1748−2446ad, যেটি প্রতি সেকেন্ডে ৭১৬ বার (প্রতি মিনিটে ৪৩০০০ বার) আবর্তন করে । নিউট্রন নক্ষত্রপৃষ্ঠের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র প্রায় পৃথিবীর তুলনায় ২০০০০০০০০০০০ গুণ শক্তিশালী । এই শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রটি মহাকর্ষীয় অক্ষিকাচ হিসেবে কাজ করে এবং নিউট্রন নক্ষত্র দ্বারা নির্গত বিকিরণকে এমনভাবে বাঁকিয়ে দেয় যে সাধারণত পিছনের পৃষ্ঠের অদৃশ্য অংশগুলো দৃশ্যমান হয় । বিশাল মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে একটি নিউট্রন নক্ষত্র এবং পৃথিবীর মধ্যে সময়ের প্রসারণ তাৎপর্যপূর্ণ হয় । বর্তমানে আকাশগঙ্গা ছায়াপথ এবং ম্যাগেলানিক ক্লাউডে প্রায় ৩২০০টি পরিচিত নিউট্রন নক্ষত্র রয়েছে, যার অধিকাংশই উচ্চ চুম্বকীয় ঘূর্ণায়মান Radio Pulsar হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে । পালসার হচ্ছে চৌম্বক আবর্তিত নিউট্রন নক্ষত্র যেটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে উচ্চ তীব্রতার তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ নির্দিষ্ট দিকে বিকিরণ করে থাকে । পালসার নক্ষত্রের শক্তির উৎস হচ্ছে নিউট্রন নক্ষত্রের ঘূর্ণন শক্তি । তবে, বেশিরভাগ পরিচিত নিউট্রন নক্ষত্র ‘পালসার’ হিসেবে আবিষ্কৃত হয়েছে যা নিয়মিত বেতার কম্পন নির্গত করে । নিউট্রন নক্ষত্রগুলো বেশিরভাগই আকাশগঙ্গা ছায়াপথের চাকতির সাথে কেন্দ্রীভূত হয় । নিকটতম পরিচিত নিউট্রন নক্ষত্র RX J1856.5−3754 হচ্ছে ‘The Magnificent Seven’ নামক নিউট্রন নক্ষত্রের একটি ঘনিষ্ঠ দলের সদস্য, যেটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ আলোকবর্ষ দূরে এবং PSR J0108−1431 নিউট্রন নক্ষত্রটি প্রায় ৪২৪ আলোকবর্ষ দূরত্বে রয়েছে । এছাড়া পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের এবং উষ্ণতম একটি বিচ্ছিন্ন নিউট্রন নক্ষত্র ক্যালভেরা (1RXS J141256.0+792204 নামেও পরিচিত), যেটি উর্সা মাইনর নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত । সমস্ত পরিচিত নিউট্রন নক্ষত্রের শতকরা প্রায় ৫ ভাগ Binary System এর সদস্য । ‘বাইনারি নিউট্রন নক্ষত্র’ এবং ‘ডাবল নিউট্রন নক্ষত্র’ গঠন ও বিবর্তন একটি জটিল প্রক্রিয়া । নিউট্রন নক্ষত্র ধারণকারী বাইনারি সিস্টেমগুলো প্রায়ই রঞ্জন রশ্মি নির্গত করে, যা নিউট্রন নক্ষত্রপৃষ্ঠের দিকে পড়ার সাথে সাথে উত্তপ্ত গ্যাস দ্বারা নির্গত হয় । নিউট্রন নক্ষত্র বহিঃসৌর গ্রহের স্বাগতিক বা অতিথিসেবক (Exoplanet Host) হতে পারে । ১৯৯২ – ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে সূর্য থেকে প্রায় ২৩০০ আলোকবর্ষ দূরে আবিষ্কৃত PSR B1257+12 (অন্যান্য নাম হচ্ছে: Lich, PSR B1257+12, PSR 1257+12, PSR J1300+1240) নামক পালসার নক্ষত্রের আশেপাশে ৩টি বহিঃসৌর গ্রহ যেমন: ড্রাগর, পোল্টারজিস্ট এবং ফোবেটরকে শনাক্ত করা হয়েছে । প্রথম আবিষ্কৃত রেডিও-পালসার হচ্ছে LGM-1 (বর্তমানে PSR B1919+21 নামে পরিচিত) । ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির সভায় জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী Wilhelm Heinrich Walter Baade এবং সুইস জ্যোতির্বিজ্ঞানী Fritz Zwicky নিউট্রন নক্ষত্রের অস্তিত্বের কথা প্রস্তাব করেন । পরবর্তীতে ‘নিউট্রন’ আবিষ্কারের দুই বছরেরও কম সময় পরে ইংরেজ পদার্থবিদ Sir James Chadwick এই নিউট্রন নক্ষত্র সম্পর্কে নিজের অভিমত প্রকাশ করেন, যিনি নিউট্রন আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন । গত ২৩শে ফেব্রুয়ারি ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা JWST দূরবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে ‘অতিনবতারা 1987A’ এর বিস্ফোরণের অবশিষ্টাংশের মধ্যে একটি নিউট্রন নক্ষত্র চিহ্নিত করেছেন ।

যাই হোক, অতিনবতারা বিস্ফোরণের সময় নক্ষত্রটি তার বহিরাবরণ বা দৈহিকরূপ পরিত্যাগ করে কার্বন-অক্সিজেন কেন্দ্রভাগটিই অবশিষ্ট থাকে যা অতিক্ষুদ্র এক উত্তপ্ত ‘শ্বেতবামন নক্ষত্রে’ পরিণত হয় । শ্বেত বামন নক্ষত্র হচ্ছে একটি নক্ষত্রের মৃত্যুর প্রথম পর্যায় এবং এর আয়তন পৃথিবীর সমান হলেও সূর্য থেকে ভর বেশি । শ্বেত বামন নক্ষত্রকে ‘অপজাত বামন’ বলা হয় । যেহেতু, শ্বেত বামন নক্ষত্রটি ইলেকট্রন অপজাত বা ক্ষয়প্রাপ্ত পদার্থ নিয়ে গঠিত তাই হাইড্রোজেন স্ফীত হয় না বিধায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং এটি চন্দ্রশেখর সীমা’র কাছে পৌঁছলে Type Ia Supernova হিসেবে বিস্ফোরিত হতে পারে । শ্বেত বামন নক্ষত্রের প্রচণ্ড মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে আশেপাশের নক্ষত্র, মহাজাগতিক গ্যাস এবং ধূলিকণা ইত্যাদি নিজের দিকে টানতে শুরু করে । ফলে, শ্বেত বামনের আকার বৃদ্ধি পেয়ে শুরু হয় নিউক্লীয় কেন্দ্রীন সংযোজন বা একীকরণ বিক্রিয়া এবং সেখানে পুনরায় বিস্ফোরণ ঘটে ‘নবতারা’ (Nova Star / Novae Star) সৃষ্টি করে । যদিও এটি অল্প সময়ের জন্য নক্ষত্রের মতোই দেখায় । কিন্তু, নবতারার বিস্ফোরণ অতিনবতারার মতো তেমন উজ্জ্বল ও শক্তিশালী নয় । একটি সাদা বামন নক্ষত্র সময়ের সাথে সাথে একাধিক নবতারা তৈরি করতে পারে । লাতিন ভাষায় Nova শব্দের অর্থ ‘নতুন’ । খ-গোলকে অবস্থিত নক্ষত্রকে নবতারা বলে । হিলিয়াম, কার্বন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, নিয়ন এবং ম্যাগনেসিয়ামের মতো সমৃদ্ধ উপাদানে নবতারা গঠিত হয় । নবতারা অতিপ্রাচীন নক্ষত্রের অবশিষ্টাংশ । এই নবতারা গামা রশ্মি নির্গত করে । আকাশগঙ্গা ছায়াপথে প্রতি বছর প্রায় ৩০ – ৬০টি নবতারার দেখা মিলে । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অভিমত প্রকাশ করেন যে, ধ্রুপদী বা সর্বোৎকৃষ্ট নবতারার বিস্ফোরণে Galactic হচ্ছে লিথিয়াম উপাদানের উৎপাদক ।

আমরা যদি আকাশের দিকে তাকাই তাহলে এই বিশাল মহাবিশ্বের খুবই ক্ষুদ্রতম একটি অংশ আমাদের চোখে পড়ে । রাতের মেঘমুক্ত আকাশে খালি চোখে প্রায় ৬ হাজার নক্ষত্র দেখা যায় । তবে, দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখলে প্রায় ৫০ হাজার নক্ষত্রের দেখা মিলে । উন্নতমানের অত্যাধুনিক দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে পর্যবেক্ষণ করলে প্রায় ৩ লক্ষাধিক নক্ষত্র, কয়েক হাজার ছায়াপথ ও বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তু দেখা সম্ভব । কিন্তু, এদের মধ্য থেকে অনুসন্ধান করে একটি অতিনবতারা বের করা দুষ্প্রাপ্য ঘটনা । তবে, প্রতি মুহূর্তই এই সীমানাহীন মহাবিশ্বের কোথাও না কোথাও অতিনবতারার বিস্ফোরণ ঘটে চলছে । কিন্তু আমরা সেগুলোকে দেখতে পাইনা । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন যে, প্রতি শতাব্দীতে ২ – ৩টি অতিনবতারার বিস্ফোরণ আকাশগঙ্গা ছায়াপথে ঘটে থাকে । হয়তো, দুর্লভভাবে খালি চোখে শুধুমাত্র আকাশগঙ্গা ছায়াপথের খুব কাছাকাছি যদি কোনো একটি অতিনবতারার বিস্ফোরণ ঘটে সেটি দেখা যেতে পারে । অতিনবতারা বিস্ফোরণ খুবই বিরল ঘটনা । অসীম মহাকাশের শত শত বিলিয়ন নক্ষত্র সমৃদ্ধ কোনো ছায়াপথে ২ – ৩ শত বছরে ১টি মাত্র অতিনবতারার বিস্ফোরণ সংঘটিত হয় । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এমন অভিমত ব্যক্ত করেন যে, আমরা এবং আমাদের সব কিছুই নক্ষত্রিক ধূলিকণায় (Star Dust) তৈরি । যখন কোনো অতিনবতারার বিস্ফোরণ ঘটে তখন এর থেকে এতই উজ্জ্বল আলো তৈরি হয় যে পুরো ছায়াপথজুড়েই আলোকচ্ছটা বিস্তৃত হয় এবং নক্ষত্রটির নানা উপাদান সমস্ত ছায়াপথে ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি অন্যান্য নক্ষত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখে । এছাড়াও নক্ষত্রের এই সকল উপাদান আশপাশে থাকা বিভিন্ন গ্রহ এবং সেই সকল গ্রহে যদি কোনো প্রকার প্রাণ থাকে সেই প্রাণেরও উপাদান হয় । অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা মহাকাশে নতুন আরো এক ধরনের নক্ষত্রের বিস্ফোরণ আবিষ্কার করেছেন, যেটি সাধারণ অতিনবতারার চেয়ে দশ গুণ বেশি শক্তিশালী । এই বিস্ফোরণের নাম হচ্ছে অধিনবতারা বা অতিসক্রিয় নবতারা বা অস্বাভাবিক নবতারা (Hypernova) । যে নক্ষত্রটির বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে এই অধিনবতারার সৃষ্টি হয় সেটির ভর সূর্যের ভরের চেয়ে প্রায় ২৫ গুণ বেশি । যদিও এতদিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল যে অতিদানব কোনো নক্ষত্র বিস্ফোরণ ঘটায় না, কারণ এটি খুবই ধীরে ধীরে তার সমস্ত শক্তি হারিয়ে মহাকাশে বিলীন হয়ে যায় । কিন্তু, তাদের সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে ।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, আন্তর্জাল (The Internet)

ছবি / Illustration of a Neutron Star 🌟 : Som ET ছবি: উইকিপিডিয়া । 

Sunday, 10 November 2024

Messier 74 ছায়াপথ


 


মেসিয়ার ৭৪ (এম৭৪) হচ্ছে নিরক্ষীয় নক্ষত্র মীন রাশির এক বৃহৎ সর্পিল ছায়াপথ । এটি NGC 628 অথবা Phantom Galaxy নামেও পরিচিত । এ ছায়াপথটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৩২ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত । অনুমান করা হয় যে, এম৭৪ ছায়াপথে প্রায় ১০০ বিলিয়ন নক্ষত্রের আবাসস্থল । ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে চার্লস মেসিয়ারের পর্যবেক্ষক সহকারী ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী Pierre Méchain এ মহাজাগতিক সৌন্দর্যের অধিকারী এম৭৪ ছায়াপথ আবিষ্কার করেন । পরবর্তীতে তিনি চার্লস মেসিয়ারকে তার আবিষ্কারের কথা জানালে এটি 'মেসিয়ার ক্যাটালগে' তালিকাভুক্ত হয় । গত ২০২২ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে এম৭৪ ছায়াপথটি জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ দ্বারা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল । এ ছায়াপথ হচ্ছে পর্যবেক্ষণ করা সবচেয়ে কঠিন মেসিয়ার বস্তুগুলোর মধ্যে একটি । এটিকে আকাশে দেখার জন্য সবচেয়ে সেরা সময় হচ্ছে নভেম্বর মাস । এম৭৪ ছায়াপথে স্পষ্টভাবে দু'টি সর্পিল বাহু রয়েছে, তাই এটি একটি দুর্দান্ত নকশার সর্পিল ছায়াপথের নিখুঁত প্রত্নতাত্ত্বিক উদাহরণ । জ্বলন্ত গ্যাসের উজ্জ্বল গিঁটগুলো সর্পিল বাহুগুলোকে আলোকিত করে, যা নক্ষত্র গঠনের একটি সমৃদ্ধ পরিবেশ নির্দেশ করে । প্রতিসাম্য সর্পিল বাহুগুলো ছায়াপথের কেন্দ্রীয় নিউক্লিয়াস থেকে বেরিয়ে আসে এবং ধূলিকণার গলি দ্বারা চিহ্নিত হয় । এ বাহুগুলো তরুণ নীল নক্ষত্রগুচ্ছ এবং হাইড্রোজেনের (হাইড্রোজেন পরমাণু যা তাদের ইলেকট্রন হারিয়েছে)  উজ্জ্বল গোলাপী অঞ্চলে বিন্দুযুক্ত । যেখানে ঐ তরুণ নক্ষত্র থেকে আসা অতিবেগুনী আলো হাইড্রোজেনের মেঘকে আয়নিত এবং আলোকিত করেছে । নক্ষত্র গঠনের এ অঞ্চলগুলো অতিবেগুনী তরঙ্গদৈর্ঘ্যে অতিরিক্ত আলোকিত দেখায় । এম৭৪ ছায়াপথের সর্পিল বাহু দুটির বাতাস ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে । সর্পিল বাহুগুলো ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে দূরে যাওয়ার সাথে সাথে প্রশস্ত হয় । তবে, একটি বাহু শেষের দিকে সরু হয়ে যায় এবং বাহুগুলো একটি ধ্রুবক কোণ থেকে সামান্য বিচ্যুত হয় । এ ছায়াপথে ৩টি বিস্ময়কর অতিনবতারা (Supernova) দেখা যায়: (ক) SN 2002ap (খ) SN 2003gd (গ) SN 2013ej । এছাড়া, গত ৬ই জুলাই ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে একটি ক্ষণস্থায়ী দৈত্যাকার অগ্নুৎপাত AT 2019krl বা LBV আবিষ্কৃত হয়েছিল । এ ছায়াপথটি এম৭৪ নামক ছায়াপথ দলের সবচেয়ে উজ্জ্বল সদস্য । ৫ থেকে ৭টি ছায়াপথের একটি দল যার মধ্যে রয়েছে অদ্ভুত এক সর্পিল ছায়াপথ NGC 660 এবং কয়েকটি অনিয়মিত ছায়াপথ । ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে The Chandra X-ray Observatory এম৭৪ ছায়াপথের মধ্যে একটি অতি আলোকিত রঞ্জনরশ্মির উৎস (ULX) পর্যবেক্ষণ করে, যা প্রায় দুই ঘন্টা পর্যায়ক্রমিক ব্যবধানে একটি নিউট্রন নক্ষত্রের চেয়ে বেশি রঞ্জনরশ্মির শক্তি বিকিরণ করে । এম৭৪ ছায়াপথের আনুমানিক ভর হচ্ছে ১০০০০ M সৌর ভর ☉ । এটি মধ্যবর্তী-ভর কৃষ্ণ গহ্বরের (An intermediate-mass black hole) একটি সূচক । নাক্ষত্রিক কৃষ্ণ গহ্বরের আকার এবং অনেক ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক বিশাল কৃষ্ণগহ্বরগুলোর মধ্যে এটি একটি বরং এটি অস্বাভাবিক শ্রেণী হবে । এ ধরনের বস্তু একটি নক্ষত্র স্তবকের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম (নাক্ষত্রিক) কৃষ্ণগহ্বর থেকে তৈরি হয় বলে বিশ্বাস করা হয় । এ উৎসটিকে CXOU J013651.1+154547 হিসেবে শনাক্তকরণ করা হয় । 

তথ্যসূত্র: www.science.nasa.gov , Wikipedia 
Image Processing: Mark Hanson 
https://www.hansonastronomy.com/m-74 
📸 Mikhail Vasilev

Sunday, 14 July 2024

ছায়াপথ M63



M63 হচ্ছে দারুণ একটি ছায়াপথ । এটি Messier 63 বা M63 বা NGC 5055 বা সূর্যমুখী ছায়াপথ (Sunflower Galaxy) নামেও পরিচিত । এ ছায়াপথে আনুমানিক ৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে যা উত্তরের Canes Venatici নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত । এটি একটি সর্পিল ছায়াপথ । ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী Pierre Méchain সর্বপ্রথম M63 ছায়াপথটি আবিষ্কার করেন । পরবর্তীতে তার সহকর্মী Charles Messier ১৪ই জুন ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে বিশদভাবে যাচাই করার মধ্য দিয়ে আবিষ্কার করেন । এ ছায়াপথটি মেসিয়ার ক্যাটালগে অবজেক্ট 63 হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে । ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে অ্যাংলো-আইরিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী Lord Rosse এ ছায়াপথের মধ্যে সর্পিল কাঠামো শনাক্ত করেন । এটিকে প্রথম ছায়াপথগুলোর মধ্যে একটি তৈরি করে যেখানে এ ধরনের কাঠামো চিহ্নিত করা হয়েছিল । এ ছায়াপথের আকৃতি বা রূপবিদ্যায় SAbc এর একটি শ্রেণীবিভাগ রয়েছে, যা একটি সর্পিল রূপ নির্দেশ করে যার কোনো কেন্দ্রীয় দণ্ড বৈশিষ্ট্য নেই (SA) এবং মাঝারি থেকে ঢিলেঢালাভাবে ক্ষত বা মর্মাঘাত বাহুগুলো (bc) ।  দৃশ্যমান আলোতে বড় আকারের ক্রমাগত সর্পিল কাঠামোর সাধারণ ঘাটতি বা অভাব রয়েছে, তাই এটিকে একটি Flocculent Galaxy বিবেচনা করা হয় । যাইহোক, যখন অবলোহিত আলোর কাছাকাছি পর্যবেক্ষণ করা হয়, তখন এর একটি প্রতিসম এবং দুই-বাহুর গঠন দেখা যায় । প্রতিটি বাহু ছায়াপথের চারপাশে ১৫০° টানে বা মোচড়ানো অবস্থার সৃষ্টি করে এবং নিউক্লিয়াস থেকে ১৩০০০ আলোকবর্ষ (৪০০০ পার্সেক) পর্যন্ত প্রসারিত হয় । M63 ছায়াপথ হচ্ছে দুর্বলভাবে সক্রিয় একটি ছায়াপথ যার একটি LINER নিউক্লিয়াসে রয়েছে একটি সংক্ষিপ্ত 'নিম্ন-আয়নকরণ পারমাণবিক নির্গমন-রেখা অঞ্চল' । এটি গ্যালাকটিক নিউক্লিয়াসে এক অমীমাংসিত উৎস হিসেবে প্রদর্শিত হয় যা একটি বিচ্ছুরিত নির্গমনে আবৃত বা লুকাইয়া থাকে ।  পরবর্তীটি উত্তর মহাকাশীয় মেরু সাপেক্ষে ১১০° অবস্থান কোণ বরাবর প্রসারিত হয় এবং নরম রঞ্জন-রশ্মি (Soft X-rays) ও হাইড্রোজেন আলফা (H-alpha) উভয়কে প্রায় একই দিক থেকে আসা লক্ষ্য করা যায় । নিউক্লিয়াসে একটি অতি বৃহদায়তন কৃষ্ণ গহ্বরের (SMBH) অস্তিত্ব অনিশ্চিত ।  যদি এটি বিদ্যমান থাকে, তাহলে ভর অনুমান করা হয় (8.5±1.9)×108 M সৌর ভর অথবা সূর্যের ভরের প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন গুণ । ২১ সেঃমিঃ হাইড্রোজেন লাইনে বেতার পর্যবেক্ষণগুলো দেখায় যে M63 ছায়াপথের গ্যাসীয় চাকতি ১৩০০০০ আলোকবর্ষ (৪০ কিলোপারসেক) ব্যাসার্ধের বাইরের দিকে প্রসারিত, উজ্জ্বল আলোকিত চাকতি ভালোভাবে অতীত । এ গ্যাস একটি প্রতিসম গঠন বা আকৃতি দেখায় যা ৩৩০০০ আলোকবর্ষ (১০ কিলোপারসেক) ব্যাসার্ধ থেকে শুরু করে একটি উচ্চারিত পদ্ধতিতে টানে বা মোচড়ায় বা বিকৃত (Warp) করে । গঠনটি একটি Dark Matter Halo কে নির্দেশ করে যা অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের ক্ষেত্রে ভারসাম্য (Offset) হয় । টানা বা বিকৃত বা মোচড়ানো অবস্থার কারণ অস্পষ্ট, কিন্তু অবস্থান কোণটি ছোট সহচর ছায়াপথ UGC 8313 এর দিকে নির্দেশ করে । আলোক-দূরত্ব পরিমাপের উপর ভিত্তি করে M63 ছায়াপথের দূরত্ব হচ্ছে ২৯৩০০০০০ আলোকবর্ষ (৮.৯৯ মেগাপারসেক) । স্থানীয় ছায়াপথ গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত অরীয় গতিবেগ ১৫২০০০০০ আলোকবর্ষ (৪.৬৫ মেগাপারসেক) অনুমান করা হয় । Tully-Fisher সম্পর্কের পরিসরের উপর ভিত্তি করে অনুমান ১৬০০০০০০–৩৪০০০০০০ আলোকবর্ষের (৫.০-১০.৩ মেগাপারসেক) বেশি । লাল-দৈত্য শাখা কৌশল 28,930,000 ± 950,000 আলোকবর্ষ (8.87 ± 0.29 মেগাপারসেক) দূরত্বের ইঙ্গিত দেয়। M63 হল M51 গ্রুপের অংশ, গ্যালাক্সির একটি গোষ্ঠী যার মধ্যে রয়েছে M51 ('Whirlpool Galaxy' ') । উল্লেখ্য যে: জ্যোতির্বিদ্যায় Tully-Fisher Relation (TFR) হচ্ছে একটি সর্পিল ছায়াপথের ভর বা অন্তর্নিহিত উজ্জ্বলতা এবং এর Asymptotic ঘূর্ণন বেগ বা নির্গমন রেখার প্রস্থের মধ্যে একটি ব্যাপকভাবে যাচাইকৃত পরীক্ষামূলক সম্পর্ক । যেহেতু উজ্জ্বলতা দূরত্ব-নির্ভর, তাই সম্পর্কটি তাদের ঘূর্ণন বেগের পরিমাপ থেকে ছায়াপথের দূরত্ব অনুমান করতে ব্যবহার করা যেতে পারে । ২৪শে মে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে এ ছায়াপথের একটি বাহুতে ১১.৮ মাত্রার একটি অতিনবতারা (Supernova) দেখা গিয়েছিল যা প্রায় সর্বোচ্চ আলোতে পৌঁছেছিল । এ SN 1971I অতিনবতারার বর্ণচ্ছটা নমুনা-I এর অতিনবতারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ । যাইহোক, এটির বর্ণালিবীক্ষনিক আচরণ অস্বাভাবিক প্রদর্শিত হয়েছিল । 

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, আন্তর্জাল (The Internet) ।

ছবি: https://www.jpl.nasa.gov/images/pia13900-spitzers-sunflower-galaxy 


Saturday, 6 July 2024

সর্পিল ছায়াপথ M83



M83 (Messier 83) ছায়াপথ তার উচ্চারিত সর্পিল বাহুগুলোর জন্য Southern Pinwheel Galaxy এবং NGC 5236 নামে পরিচিত । বৃহদায়তন, উজ্জ্বল এবং সুন্দর এ বাধা সর্পিল ছায়াপথটি Hydra এবং Centaurus নক্ষত্রমণ্ডলীর দক্ষিণ-পূর্ব সীমানার শীর্ষে প্রায় ১৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত । এটি প্রায় ৪০০০০ আলোকবর্ষ জুড়ে বিস্তৃত । ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী Nicolas-Louis de Lacaille ১৭ই ফেব্রুয়ারি ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে Cape of Good Hope এর মধ্যে M83 ছায়াপথ আবিষ্কার করেন । বিখ্যাত ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী Charles Messier ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে পর্যবেক্ষিত বস্তু হিসেবে M83 ছায়াপথকে মেসিয়ার তালিকায় যুক্ত করেন । এর আইসোফোটাল ব্যাস প্রায় ৩৬.২৪ কিলোপারসেক (১১৮০০০ আলোকবর্ষ) । একটি অদ্ভুত বামন ও অনিয়মিত ছায়াপথ NGC 5253 এর কাছে এ দৈত্যাকার M83 ছায়াপথটি অবস্থিত এবং এ দুটি ছায়াপথ সম্ভবত গত বিলিয়ন বছরের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া করেছে যার ফলে তাদের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে নক্ষত্রের বিশাল গঠন তৈরির প্রক্রিয়া বা জ্যোতির্পদার্থগত প্রক্রিয়ার (Starburst) কার্যকলাপ হয়েছে । ঘনত্ব তরঙ্গ তত্ত্ব অনুসারে, সর্পিল বাহুগুলোর অগ্রভাগের প্রান্ত বরাবর M83 ছায়াপথে নক্ষত্র গঠনের হার বেশি । NASA এর Galaxy Evolution Explorer প্রকল্পের গবেষকরা ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে ২০ কিলোপারসেক বাইরের দিকে প্রচুর সংখ্যক নতুন নক্ষত্র খুঁজে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন । এতোদিন মনে করা হতো যে, এ অঞ্চলগুলোতে তারকা গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব ছিল । এছাড়া ছায়াপথের বাহুগুলোর ঘন ধূলিকণার গলির প্রান্তের কাছে লাল রঙের নক্ষত্র গঠনের অঞ্চলগুলোর সম্পদ পাওয়া যায় । পরামর্শ দেয় যে, M83 হাজার-রুবি ছায়াপথের (Thousand-Ruby Galaxy) জন্য আরেকটি জনপ্রিয় মনিকার । এ নতুন গভীর দূরবীক্ষণিক ডিজিটাল চিত্রটি উজ্জ্বল ছায়াপথের ক্ষীণ, প্রসারিত Halo কেও প্রমাণ করে । মহাজাগতিক কাঠামোর নিচের দিকে ধাবমান একটি নাক্ষত্রিক জোয়ারের স্রোতের ধ্বংসাবশেষ বিশাল M83 ছায়াপথ থেকে একটি ছোট একত্রিত উপগ্রহ ছায়াপথের মহাকর্ষীয় বিঘ্ন দ্বারা ঘটেছে । ব্রিটিশ-অস্ট্রেলিয়ান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ফটোগ্রাফার David Frederick Malin AM এবং Brian Hadley ১৯৯০ এর দশকের মাঝামাঝি Photographic plateগুলোকে উন্নত করে অধরা নক্ষত্র প্রবাহ (Elusive star stream) খুঁজে পান । M83 ছায়াপথে ৬টি অতিনবতারা বিস্ফোরণ (Supernovae) দেখা গেছে যেমন: SN 1923A (mag. 14), SN 1945B (mag. 14.2), SN 1950B (mag. 14.5), SN 1957D (mag. 15), SN 1968L (mag. 11.9) এবং SN 1983N (ধরণ Ia, mag. 11.9) । সর্পিল M83 ছায়াপথ কাছাকাছি ছায়াপথ গোষ্ঠী Centaurus A/M83 Group এর মধ্যে দুটি উপগোষ্ঠীর একটির কেন্দ্রে রয়েছে । Centaurus A হচ্ছে Centaurus নক্ষত্রমণ্ডলের একটি ছায়াপথ ।  Centaurus A ছায়াপথটি রয়েছে অন্য একটি ছায়াপথ উপগোষ্ঠীর কেন্দ্রে । এগুলো কখনো একটি দল হিসেবে এবং কখনো কখনো দুটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় । যাইহোক, Centaurus A ছায়াপথের আশেপাশের ছায়াপথ এবং বৃহৎ M83 ছায়াপথের আশেপাশের ছায়াপথগুলো শারীরিকভাবে একে অপরের কাছাকাছি এবং উভয় ছায়াপথ উপগোষ্ঠী একে অপরের সাথে তুলনামূলক সরে যাচ্ছে না বলে মনে হয় ।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, Cristi Agapi । ছবির কপিরাইট ©: Michael Sidonio । 

আমার প্রণয়িনীর চোখ সূর্যের মত নয়

 My mistress’ eyes are nothing like the sun (Sonnet 130)  --------  William Shakespeare , 1564 –1616 My mistress’ eyes are nothing like the ...