Sunday, 14 July 2024

ছায়াপথ M63



M63 হচ্ছে দারুণ একটি ছায়াপথ । এটি Messier 63 বা M63 বা NGC 5055 বা সূর্যমুখী ছায়াপথ (Sunflower Galaxy) নামেও পরিচিত । এ ছায়াপথে আনুমানিক ৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে যা উত্তরের Canes Venatici নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত । এটি একটি সর্পিল ছায়াপথ । ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী Pierre Méchain সর্বপ্রথম M63 ছায়াপথটি আবিষ্কার করেন । পরবর্তীতে তার সহকর্মী Charles Messier ১৪ই জুন ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে বিশদভাবে যাচাই করার মধ্য দিয়ে আবিষ্কার করেন । এ ছায়াপথটি মেসিয়ার ক্যাটালগে অবজেক্ট 63 হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে । ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে অ্যাংলো-আইরিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী Lord Rosse এ ছায়াপথের মধ্যে সর্পিল কাঠামো শনাক্ত করেন । এটিকে প্রথম ছায়াপথগুলোর মধ্যে একটি তৈরি করে যেখানে এ ধরনের কাঠামো চিহ্নিত করা হয়েছিল । এ ছায়াপথের আকৃতি বা রূপবিদ্যায় SAbc এর একটি শ্রেণীবিভাগ রয়েছে, যা একটি সর্পিল রূপ নির্দেশ করে যার কোনো কেন্দ্রীয় দণ্ড বৈশিষ্ট্য নেই (SA) এবং মাঝারি থেকে ঢিলেঢালাভাবে ক্ষত বা মর্মাঘাত বাহুগুলো (bc) ।  দৃশ্যমান আলোতে বড় আকারের ক্রমাগত সর্পিল কাঠামোর সাধারণ ঘাটতি বা অভাব রয়েছে, তাই এটিকে একটি Flocculent Galaxy বিবেচনা করা হয় । যাইহোক, যখন অবলোহিত আলোর কাছাকাছি পর্যবেক্ষণ করা হয়, তখন এর একটি প্রতিসম এবং দুই-বাহুর গঠন দেখা যায় । প্রতিটি বাহু ছায়াপথের চারপাশে ১৫০° টানে বা মোচড়ানো অবস্থার সৃষ্টি করে এবং নিউক্লিয়াস থেকে ১৩০০০ আলোকবর্ষ (৪০০০ পার্সেক) পর্যন্ত প্রসারিত হয় । M63 ছায়াপথ হচ্ছে দুর্বলভাবে সক্রিয় একটি ছায়াপথ যার একটি LINER নিউক্লিয়াসে রয়েছে একটি সংক্ষিপ্ত 'নিম্ন-আয়নকরণ পারমাণবিক নির্গমন-রেখা অঞ্চল' । এটি গ্যালাকটিক নিউক্লিয়াসে এক অমীমাংসিত উৎস হিসেবে প্রদর্শিত হয় যা একটি বিচ্ছুরিত নির্গমনে আবৃত বা লুকাইয়া থাকে ।  পরবর্তীটি উত্তর মহাকাশীয় মেরু সাপেক্ষে ১১০° অবস্থান কোণ বরাবর প্রসারিত হয় এবং নরম রঞ্জন-রশ্মি (Soft X-rays) ও হাইড্রোজেন আলফা (H-alpha) উভয়কে প্রায় একই দিক থেকে আসা লক্ষ্য করা যায় । নিউক্লিয়াসে একটি অতি বৃহদায়তন কৃষ্ণ গহ্বরের (SMBH) অস্তিত্ব অনিশ্চিত ।  যদি এটি বিদ্যমান থাকে, তাহলে ভর অনুমান করা হয় (8.5±1.9)×108 M সৌর ভর অথবা সূর্যের ভরের প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন গুণ । ২১ সেঃমিঃ হাইড্রোজেন লাইনে বেতার পর্যবেক্ষণগুলো দেখায় যে M63 ছায়াপথের গ্যাসীয় চাকতি ১৩০০০০ আলোকবর্ষ (৪০ কিলোপারসেক) ব্যাসার্ধের বাইরের দিকে প্রসারিত, উজ্জ্বল আলোকিত চাকতি ভালোভাবে অতীত । এ গ্যাস একটি প্রতিসম গঠন বা আকৃতি দেখায় যা ৩৩০০০ আলোকবর্ষ (১০ কিলোপারসেক) ব্যাসার্ধ থেকে শুরু করে একটি উচ্চারিত পদ্ধতিতে টানে বা মোচড়ায় বা বিকৃত (Warp) করে । গঠনটি একটি Dark Matter Halo কে নির্দেশ করে যা অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের ক্ষেত্রে ভারসাম্য (Offset) হয় । টানা বা বিকৃত বা মোচড়ানো অবস্থার কারণ অস্পষ্ট, কিন্তু অবস্থান কোণটি ছোট সহচর ছায়াপথ UGC 8313 এর দিকে নির্দেশ করে । আলোক-দূরত্ব পরিমাপের উপর ভিত্তি করে M63 ছায়াপথের দূরত্ব হচ্ছে ২৯৩০০০০০ আলোকবর্ষ (৮.৯৯ মেগাপারসেক) । স্থানীয় ছায়াপথ গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত অরীয় গতিবেগ ১৫২০০০০০ আলোকবর্ষ (৪.৬৫ মেগাপারসেক) অনুমান করা হয় । Tully-Fisher সম্পর্কের পরিসরের উপর ভিত্তি করে অনুমান ১৬০০০০০০–৩৪০০০০০০ আলোকবর্ষের (৫.০-১০.৩ মেগাপারসেক) বেশি । লাল-দৈত্য শাখা কৌশল 28,930,000 ± 950,000 আলোকবর্ষ (8.87 ± 0.29 মেগাপারসেক) দূরত্বের ইঙ্গিত দেয়। M63 হল M51 গ্রুপের অংশ, গ্যালাক্সির একটি গোষ্ঠী যার মধ্যে রয়েছে M51 ('Whirlpool Galaxy' ') । উল্লেখ্য যে: জ্যোতির্বিদ্যায় Tully-Fisher Relation (TFR) হচ্ছে একটি সর্পিল ছায়াপথের ভর বা অন্তর্নিহিত উজ্জ্বলতা এবং এর Asymptotic ঘূর্ণন বেগ বা নির্গমন রেখার প্রস্থের মধ্যে একটি ব্যাপকভাবে যাচাইকৃত পরীক্ষামূলক সম্পর্ক । যেহেতু উজ্জ্বলতা দূরত্ব-নির্ভর, তাই সম্পর্কটি তাদের ঘূর্ণন বেগের পরিমাপ থেকে ছায়াপথের দূরত্ব অনুমান করতে ব্যবহার করা যেতে পারে । ২৪শে মে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে এ ছায়াপথের একটি বাহুতে ১১.৮ মাত্রার একটি অতিনবতারা (Supernova) দেখা গিয়েছিল যা প্রায় সর্বোচ্চ আলোতে পৌঁছেছিল । এ SN 1971I অতিনবতারার বর্ণচ্ছটা নমুনা-I এর অতিনবতারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ । যাইহোক, এটির বর্ণালিবীক্ষনিক আচরণ অস্বাভাবিক প্রদর্শিত হয়েছিল । 

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, আন্তর্জাল (The Internet) ।

ছবি: https://www.jpl.nasa.gov/images/pia13900-spitzers-sunflower-galaxy 


Saturday, 6 July 2024

সর্পিল ছায়াপথ M83



M83 (Messier 83) ছায়াপথ তার উচ্চারিত সর্পিল বাহুগুলোর জন্য Southern Pinwheel Galaxy এবং NGC 5236 নামে পরিচিত । বৃহদায়তন, উজ্জ্বল এবং সুন্দর এ বাধা সর্পিল ছায়াপথটি Hydra এবং Centaurus নক্ষত্রমণ্ডলীর দক্ষিণ-পূর্ব সীমানার শীর্ষে প্রায় ১৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত । এটি প্রায় ৪০০০০ আলোকবর্ষ জুড়ে বিস্তৃত । ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী Nicolas-Louis de Lacaille ১৭ই ফেব্রুয়ারি ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে Cape of Good Hope এর মধ্যে M83 ছায়াপথ আবিষ্কার করেন । বিখ্যাত ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী Charles Messier ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে পর্যবেক্ষিত বস্তু হিসেবে M83 ছায়াপথকে মেসিয়ার তালিকায় যুক্ত করেন । এর আইসোফোটাল ব্যাস প্রায় ৩৬.২৪ কিলোপারসেক (১১৮০০০ আলোকবর্ষ) । একটি অদ্ভুত বামন ও অনিয়মিত ছায়াপথ NGC 5253 এর কাছে এ দৈত্যাকার M83 ছায়াপথটি অবস্থিত এবং এ দুটি ছায়াপথ সম্ভবত গত বিলিয়ন বছরের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া করেছে যার ফলে তাদের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে নক্ষত্রের বিশাল গঠন তৈরির প্রক্রিয়া বা জ্যোতির্পদার্থগত প্রক্রিয়ার (Starburst) কার্যকলাপ হয়েছে । ঘনত্ব তরঙ্গ তত্ত্ব অনুসারে, সর্পিল বাহুগুলোর অগ্রভাগের প্রান্ত বরাবর M83 ছায়াপথে নক্ষত্র গঠনের হার বেশি । NASA এর Galaxy Evolution Explorer প্রকল্পের গবেষকরা ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে ২০ কিলোপারসেক বাইরের দিকে প্রচুর সংখ্যক নতুন নক্ষত্র খুঁজে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন । এতোদিন মনে করা হতো যে, এ অঞ্চলগুলোতে তারকা গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব ছিল । এছাড়া ছায়াপথের বাহুগুলোর ঘন ধূলিকণার গলির প্রান্তের কাছে লাল রঙের নক্ষত্র গঠনের অঞ্চলগুলোর সম্পদ পাওয়া যায় । পরামর্শ দেয় যে, M83 হাজার-রুবি ছায়াপথের (Thousand-Ruby Galaxy) জন্য আরেকটি জনপ্রিয় মনিকার । এ নতুন গভীর দূরবীক্ষণিক ডিজিটাল চিত্রটি উজ্জ্বল ছায়াপথের ক্ষীণ, প্রসারিত Halo কেও প্রমাণ করে । মহাজাগতিক কাঠামোর নিচের দিকে ধাবমান একটি নাক্ষত্রিক জোয়ারের স্রোতের ধ্বংসাবশেষ বিশাল M83 ছায়াপথ থেকে একটি ছোট একত্রিত উপগ্রহ ছায়াপথের মহাকর্ষীয় বিঘ্ন দ্বারা ঘটেছে । ব্রিটিশ-অস্ট্রেলিয়ান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ফটোগ্রাফার David Frederick Malin AM এবং Brian Hadley ১৯৯০ এর দশকের মাঝামাঝি Photographic plateগুলোকে উন্নত করে অধরা নক্ষত্র প্রবাহ (Elusive star stream) খুঁজে পান । M83 ছায়াপথে ৬টি অতিনবতারা বিস্ফোরণ (Supernovae) দেখা গেছে যেমন: SN 1923A (mag. 14), SN 1945B (mag. 14.2), SN 1950B (mag. 14.5), SN 1957D (mag. 15), SN 1968L (mag. 11.9) এবং SN 1983N (ধরণ Ia, mag. 11.9) । সর্পিল M83 ছায়াপথ কাছাকাছি ছায়াপথ গোষ্ঠী Centaurus A/M83 Group এর মধ্যে দুটি উপগোষ্ঠীর একটির কেন্দ্রে রয়েছে । Centaurus A হচ্ছে Centaurus নক্ষত্রমণ্ডলের একটি ছায়াপথ ।  Centaurus A ছায়াপথটি রয়েছে অন্য একটি ছায়াপথ উপগোষ্ঠীর কেন্দ্রে । এগুলো কখনো একটি দল হিসেবে এবং কখনো কখনো দুটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় । যাইহোক, Centaurus A ছায়াপথের আশেপাশের ছায়াপথ এবং বৃহৎ M83 ছায়াপথের আশেপাশের ছায়াপথগুলো শারীরিকভাবে একে অপরের কাছাকাছি এবং উভয় ছায়াপথ উপগোষ্ঠী একে অপরের সাথে তুলনামূলক সরে যাচ্ছে না বলে মনে হয় ।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, Cristi Agapi । ছবির কপিরাইট ©: Michael Sidonio । 

হাওয়াই দ্বীপের বিস্ময়কর উদ্ভিদ ওহিয়া লেহুয়া

                                                        https://bn.photo-ac.com/ 


                                                           https://portal.ehawaii.gov/


                                                          https://www.inaturalist.org/ 


                                                             https://www.inaturalist.org/ 


ওহিয়া লেহুয়া ('Ohi’a Lehua) হচ্ছে হাওয়াইয়ের স্থানীয় চিরহরিৎ বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ । এর আরেকটি নাম লেহুয়া ওহিয়া (Lehua 'Ohi'a) । উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য হাওয়াইয়ে এটিকে একচেটিয়াভাবে পাওয়া যায় । এর বৈজ্ঞানিক নাম Metrosideros polymorpha এবং এটি Myrtaceae পরিবারের সদস্য (Myrtle family) । ওহিয়া লেহুয়া হাওয়াইয়ের রাষ্ট্রীয় গাছ । এটি প্রথম প্রজাতির এমন একটি বৈচিত্র্যময় গাছ যেটি কঠিন লাভা শিলা এবং শুষ্ক-অনুর্বর লাভা প্রবাহের উপর জন্মগ্রহণ করে । হাওয়াইয়ান ভাষার শব্দ ʻŌhiʻa শুধুমাত্র গাছকে বোঝায় এবং Lehua শব্দটি তার ফুলকে বোঝায় । ʻŌhiʻa শব্দটি তার পূর্বপুরুষ প্রোটো-ওশেনিক শব্দ *কাফিকা (Ancestral Proto-Oceanic word *Kafika) থেকে উদ্ভূত হয়েছে বলে মনে করা হয় । তবে Lehua শব্দের কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যুৎপত্তি অস্পষ্ট । দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে Metrosideros গণের প্রায় ৫০টি প্রজাতি এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ১টি প্রজাতি রয়েছে । এ উদ্ভিদের ৫টি প্রজাতি যেমন: Metrosideros polymorpha, M. macropus, M. rugosa, M. tremuloides এবং M. waialealae এর আবাসস্থল হচ্ছে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে যারা এ দ্বীপের স্থানীয় অর্থাৎ এগুলো বিশ্বের আর কোথাও পাওয়া যায় না । আর্দ্র এবং শুষ্ক বন এদের বাসস্থান । পাতাগুলো ডিম্বাকৃতি । হাল্কা ধূসর রঙের কচি বাকল মসৃণ যা বয়সের সাথে সাথে রুক্ষ ও খসখসে হয়ে যায় । পাকা ফলগুলো ফেটে বাতাসের মাধ্যমে বীজ ছড়িয়ে পড়ে । ওহিয়া লেহুয়া প্রায় সমস্ত হাওয়াইয়ান বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে পাওয়া যায় যেখানে নিম্নভূমির শুষ্ক ঝোপ ভূমি থেকে বৃষ্টিবর্ষণ বন (Rainforest) এবং উচ্চ-উচ্চতার ভিজে নরম মাটি (Bog) থেকে শুষ্ক লাভা প্রবাহ পর্যন্ত । Niihau দ্বীপ এবং Kaho'olawe দ্বীপ ছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি থেকে প্রায় ৮৫০০ ফুট উচ্চতায় প্রধান হাওয়াইয়ান দ্বীপগুলোর পর্বত বা বনে এ প্রভাবশালী গাছটি দেখা যায় । উচ্চতা, মাটি এবং আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে এটি ছোট ঝোপ থেকে শুরু করে প্রায় ১০০ ফুট পর্যন্ত লম্বা বিশাল আকৃতির রূপ নিতে পারে । ওহিয়া লেহুয়া অন্যান্য গাছের সাথে বিভিন্ন বনের মধ্যে বেড়ে উঠে এবং প্রায় ৫০০ বছরেরও বেশি বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে । হাওয়াই দ্বীপে বৃষ্টিবর্ষণ বনের আবাসস্থলে তরুণ আগ্নেয়গিরির স্তরগুলোতে প্রজাতিটি তার সর্বোচ্চ তলদেশীয় এলাকায় অবস্থান (Stand basal) করতে পেরেছে । যদিও গাছটি ৫০০ মিলিমিটারের (২০ ইঞ্চি) কম বৃষ্টিপাতের উপকূলীয় অঞ্চলে এটি জন্মায় না । হাওয়াইয়ের সবচেয়ে সাধারণ এ গাছটি মূল্যবান জলবিভাজিকায় সুরক্ষা প্রদান করে । 

ওহিয়া লেহুয়া গাছ বিভিন্ন প্রকার দেশীয় পোকামাকড় এবং গাছপালাকে সমর্থন করে এদের আশ্রয় দেয় । বসন্ত বা গ্রীষ্মে ওহিয়া লেহুয়া গাছে একটি দুর্দান্ত লাল মুকুট ফুল ফোটে । তবে কিছু জাতের উদ্ভিদের নান্দনিক সৌন্দর্যের ফুল ফোটে শরৎ বা শীতকালে । Powder puff ফুলের মতো দেখতে অসাধারণ সুন্দর ফুলগুলো সাধারণত লাল রঙের হয়ে থাকে । এছাড়া উজ্জ্বল হলুদ, কমলা, কমলা-লাল, গোলাপী, স্যামন এবং কিংবদন্তি সাদা লেহুয়া থেকে শুরু করে অনেক রঙের হতে পারে । এ ফুল বেশ উজ্জ্বল এবং অসংখ্য লম্বা পুংকেশর ফুলটিকে বৈচিত্র্যময় বৈশিষ্ট্যের পম-পম আকৃতি (Pom-pom shape) দেয় । টকটকে লাল মোহনীয় ফুলগুলো দেশীয় প্রজাতির প্রতীক হিসেবে এসেছে । ওহিয়া লেহুয়া ফুল স্থানীয় পাখিদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করে । বেশিরভাগ পাখির ক্ষেত্রে ফুলের অমৃত (Nectar) এবং পোকামাকড় শিকারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস । এ পাখিদের মধ্যে কিছু বিপন্ন প্রজাতি রয়েছে যেমন: Akepa (Loxops coccinea), Crested honeycreeper (Palmeria dolei) এবং Hemignathus ইত্যাদি । স্থানীয় হাওয়াইয়ান পাখি (Hawaiian honeycreepers বা Drepanididae) এবং রকমারি কীটপতঙ্গ হচ্ছে ওহিয়া লেহুয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরাগায়নকারী । ওহিয়া লেহুয়া প্রায়শই পতিত গাছের ডালপালা থেকে উদ্ভিজ্জভাবে প্রজনন করে । বিভিন্ন বিকাশের পর্যায়ে সাধারণত ১৮ থেকে ২৪টি ফুল থাকে এবং ফল পরিপক্ক হতে প্রায় ৪ থেকে ১২ মাস সময় লাগে । কান্ডের অঙ্কুর বা কচি বৃক্ষশাখা (Sprout) আগাম শিকড় তৈরি করতে পারে এবং অবশেষে স্বাধীন হয়ে উঠে । স্থায়ী দুর্বল বা মরে যাওয়া গাছের ডালপালাগুলো কখোনো মূল গাছের চেয়ে বেশি বেঁচে থাকতে পারে । একটি গবেষণায় দেখা যায় ওহিয়া লেহুয়া বীজের সর্বাধিক অঙ্কুরোদগম ২৫° C (৭৭° ফারেনহাইট) এবং ৪ থেকে ১৫ শতাংশ পূর্ণ সূর্যালোকে । ওহিয়া লেহুয়া গাছ বিভিন্ন মাটি এবং এলাকায় জন্মে থাকে । এ গাছটি ভূতাত্ত্বিকভাবে ছোট আগ্নেয়গিরিতে প্লাইস্টোসিন লাভা প্রবাহের (Pleistocene lava flows) দিকে মৃদুভাবে ঢালু হওয়া Histosol এবং Inceptisol গুলোতে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে । Histosol, Mollisol, Spodosol, Oxisol, Ultisol ও Alfisol মাটির সংমিশ্রণে এবং হাওয়াইয়ান দ্বীপপুঞ্জের ভূতাত্ত্বিকভাবে পুরোনো আগ্নেয়গিরির উপর অশ্রেণীবদ্ধ পাহাড়ী ভূমিতে গাছটি জন্মাতে পছন্দ করে । এছাড়া উন্মুক্ত শৈলশিরা, খাড়া ঢাল ও সুনিষ্কাশিত স্থানে এটি জন্মে থাকে । 

হাওয়াইয়ের আগ্নেয়গিরিময় জাতীয় উদ্যান একটি উদ্ভিদ স্বর্গকে আশ্রয় দেয় (Harbors a Plant Paradise) । ওহিয়া লেহুয়া হাওয়াই দেশীয় গাছের মধ্যে সর্বাধিক এবং সম্ভবত সবচেয়ে আইকনিক । ৮ প্রকার ওহিয়া লেহুয়া গাছের মধ্যে ৪টিই পাওয়া যায় জাতীয় উদ্যানে । হাওয়াইয়ান স্থানীয় গাছগুলো হাওয়াই দ্বীপের মতো আগ্নেয়গিরির প্রাকৃতিক ভূচিত্রের উন্নতির জন্য বিশেষভাবে অভিযোজিত হয় । এটি নতুন লাভা প্রবাহের উপর উপনিবেশ স্থাপনকারী প্রথম উদ্ভিদগুলোর মধ্যে একটি এবং পত্ররন্ধ্র ধারণ করে যা ক্ষতিকর গ্যাসের উপস্থিতিতে বন্ধ হয়ে যাবে যখন অনেক অ-স্থানীয় গাছ লড়াই করবে বা মারা যাবে । বিশেষ করে চাপের সময় গাছটি আর্দ্রতা সংগ্রহের জন্য তাদের শাখা থেকে তন্তুযুক্ত বায়বীয় শিকড় ভের করতে পারে । কুয়াশাচ্ছন্ন ঘনবর্ষণ বনাঞ্চলের পরিবেশে (Rainforest environment) এ উন্মুক্ত শিকড়গুলো গাছকে আর্দ্রতা সংগ্রহ করতে সাহায্য করে । হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের পরিবর্তনশীল ওহিয়া লেহুয়া গাছ হচ্ছে বনের মেরুদণ্ড । এটি অন্যান্য উদ্ভিদের জন্য ছায়া ও মাটি তৈরি করে । কখনো কখনো কঠোর আবহাওয়ার সাথে অভিযোজিত হয় । ঝড়ের পর গাছটি জল ধরে রেখে, পরবর্তী ক্ষয় ও বন্যা প্রতিরোধ করে জলাশয় সুরক্ষা এবং জল সংরক্ষণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে । স্থানীয় হাওয়াইয়ান ঐতিহ্যে ওহিয়া লেহুয়া গাছ আগ্নেয় বা আগ্নেয়গিরির দেবতা পেলের (Pele) সাথে ব্যাপকভাবে জড়িত । ঐতিহ্যগতভাবে নেটিভ হাওয়াইয়ানরা নির্মাণ, সরঞ্জাম, জ্বালানি, Kapa beater, Poi board এবং অস্ত্রের জন্য এ গাছের কাঠ ব্যবহার করে যখন এখানে লেই বা পুষ্পস্তবক (Lei) শোভা পায়, হুলা নৃত্য (Hula dence) এবং কাও গল্প (Kaʻao stories) অনুপ্রাণিত করে । ওহিয়া লেহুয়ার কচি ফুল হুলা বেদীর অলঙ্করণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং অনুশীলনে ব্যবহৃত হয় । গাছের পাতাগুলো ঔষধি চা হিসেবে ব্যবহৃত হয় । ওহিয়া লেহুয়া পবিত্র বলে বিবেচিত এবং এটি হাওয়াইয়ান সংস্কৃতিতে পিলিনা বা আন্তঃসংযোগের (Pilina বা Interconnection) প্রতীক ।

বৈচিত্র্যময় Metrosideros polymorpha একটি অত্যন্ত পরিবর্তনশীল চিরহরিৎ উদ্ভিদ । স্বনামধন্য ট্যাক্সোনমিস্টরা এ প্রজাতির ১১টি শ্রেণী চিনতে পেরেছেন । শুধুমাত্র M. polymorpha var. Prostrata শ্রেণীটি গাছের মর্যাদা বা দৈহিক উচ্চতা অর্জন করে না । ওহিয়া লেহুয়াতে উপ-প্রজাতি (বাস্তুপ্রজাতি) এবং জাতিগুলোর মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট নয় । এ পরিবর্তনশীল প্রজাতির মধ্যে Altitudinal, Edaphic এবং Successional উপ-প্রজাতিগুলোকে প্রস্তাব করা হয়েছে । কিছু উপ-প্রজাতি অগ্রগামী উদ্ভিদের প্রাথমিক উত্তরাধিকার বলে মনে করা হয় । Mauna Loa সক্রিয় আগ্নেয়গিরিতে গাছটিকে প্রায় ২৫০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত পাওয়া যায় । পুরোনো উচ্চ দ্বীপগুলোতে প্রজাতিগুলো ক্রমাগত আর্দ্র বৃষ্টি বন (Moist rain forest) পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে মনে হয় । জাতগুলোর রূপবিদ্যাও আলাদা, যাদের সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত (Pubescent) পাতাগুলো দৃশ্যত প্রজাতির অগ্রগামী রূপ এবং চকচকে পাতার জাতগুলো পরবর্তী ধারাবাহিক পর্যায়ে পাওয়া যায় । ওহিয়া লেহুয়াতে প্রায়শই জিনগতভাবে স্বতন্ত্র বংশের মধ্যে প্রজাতির মিলন প্রক্রিয়া (Intraspecific hybridization) প্রদর্শিত হয়েছে কিন্তু আংশিক অসামঞ্জস্যতারও কিছু প্রমাণ রয়েছে । ওহিয়া লেহুয়া অপেক্ষাকৃত ধীর গতির একটি বৃক্ষ । তরুণ আগ্নেয়গিরির স্তরগুলোর একটি অগ্রগামী প্রজাতির ওহিয়া লেহুয়া অপেক্ষাকৃত পুরোনো মাটিতে আধিপত্য বজায় রাখে । গাছটি ঋতুভেদে আর্দ্র বনাঞ্চলেও সাধারণত প্রভাবশালী হতে পারে বা স্থানীয় Acacia koa গাছের সাথে মিশ্রণ তৈরি করতে পারে । যদিও Acacia koa প্রজাতি ভেজা বনে শামিয়ানা বা ছাউনি (Canopy) আধিপত্যের কারণে এটির প্রাথমিক প্রতিযোগী । গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফার্ন গাছ Cibotium spp. (Tree fern বা Manfern বা Arborescent fern) বৃদ্ধির কারণে সর্বোত্তম অবস্থার সাথে সেই জায়গাগুলোতে ওহিয়া লেহুয়াকে স্থানচ্যুত করতে পারে । তবে অনেক পোকামাকড় ওহিয়া লেহুয়া গাছকে মারাত্মকভাবে আক্রমণ করে । এদের মধ্যে স্থানীয় Cerambycid borer Plagithmysus bilineatus পোকার সম্ভাব্য প্রভাব সবচেয়ে বেশি । এটি দুর্বল গাছের জন্য মহামারী ও ভয়ঙ্কর হতে পারে এবং ব্যাপক শামিয়ানা ছত্রাক বা রোগের (Extensive canopy dieback) সাথে জড়িত । পাশাপাশি অন্যান্য Borer পোকাগুলো যেমন: Ceresium Unicolor, Xyleborus saxesensi, X. simillimus, Defoliator এবং Sapsucking insect ইত্যাদি ওহিয়া লেহুয়া গাছের সম্ভাব্য ক্ষতিকারক । এছাড়া The root rots, Phytophthora cinnamomi, Pythium vexans, Shoestring root rot, Armillaria mellea ইত্যাদি স্থানীয়ভাবে ক্ষতিকারক হতে পারে এবং শামিয়ানা ছত্রাক বা রোগের সাথেও জড়িত । তবে Rhizoctonia spp. ছত্রাক দ্বারা স্যাঁতসেঁতে বন্ধ হওয়ার সংবাদ জানা গেছে ।

হাওয়াইয়ের এ অনন্য বনের জীব-বৈচিত্র্য এবং ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । দুঃখজনকভাবে হাওয়াই একটি পরিবেশগত সংকটের সম্মুখীন । সহস্রাব্দ ধরে বেঁচে থাকা গাছগুলো এখন ছত্রাকজনিত মারাত্মক রোগ (Myrtle rust), দাবানল, বন্যপ্রাণী (Feral ungulates) প্রজাতি এবং আক্রমণকারী ভিনদেশী গাছপালা (Alien invasive plants) যেমন: Strawberry guava (Psidium cattleyanum), Albizia (Falcataria falcata), Purple plague (Miconia calvescens), Faya tree (Myrica faya), Christmasberry (Schinus terebinthifolia), Silk oak (Grevillea robusta), Fountain grass (Cenchrus setaceus) দ্বারা প্রচণ্ড হুমকির সম্মুখীন যা সম্পদ ব্যবস্থাপকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে । হাওয়াই আগ্নেয়গিরিময় জাতীয় উদ্যানে ২৩ প্রজাতির বিপন্ন সংবহনতান্ত্রিক উদ্ভিদ (Vascular plants) রয়েছে যার মধ্যে ১৫টিই বিপন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ । সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ গুরুত্বপূর্ণ গাছগুলোর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়েছে ROD ছড়িয়ে পড়ে এবং বন ধ্বংস করার কারণে । উল্লেখ্য যে ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে হাওয়াই দ্বীপে আবিষ্কৃত ROD বা Rapid Ohiʻa Death বা 'দ্রুত ওহিয়া মৃত্যু' হচ্ছে একটি নতুন ছত্রাক রোগ, যা বর্তমানে হাওয়াই দ্বীপে ওহিয়া উদ্ভিদকে সাংঘাতিকভাবে আক্রমণ এবং হত্যা করে । ভয়ঙ্কর এ ছত্রাকের নাম Ceratocystis fimbriata । ছত্রাকটি গাছের সংবহনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে (Vascular system) বাধাগ্রস্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং জলের ছাউনি থেকে বঞ্চিত করে খুব দ্রুতই ওহিয়া লেহুয়া গাছকে মেরে ফেলতে পারে । হাওয়াইতে হাজার হাজার ওহিয়া লেহুয়া গাছ ইতিমধ্যেই ROD দ্বারা নিহত হয়েছে । ওহিয়া লেহুয়া হচ্ছে হাওয়াইয়ান বনের মূল প্রজাতি (Keystone species) যার উপর বাস্তুতন্ত্রের অন্যান্য প্রজাতিগুলো নির্ভর করে এবং এটি কোনো কারণে অপসারিত হলে বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে । গবেষকরা বিশ্বাস করেন যে এ ছত্রাকটি দীর্ঘ দূরত্বে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং সমগ্র রাষ্ট্র জুড়ে ওহিয়া লেহুয়া গাছকে হত্যা করার ক্ষমতা ROD এর রয়েছে । সুতরাং ROD এর মাধ্যমে বনের বিশাল বাস্তুতন্ত্রে এমন ভয়ানক ব্যাঘাত সৃষ্টি হলে হাওয়াইয়ের জলাধার, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জীবনযাত্রার মানকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে । যদিও প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক সংস্থা (IUCN) বিপদগ্রস্ত ওহিয়া লেহুয়া গাছকে সংস্থাটির লাল তালিকার্ভূক্ত করেছে । 

উদ্যানের ওয়েবসাইটে গাছপালা সম্পর্কে আরো জানা যেতে পারে: https://ow.ly/BIOa50Ssf3n , 

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া,  https://research.fs.usda.gov/ , https://www.inaturalist.org/ 

 ছবি: https://bn.photo-ac.com/ , https://portal.ehawaii.gov/ ,  https://www.inaturalist.org/ 

Sunday, 23 June 2024

স্পেনীয় শৈবাল বা শ্যাওলা (Spanish moss)






শৈবাল একটি সালোক-সংশ্লেষক, Eukaryotic জীবের বৃহৎ এবং বৈচিত্র্যময় গোষ্ঠী । স্পেনীয় শৈবাল বা শ্যাওলা হচ্ছে Epiphytic ফুলের উদ্ভিদ যা প্রায়শই গ্রীষ্মমন্ডলীয় এবং উপক্রান্তীয় জলবায়ুতে বড় গাছ (ছাল এবং ডালে), বন, পর্বত, নদী, হ্রদ এবং মরুভূমিতে জন্মে থাকে । এটি বেশিরভাগ মেক্সিকো, বারমুডা, বাহামা, মধ্য আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং ওয়েস্টইন্ডিজের স্থানীয় উদ্ভিদ । এর প্রাথমিক প্রাকৃতিক পরিসর হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (পুয়ের্তো রিকো এবং ইউ.এস. ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জসহ) থেকে আর্জেন্টিনা পর্যন্ত যেখানে যথেষ্ট পরিমাণে উষ্ণ জলবায়ু বিদ্যমান এবং তুলনামূলকভাবে উচ্চ গড় আর্দ্রতা ঘটে থাকে । উত্তর আমেরিকায় এটি মেক্সিকো উপসাগর এবং দক্ষিণ আটলান্টিক উপকূল অনুসরণ করে বিস্তৃতি ঘটায় । এছাড়া নর্থ্যাম্পটন কাউন্টি, ভার্জিনিয়া, দক্ষিণ মেরিল্যান্ড এবং হাওয়াই দ্বীপসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে জন্মে থাকে । অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে স্পেনীয় শৈবালকে প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিকীকৃত (Naturalized) করা হয়েছে । এটি ফরাসি পলিনেশিয়াতে ‘দাদার দাড়ি’ (Grandpa’s beard) নামে পরিচিত । এছাড়া স্পেনীয় শৈবাল ও মোজেসের (Moses) দাড়ি নামেও পরিচিতি রয়েছে । এর অন্যান্য নামগুলো হচ্ছে : Air-plant, Grandfather’s Whiskers, Graybeard, Long Moss, Old Man’s Beard, Spanish Moss, Wool Crepe ইত্যাদি । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এটি সর্বাধিক পরিচিত, সাধারণত দক্ষিণ লাইভ ওক (Quercus virginiana) ও পালকহীন বা বাল্ড সাইপ্রেসের (Taxodium distichum) নিম্নভূমি, জলাভূমি, মধ্য আটলান্টিক ও দক্ষিণ-পূর্ব রাজ্যগুলোর জলাভূমি, দক্ষিণ-পূর্ব ভার্জিনিয়ার উপকূল থেকে ফ্লোরিডা এবং পশ্চিমে দক্ষিণ আরকানসাস ও টেক্সাস পর্যন্ত বিস্তৃত । স্পেনীয় শৈবাল Bromeliaceae (bromeliads) পরিবারের অন্তর্ভূক্ত একটি বায়ু উদ্ভিদ । পূর্বে Anoplophytum, Caraguata এবং Renealmia বংশের মধ্যে এটি স্থাপিত হয়েছিল । এ উদ্ভিদের নির্দিষ্ট নাম হচ্ছে Usneoides । যদিও এটি Lichen Usnea গণের কিছু প্রজাতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং স্পেনের স্থানীয় নয় । এর বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে: Tillandsia usneoides L. ।
স্পেনীয় শৈবাল একটি বহুবর্ষজীবী ভেষজ । এক বা একাধিক সরু ডালপালা নিয়ে গঠিত । বিকল্প পাতলা, বাঁকা বা কোঁকড়ানো এবং ভারী আকারের পাতাগুলো চওড়া হয়ে শিকল আকৃতির গাছপালায় রূপ নিয়ে একটি ঝুলন্ত কাঠামো গঠন করে । পাতা শুকিয়ে গেলে রূপালী থেকে ধূসর কিন্তু ভিজে গেলে হাল্কা সবুজ । ঘন ও ঝুলে পড়া শৈবালের গোছা বা ঝোপের মতো কোনো শিকড় নেই । কান্ড ও পাতার ধূসর আঁশগুলো আর্দ্রতা এবং পুষ্টি পাওয়ার মাধ্যম । এটি বৃদ্ধির জন্য উচ্চ আর্দ্রতা এবং দূষণমুক্ত অবস্থার প্রয়োজন । সর্পিল (Zigzagging) আকারে বৃদ্ধি পায়, তবে রৈখিকও হতে পারে । Peltate চুলের একটি পুরু স্তর (Trichomes) আঁশের মতো পাতাগুলোকে জল শোষণ এবং ধরে রাখার একটি বড় ক্ষমতা প্রদান করে । উদ্ভিদের ছোট ফুলগুলো হলুদ-সবুজ এবং পাপড়ি ছড়ানো থাকে । বৃন্তটি (Scape) আংশিকভাবে পাতার খাপের মধ্যে লুকিয়ে থাকে । বসন্ত থেকে শরৎ পর্যন্ত পুষ্পমঞ্জুরি ফুটে উঠে এবং লোম দ্বারা ঢেকে একটি মাত্র ডোরাকাটা ফুলে পরিণত হয় । একটি ফুলের সমস্ত পাপড়ির সংগ্রহকে করোলা (Corolla) বলে । পাপড়ি, ৮-১৪ মিঃমিঃ লম্বা ও সবুজ-হলুদ-নীল রঙ দ্বারা করোলা গঠিত হয় । ফুল রাতে সুগন্ধি ছড়ায় এবং পোকামাকড় দ্বারা পরাগায়ন হয় । ১.৫-৩ সেঃমিঃ লম্বা ফলগুলো Septicidal । ক্যাপসুলগুলো প্রায় ছয় মাস গাছে থাকে এবং পাকার পরে বীজগুলো বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে যেতে পারে । স্পেনীয় শৈবাল বীজ দ্বারা ও উদ্ভিজ্জভাবে বংশবিস্তার ঘটে এবং গাছের অঙ্গে লেগে থাকে যেগুলো বাসা বাঁধার উপাদান হিসেবে পাখিরা অন্য স্থানে নিয়ে যায় । স্পেনীয় শৈবাল পরজীবী নয়, কারণ এটি সূর্য থেকে তার নিজস্ব শক্তি সালোকসংশ্লেষ করে এবং সালোক-সংশ্লেষণের জন্য Crassulacean acid বিপাকের জল-সংরক্ষণ কৌশল ব্যবহার করে । এটি একটি Epiphyte (ফুলের উদ্ভিদ বা Angiosperm), যেখানে উদ্ভিদ তার নিজের পাতার আঁশগুলোর মাধ্যমে বাতাস ও বৃষ্টিপাত থেকে পুষ্টি এবং জল শোষণ করে, যার বেশিরভাগই স্বাগতিক গাছের পাতা থেকে প্রাপ্ত খনিজ পদার্থ থেকে আসে । যদিও এটি যে গাছে বেড়ে উঠে তাকে ক্ষতিসাধন বা কদাচিৎ হত্যা করে । তবে এটি মাঝে মধ্যে এতোই ঘন হয়ে যায় যে, গাছের পাতায় ছায়া দিয়ে গাছের বৃদ্ধির হার কমিয়ে দেয় । দক্ষিণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উদ্ভিদটি দক্ষিণী লাইভ ওক (Quercus virginiana) এবং পালকহীন বা বাল্ড সাইপ্রেসের (Taxodium distichum) জন্য পছন্দে অগ্রাধিকার বলে মনে হয় কারণ তাদের Foliar mineral leaching (ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম এবং ফসফরাস) এর উচ্চ হার যা এপিফাইটিক উদ্ভিদে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি সরবরাহ করে । এটি অন্যান্য গাছের প্রজাতি যেমন Sweetgum (Liquidambar styraciflua), Crepe-myrtles (Lagerstroemia spp.), Other oaks এবং এমনকি Pine গাছেও উপনিবেশ করতে সক্ষম । স্পেনীয় শৈবাল লাইভ ওক, মৃত গাছের ডালপালা, বেড়া এবং টেলিফোন লাইনের মতো কৃত্রিম কাঠামোতে আরো অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় । এটি এখনো অনেক প্রাণীর জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ । স্পেনীয় শৈবাল ইঁদুর, সাপ, তিন প্রজাতির বাদুড়, টিক, মাইট, মিলিপিডসহ বেশ কয়েকটি প্রাণীকে আশ্রয় দেয় বা পোষন করে বা আবাসস্থল । জাম্পিং মাকড়সার (Jumping spider) একটি প্রজাতি এবং Pelegrina tillandsiae শুধুমাত্র স্পেনীয় শৈবালেই পাওয়া যায় । যদিও ব্যাপকভাবে স্পেনীয় শৈবাল আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয় এবং উদ্ভিদের বাস্তুশাস্ত্রের এক গবেষণায় দেখা যায় উদ্ভিদে শনাক্ত করা অন্যান্য হাজার হাজার আর্থ্রোপডের মধ্যে Chigger উপস্থিত ছিল না । স্পেনীয় শৈবালের সবুজ আঁশগুলোতে Chlorococcum গণের একটি সবুজ শৈবাল পাওয়া যায় । স্পেনীয় শৈবাল বায়ুবাহিত দূষকগুলোর প্রতি সংবেদনশীল । এটি এমন এলাকায় বৃদ্ধি পায় না যেখানে ধোঁয়া প্রচলিত বা নিকৃষ্ট মানের, যেমন চিমনির কাছাকাছি । ক্রমবর্ধমান বায়ু দূষণের কারণে এটি শহরাঞ্চল থেকে হ্রাস পেয়েছে । স্পেনীয় শৈবাল প্রায়শই দক্ষিণ গথিক চিত্র (Gothic imagery) এবং গভীর দক্ষিণ সংস্কৃতির সাথে যুক্ত থাকে কারণ আলাবামা, দক্ষিণ আরকানসাস, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, লুইসিয়ানা, মিসিসিপি, উত্তর ক্যারোলিনা, দক্ষিণ ক্যারোলিনা, পূর্ব ও দক্ষিণ টেক্সাস এবং দক্ষিণ ভার্জিনিয়ার মতো উপক্রান্তীয় আর্দ্র দক্ষিণ অকুস্থলে বেড়ে উঠার প্রবণতা রয়েছে । স্পেনীয় শৈবালের উৎপত্তি সম্পর্কে একটি উপাখ্যানে বলা হয় ‘সর্বদা বেঁচে থাকা নিকৃষ্ট মানুষ’ (The Meanest Man Who Ever Lived), যেখানে লোকটির সাদা চুল অনেক লম্বা হয়ে গাছে ধরা পড়ে । ঊনবিংশ শতাব্দীতে হাওয়াই দ্বীপে স্পেনীয় শৈবাল প্রবর্তিত হয়েছিল । এটি একটি জনপ্রিয় শোভাময় এবং লেই উদ্ভিদ (Lei plant) হয়ে উঠে । হাওয়াইয়ের অস্থায়ী সরকারের প্রথম রাষ্ট্রপতি Sanford B. Dole এর দাড়ির নামানুসারে এটির নামকরণ করা হয় ‘Umiʻumi-o-Dole’ । এটি হিনাহিনা (Hinahina) নামেও পরিচিত এবং সমারোহের জন্য ব্যবহৃত লেই উদ্ভিদের স্থানীয় হিনাহিনার বিকল্প হয়ে উঠেছে । একুশ শতকের গোড়ার দিকে গাছটি ‘Pele’s hair’ / ‘Lauoho-o-Pele’ হিসেবে ব্যাপকভাবে বাজারজাত করা হয়েছিল, যা আসলে এক ধরণের ফিলামেন্টাস আগ্নেয়গিরিময় কাঁচকে (Filamentous volcanic glass) বোঝায় ।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রজাতিটির একটি নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক মূল্য রয়েছে । স্পেনীয় শৈবাল Building insulation, Mulch, Packing material, Mattress stuffing এবং Fiber সহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয় । এটি ফুলের রচনা এবং কারুশিল্পের সজ্জায় শোভাময় উদ্ভিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয় । এটি যান্ত্রিক টিস্যু, সজ্জিত, অত্যন্ত প্রতিরোধী ইলাস্টিক ফাইবার প্রদান করে যা প্রায়শই ঘোড়ার চুলের পরিবর্তে, গৃহসজ্জার সামগ্রী হিসেবে এবং গদির প্যাডিংয়ে ব্যবহৃত হয় । ১৯০০ দশকের গোড়ার দিকে এটি গাড়ির আসন বা বিছানায় (Padding) বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল । ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে ১০০০০ টন প্রক্রিয়াজাত স্পেনীয় শৈবাল উৎপাদিত হয়েছিল । বর্তমানে শিল্প ও কারুশিল্পে ব্যবহারের জন্য, ফুল বাগানের বিছানা হিসেবে, Bousillage এর উপাদান হিসেবে এবং ঐতিহ্যগত প্রাচীর আচ্ছাদন উপাদান হিসেবে এটি সংগ্রহ করা হয় । লাতিন আমেরিকা এবং লুইসিয়ানার কিছু অংশে এটি জন্মের দৃশ্যে (Nativity scenes) ব্যবহৃত হয় । দক্ষিণ-পশ্চিম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মরুভূমি অঞ্চলে শুকনো স্পেনীয় শৈবাল জলাভূমি শীতলক বা ঠাণ্ডিঘর (Swamp cooler) নামে পরিচিত (কিছু এলাকায় ‘মরুভূমির শীতলক’ নামে পরিচিত) যা বাতাস নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (Air conditioner) থেকে অনেক কম খরচে ঘরবাড়ি এবং অফিস ঠান্ডা করতে ব্যবহৃত হয় । শীতলকরণ প্রযুক্তির সাহায্যে একটি দমকল যা স্পেনীয় শৈবাল দিয়ে তৈরি প্যাড বা বিছানার (Pad) উপর পানি ছিটিয়ে দেয় তারপর একটি পাখা প্যাডের মধ্য দিয়ে ভবনে বাতাস টেনে নেয় । প্যাডের উপর পানির বাষ্পীভবন বাতাসের তাপমাত্রা হ্রাস করে ভবনকে শীতল করতে সাহায্য করে । বিভিন্ন জাত সমূহ হচ্ছে: Tillandsia ‘Maurice’s Robusta’, Tillandsia ‘Munro’s Filiformis’, Tillandsia usneoides var. filiformis (André) Mez (বিলুপ্ত জাত), Tillandsia ‘Odin’s Genuina’, Tillandsia ‘Spanish Gold’, Tillandsia ‘Tight and Curly’ ইত্যাদি । সংকর (Hybrids) জাত সমূহ হচ্ছে: Tillandsia ‘Nezley’, Tillandsia ‘Kimberly’, Tillandsia ‘Old Man’s Gold’ । স্পেনীয় শৈবাল হচ্ছে মারকিউরি, ক্যাডমিয়াম, সায়ানাইড, লেড, নিকেল, কপার, ক্রোমিয়াম, কার্বন ও জিঙ্কের একটি ভালো বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চয়কারী এবং জৈব অবক্ষয়ের মাধ্যমে এগুলোকে নিরপেক্ষ করতে পারে । এটি বায়ুমণ্ডল থেকে PM2,5 এবং PM10 কণা বাজেয়াপ্ত ও অপসারণ করতে পারে । এ সমস্ত বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে উদ্ভিদটি Phytoremediation এ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় । প্রাচীনকাল থেকেই আমেরিকান আদিবাসীরা বিভিন্ন কাজে স্পেনীয় শৈবাল ব্যবহার করে আসছে । Houma এবং সেমিনোল উপজাতিরা (Seminole tribes) কাঠের বাসস্থানের খুঁটিগুলোকে একত্রে বেঁধে রাখার জন্য, গদি, মাদুর এবং পেঁচানো দড়ি তৈরি করতে তন্তু হিসেবে ব্যবহার করতেন । উত্তর আমেরিকার জনগণ আগুনের তীরগুলোর জন্য শুকনো তন্তুগুলো ব্যবহার করেছিলেন যা শতাব্দী ধরে শিকার এবং যুদ্ধের জন্য অপরিহার্য হাতিয়ার ছিল । লুইসিয়ানার নাচেজ উপজাতিরা (Natchez tribes) মানুষের জ্বর কমাতে উদ্ভিদটি সেদ্ধ করে চা প্রস্তুত করতে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করতেন । মেক্সিকোতে ধর্মীয় ছুটির দিনগুলোতে উদ্ভিদটি শোভাময় উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে Cribs এবং অন্যান্য ক্রিসমাস সজ্জায় বা অলঙ্করণে । এছাড়া এটি মাটির মৃৎপাত্র, ক্যানো শক্তিবৃদ্ধি এবং এমনকি ডায়াপার প্যাডিংসহ নানা কাজে ব্যবহৃত হয় । তবে এটি Anticonvulsant এবং Astringent হিসেবে ঔষধি উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে । কিছু মার্কিন অঞ্চলে মাঝে মধ্যে পশুদের খাদ্য হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয় । স্পেনীয় শৈবাল বা T. usneoides উদ্ভিদ সহজেই চাষ করা যায় কারণ এটির মাটি প্রয়োজন হয় না । ঠান্ডা জলবায়ুতে কেবল স্বাস্থ্য, আর্দ্রতা ও জলের প্রয়োজন হয় এবং এটির জন্য একটি শীতের আশ্রয় প্রয়োজন । এটিকে নিয়মিত কুয়াশাচ্ছন্ন এবং আর্দ্র অবস্থায় বাড়ির ভিতরে জন্মানো যেতে পারে । 

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, মোনাকোনেচারএনসাইক্লোপিডিয়া । 

ছবি: https://www.monaconatureencyclopedia.com/?lang=en 

Friday, 14 June 2024

মঙ্গল গ্রহের অলিম্পাস মন্স আগ্নেয়গিরির চূড়ায় হিম আবিষ্কার


ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (European Space Agency বা ESA) ও রাশিয়ান রসকসমস সংস্থার (Russian Roscosmos Agency) মধ্যে একটি সহযোগিতামূলক প্রকল্প ExoMars Trace Gas Orbiter (TGO বা ExoMars Orbiter) এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার Mars Express Orbiter মঙ্গল গ্রহের বিষুবরেখার কাছে Olympus Mons আগ্নেয়গিরিতে প্রথমবারের মতো হিম বা তুষার দেখেছে, যেখানে হিমের অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব বলে মনে করা হয়েছিল । সত্যিই, এক বিস্ময়কর ঘটনা! Olympus Mons শুধুমাত্র মঙ্গলেরই নয়, সৌরজগতের সর্ববৃহৎ-সর্বোচ্চ পর্বত ও আগ্নেয়গিরি যেখানে Tharsis অঞ্চলে এ হিম আবিষ্কৃত হয়েছে । বিশাল ঢাল আগ্নেয়গিরিটি সর্বশেষ বিস্ফোরিত হয়েছিল ২৫ মিলিয়ন বছর আগে । নেতৃত্বদানকারী উদ্ভাবক Adomas Valantinas যিনি সুইজারল্যান্ডের বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ছাত্র হিসেবে এটি আবিষ্কার করেছিলেন এবং বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্টডক্টরাল ফেলো ও গ্রহবিজ্ঞানী তিনি বলেছেন: "আমরা ভেবেছিলাম মঙ্গল গ্রহে বিষুবরেখার চারপাশে হিম হওয়া অসম্ভব । কারণ, এখানে সূর্যালোক ও পাতলা বায়ুমণ্ডলের মিশ্রণ ভূপৃষ্ঠ এবং পর্বতচূড়া উভয় স্থানেই তাপমাত্রা অপেক্ষাকৃত বেশি বজায় রাখে । আমরা পৃথিবীতে যা দেখি তার থেকে ভিন্ন যেখানে আপনি হিমশীতল শিখর দেখার আশা করতে পারেন । এখানে হিমের অস্তিত্ব উত্তেজনাপূর্ণ এবং ইঙ্গিত দেয় যে খেলার মধ্যে ব্যতিক্রমী প্রক্রিয়া রয়েছে যা হিম গঠনের অনুমতি দিচ্ছে । আমরা যা দেখছি তা অতীতের মঙ্গল জলবায়ুর একটি চিহ্ন হতে পারে । হয়তো এটি বায়ুমণ্ডলীয় জলবায়ু প্রক্রিয়াগুলোর সাথে সম্পর্কিত যা মঙ্গল গ্রহের ইতিহাসে আগে কাজ করেছিল, সম্ভবত লক্ষ লক্ষ বছর আগে ।"

থার্সিস (Tharsis) হচ্ছে মঙ্গল গ্রহের পশ্চিম গোলার্ধে বিষুবরেখার কাছে কেন্দ্রীভূত একটি বিশাল আগ্নেয় মালভূমি । এ অঞ্চলটি সৌরজগতের বৃহত্তম আগ্নেয়গিরির আবাসস্থল, যার মধ্যে কয়েকটি বৃহদাকার ঢাল আগ্নেয়গিরি Arsia Mons, Pavonis Mons এবং Ascraeus Mons যেগুলো সম্মিলিতভাবে Tharsis Montes নামে পরিচিত । এখানে Olympus Mons আগ্নেয়গিরিসহ প্রায় এক ডজন আগ্নেয়গিরির বসতি । এ আগ্নেয়গিরিগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই দৈত্যাকার, যা পৃথিবীর মাউন্ট এভারেস্টের চেয়ে এক থেকে তিন গুণ পর্যন্ত উচ্চতায় আশেপাশের সমভূমির উপরে বিস্তৃত । মঙ্গল গ্রহের সবচেয়ে উঁচু আগ্নেয়গিরি হচ্ছে Olympus Mons যেটি থার্সিস অঞ্চলের সাথে যুক্ত কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মালভূমির পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত । থার্সিস থেকে পূর্ব দিকে প্রসারিত ক্যানিয়ন ব্যবস্থা হচ্ছে Valles Marineris । উত্তরে ডিম্বাকৃতির বৈশিষ্ট্য Alba Mons । থার্সিস অঞ্চল মঙ্গল গ্রহের পশ্চিম গোলার্ধে আধিপত্য বিস্তার করে । থার্সিস নামটি হচ্ছে বাইবেলের Tarshish এর Greco-Latin প্রতিবর্ণীকরণ বা বর্ণান্তরণ, যা পরিচিত জগতের পশ্চিম প্রান্তের ভূমি । আগ্নেয়গিরিগুলোর চূড়ায় জ্বালামুখ বা গর্ত (Caldera) এবং বিশাল ফাঁপা (Hollow) রয়েছে যা অতীতে অগ্ন্যুৎপাতের সময় ম্যাগমা প্রকোষ্ঠ খালি হওয়ার কারণে ঘটেছিল । গবেষকরা অনুমান করেন যে, থার্সিসের উপরে একটি অদ্ভুত উপায়ে বাতাস সঞ্চালিত হয় এবং এটি সেখানে আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের মধ্যে এক অনন্য ছোট জলবায়ু (Unique microclimate) গঠন করে যেটি হিমের Patch বা টুকরো বা তাপ্পি তৈরি করতে সাহায্য করে । মানুষের চুলের চেয়ে পাতলা (সম্ভবত এক মিলিমিটারের মাত্র একশতাংশ পুরু) বরফের সূক্ষ্ম কণা আগ্নেয়গিরির চূড়ার জ্বালামুখ এবং তার চক্রবেড়ের (Rim) অংশগুলোতে রাতারাতি তৈরি হতে দেখা যায় । সূর্যালোকে বাষ্পীভূত হওয়ার আগ পর্যন্ত সূর্যোদয়ের সময় চারপাশে হিম টুকরো বা সূক্ষ্ম বরফ কণা বা তাপ্পিগুলো (The patches of frost) কয়েক ঘন্টার জন্য উপস্থিত থাকে । হিমশীতল স্তরটি ব্যতিক্রমভাবে পাতলা হওয়া সত্ত্বেও এটি একটি বিশাল এলাকা জুড়ে আবরণ করে । হিমের পরিমাণ ঠাণ্ডা ঋতুতে প্রতিদিন প্রায় ১৫০০০০ টন জল পৃষ্ঠতল ও বায়ুমণ্ডলের মধ্যে অদলবদল হয়, যা প্রায় ৬০টি অলিম্পিক সুইমিং পুলের সমতুল্য এবং উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় প্রতিদিন ঘনীভূত হয় । TGO অরবিটারের Colour and Stereo Surface Imaging System (CaSSIS) এর প্রধান তদন্তকারী, বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের Adomas এর পিএইচডি সুপারভাইজার এবং সহ-উদ্ভাবক Nicolas Thomas বলেছেন: "বাতাস পাহাড়ের ঢালে ভ্রমণ করে, তুলনামূলকভাবে আর্দ্র বাতাস ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি থেকে উচ্চ-উচ্চতায় নিয়ে আসে যেখানে এটি ঘনীভূত হয় এবং বছরের নির্দিষ্ট সময়ে হিমের মতো স্থায়ী হয় । আমরা আসলে পৃথিবী এবং মঙ্গল গ্রহের অন্যান্য অংশে এটি ঘটতে দেখি, একই ঘটনা ঘটাচ্ছে মৌসুমী মঙ্গলের Arsia Mons Elongated Cloud । আমরা মঙ্গল গ্রহের আগ্নেয়গিরির শিখরে যে হিম দেখতে পাই তা বিশেষ করে জ্বালামুখের ছায়াযুক্ত অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে বলে মনে হয়, যেখানে তাপমাত্রা বেশি ঠাণ্ডা ।" 

মঙ্গল গ্রহ পর্যবেক্ষণকারী মহাকাশযানগুলো এর আগে মঙ্গলে হিমায়িত এবং তরল জলের প্রমাণ দিয়েছে । এ গ্রহের উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে যথেষ্ট পরিমাণে বরফ দেখা গেছে । ভূদৃশ্যের নিদর্শনগুলো থেকে বোঝা যায় যে রক্তিম গ্রহটি একসময় অনেক বেশি আর্দ্র, ছড়িয়ে পড়া দৈত্যাকার হ্রদ, চঞ্চল বা আঁকিয়া বাঁকিয়া যাচ্ছে এমন নদী এবং সম্ভবত বাসযোগ্যও ছিল । মঙ্গল গ্রহের বর্তমান জলচক্রটি বাসযোগ্যতা এবং ভবিষ্যত মানুষের অনুসন্ধানের জন্য প্রভাব ফেলছে । যেমন থার্সিস আগ্নেয়গিরি অঞ্চলের উপরে জলের বরফ মেঘ এবং জলীয় বাষ্প সনাক্ত করা হয়েছে, যা Regolith এবং বায়ুমণ্ডলের মধ্যে জলের সক্রিয় বিনিময়কে অনুমান করা হয় । আনন্দের বিষয় হচ্ছে গ্রহ বিজ্ঞানী Adomas Valantinas, Nicolas Thomas এবং তাদের সহকর্মীরা Olympus Mons, Arsia Mons, Ascraeus Mons এবং Ceraunius Tholus এর থার্সিস আগ্নেয়গিরিতে হিম আবিষ্কার করেছেন । এ হিমগুলো কিভাবে তৈরি হয় তার মডেলিং বিজ্ঞানীদের মঙ্গল গ্রহের অবশিষ্ট গোপন রহস্যগুলোকে প্রকাশ করার অনুমতি দিতে পারে যেখানে জলের অস্তিত্ব রয়েছে ও কিভাবে এটি জলাধারগুলোর মধ্যে চলে যায় এবং গ্রহের জটিল বায়ুমণ্ডলীয় গতিবিদ্যা বোঝার ক্ষেত্রে । মঙ্গল গ্রহের ভবিষ্যৎ অনুসন্ধান এবং পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সম্ভাব্য লক্ষণগুলো অনুসন্ধানের জন্য এ ধরণের জ্ঞান অপরিহার্য । Adomas Valantinas আরো বলেন: ''এ আবিষ্কারটি মঙ্গল গ্রহের বিষুবরেখায় প্রথমবারের মতো হিম পাওয়া গেছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে । কিন্তু আগে কেন দেখা গেল না? কয়েকটি কারণ রয়েছে: প্রথমত, আমাদের একটি কক্ষপথ দরকার যা ভোরবেলা একটি অবস্থান পর্যবেক্ষণ করতে হয় । যদিও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার মঙ্গল গ্রহ পর্যবেক্ষণ করার ক্ষেত্রে TGO অরবিটার এবং Mars Express অরবিটারে এ ধরনের কক্ষপথ রয়েছে যা দিনের সব সময় পর্যবেক্ষণ করতে পারে । এছাড়া অন্যান্য সংস্থা থেকে অনেকগুলো সূর্যের সাথে সমলয় (Synchronised) করা হয় যা শুধুমাত্র বিকেলে পর্যবেক্ষণ করতে পারে । দ্বিতীয়ত, জমাট শীতল মঙ্গল ঋতুর সাথে যুক্ত থাকে হিম যা জানালাটিকে আরো সংকীর্ণ করে দেয় । আমাদের জানতে হবে কোথায় এবং কখন ক্ষণস্থায়ী নীলাভ হিম খুঁজতে হবে । বিষুবরেখার কাছে গবেষণার জন্য আমরা অন্য কিছু খুঁজছিলাম, কিন্তু মঙ্গলের আগ্নেয়গিরির শীর্ষে এটি দেখার আশা করিনি !'' ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার TGO অরবিটার এবং Mars Express অরবিটারের প্রকল্প বিজ্ঞানী Colin Wilson বলেছেন: "মঙ্গল গ্রহের উপরিভাগে জল খোঁজা সবসময়ই উত্তেজনাপূর্ণ, বৈজ্ঞানিক স্বার্থ ও এর প্রভাবের জন্য মানব এবং রোবোটিক উভয় অনুসন্ধানই গুরুত্ব বহন করে । এমনকি এ আবিষ্কারটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয় । মঙ্গল গ্রহের নিম্ন বায়ুমণ্ডলীয় চাপ একটি অপরিচিত পরিস্থিতি তৈরি করে যেখানে গ্রহের পাহাড় চূড়াগুলো সাধারণত তার সমভূমির চেয়ে বেশি ঠাণ্ডা হয় না, কিন্তু মনে হচ্ছে আর্দ্র বাতাস পাহাড়ের ঢালে প্রবাহিত হয়ে এখনো হিমে পরিণত বা ঘনীভূত হতে পারে, এটি নিশ্চিতভাবে পৃথিবীর মতো একটি ঘটনা ৷''

আশ্চর্যজনক আবিষ্কারটি ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা এবং রাশিয়ান রসকসমস সংস্থার প্রদক্ষিণকারী দুই মঙ্গল অভিযাত্রী TGO অরবিটার এবং Mars Express অরবিটারের কৃতিত্ব । তারা মঙ্গল গ্রহে দুর্দান্তভাবে হিম আবিষ্কার করেছে । TGO অরবিটার ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে মঙ্গলে পৌঁছেছিল এবং ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে সম্পূর্ণ বিজ্ঞান মিশন শুরু হওয়ার পর থেকে মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠ, বায়ুমণ্ডল এবং জলের ছবি ও মানচিত্রকরণ করেছে । ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে Mars Express অরবিটার মঙ্গল গ্রহকে প্রদক্ষিণ করার মধ্য দিয়ে মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠ, উপ পৃষ্ঠ, খনিজ পদার্থ, বায়ুমণ্ডল এবং নানা ঘটনা অন্বেষণে দুই দশক অতিবাহিত করছে । গবেষণা দলটি প্রথমে TGO অরবিটারের CaSSIS যন্ত্রের সাহায্যে হিম দেখেছে । তারপর তারা TGO অরবিটারের Nadir and Occultation for Mars Discovery (NOMAD) স্পেকট্রোমিটার এবং Mars Express অরবিটারের High Resolution Stereo Camera (HRSC) ব্যবহার করে এলাকাটি পুনরায় দেখে তাদের অনুসন্ধান নিশ্চিত করেছে । 

তথ্যসূত্র: https://www.esa.int/ , https://www.theguardian.com/ 

অলিম্পাস মন্স আগ্নেয়গিরির অত্যাশ্চর্য ছবি : ESA - European Space Agency   https://www.esa.int/ https://web.facebook.com/EuropeanSpaceAgency

Sunday, 9 June 2024

বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৪ এবং ভূমি পুনরুদ্ধার, মরুকরণ রোধ ও খরা সহনশীলতা

৫ই জুন ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ (World Environment Day বা WED) । বিশেষ দিবসটি ‘ইকো দিবস’ নামেও পরিচিত । সারাবিশ্বে কিংবা কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের সম্মুখীন পরিবেশগত নানা জটিল সমস্যা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে এ দিবস পালন করা হয় । প্রতি বছরই পরিবেশ দিবসের একটি প্রতিপাদ্য বিষয় থাকে । উক্ত দিবসে নানা কর্মসূচী, রাজনৈতিক কর্মোদ্যোগ ও জনসচেতনতার মাধ্যমে এ গ্রহের মানুষকে পরিবেশ সচেতন করে তোলে । বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সময় পানি, বৈশ্বিক উষ্ণায়ণ, ওজোন স্তর, এসিড বৃষ্টি, দারিদ্র, জলবায়ু পরিবর্তন, মরুকরণ, বন্যপ্রাণ ও আবাসস্থল, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, জলজ প্রাণী ও সামুদ্রিক পরিবেশ, সবুজ অর্থনীতি, প্লাস্টিক দূষণ, বায়ুদূষণ এবং বাস্তুতন্ত্রসহ পরিবেশগত নানা প্রকার জটিল বিষয়ের উপর প্রতিপাদ্য করে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হয় । বিশ্ব পরিবেশ দিবসে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই বিভিন্ন পরিবেশ সচেতনতামূলক কর্মসূচী গ্রহণ করে থাকে । জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মতিতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ৫ই জুন থেকে ১৬ই জুন পর্যন্ত ‘জাতিসংঘ মানব পরিবেশ সম্মেলন’ (United Nations Conference on the Human Environment) অনুষ্ঠিত হয় । এখানেই প্রথম পরিবেশ দিবস পালিত হয় । সুইডেনের বিশেষ উদ্যোগে জাতিসঙ্ঘ ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে ৫ই জুনকে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে এবং তখন থেকেই প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন শহরে আলাদা প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে । যেমন: ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজক রাষ্ট্র এবং যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘একমাত্র পৃথিবী’ (Only one Earth) । ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ছিল বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজক শহর এবং যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘মানব বসতি’ (Human Settlements) । গত ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে আয়োজক দেশ ছিল আইভরি কোস্ট, ‘প্লাস্টিক দূষণ সমাধানে শামিল হই সকলে’ এ প্রতিপাদ্য নিয়ে সারাবিশ্বে প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করার লক্ষ্যে দিবসটি পালন করা হয় । ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজক দেশ সৌদি আরব । এ বছর জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির  United Nations Environment Programme (UNEP) নির্ধারিত প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ‘করবো ভূমি পুনরুদ্ধার, রুখবো মরুময়তা, অর্জন করতে হবে মোদের খরা সহনশীলতা’ (Land restoration, desertification and drought resilence) । বৈশ্বিকভাবে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে বসন্তকালে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে শরতকালে দিবসটি পালিত হয় । যথাযথভাবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রেখে পৃথিবীর মানুষ যাতে অন্যান্য সকল জীবের সাথে একাত্ম হয়ে (স্বতন্ত্রভাবে) এক সুন্দর পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করাই হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল উদ্দেশ্য । বর্তমানে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হচ্ছে বনভূমি উজাড় হয়ে যাওয়া । এ বনভূমি শুধুমাত্র অসংখ্য প্রজাতির আবাসস্থলই নয় এটি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । বনভূমি উজাড় হয়ে যাওয়ার ফলে ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, মরুময়, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি করে । এছাড়া ব্যাপক শিল্পায়নের ফলে তীব্রভাবে গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ হয় । গত ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ বিলিয়ন টন যা ২০২২ খ্রিস্টাব্দের তুলনায় শতকরা ১.১ ভাগ বেশি । কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক উষ্ণায়ণের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে । ফলে অতিবৃষ্টি, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবন ও প্রকৃতিতে । তাই, ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় ব্যাপক বনায়নের কোনো বিকল্প নেই । বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ৩.৯২ বিলিয়ন হেক্টর বনভূমি রয়েছে যার মধ্যে অর্ধেকেরই বেশি রাশিয়ায় শতকরা ২০.১ ভাগ, ব্রাজিলে শতকরা ১২.২ ভাগ, কানাডায় শতকরা ৮.৬ ভাগ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শতকরা ৭.৬ ভাগ এবং চীনে শতকরা ৫.৪ ভাগ । অবশিষ্ট বনভূমি পৃথিবীর অন্যান্য অংশে । এখন বাংলাদেশে মোট বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১৪৩২৮০০ হেক্টর । পরিবেশ সুরক্ষায় একটি দেশের আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন এবং সেই তুলনায় বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ প্রায় অর্ধেক । বনভূমি স্বল্পতা ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে । প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা এবং এর থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে দেশের মানুষকে পরিবেশ সচেতন, পরিবেশকে ভালোবাসা, প্রকৃতির সাথে সংযুক্ত হওয়া, নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করা এবং প্রচুর পরিমাণে বৃক্ষ রোপণ করতে হবে । প্রাণের স্পন্দনে, প্রকৃতির বন্ধনে ৷ সবুজ গাছ, সবুজ প্রাণ ৷ একটি গাছ, একটি প্রাণ ৷ একটি গাছ, শত প্রাণ ৷ আমি প্রকৃতির, প্রকৃতি আমার ৷ দূষণ মুক্ত পরিবেশ গড়ি, প্রকৃতিকে রক্ষা করি ৷ বৃক্ষরোপণে এগিয়ে আসি, পৃথিবীকে নিরাপদ রাখি ৷ নিজে বাঁচি, আগামী প্রজন্মের জন্য সবুজ পৃথিবী গড়ে তুলি । তাই, আমাদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, সুুরক্ষিত, টেকসই ও শান্তিময় বিশ্ব নির্মাণে পরিবেশ রক্ষার কোনো বিকল্প নেই । 
বর্তমান বিশ্বে অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির কল্যাণে মানব জাতির জীবনে অসীম সুফল বয়ে আনছে এবং মানুষ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতিসহ সমৃদ্ধ মানব সভ্যতা গড়ে উঠছে । পাশাপাশি মনুষ্য সৃষ্ট বিভিন্ন কর্মকাণ্ড দ্বারা যেমন: শিল্পায়ন, নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোয়া, কলকারখানায় জীবাশ্ম জ্বালানী (তেল ও কয়লা ইত্যাদি পোড়ানো) ব্যবহার, মাইকের আওয়াজ, উচ্চ শক্তির শব্দ ব্যবস্থা, মোটর-নৌ-কলকারখানার যন্ত্রপাতির শব্দ, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা, যেখানে সেখানে মলমূত্র ত্যাগ, হাসপাতালের বর্জ্য, প্লাস্টিক, কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য, যানবাহনের কালো ধোয়া, পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা ও বিস্ফোরণ এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মারাত্মক ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ইত্যাদির মাধ্যমে নানাভাবে মাটি, পানি, বায়ু ও শব্দ দূষণের ফলে ভয়াবহ পরিবেশ দূষিত হচ্ছে । ফলে মানুষের চর্মরোগ, চোখের সমস্যা, শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি, হৃদরোগ, হাইপারটেনশন, মস্তিষ্কের রোগ, যকৃত ও বৃক্কের দীর্ঘ মেয়াদী সমস্যা, শিশুর বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ব্যহত, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, গর্ভপাত, অপরিপক্ব শিশু জন্মদান, মৃত শিশু জন্মের সম্ভাবনা, বধির হওয়া এবং দুরারোগ্য ব্যধিসহ নানাবিধ রোগের কারণ ঘটিয়ে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ডেকে আনছে । বাংলাদেশে প্রতিবছর যে সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয় তার শতকরা প্রায় ২৮ ভাগ ঘটে থাকে পরিবেশ দূষণের কারণে । অতএব, পরিবেশ দূষণের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে এর ক্ষতিকর প্রভাবকে কার্যকর সমাধানের জন্য সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে । বনায়ন, নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন বন্ধ, ইটভাটায় কাঠ না পোড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তির পরিবেশ বান্ধব ইটভাটা স্থাপন, ইটভাটার চিমনী উচ্চতায় নির্মাণ, শিল্পকারখানার বর্জ্য খাল-বিল-নদীতে না ফেলে Effluent Treatment Plant (ETP) এর মাধ্যমে বিশোধন, প্লাস্টিক ব্যাগের বিকল্প হিসেবে পরিবেশ বান্ধব পাটজাত পণ্য ব্যবহার, যানবাহনে সীসা মুক্ত জ্বালানী ব্যবহার, সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস (CNG বা Compressed Natural Gas) ব্যবহার, শিল্পকারখানা-গৃহস্থালি-হাসপাতাল-ইলেকট্রনিক্স বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে না ফেলে তা পুনর্ব্যবহারযোগ্য (Recycling) করে তোলা, কীটনাশক পদার্থের ব্যবহার কমিয়ে কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহার বৃদ্ধি, কাঠের আসবাবপত্রের বিকল্প ব্যবহার বৃদ্ধি, পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি ও পণ্য ব্যবহার, পরিবেশ ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণে কঠোর আইন প্রয়োগ, সঠিক পরিকল্পনায় ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সবুজ নগরায়ন, উন্নয়ন প্রকল্প ও শিল্প কারখানায় সুন্দর-সুশৃঙ্খল পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, ব্যাংকের ক্ষেত্রে সবুজ অর্থনীতি, দূষণ কর আরোপ (Green tax), গবেষণার মাধ্যমে খরা সহনশীল বিভিন্ন জাতের ক‌ৃষি বীজ উদ্ভাবন, কৃষি বনায়ন, ভূগর্ভস্থ ও বৃষ্টির পানির সঠিক ব্যবহার, সৌরশক্তি ব্যবহার এবং মরুকরণ রোধ করে দূষণমুক্ত একটি সুন্দর পরিবেশ নির্মাণ করা যেতে পারে । জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা । জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বে উষ্ণায়ণের কারণে মানুষ, মানব সমাজ, পরিবেশ, প্রকৃতি এবং জীববৈচিত্র্যের উপর ভয়ঙ্কর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে । তাপমাত্রা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, মাটির উর্বরতা হ্রাস, বন্যা, খরা, দাবানল, সুনামি, বজ্রপাত, ঘূর্ণিঝড়, ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়, গ্রীস্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্পের কার্যকলাপ বৃদ্ধি, তুষারঝড়, তাপপ্রবাহ (Heat wave), তীব্র গরমের কারণে তাপজনিত অসুস্থতা (Heat stress), সামুদ্রিক বরফ গলন (Ice-albedo feedback), বহুবর্ষজমা বরফের (Permafrost) গলন, মহাসাগরে স্তরীভবন বৃদ্ধি ও অক্সিজেন মাত্রা হ্রাস, সামুদ্রিক স্রোতের দুর্বলতা, স্থল ও সামুদ্রিক বা মহাসাগরীয় বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, মানব বসতি ক্ষতিগ্রস্ত ও অভিযোজন সমস্যা, সংঘাত বা হিংসাত্মক অপরাধ বৃদ্ধি, অ্যান্টার্কটিকার বিশাল হিমশৈল গলে গিয়ে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে পৃথিবীর নিম্নাঞ্চলের দেশ ও ক্ষুদ্র দ্বীপসমূহ তলিয়ে যাওয়া বা নিশ্চিহ্ন হয়ে কোটি কোটি মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা, বরফাবৃত উত্তরমেরুর আকাশে ওজোন স্তরে প্রায় ১০ লাখ বর্গ কিলোমিটারের বিশাল গর্ত তৈরি, মেরু ঘূর্ণি (Polar vortex) দুর্বল হয়ে ফিনকি স্রোত (Jet stream) ক্রমশ তীব্রতর রূপ ধারণ করে তুষারপাত-শৈত্য প্রবাহ-তীব্র গরম সৃষ্টি, মরুকরণ এবং ভূমি অবক্ষয়ের মাধ্যমে পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীকুল, মানব স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ বাতাস, নিরাপদ বাসস্থান, বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা, পানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে । বিশেষকরে প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের উপর একটি বৃহৎ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য সামগ্রী নির্ভরশীল হওয়ায় তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন ও ভুক্তভোগী । এতে করে আশঙ্কাজনকভাবে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে । তাছাড়া মানুষের জীবনে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে ব্যাপক প্রভাব পড়ে । ফলে টেকসই উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয় না । ধারণা করা হয়, প্রায় দুই হাজার কোটি টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে জমা হয়েছে । যার পরিণতি বর্তমানে বিশ্বব্যাপী গড়ে শতকরা ১৬ ভাগ মানুষের মৃত্যু হার বৃদ্ধি করছে । ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ রোধ চুক্তি সম্পাদনের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিগত ২০০৫ খ্রিস্টাব্দের তুলনায় ২০২৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে শতকরা ২০-২৮ ভাগ গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনার কথা অঙ্গীকার করে । যদিও উল্লেখিত চুক্তিতে চীন কোনো প্রকার লক্ষ্য নির্ধারণ না করেই আগামী ২০৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনার কথা বলেছে । গত ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে সারাবিশ্বে ৫২ গিগাটন গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণের মধ্যে ২৭ শতাংশই নিঃসরণ করে চীন, ১১ শতাংশ নিঃসরণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বাকি অংশ নিঃসরণ করে শিল্পোন্নত দেশগুলো যাদের তালিকার প্রথম দিকেই অবস্থান । এদিকে মূলত জি-২০ ভুক্ত দেশগুলোই সারাবিশ্বে শতকরা ৮০ ভাগ কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী । পরিবেশ সুরক্ষা, জীব-বৈচিত্র্য রক্ষা ও বাস্তুতন্ত্রের উন্নয়ন ঘটিয়ে মরুকরণ এবং ভূমির অবক্ষয় রোধ করে কিভাবে টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় সৌদি আরব সরকার সেদিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে । জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সৌদি আরব সরকার ২০৩৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ৪.১ মিলিয়ন টন কার্বন হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে । তাই, ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার যে প্রতিশ্রুতি বিশ্ব নেতৃবৃন্দ দিয়েছিলেন তা কার্যকর করতে আরো উদ্যোগী হয়ে সকলের এগিয়ে আসতে হবে । জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বিশ্বব্যাপী পড়লেও উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ক্ষতির পরিমাণ বেশি । কারণ ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থান, জীবিকা নির্বাহের বিভিন্ন খাত ধ্বংসপ্রাপ্ত, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, প্রাকৃতিক সম্পদের স্বল্পতা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার অক্ষমতা এবং অভিযোজন ব্যবস্থার সমস্যা ইত্যাদি কারণে দেশগুলো তীব্রভাবে ক্ষতিসাধিত হয়ে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি করছে । অন্যদিকে শিল্পোন্নত দেশগুলোকে এমন ভয়ঙ্কর এবং জটিল সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় না । কিছু প্রভাশালী শিল্পোন্নত দেশের অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের ফলে গ্যাস নিঃসরণের মাত্রা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে । যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে আশাব্যঞ্জক বৈচিত্র্যময় উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে । তবে, তা অতি নগন্য । অতএব জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভূমি অবক্ষয়, মরুকরণ এবং খরার প্রভাব মোকাবেলার মতো বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে এ সংক্রান্ত বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে । নেট-শূন্য কার্বন নির্গমন (Net-zero carbon emission) অর্জনের লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে । পাশাপাশি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু অর্থায়ন ও পরিবেশ রক্ষায় এর ভূমিকা ও গুরুত্ব, আদিখেত্যা নকশা (Simulation model) ব্যবহার করে কৃষকদের খরা মোকাবেলায় সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন ও প্রশমন, স্মার্ট কৃষি, মুঠোফোনের মাধ্যমে খরার প্রাক-সতর্কবার্তা প্রদান এবং বাংলাদেশে একটি ‘পরিবেশ গবেষণা ইনস্টিটিউট’ গঠন করা যেতে পারে । 
এদিকে অপরিকল্পিতভাবে ও ব্যাপকহারে ভূমি ব্যবহার, বনভূমি ধ্বংস, পহাড়-নদীর মাটি কর্তন ও স্থানান্তর, লবণাক্ততা এবং ফসলী জমিতে অধিক পরিমাণে রাসায়নিক সার ব্যবহার করার কারণে ভূমি অবক্ষয় ও মরুকরণ প্রক্রিয়া বৃদ্ধি পাচ্ছে । খরা, মরুকরণ ও ভূমি অবক্ষয়ের কারণে সারাবিশ্বে প্রাণীকুল, মানব স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ বাতাস, নিরাপদ বাসস্থান, বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা, পানি নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে । বিশ্বব্যাপী প্রতিনিয়ত তাপমাত্রা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়ছে ভূমির উপর । ভূমি অবক্ষয়ের কারণে মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস, কৃষি জমি চাষাবাদের অনুপযোগী এবং সুপেয় পানির অভাব হচ্ছে । খরা, মরুকরণ এবং ভূমিক্ষয় আগামীতে পৃথিবীর জন্য এক অশনি সংকেত! United Nations Convention to Combat Desertification (UNCCD) এর তথ্যানুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় ৪০ শতাংশ ভূমি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে এবং সারাবিশ্বে জিডিপির অর্ধেক (৪৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার) হুমকির সম্মুখীন । তাই তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, অনাবৃষ্টি, লবণাক্ততা, নগরায়ন, মরুময়তা, বনাঞ্চলের পরিমাণ হ্রাস, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, জমিতে রাসায়নিক সার প্রয়োগ, কৃষিকাজে সেচ, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলাশয়-নদী-খাল-জলাধার-জলাভূমি ইত্যাদি ভরাট, নদী শুকিয়ে মৃত অবস্থা, বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ এবং জলবায়ুর প্রভাববিস্তারকারী মৌসুমী বায়ুপ্রবাহজনিত বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে বাংলাদেশে মরুময়তার ঝুঁকি বাড়ছে । এ মরুকরণের ফলে কৃষি জমি হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে । বর্তমানে খরা এবং মরুকরণ পৃথিবীর জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ । বিশ্বের মোট ভূমির শতকরা প্রায় ২৫ ভাগ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে । খরা ও মরুকরণ সারাবিশ্বে পরিবেশগত নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য, দারিদ্র্য বিমোচন, আর্থ-সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভয়াবহ সমস্যা সৃষ্টি করছে । ফলে আগামী দশকে পৃথিবীতে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে । ধারণা করা হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে ২০৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রায় ৩.৩ মিলিয়ন মানুষ এবং ২০৮০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রায় ৪.৩ মিলিয়ন মানুষের নিজস্ব জমি হারিয়ে যেতে পারে । অতএব, আমাদের দেশে যাতে মরুকরণ সৃষ্টি না হয় সেদিকে অতি জরুরী ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে । এর সাথে পরিবেশ দূষণ রোধ, বনায়ন, মানুষের সচেতেনতা বৃদ্ধি এবং খরা সহনশীল বীজ উদ্ভাবন করতে হবে । 
বর্তমান গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বনভূমির পরিমাণ উন্নীত করতে ব্যাপকভাবে বৃক্ষ রোপণ ও নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যেমন: জলবায়ু পরিবর্তনের সংপ্রশ্ন (Challenge) মোকাবেলা, সবুজায়ন, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানী এবং প্রকৃতিনির্ভর সমাধান ইত্যাদি । জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা ও ফলপ্রসূ সমাধানের প্রধান কৌশল হিসেবে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১ এবং ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ গ্রহণ করেছে । পাশাপাশি বাংলাদেশের মহান জাতীয় সংসদে Planetary Emergency Bill (গ্রহগত জরুরী অবস্থা) বিল পাস হয়েছে । এছাড়া পৃথিবীর প্রথম স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ Climate Change Trust Fund গঠন করে যেখানে গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব সম্পদ থেকে ৪৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে । মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী জলাবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর স্বার্থরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ও এর রোধকল্পে নানা উদ্যোগ গ্রহণের স্বীকৃতস্বরূপ তাকে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ পরিবেশগত পুরস্কার ‘Champions of the Earth’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয় । জলবায়ু নেতাদের শীর্ষ সম্মেলন Climate Leaders Summit নামে ভার্চুয়াল সম্মেলনে তিনি অংশ নেন এবং জলবায়ু বিপন্ন ৪৮টি দেশের জোট Vulnerable Twenty (V20) ও Climate Vulnerable Forum (CVF) এর সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন । 
Global Center on Adaptation (GCA) এর দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয় ঢাকায় অবস্থিত । জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবেলা, অভিযোজন সমস্যার সমাধান বা বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবের সাথে খাপ খাওয়ানোর উপায় বের করা এবং এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সরকার, বিভিন্ন শহরের মেয়র, ব্যবসায়ী নেতা, সুশীল সমাজ ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করে থাকে GCA কার্যালয়টি । তাই আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশ, সংস্থা এবং সংগঠনের সাথে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে পরিবেশ দূষণ, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব এবং পরিবেশগত সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে কূটনৈতিকভাবে আরো জোরালো সম্পর্ক স্থাপনের পাশাপাশি দূষণ রোধ, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা ও সমাধানের ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে । জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে ‘জলবায়ু সংকট’ হিসেবে দেখা দিয়েছে । জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম । আমি মনে করি, বৈশ্বিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবেলা ও সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ক্ষতিপূরণ আদায় ও গ্রীন হাউস গ্যাস নিঃসরণ চুক্তির নানা বিষয়গুলোর অগ্রগতি নিয়ে বাংলাদেশ সরকার প্রধান নেতৃত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশের সাথে শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে পারেন । কার্বন নিঃসরণের জন্য জলবায়ু তহবিলে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থাকে Carbon pricing বলে । এছাড়া, বিপন্ন দেশগুলোর পক্ষে তিনি শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে জলবায়ু তহবিলের প্রাপ্য কিস্তি প্রদানে জোর প্রচেষ্টা চালাতে পারেন । বিগত দিনে আয়োজক হিসেবে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য বিষয়ের উপর ১০ বার বিশ্ব পরিবেশ দিবস উৎযাপিত হয়েছিল । তাই আগামীতে এ ধরনের অনুষ্ঠানের পুনরায় আয়োজক হওয়ার জন্য সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে বলিষ্ঠভাবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে । পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে পরিবেশ দূষণরোধী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে, Green Technology এর বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে হবে এবং Track diplomacy সহ পরিবেশগত বিষয়গুলোর উপর অধিক জোর দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে । সর্বোপরি, পরিবেশের বাস্তুতন্ত্র ও জীব বৈচিত্র্যকে রক্ষা করতে হবে । তাহলে প্রকৃতি হবে সুুরক্ষিত । টিকে থাকবে এ মৃৃত্যুন্মুখ গ্রহ । নইলে অনিবার্য ধ্বংস । সুতরাং, সবুজ গ্রহ গঠনের মধ্য দিয়েই আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তৈরি হবে একটি সুন্দর ও শান্তিময় আবাসস্থল । 

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, আন্তর্জাল (The Internet) । 

Sunday, 12 May 2024

হিমালয়ান মোনাল (Himalayan Monal)


মোনাল হচ্ছে বেশ কয়েকটি এশীয় তিতির পাখি প্রজাতির মধ্যে একটি । হিমালয় মোনালের এক আকর্ষণীয় রঙের বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা একে অন্যান্য শোভাময় তিতির পাখি থেকে আলাদা করে । অবিশ্বাস্য সুন্দর ও বৈচিত্র্যময় রঙের পুরুষ পাখিটি একটি মুরগির মতো । প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মোনালকে রংধনু রঙের উজ্জ্বল পালকের (Iridescent plumage) কারণে চমৎকার লাগে । হিমালয়ান পুরুষ মোনালের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে মাথায় লম্বা ধাতব সবুজ ঝুঁটি, পিঠে ও ঘাড়ের পালকে উজ্জ্বল নীল-সবুজ রঙের আধিপত্য, গলায় উজ্জ্বল কমলা রঙের নিচে কিঞ্চিৎ হলুদের বাহারি মিশ্রণ এবং কিছু বিশিষ্ট সাদা পালক পিঠ বরাবর নীলের সাথে মিশে থাকে যা পাখিটি উড়ে যাওয়ার সময় সবচেয়ে বেশি দেখা যায় । পুরুষ পাখির সুদর্শন লেজের পালক লালচে বাদামী রঙের এবং অগ্রভাগের দিকে গাঢ় রঙ । পুরুষ মোনাল আকর্ষণীয় উজ্জ্বল রঙের হয়ে থাকে । যেখানে নারী মোনাল অস্পষ্টভাবে রঙিন । নারী মোনালের বর্ণ হচ্ছে বাদামী এবং ঈষৎ পীতাভ মিশ্রণ । চোখের চারপাশে ফ্যাকাশে-নীল বৃত্তাকার রঙ ও চিবুকের নিচে বিশিষ্ট সফেদ দাগ থাকে । লেজের উপর সামান্য পরিমাণে সাদা ফালা এবং কালো ও হাল্কা লাল রঙে পালক বাধা থাকার কারণে উড়ে যাওয়ার সময় নারী মোনালকে আলাদা করে চেনা যায় । নারী মোনালের নিঃশব্দ সুর বেশি থাকে । একটি বড় আকারের মোনাল প্রায় ৭০ সেঃমিঃ (২৮ ইঞ্চি) লম্বা হয় । পুরুষ পাখির ওজন প্রায় ২৩৮০ গ্রাম (৮৪ oz) এবং নারী পাখির ওজন প্রায় ২১৫০ গ্রাম (৭৬ oz) পর্যন্ত । হিমালয় মোনাল ২১০০ - ৪৫০০ মিটার (৬৯০০ - ১৪৮০০ ফুট) উচ্চতায় তুষারময় হিমালয় বন এবং ঝোপঝাড়ের আদি বাসিন্দা । উন্মুক্ত বনভূমি, ঘাসযুক্ত ঢাল, দুরারোহ পর্বতগাত্র, আলপাইন তৃণভূমি এবং উচ্চ নাতিশীতোষ্ণ ওক-কনিফার বনে পাখিটি বাস করে যেখানে ২৭০০ - ৩৭০০ মিটার (৮৯০০ - ১২১০০ ফুট) উচ্চতার মধ্যে এটিকে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় । এলাকার অন্যান্য তিতির প্রজাতির পাখির তুলনায় এ পাখিটির অধিক মৌসুমী গতিবিধি লক্ষ্য করা যায় এবং শীতকালে প্রায় ২০০০ মিটার (৬৬০০ ফুট) পর্যন্ত অনেক নিচে নেমে আসে । সাধারণত এমন উচ্চতায় ঘাসের মধ্যে খাদ্যের সন্ধান করে । হিমালয় মোনাল মাংসাশী (পতঙ্গভুক প্রাণী) এবং তৃণভোজী (শস্য/বীজভোজী, ফলভোজী) । সর্বভুক মোনাল পাখি তার শক্ত বাঁকা চঞ্চু ও নখর ব্যবহার করে পোকামাকড়, শিকড়, বীজ এবং কন্দের মতো খাদ্য খুঁজে বের করার জন্য মাটি আঁচড়ে ফেলে । বিশেষ করে অমেরুদণ্ডী প্রাণীর শিকার খুঁজে পেতে উদ্ভিদের শিকড়ের মধ্যে খনন করে । মোনাল প্রাথমিকভাবে শস্য, বীজ, বেরি, পোকামাকড়, কোমল পাতা এবং বাদাম ইত্যাদি খাদ্যগ্রহণ করে । প্রায়শঃ খাদ্য হিসেবে অমেরুদণ্ডী প্রাণীকে শিকার করার জন্য তুষার খনন করে থাকে । হিমালয় মোনাল হচ্ছে সামাজিক পাখি, যেটিকে প্রায়ই জোড়া বা ছোট দলে দেখা যায় । শীতকালে এ পাখি সাধারণত বৃহৎ পক্ষীদলে জড়ো হয় এবং বিশ্রাম বা ঘুমানোর জায়গায় সাম্প্রদায়িকভাবে বসবাস করে । মোনাল পাখি দিনের বেলায় সক্রিয় থাকে এবং তন্ন তন্ন করে খাদ্যের খোঁজে এটি বেশিরভাগ সময় ব্যয় করে । প্রজনন মৌসুমে শক্তিশালী জোড়া বন্ধন গঠন করে যা এপ্রিল থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত হয় । এ সময় লড়াইপ্রিয় একটি পুরুষ মোনালের পায়ে এক বা একাধিক Spurs এবং মুখে মাংসল অলঙ্কার থাকতে পারে । প্রণয়প্রার্থনাকারী পুরুষ মোনাল কখনো কখনো নারী মোনালের উপস্থিতিতে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে, যারা হট্টগোলের প্রতি একেবারেই উদাসীন বলে মনে হয় । উচ্চ-উচ্চতার হিমালয় মোনাল অত্যন্ত যোগাযোগকারী । সঙ্গীকে আকৃষ্ট করতে এটি চমৎকার শরীর প্রদর্শন, নৃত্য এবং কণ্ঠস্বর সবই ব্যবহার করে । সঙ্গীর জন্য সন্তুষ্টি, আগ্রাসন এবং সংকেত প্রকাশ বা সঙ্গীকে আকৃষ্ট করতে বিস্তৃত পরিসরে তাকে আহ্বান করে । সত্যিই, রোমাঞ্চকর । প্রজনন ঋতুতে পুরুষ মোনাল তার সঙ্গীকে আকৃষ্ট করার চেষ্টায় সারা দিন খুব সোচ্চার থাকে । সঙ্গমের সময় পুরুষ মোনাল বহুগামী হয় যেখানে সে বেশ কিছু নারীর সাথে সঙ্গম করে । অন্যদিকে নারী মোনাল পালাক্রমে শুধুমাত্র নির্বাচিত পুরুষের সাথে সঙ্গম করে এবং একগামী সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করে । হিমালয় মোনালের প্রজনন শুরু হয় যখন সে উচ্চ উচ্চতায় অভিপ্রয়াণ করে । নারী মোনাল পাখি মাটিতে একটি অগভীর বাসা খনন করে এবং প্রতি মৌসুমে ৩ - ৫টি ডিম পাড়ে । সে প্রায় ২৭ দিন ধরে ডিমে তা দেয় এবং ডিমগুলোতে তা দেয়ার সময় (Incubation period) পুরুষ মোনাল সুরক্ষার জন্য কাছাকাছি থেকে পাহারা দেয় ও প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত বাচ্চাকে বড় করতে সাহায্য করে । হিমালয় মোনাল হচ্ছে তিতির পাখির Phasianidae পরিবারের Lophophorus প্রজাতির একটি পাখি । Phasianinae পরিবারের ১৬টি বংশের প্রায় ৫০টি প্রজাতি রয়েছে । চাইনিজ মোনাল (L. lhuysii) এখন শুধুমাত্র পশ্চিম চীনে পাওয়া যায়, যদিও এটি একটি বিপন্ন প্রজাতি । হিমালয় মোনালকে Impeyan monal এবং Impeyan pheasant বলা হয় । মোনাল পাখির বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে: Lophophorus impejanus । এ বৈজ্ঞানিক নামটি বাংলার ব্রিটিশ প্রধান বিচারপতি Sir Elijah Impey এর স্ত্রী Lady Mary Impey কে স্মরণ করে । হিমালয় মোনাল তুষার সহ্য করতে পারে । এ পাখিটি পূর্ব আফগানিস্তান থেকে হিমালয় হয়ে পাকিস্তান, ভারত, ভুটান, নেপাল, মায়ানমার এবং চীন পর্যন্ত প্রাকৃতিক পরিসরে বসবাস করে । ভারতের জম্মু-কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম এবং অরুণাচল প্রদেশে মোনালকে দেখা যায় । এ পাখিটি ভারতের উত্তরাখণ্ডের রাষ্ট্রীয় পাখি এবং সেখানে এটি মোনাল নামে পরিচিত । পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশ, কাগান, পালাস উপত্যকা এবং আজাদ কাশ্মীরেও এটির দেখা মেলে । মোনাল নেপালের জাতীয় পাখি এবং স্থানীয়ভাবে এটি Danphe বা Danfe নামে পরিচিত । বন্দিদশায় এ পাখি ১০ - ১২ বছর যে কোনো জায়গায় বেঁচে থাকে । কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এ সুন্দর পাখিটিকে খাবারের জন্য শিকার করা হয় । কিছু কিছু এলাকায় বাসস্থান ধ্বংস, শিকার এবং অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক কারণের ফলে হিমালয় মোনাল আজ হুমকির সম্মুখীন । পশ্চিম হিমালয় অঞ্চলে জলবিদ্যুৎ উন্নয়নের সাথে জড়িত মানুষের কর্মকাণ্ডেও এটির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে । বিস্ময়কর যে, কোথাও কোথাও মোনাল জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ মাইলে মাত্র পাঁচ জোড়ার মতো । ফলে, পাখিটি বিরল কিংবা এটির জনসংখ্যা বিপন্ন হয়ে পড়ছে । International Union for Conservation of Nature (IUCN) এর লাল তালিকায় মোনাল পাখিকে ন্যূনতম উদ্বেগ (Least Concern বা LC) হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে । হিমালয় মোনাল প্রকৃতির অনুপম সৌন্দর্য । কিন্তু, আজ এটির সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে । আবার কিছু এলাকায় মোনালকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয় । এছাড়া, মোনালের প্রধান হুমকি হচ্ছে চোরাশিকার । পুরুষ মোনালের সৌন্দর্যময় ঝুঁটি পালকগুচ্ছ বেশ মূল্যবান । এগুলো অলঙ্কারাদি হিসেবে বা সাজসজ্জায় ব্যবহৃত হয় বলে মায়াবী সুন্দর এ পাখিটিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় । কারণ, হিমালয় মোনালের ঝুঁটি পালকগুচ্ছকে মর্যাদা এবং কর্তৃত্বের প্রতীক বলে মনে করা হয় । যাই হোক, মোনালকে রক্ষা করা এবং এটির আবাসস্থলকে সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখতে হবে । একে অবাধ বিচরণের সুযোগ করে দিতে হবে । পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে চোরাশিকারীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে । তবেই, প্রকৃতি হবে সুরক্ষিত । 

তথ্যসূত্র: https://en.wikipedia.org/ , https://www.inaturalist.org/ , https://wildlifepark.novascotia.ca/ , https://www.elmwoodparkzoo.org/ , https://animalia.bio/

Thursday, 9 May 2024

বৃহস্পতি গ্রহের মহা লাল বিন্দু (Great red spot)

 




বৃহস্পতি গ্রহের মহা লাল বিন্দু 
Great red spot 
~~~~~~~~~~
বৃহস্পতি গ্রহের বিষুবরেখার চারপাশে সামান্য স্ফীতি রয়েছে । বাইরের বায়ুমণ্ডল অক্ষাংশীয় মণ্ডলের বিভিন্ন বন্ধনীতে বিভক্ত এবং একটি বন্ধনীর সাথে অন্য আরেকটি বন্ধনীর সংযোগস্থলে ঝড়-ঝঞ্ঝাপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করে । এ ধরণের পরিবেশের একটি হচ্ছে ‘মহা লাল বিন্দু’ বা Great red spot (GRS) । বৃহস্পতি গ্রহের সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য মহা লাল বিন্দুটি হচ্ছে একটি ভয়ঙ্কর ঝড় । এটি এতোই বড় যে দুই-তিনটি পৃথিবীর সমতুল্য । ডিম্বাকৃতির এক জটিল দানবীয় ঝড় । ঝড়টির বর্তমান অবস্থান হচ্ছে দক্ষিণ নিরক্ষীয় বলয়ে । তবে, এটি সম্ভবত বৃহস্পতির স্থানান্তরিত চাঁদ (Transiting moon) ক্যালিস্টো এর ছায়ায় ছিল । ঝড়টি বৃহস্পতির দক্ষিণ গোলার্ধে নিরক্ষরেখা বা বিষুবরেখার ২২° দক্ষিণে অবস্থিত । ইটের মতো লাল থেকে গোলাপী এবং সাদাসহ রঙের ভিন্নতা রয়েছে । বিশাল এ ঝড়টি দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল এবং সক্রিয় অবস্থায় আছে । ধারণা করা হয়, অতি শক্তিশালী এ ঝড়টি সপ্তদশ শতাব্দী থেকে একটানা বয়ে চলছে ।  অসংখ্য ছোট ঝড়ের পাশাপাশি দৃশ্যমান আরো একটি বৃত্তাকার সাদা অংশ উজ্জ্বলভাবে অবস্থান করছে । কারণ, ঝড়গুলো প্রচুর সূর্যালোক প্রতিফলিত করে কিংবা একটি গভীর প্রধান মেঘ থেকে প্রতিফলিত আলো প্রদর্শন করে থাকে । এ মহা লাল বিন্দুর উচ্চ-ঊর্ধ্বতা বা গভীরতায় ধোঁয়াশা রয়েছে, যেমন নিরক্ষীয় অঞ্চলে আছে । অসংখ্য উজ্জ্বল সাদা এবং আঁকাবাঁকা দাগ বা পাতলা স্তর যেগুলো সম্ভবত ঘনীভূত সংবহনশীল ঝড়ের খুব উচ্চ-খাড়াইয়ের মেঘের চূড়া । বিপরীত দিকে, নিরক্ষীয় অঞ্চলের উত্তরে গাঢ় বন্ধনী বা ফিতাগুলোতে সামান্য মেঘের আচ্ছাদন রয়েছে । ঝড়টির অভ্যন্তরে বায়ু প্রবাহের গতি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২৭০ মাইল । 'মহা লাল বিন্দু' হচ্ছে বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলে একটি উচ্চ-চাপ অঞ্চল, যা অবিরাম একটি Anticyclonic ঝড় তৈরি করে । যেটি আমাদের সৌরজগতের বৃহত্তম ঝড় । এ দানব ঝড়টি ৪৩২ কিঃমিঃ/ঘন্টা (২৬৮ মাইল) পর্যন্ত বাতাসের গতিবেগ তৈরি করে । ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭১৩ খ্রিস্টাব্দের পর্যবেক্ষণগুলো থেকে ধারণা করা হয় যে, ভয়ানক শক্তিশালী এ ঝড়টি কমপক্ষে ৩৫৭ বছর ধরে বিদ্যমান রয়েছে । ১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে ইংরেজ Polymath, বিজ্ঞানী এবং স্থপতি Robert Hooke FRS মহা লাল বিন্দু ঝড়টি পর্যবেক্ষণ করেন । পরবর্তীতে ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইতালীয় গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ এবং প্রকৌশলী Giovanni Domenico Cassini (Jean-Dominique Cassini) বিস্ময়কর এ ঝড়টি পর্যবেক্ষণ করেন । জার্মানির একজন Pharmacist ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী Samuel Heinrich Schwabe ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে মহা লাল বিন্দুর প্রথম পরিচিত অঙ্কন তৈরি করেন । মহা লাল বিন্দুটি ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে বেশ সুস্পষ্ট হওয়ার আগে ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭০৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বেশ কয়েকটি পর্যবেক্ষণে এটি দৃষ্টি থেকে হারিয়ে গিয়েছিল । ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আবার ঝড়টি ম্লান বা অদৃশ্য হয়ে যায় । ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে মহা লাল বিন্দুর প্রান্তে ফলকায়িত (Flaking) শুরু করে ঝড়টি টুকরো হয়ে ভেঙ্গে যাওয়া কিংবা বিলুপ্ত হওয়ার অবস্থা ঘটেছিল । ঝড়টির সঙ্কুচিত হওয়া এবং Flaking এর কারণে এটি সম্পর্কে কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের উদ্বেগকে আরো উস্কে দিয়েছিল যে, মহা লাল বিন্দুটি আগামী ২০ বছরের মধ্যে বিলীন হয়ে যেতে পারে । যদিও কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে এ বিষয়ে দ্বি-মত ছিল । বৃহস্পতি গ্রহের মহা লাল বিন্দুটি ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘোরে, ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের হিসেব অনুযায়ী যার সময়কাল প্রায় ৪.৫ পৃথিবী দিন বা ১১ Jovian দিন । ৩রা এপ্রিল ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এ ঝড়টির প্রস্থ ১৬৩৫০ কিঃমিঃ (১০১৬০ মাইল) পরিমাপ করা হয় । মহা লাল বিন্দুর ব্যাস হচ্ছে পৃথিবীর ব্যাসের ১.৩ গুণ । এ ঝড়ের চূড়াগুলো (Cloud-tops) আশেপাশের মেঘ চূড়া থেকে প্রায় ৮ কিঃমিঃ (৫.০ মাইল) উপরে । মহা লাল বিন্দুটি বৃহস্পতি গ্রহের অন্যান্য মেঘের তুলনায় উচ্চ-ঊর্ধ্বতায় শীতল । তবে ঝড়ের উপরের বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা গ্রহের বাকি অংশের তুলনায় যথেষ্ট বেশি । নিচের ঝড়ের উত্তালতা থেকে ক্রমবর্ধমান শব্দ তরঙ্গগুলো এ অঞ্চলের উত্তাপের জন্য এটি একটি ব্যাখ্যা হিসেবে প্রস্তাব করা হয় । মহা লাল বিন্দুটি তার দক্ষিণে একটি পরিমিত পূর্বমুখী Jet স্রোত এবং উত্তরে একটি খুব শক্তিশালী পশ্চিমমুখী স্রোত দ্বারা সীমাবদ্ধ । যদিও ঝড়টির শিখর প্রান্তের চারপাশে বাতাস প্রায় ৪৩২ কিঃমিঃ/ঘন্টা (২৬৮ মাইল প্রতি ঘন্টা) বেগে প্রবাহিত হয় । মহা লাল বিন্দুর গভীরতা, অভ্যন্তরীণ কাঠামো এবং সামান্য আন্তঃ-বহিঃপ্রবাহসহ ঝড়টির ভিতরে স্রোত কয়েক দশক ধরে স্থবির রয়েছে বলে মনে হয় । তবে, এর ঘূর্ণন সময়ের সাথে সাথে হ্রাস পেয়েছে । মহা লাল বিন্দুর Anticyclonic সঞ্চালনের মধ্যে ফসফিন (PH₃), অ্যামোনিয়া (NH₃) এবং অ্যারোসলের (Para-H₂) সংমিশ্রণ রয়েছে । কিন্তু Jet স্রোতগুলো যে শক্তি সরবরাহ করে মহা লাল বিন্দুর ঘূর্ণিকে শক্তি দেয়, সেগুলো কাঠামোর ভিত্তির নিচে রয়েছে । মহা লাল বিন্দুর গঠন এবং এর লাল রঙের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি । তবে পরীক্ষাগারে নানা পরীক্ষা দ্বারা সমর্থিত অনুমান করা হয় যে: Ammonium hydrosulfide এবং জৈব যৌগ Acetylene এর সংস্পর্শে সূর্যের অতিবেগুনী বিকিরণ থেকে সৃষ্ট রাসায়নিক উপাদানগুলোর কারণে এমন রঙ হতে পারে, যা একটি লালচে উপাদান তৈরি করে । সম্ভবত এটি একটি জটিল জৈব যৌগ, যেটি Tholin নামে পরিচিত । যৌগগুলোর উচ্চ-ঊর্ধ্বতাও এ রঙে অবদান রাখতে পারে । Laboratory অধ্যয়নগুলোতে বৃহস্পতির মেঘের রাসায়নিক সংমিশ্রণে সূর্যের মহাজাগতিক অতিবেগুনী রশ্মির (Cosmic UV rays) প্রভাব পরীক্ষা করা হয় । বৃহস্পতি গ্রহের বাইরের বায়ুমণ্ডলে Ammonium hydrosulfide এবং জৈব যৌগ Acetylene এর সাথে সূর্যের অতিবেগুনী বিকিরণ থেকে সৃষ্ট রাসায়নিক উপাদানগুলোর বিক্রিয়া করে গভীর লাল রঙ তৈরি করে । মহা লাল বিন্দু বর্ণে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়, প্রায় ইট-লাল থেকে ফ্যাকাশে সালমন বা এমনকি সাদা । মহা লাল বিন্দুটি মাঝে মাঝে অদৃশ্য হয়ে যায় । শুধুমাত্র Red Spot Hollow এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠে, যা দক্ষিণ নিরক্ষীয় বলয় বা অঞ্চলে (South Equatorial Belt বা SEB) এটির অবস্থান । এর দৃশ্যমানতা দৃশ্যত দক্ষিণ নিরক্ষীয় বলয়ের সাথে মিলিত হয় যখন বলয়টি উজ্জ্বল সাদা হয় ও মহা লাল বিন্দুটি অন্ধকার হতে থাকে এবং যখন এটি অন্ধকার হয় মহা লাল বিন্দুটি সাধারণত হালকা হয় । ঐ গবেষণা থেকে পরামর্শ দেয়া হয় যে, ঝড়ের অশান্তি বা আলোড়নপূর্ণতার কারণে ঝড়টি চরম পরিমাণে শব্দ তরঙ্গ সৃষ্টি করে । শব্দ তরঙ্গগুলো ঝড়ের উপরে ৮০০ কিলোমিটার (৫০০ মাইল) উচ্চতায় উল্লম্বভাবে ভ্রমণ করে থাকে । যেখানে তারা উপরের বায়ুমণ্ডলে ভেঙে যায় এবং তরঙ্গ শক্তিকে তাপে রূপান্তর করে । এটি উপরের বায়ুমণ্ডলের একটি অঞ্চল তৈরি করে যা ১৬০০ Kelvin (১৩৩০°C বা ২৪২০°F)—  এ উচ্চতায় গ্রহের বাকি অংশের তুলনায় কয়েক শত Kelvin বেশি উষ্ণ থাকে । এ প্রভাবটিকে "সৈকতে সমুদ্রের ঢেউ বিধ্বস্ত হওয়ার মতো" অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে । ঘর্ষণ প্রদানের জন্য কোনো গ্রহের পৃষ্ঠ (শুধুমাত্র হাইড্রোজেনের একটি আবরণ) না থাকার কারণে ঝড়টি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিদ্যমান বা অব্যাহত রয়েছে । সঞ্চালনকারী গ্যাস ঘূর্ণিগুলো (Eddies) বায়ুমণ্ডলে খুব দীর্ঘ সময় ধরে থাকে, কারণ তাদের কৌণিক গতিবেগ বা ভরবেগের বিরোধিতা করার মতো কিছুই নেই । মহা লাল বিন্দুর সংলগ্নে দুটি ‘লাল দাগ’ এবং ঝড়টিতে ১২ সেঃমিঃ বড় একটি ছ্যাঁদা দেখা যায় । এ ঝড়ের সর্বোচ্চ ঊর্ধ্বতা আশেপাশের মেঘ চূড়াগুলো (Cloud-tops) থেকে প্রায় ৮ কিঃমিঃ (৫ মাইল) উপরে । ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের প্রথমদিকে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, প্রায় ৪১০০০ কিঃমিঃ (২৫৫০০ মাইল) জুড়ে ঝড়টির অবস্থান ছিল । ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে Voyager নভোযানের উড়ান (Flyby) থেকে পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ঝড়টির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩৩০০ কিঃমিঃ (১৪৫০০ মাইল) এবং প্রস্থ প্রায় ১৩০০০ কিঃমিঃ (৮০০০মাইল) ছিল । ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে Hubble Space Telescope এর পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, ঝড়টি আকারে ২০৯৫০ কিঃমিঃ (১৩০২০ মাইল) কমেছে এবং পরবর্তীতে ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের পর্যবেক্ষণে ঝড়টির আকার দেখা যায় প্রায় ১৭৯১০ কিঃমিঃ (১১১৩০ মাইল) । ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের হিসেবে ঝড়টি প্রায় ১৬৫০০ কিঃমিঃ থেকে ১০৯৪০ কিঃমিঃ (১০২৫০ মাইল থেকে ৬৮০০ মাইল) পরিমাপ করা হয় এবং প্রতি বছর এটির প্রায় ৯৩০ কিঃমিঃ (৫৮০ মাইল) দৈর্ঘ্য কমেছিল । ২০২১ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে প্রেরিত Juno spacecraft মহাকাশযান দ্বারা মহা লাল বিন্দুর গভীরতা পরিমাপ করা হয় প্রায় ৩০০-৫০০ কিঃমিঃ (১৯০-৩১০ মাইল) । এছাড়া, বৃহস্পতির মেরুতে বেশ কয়েকটি মেরু ঘূর্ণিঝড়পুঞ্জ বা ঘূর্ণিঝড়মণ্ডলী রয়েছে । উত্তর ঘূর্ণিঝড়পুঞ্জে ৯টি ঘূর্ণিঝড় রয়েছে, যার কেন্দ্রে বড় ১টি এবং এটির চারপাশে রয়েছে ৮টি ঘূর্ণিঝড় । অন্যদিকে দক্ষিণ অংশটিও ১টি কেন্দ্রীয় ঘূর্ণি বা ঘূর্ণিবাত্যা নিয়ে গঠিত, যার ৫টি বড় এবং ১টি ছোট ঘূর্ণিঝড় দ্বারা বেষ্টিত । এ মেরু কাঠামোগুলো বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলের তীব্র অশান্তি বা আলোড়নপূর্ণতার কারণে ঘটে থাকে । যেটিকে শনি গ্রহের উত্তর মেরুর ষট্কোণ বা ষড়ভুজ ক্ষেত্রের (Hexagon) সাথে তুলনা করা যেতে পারে । ২০০০ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ গোলার্ধে একটি বায়ুমণ্ডলীয় বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছিল যেটি মহা লাল বিন্দুর মতোই, কিন্তু এটি ছিল ছোট । সাদা ডিম্বাকার আকৃতির ঝড়গুলো একত্রিত হয়ে একটি একক বৈশিষ্ট্য তৈরি করে । ১৯৩৯-১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে এ তিনটি ছোট সাদা ডিম্বাকার আকৃতির ঝড় একত্রিত হয়ে গঠিত হয়েছিল । এ একত্রিত বৈশিষ্ট্যটির নাম Oval BA । ওভাল ঝড়টি পরবর্তীতে সাদা থেকে লালচে রঙে পরিণত হয়ে তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এটিকে "ছোট লাল বিন্দু" বা Little red spot বা Red junior নামকরণ করেছেন । গত ৫ই জুন ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে Great red spot এবং Oval BA এক-কেন্দ্রাভিমুখতা বা অভিসারণের (Convergence) দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়েছিল । ঝড় দুটি প্রায় প্রতি দুই বছর পর পর একে অপরকে অতিক্রম করে । তবে ২০০২ খ্রিস্টাব্দে এবং ২০০৪ খ্রিস্টাব্দের এ অতিক্রমগুলো খুব কম তাৎপর্যপূর্ণ ছিল । NASA এর Goddard space flight center এর আমেরিকান গ্রহ বিজ্ঞানী Amy Simon-Miller ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, ঝড়গুলো তাদের সবচেয়ে কাছাকাছি চলে যাবে । কিন্তু 'ছোট লাল বিন্দুটি' স্বল্প মেয়াদে তার আকৃতি বা গঠন ও তীব্রতা পরিবর্তন করে এবং ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বায়ুমণ্ডলে তার সাধারণ অবস্থান বজায় রেখেছে । ধারণা করা হয়, 'ছোট লাল বিন্দু'টি এক সময় মহা লাল বিন্দুর মতোই একটি দৈত্যাকার ঘূর্ণি বা ঘূর্ণিবাত্যা বা ঘূর্ণিঝড়ে (Giant vortex) পরিণত হতে পারে । এটিকে পৃথিবীর তাপমণ্ডলের (Thermosphere) ঘূর্ণিগুলোর মতোই অর্ধ-স্থিতিশীল বলে মনে হয় । এ বৈশিষ্ট্যই সম্ভবত বৃহস্পতির আইও (Io) চাঁদ থেকে উৎপন্ন চার্জিত কণার মধ্যে মিথস্ক্রিয়া দ্বারা গঠিত হতে পারে । আইও চাঁদের আগ্নেয়গিরিগুলো প্রচুর পরিমাণে সালফার ডাই অক্সাইড নির্গত করে, যা চাঁদের কক্ষপথে একটি Gas torus তৈরি করেছে । উল্লেখ্য যে: 'The Great Red Spot' বা মহা লাল বিন্দুকে Great Dark Spot এর সাথে বিভ্রান্ত করা উচিত নয় । কারণ ২০০০ খ্রিস্টাব্দে বৃহস্পতির উত্তর মেরুর কাছে Cassini–Huygens মহাকাশযান দ্বারা Great Dark Spot এর মতো একটি বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করা হয়, যে বেশিষ্ট্য নেপচুনের বায়ুমণ্ডলে রয়েছে আর সেটিই হচ্ছে Great Dark Spot । 
ছবি: http://www.nasa.gov/ , http://blogs.nasa.gov/ 
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, আন্তর্জাল (The Internet) ।





Tuesday, 7 May 2024

পৃথিবীর নিষ্প্রভ নীল বিন্দু (Pale Blue Dot of Earth)


‘নিষ্প্রভ নীল বিন্দু’ হচ্ছে পৃথিবী গ্রহের একটি আশ্চর্যজনক ছবি । এটি এমন একটি দুর্দান্ত ও দুর্লভ ছবি, যেটিকে ১৪ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবী থেকে ৬.৪ বিলিয়ন কিলোমিটার (৪ বিলিয়ন মাইল বা ৬৪০ কোটি কিলোমিটার) দূরে মহাশূন্যে থাকা ভয়েজার ১ রোবোটিক মহাকাশ যান থেকে ধারণ করা হয় । যে ছবিতে মহাকাশের বিশালতার মাঝে বিস্তৃত সূর্যালোক রশ্মির বন্ধনীতে “পৃথিবী” অতি ক্ষুদ্র একটি বিন্দুর মতো দেখা যায় । এখানে ফ্যাকাশে বিন্দুটিই পৃথিবী । অপার মহাশূন্যের প্রেক্ষাপটে এক ফালি সূর্যরশ্মির ভিতর পৃথিবী ধূলিকণার মতো ভাসছে । আমাদের এ সবুজ পৃথিবীতে সূর্য থেকে আলো আসতে সময় লাগে ০৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ড এবং দূরত্ব ১৫ কোটি কিলোমিটার । তাহলে একবার চিন্তা করুন ছবির ঐ ক্ষুদ্র বিন্দুটি কতদূর, যেখানে আপনি বসবাস করেন? এ ছবিতে পৃথিবীর আকার ০.১২ Pixel (১ মেগাপিক্সেল = ১ মিলিয়ন পিক্সেল) । পৃথিবীর এ প্রস্ফুটিত অনন্য চিত্রটি বেগুনি, নীল এবং সবুজ রঙে বিশোধন (ফিল্টার) করার মাধ্যমে নেয়া হয়েছিল । দিনটি ছিল Valentine’s Day । নাসা এর ভয়েজার ১ মিশনের জন্য ভালোবাসা দিবসটি বিশেষ হয় । দূরবর্তী মহাশূন্য থেকে ভয়েজার ১ মহাকাশ যানের ১৫০০ মিঃমিঃ উচ্চ-নির্ণয়কর সংকীর্ণ কোণের ক্যামেরার (Narrow-Angle Camera) সাহায্যে পৃথিবী গ্রহের ধারণকৃত Family Portrait সিরিজের আইকনিক ‘নিষ্প্রভ নীল বিন্দু’ ছবিটি সত্যিই উত্তেজনাকর । যা হৃদয়কে টানছে । বিশাল মহাবিশ্বে ক্ষুদ্র পৃথিবীকে আরো নাটকীয় করে তুলছে । এটি সেই নম্রতা যা বিজ্ঞান আমাদের দেয় । বিশদ বিশ্লেষণে পরামর্শ দেয়া হয়েছে যে ক্যামেরাটি চাঁদকেও শনাক্ত করেছে, তবে বিশেষ প্রক্রিয়াকরণ ছাড়াই দৃশ্যমান হওয়ার মতো অস্পষ্ট । যাক সে কথা, এটি এমন একটি অনুপ্রেরণাদায়ী পৃথিবী গ্রহের বিখ্যাত ছবি যেখানে ‘নিষ্প্রভ নীল বিন্দু’ অর্থাৎ পৃথিবী নামক ক্ষুদ্র বিন্দুটি আমাদের আবাসস্থল এবং সে সম্পর্কে পরম বিস্ময় জাগিয়ে তুলছে । অসীম বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মাঝে এ গ্রহটি নিতান্তই ক্ষুদ্র একটি বিন্দু, যেখানে আমাদের সবকিছু এবং নিরাপদ আশ্রয়স্থল । মায়ের কোলের মতোই একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়স্থল । যদিও কিছু মানুষের নির্বিচার, হিংসাত্মক ও নৃশংস কর্মকাণ্ড এমন সুন্দর ধরিত্রীকে অনিরাপদ করে তুলছে । প্রকৃতপক্ষে, যা অপ্রত্যাশিত । তবুও, স্বপ্ন দেখি এ মৃত্যুন্মুখ গ্রহে টিকে থাকার । পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে সূর্যালোকের স্থিতিস্থাপক আলোর বিচ্ছুরণ বা তড়িচ্চুম্বকীয় বিকিরণ (Rayleigh Scattering ) ছড়িয়ে পড়ার কারণে বিস্ময়কর এ ছবিতে পৃথিবী একটি ফ্যাকাসে নীল বিন্দুর মতোই আবির্ভূত হয়েছে । ভয়েজার ১ মহাকাশ যানটি যখন তার মিশনের উদ্দেশে সৌরজগৎ ছেড়ে অসীম মহাকাশের আরো গভীরে অগ্রসর হচ্ছিল সে সময় কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গ্রহ বিজ্ঞানী, বিজ্ঞান যোগাযোগকারী এবং ভয়েজার বিজ্ঞান দলের সদস্য Edward Carl Sagan নাসাকে অনুরোধ করে যে, ঐ দূরত্ব থেকে যানটির ক্যামেরা দ্বারা যেনো পৃথিবীর একটি চিত্র ধারণ করে রাখা হয় । মহাকাশযানটি গভীর মহাশূন্যের দিকে যাওয়ার পথে হঠাৎ চারদিকে ঘুরতে থাকে এবং পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখে নক্ষত্রে ভরা আকাশের উপর গ্রহগুলোর এক চমকপ্রদ বিন্যাস । যেখানে নীলাভ নেপচুন, নীল-সবুজ বরফ দৈত্য ইউরেনাস, বলয়যুক্ত শনি, গ্যাসীয় দানব বিশাল বৃহস্পতি, উজ্জ্বল সাদা শুক্র, ক্যামেরার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সূর্যালোক দ্বারা অস্পষ্ট লোহিত মঙ্গল, সূর্যের খুব কাছাকাছি বুধ, ভীষণ অন্ধকারে ম্লান হওয়া বামন গ্রহ প্লুটো খুব দূরে খুব ছোট এবং একটি অত্যাশ্চর্য ফ্যাকাশে নীল জলময় পৃথিবী । অপার মহাশূন্যের দূরবর্তী স্থান থেকে এটি সৌরজগতের প্রথম প্রতিকৃতি । অসাধারণ সুন্দর পৃথিবীর এ ছবিটি ধারণ করার চৌত্রিশ মিনিট পর ভয়েজার ১ মহাকাশ যানের ক্যামেরা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় এবং এটিই ছিল তার শেষ ছবি । যদিও কিছু বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ ছিল যে, সূর্যের এতো কাছাকাছি (মহাজাগতিক রশ্মির প্রভাবে) পৃথিবীর ছবি তোলা মহাকাশযানটির Imaging System কে অপূরণীয় ক্ষতিগ্রস্ত করার ঝুঁকি থাকতে পারে । যাই হোক, পরবর্তীতে এ অদ্ভুত ছবিটি দেখে জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান মহাশূন্যে সূর্যের আলোয় ভেসে থাকা ধুলোর ন্যায় ঐ ছোট্টো কণাটির (পৃথিবী) নাম দেন ‘নিষ্প্রভ নীল বিন্দু’ বা ‘Pale Blue Dot’ । তিনি ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে ‘নিষ্প্রভ নীল বিন্দু: মহাকাশে মানব ভবিষ্যতের দৃষ্টিভঙ্গি’ (Pale Blue Dot: A Vision of the Human Future in Space) নামক তার রচিত বইয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছবিটি নিয়ে গভীর চিন্তা ব্যাখ্যা করেন । যেখানে তিনি লিখেছেন: “সেই বিন্দুটির দিকে আবার তাকান । এটিই এখানে । এটিই বাড়ি । এটিই আমরা । এটিতে আপনি যাকে ভালোবাসেন, আপনার পরিচিত প্রত্যেকে, যাদের সম্পর্কে আপনি কখনো শুনেছেন, প্রত্যেক মানুষ যারা ছিলেন, তাদের জীবন কাটান । আমাদের ক্ষুদ্র পৃথিবীর এ দূরবর্তী চিত্রের চেয়ে মানবিক অহঙ্কারের মূর্খতার উত্তম প্রদর্শন সম্ভবত আর নেই ।” তিনি স্বীকার করেছেন যে, “এ ধরণের ছবির খুব বেশি বৈজ্ঞানিক মূল্য থাকবে না । কারণ, মহাকাশ যানটির ক্যামেরার জন্য পৃথিবী খুব ছোট বলে মনে হবে, কোনো বিস্তারিত জানার জন্য । কিন্তু, এটি মহাবিশ্বে মানবজাতির অবস্থানের এক দৃষ্টিকোণ হিসেবে অর্থবহ হবে ।” উল্লেখ্য যে, মার্কিন মহাকাশ বৈজ্ঞানিক কর্মসূচীর অংশ হিসেবে NASA ৫ই সেপ্টেম্বর ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে মনুষ্যবিহীন ভয়েজার ১ রোবোটিক মহাকাশ যানকে (Robotic Space Probe) সৌরজগতের বাইরের পরিবেশ, বহিঃসৌর গ্রহজনিত বিষয়, Heliosphere, Heliopause, Interstellar Wind এবং নক্ষত্রমণ্ডলের মধ্যবর্তী এলাকা গবেষণার জন্য মহাশূন্যে প্রেরণ করে । মহাকাশ যানটির ওজন: ৭২২ কিলোগ্রাম বা ১৫৯২ পাউন্ড । ভয়েজার ১ মহাকাশ যান ৫ই মার্চ ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে সৌরজগতের সর্ববৃহৎ গ্যাস দানব গ্রহ বৃহস্পতিকে অতিক্রম করে এবং ১২ই নভেম্বর ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে সৌরজগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাসীয় দৈত্য শনি গ্রহ ব্যবস্থার সম্মুখীন হয় । এটিই সর্বপ্রথম আমাদের সৌরজগতের বিশাল দুটি গ্রহ এবং তাদের প্রধান উপগ্রহগুলো সম্পর্কে বিশদ তথ্য ও চিত্র পাঠাতে সক্ষম হয় । ভয়েজার ১ হচ্ছে প্রথম মহাকাশযান যেটি Heliosphere অতিক্রম করে, এটি সেই সীমানা যেখানে আমাদের সৌরজগতের বাইরের প্রভাবগুলো সূর্যের তুলনায় অত্যধিক শক্তিশালী । পরবর্তীতে ২৫শে আগস্ট ২০১২ খ্রিস্টাব্দে ভয়েজার ১ মহাকাশ যানটি Hydrogen Wall এবং Heliopause এর সীমানা অতিক্রম করে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে প্রবেশ করে । বিস্ময়কর যে, মানবজাতির ইতিহাসে এটিই হচ্ছে মানবনির্মিত প্রথম বস্তু যেটি সৌরজগতের সীমানাকে ছাড়িয়ে যায় । ১১ই নভেম্বর ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে ভয়েজার ১ মহাকাশ যান পৃথিবী থেকে ১৩০.২৯ AU (প্রায় ১২ বিলিয়ন মাইল) দূরত্ব অতিক্রম করে, যা পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ দূরত্ব । এ মিশনটি পরিচালনা করে NASA (National Aeronautics and Space Administration) এবং JPL (Jet Propulsion Laboratory) । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডোনায় অবস্থিত জেপিএল সংস্থাটি নাসা এর জন্য মনুষ্যবিহীন নভোযান তৈরি এবং পরিচালনা করে থাকে । চলমান মিশনে থাকা ভয়েজার ১ মহাকাশ যানটি ৬৪০০০ কিঃমিঃ/ঘন্টা বা ৪০০০০ মাইল/ঘন্টা গতিতে বর্তমানে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে (Interstellar Space) তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে । তবে, এর ক্যামেরার ছবি তোলার ক্ষমতা আর নেই । এটি নাসা এর মাধ্যমে Deep Space Network (DSN) এর সাথে নিত্যনৈমিত্তিক আদেশ পেতে যোগাযোগ অব্যাহত রাখছে এবং চারটি স্থির-কার্যকর যন্ত্র থেকে যেমন: মহাজাগতিক রশ্মি, চৌম্বক ক্ষেত্র, কম শক্তি চার্জযুক্ত কণা এবং প্লাজমা তরঙ্গের বৈজ্ঞানিক তদন্ত করে তথ্য ফেরৎ পাঠায় । ২০২৪ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল পর্যন্ত এটি পৃথিবী থেকে ১৬২.৭ AU (২৪.৩ বিলিয়ন কিঃমিঃ বা ১৫.১ বিলিয়ন মাইল) দূরত্বে থাকবে এবং তার পূর্বের রেকর্ডটি অতিক্রম করবে । Voyager 1 হচ্ছে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী মহাশূন্যে ভ্রমণরত মানবসৃষ্ট বস্তু । সম্ভবত ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে এ মহাকাশ যানটির জ্বালানি শেষ হয়ে যাবে । হয়তো, পৃথিবীর মানুষ ভয়েজার ১ মহাকাশ যান থেকে আর কোনো সংকেত (Signal) পাবেন না । যদিও, নাসা এর বিজ্ঞানীরা মহাকাশ যানটিতে সংকেত পাঠানোর মাধ্যমে এর কয়েকটি ইউনিট বন্ধ রেখে জ্বালানি কম ব্যবহার করে আরো কিছু সময় এটিকে সচল রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন । তবুও, মহাকাশ যানটি মহাবিশ্বের মধ্য দিয়ে তার অনন্য যাত্রা চালিয়ে যাচ্ছে । 

* তথ্যসূত্র: আন্তর্জাল (The Internet), উইকিপিডিয়া । 

ছবি: https://science.nasa.gov/

Sunday, 5 May 2024

জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের দৈত্য ছায়াপথ আবিষ্কার


এ বিশাল মহাবিশ্ব অনেক গোপনীয়তা ধারণ করে । উপবৃত্তাকার বা বৃত্তাকার দানবীয় ছায়াপথগুলো সময়ের সাথে সাথে তাদের রূপ পরিবর্তন করে । এরা কখনো বেশ দৈত্যাকার, শান্ত এবং কিছু ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে রূপ ধারণ করে । ইয়েল ইউনিভার্সিটির Pieter van Dokkum এর নেতৃত্বে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি দল এ ধরনের একটি নতুন ছায়াপথ সনাক্তকরণের বিবরণ প্রকাশ করেছে । যেখানে বস্তুটিকে NASA এর জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের Near Infrared Camera (NIRCam) দিয়ে ১ মিলিয়ন পর্যন্ত ছায়াপথের চলমান JWST COSMOS-Web এর প্রশস্ত ও গভীর সমীক্ষার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর বৃহত্তম, সবচেয়ে জটিল এবং শক্তিশালী James Webb Space Telescope (JWST) ব্যবহার করে এ নতুন ছায়াপথ JWST-ER1g আবিষ্কারের কথা জানিয়েছেন । গত ১৪ই সেপ্টেম্বর ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে arXiv preprint server এর মাধ্যমে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে । অতি প্রাচীন এ বৃহৎ ছায়াপথটি তৈরি হয়েছিল যখন মহাবিশ্ব তার বর্তমান বয়সের মাত্র এক চতুর্থাংশ ছিল । নতুন আবিষ্কৃত ছায়াপথটি হচ্ছে বৃহদাকার, নিচ্ছিদ্র এবং শান্ত । অসীম বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে জন্ম নেয়া এমন বৃহদায়তন ছায়াপথগুলো তাদের জীবদ্দশায় শুরুতেই নতুন নক্ষত্র গঠন বন্ধ করে দেয়, তারা উপবৃত্তাকার দানব ছায়াপথের অনুমানযোগ্য পূর্বপুরুষ । মহাজাগতিক এ বস্তুগুলো পরবর্তীতে নক্ষত্র গঠন করে এবং তাদের নাক্ষত্রিক ভরগুলোকে আরো দ্রুত একত্রিত করেছিল । উত্তেজনাপূর্ণ অনুসন্ধানে দেখা যায়, নতুন পাওয়া ছায়াপথটিকে আলাদা করে তুলেছে এক অসাধারণ বৈশিষ্ট্য উপস্থিতির কারণে । যেখানে রয়েছে রহস্যময়, আকর্ষণীয় এবং সম্পূর্ণ বৃত্তাকার একটি আইনস্টাইন বলয় (Einstein Ring) । যেটি JWST-ER1r নামে পরিচিত । এটি হচ্ছে এক ধরণের মহাজাগতিক আলোক বলয় । আবিষ্কৃত ছায়াপথটি একটি অক্ষিকাচ (Lens) হিসেবে কাজ করে এবং দূরবর্তী উৎস থেকে আলোকে বাঁকিয়ে দেয়, যা পরবর্তীতে একটি বলয় হিসেবে উপস্থিত হয় । এ ঘটনাকে শক্তিশালী মহাকর্ষীয় লেন্সিং (Gravitational lensing) বলা হয় । আলবার্ট আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রকাশের পূর্বে একটি মহাকর্ষীয় বস্তু দ্বারা আলোর অবনমনের ভবিষ্যদ্বাণী করেন । আইনস্টাইন বলয় ব্যাসার্ধের মধ্যে আবদ্ধ মোট ভর হচ্ছে নাক্ষত্রিক এবং অদৃশ্য পদার্থের উপাদান । মহাকর্ষীয় লেন্সিং প্রভাবের কারণে আলো একটি বলয় আকারে বেঁকে গিয়ে ঘটনাটি ঘটায় । এ ছায়াপথে একটি সুস্পষ্ট লাল কেন্দ্র ও একটি নীল চাকতি রয়েছে । চাকতির অংশগুলোই বলয় তৈরি করে । বলয় কেন্দ্রের ব্যাস প্রায় ১.৫৪ আর্কসেকেন্ডে বিস্তৃত । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন যে এটি একটি পটভূমি ছায়াপথ দ্বারা বলয়টি ২.৯৮ এর একটি Photometric redshift এ তৈরি হয়েছে । সমীক্ষায় আরো দেখা গেছে যে ছায়াপথের প্রায় নিখুঁত বৃত্তাকার আকৃতি রয়েছে এবং NIRCam imaging এ কোনো সুস্পষ্ট তারকা-গঠনকারী অঞ্চল, জোয়ার বা স্রোতের লেজ ও অন্যান্য অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়নি । পৃথিবী থেকে প্রায় ১৭ বিলিয়ন আলোকবর্ষেরও বেশি দূরে JWST-ER1g ছায়াপথ অবস্থিত । ধারণা করা হয়, বিস্ময়কর এ নতুন ছায়াপথটির বয়স প্রায় ১.৯ বিলিয়ন বছর এবং এটি প্রতি বছর আমাদের সূর্যের ভরের স্তরে প্রায় চারগুণ মাঝারি গতিতে নতুন তারকা গঠন করে । ছায়াপথের লাল স্থানান্তর (Redshift) হচ্ছে ১.৯৪, ব্যাসার্ধ প্রায় ২১৫০০ আলোকবর্ষ প্রশস্ত একটি অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত এবং ভর প্রায় ৬৫০ বিলিয়ন সৌর ভর যা এটিকে তার আকারের জন্য অদ্ভুতভাবে ঘন একটি ছায়াপথ করে তুলেছে । আদি মহাবিশ্বের গতিশীল এ দৈত্য ছায়াপথের একটি নতুন বিশ্লেষণ পরামর্শ দেয় যে, গুপ্ত বা অদৃশ্য বা অন্ধকার পদার্থ (Dark Matter) নিজের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে । অন্ধকার পদার্থ হচ্ছে পদার্থের একটি কাল্পনিক রূপ যা আলো বা তড়িচ্চুম্বকীয় ক্ষেত্রের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে না বলে মনে হয় । এটি মহাকর্ষীয় প্রভাব দ্বারা আবদ্ধ । ছায়াপথটি মহাবিস্ফোরণের (Big Bang) মাত্র ৩.৪ বিলিয়ন বছর পরে গঠিত হয়েছিল ৷ যার ফলে অদৃশ্য পদার্থ সম্পর্কে জানার একটি দুর্দান্ত সুযোগ এনে দিয়েছে । মোট অনুমানকৃত ভর থেকে দৃশ্যমান নাক্ষত্রিক ভরকে বিয়োগ করে পরিমাপ করা হয় একটি ছায়াপথে কতটুকু অদৃশ্য পদার্থ । পদার্থবিদরা নিশ্চিত যে, একটি অদৃশ্য পদার্থ যা আমাদের মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থের শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ তৈরি করে বলে মনে করা হয় । অদৃশ্য পদার্থের Halo যা নতুন ছায়াপথটিকে ঘিরে থাকে । কয়েক দশকের পর্যবেক্ষণ এবং পরিস্থিতিগত প্রমাণের স্তুপ সত্ত্বেও, অদৃশ্য পদার্থটি এখনো সরাসরি পরীক্ষাগারে সনাক্ত করা যায়নি । এ ছায়াপথ আবিষ্কার দলটি নির্ধারণ করেছে যে অদৃশ্য পদার্থ প্রায় অর্ধেক ভরের ব্যবধানকে ব্যাখ্যা করে এবং লেন্সিং ফলাফল ব্যাখ্যা করার জন্য অতিরিক্ত ভরের প্রয়োজন বলে মনে হয় । ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যার অধ্যাপক এবং নতুন গবেষণার সহ-লেখক Hai-Bo Yu এক বিবৃতিতে বলেছেন: 'আমরা যদি মোট ভর থেকে নাক্ষত্রিক ভরকে বিয়োগ করি, তাহলে আমরা আইনস্টাইন ব্যাসার্ধের মধ্যে অদৃশ্য পদার্থের ভর পাই । অদৃশ্য পদার্থ ভরের মান প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বলে মনে হচ্ছে । এটি বিস্ময়কর! তিনি এবং তার সহকর্মীরা পরামর্শ দিয়েছেন যে, নতুন এ ছায়াপথের অস্বাভাবিক উচ্চ ঘনত্ব বর্তমানে চিন্তার চেয়ে বেশি নক্ষত্র জনসংখ্যা দ্বারা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে ।' একটি অদৃশ্য পদার্থ Halo হচ্ছে অদৃশ্য পদার্থের Halo যা JWST-ER1g ছায়াপথের মতো একটি ছায়াপথকে ঘিরে থাকে । একটি সংকোচন প্রক্রিয়া যার দ্বারা সাধারণ পদার্থের উপাদানগুলো গ্যাস এবং নক্ষত্র তৈরি করে JWST-ER1g ছায়াপথের অদৃশ্য পদার্থের Halo তে ধসে পড়ে ও ঘনীভূত হয়ে মোড়ক বাঁধাই করতে পারে, যার ফলে উচ্চ ঘনত্বের দিকে পরিচালিত হয় । ছায়াপথের কেন্দ্রে সবচেয়ে ঘন অদৃশ্য পদার্থের Halo হচ্ছে মহাকর্ষীয় আঠা যা ঘূর্ণায়মান ছায়াপথগুলোকে উড়তে বাধা দেয় । আমরা এখনো পরিপূর্ণভাবে জানি না, অদৃশ্য পদার্থ আসলে কি? তবে, পর্যবেক্ষণমূলক সূত্র থেকে জানা যায় এটি একটি নতুন ধরনের কণা যার উপস্থিতি শুধুমাত্র সাধারণ পদার্থের সাথে এর মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়া থেকে অনুমান করা যেতে পারে । অদৃশ্য পদার্থ হতে পারে শুধুমাত্র এক ধরনের কণা বা স্বাভাবিক পদার্থের মতো বিভিন্ন ধরনের জটিল বৈচিত্র্য, যা সম্ভবত অদৃশ্য পদার্থের সাথে এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত অজানা শক্তিগুলোর উপস্থিতিতে একচেটিয়া কাজ করে । অধ্যাপক Hai-Bo Yu গত ডিসেম্বর ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে স্ব-মিথস্ক্রিয়া অদৃশ্য পদার্থকে (Self-interacting dark matter) অন্তর্ভুক্ত করে কাঠামো গঠনের আদিখ্যেতার (Simulation) নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে, এ ধরনের স্ব-মিথস্ক্রিয়া নির্দিষ্ট ছায়াপথগুলোতে অত্যন্ত ঘন অদৃশ্য পদার্থের Halo গুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারে । পাশাপাশি অন্যদের মধ্যে বিস্ময়করভাবে কম ঘনত্ব যে, দুটিই প্রচলিত 'ঠান্ডা অদৃশ্য পদার্থ' তত্ত্ব দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না । তিনি বলেন: মহাবিশ্বের প্রথম দিকের ছায়াপথগুলোর আসন্ন অনুসন্ধান থেকে ঐ অদৃশ্য পদার্থের কণা এবং তাদের আচরণ সম্পর্কে এক আশ্চর্যজনক সূত্র প্রকাশ করতে পারে । NASA এর জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি (JWST) মহাবিশ্ব যখন তরুণ ছিল সে সময় গঠিত প্রাচীন ছায়াপথগুলোকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য আমাদেরকে একটি অভূতপূর্ব সুযোগ প্রদান করে । পদার্থবিদরা আশা করেন যে, জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি অদৃশ্য পদার্থের উপর আরো বেশি আলোকপাত করতে পারে । কারণ, এ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের দুর্লভ অবলোহিত চোখ অন্য যে কোনো দূরবীক্ষণ যন্ত্রের চেয়ে সময়ের সাথে আরো জটিল দৃষ্টিপাত করে থাকে । হয়তো, আগামীতে আমরা এ দূরবীক্ষণ যন্ত্র থেকে আরো চমক দেখতে পাবো এবং শীঘ্রই অদৃশ্য পদার্থ সম্পর্কে আরো বিশদ জানতে পারবো । গবেষণা দলটি JWST-ER1g ছায়াপথের ভবিষ্যৎ পর্যবেক্ষণের জন্য অপেক্ষা করছে । এ শক্তিশালী লেন্সিং বস্তু বা ছায়াপথটি অনন্য কারণ এখানে একটি নিখুঁত আইনস্টাইন বলয় রয়েছে যেখান থেকে আমরা আইনস্টাইন ব্যাসার্ধের মধ্যে মোট ভর সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পেতে পারি । এছাড়া কাছাকাছি কোনো ছায়াপথ বা দৃষ্টি রেখা বরাবর কাঠামোগুলো এ ছায়াপথের ভরকে প্রভাবিত করছে কি-না, এ ছায়াপথটি একটি স্তবকের পূর্বপুরুষের কেন্দ্রীয় ছায়াপথ কি-না, এটি ক্রমবর্ধমান Galactic Cluster এর বিকাশে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে কি-না এবং অদৃশ্য পদার্থের বৈশিষ্ট্যগুলো পরীক্ষা করার জন্য এটি হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ । এমনকি, ছায়াপথগুলো কিভাবে পরিবর্তিত হয় এবং বিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ উৎসকে বোঝার উন্নতির চাবিকাঠি হতে পারে । নতুন গবেষণাটি গত ১১ই এপ্রিল ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে The Astrophysical Journal Letters এ প্রকাশিত হয় । গবেষণাটি John Templeton Foundation এবং The U.S. Department of Energy দ্বারা সমর্থিত ছিল । 
তথ্যসূত্র: www.space.com, www.phys.org, www.sciencedaily.com 
 
ছবি: www.greekreporter.com 
Credit: NASA’s Marshall Space Flight Center / Flickr / CC BY-NC 2.0

আমার প্রণয়িনীর চোখ সূর্যের মত নয়

 My mistress’ eyes are nothing like the sun (Sonnet 130)  --------  William Shakespeare , 1564 –1616 My mistress’ eyes are nothing like the ...