Monday, 21 April 2025

প্রাকৃতিক স্পেসারটাইন গারনেট স্ফটিক


পৃথিবীতে অনেক রত্ন ও ধাতু রয়েছে । বিভিন্ন প্রকার দুর্লভ রত্ন খুবই মূল্যবান । রত্নপাথর তার বৈচিত্র্যময় রঙ, অসাধারণ সৌন্দর্য, বিশুদ্ধতা, গুণগত মান ও দুষ্প্রাপ্যতার কারণে কখনো সে অমূল্য হয়ে থাকে । তবে সকল প্রকার স্বচ্ছ, সূক্ষ্ম ও রঙিন পাথরগুলো তাদের বিশুদ্ধতম অবস্থানে থাকলেও শুধুমাত্র ব্যতিক্রম হচ্ছে হীরক । হীরক খুবই কঠিন রত্ন । হীরকের কাঠিন্য ৮ থেকে ১০ । এ বর্ণহীন রত্নটি একটি মাত্র বিশুদ্ধ উপাদান কার্বন থেকে সৃষ্ট । পৃথিবীর বিচিত্র পাথরকে তার রঙ, স্বচ্ছতা এবং কঠোরতা দিয়ে পৃথকীকরণ করা হয় । রত্নপাথর মানুষের কাছে অন্যতম প্রিয় বস্তু । এ রত্নপাথর নিয়ে রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক কিংবদন্তি, এমনকি মর্মান্তিক রক্তপাতের ইতিহাস । একটি প্রাকৃতিক খনিজ স্ফটিক কেটে পালিশ করে রত্নপাথর অলংকার তৈরীতে ব্যবহৃত হয় । বর্তমানে বেশ আকর্ষণীয় কৃত্রিম রত্নপাথর পাওয়া যায় । প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ অলংকার হিসেবে রত্নপাথর ব্যবহার করে আসছে । রত্নপাথর সৌভাগ্যের প্রতীক এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে । এর উজ্জ্বলতা এবং অদ্ভুত রঙ মানুষকে মুগ্ধ ও আকৃষ্ট করে । কিছু রত্নপাথর মানুষকে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী করে তোলে । জ্যোতিষীশাস্ত্রে রাশিফলের ক্ষেত্রে রত্নপাথর খুবই গুরুত্ব বহন করে । মানুষের বিশ্বাস অনুসারে পবিত্র রত্নপাথরকে অত্যন্ত শক্তিশালী বলে মনে করা হয় । মূল্যবান রত্নপাথর একটি দেশের শিল্প, ইতিহাস, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে বিশেষ ভুমিকা রাখে ।

সিলিকন (Silicone) একটি প্রতিক্রিয়াহীন মৌল । এর প্রতীক হচ্ছে Si এবং পারমাণবিক সংখ্যা ১৪ । এটি পৃথিবীর ভূত্বকে অক্সিজেনের পর দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রাপ্ত মৌল । সিলিকন বিশুদ্ধ অবস্থায় প্রকৃতিতে খুব কমই পাওয়া যায় । এটি শক্ত, ভঙ্গুর এবং সহজে চেপ্টা করা যায় । সিলিকন কক্ষ তাপমাত্রায় কঠিন পদার্থ এবং এর গলনাঙ্ক ১৪১৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস ও হিমাঙ্ক ৩২৬৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস । সিলিকনের একটি উল্লেখযোগ্য উপাদান উদ্ভিদের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় এবং বিপাকীয় প্রক্রিয়ার জন্য অপরিহার্য । বিভিন্ন বৈদ্যুতিক ট্রানজিস্টর, সৌর কোষ ও ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট ইত্যাদিতে সিলিকনকে বহুমুখী প্রয়োগ করা হয় । এর পলিমার অণু বা ম্যাক্রোমোলিকিউল অনেক উপাদান তৈরি করে । বেশিরভাগ সিলিকনকে আলাদা না করে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হয় । উৎপাদন, প্রযুক্তিগত এবং শৈল্পিক প্রয়োজনের জন্য নানা ক্ষেত্রে বহুমুখী উপকরণ হিসেবে প্রাকৃতিক (যেমন: গ্রানাইট, নুড়ি এবং গারনেট ) এবং কৃত্রিম (যেমন: পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট, জিওপলিমার সিমেন্ট, সিরামিক এবং কাচ শিল্পে যা পানিতে দ্রবণীয় বর্ণহীন স্বচ্ছ কঠিন পদার্থ বা সাদা গুঁড়ো সোডিয়াম সিলিকেট হিসেবে) উভয় ভাবেই সিলিকন ব্যবহৃত হয় । সিলিকন আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে । সিলিকন মূলত ধুলি, বালি, মহাজাগতিক ধূলিকণা, গ্রহাণুপুঞ্জ, গ্রহসমূহ এবং ধূমকেতুতে সিলিকনের অক্সাইড (সিলিকা) বা সিলিকেট আকারে থাকে । সিলিকেট (Silicate) হচ্ছে সিলিকন এবং অক্সিজেন সমন্বিত বহু-পরমাণু আয়ন বা আণবিক আয়ন (পলিঅ্যাটমিক আয়ন যেমন: অর্থোসিলিকেট, মেটাসিলিকেট, পাইরোসিলিকেট) পরিবারের যেকোনো সদস্য । এটি সিলিকন এবং অক্সিজেনের সাথে মিলিত ধাতু দিয়ে তৈরি একটি প্রাকৃতিক খনিজ । সিলিকেট সাধারণত রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকে বলেই খনিজ হিসেবে পাওয়া যায় । সিলিকেট মূলত শিলা, বালি, কাদামাটি, মাটি, গ্রানাইট, ইট, সিমেন্ট, সিরামিক এবং কাচের মধ্যে পাওয়া যায় । সিলিকেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ সিমেন্ট, সিরামিক এবং কাচ শিল্পগুলো তাদের রাসায়নিক গঠনের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয় । সিলিকেট নামটি কখনো কখনো সিলিকন ধারণকারী যেকোনো আয়নের জন্যও ব্যবহৃত হয় । 

তামড়ি পাথর (Garnet stone) হচ্ছে সিলিকেট খনিজ পদার্থের একটি দল যেটি ব্রোঞ্জ যুগ থেকে রত্নপাথর হিসেবে এবং মসৃণ-সুন্দর কাজ করার জন্য ঘষে তুলে ফেলতে সক্ষম এমন পদার্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে । গারনেট অর্থ গাঢ় লাল । এটি মূলত স্বচ্ছ ও গাঢ় লাল রঙের একটি প্রাকৃতিক উপ-রত্নপাথর । ভারতীয় সাহিত্যে হ্যাসোনাইট গারনেটকে গোমেদ বলা হয় । গোমেদ হচ্ছে জটিল সিলিকেট খনিজ । বিভিন্ন শিলায় নানা জাতের গারনেট পাওয়া যায় । গারনেটের বিভিন্ন রঙ ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে । গারনেট খনিজের নানা রঙ যেমন: কমলা, হলুদ, বাদামী, বেগুনি, গোলাপী, কালো এবং বর্ণহীন । গারনেটের একটি আইসোমেট্রিক (ঘনক) স্ফটিক কাঠামো রয়েছে । দানাদার, পূঞ্জীভূত এবং পিণ্ড আকারে এটি পাওয়া যায় । গারনেট কণা হিসেবেও পাওয়া যেতে পারে । গারনেটের স্ফটিক বা কণা সূর্যের আলোতে দারুণ চকচক করে । রত্নকার এটিকে পালিশ করলে বেশ দীপ্তিমান হয়ে ওঠে । প্রকৃতিতে সচরাচর নিষ্প্রভ স্ফটিক পাওয়া যায় । কেনিয়া, তানজানিয়া, রাশিয়া, নামিবিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারত এবং মাদাগাস্কার প্রভৃতি দেশে এটি পাও‌য়া যায় । গারনেটের কাঠিন্য হচ্ছে ৬.৫ থেকে ৭.৫, আপেক্ষিক গুরুত্ব ৩.৫ থেকে ৪.২ এবং প্রতিসরাঙ্ক ১.৭২ থেকে ১.৯৪ । গারনেট মাঝারি ধরণের তাপ সহ্য করতে পারে । কিন্তু কাটার ক্ষেত্রে বা বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের সময় এটি চরম তাপমাত্রার সংস্পর্শে এলে ফেটে যেতে পারে কিংবা তার উজ্জ্বলতা হারাতে পারে । গারনেটের রঙ গোলাপী-লাল, গাঢ় লাল, খয়েরি, হালকা হলুদ, কালো, হালকা সবুজ, উজ্জ্বল সবুজ অথবা বর্ণহীন । গারনেট দলটি রঙের বর্ণালীকে বিস্তৃত করে এবং গাঢ় লাল ও সূক্ষ্ম কমলা থেকে শুরু করে হলুদ, সবুজ, বেগুনি, এমনকি বিরল নীল রঙে পরিণত হয় । কমলা রঙের গারনেট সোডিয়াম সমৃদ্ধ পেগমাটাইট থেকে উৎপন্ন হয় । শক্ত কাঠ, কাচ, চামড়া, শক্ত রাবার, বিভিন্ন প্রকার ধাতব দ্রব্য, সেলুলয়েড জাতীয় দ্রব্যসামগ্রী এবং শিরিষ কাগজ বা কাপড় হিসেবে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় । গারনেটকে আর্থ্রাইটিস রোগ, ভ্যারিকোজ শিরা এবং পিঠের ব্যথার জন্য সহায়ক বলে মনে করা হয় ।

স্পেসারটাইন (Spessartine) [Mn2+3Al2(SiO4)3] হচ্ছে একটি নিসোসিলিকেট, ম্যাঙ্গানিজ অ্যালুমিনিয়াম গারনেট প্রজাতি । এ খনিজটিকে কখনো কখনো ভুল করে গাঢ় রঙের আগ্নেয় শিলা ল্যাম্প্রোফায়ার বা স্পেসারটাইট বলা হয় । নেসোসিলিকেট বা সিলিকেট খনিজ হচ্ছে একটি অজৈব যৌগ যেটি শিলা-গঠনকারী খনিজ যা সিলিকেট দল দিয়ে তৈরি । এগুলো খনিজ পদার্থের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণী যা পৃথিবীর ভূত্বকের প্রায় ৯০ শতাংশ (সিলিকেট যৌগ দ্বারা) তৈরি করে । সিলিকা এর স্ফটিক রূপগুলোকে (সিলিকন ডাই অক্সাইড বা SiO2 ) সাধারণত টেকটোসিলিকেট হিসেবে বিবেচনা করা হয় । সিলিকা প্রকৃতিতে খনিজ কোয়ার্টজ এবং এর বহুরূপ হিসেবে পাওয়া যায় । পৃথিবীতে কোটি কোটি বছর ধরে ভূত্বক গঠন এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার ফলে আরো বিস্তৃত পরিসরে বিভিন্ন ধরণের সিলিকেট খনিজ পদার্থের সংমিশ্রণ ঘটে । এ প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে রয়েছে আংশিক গলন, স্ফটিকীকরণ, ভগ্নাংশকরণ, রূপান্তর, আবহাওয়া এবং ডায়াজেনেসিস । জীবন্ত প্রাণীরাও এ ভূতাত্ত্বিক চক্রে অবদান রাখে । উদাহরণস্বরূপ, ডায়াটম নামে পরিচিত এক ধরণের প্লাঙ্কটন সমুদ্রের জল থেকে নিষ্কাশিত সিলিকা থেকে তাদের বহিঃকঙ্কাল (ফ্রাস্টুলস) তৈরি করে । মৃত ডায়াটমের ফ্রাস্টুলস গভীর সমুদ্রের পলি এবং ডায়াটোমাসিয়াস পৃথিবীর একটি প্রধান উপাদান । স্পেসারটাইন নামটি জার্মানির দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত বাভারিয়া রাজ্যের অ্যাসচাফেনবার্গ শহরের পূর্বে স্পেসার্ট পর্বতমালা থেকে উদ্ভূত, যেখানে এটি প্রথম আবিষ্কৃত হয়েছিল এবং এখান থেকেই এ খনিজটির নামকরণ হয়েছে । রঙ ও স্বচ্ছতার জন্য এটি একটি আধা-মূল্যবান রত্ন বা স্ফটিক । স্পেসারটাইন বিরল হওয়ার কারণে গয়না তৈরিতে খুব কমই ব্যবহৃত হয় । এটি সাধারণত গ্রানাইট, ফাইলাইট, ফেলসিক লাভা, পেগমেটাইট শিরা এবং রূপান্তরিত শিলাতে সৃষ্টি হয় । অস্ট্রেলিয়া, মায়ানমার, ভারত, আফগানিস্তান, ইসরায়েল, মাদাগাস্কার, নামিবিয়া, নাইজেরিয়া, মোজাম্বিক, তানজানিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্পেসারটাইন পাওয়া যায় । মাদাগাস্কারের সাহাতানি উপত্যকার উচ্চভূমিতে অবস্থিত শিলাস্তরে এবং দক্ষিণ মাদাগাস্কারের মায়েভাতানা অঞ্চলের পলিমাটিতে কমলা-হলুদ রঙের স্পেসারটাইন পাওয়া যায়, যেটিকে ম্যান্ডারিন গারনেট বলে । স্পেসারটাইন গারনেট হচ্ছে একটি উজ্জ্বল কমলা থেকে লালচে-কমলা রঙের রত্নপাথর যেটি তার অনন্য রঙ এবং কঠোরতার জন্য পরিচিত । এটি একটি ম্যাঙ্গানিজ অ্যালুমিনিয়াম গারনেট, যার অর্থ হচ্ছে এটির রঙ ম্যাঙ্গানিজের উপস্থিতি থেকে উদ্ভূত । উজ্জ্বল কমলা স্পেসারটাইনগুলোকে প্রায়শই 'ম্যান্ডারিন গারনেট' বলা হয় । যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো এবং মেইন রাজ্যের রাইওলাইট আগ্নেয়শিলায় বেগুনি-লাল স্পেসারটাইন পাওয়া যায় । স্পেসারটাইন খনিজ পদার্থটি গারনেট প্রজাতির অ্যালম্যান্ডিনের সাথে মিলিত হয়ে এটির রঙ ফ্যাকাশে কমলা হলুদ থেকে শুরু করে প্রায় বিশুদ্ধ হয়ে কমলা এবং গাঢ় লাল হয় । উজ্জ্বল কমলা রঙ থেকে লালচে-কমলা রঙ এটিকে সাধারণ গারনেট জাত থেকে আলাদা করে এক প্রাণবন্ত ও স্বতন্ত্র রত্নপাথর করে তোলে । স্পেসারটাইন একটি অবিচ্ছিন্ন কঠিন দ্রবণ সিরিজ গঠন করে । এ সিরিজের সুগঠিত স্ফটিকগুলো খুব গাঢ়-লাল থেকে উজ্জ্বল হলুদ-কমলা রঙের হয় যা বুলগেরিয়ার কার্দজালি প্রদেশের রোডোপ পর্বতমালার ল্যাটিঙ্কায় পাওয়া গেছে । অন্যান্য গারনেটের মতো স্পেসারটাইন সর্বদা অন্য প্রজাতির সাথে মিশ্রিত হয় । উচ্চ স্পেসারটাইনযুক্ত রত্নগুলো হালকা কমলা রঙের দিকে ঝুঁকে, অন্যদিকে অ্যালম্যান্ডিনের প্রাদুর্ভাব লাল বা বাদামী রঙের সৃষ্টি করে । রত্নপাথরের সৌন্দর্য, নান্দনিকতা এবং বৈশিষ্ট্যের জন্য অনেক রত্নপ্রেমী বিশ্বাস করেন যে এটি উদ্দীপনা, সৃজনশীলতা, মানসিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, কর্কটরোগ থেকে মুক্তি, রক্ত পরিস্কার, সুস্থতা, অর্থনৈতিক মুক্তি, দুঃখ-দুর্দশা হ্রাস এবং যৌক্তিক চিন্তাভাবনাকে উৎসাহিত করে সাহস ও উদ্ভাবনী সমাধানের মাধ্যমে এক প্রাণবন্ত জীবনের জন্য চ্যালেঞ্জগুলোকে কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করে ।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, ব্রিটানিকা, আন্তর্জাল । 

ছবি: Amazing Geologist (Image by: Masha Milshina CC) [চীন থেকে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক স্পেসারটাইন গারনেট স্ফটিক] । 



Saturday, 19 April 2025

ভিনগ্রহে প্রাণের সম্ভাবনা


আমাদের সৌরজগতের বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে মহাকাশ বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের অন্ত নেই । এ অপার মহাবিশ্বে আমরা কি একা? যদিও সৌরজগতের পৃথিবী গ্রহের চাঁদ, লোহিত মঙ্গল, প্রেম ও সৌন্দর্যের দেবী শুক্র এবং সর্ববৃহৎ গ্যাস দানব বৃহস্পতি গ্রহের বরফাচ্ছাদিত চাঁদে জীবন বা প্রাণের জন্য অনুকূল পরিবেশ ও লক্ষণ রয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন যাবৎ বলিষ্ঠ দাবি করে আসছেন । পৃথিবী ছাড়া মহাবিশ্বের অন্য কোনো প্রান্তে কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে কি-না তা খুঁজতে গিয়েই সৌরজগতের বাইরে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৮০০টি বহিঃসৌর গ্রহ বা ভিনগ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে । সৌরজগতের বাইরে বিশাল মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা এমন গ্রহকে বহিঃসৌর গ্রহ (Exoplanet) বলে, যেটি পৃথিবীর মতোই অন্য কোনো একটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে । এ সকল বহিঃসৌর গ্রহের কোনোটিতে জীবাণু বা অণুজীবের বসবাসযোগ্য মহাসাগর রয়েছে যেখানে হাইড্রোজেন সমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল বিদ্যমান । কিন্ত, বহিঃসৌর গ্রহগুলোর বেশিরভাগেই প্রাণ বা জীবন থাকা একেবারেই অসম্ভব । যেহেতু এ গ্রহগুলো তাদের স্বাগতিক নক্ষত্রের এতোই কাছাকাছি অবস্থিত যে, সেখানে চরম তাপমাত্রার কারণে জীবনের উদ্ভব মোটেই সম্ভব নয় । তবে, স্বাগতিক নক্ষত্রকে কেন্দ্র করা প্রদক্ষিণরত কোনো কোনো দূরবর্তী গ্রহে তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ার কারণে সেখানে প্রাণ বা জীবন উদ্ভবের সম্ভাবনা অনেক বেশি রয়েছে ।
সম্প্রতি সৌরজগতের বাইরে একটি বহিঃসৌর গ্রহে প্রাণ থাকার সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রমাণ মহাকাশ বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন । নাসা এর জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে আমাদের সৌরজগৎ থেকে প্রায় ১২৪ আলোকবর্ষ (৩৮ পারসেক) দূরে K2-18b নামক বহিঃসৌর গ্রহের বায়ুমণ্ডলে প্রাণের সম্ভাব্য রাসায়নিক চিহ্ন ডাইমিথাইল সালফাইড এবং ডাইমিথাইল ডিসালফাইড যৌগের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে যেগুলো পৃথিবীতে শুধুমাত্র জীবিত প্রাণী বা উদ্ভিদ থেকেই জন্ম নেয় । সাধারণত সামুদ্রিক ফাইটোপ্লাঙ্কটন বা উদ্ভিদ প্লাঙ্কটন হচ্ছে অটোট্রফিক (স্ব-ভোজী) অণুজীব বা প্রাকৃতিকভাবে তৈরি অতিক্ষুদ্র সবুজ কণা বা জীবকণা যেটি মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় (যেমন: শেওলা, নষ্টক, এনাবিনা ইত্যাদি) যেগুলো পৃথিবীতে পাওয়া যায় । আশ্চর্যের বিষয় যে, এ রাসায়নিক যৌগ পৃথিবীর তুলনায় ২০ গুণ বেশি পরিমাণে সেখানে পাওয়া গেছে । মহাজাগতিক বিস্ময়ের অধিকারী K2-18b বা EPIC 201912552b বহিঃসৌর গ্রহটি গ্যাসীয় বরফ দৈত্য উপ-নেপচুন গ্রহের মতোই । এটি সিংহ রাশির নক্ষত্রমণ্ডলে (Leo constellation) অবস্থিত । গ্রহটি পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ৯ গুণ ভারী এবং ২.৬ গুণ বড় । জলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্যের চেয়ে ছোট, কম আলোকিত, শীতল এবং লাল বামন K2-18 নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে প্রতি ৩৩ দিনে গ্রহটি পরিভ্রমণ করছে । নতুন আবিষ্কৃত গ্রহটি স্বাগতিক নক্ষত্র থেকে বাসযোগ্য অঞ্চলের (Habitable zone) মধ্যে অবস্থিত, ফলে সেই পরিবেশে প্রাণ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে যেখানে সূর্য থেকে পৃথিবী যে পরিমাণ আলো পায় সেই পরিমাণ আলো এ গ্রহটিও পেয়ে থাকে । এছাড়া, ঐ নক্ষত্রের কক্ষপথের ভিতরে K2-18c নামে আরো একটি গ্রহ রয়েছে । উল্লেখ্য যে, বিজ্ঞানীরা ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে হাবল মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে K2-18b গ্রহের বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের সন্ধান পেয়েছিলেন এবং তখন থেকেই সৌরজগতের বাইরে এ বহিঃসৌর গ্রহটিকে সবচেয়ে বাসযোগ্য গ্রহ হিসেবে বিবেচনা করা হয় । পরবর্তীতে দেখা যায় যে, গ্রহটিতে মূলত মিথেন গ্যাসের একটি আবরণ ছিল । যদিও বিজ্ঞানীরা মনে করেন, K2-18b হচ্ছে একটি হাইসিয়ান জগৎ । এ গ্রহের হাইড্রোজেনপূর্ণ বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে মিথেন ও কার্বন ডাই অক্সাইড রয়েছে এবং অ্যামোনিয়া গ্যাস পরিমাণে কম থাকায় সেখানে মহাসাগর থাকতে পারে যেখানে রয়েছে এক প্রকার আণুবীক্ষণিক এককোষী অণুজীব বা জীবাণু । এ মহাসাগরই হচ্ছে জীবনের মূল উপাদান । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, আবিষ্কৃত গ্রহের বায়ুমণ্ডলে এ সকল যৌগের উপস্থিতির কারণে সেখানে প্রাণ থাকার জোরালো ইঙ্গিত দিচ্ছে । সুতরাং, সৌরজগতের বাইরে প্রাণের সন্ধান এটি একটি যুগান্তকারী অগ্রগতি বলে বিবেচিত হচ্ছে ।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, আনন্দবাজার, প্রথম আলো, উইকিপিডিয়া ।

Thursday, 10 April 2025

বৃহস্পতি গ্রহের আইও চাঁদ


জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের লালিত বাসনা যে, সূর্য থেকে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন মাইল দূরে থাকা বৃহস্পতি গ্রহ, তার হীমশীতল চাঁদে নোনা জলের সমুদ্র, প্রাণের অস্তিত্ব এবং  বসবাসযোগ্যতার লক্ষণগুলোকে অন্বেষণ করা ৷ এছাড়া, বিজ্ঞানীদের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে পৃথিবীর চাঁদে প্রাণের অস্তিত্বের পাশাপাশি বাসযোগ্যতার বিষয়টি ৷ আমরা ছোট একটি পাথুরে গ্রহ পৃথিবীতে বাস করি । এ বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে বিদ্যমান দুই ট্রিলিয়ন ছায়াপথের মধ্যে একটি ছায়াপথ হচ্ছে আমাদের নিজস্ব ছায়াপথ আকাশগঙ্গা । আকাশগঙ্গায় প্রায় ৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে তার মধ্যে একটি নক্ষত্র সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে পৃথিবী । প্রতিটি ছায়াপথে শত শত কোটি নক্ষত্র এবং অসংখ্য গ্রহ-উপগ্রহ রয়েছে ট্রিলিয়ন কিলোমিটার দূরে । আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রের খুব কাছের নক্ষত্রটি হচ্ছে জলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্য ৷ এ সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে ৮টি গ্রহ, ৫টি বামন গ্রহ (যেমন: Pluto, Haumea, Eris, Makemake এবং Ceres), অগণিত গ্রহাণুপুঞ্জ, উল্কা এবং ধূমকেতু ইত্যাদি ৷ সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহ বৃহস্পতি এবং গ্রহদের রাজা । একজন প্রাচীন রোমান দেবতার নামে এর নামকরণ হয়েছে । সূর্য থেকে পঞ্চম দূরত্বে ৭৭.৮৪ কোটি কিলোমিটার দূরে বৃহস্পতির অবস্থান । পৃথিবী থেকে বৃহস্পতির দূরত্ব প্রায় ৮০ কোটি কিলোমিটার । বৃহস্পতি একটি গ্যাস দৈত্য গ্রহ ৷ কঠিন পদার্থের পরিবর্তে গ্যাস এবং তরল দ্বারা এটি গঠিত । বৃহস্পতির উপরিতল সম্পূর্ণ বরফে ঢাকা । তাই গ্যাসীয় পদার্থ জমাট বেঁধে এ বৃহৎ দৈত্যাকার গ্রহটি তৈরি হয়েছে । বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, ৪৬৫ কোটি বছর পূর্বে সূর্য জন্ম নেয়ার পরপরই গ্রহগুলো আবির্ভূত হয়েছিল । এদের মধ্যে সর্বপ্রথমে জন্ম নেয় বৃহস্পতি গ্রহ ৷ বৃহস্পতির ভর সৌরজগতের অন্য সকল গ্রহগুলোর ভরকে একত্রিত করলে তার থেকে আড়াই গুণ বেশি (ভর ১.৯০ * ১০২৭ কিঃগ্রাঃ) । এতোই বিশাল যে সূর্যের সাথে এর বেরিকেন্দ্র (Barycentre) সূর্যের কেন্দ্র থেকে ১.০৬৮ সৌর ব্যাসার্ধে সূর্যের পৃষ্ঠের উপরে অবস্থিত । কিন্তু সূর্যের ভরের ১০৪৭ ভাগের এক ভাগ থেকে সামান্য কম । অর্থাৎ বৃহস্পতির ভর আর একটু বেশি হলেই এর আভ্যন্তরীণ মহাকর্ষ হাইড্রোজেন পরমাণুগুলোকে নিষ্ক্রিয় গ্যাস হিলিয়ামে পরিণত করার পাশাপাশি ফোটন আলোক কণা উৎপাদন করতো । তার মানে, বৃহস্পতি একটি নক্ষত্রে পরিণত হতো । বৃহস্পতি গ্রহটি পৃথিবীর চেয়ে অনেক বড় এবং যথেষ্ট কম ঘন । বৃহস্পতি গ্রহের আয়তন পৃথিবীর ১৩২১ গুণ কিন্তু ভর মাত্র ৩১৮ গুণ । এ বৃহত্তম গ্রহটির ব্যাস নিরক্ষরেখা বা বিষুবরেখা বরাবর ১৪২৯৮৪ কিলোমিটার (৮৮৮৪৬ মাইল) । বৃহস্পতির গড় ঘনত্ব প্রতি ঘনসেন্টিমিটারে ১.৩২৬ গ্রাম, যা বৃহৎ গ্যাসীয় গ্রহগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ । সৌরজগতের গ্যাসীয় দানব নেপচুন গ্রহের ঘনত্ব সর্বোচ্চ । বৃহস্পতি হচ্ছে পৃথিবীর চাঁদ এবং শুক্র গ্রহের পরেই পৃথিবী থেকে রাতের আকাশে দৃশ্যমান মহাজাগতিক তৃতীয় উজ্জ্বল প্রাকৃতিক বস্তু ৷ গ্যাস দানব বৃহস্পতি এতোটাই বিশাল যে সৌরজগতের অন্য সমস্ত গ্রহগুলো এর ভিতরে সুন্দরভাবে মানানসই বা জায়গা করে নিতে পারে । এটি প্রায় ১৩০০ টিরও বেশি পৃথিবীর সমান । বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুন গ্রহ চারটিকে একত্রে জোভিয়ান গ্রহ বলে । বৃহস্পতি গ্রহকে প্রদক্ষিণকারী ৯৫টি উপগ্রহ বা চাঁদের মধ্যে চারটি হচ্ছে গ্যালিলীয় চাঁদ যেমন: ইউরোপা (Europa), ক্যালিস্টো (Callisto), আইও (Io) এবং গ্যানিমিড (Ganymede) । এ চাঁদগুলোর কোনোটি তার বরফ পৃষ্ঠের নিচে গভীর তরল জলের মহাসাগরকে আশ্রয় দেয়, যেখানে সামুদ্রিক প্রাণ থাকতে পারে । ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ এবং দার্শনিক গ্যালিলিও গ্যালিলি ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম এ চারটি চাঁদকে আবিষ্কার করেন বলেই তার নামানুসারে চাঁদগুলোর নামকরণ হয় গ্যালিলীয় চাঁদ । 

বৃহস্পতি গ্রহের চারটি গ্যালিলিয়ান চাঁদের মধ্যে সবচেয়ে ভেতরের এবং দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম চাঁদ হচ্ছে আইও । সম্ভবত একই বছর জার্মান জ্যোতির্বিদ সাইমন মারিয়াস স্বাধীনভাবে পুনরায় আইও চাঁদটি আবিষ্কার করেন এবং গ্রীক পৌরাণিক চরিত্র ও কিংবদন্তী আইও এর নামে এ চাঁদটির তিনি নামকরণ করেছিলেন । আইও হচ্ছেন প্রাচীন গ্রীক ধর্মে হেরার একজন ধর্মযাজিকা যিনি দেবরাজ জিউসের প্রেমিকাদের একজন । আইও চাঁদ পৃথিবীর চাঁদের চেয়ে সামান্য বড় । এর গড় ব্যাসার্ধ ১৮২১.৩ কিলোমিটার ( ১১৩১.৭ মাইল) । ভর ৯১২৮.৪০ কেজি । আইও চাঁদের গড় ঘনত্ব প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে প্রায় ৩.৫২ গ্রাম যা শিলার বৈশিষ্ট্য, কিন্তু বরফের নয় । আইও চাঁদ হচ্ছে সৌরজগতের চতুর্থ বৃহত্তম প্রাকৃতিক চাঁদ এবং এর সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব ও শক্তিশালী পৃষ্ঠের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি রয়েছে । আইও চাঁদের উচ্চ ঘনত্ব এবং সৌরজগতের যেকোনো পরিচিত বস্তুর তুলনায় এ চাঁদে সর্বনিম্ন পরিমাণে জল রয়েছে । যদিও জলীয় বরফ বা জলীয় খনিজ পদার্থের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ এ চাঁদের গিশ বার মনস পর্বতের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে শনাক্ত করা হয়েছে । জলের এ স্বল্পতা বা অভাবে সম্ভবত সৌরজগতের বিবর্তনের প্রথম দিকে বৃহস্পতি গ্রহ যথেষ্ট উত্তপ্ত ছিল যা আইও চাঁদের আশেপাশের জলের মতো উদ্বায়ী পদার্থগুলোকে তাড়িয়ে দিয়ে থাকতে পারে । তবে হয়তো, এতোটা উত্তপ্ত ছিল না যে চাঁদটি আরো দূরে যেতে পারে । আইও চাঁদ বৃহস্পতির চারপাশে সমান্তরালভাবে ঘুরছে (১.৭৬৯ পৃথিবী দিন) এবং যার একটি মুখ সর্বদা বৃহস্পতির দিকে থাকে । বৃহস্পতির কেন্দ্র থেকে ৪২১৭০০ কিলোমিটার (২৬২০০০ মাইল) এবং মেঘের চূড়া থেকে ৩৫০০০০ কিলোমিটার (২১৭০০০ মাইল) দূরে আইও চাঁদ বৃহস্পতি গ্রহকে প্রদক্ষিণ করে । বৃহস্পতি গ্রহের চারপাশে একটি কক্ষপথ সম্পূর্ণ করতে আইও চাঁদের প্রায় ৪২.৫ ঘন্টা (১.৭৭ দিন) সময় লাগে । আইও চাঁদ এবং জোভিয়ান চাঁদ ইউরোপার মধ্যে মহাকর্ষীয় অনুরণনের কারণে কক্ষপথটি কিছুটা অদ্ভুত বা বিকেন্দ্রীকরণ হতে বাধ্য হয় । এ জোরপূর্বক অদ্ভুততা বা খামখেয়ালীপনার কারণে বৃহস্পতির শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মাধ্যমে আইও চাঁদের তীব্র জোয়ারের টানে তাপ উৎপন্ন হয় যা চাঁদের ক্রমাগত নমনের কারণে অভ্যন্তরীণ ঘর্ষণ থেকে ঘটে এবং যেটি আগ্নেয়গিরিগুলোকে শক্তি প্রদানকারী শক্তির উৎস । বৃহস্পতির চাঁদ আইও এর বায়ুমণ্ডল অত্যন্ত পাতলা এবং প্রধানত সালফার ডাই অক্সাইড, সালফার মনোক্সাইড, সোডিয়াম ক্লোরাইড, পারমাণবিক সালফার ও অক্সিজেনসহ গৌণ উপাদান রয়েছে । আইও চাঁদ গ্রহনকালে মেরুপ্রভার (Aurora) মতো আভা প্রকাশ করে । পৃথিবীর মতোই এটি বায়ুমণ্ডলে কণা বিকিরণের আঘাতের কারণে ঘটে থাকে । যদিও এ ক্ষেত্রে চার্জিত কণাগুলো সৌর বায়ুর পরিবর্তে বৃহস্পতির চৌম্বক ক্ষেত্র থেকে আসে । মেরুপ্রভা সাধারণত গ্রহের চৌম্বক মেরুর কাছে ঘটে । তবে আইও চাঁদের মেরুপ্রভাগুলো এর বিষুবরেখার কাছে সবচেয়ে উজ্জ্বল রূপ ধারণ করে । আইও চাঁদের নিজস্ব কোনো অন্তর্নিহিত চৌম্বক ক্ষেত্র নেই । তাই, আইও চাঁদের কাছাকাছি বৃহস্পতির চৌম্বকক্ষেত্র বরাবর ভ্রমণকারী ইলেকট্রনগুলো সরাসরি আইও চাঁদের বায়ুমণ্ডলকে প্রভাবিত করে । আর এ ইলেকট্রনগুলোই চাঁদের বায়ুমণ্ডলের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, যার ফলে সবচেয়ে উজ্জ্বল অনন্য সুন্দর মেরুপ্রভা তৈরি হয় । আইও চাঁদের পৃষ্ঠে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মুখ, গভীর অংশ এবং লাভার ঘনীভূত প্রবাহ রয়েছে । ৫০০ কিলোমিটারের (৩০০ মাইল) বেশি দৈর্ঘ্যের অসংখ্য বিস্তৃত লাভা প্রবাহও পৃষ্ঠে দেখা যায় । আইও চাঁদের পৃষ্ঠের বেশিরভাগ অংশই সিলিকেট (যেমন অর্থোপাইরক্সিন), সালফার এবং সালফার ডাই অক্সাইডের দ্বারা হিমশীতল আবরণসহ বিস্তৃত সমভূমি গঠিত । মূলত এ সকল যৌগের জমা থাকার কারণে চাঁদটি চমৎকার, প্রাণবন্ত, উজ্জ্বল ও রঙিন ভূদৃশ্যে আবির্ভূত হয় । আইও চাঁদের আগ্নেয়গিরিময়তা অনেক অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী । চাঁদের আগ্নেয়গিরির শিখা এবং লাভা প্রবাহ পৃষ্ঠের উপর বিশাল পরিবর্তন আনে এবং পৃষ্ঠকে হলুদ, লাল, সাদা, কালো এবং সবুজ রঙের বিভিন্ন সূক্ষ্ম ছায়ায় রঙ করে, যা মূলত অ্যালোট্রপ (Allotrope) এবং সালফার যৌগের কারণে । ভূতাত্ত্বিকভাবে চাঁদের তরুণ পৃষ্ঠে আঘাতজনিত গর্তের কোনো প্রমাণ নেই । এখানে আগ্নেয়গিরির প্রবাহ এতোটাই বিস্তৃত এবং ঘন ঘন যে, তারা প্রতি কয়েক হাজার বছরে সমগ্র চাঁদটিকে কয়েক মিটার গভীরতায় পুনরুজ্জীবিত করছে । ভূত্বকের নিচে গলিত শিলার একটি স্তর এবং প্রায় ১৮০০ কিলোমিটার (১১১০ মাইল) ব্যাসের গলিত লোহা ও লোহা সালফাইডের একটি কেন্দ্রস্থল রয়েছে যার ব্যাস প্রায় ১৮০০ কিলোমিটার (১১১০ মাইল), ফলে এটি সিলিকেট শিলা দ্বারা গঠিত । আইও চাঁদ ভূতাত্ত্বিকভাবে সৌরজগতের সবচেয়ে আগ্নেয়গিরির দিক থেকে সক্রিয়, যেখানে শত শত আগ্নেয়গিরি রয়েছে । এ চরম ভূতাত্ত্বিক কার্যকলাপটি বৃহস্পতি এবং অন্যান্য গ্যালিলিয়ান চাঁদ ইউরোপা, গ্যানিমেড এবং ক্যালিস্টোর মধ্যে আকর্ষণ বা টানের কারণে আইও চাঁদের অভ্যন্তরে সৃষ্ট ঘর্ষণ থেকে জোয়ারের উত্তাপের ফলে এটি ঘটে থাকে । বেশ কয়েকটি আগ্নেয়গিরি পৃষ্ঠ থেকে ৫০০ কিলোমিটার (৩০০ মাইল) পর্যন্ত সালফার এবং সালফার ডাই অক্সাইডের শিখা তৈরি করে । কিছু শৃঙ্গ পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থান মাউন্ট এভারেস্টের চেয়েও উঁচু । আগ্নেয়গিরি দ্বারা উৎপাদিত উপকরণগুলো আইও চাঁদের পাতলা ও বিক্ষিপ্ত বায়ুমণ্ডল তৈরি করে এবং উপাদানগুলো বৃহস্পতির বিস্তৃত চৌম্বকমণ্ডলের প্রকৃতি ও বিকিরণ স্তরকেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে । আইও চাঁদের আগ্নেয়গিরির নির্গমন বৃহস্পতির চারপাশে একটি বৃহৎ ও তীব্র প্লাজমা টরাস তৈরি করে, যা চাঁদে এবং তার চারপাশে এক প্রতিকূল বিকিরণ পরিবেশের সৃষ্টি হয় । কয়েক কিলোমিটার উঁচু কিছু আগ্নেয়গিরির ফোয়ারা থেকে লাভা উদ্গত হয় । আইও চাঁদের লাভা হ্রদ লোকি প্যাটেরা যা প্রায় ৭৭০০ বর্গমাইল (২০০০০ বর্গকিলোমিটার) জুড়ে বিস্তৃত । এ জোভিয়ান চাঁদে আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ এতোটাই তীব্র যে, এটি ধূমকেতুর চেয়ে দ্রুত নতুন কিছু উপাদান জমার মাধ্যমে আইও চাঁদের আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মুখকে পুনরুজ্জীবিত করে এবং গ্রহাণুগুলো এতে বড় বড় গর্ত তৈরি করতে পারে । ভয়েজার ১ মহাকাশযান ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের ৫ই মার্চ যখন আইও চাঁদের পাশ দিয়ে উড়ে যায় তখন নয়টি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি পর্যবেক্ষণ করে যা কয়েকশ কিলোমিটার দূরে সূক্ষ্ম কণার ঝর্ণা নির্গত করে । পরবর্তীতে প্রায় ২০ বছর পরে গ্যালিলিও মহাকাশযানের উচ্চতর রেজ্যুলিউশনের পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে আইও চাঁদে প্রায় ৩০০টি আগ্নেয়গিরি সক্রিয় থাকতে পারে । আগ্নেয়গিরি থেকে যে সিলিকেট লাভা নির্গত হয় তা অত্যন্ত উত্তপ্ত (প্রায় ১৯০০ কেলভিন বা ৩০০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ১৬৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এবং তিন বিলিয়ন বছরেরও বেশি সময় আগে পৃথিবীতে উৎপন্ন লাভার মতো । চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে নির্গত আগ্নেয়গিরির উপাদানগুলো চার্জযুক্ত কণার একটি টরয়েডাল মেঘ তৈরি করে (Doughnut-shaped toroidal cloud) যা আইও চাঁদের কক্ষপথ অনুসরণ করে এবং বৃহস্পতির চারপাশের পথের কিছু অংশ আবৃত করে । আগ্নেয়গিরির নির্গত পদার্থে অক্সিজেন, সোডিয়াম, সালফার, হাইড্রোজেন এবং পটাসিয়াম থাকে । আইও চাঁদ কক্ষপথ ভ্রমণ করে বৃহস্পতির চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় এটি সর্পিল ইলেকট্রনের প্রবাহ নল (Flux tube) বরাবর প্রায় পাঁচ মিলিয়ন অ্যাম্পিয়ার বৈদ্যুতিক প্রবাহ উৎপন্ন করে যা আইও চাঁদকে বিশাল গ্রহ বৃহস্পতির সাথে সংযুক্ত করে । বৈদ্যুতিক প্রবাহটি বিশ্বের সমস্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট শক্তির ছয় গুণ বেশি অগ্ন্যুৎপাতের উৎস । এ বৈদ্যুতিক প্রবাহটি বৃহস্পতির মেরু অঞ্চলে আইও পদচিহ্ন নামে পরিচিত একটি অরোরাল আভা তৈরি করে এবং সেইসাথে আইও চাঁদের বায়ুমণ্ডলেও দৃষ্টিনন্দন মেরুপ্রভা তৈরি করে । অরোরাল মিথস্ক্রিয়া থেকে প্রাপ্ত কণাগুলো কখনো দৃশ্যমান তরঙ্গদৈর্ঘ্যে জোভিয়ান মেরু অঞ্চলগুলোকে অন্ধকার করে তোলে । বর্তমান পর্যবেক্ষণ থেকে অনুমান করা হয় যে, এখানে প্রায় ৪০০ টিরও বেশি শক্তিশালী সক্রিয় আগ্নেয়িরি রয়েছে । তবে, সবচেয়ে তীব্র আগ্নেয়গিরিগুলো থেকেই অগ্ন্যুৎপাত হয় । আইও চাঁদের দক্ষিণ গোলার্ধে চরম অবলোহিত তেজস্ক্রিয়তার এক বিশাল উষ্ণ স্থান (Hot spot) সনাক্ত হয়েছে । বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন যে, বৈশিষ্ট্যটি ৪০০০০ বর্গমাইল (১০০০০০ বর্গকিলোমিটার) জুড়ে ছড়িয়ে আছে । উষ্ণ স্থানের তেজস্ক্রিয়তার মোট শক্তি ৮০ ট্রিলিয়ন ওয়াটেরও বেশি পরিমাপ করা হয়েছে । বিজ্ঞানীদের ধারণা, আইও চাঁদের পৃষ্ঠের এ ধরনের পরিবর্তনগুলো উষ্ণ স্থান এবং আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপের সাথে সম্পর্কিত । আইও চাঁদের বৃহৎ ও চরম মাত্রার অগ্ন্যুৎপাতগুলো দীর্ঘস্থায়ী স্বাক্ষর রেখে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে পাশাপাশি বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে যেমন: পাইরোক্লাস্টিক জমা (আগ্নেয়গিরি দ্বারা নির্গত শিলাখণ্ড), ফাটল দ্বারা পুষ্ট ছোট লাভা প্রবাহ এবং সালফার ও সালফার ডাই অক্সাইড সমৃদ্ধ আগ্নেয়গিরি শিখা । বৃহস্পতির চৌম্বক ক্ষেত্র গঠনে আইও চাঁদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । এটি একটি বৈদ্যুতিক জেনারেটর হিসেবে কাজ করে যা নিজের উপর ৪০০০০০ ভোল্ট তৈরি করতে পারে এবং ৩ মিলিয়ন অ্যাম্পিয়ার বৈদ্যুতিক প্রবাহ সৃষ্টি ও আয়ন নির্গত করে বৃহস্পতিকে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করার সুযোগ করে দেয় যেটি তার দ্বিগুণেরও বেশি আকার ধারণ করে । বৃহস্পতির চৌম্বকমণ্ডল আইও চাঁদের পাতলা বায়ুমণ্ডল থেকে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১ টন হারে গ্যাস এবং ধূলিকণা টেনে নেয় । এ উপাদানগুলো বেশিরভাগই আয়নযুক্ত ও পারমাণবিক সালফার, অক্সিজেন এবং ক্লোরিন; পারমাণবিক সোডিয়াম ও পটাসিয়াম; আণবিক সালফার ডাই অক্সাইড ও সালফার; এবং সোডিয়াম ক্লোরাইড ধুলো দিয়ে গঠিত । এ সকল পদার্থ বা উপাদানগুলো আইও চাঁদের আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ থেকে উদ্ভূত হয় এবং এগুলো সরাসরি আইও চাঁদের বায়ুমণ্ডল থেকে বৃহস্পতির চৌম্বক ক্ষেত্র ও আন্তঃগ্রহীয় স্থানে আসে । যদিও পদার্থগুলো তাদের আয়নিত অবস্থা এবং গঠনের উপর নির্ভর করে । বৃহস্পতির চৌম্বকমণ্ডলের বিভিন্ন নিরপেক্ষ (অ-আয়নিত) মেঘ ও বিকিরণগুলো বলয়ে পরিণত হয়ে জোভিয়ান সিস্টেম থেকে নির্গত হয় । আইও চাঁদকে ঘিরে নিরপেক্ষ সালফার, অক্সিজেন, সোডিয়াম এবং পটাসিয়াম পরমাণুর মেঘ রয়েছে । কণাগুলো আইও চাঁদের উপরের বায়ুমণ্ডলে উৎপন্ন হয় এবং প্লাজমা টরাসে আয়নগুলোর সাথে সংঘর্ষের মাধ্যমে আইও চাঁদের পার্বত্য গোলক পূরণ করার জন্য বিভিন্ন প্রক্রিয়া দ্বারা উত্তেজিত হয়, যা সেই অঞ্চল যেখানে আইও চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ বৃহস্পতির উপর প্রাধান্য পায় । পৃথিবী এবং তার চাঁদের বিপরীতে, আইও চাঁদের অভ্যন্তরীণ তাপের প্রধান উৎসটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ক্ষয়ের পরিবর্তে জোয়ারের অপচয় থেকে আসে যেটি ইউরোপা এবং গ্যানিমিড চাঁদের সাথে আইও চাঁদের কক্ষীয় অনুরণনের ফলে ঘটে । এ ধরনের উত্তাপ বৃহস্পতি গ্রহ থেকে আইও চাঁদের দূরত্ব, এর কক্ষীয় বিকেন্দ্রীকরণ, এর অভ্যন্তরীণ গঠন এবং এর ভৌত অবস্থার উপর নির্ভর করে । আইও চাঁদের জোরপূর্বক কক্ষপথের বিকেন্দ্রীকরণের ফলে সৃষ্ট জোয়ারের উত্তাপ এটিকে সৌরজগতের সবচেয়ে আগ্নেয়গিরির দিক থেকে সক্রিয় জগতে পরিণত করেছে, যেখানে শত শত আগ্নেয়গিরি কেন্দ্র এবং বিস্তৃত লাভা প্রবাহ রয়েছে । একটি বড় অগ্ন্যুৎপাতের সময় দশ বা এমনকি শত শত কিলোমিটার দীর্ঘ লাভা প্রবাহ তৈরি হতে পারে, যার বেশিরভাগই ব্যাসাল্ট সিলিকেট লাভা দিয়ে তৈরি যেখানে ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ ম্যাফিক বা আল্ট্রাম্যাফিক বা আগ্নেয় শিলা রয়েছে । লাভা প্রবাহ আইও চাঁদে আরেকটি প্রধান আগ্নেয়গিরির ভূখণ্ডের প্রতিনিধিত্ব করে । বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, এ প্রবাহগুলো বেশিরভাগই গলিত সালফারের বিভিন্ন যৌগ দিয়ে গঠিত । তবে পৃথিবী-ভিত্তিক ইনফ্রারেড গবেষণা এবং গ্যালিলিও মহাকাশযানের পরিমাপ থেকে জানা যায় যে, এ প্রবাহগুলো ম্যাফিক থেকে আল্ট্রাম্যাফিক রচনাসহ বেসালটিক লাভা দিয়ে গঠিত । আইও চাঁদে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী শিখাগুলোর (Plume) মধ্যে রয়েছে প্রোমিথিউস, আমিরানি এবং মাসুবি । আইও চাঁদে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি পর্বত রয়েছে । পর্বতগুলো প্রায়শই বৃহৎ (গড়ে পর্বত ১৫৭ কিলোমিটার বা ৯৮ মাইল লম্বা) এবং বিচ্ছিন্ন কাঠামো হিসেবে দেখা যায় যার কোনো আপাত বৈশ্বিক টেকটোনিক নিদর্শন নেই যেটি পৃথিবীর ক্ষেত্রে দেখা যায় । দক্ষিণ বোসোল মন্টেসে এ স্থাপনাগুলোর গড় উচ্চতা ৬ কিলোমিটার (৩.৭ মাইল) এবং সর্বোচ্চ ১৭.৫ কিলোমিটার (১০.৯ মাইল) । আইও চাঁদে অবস্থিত পর্বতমালা বিভিন্ন ধরণের আকার ধারণ করে । মালভূমিগুলো সবচেয়ে সাধারণ । এ কাঠামোগুলো বৃহৎ যেটি বিচ্ছিন্ন, সমতল-শীর্ষ উচ্চতা, শৈলশিরা মেসা (Mesa) এর মতো যার পৃষ্ঠতল শক্ত । অন্যান্য পর্বতগুলো হেলানো ভূত্বকীয় ব্লক বলে মনে হয় । আইও চাঁদে কয়েকটি পাহাড়ের ছোট ঢাল আগ্নেয়গিরির উৎপত্তি রয়েছে । প্রায় সকল পর্বতই অবক্ষয়ের কোনো না কোনো পর্যায়ে রয়েছে বলে মনে হয় । আয়োনিয়ান পর্বতমালার পাদদেশে বড় বড় ভূমিধস সাধারণ ঘটনা, যা ইঙ্গিত করে যে ভরের অবক্ষয়ই অবক্ষয়ের প্রাথমিক রূপ । আইও চাঁদের মেসা এবং মালভূমিতে Scalloped প্রান্তগুলো ভূত্বক থেকে সালফার ডাই অক্সাইড শোষণের ফলে পর্বত প্রান্ত বরাবর দুর্বলতার অঞ্চল তৈরি করে ।আইও চাঁদে বিভিন্ন আগ্নেয়গিরি, পর্বত, মালভূমি এবং বৃহৎ অ্যালবেডো বৈশিষ্ট্য রয়েছে । যেমন: প্যাটেরা (সসার বা আগ্নেয়গিরির নিম্নচাপ), ফ্লকটাস (প্রবাহ বা লাভা প্রবাহ), ভ্যালিস (উপত্যকা বা লাভা চ্যানেল) এবং সক্রিয় অগ্ন্যুৎপাত কেন্দ্র ইত্যাদি । 

উল্লেখ্য যে: বিভিন্ন মহাকাশ সংস্থা এবং মহাকাশযান এ চমকপ্রদ আইও চাঁদকে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ করে আসছে । বিজ্ঞানীদের এ জোভিয়ান চাঁদ সম্পর্কে নানা ধরণের ভবিষ্যৎ মিশন ও পরিকল্পনা রয়েছে । বিশেষ করে জুনো মিশন হচ্ছে NASA এর একটি মহাকাশ অনুসন্ধান, যা বৃহস্পতি গ্রহকে প্রদক্ষিণ করছে । এটির উদ্দেশ্য হচ্ছে বৃহস্পতি গ্রহের উৎপত্তি ও গঠন, এর চাঁদ সম্পর্কে, গ্রহে পাথুরে কেন্দ্রস্থল আছে কি-না, গ্রহের বায়ুমণ্ডলে জলের পরিমাণ, ভর বিতরণ, মহা লাল বিন্দু, গভীর বাতাস, মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র, চৌম্বক ক্ষেত্র এবং মেরু চুম্বকমণ্ডল ইত্যাদি পরিমাপ করা । জুনো মিশনটি NASA এর New Frontiers Program এর অংশ, যেটি ওয়াশিংটনে এজেন্সির বিজ্ঞান মিশন অধিদপ্তরের (Science Mission Directorate) জন্য আলাবামার হান্টসভিলে নাসার Marshall Space Flight Center এ পরিচালিত হয় ৷ যুক্তরাষ্ট্রের (ডেনভার) মহাকাশ, প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা বিষয়ক কোম্পানি লকহিড মার্টিন স্পেস (Lockheed Martin Space) মহাকাশযান তৈরি এবং পরিচালনা করে । এছাড়া, ইতালীয় মহাকাশ সংস্থা (ASI) জোভিয়ান ইনফ্রারেড অরোরাল ম্যাপারের জন্য অর্থায়ন করেছে । বৃহস্পতি গ্রহে জুনো মহাকাশযানটি ৫০ বার বৃহস্পতির চারপাশে ঘুরে বর্তমানে ৫১তম মিশনে রয়েছে । 


তথ্যসূত্র:  https://www.nasa.gov/ , www.britannica.com,  https://www.cbc.ca/   ,  https://www.space.com/ , আন্তর্জাল (The Internet), ছবি: উইকিপিডিয়া ।

Tuesday, 1 April 2025

মানব মস্তিষ্কের কোষ ও মহাবিশ্বের ছায়াপথ জাল কাঠামো

ছবি: Sacred Geometry (Facebook থেকে) । 


মানব মস্তিষ্ক হচ্ছে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের স্ফীত, তরলে পূর্ণ গহ্বরযুক্ত ও মেনিনজেস নামক পর্দা বা আবরণী দ্বারা আবৃত করোটির ভেতরের অংশ । মানুষের মস্তিষ্কের প্রধান তিনটি অংশ যেমন: গুরুমস্তিষ্ক, মধ্যমস্তিষ্ক এবং লঘুমস্তিষ্ক । মস্তিষ্কের দুইটি প্রধান কোষ হচ্ছে নিউরন বা স্নায়ুকোষ এবং নিউরোগ্লিয়া বা গ্লিয়াল কোষ । মস্তিষ্কের কোষগুলো মস্তিষ্কের কার্যকরী টিস্যু তৈরি করে । মস্তিষ্কের বাকি টিস্যু হচ্ছে স্ট্রাকচারাল স্ট্রোমা যেখানে মেনিনজেস, রক্তনালী এবং নালীগুলোর মতো সংযোগকারী টিস্যু অন্তর্ভুক্ত থাকে । মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেক্স বা সেরিব্রাল ম্যান্টেল নামক অংশটি মানুষ এবং অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মস্তিষ্কের সেরিব্রামের স্নায়ু টিস্যুর বাইরের স্তর । সেরিব্রাল কর্টেক্স কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের স্নায়ু সংহতকরণের বৃহত্তম স্থান এবং এটি মনোযোগ , উপলব্ধি , সচেতনতা , চিন্তাভাবনা , স্মৃতি , ভাষা ও চেতনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । মানুষের সেরিব্রাল কর্টেক্সে প্রায় ১৪ থেকে ১৬ বিলিয়ন নিউরন থাকে । এ নিউরন বা স্নায়ুকোষই হচ্ছে মানবমস্তিষ্কের মূল গঠন উপাদান । উত্তেজনাপূর্ণ নিউরন কোষগুলো বৈদ্যুতিক সংকেতের আকারে অনুভূতি পরিবহন করতে পারে যা নিউরাল সার্কিট এবং বৃহত্তর মস্তিষ্কের নেটওয়ার্কগুলোতে অন্যান্য নিউরন এবং ইন্টারনিউরনের সাথে (সিন্যাপ্সের মাধ্যমে) যোগাযোগ রক্ষা করে কাজ করে থাকে । নিউরোগ্লিয়া বা গ্লিয়া হচ্ছে নিউরনের সহায়ক কোষ যার অনেক কাজ রয়েছে । যদিও এর সবগুলো কাজ স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না । তবে নিউরনগুলোকে সহায়তা এবং পুষ্টি সরবরাহ করাই তার মূল কাজ । গ্লিয়াল কোষগুলো নিউরনের চেয়ে সংখ্যায় অনেক বেশি এবং নিউরনের জন্য তাদের সহায়ক ভূমিকা ছাড়াও এ কোষগুলো বিশেষ করে অ্যাস্ট্রোসাইটগুলোকে গ্লিয়াট্রান্সমিশন নামক নিউরোট্রান্সমিশনের অনুরূপ একটি সংকেত প্রক্রিয়ায় জড়িত নিউরনের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম বলে স্বীকৃত হয়েছে । 

অপরদিকে অসংখ্য নক্ষত্র, নাক্ষত্রিক অবশেষ, গ্রহাণু, উল্কা, ধূমকেতু, আন্তঃগ্রহীয় ধূলি মেঘ, আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাস, ধূলিকণা, নীহারিকা, সৌরজগৎ, কৃষ্ণগহ্বর এবং অদৃশ্য পদার্থসহ মহাজাগতিক নানা বস্তুর সমন্বয়ে গঠিত হয় এক একটি ছায়াপথ । একটি ছায়াপথে গড়ে প্রায় ১০০ – ৫০০ বিলিয়ন নক্ষত্র থাকে । আকাশগঙ্গা ছায়াপথের (Milky Way Galaxy) ব্যাস ১০০০০০ আলোকবর্ষ । এ বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে বিদ্যমান ২ ট্রিলিয়ন ছায়াপথের মধ্যে আমাদের ছায়াপথ একটি । এ রকম প্রায় অর্ধশতাধিক ছায়াপথের সমন্বয়ে গঠিত হয় এক একটি ছায়াপথ স্তবক বা গুচ্ছ (Galaxy Cluster) । ছায়াপথ স্তবকগুলোই গঠন করে একটি ছায়াপথ মহাস্তবক (Galaxy Supercluster) যেটি মহাবিশ্বে এক বিশাল মহাকর্ষীয় কাঠামো তৈরি করে যেখানে কয়েক লক্ষ ছায়াপথের আবাসস্থল । এ সকল ছায়াপথ মহাস্তবকের মাঝে বিদ্যমান একটি ছায়াপথ স্তবক থেকে অন্য এক একটি ছায়াপথের মধ্যকার দূরত্ব থাকে লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ । সুতরাং একটি ছায়াপথ মহাস্তবকের আকার কতো বৃহৎ, তা নিশ্চয়ই চিন্তার বিষয়? ল্যানিয়াকিয়া ছায়পথ মহাস্তবক (Laniakea Galaxy Supercluster) হচ্ছে আমাদের নিজস্ব বাসস্থান আকাশগঙ্গা ছায়াপথসহ আশেপাশে প্রায় ১০০০০০ অন্যান্য ছায়াপথের আবাসস্থল । যেখানে ঐ আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৭০০০ আলোকবর্ষ দূরে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের এক অতি ক্ষুদ্র অংশের সর্পিল কালপুরুষ বাহুর (The Orion Arm) এক প্রান্তে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর পূর্বে জলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্য নামক নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে একাধিক গ্রহ নিয়ে গঠিত হয়েছে আমাদের সৌরজগৎ । যদিও, আদি মহাবিশ্বের ইতিহাস খুবই হিংস্র । এক মহা দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মহাবিশ্বের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সৌরজগতের সৃষ্টি । কালের আবর্তে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে প্রচণ্ড উত্তপ্ত অবস্থা থেকে পৃথিবী গ্রহটি এক সময় ঠান্ডা, শান্ত এবং জীবন ধারণের উপযোগী হলে এখানে প্রাণের উদ্ভব হয় । এ সবুজ গ্রহটিই আমাদের বাড়ি । মায়ের কোলের মতোই নিরাপদ আশ্রয়স্থল । কিন্তু, এ মৃত্যুন্মুখ গ্রহটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে! মানবজাতি টিকবে তো? 

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া । 

Sunday, 30 March 2025

ঘু-ঘু পাখি

* ছবি: Mou Zoroz 

ঘু-ঘু বাংলাদেশের অতি পরিচিত পাখি । সাধারণতঃ গ্রামাঞ্চলেই একে বেশি দেখা যায় । ঘু-ঘু পাখি কলাম্বিডি পরিবারের অন্তর্গত । বাংলাদেশ, ভারত ছাড়াও দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এদের আবাসস্থল । এছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও ঘু-ঘু পাখি দেখা যায় । পৃথিবীতে প্রায় ৩৬ প্রজাতির ঘু-ঘু পাখি রয়েছে । এদের মধ্যে বাংলাদেশে ৬টি প্রজাতির ঘু-ঘু পাখির দেখা মেলে । বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই ঘু-ঘু পাখির অবাধ বিচরণ রয়েছে । যদিও বর্তমানে এ লাজুক ও চঞ্চল পাখিটির সংখ্যা দ্রুতহারে হ্রাস পাচ্ছে । বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে ঘু-ঘু প্রজাতিটি সংরক্ষিত । ঘু-ঘু পাখির সুমধুর ডাকে প্রাণ জুড়ে যায় । অনিন্দ্য সুন্দর এ পাখিটি দেখতে প্রায় কবুতরের মতোই । বিভিন্ন প্রজাতির ঘু-ঘু পাখি যেমন: তিলা ঘু-ঘু, রাম ঘু-ঘু, সবুজ ঘু-ঘু, রাজ ঘু-ঘু, ছোট ঘু-ঘু এবং লাল ঘু-ঘু ইত্যাদি । তিলা ঘু-ঘু বা তেলিয়া ঘু-ঘু বা ছিটে ঘু-ঘু নামে পরিচিত প্রজাতিটি বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই দেখা যায় । ঘু-ঘু পাখি গাছপালা, জঙ্গল, আার্দ্র পাতাঝরা বন, বাগান, কুঞ্জবন এবং আবাদি জমিতে বিচরণ করে থাকে । শহর অঞ্চলেও ঘু-ঘু পাখি দেখা যায় । এরা সচরাচর জোড়ায় জোড়ায় কিংবা ছোট দলবদ্ধভাবে চলাচল করে । গ্রামের মাঠ-ঘাটে, বন-জঙ্গলে, তৃণভূমি, খামার, আবাদি জমি বা শস্যভিটায় এবং রাস্তাঘাট ইত্যাদি জায়গায় ঘু-ঘু পাখি একাকী বা জোড়ায় জোড়ায় হেঁটে হেঁটে শস্যদানা খায় । অনেক সময় এদেরকে গহীন বনে দেখা যায় । ঘু-ঘু পাখি প্রকৃতির এক অনুপম সৌন্দর্য । পুরুষ ঘু-ঘু পাখি ডাকতে পছন্দ করে । স্ত্রী-পুরুষ ঘু-ঘু দেখতে প্রায় একই রকম । প্রজনন মৌসুম (এপ্রিল-জুলাই মাসে) পুরুষ ঘু-ঘু পাখি তার সঙ্গীকে কাছে পাওয়ার জন্য মাথা নাচিয়ে মায়াবী সুরে অনবরত ডাকতে থাকে । অত্যন্ত সুলভ প্রজাতির এ পাখি সাধারণতঃ ঝোপ-ঝাড় ও গাছপালায় বাসা বানিয়ে ডিম পাড়ে । একটি প্রাপ্ত বয়স্ক সবুজ ঘু-ঘু পাখি দেখতে সবচেয়ে সুন্দর । সবুজ ঘু-ঘু প্রায় ৬-৭ বছর বেঁচে থাকে । শান্তিপ্রিয় এ পাখিটি শহরে লোক সমাগম এবং যানবাহনের বিকট শব্দের কারণে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে । শুধুমাত্র শব্দ দূষণই নয়, চোরা শিকারীরা ফাঁদ পেতে ঘু-ঘু পাখির সংখ্যা ক্রমেই হ্রাস করছে । ঘু-ঘু পাখি বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ । এটিকে রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য । 

* তথ্যসূত্র: আন্তর্জাল, উইকিপিডিয়া । ছবি: Mou Zoroz । 

Wednesday, 19 March 2025

ছায়াপথ NGC 1398




অনিন্দ্য সুন্দর ও বৈচিত্র্যময় NGC 1398 ছায়াপথ পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে ফরনাক্স নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত । যার মানে আজ আমরা যে আলো দেখতে পাচ্ছি তা এ ছায়াপথ ছেড়ে চলে গেছে যখন ডাইনোসর পৃথিবী গ্রহ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল । ছায়াপথটি মহাকাশীয় বিষুবরেখার দক্ষিণে অবস্থিত এবং দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে এটি আরো সহজে দৃশ্যমান । NGC 1398 হচ্ছে একটি বিচ্ছিন্ন বাধাযুক্ত সর্পিল ছায়াপথ যা একটি দ্বৈত চক্র কাঠামো প্রদর্শন করে । ছায়াপথের স্বতন্ত্র সর্পিল বাহু এবং উজ্জ্বল কেন্দ্রস্থল এটিকে রাতের আকাশে এক দুর্দান্ত দৃশ্য করে তোলে এবং এটির ধুলোর গলি ও তারকা গঠনের অঞ্চলগুলোর জটিল নিদর্শনগুলো প্রকাশ করে । মহাজাগতিক অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী এ ছায়াপথের কেন্দ্রের চারপাশে শুধুমাত্র মুক্তা নক্ষত্র, গ্যাস এবং ধূলিকণার বলয় নয়- ছায়াপথের কেন্দ্র জুড়ে নক্ষত্র ও গ্যাসীয় দণ্ড এবং সর্পিল বাহুগুলো যা ফিতার মতো আরো দূরে দেখা যায় । ছায়াপথ কেন্দ্রের নিকটবর্তী বলয়টি সম্ভবত নক্ষত্র গঠনের একটি বর্ধিত ঘনত্বের তরঙ্গ, যা অন্য ছায়াপথের সাথে মহাকর্ষীয় সংঘর্ষ হওয়ার কারণে অথবা ছায়াপথের নিজস্ব মহাকর্ষীয় অসামঞ্জস্যের কারণে । নক্ষত্রের দণ্ড আকৃতির বন্ধনী এবং ধূলিকণা এ ছায়াপথের তীব্র আলোকিত কেন্দ্রীয় অঞ্চল অতিক্রম করার জন্য এটিকে একটি বাধা সর্পিল ছায়াপথ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে । বিচিত্র নক্ষত্র দিয়ে গঠিত ছায়াপথের মনোমুগ্ধকর সর্পিল বাহুগুলোর কাণ্ড ছায়াপথের একেবারে মাঝখান থেকে শুরু করে বাইরের দিকে ঘোরাফেরা করার পরিবর্তে একটি সরল দণ্ড থেকে উদ্ভূত হয়, যা এ ছায়াপথের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের মধ্য দিয়ে কেটে যায় । বেশিরভাগ সর্পিল ছায়াপথের প্রায় দুই তৃতীয়াংশে এ বৈশিষ্ট্যটি পরিলক্ষিত হয়, তবে এ দণ্ডগুলো একটি ছায়াপথের আচরণ এবং বিকাশকে প্রভাবিত করে কি-না বা কিভাবে তা এখনো স্পষ্ট নয় । আমাদের নিজস্ব আকাশগঙ্গা ছায়াপথের চেয়েও NGC 1398 ছায়াপথ বৃহৎ, যার ব্যাস প্রায় ২৯২০০০ আলোকবর্ষ । NGC 1398 ছায়াপথে প্রায় ১০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে । ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই ডিসেম্বর জার্মানির কার্লসরুহে শহরে জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী Friedrich August Theodor Winnecke একটি ধূমকেতু সন্ধান করার সময় ছায়াপথটি প্রথম আবিষ্কার করেন । এ ছায়াপথের লাল স্থানান্তর হচ্ছে ০.০০৪৬৫৭ । গত ১২ই মার্চ ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে পার্থ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল রিসার্চ গ্রুপ দ্বারা এক বিস্ময়কর অতিনবতারা বিস্ফোরণ SN 1996N (টাইপ Ib/c, mag. 16) এবং ২১শে জানুয়ারি ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে BlackGEM দ্বারা অতিনবতারা বিস্ফোরণ SN 2025zi (টাইপ Iax [02cx-like], mag. 20.07) পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে । এ চমৎকার ছায়াপথটি NGC 1398, ESO 482-22, LEDA 13434 এবং IRAS 03367-2629 নামেও পরিচিত । 

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, https://www.sci.news/ , https://apod.nasa.gov/apod/ap180123.html 

📸 : https://apod.nasa.gov/apod/ap180123.html 

Tuesday, 25 February 2025

সূর্য (The Sun)


প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর পূর্বে একটি বৃহৎ পরমাণুর শক্তিশালী মহাবিস্ফোরণের ফলে মহাবিশ্বের উৎপত্তি হয় । এ মহাবিস্ফোরণ ভয়ানক হিংস্রভাবে সম্প্রসারিত মহাবিশ্বের মধ্যে শক্তি বিকিরণকারী প্রচণ্ড শক্তিশালী অভিঘাত তরঙ্গের (Shockwave) সৃষ্টি করে । এক সেকেন্ডের এক মিলিয়ন ভাগের এক ভাগ সময়ে মহাবিশ্বের অস্তিত্বের আদিম গঠন ৩টি স্বতন্ত্র পর্যায়গুলোর মধ্য দিয়ে স্থানান্তরিত হয় । তড়িচ্চুম্বকীয়, মাধ্যাকর্ষণ এবং দুর্বল বা শক্তিধর শক্তিগুলো মৌলিক শক্তি হিসেবে আকার ধারণ করে । সেই সময় প্রোটন মৌলিক কণিকা এবং অতিপারমাণবিক নিউট্রন কণিকা গঠনের জন্য তাপমাত্রা ছিল অত্যাধিক । পরবর্তীতে তাদের অভ্যন্তরীণ অংশ থেকে তৈরি সুরুয়া (Soup) মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে । এটি Quark বা Gluon নামেও পরিচিত । চোখের পলকেই এ সুরুয়া ঠান্ডা হয়ে সাধারণ বস্তু বা পদার্থের প্রথম লক্ষণগুলোর জন্ম দেয় । বিজ্ঞানীদের ধারণা, অতিক্ষুদ্র মৌলকণার সুরুয়া শুধুমাত্র প্রাকৃতিকভাবেই নিউট্রন নক্ষত্রের কেন্দ্রস্থলে বিদ্যমান থাকতে পারে । প্রলয়ঙ্করী মহাবিস্ফোরণের পর প্রায় ৩ লক্ষ ৮০ হাজার বছর থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক শত মিলিয়ন বছর পর্যন্ত হাইড্রোজেন এবং খুবই সামান্য পরিমাণ আলফা কণিকা হিলিয়াম নিউক্লিয়াস ছাড়া গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ ইত্যাদি বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের কোনো অস্তিত্বই ছিল না । তাই, এ সময়টিকে বলা হয় অন্ধকার যুগ । সময়ের হাত ধরে এ মহাবিশ্ব বা মহাজাগতিক উত্তপ্ত বস্তুগুলো ধীরে ধীরে শীতল হয় । মহাবিস্ফোরণের পরপরই মহাবিশ্বের উপর আধিপত্য বিস্তারকারী প্রচণ্ড গরম ও ঘন পদার্থ Plasma Soup (Quark-Gluon Plasma) থেকে আলোকরশ্মি বের হয়ে আসতে পারছিল না । পরবর্তীতে হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো প্লাজমার সাথে ধাক্কা খেয়ে ফোটন আলোক কণিকা বের হয়ে আসে । নক্ষত্র জন্ম নেয় । সেটিই হয় আলোর উৎস যেখান থেকে আলো আসতে শুরু করে । তবে, সেই অন্ধকার যুগ নির্দিষ্টভাবে ঠিক কখন শেষ হয়েছিল কিংবা কখনইবা প্রথম নক্ষত্র, ছায়াপথ, গ্রহ এবং প্রাণের উদ্ভব বা জীবনের শুরু হয়েছিল— তা এখনো অজানা । 

এ মহাবিস্ফোরণের প্রায় ৩ মিনিট থেকে ১০০০০০ বছরের মধ্যে হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম মৌলিক পরমাণুসহ প্রচুর পরিমাণ ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন, ইলেকট্রন প্লাজমা ও ভারি বস্তুকণা তৈরি হয় । অসংখ্য বস্তুকণা প্রচণ্ড গতিতে মহাবিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যায় এবং এদের কণিকাগুলো ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত । এগুলো ধীরে ধীরে শীতল হয় এবং ভিতরের আন্তঃআকর্ষণের কারণে বস্তুপুঞ্জগুলো কাছাকাছি চলে আসে । দলবদ্ধ বস্তুপুঞ্জের ঘনত্ব বৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত মহাকর্ষীয় আকর্ষণের ফলে একটি ঘূর্ণনগতির সৃষ্টি হয় । এ ঘূর্ণন গতির কারণেই মহাকাশের মেঘগুলো ঘূর্ণায়মান চাকতিতে পরিণত হয় । পর্যায়ক্রমে নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বস্তুপুঞ্জগুলো বিভিন্ন আকৃতির একক দল গঠন করে এ অসীম মহাবিশ্বে ছায়াপথ, ছায়াপথ স্তবক এবং ছায়াপথ মহাস্তবক ইত্যাদি সৃষ্টি করে । ছায়াপথ মহাস্তবকের সম্মিলিত ভর একটি মহাকর্ষীয় অক্ষিকাচ (Gravitational Lens) হিসেবে কাজ করে এবং অনেক দূরবর্তী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলোকবিন্দুগুলোকে বিবর্ধিত করে । যেখানে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য লাল-নীল-সবুজ ছায়াপথ, নক্ষত্রপুঞ্জ, অগণিত গোল-চ্যাপ্টা-লম্বাটে বিভিন্ন আকারের নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহ, ধূমকেতু এবং উল্কা ইত্যাদি । এক একটি ছায়াপথ প্রতিটি ছায়াপথগুচ্ছকে ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছে ৷ বিশাল আকৃতির ছায়াপথসহ মহাজাগতিক বিভিন্ন বস্তুগুলোকে সরাসরি কিছু ভর ও মহাকর্ষীয় শক্তি বৃদ্ধি করে এদেরকে মহাকাশে একটি সু-শৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে একসাথে ধরে রেখেছে এক প্রকার রহস্যজনক অদৃশ্য ‘অন্ধকার পদার্থ’ (Dark Matter) ৷ ছায়াপথ থেকে শুরু করে মহাজাগতিক অন্যান্য বস্তু এমনকি আমাদের দেহের উপাদানও এ অন্ধকার পদার্থের অন্তর্ভুক্ত । সৃষ্টিতত্ত্বে এটিকে Baryonic Dark Matter বলে ৷ এ সীমানাহীন মহাবিশ্বে শতকরা ৪.৯ ভাগ পদার্থ Normal Matter (নক্ষত্র, গ্রহ, ছায়াপথ, গ্যাস ও ধূলিকণা), শতকরা ২৬.৮ ভাগ পদার্থ Dark Matter, শতকরা ৬৮.৩ ভাগ Dark Energy এর অদৃশ্য প্রভাব এবং নিউট্রিনো ও ফোটন কণার মতো অন্যান্য উপাদানগুলো খুবই সামান্য পরিমাণে অবদান রাখে ৷ কিন্তু এ Dark Energy (অন্ধকারশক্তি বা তমোশক্তি বা গুপ্তশক্তি বা কৃষ্ণশক্তি) হচ্ছে বিশাল মহাবিশ্বের মহাকর্ষীয় বলের মূল চালিকাশক্তি যেটি সমস্ত মহাশূন্য জুড়ে বিস্তৃত এবং এটি মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে । অসংখ্য নক্ষত্র, নাক্ষত্রিক অবশেষ, গ্রহাণু, উল্কা, ধূমকেতু, আন্তঃগ্রহীয় ধূলি মেঘ, আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাস, ধূলিকণা, নীহারিকা, সৌরজগৎ, কৃষ্ণগহ্বর এবং অদৃশ্য পদার্থসহ মহাজাগতিক নানা বস্তুর সমন্বয়ে গঠিত হয় এক একটি ছায়াপথ । একটি ছায়াপথে গড়ে প্রায় ১০০ – ৫০০ বিলিয়ন নক্ষত্র থাকে । আকাশগঙ্গা ছায়াপথের (Milky Way Galaxy) ব্যাস ১০০০০০ আলোকবর্ষ । এ বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে বিদ্যমান দুই ট্রিলিয়ন ছায়াপথের মধ্যে আমাদের ছায়াপথ একটি । এ রকম প্রায় অর্ধশতাধিক ছায়াপথের সমন্বয়ে গঠিত হয় এক একটি ছায়াপথ স্তবক বা গুচ্ছ (Galaxy Cluster) । ছায়াপথ স্তবকগুলোই গঠন করে একটি ছায়াপথ মহাস্তবক (Galaxy Supercluster) যেটি মহাবিশ্বে এক বিশাল মহাকর্ষীয় কাঠামো তৈরি করে যেখানে কয়েক লক্ষ ছায়াপথের আবাসস্থল । এ সকল ছায়াপথ মহাস্তবকের মাঝে বিদ্যমান একটি ছায়াপথ স্তবক থেকে অন্য এক একটি ছায়াপথের মধ্যকার দূরত্ব থাকে লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ । সুতরাং একটি ছায়াপথ মহাস্তবকের আকার কতো বৃহৎ, তা নিশ্চয়ই চিন্তার বিষয়? ল্যানিয়াকিয়া ছায়পথ মহাস্তবক (Laniakea Galaxy Supercluster) হচ্ছে আমাদের নিজস্ব বাসস্থান আকাশগঙ্গা ছায়াপথসহ আশেপাশে প্রায় ১০০০০০ অন্যান্য ছায়াপথের আবাসস্থল । যেখানে ঐ আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৭০০০ আলোকবর্ষ দূরে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের এক অতি ক্ষুদ্র অংশের সর্পিল কালপুরুষ বাহুর (The Orion Arm) এক প্রান্তে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর পূর্বে জলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্য নামক নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে একাধিক গ্রহ নিয়ে গঠিত হয়েছে আমাদের সৌরজগৎ । যদিও, আদি মহাবিশ্বের ইতিহাস খুবই হিংস্র । এক মহা দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মহাবিশ্বের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সৌরজগতের সৃষ্টি । কালের আবর্তে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে প্রচণ্ড উত্তপ্ত অবস্থা থেকে পৃথিবী গ্রহটি এক সময় ঠান্ডা, শান্ত এবং জীবন ধারণের উপযোগী হলে এখানে প্রাণের উদ্ভব হয় । এ সবুজ গ্রহটিই আমাদের বাড়ি । মায়ের কোলের মতোই নিরাপদ আশ্রয়স্থল । কিন্তু, এ মৃত্যুন্মুখ গ্রহটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে! মানবজাতি টিকবে তো? 

বৃষ্টিহীন অন্ধকার রাতে মহাকাশের দিকে তাকালে জ্বলজ্বল করা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অগণিত আলোকবিন্দু দেখা যায় । এদের কোনোটি মিটমিট করে জ্বলে এবং কোনোটি স্থির হয়ে জ্বলছে । মিটমিটে আলোকবিন্দুগুলোই হচ্ছে এক একটি নক্ষত্র । এরা নিজে নিজেই জ্বলে । অন্যদিকে স্থির আলোকবিন্দুগুলো হচ্ছে বিভিন্ন গ্রহ । এরা নক্ষত্রের আলোয় আলোকিত । মহাকাশে অবস্থিত কোনো মহাজাগতিক বস্তু নিজের অভ্যন্তরীণ পদার্থকে নিউক্লীয় সংযোজন বা একীকরণ (Nuclear Fusion) বিক্রিয়া ঘটিয়ে ক্রমাগত জ্বালানি উৎপাদন করে নিজেকে জ্বালিয়ে প্রচুর পরিমাণ আলো ও তাপ উৎপন্ন করে উজ্জ্বলিত থাকে তাকেই নক্ষত্র বলে । এছাড়া, মহাশূন্যে আয়নিত গ্যাস বা প্লাজমা দশায় অবস্থিত অতি উজ্জ্বল এবং সুবৃহৎ গোলাকার জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ডকেও নক্ষত্র বলে । নক্ষত্রের জীবনচক্র হতে পারে শত শত মিলিয়ন কিংবা বিলিয়ন বছর সময়কাল । মহাকাশে প্রতিনিয়ত এ নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যুর খেলা চিরকাল ধরে চলছে । একটি নক্ষত্রের জন্মকাল থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে যে বিবর্তন ঘটে থাকে তাকে বলা হয় ‘নাক্ষত্রিক বিবর্তন’ (Stellar Evolution) । নক্ষত্রের হাইড্রোজেন জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার পর বিকিরণের চাপে ব্যাসার্ধ বেড়ে গিয়ে এটি একটি লোহিত দানব নক্ষত্রে পরিণত হয় ৷ এক পর্যায় ধীরে ধীরে ‘শ্বেত বামন’ নক্ষত্রে রূপ নেয় । তবে, কখনো দুর্লভভাবে এটি ভয়ঙ্কর নাক্ষত্রিক বিস্ফারণের মধ্য দিয়ে পুরো সৌরজগতকেও নিমিষেই ধ্বংস করে দিতে সক্ষম । Star শব্দটি গ্রিক শব্দ Aster থেকে এসেছে, যেটি হিত্তীয় ভাষার শব্দ শিত্তার থেকে উদ্ভূত । শিত্তার শব্দের ব্যুৎপত্তি হয়েছে সংস্কৃত শব্দ সিতারা থেকে । একটি নক্ষত্রের আকার, উজ্জ্বলতা‌, বিবর্তন, জীবনচক্র এবং সর্বশেষ নিজের ধ্বংস সবকিছুই নির্ভর করে তার ভরের উপর । ভর যতো বেশি হয়, ততোই দ্রুত জ্বালানি শেষ হয় ৷ এ মহাবিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তম লাল মহাদানব নক্ষত্রটি হচ্ছে UY Scuti । এটি সূর্যের চেয়ে প্রায় ১০০০ গুণেরও বেশি প্রশস্ত । অধিকাংশ নক্ষত্রের বয়স ১০০ – ১০০০ কোটি বছরের মধ্যে । তবে অতিপ্রাচীন কিছু নক্ষত্রের বয়স এ মহাবিশ্বের বয়সের কাছাকাছি, যেখানে মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর । অতি প্রাচীনতম একটি নক্ষত্র হচ্ছে HE1523-0901 যেটির বয়স প্রায় ১৩২০ কোটি বছর । মহাকাশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধূলিকণা, বস্তুপুঞ্জ, হাইড্রোজেন গ্যাস এবং প্লাজমা দ্বারা গঠিত এক ধরনের আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘকে ‘নীহারিকা’ বলে । এ নীহারিকায় শতকরা ৫০ – ৭৫ ভাগ হাইড্রোজেন গ্যাস, শতকরা ২০ – ৪৫ ভাগ হিলিয়াম গ্যাস এবং শতকরা ৫ ভাগ অন্যান্য মৌলিক পদার্থ রয়েছে । সুবিশাল আকারের এন্ড্রোমিডা ছায়াপথের পূর্ব নাম ছিল Andromeda Nebula । জমাট বাঁধা ঠাণ্ডা নীহারিকা থেকেই নক্ষত্রের জন্ম । 

নক্ষত্রের জ্বালানি হচ্ছে উদজান বা হাইড্রোজেন । হাইড্রোজেন একটি মৌলিক পদার্থ ৷ হাইড্রোজেনের পরমাণুতে ১টি মাত্র ইলেকট্রন থাকে ৷ এ অধঃপরমাণু মৌলিক কণা ইলেকট্রনটি নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে ৷ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির সময় তৈরি হওয়া প্রথম মৌল হাইড্রোজেনের ৩টি আইসোটোপ রয়েছে যেমন: (ক) প্রোটিয়াম (খ) ডিউটেরিয়াম (গ) ট্রিটিয়াম ৷ মহাকর্ষ বলের প্রভাবে নক্ষত্রমণ্ডলীয় গ্যাস এবং ধূলিকণা মেঘ বা গ্যাসের ধূলিমেঘ (Dust Cloud) জমাটবদ্ধ হয়ে একটি নক্ষত্রের জন্ম প্রক্রিয়া শুরু হয় । মহাকাশে মেঘ যতো বেশি জমাটবদ্ধ হয় নক্ষত্রের অভ্যন্তরীণ অণুগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের তীব্রতাও ততো বেশি বৃদ্ধি পায় । এতে করে প্রচণ্ড উত্তাপের সৃষ্টি হয় । এ তাপ এমন এক পর্যায় (তাপমাত্রা যখন প্রায় ১ কোটি কেলভিনে উন্নীত হয়) গিয়ে পৌঁছানোর পর নক্ষত্রের অভ্যন্তরে চলতে থাকা নিউক্লীয় কেন্দ্রীন সংযোজন বা একীকরণ বিক্রিয়ার কারণে ৪টি হাইড্রোজেন পরমাণু তার নিজের চেয়ে হালকা, বর্ণহীন, গন্ধহীন এবং স্বাদহীন নিস্ক্রিয় গ্যাস হিলিয়াম পরমাণুতে পরিণত হয় । পরবর্তীতে এ হিলিয়াম পরমাণুগুলো একত্রিত হয়ে সৃষ্টি করে কার্বন এবং সেই কার্বনের সংযোজনে তৈরি হয় নিয়ন, সিলিকন ও লোহা । অবশেষে কেন্দ্রীন বিক্রিয়ায় তাপ শোষীত হয় । যখন নক্ষত্রটির জ্বালানি হাইড্রোজেন (হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস) খুবই দ্রুত দহন হয়ে ফুরিয়ে যায় তখন এখানে ‘শেষ হুররাহ’ (Last Hurrah) ঘটে । এর ফলে নক্ষত্রের অভ্যন্তরস্থ বহির্মুখী চাপ যথেষ্ট পরিমাণ কমে গিয়ে নক্ষত্রটি সূর্যের ভরের চেয়ে অন্তত ৫ গুণ বেশি প্রসারিত হয়— যার আকার প্রায় ৩৩৩০০০ পৃথিবীর সমান । এক সময় নক্ষত্রটি নিজের মাধ্যাকর্ষণ বলকে আর ঠেকিয়ে রাখতে পারে না, ফলে নক্ষত্রের বেশিরভাগ ভরই কেন্দ্রে সংকুচিত হয়ে ফুলে ওঠে বাইরে থাকা গ্যাসীয় অঞ্চলটি প্রচণ্ড শক্তিশালী মহাপ্লাবনের মতো ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের (প্রচণ্ড অন্তস্ফোটন বা Implosion) সৃষ্টি করে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৫০০০ – ৪০০০০ কিলোমিটার প্রবলবেগে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে । এ বিশাল মহাজাগতিক বিস্ফোরণের নামই অতিনবতারা (Supernova) । অবশেষে যদি নক্ষত্রটির ভর প্রায় ৩ M সৌর ভরের চেয়ে বেশি হয়, তখন এটি মহাকর্ষীয় পতন ঘটিয়ে একটি কৃষ্ণগহ্বরে (Black Hole) পরিণত করে । 

সূর্য হচ্ছে একটি নক্ষত্র । আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রের খুব কাছের নক্ষত্রটি সূর্য । সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে ৮টি গ্রহ (এছাড়া আরো ৫টি বামন গ্রহ Pluto, Haumea, Eris, Makemake এবং Ceres), অগণিত গ্রহাণুপুঞ্জ, উল্কা এবং ধূমকেতু ইত্যাদি ৷ সূর্যের ব্যাস প্রায় ১৩ লক্ষ ৯২ হাজার কিলোমিটার যা পৃথিবীর ব্যাস থেকে ১০৯ গুণ বড় । সূর্যের ভর প্রায় ১.৯৮৯ই৩০ কিলোগ্রাম যা পৃথিবীর ভরের চেয়ে প্রায় ৩৩২৯৫০ গুণ বেশি এবং এ ভর সৌরজগতের মোট ভরের শতকরা প্রায় ৯৯.৮৬ ভাগ । ভর-শক্তি রূপান্তরের মাধ্যমে সূর্যে প্রতি সেকেন্ডে ৪২ লক্ষ মেট্রিক টন শক্তি বিমুক্ত হয় । ভর ধ্বংস হয় না বরং এ ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয় যা বিকিরণ হিসেবে মহাশূন্য ছড়িয়ে পড়ে । পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব আলোর গতিতে প্রায় ১৫২১০০০০০ কিলোমিটার বা ৯৪৫০০০০০ মাইল । আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব প্রায় ২৭২০০ আলোকবর্ষ ৷ সৌরজগৎ তথাপি সূর্য তার নিজ কক্ষপথে আকাশগঙ্গা ছায়াপথ বা নক্ষত্র জগতের কেন্দ্রস্থলকে কেন্দ্র করে চারপাশে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২৩০ কিলোমিটার গতিতে ২২.৫ - ২৫ কোটি বছরে একবার পরিভ্রমণ করে । এ পরিভ্রমণের সময়কালকে তারাজাগতিক বর্ষ (Galactic year) বা মহাজাগতিক বর্ষ (Cosmic year) বলে । আমাদের সৌরজগৎ Galactic core কে প্রদক্ষিণ করার সময় এটি মহাজাগতিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে চলাচল করে যা সময়ের সাথে সাথে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে । সেই পরিপ্রেক্ষিতে পৃথিবী গ্রহটি তার গঠনের পর থেকে মাত্র ২০ থেকে ২৫ মহাজাগতিক বছর পূর্ণ করেছে এবং সৌরজগৎ শেষবার যখন এ অবস্থানে ছিল তখন ডাইনোসররা পৃথিবী গ্রহে বিচরণ করেছিল । সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে ৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ড । ফলে সূর্যালোকশক্তি এ সবুজ গ্রহের জলবায়ু এবং আবহাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রায় সকল জীবকে বাঁচিয়ে রাখে । সূর্যের কেন্দ্রভাগের ঘনত্ব ১৫০ গ্রাম প্রতি ঘনসেন্টিমিটারে এবং তাপমাত্রা প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ কেলভিন (~১৩.৬ MK) ৷ যদিও ছটামণ্ডল বা সৌর করোনায় তাপমাত্রা থাকে ৫ MK এবং সূর্যপৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৫৭৮৫ কেলভিন । সূর্যের অন্যান্য বিকিরণ অঞ্চলের তুলনায় কেন্দ্রভাগে ঘূর্ণন বেগ অত্যাধিক বেশি । মহাবিশ্বের সমস্ত নক্ষত্রের মতো সূর্যও একটি বিশাল পারমাণবিক চুল্লি, যেটির জ্বালানি উপাদান হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম গ্যাস ৷ সূর্য সর্বদাই প্রোটন শিকল বিক্রিয়ার (Proton Chain Reaction) মাধ্যমে হাইড্রোজেনকে কেন্দ্রীন সংযোজন বা একীকরণ প্রক্রিয়া দ্বারা হিলিয়াম গ্যাস উৎপাদন করে । এটিই হচ্ছে সূর্যের শক্তির প্রধান উৎস । ফলে এখানে তৈরি হয় ফোটন আলোককণা, উত্তাপ, তেজস্ক্রিয় রশ্মি, শক্তি এবং গ্যাস । সূর্য প্রতি সেকেন্ডে কেন্দ্রে ৬২ কোটি মেট্রিক টন হাইড্রোজেন পোড়ায় । সূর্যের কেন্দ্রভাগে পারমাণবিক বিক্রিয়ার কারণে এর বাইরের দিকের গ্যাস (প্লাজমা কণা) খুব বেশি উত্তপ্ত থাকে । এটিই সূর্যের আলো বিকিরণের মূল উৎস । সূর্যের বর্ণালী শ্রেণী সংকেত জি২ভি । পূর্ণগোলক হলদে বামন নক্ষত্র সূর্যের প্রধান গাঠনিক উপাদান হচ্ছে: হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, অক্সিজেন, কার্বন, নিয়ন, আয়রন, নাইট্রোজেন, সিলিকন, ম্যাগনেসিয়াম এবং সালফার ইত্যাদি ৷ প্লাজমা কণা বা আয়নিত গ্যাস এবং ইলেকট্রনের সমন্বয়ে গঠিত সূর্যের মধ্যে রয়েছে এক মহাশক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র ৷ সূর্যপৃষ্ঠে কিছু কালো দাগ দেখা যায় যেটি ‘সৌরকলঙ্ক’ (Sunspot) নামে পরিচিত । প্রায় ১০০০ কোটি বছর পূর্বে মহাকাশীয় নক্ষত্রের সমাবেশে বা নক্ষত্রমণ্ডলে সূর্যের ভ্রূণ সৃষ্টি হয় । পরবর্তীতে মহাকালের চক্রে এটি প্রায় ৪৫০ – ৫০০ কোটি বছরের মধ্যে স্থিতিবস্থায় ফিরে আসে । 

এ সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে এবং পশ্চিমে অস্ত যায় । 

আসলেই কি তাই? 

কিন্তু পদার্থবিদ্যা বলে, পৃথিবী গ্রহটি জলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্যকে কেন্দ্র করে অনবরত ঘুরছে । তাই, সূর্য ডুবেও না ওঠেও না । 

তবে, আমরা যারা পৃথিবীতে বসবাস করি সেই পরিপ্রেক্ষিত বা দৃষ্টিকোণ থেকে সূর্য পূর্ব থেকে ওঠে এবং পশ্চিম দিকে অস্ত যায় । 

সূর্যের রঙ সাদা হলেও ভূপৃষ্ঠ থেকে একে হলুদ দেখাতে পারে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে নীল আলোর বিচ্ছুরণের কারণে । অপার বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে উত্তপ্ত নক্ষত্রগুলোতে থাকে বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক উপাদান । সূর্যের মতো নক্ষত্রগুলোতে জন্মের সময়ই ছিল প্রচুর পরিমাণ লিথিয়ামের উপস্থিতি । তবে, মহাবিস্ফোরণের পর প্রথম ১০ কোটি বছরের মধ্যেই তা পুড়ে শেষ হয়েছে । কারণ বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে, আগামী প্রায় ৫০০ কোটি বছরের মধ্যেই সূর্যের জ্বালানি বা আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাবে । কোটি কোটি বছর ধরে জ্বলতে থাকা এ নক্ষত্রটিতে মহাকর্ষীয় শক্তির প্রভাবে কেন্দ্রীয়ভাগ বা মূল অংশে হাইড্রোজেন পরমাণু হ্রাস পাবে কিংবা হাইড্রোজেনের অভাবে পারমাণবিক সংশ্লেষণ বা একীভবন আর হবে না ৷ ফলে, সূর্যের জ্বালানি সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে ‘লাল দানবে’ রূপ নিয়ে এটির কেন্দ্রে ত্রি-আলফা বিক্রিয়ার মাধ্যমে হিলিয়াম পুড়ে কার্বন ও অক্সিজেন উৎপন্ন করবে । এক সময় সূর্যের উজ্জ্বলতা বহুগুণ বেড়ে গিয়ে প্রচণ্ড উত্তপ্তভাবে অতিনবতারা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে এর ভয়ঙ্কর পরিণতি ঘটবে! ফলে সূর্য নামক নক্ষত্রটি গ্রহগুলোসহ পুরো সৌরজগতকে গ্রাস করবে । চরম উত্তাপের কারণে পৃথিবীতে আর কোনো প্রাণের অস্তিত্বই থাকবে না । চারপাশের সবকিছুই ছাই হয়ে যাবে । অর্থাৎ, এক অগ্নিময় মৃত্যুর (Fiery Death) মাধ্যমে সূর্যের পরিসমাপ্তি হবে । 

তথ্যসূত্র ও ছবি: উইকিপিডিয়া । 

Sunday, 16 February 2025

আলোক সময়



ছবি: Space & Astronaut Lovers USA 

প্রতি সেকেন্ডে আলো শূন্য স্থানে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার (১৮৬০০০ মাইল বা ২৯৯৭৯২ কিলোমিটার) পথ অতিক্রম করে । এভাবে ১ বছরে আলো যতদূর পথ অতিক্রম করে তাকে ১ আলোকবর্ষ বলে । আলোকবর্ষ হচ্ছে একটি দৈর্ঘ্য পরিমাপের একক, যা দিয়ে জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত দূরত্বকে মাপা হয় । বর্ষ বা বছর হচ্ছে সময়ের একক । 

সুতরাং ১ জুলীয় বছরে (৩৬৫.২৫ দিন) শূন্য স্থানে বা মাধ্যমে আলো যতো দূর পর্যন্ত অতিক্রম করে সেই দূরত্বকে বলে ১ আলোকবর্ষ । 

নিম্নে আলোক সময় দ্বারা আলোর গতিবেগ হচ্ছে: 

🌿 ১ আলোক সেকেন্ড = ১৮৬০০০ মাইল (৩০০০০০ কিলোমিটার), 

🌿 ১ আলোক মিনিট = ১১১৬০০০০ মাইল (১৮০০০০০০ কিলোমিটার), 

🌿 ১ আলোক ঘন্টা = ৬৭১ মিলিয়ন মাইল (১.০৮ বিলিয়ন কিলোমিটার), 

🌿 ১ আলোক দিন = ১৬.১ বিলিয়ন মাইল ( ২৫.৯ বিলিয়ন কিলোমিটার), 

🌿 ১ আলোক বর্ষ = ৫.৮ ট্রিলিয়ন মাইল (৯.৪ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার বা ৯৪৬১০০০০০০০০০ কিলোমিটার), 

🌿 ১০০ আলোক বর্ষ = ৫৮৮ ট্রিলিয়ন মাইল (৯৪৬ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার), 

🌿 ১০০০০০ আলোক বর্ষ = ৫৮৮ কোয়াড্রিলিয়ন মাইল (৯৪৬ কোয়াড্রিলিয়ন কিলোমিটার) (আকাশগঙ্গা ছায়াপথকে অতিক্রম) । 

তাই, কিছুটা অনুমান করে দেখি এ মহাবিশ্ব কতোটা বিশাল! 

 সূর্য ☀️ থেকে বুধ গ্রহের গড় দূরত্ব ৫.৮ কোটি কিলোমিটার (৫৮ মিলিয়ন কিলোমিটার), সূর্য থেকে শুক্র গ্রহের দূরত্ব ১০.৮ কোটি কিলোমিটার (১০৮ মিলিয়ন কিলোমিটার বা ৬৭ মিলিয়ন মাইল), সূর্য থেকে পৃথিবী গ্রহের দূরত্ব ১৪.৯৬ কোটি কিলোমিটার (১ জ্যোতির্বিজ্ঞান একক বা এইউ), সূর্য থেকে মঙ্গল গ্রহের গড় দূরত্ব ২৩০ মিলিয়ন কিলোমিটার (১৪৩ মিলিয়ন মাইল, ২২ কোটি ৭৯ লক্ষ ৩৯ হাজার ১০০ কিলোমিটার), সূর্য থেকে বৃহস্পতি গ্রহের দূরত্ব ৭৭.৮ কোটি কিলোমিটার (৭৭৮.৫ মিলিয়ন কিলোমিটার), সূর্য থেকে শনি গ্রহের দূরত্ব ১৪৩ কোটি কিলোমিটার, সূর্য থেকে ইউরেনাস গ্রহের গড় দূরত্ব ২.৯ বিলিয়ন কিলোমিটার (১.৮ বিলিয়ন মাইল), সূর্য থেকে নেপচুন গ্রহের গড় দূরত্ব ৪.৫ বিলিয়ন কিলোমিটার (২.৮ বিলিয়ন মাইল, ৩০ জ্যোতির্বিজ্ঞান একক বা এইউ), সূর্য থেকে বামন গ্রহ প্লুটোর গড় দূরত্ব ৫.৯ বিলিয়ন কিলোমিটার (৩.৭ বিলিয়ন মাইল, ৩৯.৫ জ্যোতির্বিজ্ঞান একক বা এইউ), সূর্য থেকে ইনার ওয়াল অফ উর্ট ক্লাউডের দূরত্ব ৬৫ জ্যোতির্বিজ্ঞান একক বা এইউ (তাত্ত্বিকভাবে ১২০০০০ এইউ, ২ আলোকবর্ষ) এবং সূর্য থেকে নিকটবর্তী লাল বামন নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টৌরি বা বহিঃসৌর গ্রহ প্রক্সিমা সেন্টৌরি বি এর দূরত্ব ২৬৮৭৭০ জ্যোতির্বিজ্ঞান একক বা এইউ, ৪.৫২ আলোকবর্ষ । 

পৃথিবী 🌎 থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব প্রায় ৩৮৪৪০০ কিলোমিটার (প্রায় ২৩৮৮৫৫ মাইল), পৃথিবী থেকে বুধ গ্রহের দূরত্ব ১৯৩.৬৯ কিলোমিটার, পৃথিবী থেকে শুক্র গ্রহের দূরত্ব ১০০.৬৯ মিলিয়ন কিলোমিটার (৪.২ কোটি কিলোমিটার), পৃথিবী থেকে মঙ্গল গ্রহের গড় দূরত্ব প্রায় ৭.৭ কোটি কিলোমিটার (৩ কোটি ৮৬ লক্ষ মাইল বা ৩১৩.৯৬ মিলয়ন কিলোমিটার), পৃথিবী থেকে সৌরজগতের সর্ববৃহৎ গ্যাসীয় দানব গ্রহ বৃহস্পতির দূরত্ব ১৩৯৮২০ কিলোমিটার (প্রায় ৬৪০.৯৫ বিলিয়ন কিলোমিটার), পৃথিবী থেকে শনি গ্রহের দূরত্ব ১.৫২১১ বিলিয়ন কিলোমিটার (৮৮৭ মিলিয়ন মাইল, ১৪২৭০০০০০০ কিলোমিটার), পৃথিবী থেকে ইউরেনাস গ্রহের দূরত্ব ২.৮৪৩৩ বিলিয়ন কিলোমিটার, পৃথিবী থেকে নেপচুন গ্রহের দূরত্ব ৪.৫২৯৩ বিলিয়ন কিলোমিটার, পৃথিবী থেকে বামন গ্রহ প্লুটোর দূরত্ব ৭৫০ কোটি কিলোমিটার, পৃথিবী থেকে বৃহত্তম বহিঃসৌর গ্রহ প্রপ্লিড ১৩৩-৩৫৩ এর দূরত্ব ১১২০০০০ কিলোমিটার, পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব ১৪.৯৬ কোটি কিলোমিটার, পৃথিবী থেকে বৃহৎ ওল্ফ রায়েট নক্ষত্র আর ১৩৬এ১ এর দূরত্ব ৫৯৪৮৬০০০ কিলোমিটার, পৃথিবী থেকে বৃহত্তম নক্ষত্র ডব্লিওওএইচ জি৬৪ এর দূরত্ব ২১৪৪৭৫৮০০০ কিলোমিটার, পৃথিবী থেকে বিশাল কৃষ্ণগহ্বর ফিনিক্স এ* এর দূরত্ব ১১৭০০০০০০০০০০ কিলোমিটার, পৃথিবী থেকে বৃহত্তর নক্ষত্রপুঞ্জ ওমেগা সেন্টৌরি এর দূরত্ব ১৫০ আলোকবর্ষ, পৃথিবী থেকে বৃহৎ অতিনবতারার অবশিষ্টাংশ দি সিগনাস লুপের দূরত্ব ৫৫০ আলোকবর্ষ, পৃথিবী থেকে বৃহত্তম ট্যারান্টুলা নীহারিকার দূরত্ব ১৮০০ আলোকবর্ষ, পৃথিবী থেকে বৃহদাকার সর্পিল ছায়াপথ এনজিসি ৬৮৭২ এর দূরত্ব ৫২২০০০ আলোকবর্ষ, পৃথিবী থেকে বৃহত্তম ছায়াপথ ইএসও ৩৮৩-৭৬ এর দূরত্ব ১৭৬০০০০ আলোকবর্ষ, পৃথিবী থেকে বৃহৎ ছায়াপথ স্তবক ইআই গর্ডো এর দূরত্ব ১৫০০০০০০ আলোকবর্ষ, পৃথিবী থেকে বৃহত্তম বুটেস ভয়েডের দূরত্ব ৩৩০০০০০০০ আলোকবর্ষ, পৃথিবী থেকে বৃহত্তর ছায়াপথ মহাস্তবক লানিয়াকেয়া এর দূরত্ব ৫২০০০০০০০ আলোকবর্ষ, পৃথিবী থেকে বৃহত্তম গ্যালাকটিক কাঠামো দৈত্যাকার আর্ক এর দূরত্ব ৩৩০০০০০০০০ আলোকবর্ষ, পৃথিবী থেকে বৃহৎ আপাত নক্ষত্র বা কোয়েসার গোষ্ঠীর (হিউজ এলকিউজি) দূরত্ব ৪০০০০০০০০০ আলোকবর্ষ, পৃথিবী থেকে সবচেয়ে বড় গামা রশ্মি বিস্ফোরণ (জায়ান্ট জিআরবি রিং) বলয়ের দূরত্ব ৫৬০০০০০০০০ আলোকবর্ষ, পৃথিবী থেকে বিশাল মহাজাগতিক জাল কাঠামোর (হারকিউলিস-করোনা বোরিয়ালিস গ্রেট ওয়াল) দূরত্ব ১০০০০০০০০০০ আলোকবর্ষ, পৃথিবী থেকে পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের দূরত্ব ৯৩০০০০০০০০০ আলোকবর্ষ । 

আমাদের নিজস্ব বাসস্থান আকাশগঙ্গা ছায়াপথকে (The Milky Way Galaxy) কক্ষপথে যেতে সূর্যের ২৫০ মিলিয়ন বছর লাগে । এ আকাশগঙ্গা ছায়াপথ প্রায় ১০০০০০ আলোকবর্ষ জুড়ে বিস্তৃত এবং পুরু ১০০০ আলোকবর্ষ । ছায়াপথের কেন্দ্রস্থল থেকে আমাদের সৌরজগৎ প্রায় ২৬০০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত । বিস্ময়কর যে, এখানে প্রায় ২০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে যার মধ্যে ১টি নক্ষত্র হচ্ছে জলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্য । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন যে, আকাশগঙ্গা ছায়াপথে প্রায় ৩.২ ট্রিলিয়ন গ্রহ থাকতে পারে । নাসা এর তথ্যানুযায়ী আমাদের দৃষ্টি যেখানে পৌঁছাতে পারে এবং যে স্থান পর্যন্ত আলো আছে সেই পর্যবেক্ষণযোগ্য (৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে) মহাবিশ্বে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ছায়াপথ রয়েছে, যার মধ্যে আমাদের নিজস্ব ছায়াপথের অবস্থান খুবই নগন্য । 

তবে, এখানেই কি দৃশ্যমান মহাবিশ্বের পরিসমাপ্তি? 

না কি, এ সীমানার বাইরেও রয়েছে এক অন্ধকারময় অনন্ত মহাবিশ্ব- যে মহাজগৎ হয়তো অন্য কোনো অদৃশ্য পদার্থে পরিপূর্ণ যা দেখা যায় না । 


তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, Universe Science, Hashem Al-Ghaili, অন্তর্জাল (The Internet) । ছবি: বিশ্ব ও মহাকাশ , ক্যালটেক ।  

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ

অগ্নিঝরা ৭ই মার্চ ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ ৷

ঐতিহাসিক রমনার রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসমুদ্র, এক অবিস্মরণীয় দিন ৷

বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকণ্ঠে জ্বালাময়ী ভাষণ ৷

''এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'' ৷ 

উত্তাল পূর্ব পাকিস্তান ৷

নির্যাতিত ও শোষিত মানুষ মুক্তির জন্য তীব্রভাবে আন্দোলিত হয় ৷

পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ স্পৃহাকে শাণিত করে ৷

রৌদ্রদগ্ধ আকাঙ্খাকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে ৷

অধিকার বঞ্চিত বাঙালি জাতি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে ৷

বঙ্গবন্ধুর সতর্ক কৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণা ও দিকনির্দেশনা প্রদান ৷

সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি গ্রহণে ঐক্যবদ্ধ জাতি ।

মুক্তিকামী মানুষের মননে সৃষ্টি হয় দ্রোহের মহাপ্লাবন ৷

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুপ্রয়াস ও সাহস জাগিয়ে তোলে ৷

দুর্নিবার লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে আনার দৃঢ় প্রত্যয় গড়ে ওঠে ৷ 

বঙ্গবন্ধুর দরাজ কণ্ঠের কালজয়ী ভাষণ বাঙালির রক্তে আগুন লাগিয়ে দেয় ৷

যার পরিণতি— রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ৷

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বীর বাঙালি জাতি আত্মত্যাগের বিনিময়ে বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে পাক-হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে ৷

পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ ৷

বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ ঘটে এবং রচিত হয় মুক্তি, স্বাধীনতা ও আত্মপরিচয়ের ইতিহাস ৷

যার স্রষ্টা শেখ মুজিবুর রহমান এবং এটি তার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন ৷

বাংলা, বাঙালি, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ এক অবিচ্ছেদ্য সত্তা ৷

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের প্রাণস্পর্শী ভাষণ বঙ্গবন্ধুর অমর রচনা ৷

চেতনার বহ্নিশিখা ৷

অন্তহীন অনুপ্রেরণার উৎস ৷

বাঙালি জাতির মুক্তি সনদ ৷

মহান স্বাধীনতার অনন্য দলিল ৷

অসাধারণ বাগ্মিতা, দূরদর্শিতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে বঙ্গবন্ধু এ ভাষণে বাঙালি জাতির আবেগ, অনুভূতি, স্বপ্ন ও আকাঙ্খাকে তুলে ধরেন ৷

১৩টি ভাষায় অনূদিত ভাষণটি পৃথিবীর অন্যতম, উজ্জীবনী, ধ্রুপদী এবং অনুপ্রেরণাদায়ক ৷

এটি বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য, মানবজাতির অমূল্য সম্পদ এবং এক শাশ্বত মহাকাব্য ৷

এ ভাষণ যুগে যুগে বাঙালি জাতিসহ সকল মুক্তিকামী মানুষকে শক্তি, সাহস, দৃঢ়তা ও অনুপ্রেরণা যোগাবে ৷ 

https://toulot.com/n_members/ashraful710/activity/195535/ 


Tuesday, 28 January 2025

দূরত্ব

দূর, বহুদূর…

হোক না— শত, হাজার, লক্ষ কিংবা কোটি মাইল দূরত্ব । 

আকাশতো একটাই । 

এ অপার আকাশের রঙ নীল । 

নীলিমায় মিশে আছে তোমার-আমার নীল ভালোবাসা এবং স্বপ্নগুলো । 

আলোর গতির চেয়েও বেশি চোখের পলকের গতি । 

তোমার সংস্পর্শে আসি । 

নীল চোখের চাহনির গভীরতা অনুভব করি । 

এক ঐন্দ্রজালিক প্রসন্নতা । 

আমার অস্তিত্ব জুড়ে তোমার উপস্থিতি । 

যেখানে সুদীপ্ত ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রত্যয় গড়ে ওঠে । 

তোমার অনুপ্রেরণা আত্মবিশ্বাসকে শাণিত করে ।  

আমাদের অগ্রযাত্রাই দ্যুতিময় পথ দেখাবে আগামী প্রজন্মকে । 

জ্যোৎস্না রাতে দুই জনে হাত ধরে হেঁটে যাই মায়াবী সৈকতে । 

এক ফালি পূর্ণিমা চাঁদ । 

নম্র আলোর ঝলক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সমুদ্রের বিস্তীর্ণ জলরাশিতে । 

নয়ন ভরে দেখি তাদের শাশ্বত ভালোবাসার উচ্ছ্বাস । 💙 ©

আমার প্রণয়িনীর চোখ সূর্যের মত নয়

 My mistress’ eyes are nothing like the sun (Sonnet 130)  --------  William Shakespeare , 1564 –1616 My mistress’ eyes are nothing like the ...